📄 মুহাম্মদ ﷺ-এর জন্ম ও বংশ পরিক্রমা
নবীজি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মতারিখ নিয়ে আজও পৃথিবীতে নানা রকমের বক্তব্য শোনা যায়। মুসলিম উম্মাহ এখনো এ বিষয়ে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়নি। জন্মসন নিয়ে মোটামুটি একই রকমের বক্তব্য পাওয়া গেলেও দিন বা সময় নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও আলেমের মতে, হস্তীবাহিনীর মক্কায় কাবাঘর আক্রমণের বছর নবীজি জন্মলাভ করেন। তবে কারও মতে, হস্তীবাহিনীর আক্রমণের এক মাস পর তিনি জন্মলাভ করেন। আবার কারও মতে, ৪০ দিন এবং কেউ ৫০ দিন পরের কথা উল্লেখ করেন। শাইখ সুহাইলি ও ইবনে কাসির এ মতকে সর্বাধিক সঠিক বলে আখ্যায়িত করেন।
আবার কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন, হস্তীবাহিনীর আক্রমণের ১০ বছর পরে নবীজি জন্মলাভ করেন। কেউ কেউ ২৩ বছর, আবার অনেকে ৩০ বছরের কথাও বলেছেন।
এ প্রসঙ্গে ইমাম জাহবি বলেন, 'আবু আহমাদ হাকিম বর্ণনা করেন, হস্তীবাহিনীর আক্রমণের এক মাস পর নবীজি জন্মলাভ করেছেন এবং অনেকেই এ মত ব্যক্ত করেছেন। আবার কেউ ৪০ দিনের কথাও বলেছেন। আমার মতে, মূলত এখানে শব্দের ভুল হয়েছে। এর ফলে পরবর্তী সময়ে এই ভুলটিই সর্বত্র প্রসিদ্ধি লাভ করে। অর্থাৎ যাঁরা ৩০ অথবা ৪০ বছরের কথা বলেছেন, তাঁরা দিনের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ভুলক্রমে দিনের জায়গায় বছরের কথা উল্লেখ করেছেন। অন্যথায় সঠিক বক্তব্য হচ্ছে ৩০ অথবা ৪০ দিন।'
এ বিষয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আবু ইসহাক মুত্তালিব ইবনে আবদুল্লাহর সূত্রে তাঁর দাদা কায়েস থেকে বর্ণনা করেন, কায়েস বলেন, 'আমি এবং নবীজি একই বছর অর্থাৎ হস্তীবাহিনীর আক্রমণের বছর জন্মগ্রহণ করি। মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ যেন দুটি জন্ম।'
ইমাম জাহবি এ সূত্রকে 'হাসান' বলে আখ্যায়িত করেছেন। অপর ঐতিহাসিক ইবনে সাদ ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন থেকে তিনি বলেন, হাজ্জাজ ইবনে মুহাম্মদ প্রখ্যাত তাবেয়ি সাঈদ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের (রা.) সূত্রে বর্ণনা, 'হস্তীবাহিনীর আক্রমণের বছর জন্মলাভ করেন।'
ইমাম জাহবি তাঁর তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে উপরিউক্ত সহিহ বলে সাব্যস্ত করেছেন।
খলিফা ইবনে খাইয়াত তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থে এবং ইবনে আয-যাদ (যাদুল মায়াদ) গ্রন্থে ওই মতকে সর্বাধিক গ্রহণ করেছেন। ইবনে কায়্যিম আরও বলেছেন, 'হস্তীবাহিনীর বছরে যে নবীজি জন্মগ্রহণ করেছেন, এ বিষয়ে কোনো মতানৈক্য নেই।'
এক বর্ণনায় আয়েশা (রা.) বলেন, 'আমি হস্তীবাহিনীর লোকদের মক্কার রাস্তায় রাস্তায় মানুষের কাছে খাবার ভিক্ষা চাইতে দেখেছি। তারা পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল।'
এবার আসা যাক সময় ও মাসের ব্যাপারে। অধিকাংশ আলেম বলেছেন, নবীজি রবিউল আউয়াল মাসে জন্মগ্রহণ করেন।
এক বর্ণনায় রমজান মাসের কথা পাওয়া যায়। ইমাম ইবনে কাসির বলেন, 'রমজানের কথাটি মালেকি মাজহাবের মুহাদ্দিস ইবনে আবদুল বার ইবনে বাক্কার থেকে বর্ণনা করেছেন। এ মতটি নিতান্ত দুর্লভ।'
রবিউল আউয়ালে নবীজির জন্ম হওয়ার সমর্থনে হাদিস পাওয়া যায়। সাহাবি আবু কাতাদা (রা.) বলেন, নবীজিকে প্রতি সোমবারে রোজা রাখার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরে তিনি বলেন, 'কারণ এতে আমি জন্মলাভ করেছি এবং এই সোমবারেই আমার ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়।'
সোমবারের তারিখ উল্লেখ করতে গিয়ে ইবনে কাসির বলেন, তিনি রবিউল আউয়ালের ২ তারিখে জন্মলাভ করেন। ইবনে আবদুল বার তাঁর বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থ আল ইসতি'আব ফি মা'রিফাতিল আসহাব-এ এ তারিখের কথা উল্লেখ করেছেন।' অপর ঐতিহাসিক ওয়াকিদি নাজিহ ইবনে আবদুর রহমান মাদানির সূত্রে ২ তারিখের কথা বলেছেন। আবার কোনো ঐতিহাসিক রবিউল আউয়ালের ৮ তারিখের কথা বলেছেন। ইবনে হাজামের সূত্রে হুমাইদি ও মালিক, উসমান ইবনে ইয়াজিদ বিখ্যাত তাবেয়ি জুহরির সূত্রে মুহাম্মদ ইবনে জুবায়ের ইবনে মুতইম থেকে এ রকম বর্ণনা করেন। ইবনে আব্দুল বার একাধিক ঐতিহাসিকের বরাতে ৮ তারিখের মতকে সহিহ বলে উল্লেখ করেছেন। তা ছাড়া হাদিসের প্রখ্যাত হাফেজ মুহাম্মদ ইবনে মুসা খাওয়ারিজমি নিশ্চিতভাবে এ মতকে সমর্থন দিয়েছেন এবং হাফেজ আবুল খাত্তাব ইবনে দিহইয়া আত তানবির ফি মাওলিদিল বাশিরিন নাযির গ্রন্থে এ মতকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
কারও মতে, রবিউল আউয়ালের ১০ তারিখে নবীজির জন্ম হয়। এ মতটি আবু জাফর বাকেরের সূত্রে ইবনে আসাকির এবং শা'বির সূত্রে মুজালিদ বর্ণনা করেছেন।
আবার কারও মতে, রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখে নবীজির জন্ম হয়। আবু ইসহাক স্পষ্ট ভাষায় ১২ তারিখের কথা ব্যক্ত করেছেন। এ ছাড়া আবু শাইবা তাঁর মুছান্নাফ গ্রন্থে আফফানের সূত্রে সাহাবি জাবের ও ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, তাঁরা বলেছেন, নবীজি হস্তীবাহিনীর আক্রমণের বছর রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে জন্মলাভ করেন। এ তারিখেই তাঁর ওপর প্রথম ওহি অবতীর্ণ হয়। এ দিনেই তিনি ঊর্ধ্বগমন করেন এবং মদিনায় হিজরত করেন। আর এ দিনেই তাঁর ওফাত হয়।
উল্লেখ্য, এই ১২ তারিখের কথাটি সর্বমহলে বেশি প্রসিদ্ধ।
তবে অনেকে ১৭ রবিউল আউয়ালের কথাও বলেছেন। ইবনে দিহইয়া এ মতটি শিয়া সম্প্রদায়ের কারও সূত্রে উল্লেখ করেন। তা ছাড়া ২২ রবিউল আউয়ালের কথা ইবনে হাজমের লেখা থেকে ইবনে দিহইয়া বর্ণনা করেছেন। তবে সে ক্ষেত্রে ইবনে হাজমের সঠিক অবস্থান সেটাই, যেটা তাঁরই সূত্রে হুমাইদি উল্লেখ করেছেন। সেটা হলো ৮ তারিখ। ইবনে কাসির উপরিউক্ত মোট ছয়টি বক্তব্য উল্লেখ করেছেন।
এগুলোর কোনোটিই সহিহ হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত নয়। এ ছাড়া ১২ তারিখের সমর্থনে সাহাবি জাবের ও ইবনে আব্বাস-এর সূত্রে যে হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে, তা সাব্যস্ত হলে উম্মাহর মধ্যে এ বিষয়ে যে দীর্ঘ বিতর্ক চলে আসছে, এক নিমেষেই তার অবসান ঘটত। কিন্তু ওই হাদিসের সনদ দুর্বল হওয়ায় তাও সম্ভব হয়নি। কারণ ইবনে কাসির বলেন, 'এ হাদিসের সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।'
তাই যেহেতু নবীজির জন্মতারিখ গ্রহণযোগ্য কোনো বর্ণনার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো না, তাই জ্যোতির্বিদদের বক্তব্য গ্রহণ করে এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে কোনো অসুবিধা নেই। অবশ্য অনেকে ৯ রবিউল আউয়ালকে নির্দিষ্ট করে তা সাব্যস্ত করতে চেয়েছেন।
শাইখ মুহাম্মদ ইবনে উছাইমিন বলেন, 'আধুনিক বিশ্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানীর করা হিসাব ও নবীজির বয়সসীমা পর্যবেক্ষণ করলে তাঁর জন্মতারিখ হয় রবিউল আউয়ালের ৯ তারিখ; ১২ তারিখ হতে পারে না।'
সোমবারে জন্মলাভ প্রসঙ্গে কেউ নবীজিকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেননি। বরং সোমবারে রোজা রাখার ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে। তবু নবীজি তাঁর জন্মদিনের বার উল্লেখ করে বলেছিলেন, 'এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করি।' অতএব, সোমবারে রোজা রাখার বিশেষত্ব হচ্ছে তিনটি। যথা:
প্রথমত, এই দিনে বান্দার আমল আল্লাহ তায়ালার দরবারে পেশ হয়; বৃহস্পতিবারেও অনুরূপ করা হয়ে থাকে।
দ্বিতীয়ত, এই দিনে নবীজি জন্মলাভ করেন।
তৃতীয়ত, এই সোমবারেই তাঁর ওপর প্রথম ওহি অবতীর্ণ হয়; অর্থাৎ তিনি নবুওয়াত লাভ করেন।
লক্ষণীয়, নবীজি নিজে কোনো তারিখের কথা উল্লেখ করেননি; সাহাবিদের কেউই তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেননি। অথচ তিনি হচ্ছেন মানুষের মধ্যে কল্যাণকর বিষয়ে সবচেয়ে আগ্রহী। এতে বোঝা যায়, নবীজির জন্মদিনের তারিখ থেকে বিশেষ কোনো বিষয় সাব্যস্ত হয় না; অন্যথায় তিনি কখনোই তাঁর উম্মতের কাছ থেকে তা গোপন রাখতেন না।
যারা প্রতিবছর ১২ রবিউল আউয়ালে নবীজির জন্মদিনের নামে উৎসবের আয়োজন করে থাকে, তারা মূলত অজ্ঞতাবশত তাঁর মৃত্যুর দিবস এমনটি করে থাকে। কারণ নবীজি ১১ হিজরির ১২ রবিউল আউয়ালে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর তারিখের ব্যাপারে তেমন কোনো মতভেদ নেই। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি এমনটিই উল্লেখ করেছেন।
📄 শৈশব এবং যৌবন
বাল্যকালে দাদা আবদুল মুত্তালিবের বিছানায় নবীজি বসতেন
ইবনে ইসহাক আব্বাস ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মা'বাদের সূত্রে বর্ণিত, কুরাইশের মহান নেতা আবদুল মুত্তালিবের জন্য কাবাঘরের পাশে বিছানা বিছানো হতো। যেখানে তাঁর সম্মানে তাঁর সন্তানদের কেউ বসত না। কিন্তু বালক নবীজি কখনো সেই বিছানায় এসে বসতেন। যার কারণে তাঁর চাচারা তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে দিতে চাইতেন। ব্যাপারটি আবদুল মুত্তালিবের নজরে পড়ল। তখন প্রিয় নাতি বালক নবীজির পিঠে হাত বুলিয়ে তিনি তাঁর চাচাদের বললেন, 'ওকে ছেড়ে দাও। আমার এ নাতির হিসাব আলাদা।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানির তাকরিব গ্রন্থের আলোকে আব্বাস ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মা'বাদ ইবনে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব ষষ্ঠ শতাব্দীর নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিকদের একজন। তাই নবীজির সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত না হলেও তিনি স্বীয় গোত্র কিংবা পরিবারের কারও সূত্রে যা কিছু বর্ণনা করেছেন, তা হুবহু সাহাবিদের সূত্রের মতো না হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ কারণে তাঁর সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।
ইবনে ইসহাকের সূত্রে তাঁর বর্ণনা বায়হাকি তাঁর দালায়েল গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
ইবনে সাদ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে এ ঘটনা নিজ শাইখ ওয়াকিদির সূত্রে উল্লেখ করেছেন, যার বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যাত বলা হয়েছে।
ইমাম জাহবি তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে সিরাতের বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবনে শাবিবের সূত্রে এ ঘটনা উল্লেখ করার পর বলেন, 'আবদুল্লাহর বর্ণনা দুর্বল।' ইবনে কাসির এ ঘটনা ইবনে ইসহাকের সূত্রে বর্ণনা করলেও এ ব্যাপারে নীরব থেকেছেন।
নবীজির বাল্যকালে দুর্ভিক্ষ ও বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা
ইবনে সাদ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে মাখরামা ইবনে নওফেল জুহরির সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি তাঁর আম্মা রুকাইকা বিনতে আবু সাইফিকে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, আমি কুরাইশের নেতা আবদুল মুত্তালিবের জন্মকালে ছিলাম। দীর্ঘ কয়েক বছর মক্কায় দুর্ভিক্ষ চলছিল, বৃষ্টিও হচ্ছিল না। কুরাইশদের খাদ্যপণ্য ও খেতের ফসল শেষ হয়ে মক্কার ঘরে ঘরে অভাব দেখা দেয়। বাজারেও খাদ্যসংকট দেখা দেয়। ক্ষুধার যন্ত্রণায় নারী ও শিশুরা হাহাকার করছিল।
এরই মাঝে একদিন ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখি, কেউ ডেকে বলছে, 'হে কুরাইশের সন্তানগণ, তোমরা শুনে রাখো! শেষ নবী তোমাদের মাঝেই প্রেরিত হয়েছেন। তিনি তোমাদের জন্য সর্বক্ষেত্রে উন্নতি ও সজীবতা ফিরিয়ে আনবেন। অতএব, তোমরা তোমাদের মধ্যে এমন একজনকে লক্ষ্য করো, যিনি তোমাদের মধ্যে বংশীয় মর্যাদায় সমপর্যায়ের; যিনি সর্বাধিক সম্মানিত ও উজ্জ্বল বর্ণবিশিষ্ট হবেন। তিনি যেন তাঁর পরিবারের সকলকে নিয়ে এবং তোমরা তোমাদের গোত্রীয় প্রত্যেক শাখা থেকে একজন করে বেরিয়ে পড়ো। অতঃপর পবিত্রতা অর্জন করে সুগন্ধি লাগিয়ে মক্কার আবু কুবায়েস পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করো। এরপর এই মহান ব্যক্তি তোমাদের জন্য বৃষ্টি চেয়ে প্রার্থনা করবেন এবং তোমরা "আমিন আমিন” বলবে। তাঁর দোয়ার ফলে তোমরা অবশ্যই পানি লাভ করবে।'
রুকাইকা সকালে স্বপ্নের এ ঘটনা কুরাইশের লোকদের জানালে তারা সবাই তাঁর স্বপ্নের বর্ণনা অনুযায়ী সে ধরনের লোক খুঁজতে লাগল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তারা নিশ্চিত হলো, এমন লোক আমাদের মধ্যে শুধু একজনই আছেন। তিনি হচ্ছেন আবদুল মুত্তালিব। কুরাইশের সবাই আবদুল মুত্তালিবের কাছে সমবেত হয়ে স্বপ্নের কথা খুলে বলল।
এরপর আবদুল মুত্তালিব সবাইকে নিয়ে যথারীতি আবু কুবায়েস পাহাড়ের উদ্দেশে রওনা হলেন। সঙ্গে করে প্রিয় নাতি মুহাম্মদকে নিয়ে চললেন। পাহাড়ের চূড়ায় ওঠে বালক নবীজিকে পাশে বসিয়ে তিনি প্রার্থনা শুরু করলেন, 'হে মালিক! এরা সবাই তোমারই বান্দা ও তাদের সন্তান। এদের সঙ্গে যেসব নারী ও শিশু সমবেত হয়েছে, এরাও তোমার দাসী ও তাদের পরিবার। ও মালিক! তুমি দেখতে পাচ্ছ, আমাদের ওপর কেমন আপদ নেমে এসেছে। আজ কত দিন বৃষ্টি নেই, মাটি ফেটে যাচ্ছে। খাদ্যপণ্য ও শস্য সব নিঃশেষ হয়ে সর্বত্র দুর্ভিক্ষ হানা দিয়েছে। তুমি দয়া করে আমাদের ওপর থেকে এ দুর্ভিক্ষ উঠিয়ে নাও। মাটির উর্বরতা ও জমির সজীবতা আমাদেরকে দান করো।'
দেখা গেল, আবদুল মুত্তালিবের প্রার্থনা শেষ না হতেই প্রবল বর্ষণে মক্কার উপত্যকা প্লাবিত হয়ে যায়। সবার প্রথম নবীজি পানি পান করলেন। এরপর সবাই পানি নিয়ে ঘরে ফিরল। অভাবনীয় এ অবস্থা দেখে রুকাইকা আনন্দে গাইতে শুরু করলেন:
প্রশংসার আধিক্যের ফলে আল্লাহ আমাদের শহরকে প্লাবিত করলেন
অথচ আমরা নির্জীব হয়ে গিয়েছিলাম, অনাবৃষ্টি দীর্ঘদিন ধরে লেগে ছিল,
প্রবল বৃষ্টির পরে তিতির পাখি তার পথ খুঁজে পেল
এতে সমস্ত প্রাণী এবং গাছপালাও সজীব হয়ে উঠল,
মেঘের বরকতময় পানি দ্বারা সকলে সিক্ত হলো
মুদার গোত্রের সুসংবাদদাতা কতই না উত্তম!
বিশ্বস্ত মুহাম্মদের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের অশুভ বিষয় সরিয়ে নিলেন,
সৃষ্টিজগতে তাঁর মতো ন্যায়পরায়ণ আর কেউ নেই।
হিশাম কালবি প্রত্যাখ্যাত। ইমাম বায়হাকি তাঁর দালায়েল গ্রন্থে ওই বর্ণনা দুটি সনদে উল্লেখ করেছেন। প্রথম সনদে তাঁদের দুজনের মধ্যে আবদুল আজিজ ইবনে ইমরান রয়েছেন। তিনিও প্রত্যাখ্যাতদের একজন। দ্বিতীয় সনদে জাহার ইবনে হিসন তাঁর দাদা হুমাইদ ইবনে মুনহিব থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম জাহবির ভাষ্যমতে তাঁরা দুজনে অজ্ঞাত।
তবে মূল হাদিস উল্লেখ করার পর আল্লামা হাইসামি বলেন, 'ইমাম তাবারানি এ হাদিস তাঁর মু'জামুল কাবির গ্রন্থে যে সূত্রে বর্ণনা করেছেন, সেখানে জাহার ইবনে হিসন রয়েছেন, যাঁকে ইমাম জাহবি অজ্ঞাত বলে উল্লেখ করেছেন।' হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ইসাবাহ গ্রন্থে জাহারের জীবনী উল্লেখ প্রসঙ্গে বলেন, 'ইমাম তাবারানি ও মুসতাগফারি তাঁকে সাহাবিদের মধ্যে গণ্য করেছেন।'
ইমাম জাহবি তাঁর তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে সিরাতের বর্ণনায় জুলহুমার সূত্রে নবীজির চাচা আবু তালিবের বৃষ্টির জন্য প্রার্থনার ঘটনা উল্লেখ করে লেখেন, জুলহুমা বলেন, 'আমি নামিরার সমতলভূমিতে অবস্থান করছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, নজদ অঞ্চলের উঁচু ভূমির দিক থেকে একটি কাফেলা আসছে। কাফেলাটি কাবার নিকটবর্তী হলে তাদের মধ্যে একজন বালককে দেখলাম যে স্বীয় উটের পিঠ থেকে নিজেকে মাটিতে ছুঁড়ে দিল...।' অতঃপর জুলহুমা আরও বলেন, 'আমি হিজাজের নিম্নাঞ্চলের দিকে দ্রুতগতিতে এগোতে থাকি। এমনকি মসজিদুল হারামের নিকটে এসে পড়ি। এখানে এসে দেখতে পাই, কুরাইশদের একটি কাফেলা পানির জন্য হাহাকার করছে। সেখানে কুরাইশ গোত্রের লোকেরাও উপস্থিত ছিল।
'তাদের কেউ তখন বলছিল, “তোমরা প্রধান দুই দেবতা লাত ও উজ্জার ওপর ভরসা করো।” আরেকজন বলতে লাগল, “তৃতীয় দেবতা মানাতের ওপরও আস্থা রাখো।” এ অবস্থায় সেখানে অভিজাত সুদর্শন ও স্বাস্থ্যবান এক ব্যক্তিকে দেখতে পাই। মনে হচ্ছিল, নেতা পর্যায়ের কেউ হবেন। তিনি বললেন, “তোমাদের মধ্যে পিতা ইবরাহিমের বংশধর ইসমাইলের সন্তান থাকতে কোথায় উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটছ?” লোকেরা জবাবে বলল, সম্ভবত তুমি আবু তালিবের কথা বলছ! তিনি বললেন, “হ্যাঁ, তাই।”
'এরপর তারা সবাই আবু তালিবের বাড়ির দিকে ছুটল। আমিও তাদের সঙ্গে যোগ দিই। আবু তালিবের বাড়ির সামনে এসে ওই লোকটি বললেন, “হে আবু তালিব! উপত্যকা শুকিয়ে মরু হয়ে যাচ্ছে। মানুষ অভাবে পড়ে কষ্ট পাচ্ছে। বের হও, আমরা তোমাকে সঙ্গে নিয়ে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করব।” আবু তালিব বললেন, “সূর্য হেলে যাওয়ার পর যখন বায়ুপ্রবাহ হতে থাকবে, তখন ধীরে ধীরে তোমারা উন্মুক্ত প্রান্তরে চলতে থাকো।”
'সূর্য কিছুটা হেলে যেতেই আবু তালিব নিজের সঙ্গে এক বালককে নিয়ে বের হলেন। বালকটির শরীর থেকে যেন মেঘাচ্ছন্ন আকাশের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছিল। তাঁর চারপাশে মুত্তালিব গোত্রের আরও বেশ কয়েকজন বালক ছিল।
আবু তালিব তাঁকে কাবাঘরের দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন। বালকটি আঙুল উঁচিয়ে কাবার আশ্রয় প্রার্থনা করতে থাকে এবং অন্য বালকেরা তার অনুকরণ করতে থাকে।
'তখন আকাশে মেঘের সামান্য কোনো খণ্ডও ছিল না। কিছুক্ষণ পরেই চারপাশ থেকে মেঘের টুকরো মক্কার আকাশে ঘনীভূত হতে লাগল। বিকট শব্দে মেঘের গর্জন শুরু হলো। প্রবল বর্ষণ শুরু হওয়ার পর দেখতে পেলাম, উপত্যকা প্লাবিত হচ্ছে এবং মক্কার খেজুর বাগান ও গাছগাছালি সজীব হয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেল।' আবু তালিব তখন গাইতে লাগলেন:
তাঁর (নবীজির) ইনসাফের পাল্লা জবের পরিমাণও হেলে যায় না
তিনি অনাথ এবং বিধবাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল
তাঁর কারণে হাশেমি বংশ থেকে বিপদাপদ দূর হয়ে যায়
বনু হাকিম তাঁর কারণে অনুগ্রহ এবং নেয়ামতে আবৃত আছে
তিনি নিষ্কলুষ সম্মানিত সরদার, তার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে মেঘ থেকে পানি চাওয়া হয়,
তিনি সত্যকে সূক্ষ্মভাবে ওজন করেন, তাঁর ওজন বিন্দুমাত্র বিপথে যায় না
পরবর্তী সময়ে আবু তালিবের উপরিউক্ত আবৃত্তির এই লাইনটি খুব প্রসিদ্ধি লাভ করে। বালক নবীজির নবুওয়াত লাভের পর এই কবিতার অনুকরণে আবু তালিব আরও দীর্ঘ কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন।
ইবনে কাসির ওই কবিতা উল্লেখ করার পর মুগ্ধ হয়ে এর প্রশংসা করেন। ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থে 'বৃষ্টি প্রার্থনার নামাজ' অধ্যায়ে এ কবিতার প্রসঙ্গ টেনেছেন। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি সহিহ বুখারির ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল বারিতে এই হাদিসের শিরোনামের আলোচনায় লিখেছেন, এখানে কবিতার মাধ্যমে প্রিয় নবীজির যে বিশেষ মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, এ রকম আরও অনেক উদাহরণ তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনে রয়েছে।
ইমাম বায়হাকি তাঁর দালায়েল গ্রন্থে সাহাবি আনাসের সূত্রে বর্ণনা করেন, এক বেদুইন নবীজির দরবারে এসে নিজের অভাবের কথা এভাবে প্রকাশ করল, 'হে নবী! আপনার কাছেই এসেছি; অথচ আমার না আছে কোনো উষ্ট্রী, যা দ্বারা নতুন প্রাণীর জন্ম হয় এবং কোনো সন্তানও নেই, যে আমার কষ্টের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করে দেবে।' এরপর বেদুইনটি নবীজিকে উদ্দেশ্য করে আবৃত্তি করল:
তোমাকে ছাড়া আমাদের পলায়নের কোনো জায়গা নেই;
তা ছাড়া মানুষের আশ্রয়স্থল রাসুলগণ ছাড়া আর কে-ইবা হবে!
বেদুইনের মুখে এ কথা শুনে নবীজি গায়ে চাদর জড়িয়ে মিম্বরে উঠে আল্লাহ তায়ালার দরবারে ফরিয়াদ করলেন, 'হে দয়াময় রব! আপনি আমাদের জন্য পানির ব্যবস্থা করে দিন।'
দোয়া শেষে তিনি বললেন, 'আজ যদি আবু তালিব জীবিত থাকতেন, তাহলে এতক্ষণে তাঁর দুই চোখ শীতল হয়ে যেত। এখানে কে আছে, যে তাঁর বিখ্যাত আবৃত্তি গেয়ে শোনাবে?'
আলি (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! আপনি মনে হয় আমার পিতা আবু তালিবের আবৃত্তির পঙ্ক্তির কথা বলতে চাচ্ছেন।' অতঃপর তিনি এ কবিতা আবৃত্তি করে নবীজিকে শোনান।
ফিজারের যুদ্ধে নবীজির অংশগ্রহণ
ইবনে ইসহাক বলেন, নবীজি যখন মাত্র ২০ বছরের যুবক, তখন ফিজারের যুদ্ধ প্রচণ্ড আকার ধারণ করে। অবশ্য ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন, নবীজির ১৪ বা ১৫ বছর বয়সেই এ যুদ্ধ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। কুরাইশ এবং তাদের মিত্র কেনানা গোত্রের সঙ্গে কায়েস আয়লান গোত্রের মধ্যে জাহেলিয়াতের যুগে দীর্ঘদিন যে যুদ্ধ চলে আসছিল, তা-ই ইতিহাসে হারবুল ফিজার বা 'প্রশস্ত গিরিপথের যুদ্ধ' নামে প্রসিদ্ধ।
নবীজি নিজেই এ যুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। কারণ তাঁকে তাঁর চাচারা সঙ্গে করে রণাঙ্গনে নিয়ে যেতেন। নবীজি এ যুদ্ধ সম্পর্কে নিজেই পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন, 'আমি চাচাদের পক্ষ হয়ে শত্রুবাহিনীর তির-বর্শা নিক্ষেপ প্রতিহত করতাম।'
ইবনে ইসহাক এ ঘটনা সনদ ছাড়া বর্ণনা করলেও ইমাম জাহবি তারিখুল ইসলাম গ্রন্থের সিরাত অধ্যায়ে এবং ইবনে কাসির তাঁর বিখ্যাত ঐতিহাসিক গ্রন্থ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে এর বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। ইবনে সাআদ তাঁর শাইখ ওয়াকিদির সূত্রে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তবে ওয়াকিদির সূত্রে আরও বর্ণিত হয়েছে। নবীজি বলেন, 'আমি এ যুদ্ধে চাচাদের পক্ষে লড়াই করলেও আমার এতে কোনো সম্মতি ছিল না।' তবে ওয়াকিদিকে ঐতিহাসিকেরা প্রত্যাখ্যাত বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে বর্তমান সময়ের কিছু ঐতিহাসিক ও হাদিসবিশারদের মতে, এ বর্ণনা সহিহ নয়। তাঁদের মতে, হয়তো-বা এমনও হতে পারে, স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা নবীজিকে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে নিরাপদে রেখেছিলেন। কারণ ফিজার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ঘোষিত হারাম মাসে।
সুহাইলি বলেন, আল্লাহ তায়ালার বিধানে ঘোষিত হারাম মাসে যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ। কিন্তু আরব জাতি সে সময়ে এ বিধান লঙ্ঘন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল বিধায় একে হারবুল ফিজার তথা প্রশস্ত গিরিপথের যুদ্ধ বলা হয়।
নবীজির সঙ্গে বিয়ের সময় খাদিজার বয়স
মুসলিম সমাজে এটাই প্রসিদ্ধ যে, নবীজি যখন খাদিজাকে বিয়ে করেন, তখন তাঁর বয়স ৪০ বছর ছিল এবং ৬৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
ইবনে সা'আদ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে ওয়াকিদির সূত্রে এমনই বর্ণনা করেছেন। অথচ এর বিপরীত বর্ণনাও ইতিহাসে পাওয়া যায়। এ বিষয়ে হাকিম ইবনে ইসহাকের সূত্রে স্বীয় সনদে বর্ণনা করেন, 'বিয়ের সময় খাদিজার বয়স ২৮ হয়েছিল।' তবে এ সনদেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়নি।
এর একটু পরে হাকিম হিশাম ইবনে ওরওয়ার সূত্রে উল্লেখ করেন, '৬৫ বছর বয়সে খাদিজা ইন্তেকাল করেন।' এরপর হাকিম বলেন, 'এটা দুর্বল মত। অন্যথায় আমি জানতে পেরেছি, মৃত্যুর সময় খাদিজার বয়স ৬০ হয়নি।'
বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে বর্ণনা করেন, 'আবু আবদুল্লাহ হাকিম বলেছেন, আমি আবু বকর ইবনে খায়ছামার সূত্রে পেয়েছি, ইন্তেকালের সময় তাঁর বয়স ৬৫ হয়েছিল। কিন্তু অপর বর্ণনায় ৫০ বছরের উল্লেখ পাওয়া যায়। হাকিম বলেন, এটাই সহিহ মত।'
ইবনে কাসির বলেন, 'আবু আবদুল্লাহ হাকিম এমনই বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ নবীজি ২৫ বছর বয়সে খাদিজাকে বিয়ে করেন। তখন খাদিজার বয়স ৩৫ এবং অপর এক বর্ণনামতে ২৫ ছিল।'
এ ব্যাপারে ইবনে ইসহাক দুটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। প্রথমটি হাকিম ইবনে হিজামের সূত্রে, যেখানে বিয়ের সময় খাদিজার বয়স ৪০ বলা হয়েছে। অপর বর্ণনা ইবনে আব্বাসের সূত্রে উল্লেখ করেন, যেখানে ইবনে আব্বাস বলেন, 'বিয়ের সময় খাদিজা ২৮ বছরের যুবতী ছিলেন।'
ড. আকরাম ওমরি বলেন, খাদিজার গর্ভে নবীজির দুই পুত্র ও চার কন্যাসন্তান জন্মলাভ করেন। এর দ্বারা ইবনে ইসহাকের বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা প্রকাশ পায়। কারণ, ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় খাদিজার বয়স ২৮ বলা হয়েছে। আর নারীদের সন্তান জন্ম দেওয়ার সময়সীমা এ সময়েই থাকে। এ ছাড়া সাধারণত নারীরা ৫০ বছর বয়সের আগেই সন্তানধারণের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।
জুবায়ের ইবনে বাক্কার বলেন, 'মুসা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হাসানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে আবু উবায়দা ইবনে আবদুল্লাহ ৬০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরে মুসাকে গর্ভে ধারণ করেন। অর্থাৎ মুসা হিন্দের ছেলে, স্বামী নয়। স্বামী আবদুল্লাহ ইবনে হাসান সন্তানের জন্ম দেন। আমি আমাদের বিজ্ঞজনদের বলতে শুনেছি, শুধু কুরাইশের মহিলারা ৬০ বছরের পরও সন্তান জন্মদানে সক্ষম হন এবং আরব জাতির নারী ছাড়া অন্য কোনো নারী ৫০ এর পরে সাধারণত সন্তান জন্মদানে সক্ষম থাকে না।'
এক ব্যক্তির জন্য নবীজির তিন দিন অপেক্ষা
সিরাতের গ্রন্থে প্রসিদ্ধ আছে, আবু দাউদ আবদুল্লাহ ইবনে আবু হামসার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'নবুওয়াতের আগে একদিন আমি নবীজির সঙ্গে একটি লেনদেন করি। এর কিছু অংশ আমার বাকি রয়ে যাওয়ায় নবীজিকে অপেক্ষায় রেখে তা নিয়ে আসার জন্য চলে আসি। কিন্তু এরই মধ্যে আমি তা ভুলে যাই। অথচ নবীজিকে আমি ওই স্থানে রেখে কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসার ওয়াদা করেছিলাম।
'তিন দিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর আমার তা মনে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ওখানে গিয়ে দেখি, নবীজি আমার অপেক্ষায় সেখানেই অবস্থান করছেন। আমাকে দেখে তিনি বললেন, “হে যুবক, তুমি আমাকে অনেক কষ্ট দিলে! তিন দিন যাবৎ আমি এখানে তোমার অপেক্ষা করছি।”'
এই বর্ণনায় আবু দাউদের শাইখ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া জুহালি বলেন, 'আবদুল কারিম ইবনে আবদুল্লাহর সূত্রে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।' আবু দাউদ বলেন, 'আলি ইবনে আবদুল্লাহর সূত্রেও আমি এ ঘটনা জানতে পেরেছি।'
তবে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর তাকরিব গ্রন্থে লেখেন, 'ওই ঘটনার বর্ণনাকারী আবদুল কারিম ইবনে আবদুল্লাহ অজ্ঞাত।'
তাহজিব গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে আবু হামসার জীবনী উল্লেখ করতে গিয়ে ইবনে হাজার বলেন, 'তাঁর থেকে শুধু একটি হাদিস পাওয়া যায়, যার সনদের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। আবু দাউদ এটি বর্ণনা করেছেন।'
ইমাম জাহবিও এ ঘটনা তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে সিরাতের অধ্যায়ে আবু দাউদের বরাতে উল্লেখ করেন।
হাফেজ ইরাকি বলেন, 'আবু দাউদ এটি বর্ণনা করেছেন, যার সনদের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে।'
📄 ওহী নাযিল
পাহাড়ের উচ্চতা থেকে নবীজির নিচে পড়ে যাওয়ার উপক্রম
ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থের শেষের দিকে ‘স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান’ অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদে নবীজির ওপর ওহি অবতীর্ণ হওয়ার পদ্ধতি ও সময়কাল সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। আয়েশার সূত্রে তিনি নিজ সনদে নবীজির ওপর ওহি অবতীর্ণ হওয়ার পদ্ধতি ও সময়কাল বর্ণনা করেন। অতঃপর হাদিসের শেষে তিনি বলেন, সর্বপ্রথম কয়েক ধাপে ওহি অবতীর্ণ হওয়ার পর কিছুকাল বিরতি থাকত। তখন নবীজির ওপর ওহি আসত না। ওহির বিরতিকালে নবীজি প্রচণ্ড দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়তেন। মাত্রাতিরিক্ত চিন্তার ফলে মনে হতো, তিনি যেন পাহাড়ের উচ্চতা থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছেন।
তখন নবীজি হেরা পর্বতের দিকে চলে যেতেন। পর্বতের চূড়ায় পৌঁছার পর জিবরাইল আলাইহিস সালাম দৃশ্যমান হয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। এতে নবীজি স্থির ও শান্ত হতেন এবং ঘরে ফিরে আসতেন। কিছুদিন পর যখন আবার ওহির বিরতি হতো, তখন তিনি আগের মতো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়তেন। তখন আবারও হেরা পর্বতে চলে যেতেন। জিবরাইলের সঙ্গে সাক্ষাতের পর পুনরায় তিনি শান্ত হয়ে যেতেন। এভাবে কিছুদিন কেটে যায়।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ফাতহুল বারি গ্রন্থে বলেন, 'ওই হাদিসের মূল ঘটনা উকাইল ও ইউনুসের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। আর ওহির বিরতিকালে নবীজির উপরিউক্ত অবস্থার কথা মা'মারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু গ্রন্থকার তা বুঝতে পারেননি। তিনি পুরো বর্ণনাকেই উকাইল ও ইউনুসের সূত্রে উল্লেখিত বলে ধারণা করেছেন।'
আবু নু'আইম তাঁর মুসতাখরাজে ওই হাদিসের মূল অংশটুকু বর্ণনা করেছেন। তবে মা'মারের সূত্রে অতিরিক্ত অংশ উল্লেখ করার পর তিনি এই অংশটুকু মা'মারের সূত্রে উল্লেখিত বলে স্পষ্ট করেছেন।
ইমাম আহমদ ও ইমাম মুসলিম লাইছের সঙ্গীদের সূত্রে মা'মার কর্তৃক অতিরিক্ত অংশ ছাড়া উপরিউক্ত মূল হাদিস বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম বুখারির সনদে 'আমি জানতে পেরেছি' বাক্যের বক্তা হচ্ছেন ইমাম জুহরি।
ইবনে মারদুইয়া তাঁর তাফসির গ্রন্থে মুহাম্মদ ইবনে কাসিরের সূত্রে মা'মার থেকে এ ঘটনা বর্ণনা করেন। তবে তাঁর সনদে 'আমি জানতে পেরেছি' বাক্যের উল্লেখ নেই। অতএব, পুরো হাদিসের যোগসূত্র জুহরির বর্ণনা এবং উরওয়ার সূত্রে আয়েশা থেকে সাব্যস্ত হলো।'
শাইখ আলবানি ওহির বিরতিকালে নবীজির দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিকে দুটি কারণে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, 'প্রথমত এ অতিরিক্ত অংশটুকু শুধু মা'মার বলেছেন, অন্য কেউ এটি বলেননি। দ্বিতীয়ত জুহরি থেকে 'আমি জানতে পেরেছি' বাক্যে এটি বর্ণিত হয়েছে। আর জুহরির এ জাতীয় বাক্যে বর্ণিত হাদিস মুরসাল পর্যায়ের আওতাভুক্ত।'
প্রচলিত ভুল তথ্য
ইসমাইল ইবনে আবু হাকিমের সূত্রে ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, খাদিজা বলেন, একদিন আমি নবীজিকে বললাম, 'আপনার সঙ্গী আবার যখন আসবেন, তখন তাঁকে আমি দেখতে চাই। আমি কি দেখতে পারব?' নবীজি বললেন, 'হ্যাঁ, দেখতে পারবে।' খাদিজা বললেন, 'আবার যখন তিনি আসবেন, আমাকে সংবাদ দেবেন।'
যথারীতি নির্দিষ্ট সময়ে জিবরাইল আলাইহিস সালাম নবীজির কাছে আগমন করলেন। তখন নবীজি খাদিজাকে ডেকে জিবরাইলের আগমনের সংবাদ দিলেন। খাদিজা এসে নবীজিকে বললেন, 'আপনি আমার বাম উরুর ওপর বসুন।' নবীজি উঠে এসে খাদিজার বাম উরুতে বসলেন। এরপর খাদিজা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'এখন কি আপনার সঙ্গী জিবরাইলকে দেখতে পাচ্ছেন?' উত্তরে তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি।' অতঃপর খাদিজা নবীজিকে বললেন, 'এবার আপনি আমার ডান উরুর ওপর বসুন।' নবীজি উঠে এসে খাদিজার ডান উরুতে বসলেন। এরপর খাদিজা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'এখন কি আপনার সঙ্গী জিবরাইলকে দেখতে পাচ্ছেন?' উত্তরে তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি।'
খাদিজা এরপর নবীজিকে তাঁর কোলে বসতে অনুরোধ করলেন। নবীজি তাঁর কোলে বসার পর খাদিজা তাঁকে আবারও জিজ্ঞেস করলেন, 'এখন কি আপনার সঙ্গী জিবরাইলকে দেখতে পাচ্ছেন?' উত্তরে তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি।'
তখন খাদিজা খুব আফসোস করতে করতে মাথা ও বুক থেকে ওড়না সরিয়ে নিলেন। এরপর আবারও তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'এখন কি আপনার সঙ্গী জিবরাইলকে দেখতে পাচ্ছেন?' উত্তরে নবীজি বললেন, 'না, এখন তো দেখতে পাচ্ছি না।' এবার খাদিজা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! আপনি শান্ত হোন, সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহর কসম! নিশ্চয় ইনি ফেরেশতা; শয়তান নয়।'
ইবনে ইসহাকের আরেক সূত্রে ফাতেমা বিনতে হুসাইনের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, খাদিজা বলেন, 'নবীজি আমার ও আমার ওড়নার ভেতরে প্রবেশ করলে জিবরাইল চলে যান। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! ইনি নিশ্চয় ফেরেশতা; শয়তান নয়।'
উল্লেখ্য, ইবনে ইসহাকের এ বর্ণনা কিছুটা ত্রুটিযুক্ত। কারণ ইসমাইল ইবনে আবু হাকিমের সূত্রে এ বর্ণনা ছাড়া সাহাবিদের থেকে অন্য কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। তা ছাড়া খাদিজা হিজরতের আগেই ইন্তেকাল করেন।
এ ছাড়া এ বর্ণনার অপর সূত্রটি মুরসাল (সরাসরি সাহাবির সূত্র বিচ্ছিন্ন)। কারণ এ সূত্রে নবীজির দৌহিত্র হুসাইনের কন্যা ফাতেমা রয়েছেন, যিনি তাঁর দাদি নবীকন্যা ফাতিমাকেই দেখেননি। সে ক্ষেত্রে কীভাবে তিনি খাদিজার সাক্ষাৎ পেতে পারেন!
ইমাম বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে ইবনে ইসহাকের সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
শাইখ আলবানির জয়িফ হাদিসের তালিকার ১৩তম খণ্ড প্রকাশিত হয়। সেখানে উল্লেখিত হয়েছে, আল্লামা হাইসামির বক্তব্যের পর শাইখ আলবানি বলেন, 'এর সনদ হাসান।' এরপর এ বর্ণনার দুর্বলতা প্রসঙ্গে বলেন, 'এর দুটি কারণ। প্রথমত, এর সূত্রে ইয়াহইয়া ইবনে সুলাইমান মাদিনি রয়েছেন, যিনি দুর্বল বলে পরিচিত। দ্বিতীয়ত, ইয়াহইয়ার চেয়ে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীরা এর বিরোধিতা করেছেন।'
ইমাম মুসলিম তাঁর সহিহ মুসলিম গ্রন্থে এ প্রসঙ্গেই উম্মুল মুমিনিন আয়েশার সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আয়েশা বলেন, নবীজি তাঁকে বলেছিলেন, 'তোমার গায়ে কাপড় না থাকলে জিবরাইল আমার ঘরে প্রবেশ করতে পারেন না।'
ইমাম বুখারি বর্ণনা করেন, নবীজি উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালামাকে বলেছিলেন, 'তোমরা আমাকে আয়েশার ব্যাপারে কষ্ট দিয়ো না। কারণ আল্লাহর কসম! সে ছাড়া তোমাদের অন্যদের সঙ্গে আমি একই কম্বলের নিচে শুয়ে থাকাবস্থায় আমার ওপর ওহি অবতীর্ণ হয় না'।
📄 গোপনে ইসলাম প্রচার
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, নবুওয়াত লাভের পর নবীজি গোপনে মক্কায় আপনজনদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন। এভাবে প্রায় তিন বছর চলতে থাকে। তখনো প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের বিধান আসেনি। অতঃপর তিন বছর অতিক্রান্ত হলে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন।
ইবনে ইসহাক সনদ ছাড়াই এটি বর্ণনা করেছেন। ইবনে সা'আদও মুহাম্মদ ইবনে ওমরের সূত্রে আবদুর রহমান ইবনে কাসেমের পিতার বরাতে তিন বছরের কথা উল্লেখ করেছেন।
তবে ইবনে সা'আদের সূত্রে যে মুহাম্মদ ইবনে ওমরের উল্লেখ এসেছে, তিনি মূলত ওয়াকিদি। ঐতিহাসিকেরা যাঁকে প্রত্যাখ্যাত বলেছেন। আর আবদুর রহমান ইবনে কাসেম হচ্ছেন তাবেয়ি।
ঐতিহাসিক বালাজুরি আয়েশার সূত্রে বর্ণনা করেন, নবীজি নবুওয়াতের প্রথম চার বছর গোপনে ইসলামের দাওয়াত দেন। এরপর প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেওয়া হয়।
মূলত ইসলামের প্রথম দিকে কিছুদিন গোপনে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করা হয়েছিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তা তিন বছর অব্যাহত ছিল নাকি চার বছর, এ নিয়ে মতভেদ পাওয়া যায়। অন্যথায় শরিয়তের বিধানের সঙ্গে এই সময়সীমার কোনো সম্পর্ক নেই।