📄 কোরাইশদের অত্যাচার-নির্যাতন
ইবনে ইসহাক হাকিম ইবনে জুবায়েরের সূত্রে বর্ণনা করেন, বিখ্যাত তাবেয়ি সাঈদ ইবনে জুবায়ের বলেন, 'আমি সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞেস করলাম, কুরাইশের কাফেররা কি কখনো নবীজির সাহাবিদের ওপর এমন অত্যাচার করেছে, যার ফলে তাঁরা অতিষ্ঠ হয়ে মুখের ওপর ইমানকে অস্বীকার করে বসেছেন?'
উত্তরে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বললেন, 'হ্যাঁ; অবশ্যই এমনটা বহুবার ঘটেছে। আল্লাহর কসম! কাফেররা নবীজির সাহাবিদের ধরে এনে পেটাত। সারা শরীরে নিজেদের সর্বশক্তি দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করত। তাঁদেরকে খেতে দিত না, পানিও পান করতে বাধা দিত। ক্রমাগত আঘাতে জর্জরিত হয়ে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থাকার ফলে সাহাবিদের এমন অবস্থা হতো যে মেরুদণ্ড সোজা করে বসার শক্তি হারিয়ে ফেলতেন। পথের পাশে কাত হয়ে পড়ে থাকতেন। আঘাত করতে করতে বলত, এই হতচ্ছাড়া কোথাকার! বল, এই লাত ও উজ্জা কি তোর ইলাহ নয়?
'অপারগ হয়ে বাধ্য হয়ে তাঁরা মুখের ওপর "হ্যাঁ হ্যাঁ” বলে উত্তর দিতেন। এমনকি তাঁদের সামনে দিয়ে বিশালদেহী গোবরে পোকা (জুআল) অতিক্রম করার সময় সেটা দেখিয়ে কাফেররা তাঁদের জিজ্ঞেস করত, এই জুআল কি তোদের রব নয়? তাঁরা বলতেন, হ্যাঁ, তোমরা যা বলো তা-ই।'
উল্লেখ্য, ওই বর্ণনার সূত্রে হাকিম ইবনে জুবায়ের রয়েছেন, যাঁর ব্যাপারে হাদিসবিশারদেরা আপত্তি করেছেন। ইমাম আহমাদ, ইয়াকুব ইবনে শায়বাহ, আবু হাতেম ও আরও অনেকেই তাঁকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ইমাম দারা কুতনি বলেন, 'হাকিম ইবনে জুবায়ের পরিত্যক্ত বর্ণনাকারীদের একজন।'
আবু জুর'আহ বলেন, 'দুর্বল হলেও তাঁকে মিথ্যাবাদী বলা যাবে না।'
অবশ্য ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদ এবং ফাজায়েলে সাহাবাহ গ্রন্থে এ জাতীয় ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। এসব বর্ণনা সামনে রাখলে সাহাবিদের নির্যাতন সইয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অন্য কোনো বর্ণনার দ্বারস্থ হওয়ার কোনো প্রয়োজনই নেই। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সূত্রে তিনি বলেন, সর্বপ্রথম মোট সাতজন প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেন। তাঁরা হলেন নবীজি, আবু বকর, আম্মার ইবনে ইয়াসির, তাঁর আম্মা সুমাইয়া, সুহাইব, বিলাল ও মিকদাদ।
তাঁদের মধ্যে নবীজিকে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাঁর চাচা আবু তালিবের মাধ্যমে নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং আবু বকরকে তাঁর গোত্রের লোকেরা নিরাপদে সরিয়ে নেয়। বাকি পাঁচজনের ওপর কুরাইশরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। জঘন্য কায়দায় বিভিন্নভাবে তাঁদের ওপর নির্যাতন চালায়। লোহার শিকলে বেঁধে বা লোহার পোশাক পরিয়ে তাঁদেরকে দুপুরবেলার সূর্যের প্রখর তাপে মরুর বালির মধ্যে শুইয়ে রাখত। দিনের পর দিন এভাবে তাঁরা অত্যাচার সয়ে যেতেন। একপর্যায়ে প্রত্যেকের পরিচিতজনেরা এসে কাফেরদের দাবি মুতাবেক মুক্তিপণ আদায় করে তাঁদের ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।
কিন্তু বিলালের মক্কায় কেউ ছিল না। কারণ তিনি ছিলেন আবিসিনিয়ার অধিবাসী। তাঁর ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়তে থাকে। মরুভূমিতে তাঁকে শুইয়ে দিয়ে কাফের নেতারা তাঁর বুকের ওপর ভারী পাথর চাপিয়ে দিত আর তাওহিদ অস্বীকারের জন্য চাপ প্রয়োগ করত।
কিন্তু তিনি নিজেকে এমন অসহনীয় কঠিন পরিস্থিতিতে একেবারে আল্লাহ তায়ালার হাতে সঁপে দিলেন। অত্যাচারীরা যখনই তাঁকে তাওহিদ ছাড়তে বলত, তিনি 'আহাদ আহাদ' বলে তা প্রত্যাখ্যান করতেন। একপর্যায়ে বিলালের পেছনে বখাটে দুই ছেলেকে লেলিয়ে দেওয়া হয়। তারা তাঁকে গলায় শিকল বেঁধে মক্কার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। এদিকে তিনি শুধু 'আহাদ আহাদ' বলে ইমানের সাক্ষ্য দিতে থাকতেন।
ইমাম ইবনে মাজাহ এবং হাকিম এ ঘটনা বর্ণনা করার পর একে সহিহ বলেছেন। ইমাম জাহবি এবং আহমাদ শাকেরও এই বর্ণনাকে সহিহ বলে সাব্যস্ত করেছেন।
ইমাম বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
সমাজে প্রচলিত আরেকটি ঘটনা ইবনে সা'আদ বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মদ ইবনে ওমরের সূত্রে তিনি বলেন, উম্মুল মুমিনিন আয়েশা বলেন, নবীজি বলেছেন, 'আমি দুই মন্দ প্রতিবেশীর সঙ্গে বসবাস করছি। এদের একজন আবু লাহাব এবং অপরজন উকবা ইবনে আবু মুঈত। তারা উটের বিষ্ঠা ও অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা ইচ্ছে করেই আমার বাড়ির দরজায় ফেলে যেত। আমি চুপচাপ সয়ে যেতাম। একপর্যায়ে আমি নিজে সেগুলো পরিষ্কার করে তুলে বাইরে নিয়ে জোরে ডাক দিয়ে বলতাম, হে আবদে মানাফের সন্তানেরা! এরা কেমন প্রতিবেশী? অতঃপর সেগুলো ভাগাড়ে ফেলে দিয়ে আসতাম।'
ইবনে সা'আদের শাইখ ওয়াকিদিকে ঐতিহাসিকেরা প্রত্যাখ্যাত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাই ওই বর্ণনা অনেকের মতে দুর্বল। অবশ্য নবীজির ওপর কুরাইশদের অত্যাচার ও নিপীড়নের আরও অনেক ঘটনা রয়েছে। যেগুলো বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র, সিরাত ও হাদিসগ্রন্থে সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এমন প্রমাণিত ঘটনা রেখে উপরিউক্ত নিতান্ত দুর্বল মতামতগুলো গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই।
📄 ইসলামের চরম শত্রু
ইবনে ইসহাকের সূত্রে ইউনুস ইবনে বুকাইর বলেন, ইকরামা ও ইবনে আব্বাসের সূত্রে মক্কার কিছু প্রবীণ লোক নবীজি এবং মক্কার কাফেরদের মধ্যে সংঘটিত এক দীর্ঘ ঘটনার বর্ণনা দেন। একদিন নবীজি নিজ বাড়িতে চলে যাওয়ার পর আবু জাহল কুরাইশদের উদ্দেশে বলল, 'হে কুরাইশ! অনেক হয়েছে! মুহাম্মদ আমাদের ধর্মকে দোষারোপ করছে, বাপ-দাদাদের গালি দিচ্ছে। আমাদের দেবতা ও পুরোহিতদের বোকা বলে আখ্যায়িত করছে। আগামীকাল সে যখন কাবা চত্বরে আসবে, তখন সেজদায় যাওয়ার পর তার মাথার ওপর এমন এক পাথর নিক্ষেপ করব, যাতে তার মাথা থেঁতলে যায়। আমি এর জন্য পাথর সংগ্রহ করব, যতটুকু ভার আমি সইতে পারি। তোমরা আমাকে সাহায্য করো কিংবা বাধা প্রদান করো, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। বনু আবদে মানাফের সঙ্গে যা হওয়ার তা পরে দেখা যাবে। দেখি, তারা কী করতে পারে!'
কুরাইশের লোকেরা তাকে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমরা তোমার এ সিদ্ধান্তে অমত প্রকাশ করি না। অতএব, তোমার যা ইচ্ছে করো।'
পরদিন যথারীতি খুব সকালে নবীজি অভ্যাসমতো কাবা চত্বরের নামাজের জন্য ঘর থেকে বের হন। তখন ইসলামের কিবলা ছিল বায়তুল মুকাদ্দাস। সিরিয়ার দিকে ফিরে নবীজি নামাজ আদায় করতেন। তিনি সাধারণত রুকনে ইয়েমেনি কোণ বরাবর নামাজের জন্য দাঁড়াতেন। এদিকে আবু জাহল একটি ভারী পাথর নিয়ে গোপনে অবস্থান নেয় আর সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। ওদিকে কুরাইশের অতি উৎসাহী লোকেরা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল আবু জাহল কী করে এবং পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়।
নবীজি যখন সেজদায় গেলেন, তখনই আবু জাহল পাথর নিয়ে তাঁর দিকে ধেয়ে গেল। কুরাইশরা দেখল, নবীজির কাছাকাছি যেতেই আবু জাহলের চেহারা আতঙ্কে বিবর্ণ হয়ে ফ্যাকাশে রূপ ধারণ করেছে এবং তার হাঁটু দুটো নড়বড়ে হয়ে যায়। ফলে পাথরটি তার হাত ফসকে মাটিতে পড়ে যায় এবং সে দ্রুত পদে পেছনে ফিরে আসে। এ অবস্থা দেখে কুরাইশের লোকেরা আবু জাহলের দিকে এগিয়ে যায়। তারা জিজ্ঞেস করতে থাকে, 'তোমার কী হলো?'
উত্তরে আবু জাহল বলল, 'গতকাল আমি তোমাদের যা বলতে গিয়েছিলাম, তাই করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু মুহাম্মদের কাছে যেতেই বিরাট আকারের একটা উট আমার দিকে ধেয়ে আসতে থাকে। এমন ভয়ংকর মোটা দাঁতওয়ালা উট আমি জীবনে কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছিল, আমাকে গিলে ফেলবে।'
ইবনে ইসহাক বলেন, অন্য সূত্রে আমি জেনেছি, নবীজি বলেছেন, 'আমার দিকে ধেয়ে আসা উটটি মূলত জিবরাইল ছিলেন। আবু জাহল আরেকটু কাছে গেলে জিবরাইল তাকে বধ করতেন।'
ওই বর্ণনায় ইবনে ইসহাকের শাইখ অজ্ঞাত। এ প্রসঙ্গে ইমাম বায়হাকি বলেন, 'ইবনে ইসহাক যখন তাঁর শায়খের নাম উল্লেখ না করে কোনো কিছু বর্ণনা করেন, তখন আমাদের মন খারাপ হয়ে যায়।'
ইবনে ইসহাকের এ বর্ণনায় বলা হয়েছে, আবু জাহল আল্লাহর নামে শপথ করেছিল। অথচ এটা পরিত্যাজ্য কথা। কারণ সহিহ মুসলিম এর বর্ণনায় এসেছে, আবু জাহল লাত ও উজ্জা নামীয় জাহেলি যুগের প্রসিদ্ধ দুই দেবতার নামে শপথ করেছে।
ইমাম হাকিম আবদুল্লাহ ইবনে সালেহের সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করার পর একে সহিহ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে ইমাম জাহবি বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনে সালেহ তেমন সুবিধাজনক কেউ নন। আর ইসহাক ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবু ফারওয়াহ নামে অপর যে বর্ণনাকারী রয়েছে, সে প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিদের অন্যতম।'
সহিহ মুসলিম গ্রন্থে সাহাবি আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, একদিন আবু জাহল কুরাইশ সম্প্রদায়ের লোকদের জিজ্ঞেস করল, 'মুহাম্মদ কি তোমাদের সামনে প্রকাশ্যেই সেজদায় মাটিতে মুখ লাগায়?' তাদের কেউ বলল, হ্যাঁ। তখন আবু জাহল লাত ও উজ্জার নামে শপথ নিয়ে বলল, 'আবার যদি তাকে এমন করতে দেখি, তাহলে আমি তার ঘাড়ের ওপর বসে তার চেহারা মাটির সঙ্গে ঘষে দেব।'
এরপর নবীজি নামাজে দাঁড়ানোর পর যখন সেজদায় গেলেন, তখন আবু জাহল তাঁর দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু দেখা গেল, আবু জাহল কী যেন হাত দিয়ে প্রতিহত করতে করতে পিছু হটছে।
লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার আবার কী হলো? আবু জাহল উত্তর দিল, 'আমার ও মুহাম্মদের মধ্যে এক বিশাল অগ্নিকুণ্ড প্রকাশ পেল, যা দেখতে খুব ভয়ংকর। তাই আমি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলাম।'
নবীজি বলেছিলেন, 'আবু জাহল আরেকটু এগোলেই ফেরেশতাগণ তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একটা একটা করে ছিঁড়ে ফেলতেন।'
ইমাম বুখারি স্বীয় সনদে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের সূত্রে সংক্ষেপে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে ওই বর্ণনায় রয়েছে, আবু জাহল বলেছিল, 'আমি মুহাম্মদের ঘাড়ে চড়ে বসব।' নবীজির কাছে এ খবর পৌঁছালে তিনি বলেছিলেন, 'আবু জাহল এমন করলে ফেরেশতাগণ তাকে বধ করে ফেলতেন।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি লিখেছেন, 'নবীজি সেজদারত সময় এ জাতীয় অন্যায় আবু জাহল ছাড়াও উকবা ইবনে আবু মুঈত করেছিল। যেমন সে জবাই করা উট ও ভেড়ার নাড়িভুঁড়ি নবীজির সেজদারত অবস্থায় তাঁর ঘাড়ে নিক্ষেপ করত।
'তবে আবু জাহল প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে এমন অন্যায় করার দুঃসাহস, বিশেষ করে নবীজির ঘাড়ে উঠে বসার দুঃসাহস দেখানোয় আল্লাহ তায়ালা তাকে তৎক্ষণাৎ ফেরেশতাগণের মাধ্যমে প্রতিহত করেন। উকবা ইবনে আবু মুঈতের বেলায় এমনটি না হলেও সে নবীজির বদ-দোয়ার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। দ্বিতীয় হিজরির বদর যুদ্ধে সে মুসলিম বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারায়।'
তা ছাড়া সহিহ মুসলিম এর অপর বর্ণনায় রয়েছে, নবীজির পিঠ মোবারকে জবাই করা উট কিংবা ভেড়ার বর্জ্য নিক্ষেপ করার প্রস্তাব আবু জাহলই উত্থাপন করেছিল।
📄 আবু লাহাব
সমাজে প্রচলিত আরেকটি ঘটনা ইবনে সা'আদ বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মদ ইবনে ওমরের সূত্রে তিনি বলেন, উম্মুল মুমিনিন আয়েশা বলেন, নবীজি বলেছেন, 'আমি দুই মন্দ প্রতিবেশীর সঙ্গে বসবাস করছি। এদের একজন আবু লাহাব এবং অপরজন উকবা ইবনে আবু মুঈত। তারা উটের বিষ্ঠা ও অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা ইচ্ছে করেই আমার বাড়ির দরজায় ফেলে যেত। আমি চুপচাপ সয়ে যেতাম। একপর্যায়ে আমি নিজে সেগুলো পরিষ্কার করে তুলে বাইরে নিয়ে জোরে ডাক দিয়ে বলতাম, হে আবদে মানাফের সন্তানেরা! এরা কেমন প্রতিবেশী? অতঃপর সেগুলো ভাগাড়ে ফেলে দিয়ে আসতাম।'
ইবনে সা'আদের শাইখ ওয়াকিদিকে ঐতিহাসিকেরা প্রত্যাখ্যাত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাই ওই বর্ণনা অনেকের মতে দুর্বল। অবশ্য নবীজির ওপর কুরাইশদের অত্যাচার ও নিপীড়নের আরও অনেক ঘটনা রয়েছে। যেগুলো বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র, সিরাত ও হাদিসগ্রন্থে সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এমন প্রমাণিত ঘটনা রেখে উপরিউক্ত নিতান্ত দুর্বল মতামতগুলো গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই।
📄 রাসূল ﷺ-এর সাহায্যকারী
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, কুরাইশ নেতারা যখন দেখল, আবু তালিব তাদের কোনো প্রস্তাবেই সায় দিচ্ছেন না; বরং উল্টো তিনি স্বীয় ভাতিজা মুহাম্মদকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন, এর সঙ্গে নবীজির কোনো বিপদ-আপদ কিংবা সমস্যা সৃষ্টি হলে আবু তালিব নিজে তা প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন, তখন কুরাইশদের যেন ঘুম হারাম হয়ে গেল।
তারা এ বিষয়ে রাতদিন সলাপরামর্শ করতে থাকে। কী করে মুহাম্মদ ও তাঁর চাচা আবু তালিবের ব্যাপারে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। এদিকে সমগ্র মক্কায় আবু তালিব ছিলেন গণ্যমান্য ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাই কুরাইশরা তাঁকে খেপাতেও চাচ্ছিল না, আবার নবীজিকেও বাগে আনতে পথ খুঁজছিল।
একদিন আবু তালিব তাঁর বাড়িতে একাকী অবস্থান করছিলেন। কুরাইশদের কয়েকজন তাঁর কাছে এসে অভিনব এক প্রস্তাব করে বসে। তারা সঙ্গে করে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরার পুত্র উমারাকে নিয়ে যায় এবং বলে, 'হে আবু তালিব, তোমার তো সেবা ও দেখাশোনার জন্য একজনকে খুব দরকার। এক কাজ করো, আমরা তোমার জন্য ওয়ালিদের পুত্র উমারাকে নিয়ে এসেছি। ছেলেটি দেখতেও সুদর্শন আবার বুদ্ধিও আছে। তুমি একে তোমার সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে নাও এবং তোমার ভাতিজা মুহাম্মদকে আমাদের হাতে তুলে দাও।
'মুহাম্মদ আমাদের বাপ-দাদাদের অপমান করছে। তোমার ও আমাদের ধর্মে বিবাদ সৃষ্টি করছে। ঘরে ঘরে পিতার থেকে পুত্রকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। সমাজের কিছু নির্বোধ ও বোকাদের নিজের দলে টেনে পুরো সমাজের বিরুদ্ধে সে অবস্থান নিয়েছে। আমরা তাকে শেষ করে দেব। এটাই ভেবে দেখেছি, এখনই একটা মিটমাট করে নেওয়া দরকার। তাহলে ভবিষ্যতে তেমন বেগ পেতে হবে না; অন্যথায় এ সমস্যা আরও বেড়ে যাবে। এতে আমাদের পরস্পরে ভুল-বোঝাবুঝিও দূর হবে এবং আগের মতো আমরা মিলেমিশে থাকতে পারব।'
উত্তরে আবু তালিব তাদের উদ্দেশে বললেন, 'আল্লাহর কসম! তোমরা আমার প্রতি ন্যায়বিচার করোনি। বাহ! তোমরা তোমাদের পুত্রকে আমার তত্ত্বাবধানে দেবে এবং আমি তার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করব, আর আমি তোমাদের হাতে আমার পুত্রতুল্য ভাতিজাকে তুলে দেব; এরপর তোমরা তাকে হত্যা করবে।
'আল্লাহর কসম! এমনটা আমি কখনোই হতে দেব না। তোমরা কি জানো না, উটনী নিজের বাচ্চাকে হারিয়ে ফেললে শুধু ওর বাচ্চাকেই খোঁজে!'
তখন মুতইম ইবনে আদি ইবনে নওফেল ইবনে আবদে মানাফ আবু তালিবকে লক্ষ করে বলল, 'আমরা তোমার জাতির ব্যাপারে তোমার সঙ্গে ন্যায়বিচার করতেই এসেছি। আমাদের মনে হচ্ছে, তুমি আমাদের প্রস্তাব মেনে নেবে না।'
উত্তরে আবু তালিব বললেন, 'আল্লাহর কসম! তারা আমার সঙ্গে ন্যায়বিচার করেনি। আর তুমি আমাকে অপমান করতে এবং পুরো জাতিকে আমার বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চাইছ। তোমার যা খুশি করতে পারো। আমি এর মধ্যে নেই।'
উল্লেখ্য, ইবনে ইসহাক সরাসরি কোনো সাহাবির সূত্র ছাড়াই এটা বর্ণনা করেছেন। তবে ইমাম জাহবি তারিখুল ইসলাম গ্রন্থের সিরাত অধ্যায়ে ইবনে ইসহাকের সূত্রে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ইবনে সা'আদও তাবাকাত গ্রন্থে ওয়াকিদির সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করেন।
ইবনে কাসির ওই ঘটনার বিশ্লেষণে একটি রহস্য উদ্ঘাটন করে বলেন, 'নবীজিকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেও চাচা আবু তালিবের ইসলাম গ্রহণ না করার পেছনে আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহস্য লুক্কায়িত আছে। কারণ আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ করলে কুরাইশ জাতি তাঁকে মোটেই ভয় পেত না; বরং তখন সবার আগে তাঁকেই শেষ করে দিত। এর ফলে প্রিয় নবীজি আশ্রয়হীন হয়ে পড়তেন এবং কুরাইশদের বর্বরতার শিকার হতেন। আবু তালিব বিধর্মী থাকার ফলে তাঁর জীবদ্দশায় কুরাইশ নেতারা প্রিয় নবীজির বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার দুঃসাহস করেনি।'
অন্য জায়গায় ইবনে কাসির বলেন, 'সর্বোপরি এটা ছিল আল্লাহ তায়ালার সিদ্ধান্ত। এর ভালো-মন্দ তিনিই জানেন। কাফেরদের জন্য ইস্তেগফার কিংবা দোয়া করার ওপর নিষেধাজ্ঞা না থাকলে আমরা অবশ্যই তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতাম।'