📄 নবী করীম (সা:) এর সুন্নাতই ইসলামী শরীয়াত
সুন্নাহ্ আরবী শব্দ। এই সুন্নাহ্ শব্দের আভিধানিক অর্থ করা হয়েছে, তরীকা, পথ-রাস্তা, রীতি-নীতি। আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনেও সুন্নাহ্ শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং তিনি তাঁর নিয়মকে সুন্নাহ্ বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন- سُنَّةَ مَنْ قَدْ أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِنْ رُّسُلِنَا وَلَا تَجِدُ لِسُنَّتِنَا تَحْوِيلاً
তোমার পূর্বে আমি যেসব রাসূল প্রেরণ করেছি এ হলো তাদের ব্যাপারে সুন্নাত এবং তুমি কখনও আল্লাহর সুন্নাতে (নিয়মে) কোনো ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাবে না। (সূরা বনি ইসরাইল-৭৭)
সূরা 'ফাতাহ্'-এ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন- سُنَّةِ اللَّهِ الَّتِي قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلُ جِ وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا -
আল্লাহর সুন্নাত, (চিরন্তন নিয়ম) যা পূর্ব থেকেই কার্যকর রয়েছে, আর কখনও আল্লাহর এ সুন্নাতে- নিয়মে কোনো ধরনের পরিবর্তন দেখবে না। (সূরা ফাতাহ্-২৩)
সূরা ফাতির-এ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরো বলেন- فَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللَّهِ تَبْدِيلاً ج وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللَّهِ تَحْوِيلاً -
তুমি আল্লাহর সুন্নাতে (বিধানে) কোনো পরিবর্তন না, না কখনো তুমি আল্লাহর বিধান নড়াচড়া অবস্থায় (দেখতে) পাবে। (সূরা ফাতির-৪৩)
পবিত্র কুরআনের এসব আয়াতে যে সুন্নাত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, মুফাসীরগণ ও আরবী ভাষাবীদগণ এর অর্থ করেছেন, 'পথ, পন্থা, পদ্ধতি, আল্লাহ তা'য়ালার কর্মকুশলতার বাস্তব পদ্ধতি, আল্লাহর নিয়ম'।
সুতরাং বুঝা গেল যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে পদ্ধতি ও নিয়মের অধীনে তাঁর সৃষ্টিসমূহ পরিচালিত করছেন, তা হলো আল্লাহ তা'য়ালার সুন্নাত এবং তাঁর সুন্নাতে কোনো পরিবর্তন হয় না। আল্লাহ তা'য়ালা মানুষকে দৃষ্টি দান করেছেন দর্শন করার জন্য। শ্রবণশক্তি দান করেছেন শোনার জন্য। মস্তিষ্ক দান করেছেন চিন্তা-গবেষণা করার জন্য। মাথা দিয়ে যেমন চোখের কাজ চলে না, হাত দিয়ে যেমন কানের কাজ চলে না, পা দিয়ে মুখের কাজ চলে না। দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আল্লাহ তা'য়ালা যে কাজের জন্য নির্ধারণ করেছেন, তাই আল্লাহর সুন্নাত এবং তাঁর এ সুন্নাতে কোনো ব্যতিক্রম নেই।
সুন্নাতে নববী এবং ই'ত্তেবা-ই সুন্নাত হলো রাসূলের নিয়ম এবং তাঁর অনুসরণ করা। হাদীস গবেষকগণ অনেক ক্ষেত্রেই সুন্নাতের অর্থ করেছেন, 'শরীয়াত'। এই অর্থে ই'ত্তেবা-ই সুন্নাতের অর্থ হলো, নবী করীম (সা:) আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছ থেকে মানব জাতির জন্য যে জীবন বিধান লাভ করেছেন তা অনুসরণ করা।
এই অর্থে সুন্নাত হলো সেই মৌলিক আদর্শ, যে আদর্শ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন গোটা পৃথিবীবাসীর অনুসরণ-অনুকরণের জন্য অবতীর্ণ করেছেন। যে আদর্শ আল্লাহর রাসূল স্বয়ং তাঁর বাস্তব জীবনে ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্ব পালনের বিশাল বিস্তীর্ণ অঙ্গনে নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করেছেন এবং মানব জাতিকে অনুসরণ করার আহ্বান করেছেন। রাসূলে করীম (সা:) অনুসরণ করেছেন আল্লাহর দেয়া নিয়ম-নীতি। তিনি বলেছেন- إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ ط আমি কারো কোনো আদর্শই অনুসরণ করি না, আমি তাই অনুসরণ করি, যা আমার কাছে ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়। (সূরা আল আনয়াম-৫০)
ইসলামে সুন্নাত বলতে যা বোঝানো হয়েছে তা হলো হাদীস বর্ণনাকারী মুহাদ্দিসগণের ভাষায়, 'রাসূল (সা:) এর মৌখিক বক্তব্য, তাঁর ক্রিয়া-কর্ম, আর অন্য কারো কথায় বা কাজে তাঁর সমর্থন। তিনি আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে যা কিছু বলেছেন, যা কিছু করেছেন অথবা অন্য কারো কাজে বা কথায় যেসব বিষয়ে তিনি সমর্থন দান করেছেন, এগুলোর সমষ্টিই হলো ইসলামী শরীয়াত। এ অর্থে আল্লাহর রাসূলের সুন্নাতের অনুসরণ করার অর্থই হলো ইসলামী শরীয়াতের আনুগত্য করা'।
নবী করীম (সা:) বলেছেন- مَنْ أَحَبَّ سُنَّتِي فَقَدْ أَحَبَّنِي وَ مَنْ أَحَبَّنِي كَانَ مَعِيَ فِي الْجَنَّةِ যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে ভালোবাসলো সে প্রকৃত অর্থে আমাকেই ভালোবাসলো। আর যে আমাকে ভালোবাসলো সে জান্নাতে আমার সাথে অবস্থান করবে।
এখানেও সুন্নাতকে শরীয়াত বা নবী করীম (সা:) এর পরিপূর্ণ জীবনাদর্শকেই বুঝতে হবে। এক কথায় ইসলামী শরীয়াতই সুন্নাতে রাসূলের পরিপূর্ণ রূপ তথা ইসলামের গোটা অবয়ব। এদিক থেকে নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, জুমুআ, ঈদ ও কোরবানী ইত্যাদি ইবাদাত পর্যায়ের বিষয়াদি-আর শরীয়াত মোতাবিক বিয়ে-শাদী, লেন-দেন, বিচার কার্য পরিচালনা ও রাষ্ট্র পরিচালনা ইত্যাদি মুআমালাত পর্যায়ের বিষয়াবলী সব কিছুই সুন্নাতে রাসূলের অন্তর্ভুক্ত। ইসলামী আইন বিশারদগণ তথা ফোকাহায়ে কেরাম কর্তৃক কুরআন ও হাদীস থেকে নির্গত ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাত ইত্যাদী পর্যায়ভুক্ত যেকোন প্রকারের বিষয়াদি মূল সুন্নাতে রাসূলের অন্তর্ভুক্ত।
এদিক থেকে ইসলামী শরীয়াত ও সুন্নাতে রাসূল (সা:) একই জীবনাদর্শের দু'টো নাম। সুন্নাতে রাসূলকে এ ধরনের ব্যাপক অর্থের ধারক হিসেবে গ্রহণ করা হলে, তখন এ বিষয়টি দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সুন্নাতে রাসূলের অনুসরণই হেদায়াতের বাস্তব রূপ, আর সুন্নাতে রাসূলকে প্রত্যাখ্যান করাই হলো পথভ্রষ্টতা তথা দালালাত বা গোমরাহী। আল্লাহর রাসূল (সা:) ঘোষণা করেছেন- لَوْ تَرَكْتُمْ سُنَّةَ نَبِيُّكُمْ لَضَلَلْتُمْ
তোমরা যদি তোমাদের নবীর সুন্নাতকে (জীবনাদর্শকে) প্রত্যাখ্যান করো, তাহলে তোমরা অবশ্যই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে।
সিরাতুল মুস্তাকিম বা হেদায়াতের পথে চলা শুধুমাত্র কুরআনের ওপরে নির্ভর করে না। এ পথে চলতে হলে অবশ্যই রাসূলের সুন্নাতকেও অনুসরণ করতে হবে। হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বলেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন- إِنِّي تَرَكْتُ فِيكُمْ شَيْتَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا بَعْدِ هِمَا أَبَدًا كِتَابُ اللَّهِ وَ سُنَّتِي وَ لَنْ يَفْتَرِقَا حَتَّى يَرِدَا عَلَى الْحَوْضِ
আমি তোমাদের মধ্যে দু'টো জিনিস রেখে যাচ্ছি, এ দু'টো জিনিসের অনুসরণ করতে থাকলে তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। সে দু'টো জিনিসের একটি হলো আল্লাহ তা'য়ালার কিতাব আর অপরটি হলো আমার সুন্নাত এবং কিয়ামতের দিন হাউজে কাওসারে উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত এ দু'টো জিনিস কখনো একটির সাথে থেকে আরেকটি বিচ্ছিন্ন হবে না। (মুস্তাদরাকে হাকেম, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-১৩)
বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক ভাষণ দান কালেও আল্লাহর রাসূল তাঁর সুন্নাতের অনুসরণের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে তা অনুসরণের জন্য মানব জাতিকে তাগিদ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন- يَا أَيُّها النَّاسُ قَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا إِنْ إِعْتَصَمْتُمْ بِهِ فَلَنْ تَضِلُّوْا أَبَدًا أَمْرًا مِ بَيْنَنَا كِتَابُ اللَّهِ وَ سُنَّةُ نَبِيَّه -
হে মানব গোষ্ঠী! আমি তোমাদের কাছে এমন এক অমূল্য সম্পদ রেখে যাচ্ছি, তোমরা যদি সে সম্পদকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো, তাহলে তোমরা কখনও পথভ্রষ্ট হবে না। সে সম্পদ হলো আল্লাহর কোরআন ও তাঁর নবীর সুন্নাত। (সীরাতে ইবনে হিশাম)
আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনুল কারീমেও তাঁর রাসূলের সুন্নাতকে অনুসরণ করার জন্য বারবার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ ছুবহানাহু তা'য়ালা বলেন-
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوهُ قِ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا جِ
এবং (আল্লাহর) রাসূল তোমাদের যা কিছু (অনুমতি) দেন তা তোমরা গ্রহণ করো এবং তিনি যা কিছু নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো। (সূরা আল হাশর-৭)
রাসূলের সুন্নাত অনুসরণের মধ্যেই রয়েছে শান্তি, স্বস্তি, কল্যাণ ও সঠিক পথ। তাঁর সুন্নাত ব্যতীত সহজ-সরল পথ লাভ করা কল্পনার অতীত। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَإِنْ تُطِيعُوهُ تَهْتَدُوا ط
যদি তোমরা তাঁর (রাসূলের) কথা মতো চলো তাহলে তোমরা সঠিক পথ পাবে। (সূরা আন্ নূর-৫৪)
রাসূলের সুন্নাত অনুসরণ করার অর্থই হলো আল্লাহ তা'য়ালার আদেশ পালন করা। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-
مَّنْ يُطِعِ الرَّسُوْلَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ جِ
যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করবে, সে-ই যথার্থ অর্থে আল্লাহর আনুগত্য করলো। (সূরা আন নিছা-৮০)
রাসূলের সুন্নাত অনুসরণ না করলে তথা তাঁর আদেশ-নিষেধ না মানলে, তাঁর সুন্নাতের বিরোধিতা করলে আল্লাহর আদালতে গ্রেফতার হতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
فَلْيَحْذَرِ الَّذِيْنَ يُخَالِفُوْنَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
যারা রাসুলের আদেশের বিরোধিতা করে, তাদের ভয় করা উচিত যে, তাদের ওপর যে কোন বিপদ-মুসিবত আসতে পারে অথবা কোন কঠিন আযাব তাদেরকে পরিবেষ্টন করতে পারে। (সূরা আন্ নূর-৬৩)
রাসূলের সুন্নাতের সাথে সামান্যতম দ্বিমত পোষণ করা, তাঁর সুন্নাতের ব্যাপারে কোন সংশয়-সন্দেহের আবর্তে ঘুরপাক খাওয়ার কারো কোনো অধিকার নেই। প্রশ্নাতীতভাবে তাঁর ইত্তেবা করতে হবে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَّلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ط وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلاً مُّبِينًا ط
যখন আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূল কোনো ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তখন কোনো মুমিন পুরুষ ও কোনো মুমিন নারীর অধিকার নেই যে, তারা সে ব্যাপারে নিজেদের কোনো রকম ইখতিয়ার খাটাবে; (মূলত) যে কেউই আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করবে, সে নিঃসন্দেহে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত হয়ে যাবে। (সূরা আল আহযাব-৩৬)
আল্লাহর রাসূলকে কোন মুসলমান অনুসরণ করতে অনিচ্ছুক হলে সে কাফিরদের দলভুক্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُوْلَ ج فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ
হে নবী আপনি বলে দিন, আল্লাহ ও রাসূলকে মেনে চলো, যদি তা না করো তবে জেনে রেখো, আল্লাহ কাফিরদের ভালোবাসেন না। (সূরা আলে ইমরান-৩২)
📄 সুন্নাতে নববীর অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা
মহান আল্লাহ যেমন আদেশ-নিষেধ দান করার ব্যাপারে কারো মুখাপেক্ষী নন-সম্পূর্ণ স্বাধীন, আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে রাসূলও তেমনি স্বাধীন। আদেশ-নিষেধ দানের ক্ষেত্রে তিনি কোনো মানুষের মুখাপেক্ষী নন। মুসলিম পরিচয় দানকারী ব্যক্তি রাসূলের আদেশ-নিষেধ তথা তাঁর সুন্নাত অনুসরণে বাধ্য। আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও নির্দেশের সাথে দ্বিমত পোষণ করলে মানুষ যেমন পথভ্রষ্ট হয়ে যায়, কাফির হিসেবে চিহ্নিত হয়, রাসূলের আদেশ-নিষেধের সাথে দ্বি-মত পোষণ করলেও মানুষ পথভ্রষ্ট ও কাফির হয়ে যাবে।
আরেকটি ব্যাখ্যানুসারে সুন্নাত হলো, নেক কর্মসমূহের একটি বিশেষ স্তর। ইসলামী শরীয়াতের বিধি-নিষেধ পালনের সুবিধার্থে, ইসলামী শরীয়াত সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী মুজতাহিদ ইমামগণ কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রামাণ্য করণীয় বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত, মুস্তাহাব ও মোস্তাহ্সান ইত্যাদি স্তরসমূহের বিভক্তি দেখিয়েছেন। অপরদিকে বর্জনীয় বিষয়াদিকে হারাম, মাকরুহে তাহরিমী ও সন্দেহযুক্ত বিষয়াদি ইত্যাদি স্তরে বিভক্ত করে উপস্থাপিত করেছেন। আবার শরীয়াত কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়নি এমন ধরনের বিষয়াদিকে মুবাহ বা হালালের স্তরে রেখেছেন।
শরীয়াতের এ ধরনের স্তর বিন্যাসের ক্ষেত্রে ইসলামী আইনবীদগণ তথা ফকীহগণ ফরজ ও ওয়াজিবের পরবর্তী পর্যায়ের করণীয় বহু বিষয়াদিকে সুন্নাত নামে আখ্যায়িত করেছেন। সুন্নাত মুস্তাহাব পর্যায়ের করণীয় নেক কাজগুলো ফরজ ও ওয়াজিবের ক্ষতি পূরণের পক্ষে সহায়ক। ফকীহগণ ফরজ ও ওয়াজিবের পরবর্তী পর্যায়ের কাজগুলোকে আবার দু'ভাগে বিভক্ত করেছেন।
প্রথমত: সুন্নাতে মুআক্কাদাহ্ অর্থাৎ এমন ধরনের সুন্নাত কাজ যা পালন করার জন্য জোর তাগিদ করা হয়েছে।
জামায়াতের সাথে ফরজ নামায আদায় করা, মুষ্ঠি পরিমাণ দাড়ি রাখা, গোঁফ খাটো করা, পুরুষের খতনা করা, যথা সময়ে হাত-পায়ের নখ কাটা, পুরুষের নাভীর নীচের পশম পরিষ্কার করা, বোগলের পশম উপড়িয়ে ফেলা; নারীর উভয় ক্ষেত্রে উপড়ানো, মুসলমানের দাওয়াত গ্রহণ করা, মুসলমানদের পারস্পরিক সাক্ষাতে একের প্রতি অন্যের সালাম আদান-প্রদান করা, মুসাফাহ্ করা, মাথায় টুপি রাখা ইত্যাদি কাজগুলো সুন্নাতে মুআক্কাদাহ্ পর্যায়ের। রোযা পূর্ণ করে সূর্যাস্তের পর ইফতার করা, আর রোযা রাখার জন্য সেহরী খাওয়াও সুন্নাত। তবে সুবহে সাদেক হয়ে গেলে কিছুই খাওয়া বা পান করা যাবে না। বরং তখন কিছু খেলে বা পান করলে রোযা হবে না।
এক মুষ্ঠিরও কম পরিমাণ দাড়ি কেটে ছোট করা মাকরুহে তাহরীমী। দাড়ি শুধু নীচের দিকে বৃদ্ধির সুযোগ দিয়ে মুখের দু'পাশ থেকে কেটে ছোট করাও মাকরুহে তাহরীমী। দাড়িকে বৃদ্ধি লাভ করতে দেয়া আর গোঁফ খাটো করা সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা:) নবী করীম (সা:) থেকে বর্ণনা করেন-
قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم جَزُّوا الشَّوَارِبَ وَاعْفُوا اللْحَيِّ রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, তোমরা তোমাদের গোঁফ খুব ছোট করবে আর দাড়ি লম্বা করবে। (মুসলিম শরীফ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-১২৯)
দাড়ি সম্পর্কে আরো একটি হাদীসে বলা হয়েছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم جَزُّوا لشَوَارِبَ وَارْخُوْا لِلْحَيِّ خَالِفُوا الْمَجُوسَ - হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, তোমরা তোমাদের গোঁফগুলো খুব খাটো করবে, আর দাড়িগুলো লম্বা করে রাখবে। (এ ব্যাপারে) অগ্নি পূজকদের বিপরীত করবে। (মুসলিম শরীফ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-১২৯)
অর্থাৎ যারা আগুনের পূজা করে তারা গোঁফ বড় করে রাখে এবং দাড়ি ছোট করে অথবা দাড়ি একেবারেই কেটে ফেলে। এ জন্য হাদীসে বলা হয়েছে, তোমরা তাদের বিপরীত করবে।
আবার অন্য হাদীসে মুখের দু'দিকের ও নীচের দিকের দাড়ি কেটে ছোট করে রাখার কথা রয়েছে। দাড়ি লম্বা করে রাখা এবং কেটে ছোট করে রাখা- উভয় পর্যায়ের হাদীসের ব্যাখ্যায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা:) এর আমল সম্পর্কীত হাদীসটি সনদ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে রদ্দুল মোহতার কিতাবের তৃতীয় খণ্ডের ৩৯৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, 'দাড়ি সম্পর্কে উল্লেখিত হাদীসের বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার থেকে বিশুদ্ধ সুত্রে বর্ণনা এসেছে যে, তিনি এক মুষ্ঠি থেকে অতিরিক্ত দাড়ি ছেঁটে নিতেন’। তবে এ ক্ষেত্রে এ কথা মনে রাখতে হবে যে, পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুসারী এক শ্রেণীর ভোগবাদী লোক ষ্টাইল হিসেবে যেমন ছোট ছোট দাড়ি রাখে, তাদেরকে অনুসরণ করা ইসলামী আইন বিশারদগণের কেউ বৈধ বলে মনে করেননি। এক মুষ্ঠি দাড়ির অতিরিক্ত দাড়ি ছেটে নেয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে আবু দাউদ শরীফের ব্যাখ্যামূলক কিতাব বাজলুল মাজহুদের প্রথম খণ্ডের ৩০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, আর তা এভাবে করতে হবে যে, পুরুষ লোক তার নিজ দাড়ি হাতের মুঠোয় ধরবে, তারপর মুঠোর বাইরের অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলবে। এমন ধরনের পদ্ধতির বিষয়টি ইমাম মুহাম্মদ (রাহঃ), ইমাম আবু হানিফা (রাহঃ) থেকে কিতাবুল আসারে উল্লেখ করেছেন।
দ্বিতীয়ত: মাথায় পাগড়ী ব্যবহার করা ও গায়ে লম্বা জামা পরিধান করা সুন্নাতে যায়েদাহ্ বা মুস্তাহাব পর্যায়ের কাজ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পাগড়ী ও লম্বা জামা পরিধান করেছেন বলে সহীহ হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত। সুতরাং লম্বা জামা ও পাগড়ী ব্যবহার করতে পারলে উত্তম। কিন্তু নিজে লম্বা জামা ও পাগড়ী ব্যবহারও করবে না এবং যারা ব্যবহার করবে তাদেরকে বিদ্রুপ করবে, এটা বৈধ হবে না। মনে রাখতে হবে, আল্লাহর রাসূল এসব ব্যবহার করেছেন, সুতরাং এ ধরনের বিদ্রুপ করা থেকে নিজেদেরকে হেফাজত করতে হবে। আল্লাহর রাসূলের যে কোনো সুন্নাত-তা হতে পারে বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পর্যায়ের, তার প্রতি সামান্যতম অবহেলা-অবজ্ঞা প্রদর্শন করা যাবে না। এ ব্যাপারে তেমনি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যেমনভাবে নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। কারণ আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন- وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوهُ قِ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا ج
এবং (আল্লাহর) রাসূল তোমাদের যা কিছু (অনুমতি) দেয় তা তোমরা গ্রহণ করো এবং তিনি যা কিছু নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো। (সূরা আল হাশর-৭)
কুরআনের উল্লেখিত আয়াতের অর্থ এটা নয় যে, রাসূলের নির্দেশের মধ্যে ফরজ আর ওয়াজিব পর্যায়ের বিষয়গুলোই অনুসরণ করতে হবে আর সুন্নাতগুলো অনুসরণ না করলেও চলবে। বরং আল্লাহর এ নির্দেশের মধ্যে রাসূলের সুন্নাত অনুসরণের কথাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুতরাং রাসূলের সুন্নাতকে অবহেলা করার অর্থই হবে আল্লাহর নির্দেশের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করা।
শরহে ফিকহে আকবর নামক কিতাবের ২২৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, হানাফী ফকীহঙ্গণ ঐ ব্যক্তির প্রতি কুফরী ফতোয়া আরোপ করেছেন, যে ব্যক্তি রাসূলের কোনো সুন্নাতকে অবজ্ঞা করে সব সময় পরিহার করে থাকে। তবে যারা সুন্নাতকে অস্বীকার বা অবজ্ঞা করে না, বরং সুন্নাতকে পালনীয় সওয়াবের কাজ বলে গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সাথে স্বীকার করে, কিন্তু অলসতা বশতঃ অথবা অন্য কোনো কারণে সুন্নাত পালন করতে পারে না, অথবা সুন্নাত ছুটে যায় এবং এ কারণে অন্তরে অনুশোচনা করে, এমন লোকদের ওপর উল্লেখিত কঠোর ফতোয়া নিপতিত হবে না। কেননা, সুন্নাতের বিরোধী হওয়া এক ব্যাপার আর মাঝে মধ্যে কোনো কারণে ছুটে যাওয়া ভিন্ন ব্যাপার।
সুন্নাত পরিহার সংক্রান্ত বিষয়ে মেশকাত শরীফের ব্যাখ্যামূলক কিতাব মিরকাতুল মাফাতীহ- প্রথম খণ্ডের ৪৪৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, অলসতা বশতঃ রাসূলুল্লাহ (সা:) এর প্রমাণ্য সুন্নাত পরিহার করা হলে সুন্নাত পরিহারকারী ব্যক্তি গুনাহের অভিযোগে তিরস্কৃত হবে। আর অবজ্ঞা বশতঃ সুন্নাত পরিহার করা হলে সুন্নাত পরিহারকারী ব্যক্তি গুনাহের অভিযোগে শাস্তিযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। সুন্নাতকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পরিপূর্ণভাবে সুন্নাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পক্ষে ফকীহ্ ইমামগণের উল্লেখিত মতামত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়াতের যথাযথ আনুগত্যের প্রশ্নে অত্যন্ত গভীর ও ফলপ্রসু ব্যবস্থা-এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। পরিপূর্ণ আমলেই পরিপূর্ণ শান্তির আশা করা যায়।
এখানে উল্লেখ্য যে, মুহাদ্দিসগণ সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য ও ক্রিয়া-কর্মকেও সুন্নাত ও হাদীস নামে আখ্যায়িত করেছেন। প্রকৃত অর্থে সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য ও ক্রিয়া কর্মের মানদণ্ড ব্যতীত রাসূলুল্লাহ (সা:) এর যথাযথ অনুসরণ ও অনুকরণ কোনোক্রমেই সম্ভব নয়।
মিশকাতুল মাসাবীহের শরাহ মিরকাতুল মাফাতীহ-অষ্টম খণ্ডের ১৩৯ পৃষ্ঠা-(১) কিতাবুল ওয়াফা (২) ইবনে মাজাহ্ (৩) জামেয়ে সগীর (৪) ও, মুস্তাদরিকে হাকেম ইত্যাদি হাদীসের কিতাবাদি থেকে হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা:) টাঙ্গুর ওপর পর্যন্ত লম্বা কামিস পরিধান করতেন। সাহাবায়ে কেরাম নবীর কাছ থেকে যা শুনতেন, নবীকে করতে দেখতেন, এসব বিষয় তাঁরা অন্যকে অবগত করা এবং পর্যালোচনা করেই ক্ষান্ত হতেন না, তাঁরা তা নিজেদের জীবনে বাস্তবে রূপদান করতেন।
আল্লাহর রাসূল (সা:) যখন কোনো আকীদা ও নিছক তত্ত্বমূলক কথা বলেছেন, তখন সাহাবায়ে কেরাম তা নিজেদের স্মৃতিতে বদ্ধমূল করে নিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী নিজেদের আকীদা বিশ্বাসের সৌধ নির্মাণ করেছেন। রাসূল (সা:) যখন কোনো আদেশ- নিষেধমূলক কথা বলেছেন, কোনো আইন জারী (Bring a law into force) করেছেন, তখন সাহাবায়ে কেরাম সাথে সাথে তা কাজে পরিণত করেছেন। রাসূলের আদেশ-নিষেধ ও জারী করা আইনকে যতক্ষণ প্রতিদিনের জীবনে নৈমিত্তিক অভ্যাসে পরিণত না হয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁরা তা চর্চা ও অভ্যাস করার ব্যাপারে সামান্য অবহেলা প্রদর্শন করেননি। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) বলেছেন, আমাদের মধ্যে যখন কেউ দশটি আয়াত শিখতো, তখন তার অর্থ অত্যন্ত ভালোভাবে অনুধাবন করা এবং সে অনুসারে কাজ করার পূর্বে সে আর দ্বিতীয় কিছু শেখার জন্য চেষ্টা করতো না। (জামেউল বায়ান)
অর্থাৎ যা শেখা হলো, তার মর্মার্থ অনুধাবন না করে এবং তা বাস্তব জীবনে কর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত না করে সাহাবায়ে কেরাম আরো কিছু শেখার ব্যাপারে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন না। শেখা হলো অনেককিছু কিন্তু আমল করা হলো না, সাহাবায়ে কেরামের জীবন এমন ছিলো না। ইসলামের মৌলিক বিধানসমূহ (Fundamental law of Islam) সাহাবায়ে কেরামের জীবনে বাস্তবায়িত করার জন্য আল্লাহর রাসূল (সা:) বিশেষভাবে যত্ন নিতেন। মুসলিম জনগোষ্ঠী তাঁর নির্দেশ অনুসরণ করছে কিনা, সেদিকে তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেন। তিনি ইসলামের ব্যবহারিক নিয়ম-পদ্ধতির অনুসরণের ওপর অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করতেন। ইসলামের মৌলনীতিসমূহ যেন মুসলমানদের প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়, এজন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। বুখারী শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহর রাসূল (সা:) তাঁর সাহাবায়ে কেরামকে বলতেন-
صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُوْنِي أُصَلِّي তোমরা আমাকে যেভাবে নামায আদায় করতে দেখো, ঠিক অনুরূপভাবে নামায আদায় করবে। (বুখারী)
একইভাবে হজ্জের ব্যাপারে তিনি বলেছেন- خُذُوا عَنِّى مَنَا سِكَكُمْ আমার কাছ থেকে তোমরা হজ্জ পালন করার নিয়ম-পদ্ধতি গ্রহণ করো। (মুসলিম)
পবিত্র কুরআনে নামায আদায়, রোযা রাখা ও যাকাত আদায়ের আদেশসহ অন্যান্য বিষয়ের আদেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এসব আদেশের বিস্তারিত দিক সম্পর্কে আলোচনা করা হয়নি। সুতরাং আল্লাহ তা'য়ালার আদেশের বিস্তারিত দিক জানতে ও অনুসরণ করতে হলে তা আল্লাহর রাসূলের কাছ থেকেই জানতে হবে এবং রাসূল (সা:) যেভাবে আল্লাহ তা'য়ালার বিধানসমূহ বাস্তবায়ন করেছেন সেভাবেই অনুসরণ করতে হবে। কারণ তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্য শিক্ষক। প্রত্যেকটি কাজের নিয়ম-পদ্ধতি শিক্ষাদানের জন্য রাসূল (সা:) স্বয়ং সে কাজ বাস্তবে করে মানুষের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, সাহাবায়ে কেরাম সে নিয়মেই কর্মসমূহ সম্পাদন করেছেন।
ইসলামী বিধানের নিয়ম-পদ্ধতি সাহাবায়ে কেরাম কিভাবে পালন করছেন, রাসূল (সা:) সেদিকে লক্ষ্য করতেন। কারো কোনো ভুল হলে তিনি তা সংশোধন করে দিতেন। বুখারী শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি মসজিদে নববীতে একদিন লক্ষ্য করলেন, একজন সাহাবীর নামায আদায় পদ্ধতি যথাযথভাবে সম্পাদিত হলো না। নামায সমাপ্ত করে সাহাবী যখন তাঁর কাছে এলেন তখন তিনি তাঁকে বললেন, তোমার নামায যথাযথভাবে আদায় করা হয়নি, যাও নামায যথাযথ নিয়মে আদায় করো।
সাহাবী সাথে সাথে চলে গেলেন নামায আদায় করার জন্য। রাসূল (সা:) আবার বললেন, এবারও তোমার নামায আদায় পদ্ধতি ঠিক হলো না। সাহাবী পুনরায় নামায আদায় করলেন। এভাবে চারবার করার পরেও যখন সাহাবীর নামায আদায়ের নিয়ম ঠিক হলো না, তখন নবী করীম (সা:) স্বয়ং নামাযে দাঁড়িয়ে উক্ত সাহাবীকে নামায আদায়ের পদ্ধতি শিক্ষা দিলেন। এভাবে সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর রাসূলের কাছ থেকে ইসলামের আদর্শিক, নীতিগত ও বাস্তব প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতেন। কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হবার সাথে সাথে তা শুনে মুখস্থ করে নিতেন এবং সে আয়াতের মর্ম তাঁরা রাসূলের কাছ থেকেই জেনে নিতেন।
শুধু তাই নয়, সাহাবায়ে কেরামও আল্লাহর রাসূলের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি কর্ম, প্রতিটি স্পন্দনের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেন। বুখারী ও আবু দাউদ শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েকজন ব্যক্তি হযরত খাব্বাব ইবনুল আরিত (রা:) কে প্রশ্ন করেছিলেন, 'নবী করীম (সা:) যুহরের নামায আদায় করার সময় কি কুরআন তিলাওয়াত করতেন?' তিনি জবাব দিলেন, 'কুরআন তিলাওয়াত করতেন'। তাঁরা জানতে চাইলেন, 'আপনারা তো পিছনে থাকতেন, বুঝতেন কিভাবে যে তিনি কুরআন তিলওয়াত করছেন?' তিনি জবাব দিলেন, 'আমরা আল্লাহর নবীর দাড়ির কম্পন দেখেই অনুভব করতে পারতাম'।
মুসলিম ও আবু দাউদ শরীফে উল্লেখ রয়েছে, হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রা:) বলেন- নবী করীম (সা:) যুহর ও আসরের নামাযে দাঁড়িয়ে কতটুকু সময় ব্যয় করতেন তা আমরা অনুমান করে দেখতাম। আমরা দেখতাম, তিনি প্রথম দুই রাকা'আতে তিন আয়াত কুরআন তিলাওয়াতের সমান সময় এবং শেষ দুই রাকাআতে তার অর্ধেক পরিমাণ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন।
মুসনাদে আহমাদে উল্লেখ করা হয়েছে, একজন লোক হযরত উমার (রা:) কে প্রশ্ন করলেন, 'আমরা কুরআনে শুধু ভয়কালীন নামায ও নিজের বাড়িতে থাকাকালীন নামায সম্পর্কে উল্লেখ দেখতে পাই। কিন্তু ভ্রমণকালে কিভাবে নামায আদায় করতে হবে, তা দেখতে পাই না। কেনো দেখতে পাই না?' তিনি জবাব দিলেন, 'আমরা দ্বীন সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। এ অবস্থায় আল্লাহ তা'য়ালা অনুগ্রহ করে মুহাম্মাদ (সা:) কে আমাদের জন্য রাসূল হিসাবে পাঠালেন। সুতরাং এখন আমরা তাঁকে যেভাবে দ্বীনের কর্মসমূহ সম্পাদন করতে দেখি অনুরূপভাবে তাই করতে থাকি'।
সাহাবায়ে কেরাম এমন অনেক কাজেও রাসূলের করা কাজের হু-বহু অনুসরণ-অনুকরণ করতেন, যে কাজ অনুসরণ করা শরীয়াত অনুসারে অপরিহার্য নয়। তবুও সাহাবায়ে কেরাম তা আন্তরিকতার সাথে অনুসরণ করতেন। প্রকৃতপক্ষে সাহাবায়ে কেরামের এমন অনুসরণের মাধ্যমেই নবী করীম (সা:) এর জীবনের ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র দিকও সংরক্ষিত হয়েছে, বর্তমান যুগের মানুষ তা জানতে পারছে। সুতরাং আল্লাহর নবীর সুন্নাত হিসেবে আমাদের সামনে যা রয়েছে, তা অনুসরণ করা আমাদের জন্য একান্ত অপরিহার্য। আহার করে আমাদের যখন জীবন ধারণ করতেই হয়, তাহলে সে আহারের পদ্ধতিটা নবীর কাছ থেকেই গ্রহণ করা উচিত। দাড়ি যখন রেখেছি, তখন তা রাসূলের অনুসরণেই রাখা উচিত। এভাবে রাসূলের সুন্নাত অনুসরণে সচেতনতা ক্রমশঃ বৃদ্ধি করতে হবে।
যে নবী ও রাসূলদেরকে অনুসরণ করার জন্য আল্লাহ তা'য়ালা এতো তাগিদ দিয়েছেন, তাঁদের সম্পর্কে সর্বপ্রথম আমাদেরকে এ কথা জানতে হবে যে, কেনো এই রিসালাত ও নবুয়্যতের প্রয়োজনীতা। কেনো মানুষের জন্য নবুয়্যাত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করা মানুষের জন্য একান্ত প্রয়োজন। কারণ নবী ও রাসূল ব্যতীত মানুষ কোনোক্রমেই শান্তি, স্বস্তি, কল্যাণ এবং সত্য ও সঠিক পথ সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম নয়।
📄 নবী করীম (সা:) কে দিয়েই নবুয়্যাতের সমাপ্তি
১. পৃথিবীতে বিশেষ কোনো জাতির মধ্যে নবী প্রেরণের প্রয়োজন এ জন্য দেখা যায় যে, তাদের মধ্যে ইতোপূর্বে কোনো নবী-রাসূল আসেননি এবং অন্য কোনো জাতির মধ্যে প্রেরিত নবীর শিক্ষাও তাদের কাছে পৌঁছেনি।
২. নবী প্রেরণের প্রয়োজন এ জন্য দেখা যায় যে, সংশ্লিষ্ট জাতি ইতোপূর্বে প্রেরিত নবী-রাসূলের শিক্ষা ভুলে যায় অথবা তা বিকৃত হয়ে যায় এবং তাঁদের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ অসম্ভব হয়ে পড়ে।
৩. ইতোপূর্বে প্রেরিত নবী-রাসূলের মাধ্যমে প্রদত্ত শিক্ষা মানুষের মধ্যে পূর্ণতা লাভ করেনি এবং দ্বীনের পূর্ণতার জন্য অতিরিক্ত নবীর প্রয়োজন হয়।
৪. কোনো নবীর সাথে সাহায্য-সহযোগিতার জন্য আরেকজন নবীর প্রয়োজন হয়।
এখন এ কথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, ওপরে উল্লেখিত চারটি বিষয়ের মধ্যে কোনো একটিও আর বিশ্বনবী (সা:) এর পরে বিদ্যমান নেই। পবিত্র কুরআন ঘোষণা করেছে, বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা:) কে সমগ্র পৃথিবীর জন্য হিদায়াতকারী হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। পৃথিবীর সাংস্কৃতিক ইতিহাস এ কথা বলে যে, তাঁর নবুয়্যাত প্রাপ্তির পর থেকে সমগ্র পৃথিবীতে এমন অবস্থা বিরাজ করছে, যাতে করে তাঁর নবুয়্যাত সকল যুগে পৃথিবীর সকল জাতির মধ্যে পৌঁছতে পারে। এরপরেও প্রত্যেক জাতির মধ্যে পৃথক পৃথক নবী প্রেরণের প্রয়োজন থাকে না। কুরআন-হাদীস ও সীরাতের সকল বর্ণনাও এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, নবী করীম (সা:) এর শিক্ষা সম্পূর্ণ নির্ভুল, নির্ভেজাল এবং পরিপূর্ণ অবয়বে সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে কোনো প্রকার বিকৃতি বা পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়নি। তাঁর প্রতি যে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল তার মধ্যে আজ পর্যন্ত একটি শব্দেরও কম-বেশি হয়নি। কিয়ামত পর্যন্তও তা হতে পারে না। নিজের কথা ও কর্মের মাধ্যমে যে নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন, তা আজও আমরা এমনভাবে পেয়ে যাচ্ছি, যেন আমরা তাঁরই যুগে বাস করছি। সুতরাং নবী আসার কোন প্রয়োজনই থাকতে পারে না।
পবিত্র কুরআন এ কথা ঘোষণা করেছে, নবী করীম (সা:) এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'য়ালার দ্বীনের পূর্ণতা দান করা হয়েছে। সুতরাং দ্বীনের পূর্ণতার জন্যও কোনো নবী আসার আর প্রয়োজন নেই। তাঁর কাজে সহযোগিতা করার জন্য যদি কোনো সাহায্যকারী নবীর প্রয়োজন হতো, তাহলে সেটা তাঁর জীবনকালেই আল্লাহ তা'য়ালা প্রেরণ করতেন। এ ধরনের কোনো প্রয়োজন ছিল না বিধায় মহান আল্লাহ তা করেননি। বর্তমানে এমন কি কারণ থাকতে পারে যে, নবীকে পৃথিবীতে আসতেই হবে? কেউ যদি যুক্তি প্রদর্শন করে যে, মুসলিম জাতি পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছে এ কারণে তাদের সংস্কারের জন্য একজন নতুন নবীর প্রয়োজন।
এই যুক্তি যারা দিতে চায় তাদের কাছে ইসলামী চিন্তাবিদদের জিজ্ঞাসা, নিছক সংস্কারের জন্য পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত কি কোনো নবী এসেছে যে শুধু এই উদ্দেশ্যেই আর একজন নতুন নবীর আগমন ঘটলো? ওহী অবতীর্ণ করার জন্যই তো নবী প্রেরণ করা হয়। কেননা, নবীর কাছেই ওহী অবতীর্ণ করা হয়। আর ওহীর প্রয়োজন পড়ে কোনো নতুন পয়গাম দেয়ার অথবা পূর্ববর্তী পয়গামকে বিকৃতি থেকে রক্ষা করার জন্য। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কুরআন এবং নবী করীম (সা:) এর আদর্শ সংরক্ষিত হয়ে যাবার পর যখন আল্লাহর দ্বীন পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে এবং ওহীর সকল সম্ভাব্য প্রয়োজন খতম হয়ে গিয়েছে, তখন সংস্কারের জন্য একমাত্র সংস্কারের প্রয়োজনই অবশিষ্ট রয়েছে- নতুন কোনো নবীর নয়।
যখন কোনো জাতির মধ্যে নবীর আগমন হবে, তখনই সেখানে প্রশ্ন উঠবে কুফর ও ঈমানের। যারা ঐ নবীকে স্বীকার করে নিবে, তারা এক উম্মাতভুক্ত হবে এবং যারা তাকে স্বীকার করবে না তারা অবশ্যই একটি পৃথক উম্মাতে শামিল হবে। এই দুই উম্মাতের মতবিরোধ কোনো আংশিক মতবিরোধ বলে গণ্য হবে না বরং এটি এমন একটি বুনিয়াদী মতবিরোধের পর্যায়ে নেমে আসবে, যার ফলে তাদের একটি দল যতদিন না নিজের আকিদা-বিশ্বাসকে পরিত্যাগ করবে, ততদিন পর্যন্ত তারা দু'দল কখনো একত্র হতে পারবে না। এ ছাড়াও কার্যত তাদের প্রত্যেকের জন্য হিদায়াত এবং আইনের উৎস হবে বিভিন্ন। কেননা একটি দল তাদের নিজেদের নবীর ওহী এবং সুন্নাত থেকে আইন প্রণয়ন করবে এবং দ্বিতীয় দলটি এ দু'টোকে তাদের আইনের উৎস হিসেবেই মেনে নিতে প্রথমত অস্বীকার করবে। সুতরাং এই দুই দলের মিলনে একটি সমাজ বা জাতি কোনোক্রমেই সৃষ্টি হতে পারে না। ইতিহাস বলে, নবী করীম (সা:) এর পরে এমন কখনো হয়নি।
এই স্পষ্ট সত্য পর্যবেক্ষণ করার পর যে কোনো ব্যক্তি স্পষ্ট বুঝতে পারবেন, যে নবুয়্যাত মুসলিম জাতির জন্য আল্লাহ তা'য়ালার বিরাট রহমত স্বরূপ। এর বিনিময়েই সমগ্র মুসলিম জাতি একটি চিরন্তন বিশ্বব্যাপী ভ্রাতৃত্বে শামিল হতে পেরেছে। এ বিষয়টি মুসলমানদেরকে এখন সব মৌলিক মতবিরোধ থেকে রক্ষা করেছে, যা তাদের মধ্যে চিরন্তন বিচ্ছেদের বীজ বপন করতো। সুতরাং যে ব্যক্তি নিবী করীম (সা:) কে হিদায়াত দানকারী এবং একমাত্র অনুসরণীয় নেতা বলে স্বীকার করে এবং তিনি যে শিক্ষা দিয়েছেন তাছাড়া অন্য কোনো হিদায়াতের উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়তে চায় না, সে আজ এই ভ্রাতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে। নবুয়্যাতের দরোজা বন্ধ না হয়ে গেলে মুসলিম জাতি কখনো এই ঐক্যের সন্ধান পেতো না। কারণ প্রত্যেক নবীর আগমনের পরে এই ঐক্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতো।
সাধারণত স্থূলভাবে ভাবনা-চিন্তা করলেও মানুষের বিবেক-বুদ্ধিও এ কথাই সমর্থন করে যে, একটি বিশ্বজনীন এবং পরিপূর্ণ দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) দিয়ে দেবার এবং তাকে সকল প্রকার বিকৃতি ও পরিবর্তন-পরিবর্ধন থেকে সংরক্ষিত করার পর নবুয়্যাতের দরোজা বন্ধ হয়ে যাওয়াই উচিত। এর ফলে সম্মিলিতভাবে শেষ নবীর অনুগমন করে সমগ্র পৃথিবীর মুসলমান চিরকালের জন্য একই উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারবে এবং অপ্রয়োজনে নতুন নতুন নবীদের আগমন উম্মাতের মধ্যে বার বার বিভেদ সৃষ্টি হবার সুযোগ থাকবে না।
নতুন নবুয়্যাতের দাবীদারদের ভাষায় নবী 'যিল্লী অর্থাৎ ছায়া নবী' হোক অথবা বুরুজী নবী হোক, উম্মাতওয়ালা হোক, শরীয়াতওয়ালা হোক বা কিতাবওয়ালা হোক, যে কোনো অবস্থায়ই যিনি নবী হবেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে যাকে প্রেরণ করা হবে, তাঁর আগমনের অবশ্যম্ভাবী ফল দাঁড়াবে এই যে, তাকে যারা মেনে নিবে, তারা হবে একটি উম্মাত, আর যারা মানবে না তারা কাফির বলে গণ্য হবে। যখন নবী প্রেরণের সত্যিকারের প্রয়োজন হয়েছিল, শুধুমাত্র তখনই এই বিভেদ অবশ্যম্ভাবী হয়েছিল, বর্তমানে হয়নি এবং কিয়ামত পর্যন্তও হবে না।
পক্ষান্তরে যখন কোনো নবী আগমনের প্রয়োজন থাকে না, তখন আল্লাহ তা'য়ালার হিকমাত এবং তাঁর রহমতের কাছে কোনোক্রমেই আশা করা যায় না যে, তিনি নিজের বান্দাদেরকে শুধু শুধু কুফর ও ঈমানের সংঘর্ষে লিপ্ত করবেন এবং তাদেরকে সম্মিলিতভাবে একটি উম্মাতভুক্ত হবার সুযোগ দিবেন না। সুতরাং কুরআন, সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরামের ইজমা ও সকল আলেম-উলামার ইজমা থেকে যা কিছু প্রমাণিত হয়, মানুষের বিবেক-বুদ্ধিও তাকে নির্ভুল বলে স্বীকার করে এবং তা থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, নবী করীম (সা:) এর পরে চিরকালের জন্য নবুয়্যাতের দরোজা বন্ধ আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। সর্বোপরি নবী করীম (সা:) কে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা যে সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রদান করেছেন, এর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেও এ কথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তাঁর পরে এ পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোনো নতুন নবী-রাসূলের প্রয়োজন নেই।
📄 মর্যাদার সর্বোচ্চ সোপান, তিনিই নবীদের সীল মোহর
নবী করীম (সা:) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন- مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَّسُوْلَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ طَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا ع হে মানুষ (তোমরা জেনে রেখো), মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন, তিনি তো হচ্ছেন আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল এবং নবীদের সিল (মোহর), আল্লাহ তা'য়ালা সর্ববিষয়ে অবগত রয়েছেন। (সূরা আল আহযাব-৪০)
মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে সর্বোচ্চ মর্যাদার পূর্ণ সোপানে উপনীত করেছেন বিধায় তাঁকেই নবী-রাসূলের সীল মোহর হিসাবে ঘোষণা করে নবুয়্যাতের সমাপ্তি করেছেন। পক্ষান্তরে বর্তমান পৃথিবীতে একটি জনগোষ্ঠী যারা কাদিয়ানী নামে পরিচিত, তারা খতমে নবুয়্যাতের বিরুদ্ধে ফেতনা সৃষ্টি করেছে ইসলাম বিদ্বেষী মহল মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত ও দুর্বল করার লক্ষ্যে কাদিয়ানীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। তারা সূরা আহযাবের উল্লেখিত আয়াতের 'খাতামান নাবিয়্যীন' শব্দের অর্থ করে থাকে 'নবীদের মোহর'। তারা বুঝাতে চায়, নবী করীম (সা:) এর পরে তাঁর মোহরাঙ্কিত হয়ে আরো অনেক নবী পৃথিবীতে আগমন করবেন। অথবা অন্য কথায় বলা যায়, যতক্ষণ পর্যন্ত কারো নবুয়্যাত বিশ্বনবীর মোহরাঙ্কিত না হয় ততক্ষণ তিনি নবী হতে পারবেন না।
পক্ষান্তরে উল্লেখিত আয়াতটি যে ঘটনা পরম্পরায় বিবৃত হয়েছে, তাকে সেই বিশেষ পরিবেশে রেখে বিচার করলে, তা থেকে ঐ অর্থ গ্রহণ করার কোনো সুযোগই অবশিষ্ট থাকে না। যারা উল্লেখিত অর্থ গ্রহণ করেছে, যদি সে অর্থ গ্রহণ করা হয় তাহলে যে উদ্দেশ্যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, তার প্রয়োজনীয়তাই বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং প্রকৃত উদ্দেশ্যেরও পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। এটা কি নিতান্ত অবান্তর ও অপ্রাসঙ্গিক কথা নয় যে, হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা:) এর তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী হযরত যয়নব (রা:) এর সাথে নবী করীম (সা:) এর বিয়ের বিরুদ্ধে উত্থিত প্রতিবাদ এবং তা থেকে সৃষ্ট নানা ধরনের সংশয়-সন্দেহের উত্তর দিতে গিয়ে সূরা আহযাবের যেসব আয়াত অবতীর্ণ হয় সহসা সে আয়াতের মাঝে বলে দেয়া হলো যে, 'মুহাম্মদ (সা:) হলেন নবীদের মোহর। অর্থাৎ ভবিষ্যতে যে সংখ্যক নবী আগমন করবেন তারা সকলেই তাঁরই মোহরাঙ্কিত হবেন'।
হযরত যয়নব (রা:) এর ঘটনার মাঝখানে এ কথাটির আকস্মিক আগমন শুধু অবান্তরই নয়, এ থেকে উক্ত বিয়ের বিরোধিদেরকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যে যুক্তি পেশ করা হচ্ছিলো তাও দুর্বল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে বিরোধিদের হাতে এক চমৎকার সুযোগ আসতো এবং তারা সহজেই নবী করীম (সা:) কে বলতে পারতো যে, 'আপনি যয়নবকে বিয়ে করে পালক পুত্রের প্রথা রহিত না-ও করতে পারতেন, এ প্রথা রহিত করতে গিয়ে আজ যে অপবাদের মোকাবেলা আপনাকে করতে হচ্ছে, এ থেকে অন্তত নিষ্কৃতি পেতেন। কেননা এই অর্থহীন বিপর্যয় সৃষ্টিকারী প্রথাটা যদি একান্তই বাতিল করার প্রয়োজন হতো, তাহলে আপনার পরে আপনার মোহরাঙ্কিত হয়ে যেসকল নবী আসবেন, তারাই তো এই প্রথাটি বাতিল করতে পারতেন'।
কিন্তু আরবী ভাষার অধিকারী আরববাসী এ ধরনের কোনো প্রশ্ন নবী করীম (সা:) এর সামনে উত্থাপন করেনি। 'খাতামুন নাবিয়্যীন' শব্দের অর্থ যদি বর্তমানে মিথ্যা নবুয়্যতের দাবিদারদের অনুরূপ হতো, তাহলে আরবের লোকজন নবী করীম (সা:) এর সম্মুখে তেমন কোনো প্রশ্ন অবশ্যই উত্থাপন করতো। আরবদের তুলনায় বর্তমানের কাদিয়ানী গোষ্ঠী কি আরবী ভাষায় অধিক দক্ষ? এই কাদিয়ানী গোষ্ঠী কুরআনের উক্ত আয়াতের আরেকটি অর্থ করেছে যে, 'খাতামুন নাবিয়্যীন'-এর অর্থ হলো, 'আফজালুন নাবিয়্যীন' অর্থাৎ নবুয়্যাতের দরোজা উন্মুক্তই রয়েছে, তবে কিনা নবুয়্যাত পূর্ণতা লাভ করেছে মুহাম্মাদ (সা:) এর ওপর।
কিন্তু তাদের এ অর্থ গ্রহণ করতে গিয়েও পূর্বোল্লিখিত বিভ্রান্তির পুনরাবির্ভাবের হাত থেকে নিষ্কৃতি নেই। মূল ঘটনার অগ্রপশ্চাতের সাথে এ ধরনের কোনো ব্যাখ্যার সাদৃশ্য নেই। বরং তাদের সে ব্যাখ্যা পূর্বাপরের ঘটনা পরম্পরার সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থই প্রকাশ করে। তদানীন্তন কালের কাফির ও মুনাফিকরা নবী করীম (সা:) কে বলতে পারতো, 'হে মুহাম্মদ (সা:), আপনার তুলনায় কম মর্যাদা সম্পন্ন নবী যখন আপনার পরে আসতেই থাকবে, তখন এ পালক পুত্র রহিতকরণের বিষয়টি তাদের ওপরই ছেড়ে দিতেন, এই প্রথার ইতি যে আপনাকেই ঘটাতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা তো নেই'।
মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে উপনীত করে নবী-রাসূলদের আগমনের ধারার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে যে 'খাতামুন' শব্দ ব্যবহার করেছেন, এ শব্দটি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। আরবী ভাষায় এই শব্দটি 'খাতাম'ও হয় আরার 'খাতিম'ও হতে পারে। এ শব্দটি ক্রিয়াবাচক হতে পারে আবার শেষ অর্থে নাম ও 'পদ'ও হতে পারে। যা দিয়ে শেষ করা হয় এ শব্দটি সে অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে। অর্থাৎ এই শব্দ ব্যবহার করে নবুয়্যাতের দ্বার চিরতরে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সূরা আহযাবে ব্যবহৃত খাতাম শব্দটির মাত্র একটি অর্থই হতে পারে। সে অর্থ হলো, নবুয়্যাতের দ্বার চিরতরে কিয়ামত পর্যন্ত রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। নবী করীম (সা:) এর পরে কোনো নবী আগমনের অবকাশ নেই এবং অবকাশ নেই রিসালাতের। এ ব্যাপারে, আল্লাহর রাসূল, সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের পরবর্তীকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত রচিত কুরআনের অভিধান, তাফসীর ও ইতিহাসের এ বিষয়ে এটাই শেষ কথা। এ সম্পর্কে দুইজন গবেষকও দ্বিমত প্রকাশ করেননি।
সকল অভিধান বিশারদ এবং মুফাস্সিরীনে কেরাম 'খাতামুন নাবিয়্যীন' শব্দের অর্থ গ্রহণ করেছেন, আখিরুন নাবিয়্যীন অর্থাৎ নবীদের শেষ। আরবী অভিধান এবং প্রবাদ অনুযায়ী 'খাতাম'-এর অর্থ ডাক ঘরের মোহর নয়, যা চিঠির ওপর লাগিয়ে চিঠি ডাকে দেয়া হয়, বরং সেই মোহর যা খামের মুখে এ উদ্দেশ্যে লাগানো হয় যে, তার ভেতর থেকে কোনো জিনিস বাইরে বের হতে পারবে না এবং বাইরের কোন জিনিস ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না। সমগ্র কুরআনে নবী করীম (সা:) এর সর্বোচ্চ মর্যাদার যে চিত্র মহান আল্লাহ তা'য়ালা অঙ্কন করেছেন, কাদিয়ানীরা কুরআনে বিবৃত 'খাতাম' শব্দের যে অর্থ প্রচার করে থাকে তা কুরআনে অঙ্কিত এ চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত।
নবী করীম (সা:) খতমে নবুয়্যাত সম্পর্কে বলেন, 'বনী ইসরাঈলীদের নেতৃত্ব দিতেন আল্লাহর রাসূলগণ। যখন কোনো নবী ইন্তেকাল করতেন, তখন অন্য কোনো নবী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন (সেই শূন্যতা পূরণ করতেন)। কিন্তু আমার পরে কোনো নবী হবে না, শুধু খলীফা'। (বুখারী)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم قَالَ إِنَّ مَثَلِي وَمَثَلَ الأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِي كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى بَيْتًا فَأَحْسَنَهُ وَ أَجْمَلَهُ إِلَّا مَوْضِعَ لَبِنَةٍ مِّنْ زَوِيَةٍ فَجَعَلَ النَّاسُ يَطُوفُوْنَ بِهِ وَيَعْجَبُوْنَ لَهُ وَيَقُولُوْنَ هَلَا وُضِعَتْ هَاذِهِ اللبِنَةُ . وَأَنَا خَاتِمُ النَّبِيِّينَ
হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা:) বলেছেন, 'আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীদের দৃষ্টান্ত হলো, এক ব্যক্তি একটি দালান নির্মাণ করলো এবং তা খুব সুন্দর ও শোভনীয় করে সজ্জিত করলো। কিন্তু তার এক কোণে একটি ইটের স্থান শূন্য ছিল। দালানটির চতুর্দিকে মানুষ ঘুরে ঘুরে তার সৌন্দর্য দেখে বিস্ময় প্রকাশ করছিল এবং বলছিল, এ স্থানে একটি ইট রাখা হয়নি কেনো? বস্তুতঃ আমি সেই ইট এবং আমিই শেষনবী'। (অর্থাৎ আমার আসার পর নবুয়্যাতের দালান পূর্ণতা লাভ করেছে, এখন এর মধ্যে এমন কোনো শূন্যস্থান নেই যাকে পূর্ণ করার জন্য পুনরায় কোনো নবীর প্রয়োজন হবে।) (বুখারী)
এই একই ধরনের বক্তব্য সম্বলিত চারটি হাদীস মুসলিম শরীফে কিতাবুল ফাযায়েলের বাবু খাতামুন নাবিয়্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। এবং শেষ হাদীসটিতে কিছু অংশ বেশি উল্লেখ করা হয়েছে যে, 'এরপর আমি এলাম এবং আমি নবীদের সিলসিলা খতম করে দিলাম'। হাদীসটি তিরমিজী শরীফে একই শব্দসহ কিতাবুল মানাকিবের বাবু ফাদলিন নাবী এবং কিতাবুল আদাবের বাবুল আমসালে বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদে আবু দাউদ তিয়ালাসীতে হাদীসটি জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা:) বর্ণিত হাদীসের সিলসিলায় উল্লেখ করা হয়েছে এবং এর শেষের অংশ হলো 'আমার মাধ্যমে নবীদের সিলসিলা খতম হলো'।
মুসনাদে আহমাদে সামান্য শাব্দিক পার্থক্যের সাথে একই বক্তব্য সম্বলিত হাদীস হযরত উবাই ইবনে কা'ব, হযরত আবু সাঈদ খুদরী এবং হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহুম আজমাঈন থেকে বর্ণিত হয়েছে। নবী করীম (সা:) বলেন, 'ছয়টি ব্যাপারে অন্যান্য নবীদের ওপর আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে। (১) আমাকে পূর্ণ অর্থব্যঞ্জক সংক্ষিপ্ত কথা বলার যোগ্যতা দান করা হয়েছে। (২) আমাকে শক্তিমত্তা ও প্রতিপত্তি দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে। (৩) যুদ্ধলব্ধ অর্থ-সম্পদ আমার জন্য হালাল করা হয়েছে। (৪) পৃথিবীর যমীনকে আমার জন্য মসজিদ (অর্থাৎ আমার শরীয়াতে নামাজ কেবল বিশেষ ইবাদাতগাহে নয়, পৃথিবীর প্রত্যেক স্থানে আদায় করা যেতে পারে) এবং মাটিকে পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে (শুধু পানিই নয়, মাটির সাহায্যে তায়াম্মুম করেও পবিত্রতা হাসিল অর্থাৎ অজু এবং গোসলের কাজ সম্পন্ন করা যেতে পারে) পরিণত করা হয়েছে। (৫) সমগ্র পৃথিবীর জন্য আমাকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে এবং (৬) আমার ওপর নবীদের সিলসিলা খতম করে দেয়া হয়েছে'। (মুসলিম)
নবী করীম (সা:) বলেন, 'রিসালাত এবং নবুয়্যাতের সিলসিলা খতম করে দেয়া হয়েছে। আমার পর আর কোনো রাসূল এবং নবী আসবে না'। (তিরমিযী)
নবী করীম (সা:) বলেন, 'আমি মুহাম্মাদ (সা:)। আমি আহ্লাদ। আমি বিলুপ্তকারী, আমার সাহায্যে কুফ্রকে বিলুপ্ত করা হবে। আমি সমবেতকারী, আমার পরে লোকদেরকে হাশরের ময়দানে সমবেত করা হবে (অর্থাৎ আমার পরে শুধু কিয়ামতই বাকি আছে) আমি সবার শেষে আগমনকারী (এবং সবার শেষে আগমনকারী হলো সেই) যার পরে আর নবী আসবে না'। (বুখারী, মুসলিম)
عَنْ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ قَالَ: قَالَ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم لِي خَمْسَةُ أَسْمَاءِ أَنَا مُحَمَّدُ وَ أَنَا الْمَاحِيَ الَّذِي يَمْحُو اللَّهُ بِي الْكُفْرَ وَ أَنَا الْحَاشِرُ الَّذِي يَحْشَرُ النَّاسُ عَلَى قَدَمِي وَ أَنَا الْعَاقِبُ
হযরত জুবাইর ইবনে মুতয়িম (রা:) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলূল্লাহ (সা:) বলেছেন, আমার পাঁচটি নাম রয়েছে। আমি মুহাম্মাদ ও আহমদ। আমি আল মাহী (নিশ্চিহ্নকারী), আমার মাধ্যমে আল্লাহ তা'য়ালা কুফর নিশ্চিহ্ন করেন। আমি আল হাশির (কিয়ামতের দিনে সমবেতকারী) আমার পশ্চাতে মানব জাতিকে সমবেত করা হবে এবং আমি আল আকিব (শেষ আগমনকারী, আমার পর আর কোনো নবী আসবে না) (বুখারী)
নবী করীম (সা:) বলেন, 'আল্লাহ নিশ্চয়ই এমন কোনো নবী পাঠাননি যিনি তাঁর উম্মাতকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেননি। (কিন্তু তাদের যুগে সে বহির্গত হয়নি) এখন আমিই শেষ নবী এবং তোমরা শেষ উম্মাত। দাজ্জাল নিঃসন্দেহে এখন তোমাদের মধ্যে বহির্গত হবে'। (ইবনে মাজাহ্)
হযরত আব্দুর রহমান ইবনে জুবায়ের (রা:) বলেন, 'আমি আবদুল্লাহ ইবনে উমার ইবনে আ'স (রা:) কে বলতে শুনেছি, একদিন আল্লাহর রাসূল (সা:) নিজের ঘর থেকে বের হয়ে আমাদের মাঝে এলেন। তিনি এভাবে এলেন যেন আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি তিনবার বললেন, আমি উম্মী নবী মুহাম্মাদ (সা:)। তারপর বললেন, আমার পর আর কোনো নবী নেই'। (মুসনাদে আহমাদ)
নবী করীম (সা:) বলেছেন, 'আমার পরে আর কোনো নবুয়্যাত নেই। আছে সুসংবাদ দানকারী ঘটনাবলী। জানতে চাওয়া হলো, ইয়া রাসূলুল্লাহ! সুসংবাদ দানকারী ঘটনাগুলো কি? জবাবে তিনি বললেন, 'উত্তম স্বপ্ন-কল্যাণময় স্বপ্ন'। (অর্থাৎ ওহী অবতীর্ণ হবার এখন আর কোনো সম্ভাবনা নেই। খুব বেশি একথা বলা যেতে পারে যে, আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে যদি কাউকে কোনো ইঙ্গিত দেয়া হয়, তাহলে শুধু ভালো স্বপ্নের মাধ্যমেই তা দেয়া হবে) (মুসনাদে আহমাদ, নাসায়ী, আবু দাউদ)
নবী করীম (সা:) বলেন, 'আমার পরে যদি কোনো নবী হতো তাহলে উমার ইবনে খাত্তাব সে সৌভাগ্য লাভ করতো'। (তিরমিযী)
আল্লাহর রাসূল (সা:) হযরত আলী (রা:) কে বলেন, 'আমার সাথে তোমার সম্পর্ক মূসার সাথে হারুনের সম্পর্কের মতো। কিন্তু আমার পরে আর কোনো নবী নেই'। (বুখারী, মুসলিম)
বুখারী এবং মুসলিম তাবুক যুদ্ধের বর্ণনা প্রসংগেও এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমাদে এই বিষয়বস্তু সম্বলিত দু'টো হাদীস হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা:) থেকে বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি বর্ণনার শেষাংশ হলো, 'কিন্তু আমার পরে আর কোনো নবুয়্যাত নেই'। আবু দাউদ তিয়ালাসি, ইমাম আহমাদ এবং মুহাম্মাদ ইসহাক এ সম্পর্কে যে বিস্তারিত বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন তা থেকে জানা যায় যে, তাবুক যুদ্ধে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে নবী করীম (সা:) হযরত আলী (রা:) কে মদীনা নগরীর তত্ত্বাবধান এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রেখে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। এ ব্যাপারটি নিয়ে মুনাফিকরা বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে থাকে।
হযরত আলী (রা:) আল্লাহর রাসূল (সা:) কে বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাকে শিশু এবং নারীদের মধ্যে ছেড়ে যাচ্ছেন? আল্লাহর নবী তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, 'আমার সাথে তোমার সম্পর্ক মূসার সাথে হারুনের সম্পর্কের মতো'। অর্থাৎ তূর পর্বতে যাবার সময় হযরত মূসা (আ:) যেমন বনী ইসরাঈলীদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য হযরত হারুনকে রেখে গিয়েছিলেন অনুরূপভাবে মদীনার হেফাজতের জন্য আমি তোমাকে পেছনে রেখে যাচ্ছি। কিন্তু সাথে সাথে তাঁর মনে এই একথাও জাগে যে, হযরত হারুনের সাথে এভাবে তুলনা করার ফলে হয়তো পরে এ থেকে কোনো বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে। সুতরাং পর মুহূর্তেই তিনি কথাটি স্পষ্ট করে দেন এই বলে যে, 'আমার পর আর কোনো ব্যক্তি নবী হবে না'।
হযরত সাওবান (রা:) বর্ণনা করেছেন, 'আল্লাহর রাসূল (সা:) বলেন, আমার উম্মাতের মধ্যে ত্রিশজন মিথ্যাবাদী হবে। তাদের প্রত্যেকেই নিজেকে নবী বলে দাবী করবে। অথচ আমার পর আর কোনো নবী নেই'। (আবু দাউদ)
আল্লাহর রাসূল (সা:) বলেন, 'আমার পরে আর কোনো নবী নেই এবং আমার উম্মাতের পর আর কোনো উম্মাত নেই'। (বাইহাকী, তাবারাণী)
নবী করীম (সা:) বলেন, 'আমি শেষনবী এবং আমার মাসজিদ' (অর্থাৎ মাসজিদে নববী শেষ মাসজিদ)। (মুসলিম)
অমুসলিম কাদিয়ানী সম্প্রদায় এ হাদীস থেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে,' নবী করীম (সা:) যেমন তাঁর মাসজিদকে শেষ মাসজিদ বলেছেন অথচ এটিই শেষ মাসজিদ নয়, এরপরও পৃথিবীতে অগণিত মাসজিদ নির্মিত হয়েছে। অনুরূপভাবে তিনি বলেছেন যে তিনি শেষনবী। এর অর্থ হলো এই যে, তাঁর পরেও নবী আসবে। অবশ্য শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে তিনি হলেন শেষনবী এবং তাঁর মাসজিদ শেষ মাসজিদ'। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের বিকৃত অর্থই এ কথা প্রমাণ করে যে, এ লোকগুলো আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের কথার অর্থ অনুধাবন করার চেষ্টাও করেনি। মুসলিম শরীফের এ সম্পর্কিত হাদীসগুলো সম্মুখে রাখলেই এ কথা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, আল্লাহর রাসূল তাঁর মাসজিদকে শেষ মাসজিদ কোন্ অর্থে বলেছেন।
এখানে হযরত আবু হুরাইরা (রা:), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা:) এবং হযরত মাইমুনা (রা:) এর যে বর্ণনা ইমাম মুসলিম উদ্ধৃত করেছেন, সেখানে বলা হয়েছে, পৃথিবীর মাত্র তিনটি মাসজিদ এমন রয়েছে যেগুলো সাধারণ মাসজিদগুলোর ওপর শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। সেখানে নামাজ আদায় করলে অন্যান্য মাসজিদের চেয়ে হাজার গুণ বেশি সওয়াব হয় এবং এ জন্য একমাত্র এ তিনটি মাসজিদে নামাজ আদায় করার জন্য ভ্রমণ করা জায়েজ। পৃথিবীর অবশিষ্ট মাসজিদগুলোর মধ্যে সকল মাসজিদকে বাদ দিয়ে বিশেষ করে একটি মাসজিদে নামাজ আদায় করার জন্য সেদিকে ভ্রমণ করা জায়েজ নয়।
উক্ত তিনটি মাসজিদের মধ্যে মাসজিদুল হারাম হলো প্রথম মাসজিদ। হযরত ইবরাহীম (আ:) এই মাসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। দ্বিতীয়টি হলো মাসজিদুল আক্সা, হযরত সুলাইমান (আ:) এটি নির্মাণ করেছিলেন এবং তৃতীয়টি হলো মদীনা নগরীর মাসজিদে নববী। এটি নির্মাণ করেন নবী করীম (সা:)। রাসূলের কথার অর্থ হলো, এখন যেহেতু আমার পর আর কোনো নবী আসবে না, সেহেতু আমার মাসজিদের পর পৃথিবীর আর চতুর্থ এমন কোনো মাসজিদ নির্মিত হবে না, যেখানে নামাজ আদায় করার সওয়াব অন্যান্য মাসজিদের তুলনায় বেশি হবে এবং সেখানে নামাজ আদায় করার জন্য সেদিকে ভ্রমণ করা জায়েজ হবে।
আল্লাহর নবীর কাছ থেকে বহু সংখ্যক সাহাবী এসব হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং বহু মুহাদ্দিস অত্যন্ত শক্তিশালী এবং নির্ভযোগ্য সনদসহ এ হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন। এগুলো অধ্যয়ন করার পর স্পষ্ট জানা যায় যে, নবী করীম (সা:) বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে এ কথা পরিস্কার করে দিয়েছেন যে, তিনিই শেষনবী। তাঁর পর কোনো নবী আসবে না। নবুয়্যাতের ক্রমধারা তাঁর ওপর খতম হয়ে গেছে এবং তাঁর পর যে ব্যক্তি রাসূল অথবা নবী হবার দাবী করবে, সে হবে দাজ্জাল এবং মিথ্যুক। পবিত্র কুরআনের খাতামুন নাবিয়্যীন শব্দের এর চেয়ে বেশি শক্তিশালী, নির্ভরযোগ্য এবং প্রামাণ্য ব্যাখ্যা আর কি হতে পারে? রাসূলের বক্তব্যই এখানে বাস্তব সনদ এবং প্রমাণ। উপরন্তু যখন রাসূলের বক্তব্য কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা করে তখন তা আরো অধিক শক্তিশালী প্রমাণে পরিণত হয়। এখন প্রশ্ন হলো, মুহাম্মাদ (সা:) এর চেয়ে অধিক আর কে কুরআন বুঝেছে এবং তাঁর চেয়ে অধিক কুরআনের ব্যাখ্যার অধিকার কোন্ ব্যক্তির রয়েছে? এমন কে আছে যে, খতমে নবুয়্যাতের অন্য কোনো অর্থ বর্ণনা করবে এবং তা মেনে নেয়া তো দূরের কথা, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করতেও ইসলামের অনুসারীরা প্রস্তুত থাকবে?
খতমে নবুয়্যাতে অবিশ্বাসী কাদিয়ানী সম্প্রদায় নবী করীম (সা:) এর বক্তব্যের বিপরীতে হযরত আয়েশা (রা:) এর বলে কথিত একটি বর্ণনা প্রমাণ হিসেবে পেশ করে। সে বর্ণনা হলো, 'বলো নিশ্চয়ই তিনি খাতামুন নাবিয়্যীন, এ কথা বলো না যে তাঁর পর নবী নেই'।
এ হাদীসের ব্যাপারে ইসলামী চিন্তাবিদদের কথা হলো, প্রথমত নবী করীম (সা:) এর সুস্পষ্ট আদেশকে অস্বীকার করার জন্য হযরত আয়েশা নবী করীম (রা:) এর উদ্ধৃতি দেয়া চরম ধৃষ্টতা। অধিকন্তু হযরত আয়েশা (রা:) এর বলে কথিত হাদীসটি মোটেই হাদীস নয়। এ বর্ণনা নির্ভরযোগ্য নয়। হাদীস শাস্ত্রের প্রামাণিক কোনো গ্রন্থেই হযরত আয়েশার বলে কথিত হাদীসটির উল্লেখ নেই। কোনো বিখ্যাত হাদীস লিপিবদ্ধকারী হাদীস নামে বর্ণিত সে বর্ণনা উল্লেখ করেননি।
হযরত আয়িশা (রা:) এর বর্ণনা বলে কথিত বর্ণনাটি শুধু 'দুররি মানসুর' নামক তাফসীরে এবং 'তাকমিলাহ মাজমা-উল-বাহার' নামক অপরিচিত সংকলন থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এর উৎপত্তি ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে কোনোই ধারণা পাওয়া যায় না। নবী করীম (সা:) এর সুস্পষ্ট হাদীস যা বিখ্যাত হাদীস বর্ণনাকারীরা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে বর্ণনা করেছেন অতি সতর্কতার সাথে, তাকে অস্বীকার করার জন্য হযরত আয়েশার বলে কথিত একেবারেই দুর্বল সূত্রে বর্ণিত হাদীস নামে কথিত বাক্য দিয়ে প্রমাণ পেশ করতে যাওয়া চরমতম ধৃষ্টতা এবং হযরত আয়েশা (রা:) এর ওপরে মদীনার মুনাফিকদের ন্যায় কলঙ্ক আরোপের শামিল।