📘 সিরাতের প্রচলিত ভুল > 📄 আবু বকর সিদ্দীক (রা)

📄 আবু বকর সিদ্দীক (রা)


সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সূত্রে তিনি বলেন, সর্বপ্রথম মোট সাতজন প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেন। তাঁরা হলেন নবীজি, আবু বকর, আম্মার ইবনে ইয়াসির, তাঁর আম্মা সুমাইয়া, সুহাইব, বিলাল ও মিকদাদ।
তাঁদের মধ্যে নবীজিকে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাঁর চাচা আবু তালিবের মাধ্যমে নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং আবু বকরকে তাঁর গোত্রের লোকেরা নিরাপদে সরিয়ে নেয়। বাকি পাঁচজনের ওপর কুরাইশরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। জঘন্য কায়দায় বিভিন্নভাবে তাঁদের ওপর নির্যাতন চালায়।

📘 সিরাতের প্রচলিত ভুল > 📄 উসমান বিন আফফান (রা)

📄 উসমান বিন আফফান (রা)


মক্কার কুরাইশদের নির্যাতন থেকে রক্ষার জন্য ইসলামের প্রাথমিক যুগে কয়েকজন মুসলিম আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। তাঁরাই ইসলামের জন্য প্রথম হিজরতকারী। নবীজি তখন মক্কায় ছিলেন। ওই হিজরতকারীদের একজন ছিলেন সাহাবি উসমান ইবনে মাজউন।
তাঁরা আবিসিনিয়ায় যাওয়ার পর সেখানে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে মক্কার কুরাইশ সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করেছে। এ খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে আবিসিনিয়ার নবমুসলিম নারী-পুরুষ সকলেই অত্যন্ত আনন্দিত হয়। তারা ভাবতে লাগল, এবার তাহলে মাতৃভূমিতে নিরাপদে ফিরতে পারব। তাদের অনেকেই মক্কায় রওনা হয়। কিন্তু বাস্তবে এটা ছিল মিথ্যা খবর।
মক্কায় পৌঁছে তারা জানতে পারল, কুরাইশ কাফেররা আগের অবস্থায়ই আছে। নির্যাতনের মাত্রা একটুও কমেনি। তখন তারা চরম বিপদের সম্মুখীন হলো। এদিকে তাদের কারও কারও সঙ্গে কুরাইশের নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকায় কুরাইশের এসব লোক তাদেরকে বিশেষ নিরাপত্তায় থাকার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু যাদের সঙ্গে কুরাইশ সম্প্রদায়ের কারও সম্পর্ক ছিল না বা যারা একটু অসহায় ছিল, তাদের ওপর নির্যাতনের নয়া মাত্রা যোগ হয়। অথবা তারা কোনো রকম লুকিয়ে থাকতে থাকে।
উসমান ইবনে মাজউনও এ খবর শুনে মক্কায় ফিরে আসেন। কুরাইশ নেতা ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা তাঁকে তার বিশেষ নিরাপত্তায় থাকার প্রস্তাব দেয়। তিনি তার প্রস্তাব মেনে নেন। কিছুদিনের মধ্যে তিনি লক্ষ করলেন, নবীজির অনেক সাহাবি এখনো কুরাইশদের নানামুখী অত্যাচার-নিপীড়ন সয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের জীবনের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। ব্যাপারটি তাঁকে খুব পীড়া দেয়।
সকাল-বিকাল তিনি ওয়ালিদের নিরাপত্তায় মক্কার অলিগলিতে ঘুরে বেড়াবেন আর সাহাবিদের অত্যাচার নিজ চোখে দেখবেন, তা তিনি মেনে নিতে পারলেন না। উসমান ইবনে মাজউন তখনই ওয়ালিদের কাছে গিয়ে বললেন, 'আবু আবদে শামস, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করেছ। তোমার এই নিরাপত্তার কোনো প্রয়োজন আমার নেই। আমি তোমার নিরাপত্তা তোমাকে ফিরিয়ে দিলাম।' উত্তরে ওয়ালিদ বলল, 'উসমান, এ কী করছ! তুমি তোমার নিরাপত্তা আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছ?' উসমান বললেন, 'হ্যাঁ, আমি সত্যই বলেছি।' এরপর তিনি কাবা চত্বরের দিকে চলে যান।
ওই সময় লাবিদ ইবনে রবিআ কুরাইশদের এক মজলিসে কবিতা আবৃত্তি করছিল। উসমান সেখানে অংশগ্রহণ করেন। লাবিদ কবিতা আবৃত্তি করল, 'জেনে রাখো! আল্লাহ ছাড়া সবকিছুই নিঃশেষ হয়ে যাবে।' উত্তরে উসমান বললেন, 'তুমি সত্য বলেছ।' তখন লাবিদ বলল, 'জান্নাতের আরাম-আয়েশের আয়োজন ক্ষণস্থায়ী।' উসমান বললেন, 'এটা তুমি মিথ্যা বলছ। জান্নাতের নিয়ামত চিরস্থায়ী; সেগুলো কখনো নিঃশেষ হবে না।'
লাবিদ সবার উদ্দেশে বলল, 'হে কুরাইশ সম্প্রদায়! আমি তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী। তোমাদের বন্ধুকে কে কষ্ট দিচ্ছে? এ লোক কোথা থেকে এল?' কুরাইশের এক লোক বলল, 'লাবিদ, তুমি বলতে থাকো। এই লোকটি আমাদের বাপ-দাদাদের ধর্ম ত্যাগ করে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তার কথায় তুমি কিছু মনে করো না।'
কিন্তু লাবিদ যতই শির্ক ও কুফরির কথা কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে প্রকাশ করছিল, উসমান তার প্রতিবাদ করতে লাগলেন। একপর্যায়ে এক গালাগালকারী লোকটি তাঁর দিকে এগিয়ে যায় এবং সজোরে তাঁকে এক চড় মারে, যার ফলে তাঁর এক চোখ আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এরপর লোকটি তাঁকে অপমানও করে। এদিকে ওয়ালিদ সামান্য দূরেই ছিল। সে সব দেখতে লাগল।
উসমানকে অপমানিত হতে দেখে সে তাঁকে বলতে লাগল, 'হে ভাতিজা, এবার দেখলে তো! তুমি আমার নিরাপত্তায় থাকতে চাইলে আজ তোমার এমন পরিস্থিতির শিকার হওয়া লাগত না।' উত্তরে উসমান বললেন, 'আল্লাহর কসম! আমার যে চোখ এখনো ভালো আছে, সেটাও আল্লাহর জন্য এমন আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে গেলেও আমার আপত্তি নেই। আমি এটাই চাই।'
ওই ঘটনা ইবনে ইসহাক সালেহ ইবনে ইবরাহিমের এক শায়খের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই শায়খের পরিচয় পাওয়া যায়নি। ইমাম বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে মুসা ইবনে উকবার সূত্রে বর্ণনা করেন। কিন্তু সেখানে সাহাবির নাম সরাসরি উল্লেখ নেই।
হাইসামি মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে বলেন, 'ইমাম তাবারানি কোনো সাহাবির সূত্র ছাড়া এ ঘটনা বর্ণনা করেন। যে সূত্রে ওয়াকিদির মতো দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন।'
তবে ইসলামের প্রাথমিক যুগে হিজরতের আগে মক্কা নগরীতে স্বয়ং নবীজি এবং তাঁর সাহাবিগণ বহুমুখী নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। হতভাগা কুরাইশ নেতারা তাঁদেরকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেয়নি। এ জাতীয় অনেক ঘটনা সহিহ সনদে হাদিসে অনেক জায়গায় বর্ণিত হয়েছে।
সহিহ বুখারিতে 'আনসার সাহাবিদের মর্যাদা' শীর্ষক অধ্যায়ে 'মক্কায় মুশরিকদের হাতে নবীজি ও সাহাবিগণ যেসব নির্যাতনের সম্মুখীন হন' শিরোনামে এ রকম ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। আর লাবিদের উপরিউক্ত কবিতার আবৃত্তি সহিহ সূত্রে প্রমাণিত। ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম আবু হুরায়রার সূত্রে লাবিদের কবিতার প্রসঙ্গ বর্ণনা করেছেন।
আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী নবমুসলিমদের কাছে মক্কার কুরাইশ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, সেটা গারানিকের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। তার সূত্রের ব্যাপারে শাইখ আলবানি বলেন, 'আমি এর কোনো সহিহ সনদ পাইনি।'
তা ছাড়া ইতিহাসে আছে, নবীজির এই সাহাবি উসমান ইবনে মাজউনই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যাঁকে মদিনা মুনাওয়ারার জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়। তবে এ প্রসঙ্গেও শাইখ আলবানি বলেন, 'আমি এ ব্যাপারে শক্তিশালী কোনো প্রমাণ বা সূত্র পাইনি। ওয়াকিদির সূত্রে এই কথা প্রচলিত হয়েছে।'

📘 সিরাতের প্রচলিত ভুল > 📄 হামযাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা)

📄 হামযাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা)


ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, মক্কার আসলাম গোত্রের এক নবমুসলিম বলেছেন, 'একদিন নবীজি সাফা পাহাড়ের পাশ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। এমন সময় আবু জাহল তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করে। সে নবীজিকে ইচ্ছেমতো গালাগাল করে এবং তাঁর নবুওয়াতকে কটাক্ষ করে। সাফা পাহাড়ের পাশে আবদুল্লাহ ইবনে জাদ'আনের বাড়ি ছিল। তার দাস বাড়ির ভেতর থেকে আবু জাহলের সব কথা শোনে। নবীজি আবু জাহলকে কিছুই বললেন না।
'ওদিকে নবীজির চাচা হামজা (রা.) সবেমাত্র শিকার থেকে ঘরে ফিরেছেন। ইবনে জাদ'আনের দাস হামজার কাছে এসে সব বলে দেয়। নিজ ভাতিজার সঙ্গে এহেন দুর্ব্যবহারের কথা শুনে হামজা আবু জাহলের ওপর খেপে যান। রাগে তাঁর চেহারা লাল হয়ে যায়। বংশীয় আত্মমর্যাদা জেগে ওঠে তাঁর। 'হামজা তখনই ঘর থেকে বের হয়ে আবু জাহলের কাছে যান। আবু জাহলের মাথায় সজোরে আঘাত করে বলতে থাকেন, "তুমি আমার ভাতিজাকে কটাক্ষ করছ। তোমার তো সাহস কম নয়! অথচ সে যে দ্বীনের দাওয়াত দেয়, আমি তা বিশ্বাস করি। আমি তার ওপর ইমান এনেছি।"'
ইমাম হাকিম ইবনে ইসহাকের এই সূত্রেই উপরিউক্ত ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে এর সূত্রে সরাসরি সাহাবির নাম না থাকায় ইমাম জাহবি এই বর্ণনাকে মুরসাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তা ছাড়া ইবনে ইসহাক যার কাছ থেকে এই ঘটনা শুনেছেন, তার কোনো পরিচয় ইতিহাসে পাওয়া যায় না। ইবনে সা'আদ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে ওই ঘটনা ওয়াকিদির সূত্রে সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন।
ইমাম হাইসামি মাজমাউজ জাওয়ায়েد গ্রন্থে লেখেন, 'শাইখ তাবারানি এ ঘটনা মুহাম্মদ ইবনে কা'ব কুরাজির সূত্রে বর্ণনা করলেও কোনো সাহাবির নাম উল্লেখ করেননি। তবে তাঁর সনদের বর্ণনাকারীরা সহিহ হাদিসের গ্রন্থসমূহের বর্ণনাকারীদের অন্যতম।'
ড. আকরাম উমরি বলেন, 'হামজা মক্কায় নবীজির কঠিন সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু উপরিউক্ত বর্ণনায় যেভাবে তাঁর ইসলাম গ্রহণের চিত্রায়ণ করা হয়েছে, এর সহিহ কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।'

📘 সিরাতের প্রচলিত ভুল > 📄 মক্কী জীবনে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

📄 মক্কী জীবনে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা


এ ঘটনায় ইসলামের এক মহান শিক্ষা ও নবীজির নবুওয়াতের বিশেষ নিদর্শনের আভাস পাওয়া যায়।
'তা হচ্ছে, প্রাচীন যুগে আরব জাতি পক্ষপাত ও নিজেদের লোকদের সাফাই গাওয়ার মধ্যে ছিল সর্বসেরা। অন্যায় দেখলেও নিজেদের আপনজনের বেলায় তারা অন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাবের পর যখন তাদের হৃদয়ে ইমানের আলো উদ্ভাসিত হয়, তখন তারা যেন আমূল পাল্টে যায়। যার প্রমাণ উপরিউক্ত ঘটনা।
'শুধু আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভ ও নবীজির ভালোবাসায় আরবের এ সন্তানেরাই নিজেদের পিতাকে অথবা নিজের কলিজার টুকরা সন্তানকেও হত্যা করতে দ্বিধা করত না। অথচ মদিনার আনসারদের সঙ্গে নবীজির কোনো রক্ত বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল না। শুধু ইমানের খাতিরে তাঁরা নিজেদের সব ইসলামের জন্য বিসর্জন দেন।
'নবীজিকে মক্কা থেকে তাঁরই আপনজনেরা বিতাড়িত করেছিল। তাঁর গোত্রের নেতারা তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেনি। যদি নবীজির আপনজনেরা তাঁর ওপর প্রথমেই ইমান আনত, তা হলে হয়তো-বা ইতিহাসে কেউ লিখত, নিজেদের লোক বলেই তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে। আর এমন সবাই করে থাকে। কারণ নিজের লোককে কে না বিশ্বাস করে! কিন্তু নবীজির ক্ষেত্রে তা হয়নি।
'মক্কা থেকে বহুদূরে সম্পূর্ণ অপরিচিত লোকেরা প্রথমে প্রিয় নবীজির জন্য এগিয়ে আসে। তারা তাঁর ওপর ইমান এনে তাঁকে বরণ করে নেয়। এরপর তাঁরা নবীজির ভালোবাসায় আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের আশায় নিজেদের আপনজনকে ছেড়ে কথা বলেনি। ইসলাম এসে তাদের অন্তরকে বিশুদ্ধ করে দেয়, যা বহু যুগ ধরে জাহেলিয়াতের বর্বরতায় কলুষিত হয়ে ছিল।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00