📘 সিরাতের প্রচলিত ভুল > 📄 ইসরা ও মিরাজ

📄 ইসরা ও মিরাজ


ইতিহাসে বর্ণিত আছে, নবীজি আল্লাহ তায়ালার দরবারে উমরের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে দোয়া করেছিলেন। একাধিক সূত্রে বিভিন্ন শব্দে এটি বর্ণিত হয়েছে। তবে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে শুধু আয়েশার সূত্রে ইমাম হাকিমের সনদকে সহিহ বলে সাব্যস্ত করেন।

📘 সিরাতের প্রচলিত ভুল > 📄 মিরাজের কথা

📄 মিরাজের কথা


সুনানে ইবনে মাজাহ এবং সহিহ ইবনে হিব্বান গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি বলেন, 'উমরের ইসলাম গ্রহণের পর জিবরাইল আসমানবাসীকে আনন্দিত হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছিলেন।'
ইমাম হাকিম এই বর্ণনাকে সহিহ বলেছেন। তবে এর পরই ইমাম জাহবি বলেন, 'ওই বর্ণনার সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে খেরাশ রয়েছেন, যাকে ইমাম দারা কুতনি দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন।'
শাইখ সা'আদ হুমাইদ বলেন, 'এই বর্ণনা নিতান্ত দুর্বল।' তা ছাড়া শাইখ আলবানিও একে দুর্বল বর্ণনা বলে চিহ্নিত করেছেন।

📘 সিরাতের প্রচলিত ভুল > 📄 ইয়াসরিবের ছয় ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণ

📄 ইয়াসরিবের ছয় ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণ


ইমাম বুখারি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেন, নবীজি সুরা নাজমের সেজদার আয়াত পড়ে সেজদা করলেন। তাঁর সঙ্গে সমস্ত মুশরিক গোষ্ঠী এবং তাদের সঙ্গে জিন জাতিও সেজদা করে।
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, 'সর্বপ্রথম সুরা নাজমের আয়াত অবতীর্ণ হয়। নবীজির সঙ্গে সকলেই তাঁর পেছনে সেজদা করল। এক ব্যক্তিকে দেখলাম, মাটির টুকরো নিয়ে সে তার ওপর সেজদা করত। পরবর্তী সময়ে আমি তাকে কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে দেখি, সে ছিল উমাইয়া ইবনে খালফ।'
ইমাম মুসলিম তাঁর সহিহ মুসলিম গ্রন্থে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন, সেখানে উমাইয়ার নাম নেই।
অনেক তাফসিরকারক সুরা নাজমে উল্লেখিত লাত ও উজ্জার ব্যাখ্যায় একটি ঘটনা উল্লেখ করে থাকেন। তাঁরা বলেন, নবীজি এ আয়াত তেলাওয়াত করার পর বললেন, 'এখানে গারানিকে হয়েছে। আমি আশা করি, এদের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।' অতঃপর সেজদা করলেন এবং মুশরিক সম্প্রদায়ও তাঁর সঙ্গে সেজদায় লুটিয়ে পড়ল। তারা অবাক হয়ে বলতে লাগল, 'মুহাম্মদ তো এক দিন আগেও আমাদের খোদাদেরকে ভালো বলত না।'
এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন, 'আমি আপনার পূর্বে যেসব রাসুল ও নবী প্রেরণ করেছি, তারা যখনই কোনো কামনা-কল্পনা করেছে, তখনই শয়তান তাদের কল্পনায় কিছু মিশ্রণ করেছে। অতঃপর আল্লাহ শয়তান যা মিশ্রণ করে, তা দূর করে দেন এবং তাঁর আয়াতসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। আল্লাহ জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়।' (সুরা হজ, আয়াত ৫২)
অথচ এ জাতীয় কথার কোনো ভিত্তি নেই। এটি সত্যবাদীদের ওপর মিথ্যারোপ। এ বিষয়ে ইমাম ইবনে কাসির কত সুন্দর আলোচনা করেছেন। তিনি এ আয়াতের তাফসিরে বলেন, 'অধিকাংশ মুফাসসির এর ব্যাখ্যায় গারানিকের কাহিনি উল্লেখ করেছেন। আর এটিও তাঁরা উল্লেখ করেছেন যে, মুশরিক সম্প্রদায় যখন নবীজির সঙ্গে সেজদা করল, তখন হিজরতকারী অধিকাংশ মুসলিম মনে করেছিল, মক্কার সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাই তারা মক্কায় ফিরে আসে।'
এরপর ইবনে কাসির বলেন, 'এ জাতীয় বর্ণনা সবই মুরসাল ধারায় বর্ণিত। আমি এর কোনো ধারাবাহিক সূত্র পাইনি।'

📘 সিরাতের প্রচলিত ভুল > 📄 প্রথম আকাবার শপথ

📄 প্রথম আকাবার শপথ


মক্কার কুরাইশদের নির্যাতন থেকে রক্ষার জন্য ইসলামের প্রাথমিক যুগে কয়েকজন মুসলিম আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। তাঁরাই ইসলামের জন্য প্রথম হিজরতকারী। নবীজি তখন মক্কায় ছিলেন। ওই হিজরতকারীদের একজন ছিলেন সাহাবি উসমান ইবনে মাজউন।
তাঁরা আবিসিনিয়ায় যাওয়ার পর সেখানে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে মক্কার কুরাইশ সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করেছে। এ খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে আবিসিনিয়ার নবমুসলিম নারী-পুরুষ সকলেই অত্যন্ত আনন্দিত হয়। তারা ভাবতে লাগল, এবার তাহলে মাতৃভূমিতে নিরাপদে ফিরতে পারব। তাদের অনেকেই মক্কায় রওনা হয়। কিন্তু বাস্তবে এটা ছিল মিথ্যা খবর।
মক্কায় পৌঁছে তারা জানতে পারল, কুরাইশ কাফেররা আগের অবস্থায়ই আছে। নির্যাতনের মাত্রা একটুও কমেনি। তখন তারা চরম বিপদের সম্মুখীন হলো। এদিকে তাদের কারও কারও সঙ্গে কুরাইশের নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকায় কুরাইশের এসব লোক তাদেরকে বিশেষ নিরাপত্তায় থাকার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু যাদের সঙ্গে কুরাইশ সম্প্রদায়ের কারও সম্পর্ক ছিল না বা যারা একটু অসহায় ছিল, তাদের ওপর নির্যাতনের নয়া মাত্রা যোগ হয়। অথবা তারা কোনো রকম লুকিয়ে থাকতে থাকে।
উসমান ইবনে মাজউনও এ খবর শুনে মক্কায় ফিরে আসেন। কুরাইশ নেতা ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা তাঁকে তার বিশেষ নিরাপত্তায় থাকার প্রস্তাব দেয়। তিনি তার প্রস্তাব মেনে নেন। কিছুদিনের মধ্যে তিনি লক্ষ করলেন, নবীজির অনেক সাহাবি এখনো কুরাইশদের নানামুখী অত্যাচার-নিপীড়ন সয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের জীবনের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। ব্যাপারটি তাঁকে খুব পীড়া দেয়।
সকাল-বিকাল তিনি ওয়ালিদের নিরাপত্তায় মক্কার অলিগলিতে ঘুরে বেড়াবেন আর সাহাবিদের অত্যাচার নিজ চোখে দেখবেন, তা তিনি মেনে নিতে পারলেন না। উসমান ইবনে মাজউন তখনই ওয়ালিদের কাছে গিয়ে বললেন, 'আবু আবদে শামস, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করেছ। তোমার এই নিরাপত্তার কোনো প্রয়োজন আমার নেই। আমি তোমার নিরাপত্তা তোমাকে ফিরিয়ে দিলাম।' উত্তরে ওয়ালিদ বলল, 'উসমান, এ কী করছ! তুমি তোমার নিরাপত্তা আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছ?' উসমান বললেন, 'হ্যাঁ, আমি সত্যই বলেছি।' এরপর তিনি কাবা চত্বরের দিকে চলে যান।
ওই সময় লাবিদ ইবনে রবিআ কুরাইশদের এক মজলিসে কবিতা আবৃত্তি করছিল। উসমান সেখানে অংশগ্রহণ করেন। লাবিদ কবিতা আবৃত্তি করল, 'জেনে রাখো! আল্লাহ ছাড়া সবকিছুই নিঃশেষ হয়ে যাবে।' উত্তরে উসমান বললেন, 'তুমি সত্য বলেছ।' তখন লাবিদ বলল, 'জান্নাতের আরাম-আয়েশের আয়োজন ক্ষণস্থায়ী।' উসমান বললেন, 'এটা তুমি মিথ্যা বলছ। জান্নাতের নিয়ামত চিরস্থায়ী; সেগুলো কখনো নিঃশেষ হবে না।'
লাবিদ সবার উদ্দেশে বলল, 'হে কুরাইশ সম্প্রদায়! আমি তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী। তোমাদের বন্ধুকে কে কষ্ট দিচ্ছে? এ লোক কোথা থেকে এল?' কুরাইশের এক লোক বলল, 'লাবিদ, তুমি বলতে থাকো। এই লোকটা আমাদের বাপ-দাদাদের ধর্ম ত্যাগ করে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তার কথায় তুমি কিছু মনে করো না।'
কিন্তু লাবিদ যতই শির্ক ও কুফরির কথা কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে প্রকাশ করছিল, উসমান তার প্রতিবাদ করতে লাগলেন। একপর্যায়ে গালাগালকারী লোকটি তাঁর দিকে এগিয়ে যায় এবং সজোরে এমন এক চড় মারে, যার ফলে তাঁর এক চোখ আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এরপর লোকটি তাঁকে অপমানও করে। এদিকে ওয়ালিদ সামান্য দূরেই ছিল। সে সবকিছু দেখতে লাগল।
উসমানকে অপমানিত হতে দেখে সে তাঁকে বলতে লাগল, 'হে ভাতিজা, এবার দেখলে তো! তুমি আমার নিরাপত্তায় থাকতে চাইলে আজ তোমার এমন পরিস্থিতির শিকার হওয়া লাগত না।' উসমান বললেন, 'আল্লাহর কসম! আমার যে চোখ এখনো ভালো আছে, আল্লাহর জন্য এমন আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে গেলেও আমার আপত্তি নেই। আমি এটাই চাই।'
ওই ঘটনা ইবনে ইসহাক সালেহ ইবনে ইবরাহিমের শায়খ থেকে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই শায়খের পরিচয় পাওয়া যায়নি। বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে মুসা ইবনে উকবার সূত্রে বর্ণনা করেন। কিন্তু সেখানে কোনো সাহাবির নাম সরাসরি উল্লেখ নেই।
হাইসামি মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে বলেন, 'ইমাম তাবারানি কোনো সাহাবির সূত্র ছাড়া এ ঘটনা বর্ণনা করেন। যে সূত্রে ইবনে লাহিয়ার মতো দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন।'
তবে ইসলামের প্রাথমিক যুগে হিজরতের আগে মক্কা নগরীতে স্বয়ং নবীজি এবং তাঁর সাহাবিগণ বহুমুখী নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। হতভাগা কুরাইশ নেতারা তাঁদেরকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেয়নি। এ জাতীয় অনেক ঘটনা সহিহ সনদে হাদিসে অনেক জায়গায় বর্ণিত হয়েছে।
সহিহ বুখারিতে 'আনসার সাহাবিদের মর্যাদা' শীর্ষক অধ্যায়ে 'মক্কায় মুশরিকদের হাতে নবীজি ও সাহাবিগণ যেসব নির্যাতনের সম্মুখীন হন' শিরোনামে এ রকম ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। আর লাবিদের উপরিউক্ত কবিতার আবৃত্তি সহিহ সূত্রে প্রমাণিত। ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম আবু হুরায়রার সূত্রে লাবিদের কবিতার প্রসঙ্গ বর্ণনা করেছেন।
আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী নবমুসলিমদের কাছে মক্কার কুরাইশ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, সেটা গারানিকের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। তার সূত্রের ব্যাপারে শাইখ আলবানি বলেন, 'আমি এর কোনো সহিহ সনদ পাইনি।'
তা ছাড়া ইতিহাসে আছে, নবীজির এই সাহাবি উসমান ইবনে মাজউনই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যাঁকে মদিনা মুনাওয়ারার জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়। তবে এ প্রসঙ্গেও শাইখ আলবানি বলেন, 'আমি এ ব্যাপারে শক্তিশালী কোনো প্রমাণ বা সূত্র পাইনি। ওয়াকিদির সূত্রে এই কথা প্রচলিত হয়েছে।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00