📘 সিরাতের প্রচলিত ভুল > 📄 শৈশব এবং যৌবন

📄 শৈশব এবং যৌবন


বাল্যকালে দাদা আবদুল মুত্তালিবের বিছানায় নবীজি বসতেন
ইবনে ইসহাক আব্বাস ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মা'বাদের সূত্রে বর্ণিত, কুরাইশের মহান নেতা আবদুল মুত্তালিবের জন্য কাবাঘরের পাশে বিছানা বিছানো হতো। যেখানে তাঁর সম্মানে তাঁর সন্তানদের কেউ বসত না। কিন্তু বালক নবীজি কখনো সেই বিছানায় এসে বসতেন। যার কারণে তাঁর চাচারা তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে দিতে চাইতেন। ব্যাপারটি আবদুল মুত্তালিবের নজরে পড়ল। তখন প্রিয় নাতি বালক নবীজির পিঠে হাত বুলিয়ে তিনি তাঁর চাচাদের বললেন, 'ওকে ছেড়ে দাও। আমার এ নাতির হিসাব আলাদা।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানির তাকরিব গ্রন্থের আলোকে আব্বাস ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মা'বাদ ইবনে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব ষষ্ঠ শতাব্দীর নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিকদের একজন। তাই নবীজির সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত না হলেও তিনি স্বীয় গোত্র কিংবা পরিবারের কারও সূত্রে যা কিছু বর্ণনা করেছেন, তা হুবহু সাহাবিদের সূত্রের মতো না হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ কারণে তাঁর সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।
ইবনে ইসহাকের সূত্রে তাঁর বর্ণনা বায়হাকি তাঁর দালায়েল গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
ইবনে সাদ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে এ ঘটনা নিজ শাইখ ওয়াকিদির সূত্রে উল্লেখ করেছেন, যার বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যাত বলা হয়েছে।
ইমাম জাহবি তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে সিরাতের বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবনে শাবিবের সূত্রে এ ঘটনা উল্লেখ করার পর বলেন, 'আবদুল্লাহর বর্ণনা দুর্বল।' ইবনে কাসির এ ঘটনা ইবনে ইসহাকের সূত্রে বর্ণনা করলেও এ ব্যাপারে নীরব থেকেছেন।

নবীজির বাল্যকালে দুর্ভিক্ষ ও বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা
ইবনে সাদ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে মাখরামা ইবনে নওফেল জুহরির সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি তাঁর আম্মা রুকাইকা বিনতে আবু সাইফিকে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, আমি কুরাইশের নেতা আবদুল মুত্তালিবের জন্মকালে ছিলাম। দীর্ঘ কয়েক বছর মক্কায় দুর্ভিক্ষ চলছিল, বৃষ্টিও হচ্ছিল না। কুরাইশদের খাদ্যপণ্য ও খেতের ফসল শেষ হয়ে মক্কার ঘরে ঘরে অভাব দেখা দেয়। বাজারেও খাদ্যসংকট দেখা দেয়। ক্ষুধার যন্ত্রণায় নারী ও শিশুরা হাহাকার করছিল।
এরই মাঝে একদিন ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখি, কেউ ডেকে বলছে, 'হে কুরাইশের সন্তানগণ, তোমরা শুনে রাখো! শেষ নবী তোমাদের মাঝেই প্রেরিত হয়েছেন। তিনি তোমাদের জন্য সর্বক্ষেত্রে উন্নতি ও সজীবতা ফিরিয়ে আনবেন। অতএব, তোমরা তোমাদের মধ্যে এমন একজনকে লক্ষ্য করো, যিনি তোমাদের মধ্যে বংশীয় মর্যাদায় সমপর্যায়ের; যিনি সর্বাধিক সম্মানিত ও উজ্জ্বল বর্ণবিশিষ্ট হবেন। তিনি যেন তাঁর পরিবারের সকলকে নিয়ে এবং তোমরা তোমাদের গোত্রীয় প্রত্যেক শাখা থেকে একজন করে বেরিয়ে পড়ো। অতঃপর পবিত্রতা অর্জন করে সুগন্ধি লাগিয়ে মক্কার আবু কুবায়েস পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করো। এরপর এই মহান ব্যক্তি তোমাদের জন্য বৃষ্টি চেয়ে প্রার্থনা করবেন এবং তোমরা "আমিন আমিন” বলবে। তাঁর দোয়ার ফলে তোমরা অবশ্যই পানি লাভ করবে।'
রুকাইকা সকালে স্বপ্নের এ ঘটনা কুরাইশের লোকদের জানালে তারা সবাই তাঁর স্বপ্নের বর্ণনা অনুযায়ী সে ধরনের লোক খুঁজতে লাগল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তারা নিশ্চিত হলো, এমন লোক আমাদের মধ্যে শুধু একজনই আছেন। তিনি হচ্ছেন আবদুল মুত্তালিব। কুরাইশের সবাই আবদুল মুত্তালিবের কাছে সমবেত হয়ে স্বপ্নের কথা খুলে বলল।
এরপর আবদুল মুত্তালিব সবাইকে নিয়ে যথারীতি আবু কুবায়েস পাহাড়ের উদ্দেশে রওনা হলেন। সঙ্গে করে প্রিয় নাতি মুহাম্মদকে নিয়ে চললেন। পাহাড়ের চূড়ায় ওঠে বালক নবীজিকে পাশে বসিয়ে তিনি প্রার্থনা শুরু করলেন, 'হে মালিক! এরা সবাই তোমারই বান্দা ও তাদের সন্তান। এদের সঙ্গে যেসব নারী ও শিশু সমবেত হয়েছে, এরাও তোমার দাসী ও তাদের পরিবার। ও মালিক! তুমি দেখতে পাচ্ছ, আমাদের ওপর কেমন আপদ নেমে এসেছে। আজ কত দিন বৃষ্টি নেই, মাটি ফেটে যাচ্ছে। খাদ্যপণ্য ও শস্য সব নিঃশেষ হয়ে সর্বত্র দুর্ভিক্ষ হানা দিয়েছে। তুমি দয়া করে আমাদের ওপর থেকে এ দুর্ভিক্ষ উঠিয়ে নাও। মাটির উর্বরতা ও জমির সজীবতা আমাদেরকে দান করো।'
দেখা গেল, আবদুল মুত্তালিবের প্রার্থনা শেষ না হতেই প্রবল বর্ষণে মক্কার উপত্যকা প্লাবিত হয়ে যায়। সবার প্রথম নবীজি পানি পান করলেন। এরপর সবাই পানি নিয়ে ঘরে ফিরল। অভাবনীয় এ অবস্থা দেখে রুকাইকা আনন্দে গাইতে শুরু করলেন:
প্রশংসার আধিক্যের ফলে আল্লাহ আমাদের শহরকে প্লাবিত করলেন
অথচ আমরা নির্জীব হয়ে গিয়েছিলাম, অনাবৃষ্টি দীর্ঘদিন ধরে লেগে ছিল,
প্রবল বৃষ্টির পরে তিতির পাখি তার পথ খুঁজে পেল
এতে সমস্ত প্রাণী এবং গাছপালাও সজীব হয়ে উঠল,
মেঘের বরকতময় পানি দ্বারা সকলে সিক্ত হলো
মুদার গোত্রের সুসংবাদদাতা কতই না উত্তম!
বিশ্বস্ত মুহাম্মদের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের অশুভ বিষয় সরিয়ে নিলেন,
সৃষ্টিজগতে তাঁর মতো ন্যায়পরায়ণ আর কেউ নেই।
হিশাম কালবি প্রত্যাখ্যাত। ইমাম বায়হাকি তাঁর দালায়েল গ্রন্থে ওই বর্ণনা দুটি সনদে উল্লেখ করেছেন। প্রথম সনদে তাঁদের দুজনের মধ্যে আবদুল আজিজ ইবনে ইমরান রয়েছেন। তিনিও প্রত্যাখ্যাতদের একজন। দ্বিতীয় সনদে জাহার ইবনে হিসন তাঁর দাদা হুমাইদ ইবনে মুনহিব থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম জাহবির ভাষ্যমতে তাঁরা দুজনে অজ্ঞাত।
তবে মূল হাদিস উল্লেখ করার পর আল্লামা হাইসামি বলেন, 'ইমাম তাবারানি এ হাদিস তাঁর মু'জামুল কাবির গ্রন্থে যে সূত্রে বর্ণনা করেছেন, সেখানে জাহার ইবনে হিসন রয়েছেন, যাঁকে ইমাম জাহবি অজ্ঞাত বলে উল্লেখ করেছেন।' হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ইসাবাহ গ্রন্থে জাহারের জীবনী উল্লেখ প্রসঙ্গে বলেন, 'ইমাম তাবারানি ও মুসতাগফারি তাঁকে সাহাবিদের মধ্যে গণ্য করেছেন।'
ইমাম জাহবি তাঁর তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে সিরাতের বর্ণনায় জুলহুমার সূত্রে নবীজির চাচা আবু তালিবের বৃষ্টির জন্য প্রার্থনার ঘটনা উল্লেখ করে লেখেন, জুলহুমা বলেন, 'আমি নামিরার সমতলভূমিতে অবস্থান করছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, নজদ অঞ্চলের উঁচু ভূমির দিক থেকে একটি কাফেলা আসছে। কাফেলাটি কাবার নিকটবর্তী হলে তাদের মধ্যে একজন বালককে দেখলাম যে স্বীয় উটের পিঠ থেকে নিজেকে মাটিতে ছুঁড়ে দিল...।' অতঃপর জুলহুমা আরও বলেন, 'আমি হিজাজের নিম্নাঞ্চলের দিকে দ্রুতগতিতে এগোতে থাকি। এমনকি মসজিদুল হারামের নিকটে এসে পড়ি। এখানে এসে দেখতে পাই, কুরাইশদের একটি কাফেলা পানির জন্য হাহাকার করছে। সেখানে কুরাইশ গোত্রের লোকেরাও উপস্থিত ছিল।
'তাদের কেউ তখন বলছিল, “তোমরা প্রধান দুই দেবতা লাত ও উজ্জার ওপর ভরসা করো।” আরেকজন বলতে লাগল, “তৃতীয় দেবতা মানাতের ওপরও আস্থা রাখো।” এ অবস্থায় সেখানে অভিজাত সুদর্শন ও স্বাস্থ্যবান এক ব্যক্তিকে দেখতে পাই। মনে হচ্ছিল, নেতা পর্যায়ের কেউ হবেন। তিনি বললেন, “তোমাদের মধ্যে পিতা ইবরাহিমের বংশধর ইসমাইলের সন্তান থাকতে কোথায় উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটছ?” লোকেরা জবাবে বলল, সম্ভবত তুমি আবু তালিবের কথা বলছ! তিনি বললেন, “হ্যাঁ, তাই।”
'এরপর তারা সবাই আবু তালিবের বাড়ির দিকে ছুটল। আমিও তাদের সঙ্গে যোগ দিই। আবু তালিবের বাড়ির সামনে এসে ওই লোকটি বললেন, “হে আবু তালিব! উপত্যকা শুকিয়ে মরু হয়ে যাচ্ছে। মানুষ অভাবে পড়ে কষ্ট পাচ্ছে। বের হও, আমরা তোমাকে সঙ্গে নিয়ে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করব।” আবু তালিব বললেন, “সূর্য হেলে যাওয়ার পর যখন বায়ুপ্রবাহ হতে থাকবে, তখন ধীরে ধীরে তোমারা উন্মুক্ত প্রান্তরে চলতে থাকো।”
'সূর্য কিছুটা হেলে যেতেই আবু তালিব নিজের সঙ্গে এক বালককে নিয়ে বের হলেন। বালকটির শরীর থেকে যেন মেঘাচ্ছন্ন আকাশের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছিল। তাঁর চারপাশে মুত্তালিব গোত্রের আরও বেশ কয়েকজন বালক ছিল।
আবু তালিব তাঁকে কাবাঘরের দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন। বালকটি আঙুল উঁচিয়ে কাবার আশ্রয় প্রার্থনা করতে থাকে এবং অন্য বালকেরা তার অনুকরণ করতে থাকে।
'তখন আকাশে মেঘের সামান্য কোনো খণ্ডও ছিল না। কিছুক্ষণ পরেই চারপাশ থেকে মেঘের টুকরো মক্কার আকাশে ঘনীভূত হতে লাগল। বিকট শব্দে মেঘের গর্জন শুরু হলো। প্রবল বর্ষণ শুরু হওয়ার পর দেখতে পেলাম, উপত্যকা প্লাবিত হচ্ছে এবং মক্কার খেজুর বাগান ও গাছগাছালি সজীব হয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেল।' আবু তালিব তখন গাইতে লাগলেন:
তাঁর (নবীজির) ইনসাফের পাল্লা জবের পরিমাণও হেলে যায় না
তিনি অনাথ এবং বিধবাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল
তাঁর কারণে হাশেমি বংশ থেকে বিপদাপদ দূর হয়ে যায়
বনু হাকিম তাঁর কারণে অনুগ্রহ এবং নেয়ামতে আবৃত আছে
তিনি নিষ্কলুষ সম্মানিত সরদার, তার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে মেঘ থেকে পানি চাওয়া হয়,
তিনি সত্যকে সূক্ষ্মভাবে ওজন করেন, তাঁর ওজন বিন্দুমাত্র বিপথে যায় না
পরবর্তী সময়ে আবু তালিবের উপরিউক্ত আবৃত্তির এই লাইনটি খুব প্রসিদ্ধি লাভ করে। বালক নবীজির নবুওয়াত লাভের পর এই কবিতার অনুকরণে আবু তালিব আরও দীর্ঘ কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন।
ইবনে কাসির ওই কবিতা উল্লেখ করার পর মুগ্ধ হয়ে এর প্রশংসা করেন। ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থে 'বৃষ্টি প্রার্থনার নামাজ' অধ্যায়ে এ কবিতার প্রসঙ্গ টেনেছেন। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি সহিহ বুখারির ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল বারিতে এই হাদিসের শিরোনামের আলোচনায় লিখেছেন, এখানে কবিতার মাধ্যমে প্রিয় নবীজির যে বিশেষ মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, এ রকম আরও অনেক উদাহরণ তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনে রয়েছে।
ইমাম বায়হাকি তাঁর দালায়েল গ্রন্থে সাহাবি আনাসের সূত্রে বর্ণনা করেন, এক বেদুইন নবীজির দরবারে এসে নিজের অভাবের কথা এভাবে প্রকাশ করল, 'হে নবী! আপনার কাছেই এসেছি; অথচ আমার না আছে কোনো উষ্ট্রী, যা দ্বারা নতুন প্রাণীর জন্ম হয় এবং কোনো সন্তানও নেই, যে আমার কষ্টের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করে দেবে।' এরপর বেদুইনটি নবীজিকে উদ্দেশ্য করে আবৃত্তি করল:
তোমাকে ছাড়া আমাদের পলায়নের কোনো জায়গা নেই;
তা ছাড়া মানুষের আশ্রয়স্থল রাসুলগণ ছাড়া আর কে-ইবা হবে!
বেদুইনের মুখে এ কথা শুনে নবীজি গায়ে চাদর জড়িয়ে মিম্বরে উঠে আল্লাহ তায়ালার দরবারে ফরিয়াদ করলেন, 'হে দয়াময় রব! আপনি আমাদের জন্য পানির ব্যবস্থা করে দিন।'
দোয়া শেষে তিনি বললেন, 'আজ যদি আবু তালিব জীবিত থাকতেন, তাহলে এতক্ষণে তাঁর দুই চোখ শীতল হয়ে যেত। এখানে কে আছে, যে তাঁর বিখ্যাত আবৃত্তি গেয়ে শোনাবে?'
আলি (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! আপনি মনে হয় আমার পিতা আবু তালিবের আবৃত্তির পঙ্ক্তির কথা বলতে চাচ্ছেন।' অতঃপর তিনি এ কবিতা আবৃত্তি করে নবীজিকে শোনান।

ফিজারের যুদ্ধে নবীজির অংশগ্রহণ
ইবনে ইসহাক বলেন, নবীজি যখন মাত্র ২০ বছরের যুবক, তখন ফিজারের যুদ্ধ প্রচণ্ড আকার ধারণ করে। অবশ্য ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন, নবীজির ১৪ বা ১৫ বছর বয়সেই এ যুদ্ধ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। কুরাইশ এবং তাদের মিত্র কেনানা গোত্রের সঙ্গে কায়েস আয়লান গোত্রের মধ্যে জাহেলিয়াতের যুগে দীর্ঘদিন যে যুদ্ধ চলে আসছিল, তা-ই ইতিহাসে হারবুল ফিজার বা 'প্রশস্ত গিরিপথের যুদ্ধ' নামে প্রসিদ্ধ।
নবীজি নিজেই এ যুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। কারণ তাঁকে তাঁর চাচারা সঙ্গে করে রণাঙ্গনে নিয়ে যেতেন। নবীজি এ যুদ্ধ সম্পর্কে নিজেই পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন, 'আমি চাচাদের পক্ষ হয়ে শত্রুবাহিনীর তির-বর্শা নিক্ষেপ প্রতিহত করতাম।'
ইবনে ইসহাক এ ঘটনা সনদ ছাড়া বর্ণনা করলেও ইমাম জাহবি তারিখুল ইসলাম গ্রন্থের সিরাত অধ্যায়ে এবং ইবনে কাসির তাঁর বিখ্যাত ঐতিহাসিক গ্রন্থ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে এর বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। ইবনে সাআদ তাঁর শাইখ ওয়াকিদির সূত্রে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তবে ওয়াকিদির সূত্রে আরও বর্ণিত হয়েছে। নবীজি বলেন, 'আমি এ যুদ্ধে চাচাদের পক্ষে লড়াই করলেও আমার এতে কোনো সম্মতি ছিল না।' তবে ওয়াকিদিকে ঐতিহাসিকেরা প্রত্যাখ্যাত বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে বর্তমান সময়ের কিছু ঐতিহাসিক ও হাদিসবিশারদের মতে, এ বর্ণনা সহিহ নয়। তাঁদের মতে, হয়তো-বা এমনও হতে পারে, স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা নবীজিকে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে নিরাপদে রেখেছিলেন। কারণ ফিজার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ঘোষিত হারাম মাসে।
সুহাইলি বলেন, আল্লাহ তায়ালার বিধানে ঘোষিত হারাম মাসে যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ। কিন্তু আরব জাতি সে সময়ে এ বিধান লঙ্ঘন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল বিধায় একে হারবুল ফিজার তথা প্রশস্ত গিরিপথের যুদ্ধ বলা হয়।

নবীজির সঙ্গে বিয়ের সময় খাদিজার বয়স
মুসলিম সমাজে এটাই প্রসিদ্ধ যে, নবীজি যখন খাদিজাকে বিয়ে করেন, তখন তাঁর বয়স ৪০ বছর ছিল এবং ৬৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
ইবনে সা'আদ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে ওয়াকিদির সূত্রে এমনই বর্ণনা করেছেন। অথচ এর বিপরীত বর্ণনাও ইতিহাসে পাওয়া যায়। এ বিষয়ে হাকিম ইবনে ইসহাকের সূত্রে স্বীয় সনদে বর্ণনা করেন, 'বিয়ের সময় খাদিজার বয়স ২৮ হয়েছিল।' তবে এ সনদেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়নি।
এর একটু পরে হাকিম হিশাম ইবনে ওরওয়ার সূত্রে উল্লেখ করেন, '৬৫ বছর বয়সে খাদিজা ইন্তেকাল করেন।' এরপর হাকিম বলেন, 'এটা দুর্বল মত। অন্যথায় আমি জানতে পেরেছি, মৃত্যুর সময় খাদিজার বয়স ৬০ হয়নি।'
বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে বর্ণনা করেন, 'আবু আবদুল্লাহ হাকিম বলেছেন, আমি আবু বকর ইবনে খায়ছামার সূত্রে পেয়েছি, ইন্তেকালের সময় তাঁর বয়স ৬৫ হয়েছিল। কিন্তু অপর বর্ণনায় ৫০ বছরের উল্লেখ পাওয়া যায়। হাকিম বলেন, এটাই সহিহ মত।'
ইবনে কাসির বলেন, 'আবু আবদুল্লাহ হাকিম এমনই বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ নবীজি ২৫ বছর বয়সে খাদিজাকে বিয়ে করেন। তখন খাদিজার বয়স ৩৫ এবং অপর এক বর্ণনামতে ২৫ ছিল।'
এ ব্যাপারে ইবনে ইসহাক দুটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। প্রথমটি হাকিম ইবনে হিজামের সূত্রে, যেখানে বিয়ের সময় খাদিজার বয়স ৪০ বলা হয়েছে। অপর বর্ণনা ইবনে আব্বাসের সূত্রে উল্লেখ করেন, যেখানে ইবনে আব্বাস বলেন, 'বিয়ের সময় খাদিজা ২৮ বছরের যুবতী ছিলেন।'
ড. আকরাম ওমরি বলেন, খাদিজার গর্ভে নবীজির দুই পুত্র ও চার কন্যাসন্তান জন্মলাভ করেন। এর দ্বারা ইবনে ইসহাকের বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা প্রকাশ পায়। কারণ, ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় খাদিজার বয়স ২৮ বলা হয়েছে। আর নারীদের সন্তান জন্ম দেওয়ার সময়সীমা এ সময়েই থাকে। এ ছাড়া সাধারণত নারীরা ৫০ বছর বয়সের আগেই সন্তানধারণের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।
জুবায়ের ইবনে বাক্কার বলেন, 'মুসা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হাসানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে আবু উবায়দা ইবনে আবদুল্লাহ ৬০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরে মুসাকে গর্ভে ধারণ করেন। অর্থাৎ মুসা হিন্দের ছেলে, স্বামী নয়। স্বামী আবদুল্লাহ ইবনে হাসান সন্তানের জন্ম দেন। আমি আমাদের বিজ্ঞজনদের বলতে শুনেছি, শুধু কুরাইশের মহিলারা ৬০ বছরের পরও সন্তান জন্মদানে সক্ষম হন এবং আরব জাতির নারী ছাড়া অন্য কোনো নারী ৫০ এর পরে সাধারণত সন্তান জন্মদানে সক্ষম থাকে না।'

এক ব্যক্তির জন্য নবীজির তিন দিন অপেক্ষা
সিরাতের গ্রন্থে প্রসিদ্ধ আছে, আবু দাউদ আবদুল্লাহ ইবনে আবু হামসার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'নবুওয়াতের আগে একদিন আমি নবীজির সঙ্গে একটি লেনদেন করি। এর কিছু অংশ আমার বাকি রয়ে যাওয়ায় নবীজিকে অপেক্ষায় রেখে তা নিয়ে আসার জন্য চলে আসি। কিন্তু এরই মধ্যে আমি তা ভুলে যাই। অথচ নবীজিকে আমি ওই স্থানে রেখে কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসার ওয়াদা করেছিলাম।
'তিন দিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর আমার তা মনে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ওখানে গিয়ে দেখি, নবীজি আমার অপেক্ষায় সেখানেই অবস্থান করছেন। আমাকে দেখে তিনি বললেন, “হে যুবক, তুমি আমাকে অনেক কষ্ট দিলে! তিন দিন যাবৎ আমি এখানে তোমার অপেক্ষা করছি।”'
এই বর্ণনায় আবু দাউদের শাইখ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া জুহালি বলেন, 'আবদুল কারিম ইবনে আবদুল্লাহর সূত্রে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।' আবু দাউদ বলেন, 'আলি ইবনে আবদুল্লাহর সূত্রেও আমি এ ঘটনা জানতে পেরেছি।'
তবে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর তাকরিব গ্রন্থে লেখেন, 'ওই ঘটনার বর্ণনাকারী আবদুল কারিম ইবনে আবদুল্লাহ অজ্ঞাত।'
তাহজিব গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে আবু হামসার জীবনী উল্লেখ করতে গিয়ে ইবনে হাজার বলেন, 'তাঁর থেকে শুধু একটি হাদিস পাওয়া যায়, যার সনদের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। আবু দাউদ এটি বর্ণনা করেছেন।'
ইমাম জাহবিও এ ঘটনা তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে সিরাতের অধ্যায়ে আবু দাউদের বরাতে উল্লেখ করেন।
হাফেজ ইরাকি বলেন, 'আবু দাউদ এটি বর্ণনা করেছেন, যার সনদের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে।'

📘 সিরাতের প্রচলিত ভুল > 📄 ওহী নাযিল

📄 ওহী নাযিল


পাহাড়ের উচ্চতা থেকে নবীজির নিচে পড়ে যাওয়ার উপক্রম
ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থের শেষের দিকে ‘স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান’ অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদে নবীজির ওপর ওহি অবতীর্ণ হওয়ার পদ্ধতি ও সময়কাল সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। আয়েশার সূত্রে তিনি নিজ সনদে নবীজির ওপর ওহি অবতীর্ণ হওয়ার পদ্ধতি ও সময়কাল বর্ণনা করেন। অতঃপর হাদিসের শেষে তিনি বলেন, সর্বপ্রথম কয়েক ধাপে ওহি অবতীর্ণ হওয়ার পর কিছুকাল বিরতি থাকত। তখন নবীজির ওপর ওহি আসত না। ওহির বিরতিকালে নবীজি প্রচণ্ড দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়তেন। মাত্রাতিরিক্ত চিন্তার ফলে মনে হতো, তিনি যেন পাহাড়ের উচ্চতা থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছেন।
তখন নবীজি হেরা পর্বতের দিকে চলে যেতেন। পর্বতের চূড়ায় পৌঁছার পর জিবরাইল আলাইহিস সালাম দৃশ্যমান হয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। এতে নবীজি স্থির ও শান্ত হতেন এবং ঘরে ফিরে আসতেন। কিছুদিন পর যখন আবার ওহির বিরতি হতো, তখন তিনি আগের মতো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়তেন। তখন আবারও হেরা পর্বতে চলে যেতেন। জিবরাইলের সঙ্গে সাক্ষাতের পর পুনরায় তিনি শান্ত হয়ে যেতেন। এভাবে কিছুদিন কেটে যায়।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ফাতহুল বারি গ্রন্থে বলেন, 'ওই হাদিসের মূল ঘটনা উকাইল ও ইউনুসের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। আর ওহির বিরতিকালে নবীজির উপরিউক্ত অবস্থার কথা মা'মারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু গ্রন্থকার তা বুঝতে পারেননি। তিনি পুরো বর্ণনাকেই উকাইল ও ইউনুসের সূত্রে উল্লেখিত বলে ধারণা করেছেন।'
আবু নু'আইম তাঁর মুসতাখরাজে ওই হাদিসের মূল অংশটুকু বর্ণনা করেছেন। তবে মা'মারের সূত্রে অতিরিক্ত অংশ উল্লেখ করার পর তিনি এই অংশটুকু মা'মারের সূত্রে উল্লেখিত বলে স্পষ্ট করেছেন।
ইমাম আহমদ ও ইমাম মুসলিম লাইছের সঙ্গীদের সূত্রে মা'মার কর্তৃক অতিরিক্ত অংশ ছাড়া উপরিউক্ত মূল হাদিস বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম বুখারির সনদে 'আমি জানতে পেরেছি' বাক্যের বক্তা হচ্ছেন ইমাম জুহরি।
ইবনে মারদুইয়া তাঁর তাফসির গ্রন্থে মুহাম্মদ ইবনে কাসিরের সূত্রে মা'মার থেকে এ ঘটনা বর্ণনা করেন। তবে তাঁর সনদে 'আমি জানতে পেরেছি' বাক্যের উল্লেখ নেই। অতএব, পুরো হাদিসের যোগসূত্র জুহরির বর্ণনা এবং উরওয়ার সূত্রে আয়েশা থেকে সাব্যস্ত হলো।'
শাইখ আলবানি ওহির বিরতিকালে নবীজির দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিকে দুটি কারণে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, 'প্রথমত এ অতিরিক্ত অংশটুকু শুধু মা'মার বলেছেন, অন্য কেউ এটি বলেননি। দ্বিতীয়ত জুহরি থেকে 'আমি জানতে পেরেছি' বাক্যে এটি বর্ণিত হয়েছে। আর জুহরির এ জাতীয় বাক্যে বর্ণিত হাদিস মুরসাল পর্যায়ের আওতাভুক্ত।'

প্রচলিত ভুল তথ্য
ইসমাইল ইবনে আবু হাকিমের সূত্রে ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, খাদিজা বলেন, একদিন আমি নবীজিকে বললাম, 'আপনার সঙ্গী আবার যখন আসবেন, তখন তাঁকে আমি দেখতে চাই। আমি কি দেখতে পারব?' নবীজি বললেন, 'হ্যাঁ, দেখতে পারবে।' খাদিজা বললেন, 'আবার যখন তিনি আসবেন, আমাকে সংবাদ দেবেন।'
যথারীতি নির্দিষ্ট সময়ে জিবরাইল আলাইহিস সালাম নবীজির কাছে আগমন করলেন। তখন নবীজি খাদিজাকে ডেকে জিবরাইলের আগমনের সংবাদ দিলেন। খাদিজা এসে নবীজিকে বললেন, 'আপনি আমার বাম উরুর ওপর বসুন।' নবীজি উঠে এসে খাদিজার বাম উরুতে বসলেন। এরপর খাদিজা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'এখন কি আপনার সঙ্গী জিবরাইলকে দেখতে পাচ্ছেন?' উত্তরে তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি।' অতঃপর খাদিজা নবীজিকে বললেন, 'এবার আপনি আমার ডান উরুর ওপর বসুন।' নবীজি উঠে এসে খাদিজার ডান উরুতে বসলেন। এরপর খাদিজা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'এখন কি আপনার সঙ্গী জিবরাইলকে দেখতে পাচ্ছেন?' উত্তরে তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি।'
খাদিজা এরপর নবীজিকে তাঁর কোলে বসতে অনুরোধ করলেন। নবীজি তাঁর কোলে বসার পর খাদিজা তাঁকে আবারও জিজ্ঞেস করলেন, 'এখন কি আপনার সঙ্গী জিবরাইলকে দেখতে পাচ্ছেন?' উত্তরে তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি।'
তখন খাদিজা খুব আফসোস করতে করতে মাথা ও বুক থেকে ওড়না সরিয়ে নিলেন। এরপর আবারও তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'এখন কি আপনার সঙ্গী জিবরাইলকে দেখতে পাচ্ছেন?' উত্তরে নবীজি বললেন, 'না, এখন তো দেখতে পাচ্ছি না।' এবার খাদিজা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! আপনি শান্ত হোন, সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহর কসম! নিশ্চয় ইনি ফেরেশতা; শয়তান নয়।'
ইবনে ইসহাকের আরেক সূত্রে ফাতেমা বিনতে হুসাইনের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, খাদিজা বলেন, 'নবীজি আমার ও আমার ওড়নার ভেতরে প্রবেশ করলে জিবরাইল চলে যান। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! ইনি নিশ্চয় ফেরেশতা; শয়তান নয়।'
উল্লেখ্য, ইবনে ইসহাকের এ বর্ণনা কিছুটা ত্রুটিযুক্ত। কারণ ইসমাইল ইবনে আবু হাকিমের সূত্রে এ বর্ণনা ছাড়া সাহাবিদের থেকে অন্য কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। তা ছাড়া খাদিজা হিজরতের আগেই ইন্তেকাল করেন।
এ ছাড়া এ বর্ণনার অপর সূত্রটি মুরসাল (সরাসরি সাহাবির সূত্র বিচ্ছিন্ন)। কারণ এ সূত্রে নবীজির দৌহিত্র হুসাইনের কন্যা ফাতেমা রয়েছেন, যিনি তাঁর দাদি নবীকন্যা ফাতিমাকেই দেখেননি। সে ক্ষেত্রে কীভাবে তিনি খাদিজার সাক্ষাৎ পেতে পারেন!
ইমাম বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে ইবনে ইসহাকের সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
শাইখ আলবানির জয়িফ হাদিসের তালিকার ১৩তম খণ্ড প্রকাশিত হয়। সেখানে উল্লেখিত হয়েছে, আল্লামা হাইসামির বক্তব্যের পর শাইখ আলবানি বলেন, 'এর সনদ হাসান।' এরপর এ বর্ণনার দুর্বলতা প্রসঙ্গে বলেন, 'এর দুটি কারণ। প্রথমত, এর সূত্রে ইয়াহইয়া ইবনে সুলাইমান মাদিনি রয়েছেন, যিনি দুর্বল বলে পরিচিত। দ্বিতীয়ত, ইয়াহইয়ার চেয়ে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীরা এর বিরোধিতা করেছেন।'
ইমাম মুসলিম তাঁর সহিহ মুসলিম গ্রন্থে এ প্রসঙ্গেই উম্মুল মুমিনিন আয়েশার সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আয়েশা বলেন, নবীজি তাঁকে বলেছিলেন, 'তোমার গায়ে কাপড় না থাকলে জিবরাইল আমার ঘরে প্রবেশ করতে পারেন না।'
ইমাম বুখারি বর্ণনা করেন, নবীজি উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালামাকে বলেছিলেন, 'তোমরা আমাকে আয়েশার ব্যাপারে কষ্ট দিয়ো না। কারণ আল্লাহর কসম! সে ছাড়া তোমাদের অন্যদের সঙ্গে আমি একই কম্বলের নিচে শুয়ে থাকাবস্থায় আমার ওপর ওহি অবতীর্ণ হয় না'।

📘 সিরাতের প্রচলিত ভুল > 📄 গোপনে ইসলাম প্রচার

📄 গোপনে ইসলাম প্রচার


ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, নবুওয়াত লাভের পর নবীজি গোপনে মক্কায় আপনজনদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন। এভাবে প্রায় তিন বছর চলতে থাকে। তখনো প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের বিধান আসেনি। অতঃপর তিন বছর অতিক্রান্ত হলে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন।
ইবনে ইসহাক সনদ ছাড়াই এটি বর্ণনা করেছেন। ইবনে সা'আদও মুহাম্মদ ইবনে ওমরের সূত্রে আবদুর রহমান ইবনে কাসেমের পিতার বরাতে তিন বছরের কথা উল্লেখ করেছেন।
তবে ইবনে সা'আদের সূত্রে যে মুহাম্মদ ইবনে ওমরের উল্লেখ এসেছে, তিনি মূলত ওয়াকিদি। ঐতিহাসিকেরা যাঁকে প্রত্যাখ্যাত বলেছেন। আর আবদুর রহমান ইবনে কাসেম হচ্ছেন তাবেয়ি।
ঐতিহাসিক বালাজুরি আয়েশার সূত্রে বর্ণনা করেন, নবীজি নবুওয়াতের প্রথম চার বছর গোপনে ইসলামের দাওয়াত দেন। এরপর প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেওয়া হয়।
মূলত ইসলামের প্রথম দিকে কিছুদিন গোপনে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করা হয়েছিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তা তিন বছর অব্যাহত ছিল নাকি চার বছর, এ নিয়ে মতভেদ পাওয়া যায়। অন্যথায় শরিয়তের বিধানের সঙ্গে এই সময়সীমার কোনো সম্পর্ক নেই।

📘 সিরাতের প্রচলিত ভুল > 📄 প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার

📄 প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার


নবুওয়াতের বিরুদ্ধে মক্কার কুরাইশদের প্রস্তাব
ইয়াকুব ইবনে উতবার সূত্রে ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নবীজি যখন ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন, তখন একপর্যায়ে কুরাইশ নেতারা এতে বিরক্ত হয়ে নবীজির চাচা আবু তালিবের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে।
আবু তালিব ঘরে এসে নবীজিকে ডেকে বললেন, 'ভাতিজা, দেখো, তোমার গোত্রের লোকেরা তোমার বিরুদ্ধে নানা কথা রটাচ্ছে। তুমি এমন কোনো কিছু করো না, যাতে তা সামাল দিতে আমি অপারগ হয়ে যাই অথবা তোমারও যেন কষ্ট না হয়।' নবীজি ভাবতে লাগলেন, হয়তো-বা চাচা তাঁর ব্যাপারে অতিমাত্রায় দুশ্চিন্তা করছেন। নবীজি কোনো উত্তর দিলেন না।
কিন্তু মক্কার কুরাইশরা থেমে থাকেনি। তাঁকে প্রতিহত করার জন্য তারা কতই না সলাপরামর্শ করেছে, ষড়যন্ত্র করেছে, এর কোনো ইয়ত্তা নেই। একপর্যায়ে তারা নবীজির কাছে তিনটি প্রস্তাব নিয়ে এল। পৃথিবীর লাভ- লোকসানের হিসাবের বিবেচনায় এগুলো ছিল খুবই লাভজনক ও মোহনীয় প্রস্তাব।
প্রথম প্রস্তাব: আপনি যদি নেতৃত্ব চান, তাহলে আপনাকে আরবের নেতা বানিয়ে দেওয়া হবে। সমগ্র আরব আপনার কথায় ওঠাবসা করবে।
দ্বিতীয় প্রস্তাব: আপনি যদি আরবের সর্বাধিক সুন্দরী নারীকে বিয়ে করতে চান, তাহলে আপনাকে বিয়ে করিয়ে দেওয়া হবে।
তৃতীয় প্রস্তাব: আপনি যদি আরবের শ্রেষ্ঠ ধনী হতে চান, তাহলে আপনাকে বিপুল ধন-সম্পত্তির অধিকারী করা হবে।
তবে এর বিনিময়ে আমাদের একটি কথা মেনে নিতে হবে। আপনি যে নতুন দাওয়াতের পয়গাম দিচ্ছেন, তা বন্ধ করে দিতে হবে।
এর উত্তরে নবীজি কী করলেন? একটা অসম্ভব বিষয়ের উদাহরণ দিয়ে তাদের সব প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, 'তোমরা যদি আমার এক হাতে সূর্য এবং অপর হাতে চাঁদ এনে দাও, এর পরও আল্লাহ তায়ালা আমাকে যে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন, তা আমি কখনোই ছেড়ে দিতে পারি না। হয়তো-বা এ দাওয়াতি কার্যক্রম সফল হবে, নয়তো আমি শেষ হয়ে যাব।'
এরপর নবীজি কেঁদে দিলেন। নিজের চাচার কষ্ট ও তাঁর নিজের অসহায়ত্ব তাঁকে ঘিরে ধরল। অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন। নবীজি যখন ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন আবু তালিব তাঁকে ডাক দিয়ে বললেন, 'ভাতিজা, তুমি তোমার কাজ চালিয়ে যাও। আল্লাহর কসম! তোমাকে আমি কখনোই একা ছেড়ে দেব না।'
শাইখ আলবানি বলেন, 'এ ঘটনার সনদে দুর্বলতা ও বিচ্ছিন্নতা বিদ্যমান। তবে ইয়াহইয়া ইবনে উতবা নির্ভরযোগ্য তাবে-তাবেয়িদের অন্যতম। ১২৮ হিজরিতে তাঁর ইন্তেকাল হয়। অবশ্য হাসান পর্যায়ের সনদে অন্য আরেক সূত্রে আমি এ হাদিস অন্য জায়গায় পেয়েছি। তবে সেখানে শব্দের কিছু ভিন্নতা রয়েছে।' সেখানে বলা হয়েছে, নবীজি কুরাইশদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, 'তোমরা আমার হাতে আগুনের ফুলকি অর্থাৎ সূর্য এনে দিলেও আমি এ দ্বীন ছাড়তে পারব না।'
আবু জাফর বাখতারি এবং ইবনে আসাকির ওই ঘটনা আবু ইয়ালার সূত্রে ইউনুস ইবনে বুকাইরের সনদে আবু তালিবের পুত্র উকাইল থেকে বর্ণনা করেছেন। উকাইল বলেন, 'কুরাইশদের অভিযোগের পর নবীজি আসমানের দিকে দৃষ্টি দিয়ে উপরিউক্ত কথা বললেন। তখন উত্তরে আবু তালিব অভিযোগকারীদের শুনিয়ে বললেন, আমার ভাতিজা মিথ্যা বলেনি। তোমরা ফিরে যাও।'
শাইখ আলবানি এ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, 'এর সনদ হাসান। এর বর্ণনাকারীরা সবাই সহিহ মুসলিম গ্রন্থের বর্ণনাকারী। তবে ইউনুস ইবনে বুকাইর ও তালহা ইবনে ইয়াহইয়া সম্পর্কে কিছু সমালোচনা শুনতে পাওয়া যায়। কিন্তু তাতে সমস্যা নেই।'
ইমাম জাহবি উকাইলের বর্ণনার ব্যাপারে বলেন, 'ইমাম বুখারি এমনই আবু কুরাইব থেকে ইউনুসের সূত্রে তারিখ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।' হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানির সনদকে উত্তম সনদ বলে ব্যক্ত করেছেন।

ওয়ালিদ ইবনে মুগিরার পুত্রের ব্যাপারে আবু তালিবের প্রতি কুরাইশদের অভিনব প্রস্তাব
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, কুরাইশ নেতারা যখন দেখল, আবু তালিব তাদের কোনো প্রস্তাবেই সায় দিচ্ছেন না; বরং উল্টো তিনি স্বীয় ভাতিজা মুহাম্মদকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন, এর সঙ্গে নবীজির কোনো বিপদ-আপদ কিংবা সমস্যা সৃষ্টি হলে আবু তালিব নিজে তা প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন, তখন কুরাইশদের যেন ঘুম হারাম হয়ে গেল।
তারা এ বিষয়ে রাতদিন সলাপরামর্শ করতে থাকে। কী করে মুহাম্মদ ও তাঁর চাচা আবু তালিবের ব্যাপারে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। এদিকে সমগ্র মক্কায় আবু তালিব ছিলেন গণ্যমান্য ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাই কুরাইশরা তাঁকে খেপাতেও চাচ্ছিল না, আবার নবীজিকেও বাগে আনতে পথ খুঁজছিল।
একদিন আবু তালিব তাঁর বাড়িতে একাকী অবস্থান করছিলেন। কুরাইশদের কয়েকজন তাঁর কাছে এসে অভিনব এক প্রস্তাব করে বসে। তারা সঙ্গে করে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরার পুত্র উমারাকে নিয়ে যায় এবং বলে, 'হে আবু তালিব, তোমার তো সেবা ও দেখাশোনার জন্য একজনকে খুব দরকার। এক কাজ করো, আমরা তোমার জন্য ওয়ালিদের পুত্র উমারাকে নিয়ে এসেছি। ছেলেটি দেখতেও সুদর্শন আবার বুদ্ধিও আছে। তুমি একে তোমার সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে নাও এবং তোমার ভাতিজা মুহাম্মদকে আমাদের হাতে তুলে দাও।
'মুহাম্মদ আমাদের বাপ-দাদাদের অপমান করছে। তোমার ও আমাদের ধর্মে বিবাদ সৃষ্টি করছে। ঘরে ঘরে পিতার থেকে পুত্রকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। সমাজের কিছু নির্বোধ ও বোকাদের নিজের দলে টেনে পুরো সমাজের বিরুদ্ধে সে অবস্থান নিয়েছে। আমরা তাকে শেষ করে দেব। এটাই ভেবে দেখেছি, এখনই একটা মিটমাট করে নেওয়া দরকার। তাহলে ভবিষ্যতে তেমন বেগ পেতে হবে না; অন্যথায় এ সমস্যা আরও বেড়ে যাবে। এতে আমাদের পরস্পরে ভুল-বোঝাবুঝিও দূর হবে এবং আগের মতো আমরা মিলেমিশে থাকতে পারব।'
উত্তরে আবু তালিব তাদের উদ্দেশে বললেন, 'আল্লাহর কসম! তোমরা আমার প্রতি ন্যায়বিচার করোনি। বাহ! তোমরা তোমাদের পুত্রকে আমার তত্ত্বাবধানে দেবে এবং আমি তার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করব, আর আমি তোমাদের হাতে আমার পুত্রতুল্য ভাতিজাকে তুলে দেব; এরপর তোমরা তাকে হত্যা করবে।
'আল্লাহর কসম! এমনটা আমি কখনোই হতে দেব না। তোমরা কি জানো না, উটনী নিজের বাচ্চাকে হারিয়ে ফেললে শুধু ওর বাচ্চাকেই খোঁজে!'
তখন মুতইম ইবনে আদি ইবনে নওফেল ইবনে আবদে মানাফ আবু তালিবকে লক্ষ করে বলল, 'আমরা তোমার জাতির ব্যাপারে তোমার সঙ্গে ন্যায়বিচার করতেই এসেছি। আমাদের মনে হচ্ছে, তুমি আমাদের প্রস্তাব মেনে নেবে না।'
উত্তরে আবু তালিব বললেন, 'আল্লাহর কসম! তারা আমার সঙ্গে ন্যায়বিচার করেনি। আর তুমি আমাকে অপমান করতে এবং পুরো জাতিকে আমার বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চাইছ। তোমার যা খুশি করতে পারো। আমি এর মধ্যে নেই।'
উল্লেখ্য, ইবনে ইসহাক সরাসরি কোনো সাহাবির সূত্র ছাড়াই এটা বর্ণনা করেছেন। তবে ইমাম জাহবি তারিখুল ইসলাম গ্রন্থের সিরাত অধ্যায়ে ইবনে ইসহাকের সূত্রে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ইবনে সা'আদও তাবাকাত গ্রন্থে ওয়াকিদির সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করেন।
ইবনে কাসির ওই ঘটনার বিশ্লেষণে একটি রহস্য উদ্‌ঘাটন করে বলেন, 'নবীজিকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেও চাচা আবু তালিবের ইসলাম গ্রহণ না করার পেছনে আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহস্য লুক্কায়িত আছে। কারণ আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ করলে কুরাইশ জাতি তাঁকে মোটেই ভয় পেত না; বরং তখন সবার আগে তাঁকেই শেষ করে দিত। এর ফলে প্রিয় নবীজি আশ্রয়হীন হয়ে পড়তেন এবং কুরাইশদের বর্বরতার শিকার হতেন। আবু তালিব বিধর্মী থাকার ফলে তাঁর জীবদ্দশায় কুরাইশ নেতারা প্রিয় নবীজির বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার দুঃসাহস করেনি।'
অন্য জায়গায় ইবনে কাসির বলেন, 'সর্বোপরি এটা ছিল আল্লাহ তায়ালার সিদ্ধান্ত। এর ভালো-মন্দ তিনিই জানেন। কাফেরদের জন্য ইস্তেগফার কিংবা দোয়া করার ওপর নিষেধাজ্ঞা না থাকলে আমরা অবশ্যই তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতাম।'

এই জুআল (বড় গোবরে পোকা) কি তোমার ইলাহ?
ইবনে ইসহাক হাকিম ইবনে জুবায়েরের সূত্রে বর্ণনা করেন, বিখ্যাত তাবেয়ি সাঈদ ইবনে জুবায়ের বলেন, 'আমি সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞেস করলাম, কুরাইশের কাফেররা কি কখনো নবীজির সাহাবিদের ওপর এমন অত্যাচার করেছে, যার ফলে তাঁরা অতিষ্ঠ হয়ে মুখের ওপর ইমানকে অস্বীকার করে বসেছেন?'
উত্তরে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বললেন, 'হ্যাঁ; অবশ্যই এমনটা বহুবার ঘটেছে। আল্লাহর কসম! কাফেররা নবীজির সাহাবিদের ধরে এনে পেটাত। সারা শরীরে নিজেদের সর্বশক্তি দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করত। তাঁদেরকে খেতে দিত না, পানিও পান করতে বাধা দিত। ক্রমাগত আঘাতে জর্জরিত হয়ে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থাকার ফলে সাহাবিদের এমন অবস্থা হতো যে মেরুদণ্ড সোজা করে বসার শক্তি হারিয়ে ফেলতেন। পথের পাশে কাত হয়ে পড়ে থাকতেন। আঘাত করতে করতে বলত, এই হতচ্ছাড়া কোথাকার! বল, এই লাত ও উজ্জা কি তোর ইলাহ নয়?
'অপারগ হয়ে বাধ্য হয়ে তাঁরা মুখের ওপর "হ্যাঁ হ্যাঁ” বলে উত্তর দিতেন। এমনকি তাঁদের সামনে দিয়ে বিশালদেহী গোবরে পোকা (জুআল) অতিক্রম করার সময় সেটা দেখিয়ে কাফেররা তাঁদের জিজ্ঞেস করত, এই জুআল কি তোদের রব নয়? তাঁরা বলতেন, হ্যাঁ, তোমরা যা বলো তা-ই।'
উল্লেখ্য, ওই বর্ণনার সূত্রে হাকিম ইবনে জুবায়ের রয়েছেন, যাঁর ব্যাপারে হাদিসবিশারদেরা আপত্তি করেছেন। ইমাম আহমাদ, ইয়াকুব ইবনে শায়বাহ, আবু হাতেম ও আরও অনেকেই তাঁকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ইমাম দারা কুতনি বলেন, 'হাকিম ইবনে জুবায়ের পরিত্যক্ত বর্ণনাকারীদের একজন।'
আবু জুর'আহ বলেন, 'দুর্বল হলেও তাঁকে মিথ্যাবাদী বলা যাবে না।'
অবশ্য ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদ এবং ফাজায়েলে সাহাবাহ গ্রন্থে এ জাতীয় ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। এসব বর্ণনা সামনে রাখলে সাহাবিদের নির্যাতন সইয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অন্য কোনো বর্ণনার দ্বারস্থ হওয়ার কোনো প্রয়োজনই নেই। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সূত্রে তিনি বলেন, সর্বপ্রথম মোট সাতজন প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেন। তাঁরা হলেন নবীজি, আবু বকর, আম্মার ইবনে ইয়াসির, তাঁর আম্মা সুমাইয়া, সুহাইব, বিলাল ও মিকদাদ।
তাঁদের মধ্যে নবীজিকে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাঁর চাচা আবু তালিবের মাধ্যমে নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং আবু বকরকে তাঁর গোত্রের লোকেরা নিরাপদে সরিয়ে নেয়। বাকি পাঁচজনের ওপর কুরাইশরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। জঘন্য কায়দায় বিভিন্নভাবে তাঁদের ওপর নির্যাতন চালায়। লোহার শিকলে বেঁধে বা লোহার পোশাক পরিয়ে তাঁদেরকে দুপুরবেলার সূর্যের প্রখর তাপে মরুর বালির মধ্যে শুইয়ে রাখত। দিনের পর দিন এভাবে তাঁরা অত্যাচার সয়ে যেতেন। একপর্যায়ে প্রত্যেকের পরিচিতজনেরা এসে কাফেরদের দাবি মুতাবেক মুক্তিপণ আদায় করে তাঁদের ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।
কিন্তু বিলালের মক্কায় কেউ ছিল না। কারণ তিনি ছিলেন আবিসিনিয়ার অধিবাসী। তাঁর ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়তে থাকে। মরুভূমিতে তাঁকে শুইয়ে দিয়ে কাফের নেতারা তাঁর বুকের ওপর ভারী পাথর চাপিয়ে দিত আর তাওহিদ অস্বীকারের জন্য চাপ প্রয়োগ করত।
কিন্তু তিনি নিজেকে এমন অসহনীয় কঠিন পরিস্থিতিতে একেবারে আল্লাহ তায়ালার হাতে সঁপে দিলেন। অত্যাচারীরা যখনই তাঁকে তাওহিদ ছাড়তে বলত, তিনি 'আহাদ আহাদ' বলে তা প্রত্যাখ্যান করতেন। একপর্যায়ে বিলালের পেছনে বখাটে দুই ছেলেকে লেলিয়ে দেওয়া হয়। তারা তাঁকে গলায় শিকল বেঁধে মক্কার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। এদিকে তিনি শুধু 'আহাদ আহাদ' বলে ইমানের সাক্ষ্য দিতে থাকতেন।
ইমাম ইবনে মাজাহ এবং হাকিম এ ঘটনা বর্ণনা করার পর একে সহিহ বলেছেন। ইমাম জাহবি এবং আহমাদ শাকেরও এই বর্ণনাকে সহিহ বলে সাব্যস্ত করেছেন।
ইমাম বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন।

নবীজির ওপর প্রতিবেশীর নিপীড়ন
সমাজে প্রচলিত আরেকটি ঘটনা ইবনে সা'আদ বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মদ ইবনে ওমরের সূত্রে তিনি বলেন, উম্মুল মুমিনিন আয়েশা বলেন, নবীজি বলেছেন, 'আমি দুই মন্দ প্রতিবেশীর সঙ্গে বসবাস করছি। এদের একজন আবু লাহাব এবং অপরজন উকবা ইবনে আবু মুঈত। তারা উটের বিষ্ঠা ও অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা ইচ্ছে করেই আমার বাড়ির দরজায় ফেলে যেত। আমি চুপচাপ সয়ে যেতাম। একপর্যায়ে আমি নিজে সেগুলো পরিষ্কার করে তুলে বাইরে নিয়ে জোরে ডাক দিয়ে বলতাম, হে আবদে মানাফের সন্তানেরা! এরা কেমন প্রতিবেশী? অতঃপর সেগুলো ভাগাড়ে ফেলে দিয়ে আসতাম।'
ইবনে সা'আদের শাইখ ওয়াকিদিকে ঐতিহাসিকেরা প্রত্যাখ্যাত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাই ওই বর্ণনা অনেকের মতে দুর্বল। অবশ্য নবীজির ওপর কুরাইশদের অত্যাচার ও নিপীড়নের আরও অনেক ঘটনা রয়েছে। যেগুলো বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র, সিরাত ও হাদিসগ্রন্থে সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এমন প্রমাণিত ঘটনা রেখে উপরিউক্ত নিতান্ত দুর্বল মতামতগুলো গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই।

উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ
সিরাতের গ্রন্থে এটি খুব প্রসিদ্ধ যে, উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ আবিসিনিয়ায় হিজরত করে চলে যাওয়ার পর সেখানে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান হয়ে যান। তিনি স্বীয় স্ত্রী উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ানসহ আবিসিনিয়ায় গমন করেন। প্রকৃতপক্ষে এটি সত্য কি না, এ নিয়ে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়।
ইবনে ইসহাক বলেন, 'জাহেলিয়াতের যুগে মক্কার কয়েকজন একাকী চলত। তারা কুরাইশদের মতো প্রতিমার পূজা করত না। নীরবে তারা একত্ববাদের অনুসন্ধানী ছিল। তারা হলো ওয়ারাকা ইবনে নওফেল, উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ, উসমান ইবনে হুওয়ারিস এবং জায়িদ ইবনে আমর।
'তারা একে অপরকে বলেছিল, আমাদের জাতি ইবরাহিম আলাইহিস সালামের আদর্শ থেকে সরে গেছে। একত্ববাদ ছেড়ে তারা শির্ক ও প্রতিমার পূজায় লিপ্ত। পাথরকে তারা দেবতা বানিয়েছে। এদের না আছে কোনো কিছু করার ক্ষমতা! না এরা দেখতে পারে আর না কারও ডাক শুনতে পারে! না কারও উপকার করতে পারে আর না অপকার! কিছুই করতে পারে না। একটা কাজ করা যাক, তোমরা নিজেদের বাঁচার পথ আগে বের করো। এরপর তারা একনিষ্ঠ ধর্ম ও বিশ্বাসের অনুসন্ধানে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
‘অতঃপর ওয়ারাকা ইবনে নওফেল খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে এবং উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে মক্কায় অবস্থান করতে থাকে। ইসলামের আবির্ভাবের পর সে ইমান আনে। কিছুদিন পর প্রথম হিজরতের কাফেলায় যোগদান করে সে তার স্ত্রী উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ানকে নিয়ে আবিসিনিয়ায় চলে যায়। সেখানে সে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান হয়ে যায়। অতঃপর আবিসিনিয়াতেই খ্রিষ্টান অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করে।’
ইবনে ইসহাক মুহাম্মদ ইবনে জাফর ইবনে জুবায়েরের সূত্রে বর্ণনা করেন, আবিসিনিয়ায় খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করার পর উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ নবীজির অন্য সাহাবিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁদের উদ্দেশে বলতেন, ‘এখানে এসে আমি দৃষ্টি লাভ করেছি আর তোমরা এখনো দৃষ্টিশক্তি খুঁজে বেড়াচ্ছ! তোমরা তো এর পরে দৃষ্টি আর খুঁজেই পাবে না।’
ওই বর্ণনায় ইবনে ইসহাকের শাইখ মুহাম্মদ ইবনে জাফর ইবনে জুবায়ের রয়েছেন। যিনি ষষ্ঠ পর্যায়ের নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের অন্যতম ছিলেন। তবে এই পর্যায়ের কেউই সরাসরি নবীজির কোনো সাহাবির সাক্ষাৎ পাননি। তাই এ বর্ণনা মুরসালের পর্যায়ভুক্ত বলে বিবেচিত।
অবশ্য ইবনে ইসহাক আবিসিনিয়া থেকে নবীজির চাচাতো ভাই জাফর ইবনে আবু তালিবের ফিরে আসার বিবরণে এ ঘটনাই মুহাম্মদ ইবনে জাফরের সূত্রে উরওয়াহ থেকে বর্ণনা করেন। অতঃপর উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ানের সঙ্গে নবীজির বিয়ের বর্ণনায় উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের খ্রিষ্টান হয়ে যাওয়ার কথা পুনরায় তিনি উল্লেখ করেন।
ইবনে সা'আদ তাবাকাত গ্রন্থে এ প্রসঙ্গেই ইসমাইল ইবনে আমরের সূত্রে উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘এক রাতে আমি স্বপ্নে দেখি, আমার স্বামী উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের চেহারা কুৎসিত ও বিকৃত হয়ে গেছে। তাকে দেখে আমি চিনতেই পারছি না। তার অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছিল। সকালে ঘুম ভাঙার পর ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে যাই। খুবই দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। মনে মনে ভাবছি, আল্লাহর কসম! তিনি তার অবস্থা পরিবর্তন করে দিয়েছেন।
‘স্বামীকে স্বপ্নের কথা বলতে যাব, এর মধ্যেই তিনি আমাকে বলতে লাগলেন, "জানো! আমি দীর্ঘদিন প্রকৃত ধর্মের খোঁজ করেছি। কিন্তু খ্রিষ্টধর্মের চেয়ে উত্তম কোনো ধর্ম পাইনি। তাই আমি খ্রিষ্টান হয়ে যাই। অতঃপর মুহাম্মদের দ্বীন গ্রহণ করি। এর কিছুদিন পর পুনরায় খ্রিষ্টধর্মে ফিরে আসি।"
'উত্তরে আমি বললাম, “আল্লাহর কসম! তুমি যা করেছ এর মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।” কিন্তু সে আমার কথার দিকে কানই দিল না। গোগ্রাসে মদ গিলতে লাগল। এরপর কিছুক্ষণের মধ্যেই নেশায় বুঁদ হয়ে মৃত্যুবরণ করে।'
অতঃপর ইবনে সা'আদ ওয়াকিদির সূত্রে নবীজির স্ত্রীগণের আলোচনায় উম্মে হাবিবার জীবনীতে এ ঘটনা দ্বিতীয়বার উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া ইমাম হাকিম তাঁর মুসতাদরাক গ্রন্থে জুহরির সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করেন। কিন্তু তাঁর এ বর্ণনার ধারাবাহিকতায় নবীজির সাহাবির উল্লেখ ছিল না। অতঃপর তিনি ইবনে সা'আদের মতো ওয়াকিদির সূত্রে উম্মে হাবিবার স্বপ্নের বিবরণ উল্লেখ করেন। ঐতিহাসিকদের কাছে জুহরি নবীজির সাহাবিদের উল্লেখ ছাড়া যা কিছু বর্ণনা করেছেন, সেসব বর্ণনাকে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন।
ইমাম জাহবি বলেন, 'হাদিসশাস্ত্রের বিজ্ঞ পণ্ডিত ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল কাত্তান বলেছেন, সাহাবিগণের উল্লেখ ছাড়া জুহরি যা বর্ণনা করেছেন, তা অন্যদের এ জাতীয় বর্ণনার চেয়েও অনেক নিম্ন পর্যায়ের। কারণ তিনি হাদিসের হাফেজ ছিলেন। তাই ইচ্ছে করলেই সাহাবিদের নাম উল্লেখ করতে পারতেন। অথচ তিনি ইচ্ছাকৃত এমনটি করেছেন। যার নাম নিতে ইচ্ছে হতো, তিনি তার নাম উল্লেখ করতেন।'
ইমাম তাবারি তাঁর তারিখে তাবারি নামক ঐতিহাসিক গ্রন্থে এ ঘটনা হিশাম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সায়েব কালবির সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তবে এই হিশাম কালবি রাফেজি হওয়ায় তাঁকে মুহাদ্দিসগণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে ঐতিহাসিকদের নিকট উম্মে হাবিবার প্রথম স্বামীর খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের বিবরণের এ সূত্রটি জুহরির সূত্রের চেয়েও নিম্ন পর্যায়ের বিবেচিত হয়েছে।
ইমাম বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে ইবনে লাহিয়ার সূত্রে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁর বর্ণনায় কিছুটা অতিরিক্ত বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ আবিসিনিয়া থেকেই সাহাবি উসমান ইবনে আফফান নবীজির সঙ্গে উম্মে হাবিবার বিয়ে পড়িয়ে দেন। ইমাম বায়হাকির সূত্রে যে ইবনে লাহিয়ার কথা এসেছে, তার বর্ণনাকে ঐতিহাসিকেরা দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ইবনে কাসির বলেন, 'ইবনে লাহিয়ার সূত্রে সাহাবি উসমান কর্তৃক উম্মে হাবিবার সঙ্গে নবীজিকে বিয়ে করিয়ে দেওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তার সমার্থক অন্য কোনো বর্ণনা কিংবা সনদ পাওয়া যায় না। কারণ উসমান এর আগেই আবিসিনিয়া থেকে মক্কায় ফিরে আসেন। অতঃপর মদিনায় হিজরত করে নবীজির সান্নিধ্যে গমন করেন।'
ইবনে আবদুল বার তাঁর ইসতি'আব গ্রন্থে উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের জীবনী উল্লেখ করেননি। শুধু এতটুকু বলেছেন, 'আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ (উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের ভাই) এবং তার ভাই (উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ) ইসলামের প্রথম হিজরতকারীদের কাফেলায় ছিলেন। আবিসিনিয়ায় গমনের পর আবদুল্লাহর ভাই খ্রিষ্টান হয়ে যায় এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করে। অতঃপর উম্মে হাবিবা তার থেকে আলাদা হয়ে যান।'
ইবনে আছির তাঁর উসুদুল গাবাহ ফি মা'রিফাতিস সাহাবাহ গ্রন্থে উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের জীবনী উল্লেখ করেননি। ইবনে আবদুল বারের মতো শুধু উপরিউক্ত ঘটনা লিখে শেষ করে দেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি সাহাবিদের সংক্ষিপ্ত জীবনী শীর্ষক তাঁর বিখ্যাত ইসাবাহ গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের জীবনী উল্লেখ করলেও তাঁর ভাই উবাইদুল্লাহর ব্যাপারে কিছুই বলেননি। তবে উম্মে হাবিবার জীবনীতে লিখেছেন, 'উম্মে হাবিবার প্রথম স্বামী উবাইদুল্লাহ আবিসিনিয়ায় গমন করে খ্রিষ্টান হয়ে মারা যায়। ফলে উম্মে হাবিবা তাঁর থেকে আলাদা হয়ে যান।'
তবে তাহজিব গ্রন্থে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি উম্মে হাবিবার জীবনীতে তাঁর প্রথম স্বামী উবাইদুল্লাহর খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের ব্যাপারে কিছুই বলেননি। তিনি শুধু লিখেছেন, 'উম্মে হাবিবা তাঁর স্বামী উবাইদুল্লাহর সঙ্গে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। আবিসিনিয়ায় যাওয়ার পর উবাইদুল্লাহ মারা যাওয়ার পর নবীজি তাঁকে বিয়ে করেন। তিনি আবিসিনিয়ায় ছয় বছর অথবা কোনো বর্ণনামতে সাত বছর ছিলেন।'
ইমাম জাহবি তাঁর তারিখ গ্রন্থে সিরাতের অধ্যায়ে এ ঘটনা ইবনে সা'আদের সূত্র উল্লেখসহ বর্ণনা করেন। কিন্তু উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ সম্পর্কে বলেন, 'এটা অস্বীকৃত কথা।' তবে তিনি এ বিষয়টি অস্বীকৃত হওয়ার কারণ উল্লেখ করেননি।
উপরিউক্ত সমস্ত বর্ণনার সার্বিক বিশ্লেষণে এটাই প্রমাণিত হয়, উম্মে হাবিবার প্রথম স্বামী উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের যে ঘটনা লোকমুখে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, এর কোনো ভিত্তি নেই। কারণ উম্মে হাবিবার হিজরত এবং তাঁর প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর নবীজির সঙ্গে তাঁর বিয়ের ঘটনা যেসব সহিহ হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোর কোনোটিতেই উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করার কথা উল্লেখ নেই।
যথা ইমাম আহমাদ সহিহ সনদে জুহরির সূত্রে উম্মে হাবিবার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। যেখানে এ জাতীয় কোনো কথাই নেই। বরং তিনি আরও উল্লেখ করেন, 'স্বয়ং আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশি উম্মে হাবিবাকে নবীজির সঙ্গে বিয়ে পড়িয়ে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে চার হাজার দিরহাম মোহর বাবদ আদায় করে দেন।' তা ছাড়া ইমাম আবু দাউদ ও ইমাম নাসায়িও একই রকম বর্ণনা করেছেন।
সবশেষে এর সপক্ষে ঐতিহাসিকেরা একাধিক যুক্তি ও প্রমাণ উল্লেখ করেছেন। তাঁরা বলেন:
১. উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের ইসলাম ত্যাগের ঘটনা কোনো সহিহ সনদ দ্বারা প্রমাণিত নয়। উপরিউক্ত বর্ণনা উরওয়া ইবনে জুবায়েরের সূত্রে মুরসাল ধারায় বর্ণিত হয়েছে। আর হাদিসশাস্ত্রের নীতিমালা অনুযায়ী মুরসাল বর্ণনা দ্বারা এ জাতীয় বিষয় সাব্যস্ত হয় না।
তা ছাড়া সহিহ হাদিসের যেসব বর্ণনায় নবীজির সঙ্গে উম্মে হাবিবার বিয়ের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে কোথাও উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের ইসলাম ত্যাগ করার কথা বলা হয়নি।
২. ইসলামের প্রথম দিকে সর্বপ্রথম যে কজন সাহাবি নবীজির নির্দেশে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন, তাঁরা স্বজ্ঞানে বুঝেশুনেই ইসলামে দীক্ষিত হন। এর কারণ হলো, প্রথমত তাঁরা কুরাইশদের শিরকি কর্মকাণ্ড থেকে নিরাপদে থাকার উদ্দেশ্যেই নিজেদের মাতৃভূমি ও স্বজনদের ত্যাগ করে হিজরত করেন। সে ক্ষেত্রে তাঁদের কারও পক্ষে ইসলাম ত্যাগ করা কীভাবে সম্ভব হতে পারে?
দ্বিতীয়ত, আবিসিনিয়ায় যাওয়ার পর সেখানকার বাদশাহ নাজাশি তাঁদের সবাইকে রাজদরবারে তলব করে নবীজির পরিচয় ও তাঁর নবুওয়াতের নিদর্শন এবং দাওয়াতের প্রকৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। জাফর ইবনে আবু তালিব সবার পক্ষ থেকে জিজ্ঞাসাবাদের উত্তর প্রদান করেন।
৩. অনুরূপ ঘটনা রোমের সম্রাট হেরাক্লিয়াসের দরবারেও ঘটেছিল। ঘটনাক্রমে কুরাইশদের একটি বাণিজ্যিক কাফেলা ওই সময় রোম সাম্রাজ্যের রাজধানী সিরিয়ায় অবস্থান করছিল। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন আবু সুফিয়ান, যিনি উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের শ্বশুর ছিলেন। উবাইদুল্লাহর স্ত্রী উম্মে হাবিবা ছিলেন আবু সুফিয়ানের কন্যা।
সম্রাট হেরাক্লিয়াস কুরাইশদের ওই কাফেলাকে রাজদরবারে তলব করে ইসলাম ও নবীজি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান। তিনি আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'তোমাদের মধ্যে যারা তোমাদের বাপ-দাদাদের ধর্ম ত্যাগ করে মুহাম্মদের অনুসারী হয়েছে, তাদের কেউ কি এর পরে ইসলাম ত্যাগ করে তোমাদের কাছে ফিরে এসেছে?' উত্তরে আবু সুফিয়ান স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, 'না, এমন কেউ করেনি।'
ঐতিহাসিকেরা বলেন, 'উবাইদুল্লাহর পরিচয় ও তার সার্বিক অবস্থানের ব্যাপারে আবু সুফিয়ানের অবগত থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ একে তো তিনি ছিলেন কুরাইশদের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একজন, আবার তিনি তাঁর মেয়ে উম্মে হাবিবার পিতাও ছিলেন। উবাইদুল্লাহ যদি সত্যিই খ্রিষ্টান হয়ে যেতেন, তাহলে আবু সুফিয়ান অবশ্যই হেরাক্লিয়াসের দরবারে তা প্রকাশ করতেন। কারণ আবু সুফিয়ান নিজেই বিনা দ্বিধায় স্বীকার করে বলেছেন, 'আমি মুহাম্মদ এবং ইসলাম ও তাঁর সাহাবিদের ব্যাপারে সম্রাট হেরাক্লিয়াসের সামনে মিথ্যা কথা বলতে চেয়েও অপারগ হয়ে গেছি। বলতে চেয়েও সত্য গোপন করার দুঃসাহস করিনি।'
৪. জাহেলি যুগেও উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ কুরাইশ সম্প্রদায়ের মূর্তিপূজা থেকে বিরত থাকতেন। বিধর্মীদের কোনো অনুষ্ঠানে তিনি যেতেন না। ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের মতো তিনিও নীরবে সত্য ধর্মের আবির্ভাবের অপেক্ষায় দিন কাটিয়ে দিতেন।
ইবনে ইসহাক থেকে সনদ ছাড়া এ ঘটনার শুরুতে এ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। অপর ঐতিহাসিক ইবনে সা'আদ ওয়াকিদির সূত্রে বর্ণনা করেন, 'জাহেলি যুগে ইসলাম গ্রহণের আগে উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ খ্রিষ্টধর্মের অনুরক্ত ছিলেন। আর এটা প্রসিদ্ধ কথা যে, নবীজি যখন নবুওয়াতপ্রাপ্ত হন, তখন আরব দেশে খ্রিষ্ট ও ইহুদিধর্মের আহলে কিতাব সম্প্রদায় বসবাস করত। তিনি তাদের প্রতি আবির্ভূত হয়েছিলেন। অতএব, এটা কীভাবে সম্ভব, যে ব্যক্তি দীর্ঘদিন সত্য ধর্মের অনুসন্ধানী ছিল এবং এর অপেক্ষায় জনসমাগম এড়িয়ে চলত, সে ইসলাম গ্রহণের পর পুনরায় সেই বিতর্কিত ধর্ম ও অন্ধবিশ্বাসের দিকে ফিরে যেতে পারে?'
৫. নবীজি উম্মে হাবিবাকে ষষ্ঠ অথবা সপ্তম হিজরিতে বিয়ে করেন। সে সময় ইসলামের ব্যাপ্তি আরবভূমি ছাড়িয়ে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়েছিল। আর উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ ইসলামের প্রথম যুগেই আবিসিনিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। তখনো নবীজি মদিনায় হিজরত করেননি।
মদিনায় হিজরতের পর ইসলামের শক্তি ও সীমানা বহুগুণে বিস্তৃতি লাভ করে। তখন কেউ ইসলাম ত্যাগ করলে তাকে প্রথমে মুনাফিক বলে গণ্য করা হতো। মুনাফিকদের পরিচয় ও বিধান সম্পর্কে কোরআনে আয়াত অবতীর্ণ হচ্ছিল। অথচ উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের নাম ইতিহাসের কোথাও মুনাফিকের তালিকায় পাওয়া যায় না। এর পক্ষে কোনো সূত্রও নেই।
সর্বোপরি এখানে আলোচনা চলছে নবীজির একজন বিশিষ্ট সাহাবিকে নিয়ে। যিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। তাঁর ইসলাম ত্যাগের ব্যাপারে যে বর্ণনা ইতিহাসে পাওয়া যায়, তার কোনো প্রমাণযোগ্য ভিত্তি নেই।
কিন্তু এর পরও যদি মেনে নেওয়া হয় যে ওই বর্ণনার সনদ প্রমাণিত, তাহলে এ সত্ত্বেও আমার (মূল গ্রন্থকার) মতে, যেহেতু ইসলামের বিধানে কোনো মুসলিমের নিন্দা করা নিষিদ্ধ, তাই এ সম্পর্কে আলোচনা কিংবা বিতর্কে জড়ানো সমীচীন হবে না। আবার যদি তা নবীজির কোনো সাহাবির নামে হয়, তাহলে تو আরও আগেই তা থেকে বিরত থাকা উচিত।
ইবনে হিব্বান তাঁর সহিহ গ্রন্থে উরওয়ার সূত্রে আয়েশা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ তাঁর স্ত্রী উম্মে হাবিবাকে সঙ্গে নিয়ে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন। সেখানে যাওয়ার পরে উবাইদুল্লাহ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। মৃত্যুশয্যায় তিনি নবীজিকে উম্মে হাবিবার দেখাশোনার জন্য অনুরোধ করে যান। তাঁর অনুরোধ রক্ষার্থে নবীজি উম্মে হাবিবাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর স্বয়ং বাদশাহ নাজাশি শুরাহবিল ইবনে হাসানার সঙ্গে উম্মে হাবিবাকে মদিনায় নবীজির কাছে প্রেরণ করেন।'

সাকরান ইবনে আমরের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ
সাকরান ইবনে আমর ইসলামের প্রথম যুগে আবিসিনিয়ায় হিজরতকারীদের অন্যতম ছিলেন। তাঁর ভাইয়ের নাম সুহাইল ইবনে আমর। উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের মতো ইতিহাসের পাতায় তাঁরও আবিসিনিয়ায় যাওয়ার পর খ্রিষ্টান হয়ে যাওয়ার গুঞ্জন লোকমুখে শোনা যায়। যদিও উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশের মতো তাঁর বিষয়টি অতটা প্রসিদ্ধ হয়নি। তবে এর সপক্ষে শক্তিশালী কোনো সূত্র যেমন নেই, আবার যেসব বর্ণনার সূত্রে এ কথা ছড়িয়ে পড়েছে সেগুলোকেও অতিমাত্রায় দুর্বল বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমার (মূল গ্রন্থের লেখক) জানামতে, এর সপক্ষে কোনো দুর্বল বর্ণনাও নেই।
মুসা ইবনে উকবা তাঁকে আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী বলে উল্লেখ করেছেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ইসাবাহ গ্রন্থে লেখেন, 'তিনি সুহাইল ইবনে আমরের ভাই।' তবে তিনি তাঁর খ্রিষ্টান হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কিছু বলেননি।
ইবনে ইসহাক তাঁর ব্যাপারে বর্ণনা করেন, 'সাকরান ইবনে আমর দীর্ঘদিন আবিসিনিয়ায় থাকার পর মক্কায় ফিরে আসেন এবং সেখানে ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের পর তাঁর স্ত্রী সাওদা বিনতে যাম'আকে স্বয়ং নবীজি বিয়ে করেন।'
আবু উবাইদার মতে, তিনি আবিসিনিয়ায় গিয়ে খ্রিষ্টান হয়ে যান এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। ঐতিহাসিক বালাজুরি বলেন, 'প্রথম মতটি সর্বাধিক সহিহ।' অর্থাৎ তিনি মুসলিম অবস্থায়ই মক্কায় মৃত্যুবরণ করেন।
ইবনে আবদুল বার তাঁর ইসতি'আব গ্রন্থে সাকরান ইবনে আমরের জীবনী উল্লেখ করলেও তাঁর খ্রিষ্টান হওয়ার ব্যাপারে কোনো কিছু বলেননি।
ইবনে ইসহাক মক্কা থেকে আবিসিনিয়ায় হিজরতকারীদের তালিকা বিন্যাস করেছেন। ওই তালিকায় সাকরান ইবনে আমরের নাম উল্লেখ করলেও তাঁর খ্রিষ্টান হওয়ার কথা নেই। তবে নবীজির সঙ্গে সাওদা বিনতে যাম'আর বিয়ের আলোচনায় তিনি বলেন, 'সাওদা বিনতে যাম'আ সাকরানের চাচাতো বোন ছিলেন। সাকরান তাঁকে কুমারী থাকতেই বিয়ে করেন। অতঃপর আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। সেখান থেকে মক্কায় ফেরার পর তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর নবীজি সাওদা বিনতে যাম'আকে বিয়ে করেন।'
ইবনে সা'আদ তাবাকাত গ্রন্থে সাকরানের কথা উল্লেখ করলেও তাঁর খ্রিষ্টান হওয়ার ব্যাপারে কিছু বলেননি। নবীজির স্ত্রী সাওদা বিনতে যাম'আর জীবনীতেও এ সম্পর্কে বলেননি।
ইমাম জাহবি তারিখুল ইসলাম গ্রন্থের সিরাত অধ্যায়ে এ ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেননি। এমনকি তাঁর ছাত্র ইবনে কাসিরও তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক গ্রন্থ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াতে এ সম্পর্কে কিছুই বলেননি।
তবে ইবনে জারির তাবারি তাঁর তারিখ গ্রন্থে নবীজির স্ত্রী সাওদা বিনতে যাম'আর জীবনীতে বলেন, 'নবীজি যখন সাওদাকে বিয়ে করেন, তখন তিনি বিধবা ছিলেন। এর আগে সাকরানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। সাকরান আবিসিনিয়ায় হিজরত করার পর সেখানে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।' তবে ইবনে জারির তাবারি এর কোনো সূত্র উল্লেখ করেননি।
ইবনে আছির তাঁর উসুদুল গাবাহ ফি মা'রিফাতিস সাহাবাহ গ্রন্থে ইবনে কালবির সূত্রে সাকরানের খ্রিষ্টান হয়ে যাওয়ার তথ্য উল্লেখ করেন। অথচ এই ইবনে কালবি অধিকাংশ ঐতিহাসিকের কাছে প্রত্যাখ্যাত বর্ণনাকারীদের একজন।

আরাশি অঞ্চলের এক অধিবাসীর কাহিনি
ইবনে ইসহাক আবদুল মালিক সাকাফের সূত্রে বর্ণনা করেন, আরাশি অঞ্চল থেকে এক লোক তার উট নিয়ে মক্কায় আসে। কুরাইশ নেতা আবু জাহল ওই লোকের একটি উট কেনে। কিন্তু লোকটি উটের মূল্য চাইলে আবু জাহল তা দিতে গড়িমসি করতে থাকে। উট বিক্রেতা অনেক অনুনয় করলেও আবু জাহল এতে কোনো পাত্তা দিল না।
তখন লোকটি ক্ষুব্ধ মনে মক্কার হারামের পাশে কুরাইশদের এক খোলা আঙিনায় এসে হাঁক দিয়ে বলতে থাকে, 'হে কুরাইশ সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে কে আছে যে আমাকে আবুল হাকাম ইবনে হিশামের (আবু জাহলের) ব্যাপারে সাহায্য করবে?' তখন নবীজি মসজিদুল হারামের চত্বরে বসে ছিলেন। আরাশির উট বিক্রেতা আরও বলল, 'আমি খুবই অসহায় ও দরিদ্র মুসাফির। সে আমার অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে। এ অবস্থায় তোমরাই বলো, তোমাদের কোনো ব্যক্তির জন্য আমার প্রাপ্য নিয়ে টালবাহানা করা কি উচিত হচ্ছে?'
কুরাইশের কেউ কেউ তার কাছে গিয়ে বলল, 'মসজিদুল হারামের চত্বরে এক ব্যক্তি বসে আছেন। তাঁর সঙ্গে আবু জাহলের শত্রুতা আছে। তিনিই তোমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবেন। তুমি তাঁর কাছে যাও।' তারা এসব বলে মূলত নবীজির সঙ্গে তাচ্ছিল্য করছিল। এরা ভালোভাবেই জানত, নবীজির সঙ্গে আবু জাহলের শত্রুতার কথা।
উট বিক্রেতা নবীজির কাছে এসে সব খুলে বলে এবং তাঁর কাছে সাহায্য তলব করে। নবীজি তার সব কথা শুনে তাকে নিয়ে আবু জাহলের উদ্দেশে চললেন। কুরাইশ লোকেরা যখন দেখল, নবীজি উট বিক্রেতার সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়েছেন, তখন তাদের একজন বলল, 'এবার হয়েছে, দেখা যাক কী হয়!'
নবীজি আবু জাহলের বাড়িতে গিয়ে তার দরজায় কড়া নাড়লেন। আবু জাহল ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করল, কে? 'আমি এসেছি, দরজা খোলো।' নবীজি উত্তর দিলেন। তাঁর গলার আউয়াজ শুনে আবু জাহলের চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। দরজা খোলার পর নবীজি তাকে ওই উট বিক্রেতার প্রাপ্য মূল্য দিয়ে দিতে বললেন। আবু জাহল কোনো রাখঢাক না করেই উত্তর দিল, হ্যাঁ, এখনই দিচ্ছি। ঘরের ভেতর গিয়ে আবু জাহল দিরহাম নিয়ে আসে এবং উট বিক্রেতাকে উটের মূল্য দিয়ে দেয়।
অতঃপর নবীজি উট বিক্রেতাকে বললেন, 'এই হচ্ছে তোমার প্রাপ্য। তুমি এবার যেতে পারো।' এরপর উট বিক্রেতা নবীজির সঙ্গে কাবা চত্বরে ফিরে আসে। সে কুরাইশ সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বলতে থাকে, 'আল্লাহ এই মহান ব্যক্তিকে উত্তম বিনিময় দান করুন। তিনি আমার হক আদায় করে দিয়েছেন।'
এ কথা বলতেই কুরাইশের ওই লোকটি এগিয়ে এল, যে উট বিক্রেতাকে নবীজির কাছে প্রেরণ করেছিল। কুরাইশ সম্প্রদায় তামাশা দেখতে একজনকে উট বিক্রেতার পেছনে পেছনে পাঠাল। কিছুক্ষণ পর সে ফিরে এল। তখন সবাই তাকে জিজ্ঞেস করলে সে নিজে উট বিক্রেতাকে সাহায্য করার দাবি করে বসে। তখন উট বিক্রেতা উত্তরে বলল, তোমার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে! তুমি কখন সাহায্য করলে? কাবাঘরের চত্বরে বসে থাকা ওই মহান ব্যক্তিই আমাকে সাহায্য করেছেন। তিনি নিজে আবু জাহলের বাড়ির দরজায় গিয়ে তাকে আমার ন্যায্য মূল্য আদায় করে দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। তখনই আবু জাহল আমার প্রাপ্য আদায় করে।
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আবু জাহল হারামের চত্বরে আগমন করে। কুরাইশের লোকেরা তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে আবু জাহল বলে, 'রবের কসম! মুহাম্মদ আমার দরজায় কড়া নাড়েন। আমি তাঁর গলার আওয়াজ শুনেই ভয় পেয়ে যাই। দরজা খোলার পর দেখি, তাঁর মাথার ওপর বিশালাকায় একটি উট। উটের এত বড় মাথা আমি জীবনেও দেখিনি। দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছিল। এত মোটা দাঁত এবার প্রথম দেখলাম। আমার মনে হচ্ছিল, তখন ওই উট বিক্রেতার মূল্য না দিলে এই উট আমাকেই খেয়ে ফেলত।'
ইবনে ইসহাক এ ঘটনা তাঁর শাইখ আবদুল মালেকের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আবু হাতেম তাঁর জারহ ওয়া তা'দিল গ্রন্থে আবদুল মালেকের জীবনী উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কোনো মন্তব্য করেননি। তবে এ ঘটনার সূত্রে সরাসরি কোনো সাহাবির নাম উল্লেখ নেই। তাই এটি মুরসাল বর্ণনার পর্যায়ভুক্ত।
ইবনে কাসির এ ঘটনা ইবনে ইসহাকের বরাতে বর্ণনা করেছেন। তবে সনদের ব্যাপারে নীরব থেকেছেন।

আবু জাহলের ওপর ভয়ংকর বিশাল উটের আক্রমণ
ইবনে ইসহাকের সূত্রে ইউনুস ইবনে বুকাইর বলেন, ইকরামা ও ইবনে আব্বাসের সূত্রে মক্কার কিছু প্রবীণ লোক নবীজি এবং মক্কার কাফেরদের মধ্যে সংঘটিত এক দীর্ঘ ঘটনার বর্ণনা দেন। একদিন নবীজি নিজ বাড়িতে চলে যাওয়ার পর আবু জাহল কুরাইশদের উদ্দেশে বলল, 'হে কুরাইশ! অনেক হয়েছে! মুহাম্মদ আমাদের ধর্মকে দোষারোপ করছে, বাপ-দাদাদের গালি দিচ্ছে। আমাদের দেবতা ও পুরোহিতদের বোকা বলে আখ্যায়িত করছে। আগামীকাল সে যখন কাবা চত্বরে আসবে, তখন সেজদায় যাওয়ার পর তার মাথার ওপর এমন এক পাথর নিক্ষেপ করব, যাতে তার মাথা থেঁতলে যায়। আমি এর জন্য পাথর সংগ্রহ করব, যতটুকু ভার আমি সইতে পারি। তোমরা আমাকে সাহায্য করো কিংবা বাধা প্রদান করো, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। বনু আবদে মানাফের সঙ্গে যা হওয়ার তা পরে দেখা যাবে। দেখি, তারা কী করতে পারে!'
কুরাইশের লোকেরা তাকে বলল, 'আল্লাহর কসম! আমরা তোমার এ সিদ্ধান্তে অমত প্রকাশ করি না। অতএব, তোমার যা ইচ্ছে করো।'
পরদিন যথারীতি খুব সকালে নবীজি অভ্যাসমতো কাবা চত্বরের নামাজের জন্য ঘর থেকে বের হন। তখন ইসলামের কিবলা ছিল বায়তুল মুকাদ্দাস। সিরিয়ার দিকে ফিরে নবীজি নামাজ আদায় করতেন। তিনি সাধারণত রুকনে ইয়েমেনি কোণ বরাবর নামাজের জন্য দাঁড়াতেন। এদিকে আবু জাহল একটি ভারী পাথর নিয়ে গোপনে অবস্থান নেয় আর সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। ওদিকে কুরাইশের অতি উৎসাহী লোকেরা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল আবু জাহল কী করে এবং পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়।
নবীজি যখন সেজদায় গেলেন, তখনই আবু জাহল পাথর নিয়ে তাঁর দিকে ধেয়ে গেল। কুরাইশরা দেখল, নবীজির কাছাকাছি যেতেই আবু জাহলের চেহারা আতঙ্কে বিবর্ণ হয়ে ফ্যাকাশে রূপ ধারণ করেছে এবং তার হাঁটু দুটো নড়বড়ে হয়ে যায়। ফলে পাথরটি তার হাত ফসকে মাটিতে পড়ে যায় এবং সে দ্রুত পদে পেছনে ফিরে আসে। এ অবস্থা দেখে কুরাইশের লোকেরা আবু জাহলের দিকে এগিয়ে যায়। তারা জিজ্ঞেস করতে থাকে, 'তোমার কী হলো?'
উত্তরে আবু জাহল বলল, 'গতকাল আমি তোমাদের যা বলতে গিয়েছিলাম, তাই করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু মুহাম্মদের কাছে যেতেই বিরাট আকারের একটা উট আমার দিকে ধেয়ে আসতে থাকে। এমন ভয়ংকর মোটা দাঁতওয়ালা উট আমি জীবনে কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছিল, আমাকে গিলে ফেলবে।'
ইবনে ইসহাক বলেন, অন্য সূত্রে আমি জেনেছি, নবীজি বলেছেন, 'আমার দিকে ধেয়ে আসা উটটি মূলত জিবরাইল ছিলেন। আবু জাহল আরেকটু কাছে গেলে জিবরাইল তাকে বধ করতেন।'
ওই বর্ণনায় ইবনে ইসহাকের শাইখ অজ্ঞাত। এ প্রসঙ্গে ইমাম বায়হাকি বলেন, 'ইবনে ইসহাক যখন তাঁর শায়খের নাম উল্লেখ না করে কোনো কিছু বর্ণনা করেন, তখন আমাদের মন খারাপ হয়ে যায়।'
ইবনে ইসহাকের এ বর্ণনায় বলা হয়েছে, আবু জাহল আল্লাহর নামে শপথ করেছিল। অথচ এটা পরিত্যাজ্য কথা। কারণ সহিহ মুসলিম এর বর্ণনায় এসেছে, আবু জাহল লাত ও উজ্জা নামীয় জাহেলি যুগের প্রসিদ্ধ দুই দেবতার নামে শপথ করেছে।
ইমাম হাকিম আবদুল্লাহ ইবনে সালেহের সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করার পর একে সহিহ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে ইমাম জাহবি বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনে সালেহ তেমন সুবিধাজনক কেউ নন। আর ইসহাক ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবু ফারওয়াহ নামে অপর যে বর্ণনাকারী রয়েছে, সে প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিদের অন্যতম।'
সহিহ মুসলিম গ্রন্থে সাহাবি আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, একদিন আবু জাহল কুরাইশ সম্প্রদায়ের লোকদের জিজ্ঞেস করল, 'মুহাম্মদ কি তোমাদের সামনে প্রকাশ্যেই সেজদায় মাটিতে মুখ লাগায়?' তাদের কেউ বলল, হ্যাঁ। তখন আবু জাহল লাত ও উজ্জার নামে শপথ নিয়ে বলল, 'আবার যদি তাকে এমন করতে দেখি, তাহলে আমি তার ঘাড়ের ওপর বসে তার চেহারা মাটির সঙ্গে ঘষে দেব।'
এরপর নবীজি নামাজে দাঁড়ানোর পর যখন সেজদায় গেলেন, তখন আবু জাহল তাঁর দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু দেখা গেল, আবু জাহল কী যেন হাত দিয়ে প্রতিহত করতে করতে পিছু হটছে।
লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার আবার কী হলো? আবু জাহল উত্তর দিল, 'আমার ও মুহাম্মদের মধ্যে এক বিশাল অগ্নিকুণ্ড প্রকাশ পেল, যা দেখতে খুব ভয়ংকর। তাই আমি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলাম।'
নবীজি বলেছিলেন, 'আবু জাহল আরেকটু এগোলেই ফেরেশতাগণ তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একটা একটা করে ছিঁড়ে ফেলতেন।'
ইমাম বুখারি স্বীয় সনদে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের সূত্রে সংক্ষেপে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে ওই বর্ণনায় রয়েছে, আবু জাহল বলেছিল, 'আমি মুহাম্মদের ঘাড়ে চড়ে বসব।' নবীজির কাছে এ খবর পৌঁছালে তিনি বলেছিলেন, 'আবু জাহল এমন করলে ফেরেশতাগণ তাকে বধ করে ফেলতেন।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি লিখেছেন, 'নবীজি সেজদারত সময় এ জাতীয় অন্যায় আবু জাহল ছাড়াও উকবা ইবনে আবু মুঈত করেছিল। যেমন সে জবাই করা উট ও ভেড়ার নাড়িভুঁড়ি নবীজির সেজদারত অবস্থায় তাঁর ঘাড়ে নিক্ষেপ করত।
'তবে আবু জাহল প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে এমন অন্যায় করার দুঃসাহস, বিশেষ করে নবীজির ঘাড়ে উঠে বসার দুঃসাহস দেখানোয় আল্লাহ তায়ালা তাকে তৎক্ষণাৎ ফেরেশতাগণের মাধ্যমে প্রতিহত করেন। উকবা ইবনে আবু মুঈতের বেলায় এমনটি না হলেও সে নবীজির বদ-দোয়ার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। দ্বিতীয় হিজরির বদর যুদ্ধে সে মুসলিম বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারায়।'
তা ছাড়া সহিহ মুসলিম এর অপর বর্ণনায় রয়েছে, নবীজির পিঠ মোবারকে জবাই করা উট কিংবা ভেড়ার বর্জ্য নিক্ষেপ করার প্রস্তাব আবু জাহলই উত্থাপন করেছিল।

কুরাইশদের পক্ষ থেকে দেবতা-পূজার অভিনব প্রস্তাব
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, একদিন নবীজি কাবাঘর তাওয়াফ করছিলেন। তখন কুরাইশদের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন-আসওয়াদ ইবনে মুত্তালিব ইবনে আসাদ, ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা, উমাইয়া ইবনে খালফ এবং আস ইবনে ওয়ায়েল সাহমিসহ সবাই নবীজিকে এক অভিনব প্রস্তাব দেয়। তারা বলে,
'চলো মুহাম্মদ, একটা রফা-দফায় আসা যাক। একদিন আমরা তোমার ইলাহর ইবাদত করব, আরেক দিন তুমি আমাদের সঙ্গে আমাদের দেবতার পূজা করবে। যদি তোমার ইলাহ সঠিক হয়, তাহলে তোমার অংশটুকু তুমি নেবে। আর আমাদের দেবতা সত্যি হলে আমরা আমাদের অংশটুকু নেব।' এ কথা বলার পর আল্লাহ তায়ালা সুরা কাফিরুন অবতীর্ণ করেন।
ইবনে ইসহাক সনদ ছাড়া এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি লিখেছেন, 'ইবনে আবু হাতেম আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেন, কুরাইশ নেতৃবৃন্দ নবীজিকে বলল, তুমি আমাদের দেবতার ব্যাপারে চুপ হও। যদি তা না পারো, তাহলে আসো, একদিন আমরা তোমার ইলাহর ইবাদত করব এবং আরেক দিন তুমি আমাদের দেবতার পূজা করবে। তখনই সুরা কাফেরুন অবতীর্ণ হয়।
'ইবনে আবু হাতেমের ওই বর্ণনার সূত্রে আবু খালফ আবদুল্লাহ ইবনে ঈসা রয়েছেন। তিনি দুর্বল বর্ণনাকারীদের একজন।'
ইবনে কাসির তাঁর তাফসির গ্রন্থে ঘটনার সূত্র দুর্বল হওয়ার প্রতি ইঙ্গিতপূর্বক এভাবে লিখেছেন, 'বলা হয়, কুরাইশ সম্প্রদায় নবীজিকে তাদের দেবতার পূজার প্রস্তাব দিয়ে বলেছিল, একদিন আমরা তোমার রবের ইবাদত করব এবং অপর দিন তুমি আমাদের দেবতার ইবাদত করবে। তাদের এ মূর্খতাসুলভ প্রস্তাবের উত্তরে আল্লাহ তায়ালা সুরা কাফেরুন অবতীর্ণ করেন।'

হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবের ইসলাম গ্রহণ
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, মক্কার আসলাম গোত্রের এক নবমুসলিম বলেছেন, 'একদিন নবীজি সাফা পাহাড়ের পাশ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। এমন সময় আবু জাহল তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করে। সে নবীজিকে ইচ্ছেমতো গালাগাল করে এবং তাঁর নবুওয়াতকে কটাক্ষ করে। সাফা পাহাড়ের পাশে আবদুল্লাহ ইবনে জাদ'আনের বাড়ি ছিল। তার দাস বাড়ির ভেতর থেকে আবু জাহলের সব কথা শোনে। নবীজি আবু জাহলকে কিছুই বললেন না।
'ওদিকে নবীজির চাচা হামজা (রা.) সবেমাত্র শিকার থেকে ঘরে ফিরেছেন। ইবনে জাদ'আনের দাস হামজার কাছে এসে সব বলে দেয়। নিজ ভাতিজার সঙ্গে এহেন দুর্ব্যবহারের কথা শুনে হামজা আবু জাহলের ওপর খেপে যান। রাগে তাঁর চেহারা লাল হয়ে যায়। বংশীয় আত্মমর্যাদা জেগে ওঠে তাঁর।
'হামজা তখনই ঘর থেকে বের হয়ে আবু জাহলের কাছে যান। আবু জাহলের মাথায় সজোরে আঘাত করে বলতে থাকেন, "তুমি আমার ভাতিজাকে কটাক্ষ করছ। তোমার তো সাহস কম নয়! অথচ সে যে দ্বীনের দাওয়াত দেয়, আমি তা বিশ্বাস করি। আমি তার ওপর ইমান এনেছি।"'
ইমাম হাকিম ইবনে ইসহাকের এই সূত্রেই উপরিউক্ত ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে এর সূত্রে সরাসরি সাহাবির নাম না থাকায় ইমাম জাহবি এই বর্ণনাকে মুরসাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তা ছাড়া ইবনে ইসহাক যার কাছ থেকে এই ঘটনা শুনেছেন, তার কোনো পরিচয় ইতিহাসে পাওয়া যায় না। ইবনে সা'আদ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে ওই ঘটনা ওয়াকিদির সূত্রে সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন।
ইমাম হাইসামি মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে লেখেন, 'শাইখ তাবারানি এ ঘটনা মুহাম্মদ ইবনে কা'ব কুরাজির সূত্রে বর্ণনা করলেও কোনো সাহাবির নাম উল্লেখ করেননি। তবে তাঁর সনদের বর্ণনাকারীরা সহিহ হাদিসের গ্রন্থসমূহের বর্ণনাকারীদের অন্যতম।'
ড. আকরাম উমরি বলেন, 'হামজা মক্কায় নবীজির কঠিন সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু উপরিউক্ত বর্ণনায় যেভাবে তাঁর ইসলাম গ্রহণের চিত্রায়ণ করা হয়েছে, এর সহিহ কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।'

উমর ইবনে খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, জাহেলি যুগে উমর (রা.) নবীজিকে হত্যার উদ্দেশে খোলা তরবারি হাতে নিয়ে বের হন। পথিমধ্যে এক লোকের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সে তাঁকে বলে, 'আগে তোমার বোনের খবর নাও।' উমর জিজ্ঞেস করলেন, এর মানে কী? লোকটি তাঁকে তাঁরই বোন ফাতেমা বিনতে খাত্তাব ও ভগ্নিপতি সাঈদ ইবনে জায়েদের ইসলাম গ্রহণের কথা ফাঁস করে দেয়।
উমর রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বোনের বাড়িতে ছুটে যান। গিয়ে দেখেন, ফাতেমা ও তাঁর স্বামী সাঈদ কোরআনের সুরা ত্বহার আয়াত তেলাওয়াত করছেন। বোনকে তিনি ইসলাম গ্রহণের কথা জিজ্ঞেস করলে ফাতেমা তা স্বীকার করেন। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে উমর তাঁর বোনকে চড় মারেন।
ইবনে ইসহাকের সূত্রে ইউনুস ইবনে বুকাইরের বর্ণনায় আছে, কুরাইশ গোত্রের কয়েক নেতা উমরকে নবীজির খোঁজে প্রেরণ করেছিল। নবীজি তখন আস-সাফা পাহাড়ের পাদদেশে একটি ঘরে অবস্থান করছিলেন (ইসলামের প্রাথমিক যুগে নবীজি তাঁর নবমুসলিম সঙ্গীদের নিয়ে এই ঘরে অবস্থান করতেন)। পথিমধ্যে উমরের সঙ্গে নুআইম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আসাদের সাক্ষাৎ হয়। উমর তখন তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে নবীজির খোঁজে যাচ্ছিলেন। নুআইম অবশ্য আগেই নবীজির কাছে ইসলাম গ্রহণ করেন।
আমার (মূল গ্রন্থকারের) জানামতে, উমরের ইসলাম গ্রহণের এ ঘটনা ব্যাপক প্রসিদ্ধ হলেও ধারাবাহিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়নি। এখানে কয়েকটি সূত্র উল্লেখ করা হলো, যেগুলো শাইখ মুহাম্মদ ইবনে রিজিক তারহুনি উল্লেখ করেছেন।
১. ইবনে আসাকির সাঈদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে কায়েসের সূত্রে কাসেম থেকে বর্ণনা করেন।
২. ইবনে সা'আদ, দারা কুতনি, হাকিম, ইবনে আসাকির এবং ইমাম বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে ইসহাক ইবনে ইউসুফ আজরাক থেকে কাসেমের সূত্রে বর্ণনা করেন। শাইখ তারহুনি বলেন, 'এ সূত্রে কাসেম ছাড়া সকলেই নির্ভরযোগ্য।'
ইমাম বুখারি কাসেমের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, 'কাসেম থেকে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে; কিন্তু তাঁর বর্ণনাগুলোর সমার্থক কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।' শাইখ উকাইলিও তা-ই বলেছেন। ইমাম দারা কুতনি কাসেমকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ইবনে হিব্বান তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন।
৩. ইবনে ইসহাকের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, যা প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে।
৪. বাজ্জার ইসহাক ইবনে ইবরাহিম হুনাইনির সূত্রে বর্ণনা করেন।
৫. ইবনে আয়েদ তাঁর মাগাযিতে ওয়ালিদ ইবনে মুসলিমের সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
৬. আবু নুআইম দালায়েল গ্রন্থে এবং হুলইয়া গ্রন্থে মুহাম্মদ ইবনে উসমান ইবনে আবু শাইবার সূত্রে সাহাবি ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমি উমরকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম ফারুক কে রেখেছে? তখন তিনি হামজা ও তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা আমাকে শোনান। হামজার তিন দিন পরে উমর ইসলাম গ্রহণ করেন।' তবে এই সূত্রে ইসহাক ইবনে আবু ফারওয়া রয়েছেন, যাঁর ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দুই ধরনের মন্তব্য পাওয়া যায়। কেউ তাঁকে দুর্বল বলেছেন। আবার অনেকে তাঁর বর্ণনাকে পরিপূর্ণ প্রত্যাখ্যাত বলে মত দিয়েছেন।
৭. ইমাম তাবারানি সাওবানের সূত্রে বর্ণনা করেন। হাইসামি এই সনদের বর্ণনাকারী ইয়াজিদ ইবনে রাবিআ রাহবিকে পরিত্যক্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ইবনে আদি বলেন, 'তার বর্ণনা গ্রহণ করতে তেমন সমস্যা নেই।'
৮. আবদুর রাজ্জাক জুহরির সূত্রে সহিহ সনদে বর্ণনা করেন।
৯. আবদুর রাজ্জাক অপর সূত্রে এ ঘটনা ইমাম সুযুতি থেকে বর্ণনা করেন, যা ইমাম সুযুতি তাঁর খাছায়েদুল কুবরা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে এ সূত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, 'আমি ইমাম সুযুতির সনদের খোঁজ পাইনি।' তবে উমরের ইসলাম গ্রহণের ঘটনায় তাঁর বোন ফাতেমা ও ভগ্নিপতি সাঈদ ইবনে জায়েদের সুরা ত্বহা তেলাওয়াত করার যে কথা বলা হয়েছে, এর কোনো সহিহ সনদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থে 'উমরের ইসলাম গ্রহণ' সম্পর্কে আলাদা অধ্যায় এনেছেন, যাতে তিনি উপরিউক্ত বিষয়টির কিছুই উল্লেখ করেননি।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এবং ড. আকরাম উমরি প্রমুখ মনীষীও এ ব্যাপারে সহিহ সনদ না পাওয়ার কথা বলেছেন।
ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে আবুল মুগিরার সূত্রে উমরের ইসলাম গ্রহণ করার অন্য এক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, শুরাইহ ইবনে উবাইদের সূত্রে সাফওয়ান কর্তৃক আবুল মুগিরা বর্ণনা করেন, উমর বলেন, 'আমি একবার নবীজির খোঁজে বের হই। দেখি, তিনি আমার আগেই মসজিদুল হারামে চলে এসেছেন। আমি তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি সুরা হাক্কাহ তেলাওয়াত শুরু করলেন। আমি তাঁর তেলাওয়াত শুনছি আর কোরআনের গদ্যছন্দের ধরন দেখে বিস্মিত হচ্ছিলাম।
'মনে মনে ভাবলাম, নিশ্চিতভাবে এটা কোনো কবির রচনা; যেমন কুরাইশরা দাবি করে থাকে। কিন্তু একটু পরে নবীজি দুটি আয়াত তেলাওয়াত করতে শুরু করলেন; যার অর্থ হলো, “এটা কোনো কবির রচনা নয়; কিন্তু তোমরা খুব কম লোকই এর প্রতি ইমান আনছ এবং এটা কোনো জ্যোতিষীও কথা নয়; অথচ সামান্য কয়েক লোক ছাড়া কেউই তা বোঝার চেষ্টা করে না।”'
অতঃপর উমর বলেন, 'এই আয়াতগুলো শোনার পর আমার অন্তরে ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে যায়।'
হাইসামি বলেন, 'এ ঘটনা ইমাম তাবারানিও মুজামুল আওসাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তাঁর সনদের সকল বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। তবে শুরাইহ ইবনে উবাইদ উমরের সাক্ষাৎ লাভ করেননি।'
ইমাম জাহবি তাঁর তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে সিরাতের অধ্যায়ে উমরের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আলোচনা করার সময় ইমাম আহমাদ কর্তৃক বর্ণিত উপরিউক্ত ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তবে এর সঙ্গে আরেকটু মিলিয়েছেন। যার সারমর্ম হলো, উমর বলেন, 'আমি স্বীয় বোনের বাড়ি থেকে বের হয়ে নবীজির খোঁজে যাই। তখন রাত ছিল। আমি কাবাঘরের গেলাফের কাছে এসে দেখি নবীজি কাবাঘরের দিকে আসছেন। হাজরে আসওয়াদের কাছে এসে তিনি অনেকক্ষণ নামাজ আদায় করলেন। নামাজে তিনি কোরআন থেকে এ আয়াত পড়ছিলেন, যা শুনে আমি হতবাক হয়ে যাই। এমন কথা কস্মিনকালে আমি কারও কাছে শুনিনি।'
এরপর উমর আরও বলেন, 'নামাজ শেষে নবীজি বাড়ির পথ ধরলেন, আমি তাঁর পিছু নিই। তিনি আমার দিকে ফিরে তাকালেন। অন্ধকারে চিনতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, "কে তুমি?” উত্তর দিলাম, "আমি উমর।”'
বললেন, “তুমি! কী উদ্দেশ্যে এখানে আসছ? রাতদিন শুধু আমার পিছেই লেগে থাকো?”
'আমার আশঙ্কা হচ্ছিল, তিনি আমার বিরুদ্ধে বদ-দোয়া করে ফেলেন কি না! আমি তাঁকে বললাম, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং আপনিই তাঁর রাসুল।" নবীজি বললেন, “উমর, আস্তে বলো।” আমি বললাম, “না, হে আল্লাহর রাসুল! কাফেররা যেভাবে প্রকাশ্যে শিকের ঘোষণা দিয়েছে, ঠিক সেভাবে আমিও ইসলামের ঘোষণা দিতে চাই।"'

উমরের 'ফারুক' উপাধি
উমরের উপাধি 'ফারুক' কে দিয়েছিল, এ নিয়ে একাধিক মত পাওয়া যায়। তবে কোনো মতের ব্যাপারেই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। যথা:
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে বলেন, 'সাহাবি ইবনে আব্বাসের সূত্রে এবং উম্মুল মুমিনিন আয়েশার সূত্রে ইবনে সা'আদের বর্ণনামতে স্বয়ং নবীজি তাঁকে এই উপাধি দেন। কোনো কোনো বর্ণনামতে আহলে কিতাব সম্প্রদায় এই উপাধি দিয়েছিল। ইমাম বাগাভির বর্ণনামতে জিবরাইল আলাইহিস সালাম এই উপাধি দেন।'

উমর ইবনে খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণের জন্য নবীজির দোয়া
ইতিহাসে বর্ণিত আছে, নবীজি আল্লাহ তায়ালার দরবারে উমরের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে দোয়া করেছিলেন। একাধিক সূত্রে বিভিন্ন শব্দে এটি বর্ণিত হয়েছে। তবে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে শুধু আয়েশার সূত্রে ইমাম হাকিমের সনদকে সহিহ বলে সাব্যস্ত করেন।

উমরের ইসলাম গ্রহণের পর জিবরাইলের সুসংবাদ
সুনানে ইবনে মাজাহ এবং সহিহ ইবনে হিব্বান গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি বলেন, 'উমরের ইসলাম গ্রহণের পর জিবরাইল আসমানবাসীকে আনন্দিত হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছিলেন।'
ইমাম হাকিম এই বর্ণনাকে সহিহ বলেছেন। তবে এর পরই ইমাম জাহবি বলেন, 'ওই বর্ণনার সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে খেরাশ রয়েছেন, যাকে ইমাম দারা কুতনি দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন।'
শাইখ সা'আদ হুমাইদ বলেন, 'এই বর্ণনা নিতান্ত দুর্বল।' তা ছাড়া শাইখ আলবানিও একে দুর্বল বর্ণনা বলে চিহ্নিত করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00