📄 প্রথম আকাবার শপথ
মক্কার কুরাইশদের নির্যাতন থেকে রক্ষার জন্য ইসলামের প্রাথমিক যুগে কয়েকজন মুসলিম আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। তাঁরাই ইসলামের জন্য প্রথম হিজরতকারী। নবীজি তখন মক্কায় ছিলেন। ওই হিজরতকারীদের একজন ছিলেন সাহাবি উসমান ইবনে মাজউন।
তাঁরা আবিসিনিয়ায় যাওয়ার পর সেখানে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে মক্কার কুরাইশ সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করেছে। এ খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে আবিসিনিয়ার নবমুসলিম নারী-পুরুষ সকলেই অত্যন্ত আনন্দিত হয়। তারা ভাবতে লাগল, এবার তাহলে মাতৃভূমিতে নিরাপদে ফিরতে পারব। তাদের অনেকেই মক্কায় রওনা হয়। কিন্তু বাস্তবে এটা ছিল মিথ্যা খবর।
মক্কায় পৌঁছে তারা জানতে পারল, কুরাইশ কাফেররা আগের অবস্থায়ই আছে। নির্যাতনের মাত্রা একটুও কমেনি। তখন তারা চরম বিপদের সম্মুখীন হলো। এদিকে তাদের কারও কারও সঙ্গে কুরাইশের নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকায় কুরাইশের এসব লোক তাদেরকে বিশেষ নিরাপত্তায় থাকার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু যাদের সঙ্গে কুরাইশ সম্প্রদায়ের কারও সম্পর্ক ছিল না বা যারা একটু অসহায় ছিল, তাদের ওপর নির্যাতনের নয়া মাত্রা যোগ হয়। অথবা তারা কোনো রকম লুকিয়ে থাকতে থাকে।
উসমান ইবনে মাজউনও এ খবর শুনে মক্কায় ফিরে আসেন। কুরাইশ নেতা ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা তাঁকে তার বিশেষ নিরাপত্তায় থাকার প্রস্তাব দেয়। তিনি তার প্রস্তাব মেনে নেন। কিছুদিনের মধ্যে তিনি লক্ষ করলেন, নবীজির অনেক সাহাবি এখনো কুরাইশদের নানামুখী অত্যাচার-নিপীড়ন সয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের জীবনের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। ব্যাপারটি তাঁকে খুব পীড়া দেয়।
সকাল-বিকাল তিনি ওয়ালিদের নিরাপত্তায় মক্কার অলিগলিতে ঘুরে বেড়াবেন আর সাহাবিদের অত্যাচার নিজ চোখে দেখবেন, তা তিনি মেনে নিতে পারলেন না। উসমান ইবনে মাজউন তখনই ওয়ালিদের কাছে গিয়ে বললেন, 'আবু আবদে শামস, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করেছ। তোমার এই নিরাপত্তার কোনো প্রয়োজন আমার নেই। আমি তোমার নিরাপত্তা তোমাকে ফিরিয়ে দিলাম।' উত্তরে ওয়ালিদ বলল, 'উসমান, এ কী করছ! তুমি তোমার নিরাপত্তা আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছ?' উসমান বললেন, 'হ্যাঁ, আমি সত্যই বলেছি।' এরপর তিনি কাবা চত্বরের দিকে চলে যান।
ওই সময় লাবিদ ইবনে রবিআ কুরাইশদের এক মজলিসে কবিতা আবৃত্তি করছিল। উসমান সেখানে অংশগ্রহণ করেন। লাবিদ কবিতা আবৃত্তি করল, 'জেনে রাখো! আল্লাহ ছাড়া সবকিছুই নিঃশেষ হয়ে যাবে।' উত্তরে উসমান বললেন, 'তুমি সত্য বলেছ।' তখন লাবিদ বলল, 'জান্নাতের আরাম-আয়েশের আয়োজন ক্ষণস্থায়ী।' উসমান বললেন, 'এটা তুমি মিথ্যা বলছ। জান্নাতের নিয়ামত চিরস্থায়ী; সেগুলো কখনো নিঃশেষ হবে না।'
লাবিদ সবার উদ্দেশে বলল, 'হে কুরাইশ সম্প্রদায়! আমি তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী। তোমাদের বন্ধুকে কে কষ্ট দিচ্ছে? এ লোক কোথা থেকে এল?' কুরাইশের এক লোক বলল, 'লাবিদ, তুমি বলতে থাকো। এই লোকটা আমাদের বাপ-দাদাদের ধর্ম ত্যাগ করে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তার কথায় তুমি কিছু মনে করো না।'
কিন্তু লাবিদ যতই শির্ক ও কুফরির কথা কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে প্রকাশ করছিল, উসমান তার প্রতিবাদ করতে লাগলেন। একপর্যায়ে গালাগালকারী লোকটি তাঁর দিকে এগিয়ে যায় এবং সজোরে এমন এক চড় মারে, যার ফলে তাঁর এক চোখ আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এরপর লোকটি তাঁকে অপমানও করে। এদিকে ওয়ালিদ সামান্য দূরেই ছিল। সে সবকিছু দেখতে লাগল।
উসমানকে অপমানিত হতে দেখে সে তাঁকে বলতে লাগল, 'হে ভাতিজা, এবার দেখলে তো! তুমি আমার নিরাপত্তায় থাকতে চাইলে আজ তোমার এমন পরিস্থিতির শিকার হওয়া লাগত না।' উসমান বললেন, 'আল্লাহর কসম! আমার যে চোখ এখনো ভালো আছে, আল্লাহর জন্য এমন আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে গেলেও আমার আপত্তি নেই। আমি এটাই চাই।'
ওই ঘটনা ইবনে ইসহাক সালেহ ইবনে ইবরাহিমের শায়খ থেকে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই শায়খের পরিচয় পাওয়া যায়নি। বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে মুসা ইবনে উকবার সূত্রে বর্ণনা করেন। কিন্তু সেখানে কোনো সাহাবির নাম সরাসরি উল্লেখ নেই।
হাইসামি মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে বলেন, 'ইমাম তাবারানি কোনো সাহাবির সূত্র ছাড়া এ ঘটনা বর্ণনা করেন। যে সূত্রে ইবনে লাহিয়ার মতো দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন।'
তবে ইসলামের প্রাথমিক যুগে হিজরতের আগে মক্কা নগরীতে স্বয়ং নবীজি এবং তাঁর সাহাবিগণ বহুমুখী নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। হতভাগা কুরাইশ নেতারা তাঁদেরকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেয়নি। এ জাতীয় অনেক ঘটনা সহিহ সনদে হাদিসে অনেক জায়গায় বর্ণিত হয়েছে।
সহিহ বুখারিতে 'আনসার সাহাবিদের মর্যাদা' শীর্ষক অধ্যায়ে 'মক্কায় মুশরিকদের হাতে নবীজি ও সাহাবিগণ যেসব নির্যাতনের সম্মুখীন হন' শিরোনামে এ রকম ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। আর লাবিদের উপরিউক্ত কবিতার আবৃত্তি সহিহ সূত্রে প্রমাণিত। ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম আবু হুরায়রার সূত্রে লাবিদের কবিতার প্রসঙ্গ বর্ণনা করেছেন।
আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী নবমুসলিমদের কাছে মক্কার কুরাইশ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, সেটা গারানিকের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। তার সূত্রের ব্যাপারে শাইখ আলবানি বলেন, 'আমি এর কোনো সহিহ সনদ পাইনি।'
তা ছাড়া ইতিহাসে আছে, নবীজির এই সাহাবি উসমান ইবনে মাজউনই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যাঁকে মদিনা মুনাওয়ারার জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়। তবে এ প্রসঙ্গেও শাইখ আলবানি বলেন, 'আমি এ ব্যাপারে শক্তিশালী কোনো প্রমাণ বা সূত্র পাইনি। ওয়াকিদির সূত্রে এই কথা প্রচলিত হয়েছে।'
📄 দ্বিতীয় আকাবার শপথ
ইবনে ইসহাক তাঁর সিরাত গ্রন্থে তায়েফ নগরীর বিখ্যাত সাকিফ গোত্রের আলোচনা প্রসঙ্গে ইয়াজিদ ইবনে জিয়াদ কুরাজির সূত্রে বর্ণনা করেন, 'কুরাইশ সম্প্রদায়ের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে নবীজি মক্কার অদূরে তায়েফ নগরীতে গমন করেন। সেখানে পৌঁছার পর তিনি তায়েফের তিন নেতার সঙ্গে কথা বললেন। তিনি তাদেরকে আল্লাহ তায়ালার দ্বীনের প্রতি দাওয়াত দিলেন এবং আল্লাহর রাসুলের সাহায্যের আহ্বান জানালেন। কিন্তু তারা দাওয়াত কবুল করা তো দূরের কথা, আরবের প্রসিদ্ধ ঐতিহ্য মেহমানদারি পর্যন্ত করল না। একজন নবাগত মেহমানের প্রতি খাতির-যত্ন করার পরিবর্তে তারা নবীজির সঙ্গে অত্যন্ত রুক্ষ ও অভদ্র ব্যবহার করল। এমনকি তারা এটাও সহ্য করল না যে নবীজি এখানে অবস্থান করবেন।
'তাদের একজন নবীজিকে বলতে লাগল, "ওহ-হো! আল্লাহ তোমাকেই নবী করে পাঠিয়েছেন?” দ্বিতীয়জন বলল, "আল্লাহ কি তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে পাননি, যাকে নবী করে পাঠাবেন?” তৃতীয় নেতা বলল, "আমি তোমার সঙ্গে কথাই বলব না। কারণ তুমি সত্য নবী হয়ে থাকলে তুমি যা করছ, তা না মানলে বিপদ হবে। অপরদিকে তুমি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকলে আমি এরূপ লোকের সঙ্গে কথা বলতে চাই না।" তখন নবীজি তাদের ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করতে না চাইলে বিষয়টি গোপন রাখার অঙ্গীকার করলে তারা তাও প্রত্যাখ্যান করে।
'এরপর তারা শহরের কিছু ছেলেকে নবীজির পেছনে লাগিয়ে দেয়। নবীজির প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে শুরু করল, তালি বাজাতে লাগল, লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করতে লাগল। আঘাতে আঘাতে তাঁর শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে লাগল। একপর্যায়ে তিনি দুর্বল হয়ে গেলেন।
'কোনোমতে পায়ে ভর করে নবীজি উতবা ইবনে রবিআ এবং শাইবা ইবনে রবিআ নামীয় দুই ভাইয়ের আঙুর বাগানের প্রাচীরের আড়ালে আশ্রয় নিলেন। সেখানে তিনি বসে পড়লেন। এতই রক্ত তাঁর শরীর থেকে বের হচ্ছিল যে রক্তে ভিজে পায়ের সঙ্গে জুতা আটকে গিয়েছিল।'
ইবনে ইসহাক আরও বলেন, 'আঙুর বাগানের প্রাচীরের পাশে আশ্রয় নেওয়ার পর যখন বখাটে ছেলেদের থেকে নবীজি কিছুটা নিস্তার পেলেন, তখন তিনি আল্লাহ তায়ালার দরবারে যে করুণ আর্তি পেশ করেছিলেন, তা যে কারও হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তিনি তায়েফবাসীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ কিংবা বদ-দোয়াও দিলেন না। অত্যাচার-অপমানের দুঃখ-কষ্ট ও বেদনাকে মনে এক কোণে চাপা দিয়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে তাদের হেদায়াতের দোয়া করলেন।
'এর উত্তরে আল্লাহ তায়ালা পাহাড়ের ফেরেশতা পাঠিয়ে দেন। উতবা ও শাইবার বাগানে আঙুরগাছের নিচে বসে আসমানের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেললেন আর আল্লাহ তায়ালার দরবারে আরজ করতে লাগলেন, “হে দয়াময় আল্লাহ! আমি তোমার কাছেই আমার অসহায়ত্ব এবং মানুষের মধ্যে লাঞ্ছিত হওয়ার অভিযোগ করছি। হে পরম দয়ালু! তুমিই অসহায় লোকদের রব এবং তুমিই আমার রব। তুমি আমাকে কার কাছে সোপর্দ করছ, কোন অপরিচিত পরমানুষের প্রতি সোপর্দ করছ যে আমাকে দেখে বিরক্ত হয় এবং মুখকে বিকৃত করে। তুমি কি আমাকে এমন দুশমনের কবলে নিপতিত করছ, যে আমার ওপর ক্ষমতা রাখে। আল্লাহ! তুমি যদি আমার ওপর সন্তুষ্ট থাকো, তাহলে আমি কারও পরোয়া করি না। তোমার হেফাজতই আমার জন্য যথেষ্ট। আমি তোমার চেহারার নুরের অছিলায় আশ্রয় প্রার্থনা করছি যা দ্বারা সকল অন্ধকার আলোকিত হয়ে যায় এবং দুনিয়া ও আখেরাতের সব কাজ সমাধা হয়ে যায়। আমি এই বিষয়ে আশ্রয় চাচ্ছি যে আমার প্রতি তোমার রাগ হয় এবং তুমি আমার ওপর অসন্তুষ্ট হও। তুমি ছাড়া অন্য কোনো শক্তি নেই, ক্ষমতাও নেই।"'
এরপর ইবনে ইসহাক উতবা ও শাইবার দাস আদ্দাসের সঙ্গে নবীজির কথোপকথনের বিষয় উল্লেখ করেন। তিনি বর্ণনা করেন, 'আঙুর বাগানের প্রাচীরের পাশে বসে নবীজি যখন আল্লাহ তায়ালার দরবারে ফরিয়াদ করছিলেন, তখন উতবা ও শাইবা বাগানে এসে দূর থেকে নবীজিকে দেখতে পেল। নবীজির অসহায়ত্ব ও তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখে তাদের ভেতর দয়ার সঞ্চার হয়। তখন তারা দুই ভাই মিলে গাছ থেকে আঙুর পেড়ে তাদের দাস আদ্দাসের মাধ্যমে প্রেরণ করে নবীজিকে খেতে দেয়। আদ্দাস নবীজির কাছে এসে তাঁকে আঙুর খেতে দেয়। নবীজির মুখে আল্লাহ তায়ালার নাম শুনে আদ্দাস অবাক হয়ে যায় এবং এ সম্পর্কে সে নবীজিকে জিজ্ঞেস করে। নবীজি তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলে সে ইসলাম গ্রহণ করে...।'
শাইখ আলবানি বলেন, 'ইবনে ইসহাক এ ঘটনা মুহাম্মদ ইবনে কা'ব কুরাজির সূত্রে সহিহ সনদে বর্ণনা করলেও সরাসরি কোনো সাহাবির সূত্র উল্লেখ করেননি। এ ছাড়া নবীজি কর্তৃক তায়েফের নেতাদের কাছে দাওয়াত দেওয়ার বিষয়টি গোপন রাখার জন্য অনুরোধ এবং আল্লাহ তায়ালার দরবারে “আমি আপনার কাছে আমার নিজ দুর্বলতার অভিযোগ করছি” দোয়ার বিষয়টি কোনো সনদ ছাড়াই উল্লেখ করেছেন।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি ব্যাখ্যাগ্রন্থে লেখেন, 'মুসা ইবনে উকবা তাঁর মাগাজিতে ইবনে শিহাবের সূত্রে আবু তালিবের মৃত্যুর পর তায়েফবাসীর সমর্থন পাওয়ার উদ্দেশ্যে নবীজির তায়েফ গমন এবং সেখান থেকে লাঞ্ছিত হয়ে মক্কায় ফিরে আসার ঘটনা বর্ণনা করেছেন।'
মূল ঘটনা হচ্ছে, নবীজি তায়েফে ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়েছেন; কিন্তু তারা নবীজির দাওয়াত গ্রহণ করেনি। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম গ্রন্থে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।
হাফেজ ইরাকি তায়েফে নবীজির দোয়ার ব্যাপারে বলেন, 'ইবনে জাওজি “আল্লাহ! আপনার নিরাপত্তা আমার সামর্থ্যের চেয়েও বেশি বিস্তৃত” বাক্যের মাধ্যমে নবীজির তায়েফে যাত্রার সময় এই দোয়ার ঘটনা বর্ণনা করেছেন।'
এমনিভাবে ইবনে আবিদ দুনিয়া কিতাবুদ দোয়া গ্রন্থে হাসসান ইবনে আতিয়াহর সূত্রে নবীজির তায়েফের দোয়ার ঘটনা সরাসরি সাহাবির সূত্র উল্লেখ ছাড়া বর্ণনা করেন।
আবু আবদুল্লাহ ইবনে মানদাহ এই ঘটনা আবদুল্লাহ ইবনে জাফর বর্ণিত হাদিসের সূত্রে উল্লেখ করেছেন। এ সনদে এমন বর্ণনাকারী রয়েছে যিনি অজ্ঞাত।
📄 রাসূল ﷺ-এর মদীনায় হিজরত
নবুওয়াতের দশম বছর ঐতিহাসিকদের কাছে নবীজির 'দুঃখের বছর' বলে পরিচিত। কারণ এ বছর নবীজির স্ত্রী খাদিজা পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। অল্প কয়েক দিন পরই নবীজির অভিভাবক আবু তালিব পরপারে পাড়ি জমান। বর্ণিত আছে, অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানেই সর্বাধিক প্রিয় আপনজন ও আশ্রয়দাতা অভিভাবককে হারিয়ে নবীজি খুবই কষ্ট পান। যার কারণে ওই বছরটি 'দুঃখের বছর' নামে পরিচিতি লাভ করে। এখন ব্যাপার হলো, এ কথাটি কতটুকু সঠিক!
বাস্তবতা হলো, কোনো সহিh হাদিস কিংবা ঐতিহাসিক বর্ণনায় এর কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি দুর্বল হাদিসের কোথাও নেই। সিরাত বিষয়ে যে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রয়েছে, সেখানেও এমন কিছু বলা হয়নি। যথা ইবনে ইসহাকের সিরাতগ্রন্থ, শাইখ সুহাইলি কর্তৃক ইবনে ইসহাকের সিরাতের ব্যাখ্যা, ইবনে কায়্যিম, ইবনে কাসির ও ইমাম জাহবি প্রমুখ কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনায় নবুওয়াতের দশম বছরকে দুঃখের বছর বলে অভিহিত করা হয়নি। এ ছাড়া ইমাম নববি এবং হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি হাদিসবিশারদও তাঁদের হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থে এ সম্পর্কে কিছু উল্লেখ করেননি।
তবে শাইখ সা'আতি ফাতহুর রাব্বানি গ্রন্থে বলেন, 'নবীজি নবুওয়াতের দশম বছরকে দুঃখের বছর বলে অভিহিত করেছেন। মাওয়াহিবুল লুদুনিয়া গ্রন্থে এমনটাই বর্ণিত হয়েছে।'
শাইখ আলবানি ড. বুতিকে লক্ষ করে এ উদ্ধৃতির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘তিনি কোন জায়গা থেকে এর উৎস খুঁজে পেলেন? আমি সাধ্যমতো যাচাই-বাছাই করেও এ সম্পর্কে কোনো গ্রহণযোগ্য সূত্র পাইনি। তিনি মাওয়াহিবুল লুদুনিয়া গ্রন্থের যে উদ্ধৃতি দিয়েছেন, সেখানে কাসতাল্লানি এই বর্ণনা এনেছেন। যার সূত্রে সায়েদ নামের একজনের কথা উল্লেখিত হয়েছে। এই সায়েদ কোন সায়েদ? যাকে শাইখ জারকানি তাঁর ব্যাখ্যায় ইবনে উবাইদ বাজলি নামে উল্লেখ করেছেন? এই বাজলি تو অজ্ঞাত, যাকে কেউই নির্ভরযোগ্য বলেনি।’
তবে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর তাকরিব গ্রন্থে সায়েদকে 'মাকবুল' বলে চিহ্নিত করেছেন। আর ইবনে হাজার তাকরিব গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, তিনি তাকরিব গ্রন্থে যাঁকে 'মাকবুল' বলে চিহ্নিত করেছেন, তাঁর বর্ণনার পেছনে সহায়ক সূত্র পাওয়া গেলে গ্রহণ করা যাবে। অন্যথায় তাঁকে হাদিস বর্ণনার ব্যাপারে নিতান্ত দুর্বল বলে আখ্যায়িত করা হবে। সে হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না।
আর মাওয়াহিবুল লুদুনিয়া গ্রন্থে কাসতালানি সায়েদের সূত্রে যে বর্ণনা এনেছেন, তা তিনি সনদ ছাড়াই উল্লেখ করেছেন। তাই ওই বর্ণনা দুর্বল বলে বিবেচিত হবে।
সর্বশেষে শাইখ আলবানি আরও বলেন, 'সায়েদ যদি অন্য কোনো মাধ্যমেও পরিচিত অথবা নির্ভরযোগ্য সাব্যস্ত হয়েও থাকে, এ সত্ত্বেও এ বর্ণনা গ্রহণ করা যাবে না।'
সর্বোপরি নবীজি ও তাঁর সাহাবিগণের ওপর মক্কায় কুরাইশরা যে অত্যাচার চালিয়েছিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তা ছাড়া সাধারণভাবে নবীজি মক্কি জীবনে কুরাইশ সম্প্রদায়ের যত যন্ত্রণা সহ্য করেছেন এবং তাঁর সাহাবিগণ যে অত্যাচার-নিপীড়ন ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলেন, সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম গ্রন্থে এ সম্পর্কে আয়েশা (রা.) এর সূত্রে সহিহ সনদে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা বলেন, 'একদিন আমি নবীজিকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কখনো উহুদের ভয়াবহ পরিস্থিতির চেয়ে আরও কঠিন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন কি না?' উত্তরে তিনি বললেন, 'আমি তোমার জাতির যে দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছি, তা তুমি হওনি।'
যথা সাহাবি আনাস ইবনে মালিকের সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবীজি বিরে মাউনা এলাকায় ৭০ জন কারি সাহাবিকে কোরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু সেখানকার কিছু বিশ্বাসঘাতক তাঁদের সবাইকে নির্মমভাবে শহীদ করে দেয়। এ খবর নবীজির কাছে পৌঁছালে তিনি এত কষ্ট পেয়েছিলেন যে এক মাস যাবৎ ওই বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে বদ-দোয়া করেন।'
এটা তো চতুর্থ হিজরির ঘটনা। এ ছাড়া মদিনায় হিজরতের পর বিভিন্ন সময়ে মুসলিমরা কাফের ও ইহুদিদের নানামুখী আক্রমণের শিকার হন। তৃতীয় হিজরিতে উহুদের যুদ্ধে একটু ভুলের জন্য ৭০ জন বীর সাহাবি শাহাদাতবরণ করেন। যাঁদের মধ্যে নবীজির চাচা হামজা, আনাস ইবনে নজর, জাবির-এর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আমর, নবীজির গোয়েন্দা সাহাবি হুজাইফার পিতা ইয়ামানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাহাবিগণ ছিলেন।
তা ছাড়া এই উহুদের যুদ্ধেই নবীজির দাঁত আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং কপালেও প্রচণ্ডভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। হিজরতর প্রথম তিন বছরের অল্প সময়ের মধ্যেই এসব দুর্ঘটনা ঘটে। নবীজি ও তাঁর জানবাজ সাহাবিদের ওপর দিয়ে যেন রক্তের তুফান বইয়ে যায়। এতে প্রায় দেড় শ সাহাবি নিহত হন এবং দুই শতাধিক সাহাবি গুরুতর আহত হন। অথচ নবীজি ওই বছর বা সময়কে এ জাতীয় কোনো নামে অভিহিত করেননি।
তবে ইতিহাস ও সিরাতের অনেক গ্রন্থেই এ জাতীয় ঘটনাবলির মূল বিবরণের আগে-পিছে আরও বিভিন্ন কথা জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর কোনো সহিহ সূত্র পাওয়া যায় না অথবা সরাসরি কোনো সাহাবির পক্ষ থেকেও এর সত্যায়ন প্রমাণিত হয়নি।