📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে প্রয়োজনীয় কথা

📄 সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে প্রয়োজনীয় কথা


একটি কথা সকলকেই স্মরণে রেখে সাহাবায়ে কেরাম বা অন্যান্য যুগশ্রেষ্ঠ মনীষীদের জীবনী পাঠ করতে হবে যে, নবী করীম (সা:) এর জীবনী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যে নিয়ম-নীতি, পন্থা ও পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে, তা পৃথিবীর অন্য কোনো দ্বিতীয় ব্যক্তির ক্ষেত্রে হয়নি। সুতরাং নবী করীম (সা:) ব্যতীত অন্য কারো জীবন চরিত রচনার ক্ষেত্রে প্রকৃত সত্য আড়াল হওয়া, কোনো ঘটনা উল্লেখ না হওয়া অথবা কোনো ঘটনা সম্পর্কে অতিরঞ্জিত বর্ণনা, বিদ্বেষপ্রসূত বর্ণনা বা অতি ভক্তি-শ্রদ্ধা রঞ্জিত বর্ণনা, বর্ণনাকারীর দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাধারা, মানসিকতা কর্তৃক প্রভাবিত বর্ণনা দোষাশ্রিত হওয়াই স্বাভাবিক। যেমন হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রাহ:) এর জীবনী গ্রন্থগুলোয় এমন সব ঘটনাবলীর উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়, যা পাঠ করলে মনে হবে যে, তাঁর ক্ষমতা ও মর্যাদা আল্লাহর রাসূলের থেকেও অনেক অনেক বেশি ছিলো (নাউযুবিল্লাহ)। আসলে অতিভক্তির কারণেই এ ধরনের অতিরঞ্জিত ঘটনাবলীর জন্ম দেয়া হয়েছে।

দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, ১৮৫৭ সালে সংঘটিত সিপাহী বিপ্লবের ইতিহাস, তারও পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের ইতিহাস, বালাকোটের ইতিহাস, পাকিস্থান প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং নিকট অতীতে ১৯৭১ সনে বাংলাদেশ জন্ম নেয়ার ইতিহাস সম্পর্কে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, যিনি যে দৃষ্টিভঙ্গি, নীতি-আদর্শ ও চিন্তাধারার অনুসারী ছিলেন, তিনি সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই ইতিহাস রচনা করেছেন। কোথাও প্রকৃত সত্যকে আড়াল করা হয়েছে, কোথাও ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে আবার কোথাও মন-মস্তিষ্কপ্রসূত কাহিনী সংযোজন করা হয়েছে। অধিকাংশ ইতিহাস পক্ষপাত দোষাশ্রিত এবং বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত। সুতরাং দুই ধরনের বর্ণনা সম্বলিত রচিত ইতিহাস পাঠ করে কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তি বা ঘটনা সম্পর্কে মন্তব্য করা বড়ই কঠিন। এ জন্য সমগ্র ইতিহাস পাঠ করে প্রকৃত সত্য অনুধাবন করতে হবে এবং মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যে সত্য আড়াল করা হয়েছে, তা উদ্ঘাটন করার চেষ্টা করতে হবে।

আল্লাহর রাসূলের সাহাবায়ে কেরাম শুধু মুসলিম উম্মাহরই নয়, সমগ্র মানব জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। এ ব্যাপারে বিখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) থেকে বর্ণনা করা হয়েছে-

مَنْ كَانَ مُسْتَنَّا فَلْيَسْتَنَّا بِمَنْ قَدْ مَاتَ فَإِنَّ الْحَيَّ لَا تُؤْمَنُ عَلَيْهِ الْفِتْنَةُ أُولئِكَ أَصْحَابُ مُحَمَّد صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانُوْا أَفْضَلُ هذه الأُمَّةِ أَبَرَّهَا قُلُوبًا وَ أَعْمَقَهَا عِلْمًا وَّ أَقَلُّهَا تَكَلُّفًا إِخْتَارَ هُمُ اللهُ لِصُحْبَةِ نَبِيِّهِ وَلِإِقَامَةِ دِيْنِهِ فَاعْرِفُوْا لَهُمْ فَضْلَهُمْ وَاتَّبِعُوْا هُمْ عَلَى أَثَرِهِمْ وَتَمَسَّكُوا بِمَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ أَخْلَاقِهِمْ وَسِيَرِ هِمْ فَإِنَّهُمْ عَلَى الْهُدَى الْمُسْتَقِيمِ

অর্থাৎ যে ব্যক্তি সুন্নাতের পূর্ণাঙ্গ অনুসারী হতে আগ্রহী, তার উচিত এমন ব্যক্তির সুন্নাত ধারণ করা যিনি ইন্তেকাল করেছেন। কারণ যে ব্যক্তি জীবিত সে যে ভবিষ্যতে ফিত্নায় নিপতিত হবে না, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। আর সেই ইন্তেকাল করা লোকগুলো হচ্ছেন মুহাম্মদ (সা:) এর সাহাবায়ে কেরাম। তাঁরা ছিলেন এই উম্মতের সর্বোত্তম চরিত্রবান লোক। তাঁদের হৃদয় ছিলো সমধিক পূণ্যময়-আলোক উজ্জ্বল এবং গভীরতম জ্ঞান সম্পন্ন। তাঁদের মধ্যে কেনো কৃত্রিমতা ছিলো না। মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁদেরকে বাছাই করেছিলেন তাঁর নবীর সাহাবী হিসেবে এবং তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। অতএব তোমরা তাঁদের সঠিক মর্যাদা অনুধাবন করো, স্বীকার করো, তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করো এবং তাঁদের চরিত্র ও স্বভাবের যতদূর সম্ভব তোমরা গ্রহণ করো। কারণ তাঁরা ছিলেন সঠিক ও সুদৃঢ় হেদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। (মিশকাতুল মাসাবীহ)

তাঁদেরকে অনুসরণ করে কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবমণ্ডলী কৃতকার্যতা ও সফলতার পথে এগিয়ে যাবে। আল্লাহ তা'য়ালা যেমন তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন, অনুরূপভাবে তাঁদেরকে যারা একনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করে এই পৃথিবীতে জীবন পরিচালিত করবে, তাদের প্রতিও আল্লাহ তা'য়ালা সন্তুষ্ট হবেন। আল্লাহর রাসূলের সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন শীশাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ। কুরআন মাজীদে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন-

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الَّذِيْنَ يُقَاتِلُوْنَ فِي سَبِيْلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُمْ بُنْيَانٌ مَّرْصُوصٌ -

আল্লাহ তা'য়ালা তাদেও (বেশি) পছন্দ করেন যারা তাঁর পথে এমনভাবে সারিবদ্ধ হয়ে লড়াই কওে, যেন তারা এক শীশাঢালা সুদৃঢ় প্রাচীর। (সূরা আস্ সফ-৪)

আল্লাহর রাসূলের সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন কুরআনের এই আয়াতের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। আকীদা-বিশ্বাস এবং উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে পূর্ণ ঐকমত্য ছিলো। তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক নিষ্ঠা, আস্থা ও ঐকান্তিকতা পূর্ণমাত্রায় ছিলো। নৈতিক চরিত্রের সর্বোন্নত মান তাঁদের সকলের মধ্যে সক্রিয় ছিলো এবং উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের প্রতি তাঁদের সকলের ঐকান্তিক অনুরাগ ছিলো। এভাবে তাঁরা ছিলেন শীশাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ, ফলে তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিলো আল্লাহর রাসূলের নেতৃত্বে একটি যুগান্তকারী পৃথিবী কাঁপানো ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটানো। তাঁদের ঈমান-আকীদা, ঐক্য ও শক্তির সম্মুখে তাঁদের শত্রুরা প্রত্যক্ষ মোকাবিলায় নাস্তানাবুদ হতে বাধ্য হয়েছিলো। তাঁরা সংখ্যায় মাত্র তিন হাজার হচ্ছে এক লক্ষ রোমান সৈন্যের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছেন। একের পর এক এলাকা বিজয় করে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত করে মজলুম জনতার মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। শক্তিধর স্বৈরাচারীর তত্ত্বে তাউস ভেঙে খান্ খান্ করে দিয়েছেন। তদানীন্তন দুই পরাশক্তি রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের শাসকদের গগনচুম্বী অহঙ্কার ভেঙে ধূলিস্মাৎ করে দিয়েছেন।

আল্লাহর রাসূলের পবিত্র হাতে গড়া মুসলমানদের এই অগ্রযাত্রার কারণে মানবতার দুশমন ইয়াহুদী-নাসারা ও মুশরিকদের নিভু নিভু প্রদীপের শেষ আলোটুকুও নির্বাপিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিলো এবং তাদের পায়ের নীচের মাটি সরে গিয়েছিলো। মুসলমানদের অগ্রযাত্রার মধ্যে তারা নিজের মৃত্যুদূত দেখতে পেয়ে অন্ধকার কুঠুরীতে বসে তারা ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে দিলো। মুসলমানদের ঐক্যে ফাটল ধরানোর ঘৃণ্য দায়িত্ব অর্পিত হলো আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নামক জনৈক ইয়াহুদীর প্রতি। এই কুচক্রী লোকটি তার সঙ্গী-সাথীসহ ইসলামের তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান (রা:) এর কাছে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণের প্রহসন করলো এবং মুসলিম সমাজে প্রবেশ করে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদের সূচনা করলো। নবী করীম (সা:) যা বলেননি এই লোকটি সেসব কথা আল্লাহর রাসূলের নামে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা শুরু করলো। জাল হাদীস রচনা করার মূল হোতাই এই আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নামক অভিশপ্ত লোকটি।

এরপরের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক- মুসলমানদের কলিজায় রক্তক্ষরণের ইতিহাস। জাল হাদীসের সূত্র ধরে মুসলমানদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি হলো। ষড়যন্ত্রকারীরা ইরাকের বসরা, কুফা ও মিসরে ঘাঁটি গেড়ে মুসলিম জাহানের সকল স্থানে ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে দিলো। তাদের ষড়যন্ত্রের কালোহাত ক্রমশ পবিত্র ভূমি মদীনার দিকে অগ্রসর হলো। মক্কা বিজয়ের পরে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, নবী করীম (সা:) এর পবিত্র সান্নিধ্য ও প্রশিক্ষণ দ্বারা তাদের মধ্যে অধিকাংশেরই উপকৃত হওয়ার সুযোগ খুব কম হয়েছে। এরপরও ছিলো তোলাকা বংশের লোকজন, যারা শেষ পর্যন্ত আল্লাহর রাসূলের সাথে বিরোধিতায় লিপ্ত ছিলো। মক্কা বিজয়ের পরে তারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলো বটে, কিন্তু আল্লাহর রাসূলের কাছ থেকে প্রত্যক্ষভাবে ঈমানের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার সুযোগ তাদের ভাগ্যে জোটেনি।

রাসূলের ইন্তেকালের পরে হযরত আবু বকর (রা:) এর খিলাফতের সময় মক্কা বিজয়ের পরে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকেই প্রথমে যাকাত দিতে অস্বীকার করে এবং পরবর্তীতে ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিলো। অপরদিকে মুসায়লামাহ্ নামক এক অভিশপ্ত লোক নিজেকে নবী হিসাবে দাবি করলো। এসব মুরতাদদের সাথে মুসলমানরা যুদ্ধ করতে বাধ্য হলো এবং মুসায়লামাহ্ কাজ্জাবসহ তার দলের অনেকেই মুসলমানদের হাতে নিহত হলো। অপরদিকে ইয়াহুদীদের আদি আবাস ভূমি ছিলো মদীনা। আল্লাহর রাসূলের সাথে বার বার বিশ্বাসঘাতকতা করার কারণে মদীনা থেকে তাদেরকে বহিষ্কৃত হতে হয়। এই ইয়াহুদী গোষ্ঠী আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে গোপনে সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছিলো। এ ধরনের নানাবিধ বিষে মুসলিম সমাজ আক্রান্ত হয়েছিলো ফলে সমগ্র মুসলিম জাহান এক তরিৎ গতিতে বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো।

মক্কা বিজয়ের পরে ইসলাম গ্রহণকারী রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকরা আঁতাত করে মুসলিম সাম্রাজ্যে এক ঘোলাটে পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছিলো। অবশেষে সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিষ্ফোরিত হলো হযরত উসমান (রা:) এর শাহাদাতবরণের মাধ্যমে। তৃতীয় খলীফার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বিশ্বাসঘাতকরা ষড়যন্ত্র নামক বিষবৃক্ষের গোড়ায় পানি সিঞ্চন করতে থাকলো। পরিণতিতে মুসলমানদের আত্মকলহের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটলো জামাল ও সিফফিন যুদ্ধের মাধ্যমে। ভাই কর্তৃক আরেক ভাইয়ের হাত রক্তে রঞ্জিত করে ছাড়লো ষড়যন্ত্রকারীর দল। মুসলিম জাহানে বিভেদ রেখা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে দেখা দিলো। ষড়যন্ত্রের আগুনে জ্বলতে থাকলো মুসলিম জাহান। এরই ধারাবাহিকতায় চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রা:) ও শাহাদাতবরণ করলেন। মুসলমানদের পতনের যে সূচনা ঘটেছিলো, কারবালার লোমহর্ষক- করুণ ঘটনার মধ্য দিয়ে তা যেনো পূর্ণতা লাভ করলো।

এরপর ষড়যন্ত্রকারী ও বিশ্বাসঘাতকদের দল ইসলামের দরদী সেজে মুসলমানদের মধ্যে কয়েকটি দল ও উপদলের সূচনা করলো, কোনো কোনো দল হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহুর প্রতি অতিভক্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত খলীফাতুর রাসূল হযরত আবু বকর, খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমার, হযরত উসমান ও হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহুম আজমাঈনসহ অপরাপর বহু সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে মিথ্যাশ্রিত তথ্য ও তত্ত্বে অবতারণা ঘটিয়ে তাঁদেরকে ঐতিহাসিকভাবে কলঙ্কিত করার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করলো।

এবার সামনে এলো ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাস রচনার পালা। কারবালার নিষ্ঠুর নিদারুণ ঘটনার মধ্য দিয়েই ষড়যন্ত্রের যবনিকাপাত ঘটলো না। ষড়যন্ত্রকারীরা আল্লাহর রাসূলের পবিত্র সাহাবায়ে কেরামের ইতিহাস এমন সুচতুরভাবে কালিমা লিপ্ত করার অপপ্রয়াস গ্রহণ করলো যে, কিয়ামত পর্যন্ত যেনো মুসলিম মিল্লাত সাহাবায়ে কেরামের ইতিহাস নিয়ে আত্মকলহে লিপ্ত থাকে। মুসলিম মিল্লাত যেসব মর্যাদাবান বুযুর্গ ব্যক্তিদের অনুসরণ করে মহাসত্যের পথে তথা কৃতকার্যতা ও সাফল্যের পথে অগ্রসর হবে, সেসব বুযুর্গ ব্যক্তিদের বিতর্কিত করার অপচেষ্টা করলো। যারা বদর, ওহুদ, খন্দক, ইয়ারমুক, হুনাইন ইত্যাদী রণক্ষেত্রে পরস্পরে কাঁধ মিলিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে ইসলাম বিরোধিদের সাথে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করার নিয়তে একদিন যুদ্ধ করেছিলো, কালের আবর্তনে ষড়যন্ত্রকারীদের কূটকৌশলে তাঁরাই পরস্পরের রক্ত পিপাসু হয়ে উঠলো। যাদের ষড়যন্ত্রে সাহাবায়ে কেরামের ইস্পাত কঠিন ঐক্যে ফাটল ধরলো, এক ভাইয়ের হাত অন্য ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হলো, তারাই আবার সাধু সেজে প্রতিযোগিতামূলকভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাস রচনায় কোমর বেঁধে নেমে পড়লো। ষড়যন্ত্রকারীরা ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে মহাসত্যের ধারক-বাহক, মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সিপাহসালার, আমানতদার ও বিশ্বস্ত সাহাবায়ে কেরামের সূর্য-উজ্জ্বল পৃষ্ঠদেশে মসীলিপ্ত করলো। সত্যাশ্রয়ীকে বানালো মিথ্যাশ্রয়ী, আমানতদারকে বানালো খিয়ানতকারী, অহিংসকে বানালো হিংসুক, দয়ালুকে বানালো নিষ্ঠুর, পরস্বার্থ রক্ষাকারীকে বানালো পরস্বার্থ হরণকারী, জাগতিক সহায়-সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতি মোহমুক্ত নির্লোভীকে বানালো ক্ষমতালোভী, সহজ-সরল ও স্বচ্ছ হৃদয়ের অধিকারীকে বানালো কূটকৌশলের অধিকারী ও সোজা পথের পথিককে বানালো বক্র পথের যাত্রী। এভাবে ষড়যন্ত্রকারী বিশ্বাসঘাতকরা এমন ইতিহাস রচনা করলো, যেনো পৃথিবীর অনাগত মানবমণ্ডলী সাহাবায়ে কেরামের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের প্রতি সন্দিহান হয়ে ওঠে।

আরেক শ্রেণীর ঐতিহাসিক, নবী পরিবারের প্রতি অতিমাত্রায় আবেগ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে গিয়ে এমন ইতিহাস রচনা করলো যে, যা হয়ে পড়লো সম্পূর্ণ একপেশে। কেউ আবার আবেগ নির্ভর শব্দ সংযোজন করে ইতিহাস রচনা করে সম্পূর্ণ ইতিহাস গ্রন্থটিই আবেগ নির্ভর করে তুললো। এভাবে কোনো সাহাবীর প্রতি অতিমাত্রায় ভক্তি, কোনো সাহাবীর প্রতি মনের কোণে বিদ্বেষ লালিত করে এমনভাবে ইতিহাস রচনা করা হলো যে, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া পরবর্তী লোকদের জন্য চরম কঠিন হয়ে পড়লো।

বর্তমানে একবিশং শতাব্দীর কয়েকটি ঘটনার দিকে নিরপেক্ষভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে বিষয়টি অনুধাবন করা সহজ হবে। আমেরিকা আফগানিস্থান ও ইরাকে মুসলমানদের রক্তস্রোত বইয়ে দিয়ে দেশ দু'টো দখল করলো। এই দেশ দু'টো দখল করার পূর্বে তারা একটি হাস্যকর প্রেক্ষাপট রচনা করে দেশ দু'টোর উপরে হামলে পড়লো। কালের আবর্তনে একদিন আফগানিস্থান ও ইরাকের ইতিহাস রচিত হবে। এই দেশ দু'টো দখল করার ব্যাপারে আগ্রাসী আমেরিকার সমর্থক যারা-তারা লিখবে, 'এই দেশ দু'টোর শাসক গোষ্ঠী ছিলো সন্ত্রাসের সমর্থক। আল কায়েদা নামক সন্ত্রাসী দলকে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে আমেরিকার টুইনটাওয়ার ধ্বংস করিয়েছে, বিশেষ করে ইরাকের শাসক ছিলো মানবতা ও গণতন্ত্রের দুশমন। ইরাকের শাসক গোষ্ঠী মানবতা বিধ্বংসী অস্ত্র আবিষ্কার করে পৃথিবীকে বিপন্ন করে তুলেছিলো। এ কারণে মানবতার বন্ধু আমেরিকা তার সমর্থকদের সহযোগিতায় দেশ দু'টোয় আক্রমণ করে সন্ত্রাসী দলকে ধ্বংস করে পৃথিবীকে বিপদ মুক্ত করেছে'।

অপরদিকে আমেরিকা-বৃটেন ও ইসরাঈলের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের বিরোধিদের মধ্যে যারা আফগানিস্থান ও ইরাকে আমেরিকার আগ্রাসন সম্পর্কে ইতিহাস রচনা করবে- তারা লিখবে, 'একবিংশ শতাব্দীর জঘণ্যতম স্বৈরাচার, মানবতার দুশমন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বুশ- যে লোকটিই সর্বপ্রথম আমেরিকার ইতিহাসে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে, তিনি অভিশপ্ত ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের নামে ইসলাম ও মুসলমানদের ধ্বংস করে তাদের তেল সম্পদসহ অন্যান্য সম্পদ নিজেদের কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে নিজেরাই আমেরিকার টুইনটাওয়ার ধ্বংস করে মুসলমানদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে স্বাধীন দু'টো মুসলিম দেশ আফগানিস্থান ও ইরাকে যুদ্ধের নামে ধ্বংস যজ্ঞ চালিয়ে দেশ দু'টো দখল করে পরাধীনতার জিঞ্জির পরিয়ে দিয়েছে'।

উল্লেখিত এই দু'ধরনের ইতিহাস রচনা ব্যতীতও নানাজনে নানা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ইতিহাস রচনা করবে এবং আগামী কয়েক শতাব্দী পরের লোকজন যখন এসব ইতিহাস পড়বে, তখন তাদের পক্ষে প্রকৃত সত্য খুঁজে বের করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। এটাই যদি হয় বাস্তবতা এবং প্রকৃত সত্য, তাহলে চৌদ্দশত বছর পূর্বে ষড়যন্ত্রকারী ও বিশ্বাসঘাতকদের কূটকৌশলের কারণে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যে দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছিলো এবং পরবর্তীতে ষড়যন্ত্রকারী ও বিশ্বাসঘাতকরাসহ নানাজনে এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে ইতিহাস রচনা করলো, সেসব ইতিহাস পাঠ করে কি করে একজন সাহাবী সম্পর্কেও বিরূপ মন্তব্য করা যেতে পারে?

সাহাবায়ে কেরামের জীবনী রচনা ও তাঁদের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে যদিও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়, তারপরেও হাদীস গবেষক ও বিশারদ মুহাদ্দিসগণ হাদীস বর্ণনার সনদমূলক ইতিহাস যাচাই করতে গিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছেন যে, আল্লাহর রাসূলের সাহাবায়ে কেরাম হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে পরিপূর্ণ বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছেন। এ কথা সম্পূর্ণ সত্য ও স্পষ্ট যে, পরম সম্মানিত ও মর্যাদাবান সাহাবায়ে কেরাম নবী-রাসূলদের পর সর্বোত্তম সৃষ্ট মাখলুক ছিলেন- নবী-রাসূলদের পরেই তাঁরা ছিলেন মানব জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। পক্ষান্তরে তাঁরা মানবীয় বৈশিষ্টের ঊর্ধ্বেও ছিলেন না।

নবী করীম (সা:) এর অনুপম সাহচর্য, আদর্শ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হওয়ার পরও তাঁদের দ্বারা ভুল-ভ্রান্তি সংঘটিত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু ছিলো না। সুতরাং আল্লাহ তা'য়ালার ইচ্ছা ও কৌশলের এ বিষয়ের স্বাভাবিক দাবী ছিলো এবং আল্লাহর রাসূলেরও একান্ত আকাঙ্খা ছিলো যে, তাঁর সাহাবায়ে কেরামের জীবন চরিত্র থেকে অন্তত: একটি ভুলের চির অবসান হওয়া উচিত, সেই ভুলটি হলো- তাঁর কোনো সাহাবী যেনো ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর ব্যাপারে কোনো মিথ্যা কথা সম্পৃক্ত না করেন। অন্য কোনো ভুল-ভ্রান্তির প্রভাব তো এক ব্যক্তি অথবা কতিপয় ব্যক্তি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

কিন্তু সাহাবায়ে কেরামের ভুল হাদীস বর্ণনার কারণে ইসলামের সমগ্র ইমারতই সন্দেহযুক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা বিদ্যমান ছিলো। এই আশঙ্কা রোধ করা ও অবসানের লক্ষ্যে আল্লাহর রাসূল সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি তাঁর সাহাবায়ে কেরামকে সম্বোধন করে বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আমার ওপর ইচ্ছা করে মিথ্যা আরোপ করবে সে যেন তার জন্য আগুনের আসন ঠিক করে রাখে'। (বুখারী-কিতাবুল ইল্ম)

عَنْ عَبْدِ الْعَزِيزِ قَالَ أَنَسٌ أَنَّهُ لَيَمْنَعُنِي أَنْ أُحَدِّثُكُمْ حَدِيثًا كَثِيرًا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ تَعَمَّدَ عَلَى كَذِبًا فَلْيَتَبَوَّا مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ -

হযরত আব্দুল আযীয (রাহঃ) বর্ণনা করেন, হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, আমাকে তোমাদের কাছে বেশি হাদীস বর্ণনা করতে বাধা দেয় নবী করীম (সাঃ) এর একটি বাণী, যে ব্যক্তি আমার ওপর ইচ্ছা করে মিথ্যা আরোপ করবে সে যেন তার জন্য আগুনের আসন ঠিক করে রাখে'। (বুখারী-কিতাবুল ইল্ম)

رِبْعِي بْنِ حَرَاشٍ يَقُوْلُ سَمِعْتُ عَلِيًّا يَقُوْلُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا تَكْذِبُوا عَلَيَّ فَإِنَّهُ مَنْ كَذَبَ عَلَى فَلْيَلِجِ النَّارَ -

হযরত রিবঈ ইবনে হারাশ (রাঃ) বলতেন যে, তিনি আলী (রাঃ) কে বলতে শুনেছেন, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, তোমরা আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করো না, কারণ যে ব্যক্তি আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করবে তাকে (জাহান্নামের) আগুনে প্রবেশ করতে হবে। (বুখারী- কিতাবুল ইলম)

عَبْدُ اللهِ بْنُ الزُّبَيْرِ قَالَ قُلْتُ الزُّبَيْرِ إِنِّي لَا أَسْمَعُكَ تُحَدِّثُ عَنْ رَّسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَمَا يُحَدِّثُ فُلاَنٌ وَفُلاَنٌ قَالَ أَمَا إِنِّي لَمْ أُفَارِقْهُ وَلَكِنْ سَمِعْتُهُ يَقُوْلُ مَنْ كَذَبَ عَلَى فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ -

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ) বলেন, আমি (নিজ পিতা) যুবাইরকে বললাম, অমুক অমুক লোক যেমন হাদীস বর্ণনা করে, আপনাকে তো আমি রাসূলূল্লাহ (সাঃ) থেকে তেমন হাদীস বর্ণনা করতে শুনি না। তিনি বললেন, দেখো, আমি তাঁর (ঘনিষ্ঠতা) থেকে বিচ্ছিন্ন হইনি। (সুতরাং হাদীস তো আমি জানি) কিন্তু তাঁকে (রাসূল স. কে) বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করবে তাকে তার আসন আগুনের বানাতে হবে। (বুখারী, কিতাবুল ইলম)

عَنْ سَلَمَةَ هُوَ إِبْنُ الأَكْوَعِ قَالَ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ مَنْ يَقُلُ عَلَى مَالَمْ أَقُلْ فَلْيَتَبَوَّ أَمَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ -

দুই শতেরও অধিক সাহাবী আল্লাহর রাসূলের উল্লেখিত হাদীসসমূহ বর্ণনা করেছেন। এমনকি মুহাদ্দিসগণ বর্ণনা করেছেন যে, অন্য কোনো হাদীস এসব হাদীসের বর্ণনার ধারাবাহিকতার সীমায় পৌঁছতে পারেনি। নবী করীম (সা:) এর কোনো হাদীস বর্ণনা করার সময় অধিকাংশ সাহাবী এসব হাদীস শুনাতেন এবং সে সময় আল্লাহ তা'য়ালার ভয়ে তাঁদের চেহারা বিবর্ণ হয়ে যেতো ও দেহ রোমাঞ্চিত হতো। কি জানি, হঠাৎ করে মুখ থেকে যদি কোনো ভুল কথা বের হয়ে যায়, এই ভয়ে অনেক সাহাবী অধিক হাদীস বর্ণনা করা থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখতেন। মুহাদ্দিসগণও এসব হাদীস অধিক বর্ণনা করতেন এবং অনেকে এ হাদীসসমূহ দিয়েই তাঁদের বর্ণনাধারার সূচনা করতেন। এরপর অত্যন্ত সতর্কতা সহকারে হাদীস বর্ণনা করার পর বলতেন-

أَوْ كَمَا قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم

'অথবা নবী করীম (সা:) যেমন বলেছেন'। যেনো অজ্ঞতার কারণে জাহান্নামের শাস্তির যোগ্য হতে না হয়।

এ ব্যাপারে শুধুমাত্র একটি হাদীস নয় বরং অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। বুখারীর কিতাবুল জানায়েয এবং অন্যান্য হাদীস গ্রন্থাবলীতে হযরত মুগীরা ইবনে শু'বা (রা:) প্রমুখ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম (সা:) বলেছেন, 'আমার সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলা অন্য কারো সম্পর্কে মিথ্যা বলা সমপর্যায়ের নয়। যে ব্যক্তি আমার সম্পর্কে মিথ্যা রটনা করলো সে যেনো জাহান্নামকেই তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়'। হযরত আলী (রা:) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম (সা:) বলেছেন, 'আমার প্রতি মিথ্যা কথা সম্পৃক্ত করো না, যে ব্যক্তি আমার সম্পর্কে মিথ্যা রটনার আশ্রয় গ্রহণ করবে, তার জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়া অধারিত'। (বুখারী-কিতাবুল ইল্ম)

কুরাইশে ওয়াসেলী (রা:) থেকে বর্ণিত নবী করীম (সা:) বলেন-
إِنَّ مِنْ أَعْظَمِ الْفَرِى أَنْ يَقُوْلَ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا لَمْ يَقُلْ

সবথেকে বড় মিথ্যা ও জঘণ্যতম রটনা হলো, নবী করীম (সা:) যা বলেননি সে কথা তাঁর সাথে সম্পৃক্ত করা। (বুখারী-কিতাবুল মানাকেব)

হযরত আবু মুসা (রা:) বলেন, 'আমাদের প্রতি নবী করীম (সা:) এর শেষ ওসিয়ত ছিলো, যারা আমার হাদীস ভালোবাসবে তাদের সাথে খুব শীঘ্রই তোমাদের পরিচয় ঘটবে। আমি বলিনি এমন কথা যে ব্যক্তি আমার সাথে সম্পৃক্ত করে প্রচার করবে আমার দিকে সম্বোধন করে বলবে তার ঠিকানা অবশ্যই জাহান্নামে'। প্রায় হাদীস গ্রন্থসমূহেই এই বিষয়ের ওপরে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রাসূলের এই ধরনের অসামান্য সতর্কতা ও কঠোর শাস্তিমূলক সতর্কবাণীর কারণে সাহাবায়ে কেরামদের হৃদয় থেকে আল্লাহর রাসূলের বলা কথার সাথে মাত্র একটি অক্ষরও নিজেদের পক্ষ থেকে সম্পৃক্ত করার প্রবণতা এমনভাবে দূরীভূত হয়েছিলো যে, সমগ্র সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে একজন সাহাবীও আল্লাহর নবীর কথার সাথে নিজের পক্ষ থেকে একটি মাত্র কথাও সম্পৃক্ত করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

হযরত আলী (রা:) বর্ণনা করেন, 'আল্লাহ তা'য়ালার শপথ! আল্লাহর রাসূলের প্রতি মিথ্যা কথা সম্পৃক্ত করা অপেক্ষা আকাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া আমার জন্য অধিকতর সহজ বিষয়'। (বুখারী)

হযরত ওয়াকী সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে হযরত আমাশের একটি কথা এভাবে বর্ণনা করেছেন, 'সাহাবায়ে কেরামের প্রত্যেকের অবস্থা এমন ছিলো যে, নবী করীম (সা:) এর কথায় ওয়া, আলিফ বা দাল ধরনের একটি অক্ষরও নিজেদের পক্ষ থেকে সংযুক্ত করে দেয়ার থেকে আকাশ থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে যাওয়াকে তাঁরা প্রাধান্য দিতেন'। যে মুয়াবিয়া (রা:) সম্পর্কে ইতিহাসে নানা ধরনের আপত্তিকর বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া (রাহঃ) মিনহাজুস সুন্নাহ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে উল্লেখ করেছেন, 'আমীর মুয়াবিয়া (রা:) মদীনার মিম্বারে দাঁড়িয়ে যে হাদীস বর্ণনা করেছেন সে হাদীসও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হতো এবং বলা হতো, হাদীস বর্ণনা করার ব্যাপারে তাঁকে সামান্যতম অভিযুক্তও করা যায় না'।

এ জন্য মুহাদ্দিসগণ সাহাবায়ে কেরামের পরবর্তী বর্ণনাকারীদের বর্ণনা যখন বিশ্বস্ত সূত্রে সাহাবায়ে কেরামের বর্ণনা বলে যথার্থ প্রমাণ পেয়েছেন, তখন সাহাবায়ে কেরামদের বর্ণনা গ্রহণ করতে তাঁরা কোনো সন্দেহে জড়িয়ে পড়েননি। কারণ, গবেষক ও মুহাদ্দিসগণের মতে সাহাবায়ে কেরাম সম্পূর্ণরূপে বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী। সুতরাং প্রাচীন ঐতিহাসিকদের মতবিরোধপূর্ণ সকল ইতিহাসের আলোকে সার্বিক বিবেচনায় এ কথা দৃঢ়তার সাথে বলা যেতে পারে যে, হযরত মুয়াবিয়া ও হযরত আমর ইবনুল আ'স (রা:) এর অথবা অন্য কোনো সাহাবীর ব্যাপারে যেসব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয় এবং সে সকল বর্ণনা ত্রুটিমুক্ত নয়। এ ধরনের ইতিহাস কোনোক্রমেই যেমন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না এবং এসব ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে সে সকল সম্মানিত সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে সামান্যতম আপত্তিকর মন্তব্যও করা যেতে পারে না।

কারণ ইতিহাসে দেখা যায়, একই ঘটনা বিভিন্ন সূত্রে নানাভাবে বর্ণিত হয়েছে। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঐতিহাসিক ঘটনাবলীতে জড়তা, স্থবিরতা, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সন্দেহের অবতারণা ঘটেছে। আর এ কারনেই ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনার ক্ষেত্রে অসতর্কতা বশতঃ কোনো কোনো উচ্চস্তরের জ্ঞানী-গুণী গবেষক, সমালোচক তথা পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গও ঐতিহাসিক ভুলের শিকার হয়েছেন। সুতরাং এ কথা স্বীকার করতে মোটেও দ্বিধা করার কারণ থাকতে পারে না যে, এ ধরনের ভুল যারাই করেছেন, তাঁদের ভুলকে শ্রদ্ধার সাথে ভুল বলেই স্বীকার করতে হবে। এ ধরনের ভ্রান্ত ও অস্বচ্ছ ইতিহাস যখন কোনো পণ্ডিত ব্যক্তিদের লেখনী যন্ত্রে ফুটে ওঠে, তখন অন্যান্যদেরকে এ কথা অনুধাবন করতে হবে যে, উক্ত পণ্ডিত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ লেখনী বা বর্ণনার ক্ষেত্রে তদানীন্তন কালের ঘটনাবলীর ইতিহাসকে সঠিক ইতিহাস বলে বুঝতে গিয়ে ঐতিহাসিক ভুলের শিকার হয়েছেন- বিষয়টি এমনও হতে পারে।

পক্ষান্তরে এই ধরনের ঐতিহাসিক ভুল বুঝাবুঝি অথবা ঐতিহাসিক ভুলের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে নবী করীম (সা:) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রতি ঈমানদার হিসাবে হৃদয়ের স্বাভাবিক অদম্য আকর্ষণ জনিত স্পর্শকাতর প্রশ্নটি ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। সিফফিন যুদ্ধে হযরত আলী (রা:) এর খিলাফত বিভক্ত হওয়া, হযরত মুয়াবিয়া (রা:) কর্তৃক তাঁর সন্তান ইয়াযীদের ক্ষমতারোহণ, কারবালার মর্মস্পর্শী লোমহর্ষক ঘটনা সংঘটিত হওয়া, ইয়াযীদ কর্তৃক হাব্রা-এর মর্মান্তিক ঘটনা সংঘটিত হওয়া এবং তার প্রেরিত চার হাজার সৈন্যবাহিনীর দ্বারা পবিত্র মদীনার অধিবাসীদের ওপর নির্মম নিষ্ঠুর নির্যাতন অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘটনা অধিকাংশ মুসলমানদের হৃদয়ের কোমল কোণে স্পর্শ করে হৃদয় জগতকে আলোড়িত করাই স্বাভাবিক। নবী করীম (সা:) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রতি হৃদয়ের স্বাভাবিক ভালোবাসার প্রশ্নে ইতিহাসের এই স্পর্শকাতর কালো অধ্যায়টিতে উপনীত হয়ে বহু উচ্চস্তরের গবেষক, আলোচক-সমালোচক ও পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গও তাঁদের আলোচনা-সমালোচনা ও লেখনীতে ভারসাম্য রক্ষা করতে সক্ষম হননি।

আল্লাহর রাসূলের অবর্তমানে ইতিহাসের এই অধ্যায়ে উপনীত হয়ে কোনো একক ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা বাস্তবতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাছাড়া এই স্পর্শকাতর ঐতিহাসিক অধ্যায়ে যে সকল উচ্চস্তরের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ঐতিহাসিক ভুলের শিকার হয়েছেন- তাঁরা যদিও ভুলের শিকার হয়েছেন, তবুও তাঁদের এই ভুল নবী করীম (সা:) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রতি ঈমানী ভালোবাসার কারণে 'ভারসাম্যহীনতা' বলে আখ্যায়িত করাই সর্বাধিক বিবেচনার বিষয় বলে পরিগণিত করা যেতে পারে।

আমার উল্লেখিত এই কথাকে কেউ যদি ভুলকে বিশুদ্ধ করার ব্যাপারে আমার পক্ষ থেকে ওকালতী হিসাবে গণ্য করেন, তাহলে আমার প্রতি অবিচার করা হবে। কারণ এটা হলো মুসলিম উম্মাহর পারস্পরিক আলোচনা-সমালোচনার ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার ফতোয়াগত একটি সর্বজন স্বীকৃত মূলনীতির ব্যাপার।

পক্ষান্তরে উল্লেখিত এই মূলনীতিটি সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। প্রযোজ্য হবে শুধুমাত্র সেই ক্ষেত্রে- যে ক্ষেত্রে অভক্তি, বিদ্রোহ তথা ইলহাদের অনুপস্থিতির কারণে উল্লেখিত মূলনীতি অবলম্বন করা শরীয়াতের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে। তবে মূল বিষয়টিতে যেহেতু উভয়পক্ষে সম্মানিত ও মর্যাদাবান সাহাবায়ে কেরাম যুক্ত রয়েছেন, সুতরাং তাঁদের আলোচনা-সমালোচনা ও পর্যালোচনায় ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অবলম্বন করা শুধু নিরাপদই নয়- বরং এটাই হবে ইনসাফপূর্ণ নীতি।

অতএব আল্লাহর রাসূলের সম্মানিত সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে রচিত বিদ্বেষপূর্ণ ও সন্দেহযুক্ত জীবনী ও ইতিহাসকে প্রত্যাখ্যাত বলেই সকলের বিবেচনা করা সর্বাধিক উত্তম এবং এর মধ্যেই মুসলমানদের ঈমানী নিরাপত্তা নিহিত- এর মধ্যেই কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধতা ও বিশ্বস্ততা সুরক্ষিত। আর এই নীতি অবলম্বন করেই আমরা দৃঢ়তা ও সাহসিকতার সাথে চ্যালেঞ্জ করে ঘোষণা করতে সক্ষম হচ্ছি যে, 'আমরা পৃথিবীর জীবনে শান্তি, স্বস্তি ও কল্যাণকর জীবন বিধান ইসলামী শরীয়াত ও মৃত্যুর পরবর্তী জগতে নাজাতের ব্যবস্থাপত্র নির্ভরশীল ও বিশ্বস্ত সূত্রে প্রাপ্ত হয়েছি। এই পথ অবলম্বন করে জীবিত থাকা ও মৃত্যুবরণ করা- উভয়টির মধ্যেই রয়েছে কৃতকার্যতা ও সার্থকতা। এই ধরনের সন্দেহাতীত দৃঢ় বিশ্বাসই আমাদের মনোবল বৃদ্ধি করে এবং আমাদের ভেতরে আত্মতৃপ্তি যোগায়'।

আমি একটি বিষয় দৃঢ়তার সাথে উপস্থাপন করতে চাই যে, কোনো বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের মতানৈক্য পরিলক্ষিত হলে বিশেষ কোনো সাহাবীর প্রতি কটুক্তি, অভক্তি, অশ্রদ্ধা, অবজ্ঞা অথবা উপহাস না করে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাহাবায়ে কেরাম কর্তৃক গৃহীত মতামতকে গ্রহণ করলেই যে কোনো দলাদলি, মতানৈক্য ও মতদ্বৈততার অবসান ঘটতে পারে। এ পথ অবলম্বন না করে কোনো বিরোধপূর্ণ কোনো বিষয়কে সামনে অগ্রসর করানোর পন্থা অবলম্বন করার অর্থই হলো, ইসলাম ও মুসলিম মিল্লাতের মারাত্মক ক্ষতিকর পন্থাই অবলম্বন করা। মুসলিম মিল্লাতের সলফে-সালেহীন, ওলামা-মাশায়েখ তথা আহলুস্ সুন্নাত ওয়াল জামাআত সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে এই ধরনের পবিত্র আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা ধারাই পোষণ করতেন। আল ফিহুল আকবর কিতাবের ১০১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, ইমাম আবু হানিফা (রাহঃ) বলেছেন-

لَا تَذْكُرُ أَحَدًا مِنْ أَصْحَابِ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَّا بِخَيْرِ - নবী করীম (সা:) এর সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে আমরা যাঁর আলোচনাই করবো তাতে উত্তম ও প্রশংসনীয় পন্থাই অবলম্বন করবো।

ইমাম তাহাবী (রাহ:) এর আকীদাতুত্তাহাবী নামক কিতাবের ১৩৭ থেকে ১৪০ পৃষ্ঠায় এ ব্যাপারে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে-

وَ نَحْنُ أَصْحَابُ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَ لَا تَفْرُطُ فِي حُبِّ أَحَدٌ مِنْهُمْ وَ لَا نَتْبِرًا مَنْ أَحَدٌ مِنْهُمْ وَ نَبْغُضُ مَنْ يَبْغُضُهُمْ وَ بِغَيْرِ الْحَقِّ يَذْكُرْهُمْ وَ لَا تَذْكُرْهُمْ إِلَّا بِخَيْرٍ وَ حُبُّهُمْ دِيْنِ وَ إِيْمَانِ وَ إِحْسَانِ وَ يَبْغُضُهُمْ وَ نِفَاقٌ وَ طُغْيَانِ

(সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে আমাদের আহলুস্ সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের পন্থা হলো) আমরা নবী করীম (সা:) এর সাহাবায়ে কেরামকে ভালোবাসি। তবে তাঁদের মধ্য থেকে কোনো একজন সাহাবীর প্রতি অধিক ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে অন্য কোনো সাহাবী সম্পর্কে শত্রুতা পোষণ করি না। যারা সাহাবায়ে কেরামের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে এবং তাঁদের ব্যাপারে অশোভন উক্তি করে আমরা তাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করি। আমরা সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে উত্তম ও প্রশংসনীয় আলোচনা করি। (আমরা বিশ্বাস করি) তাঁদেরকে ভালোবাসা দ্বীন, ঈমান ও কল্যাণের পাথেয়। পক্ষান্তরে তাঁদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করা কুফর, মুনাফেকী ও শরীয়াতের সীমা লংঘনের নামান্তর।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 সাহাবায়ে কেরাম এর অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা

📄 সাহাবায়ে কেরাম এর অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা


রাসূলের যুগে যেসব ব্যক্তিবর্গ নবী করীম (সা:) এর সংস্পর্শ লাভ করেছেন, তাঁর আনুগত্য করেছেন এবং ঈমানদার অবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করেছেন সেসব সম্মানিত ও মর্যাদাবান ব্যক্তিবর্গই আল্লাহর রাসূলের সাহাবী হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর রাসূলের কাছ থেকে প্রত্যক্ষভাবে দ্বীন গ্রহণ করেছেন। স্বয়ং আল্লাহর রাসূল তাঁদেরকে দ্বীনের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। কুরআনুল কারീমের রুহানী খোরাক নবী করীম (সা:) তাঁদের ভেতরে সরবরাহ করে ঈমানের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। আল্লাহর নবী তাঁদের দৈহিক পবিত্রতা ও হৃদয়ের ভয়-ভক্তি মিশ্রিত বিনয় শিখিয়েছেন এবং এসবের বাহ্যিক প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আধ্যাত্মিকতার সমুন্নতি, হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতা ও স্বচ্ছতা, নৈতিক ও চারিত্রিক পরিশুদ্ধি চরম উৎকর্ষতা লাভ করেছিলো। সুতরাং তাঁদের ঈমান ও আমল পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণকারীদের তুলনায় নিখুঁত ও উন্নত হবে এবং অনুসরণীয় হবে এটাই স্বাভাবিক।

নবী করীম (সা:) সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরাম ঐ ধারণাই পোষণ করতেন যে ধারণা মহান আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে তাঁর প্রিয় হাবীব সম্পর্কে পেশ করেছেন। অগণিত সাহাবীর মধ্যে এমন একজন সাহাবীর সন্ধানও পাওয়া যাবে না, যিনি আল্লাহ তা'য়ালা কর্তৃক তাঁর রাসূলকে প্রদত্ত সর্বোচ্চ মর্যাদার সীমারেখা অতিক্রম করেছেন। অথচ এই সাহাবায়ে কেরামই নবী করীম (সা:) এর প্রতি প্রবল আকর্ষণের কারণে জীবনের সকল কিছু ত্যাগ করে প্রয়োজনে জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের অভাব ছিলো, কিন্তু কখনোই তাঁরা নবী করীম (সা:) এর কাছে এ দাবী করেননি যে, 'আপনি তো আল্লাহ তা'য়ালার নবী। আপনি ক্ষমতা বলে আমাকে ধনী বানিয়ে দিন'। তাঁরা অভাবের কথা শুধু মহান আল্লাহ তা'য়ালাকেই জানিয়েছেন।

বহু সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম নিঃসন্তান ছিলেন, কেউ ছিলেন রোগগ্রস্ত আবার কেউ ছিলেন নানা ধরনের বিপদ-মুসিবতে আক্রান্ত। তাদের একজনও কখনো রাসূলের কাছে এ দাবী করেননি যে, 'আমাকে সন্তান দান করুন, আমাকে রোগ মুক্ত করুন বা বিপদ থেকে উদ্ধার করুন'। কারণ তাঁদের কাছে এ বিষয়টি স্পষ্ট ছিলো যে, কোন্ বিষয়ে আল্লাহর কাছে আবেদন করতে হবে আর কোন্ বিষয় রাসূল (সা:) কে জানাতে হবে। মহান মালিক আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত বিষয়সমূহ তাঁরা কখনোই নবী করীম (সা:) এর কাছে উত্থাপন করেননি। খুব বেশি হলে তাঁরা এ পর্যন্তই বলেছেন যে, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এ বিষয়ে মহান আল্লাহ তা'য়ালার কাছে আমার জন্য দোয়া করুন'।

সাহাবায়ে কেরামের সমষ্টিগত দলের ঈমান ও আমল কুরআন ও সুন্নাহর মানদণ্ডে যাচাই করা বিশুদ্ধ ও সঠিক বলে ঘোষিত হয়েছে আল্লাহ তা'য়ালার অবতীর্ণ করা কিতাব মহাগ্রন্থ আল কুরআনে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَالسَّابِقُوْنَ الأَوَّلُوْنَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانِ لَا رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ط ذَالِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

যেসব মুহাজির ও আনসার সর্বপ্রথম ঈমানের দাওয়াত কবুল করার জন্য অগ্রসর হয়েছিলো এবং যারা পরে নিতান্ত সততার সাথে তাদের পিছনে পিছনে এসেছিলো, আল্লাহ তা'য়ালা তাদের প্রতি রাযী ও সন্তুষ্ট হলেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি রাযী ও সন্তুষ্ট হলো। আল্লাহ তাদের জন্য এমন উদ্যান রচনা করে রেখেছেন, যার নিম্নদেশে ঝর্ণাধারা সতত প্রবাহমান। আর তারা চিরদিন সেখানে থাকবে, বস্তুত এটাই বিরাট সাফল্য। (সূরা আত্ তাওবা-১০০)

কুরআন ও সুন্নাহর যথাযথ আনুগত্যকারী মুসলিম মিল্লাতের প্রথম স্তরের অগ্রগামী ব্যক্তিবর্গ অর্থাৎ যারা মক্কা থেকে হিজরতকারী মুহাজিরগণ ও মদীনার ঐ সব লোকজন, যারা ইসলাম ও মুসলমানদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলো, সেসব আনসারগণ এবং পরবর্তীতে যারা অকপট চিত্তে ঈমান ও আমলে মুহাজির ও আনসারগণের অনুসরণ করলো, তারা সকলেই এমন নেক লোক, আল্লাহ তা'য়ালা তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট আর তাঁরাও আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতি সন্তুষ্ট। তিনি তাঁদের জন্য জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন, যেসব জান্নাতের তলদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারাসমূহ প্রবাহমান থাকবে। তাঁরা সেখানে চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করবে। আর এটাই হলো সফলতার সর্বোচ্চ স্তর।

সাহাবায়ে কেরাম রেদওয়ানুল্লাহি তা'য়ালা আলাইহিম আজমাঈন কুরআন ও সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন এবং তাঁরা সকলেই ছিলেন সত্যবাদী। হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তারা সকলেই ছিলেন নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণীয়। হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে কখনো কোনো সাহাবী মিথ্যা রাওয়ায়েত করেননি। হাদীস রাওয়ায়েতের ক্ষেত্রে কোনো সাহাবীর অসত্য বক্তব্য বাস্তবে প্রমাণিত হয়নি এবং সাহাবীদের জীবন চরিত গবেষণা করে এ কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, যে সময়ে কতিপয় সাহাবা দুঃখজনকভাবে পারস্পরিক বিরোধ ও আত্মকলহে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাঁদের জীবন চরিতও গবেষণা করে এ কথা প্রমাণীত হয়েছে যে, নবী করীম (সা:) যে কথা বলেননি, এমন কোনো কথাকে আল্লাহর রাসূলের উক্তি বলার ব্যাপারে তারা চূড়ান্ত পর্যায়ে সর্তকতা অবলম্বন করেছেন। নিজেদের কোনো কথাকে আল্লাহর রাসূলের নামে চালিয়ে দেয়াকে তাঁরা সীমাহীন ধৃষ্টতা ও সাংঘাতিক গুনাহ্ হিসাবে বিবেচনা করতেন।

প্রকৃতপক্ষে নবী করীম (সা:) যে কথা বলেননি এবং যার কোনো ভিত্তি নেই সেসব কথা সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরিহার করে চলতেন। নবী করীম (সা:) বলেন- الصَّحَابَةُ كُلُّهُمْ عَدُولٌ -
সাহাবায়ে কেরামের সকলেই সত্যবাদী।

হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে হাদীস বিশারদ মুহাদ্দিসগণ হাদীসের বর্ণনাকারীদের সত্যবাদিতার বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাচাই করে দেখেছেন। সার্বিকভাবে যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ নবী করীম (সা:) এর কাছ থেকে হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সকল সাহাবায়ে কেরামদের সম্পূর্ণ সত্যবাদী পেয়েছেন। সুতরাং আহলে সুন্নাতের আকীদা হলো, হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম সকলেই আদেল বা ন্যায়বান। ১৩২১ হিজরী সনে আল আমীরা প্রেস-মিসর থেকে প্রকাশিত 'মিনহাজুস সুন্নাহ্' নামক গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ২২৯ পৃষ্ঠায় ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রাহ:) বলেছেন-

الصَّحَابَةُ ثَقَاةٌ صَادِقُوْنَ فِيْمَا يَحْبَرُوْنَ بِهِ عَنِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم وَ أَصْحَابُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاللهِ الْحَمْدُ مِنْ أَصْدَقُ النَّاسِ حَدِيثًا عَنْهُ لا يَعْرِفُ مِنْهُمْ تَعَمَدَ عَلَيْهِ كَذِبًا مَعَ إِنَّهُ كَانَ يَقَعُ مَنْ أَحَدُهُمْ مِنَ الْهَنَاتِ مَا يَقْعُوْنَهُمْ ذُنُوْبِ وَ لَيْسُوا مَعْصُوْمَيْنِ وَ مَعَ هَذَا فَقَدْ جَرَبَ أَصْحَابُ النَّقْدِ وَالإِمْتِحَانِ أَحَادِيثَهُمْ وَ اعْتَبِرُوهَا بِمَا تَعْتَبِرُ الأَحَادِيثُ فَلَمْ يُوْجَدْ عَنْ أَحَدٍ مِنْهُمْ تَعَمَّدَ كَذَّبَةٌ

সকল সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন নির্ভরযোগ্য রাবী (হাদীস বর্ণনাকারী)। নবী করীম (সা:) এর কাছ তাঁরা যা কিছু বর্ণনা করেন, সে ব্যাপারে তাঁরা সকলেই ছিলেন সত্যবাদী- আল হামদুলিল্লাহ্! আল্লাহর রাসূল থেকে হাদীস বর্ণনা করার ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরাম সকলের চেয়ে অধিক সত্যবাদী। আল্লাহর রাসূলের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা আরোপ করেছেন, অনুসন্ধানে এমন একজন সাহাবীরও খোঁজ পাওয়া অসম্ভব। অথচ সাহাবায়ে কেরামদের মধ্য থেকে ব্যক্তি বিশেষের কোনো দুর্বলতা যে প্রকাশ পায়নি এমনটি নয়। কারণ তাঁরা নিষ্পাপ মাসুম ছিলেন না। সুতরাং তাঁদের কারো মধ্যে থেকে ব্যক্তি বিশেষের দ্বারা গুনাহ্ সংঘটিত হয়ে যাওয়া বিচিত্র অথবা অসম্ভব কিছু নয়। সর্বোপরি হাদীস যাচাই-বাছাই এর ক্ষেত্রে বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণ সাহাবায়ে কেরামদের বর্ণিত হাদীস সুক্ষ্মভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছেন। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে অসত্য হাদীস বর্ণনা করার মতো একজন সাহাবীরও সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এ জন্য বিজ্ঞ হাদীস বিশারদগণ বলেছেন, 'সাহাবায়ে কেরাম কোনো গুনাহর কাজে জড়িত হন বা না হন তাঁদের বর্ণিত হাদীসসমূহ গৃহীত হওয়ার ব্যাপারে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। কোনো সাহাবী ইচ্ছা করে নবী করীম (সা:) এর পবিত্র সত্ত্বর সাথে মিথ্যা কথা সম্পৃক্ত করতে পারেন না'।

উপরে আলোচিত ইসলাম গ্রহণ ও বিশুদ্ধ ঈমান ও আমলের অধিকারী হওয়া সম্পর্কে মুহাজির ও আনসারগণের প্রথম ও অগ্রগামী হওয়া সম্পর্কীয় সূরা তওবার ১০০ নম্বর যে আয়াত উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, সে আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যা বলেছেন, তা সর্বযুগের, সর্বকালের ও পৃথিবীর সকল স্থানে অবস্থানরত মুসলিম উম্মাহর জন্য আদর্শিক দিক নির্দেশনামূলক একটি অতি উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট বক্তব্য। এই বক্তব্যে দুই শ্রেণীর উচ্চ সম্মান ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষের সফলতা ও কৃতকার্যতা সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করেছেন।

ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামী এই দুই শ্রেণীর সম্মান ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ অর্থাৎ মুহাজির ও আনসারগণের সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা সূরা হাদীদে আলোচনা করেছেন। হোদায়বিয়ার সন্ধি ও মক্কা বিজয়ের পূর্বে যারা আল্লাহর নবীর সাহাবী হওয়ার মহান সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন, আর যারা হোদায়বিয়ার সন্ধি ও মক্কা বিজয়ের পরে নবী করীম (সা:) এর মহান সাহাবী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন, সম্মানীত সাহাবায়ে কেরামের এই দুই দলের মধ্যে প্রথম দলটি সম্মান ও মর্যাদাগত দিক থেকে দ্বিতীয় দলটির তুলনায় শ্রেষ্ঠ। অবশ্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সাহাবায়ে কেরাম এর উভয় দলের প্রশংসা করেছেন এবং তাঁদের প্রতি নিজের সন্তুষ্টি ব্যক্ত করে তাঁদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

لَا يَسْتَوِي مِنكُمْ مَّنْ أَنفَقَ مِن قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ طَ أُوْلَئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِّنَ الَّذِينَ أَنْفَقُوْا مِنْم بَعْدُ وَقَاتَلُوا طَ وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى طَ

তোমাদের মধ্যে তারা কখনো একই রকম (মর্যাদার অধিকারী) হবে না, যারা বিজয় সাধিত হওয়ার আগে (আল্লাহর পথে) ব্যয় করেছে এবং (ময়দানে) সংগ্রাম করেছে; তাদের মর্যাদা ওদের তুলনায় অনেক বেশি যারা বিজয় সাধিক হবার পর আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করেছে এবং জিহাদে অংশ গ্রহণ করেছে; (অবশ্য) আল্লাহ তা'য়ালা এদের সবাইকেই উত্তম পুরস্কার প্রদানের ওয়াদা দিয়েছেন। (সূরা হাদীদ-১০)

অর্থাৎ বিপুল শুভফল, কল্যাণ ও সওয়াবের অধিকারী এই উভয় শ্রেণীর লোকই। কিন্তু প্রথমোক্ত শ্রেণীর সম্মান ও মর্যাদা অন্য সকল শ্রেণীর লোকদের তুলনায় সর্বাধিক। কারণ, তাঁরা অধিকতর কঠিন অবস্থায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টির জন্য এমন সব বিপদ, মুসিবত ও দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছেন যা অন্য সকল শ্রেণীর লোকদের ভোগ করতে হয়নি। তাঁরা এমন কঠিন অবস্থায় নিজের সহায়-সম্পদ, অর্থ-বিত্ত আল্লাহ তা'য়ালার বিধান প্রতিষ্ঠা, প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে ব্যয় করেছেন যখন দেশের পর দেশ, এলাকার পর এলাকা বিজয়ের ফলে এই ব্যয়ের প্রতিবিধান করার কোনো দূরতম সম্ভাবনাও দৃষ্টি গোচর ছিলো না। তাঁরা এমন কঠিন ও সঙ্কটময় পরিবেশে ইসলামের দুশমনদের সাথে সংগ্রাম-আন্দোলন, যুদ্ধ-জিহাদ করেছেন যখন দুশমনরা বিজয়ী হয়ে ইসলামী আদর্শের পতাকাবাহী লোকদের সম্পূর্ণ উৎখাত করে ফেলবে বলে সময়ের প্রতিটি মুহূর্তে আশঙ্কা হচ্ছিলো।

হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রা:) বলেন, নবী করীম (সা:) হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় আমাদেরকে বলেছিলেন, 'খুব শীঘ্রই এমনসব লোকজন আসবে যাদের আমল দেখে তোমরা তোমাদের আমলকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র, নগণ্য ও সামান্য ধারণা করবে। কিন্তু সেসব লোকদের মধ্যে কারো কাছে যদি পর্বত সমতুল্যও স্বর্ণ থাকে এবং সে তার সমস্তই আল্লাহর পথে ব্যয় করে দেয়, তাহলে তোমাদের দুই রতল (আমাদের দেশে প্রচলিত ওজনের প্রায় ৫০০ গ্রামের সমান হলো এক রতল) এমনকি এক রতল ব্যয় করারও সমান হতে পারবে না'। (ইবনে জরীর)

সুতরাং সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের একনিষ্ঠ অনুসারীগণ কৃতকার্যতা ও সফলতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়ে জান্নাত লাভ করবেন, এ কথারই প্রতিধ্বনি করা হয়েছে সূরা হাদীদের ১০ নম্বর আয়াতে। হোদায়বিয়ার সন্ধি ও মক্কা বিজয়ের পূর্ববর্তী মুহাজির ও আনসারগণ প্রথম দিকের অর্থাৎ সাবিকুনাল আওয়ালীন- অগ্রগামী মুসলমান হওয়ার সম্মান ও মর্যাদার বিষয় উল্লেখিত আয়াতে ব্যক্ত করার পরেই বলা হয়েছে, 'যারা সাবিকুনাল আওয়ালীন' অর্থাৎ প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারীদের অনুসরণকারী বলে প্রমাণীত হবে, তারা সে সকল মর্যাদাবান লোকদের দলভুক্ত হবে, যাদের প্রতি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের সুসংবাদ ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রাথমিক যুগের মুসলমান অর্থাৎ মুহাজির ও আনসারগণের একনিষ্ঠ অনুসারীদের প্রতি আল্লাহ তা'য়ালার সন্তুষ্টি ও তাঁদের জান্নাতী হওয়ার সুসংবাদের ব্যাপকতায় সেসব লোকও অন্তর্ভুক্ত হবে, যারা কিয়ামতের পূর্ববর্তী যুগেও মুহাজির ও আনসারদের অনুরূপ ঈমান-আকীদা ও আমল দ্বারা নিজেদেরকে তাঁদের একনিষ্ঠ অনুসারী বলে প্রমাণ দিতে সক্ষম হবে। উল্লেখিত আলোচনা দ্বারা এ কথা অনুধাবন করা গেলো যে, সাহাবায়ে কেরাম অবশ্যই নাজাতপ্রাপ্ত এবং তাঁরা জান্নাতী। আর তাঁদের একনিষ্ঠ অনুসারীগণও নাজাতের পথের পথিক। সুতরাং সাহাবায়ে কেরামদের জীবনী ভিত্তিক বা তাঁদেরকে কেন্দ্র করে ঐসব ইতিহাসমূলক গ্রন্থ কিছুতেই প্রামাণ্য গ্রন্থ হতে পারে না, যেসব গ্রন্থ তাঁদের দোষ-ত্রুটিকেই প্রাধান্য দিয়ে রচনা করা হয়েছে। সেই গবেষণা, পর্যালোচনা, সমালোচনা ও মন্তব্যই গ্রহণযোগ্য হবে, যা সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কিত আয়াত ও বিশুদ্ধ হাদীসের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 উম্মাতে মুহাম্মাদী (সা:) এর মর্যাদা: দায়িত্ব ও করণীয়

📄 উম্মাতে মুহাম্মাদী (সা:) এর মর্যাদা: দায়িত্ব ও করণীয়


বিশ্ব মানবতার মহান মুক্তির দূত শেষ নবী-রাসূল নবী করীম (সা:) এর যারা অনুসরণ করে তাঁরাই উম্মাতে মুহাম্মাদী (সা:) নামে পরিচিত। সমগ্র পৃথিবীর কল্যাণ সাধন ও মানুষের মুক্তির গুরুদায়িত্ব এই উম্মাতের প্রতি অর্পিত হয়েছে। পৃথিবী ও মানবতার জন্যে যা কিছুই অশুভ তার মূলোৎপাটন করে সত্য, ন্যায়-নীতি ও শান্তি স্থাপন করাই এই উম্মাতের প্রকৃত কাজ এবং এই মহান কাজটি সম্পাদনের লক্ষ্যে যে প্রচেষ্টা চালানো হয় সে প্রচেষ্টাকেই সংক্ষিপ্ত কথায় জিহাদ বলা হয়। ইসলাম বিদ্বেষী একশ্রেণীর মানুষ ইসলাম থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখার লক্ষ্যে জিহাদ শব্দকে সন্ত্রাসের সাথে একাকার করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত বিষয় হলো, ইসলামে জিহাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো শুভ ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা এবং এ কাজটিই সম্পাদন করাই উম্মাতে মুহাম্মাদী (সা:) এর প্রধান দায়িত্ব। নবী করীম (সা:) তাঁর পবিত্র জীবনের শেষ মুহূর্তটিও এই কাজেই ব্যয় করেছেন। তাঁর অবর্তমানে সকল সচেতন মুসলিমদের প্রতি এ দায়িত্ব পালন করা বাধ্যতামূলক।

দায়িত্বের ধরনটি কেমন তা একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা যাক। বর্তমানে পৃথিবীর সকল দেশেই যান-বাহন চলাচলের সুনির্দিষ্ট পথ এবং নিয়ম-নীতি রয়েছে। যান-বাহন সুনির্দিষ্ট পথে চলছে কিনা এবং সঠিক নিয়ম-নীতি অনুসরণ করছে কিনা তা দেখার জন্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগ কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত লোক রয়েছে। এসব লোক যদি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন না করে বা দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা অদক্ষতার পরিচয় দেয় তাহলে যান-বাহন দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে প্রাণহানীর ঘটনা যেমন ঘটবে তেমনি সম্পদেরও ক্ষতি হবে। ট্রাফিক পুলিশ যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করলে পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা সচেতন মহল সহজেই অনুভব করতে পারে।

এ পৃথিবীর জাতিসমূহ পরিচালনায় উম্মাতে মুহাম্মাদী (সা:) এর প্রতি ট্রাফিক পুলিশের ন্যায় দায়িত্ব অর্পণ করেছেন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। অর্থাৎ সমগ্র পৃথিবীকে শুভ ও কল্যাণের পথে পরিচালনার দায়িত্ব এই উম্মাতে মুহাম্মাদী (সা:) তথা মুসলিম মিল্লাতের প্রতি অর্পণ করে মুসলিমদেরকে মর্যাদাবান উম্মাত বানানো হয়েছে। মুসলিম মিল্লাত নবী করীম (সা:) এর সীরাত অনুসরণে সমগ্র পৃথিবীকে শুভ ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করবে এই দায়িত্বই এদের প্রতি অর্পণ করে এদেরকে পবিত্র কুরআনে 'উম্মাতে ওয়াসাত' বা মধ্যপন্থী উম্মাত হিসাবে পরিচিতি দান করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكুনুনুওয়া শুহাদা-আ ‘আলান্না-সি ওয়া ইয়াকুনার রাসূলু ‘আলাইকুম শাহীদান।

এভাবেই আমি তোমাদের এক মধ্যপন্থী মানব দলে পরিণত করেছি, যেন তোমরা পৃথিবীর অন্যান্য মানুষদের ওপর (হিদায়াতের) সাক্ষী হয়ে থাকতে পারো (এবং একইভাবে) রাসূলও তোমাদের ওপর সাক্ষী হয়ে থাকতে পারেন। (সূরা আল বাকারা-১৪৩)

উক্ত আয়াতে মুসলিমদেরকে 'উম্মাতে ওয়াসাত' বা মধ্যপন্থী উম্মাত হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। উম্মাতে ওয়াসাত শব্দটি এতই ব্যাপক অর্থবোধক যে, আরবী ব্যতীত পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষায় ব্যবহার করে উক্ত শব্দটির পরিপূর্ণ ভাব প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এই শব্দ দিয়ে এমন এক সর্বোচ্চ, সর্বোন্নত ও উৎকৃষ্ট এবং সম্মানিত মানব দলকে বুঝায় যাঁরা শুভ, কল্যাণ, ন্যায়-নীতি, ইনসাফপূর্ণ এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠায় মধ্যম পন্থানুসরণের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত; যারা সমগ্র বিশ্বেও মানব সম্প্রদায়ের পথ প্রদর্শক, পরিচালক, নেতৃত্বদানকারী অগ্রনায়ক হওয়ার মর্যাদায় অভিষিক্ত, যাঁদের সাথে অশান্তি, বিপর্যয়, বিশৃঙ্খলা, শঠতা, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, ধোকাবাজি, অন্যায়, অবিচার, সন্ত্রাস ও মিথ্যাচার বা কুটকৌশলের দূরতম সম্পর্ক নেই।

পৃথিবীতে কোনো মানব সম্প্রদায়কে এভাবে মহান আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে সাক্ষ্যদানের সম্মানিত পদে নিযুক্ত হবার বাস্তব অর্থই হচ্ছে সমগ্র মানব জাতির নেতৃত্ব ও পরিচালকের সর্বাধিক সম্মানজনক পদে অভিষিক্ত হওয়া- আর এটাই হলো পৃথিবীতে মুসলিম মিল্লাতের মর্যাদা। মহান আল্লাহপ্রদত্ত এই মর্যাদা একদিকে পৃথিবীতে মুসলিম মিল্লাতের জন্য যেমন শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশিষ্টতার পরিচায়ক তেমনি এটি এক বিরাট গুরুদায়িত্ব। এই দায়িত্ব কিভাবে কতটুকু মুসলিম মিল্লাত পালন করেছে কিয়ামতের ময়দানে তাদেরকে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার ও তাঁর রাসূল (সা:) এর সম্মুখে জবাবদিহী করতে হবে।

নবী করীম (সা:) যেভাবে আল্লাহভীরুতা, সততা, স্বচ্ছতা, সত্যপ্রিয়তা, সত্যানুসরণ, ইনসাফ, সুবিচার ও ন্যায়নিষ্ঠার সকল মানদণ্ডে উন্নীত সমগ্র মানবতার জন্যে জীবন্ত আদর্শ, তেমনি মুসলিম উম্মাহকেও সমগ্র বিশ্বের সকল মানুষের জন্য এক জীবন্ত আদর্শে পরিণত হতে হবে। মুসলিম মিল্লাতের সকল কথা শুনে ও কর্ম দেখে আল্লাহভীরুতা, সততা, স্বচ্ছতা, সত্যপ্রিয়তা, সত্যানুসরণ, ইনসাফ, সুবিচার ও ন্যায়নিষ্ঠার প্রকৃত তত্ত্ব বাস্তবে অনুধাবন করতে পারে।

মানুষের কাছে মহান আল্লাহর নাযিল করা মহাসত্য জীবনাদর্শ ইসলামকে পৌঁছানোর ব্যাপারে নবী করীম (সা:) এর প্রতি যে কঠিন দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিলো, সে দায়িত্ব তিনি সুচারুরুপে পালন করেছেন এবং তাঁর অবর্তমানে এ মহান দায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই অর্পিত হয়েছে মুসলিম মিল্লাতের প্রতি। নবী করীম (সা:) যদি এ মহান দায়িত্ব পালনে সামান্যতম অবহেলা প্রদর্শন করতেন তাহলে তাঁকেও মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার সম্মুখে জবাবদিহী করতে হতো। সে ক্ষেত্রে মুসলিম মিল্লাতকে কিভাবে আল্লাহ তা'য়ালার সম্মুখে জবাবদিহী করতে হবে তা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে।

পৃথিবীতে মুসলিম মিল্লাতকে সম্মানিত পদ নেতৃত্বের পদ দান করা হয়েছে এবং এ পদটি অত্যন্ত মর্যাদাবান ও গৌরবের। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও এ কথা সত্য যে, বর্তমানে মুসলিম মিল্লাত নিজেদের পরিচয় জানে না, জানার চেষ্টাও করে না এবং নিজেদের মর্যাদাবোধও অনুধাবন করে না। আমরা কি ক্ষীণ কণ্ঠেও এ কথা বলতে পারি যে, মহান আল্লাহর যে বিধান আমাদের কাছে রয়েছে তা পৃথিবীর অন্যান্য জাতিসমূহের কাছে আমরা পৌঁছে দিয়েছি? যদি বলতে না পারি তাহলে হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহর আদালতে পৃথিবীর অন্যান্য মানব সম্প্রদায় আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবে এবং আমরা আসামীর কাঠ গড়ায় দাঁড়াবো, ভয়ানক শাস্তি আমাদেরকে বরণ করতে হবে। মহান আল্লাহর দেয়া নেতৃত্বের সম্মানিত এই পদকে আমরা নিজেরাই কলুষিত করে নিজেদের জন্যে ধ্বংস ও অভিশাপের পদে পরিণত করেছি। পৃথিবীতে মুসলিম নামে আমরা টিকে রয়েছি, অথচ এ পৃথিবীতে বিভ্রান্তিকর চিন্তা ও কর্মের যে বিপর্যয়কর প্লাবন প্রবাহিত হচ্ছে, অশান্তির দাবানল সমগ্র পৃথিবীকে উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করেছে, এসবের জন্যে ধূর্ত নেতৃবৃন্দ, মানবরূপী শয়তান ও জ্বীন শয়তানদের পাশাপাশি আমাদেরকে কি দায়ি করা হবে না? অবশ্য অবশ্যই হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহর আদালতে কঠিন তিরস্কারে আমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে, 'সমগ্র পৃথিবীতে যখন অন্যায়, অবিচার, পাপাচার, জুলুম, নির্যাতন, শোষণ, ব্যভিচার, দলন- নিপীড়ন ও বিভ্রান্তির প্লাবন প্রবাহিত হচ্ছিলো, তখন তোমরা মুসলিম মিল্লাত কোথায় অবস্থান করছিলে'?

লক্ষ্য করুন এবং অনুধাবন করুন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের দায়িত্ব- কর্তব্য ও পরিচিতি কিভাবে দিয়েছেন- কুন্তুম খাইরা উম্মাতিন উখরিজাত লিন্না-সি তায়’মুরুনা বিল মা’রুফি ওয়া তানহাওনা ‘আনিল মুনকারি ওয়া তু’মিনুনা বিল্লাহ।

তোমরাই (হচ্ছো পৃথিবীতে) সর্বোত্তম জাতি, সমগ্র মানব জাতির (কল্যাণের) জন্যেই তোমাদের উত্থান, (তোমাদের দায়িত্ব হচ্ছে) তোমরা পৃথিবীর মানুষদের সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে, আর তোমরা নিজেরাও আল্লাহর ওপর (পরিপূর্ণ) ঈমান আনবে। (সূরা আলে ইমরান-১১০)

মুসলিম মিল্লাতের পরিচয় আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে দিয়েছেন যে তারা পৃথিবীর মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে 'সর্বোত্তম জাতি' এবং এই জাতির দায়িত্ব হলো পৃথিবীর নেতৃত্বের আসনে আসীন হয়ে সমগ্র পৃথিবীর মানব সম্প্রদায়কে তারা শুভ ও কল্যাণকর কাজের আদেশ দিবে এবং অশুভ ও অকল্যাণকর কাজ থেকে বিরত রাখবে। এটাই মুসলিম মিল্লাতের প্রতি অর্পিত গুরু দায়িত্ব। এই মর্যাদাপূর্ণ ও কঠিন দায়িত্ব পৃথিবীতে সর্বপ্রথম পালন করেছেন নবী-রাসূলগণ। তাঁদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- ইয়ামুরুহুম বিল মা’রুফি ওয়া ইয়ানহাহুম ‘আনিল মুনকারি ওয়া ইউহিল্লু লাহুমুত তায়্যিবা-তি ওয়া ইউহাররিমু ‘আলাইহিমুল খাবা-ইসা ওয়া ইয়াদাউ ‘আনহুম ইসরাহুম ওয়াল আগলা-লাল্লাতি কা-নাত ‘আলাইহিম।

(নবী করীম স.) তাদের ভালো কাজের আদেশ দেন, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখেন, যিনি তাদের জন্যে যাবতীয় পবিত্র জিনিসকে হালাল ও অপবিত্র জিনিসমূহকে তাদের ওপর হারাম ঘোষণা করেন, তাদের ঘাড় থেকে (মানুষের গোলামীর) যে বোঝা ছিলো তা তিনি নামিয়ে দেন এবং (মানুষের চাপানো) যেসব বন্ধন তাদের গলার ওপর (ঝুলানো) ছিলো তা তিনি খুলে ফেলেন। (সূরা আল আ'রাফ-১৫৭)

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মসনদে আসীন না হলে আদেশ- নিষেধের কাজটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এ কারণে নবী করীম (সা:) কে আল্লাহ তা'য়ালা রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করার জন্যে এভাবে দোয়া করতে বলেছেন- ওয়া ক্কুর রব্বি আদখিলনী মুদখালা সিদক্কিঁ ওয়া আখরিজনী মুখরাজা সিদক্কিঁ ওয়াজ’আল লী মিল্লাদুনকা সুলতানা-ন নাসী-রা।

(হে রাসূল) আপনি বলুন, হে আমার মালিক, (যেখানেই আমাকে নিয়ে যাননা কেনো), আপনি আমাকে সত্যের সাথে নিয়ে যান এবং (যেখান থেকেই আমাকে বের করুন না কেনো) সত্যের সাথেই বের করুন এবং আপনার পক্ষ থেকে আমার জন্যে একটি সাহায্যকারী (রাষ্ট্র) শক্তি প্রদান করুন। (সূরা বনী ইসরাঈল-৮০)

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকার বিষয়টি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এ কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কেবলমাত্র রাষ্ট্রই আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি আঞ্জাম দিতে পারে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- আল্লাযীনা ইম মাককান্না-হুম ফিল আরদ্বি আক্কা-মুস সালা-তা ওয়া আ-তাউয যাকা-তা ওয়া আমারূ বিল মা’রূফি ওয়া নাহাও ‘আনিল মুনকারি।

আমি যদি এ (মুসলমান)-দের (আমার) যমীনে (রাজনৈতিক) প্রতিষ্ঠা দান করি, তাহলে তারা (প্রথমে) নামায প্রতিষ্ঠা করবে, (দ্বিতীয়) যাকাত আদায় (-এর ব্যবস্থা) করবে, আর (নাগরিকদের) তারা সৎকাজের আদেশ দিবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। (সূরা আল হাজ্জ-৪১)

নবী করীম (সা:) এর স্বর্ণালী যুগে স্বয়ং আল্লাহর নবী ও তাঁর সম্মানিত সাহাবায়ে কেরাম সকলেই সর্বাধিক গুরুত্বের সাথে ইসলাম গ্রহণ করার পরে জীবনের অবশিষ্ট সময় এ গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন। রাসূল (সা:) এর বিদায়ের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হলো হযরত আবু বকর (রা:) এর ওপর। তিনি ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব অর্পণ করলেন হযরত উমার (রা:) এর প্রতি। ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন, হযরত উমার (রা:) এক বছর প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করার পর দৃশ্যপট কেমন হলো, পাঠক-পাঠিকাগণ লক্ষ্য করুন-

ফামাকাসা ‘আ-মান কা-মিলাঁ ওয়ালাম ইয়াখতাসিম ইলাইহি ইসনা-নি ফাক্কা-লা ‘উমারু (রাযিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু) মা হা-জাতী বী ‘ইন্দা ক্কওমিম মু’মিনীন ইয়া খলীফাতা রাসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

দীর্ঘ একটি বছর তিনি সেই পদে অবস্থান করলেন, কিন্তু একটি মামলা-মোকদ্দমাও তাঁর কাছে এলো না। তিনি খলীফার কাছে অনুযোগের সুরে বলেছিলেন, 'দীর্ঘ একটি বছর যাবৎ দেশের প্রধান বিচারপতির পদে আসীন রয়েছি, অথচ একটি মামলাও আমার কাছে এলো না। হে আল্লাহর রাসূলের খলীফা! মুমীন লোকদের জন্য আমার মতো বিচারকের কোনো প্রয়োজন নেই'।

খলীফা জানতে চাইলেন, 'বিশাল একটি দেশের বিপুল সংখ্যক জনতার পক্ষ থেকে একজন নাগরিকও দীর্ঘ এক বছরেও কারো বিরুদ্ধে একটি মামলাও দায়ের করলো না, এর কারণ কি?'

খলীফার প্রশ্নের জবাবে হযরত উমার (রা:) বললেন- দ্বীনুহুমুন নাসি-হাতু ওয়া মানহাজুহুমুল কুরআন ওয়া ‘আমালুহুমুল আমরু বিল মা’রুফি ওয়ান নাহইউ ‘আনিল মুনকারি কুল্লু ওয়া-হিদিম মিনহুম ইয়া’রিফু হাদ্দাহু ফইয়াক্কিফু ‘ইন্দাহু ওয়া ইযা মারিদ্বা আহাদুহুম ‘আ-দুহু ওয়া ইযাফতাক্করা নাসারুহু ওয়া ইযাহতা-জা সা’আদুহু ফাফীমা হুম ইয়াখতাসিমূনা ইলাইয়্যা ইয়া খলীফাতা রাসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম?

তাঁদের তথা দেশের জনগণের দ্বীন-ই হলো পরস্পরকে সৎ উপদেশ দেয়া, তাঁদের জীবন চলার নির্দেশক হলো আল-কুরআন এবং তাদের কাজ হলো সৎকাজের আদেশ দেয়া এবং অসৎ কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। দেশের প্রত্যেকটি মানুষ জানে তাদের নিজের চলার সীমা রেখা কোন্ পর্যন্ত এবং এজন্য তাঁরা নিজের সীমার কাছে থেমে যায়। তাঁদের মধ্যে কেউ একজন অসুস্থ হলে তাঁরা তাঁর সেবা করে, কেউ বিপদে নিপতিত হলে তাকে সাহায্য করে এবং কেউ অভাবী হলে তাকে সহায়তা করে। সুতরাং হে আল্লাহর রাসূলের খলীফা! তাঁরা কোন্ প্রয়োজনে কেন আমার কাছে বিচারের জন্য আসবে?

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এ কাজটি বাস্তবায়ন করার জন্যে এক দল মুসলিমকে সময়ের প্রত্যেক মুহূর্ত এ কাজেই ব্যয় করতে হবে। এই দলটিকে হতে হবে সংঘবদ্ধ এবং এর সাংগনিক ভিত্তি হতে হবে অত্যন্ত মজবুত। অর্থাৎ দলবদ্ধভাবে শক্তিশালী সংগঠনের মাধ্যমে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ বাস্তবায়ন করতে হবে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- ওয়ালতাকুম মিনকুম উম্মাতুই ইয়াদ’ঊনা ইলাল খাইরি ওয়া ইয়ামুরুনা বিল মা’রুফি ওয়া ইয়ানহাওনা ‘আনিল মুনকারি ওয়া উলা-ইকা হুমুল মুফলিহুন।

তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা (মানুষকে কল্যাণের দিকে ডাকবে, সত্য ও) ন্যায়ের আদেশ দিবে, আর (অসত্য ও) অন্যায় কাজ থেকে (তাদের) বিরত রাখবে; (অতপর যারা এই দলে শামিল হবে) সত্যিকার অর্থে তারাই সাফল্যমণ্ডিত হবে। (সূরা আলে ইমরান-১০৪)

মহান এ দায়িত্ব পালন করা প্রত্যেক মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর প্রতি অপরিহার্য কর্তব্য। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- ওয়াল মু’মিনূনা ওয়াল মু’মিনা-তু বা’দ্বুহুম আওলিয়া-উ বা’দ্বিঁ ইয়ামুরুনা বিল মা’রুফি ওয়া ইয়ানহাওনা ‘আনিল মুনকারি ওয়া ইউক্বিমুনাস সালা-তা ওয়া ইউ’তূনায যাকা-তা ওয়া ইউতীউনাল্লা-হা ওয়া রাসুলাহু উলা-ইকা সাইয়ারহামুহুমুল্লা-হ।

মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা হচ্ছে এক অপরের বন্ধু। এরা (অন্য মানুষকে) ন্যায় কাজের আদেশ দেয়, অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে, তারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে, (জীবনের সব কাজে) আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের (বিধানের) অনুসরণ করে, এরাই হচ্ছে সেসব মানুষ যাদের ওপর আল্লাহ তা'য়ালা অচিরেই তাঁর রহমত নাযিল করবেন, অবশ্যই আল্লাহ তা'য়ালা পরাক্রমশালী, কুশলী। (সূরা আত্ তাওবা-৭১)

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ বাস্তবায়নের কাজটি শুধুমাত্র নবী-রাসূল, সাহাবায়ে কেরাম, রাষ্ট্র, দল বা কোনো সংগঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এ কাজটি প্রত্যেক সচেতন ঈমানদার নারী-পুরুষের জন্যে অবশ্যই পালনীয়। যেমন হযরত লুকমান (আ:) এ দায়িত্ব পারিবারিকভাবে পালন করেছিলেন এবং বিষয়টি আল্লাহ তা'য়ালা এতই পছন্দ করলেন যে, তাঁর নামে পবিত্র কুরআনে একটি সূরা অবতীর্ণ করে তাঁকে চিরন্তন করে দিয়েছেন। তিনি তাঁর সন্তানকে নয়টি উপদেশ দিয়েছিলেন, তার মধ্যে একটি উপদেশ ছিলো- ইয়া বুনাইয়্যা আক্কিমিস সালা-তা ওয়ামুর বিল মা’রুফি ওয়ানহা ‘আনিল মুনকারি ওয়াসবির ‘আলা মা আসা-বাকা ইন্না যা-লিকা মিন ‘আযমিল উমুর।

(লুকমান আরো বললো), হে বৎস, তুমি নামায প্রতিষ্ঠা করো, মানুষদের ভালো কাজের আদেশ দাও, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখো, তোমার ওপর কোনো বিপদ মসিবত এসে পড়লে তার ওপর ধৈর্য ধারণ করো; (বিপদে ধৈর্য ধারণ করার) এ কাজ নিঃসন্দেহে একটি বড় সাহসিকতাপূর্ণ কাজ। (সূরা লুকমান-১৭)

সৎ কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজে বাধা বা প্রতিরোধ গড়ে তোলার গুরুত্ব দিতে গিয়ে নবী করীম (সা:) কঠোর নির্দেশ দিয়ে বলেছেন- ‘আন আবী সা’ঈদিনিল খুদরিয়্যি ‘আন রাসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামা ক্কা-লা মান র’আ মিনকুম মুনকারান ফালইউগাইয়্যিরহু বিয়াদিহী ফইল্লাম ইয়াস্তাত্বি’ ফাবিলিসা-নিহী ফইল্লাম ইয়াস্তাত্বি’ ফাবিক্কালবিহী ওয়া যা-লিকা আদ’য়াফুল ঈমা-ন। (রাওয়াহু মুসলিম)

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা:) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা:) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কোনো অন্যায় অসৎ কাজ সংঘটিত হতে দেখলে তা প্রতিরোধ করার জন্যে দু'হাত দিয়ে বাধা দাও, (শক্তি প্রয়োগ করে বন্ধ করে দাও) যদি এটা তোমার পক্ষে সম্ভব না হয় তাহলে মুখ দিয়ে প্রতিবাদ জানাও, এটাও যদি সম্ভব না হয় তাহলে এ অন্যায় অসৎ কাজের প্রতি হৃদয়ে ঘৃণা পোষণ করো, (অন্যায় অসৎ কাজ উৎখাত করার লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করো) তবে এটি ঈমানের দূর্বলতার পরিচায়ক। (মুসলিম)

যে সমাজ ও রাষ্ট্রের অধিবাসীগণ সৎ কাজের আদেশ দিবে না ও অন্যায় কাজের প্রতিরোধ করবে না, তাদের ব্যাপারে নবী করীম (সা:) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন- ক্কা-লা রাসূলুল্লাহি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামা ফাওয়াল্লাযী নাফসী বিয়াদিহী লাতামুরুন্না বিল মা’রুফি ওয়া লাতানহাওউন্না ‘আনিল মুনকারি আও লাইউসাল্লিত্বান্নাল্লা-হু ‘আলাইকুম সুলত্বা-নান যা-লিমান লা ইউবাজ্জিলু কাবীরাকুম ওয়া লা ইয়ারহামু সগীরাকুম ওয়া ইয়াদ’ঊ ‘আলাইহি খিয়া-রাকুম ফালা ইউস্তাজা-বা লাকুম ওয়া ইয়াস্তাসিরূনা ফালা ইউনসারূনা ওয়া তাস্তাগফিরূনা ফালা ইউগফারা লাকুম।

নবী করীম (সা:) তাঁর উম্মাতকে লক্ষ্য করে বলেছেন, সেই জাত পাকের শপথ, যাঁর হাতের মুষ্টিতে আমার জীবন, তোমাদেরকে অবশ্যই মানুষদের সৎ কাজের আদেশ করতেই হবে এবং অন্যায় ও অসৎ কাজের প্রতিরোধ করতেই হবে। তোমরা যদি এ দায়িত্ব পালন করা থেকে বিরত থাকো তাহলে আল্লাহ তা'য়ালা তোমার ওপর জালিম শাসক চাপিয়ে দিবেন, তারা তোমাদের সম্মানিত লোকদের অপমান করবে এবং অসহায় লোকদের প্রতি নির্দয় হবে। এমতাবস্থায় তোমাদের নেককার লোকেরা যে দোয়া করবে তা মঞ্জুর হবে না, তোমরা সাহায্য কামনা করবে কিন্তু দেয়া হবে না, ক্ষমা ভিক্ষা চাইবে কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালা ক্ষমাও করবেন না। (যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালন না করছো)। (মিশকাত শরীফ)

এ দায়িত্ব যদি পালন করা না হয় তাহলে যে ভাঙ্গন ও বিপর্যয় দেখা দিবে তা থেকে আলেম, ওলামা, পীর-মাশায়েখ, সৎ- অসৎ কোনো মানুষই মুক্ত থাকবে না। সর্বগ্রাসী আযাব সকলকেই গ্রাস করবে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

ইল্লা তাফ’আলূহু তাকুন ফিতনাতুন ফিল আরদ্বি ওয়া ফাসা-দুন কাবীর।

তোমরা যদি সে কাজটি না করো, তাহলে (আল্লাহর এ) যমীনে ফিতনা- ফাসাদ ও বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। (সূরা আনফাল-৭৩)

ওয়াত্তাকু ফিতনাতাল লা তুসীবান্নাল্লাযীনা জোলামু মিনকুম খ-সসাহ।

তোমরা সেই ফিতনা থেকে বেঁচে থাকো, যার ভয়াবহ শাস্তি- যারা তোমাদের মধ্যে যালিম শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে না। (সূরা আনফাল-২৫)

এ প্রসঙ্গে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে-

ওয়া ‘আন হুযাইফাতা আন্নান নাবিয়্যা সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামা ক্কা-লা ওয়াল্লাযী নাফসী বিয়াদিহী লাতামুরুন্না বিল মা’রূফি ওয়া লাতানহাওউন্না ‘আনিল মুনকারি আওলাইউশিকাান্নাল্লা-হু আইঁ ইয়াব’আসা ‘আলাইকুম ‘আযা-বাম মিন ‘ইন্দিহী সুম্মা লাতাদ’ঊনাহু ওয়া লা ইউস্তাজা-বা লাকুম। (রাওয়াহুত তিরমিযী)

হযরত হুযায়ফাহ্ (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন, শপথ সেই সত্তার যার হাতের মুষ্টিতে আমার প্রাণ, তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবেন। অন্যথায় অচিরেই আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর শাস্তি প্রয়োগ করা হবে। সে শাস্তি থেকে মুক্তি লাভের জন্যে তোমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করবে কিন্তু তোমাদের দোয়া কবুল করা হবে না। (তিরমিযী)

সুতরাং সময় আমরা অনেক অপচয় করেছি, গভীর নিদ্রায় বিভোর থেকেছি, দায়িত্বের প্রতি অবহেলা প্রদর্শনের মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছি বহু পূর্বেই, এরই ফলশ্রুতিতে সমগ্র পৃথিবীব্যাপী যে বিপর্যয় ও ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে তা থেকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার জন্যে এখনই আমাদেরকে সংঘবদ্ধভাবে দায়িত্ব পালনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। এ মহান দায়িত্ব পালনে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে তাদেরকেই যারা এ দায়িত্ব সম্পর্কে সবথেকে বেশি সচেতন তথা আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখ এবং ইসলাম সম্পর্কে সজাগ ব্যক্তিবর্গকে।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম-ওলামা-মাশায়েখদের করণীয়

📄 ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম-ওলামা-মাশায়েখদের করণীয়


বর্তমান পৃথিবীর মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের নেতৃত্বে যারা অধিষ্ঠিত রয়েছেন এবং হচ্ছেন, তারা প্রায় সকলেই পাশ্চাত্যের জড়বাদ আর বস্তুবাদী জীবন দর্শনের ওপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত এবং পাশ্চাত্যের ইসলাম বিরোধী চিন্তা-চেতনা, নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শিক প্রভাবে প্রভাবিত। ফলে তারা নামে মুসলিম হিসাবে পরিচয় দিলেও কেউ প্রকাশ্যে আবার কেউ সতর্কতার সাথে ইসলাম বিরোধী মতবাদ-মতাদর্শের অনুসরণ করে যাচ্ছেন। মুসলিম দেশসমূহের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থাও অনুরূপ। কেউ ভোগবাদী পূজিবাদী ব্যবস্থা, কেউ বা নাস্তিক্যবাদী সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা অথবা কেউ ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা আবার কেউ পৌত্তলিক ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থার অনুসারী এবং তারা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে তাদের অনুসৃত নীতি আদর্শই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ওপরে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

দেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদ, গবেষক, কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী সর্বপরি শাসক গোষ্ঠী ইসলাম বিরোধী চিন্তাধারা কর্তৃক প্রভাবিত হওয়ার কারণে সমাজ ও রাষ্ট্রে কুরআন ও সুন্নাহ্ বিরোধী নীতি-আদর্শ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। আইন কানুন প্রনয়ণে, কল-কারখানা শিল্পাঙ্গনে, শিক্ষাঙ্গনে, কবিতা-সাহিত্যে, সভ্যতা-সংস্কৃতিতে, বক্তৃতা ও লেখনীতে প্রায় সর্বক্ষেত্রে ইসলামের বিপরীত মতবাদ মতাদর্শকেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এভাবে সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমানদেরকে পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্ধ পূজারী মাত্র গুটি কয়েক লোকজন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে থাকার কারণে ইসলামের বিপরীত পথেই অগ্রসর হতে বাধ্য করছে। এভাবে মুসলমানদের সমাজ ও মুসলিম মানস থেকে তাঁদের প্রাণপ্রিয় আদর্শ ইসলামকে সুকৌশলে অথবা কোথাও আইন প্রয়োগ করে বিদায় করছে, এই অবস্থায় পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর ধারক-বাহক ওলামা-মাশায়েখ ও ইসলামপন্থী লোকজন নীরবে দর্শকের ভূমিকা পালন করবেন, কেউ খানকায় বসে পীর-মুরিদী কাজে ব্যস্ত থাকবেন, কেউ বা মাসজিদ মাদ্রাসার চার দেয়ালের মধ্যে নিজের কর্মকাণ্ডকে সীমাবদ্ধ রাখবেন, আবার কেউ ওয়াজের ময়দানে ওয়াজ করেই নিজের ইতিকর্তব্যের সমাপ্তি ঘটাবেন, এটা ইসলাম সমর্থন করে না।

অধিকাংশ মুসলিম দেশসমূহের শাসক গোষ্ঠী ও দেশের রাজনৈতিক দলসমূহ পাশ্চাত্যের ভোগবাদী গণতন্ত্রের অনুসারী। এসব নামধারী মুসলিম নেতৃবৃন্দ মৃত্তিকা পাথরে নির্মিত মূর্তির পূজা বাহ্যিকভাবে পরিহার করলেও এরা এদের হৃদয়ের কোণে স্বযত্নে এমন এক অদৃশ্য মূর্তির পূজা করে, যে মূর্তি কোথাও গণতন্ত্রের কোথাও বা রাজতন্ত্রের আবরণে আবৃত। মৃত্তিকা-পাথরে নির্মিত মূর্তি জড়পদার্থ, তাদের কোনো অনুভূতিই নেই। তাদের দেহে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজিত থাকলেও সেগুলো তারা ব্যবহার করার ক্ষমতা রাখে না। কিন্তু পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রের যে অদৃশ্য মূর্তি, তা অধিকাংশ মানুষের রায় তথা মতামতকে গ্রহণ করে, অনুসরণ করে এবং আইন হিসাবে দেশের বুকে প্রয়োগ করে। ভোগবাদী গণতন্ত্রের এই অদৃশ্য মূর্তি সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্য, সাধুকে চোর, চোরকে সাধু, বৈধকে অবৈধ, অবৈধকে বৈধ বানানোর ক্ষমতাও সংরক্ষণ করে।

পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র নামক এই অদৃশ্য মূর্তির অন্ধ পূজারীদের কাছে স্থায়ী কোনো মূল্যমান নেই- এদের কাছে সত্য আর মিথ্যা, ন্যায় আর অন্যায়ের চিরন্তন কোনো মানদণ্ড নেই। এদের মানদণ্ড হলো দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণের রায় বা মতামত। আবার সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণের রায়ের যথাযথ প্রতিফলনের ব্যবস্থাও পাশ্চাত্যের তথাকথিত গণতন্ত্রে যেমন অনুপস্থিত- তেমনি সুক্ষ্ম কারচুপি, অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার আশ্রয় গ্রহণ করে প্রকৃত জনরায়কে ভিন্ন পথে পরিচালিত করার সুযোগ রয়েছে।

দেশের জনসমষ্টির মধ্যে যদি সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষ সত্যকে মিথ্যা বলে রায় দেয়, তাহলে পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র সত্যকে মিথ্যা বলেই গ্রহণ করতে বাধ্য। পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রে সংখ্যা গরিষ্ঠের রায়ের মুকাবেলায় আল্লাহর নাযিল করা কুরআনও বড় সত্য নয়। সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী যে রায় বা মতামত দিলো, সেই জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনা, নীতি-আদর্শ, রুচিবোধ, মননশীলতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক অবস্থান, ন্যায়-নীতির বিচারবোধ, সত্য-মিথ্যা যাচাই করার যোগ্যতা কোনোটিই ধর্তব্য নয়। অশিক্ষিত, বিবেক-বুদ্ধি, বিচারবোধ শূন্য, দেশ-সমাজ ও সভ্যতা-সংস্কৃতি সচেতন দেশ ও সমাজের সংখ্যা লঘিষ্ঠ জনগোষ্ঠী আরেকদিকে রায় বা মতামত পেশ করলো, পাশ্চাত্যের এই ভোগবাদী গণতন্ত্র নামক মূর্তি সংখ্যা লঘিষ্ঠের সুচিন্তিত রায়কে পদদলিত করে অবিবেচনা প্রসূত অজ্ঞ জড়বুদ্ধির অধিকারী সংখ্যা গরিষ্ঠের রায়কেই সমাদরে গ্রহণ করলো।

শুধু তাই নয়, পাশ্চাত্যের ভোগবাদী গণতন্ত্রের অনুসারীরা ক্ষেত্র বিশেষে সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণের মতামতেরও মূল্য দেয় না। সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আল্লাহর বিধান অনুসরণের লক্ষ্যে নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের পক্ষে যদি রায় দেয়, পাশ্চাত্যের ভোগবাদী গণতন্ত্রের অনুসারীরা সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণের সে রায়কে পদদলিত করতে সামান্যতম দ্বিধা করে না। এর বাস্তব প্রমাণ আলজেরিয়া ও তুরস্ক। ১৯৯২ সনে আলজেরিয়ার সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কুরআন- সুন্নাহর বিধান অনুসরণ করার লক্ষ্যে ইসলামপন্থী দলকে নির্বাচনে বিজয়ী করলো। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্যের ভোগবাদী গণতন্ত্রের অনুসারীরা অস্ত্রের জোরে সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণের রায়কে পদদলিত করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করলো। তুরস্ক ও মিসরের দিকে দৃষ্টি দিলেও একই অবস্থা পরিলক্ষিত হবে। তুরস্কের সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণ ইসলামপন্থীদের নির্বাচনে বিজয়ী করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় পাঠায়, কিন্তু পাশ্চাত্যের ভোগবাদী গণতন্ত্রের অনুসারীরা নির্বাচনে বিজয়ী দলকে- দলের আদর্শ ইসলামের বিধান অনুসারে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ দেয় না। এমনকি ইসলামপন্থী দল ও ব্যক্তিত্ব যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারে, এ জন্য আইনের মোড়কে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে মিসর ও তুরস্কে। পাশ্চাত্যের ভোগবাদী গণতন্ত্রের অনুসারীরা তাদের ভোগের পথে অন্তরায় সৃষ্টি হতে পারে, এ ধরনের কোনো ব্যবস্থাকে সহ্য করে না। বর্তমানে যদিও মিসরে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে কিন্তু এ পরিবর্তন জনগণের আকাঙ্খা অনুযায়ী ঘটবে কিনা তা ভবিষ্যতের গর্ভে লুকায়িত।

পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র নামক এই মূর্তির কাছে মানুষের মেধা, যোগ্যতা, মননশীলতা, রুচিবোধ, উন্নত চিন্তাধারা, বিচার-বিবেচনাবোধ কোনো কিছুই বিবেচিত বিষয় নয়। বিবেচিত বিষয় শুধু সংখ্যাধিক্য। দেশ ও জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ব্যক্তির মতামত আর তারই গৃহের অশিক্ষিত বিবেক-বুদ্ধি ও বিচারবোধহীন পরিচারিকার মতামতের একই মূল্য পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র নামক অদৃশ্য মূর্তির কাছে। অর্থাৎ উভয়ের মতামতের একই মূল্য। এই গণতন্ত্র শতকরা ৫১ জন মানুষের মতামত বা রায়ের ভিত্তিতে কুরআন-সুন্নাহ নির্দেশিত হালালকে হারাম আর হারামকে হালাল করার ক্ষমতা রাখে। পার্লামেন্টে সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে এরা চিরন্তন মূলবোধ ও সত্যকে মুহূর্তে কবরস্থ করতে পারে। পাশ্চাত্যের ভোগবাদী এই গণতন্ত্র নামক অদৃশ্য মূর্তির পূজারীদের কাছে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সকল শক্তির উৎস নয়- দেশের জনগণই সকল ক্ষমতা ও শক্তির উৎস। অথচ আল্লাহ তা'য়ালা ঘোষণা করেছেন-

ওয়া ইন তুতি’ আকসারা মান ফিল আরদ্বি ইউদ্বিল্লুকা ‘আন সাবীলিল্লা-হ।

(হে নবী) আপনি যদি সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের অনুসরণ করেন তাহলে আপনি আল্লাহর পথ থেকে (সত্য পথ থেকে) পথভ্রষ্ট হয়ে যাবেন। (সূরা আনআম-১১৬)

মুসলিম উম্মাহ্, দেশ ও জাতির এই অবস্থায় ওলামা-মাশায়েখ ও ইসলামপন্থী নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই, বরং রাজনৈতিক ময়দানে উপস্থিত হয়ে ইসলাম বিরোধী বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে হক-এর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার আওয়াজ উত্থাপন করা ইসলামী শরীয়াতের দৃষ্টিতে ওয়াজিব। মুসলিম রাষ্ট্র ও সমাজে যারা নেতৃত্বের আসনে আসীন হবে, তারা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কুরআন-সুন্নাহর আদেশ-নিষেধ বাস্তবায়ন করবে, এটা মহান আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ। এটাই খুলাফায়ে রাশেদীনের প্রতিষ্ঠিত আদর্শ ও সাহাবায়ে কেরামের অনুসৃত প্রতিষ্ঠিত নীতি। বর্তমানে মুসলিম দেশ ও সমাজে ইসলামের বিপরীত চিন্তা-চেতনার অনুসারী লোকদেরই নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এসব নেতৃত্বের আনুগত্য করতে কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

ওয়া লা তুতি’ঊ আমরাল মুসরিফীনাল্লাযীনা ইউফসিদুনা ফিল আরদ্বি ওয়া লা ইউসলিহুন।

(সে সব) সীমালংঘনকারী মানুষদের কথা শুনো না, যারা (আল্লাহর) যমীনে শুধু বিপর্যয় সৃষ্টি কওে এবং কখনো (সমাজের) সংশোধন করে না। (সূরা শু'আরা-১৫১-১৫২)

মহান আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ, মুসলিম দেশ ও সমাজে ইসলামের বিপরীত চিন্তা-চেতনা ও নীতি-আদর্শের অনুসারী লোকদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব মেনে নেয়া যাবে না, বরং দেশ ও সমাজে তাদের যাবতীয় কর্তৃত্ব হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। অপরদিকে কুরআন- সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারী লোকদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, তাদের আনুগত্যের অপরিহার্যতা সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেছেন-

ইয়া আইয়্যুহাল্লাযীনা আ-মানু আতিউল্লা-হা ওয়া আতিউর রাসূলা ওয়া উলিল আমরি মিনকুম।

হে ঈমানদারগণ! আনুগত্য করো আল্লাহর, আনুগত্য করো রাসূলের এবং সেসব লোকদেরও, যারা তোমাদের মধ্যে সামগ্রিক দায়িত্বসম্পন্ন। অতপর তোমাদের মধ্যে যদি কোনো ব্যাপারে মতবৈষম্যের সৃষ্টি হয়, তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। যদি তোমরা প্রকৃতই আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হয়ে থাকো, (তাহলে) এই পদ্ধতিই হবে (তোমাদের বিরোধ মীমাংসার) সর্বোৎকৃষ্ট উপায় এবং বিরোধপূর্ণ বিষয়সমূহের ব্যাখ্যার দিক থেকেও (এটি) হচ্ছে উত্তম পন্থা। (সূরা আন্ নিসা-৫৯)

মুসলিম জনগোষ্ঠী কোন্ শ্রেণীর লোকদের আনুগত্য করবে, তাদের গুণ ও বৈশিষ্ট কি, এ ব্যাপারে মুসলমানরা যেনো তাদের যোগ্য নেতা নির্বাচনে ভুল না করে, এ জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুসলমানদের যোগ্য নেতার পরিচয়ও স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন-

আল্লাযীনা ইম মাককান্না-হুম ফিল আরদ্বি আক্কা-মুস সালা-তা ওয়া আ-তাউয যাকা-তা ওয়া আমারূ বিল মা’রূফি ওয়া নাহাও ‘আনিল মুনকারি।

আমি যদি এ (মুসলমান)-দের (আমার) যমীনে (রাজনৈতিক) প্রতিষ্ঠা দান করি, তাহলে তারা (প্রথমে) নামায প্রতিষ্ঠা করবে, (দ্বিতীয়) যাকাত আদায় (-এর ব্যবস্থা) করবে, আর (নাগরিকদের) তারা সৎকাজের আদেশ দিবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। (সূরা আল হাজ্জ-৪১)

অর্থাৎ মুসলিম জনগোষ্ঠীর যোগ্য নেতা তারাই, কেবলমাত্র তারাই নেতৃত্বের আসন অলঙ্কৃত করতে পারবে, যারা নেতৃত্বের আসনে আসীন হলে ব্যক্তিগত জীবনে ফাসেকী, দুষ্কৃতি, অহঙ্কার ও আত্মম্ভরিতার শিকার হওয়ার পরিবর্তে নামাজ কায়েম করবে। দেশের মুসলিম জনতাকে নামাজের দিকে অগ্রসর করাবে। তাদের ধন-সম্পদ বিলাসিতা ও প্রবৃত্তি পূজার পরিবর্তে যাকাত আদায়ের মাধ্যমে ব্যয় করবে। দেশের ধনীদের কাছ থেকে যাকাত আদায় করে অভাবীদের মধ্যে বন্টন করবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যন্ত্রকে তারা সৎকাজ বিকশিত ও সম্প্রসারিত করার কাজে প্রয়োগ করবে। আইনের মাধ্যমে তারা অসৎ কাজকে দেশ থেকে বিদূরিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা-সংগ্রাম করবে। মুসলিম জনতার নেতৃবৃন্দ ইসলাম বিরোধী কর্মসমূহের মূলোৎপাটিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করবে আর ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ভাবধারার প্রসার ঘটাবে।

অথচ বর্তমান বিশ্বের মুসলিম নেতৃত্ব মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ঘোষণার প্রায় সম্পূর্ণ বিপরীত পথেই অগ্রসর হচ্ছে। ইসলাম বিরোধী, অপরাধ প্রবণ, নীতি-নৈতিকতাহীন, পাশ্চাত্যের ক্রীড়নক, পরাশক্তির গোলাম ও দুনিয়া পূজারী নেতৃত্বই মুসলমানদের নেতৃত্বের আসনসমূহ দখল করে রয়েছে। এর অনিবার্য পরিণতি যা হবার তাই হয়েছে। এই ধরনের অপরাধ প্রবণ ও অযোগ্য নেতৃত্বের ব্যাপারে মুসলমানদেরকে সাবধান করে নবী করীম (সা:) ঘোষণা করেছেন- ইযা দুয়্যি’আতিল আমা-নাতু ফানতাযিরিস সা-’য়াতা ক্কা-লা আদোয়া-’আতুহা ইয়া রাসূলাল্লা-হি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামা ক্কা-লা ইযা উসনিদাল আমরু ইলা গাইরি আহলিহী ফানতাযিরিস সা-’য়াতা।

যখন আমানতসমূহ বিনষ্ট করা হবে তখন তুমি কিয়ামতের গযব নাযিলের অপেক্ষা করবে। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হলো, আমানতসমূহ বিনষ্ট করা হয় কিভাবে? উত্তরে তিনি বললেন, অযোগ্য ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের হাতে নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের আমানত অর্পন করা আমানত বিনষ্ট করার নামান্তর। সুতরাং যখন অযোগ্য ব্যক্তির প্রতি নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব অর্পিত হবে, তখন তুমি কিয়ামতের মহাবিপদের অপেক্ষা করো। (বুখারী)

এবার মুসলিম দেশসমূহে বাস্তব অবস্থার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখা যাবে, খুলাফায়ে রাশেদীনের অনুসৃত নীতি পরিত্যাগ করে পাশ্চাত্যের ভোগবাদী গণতন্ত্রের মূর্তির পূজা করা হচ্ছে। এই গণতন্ত্রের নামে এমন এক নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছে যে, যেখানে অজ্ঞ ও বিজ্ঞ লোকের মতামতের মূল্যমান সমান। অজ্ঞ ও বিজ্ঞ লোকের মতামতের মূল্যমান সমান হেতু এই সুযোগটির সদ্ব্যবহার করার জন্য কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে সমাজের অসৎ, অপরাধ প্রবণ ও পরস্বার্থ হরণকারী হিংস্র প্রকৃতির দুষ্কৃতিকারী লোকজন। তারা দেশ ও সমাজ সম্পর্কে অসচেতন, অজ্ঞ, অশিক্ষিত ও ন্যায়-অন্যায়ের বিচার বোধহীন অভাবী লোকদের মধ্যে অর্থ বিলি-বন্টন করে নিজেদের পক্ষে রায় ক্রয় করছে। এ পথে নেতৃত্বের আসন লাভ করার ব্যাপারে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে নানা ধরনের কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করছে। নেতৃত্বের আসন লাভ করার যাবতীয় কূটকৌশল ব্যর্থ হলে পেশী শক্তির আশ্রয় গ্রহণ করে সন্ত্রাসের মাধ্যমে নেতৃত্বের আসন দখল করছে।

এর অনিবার্য বিষময় ফল দেশ ও সমাজের প্রত্যেক স্তরে প্রতিভাত হচ্ছে। অপরাধ প্রবণ, অসৎ প্রকৃতির দুষ্কৃতিকারী লোকজন দেশ ও সমাজের নেতৃত্বের আসনে আসীন হয়ে অশ্লীলতা, নগ্নতা, বেহায়াপনা, নোংরামী, অন্যায়-অত্যাচার, অবিচার, খুন-রাহাজানী, হত্যা-ধর্ষন, শোষণ-নির্যাতন, শঠতা-প্রতারণা, প্রবঞ্চনা ও জুলুমের প্রত্যেকটি জ্বালা মুখ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সর্বপ্নাবী বন্যার বেগে মুসলিম সমাজে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়েছে। কুরআন-সুন্নাহর মূল্যবোধ বিদায় করে দেয়া হয়েছে। নানা কৌশলে কুরআন-সুন্নাহর ধারক-বাহক ওলামা-মাশায়েখদের প্রতি মুসলিম জন-মানসে অভক্তি আর অশ্রদ্ধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। অপরাধ প্রবণ জালিম নেতৃত্বের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে মুসলিম জনগোষ্ঠী ঈমানী দুর্বলতার শিকার হয়েছে। ঠিক এই সুযোগে সিংহসম সাহাসের অধিকারী মুসলমানদের ঘাড়ের ওপর ইয়াহুদী-নাসারা ও মুশরিক নামক চির ভীরু শৃগালের গোষ্ঠী উদ্বাহু নৃত্য শুরু করেছে। মুসলমানদের এই করুণ অবস্থা দেখে বিশ্বকবি আল্লামা ইকবাল (রাহঃ) বলেছেন-

শের কি সার পে বিল্লি খেল রাহি, ক্যায়সা হ্যায় মুসলমাঁ কা বদ নসীব, শাহাদাত্ কি তামান্না ভুল গ্যায়ি, তাছবি কি দাঁনু মে, জান্নাত ছুঁড় রাহী।

সিংহের মাথার ওপর আজ বিড়াল খেলা করছে। বড়ই দুর্ভাগ্য মুসলমানদের, তারা শাহাদাতের আকাংখা ভুলে গিয়ে তছবিহ্ দানার মধ্যে জান্নাত অনুসন্ধান করছে।

অপরাধ প্রবণ ভোগ-বিলাসে মত্ত নামধারী মুসলিম নেতৃত্ব ও মুসলিম জনতার ঈমানী দুর্বলতার সুযোগে মানবতার দুশমন, পাশ্চাত্যের ভোগবাদী গনতন্ত্রের অনুসারীগণ, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের সহযোগিরা দস্যু-তস্কর এবং নরখাদকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে মুসলিম দেশসমূহে আগ্রাসন চালিয়ে মুসলমানদের রক্তস্রোত বইয়ে তাদের যাবতীয় সম্পদ লুট করে নিজেদের ভাণ্ডার পরিপূর্ণ করছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সৃষ্টিগতভাবে মানুষকে যে মৌলিক অধিকারসমূহ প্রদান করেছেন, গুটি কয়েক শক্তিমান ও প্রভাবশালী মানুষ তা হরণ করেছে। অধিকারহারা বঞ্চিত মানুষ সর্বত্র শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। ইনসাফ নামক শব্দটিকে কফিন আবৃত করে পেরেক ঠুকে দেয়া হয়েছে। কোথাও ন্যায় বিচার নেই, সর্বত্র মজলুম মানুষের হাহাকার। বঞ্চিত জনতার করুণ আর্তচিৎকারে আকাশ-বাতাস বেদনা বিধূর হয়ে উঠেছে।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে নেতা নির্বাচনের মানদণ্ড নিরুপণ করতে হবে। একদিকে যেমন নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রত্যেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে হবে, অপরদিকে নেতৃত্বের যোগ্য কোন্ শ্রেণীর মানুষ, সে সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণার ভিত্তিতে নির্বাচনে মনোনয়ন দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেশের রাজনৈতিক দলসমূহকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। বর্তমানে নেতা নির্বাচিত করার বা নির্বাচনে নমিনেশন দেয়ার যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, এই পদ্ধতি ইসলাম অনুমোদন করে না। কারণ এই পদ্ধতি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ এবং দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর।

নির্বাচনকালে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলসমূহ যে প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিকে নমিনেশন প্রদান করে, এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করে আল্লাহভীরু সৎ মানুষের পক্ষে নির্বাচিত হয়ে নেতৃত্বের পদে আসীন হওয়া প্রায় অসম্ভব। কারণ, যখন নমিনেশন দেয়া হয় তখন প্রার্থী- নির্বাচনে সর্বাধিক অর্থ ব্যয় করতে সক্ষম কিনা অথবা যে কোনো প্রকারে বিজয়ী হতে সক্ষম কিনা, সেদিকটিই দলের নীতি-নির্ধারকদের কাছে মুখ্য হয়ে দেখা দেয়। কারণ, দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার লক্ষ্যে। এ ক্ষেত্রে সর্বাধিক সংখ্যক সদস্যকে বিজয়ী করে আনার প্রতিই দলের লক্ষ্য থাকে নিবদ্ধ।

সুতরাং প্রার্থী আল্লাহভীরু-সৎ, চরিত্রবান কিনা, তার অর্থ-সম্পদ বৈধ পথে অর্জিত কিনা, তিনি প্রকৃত অর্থেই জনগণের সেবা করবেন, না নেতৃত্বের পদ দখল করে যে কোনো উপায়ে অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ করবেন, অথবা নিজের নাম-যশ, প্রভাব- প্রতিপত্তি বিস্তারের লক্ষ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন কিনা, প্রার্থী নিজের এলাকায় সর্বাধিক সৎ ও ভদ্র কিনা, প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, মেধা, জ্ঞান, বিবেক-বুদ্ধি, নীতি-আদর্শ, রুচিবোধ, মননশীলতা ইত্যাদি কোন্ পর্যায়ের, ক্ষমতা লিঙ্গু রাজনৈতিক দল এসব দিকে দৃষ্টি দেয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করে না। ফলে অসৎ উপায়ে যারা ধন-সম্পদ অর্জন করেছে এবং পেশীশক্তি প্রয়োগ করে প্রভাব- প্রতিপত্তি বিস্তার করেছে, এই শ্রেণীর অসৎ লোকগুলোর জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নেতৃত্বের আসন দখল করার পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়।

সুতরাং এই পদ্ধতি পরিহার করে রাজনৈতিক দলসমূহকে ঐসব লোককেই স্ব-স্ব এলাকায় নমিনেশন দিতে হবে, যে লোক আল্লাহভীরু, সৎ-চরিত্রবান। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নেতৃত্বের আসন দখল করার অর্থই হলো, তিনি জনগণের সেবা করতে চান। জনগণের সেবা করা সর্বাধিক দায়িত্বপূর্ণ, কষ্ট, ত্যাগ ও পরিশ্রমের কাজ। তদুপরি এই কঠিন কাজের পেছনে অর্থাৎ জনগণের সেবা করার পেছনে নগদ স্বার্থ জড়িত থাকবে না, এই কাজ হতে হবে নিঃস্বার্থ। আর সাধারণত মানুষের স্বভাব হলো, যে কাজ অত্যন্ত কঠিন, দায়িত্বপূর্ণ, কষ্টের-পরিশ্রমের ও ত্যাগের এবং যে কাজে নগদ প্রাপ্তি নেই, সে কাজ থেকে নিজেকে স্বযত্নে দূরে রেখে অন্যের ওপরে তা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। নিজেকে দায়িত্বমুক্ত রাখতে চায়।

তাহলে যারা জনগণের সেবা করার নামে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নেতৃত্বের আসন দখল করার উদ্দেশ্যে দলের পক্ষ থেকে নমিনেশন লাভের জন্য রীতি মতো প্রতিযোগিতা করে, নমিনেশন লাভের পথ কন্টকমুক্ত করার জন্য প্রতিযোগীকে প্রতিযোগিতা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা ব্যর্থ হলে হত্যা করাতেও দ্বিধা করে না, দলের পক্ষ থেকে নমিনেশন লাভে ব্যর্থ হলে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, অঢেল অর্থ ব্যয় করাসহ যে কোনো উপায়ে নেতৃত্বের আসন দখলে মরিয়া হয়ে ওঠে। জনগণের সেবা করা ও নেতৃত্ব দেয়ার এই চরম কঠিন, দায়িত্বপূর্ণ, কষ্টের, ত্যাগের ও পরিশ্রমের কাজের দায়িত্ব নিজের কাঁধে উঠিয়ে নেয়ার পেছনে তাদের নিশ্চয়ই সৎ উদ্দেশ্য নিহিত থাকে না- এ বিষয়টি অনুধাবন করা কঠিন কিছু নয়।

ঠিক এ কারণেই নেতৃত্বের পদ চেয়ে নেয়া বা এই পদের ব্যাপারে অভিলাষ পোষণ করার ক্ষেত্রে ইসলাম অনুমতি দেয়নি। হযরত আবু মুসা (রা:) থেকে বর্ণনা করা হয়েছে, দুই জন লোক নবী করীম (সা:) এর কাছে উপস্থিত হলো এবং তাঁদের একজন আবেদন করলো, হে আল্লাহর রাসূল! মহান আল্লাহ আপনাকে যে বিরাট দায়িত্ব-ক্ষমতা দান করেছেন তার কোনো দায়িত্বপূর্ণ কাজে আমাকে নিযুক্ত করুন। অন্যজনও অনুরূপ প্রার্থনা জানালো। তাঁদের কথা শুনে নবী করীম (সা:) স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন- আল্লাহর শপথ, আমি এই কাজে এমন কাউকেও নিযুক্ত করবো না, যে এর জন্য প্রার্থনা করে এবং তা পাবার জন্য লোভ পোষণ করে। (মুসলিম)

হযরত আব্দুর রহমান ইবনে সামুরাহ (রা:) থেকে বর্ণনা করা হয়েছে, নবী করীম (সা:) বলেছেন- নেতৃত্বের পদ লাভের জন্য আগ্রহ পোষণ করো না। কারণ এই পদ যদি তুমি প্রার্থনা করে লাভ করো, তাহলে তোমাকে এই পদের কাছে সোপর্দ করে দেয়া হবে। আর নেতৃত্বের পদ যদি প্রার্থনা ব্যতীতই পাওয়া যায়, তাহলে (সেখানে দায়িত্ব পালনের জন্য অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে) তোমাকে সাহায্য করা হবে। (বুখারী, মুসলিম)

সুতরাং নেতৃত্বের পদ অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ পদ, এটা এমন কঠিন দায়িত্ব যে- কোনো বুদ্ধিমান মানুষই এই পদের জন্য আগ্রহী হতে পারে না বা তা লাভ করার জন্য চেষ্টা-সাধনা করতে পারে না। এরপরও যদি কোনো ব্যক্তি চেষ্টা-সাধনা করে নেতৃত্বের পদ লাভ করতে আগ্রহী হয়, তাহলে বুঝতে হবে, সে নেতৃত্বের পদের গুরুত্ব, তীব্রতা ও কঠোরতা অনুধাবন করতে পারেনি- অথবা সব কিছু জেনে বুঝে নিছক স্বার্থ ও ক্ষমতার লোভ-লালসার কারণেই সে নেতৃত্বের পদ লাভের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এই ধরনের কোন ব্যক্তি নেতৃত্বের পদ পাওয়ার যোগ্য নয় এবং যে ব্যক্তি নেতৃত্বের পদ লাভের জন্য চেষ্টা-সাধনা করবে, তাকে এমন সুযোগ দেয়াও ইসলাম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

পক্ষান্তরে নেতৃত্বের পদ লাভের আগ্রহ, চেষ্টা-সাধনা ব্যতীতই যার ওপরে দায়িত্বপূর্ণ কাজের ভার অর্পণ করা হয়েছে, সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার জন্য আল্লাহ তা'য়ালার কাছ থেকে রহমত ও সাহায্য নাযিল হবে। কারণ এই নেতৃত্বের পদ সে নিজে প্রার্থনা বা চেষ্টা করে লাভ করেনি, এ জন্য তার আগ্রহও ছিলো না। আগ্রহ, চেষ্টা-সাধনা ও প্রার্থনা ব্যতীতই আল্লাহ তা'য়ালার মঞ্জুরীক্রমে জনগণের পক্ষ থেকে তার ওপর অর্পিত হয়েছে। এ জন্য এই দায়িত্ব পালনে সে আল্লাহর রহমত ও জনগণের আন্তরিক সহযোগিতা লাভ করতে পারবে।

এ জন্য নির্বাচনে নমিনেশন দেয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলসমূহকে আল্লাহভীরু সৎ লোক বাছাই করে নমিনেশন দিতে হবে। রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ প্রত্যেক এলাকায় অনুসন্ধান করে দেখবেন, সে এলাকায় কোন্ ব্যক্তি আল্লাহ তা'য়ালালে সবথেকে বেশি ভয় করেন, সৎ-চরিত্রবান, উত্তম জ্ঞান, বিবেক-বুদ্ধির অধিকারী, মেধাবী, নিঃস্বার্থ, ত্যাগী, দক্ষ-যোগ্য, জনপ্রিয় ইত্যাদি গুণ-বৈশিষ্টের অধিকারী, তাকেই নির্বাচনে নমিনেশন দিতে হবে। অপরদিকে জনগণের মধ্যেও এই অনুভূতি শানিত করতে হবে যে, ভোট একটি আমানত। এই আমানত সম্পর্কে আদালতে আখিরাতে আল্লাহ তা'য়ালার কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এ জন্য এই আমানতের খেয়ানত তথা অপব্যবহার করা যাবে না। অর্থাৎ এমন কোনো ব্যক্তিকে ভোট দেয়া যাবে না, যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান অনুসরণ করে না, যার মধ্যে আল্লাহ তা'য়ালার ভয় নেই, অসৎ-অযোগ্য। হতে পারে সে ব্যক্তি নিজের পিতা, ভাই বা কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। সে ব্যক্তি যদি আল্লাহর বিধান অনুসরণে নিষ্ঠাবান না হয়, অসৎ-অযোগ্য হয় তাহলে তাকে ভোট দেয়া যাবে না- এ ব্যাপারে জনগণকে সজাগ করতে হবে। এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করলে আল্লাহভীরু, সৎ-চরিত্রবান, দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্ব লাভ করার সুযোগ জাতি লাভ করবে এবং সমাজ ও দেশ থেকে যাবতীয় অনাচার দূরিভূত হবে ইন্‌শাআল্লাহ্।

নবী করীম (সা:) আমানত বিনষ্ট করা সম্পর্কে যে সতর্ক বাণী উচ্চারণ করেছিলেন, তা বর্তমানে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছে। আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের বিধান এবং সাহাবায়ে কেরামদের অনুসৃত নীতি-আদর্শ প্রত্যেক পদে লংঘন ও অপমানিত করার এক নিষ্ঠুর রীতি মুসলিম সমাজের উচ্চপর্যায় থেকে চালু করা হয়েছে। ফলে সমাজে অশান্তি, অনাচার, বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। এই অবস্থায় মুসলিম মিল্লাতের অস্তিত্ব ও স্বকীয় আদর্শ রক্ষার স্বার্থেই মুসলিম রাষ্ট্র ও সমাজকে ইসলাম বিরোধী নীতি-পদ্ধতি ও আদর্শ থেকে মুক্ত করতে হবে এবং এই দায়িত্ব পালন করতে হবে তাদেরকেই, যারা কুরআনের ধারক ও বাহক তথা আলিম-ওলামা, মাশায়েখ এবং ইসলামী চিন্তাবীদদেরকে। অর্থাৎ রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে ইসলামী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর এটাই হলো আল্লাহর রাসূল ও খুলাফায়ে রাশেদীনের অনুসৃত নীতি-আদর্শ। এ সম্পর্কে নবী করীম (সা:) বলেছেন-

‘আলাইকুম বিসুন্নাতী ওয়া সুন্নাতিল খুলাফা-ইরা-শিদীহাল মাহদিয়্যীন।

'তোমরা আমার আদর্শ ও হেদায়াত প্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শকে অনুসরণ করে চলবে'। ইসলামী নেতৃত্ব তথা আল্লাহভীরু নেতৃত্ব ব্যতীত রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে আল্লাহ ও রাসূলের বিধি-বিধান সার্বিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। ঠিক এই কারণেই কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে-

ইন্না আকরামাকুম ‘ইনদাল্লা-হি আত্ক্কা-কুম।

তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে ব্যক্তি আল্লাহকে সর্বাধিক ভয় করে। কুরআনে ঘোষিত এই মূলনীতি অনুসারে ইসলামী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সক্রিয়ভাবে রাজনীতির ময়দানে তৎপর হওয়াকে ওয়াজিব সাব্যস্ত করা হয়েছে। ইমাম আবু হানিফা (রাহঃ)-এর 'ফিক্সে আকবর' নামক কিতাবে- আল্লামা মুল্লা আলী কারী (রাহঃ) হানাফী, শাফেঈ, মালেকী, হাম্বলী, আহলে হাদীসসহ বিশ্বের মুসলমানদের সর্বশ্রেণীর জ্ঞানী-গুণী, আলোচক-গবেষক ও চিন্তাবিদদের ঐকমত্যে গৃহিত সিদ্ধান্তটি উল্লেখপূর্বক লিখেছেন-রাষ্ট্র ও সমাজে ইসলামী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সমাজে বসবাসকারী লোকদের ওপর ওয়াজিব।

কুরআন ও সুন্নাহর উল্লেখিত দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে এই বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিম সমাজে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামী শরীআতের আইন- কানুন চালু করার উদ্দেশ্যে নবী করীম (সা:) ও সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের ভিত্তিতে ইসলামী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সক্রিয়ভাবে রাজীনিত করা ওয়াজিব। কুরআন- সুন্নাহ্ ভিত্তিক এই রাজনীতির প্রতি অবজ্ঞা-অবহেলা প্রদর্শন করা, ইচ্ছাকৃতভাবে এর প্রতি অমনোযোগী থাকা বা করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা অথবা এই রাজনীতির প্রতি বিরোধিতা করা কুরআন-সুন্নাহ তথা ইসলামী শরীআতের দৃষ্টিতেই জঘন্য অপরাধ।

পক্ষান্তরে অন্যান্য ক্ষেত্রে যারা প্রশংসিত যোগ্যতার অধিকারী কিন্তু রাজনীতির ক্ষেত্রে অবদান রাখতে দুর্বল বা এই ময়দানে সক্রিয় হবার যোগ্যতা রাখেন না অথবা অন্য কোনো প্রকারের গ্রহণযোগ্য অপারগতার কারণে প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় হতে পারেন না কিন্তু ইসলামী বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠার রাজনীতির বিরোধিতাও করেন না- বরং মনে-প্রাণে এই রাজনীতিকে সমর্থন করেন এবং সাম্ভাব্য সকল উপায়ে সাহায্য-সহযোগিতা করেন, ইসলামী শরীআতের দৃষ্টিতে তারা অপরাধী বলে সাব্যস্ত হবেন না।

কিন্তু অগ্রহণযোগ্য তথা ঠুনকো অজুহাতে কেউ যদি কুরআন-সুন্নাহর বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠার রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় থাকেন, এই ময়দান থেকে সরে দাঁড়ান অথবা জাগতিক কোনো স্বার্থ, ভয়-ভীতি বা ক্ষতির কারণে সক্রিয় না হন, তাহলে মুসলিম মিল্লাতই বিপর্যয়ের সম্মুখিন হতে বাধ্য। এ জন্য শরীআতের আইন-কানুন প্রতিষ্ঠার অসীম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে জ্ঞানী-গুণী আলিম-ওলামা মাশায়েখ ও ইসলামী চিন্তাবিদদেরকে নিজেদের সমর্থক এবং কর্মীদেরকে সাথে নিয়ে সুচিন্তিত ফলপ্রসূ কর্মসূচীর ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধভাবে বৃহত্তর ইসলামী রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় তৎপরতা পরিচালিত করতেই হবে। তাদের এই মহান কাজে দেশের সাধারণ মুসলিম জনগণ ইসলামী নেতৃত্বকে সার্বিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতে বাধ্য থাকবেন আর এটাই মুসলমানদের কাছে কুরআন ও সুন্নাহর দাবী।

এ কথা স্পষ্ট স্মরণে রাখতে হবে যে, নেতৃত্বের পরিবর্তন, সৎ নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠা এবং আল্লাহর বিধান রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুরআন-সুন্নাহ্ নির্দেশিত নিয়মতান্ত্রিক পথেই অগ্রসর হতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য কোনো ধরনের অনিয়মতান্ত্রিক পন্থা, অস্বচ্ছ কার্যক্রম, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনভাবে বা কোনো প্রকারে সন্ত্রাসের আশ্রয়ও গ্রহণ করা যাবে না। এমন কোনো পদক্ষেপও গ্রহণ করা যাবে না, যে কারণে বিশৃংখলা ও অরাজকতা সৃষ্টি হতে পারে। মানুষকে আল্লাহর বিধানের দিকে আহ্বান জানাতে হবে, তাদের ভেতরে কুরআন-সুন্নাহর বিধান অনুসরণের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতে হবে এবং এই অনুভূতি তাদের ভেতরে শানিত করতে হবে যে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত না করলে এবং সকল ক্ষেত্রে আল্লাহভীরু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত না হলে দেশ ও সমাজে কাঙ্খিত শান্তি লাভ করা যাবে না।

এই অনুভূতি সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণের মধ্যে সৃষ্টি করে ত্রুটিমুক্ত স্বচ্ছ নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হলে অবশ্য অবশ্যই দেশ ও সমাজে কুরআন-সুন্নাহর বিধান কায়েম করা যাবে এবং সকল ক্ষেত্রে আল্লাহভীরু নেতৃত্বও প্রতিষ্ঠিত করা যাবে। এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার লক্ষ্যেই আলিম-ওলামা-মাশায়েখ ও ইসলামী চিন্তাবিদদেরকে রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। এই দায়িত্ব পালনে অবহেলার পরিচয় দিলে আদালতে আখিরাতে গ্রেফতার হয়ে আযাবের সম্মুখিন হতে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

ফন্ট সাইজ
15px
17px