📘 সিরাতের প্রচলিত ভুল 📄 রাসূল ﷺ-এর মদীনায় হিজরত

📄 রাসূল ﷺ-এর মদীনায় হিজরত


নবুওয়াতের দশম বছর ঐতিহাসিকদের কাছে নবীজির 'দুঃখের বছর' বলে পরিচিত। কারণ এ বছর নবীজির স্ত্রী খাদিজা পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। অল্প কয়েক দিন পরই নবীজির অভিভাবক আবু তালিব পরপারে পাড়ি জমান। বর্ণিত আছে, অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানেই সর্বাধিক প্রিয় আপনজন ও আশ্রয়দাতা অভিভাবককে হারিয়ে নবীজি খুবই কষ্ট পান। যার কারণে ওই বছরটি 'দুঃখের বছর' নামে পরিচিতি লাভ করে। এখন ব্যাপার হলো, এ কথাটি কতটুকু সঠিক!
বাস্তবতা হলো, কোনো সহিh হাদিস কিংবা ঐতিহাসিক বর্ণনায় এর কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি দুর্বল হাদিসের কোথাও নেই। সিরাত বিষয়ে যে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রয়েছে, সেখানেও এমন কিছু বলা হয়নি। যথা ইবনে ইসহাকের সিরাতগ্রন্থ, শাইখ সুহাইলি কর্তৃক ইবনে ইসহাকের সিরাতের ব্যাখ্যা, ইবনে কায়্যিম, ইবনে কাসির ও ইমাম জাহবি প্রমুখ কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনায় নবুওয়াতের দশম বছরকে দুঃখের বছর বলে অভিহিত করা হয়নি। এ ছাড়া ইমাম নববি এবং হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি হাদিসবিশারদও তাঁদের হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থে এ সম্পর্কে কিছু উল্লেখ করেননি।
তবে শাইখ সা'আতি ফাতহুর রাব্বানি গ্রন্থে বলেন, 'নবীজি নবুওয়াতের দশম বছরকে দুঃখের বছর বলে অভিহিত করেছেন। মাওয়াহিবুল লুদুনিয়া গ্রন্থে এমনটাই বর্ণিত হয়েছে।'
শাইখ আলবানি ড. বুতিকে লক্ষ করে এ উদ্ধৃতির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘তিনি কোন জায়গা থেকে এর উৎস খুঁজে পেলেন? আমি সাধ্যমতো যাচাই-বাছাই করেও এ সম্পর্কে কোনো গ্রহণযোগ্য সূত্র পাইনি। তিনি মাওয়াহিবুল লুদুনিয়া গ্রন্থের যে উদ্ধৃতি দিয়েছেন, সেখানে কাসতাল্লানি এই বর্ণনা এনেছেন। যার সূত্রে সায়েদ নামের একজনের কথা উল্লেখিত হয়েছে। এই সায়েদ কোন সায়েদ? যাকে শাইখ জারকানি তাঁর ব্যাখ্যায় ইবনে উবাইদ বাজলি নামে উল্লেখ করেছেন? এই বাজলি تو অজ্ঞাত, যাকে কেউই নির্ভরযোগ্য বলেনি।’
তবে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর তাকরিব গ্রন্থে সায়েদকে 'মাকবুল' বলে চিহ্নিত করেছেন। আর ইবনে হাজার তাকরিব গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, তিনি তাকরিব গ্রন্থে যাঁকে 'মাকবুল' বলে চিহ্নিত করেছেন, তাঁর বর্ণনার পেছনে সহায়ক সূত্র পাওয়া গেলে গ্রহণ করা যাবে। অন্যথায় তাঁকে হাদিস বর্ণনার ব্যাপারে নিতান্ত দুর্বল বলে আখ্যায়িত করা হবে। সে হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না।
আর মাওয়াহিবুল লুদুনিয়া গ্রন্থে কাসতালানি সায়েদের সূত্রে যে বর্ণনা এনেছেন, তা তিনি সনদ ছাড়াই উল্লেখ করেছেন। তাই ওই বর্ণনা দুর্বল বলে বিবেচিত হবে।
সর্বশেষে শাইখ আলবানি আরও বলেন, 'সায়েদ যদি অন্য কোনো মাধ্যমেও পরিচিত অথবা নির্ভরযোগ্য সাব্যস্ত হয়েও থাকে, এ সত্ত্বেও এ বর্ণনা গ্রহণ করা যাবে না।'
সর্বোপরি নবীজি ও তাঁর সাহাবিগণের ওপর মক্কায় কুরাইশরা যে অত্যাচার চালিয়েছিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তা ছাড়া সাধারণভাবে নবীজি মক্কি জীবনে কুরাইশ সম্প্রদায়ের যত যন্ত্রণা সহ্য করেছেন এবং তাঁর সাহাবিগণ যে অত্যাচার-নিপীড়ন ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলেন, সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম গ্রন্থে এ সম্পর্কে আয়েশা (রা.) এর সূত্রে সহিহ সনদে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা বলেন, 'একদিন আমি নবীজিকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কখনো উহুদের ভয়াবহ পরিস্থিতির চেয়ে আরও কঠিন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন কি না?' উত্তরে তিনি বললেন, 'আমি তোমার জাতির যে দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছি, তা তুমি হওনি।'
যথা সাহাবি আনাস ইবনে মালিকের সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবীজি বিরে মাউনা এলাকায় ৭০ জন কারি সাহাবিকে কোরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু সেখানকার কিছু বিশ্বাসঘাতক তাঁদের সবাইকে নির্মমভাবে শহীদ করে দেয়। এ খবর নবীজির কাছে পৌঁছালে তিনি এত কষ্ট পেয়েছিলেন যে এক মাস যাবৎ ওই বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে বদ-দোয়া করেন।'
এটা তো চতুর্থ হিজরির ঘটনা। এ ছাড়া মদিনায় হিজরতের পর বিভিন্ন সময়ে মুসলিমরা কাফের ও ইহুদিদের নানামুখী আক্রমণের শিকার হন। তৃতীয় হিজরিতে উহুদের যুদ্ধে একটু ভুলের জন্য ৭০ জন বীর সাহাবি শাহাদাতবরণ করেন। যাঁদের মধ্যে নবীজির চাচা হামজা, আনাস ইবনে নজর, জাবির-এর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আমর, নবীজির গোয়েন্দা সাহাবি হুজাইফার পিতা ইয়ামানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাহাবিগণ ছিলেন।
তা ছাড়া এই উহুদের যুদ্ধেই নবীজির দাঁত আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং কপালেও প্রচণ্ডভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। হিজরতর প্রথম তিন বছরের অল্প সময়ের মধ্যেই এসব দুর্ঘটনা ঘটে। নবীজি ও তাঁর জানবাজ সাহাবিদের ওপর দিয়ে যেন রক্তের তুফান বইয়ে যায়। এতে প্রায় দেড় শ সাহাবি নিহত হন এবং দুই শতাধিক সাহাবি গুরুতর আহত হন। অথচ নবীজি ওই বছর বা সময়কে এ জাতীয় কোনো নামে অভিহিত করেননি।
তবে ইতিহাস ও সিরাতের অনেক গ্রন্থেই এ জাতীয় ঘটনাবলির মূল বিবরণের আগে-পিছে আরও বিভিন্ন কথা জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর কোনো সহিহ সূত্র পাওয়া যায় না অথবা সরাসরি কোনো সাহাবির পক্ষ থেকেও এর সত্যায়ন প্রমাণিত হয়নি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px