📄 নবী করীম (সা:) কে দিয়েই নবুয়্যাতের সমাপ্তি
১. পৃথিবীতে বিশেষ কোনো জাতির মধ্যে নবী প্রেরণের প্রয়োজন এ জন্য দেখা যায় যে, তাদের মধ্যে ইতোপূর্বে কোনো নবী-রাসূল আসেননি এবং অন্য কোনো জাতির মধ্যে প্রেরিত নবীর শিক্ষাও তাদের কাছে পৌঁছেনি।
২. নবী প্রেরণের প্রয়োজন এ জন্য দেখা যায় যে, সংশ্লিষ্ট জাতি ইতোপূর্বে প্রেরিত নবী-রাসূলের শিক্ষা ভুলে যায় অথবা তা বিকৃত হয়ে যায় এবং তাঁদের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ অসম্ভব হয়ে পড়ে।
৩. ইতোপূর্বে প্রেরিত নবী-রাসূলের মাধ্যমে প্রদত্ত শিক্ষা মানুষের মধ্যে পূর্ণতা লাভ করেনি এবং দ্বীনের পূর্ণতার জন্য অতিরিক্ত নবীর প্রয়োজন হয়।
৪. কোনো নবীর সাথে সাহায্য-সহযোগিতার জন্য আরেকজন নবীর প্রয়োজন হয়।
এখন এ কথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, ওপরে উল্লেখিত চারটি বিষয়ের মধ্যে কোনো একটিও আর বিশ্বনবী (সা:) এর পরে বিদ্যমান নেই। পবিত্র কুরআন ঘোষণা করেছে, বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা:) কে সমগ্র পৃথিবীর জন্য হিদায়াতকারী হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। পৃথিবীর সাংস্কৃতিক ইতিহাস এ কথা বলে যে, তাঁর নবুয়্যাত প্রাপ্তির পর থেকে সমগ্র পৃথিবীতে এমন অবস্থা বিরাজ করছে, যাতে করে তাঁর নবুয়্যাত সকল যুগে পৃথিবীর সকল জাতির মধ্যে পৌঁছতে পারে। এরপরেও প্রত্যেক জাতির মধ্যে পৃথক পৃথক নবী প্রেরণের প্রয়োজন থাকে না। কুরআন-হাদীস ও সীরাতের সকল বর্ণনাও এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, নবী করীম (সা:) এর শিক্ষা সম্পূর্ণ নির্ভুল, নির্ভেজাল এবং পরিপূর্ণ অবয়বে সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে কোনো প্রকার বিকৃতি বা পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়নি। তাঁর প্রতি যে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল তার মধ্যে আজ পর্যন্ত একটি শব্দেরও কম-বেশি হয়নি। কিয়ামত পর্যন্তও তা হতে পারে না। নিজের কথা ও কর্মের মাধ্যমে যে নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন, তা আজও আমরা এমনভাবে পেয়ে যাচ্ছি, যেন আমরা তাঁরই যুগে বাস করছি। সুতরাং নবী আসার কোন প্রয়োজনই থাকতে পারে না।
পবিত্র কুরআন এ কথা ঘোষণা করেছে, নবী করীম (সা:) এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'য়ালার দ্বীনের পূর্ণতা দান করা হয়েছে। সুতরাং দ্বীনের পূর্ণতার জন্যও কোনো নবী আসার আর প্রয়োজন নেই। তাঁর কাজে সহযোগিতা করার জন্য যদি কোনো সাহায্যকারী নবীর প্রয়োজন হতো, তাহলে সেটা তাঁর জীবনকালেই আল্লাহ তা'য়ালা প্রেরণ করতেন। এ ধরনের কোনো প্রয়োজন ছিল না বিধায় মহান আল্লাহ তা করেননি। বর্তমানে এমন কি কারণ থাকতে পারে যে, নবীকে পৃথিবীতে আসতেই হবে? কেউ যদি যুক্তি প্রদর্শন করে যে, মুসলিম জাতি পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছে এ কারণে তাদের সংস্কারের জন্য একজন নতুন নবীর প্রয়োজন।
এই যুক্তি যারা দিতে চায় তাদের কাছে ইসলামী চিন্তাবিদদের জিজ্ঞাসা, নিছক সংস্কারের জন্য পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত কি কোনো নবী এসেছে যে শুধু এই উদ্দেশ্যেই আর একজন নতুন নবীর আগমন ঘটলো? ওহী অবতীর্ণ করার জন্যই তো নবী প্রেরণ করা হয়। কেননা, নবীর কাছেই ওহী অবতীর্ণ করা হয়। আর ওহীর প্রয়োজন পড়ে কোনো নতুন পয়গাম দেয়ার অথবা পূর্ববর্তী পয়গামকে বিকৃতি থেকে রক্ষা করার জন্য। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কুরআন এবং নবী করীম (সা:) এর আদর্শ সংরক্ষিত হয়ে যাবার পর যখন আল্লাহর দ্বীন পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে এবং ওহীর সকল সম্ভাব্য প্রয়োজন খতম হয়ে গিয়েছে, তখন সংস্কারের জন্য একমাত্র সংস্কারের প্রয়োজনই অবশিষ্ট রয়েছে- নতুন কোনো নবীর নয়।
যখন কোনো জাতির মধ্যে নবীর আগমন হবে, তখনই সেখানে প্রশ্ন উঠবে কুফর ও ঈমানের। যারা ঐ নবীকে স্বীকার করে নিবে, তারা এক উম্মাতভুক্ত হবে এবং যারা তাকে স্বীকার করবে না তারা অবশ্যই একটি পৃথক উম্মাতে শামিল হবে। এই দুই উম্মাতের মতবিরোধ কোনো আংশিক মতবিরোধ বলে গণ্য হবে না বরং এটি এমন একটি বুনিয়াদী মতবিরোধের পর্যায়ে নেমে আসবে, যার ফলে তাদের একটি দল যতদিন না নিজের আকিদা-বিশ্বাসকে পরিত্যাগ করবে, ততদিন পর্যন্ত তারা দু'দল কখনো একত্র হতে পারবে না। এ ছাড়াও কার্যত তাদের প্রত্যেকের জন্য হিদায়াত এবং আইনের উৎস হবে বিভিন্ন। কেননা একটি দল তাদের নিজেদের নবীর ওহী এবং সুন্নাত থেকে আইন প্রণয়ন করবে এবং দ্বিতীয় দলটি এ দু'টোকে তাদের আইনের উৎস হিসেবেই মেনে নিতে প্রথমত অস্বীকার করবে। সুতরাং এই দুই দলের মিলনে একটি সমাজ বা জাতি কোনোক্রমেই সৃষ্টি হতে পারে না। ইতিহাস বলে, নবী করীম (সা:) এর পরে এমন কখনো হয়নি।
এই স্পষ্ট সত্য পর্যবেক্ষণ করার পর যে কোনো ব্যক্তি স্পষ্ট বুঝতে পারবেন, যে নবুয়্যাত মুসলিম জাতির জন্য আল্লাহ তা'য়ালার বিরাট রহমত স্বরূপ। এর বিনিময়েই সমগ্র মুসলিম জাতি একটি চিরন্তন বিশ্বব্যাপী ভ্রাতৃত্বে শামিল হতে পেরেছে। এ বিষয়টি মুসলমানদেরকে এখন সব মৌলিক মতবিরোধ থেকে রক্ষা করেছে, যা তাদের মধ্যে চিরন্তন বিচ্ছেদের বীজ বপন করতো। সুতরাং যে ব্যক্তি নিবী করীম (সা:) কে হিদায়াত দানকারী এবং একমাত্র অনুসরণীয় নেতা বলে স্বীকার করে এবং তিনি যে শিক্ষা দিয়েছেন তাছাড়া অন্য কোনো হিদায়াতের উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়তে চায় না, সে আজ এই ভ্রাতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে। নবুয়্যাতের দরোজা বন্ধ না হয়ে গেলে মুসলিম জাতি কখনো এই ঐক্যের সন্ধান পেতো না। কারণ প্রত্যেক নবীর আগমনের পরে এই ঐক্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতো।
সাধারণত স্থূলভাবে ভাবনা-চিন্তা করলেও মানুষের বিবেক-বুদ্ধিও এ কথাই সমর্থন করে যে, একটি বিশ্বজনীন এবং পরিপূর্ণ দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) দিয়ে দেবার এবং তাকে সকল প্রকার বিকৃতি ও পরিবর্তন-পরিবর্ধন থেকে সংরক্ষিত করার পর নবুয়্যাতের দরোজা বন্ধ হয়ে যাওয়াই উচিত। এর ফলে সম্মিলিতভাবে শেষ নবীর অনুগমন করে সমগ্র পৃথিবীর মুসলমান চিরকালের জন্য একই উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারবে এবং অপ্রয়োজনে নতুন নতুন নবীদের আগমন উম্মাতের মধ্যে বার বার বিভেদ সৃষ্টি হবার সুযোগ থাকবে না।
নতুন নবুয়্যাতের দাবীদারদের ভাষায় নবী 'যিল্লী অর্থাৎ ছায়া নবী' হোক অথবা বুরুজী নবী হোক, উম্মাতওয়ালা হোক, শরীয়াতওয়ালা হোক বা কিতাবওয়ালা হোক, যে কোনো অবস্থায়ই যিনি নবী হবেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে যাকে প্রেরণ করা হবে, তাঁর আগমনের অবশ্যম্ভাবী ফল দাঁড়াবে এই যে, তাকে যারা মেনে নিবে, তারা হবে একটি উম্মাত, আর যারা মানবে না তারা কাফির বলে গণ্য হবে। যখন নবী প্রেরণের সত্যিকারের প্রয়োজন হয়েছিল, শুধুমাত্র তখনই এই বিভেদ অবশ্যম্ভাবী হয়েছিল, বর্তমানে হয়নি এবং কিয়ামত পর্যন্তও হবে না।
পক্ষান্তরে যখন কোনো নবী আগমনের প্রয়োজন থাকে না, তখন আল্লাহ তা'য়ালার হিকমাত এবং তাঁর রহমতের কাছে কোনোক্রমেই আশা করা যায় না যে, তিনি নিজের বান্দাদেরকে শুধু শুধু কুফর ও ঈমানের সংঘর্ষে লিপ্ত করবেন এবং তাদেরকে সম্মিলিতভাবে একটি উম্মাতভুক্ত হবার সুযোগ দিবেন না। সুতরাং কুরআন, সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরামের ইজমা ও সকল আলেম-উলামার ইজমা থেকে যা কিছু প্রমাণিত হয়, মানুষের বিবেক-বুদ্ধিও তাকে নির্ভুল বলে স্বীকার করে এবং তা থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, নবী করীম (সা:) এর পরে চিরকালের জন্য নবুয়্যাতের দরোজা বন্ধ আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। সর্বোপরি নবী করীম (সা:) কে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা যে সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রদান করেছেন, এর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেও এ কথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তাঁর পরে এ পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোনো নতুন নবী-রাসূলের প্রয়োজন নেই।
📄 মর্যাদার সর্বোচ্চ সোপান, তিনিই নবীদের সীল মোহর
নবী করীম (সা:) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন- مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَّسُوْلَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ طَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا ع হে মানুষ (তোমরা জেনে রেখো), মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন, তিনি তো হচ্ছেন আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল এবং নবীদের সিল (মোহর), আল্লাহ তা'য়ালা সর্ববিষয়ে অবগত রয়েছেন। (সূরা আল আহযাব-৪০)
মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে সর্বোচ্চ মর্যাদার পূর্ণ সোপানে উপনীত করেছেন বিধায় তাঁকেই নবী-রাসূলের সীল মোহর হিসাবে ঘোষণা করে নবুয়্যাতের সমাপ্তি করেছেন। পক্ষান্তরে বর্তমান পৃথিবীতে একটি জনগোষ্ঠী যারা কাদিয়ানী নামে পরিচিত, তারা খতমে নবুয়্যাতের বিরুদ্ধে ফেতনা সৃষ্টি করেছে ইসলাম বিদ্বেষী মহল মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত ও দুর্বল করার লক্ষ্যে কাদিয়ানীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। তারা সূরা আহযাবের উল্লেখিত আয়াতের 'খাতামান নাবিয়্যীন' শব্দের অর্থ করে থাকে 'নবীদের মোহর'। তারা বুঝাতে চায়, নবী করীম (সা:) এর পরে তাঁর মোহরাঙ্কিত হয়ে আরো অনেক নবী পৃথিবীতে আগমন করবেন। অথবা অন্য কথায় বলা যায়, যতক্ষণ পর্যন্ত কারো নবুয়্যাত বিশ্বনবীর মোহরাঙ্কিত না হয় ততক্ষণ তিনি নবী হতে পারবেন না।
পক্ষান্তরে উল্লেখিত আয়াতটি যে ঘটনা পরম্পরায় বিবৃত হয়েছে, তাকে সেই বিশেষ পরিবেশে রেখে বিচার করলে, তা থেকে ঐ অর্থ গ্রহণ করার কোনো সুযোগই অবশিষ্ট থাকে না। যারা উল্লেখিত অর্থ গ্রহণ করেছে, যদি সে অর্থ গ্রহণ করা হয় তাহলে যে উদ্দেশ্যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, তার প্রয়োজনীয়তাই বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং প্রকৃত উদ্দেশ্যেরও পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। এটা কি নিতান্ত অবান্তর ও অপ্রাসঙ্গিক কথা নয় যে, হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা:) এর তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী হযরত যয়নব (রা:) এর সাথে নবী করীম (সা:) এর বিয়ের বিরুদ্ধে উত্থিত প্রতিবাদ এবং তা থেকে সৃষ্ট নানা ধরনের সংশয়-সন্দেহের উত্তর দিতে গিয়ে সূরা আহযাবের যেসব আয়াত অবতীর্ণ হয় সহসা সে আয়াতের মাঝে বলে দেয়া হলো যে, 'মুহাম্মদ (সা:) হলেন নবীদের মোহর। অর্থাৎ ভবিষ্যতে যে সংখ্যক নবী আগমন করবেন তারা সকলেই তাঁরই মোহরাঙ্কিত হবেন'।
হযরত যয়নব (রা:) এর ঘটনার মাঝখানে এ কথাটির আকস্মিক আগমন শুধু অবান্তরই নয়, এ থেকে উক্ত বিয়ের বিরোধিদেরকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যে যুক্তি পেশ করা হচ্ছিলো তাও দুর্বল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে বিরোধিদের হাতে এক চমৎকার সুযোগ আসতো এবং তারা সহজেই নবী করীম (সা:) কে বলতে পারতো যে, 'আপনি যয়নবকে বিয়ে করে পালক পুত্রের প্রথা রহিত না-ও করতে পারতেন, এ প্রথা রহিত করতে গিয়ে আজ যে অপবাদের মোকাবেলা আপনাকে করতে হচ্ছে, এ থেকে অন্তত নিষ্কৃতি পেতেন। কেননা এই অর্থহীন বিপর্যয় সৃষ্টিকারী প্রথাটা যদি একান্তই বাতিল করার প্রয়োজন হতো, তাহলে আপনার পরে আপনার মোহরাঙ্কিত হয়ে যেসকল নবী আসবেন, তারাই তো এই প্রথাটি বাতিল করতে পারতেন'।
কিন্তু আরবী ভাষার অধিকারী আরববাসী এ ধরনের কোনো প্রশ্ন নবী করীম (সা:) এর সামনে উত্থাপন করেনি। 'খাতামুন নাবিয়্যীন' শব্দের অর্থ যদি বর্তমানে মিথ্যা নবুয়্যতের দাবিদারদের অনুরূপ হতো, তাহলে আরবের লোকজন নবী করীম (সা:) এর সম্মুখে তেমন কোনো প্রশ্ন অবশ্যই উত্থাপন করতো। আরবদের তুলনায় বর্তমানের কাদিয়ানী গোষ্ঠী কি আরবী ভাষায় অধিক দক্ষ? এই কাদিয়ানী গোষ্ঠী কুরআনের উক্ত আয়াতের আরেকটি অর্থ করেছে যে, 'খাতামুন নাবিয়্যীন'-এর অর্থ হলো, 'আফজালুন নাবিয়্যীন' অর্থাৎ নবুয়্যাতের দরোজা উন্মুক্তই রয়েছে, তবে কিনা নবুয়্যাত পূর্ণতা লাভ করেছে মুহাম্মাদ (সা:) এর ওপর।
কিন্তু তাদের এ অর্থ গ্রহণ করতে গিয়েও পূর্বোল্লিখিত বিভ্রান্তির পুনরাবির্ভাবের হাত থেকে নিষ্কৃতি নেই। মূল ঘটনার অগ্রপশ্চাতের সাথে এ ধরনের কোনো ব্যাখ্যার সাদৃশ্য নেই। বরং তাদের সে ব্যাখ্যা পূর্বাপরের ঘটনা পরম্পরার সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থই প্রকাশ করে। তদানীন্তন কালের কাফির ও মুনাফিকরা নবী করীম (সা:) কে বলতে পারতো, 'হে মুহাম্মদ (সা:), আপনার তুলনায় কম মর্যাদা সম্পন্ন নবী যখন আপনার পরে আসতেই থাকবে, তখন এ পালক পুত্র রহিতকরণের বিষয়টি তাদের ওপরই ছেড়ে দিতেন, এই প্রথার ইতি যে আপনাকেই ঘটাতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা তো নেই'।
মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে উপনীত করে নবী-রাসূলদের আগমনের ধারার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে যে 'খাতামুন' শব্দ ব্যবহার করেছেন, এ শব্দটি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। আরবী ভাষায় এই শব্দটি 'খাতাম'ও হয় আরার 'খাতিম'ও হতে পারে। এ শব্দটি ক্রিয়াবাচক হতে পারে আবার শেষ অর্থে নাম ও 'পদ'ও হতে পারে। যা দিয়ে শেষ করা হয় এ শব্দটি সে অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে। অর্থাৎ এই শব্দ ব্যবহার করে নবুয়্যাতের দ্বার চিরতরে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সূরা আহযাবে ব্যবহৃত খাতাম শব্দটির মাত্র একটি অর্থই হতে পারে। সে অর্থ হলো, নবুয়্যাতের দ্বার চিরতরে কিয়ামত পর্যন্ত রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। নবী করীম (সা:) এর পরে কোনো নবী আগমনের অবকাশ নেই এবং অবকাশ নেই রিসালাতের। এ ব্যাপারে, আল্লাহর রাসূল, সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের পরবর্তীকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত রচিত কুরআনের অভিধান, তাফসীর ও ইতিহাসের এ বিষয়ে এটাই শেষ কথা। এ সম্পর্কে দুইজন গবেষকও দ্বিমত প্রকাশ করেননি।
সকল অভিধান বিশারদ এবং মুফাস্সিরীনে কেরাম 'খাতামুন নাবিয়্যীন' শব্দের অর্থ গ্রহণ করেছেন, আখিরুন নাবিয়্যীন অর্থাৎ নবীদের শেষ। আরবী অভিধান এবং প্রবাদ অনুযায়ী 'খাতাম'-এর অর্থ ডাক ঘরের মোহর নয়, যা চিঠির ওপর লাগিয়ে চিঠি ডাকে দেয়া হয়, বরং সেই মোহর যা খামের মুখে এ উদ্দেশ্যে লাগানো হয় যে, তার ভেতর থেকে কোনো জিনিস বাইরে বের হতে পারবে না এবং বাইরের কোন জিনিস ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না। সমগ্র কুরআনে নবী করীম (সা:) এর সর্বোচ্চ মর্যাদার যে চিত্র মহান আল্লাহ তা'য়ালা অঙ্কন করেছেন, কাদিয়ানীরা কুরআনে বিবৃত 'খাতাম' শব্দের যে অর্থ প্রচার করে থাকে তা কুরআনে অঙ্কিত এ চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত।
নবী করীম (সা:) খতমে নবুয়্যাত সম্পর্কে বলেন, 'বনী ইসরাঈলীদের নেতৃত্ব দিতেন আল্লাহর রাসূলগণ। যখন কোনো নবী ইন্তেকাল করতেন, তখন অন্য কোনো নবী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন (সেই শূন্যতা পূরণ করতেন)। কিন্তু আমার পরে কোনো নবী হবে না, শুধু খলীফা'। (বুখারী)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم قَالَ إِنَّ مَثَلِي وَمَثَلَ الأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِي كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى بَيْتًا فَأَحْسَنَهُ وَ أَجْمَلَهُ إِلَّا مَوْضِعَ لَبِنَةٍ مِّنْ زَوِيَةٍ فَجَعَلَ النَّاسُ يَطُوفُوْنَ بِهِ وَيَعْجَبُوْنَ لَهُ وَيَقُولُوْنَ هَلَا وُضِعَتْ هَاذِهِ اللبِنَةُ . وَأَنَا خَاتِمُ النَّبِيِّينَ
হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা:) বলেছেন, 'আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীদের দৃষ্টান্ত হলো, এক ব্যক্তি একটি দালান নির্মাণ করলো এবং তা খুব সুন্দর ও শোভনীয় করে সজ্জিত করলো। কিন্তু তার এক কোণে একটি ইটের স্থান শূন্য ছিল। দালানটির চতুর্দিকে মানুষ ঘুরে ঘুরে তার সৌন্দর্য দেখে বিস্ময় প্রকাশ করছিল এবং বলছিল, এ স্থানে একটি ইট রাখা হয়নি কেনো? বস্তুতঃ আমি সেই ইট এবং আমিই শেষনবী'। (অর্থাৎ আমার আসার পর নবুয়্যাতের দালান পূর্ণতা লাভ করেছে, এখন এর মধ্যে এমন কোনো শূন্যস্থান নেই যাকে পূর্ণ করার জন্য পুনরায় কোনো নবীর প্রয়োজন হবে।) (বুখারী)
এই একই ধরনের বক্তব্য সম্বলিত চারটি হাদীস মুসলিম শরীফে কিতাবুল ফাযায়েলের বাবু খাতামুন নাবিয়্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। এবং শেষ হাদীসটিতে কিছু অংশ বেশি উল্লেখ করা হয়েছে যে, 'এরপর আমি এলাম এবং আমি নবীদের সিলসিলা খতম করে দিলাম'। হাদীসটি তিরমিজী শরীফে একই শব্দসহ কিতাবুল মানাকিবের বাবু ফাদলিন নাবী এবং কিতাবুল আদাবের বাবুল আমসালে বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদে আবু দাউদ তিয়ালাসীতে হাদীসটি জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা:) বর্ণিত হাদীসের সিলসিলায় উল্লেখ করা হয়েছে এবং এর শেষের অংশ হলো 'আমার মাধ্যমে নবীদের সিলসিলা খতম হলো'।
মুসনাদে আহমাদে সামান্য শাব্দিক পার্থক্যের সাথে একই বক্তব্য সম্বলিত হাদীস হযরত উবাই ইবনে কা'ব, হযরত আবু সাঈদ খুদরী এবং হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহুম আজমাঈন থেকে বর্ণিত হয়েছে। নবী করীম (সা:) বলেন, 'ছয়টি ব্যাপারে অন্যান্য নবীদের ওপর আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে। (১) আমাকে পূর্ণ অর্থব্যঞ্জক সংক্ষিপ্ত কথা বলার যোগ্যতা দান করা হয়েছে। (২) আমাকে শক্তিমত্তা ও প্রতিপত্তি দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে। (৩) যুদ্ধলব্ধ অর্থ-সম্পদ আমার জন্য হালাল করা হয়েছে। (৪) পৃথিবীর যমীনকে আমার জন্য মসজিদ (অর্থাৎ আমার শরীয়াতে নামাজ কেবল বিশেষ ইবাদাতগাহে নয়, পৃথিবীর প্রত্যেক স্থানে আদায় করা যেতে পারে) এবং মাটিকে পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে (শুধু পানিই নয়, মাটির সাহায্যে তায়াম্মুম করেও পবিত্রতা হাসিল অর্থাৎ অজু এবং গোসলের কাজ সম্পন্ন করা যেতে পারে) পরিণত করা হয়েছে। (৫) সমগ্র পৃথিবীর জন্য আমাকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে এবং (৬) আমার ওপর নবীদের সিলসিলা খতম করে দেয়া হয়েছে'। (মুসলিম)
নবী করীম (সা:) বলেন, 'রিসালাত এবং নবুয়্যাতের সিলসিলা খতম করে দেয়া হয়েছে। আমার পর আর কোনো রাসূল এবং নবী আসবে না'। (তিরমিযী)
নবী করীম (সা:) বলেন, 'আমি মুহাম্মাদ (সা:)। আমি আহ্লাদ। আমি বিলুপ্তকারী, আমার সাহায্যে কুফ্রকে বিলুপ্ত করা হবে। আমি সমবেতকারী, আমার পরে লোকদেরকে হাশরের ময়দানে সমবেত করা হবে (অর্থাৎ আমার পরে শুধু কিয়ামতই বাকি আছে) আমি সবার শেষে আগমনকারী (এবং সবার শেষে আগমনকারী হলো সেই) যার পরে আর নবী আসবে না'। (বুখারী, মুসলিম)
عَنْ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ قَالَ: قَالَ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم لِي خَمْسَةُ أَسْمَاءِ أَنَا مُحَمَّدُ وَ أَنَا الْمَاحِيَ الَّذِي يَمْحُو اللَّهُ بِي الْكُفْرَ وَ أَنَا الْحَاشِرُ الَّذِي يَحْشَرُ النَّاسُ عَلَى قَدَمِي وَ أَنَا الْعَاقِبُ
হযরত জুবাইর ইবনে মুতয়িম (রা:) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলূল্লাহ (সা:) বলেছেন, আমার পাঁচটি নাম রয়েছে। আমি মুহাম্মাদ ও আহমদ। আমি আল মাহী (নিশ্চিহ্নকারী), আমার মাধ্যমে আল্লাহ তা'য়ালা কুফর নিশ্চিহ্ন করেন। আমি আল হাশির (কিয়ামতের দিনে সমবেতকারী) আমার পশ্চাতে মানব জাতিকে সমবেত করা হবে এবং আমি আল আকিব (শেষ আগমনকারী, আমার পর আর কোনো নবী আসবে না) (বুখারী)
নবী করীম (সা:) বলেন, 'আল্লাহ নিশ্চয়ই এমন কোনো নবী পাঠাননি যিনি তাঁর উম্মাতকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেননি। (কিন্তু তাদের যুগে সে বহির্গত হয়নি) এখন আমিই শেষ নবী এবং তোমরা শেষ উম্মাত। দাজ্জাল নিঃসন্দেহে এখন তোমাদের মধ্যে বহির্গত হবে'। (ইবনে মাজাহ্)
হযরত আব্দুর রহমান ইবনে জুবায়ের (রা:) বলেন, 'আমি আবদুল্লাহ ইবনে উমার ইবনে আ'স (রা:) কে বলতে শুনেছি, একদিন আল্লাহর রাসূল (সা:) নিজের ঘর থেকে বের হয়ে আমাদের মাঝে এলেন। তিনি এভাবে এলেন যেন আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি তিনবার বললেন, আমি উম্মী নবী মুহাম্মাদ (সা:)। তারপর বললেন, আমার পর আর কোনো নবী নেই'। (মুসনাদে আহমাদ)
নবী করীম (সা:) বলেছেন, 'আমার পরে আর কোনো নবুয়্যাত নেই। আছে সুসংবাদ দানকারী ঘটনাবলী। জানতে চাওয়া হলো, ইয়া রাসূলুল্লাহ! সুসংবাদ দানকারী ঘটনাগুলো কি? জবাবে তিনি বললেন, 'উত্তম স্বপ্ন-কল্যাণময় স্বপ্ন'। (অর্থাৎ ওহী অবতীর্ণ হবার এখন আর কোনো সম্ভাবনা নেই। খুব বেশি একথা বলা যেতে পারে যে, আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে যদি কাউকে কোনো ইঙ্গিত দেয়া হয়, তাহলে শুধু ভালো স্বপ্নের মাধ্যমেই তা দেয়া হবে) (মুসনাদে আহমাদ, নাসায়ী, আবু দাউদ)
নবী করীম (সা:) বলেন, 'আমার পরে যদি কোনো নবী হতো তাহলে উমার ইবনে খাত্তাব সে সৌভাগ্য লাভ করতো'। (তিরমিযী)
আল্লাহর রাসূল (সা:) হযরত আলী (রা:) কে বলেন, 'আমার সাথে তোমার সম্পর্ক মূসার সাথে হারুনের সম্পর্কের মতো। কিন্তু আমার পরে আর কোনো নবী নেই'। (বুখারী, মুসলিম)
বুখারী এবং মুসলিম তাবুক যুদ্ধের বর্ণনা প্রসংগেও এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমাদে এই বিষয়বস্তু সম্বলিত দু'টো হাদীস হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা:) থেকে বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি বর্ণনার শেষাংশ হলো, 'কিন্তু আমার পরে আর কোনো নবুয়্যাত নেই'। আবু দাউদ তিয়ালাসি, ইমাম আহমাদ এবং মুহাম্মাদ ইসহাক এ সম্পর্কে যে বিস্তারিত বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন তা থেকে জানা যায় যে, তাবুক যুদ্ধে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে নবী করীম (সা:) হযরত আলী (রা:) কে মদীনা নগরীর তত্ত্বাবধান এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রেখে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। এ ব্যাপারটি নিয়ে মুনাফিকরা বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে থাকে।
হযরত আলী (রা:) আল্লাহর রাসূল (সা:) কে বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাকে শিশু এবং নারীদের মধ্যে ছেড়ে যাচ্ছেন? আল্লাহর নবী তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, 'আমার সাথে তোমার সম্পর্ক মূসার সাথে হারুনের সম্পর্কের মতো'। অর্থাৎ তূর পর্বতে যাবার সময় হযরত মূসা (আ:) যেমন বনী ইসরাঈলীদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য হযরত হারুনকে রেখে গিয়েছিলেন অনুরূপভাবে মদীনার হেফাজতের জন্য আমি তোমাকে পেছনে রেখে যাচ্ছি। কিন্তু সাথে সাথে তাঁর মনে এই একথাও জাগে যে, হযরত হারুনের সাথে এভাবে তুলনা করার ফলে হয়তো পরে এ থেকে কোনো বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে। সুতরাং পর মুহূর্তেই তিনি কথাটি স্পষ্ট করে দেন এই বলে যে, 'আমার পর আর কোনো ব্যক্তি নবী হবে না'।
হযরত সাওবান (রা:) বর্ণনা করেছেন, 'আল্লাহর রাসূল (সা:) বলেন, আমার উম্মাতের মধ্যে ত্রিশজন মিথ্যাবাদী হবে। তাদের প্রত্যেকেই নিজেকে নবী বলে দাবী করবে। অথচ আমার পর আর কোনো নবী নেই'। (আবু দাউদ)
আল্লাহর রাসূল (সা:) বলেন, 'আমার পরে আর কোনো নবী নেই এবং আমার উম্মাতের পর আর কোনো উম্মাত নেই'। (বাইহাকী, তাবারাণী)
নবী করীম (সা:) বলেন, 'আমি শেষনবী এবং আমার মাসজিদ' (অর্থাৎ মাসজিদে নববী শেষ মাসজিদ)। (মুসলিম)
অমুসলিম কাদিয়ানী সম্প্রদায় এ হাদীস থেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে,' নবী করীম (সা:) যেমন তাঁর মাসজিদকে শেষ মাসজিদ বলেছেন অথচ এটিই শেষ মাসজিদ নয়, এরপরও পৃথিবীতে অগণিত মাসজিদ নির্মিত হয়েছে। অনুরূপভাবে তিনি বলেছেন যে তিনি শেষনবী। এর অর্থ হলো এই যে, তাঁর পরেও নবী আসবে। অবশ্য শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে তিনি হলেন শেষনবী এবং তাঁর মাসজিদ শেষ মাসজিদ'। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের বিকৃত অর্থই এ কথা প্রমাণ করে যে, এ লোকগুলো আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের কথার অর্থ অনুধাবন করার চেষ্টাও করেনি। মুসলিম শরীফের এ সম্পর্কিত হাদীসগুলো সম্মুখে রাখলেই এ কথা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, আল্লাহর রাসূল তাঁর মাসজিদকে শেষ মাসজিদ কোন্ অর্থে বলেছেন।
এখানে হযরত আবু হুরাইরা (রা:), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা:) এবং হযরত মাইমুনা (রা:) এর যে বর্ণনা ইমাম মুসলিম উদ্ধৃত করেছেন, সেখানে বলা হয়েছে, পৃথিবীর মাত্র তিনটি মাসজিদ এমন রয়েছে যেগুলো সাধারণ মাসজিদগুলোর ওপর শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। সেখানে নামাজ আদায় করলে অন্যান্য মাসজিদের চেয়ে হাজার গুণ বেশি সওয়াব হয় এবং এ জন্য একমাত্র এ তিনটি মাসজিদে নামাজ আদায় করার জন্য ভ্রমণ করা জায়েজ। পৃথিবীর অবশিষ্ট মাসজিদগুলোর মধ্যে সকল মাসজিদকে বাদ দিয়ে বিশেষ করে একটি মাসজিদে নামাজ আদায় করার জন্য সেদিকে ভ্রমণ করা জায়েজ নয়।
উক্ত তিনটি মাসজিদের মধ্যে মাসজিদুল হারাম হলো প্রথম মাসজিদ। হযরত ইবরাহীম (আ:) এই মাসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। দ্বিতীয়টি হলো মাসজিদুল আক্সা, হযরত সুলাইমান (আ:) এটি নির্মাণ করেছিলেন এবং তৃতীয়টি হলো মদীনা নগরীর মাসজিদে নববী। এটি নির্মাণ করেন নবী করীম (সা:)। রাসূলের কথার অর্থ হলো, এখন যেহেতু আমার পর আর কোনো নবী আসবে না, সেহেতু আমার মাসজিদের পর পৃথিবীর আর চতুর্থ এমন কোনো মাসজিদ নির্মিত হবে না, যেখানে নামাজ আদায় করার সওয়াব অন্যান্য মাসজিদের তুলনায় বেশি হবে এবং সেখানে নামাজ আদায় করার জন্য সেদিকে ভ্রমণ করা জায়েজ হবে।
আল্লাহর নবীর কাছ থেকে বহু সংখ্যক সাহাবী এসব হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং বহু মুহাদ্দিস অত্যন্ত শক্তিশালী এবং নির্ভযোগ্য সনদসহ এ হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন। এগুলো অধ্যয়ন করার পর স্পষ্ট জানা যায় যে, নবী করীম (সা:) বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে এ কথা পরিস্কার করে দিয়েছেন যে, তিনিই শেষনবী। তাঁর পর কোনো নবী আসবে না। নবুয়্যাতের ক্রমধারা তাঁর ওপর খতম হয়ে গেছে এবং তাঁর পর যে ব্যক্তি রাসূল অথবা নবী হবার দাবী করবে, সে হবে দাজ্জাল এবং মিথ্যুক। পবিত্র কুরআনের খাতামুন নাবিয়্যীন শব্দের এর চেয়ে বেশি শক্তিশালী, নির্ভরযোগ্য এবং প্রামাণ্য ব্যাখ্যা আর কি হতে পারে? রাসূলের বক্তব্যই এখানে বাস্তব সনদ এবং প্রমাণ। উপরন্তু যখন রাসূলের বক্তব্য কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা করে তখন তা আরো অধিক শক্তিশালী প্রমাণে পরিণত হয়। এখন প্রশ্ন হলো, মুহাম্মাদ (সা:) এর চেয়ে অধিক আর কে কুরআন বুঝেছে এবং তাঁর চেয়ে অধিক কুরআনের ব্যাখ্যার অধিকার কোন্ ব্যক্তির রয়েছে? এমন কে আছে যে, খতমে নবুয়্যাতের অন্য কোনো অর্থ বর্ণনা করবে এবং তা মেনে নেয়া তো দূরের কথা, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করতেও ইসলামের অনুসারীরা প্রস্তুত থাকবে?
খতমে নবুয়্যাতে অবিশ্বাসী কাদিয়ানী সম্প্রদায় নবী করীম (সা:) এর বক্তব্যের বিপরীতে হযরত আয়েশা (রা:) এর বলে কথিত একটি বর্ণনা প্রমাণ হিসেবে পেশ করে। সে বর্ণনা হলো, 'বলো নিশ্চয়ই তিনি খাতামুন নাবিয়্যীন, এ কথা বলো না যে তাঁর পর নবী নেই'।
এ হাদীসের ব্যাপারে ইসলামী চিন্তাবিদদের কথা হলো, প্রথমত নবী করীম (সা:) এর সুস্পষ্ট আদেশকে অস্বীকার করার জন্য হযরত আয়েশা নবী করীম (রা:) এর উদ্ধৃতি দেয়া চরম ধৃষ্টতা। অধিকন্তু হযরত আয়েশা (রা:) এর বলে কথিত হাদীসটি মোটেই হাদীস নয়। এ বর্ণনা নির্ভরযোগ্য নয়। হাদীস শাস্ত্রের প্রামাণিক কোনো গ্রন্থেই হযরত আয়েশার বলে কথিত হাদীসটির উল্লেখ নেই। কোনো বিখ্যাত হাদীস লিপিবদ্ধকারী হাদীস নামে বর্ণিত সে বর্ণনা উল্লেখ করেননি।
হযরত আয়িশা (রা:) এর বর্ণনা বলে কথিত বর্ণনাটি শুধু 'দুররি মানসুর' নামক তাফসীরে এবং 'তাকমিলাহ মাজমা-উল-বাহার' নামক অপরিচিত সংকলন থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এর উৎপত্তি ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে কোনোই ধারণা পাওয়া যায় না। নবী করীম (সা:) এর সুস্পষ্ট হাদীস যা বিখ্যাত হাদীস বর্ণনাকারীরা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে বর্ণনা করেছেন অতি সতর্কতার সাথে, তাকে অস্বীকার করার জন্য হযরত আয়েশার বলে কথিত একেবারেই দুর্বল সূত্রে বর্ণিত হাদীস নামে কথিত বাক্য দিয়ে প্রমাণ পেশ করতে যাওয়া চরমতম ধৃষ্টতা এবং হযরত আয়েশা (রা:) এর ওপরে মদীনার মুনাফিকদের ন্যায় কলঙ্ক আরোপের শামিল।
📄 শেষনবী প্রসঙ্গ ও সাহাবায়ে কেরাম
মহাপবিত্র আল কুরআন ও হাদীসের প্রমাণের পর অবশিষ্ট থাকে সকল সাহাবায়ে কেরামের মতামত এবং সাহাবায়ে কেরামের মতামতই হলো সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাহাবায়ে কেরামের মতামতের সামনে তাঁদের পরবর্তী কোনো মানুষের মতামতের কানাকড়ি মূল্যও নেই। সকল নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবী করীম (সা:) এর ইন্তেকালের অব্যবহিত পরেই যেসব লোক নবুয়্যাতের দাবী করে এবং যারা তাদের নবুয়্যাত স্বীকার করে নেয়, তাদের সকলের বিরুদ্ধে সাহাবায়ে কেরাম সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ করেছিলেন। এ সম্পর্কে মুসাইলামা মিথ্যাবাদীর বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। এই লোকটি নবী করীম (সা:) এর নবুয়্যাত অস্বীকার করেনি, বরং সে দাবী করেছিল যে, মুহাম্মাদ (সা:) এর নবুয়্যাতে তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অংশীদার করা হয়েছে। নবী করীম (সা:) এর ইন্তেকালের পূর্বে এই মিথ্যাবাদী মুসাইলামা আল্লাহর রাসূলের কাছে যে পত্র প্রেরণ করেছিল তাতে সে উল্লেখ করেছিল, 'আল্লাহর রাসূল মুসাইলামার পক্ষ থেকে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ সমীপে। আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আপনি জেনে রাখুন, আমাকে আপনার সাথে নবুয়্যাতের কার্যক্রমে অংশীদার স্থাপন করা হয়েছে'।
এ ছাড়াও ঐতিহাসিক তাবারী একথাও বর্ণনা করেছেন যে, মুসাইলামা যে আযান প্রথার প্রচলন করেছিল তাতে 'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ'-ও বলা হতো। এভাবে স্পষ্ট করে রিসালাতে মুহাম্মাদীকে স্বীকার করে নেবার পরও তাকে কাফির ও মুসলিম উম্মাত বহির্ভূত বলে ঘোষণা করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়েছে। ইতিহাস থেকে এ কথাও প্রমাণ হয় যে, বনু হুনায়ফা সরল অন্তকরণে তার ওপর ঈমান এনেছিল। অবশ্য তারা এই বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গিয়েছিল যে, মুহাম্মাদ (সা:) নিজেই তাকে তাঁর নবুয়্যাতের কাজে অংশীদার স্থাপন করেছেন। এ ছাড়াও আরেকটি কথা হলো, মদীনা থেকে এক ব্যক্তি কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করেছিল এবং বনু হুনায়ফার কাছে গিয়ে সে কুরআনের আয়াতকে মুসাইলামার প্রতি অবতীর্ণ আয়াত বলে বর্ণনা করেছিল। (আল বিদায়াতু ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসীর)
সাহাবায়ে কেরাম এই মিথ্যাবাদীর ব্যাপারে সামান্য অনুকম্পা প্রদর্শন করেননি বরং তার বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম যে অপরাধের কারণে মুসাইলামার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন, তা কোনো বিদ্রোহের অপরাধ ছিলো না বরং সে অপরাধ ছিলো এক ব্যক্তি নবী করীম (সা:) এর পরে নবুয়্যাতের দাবী করে এবং কিছু লোকজন তার প্রতি ঈমান আনে। আল্লাহর রাসূলের ইন্তেকালের অব্যবহিত পরেই সাহাবায়ে কেরাম এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সাহাবায়ে কেরামের পক্ষ থেকে এই যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন হযরত আবু বকর (রা:) এবং সাহাবায়ে কেরামের সমগ্র দলটি একযোগে তাঁর নেতৃত্বাধীনে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। নবী করীম (সা:) শেষনবী এবং তাঁর পরে কোনো ধরনের ছায়া নবী বা যে কোনো নবীর যে আসার আর অবকাশ নেই, সকল সাহাবায়ে কেরামের এই পদক্ষেপই তো সব চেয়ে বড় প্রমাণ।
ইসলামী আইনে সাহাবায়ে কেরামের মতামতের পরে চতুর্থ পর্যায়ের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হলো সাহাবায়ে কেরামের পরবর্তী কালের ইসলামী চিন্তাবিদগণ। বিষয়টি এদিক দিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, হিজরীর প্রথম শতাব্দী থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রত্যেক শতাব্দীর, যুগের এবং সমগ্র মুসলিম জাহানের প্রত্যেক এলাকার ইসলামী চিন্তাবিদগণই সর্বদা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ ঐক্যমত রয়েছেন যে, 'মুহাম্মাদ (সা:) এর পরে কোনো ব্যক্তি নবী হতে পারে না। তাঁর পর যে ব্যক্তি নবুয়্যাতের দাবী করবে এবং যে ব্যক্তি এই মিথ্যা দাবী মেনে নিবে বা সমর্থন দেবে, সে সর্বসম্মতভাবে কাফির এবং ইসলামের সীমানায় তার স্থান নেই'। ইমাম আবু হানিফা (রাহ:) এর যুগে এক ব্যক্তি নবুয়্যাতের দাবী করে বলেছিল, 'আমাকে সুযোগ দাও, আমি যে নবী তা প্রমাণ করে দেবো এবং নবুয়্যাতের দলীল পেশ করবো'।
এ কথা শুনে খতমে নবুয়্যাতের অতন্দ্র প্রহরী হযরত ইমামে আজম আবু হানিফা (রাহ:) দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, 'নবী করীম (সা:) এর পরে যারা নবুয়্যাতের দাবী করবে আর যে ব্যক্তি তাদের কাছে নবী হওয়ার প্রমাণ দাবী করবে সে-ও কাফির হয়ে যাবে। কারণ আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (সা:) বলেছেন, আমার পরে আর কোনো নবী নেই'।
আল্লামা ইবনে জারীর তাবারী (রাহ:) (২২৪-৩১০ হিঃ) তাঁর বিখ্যাত কুরআনের তাফসীরে খাতামুন নাবিয়্যীন শব্দের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, 'যে নবুয়্যাতকে খতম করে দেয়া হয়েছে এবং তার ওপর মোহর লাগিয়ে দেয়া হয়েছে, কিয়ামত পর্যন্ত এর দরোজা আর কারো জন্য খুলবে না'। (তাফসীরে ইবনে জারীর, খণ্ড-২২, পৃষ্ঠা নম্বর ১২)
📄 সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে প্রয়োজনীয় কথা
একটি কথা সকলকেই স্মরণে রেখে সাহাবায়ে কেরাম বা অন্যান্য যুগশ্রেষ্ঠ মনীষীদের জীবনী পাঠ করতে হবে যে, নবী করীম (সা:) এর জীবনী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যে নিয়ম-নীতি, পন্থা ও পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে, তা পৃথিবীর অন্য কোনো দ্বিতীয় ব্যক্তির ক্ষেত্রে হয়নি। সুতরাং নবী করীম (সা:) ব্যতীত অন্য কারো জীবন চরিত রচনার ক্ষেত্রে প্রকৃত সত্য আড়াল হওয়া, কোনো ঘটনা উল্লেখ না হওয়া অথবা কোনো ঘটনা সম্পর্কে অতিরঞ্জিত বর্ণনা, বিদ্বেষপ্রসূত বর্ণনা বা অতি ভক্তি-শ্রদ্ধা রঞ্জিত বর্ণনা, বর্ণনাকারীর দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাধারা, মানসিকতা কর্তৃক প্রভাবিত বর্ণনা দোষাশ্রিত হওয়াই স্বাভাবিক। যেমন হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রাহ:) এর জীবনী গ্রন্থগুলোয় এমন সব ঘটনাবলীর উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়, যা পাঠ করলে মনে হবে যে, তাঁর ক্ষমতা ও মর্যাদা আল্লাহর রাসূলের থেকেও অনেক অনেক বেশি ছিলো (নাউযুবিল্লাহ)। আসলে অতিভক্তির কারণেই এ ধরনের অতিরঞ্জিত ঘটনাবলীর জন্ম দেয়া হয়েছে।
দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, ১৮৫৭ সালে সংঘটিত সিপাহী বিপ্লবের ইতিহাস, তারও পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের ইতিহাস, বালাকোটের ইতিহাস, পাকিস্থান প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং নিকট অতীতে ১৯৭১ সনে বাংলাদেশ জন্ম নেয়ার ইতিহাস সম্পর্কে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, যিনি যে দৃষ্টিভঙ্গি, নীতি-আদর্শ ও চিন্তাধারার অনুসারী ছিলেন, তিনি সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই ইতিহাস রচনা করেছেন। কোথাও প্রকৃত সত্যকে আড়াল করা হয়েছে, কোথাও ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে আবার কোথাও মন-মস্তিষ্কপ্রসূত কাহিনী সংযোজন করা হয়েছে। অধিকাংশ ইতিহাস পক্ষপাত দোষাশ্রিত এবং বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত। সুতরাং দুই ধরনের বর্ণনা সম্বলিত রচিত ইতিহাস পাঠ করে কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তি বা ঘটনা সম্পর্কে মন্তব্য করা বড়ই কঠিন। এ জন্য সমগ্র ইতিহাস পাঠ করে প্রকৃত সত্য অনুধাবন করতে হবে এবং মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যে সত্য আড়াল করা হয়েছে, তা উদ্ঘাটন করার চেষ্টা করতে হবে।
আল্লাহর রাসূলের সাহাবায়ে কেরাম শুধু মুসলিম উম্মাহরই নয়, সমগ্র মানব জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। এ ব্যাপারে বিখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) থেকে বর্ণনা করা হয়েছে-
مَنْ كَانَ مُسْتَنَّا فَلْيَسْتَنَّا بِمَنْ قَدْ مَاتَ فَإِنَّ الْحَيَّ لَا تُؤْمَنُ عَلَيْهِ الْفِتْنَةُ أُولئِكَ أَصْحَابُ مُحَمَّد صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانُوْا أَفْضَلُ هذه الأُمَّةِ أَبَرَّهَا قُلُوبًا وَ أَعْمَقَهَا عِلْمًا وَّ أَقَلُّهَا تَكَلُّفًا إِخْتَارَ هُمُ اللهُ لِصُحْبَةِ نَبِيِّهِ وَلِإِقَامَةِ دِيْنِهِ فَاعْرِفُوْا لَهُمْ فَضْلَهُمْ وَاتَّبِعُوْا هُمْ عَلَى أَثَرِهِمْ وَتَمَسَّكُوا بِمَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ أَخْلَاقِهِمْ وَسِيَرِ هِمْ فَإِنَّهُمْ عَلَى الْهُدَى الْمُسْتَقِيمِ
অর্থাৎ যে ব্যক্তি সুন্নাতের পূর্ণাঙ্গ অনুসারী হতে আগ্রহী, তার উচিত এমন ব্যক্তির সুন্নাত ধারণ করা যিনি ইন্তেকাল করেছেন। কারণ যে ব্যক্তি জীবিত সে যে ভবিষ্যতে ফিত্নায় নিপতিত হবে না, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। আর সেই ইন্তেকাল করা লোকগুলো হচ্ছেন মুহাম্মদ (সা:) এর সাহাবায়ে কেরাম। তাঁরা ছিলেন এই উম্মতের সর্বোত্তম চরিত্রবান লোক। তাঁদের হৃদয় ছিলো সমধিক পূণ্যময়-আলোক উজ্জ্বল এবং গভীরতম জ্ঞান সম্পন্ন। তাঁদের মধ্যে কেনো কৃত্রিমতা ছিলো না। মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁদেরকে বাছাই করেছিলেন তাঁর নবীর সাহাবী হিসেবে এবং তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। অতএব তোমরা তাঁদের সঠিক মর্যাদা অনুধাবন করো, স্বীকার করো, তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করো এবং তাঁদের চরিত্র ও স্বভাবের যতদূর সম্ভব তোমরা গ্রহণ করো। কারণ তাঁরা ছিলেন সঠিক ও সুদৃঢ় হেদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। (মিশকাতুল মাসাবীহ)
তাঁদেরকে অনুসরণ করে কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবমণ্ডলী কৃতকার্যতা ও সফলতার পথে এগিয়ে যাবে। আল্লাহ তা'য়ালা যেমন তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন, অনুরূপভাবে তাঁদেরকে যারা একনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করে এই পৃথিবীতে জীবন পরিচালিত করবে, তাদের প্রতিও আল্লাহ তা'য়ালা সন্তুষ্ট হবেন। আল্লাহর রাসূলের সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন শীশাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ। কুরআন মাজীদে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন-
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الَّذِيْنَ يُقَاتِلُوْنَ فِي سَبِيْلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُمْ بُنْيَانٌ مَّرْصُوصٌ -
আল্লাহ তা'য়ালা তাদেও (বেশি) পছন্দ করেন যারা তাঁর পথে এমনভাবে সারিবদ্ধ হয়ে লড়াই কওে, যেন তারা এক শীশাঢালা সুদৃঢ় প্রাচীর। (সূরা আস্ সফ-৪)
আল্লাহর রাসূলের সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন কুরআনের এই আয়াতের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। আকীদা-বিশ্বাস এবং উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে পূর্ণ ঐকমত্য ছিলো। তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক নিষ্ঠা, আস্থা ও ঐকান্তিকতা পূর্ণমাত্রায় ছিলো। নৈতিক চরিত্রের সর্বোন্নত মান তাঁদের সকলের মধ্যে সক্রিয় ছিলো এবং উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের প্রতি তাঁদের সকলের ঐকান্তিক অনুরাগ ছিলো। এভাবে তাঁরা ছিলেন শীশাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ, ফলে তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিলো আল্লাহর রাসূলের নেতৃত্বে একটি যুগান্তকারী পৃথিবী কাঁপানো ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটানো। তাঁদের ঈমান-আকীদা, ঐক্য ও শক্তির সম্মুখে তাঁদের শত্রুরা প্রত্যক্ষ মোকাবিলায় নাস্তানাবুদ হতে বাধ্য হয়েছিলো। তাঁরা সংখ্যায় মাত্র তিন হাজার হচ্ছে এক লক্ষ রোমান সৈন্যের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছেন। একের পর এক এলাকা বিজয় করে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত করে মজলুম জনতার মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। শক্তিধর স্বৈরাচারীর তত্ত্বে তাউস ভেঙে খান্ খান্ করে দিয়েছেন। তদানীন্তন দুই পরাশক্তি রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের শাসকদের গগনচুম্বী অহঙ্কার ভেঙে ধূলিস্মাৎ করে দিয়েছেন।
আল্লাহর রাসূলের পবিত্র হাতে গড়া মুসলমানদের এই অগ্রযাত্রার কারণে মানবতার দুশমন ইয়াহুদী-নাসারা ও মুশরিকদের নিভু নিভু প্রদীপের শেষ আলোটুকুও নির্বাপিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিলো এবং তাদের পায়ের নীচের মাটি সরে গিয়েছিলো। মুসলমানদের অগ্রযাত্রার মধ্যে তারা নিজের মৃত্যুদূত দেখতে পেয়ে অন্ধকার কুঠুরীতে বসে তারা ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে দিলো। মুসলমানদের ঐক্যে ফাটল ধরানোর ঘৃণ্য দায়িত্ব অর্পিত হলো আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নামক জনৈক ইয়াহুদীর প্রতি। এই কুচক্রী লোকটি তার সঙ্গী-সাথীসহ ইসলামের তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান (রা:) এর কাছে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণের প্রহসন করলো এবং মুসলিম সমাজে প্রবেশ করে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদের সূচনা করলো। নবী করীম (সা:) যা বলেননি এই লোকটি সেসব কথা আল্লাহর রাসূলের নামে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা শুরু করলো। জাল হাদীস রচনা করার মূল হোতাই এই আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নামক অভিশপ্ত লোকটি।
এরপরের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক- মুসলমানদের কলিজায় রক্তক্ষরণের ইতিহাস। জাল হাদীসের সূত্র ধরে মুসলমানদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি হলো। ষড়যন্ত্রকারীরা ইরাকের বসরা, কুফা ও মিসরে ঘাঁটি গেড়ে মুসলিম জাহানের সকল স্থানে ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে দিলো। তাদের ষড়যন্ত্রের কালোহাত ক্রমশ পবিত্র ভূমি মদীনার দিকে অগ্রসর হলো। মক্কা বিজয়ের পরে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, নবী করীম (সা:) এর পবিত্র সান্নিধ্য ও প্রশিক্ষণ দ্বারা তাদের মধ্যে অধিকাংশেরই উপকৃত হওয়ার সুযোগ খুব কম হয়েছে। এরপরও ছিলো তোলাকা বংশের লোকজন, যারা শেষ পর্যন্ত আল্লাহর রাসূলের সাথে বিরোধিতায় লিপ্ত ছিলো। মক্কা বিজয়ের পরে তারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলো বটে, কিন্তু আল্লাহর রাসূলের কাছ থেকে প্রত্যক্ষভাবে ঈমানের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার সুযোগ তাদের ভাগ্যে জোটেনি।
রাসূলের ইন্তেকালের পরে হযরত আবু বকর (রা:) এর খিলাফতের সময় মক্কা বিজয়ের পরে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকেই প্রথমে যাকাত দিতে অস্বীকার করে এবং পরবর্তীতে ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিলো। অপরদিকে মুসায়লামাহ্ নামক এক অভিশপ্ত লোক নিজেকে নবী হিসাবে দাবি করলো। এসব মুরতাদদের সাথে মুসলমানরা যুদ্ধ করতে বাধ্য হলো এবং মুসায়লামাহ্ কাজ্জাবসহ তার দলের অনেকেই মুসলমানদের হাতে নিহত হলো। অপরদিকে ইয়াহুদীদের আদি আবাস ভূমি ছিলো মদীনা। আল্লাহর রাসূলের সাথে বার বার বিশ্বাসঘাতকতা করার কারণে মদীনা থেকে তাদেরকে বহিষ্কৃত হতে হয়। এই ইয়াহুদী গোষ্ঠী আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে গোপনে সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছিলো। এ ধরনের নানাবিধ বিষে মুসলিম সমাজ আক্রান্ত হয়েছিলো ফলে সমগ্র মুসলিম জাহান এক তরিৎ গতিতে বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো।
মক্কা বিজয়ের পরে ইসলাম গ্রহণকারী রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকরা আঁতাত করে মুসলিম সাম্রাজ্যে এক ঘোলাটে পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছিলো। অবশেষে সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিষ্ফোরিত হলো হযরত উসমান (রা:) এর শাহাদাতবরণের মাধ্যমে। তৃতীয় খলীফার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বিশ্বাসঘাতকরা ষড়যন্ত্র নামক বিষবৃক্ষের গোড়ায় পানি সিঞ্চন করতে থাকলো। পরিণতিতে মুসলমানদের আত্মকলহের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটলো জামাল ও সিফফিন যুদ্ধের মাধ্যমে। ভাই কর্তৃক আরেক ভাইয়ের হাত রক্তে রঞ্জিত করে ছাড়লো ষড়যন্ত্রকারীর দল। মুসলিম জাহানে বিভেদ রেখা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে দেখা দিলো। ষড়যন্ত্রের আগুনে জ্বলতে থাকলো মুসলিম জাহান। এরই ধারাবাহিকতায় চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রা:) ও শাহাদাতবরণ করলেন। মুসলমানদের পতনের যে সূচনা ঘটেছিলো, কারবালার লোমহর্ষক- করুণ ঘটনার মধ্য দিয়ে তা যেনো পূর্ণতা লাভ করলো।
এরপর ষড়যন্ত্রকারী ও বিশ্বাসঘাতকদের দল ইসলামের দরদী সেজে মুসলমানদের মধ্যে কয়েকটি দল ও উপদলের সূচনা করলো, কোনো কোনো দল হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহুর প্রতি অতিভক্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত খলীফাতুর রাসূল হযরত আবু বকর, খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমার, হযরত উসমান ও হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহুম আজমাঈনসহ অপরাপর বহু সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে মিথ্যাশ্রিত তথ্য ও তত্ত্বে অবতারণা ঘটিয়ে তাঁদেরকে ঐতিহাসিকভাবে কলঙ্কিত করার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করলো।
এবার সামনে এলো ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাস রচনার পালা। কারবালার নিষ্ঠুর নিদারুণ ঘটনার মধ্য দিয়েই ষড়যন্ত্রের যবনিকাপাত ঘটলো না। ষড়যন্ত্রকারীরা আল্লাহর রাসূলের পবিত্র সাহাবায়ে কেরামের ইতিহাস এমন সুচতুরভাবে কালিমা লিপ্ত করার অপপ্রয়াস গ্রহণ করলো যে, কিয়ামত পর্যন্ত যেনো মুসলিম মিল্লাত সাহাবায়ে কেরামের ইতিহাস নিয়ে আত্মকলহে লিপ্ত থাকে। মুসলিম মিল্লাত যেসব মর্যাদাবান বুযুর্গ ব্যক্তিদের অনুসরণ করে মহাসত্যের পথে তথা কৃতকার্যতা ও সাফল্যের পথে অগ্রসর হবে, সেসব বুযুর্গ ব্যক্তিদের বিতর্কিত করার অপচেষ্টা করলো। যারা বদর, ওহুদ, খন্দক, ইয়ারমুক, হুনাইন ইত্যাদী রণক্ষেত্রে পরস্পরে কাঁধ মিলিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে ইসলাম বিরোধিদের সাথে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করার নিয়তে একদিন যুদ্ধ করেছিলো, কালের আবর্তনে ষড়যন্ত্রকারীদের কূটকৌশলে তাঁরাই পরস্পরের রক্ত পিপাসু হয়ে উঠলো। যাদের ষড়যন্ত্রে সাহাবায়ে কেরামের ইস্পাত কঠিন ঐক্যে ফাটল ধরলো, এক ভাইয়ের হাত অন্য ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হলো, তারাই আবার সাধু সেজে প্রতিযোগিতামূলকভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাস রচনায় কোমর বেঁধে নেমে পড়লো। ষড়যন্ত্রকারীরা ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে মহাসত্যের ধারক-বাহক, মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সিপাহসালার, আমানতদার ও বিশ্বস্ত সাহাবায়ে কেরামের সূর্য-উজ্জ্বল পৃষ্ঠদেশে মসীলিপ্ত করলো। সত্যাশ্রয়ীকে বানালো মিথ্যাশ্রয়ী, আমানতদারকে বানালো খিয়ানতকারী, অহিংসকে বানালো হিংসুক, দয়ালুকে বানালো নিষ্ঠুর, পরস্বার্থ রক্ষাকারীকে বানালো পরস্বার্থ হরণকারী, জাগতিক সহায়-সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতি মোহমুক্ত নির্লোভীকে বানালো ক্ষমতালোভী, সহজ-সরল ও স্বচ্ছ হৃদয়ের অধিকারীকে বানালো কূটকৌশলের অধিকারী ও সোজা পথের পথিককে বানালো বক্র পথের যাত্রী। এভাবে ষড়যন্ত্রকারী বিশ্বাসঘাতকরা এমন ইতিহাস রচনা করলো, যেনো পৃথিবীর অনাগত মানবমণ্ডলী সাহাবায়ে কেরামের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের প্রতি সন্দিহান হয়ে ওঠে।
আরেক শ্রেণীর ঐতিহাসিক, নবী পরিবারের প্রতি অতিমাত্রায় আবেগ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে গিয়ে এমন ইতিহাস রচনা করলো যে, যা হয়ে পড়লো সম্পূর্ণ একপেশে। কেউ আবার আবেগ নির্ভর শব্দ সংযোজন করে ইতিহাস রচনা করে সম্পূর্ণ ইতিহাস গ্রন্থটিই আবেগ নির্ভর করে তুললো। এভাবে কোনো সাহাবীর প্রতি অতিমাত্রায় ভক্তি, কোনো সাহাবীর প্রতি মনের কোণে বিদ্বেষ লালিত করে এমনভাবে ইতিহাস রচনা করা হলো যে, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া পরবর্তী লোকদের জন্য চরম কঠিন হয়ে পড়লো।
বর্তমানে একবিশং শতাব্দীর কয়েকটি ঘটনার দিকে নিরপেক্ষভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে বিষয়টি অনুধাবন করা সহজ হবে। আমেরিকা আফগানিস্থান ও ইরাকে মুসলমানদের রক্তস্রোত বইয়ে দিয়ে দেশ দু'টো দখল করলো। এই দেশ দু'টো দখল করার পূর্বে তারা একটি হাস্যকর প্রেক্ষাপট রচনা করে দেশ দু'টোর উপরে হামলে পড়লো। কালের আবর্তনে একদিন আফগানিস্থান ও ইরাকের ইতিহাস রচিত হবে। এই দেশ দু'টো দখল করার ব্যাপারে আগ্রাসী আমেরিকার সমর্থক যারা-তারা লিখবে, 'এই দেশ দু'টোর শাসক গোষ্ঠী ছিলো সন্ত্রাসের সমর্থক। আল কায়েদা নামক সন্ত্রাসী দলকে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে আমেরিকার টুইনটাওয়ার ধ্বংস করিয়েছে, বিশেষ করে ইরাকের শাসক ছিলো মানবতা ও গণতন্ত্রের দুশমন। ইরাকের শাসক গোষ্ঠী মানবতা বিধ্বংসী অস্ত্র আবিষ্কার করে পৃথিবীকে বিপন্ন করে তুলেছিলো। এ কারণে মানবতার বন্ধু আমেরিকা তার সমর্থকদের সহযোগিতায় দেশ দু'টোয় আক্রমণ করে সন্ত্রাসী দলকে ধ্বংস করে পৃথিবীকে বিপদ মুক্ত করেছে'।
অপরদিকে আমেরিকা-বৃটেন ও ইসরাঈলের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের বিরোধিদের মধ্যে যারা আফগানিস্থান ও ইরাকে আমেরিকার আগ্রাসন সম্পর্কে ইতিহাস রচনা করবে- তারা লিখবে, 'একবিংশ শতাব্দীর জঘণ্যতম স্বৈরাচার, মানবতার দুশমন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বুশ- যে লোকটিই সর্বপ্রথম আমেরিকার ইতিহাসে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে, তিনি অভিশপ্ত ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের নামে ইসলাম ও মুসলমানদের ধ্বংস করে তাদের তেল সম্পদসহ অন্যান্য সম্পদ নিজেদের কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে নিজেরাই আমেরিকার টুইনটাওয়ার ধ্বংস করে মুসলমানদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে স্বাধীন দু'টো মুসলিম দেশ আফগানিস্থান ও ইরাকে যুদ্ধের নামে ধ্বংস যজ্ঞ চালিয়ে দেশ দু'টো দখল করে পরাধীনতার জিঞ্জির পরিয়ে দিয়েছে'।
উল্লেখিত এই দু'ধরনের ইতিহাস রচনা ব্যতীতও নানাজনে নানা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ইতিহাস রচনা করবে এবং আগামী কয়েক শতাব্দী পরের লোকজন যখন এসব ইতিহাস পড়বে, তখন তাদের পক্ষে প্রকৃত সত্য খুঁজে বের করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। এটাই যদি হয় বাস্তবতা এবং প্রকৃত সত্য, তাহলে চৌদ্দশত বছর পূর্বে ষড়যন্ত্রকারী ও বিশ্বাসঘাতকদের কূটকৌশলের কারণে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যে দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছিলো এবং পরবর্তীতে ষড়যন্ত্রকারী ও বিশ্বাসঘাতকরাসহ নানাজনে এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে ইতিহাস রচনা করলো, সেসব ইতিহাস পাঠ করে কি করে একজন সাহাবী সম্পর্কেও বিরূপ মন্তব্য করা যেতে পারে?
সাহাবায়ে কেরামের জীবনী রচনা ও তাঁদের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে যদিও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়, তারপরেও হাদীস গবেষক ও বিশারদ মুহাদ্দিসগণ হাদীস বর্ণনার সনদমূলক ইতিহাস যাচাই করতে গিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছেন যে, আল্লাহর রাসূলের সাহাবায়ে কেরাম হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে পরিপূর্ণ বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছেন। এ কথা সম্পূর্ণ সত্য ও স্পষ্ট যে, পরম সম্মানিত ও মর্যাদাবান সাহাবায়ে কেরাম নবী-রাসূলদের পর সর্বোত্তম সৃষ্ট মাখলুক ছিলেন- নবী-রাসূলদের পরেই তাঁরা ছিলেন মানব জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। পক্ষান্তরে তাঁরা মানবীয় বৈশিষ্টের ঊর্ধ্বেও ছিলেন না।
নবী করীম (সা:) এর অনুপম সাহচর্য, আদর্শ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হওয়ার পরও তাঁদের দ্বারা ভুল-ভ্রান্তি সংঘটিত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু ছিলো না। সুতরাং আল্লাহ তা'য়ালার ইচ্ছা ও কৌশলের এ বিষয়ের স্বাভাবিক দাবী ছিলো এবং আল্লাহর রাসূলেরও একান্ত আকাঙ্খা ছিলো যে, তাঁর সাহাবায়ে কেরামের জীবন চরিত্র থেকে অন্তত: একটি ভুলের চির অবসান হওয়া উচিত, সেই ভুলটি হলো- তাঁর কোনো সাহাবী যেনো ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর ব্যাপারে কোনো মিথ্যা কথা সম্পৃক্ত না করেন। অন্য কোনো ভুল-ভ্রান্তির প্রভাব তো এক ব্যক্তি অথবা কতিপয় ব্যক্তি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
কিন্তু সাহাবায়ে কেরামের ভুল হাদীস বর্ণনার কারণে ইসলামের সমগ্র ইমারতই সন্দেহযুক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা বিদ্যমান ছিলো। এই আশঙ্কা রোধ করা ও অবসানের লক্ষ্যে আল্লাহর রাসূল সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি তাঁর সাহাবায়ে কেরামকে সম্বোধন করে বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আমার ওপর ইচ্ছা করে মিথ্যা আরোপ করবে সে যেন তার জন্য আগুনের আসন ঠিক করে রাখে'। (বুখারী-কিতাবুল ইল্ম)
عَنْ عَبْدِ الْعَزِيزِ قَالَ أَنَسٌ أَنَّهُ لَيَمْنَعُنِي أَنْ أُحَدِّثُكُمْ حَدِيثًا كَثِيرًا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ تَعَمَّدَ عَلَى كَذِبًا فَلْيَتَبَوَّا مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ -
হযরত আব্দুল আযীয (রাহঃ) বর্ণনা করেন, হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, আমাকে তোমাদের কাছে বেশি হাদীস বর্ণনা করতে বাধা দেয় নবী করীম (সাঃ) এর একটি বাণী, যে ব্যক্তি আমার ওপর ইচ্ছা করে মিথ্যা আরোপ করবে সে যেন তার জন্য আগুনের আসন ঠিক করে রাখে'। (বুখারী-কিতাবুল ইল্ম)
رِبْعِي بْنِ حَرَاشٍ يَقُوْلُ سَمِعْتُ عَلِيًّا يَقُوْلُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا تَكْذِبُوا عَلَيَّ فَإِنَّهُ مَنْ كَذَبَ عَلَى فَلْيَلِجِ النَّارَ -
হযরত রিবঈ ইবনে হারাশ (রাঃ) বলতেন যে, তিনি আলী (রাঃ) কে বলতে শুনেছেন, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, তোমরা আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করো না, কারণ যে ব্যক্তি আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করবে তাকে (জাহান্নামের) আগুনে প্রবেশ করতে হবে। (বুখারী- কিতাবুল ইলম)
عَبْدُ اللهِ بْنُ الزُّبَيْرِ قَالَ قُلْتُ الزُّبَيْرِ إِنِّي لَا أَسْمَعُكَ تُحَدِّثُ عَنْ رَّسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَمَا يُحَدِّثُ فُلاَنٌ وَفُلاَنٌ قَالَ أَمَا إِنِّي لَمْ أُفَارِقْهُ وَلَكِنْ سَمِعْتُهُ يَقُوْلُ مَنْ كَذَبَ عَلَى فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ -
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ) বলেন, আমি (নিজ পিতা) যুবাইরকে বললাম, অমুক অমুক লোক যেমন হাদীস বর্ণনা করে, আপনাকে তো আমি রাসূলূল্লাহ (সাঃ) থেকে তেমন হাদীস বর্ণনা করতে শুনি না। তিনি বললেন, দেখো, আমি তাঁর (ঘনিষ্ঠতা) থেকে বিচ্ছিন্ন হইনি। (সুতরাং হাদীস তো আমি জানি) কিন্তু তাঁকে (রাসূল স. কে) বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করবে তাকে তার আসন আগুনের বানাতে হবে। (বুখারী, কিতাবুল ইলম)
عَنْ سَلَمَةَ هُوَ إِبْنُ الأَكْوَعِ قَالَ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ مَنْ يَقُلُ عَلَى مَالَمْ أَقُلْ فَلْيَتَبَوَّ أَمَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ -
দুই শতেরও অধিক সাহাবী আল্লাহর রাসূলের উল্লেখিত হাদীসসমূহ বর্ণনা করেছেন। এমনকি মুহাদ্দিসগণ বর্ণনা করেছেন যে, অন্য কোনো হাদীস এসব হাদীসের বর্ণনার ধারাবাহিকতার সীমায় পৌঁছতে পারেনি। নবী করীম (সা:) এর কোনো হাদীস বর্ণনা করার সময় অধিকাংশ সাহাবী এসব হাদীস শুনাতেন এবং সে সময় আল্লাহ তা'য়ালার ভয়ে তাঁদের চেহারা বিবর্ণ হয়ে যেতো ও দেহ রোমাঞ্চিত হতো। কি জানি, হঠাৎ করে মুখ থেকে যদি কোনো ভুল কথা বের হয়ে যায়, এই ভয়ে অনেক সাহাবী অধিক হাদীস বর্ণনা করা থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখতেন। মুহাদ্দিসগণও এসব হাদীস অধিক বর্ণনা করতেন এবং অনেকে এ হাদীসসমূহ দিয়েই তাঁদের বর্ণনাধারার সূচনা করতেন। এরপর অত্যন্ত সতর্কতা সহকারে হাদীস বর্ণনা করার পর বলতেন-
أَوْ كَمَا قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم
'অথবা নবী করীম (সা:) যেমন বলেছেন'। যেনো অজ্ঞতার কারণে জাহান্নামের শাস্তির যোগ্য হতে না হয়।
এ ব্যাপারে শুধুমাত্র একটি হাদীস নয় বরং অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। বুখারীর কিতাবুল জানায়েয এবং অন্যান্য হাদীস গ্রন্থাবলীতে হযরত মুগীরা ইবনে শু'বা (রা:) প্রমুখ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম (সা:) বলেছেন, 'আমার সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলা অন্য কারো সম্পর্কে মিথ্যা বলা সমপর্যায়ের নয়। যে ব্যক্তি আমার সম্পর্কে মিথ্যা রটনা করলো সে যেনো জাহান্নামকেই তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়'। হযরত আলী (রা:) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম (সা:) বলেছেন, 'আমার প্রতি মিথ্যা কথা সম্পৃক্ত করো না, যে ব্যক্তি আমার সম্পর্কে মিথ্যা রটনার আশ্রয় গ্রহণ করবে, তার জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়া অধারিত'। (বুখারী-কিতাবুল ইল্ম)
কুরাইশে ওয়াসেলী (রা:) থেকে বর্ণিত নবী করীম (সা:) বলেন-
إِنَّ مِنْ أَعْظَمِ الْفَرِى أَنْ يَقُوْلَ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا لَمْ يَقُلْ
সবথেকে বড় মিথ্যা ও জঘণ্যতম রটনা হলো, নবী করীম (সা:) যা বলেননি সে কথা তাঁর সাথে সম্পৃক্ত করা। (বুখারী-কিতাবুল মানাকেব)
হযরত আবু মুসা (রা:) বলেন, 'আমাদের প্রতি নবী করীম (সা:) এর শেষ ওসিয়ত ছিলো, যারা আমার হাদীস ভালোবাসবে তাদের সাথে খুব শীঘ্রই তোমাদের পরিচয় ঘটবে। আমি বলিনি এমন কথা যে ব্যক্তি আমার সাথে সম্পৃক্ত করে প্রচার করবে আমার দিকে সম্বোধন করে বলবে তার ঠিকানা অবশ্যই জাহান্নামে'। প্রায় হাদীস গ্রন্থসমূহেই এই বিষয়ের ওপরে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রাসূলের এই ধরনের অসামান্য সতর্কতা ও কঠোর শাস্তিমূলক সতর্কবাণীর কারণে সাহাবায়ে কেরামদের হৃদয় থেকে আল্লাহর রাসূলের বলা কথার সাথে মাত্র একটি অক্ষরও নিজেদের পক্ষ থেকে সম্পৃক্ত করার প্রবণতা এমনভাবে দূরীভূত হয়েছিলো যে, সমগ্র সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে একজন সাহাবীও আল্লাহর নবীর কথার সাথে নিজের পক্ষ থেকে একটি মাত্র কথাও সম্পৃক্ত করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হযরত আলী (রা:) বর্ণনা করেন, 'আল্লাহ তা'য়ালার শপথ! আল্লাহর রাসূলের প্রতি মিথ্যা কথা সম্পৃক্ত করা অপেক্ষা আকাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া আমার জন্য অধিকতর সহজ বিষয়'। (বুখারী)
হযরত ওয়াকী সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে হযরত আমাশের একটি কথা এভাবে বর্ণনা করেছেন, 'সাহাবায়ে কেরামের প্রত্যেকের অবস্থা এমন ছিলো যে, নবী করীম (সা:) এর কথায় ওয়া, আলিফ বা দাল ধরনের একটি অক্ষরও নিজেদের পক্ষ থেকে সংযুক্ত করে দেয়ার থেকে আকাশ থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে যাওয়াকে তাঁরা প্রাধান্য দিতেন'। যে মুয়াবিয়া (রা:) সম্পর্কে ইতিহাসে নানা ধরনের আপত্তিকর বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া (রাহঃ) মিনহাজুস সুন্নাহ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে উল্লেখ করেছেন, 'আমীর মুয়াবিয়া (রা:) মদীনার মিম্বারে দাঁড়িয়ে যে হাদীস বর্ণনা করেছেন সে হাদীসও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হতো এবং বলা হতো, হাদীস বর্ণনা করার ব্যাপারে তাঁকে সামান্যতম অভিযুক্তও করা যায় না'।
এ জন্য মুহাদ্দিসগণ সাহাবায়ে কেরামের পরবর্তী বর্ণনাকারীদের বর্ণনা যখন বিশ্বস্ত সূত্রে সাহাবায়ে কেরামের বর্ণনা বলে যথার্থ প্রমাণ পেয়েছেন, তখন সাহাবায়ে কেরামদের বর্ণনা গ্রহণ করতে তাঁরা কোনো সন্দেহে জড়িয়ে পড়েননি। কারণ, গবেষক ও মুহাদ্দিসগণের মতে সাহাবায়ে কেরাম সম্পূর্ণরূপে বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী। সুতরাং প্রাচীন ঐতিহাসিকদের মতবিরোধপূর্ণ সকল ইতিহাসের আলোকে সার্বিক বিবেচনায় এ কথা দৃঢ়তার সাথে বলা যেতে পারে যে, হযরত মুয়াবিয়া ও হযরত আমর ইবনুল আ'স (রা:) এর অথবা অন্য কোনো সাহাবীর ব্যাপারে যেসব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয় এবং সে সকল বর্ণনা ত্রুটিমুক্ত নয়। এ ধরনের ইতিহাস কোনোক্রমেই যেমন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না এবং এসব ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে সে সকল সম্মানিত সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে সামান্যতম আপত্তিকর মন্তব্যও করা যেতে পারে না।
কারণ ইতিহাসে দেখা যায়, একই ঘটনা বিভিন্ন সূত্রে নানাভাবে বর্ণিত হয়েছে। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঐতিহাসিক ঘটনাবলীতে জড়তা, স্থবিরতা, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সন্দেহের অবতারণা ঘটেছে। আর এ কারনেই ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনার ক্ষেত্রে অসতর্কতা বশতঃ কোনো কোনো উচ্চস্তরের জ্ঞানী-গুণী গবেষক, সমালোচক তথা পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গও ঐতিহাসিক ভুলের শিকার হয়েছেন। সুতরাং এ কথা স্বীকার করতে মোটেও দ্বিধা করার কারণ থাকতে পারে না যে, এ ধরনের ভুল যারাই করেছেন, তাঁদের ভুলকে শ্রদ্ধার সাথে ভুল বলেই স্বীকার করতে হবে। এ ধরনের ভ্রান্ত ও অস্বচ্ছ ইতিহাস যখন কোনো পণ্ডিত ব্যক্তিদের লেখনী যন্ত্রে ফুটে ওঠে, তখন অন্যান্যদেরকে এ কথা অনুধাবন করতে হবে যে, উক্ত পণ্ডিত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ লেখনী বা বর্ণনার ক্ষেত্রে তদানীন্তন কালের ঘটনাবলীর ইতিহাসকে সঠিক ইতিহাস বলে বুঝতে গিয়ে ঐতিহাসিক ভুলের শিকার হয়েছেন- বিষয়টি এমনও হতে পারে।
পক্ষান্তরে এই ধরনের ঐতিহাসিক ভুল বুঝাবুঝি অথবা ঐতিহাসিক ভুলের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে নবী করীম (সা:) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রতি ঈমানদার হিসাবে হৃদয়ের স্বাভাবিক অদম্য আকর্ষণ জনিত স্পর্শকাতর প্রশ্নটি ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। সিফফিন যুদ্ধে হযরত আলী (রা:) এর খিলাফত বিভক্ত হওয়া, হযরত মুয়াবিয়া (রা:) কর্তৃক তাঁর সন্তান ইয়াযীদের ক্ষমতারোহণ, কারবালার মর্মস্পর্শী লোমহর্ষক ঘটনা সংঘটিত হওয়া, ইয়াযীদ কর্তৃক হাব্রা-এর মর্মান্তিক ঘটনা সংঘটিত হওয়া এবং তার প্রেরিত চার হাজার সৈন্যবাহিনীর দ্বারা পবিত্র মদীনার অধিবাসীদের ওপর নির্মম নিষ্ঠুর নির্যাতন অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘটনা অধিকাংশ মুসলমানদের হৃদয়ের কোমল কোণে স্পর্শ করে হৃদয় জগতকে আলোড়িত করাই স্বাভাবিক। নবী করীম (সা:) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রতি হৃদয়ের স্বাভাবিক ভালোবাসার প্রশ্নে ইতিহাসের এই স্পর্শকাতর কালো অধ্যায়টিতে উপনীত হয়ে বহু উচ্চস্তরের গবেষক, আলোচক-সমালোচক ও পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গও তাঁদের আলোচনা-সমালোচনা ও লেখনীতে ভারসাম্য রক্ষা করতে সক্ষম হননি।
আল্লাহর রাসূলের অবর্তমানে ইতিহাসের এই অধ্যায়ে উপনীত হয়ে কোনো একক ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা বাস্তবতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাছাড়া এই স্পর্শকাতর ঐতিহাসিক অধ্যায়ে যে সকল উচ্চস্তরের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ঐতিহাসিক ভুলের শিকার হয়েছেন- তাঁরা যদিও ভুলের শিকার হয়েছেন, তবুও তাঁদের এই ভুল নবী করীম (সা:) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রতি ঈমানী ভালোবাসার কারণে 'ভারসাম্যহীনতা' বলে আখ্যায়িত করাই সর্বাধিক বিবেচনার বিষয় বলে পরিগণিত করা যেতে পারে।
আমার উল্লেখিত এই কথাকে কেউ যদি ভুলকে বিশুদ্ধ করার ব্যাপারে আমার পক্ষ থেকে ওকালতী হিসাবে গণ্য করেন, তাহলে আমার প্রতি অবিচার করা হবে। কারণ এটা হলো মুসলিম উম্মাহর পারস্পরিক আলোচনা-সমালোচনার ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার ফতোয়াগত একটি সর্বজন স্বীকৃত মূলনীতির ব্যাপার।
পক্ষান্তরে উল্লেখিত এই মূলনীতিটি সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। প্রযোজ্য হবে শুধুমাত্র সেই ক্ষেত্রে- যে ক্ষেত্রে অভক্তি, বিদ্রোহ তথা ইলহাদের অনুপস্থিতির কারণে উল্লেখিত মূলনীতি অবলম্বন করা শরীয়াতের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে। তবে মূল বিষয়টিতে যেহেতু উভয়পক্ষে সম্মানিত ও মর্যাদাবান সাহাবায়ে কেরাম যুক্ত রয়েছেন, সুতরাং তাঁদের আলোচনা-সমালোচনা ও পর্যালোচনায় ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অবলম্বন করা শুধু নিরাপদই নয়- বরং এটাই হবে ইনসাফপূর্ণ নীতি।
অতএব আল্লাহর রাসূলের সম্মানিত সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে রচিত বিদ্বেষপূর্ণ ও সন্দেহযুক্ত জীবনী ও ইতিহাসকে প্রত্যাখ্যাত বলেই সকলের বিবেচনা করা সর্বাধিক উত্তম এবং এর মধ্যেই মুসলমানদের ঈমানী নিরাপত্তা নিহিত- এর মধ্যেই কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধতা ও বিশ্বস্ততা সুরক্ষিত। আর এই নীতি অবলম্বন করেই আমরা দৃঢ়তা ও সাহসিকতার সাথে চ্যালেঞ্জ করে ঘোষণা করতে সক্ষম হচ্ছি যে, 'আমরা পৃথিবীর জীবনে শান্তি, স্বস্তি ও কল্যাণকর জীবন বিধান ইসলামী শরীয়াত ও মৃত্যুর পরবর্তী জগতে নাজাতের ব্যবস্থাপত্র নির্ভরশীল ও বিশ্বস্ত সূত্রে প্রাপ্ত হয়েছি। এই পথ অবলম্বন করে জীবিত থাকা ও মৃত্যুবরণ করা- উভয়টির মধ্যেই রয়েছে কৃতকার্যতা ও সার্থকতা। এই ধরনের সন্দেহাতীত দৃঢ় বিশ্বাসই আমাদের মনোবল বৃদ্ধি করে এবং আমাদের ভেতরে আত্মতৃপ্তি যোগায়'।
আমি একটি বিষয় দৃঢ়তার সাথে উপস্থাপন করতে চাই যে, কোনো বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের মতানৈক্য পরিলক্ষিত হলে বিশেষ কোনো সাহাবীর প্রতি কটুক্তি, অভক্তি, অশ্রদ্ধা, অবজ্ঞা অথবা উপহাস না করে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাহাবায়ে কেরাম কর্তৃক গৃহীত মতামতকে গ্রহণ করলেই যে কোনো দলাদলি, মতানৈক্য ও মতদ্বৈততার অবসান ঘটতে পারে। এ পথ অবলম্বন না করে কোনো বিরোধপূর্ণ কোনো বিষয়কে সামনে অগ্রসর করানোর পন্থা অবলম্বন করার অর্থই হলো, ইসলাম ও মুসলিম মিল্লাতের মারাত্মক ক্ষতিকর পন্থাই অবলম্বন করা। মুসলিম মিল্লাতের সলফে-সালেহীন, ওলামা-মাশায়েখ তথা আহলুস্ সুন্নাত ওয়াল জামাআত সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে এই ধরনের পবিত্র আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা ধারাই পোষণ করতেন। আল ফিহুল আকবর কিতাবের ১০১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, ইমাম আবু হানিফা (রাহঃ) বলেছেন-
لَا تَذْكُرُ أَحَدًا مِنْ أَصْحَابِ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَّا بِخَيْرِ - নবী করীম (সা:) এর সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে আমরা যাঁর আলোচনাই করবো তাতে উত্তম ও প্রশংসনীয় পন্থাই অবলম্বন করবো।
ইমাম তাহাবী (রাহ:) এর আকীদাতুত্তাহাবী নামক কিতাবের ১৩৭ থেকে ১৪০ পৃষ্ঠায় এ ব্যাপারে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে-
وَ نَحْنُ أَصْحَابُ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَ لَا تَفْرُطُ فِي حُبِّ أَحَدٌ مِنْهُمْ وَ لَا نَتْبِرًا مَنْ أَحَدٌ مِنْهُمْ وَ نَبْغُضُ مَنْ يَبْغُضُهُمْ وَ بِغَيْرِ الْحَقِّ يَذْكُرْهُمْ وَ لَا تَذْكُرْهُمْ إِلَّا بِخَيْرٍ وَ حُبُّهُمْ دِيْنِ وَ إِيْمَانِ وَ إِحْسَانِ وَ يَبْغُضُهُمْ وَ نِفَاقٌ وَ طُغْيَانِ
(সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে আমাদের আহলুস্ সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের পন্থা হলো) আমরা নবী করীম (সা:) এর সাহাবায়ে কেরামকে ভালোবাসি। তবে তাঁদের মধ্য থেকে কোনো একজন সাহাবীর প্রতি অধিক ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে অন্য কোনো সাহাবী সম্পর্কে শত্রুতা পোষণ করি না। যারা সাহাবায়ে কেরামের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে এবং তাঁদের ব্যাপারে অশোভন উক্তি করে আমরা তাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করি। আমরা সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে উত্তম ও প্রশংসনীয় আলোচনা করি। (আমরা বিশ্বাস করি) তাঁদেরকে ভালোবাসা দ্বীন, ঈমান ও কল্যাণের পাথেয়। পক্ষান্তরে তাঁদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করা কুফর, মুনাফেকী ও শরীয়াতের সীমা লংঘনের নামান্তর।