📄 হামযাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা)
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, মক্কার আসলাম গোত্রের এক নবমুসলিম বলেছেন, 'একদিন নবীজি সাফা পাহাড়ের পাশ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। এমন সময় আবু জাহল তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করে। সে নবীজিকে ইচ্ছেমতো গালাগাল করে এবং তাঁর নবুওয়াতকে কটাক্ষ করে। সাফা পাহাড়ের পাশে আবদুল্লাহ ইবনে জাদ'আনের বাড়ি ছিল। তার দাস বাড়ির ভেতর থেকে আবু জাহলের সব কথা শোনে। নবীজি আবু জাহলকে কিছুই বললেন না।
'ওদিকে নবীজির চাচা হামজা (রা.) সবেমাত্র শিকার থেকে ঘরে ফিরেছেন। ইবনে জাদ'আনের দাস হামজার কাছে এসে সব বলে দেয়। নিজ ভাতিজার সঙ্গে এহেন দুর্ব্যবহারের কথা শুনে হামজা আবু জাহলের ওপর খেপে যান। রাগে তাঁর চেহারা লাল হয়ে যায়। বংশীয় আত্মমর্যাদা জেগে ওঠে তাঁর। 'হামজা তখনই ঘর থেকে বের হয়ে আবু জাহলের কাছে যান। আবু জাহলের মাথায় সজোরে আঘাত করে বলতে থাকেন, "তুমি আমার ভাতিজাকে কটাক্ষ করছ। তোমার তো সাহস কম নয়! অথচ সে যে দ্বীনের দাওয়াত দেয়, আমি তা বিশ্বাস করি। আমি তার ওপর ইমান এনেছি।"'
ইমাম হাকিম ইবনে ইসহাকের এই সূত্রেই উপরিউক্ত ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে এর সূত্রে সরাসরি সাহাবির নাম না থাকায় ইমাম জাহবি এই বর্ণনাকে মুরসাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তা ছাড়া ইবনে ইসহাক যার কাছ থেকে এই ঘটনা শুনেছেন, তার কোনো পরিচয় ইতিহাসে পাওয়া যায় না। ইবনে সা'আদ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে ওই ঘটনা ওয়াকিদির সূত্রে সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন।
ইমাম হাইসামি মাজমাউজ জাওয়ায়েد গ্রন্থে লেখেন, 'শাইখ তাবারানি এ ঘটনা মুহাম্মদ ইবনে কা'ব কুরাজির সূত্রে বর্ণনা করলেও কোনো সাহাবির নাম উল্লেখ করেননি। তবে তাঁর সনদের বর্ণনাকারীরা সহিহ হাদিসের গ্রন্থসমূহের বর্ণনাকারীদের অন্যতম।'
ড. আকরাম উমরি বলেন, 'হামজা মক্কায় নবীজির কঠিন সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু উপরিউক্ত বর্ণনায় যেভাবে তাঁর ইসলাম গ্রহণের চিত্রায়ণ করা হয়েছে, এর সহিহ কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।'
📄 মক্কী জীবনে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
এ ঘটনায় ইসলামের এক মহান শিক্ষা ও নবীজির নবুওয়াতের বিশেষ নিদর্শনের আভাস পাওয়া যায়।
'তা হচ্ছে, প্রাচীন যুগে আরব জাতি পক্ষপাত ও নিজেদের লোকদের সাফাই গাওয়ার মধ্যে ছিল সর্বসেরা। অন্যায় দেখলেও নিজেদের আপনজনের বেলায় তারা অন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাবের পর যখন তাদের হৃদয়ে ইমানের আলো উদ্ভাসিত হয়, তখন তারা যেন আমূল পাল্টে যায়। যার প্রমাণ উপরিউক্ত ঘটনা।
'শুধু আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভ ও নবীজির ভালোবাসায় আরবের এ সন্তানেরাই নিজেদের পিতাকে অথবা নিজের কলিজার টুকরা সন্তানকেও হত্যা করতে দ্বিধা করত না। অথচ মদিনার আনসারদের সঙ্গে নবীজির কোনো রক্ত বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল না। শুধু ইমানের খাতিরে তাঁরা নিজেদের সব ইসলামের জন্য বিসর্জন দেন।
'নবীজিকে মক্কা থেকে তাঁরই আপনজনেরা বিতাড়িত করেছিল। তাঁর গোত্রের নেতারা তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেনি। যদি নবীজির আপনজনেরা তাঁর ওপর প্রথমেই ইমান আনত, তা হলে হয়তো-বা ইতিহাসে কেউ লিখত, নিজেদের লোক বলেই তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে। আর এমন সবাই করে থাকে। কারণ নিজের লোককে কে না বিশ্বাস করে! কিন্তু নবীজির ক্ষেত্রে তা হয়নি।
'মক্কা থেকে বহুদূরে সম্পূর্ণ অপরিচিত লোকেরা প্রথমে প্রিয় নবীজির জন্য এগিয়ে আসে। তারা তাঁর ওপর ইমান এনে তাঁকে বরণ করে নেয়। এরপর তাঁরা নবীজির ভালোবাসায় আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের আশায় নিজেদের আপনজনকে ছেড়ে কথা বলেনি। ইসলাম এসে তাদের অন্তরকে বিশুদ্ধ করে দেয়, যা বহু যুগ ধরে জাহেলিয়াতের বর্বরতায় কলুষিত হয়ে ছিল।'
📄 আবু তালিব ও রাসূল ﷺ-এর সাথে কোরাইশদের বৈঠক
ইয়াকুব ইবনে উতবার সূত্রে ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নবীজি যখন ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন, তখন একপর্যায়ে কুরাইশ নেতারা এতে বিরক্ত হয়ে নবীজির চাচা আবু তালিবের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে।
আবু তালিব ঘরে এসে নবীজিকে ডেকে বললেন, 'ভাতিজা, দেখো, তোমার গোত্রের লোকেরা তোমার বিরুদ্ধে নানা কথা রটাচ্ছে। তুমি এমন কোনো কিছু করো না, যাতে তা সামাল দিতে আমি অপারগ হয়ে যাই অথবা তোমারও যেন কষ্ট না হয়।' নবীজি ভাবতে লাগলেন, হয়তো-বা চাচা তাঁর ব্যাপারে অতিমাত্রায় দুশ্চিন্তা করছেন। নবীজি কোনো উত্তর দিলেন না।
কিন্তু মক্কার কুরাইশরা থেমে থাকেনি। তাঁকে প্রতিহত করার জন্য তারা কতই না সলাপরামর্শ করেছে, ষড়যন্ত্র করেছে, এর কোনো ইয়ত্তা নেই। একপর্যায়ে তারা নবীজির কাছে তিনটি প্রস্তাব নিয়ে এল। পৃথিবীর লাভ- লোকসানের হিসাবের বিবেচনায় এগুলো ছিল খুবই লাভজনক ও মোহনীয় প্রস্তাব।
প্রথম প্রস্তাব: আপনি যদি নেতৃত্ব চান, তাহলে আপনাকে আরবের নেতা বানিয়ে দেওয়া হবে। সমগ্র আরব আপনার কথায় ওঠাবসা করবে।
দ্বিতীয় প্রস্তাব: আপনি যদি আরবের সর্বাধিক সুন্দরী নারীকে বিয়ে করতে চান, তাহলে আপনাকে বিয়ে করিয়ে দেওয়া হবে।
তৃতীয় প্রস্তাব: আপনি যদি আরবের শ্রেষ্ঠ ধনী হতে চান, তাহলে আপনাকে বিপুল ধন-সম্পত্তির অধিকারী করা হবে।
তবে এর বিনিময়ে আমাদের একটি কথা মেনে নিতে হবে। আপনি যে নতুন দাওয়াতের পয়গাম দিচ্ছেন, তা বন্ধ করে দিতে হবে।
এর উত্তরে নবীজি কী করলেন? একটা অসম্ভব বিষয়ের উদাহরণ দিয়ে তাদের সব প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, 'তোমরা যদি আমার এক হাতে সূর্য এবং অপর হাতে চাঁদ এনে দাও, এর পরও আল্লাহ তায়ালা আমাকে যে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন, তা আমি কখনোই ছেড়ে দিতে পারি না। হয়তো-বা এ দাওয়াতি কার্যক্রম সফল হবে, নয়তো আমি শেষ হয়ে যাব।'
এরপর নবীজি কেঁদে দিলেন। নিজের চাচার কষ্ট ও তাঁর নিজের অসহায়ত্ব তাঁকে ঘিরে ধরল। অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন। নবীজি যখন ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন আবু তালিব তাঁকে ডাক দিয়ে বললেন, 'ভাতিজা, তুমি তোমার কাজ চালিয়ে যাও। আল্লাহর কসম! তোমাকে আমি কখনোই একা ছেড়ে দেব না।'
শাইখ আলবানি বলেন, 'এ ঘটনার সনদে দুর্বলতা ও বিচ্ছিন্নতা বিদ্যমান। তবে ইয়াহইয়া ইবনে উতবা নির্ভরযোগ্য তাবে-তাবেয়িদের অন্যতম। ১২৮ হিজরিতে তাঁর ইন্তেকাল হয়। অবশ্য হাসান পর্যায়ের সনদে অন্য আরেক সূত্রে আমি এ হাদিস অন্য জায়গায় পেয়েছি। তবে সেখানে শব্দের কিছু ভিন্নতা রয়েছে।' সেখানে বলা হয়েছে, নবীজি কুরাইশদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, 'তোমরা আমার হাতে আগুনের ফুলকি অর্থাৎ সূর্য এনে দিলেও আমি এ দ্বীন ছাড়তে পারব না।'
আবু জাফর বাখতারি এবং ইবনে আসাকির ওই ঘটনা আবু ইয়ালার সূত্রে ইউনুস ইবনে বুকাইরের সনদে আবু তালিবের পুত্র উকাইল থেকে বর্ণনা করেছেন। উকাইল বলেন, 'কুরাইশদের অভিযোগের পর নবীজি আসমানের দিকে দৃষ্টি দিয়ে উপরিউক্ত কথা বললেন। তখন উত্তরে আবু তালিব অভিযোগকারীদের শুনিয়ে বললেন, আমার ভাতিজা মিথ্যা বলেনি। তোমরা ফিরে যাও।'
শাইখ আলবানি এ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, 'এর সনদ হাসান। এর বর্ণনাকারীরা সবাই সহিহ মুসলিম গ্রন্থের বর্ণনাকারী। তবে ইউনুস ইবনে বুকাইর ও তালহা ইবনে ইয়াহইয়া সম্পর্কে কিছু সমালোচনা শুনতে পাওয়া যায়। কিন্তু তাতে সমস্যা নেই।'
ইমাম জাহবি উকাইলের বর্ণনার ব্যাপারে বলেন, 'ইমাম বুখারি এমনই আবু কুরাইব থেকে ইউনুসের সূত্রে তারিখ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।' হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানির সনদকে উত্তম সনদ বলে ব্যক্ত করেছেন।
ওয়ালিদ ইবনে মুগিরার পুত্রের ব্যাপারে আবু তালিবের প্রতি কুরাইশদের অভিনব প্রস্তাব
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, কুরাইশ নেতারা যখন দেখল, আবু তালিব তাদের কোনো প্রস্তাবেই সায় দিচ্ছেন না; বরং উল্টো তিনি স্বীয় ভাতিজা মুহাম্মদকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন, এর সঙ্গে নবীজির কোনো বিপদ-আপদ কিংবা সমস্যা সৃষ্টি হলে আবু তালিব নিজে তা প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন, তখন কুরাইশদের যেন ঘুম হারাম হয়ে গেল।
তারা এ বিষয়ে রাতদিন সলাপরামর্শ করতে থাকে। কী করে মুহাম্মদ ও তাঁর চাচা আবু তালিবের ব্যাপারে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। এদিকে সমগ্র মক্কায় আবু তালিব ছিলেন গণ্যমান্য ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাই কুরাইশরা তাঁকে খেপাতেও চাচ্ছিল না, আবার নবীজিকেও বাগে আনতে পথ খুঁজছিল।
একদিন আবু তালিব তাঁর বাড়িতে একাকী অবস্থান করছিলেন। কুরাইশদের কয়েকজন তাঁর কাছে এসে অভিনব এক প্রস্তাব করে বসে। তারা সঙ্গে করে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরার পুত্র উমারাকে নিয়ে যায় এবং বলে, 'হে আবু তালিব, তোমার তো সেবা ও দেখাশোনার জন্য একজনকে খুব দরকার। এক কাজ করো, আমরা তোমার জন্য ওয়ালিদের পুত্র উমারাকে নিয়ে এসেছি। ছেলেটি দেখতেও সুদর্শন আবার বুদ্ধিও আছে। তুমি একে তোমার সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে নাও এবং তোমার ভাতিজা মুহাম্মদকে আমাদের হাতে তুলে দাও।
'মুহাম্মদ আমাদের বাপ-দাদাদের অপমান করছে। তোমার ও আমাদের ধর্মে বিবাদ সৃষ্টি করছে। ঘরে ঘরে পিতার থেকে পুত্রকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। সমাজের কিছু নির্বোধ ও বোকাদের নিজের দলে টেনে পুরো সমাজের বিরুদ্ধে সে অবস্থান নিয়েছে। আমরা তাকে শেষ করে দেব। এটাই ভেবে দেখেছি, এখনই একটা মিটমাট করে নেওয়া দরকার। তাহলে ভবিষ্যতে তেমন বেগ পেতে হবে না; অন্যথায় এ সমস্যা আরও বেড়ে যাবে। এতে আমাদের পরস্পরে ভুল-বোঝাবুঝিও দূর হবে এবং আগের মতো আমরা মিলেমিশে থাকতে পারব।'
উত্তরে আবু তালিব তাদের উদ্দেশে বললেন, 'আল্লাহর কসম! তোমরা আমার প্রতি ন্যায়বিচার করোনি। বাহ! তোমরা তোমাদের পুত্রকে আমার তত্ত্বাবধানে দেবে এবং আমি তার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করব, আর আমি তোমাদের হাতে আমার পুত্রতুল্য ভাতিজাকে তুলে দেব; এরপর তোমরা তাকে হত্যা করবে।
'আল্লাহর কসম! এমনটা আমি কখনোই হতে দেব না। তোমরা কি জানো না, উটনী নিজের বাচ্চাকে হারিয়ে ফেললে শুধু ওর বাচ্চাকেই খোঁজে!'
তখন মুতইম ইবনে আদি ইবনে নওফেল ইবনে আবদে মানাফ আবু তালিবকে লক্ষ করে বলল, 'আমরা তোমার জাতির ব্যাপারে তোমার সঙ্গে ন্যায়বিচার করতেই এসেছি। আমাদের মনে হচ্ছে, তুমি আমাদের প্রস্তাব মেনে নেবে না।'
উত্তরে আবু তালিব বললেন, 'আল্লাহর কসম! তারা আমার সঙ্গে ন্যায়বিচার করেনি। আর তুমি আমাকে অপমান করতে এবং পুরো জাতিকে আমার বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চাইছ। তোমার যা খুশি করতে পারো। আমি এর মধ্যে নেই।'
উল্লেখ্য, ইবনে ইসহাক সরাসরি কোনো সাহাবির সূত্র ছাড়াই এটা বর্ণনা করেছেন। তবে ইমাম জাহবি তারিখুল ইসলাম গ্রন্থের সিরাত অধ্যায়ে ইবনে ইসহাকের সূত্রে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ইবনে সা'আদও তাবাকাত গ্রন্থে ওয়াকিদির সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করেন।
ইবনে কাসির ওই ঘটনার বিশ্লেষণে একটি রহস্য উদ্ঘাটন করে বলেন, 'নবীজিকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেও চাচা আবু তালিবের ইসলাম গ্রহণ না করার পেছনে আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহস্য লুক্কায়িত আছে। কারণ আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ করলে কুরাইশ জাতি তাঁকে মোটেই ভয় পেত না; বরং তখন সবার আগে তাঁকেই শেষ করে দিত। এর ফলে প্রিয় নবীজি আশ্রয়হীন হয়ে পড়তেন এবং কুরাইশদের বর্বরতার শিকার হতেন। আবু তালিব বিধর্মী থাকার ফলে তাঁর জীবদ্দশায় কুরাইশ নেতারা প্রিয় নবীজির বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার দুঃসাহস করেনি।'
অন্য জায়গায় ইবনে কাসির বলেন, 'সর্বোপরি এটা ছিল আল্লাহ তায়ালার সিদ্ধান্ত। এর ভালো-মন্দ তিনিই জানেন। কাফেরদের জন্য ইস্তেগফার কিংবা দোয়া করার ওপর নিষেধাজ্ঞা না থাকলে আমরা অবশ্যই তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতাম।'
📄 দুঃখের বছর
নবুওয়াতের দশম বছর ঐতিহাসিকদের কাছে নবীজির 'দুঃখের বছর' বলে পরিচিত। কারণ এ বছর নবীজির স্ত্রী খাদিজা পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। অল্প কয়েক দিন পরই নবীজির অভিভাবক আবু তালিব পরপারে পাড়ি জমান। বর্ণিত আছে, অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানেই সর্বাধিক প্রিয় আপন দুই আশ্রয়দাতা অভিভাবককে হারিয়ে নবীজি খুবই কষ্ট পান। যার কারণে এ বছরটি 'দুঃখের বছর' নামে পরিচিতি লাভ করে। এখন ব্যাপার হলো, এই কথাটি কতটুকু সঠিক!
বাস্তবতা হলো, কোনো সহিহ হাদিস কিংবা ঐতিহাসিক বর্ণনায় এর উল্লেখ নেই। এমনকি দুর্বল হাদিসের কোথাও নেই। সিরাত বিষয়ে যে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রয়েছে, সেখানেও এমন কিছু বলা হয়নি। যথা ইবনে ইসহাকের সিরাতগ্রন্থ, শাইখ সুহাইলি কর্তৃক ইবনে ইসহাকের সিরাতের ব্যাখ্যা, ইবনে কায়্যিম, ইবনে কাসির ও ইমাম জাহবি প্রমুখ কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনায় নবুওয়াতের দশম বছরকে দুঃখের বছর বলে অভিহিত করা হয়নি। এ ছাড়া ইমাম নববি এবং হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি হাদিসবিশারদও তাঁদের হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থে এ সম্পর্কে কিছু উল্লেখ করেননি।
তবে শাইখ সা'আতি ফাতহুর রাব্বানি গ্রন্থে বলেন, 'নবীজি নবুওয়াতের দশম বছরকে দুঃখের বছর বলে অভিহিত করেছেন। মাওয়াহিবুল লুদুনিয়া গ্রন্থে এমনটাই বর্ণিত হয়েছে।'
শাইখ আলবানি ড. বুতিকে লক্ষ করে এ উদ্ধৃতির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘তিনি কোন জায়গা থেকে এর উৎস খুঁজে পেলেন? আমি সাধ্যমতো যাচাই-বাছাই করেও এ সম্পর্কে কোনো গ্রহণযোগ্য সূত্র পাইনি। তিনি মাওয়াহিবুল লুদুনিয়া গ্রন্থের যে উদ্ধৃতি দিয়েছেন, সেখানে কাসতাল্লানি এই বর্ণনা এনেছেন। যার সূত্রে সায়েদ নামের একজনের কথা উল্লেখিত হয়েছে। এই সায়েদ কোন সায়েদ? যাকে শাইখ জারকানি তাঁর ব্যাখ্যায় ইবনে উবাইদ বাজলি নামে উল্লেখ করেছেন? এই বাজলি তো অজ্ঞাত, যাকে কেউই নির্ভরযোগ্য বলেনি।’
তবে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর তাকরিব গ্রন্থে সায়েদকে 'মাকবুল' বলে চিহ্নিত করেছেন। আর ইবনে হাজার তাকরিব গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, তিনি তাকরিব গ্রন্থে যাঁকে 'মাকবুল' বলে চিহ্নিত করেছেন, তাঁর বর্ণনার পেছনে সহায়ক সূত্র পাওয়া গেলে গ্রহণ করা যাবে। অন্যথায় তাঁকে হাদিস বর্ণনার ব্যাপারে নিতান্ত দুর্বল বলে আখ্যায়িত করা হবে। সে হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না।
আর মাওয়াহিবুল লুদুনিয়া গ্রন্থে কাসতালানি সায়েদের সূত্রে যে বর্ণনা এনেছেন, তা তিনি সনদ ছাড়াই উল্লেখ করেছেন। তাই ওই বর্ণনা দুর্বল বলে বিবেচিত হবে।
সর্বশেষে শাইখ আলবানি আরও বলেন, 'সায়েদ যদি অন্য কোনো মাধ্যমেও পরিচিত অথবা নির্ভরযোগ্য সাব্যস্ত হয়েও থাকে, এ সত্ত্বেও এ বর্ণনা গ্রহণ করা যাবে না।'
সর্বোপরি নবীজি ও তাঁর সাহাবিগণের ওপর মক্কায় কুরাইশরা যে অত্যাচার চালিয়েছিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তা ছাড়া সাধারণভাবে নবীজি মক্কি জীবনে কুরাইশ সম্প্রদায়ের যত যন্ত্রণা সহ্য করেছেন এবং তাঁর সাহাবিগণ যে অত্যাচার-নিপীড়ন ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলেন, সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম গ্রন্থে এ সম্পর্কে আয়েশা (রা.) এর সূত্রে সহিহ সনদে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা বলেন, 'একদিন আমি নবীজিকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কখনো উহুদের ভয়াবহ পরিস্থিতির চেয়ে আরও কঠিন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন কি না?' উত্তরে তিনি বললেন, 'আমি তোমার জাতির যে দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছি, তা তুমি হওনি।'
যথা সাহাবি আনাস ইবনে মালিকের সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবীজি বিরে মাউনা এলাকায় ৭০ জন কারি সাহাবিকে কোরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু সেখানকার কিছু বিশ্বাসঘাতক তাঁদের সবাইকে নির্মমভাবে শহীদ করে দেয়। এ খবর নবীজির কাছে পৌঁছালে তিনি এত কষ্ট পেয়েছিলেন যে এক মাস যাবৎ ওই বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে বদ-দোয়া করেন।'
এটা তো চতুর্থ হিজরির ঘটনা। এ ছাড়া মদিনায় হিজরতের পর বিভিন্ন সময়ে মুসলিমরা কাফের ও ইহুদিদের নানামুখী আক্রমণের শিকার হন। তৃতীয় হিজরিতে উহুদের যুদ্ধে একটু ভুলের জন্য ৭০ জন বীর সাহাবি শাহাদাতবরণ করেন। যাঁদের মধ্যে নবীজির চাচা হামজা, আনাস ইবনে নজর, জাবির-এর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আমর, নবীজির গোয়েন্দা সাহাবি হুজাইফার পিতা ইয়ামানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাহাবিগণ ছিলেন।
তা ছাড়া এই উহুদের যুদ্ধেই নবীজির দাঁত আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং কপালেও প্রচণ্ডভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। হিজরতর প্রথম তিন বছরের অল্প সময়ের মধ্যেই এসব দুর্ঘটনা ঘটে। নবীজি ও তাঁর জানবাজ সাহাবিদের ওপর দিয়ে যেন রক্তের তুফান বইয়ে যায়। এতে প্রায় দেড় শ সাহাবি নিহত হন এবং দুই শতাধিক সাহাবি গুরুতর আহত হন। অথচ নবীজি ওই বছর বা সময়কে এ জাতীয় কোনো নামে অভিহিত করেননি।
তবে ইতিহাস ও সিরাতের অনেক গ্রন্থেই এ জাতীয় ঘটনাবলির মূল বিবরণের আগে-পিছে আরও বিভিন্ন কথা জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর কোনো সহিহ সূত্র পাওয়া যায় না অথবা সরাসরি কোনো সাহাবির পক্ষ থেকেও এর সত্যায়ন প্রমাণিত হয়নি।