📄 ইয়াসির (রা)
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সূত্রে তিনি বলেন, সর্বপ্রথম মোট সাতজন প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেন। তাঁরা হলেন নবীজি, আবু বকর, আম্মার ইবনে ইয়াসির, তাঁর আম্মা সুমাইয়া, সুহাইব, বিলাল ও মিকদাদ।
তাঁদের মধ্যে নবীজিকে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাঁর চাচা আবু তালিবের মাধ্যমে নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং আবু বকরকে তাঁর গোত্রের লোকেরা নিরাপদে সরিয়ে নেয়। বাকি পাঁচজনের ওপর কুরাইশরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। জঘন্য কায়দায় বিভিন্নভাবে তাঁদের ওপর নির্যাতন চালায়। লোহার শিকলে বেঁধে বা লোহার পোশাক পরিয়ে তাঁদেরকে দুপুরবেলার সূর্যের প্রখর তাপে মরুর বালির মধ্যে শুইয়ে রাখত। দিনের পর দিন এভাবে তাঁরা অত্যাচার সয়ে যেতেন। একপর্যায়ে প্রত্যেকের পরিচিতজনেরা এসে কাফেরদের দাবি মুতাবেক মুক্তিপণ আদায় করে তাঁদের ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।
📄 যাবির বিন হারেছাহ (রা)
ইবনে সা'আদ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে হিশাম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সায়েব কালবির পিতার সূত্রে জায়িদ ইবনে হারিসার বন্দী হয়ে মক্কার ওকাজ বাজারে আসার ঘটনা উল্লেখ করেন। বর্ণিত আছে, হারিসা ইবনে শারাহিল নাবহান অঞ্চলের এক নারীকে বিয়ে করেন। এরপর তাঁদের সংসারে জাবলা, আসমা ও জায়িদ নামের তিন সন্তান জন্মলাভ করে।
অতঃপর তিনি আরও লেখেন, একদিন হারিসা তাঁর ছোট পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে হেজাজের নিম্নাঞ্চল তিহামার উপকণ্ঠে ফারাজা গোত্রের দস্যুবাহিনী লুট করে জায়িদকে হারিসার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়। অতঃপর দস্যুরা জায়িদকে মক্কার ওকাজ বাজারে বিক্রি করে দেয়। নবীজি জায়িদকে নবুওয়াতের আগে থেকেই চিনতেন। কারণ খাদিজা ওকাজ বাজার থেকে জায়িদকে কিনে নিয়ে আসেন। এরপর জায়িদ খাদিজার বসতবাড়িতে কাজ করতেন। সেই সূত্রে পরবর্তী সময়ে জায়িদ নবীজির তত্ত্বাবধানে লালিত হন। এভাবে দীর্ঘদিন চলে যায়।
হিজরতের পর একদিন হারিসা ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য নবীজির দরবারে আগমন করে জায়িদকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান। কিন্তু জায়িদ নিজেই তার পিতার সঙ্গে যেতে অস্বীকার করে। ফলে হারিসা ব্যর্থ মনোরথে মদিনা ত্যাগ করেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর তাহজিব গ্রন্থে এ ঘটনার সূত্র উল্লেখ করে বলেন, 'এটা একেবারে ভিত্তিহীন বর্ণনা।'
হাফেজ আবু আবদুল্লাহ ইবনে মানদাহ সাহাবি জায়িদ ইবনে হারিসার জীবনীতে লেখেন, 'এই সনদ ছাড়া এ ঘটনার অন্য কোনো সূত্র নেই। কিন্তু পরে আমি এ ঘটনা হাফেজ হাকিমের মুসতাদরাক গ্রন্থে পেয়েছি। তবে হাকিম এর সূত্রের ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু বলেননি।'
তা ছাড়া ইবনে সা'আদের সনদে হিশাম এবং তাঁর পিতা রয়েছেন। তাঁরা উভয়েই প্রত্যাখ্যাত। ইবনে ইসহাকও তাঁর সিরাতগ্রন্থে এ ঘটনা সনদ ছাড়াই উল্লেখ করেছেন।
ইবনে আবদুল বার তাঁর সাহাবিদের জীবনী শীর্ষক ইসতি'আব গ্রন্থে আবু ইসহাকের সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করার পর উল্লেখ করেন, 'হারিসার পুত্র জাবলাকে কেউ জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি বড় নাকি জায়িদ বড়? উত্তরে সে বলল, আমি তার আগে জন্মলাভ করেছি; কিন্তু আমার চেয়ে জায়িদ অনেক উত্তম।'
অতঃপর তিনি সংক্ষেপে জায়িদের বন্দী হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করেন। কিন্তু সেখানে পরে জায়িদকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর পিতা হারিসার নবীজির দরবারে আগমনের কথা নেই।
তবে ইবনে আবদুল বার এ ঘটনা উল্লেখ করার আগে বলেন, 'এ ঘটনার সূত্রে আবু ইসহাক ও জাবলার মধ্যে কেউ কেউ ফারওয়া ইবনে নওফেলের নাম এনেছেন।' কিন্তু হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাহজিব গ্রন্থে জাবলার জীবনীতে বলেন, 'সঠিক সূত্র হলো, ফারওয়াহ থেকেই আবু ইসহাক এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন।'
তবে হারিসার পুত্র হয়েও লোকমুখে জায়িদের নামের সঙ্গে নবীজির নাম যুক্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ আরবের লোকেরা জায়িদকে মুহাম্মদের পুত্র বলে সম্বোধন করত। কিন্তু নবুওয়াতের যুগে আল্লাহ তায়ালা কোরআনে এ বিষয়টি রহিত করে দেন।
ইমাম বুখারি ওই আয়াতের শিরোনামে সহিহ বুখারিতে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম তাঁর রচিত সহিহ মুসলিম গ্রন্থে 'সাহাবিদের ফজিলত' অধ্যায়ে বর্ণনা করেন।
ইমাম তিরমিজি আবু আমর শাইবানির সূত্রে হারিসার অপর পুত্র জাবলা থেকে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। জাবলা বলেন, আমি নবীজির কাছে আগমন করে বললাম, 'হে আল্লাহর রাসুল! আমার ভাই জায়িদকে আমার সঙ্গে পরিবারের কাছে যেতে দিন।' উত্তরে নবীজি বললেন, 'সেটা তোমাদের ব্যাপার। জায়িদ স্বেচ্ছায় যেতে চাইলে আমি নিষেধ করব না।' তখন জায়িদ বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কসম! আমি আপনার ওপর অন্য কাউকে প্রাধান্য দিতে পারি না।' তখন জাবলা বলল, 'আমার কাছে আমার মতের চেয়ে আমার ভাইয়ের ইচ্ছা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।'
অতঃপর ইমাম তিরমিজি বলেন, 'এ হাদিসটি হাসান ও গরিব। কারণ ইবনে রুমির সূত্র ছাড়া অন্য কোনো সূত্রে আমি এ হাদিস কোথাও পাইনি।' তবে শাইখ আলবানি এ হাদিসকে সুনানে তিরমিজি গ্রন্থের সহিহ হাদিসের তালিকাভুক্ত করেছেন।
ইমাম হাকিম এ ঘটনা উল্লেখ করার পর এর সূত্রকে সহিহ বলে মত দেন এবং ইমাম জাহবি এর পক্ষে সমর্থন দেন।
📄 জাফর বিন আবু তালিব (রা)
ইবনে ইসহাক মুজাহিদের সূত্রে বর্ণনা করেন, 'আলি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যেন সরাসরি আশীর্বাদপ্রাপ্ত ছিলেন। কারণ নবীজির বাল্যকালে মক্কায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এতে কুরাইশ গোত্র মারাত্মক খাদ্যসংকট ও অভাবে শিকার হয়। এদিকে নবীজির চাচা আবু তালিবের পরিবারে সদস্যসংখ্যা অনেক। ফলে তিনি পুরো পরিবারের ভরণপোষণে হিমশিম খাচ্ছিলেন। নবীজির চাচা আব্বাস হাশিম গোত্রের সবচেয়ে সচ্ছল মানুষ ছিলেন। তাই নবীজি তাঁর চাচা আব্বাসকে বললেন, 'চাচাজান, আবু তালিবের পরিবারে লোকসংখ্যা বেশি হওয়ায় তাঁর সংসার চালাতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। চলুন আমরা কয়েকজন মিলে তাঁর পরিবারের দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিই।'
চাচা আব্বাস ভাতিজা মুহাম্মদের কথামতো তা-ই করলেন। নবীজি এবং আব্বাস একেকজনের ভরণপোষণের দায়িত্ব ভাগ করে নিলেন। নবীজি চাচাতো ভাই (আবু তালিবের পুত্র) আলির দায়িত্ব নিলেন এবং আব্বাস আবু তালিবের অপর পুত্র জাফরের দায়িত্ব নেন।
...আবু তালিবের পুত্র ছিলেন মোট চারজন। তাঁরা হচ্ছেন আলি, জাফর, উকাইল ও তালিব। ...جعفر আলির চেয়ে ১০ বছরের বড় ছিলেন।
...বড় ভাই জাফরও ইসলামের প্রাথমিক যুগেই ইমান এনেছিলেন। আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী কাফেলার মধ্যে তিনিও ছিলেন।
📄 আলী বিন আবু তালিব (রা)
ইবনে ইসহাক মুজাহিদের সূত্রে বর্ণনা করেন, 'আলি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যেন সরাসরি আশীর্বাদপ্রাপ্ত ছিলেন। কারণ নবীজির বাল্যকালে মক্কায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এতে কুরাইশ গোত্র মারাত্মক খাদ্যসংকট ও অভাবে শিকার হয়। এদিকে নবীজির চাচা আবু তালিবের পরিবারে সদস্যসংখ্যা অনেক। ফলে তিনি পুরো পরিবারের ভরণপোষণে হিমশিম খাচ্ছিলেন। নবীজির চাচা আব্বাস হাশিম গোত্রের সবচেয়ে সচ্ছল মানুষ ছিলেন। তাই নবীজি তাঁর চাচা আব্বাসকে বললেন, 'চাচাজান, আবু তালিবের পরিবারে লোকসংখ্যা বেশি হওয়ায় তাঁর সংসার চালাতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। চলুন আমরা কয়েকজন মিলে তাঁর পরিবারের দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিই।'
চাচা আব্বাস ভাতিজা মুহাম্মদের কথামতো তা-ই করলেন। নবীজি এবং আব্বাস একেকজনের ভরণপোষণের দায়িত্ব ভাগ করে নিলেন। নবীজি চাচাতো ভাই (আবু তালিবের পুত্র) আলির দায়িত্ব নিলেন এবং আব্বাস আবু তালিবের অপর পুত্র জাফরের দায়িত্ব নেন।
ইবনে ইসহাকের সূত্রে হাকিম এ ঘটনা বর্ণনা করলেও সনদের ব্যাপারে নিশ্চুপ থেকেছেন। ইমাম জাহবি তালখিস গ্রন্থে এ ঘটনা উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকেন।
তবে অন্যান্য ঐতিহাসিকের মতে, এ বর্ণনার তেমন ভিত্তি নেই। কারণ আবু তালিবের পুত্র ছিলেন মোট চারজন। তাঁরা হচ্ছেন আলি, জাফর, উকাইল ও তালিব। তা ছাড়া আবু তালিব ছিলেন কুরাইশ গোত্রের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্বের অন্যতম। তাঁর অভাবের যে চিত্রায়ণ উপরিউক্ত বর্ণনায় করা হয়েছে, তা নিতান্ত হাস্যকর।
এদিকে আবু তালিবের সন্তানদের মধ্যে আলি ও জাফর ছিলেন অল্পবয়সী। কিন্তু অপর দুজন-উকাইল ও তালিব উপার্জন করতে সক্ষম ছিলেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন, জাফর আলির চেয়ে ১০ বছরের বড় ছিলেন। উকাইল জাফরের চেয়ে ১০ বছরের বড় এবং তালিব উকাইলের চেয়ে ১০ বছরের বড় ছিলেন।
উল্লেখ্য, আলি নবীজির তত্ত্বাবধানে থাকার ফলে বাল্যকালেই ইসলামে দীক্ষিত হন। এর দ্বারা উপরিউক্ত ঘটনার সত্যতা বিচার হয় না। তা ছাড়া তাঁর বড় ভাই জাফরও ইসলামের প্রাথমিক যুগেই ইমান এনেছিলেন। আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী কাফেলার মধ্যে তিনিও ছিলেন। আর চাচা আব্বাস নবীজি মদিনায় হিজরতের কয়েক বছর পরে ইসলাম গ্রহণ করেন।
ইবনে আবদুল বার স্বীয় সনদে ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেন, খাদিজার পরই আলি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। অতঃপর ইবনে আবদুল বার বলেন, 'এই সনদের ব্যাপারে কোনো আপত্তি কিংবা মতানৈক্য নেই।' ইমাম জাহবিও ইবনে আব্বাসের সূত্রে এমনটাই বলেছেন। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং ইসমাইল ইবনে ইসহাক বলেন, আলির ফজিলত যতগুলো সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এ পরিমাণ বর্ণনা অন্য কোনো সাহাবির ব্যাপারে হয়নি।
তবে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া ইমাম আহমাদের ব্যাপারে উপরিউক্ত বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ইমাম আহমাদের বক্তব্যের অর্থ কখনোই এটা নয় যে তিনি বলেছেন, আলির যে পরিমাণ ফজিলত সেটা অন্য কারও নেই। এ জাতীয় মিথ্যা বলা থেকে ইমাম আহমাদের মতো ব্যক্তি অনেক ঊর্ধ্বে। বরং অর্থ হলো, বিশুদ্ধ বর্ণনায় আলির যত ফজিলত এসেছে, তা অন্য কারও ক্ষেত্রে আসেনি।