📄 সুরাকা, সেদিন তোমাকে কতই না সুন্দর দেখাবে!
মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রিয় হাবীবকে মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ অনুসারে প্রস্তুতি নিতে থাকলেন। ইসলামের দুশমনরা সার্বক্ষণিক প্রহরার ব্যবস্থা করলো যাতে মুহাম্মাদ (সা:) মক্কা ত্যাগ করতে না পারেন। এমনকি জালিমের দল আল্লাহর নবীকে হত্যার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলো। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর হাবীবকে মদীনার পথে নিয়ে গেলেন। দুশমনরা নবী করীম (সা:) কে না পেয়ে ঘোষণা করেছিলো, তাঁর সন্ধানদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে। পুরস্কারের লোভে নির্বোধ কিছু মানুষ আল্লাহর নবীর সন্ধানে বের হয়েছিল। সুরাকা ইবনে মালিক (রা:), তিনি মক্কা বিজয়ের পরে মুসলমান হয়েছিলেন। তিনি স্বয়ং বর্ণনা করেন, একদিন আমি আমার গোত্রের পরামর্শ সভায় বসে আছি, এ সময় এক ব্যক্তি এসে বললো, 'আমি এই মাত্র একটি দলকে দেখে এলাম তাঁরা মদীনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আমার মনে হয় উক্ত দলে মুহাম্মাদ (সা:) আছেন'।
এ কথা আমার কানে প্রবেশ করতেই আমি তাকে ইশারা দিলাম সে যেন বিষয়টি আর কাউকে না বলে। তারপর আমি সেখান থেকে উঠে বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় অস্ত্র সাথে নিয়ে দ্রুত বের হয়ে পড়লাম। একস্থানে গিয়ে আমি আমার ভাগ্য পরীক্ষা করলাম যে, মুহাম্মাদ (সা:) এর কোনো ক্ষতি আমি করতে পারবো কিনা।
আমি 'না' বোধক চিহ্ন দেখতে পেলাম। তবুও আমি বিরত না হয়ে তাদের পিছনে ছুটলাম। অবশেষে তাঁরা আমার দৃষ্টি সীমার মধ্যে এসে গেল। এ সময় আমার ঘোড়াটি হোঁচট খেয়ে আমাকে ঘোড়ার পিঠ থেকে নিক্ষেপ করলো। আমি আবার আমার ভাগ্য পরীক্ষা করলাম। এবারেও অকৃতকার্যতার চিহ্ন বের হলো। তবুও আমি তাদেরকে ধরার জন্য অগ্রসর হলাম।
এবার আমার ঘোড়ার সামনের পা দুটো নীচে বসে গেল। আমি ঘোড়ার পা উঠাতেই সে গর্ত থেকে ধোঁয়া বের হতে থাকলো। তখন আমি বুঝলাম মুহাম্মাদ (সা:) কে ধরা যাবে না। তারপর তাদেরকে আহ্বান করে বললাম, খোদার শপথ! তোমাদের সম্পর্কে আমার আর কোনো সন্দেহ নেই। আমি জুসুমের সন্তান সুরাকা। আমি তোমাদের ক্ষতির কারণ হবো না। তোমরা একটু থামো, তোমাদের সাথে আমার কিছু কথা আছে।
নবী করীম (সা:) হযরত আবু বকর (রা:) কে বললেন, তাঁর কাছ থেকে জেনে নাও সে আমাদের কাছে কি চায়?
হযরত আবু বকর (রা:) জানতে চাইলেন আমি তাদের কাছে কি চাই। আমি বলেছিলাম, আমাকে কিছু লিখে দিন, যা আমার এবং আপনার মধ্যে একটা প্রমাণ হয়ে থাকবে।
তারপর আমি তাদেরকে মক্কার লোকদের ঘোষনা সম্পর্কে জানালাম। কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, হযরত আবু বকর (রা:) নবী (সা:) এর নির্দেশে 'মুক্তিনামা' লিখে দিয়েছিলেন। আবার কোনো বর্ণনায় এসেছে হযরত আবু বকর (রা:) এর গোলাম তা লিখে দিয়েছিলেন। কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, নবী করীম (সা:) সে সময় সুরাকাকে বলেছিলেন, 'সে সময় তোমাকে কতই না সুন্দর দেখাবে যখন পারস্য সম্রাটের অলংকারাদি তোমার দেহে শোভা পাবে'।
বিশ্বনবী (সা:) এর সেদিনের কথা বাস্তবে রূপলাভ করেছিল হযরত উমার (রা:) এর শাসনামলে। পারস্য সাম্রাজ্য জয় করার পরে হযরত উমার (রা:) পারস্য সম্রাটের অলংকারসমূহ হযরত সুরাকাকে পরিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। নবী করীম (সা:) আর হযরত আবু বকর (রা:) সে সময় পৃথিবীতে ছিলেন না। প্রায় তের চৌদ্দ বছর পূর্বের সে কথা স্মরণে এলে হযরত সুরাকা (রা:) এর আনন্দের পরিবর্তে তাঁর দু'চোখ অশ্রু সরোবরে প্লাবিত হয়ে পড়েছিল।
📄 ভবিষ্যৎ বাণী সম্পর্কিত কতিপয় হাদীস
হযরত ছাওবান (রা:) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন, শীঘ্রই আমার উম্মতের জন্য এমন একটি সময় আসবে যখন দুনিয়ার বিভিন্ন জাতি তাদের দিকে এমনভাবে ধাবিত হবে, যেমন ধাবিত হয় ক্ষুধার্ত ব্যক্তি খাদ্যের দিকে।
এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! সেদিন কি আমরা সংখ্যায় খুবই নগণ্য থাকবো যে দুনিয়ার বিভিন্ন জাতি আমাদেরকে ধ্বংস করার জন্য অগ্রসর হবে?
নবী করীম (সা:) বললেন- না, বরং সেদিন তোমাদের সংখ্যা হবে প্রচুর। কিন্তু তোমরা হবে বন্যার পানির ফেনা সমতুল্য। অবশ্যই আল্লাহ তা'য়ালা সেদিন তোমাদের মনে তাদের ভয় প্রবেশ করিয়ে দিবেন।
এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর হাবীব! আমাদের মনে এ দুর্বলতা ও ভীতি দেখা দেয়ার কারণ কী হবে?
নবী করীম (সা:) বললেন, যেহেতু সেদিন তোমরা দুনিয়াকে ভালোবাসবে এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করবে। (আবু দাউদ, বায়হাকী)
উল্লেখিত হাদীসে স্পষ্ট যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, তা বর্তমান মুসলমানদের বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন। নবী করীম (সা:) বলেছিলেন, এমন একটি সময় আসবে, যখন পৃথিবীতে মুসলিম নামে পরিচিত লোকের সংখ্যা হবে অগণিত। কিন্তু তাদের ঈমানী শক্তি থাকবে না, তারা পৃথিবীতে ভোগ-বিলাসকে প্রাধান্য দিবে। ইসলামের শত্রুদের আনুগত্য করে হলেও ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকার চেষ্টা করবে। ইসলামের দুশমনরা সংখ্যায় অল্প হলেও তারাই মুসলমানদের ওপরে নির্যাতন করবে, মুসলমানদেরকে অবজ্ঞা, অবহেলা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবে। কারণ, শত্রুর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক জিহাদে অবতীর্ণ হয়ে শাহাদাতবরণ করাকে মুসলমানরা পসন্দ করবে না। দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে এমনভাবে মত্ত হয়ে থাকবে যে, তাদের চোখের সামনে অন্য মুসলিম নারী, শিশু, কিশোর, তরুণ-যুবক, বৃদ্ধ দুশমনদের হাতে লাঞ্ছিত-অপমানিত ও অত্যাচারিত হতে থাকবে, কিন্তু তারা মৌখিক প্রতিবাদও করবে না। মুসলমানরা নিজের যাবতীয় সহায়-সম্পদ, অর্থ-বিত্ত, শক্তি-মত্তা ইসলামের দুশমনদের অধীন করে দিবে। নিজেদের অর্থ-সম্পদ শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করে শত্রুকে পরাজিত করার মন-মানসিকতা মুসলমানদের থাকবে না, যদিও তারা সংখ্যায় হবে বিপুল।
নবী করীম (সা:) বলেছেন, ইয়াহুদীদের সাথে মুসলমানদের বড় ধরনের যুদ্ধ সংঘটিত হবে। সে যুদ্ধে ইয়াহুদীরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হরে। এমনকি তারা পর্বত, বৃক্ষ, পাথর ইত্যাদির আড়ালে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করবে। সে সময় পর্বত, বৃক্ষ ও পাথর খন্ড থেকে আওয়াজ উত্থিত হবে, হে মুসলিমগণ, এদিকে এসো, এখানে ইয়াহুদী আত্মগোপন করে আছে। (মুসলিম)
নবী করীম (সা:) এর এ ভব্যিষদ্বাণী বাস্তবায়িত হতে খুব একটা দেরী নেই ইনশাআল্লাহ। পৃথিবীর বৃহৎ শক্তিবর্গ ইয়াহুদীদের সহযোগিতা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়ে তাদের ধ্বংসের মঞ্চ প্রস্তুত করছে।
খন্দকের যুদ্ধে পরীখা খননকালে বিশাল একটি পাথরখণ্ড পরীখা খননে বাধা সৃষ্টি করছিলো। সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই উক্ত পাথরখণ্ড ভাঙার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন। অবশেষে নবী করীম (সা:) শাবলের আঘাতে পাথরখণ্ডটি চূর্ণ করলেন। তিনি তিনবার পাথরখণ্ডে আঘাত করেছিলেন। প্রত্যেক আঘাতেই লৌহ আর পাথরের ঘর্ষণে অগ্নি স্ফুলিঙ্গ নির্গত হয়েছিলো। নবী করীম (সা:) বললেন, আমি যখন প্রথম আঘাত হানলাম তখন আমাকে পারস্যের রাজধানী ও তার পরিপার্শ্বের এলাকা দেখানো হলো এবং আমার দু'চোখ দিয়ে তা দেখলাম।
সাহাবায়ে কেরাম আবেদন করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! দোয়া করুন এসব এলাকা যেনো আমার জয় করতে পারি'। নবী করীম (সা:) দোয়া করার পর বললেন, 'আমি যখন দ্বিতীয় আঘাত করলাম তখন রোম সম্রাটের রাজধানী ও তার পরিপার্শ্বের এলাকা দেখানো হলো'। সাহাবায়ে কেরাম উক্ত এলাকা বিজয় করার জন্যে দোয়ার আবেদন জানালে তিনি দোয়া করে পুনরায় বললেন, 'আমি যখন তৃতীয় আঘাত করলাম তখন আমাকে আবিসিনিয়ার রাজধানী ও তার আশেপাশের এলাকা দেখানো হলো। তবে আবিসিনিয়ার লোকজন তোমাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না এলে তোমরা তাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে অগ্রসর হয়ো না। আর তুর্কীদেরকে তোমরা অবকাশ দিবে যতক্ষণ তারা তোমাদেরকে অবকাশ দেয়'। (মুসলিম, নাসাঈ)
নবী করীম (সা:) এর এ ভবিষ্যদ্বাণীও সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে। হযরত উসমান (রা:) এর শানসামলে দেশে কতিপয় লোকজন বিশৃংখলা সৃষ্টি করবে এ সংবাদ রাসূল (সা:) পূর্বেই তাঁকে জানিয়েছিলেন। মদীনার একটি খেজুর বাগানে নবী করীম (সা:) বসেছিলেন। সেখানে হযরত আবু বকর (রা:) এলে তিনি তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ জানালেন। কিছুক্ষণ পর সেখানে হযরত উমার (রা:) এলে তাঁকেও তিনি জান্নাতের সুসংবাদ দিলেন। এরপর হযরত উসমান (রা:) সেখানে এলে তাঁকেও জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে জানিয়ে দিলেন, তিনি নানা ধরনের বিশৃংখলা ও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হবেন। (মুসলিম)
নবী করীম (সা:) এর এ ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত হতে খুব বেশী দেরী হয়নি। আল্লাহর রাসূল (সা:) হযরত আবু বকর (রা:), হযরত উমার (রা:) ও হযরত উসমান (রা:) কে সাথে নিয়ে মদীনার একটি পাহাড়ে উঠলেন। পাহাড়টি অকস্মাৎ কাঁপতে থাকলো। নবী করীম (সা:) পবিত্র কদম মুবারক দিয়ে পাহাড়ে আঘাত করে বললেন, 'হে পাহাড়! শান্ত হও। তোমার উপরে রয়েছেন একজন রাসূল, একজন সিদ্দীক এবং দুই জন শহীদ'। (বুখারী, তিরমিযী, নাসাঈ)
নবী করীম (সা:) এর এ ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত হলো। হযরত উমার (রা:) ও হযরত উসমান (রা:) উভয়েই শাহাদাতবরণ করেছেন। নবী করীম (সা:) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, 'আমার পরে কিয়ামতের পূর্বে ত্রিশজন মিথ্যাবাদী লোক নিজেদেরক নবী হিসাবে দাবী করবে'। (মুসলিম, আবু দাউদ, আহমাদ)
নবী করীম (সা:) এর পরে এ পর্যন্ত প্রায় উনত্রিশ জন মিথ্যাবাদী নিজেকে নবী হিসাবে দাবী করেছে। এদের মধ্যে অন্যতম হলো ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের গুরুদাসপুর জেলার কাদিয়ান নামক গ্রামের মির্জা গোলাম আহমাদ কাদীয়ানী। আবহমান কাল থেকে ইসলামের চির দুশমন ইয়াহুদী-খ্রিষ্ট-মুশরিকরা মুসলমানদের ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করার লক্ষ্যে নানা ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা মুসলমানদের আকিদা-বিশ্বাসের মধ্যে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে থাকে। আর একাজে তারা কখনো নিজেরা প্রকাশ্যে আসে না। পর্দার আড়ালে থেকে মূল কলকাঠি নাড়তে থাকে। নামধারী কোনো মুসলমানকে নির্বাচিত করে তার মাধ্যমেই অমুসলিমরা নিজেদের হীন উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করে। এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার কাজে তারা মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীকে নির্বাচিত করে মুসলমানদের খতমে নবুয়্যাত বিষয়ক আকিদা-বিশ্বাসের ওপরে চূড়ান্ত আঘাত হেনেছে। এই লোকটির মাধ্যমে নবুয়্যাতের দাবী উত্থাপন করে তারা এক নতুন ফেত্না সৃষ্টি করেছে। নবুয়্যাতের দাবী করার কারণে পৃথিবীর সকল মুহাক্কিক আলিম-ওলামা এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, কাদিয়ানীরা কাফির-তারা মুসলমান নয়।
কাদিয়ানীদের পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলিম দেশেই সরকারীভাবে অমুসলিম সংখ্যালঘু ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ-বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত তাদেরকে সারকারীভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা হয়নি। তবে এব্যাপারে এদেশের আলিম-ওলামা ও সচেতন মুসলমানরা আন্দোলন করে যাচ্ছেন। কিন্তু বাম-রামপন্থী নাস্তিক, মুরতাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ-ধর্মহীন গোষ্ঠী কাদিয়ানীদের পক্ষাবলম্বন করেছে। মির্জা গোলামের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী সে ১৮৩৯ বা ১৮৪০ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করে এবং তার পিতা ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন ছিলো দখলদার ইংরেজদের রাজকর্মচারী ও তাদের অনুগত ভৃত্য। এই গোলাম আহমাদ নামক লোকটি প্রথমে ইসলামের একজন প্রচারক হিসেবে সাধারণ মুসলমানদের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করলো। কিছুদিন পর নিজেকে মুজাদ্দীদ হিসেবে দাবী করলো। তারপর সে নিজেকে প্রতিশ্রুত ইমাম মাহ্দী হিসেবে দাবি করলো। এরপর সে নিজেকে নবী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হারাম বলে ফতোয়া দিলো। মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী তার শরীয়াতের ভিত্তি স্থাপন করলো ইংরেজদের শর্তহীন আনুগত্যের ওপরে। ইংরেজদের অর্থপুষ্ট এই জাহান্নামী ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা আলিম-ওলামাদের বিরুদ্ধে জঘন্য ভাষায় গালিগালাজ করে নানা ধরনের বই-পুস্তক রচনা করে প্রচার করলো এবং তার রচিত বইপত্রে সে ইংরেজদেরকে এদেশে আল্লাহ তা'য়ালার রহমত হিসেবে ঘোষণা করলো।
তার অপপ্রচারে যারা প্রলুব্ধ হতো, তাদেরকে ইংরেজ রাজশক্তি অর্থ-বিত্ত দিয়ে, উচ্চপদে চাকরীসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে একটি বিশেষ ধর্মসম্প্রদায়ের সৃষ্টি করলো। ইংরেজ সৃষ্ট ফেত্না মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর অনুসারীরাই কাদিয়ানী নামে পরিচিত। ইসলামের দুশমন চরম মুসলিম বিদ্বেষী ইয়াহুদী রাষ্ট্র ইসরাঈলের হাইফা শহরেই কাদিয়ানীদের প্রধান কেন্দ্র অবস্থিত এবং সেখান থেকেই পরিচালিত হয় তাদের বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম। লন্ডনেও তাদের বিশাল কেন্দ্র রয়েছে। তাদের পৃথক টিভি চ্যানেল রয়েছে। বিজ্ঞাপন ব্যতীত টিভি চ্যানেল-এর কার্যক্রম চালু রাখা অসম্ভব। পক্ষান্তরে এ, এমটিভি চ্যানেল বিজ্ঞাপন ব্যতীতই বিশ্বব্যাপী পরিচালিত হচ্ছে। সুতরাং এ কথা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, কাদিয়ানীদের টিভি চ্যানেল এ, এমটিভি ইসলামের দুশমনদের অর্থে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এদের আড্ডা রয়েছে। ঢাকায় এদের কেন্দ্র বশী বাজারে। কাদিয়ানীরা মুসলিম হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়ে সাধারণ মুসলমানদের ঈমান হরণ করার কাজে নিয়োজিত।
নবী করীম (সা:) বলেছেন, অত্যন্ত দ্রুত এমন সময় সম্মুখে আসবে যে, এমন কোনো মানুষ থাকবে না যে সুদের সাথে জড়িত হবে না। যদিও সে প্রত্যক্ষভাবে সুদ গ্রহণ করবে না, তবুও সুদ জড়িত ধুলো-বালি বাতাসের সাথে উড়ে এসে তার নাকে প্রবেশ করবে। (আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)
বর্তমান পৃথিবীতে প্রচলিত অর্থনীতি সুদের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। অর্থনৈতিক লেনদেন সুদের মাধ্যমে ব্যতীত সম্ভব নয়। শিল্প, কলকার-খানা যা কিছু উৎপাদন করছে এর সকল কিছুই কোনো না কোনোভাবে সুদের সাথে জড়িত। বৈদেশকি ঋণ সুদ ব্যতীত পাওয়া যায় না এবং বিদেশ থেকে কোনো কিছু আমদানী-রফতানী করতে গেলেও সুদ ব্যতীত সম্ভব নয়। পোষাকের প্রতিটি সুতা এবং খাদ্যের প্রত্যেক কণার সাথেও সুদ জড়ানো হয়েছে। ইসলামী অর্থনীতির বাস্তবায়ন ব্যতীত সুদের অভিশাপ থেকে মুক্ত থাকা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ তা'য়ালা সুদের অভিশাপ থেকে সকলকে মুক্ত রাখার পরিবেশ দান করুন।
📄 মক্কা অভিযান, গোপন পত্রের সংবাদ
মহান আল্লাহর নির্দেশে নবী করীম (সা:) মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকলেন। অভিযানের প্রস্তুতি অত্যন্ত গোপনে সম্পাদন হচ্ছিল। নবী করীম (সা:) তাঁর পরিকল্পনার কথা কাউকে জানলেন না। যুদ্ধ বা রক্তপাত ছিল তাঁর পবিত্র স্বভাবের বাইরে। তিনি তাঁর পবিত্র অন্তর থেকে কামনা করতেন মক্কা বিজয় যেন কোনো ধরণের রক্তপাত ব্যতীতই সমাপ্ত হয়। তিনি জানতেন, মক্কাবাসী তাঁর সাথে শত্রুতা করলেও তারা তাঁর পরম আপনজন। তারা বোঝে না, সত্য চিনে না, না বুঝে তাঁর সাথে শত্রুতা করে। সুতরাং কোনো ধরনের যুদ্ধ ব্যতীতই তিনি মক্কা জয়ের আশা পোষণ করছিলেন। গোপন পরিকল্পনার ভিত্তিতে তিনি অগ্রসর হতে থাকলেন। মিত্র গোত্রদেরকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল, কিন্তু কেনো কি উদ্দেশ্যে প্রস্তুত হতে বলা হলো, তারা তা জানতে পারলেন না। এমনকি হযরত আয়িশা (রা:) ও জানতেন না, নবী করীম (সা:) কোনদিকে যাবেন। শত্রু পক্ষের গুপ্তচরদের দৃষ্টি এড়িয়ে তিনি বিশাল এক বাহিনী প্রস্তত করলেন। সকল বাহিনী মদীনায় একত্রিত করে মদীনা থেকে সবাই একত্রে যাত্রা করবেন বিষয়টি এমন ছিল না। পথে যেন তারা রাসূল (সা:) এর সাথে নিজের গোত্রের পতাকা আর বাহিনী নিয়ে তাঁর সাথে মিলিত হয় সে ব্যবস্থা করা হরো। কোনো অভিযানের ব্যাপারে সাধারণত তিনি এতটা গোপনীয়তা অবলম্বন করতেন না।
মদীনা থেকে বের হয়ে কেউ মক্কার দিকে যাবে, এমন পথসমূহে তিনি প্রহরার ব্যবস্থা করলেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে কুলসুম (রা:) কে দায়িত্ব দিলেন, নবী করীম (সা:) মদীনায় অনুপস্থিত থাকা অবস্থায় তিনি যেন মদীনার শাসকের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় বিশ্বনবী (সা:) এর একজন প্রখ্যাত সাহাবী হযরত হাতিব ইবনে আবি বুলতায়া (রা:) মানবীয় দুর্বলতার কারণে একটি অনাকাঙ্খিত কাজ করলেন।
এই সাহাবী মক্কাতেই প্রথম দিকে ইসলাম কবুল করে নিষ্ঠুর নির্যাতন সহ্য করেছেন। সহায় সম্পদ ত্যাগ করে মাতৃভূমি থেকে হিজরত করেছেন। বদরের যুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। মিশরের বুকে ইসলামের আহ্বান নিয়ে রাসূলের দূত হিসাবে তিনি গমন করে শাসকদেরকে ইসলামের পথে এনেছিলেন। ইসলাম বিরোধিদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেয়ায় তিনি ছিলেন পারদর্শী। অর্থাৎ তিনি ছিলেন অত্যন্ত মর্যাদাবান সাহাবী।
তবুও তিনি মানুষই ছিলেন। মানবীয় দুর্বলতার ঊর্ধ্বে ছিলেন না। তিনি মেজাজের দিক দিয়ে কিছুটা উগ্র ছিলেন। তাঁর এক দাস একদিন রাসূল (সা:) এর কাছে এসে অভিযোগ করেছিল, 'হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমার মনিব হাতিব নিশ্চয়ই জাহান্নামে যাবে'।
নবী করীম (সা:) জবাব দিয়েছিলেন, 'তুমি মিথ্যা বলছো, যারা বদরের যুদ্ধে এবং হুদায়বিয়াতে (বাইয়াতুর রিদওয়ানে) অংশগ্রহণ করেছে, তাঁরা জাহান্নামে যাবে না'।
হযরত হাতিব সে সময় মদীনাতে বাস করলেও তাঁর আপনজন সকলেই ছিল মক্কায়। মানবীয় দুর্বলতার কারণে তিনি শংকিত হয়ে পড়েছিলেন। মক্কা অভিযানের সময় যদি যুদ্ধ হয়, তাহলে তাঁর পরিবার-পরিজন ক্ষতিগ্রস্থ হয় কিনা, এ চিন্তায় তিনি চিন্তিত হয়ে মক্কা অভিযানের গোপন প্রস্তুতির সংবাদ সম্পর্কে এক পত্র লিখলেন। সে পত্র মুযাইনা গোত্রের এক মহিলাকে দিয়ে মজুরির বিনিময়ে মক্কায় প্রেরণ করলেন। মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের এই প্রিয় সাহাবীর মনের প্রকৃত অবস্থা এবং গোপনে প্রেরিত পত্রের বিষয়টি ওহীর মাধ্যমে নবীকে জানিয়ে দিলেন।
নবী করীম (সা:) মহিলার কাছ থেকে পত্র উদ্ধার করার জন্য হযরত আলী (রা:), হযরত যুবাইর (রা:) ও হযরত মিকদাদ (রা:) কে প্রেরণ করলেন। তাঁরা দ্রুতগামী বাহনে আরোহন করে রাওদাতু খাক নামক স্থানে গিয়ে মহিলাকে গ্রেফতার করলেন। প্রথমে তার বাহনে অনুসন্ধান করে তাঁরা কোনো কিছুই পেলেন না। হযরত আলী (রা:) মহিলাকে বললেন, 'আমি ঐ মহান আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, রাসূল (সা:) কে মিথ্যা সংবাদ দেয়া হয়নি। তিনিও আমাদেরকে মিথ্যা সংবাদ দেননি। এখন তুমি নিজের ইচ্ছায় পত্র বের করে দাও, নতুবা আমরা তোমাকে বস্ত্রহীন করে পত্র অনুসন্ধান করবো'।
হযরত আলী (রা:) এর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে মহিলা বললো, 'তোমরা একটু সরে দাঁড়াও, আমি পত্র বের করে দিচ্ছি'।
সাহাবায়ে কেরাম সরে দাঁড়ালেন। মহিলা তার মাথার চুলের বেণীর ভেতর থেকে হযরত হাতিব (রা:) এর লেখা পত্র বের করে তাদের হাতে হস্তান্তর করলেন। তাঁরা পত্রটি নবী করীম (সা:) এর সামনে পেশ করলেন। পত্রের বিষয় জেনে তিনি হযরত হাতিব (রা:) কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'হাতিব, তুমি এমন কাজ কেনো করলে?'
হযরত হাতিব (রা:) জানতেন, তাঁর এই অপরাধের শাস্তি কি। তিনি বিনয়ের সাথে নবী করীম (সা:) কে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমার সম্পর্কে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না। যদিও আমি কুরাইশদের কেউ নই তবুও ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তাদের সাথে আমার সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। মক্কা থেকে যারা মদীনায় আগমন করেছে তাঁরা সকলেই তাদের মক্কার আত্মীয়দেরকে সাহায্য করে থাকে। আমার ধারণা হলো, কুরাইশরা আমার পরিবার-পরিজনদের সাথে যে সদ্ব্যবহার করে থাকে, এ জন্য তাদেরকে আমি কিছু প্রতিদান যদি দিতে পারি! এ কাজ আমি মুরতাদ হয়ে বা ইসলাম ত্যাগ করে বা ইসলামের ওপর কুফরকে প্রাধান্য দিয়ে করিনি'। (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী)
আরেক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, হযরত হাতিব (রা:) নবী করীম (সা:) কে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমার পরিবার-পরিজন তাদের মধ্যে অবস্থান করছে, বিষয়টি ক্ষতিকর হবে না আমি এ ধারণা করেই এই পত্রটি লিখেছি। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা:) সম্পর্কে আমার মনে সামান্যতম প্রশ্ন সৃষ্টি হয়নি। মক্কায় আমার মা, ভাই ও সন্তান রয়েছে। এ কারনেই আমি এই পত্র লিখেছি'। (হায়াতুস সাহাবা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৪২৫, আল ইসাবা প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৩০০)
নবী করীম (সা:) হযরত হাতিব (রা:) এর বক্তব্য সমর্থন করে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে বললেন, 'হাতিব সত্য কথা বলেছে। কেউ যেন তাঁর সম্পর্কে কটুক্তি না করে'।
হযরত উমার (রা:) বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! হাতিব আল্লাহ, রাসূল (সা:) এবং মুসলমানদের প্রতি বিশ্বাসহীনতার কাজ করেছে। আপনি আমাকে অনুমতি দান করুন, আমি এই মুনাফিকের মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেই'।
নবী করীম (সা:) বললেন, 'উমার! তুমি এমন করে বলো না। হাতিব বদর যুদ্ধের সৈনিক। আল্লাহ তা'য়ালা বদর যুদ্ধের সৈনিকদের পূর্বের ও পরের সকল গোনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'য়ালা তাদের সম্পর্কে বলেছেন, তোমরা যা খুশী করো, তোমাদের জন্য অবশ্যই জান্নাত রয়েছে'। (বুখারী)
আল্লাহর রাসূল (সা:) এর এ কথা শুনে হযরত উমার (রা:) এর দু'চোখ অশ্রু সজল হয়ে উঠলো। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা মুমতাহিনার আয়াত অবতীর্ণ করে জানালেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُوْنَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِّنَ الْحَقِّ ج يُخْرِجُوْنَ الرَّسُوْلَ وَإِيَّاكُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ ط إِنْ كُنْتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيْلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي قَ تُسِرُّوْنَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ قِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمْ وَمَا أَعْلَنْتُمْ ط وَمَنْ يَفْعَلْهُ مِنْكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيْلِ
হে ঈমানদার ব্যক্তিরা, তোমরা (কখনো) আমার ও তোমাদের দুশমনদের নিজেদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না (এটা কেমন কথা), তোমরা তাদের প্রতি বন্ধুত্ব দেখাচ্ছো, (অথচ) তোমাদের কাছে যে সত্য (দ্বীন) এসেছে তারা তা অস্বীকার করছে, তারা আল্লাহর রাসূল ও তোমাদের (জন্মভূমি থেকে) বের করে দিচ্ছে শুধু এ কারণে, তোমরা তোমাদের মালিক আল্লাহ তা'য়ালার ওপর ঈমান এনেছো; যদি তোমরা (সত্যিই) আমার পথে জিহাদ ও আমার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে (ঘরবাড়ি থেকে) বেরিয়ে থাকো, তাহলে কিভাবে তোমরা চুপে চুপে তাদের সাথে (আবার) বন্ধুত্ব পাতাতে পারো, তোমরা যে কাজ গোপনে করো আর যে কাজ প্রকাশ্যে করো, আমি তা সম্যক অবগত আছি; তোমাদের মধ্যে যদি কেউ (দুশমনদের সাথে গোপনে বন্ধুত্ব গড়ার) এ কাজটি করে, তাহলে (বুঝতে হবে) সে (দ্বীনের) সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে। (সূরা আল মুমতাহিনা-১)
📄 নবী করীম (সা:) এর আনুগত্যের মধ্যেই শান্তি ও মুক্তি
নবী করীম (সা:) এর জীবনী সম্পর্কে যাদের সামান্য ধারণা রয়েছে, তারাও এ কথা অবগত রয়েছে যে, তিনি কোন্ সমাজে এবং কি বিভৎস-বিভিষীকাময় পরিবেশে আগমন করেছিলেন। সে সমাজের লোকদের জান-মাল, ইয্যত-আব্রু, সহায়-সম্পদ কোনো কিছুর নিরাপত্তা ছিলো না। খাদ্য-বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা-চিকিৎসা ও নিরাপত্তার কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ছিলো না। জোর যার মুলুক তার- এটাই ছিলো সেই সমাজের রীতি। যেখানে নিয়ম পরিণত হয়েছিলো অনিয়মে আর অনিয়ম পরিণত হয়েছিলো নিয়মে। সমাজের প্রত্যেকটি মানুষ শান্তির আশায় হাহাকার করছিলো। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই অবস্থায় বিশ্ব শান্তির অগ্রদূত মানব মুক্তির মহানায়ক মুহাম্মাদুর (সা:) কে প্রেরণ করলেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি আদিষ্ট হয়ে মানুষকে তাঁর আনুগত্য করার আহ্বান জানালেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরে যারা তাঁর আনুগত্য স্বীকার করলো এবং তাঁর নেতৃত্বে একটি ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো।
যে সমাজ থেকে শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তার শেষ রেশটুকু বিদায় গ্রহণ করেছিলো, ইতিহাস সাক্ষী- সেই সমাজ ভেঙে আল্লাহর রাসূলের আনুগত্যের ভিত্তিতে নতুন করে যে সমাজ গড়া হলো, সেই সমাজে নেমে এলো শান্তির ঝর্ণাধারা। অনৈক্যই যে সমাজে ছিলো সাধারণ নিয়ম, সে নিয়ম পরিবর্তন হয়ে সেখানে ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে উঠলো। একমাত্র নিজের স্বার্থ ব্যতীত পরের উপকার শব্দটি ছিলো যাদের কাছে অপরিচিত, তারাই পরের উপকারের জন্য নিজের সঞ্চিত ধনরাশি উন্মুক্ত অবারিত হস্তে বিতরণ করে দিলো। যুদ্ধের ময়দানে প্রতিপক্ষের অস্ত্রাঘাতে প্রাণ কণ্ঠনালীর কাছে চলে এসেছে, সমুদ্রসম তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে, সেই কঠিন মুহূর্তেও তাঁরা পানির পেয়ালা সামনে পেয়েও পানি পান না করে আরেকজনের দিকে পেয়ালা এগিয়ে দিয়েছেন। যারা ছিলো নারীর ইয্যতের যম, তারাই হয়ে গেলো নারীর সতীত্বের হেফাজতকারী। মিথ্যা ছিলো যাদের জীবনে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত, তারাই হয়ে গেলো মহাসত্যের নিশানবরদার।
রাসূলের আনুগত্য ভিত্তিক সমাজে মানুষ লাভ করলো জান-মাল, ইয্যত-আব্রু, সহায়-সম্পদের নিরাপত্তা। মানুষ বুঝে পেলো তাদের মৌলিক অধিকারসমূহ। এটা কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়- রাসূলের আনুগত্য ভিত্তিক সমাজের চিত্র সোনালী অক্ষরে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। সুতরাং এ কথা প্রমাণিত সত্য যে, মানবতার মুক্তি, শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তা অর্জনের জন্য আল্লাহর রাসূলের আনুগত্যের বিকল্প নেই। এ বিষয়টি পবিত্র কোরআনেও স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এ কথা মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করার অর্থই হলো মহান আল্লাহর বিধানের আনুগত্য করা।
নবী করীম (সা:) এর আনুগত্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে শান্তি, কল্যাণ ও ঐক্য। আর রাসূলের বিরুদ্ধাচারণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে অশান্তি, অনৈক্য ও অকল্যাণ। যারা জীবনের সর্বক্ষেত্রে একমাত্র রাসূলকেই নেতা হিসাবে গ্রহণ করে তাঁর আনুগত্য করলো, প্রকৃতপক্ষে তারা মহান আল্লাহরই আনুগত্য করলো। প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষভবে আল্লাহর বিধান অস্বীকার বা অমান্য করলে যেমন অশান্তি, অনৈক্য, অকল্যাণ ও গযব নেমে আসে, অনুরূপভাবে রাসূলের আদেশ-নিষেধ অমান্য করলেও অশান্তি, অনৈক্য, অকল্যাণ ও গযব নেমে আসবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ ব্যপারে মানব জাতিকে সতর্ক দিয়ে বলেন-
فَلْيَحْذَرِ الَّذِيْنَ يُخَالِفُوْنَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ -
যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচারণ করে এ বিষয়ে তাদের সতর্ক থাকা একান্ত কর্তব্য যে, তারা মহাবিপদগ্রস্ত হবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক আযাব তাদেরকে গ্রেফতার করবে। (আল কুরআন)
রাসূলের আনুগত্য পরিত্যাগ করে শান্তি, মুক্তি, ঐক্য ও কল্যাণের প্রত্যাশা করা বোকামী বৈ আর কিছুই নয়। অতএব দিনের আলোয়, রাতের অন্ধকারে, নির্জনে-একাকী, গোপনে-প্রকাশ্যে তথা সর্বাবস্থায় রাসূলের আনুগত্য করতে হবে। তাহলেই কাঙ্খিত শান্তি-মুক্তি ও কল্যাণ লাভ করা যাবে। রাসূলের আনুগত্য করাকেই পবিত্র কোরআনে ইত্তেবায়ে রাসূল বলা হয়েছে। ই'ত্তেবা আরবী শব্দ। এ শব্দের অর্থ হলো অনুসরণ করা, আনুগত্য করা, তাঁবেদারী করা, কারো পদাঙ্ক অনুসরণ করা, কারো পিছে পিছে চলা। রাসূলের ই'ত্তেবা করার অর্থ হলো, রাসূলকে অনুসরণ করা। রাসূলকে অনুসরণ সম্পর্কিত যে আয়াতসমূহ পবিত্র কুরআনে এসেছে, সেসব আয়াতেও 'ই'ত্তেবা' শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন-
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ط وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
হে রাসূল! আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো তাহলে আল্লাহ তোমাদেরও ভালোবাসবেন; তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পাপ ক্ষমাকারী, করুণাময়। (সূরা আলে ইমরাণ-৩১)
উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন 'ই'ত্তেবা' শব্দ ব্যবহার করে তাঁর রাসূলকে অনুসরণ করার কথা বান্দাদের জানিয়ে দিলেন এবং এ কথা স্পষ্ট করে দিলেন যে, মানুষ যদি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জন করতে ইচ্ছুক হয়, শান্তি, স্বস্তি, ঐক্য ও কল্যাণের প্রত্যাশা করে- তাহলে তাকে অবশ্য অবশ্যই তাঁর প্রেরিত রাসূলকে অনুসরণ করতে হবে। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার, শান্তি ও কল্যাণ লাভ করার- এ ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ নেই। সেই সাথে এ কথাও স্পষ্ট হয়ে গেল যে, রাসূলকে যারা অনুসরণ করবে, তাদেরকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ভালোবাসবেন অর্থাৎ তাদের ওপরে তিনি সন্তুষ্ট হবেন। আর আল্লাহ তা'য়ালা যাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন, তারা অবশ্যই শান্তি, স্বস্তি, কল্যাণ ও নিরাপত্তা লাভ করবে।