📄 রাসূল ﷺ-এর সাহায্যকারী
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, কুরাইশ নেতারা যখন দেখল, আবু তালিব তাদের কোনো প্রস্তাবেই সায় দিচ্ছেন না; বরং উল্টো তিনি স্বীয় ভাতিজা মুহাম্মদকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন, এর সঙ্গে নবীজির কোনো বিপদ-আপদ কিংবা সমস্যা সৃষ্টি হলে আবু তালিব নিজে তা প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন, তখন কুরাইশদের যেন ঘুম হারাম হয়ে গেল।
তারা এ বিষয়ে রাতদিন সলাপরামর্শ করতে থাকে। কী করে মুহাম্মদ ও তাঁর চাচা আবু তালিবের ব্যাপারে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। এদিকে সমগ্র মক্কায় আবু তালিব ছিলেন গণ্যমান্য ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাই কুরাইশরা তাঁকে খেপাতেও চাচ্ছিল না, আবার নবীজিকেও বাগে আনতে পথ খুঁজছিল।
একদিন আবু তালিব তাঁর বাড়িতে একাকী অবস্থান করছিলেন। কুরাইশদের কয়েকজন তাঁর কাছে এসে অভিনব এক প্রস্তাব করে বসে। তারা সঙ্গে করে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরার পুত্র উমারাকে নিয়ে যায় এবং বলে, 'হে আবু তালিব, তোমার তো সেবা ও দেখাশোনার জন্য একজনকে খুব দরকার। এক কাজ করো, আমরা তোমার জন্য ওয়ালিদের পুত্র উমারাকে নিয়ে এসেছি। ছেলেটি দেখতেও সুদর্শন আবার বুদ্ধিও আছে। তুমি একে তোমার সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে নাও এবং তোমার ভাতিজা মুহাম্মদকে আমাদের হাতে তুলে দাও।
'মুহাম্মদ আমাদের বাপ-দাদাদের অপমান করছে। তোমার ও আমাদের ধর্মে বিবাদ সৃষ্টি করছে। ঘরে ঘরে পিতার থেকে পুত্রকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। সমাজের কিছু নির্বোধ ও বোকাদের নিজের দলে টেনে পুরো সমাজের বিরুদ্ধে সে অবস্থান নিয়েছে। আমরা তাকে শেষ করে দেব। এটাই ভেবে দেখেছি, এখনই একটা মিটমাট করে নেওয়া দরকার। তাহলে ভবিষ্যতে তেমন বেগ পেতে হবে না; অন্যথায় এ সমস্যা আরও বেড়ে যাবে। এতে আমাদের পরস্পরে ভুল-বোঝাবুঝিও দূর হবে এবং আগের মতো আমরা মিলেমিশে থাকতে পারব।'
উত্তরে আবু তালিব তাদের উদ্দেশে বললেন, 'আল্লাহর কসম! তোমরা আমার প্রতি ন্যায়বিচার করোনি। বাহ! তোমরা তোমাদের পুত্রকে আমার তত্ত্বাবধানে দেবে এবং আমি তার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করব, আর আমি তোমাদের হাতে আমার পুত্রতুল্য ভাতিজাকে তুলে দেব; এরপর তোমরা তাকে হত্যা করবে।
'আল্লাহর কসম! এমনটা আমি কখনোই হতে দেব না। তোমরা কি জানো না, উটনী নিজের বাচ্চাকে হারিয়ে ফেললে শুধু ওর বাচ্চাকেই খোঁজে!'
তখন মুতইম ইবনে আদি ইবনে নওফেল ইবনে আবদে মানাফ আবু তালিবকে লক্ষ করে বলল, 'আমরা তোমার জাতির ব্যাপারে তোমার সঙ্গে ন্যায়বিচার করতেই এসেছি। আমাদের মনে হচ্ছে, তুমি আমাদের প্রস্তাব মেনে নেবে না।'
উত্তরে আবু তালিব বললেন, 'আল্লাহর কসম! তারা আমার সঙ্গে ন্যায়বিচার করেনি। আর তুমি আমাকে অপমান করতে এবং পুরো জাতিকে আমার বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চাইছ। তোমার যা খুশি করতে পারো। আমি এর মধ্যে নেই।'
উল্লেখ্য, ইবনে ইসহাক সরাসরি কোনো সাহাবির সূত্র ছাড়াই এটা বর্ণনা করেছেন। তবে ইমাম জাহবি তারিখুল ইসলাম গ্রন্থের সিরাত অধ্যায়ে ইবনে ইসহাকের সূত্রে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ইবনে সা'আদও তাবাকাত গ্রন্থে ওয়াকিদির সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করেন।
ইবনে কাসির ওই ঘটনার বিশ্লেষণে একটি রহস্য উদ্ঘাটন করে বলেন, 'নবীজিকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেও চাচা আবু তালিবের ইসলাম গ্রহণ না করার পেছনে আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহস্য লুক্কায়িত আছে। কারণ আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ করলে কুরাইশ জাতি তাঁকে মোটেই ভয় পেত না; বরং তখন সবার আগে তাঁকেই শেষ করে দিত। এর ফলে প্রিয় নবীজি আশ্রয়হীন হয়ে পড়তেন এবং কুরাইশদের বর্বরতার শিকার হতেন। আবু তালিব বিধর্মী থাকার ফলে তাঁর জীবদ্দশায় কুরাইশ নেতারা প্রিয় নবীজির বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার দুঃসাহস করেনি।'
অন্য জায়গায় ইবনে কাসির বলেন, 'সর্বোপরি এটা ছিল আল্লাহ তায়ালার সিদ্ধান্ত। এর ভালো-মন্দ তিনিই জানেন। কাফেরদের জন্য ইস্তেগফার কিংবা দোয়া করার ওপর নিষেধাজ্ঞা না থাকলে আমরা অবশ্যই তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতাম।'
📄 আবিসিনিয়ায় হিজরত
সিরাতের গ্রন্থে এটি খুব প্রসিদ্ধ যে, উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ আবিসিনিয়ায় হিজরত করে চলে যাওয়ার পর সেখানে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান হয়ে যান। তিনি স্বীয় স্ত্রী উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ানসহ আবিসিনিয়ায় গমন করেন। প্রকৃতপক্ষে এটি সত্য কি না, এ নিয়ে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়।
ইবনে ইসহাক বলেন, 'জাহেলিয়াতের যুগে মক্কার কয়েকজন একাকী চলত। তারা কুরাইশদের মতো প্রতিমার পূজা করত না। নীরবে তারা একত্ববাদের অনুসন্ধানী ছিল। তারা হলো ওয়ারাকা ইবনে নওফেল, উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ, উসমান ইবনে হুওয়ারিস এবং জায়িদ ইবনে আমর।
'তারা একে অপরকে বলেছিল, আমাদের জাতি ইবরাহিম আলাইহিস সালামের আদর্শ থেকে সরে গেছে। একত্ববাদ ছেড়ে তারা শির্ক ও প্রতিমার পূজায় লিপ্ত। পাথরকে তারা দেবতা বানিয়েছে। এদের না আছে কোনো কিছু করার ক্ষমতা! না এরা দেখতে পারে আর না কারও ডাক শুনতে পারে! না কারও উপকার করতে পারে আর না অপকার! কিছুই করতে পারে না। একটা কাজ করা যাক, তোমরা নিজেদের বাঁচার পথ আগে বের করো। এরপর তারা একনিষ্ঠ ধর্ম ও বিশ্বাসের অনুসন্ধানে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
‘অতঃপর ওয়ারাকা ইবনে নওফেল খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে এবং উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে মক্কায় অবস্থান করতে থাকে। ইসলামের আবির্ভাবের পর সে ইমান আনে। কিছুদিন পর প্রথম হিজরতের কাফেলায় যোগদান করে সে তার স্ত্রী উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ানকে নিয়ে আবিসিনিয়ায় চলে যায়। সেখানে সে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান হয়ে যায়। অতঃপর আবিসিনিয়াতেই খ্রিষ্টান অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করে।’
ইবনে ইসহাক মুহাম্মদ ইবনে জাফর ইবনে জুবায়েরের সূত্রে বর্ণনা করেন, আবিসিনিয়ায় খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করার পর উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ নবীজির অন্য সাহাবিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁদের উদ্দেশে বলতেন, ‘এখানে এসে আমি দৃষ্টি লাভ করেছি আর তোমরা এখনো দৃষ্টিশক্তি খুঁজে বেড়াচ্ছ! তোমরা তো এর পরে দৃষ্টি আর খুঁজেই পাবে না।’
ওই বর্ণনায় ইবনে ইসহাকের শাইখ মুহাম্মদ ইবনে জাফর ইবনে জুবায়ের রয়েছেন। যিনি ষষ্ঠ পর্যায়ের নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের অন্যতম ছিলেন। তবে এই পর্যায়ের কেউই সরাসরি নবীজির কোনো সাহাবির সাক্ষাৎ পাননি। তাই এ বর্ণনা মুরসালের পর্যায়ভুক্ত বলে বিবেচিত।
অবশ্য ইবনে ইসহাক আবিসিনিয়া থেকে নবীজির চাচাতো ভাই জাফর ইবনে আবু তালিবের ফিরে আসার বিবরণে এ ঘটনাই মুহাম্মদ ইবনে জাফরের সূত্রে উরওয়াহ থেকে বর্ণনা করেন। অতঃপর উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ানের সঙ্গে নবীজির বিয়ের বর্ণনায় উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের খ্রিষ্টান হয়ে যাওয়ার কথা পুনরায় তিনি উল্লেখ করেন।
ইবনে সা'আদ তাবাকাত গ্রন্থে এ প্রসঙ্গেই ইসমাইল ইবনে আমরের সূত্রে উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘এক রাতে আমি স্বপ্নে দেখি, আমার স্বামী উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের চেহারা কুৎসিত ও বিকৃত হয়ে গেছে। তাকে দেখে আমি চিনতেই পারছি না। তার অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছিল। সকালে ঘুম ভাঙার পর ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে যাই। খুবই দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। মনে মনে ভাবছি, আল্লাহর কসম! তিনি তার অবস্থা পরিবর্তন করে দিয়েছেন।
‘স্বামীকে স্বপ্নের কথা বলতে যাব, এর মধ্যেই তিনি আমাকে বলতে লাগলেন, "জানো! আমি দীর্ঘদিন প্রকৃত ধর্মের খোঁজ করেছি। কিন্তু খ্রিষ্টধর্মের চেয়ে উত্তম কোনো ধর্ম পাইনি। তাই আমি খ্রিষ্টান হয়ে যাই। অতঃপর মুহাম্মদের দ্বীন গ্রহণ করি। এর কিছুদিন পর পুনরায় খ্রিষ্টধর্মে ফিরে আসি।"
'উত্তরে আমি বললাম, “আল্লাহর কসম! তুমি যা করেছ এর মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।” কিন্তু সে আমার কথার দিকে কানই দিল না। গোগ্রাসে মদ গিলতে লাগল। এরপর কিছুক্ষণের মধ্যেই নেশায় বুঁদ হয়ে মৃত্যুবরণ করে।'
অতঃপর ইবনে সা'আদ ওয়াকিদির সূত্রে নবীজির স্ত্রীগণের আলোচনায় উম্মে হাবিবার জীবনীতে এ ঘটনা দ্বিতীয়বার উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া ইমাম হাকিম তাঁর মুসতাদরাক গ্রন্থে জুহরির সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করেন। কিন্তু তাঁর এ বর্ণনার ধারাবাহিকতায় নবীজির সাহাবির উল্লেখ ছিল না। অতঃপর তিনি ইবনে সা'আদের মতো ওয়াকিদির সূত্রে উম্মে হাবিবার স্বপ্নের বিবরণ উল্লেখ করেন। ঐতিহাসিকদের কাছে জুহরি নবীজির সাহাবিদের উল্লেখ ছাড়া যা কিছু বর্ণনা করেছেন, সেসব বর্ণনাকে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন।
ইমাম জাহবি বলেন, 'হাদিসশাস্ত্রের বিজ্ঞ পণ্ডিত ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল কাত্তান বলেছেন, সাহাবিগণের উল্লেখ ছাড়া জুহরি যা বর্ণনা করেছেন, তা অন্যদের এ জাতীয় বর্ণনার চেয়েও অনেক নিম্ন পর্যায়ের। কারণ তিনি হাদিসের হাফেজ ছিলেন। তাই ইচ্ছে করলেই সাহাবিদের নাম উল্লেখ করতে পারতেন। অথচ তিনি ইচ্ছাকৃত এমনটি করেছেন। যার নাম নিতে ইচ্ছে হতো, তিনি তার নাম উল্লেখ করতেন।'
ইমাম তাবারি তাঁর তারিখে তাবারি নামক ঐতিহাসিক গ্রন্থে এ ঘটনা হিশাম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সায়েব কালবির সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তবে এই হিশাম কালবি রাফেজি হওয়ায় তাঁকে মুহাদ্দিসগণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে ঐতিহাসিকদের নিকট উম্মে হাবিবার প্রথম স্বামীর খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের বিবরণের এ সূত্রটি জুহরির সূত্রের চেয়েও নিম্ন পর্যায়ের বিবেচিত হয়েছে।
ইমাম বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে ইবনে লাহিয়ার সূত্রে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁর বর্ণনায় কিছুটা অতিরিক্ত বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ আবিসিনিয়া থেকেই সাহাবি উসমান ইবনে আফফান নবীজির সঙ্গে উম্মে হাবিবার বিয়ে পড়িয়ে দেন। ইমাম বায়হাকির সূত্রে যে ইবনে লাহিয়ার কথা এসেছে, তার বর্ণনাকে ঐতিহাসিকেরা দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ইবনে কাসির বলেন, 'ইবনে লাহিয়ার সূত্রে সাহাবি উসমান কর্তৃক উম্মে হাবিবার সঙ্গে নবীজিকে বিয়ে করিয়ে দেওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তার সমার্থক অন্য কোনো বর্ণনা কিংবা সনদ পাওয়া যায় না। কারণ উসমান এর আগেই আবিসিনিয়া থেকে মক্কায় ফিরে আসেন। অতঃপর মদিনায় হিজরত করে নবীজির সান্নিধ্যে গমন করেন।'
ইবনে আবদুল বার তাঁর ইসতি'আব গ্রন্থে উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের জীবনী উল্লেখ করেননি। শুধু এতটুকু বলেছেন, 'আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ (উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের ভাই) এবং তার ভাই (উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ) ইসলামের প্রথম হিজরতকারীদের কাফেলায় ছিলেন। আবিসিনিয়ায় গমনের পর আবদুল্লাহর ভাই খ্রিষ্টান হয়ে যায় এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করে। অতঃপর উম্মে হাবিবা তার থেকে আলাদা হয়ে যান।'
ইবনে আছির তাঁর উসুদুল গাবাহ ফি মা'রিফাতিস সাহাবাহ গ্রন্থে উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের জীবনী উল্লেখ করেননি। ইবনে আবদুল বারের মতো শুধু উপরিউক্ত ঘটনা লিখে শেষ করে দেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি সাহাবিদের সংক্ষিপ্ত জীবনী শীর্ষক তাঁর বিখ্যাত ইসাবাহ গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের জীবনী উল্লেখ করলেও তাঁর ভাই উবাইদুল্লাহর ব্যাপারে কিছুই বলেননি। তবে উম্মে হাবিবার জীবনীতে লিখেছেন, 'উম্মে হাবিবার প্রথম স্বামী উবাইদুল্লাহ আবিসিনিয়ায় গমন করে খ্রিষ্টান হয়ে মারা যায়। ফলে উম্মে হাবিবা তাঁর থেকে আলাদা হয়ে যান।'
তবে তাহজিব গ্রন্থে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি উম্মে হাবিবার জীবনীতে তাঁর প্রথম স্বামী উবাইদুল্লাহর খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের ব্যাপারে কিছুই বলেননি। তিনি শুধু লিখেছেন, 'উম্মে হাবিবা তাঁর স্বামী উবাইদুল্লাহর সঙ্গে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। আবিসিনিয়ায় যাওয়ার পর উবাইদুল্লাহ মারা যাওয়ার পর নবীজি তাঁকে বিয়ে করেন। তিনি আবিসিনিয়ায় ছয় বছর অথবা কোনো বর্ণনামতে সাত বছর ছিলেন।'
ইমাম জাহবি তাঁর তারিখ গ্রন্থে সিরাতের অধ্যায়ে এ ঘটনা ইবনে সা'আদের সূত্র উল্লেখসহ বর্ণনা করেন। কিন্তু উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ সম্পর্কে বলেন, 'এটা অস্বীকৃত কথা।' তবে তিনি এ বিষয়টি অস্বীকৃত হওয়ার কারণ উল্লেখ করেননি।
উপরিউক্ত সমস্ত বর্ণনার সার্বিক বিশ্লেষণে এটাই প্রমাণিত হয়, উম্মে হাবিবার প্রথম স্বামী উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের যে ঘটনা লোকমুখে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, এর কোনো ভিত্তি নেই। কারণ উম্মে হাবিবার হিজরত এবং তাঁর প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর নবীজির সঙ্গে তাঁর বিয়ের ঘটনা যেসব সহিহ হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোর কোনোটিতেই উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করার কথা উল্লেখ নেই।
যথা ইমাম আহমাদ সহিহ সনদে জুহরির সূত্রে উম্মে হাবিবার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। যেখানে এ জাতীয় কোনো কথাই নেই। বরং তিনি আরও উল্লেখ করেন, 'স্বয়ং আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশি উম্মে হাবিবাকে নবীজির সঙ্গে বিয়ে পড়িয়ে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে চার হাজার দিরহাম মোহর বাবদ আদায় করে দেন।' তা ছাড়া ইমাম আবু দাউদ ও ইমাম নাসায়িও একই রকম বর্ণনা করেছেন।
সবশেষে এর সপক্ষে ঐতিহাসিকেরা একাধিক যুক্তি ও প্রমাণ উল্লেখ করেছেন। তাঁরা বলেন:
১. উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের ইসলাম ত্যাগের ঘটনা কোনো সহিহ সনদ দ্বারা প্রমাণিত নয়। উপরিউক্ত বর্ণনা উরওয়া ইবনে জুবায়েরের সূত্রে মুরসাল ধারায় বর্ণিত হয়েছে। আর হাদিসশাস্ত্রের নীতিমালা অনুযায়ী মুরসাল বর্ণনা দ্বারা এ জাতীয় বিষয় সাব্যস্ত হয় না।
তা ছাড়া সহিহ হাদিসের যেসব বর্ণনায় নবীজির সঙ্গে উম্মে হাবিবার বিয়ের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে কোথাও উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের ইসলাম ত্যাগ করার কথা বলা হয়নি।
২. ইসলামের প্রথম দিকে সর্বপ্রথম যে কজন সাহাবি নবীজির নির্দেশে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন, তাঁরা স্বজ্ঞানে বুঝেশুনেই ইসলামে দীক্ষিত হন। এর কারণ হলো, প্রথমত তাঁরা কুরাইশদের শিরকি কর্মকাণ্ড থেকে নিরাপদে থাকার উদ্দেশ্যেই নিজেদের মাতৃভূমি ও স্বজনদের ত্যাগ করে হিজরত করেন। সে ক্ষেত্রে তাঁদের কারও পক্ষে ইসলাম ত্যাগ করা কীভাবে সম্ভব হতে পারে?
দ্বিতীয়ত, আবিসিনিয়ায় যাওয়ার পর সেখানকার বাদশাহ নাজাশি তাঁদের সবাইকে রাজদরবারে তলব করে নবীজির পরিচয় ও তাঁর নবুওয়াতের নিদর্শন এবং দাওয়াতের প্রকৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। জাফর ইবনে আবু তালিব সবার পক্ষ থেকে জিজ্ঞাসাবাদের উত্তর প্রদান করেন।
৩. অনুরূপ ঘটনা রোমের সম্রাট হেরাক্লিয়াসের দরবারেও ঘটেছিল। ঘটনাক্রমে কুরাইশদের একটি বাণিজ্যিক কাফেলা ওই সময় রোম সাম্রাজ্যের রাজধানী সিরিয়ায় অবস্থান করছিল। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন আবু সুফিয়ান, যিনি উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের শ্বশুর ছিলেন। উবাইদুল্লাহর স্ত্রী উম্মে হাবিবা ছিলেন আবু সুফিয়ানের কন্যা।
সম্রাট হেরাক্লিয়াস কুরাইশদের ওই কাফেলাকে রাজদরবারে তলব করে ইসলাম ও নবীজি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান। তিনি আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'তোমাদের মধ্যে যারা তোমাদের বাপ-দাদাদের ধর্ম ত্যাগ করে মুহাম্মদের অনুসারী হয়েছে, তাদের কেউ কি এর পরে ইসলাম ত্যাগ করে তোমাদের কাছে ফিরে এসেছে?' উত্তরে আবু সুফিয়ান স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, 'না, এমন কেউ করেনি।'
ঐতিহাসিকেরা বলেন, 'উবাইদুল্লাহর পরিচয় ও তার সার্বিক অবস্থানের ব্যাপারে আবু সুফিয়ানের অবগত থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ একে তো তিনি ছিলেন কুরাইশদের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একজন, আবার তিনি তাঁর মেয়ে উম্মে হাবিবার পিতাও ছিলেন। উবাইদুল্লাহ যদি সত্যিই খ্রিষ্টান হয়ে যেতেন, তাহলে আবু সুফিয়ান অবশ্যই হেরাক্লিয়াসের দরবারে তা প্রকাশ করতেন। কারণ আবু সুফিয়ান নিজেই বিনা দ্বিধায় স্বীকার করে বলেছেন, 'আমি মুহাম্মদ এবং ইসলাম ও তাঁর সাহাবিদের ব্যাপারে সম্রাট হেরাক্লিয়াসের সামনে মিথ্যা কথা বলতে চেয়েও অপারগ হয়ে গেছি। বলতে চেয়েও সত্য গোপন করার দুঃসাহস করিনি।'
৪. জাহেলি যুগেও উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ কুরাইশ সম্প্রদায়ের মূর্তিপূজা থেকে বিরত থাকতেন। বিধর্মীদের কোনো অনুষ্ঠানে তিনি যেতেন না। ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের মতো তিনিও নীরবে সত্য ধর্মের আবির্ভাবের অপেক্ষায় দিন কাটিয়ে দিতেন।
ইবনে ইসহাক থেকে সনদ ছাড়া এ ঘটনার শুরুতে এ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। অপর ঐতিহাসিক ইবনে সা'আদ ওয়াকিদির সূত্রে বর্ণনা করেন, 'জাহেলি যুগে ইসলাম গ্রহণের আগে উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ খ্রিষ্টধর্মের অনুরক্ত ছিলেন। আর এটা প্রসিদ্ধ কথা যে, নবীজি যখন নবুওয়াতপ্রাপ্ত হন, তখন আরব দেশে খ্রিষ্ট ও ইহুদিধর্মের আহলে কিতাব সম্প্রদায় বসবাস করত। তিনি তাদের প্রতি আবির্ভূত হয়েছিলেন। অতএব, এটা কীভাবে সম্ভব, যে ব্যক্তি দীর্ঘদিন সত্য ধর্মের অনুসন্ধানী ছিল এবং এর অপেক্ষায় জনসমাগম এড়িয়ে চলত, সে ইসলাম গ্রহণের পর পুনরায় সেই বিতর্কিত ধর্ম ও অন্ধবিশ্বাসের দিকে ফিরে যেতে পারে?'
৫. নবীজি উম্মে হাবিবাকে ষষ্ঠ অথবা সপ্তম হিজরিতে বিয়ে করেন। সে সময় ইসলামের ব্যাপ্তি আরবভূমি ছাড়িয়ে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়েছিল। আর উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ ইসলামের প্রথম যুগেই আবিসিনিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। তখনো নবীজি মদিনায় হিজরত করেননি।
মদিনায় হিজরতের পর ইসলামের শক্তি ও সীমানা বহুগুণে বিস্তৃতি লাভ করে। তখন কেউ ইসলাম ত্যাগ করলে তাকে প্রথমে মুনাফিক বলে গণ্য করা হতো। মুনাফিকদের পরিচয় ও বিধান সম্পর্কে কোরআনে আয়াত অবতীর্ণ হচ্ছিল। অথচ উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের নাম ইতিহাসের কোথাও মুনাফিকের তালিকায় পাওয়া যায় না। এর পক্ষে কোনো সূত্রও নেই।
সর্বোপরি এখানে আলোচনা চলছে নবীজির একজন বিশিষ্ট সাহাবিকে নিয়ে। যিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। তাঁর ইসলাম ত্যাগের ব্যাপারে যে বর্ণনা ইতিহাসে পাওয়া যায়, তার কোনো প্রমাণযোগ্য ভিত্তি নেই।
কিন্তু এর পরও যদি মেনে নেওয়া হয় যে ওই বর্ণনার সনদ প্রমাণিত, তাহলে এ সত্ত্বেও আমার (মূল গ্রন্থকার) মতে, যেহেতু ইসলামের বিধানে কোনো মুসলিমের নিন্দা করা নিষিদ্ধ, তাই এ সম্পর্কে আলোচনা কিংবা বিতর্কে জড়ানো সমীচীন হবে না। আবার যদি তা নবীজির কোনো সাহাবির নামে হয়, তাহলে تو আরও আগেই তা থেকে বিরত থাকা উচিত।
ইবনে হিব্বان তাঁর সহিহ গ্রন্থে উরওয়ার সূত্রে আয়েশা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ তাঁর স্ত্রী উম্মে হাবিবাকে সঙ্গে নিয়ে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন। সেখানে যাওয়ার পরে উবাইদুল্লাহ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। মৃত্যুশয্যায় তিনি নবীজিকে উম্মে হাবিবার দেখাশোনার জন্য অনুরোধ করে যান। তাঁর অনুরোধ রক্ষার্থে নবীজি উম্মে হাবিবাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর স্বয়ং বাদশাহ নাজাশি শুরাহবিল ইবনে হাসানার সঙ্গে উম্মে হাবিবাকে মদিনায় নবীজির কাছে প্রেরণ করেন।'
সাকরান ইবনে আমর ইসলামের প্রথম যুগে আবিসিনিয়ায় হিজরতকারীদের অন্যতম ছিলেন। তাঁর ভাইয়ের নাম সুহাইল ইবনে আমর। উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের মতো ইতিহাসের পাতায় তাঁরও আবিসিনিয়ায় যাওয়ার পর খ্রিষ্টান হয়ে যাওয়ার গুঞ্জন লোকমুখে শোনা যায়। যদিও উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের মতো তাঁর বিষয়টি অতটা প্রসিদ্ধ হয়নি। তবে এর সপক্ষে শক্তিশালী কোনো সূত্র যেমন নেই, আবার যেসব বর্ণনার সূত্রে এ কথা ছড়িয়ে পড়েছে সেগুলোকেও অতিমাত্রায় দুর্বল বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমার (মূল গ্রন্থের লেখক) জানামতে, এর সপক্ষে কোনো দুর্বল বর্ণনাও নেই।
মুসা ইবনে উকবা তাঁকে আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী বলে উল্লেখ করেছেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ইসাবাহ গ্রন্থে লেখেন, 'তিনি সুহাইল ইবনে আমরের ভাই।' তবে তিনি তাঁর খ্রিষ্টান হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কিছু বলেননি।
ইবনে ইসহাক তাঁর ব্যাপারে বর্ণনা করেন, 'সাকরান ইবনে আমর দীর্ঘদিন আবিসিনিয়ায় থাকার পর মক্কায় ফিরে আসেন এবং সেখানে ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের পর তাঁর স্ত্রী সাওদা বিনতে যাম'আকে স্বয়ং নবীজি বিয়ে করেন।'
আবু উবাইদার মতে, তিনি আবিসিনিয়ায় গিয়ে খ্রিষ্টান হয়ে যান এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। ঐতিহাসিক বালাজুরি বলেন, 'প্রথম মতটি সর্বাধিক সহিহ।' অর্থাৎ তিনি মুসলিম অবস্থায়ই মক্কায় মৃত্যুবরণ করেন।
ইবনে আবদুল বার তাঁর ইসতি'আব গ্রন্থে সাকরান ইবনে আমরের জীবনী উল্লেখ করলেও তাঁর খ্রিষ্টান হওয়ার ব্যাপারে কোনো কিছু বলেননি।
ইবনে ইসহাক মক্কা থেকে আবিসিনিয়ায় হিজরতকারীদের তালিকা বিন্যাস করেছেন। ওই তালিকায় সাকরান ইবনে আমরের নাম উল্লেখ করলেও তাঁর খ্রিষ্টান হওয়ার কথা নেই। তবে নবীজির সঙ্গে সাওদা বিনতে যাম'আর বিয়ের আলোচনায় তিনি বলেন, 'সাওদা বিনতে যাম'আ সাকরানের চাচাতো বোন ছিলেন। সাকরান তাঁকে কুমারী থাকতেই বিয়ে করেন। অতঃপর আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। সেখান থেকে মক্কায় ফেরার পর তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর নবীজি সাওদা বিনতে যাম'আকে বিয়ে করেন।'
ইবনে সা'আদ তাবাকাত গ্রন্থে সাকরানের কথা উল্লেখ করলেও তাঁর খ্রিষ্টান হওয়ার ব্যাপারে কিছু বলেননি। নবীজির স্ত্রী সাওদা বিনতে যাম'আর জীবনীতেও এ সম্পর্কে বলেননি।
ইমাম জাহবি তারিখুল ইসলাম গ্রন্থের সিরাত অধ্যায়ে এ ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেননি। এমনকি তাঁর ছাত্র ইবনে কাসিরও তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক গ্রন্থ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াতে এ সম্পর্কে কিছুই বলেননি।
তবে ইবনে জারির তাবারি তাঁর তারিখ গ্রন্থে নবীজির স্ত্রী সাওদা বিনতে যাম'আর জীবনীতে বলেন, 'নবীজি যখন সাওদাকে বিয়ে করেন, তখন তিনি বিধবা ছিলেন। এর আগে সাকরানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। সাকরান আবিসিনিয়ায় হিজরত করার পর সেখানে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।' তবে ইবনে জারির তাবারি এর কোনো সূত্র উল্লেখ করেননি।
ইবনে আছির তাঁর উসুদুল গাবাহ ফি মা'রিফাতিস সাহাবাহ গ্রন্থে ইবনে কালবির সূত্রে সাকরানের খ্রিষ্টান হয়ে যাওয়ার তথ্য উল্লেখ করেন। অথচ এই ইবনে কালবি অধিকাংশ ঐতিহাসিকের কাছে প্রত্যাখ্যাত বর্ণনাকারীদের একজন।
📄 প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী
ইবনে ইসহাক মুজাহিদের সূত্রে বর্ণনা করেন, 'আলি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যেন সরাসরি আশীর্বাদপ্রাপ্ত ছিলেন। কারণ নবীজির বাল্যকালে মক্কায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এতে কুরাইশ গোত্র মারাত্মক খাদ্যসংকট ও অভাবে শিকার হয়। এদিকে নবীজির চাচা আবু তালিবের পরিবারে সদস্যসংখ্যা অনেক। ফলে তিনি পুরো পরিবারের ভরণপোষণে হিমশিম খাচ্ছিলেন। নবীজির চাচা আব্বাস হাশিম গোত্রের সবচেয়ে সচ্ছল মানুষ ছিলেন। তাই নবীজি তাঁর চাচা আব্বাসকে বললেন, 'চাচাজান, আবু তালিবের পরিবারে লোকসংখ্যা বেশি হওয়ায় তাঁর সংসার চালাতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। চলুন আমরা কয়েকজন মিলে তাঁর পরিবারের দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিই।'
চাচা আব্বাস ভাতিজা মুহাম্মদের কথামতো তা-ই করলেন। নবীজি এবং আব্বাস একেকজনের ভরণপোষণের দায়িত্ব ভাগ করে নিলেন। নবীজি চাচাতো ভাই (আবু তালিবের পুত্র) আলির দায়িত্ব নিলেন এবং আব্বাস আবু তালিবের অপর পুত্র জাফরের দায়িত্ব নেন।
ইবনে ইসহাকের সূত্রে হাকিম এ ঘটনা বর্ণনা করলেও সনদের ব্যাপারে নিশ্চুপ থেকেছেন। ইমাম জাহবি তালখিস গ্রন্থে এ ঘটনা উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকেন।
তবে অন্যান্য ঐতিহাসিকের মতে, এ বর্ণনার তেমন ভিত্তি নেই। কারণ আবু তালিবের পুত্র ছিলেন মোট চারজন। তাঁরা হচ্ছেন আলি, জাফর, উকাইল ও তালিব। তা ছাড়া আবু তালিব ছিলেন কুরাইশ গোত্রের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্বের অন্যতম। তাঁর অভাবের যে চিত্রায়ণ উপরিউক্ত বর্ণনায় করা হয়েছে, তা নিতান্ত হাস্যকর।
এদিকে আবু তালিবের সন্তানদের মধ্যে আলি ও জাফর ছিলেন অল্পবয়সী। কিন্তু অপর দুজন-উকাইল ও তালিব উপার্জন করতে সক্ষম ছিলেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন, জাফর আলির চেয়ে ১০ বছরের বড় ছিলেন। উকাইল জাফরের চেয়ে ১০ বছরের বড় এবং তালিব উকাইলের চেয়ে ১০ বছরের বড় ছিলেন।
উল্লেখ্য, আলি নবীজির তত্ত্বাবধানে থাকার ফলে বাল্যকালেই ইসলামে দীক্ষিত হন। এর দ্বারা উপরিউক্ত ঘটনার সত্যতা বিচার হয় না। তা ছাড়া তাঁর বড় ভাই জাফরও ইসলামের প্রাথমিক যুগেই ইমান এনেছিলেন। আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী কাফেলার মধ্যে তিনিও ছিলেন। আর চাচা আব্বাস নবীজি মদিনায় হিজরতের কয়েক বছর পরে ইসলাম গ্রহণ করেন।
ইবনে আবদুল বার স্বীয় সনদে ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেন, খাদিজার পরই আলি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। অতঃপর ইবনে আবদুল বার বলেন, 'এই সনদের ব্যাপারে কোনো আপত্তি কিংবা মতানৈক্য নেই।' ইমাম জাহবিও ইবনে আব্বাসের সূত্রে এমনটাই বলেছেন। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং ইসমাইল ইবনে ইসহাক বলেন, আলির ফজিলত যতগুলো সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এ পরিমাণ বর্ণনা অন্য কোনো সাহাবির ব্যাপারে হয়নি।
তবে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া ইমাম আহমাদের ব্যাপারে উপরিউক্ত বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ইমাম আহমাদের বক্তব্যের অর্থ কখনোই এটা নয় যে তিনি বলেছেন, আলির যে পরিমাণ ফজিলত সেটা অন্য কারও নেই। এ জাতীয় মিথ্যা বলা থেকে ইমাম আহমাদের মতো ব্যক্তি অনেক ঊর্ধ্বে। বরং অর্থ হলো, বিশুদ্ধ বর্ণনায় আলির যত ফজিলত এসেছে, তা অন্য কারও ক্ষেত্রে আসেনি।
জায়িদ ইবনে হারিসার বন্দী হওয়ার কাহিনি
ইবনে সা'আদ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে হিশাম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সায়েব কালবির পিতার সূত্রে জায়িদ ইবনে হারিসার বন্দী হয়ে মক্কার ওকাজ বাজারে আসার ঘটনা উল্লেখ করেন। বর্ণিত আছে, হারিসা ইবনে শারাহিল নাবহান অঞ্চলের এক নারীকে বিয়ে করেন। এরপর তাঁদের সংসারে জাবলা, আসমা ও জায়িদ নামের তিন সন্তান জন্মলাভ করে।
অতঃপর তিনি আরও লেখেন, একদিন হারিসা তাঁর ছোট পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে হেজাজের নিম্নাঞ্চল তিহামার উপকণ্ঠে ফারাজা গোত্রের দস্যুবাহিনী লুট করে জায়িদকে হারিসার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়। অতঃপর দস্যুরা জায়িদকে মক্কার ওকাজ বাজারে বিক্রি করে দেয়। নবীজি জায়িদকে নবুওয়াতের আগে থেকেই চিনতেন। কারণ খাদিজা ওকাজ বাজার থেকে জায়িদকে কিনে নিয়ে আসেন। এরপর জায়িদ খাদিজার বসতবাড়িতে কাজ করতেন। সেই সূত্রে পরবর্তী সময়ে জায়িদ নবীজির তত্ত্বাবধানে লালিত হন। এভাবে দীর্ঘদিন চলে যায়।
হিজরতের পর একদিন হারিসা ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য নবীজির দরবারে আগমন করে জায়িদকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান। কিন্তু জায়িদ নিজেই তার পিতার সঙ্গে যেতে অস্বীকার করে। ফলে হারিসা ব্যর্থ মনোরথে মদিনা ত্যাগ করেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর তাহজিব গ্রন্থে এ ঘটনার সূত্র উল্লেখ করে বলেন, 'এটা একেবারে ভিত্তিহীন বর্ণনা।'
হাফেজ আবু আবদুল্লাহ ইবনে মানদাহ সাহাবি জায়িদ ইবনে হারিসার জীবনীতে লেখেন, 'এই সনদ ছাড়া এ ঘটনার অন্য কোনো সূত্র নেই। কিন্তু পরে আমি এ ঘটনা হাফেজ হাকিমের মুসতাদরাক গ্রন্থে পেয়েছি। তবে হাকিম এর সূত্রের ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু বলেননি।'
তা ছাড়া ইবনে সা'আদের সনদে হিশام এবং তাঁর পিতা রয়েছেন। তাঁরা উভয়েই প্রত্যাখ্যাত। ইবনে ইসহাকও তাঁর সিরাতগ্রন্থে এ ঘটনা সনদ ছাড়াই উল্লেখ করেছেন।
ইবনে আবদুল বার তাঁর সাহাবিদের জীবনী শীর্ষক ইসতি'আব গ্রন্থে আবু ইসহাকের সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করার পর উল্লেখ করেন, 'হারিসার পুত্র জাবলাকে কেউ জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি বড় নাকি জায়িদ বড়? উত্তরে সে বলল, আমি তার আগে জন্মলাভ করেছি; কিন্তু আমার চেয়ে জায়িদ অনেক উত্তম।'
অতঃপর তিনি সংক্ষেপে জায়িদের বন্দী হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করেন। কিন্তু সেখানে পরে জায়িদকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর পিতা হারিসার নবীজির দরবারে আগমনের কথা নেই।
তবে ইবনে আবদুল বার এ ঘটনা উল্লেখ করার আগে বলেন, 'এ ঘটনার সূত্রে আবু ইসহাক ও জাবলার মধ্যে কেউ কেউ ফারওয়া ইবনে নওফেলের নাম এনেছেন।' কিন্তু হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাহজিব গ্রন্থে জাবলার জীবনীতে বলেন, 'সঠিক সূত্র হলো, ফারওয়াহ থেকেই আবু ইসহাক এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন।'
তবে হারিসার পুত্র হয়েও লোকমুখে জায়িদের নামের সঙ্গে নবীজির নাম যুক্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ আরবের লোকেরা জায়িদকে মুহাম্মদের পুত্র বলে সম্বোধন করত। কিন্তু নবুওয়াতের যুগে আল্লাহ তায়ালা কোরআনে এ বিষয়টি রহিত করে দেন।
ইমাম বুখারি ওই আয়াতের শিরোনামে সহিহ বুখারিতে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম তাঁর রচিত সহিহ মুসলিম গ্রন্থে 'সাহাবিদের ফজিলত' অধ্যায়ে বর্ণনা করেন।
ইমাম তিরমিজি আবু আমর শাইবানির সূত্রে হারিসার অপর পুত্র জাবলা থেকে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। জাবলা বলেন, আমি নবীজির কাছে আগমন করে বললাম, 'হে আল্লাহর রাসুল! আমার ভাই জায়িদকে আমার সঙ্গে পরিবারের কাছে যেতে দিন।' উত্তরে নবীজি বললেন, 'সেটা তোমাদের ব্যাপার। জায়িদ স্বেচ্ছায় যেতে চাইলে আমি নিষেধ করব না।' তখন জায়িদ বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কসম! আমি আপনার ওপর অন্য কাউকে প্রাধান্য দিতে পারি না।' তখন জাবলা বলল, 'আমার কাছে আমার মতের চেয়ে আমার ভাইয়ের ইচ্ছা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।'
অতঃপর ইমাম তিরমিজি বলেন, 'এ হাদিসটি হাসান ও গরিব। কারণ ইবনে রুমির সূত্র ছাড়া অন্য কোনো সূত্রে আমি এ হাদিস কোথাও পাইনি।' তবে শাইখ আলবানি এ হাদিসকে সুনানে তিরমিজি গ্রন্থের সহিহ হাদিসের তালিকাভুক্ত করেছেন।
ইমাম হাকিম এ ঘটনা উল্লেখ করার পর এর সূত্রকে সহিহ বলে মত দেন এবং ইমাম জাহবি এর পক্ষে সমর্থন দেন।
📄 বিলাল বিন রাবাহ (রা)
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সূত্রে তিনি বলেন, সর্বপ্রথম মোট সাতজন প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেন। তাঁরা হলেন নবীজি, আবু বকর, আম্মার ইবনে ইয়াসির, তাঁর আম্মা সুমাইয়া, সুহাইব, বিলাল ও মিকদাদ।
তাঁদের মধ্যে নবীজিকে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাঁর চাচা আবু তালিবের মাধ্যমে নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং আবু বকরকে তাঁর গোত্রের লোকেরা নিরাপদে সরিয়ে নেয়। বাকি পাঁচজনের ওপর কুরাইশরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। জঘন্য কায়দায় বিভিন্নভাবে তাঁদের ওপর নির্যাতন চালায়। লোহার শিকলে বেঁধে বা লোহার পোশাক পরিয়ে তাঁদেরকে দুপুরবেলার সূর্যের প্রখর তাপে মরুর বালির মধ্যে শুইয়ে রাখত। দিনের পর দিন এভাবে তাঁরা অত্যাচার সয়ে যেতেন। একপর্যায়ে প্রত্যেকের পরিচিতজনেরা এসে কাফেরদের দাবি মুতাবেক মুক্তিপণ আদায় করে তাঁদের ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।
কিন্তু বিলালের মক্কায় কেউ ছিল না। কারণ তিনি ছিলেন আবিসিনিয়ার অধিবাসী। তাঁর ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়তে থাকে। মরুভূমিতে তাঁকে শুইয়ে দিয়ে কাফের নেতারা তাঁর বুকের ওপর ভারী পাথর চাপিয়ে দিত আর তাওহিদ অস্বীকারের জন্য চাপ প্রয়োগ করত।
কিন্তু তিনি নিজেকে এমন অসহনীয় কঠিন পরিস্থিতিতে একেবারে আল্লাহ তায়ালার হাতে সঁপে দিলেন। অত্যাচারীরা যখনই তাঁকে তাওহিদ ছাড়তে বলত, তিনি 'আহাদ আহাদ' বলে তা প্রত্যাখ্যান করতেন। একপর্যায়ে বিলালের পেছনে বখাটে দুই ছেলেকে লেলিয়ে দেওয়া হয়। তারা তাঁকে গলায় শিকল বেঁধে মক্কার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। এদিকে তিনি শুধু 'আহাদ আহাদ' বলে ইমানের সাক্ষ্য দিতে থাকতেন।
ইমাম ইবনে মাজাহ এবং হাকিম এ ঘটনা বর্ণনা করার পর একে সহিহ বলেছেন। ইমাম জাহবি এবং আহমাদ শাকেরও এই বর্ণনাকে সহিহ বলে সাব্যস্ত করেছেন।
ইমাম বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন।