📄 নবী করীম (সা:) কর্তৃক দূরের সংবাদ পরিবেশন
মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে প্রয়োজন অনুসারে অদৃশ্যের সংবাদ প্রদান করেছেন এবং তিনি তা সাহাবায়ে কেরামের সম্মুখে প্রকাশ করেছেন। এর অর্থ এটা নয় যে, তিনি সকল অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখতেন বা গায়েবের সংবাদ তাঁর জানা ছিলো। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তিনি কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি এবং অদৃশ্যের সংবাদও প্রকাশ করেননি। শরাব নিষিদ্ধকালে সাহাবায়ে কেরাম নবী করীম (সা:) এর কাছে জানতে চেয়েছেন কিন্তু তিনি কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা যখন ওহী অবতীর্ণ করেছেন তখনই তিনি শরাব নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রিয় হাবীব সম্পর্কে স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছেন-
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى طَ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى لا তিনি কখনো নিজের থেকে কোনো কথা বলেন না, বরং তা হচ্ছে 'ওহী' যা (তাঁর কাছে) পাঠানো হয়। (সূরা আন নাজম-৩-৪)
وَیَقُولُوْنَ لَوْلَا أُنْزِلَ عَلَیْهِ آيَةٌ مِّنْ رَّبِّهِ جِ فَقُلْ إِنَّمَا الْغَيْبُ لِلَّهِ فَانْتَظِرُوا جِ إِنِّي مَعَكُم مِّنَ الْمُنْتَظِرِينَ ع
আপনি তাদের বলে দিন, গায়েব সংক্রান্ত যাবতীয় জ্ঞান তো একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার কাছে। (সূরা ইউনুস-২০)
وَلِلَّهِ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَ আসমানসমূহ ও যমীনের যাবতীয় অদৃশ্য জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার জন্যেই (নির্দিষ্ট রয়েছে)। সূরা আন নাহল-৭৭)
قُل لا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ طَ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ جِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ جِ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُوْنَ عِ আপনি বলে দিন, আমার নিজের ভালো-মন্দের মালিকও তো আমি নই, তবে আল্লাহ তা'য়ালা যা চান তাই হয়; যদি আমি অজানা বিষয় সম্পর্কে জানতাম, তাহলে আমি (নিজের জন্যে সে জ্ঞানের জোরে) অনেক ফায়দাই হাসিল করে নিতে পারতাম এবং (এ কারণে) কোনো অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করতে পারতো না, আমি তো শুধু (একজন নবী, জাহান্নামের) সতর্ককারী ও (জান্নাতের) সুসংবাদবাহী মাত্র, শুধু সে জাতির জন্যে যারা আমার ওপর ঈমান আনে। (সূরা আল আ'রাফ-১৮৮)
عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا لا إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَّسُوْلٍ فَإِنَّه يَسْلُكُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ رَصَدًا لا তিনি (সমগ্র) অদৃশ্য জগতের (জ্ঞানের একক) জ্ঞানী, তাঁর সে অদৃশ্য জগতের কোনো কিছুই তিনি কারো কাছে প্রকাশ করেন না, অবশ্য তাঁর রাসূল ছাড়া-যাকে তিনি (এ কাজের জন্যে) বাছাই করে নিয়েছেন, কিন্তু তার আগে-পিছেও তিনি (অতন্দ্র) প্রহরী নিযুক্ত করে রেখেছেন। (সূরা আল জ্বিন-২৬-২৭)
হাদীসে জিবরাঈল নামে খ্যাত একটি বহুল পরিচিত হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, মানুষের রূপ ধারণ করে মানুষকে শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে হযরত জিবরাঈল (আ:) নবী করীম (সা:)-এর কাছে জানতে চাইলেন, 'কিয়ামত কোন্দিন অনুষ্ঠিত হবে?' জবাবে তিনি বলেছিলেন, 'যার কাছে এ প্রশ্ন করা হয়েছে তিনি এ বিষয়ে প্রশ্নকারীর তুলনায় অধিক অবহিত নন। তবে আমি কিয়ামতের আলামতসমূহ আপনাকে বলতে পারি'। (বুখারী, মুসলিম)
হযরত আয়িশা (রা:) বলেছেন, 'তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ কথা বলে যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) গায়েব জানতেন সে মিথ্যুক'। (বুখারী)
কোনো একদিন কিছু সংখ্যক বালিকা নবী করীম (সা:)-এর পাশেই কবিতা আবৃত্তি করছিলো, তাদের একজন আবৃত্তি করলো, 'আমাদের মধ্যে এমন একজন নবী রয়েছেন যিনি আগামী দিনের কথা জানেন'। নবী করীম (সা:) এ কথা শুনে দ্রুত তাদেরকে এমন কথা বলতে নিষেধ করলেন। (বুখারী)
সুতরাং নবী করীম (সা:) গায়েবের যেসকল সংবাদ জানিয়েছেন তা সবই মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে জানিয়েছেন বলেই তিনি প্রকাশ করেছেন। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অদৃশ্যের বা ভবিষ্যতে ঘটিতব্য যে সকল বিষয় তাঁকে জানানো ও প্রকাশ করার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে, তা তিনি জানিয়েছেন এবং সে সকল বিষয় থেকে এখানে আমরা কতিপয় ঘটনা ও ভবিষ্যদ্বাণী উল্লেখ করছি।
ইতিহাসের পাঠক মাত্রই অবগত আছেন যে, বিশ্বনবী (সা:) এর সমগ্র জীবনই দুঃখ আর যন্ত্রণায় পরিপূর্ণ। মায়ের গর্ভে যখন ছিলেন তখন থেকেই তাঁর জীবন থেকে একের পর এক প্রিয়জন হারিয়ে যাচ্ছিলো। ইন্তেকালের সময় পর্যন্তও এই প্রিয়হারানোর ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। বদরের যুদ্ধে জয়ী হয়ে এলেন মদীনায়, দেখলেন তাঁর কলিজার টুকরা বড় মেয়ের দাফন কাফনের আয়োজন চলছে, তাঁর কলিজার টুকরা কন্যার ইন্তেকালের মর্মান্তিক সংবাদ পথিমধ্যে আল্লাহ তাঁকে জানাননি। ওহূদের ময়দানে প্রিয় চাচা হামজা (রা:) ও সাহাবায়ে কেরামের একটি অংশকে হারাতে হবে ভবিষ্যতে ঘটিতব্য এ ঘটনা তাঁকে পূর্বে জানানো হয়নি।
মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার অনেক বছর পর তিনি পবিত্র মক্কায় প্রবেশ করার সুযোগ পেলেন, আল্লাহ তা'য়ালার ঘর তাওয়াফ ও নামাজ আদায়ের সুযোগ পেলেন। এ ঘটনায় সাহাবায়ে কেরামের হৃদয়-মন আনন্দে ভরপুর পরিপূর্ণ ছিলো। কিন্তু এই আনন্দ বেশী দিন স্থায়ী হলো না। যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো। নবী করীম (সা:) এই যুদ্ধে প্রিয় ভাই জাফরকে হারালেন। শিশুকাল থেকে যে যায়িদকে তিনি লালন পালন করে বড় করেছেন, সেই যায়িদকে হারালেন, আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার মত প্রিয়জনকে হারালেন। এ সংবাদ তাঁকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিলো।
মক্কা থেকে প্রত্যাবর্তনের পরে নবী করীম (সা:) বেশ কয়েকটি দেশের নেতার কাছে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে পত্র প্রেরণ করেছিলেন। সিরিয়ার সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় রোম সম্রাটের অধীনে বেশ কয়েকজন নেতা শাসন কাজ পরিচালনা করতো। বালক্কা এলাকায় যে নেতা শাসন করতো তার নাম ছিল শোরহাবিল। নবী করীম (সা:) এর দূত হারিস ইবনে ওমায়ের (রা:) নবীর পত্র নিয়ে তার কাছে গিয়েছিলেন। বর্তমানেই শুধু নয়, সে সময়েও দূত হত্যা করা সকল দেশেই নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু শুরহাবিল আন্তর্জাতিক সকল রীতি-নীতি ভঙ্গ করে মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের দূতকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিলো।
এই ঘটনার কিসাস হিসাবে নবী করীম (সা:) তিনহাজারের এক মুসলিম বাহিনী সেখানে প্রেরণ করেছিলেন। রোম সম্রাট নবীর পত্র পেয়ে সাময়িকের জন্য ইসলামের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়েছিল বটে, কিন্তু বৈষয়িক স্বার্থের কারণে ইসলামের কঠিন শত্রুর ভূমিকায় সে অবতীর্ণ হয়েছিল। তার অধীনস্ত নেতা শুরহাবিলকে মদীনা আক্রমনের উৎসাহ সে-ই দিয়েছিল। উদিয়মান ইসলামী শক্তিকে অঙ্কুরে ধ্বংস করাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। কারণ তার বেশ কয়েকটি মিত্র রাষ্ট্র ইসলামের প্রতি ছিল সহানুভূতিশীল। অনেকে ইসলাম কবুল করেছিল। তার সাম্রাজ্য কখন ইসলামের শক্তির কাছে নত হয়ে যায় এই ভয়েই সে ছিল কম্পমান।
তার শাসনাধীন সিরিয়ার মায়ান প্রদেশের গভর্ণর ফারুয়া ইতোমধ্যেই ইসলাম কবুল করেছিল। ফারোয়াকে সে তার দরবারে ডেকে নিয়ে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখালো ইসলাম ত্যাগ করে পুনরায় খ্রিষ্টান হবার জন্য। তিনি ইসলাম ত্যাগ করলেন না। তারপর তাকে প্রলোভন দেখানো হলো। তবুও তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। তারপর তাঁকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল। ভয় পেয়ে গিয়েছিল রোম সম্রাট হোরাক্লিয়াস। তার শাসনাধীন এলাকার নেতারা যদি ইসলাম কবুল করতে থাকে, তাহলে তো তার সাম্রাজ্যই টিকবে না। সুতরাং শোরহাবিলকে সে উৎসাহ দিল, সৈন্য বাহিনী যা প্রয়োজন আমার কাছে থেকে গ্রহণ করো, তবুও মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রকে উৎখাত করতেই হবে।
বিশ্বনবী (সা:) এবার ভিন্ন ধরনের ব্যাবস্থাধীনে ইসলামের সেনাবহিনী প্রেরণ করেছিলেন। মাত্র তিন হাজার সেনা সদস্য। সকলেই তাওহীদের অতন্দ্র সিপাহসালার। এক সময়ের ক্রীতদাস, হযরত যায়িদ (রা:), যাকে রাসূল (সা:) নিজের সন্তানের মতই দেখতেন। সেই শিশুকাল থেকেই তিনি নবীর সাহচর্যে রয়েছেন। তাঁকেই এই বাহিনীর প্রথম সেনাপতি নিযুক্ত করলেন। প্রতিটি যুদ্ধেই একজন করে সেনাবাহিনী নিযুক্ত করা হতো। এই যুদ্ধে পরপর তিনজন সেনাবাহিনী রাসূল (সা:) নিযুক্ত করলেন। বিষয়টি ছিলো অন্য যুদ্ধের তুলনায় একটু ব্যতিক্রমধর্মী। দ্বিতীয় প্রধান করা হলো হযরত জাফর ইবনে আবি তালেব (রা:) কে। তৃতীয় প্রধান করা হলো হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা:) কে।
নবী করীম (সা:) ঘোষণা করলেন, 'যায়িদ শাহাদাতবরণ করলে দায়িত্ব গ্রহণ করবে জাফর, জাফর শাহাদাতবরণ করলে দায়িত্ব গ্রহণ করবে আব্দুল্লাহ। সেও যদি শাহাদাতবরণ করে তাহলে মুসলিম বাহিনী যাকে ইচ্ছা তাকে সেনবাহিনী প্রধান নিযুক্ত করবে'।
কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, একজন ইয়াহুদী নবী করীম (সা:) এর কথা শুনে মন্তব্য করেছিল, 'খোদার শপথ! এই তিনজনই আজ শাহাদাতবরণ করবে'।
হযরত যায়িদ ইবনে হারিসা (রা:) কে প্রথম সেনাপতি নিযুক্ত করায় কোনো কোনো সাহাবায়ে কেরামের ভেতরে জল্পনা কল্পনা সৃষ্টি হয়েছিল। একজন দাস শ্রেণীর লোককে সেনাপতি নিযুক্ত করা হলো। কিন্তু নবী করীম (সা:) তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থেকে প্রমাণ করে দিলেন, আল্লাহর বিধানের সামনে উচ্চনীচ আর মনিব এবং দাসের ভেতরে মানুষ হিসাবে কোনো প্রভেদ নেই। মানুষের সম্মান আর মর্যাদা নির্ধারণ করা হয় একমাত্র আল্লাহ ভীতির দ্বারা। যে ব্যক্তি আল্লাহকে যতো বেশি ভয় করে, সে ততবেশি মর্যাদাবান।
সেনাবাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে, নবী করীম (সা:) সাথে সাথেই যাচ্ছেন। তিনি সেনা প্রধানকে বললেন, 'প্রথমে তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাবে, যদি তারা ইসলাম কবুল করে তাহলে যুদ্ধের কোনো প্রয়োজন নেই। তোমরা অগ্রসর হবে ঐ পর্যন্ত যেখানে হারিস তাঁর মহান কর্তব্য পালন করার সময় শাহাদাতবরণ করেছে'।
নবী করীম (সা:) সানিয়াতুল বিদা পর্বত পর্যন্ত গিয়ে তাদের জন্য আল্লাহ তা'য়ালার কাছে দোয়া করে মদীনায় তিনি ফিরে এলেন। সেনাবাহিনী সামনের দিকে এগিয়ে গেল। মুসলিম বাহিনী মদীনা হতে বের হয়েছে, এ সংবাদ গুপ্তচর মাধ্যমে শুরহাবিল জানতে পেরে এক লক্ষ সৈন্যের এক বাহিনী প্রস্তুত করলো। রোম সম্রাট এবং আরব গোত্রগুলোর ভেতর থেকে আরো প্রায় এক লক্ষ সৈন্য প্রস্তুত রাখলো। প্রথম এক লক্ষ ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় এক লক্ষের দলকে সামনের দিকে এগিয়ে দেয়া হবে।
মুসলিম বাহিনী সিরিয়া প্রদেশে উপনীত হয়ে জানতে পারলো, তাদেরকে মুকাবেলা করার জন্য শোরহাবিল এক লক্ষ সৈন্যবাহিনী নিয়ে প্রস্তুত রয়েছে এবং আরো এক লক্ষ সৈন্য তাদেরকে সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। মুসলিম বাহিনী সেখানেই যাত্রা'বিরতি করে নিজেদের ভেতরে আলোচনায় বসলেন। সেনাপতি হযরত যায়িদ (রা:) বললেন, 'এ অবস্থায় সামনের দিকে আর অগ্রসর না হয়ে এখানেই অবস্থান করা উচিত। মদীনায় সংবাদ প্রেরণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করি'।
শাহাদাতের আকাংখায় উদ্দীপ্ত মুসলিম বাহিনী তাদের সেনাপতির কথায় সন্তুষ্ট হলেন না। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা:) দীপ্ত কণ্ঠে বললেন, 'আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তা'য়ালার পথে শাহাদাতবরণ করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা। শাহাদাতের মধ্যেই রয়েছে জীবনে পরম সাফল্য। শাহাদাত আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামত হিসাবেই এসে থাকে। এই নিয়ামত সবার ভাগ্যে হয় না। আর সংখ্যা বিচারে মুসলমানগণ বিজয়ের আশা করে না। বিজয় দানের মালিক মহান আল্লাহ'।
আল্লাহ তা'য়ালার পথের নির্ভীক সৈনিক হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা:) এর তোজোদৃপ্ত কথা শুনে মুসলিম বাহিনীর ভেতরে শাহাদাতের অদম্য কামনা তীব্র হয়ে উঠলো। তাঁরা বীরদর্পে সামনের দিকেই এগিয়ে গেলেন। এ ধরনের একটি ঘটনা হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা:) এর জীবনে একবার ঘটেছিল। এই সিরিয়াতেই তিনি রোমক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করতে এসেছিলেন। রোমান সেনাপতি ক্লিভাস সমরাস্ত্রে সজ্জিত বিশাল বাহিনীসহ দুর্গের অভ্যন্তরে অবস্থান করছিল। মদমত্ত ক্লিভাস তার সুশিক্ষিত রণকৌশলি বিপুল বাহিনী নিয়ে বড় গর্ব করছিল। মহাসত্যের পতাকাবাহী তৌহিদের নিশানবরদার হযরত খালিদ (রা:) তাঁর স্বল্প সংখ্যক বাহিনী নিয়ে দামেস্ক নগরী অবরোধ করেছিলেন।
ইসলামের ঐতিহ্যানুযায়ী বীর কেশরী খালেদ (রা:) সত্যের উজ্জ্বল শিখায় আলোকিত করার ইচ্ছায় কয়েকজন সাথীকে নিয়ে ক্লিভাসের প্রাসাদে গমন করলেন। বাতিল শক্তির প্রতিভূ সম্রাট হিরাক্লিয়াসের গর্বিত সেনাপতি শক্তির দর্পে তার দোভাষীর মাধ্যমে বিশ্ব ইতিহাসের বীর সম্রাট তাওহীদের অতন্দ্র প্রহরী ইসলামের বিপ্লবী সিপাহসালার বীর কেশরী খালিদকে ভীতি প্রদর্শন করছিল। কালিমার আওয়াজ বুলন্দ করার দৃপ্ত শপথ নিয়ে খালিদ আগমন করেছেন দামেস্কে।
ক্লিভাসের দোভাষী জারজিসের কথা শুনে আল্লাহর তরবারী খালিদ (রা:) আহত সিংহের মতই গর্জন করে উঠলেন, 'ঐ আল্লাহ তা'য়ালার নামে শপথ করেই ঘোষনা করছি, তোমাদের সৈন্য সংখ্যাকে আমরা ঐ ক্ষুদ্র পাখির ঝাঁকের সাথেই তুলনা করি, শিকারী যে ঝাঁক ধরে খায়। শিকারী কখনো পাখির বৃহৎ ঝাঁক দেখে ভয় পায় না বরং আনন্দিত হয়। পাখির বিশাল ঝাঁক শিকারীর মনে আনন্দ বৃদ্ধি করে। পাখির ঝাঁকের চারদিকে জালের বেষ্টনী দিয়ে শিকারী অনায়াসে সে পাখি ধরে ফেলে। হে জারজিস! তুমি তোমার সেনাপতি ক্লিভাসকে জানিয়ে দাও! তাওহীদের সেনাবাহিনী আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। তাঁরা শাহাদাতবরণকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিয়ামত মনে করে যুদ্ধের ময়দানে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। শাহাদাত নামক নিয়ামতের জন্য এই বাহিনী কতটা ব্যাকুল তা তোমরা একটু পরেই নিজের চোখে দেখতে পাবে। তাঁরা শাহাদাতের অলিন্দে জীবনের সফলতার সন্ধান লাভ করে। সত্যের পতাকাধারীদের সিদ্ধান্তই শাহাদাতবরণ করা। তাঁরা শাহাদাতের মৃত্যুকে হন্যে হয়েই খুঁজে ফিরে। মৃত্যু যাদের পায়ের ভৃত্য তাদেরকে তোমরা মৃত্যুর ভয় দেখাও? শাহাদাতবরণ করার জন্যই যারা যুদ্ধের ময়দানে আগমন করেছে, পৃথিবীতে জীবিত থাকা তাদের কাছে একটি আপদ ব্যতীত আর কিছুই নয়। যাও, তুমি তোমার সেনাপতিকে আমার কথাগুলো জানিয়ে দাও'।
সেই খালিদ (রা:) ও মুতার প্রান্তরে এসেছেন। যদিও তিনি সামান্য কিছু দিন পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি হযরত যায়িদ (রা:) দক্ষতার সাথে সৈন্য বিন্যাস করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে এক সময় তিনি শাহাদাতের সুধা পান করলেন। এরপর হযরত জাফর (রা:) পতাকা হাতে উঠিয়ে নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। একলক্ষের এক বাহিনীর সাথে মাত্র তিন হাজার সৈন্যর এক অসম যুদ্ধ হচ্ছে। ময়দানের অবস্থা তখন ভয়ঙ্কর। হযরত জাফর (রা:) এর ঘোড়া আহত হলো।
তিনি পদাতিক অবস্থায় যুদ্ধ করতে লাগলেন। শত্রু পক্ষ তাঁর বাম হাত কেটে ফেললে তিনি ডান হাতে পতাকা তুলে ধরলেন। ডান হাত কেটে ফেললে তিনি কাটা বাহু দিয়ে পতাকা উড্ডীন রাখলেন। শত্রু পক্ষ তাঁকে শহীদ করে ফেললো। কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি মুখ দিয়ে পতাকা উড্ডীন রেখেছিলেন। হযরত জাফর (রা:) সম্পর্কে নবী করীম (সা:) বলেছেন, 'তাঁকে জান্নাতে এমন দু'টো পাখা দান করা হয়েছে যে, সে পাখার সাহায্যে তিনি জান্নাতের যেখানে খুশী সেখানে উড়ে বেড়াচ্ছেন'।
এ কারণে হযরত জাফর (রা:) এর উপাধি হয়েছে, তাইয়্যার। অর্থাৎ যে উড়ে বেড়ায়। চাচাত ভাই জাফরকে নবী করীম (সা:) খুবই ভালোবাসতেন। তাঁর শাহাদাতে নবী করীম (সা:) অত্যন্ত ব্যথা পেয়েছিলেন। তিনি বেদনাহত হয়ে মসজিদে নববীতে বসেছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম এসে তাঁকে জানিয়েছিলেন, মহিলাগণ হযরত জাফরের জন্য মাতম করছে। নবী করীম (সা:) তাদেরকে সেই জাহেলি প্রথায় মাতম করতে নিষেধ করেছিলেন।
এবার এগিয়ে এলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা:)। প্রচণ্ড বেগে সে সময় যুদ্ধ চলছে। তরবারী চালনা করতে করতে তিনি বেশ ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লেন। একজন সাহাবী তাঁকে একটুকরা গোস্ত দিয়ে বললেন, 'আপনি বড় ক্ষুধার্ত, এইটুকু খেয়ে তরবারী চালনা করুন'।
গোস্তের টুকরা তিনি মুখে দিয়েছেন। এমন সময় তিনি দেখলেন একজন মুসলিম সৈন্য বড় বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তিনি গোস্তের টুকরো ফেলে দিয়ে বললেন, 'এ পৃথিবীতে আমার খাবারের কোনো প্রয়োজন আর নেই'।
ছুটে গেলেন তিনি রণাঙ্গনে। এক সময় তিনিও শাহাদাতের পেয়ালা পান করলেন। মুতার যুদ্ধে তিনজন সেনাপতির অধীনে হযরত খালিদ (রা:) জেনারেলের সকল অহংকার বিসর্জন দিয়ে একজন সাধারণ সৈনিক হিসাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন। পরপর তিনজনই যখন শাহাদাতবরণ করলেন তখন হযরত সাবিত ইবনে আকরাম (রা:) যুদ্ধের পতাকা উঠিয়ে নিলেন, যেন মুসলিম বাহিনীর ভেতরে কোনো ধরনের বিশৃংখলা সৃষ্টি না হয়।
পতাকা হাতে তিনি ছুটে এলেন হযরত খালিদ (রা:) এর কাছে। তিনি বললেন, 'হে খালিদ! এই পতাকা তুমি ধরো'।
দুই লক্ষের বিরুদ্ধে মাত্র দুই হাজার সৈন্য। যাদের ভেতরে প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা বেশি। বদর, ওহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবায়ে কেরাম এই বাহিনীতে শামিল রয়েছেন। তাদের ওপরে নও মুসলিম খালিদের যে নেতৃত্ব দেবার কোনো অধিকার নেই এ কথা হযরত খালিদের থেকে আর কে ভালো বুঝতো! তিনি আপত্তি জানিয়ে শ্রদ্ধাভরে বললেন, 'অসম্ভব! আমি এ পতাকা গ্রহণ করতে পারি না। আপনি আমার থেকে বয়সে অনেক বড়। আপনি বদর ওহুদে অংশগ্রহণ করেছেন। আপনিই এই পতাকার যোগ্যতম ব্যক্তি'।
হযরত সাবিত (রা:) বললেন, 'আমি এই পতাকা তোমার জন্যই উঠিয়ে এনেছি। আমার থেকে তোমার সামরিক দিক দিয়ে যোগ্যতা অধিক। তুমি এ পতাকা ধরো'।
এবার হযরত সাবিত (রা:) মুসলিম বাহিনীর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোমরা কি খালিদের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে রাজি আছো?'
সমবেত বাহিনী সম্মতি জানিয়ে বলেছিল, 'অবশ্যই আমরা রাজি আছি'।
হযরত খালিদ (রা:) জেনারেলের দায়িত্ব গ্রহণ করার পরে দুই হাজার মুসলিম বাহিনী দুই লক্ষের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিল। হযরত খালিদ (রা:) বলেন, 'সেদিনের যুদ্ধে আমার হাতে সাতটি তরবারী ভেঙ্গেছিল। সর্বশেষে একটি ইয়েমেনী তরবারী টিকে ছিল'।
বুখারীর বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে আটটি তরবারীর কথা। নবী করীম (সা:) হযরত খালিদ (রা:) এর উপাধি দান করেছিলেন, সাইফুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর তরবারী। তিনি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে যেমন ছিলেন ইসলামের কট্টর শত্রু, তেমনি ইসলাম গ্রহণ করার পরে হয়েছিলেন ইসলামের পরম বন্ধু। (উসুদুল গাবা, দ্বিতীয় খণ্ড, ৯৪, রিজানুল হাওলার রাসুল, পৃষ্ঠা নং-২৮৬-২৮৭, আল ইসাবা, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৪১৩)
হযরত জাফর (রা:) এর গোটা দেহ অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছিল। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা:) বলেন, 'আমি তাঁর শরীরে তরবারী এবং বর্শার ৯০টি আঘাত দেখেছি। সকল আঘাতগুলো ছিল সামনের দিকে'।
এই যুদ্ধের ময়দানের সংবাদ নবী করীম (সা:) কে মদীনাতেই ফেরেশতার মাধ্যমে দেয়া হচ্ছিলো। কে কখন শাহাদাত বরণ করছেন, নবী করীম (সা:) সে সংবাদ অবগত হয়ে তাঁর সাহাবায়ে কেরামকে শোনাচ্ছিলেন। হাদীসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, নবী করীম (সা:) এর সামনে যেন মৃতার প্রান্তর তুলে ধরা হয়েছিল। যুদ্ধের দৃশ্য দেখে দেখে তিনি বর্ণনা করছিলেন। যুদ্ধের ময়দানের সংবাদ নিয়ে এসেছিলেন হযরত ইয়ালী ইবনে মাম্বাহ (রা:)। তিনি সংবাদ বলার আগেই নবী করীম (সা:) বলেছিলেন, 'তুমিই সংবাদ বলবে না আমি তোমাকে শোনাবো?'
সংবাদ আনয়নকারী সাহাবী আল্লাহর রাসূল (সা:) এর পবিত্র মুখ থেকে যুদ্ধের ঘটনা শুনে বললেন, 'আল্লাহর শপথ! আপনি বাড়িয়েও বলেননি কিছু কমও বলেননি'।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা:) শাহাদাতবরণ করার পরে মুসলিম বাহিনীর ভেতরে কিছুটা বিশৃংখল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এ কারণে কিছু সংখ্যক সৈন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে মদীনায় চলে এসেছিল। মদীনাবাসী তাদেরকে ময়দান ত্যাগ করে চলে আসার জন্য লজ্জিত করেছিল। নবী করীম (সা:) আরো সৈন্য সংগ্রহ করে মৃতার প্রান্তরে মুসলিম বাহিনীর সাহায্যে প্রেরণ করেছিলেন।
যুদ্ধের প্রথম দিনে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করা হলো। হযরত খালিদ (রা:) নতুন এক কৌশলে পরের দিন সৈন্য সমাবেশ করেছিলেন। তাঁর এই কৌশলের কারণে রোমক বাহিনী ধারণা করেছিল, মদীনা থেকে বহু সৈন্য মুসলমানদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। ফলে তাদের মনে ভীতি সঞ্চার হয়ে তারা ময়দান ত্যাগ করে পালিয়েছিল। হযরত খালিদ (রা:) প্রচুর গণীমতের সম্পদসহ যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে মদীনায় আগমন করেছিলেন।
যারা ময়দান ত্যাগ করে মদীনায় চলে এসেছিল, তাদের সম্পর্কে নবী করীম (সা:) বলেছিলেন, 'এরা পলাতক নয়, আল্লাহ তা'য়ালার ইচ্ছায় এরা পুনরায় যুদ্ধে যোগদান করবে'। (বুখারী)
কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই মৃতার যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয় ঘটেছিল। কিন্তু এই বর্ণনা ঠিক নয়। কারণ, যে সময় মৃতার প্রান্তরে যুদ্ধ চলছে, সে সময় নবী করীম (সা:) ওহীর মাধ্যমে অবগত হয়ে বলেছিলেন, 'আল্লাহ তা'য়ালার তরবারী খালিদ এই মাত্র মুসলিম বাহিনীর পতাকা ধারণ করেছে, আল্লাহ তা'য়ালা মুসলিম বাহিনীকে শত্রুর ওপর বিজয় দান করেছেন'। (বুখারী)
📄 নবী করীম (সা:) কর্তৃক ভবিষ্যৎবাণী
নবী করীম (সা:) যখন ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি তখন নবী পরিবারের যাবতীয় খরচের দায়িত্ব পালন করতেন হযরত বিলাল (রাঃ)। হযরত আব্দুল্লাহ হাওজানী (রা:) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল (সা:) এর পারিবারিক ভরণ-পোষণের অবস্থা কেমন ছিল?'
হযরত বিলাল (রা:) তাঁকে জানিয়েছিলেন, 'নবী করীম (সা:) এর পারিবারিক যাবতীয় কাজ-কর্মের দায়িত্ব আমার ওপরে অর্পিত ছিল। আল্লাহর নবীর ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত আমি সে দায়িত্ব পালন করেছি। কোনো মেহমান এলে আমাকে আদেশ করা হতো তাকে আপ্যায়নের জন্য। আমি ঋণ করে হলেও সে ব্যবস্থা করতাম। পরে আবার সে ঋণ পরিশোধ করে দিতাম'। (আবু দাউদ)
কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেছেন, নবী করীম (সা:) যখন ১২ বছর বয়সে সর্বপ্রথম-চাচা আবু তালিবের সাথে সিরিয়া গমন করেন সে সময় হযরত বিলালের জন্ম। আবার কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেছেন, নবী করীম (সা:) এর নবুয়্যাত লাভের ২৮ বছর পূর্বে হযরত বিলাল (রা:) মক্কায় জন্ম গ্রহণ করেন। তবে এ বিষয়ে, সকল ঐতিহাসিক একমত যে, হযরত বিলাল (রা:) বিশ্বনবী (সা:) এর থেকে ১২ বা ১৪ বছরের ছোট ছিলেন। তাঁর পিতা রাবাহ ছিলেন হাবশী। তিনি তাঁর স্ত্রীকে সাথে নিয়ে মক্কায় এসে কুরাইশদের বনী জুমাহ বংশের দাসত্বের জীবনে বন্দী হয়ে পড়েছিলেন। হযরত বিলাল (রা:) যে সময় পৃথিবীতে চোখ মেলে ছিলেন, সে সময় পৃথিবী ছিল শিরকের অন্ধকারে নিমজ্জিত।
মক্কার উমাইয়া ইবনে খালফ ছিলো নৃশংতা ও নির্মমতার প্রতীক। হযরত বিলাল (রা:) ছিলেন এই লোকটির কৃতদাস, তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পরে তাঁর ওপরে উমাইয়া লোমহর্ষক নির্যাতন করেছিলো। এ লোকটি ইসলাম বিরোধী নেতৃবৃন্দের অন্যতম একজন ছিল। মানব ইতিহাসে সে যুগে যতগুলো কঠোর হৃদয়ের মানুষের আগমন ঘটেছিল, উমাইয়া ছিল তাদের একজন। হযরত বিলাল (রা:)-এর জীবনের ২৮ টি বছর এই উমাইয়া ইবনে খালফের কাছেই দাসত্ব করে কাটিয়ে ছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁকে জন্মগতভাবেই সর্বোত্তম স্বভাব চরিত্র দান করেছিলেন। সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য করার মত প্রকৃত জ্ঞান তাঁর ছিল। ইসলাম পূর্ব জীবনেও তাঁর চরিত্রে খারাপ কিছু স্পর্শ করতে পারেনি। এ কারণে সমাজের উত্তম চরিত্রের লোকগুলোর সাথে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় নবী করীম (সা:) এর সাথেও হযরত বিলাল (রা:) এর আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।
এ কারণে তিনি নবী করীম (সা:) কে অত্যন্ত কাছ থেকে জানার সুযোগ লাভ করেছিলেন। ফল এই হয়েছিল যে, রাসূল (সা:) নবুয়্যাত লাভ করে মহাসত্যের দিকে মানুষকে গোপনে আহ্বান করার প্রাথমিক দিকেই হযরত বিলাল (রা:) সাড়া দিয়েছিলেন। প্রথম যে ভাগ্যবান সাত ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (সা:) এর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন হযরত বিলাল (রা:) ছিলেন তাদের একজন। এ কারণে ইসলামের ইতিহাস 'সাবিকুনাল আওয়ালিন' এর মত বিশাল মর্যাদার উপাধি তাঁকে দান করেছে। মক্কার ইসলাম বিরোধিদের ঘৃণ্য কর্মধারা ছিলো, সমাজের অর্থ, বিত্তহীন দুর্বল শ্রেণী যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাদের প্রতি অত্যাচার করলেই তাঁরা ইসলাম ত্যাগ করবে এবং ভয়ে আর কেউ মুহাম্মাদ (সা:) এর সাথে থাকবে না। বর্তমান যুগেও ইসলামপন্থীদের ক্ষেত্রে সেই একই ঘৃণ্য পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে ইসলাম বিরোধিরা। সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, রাষ্ট্র বিরোধী ও সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে ইসলামপন্থী লোকগুলোর ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়ে অন্যান্য মানুষদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়া হয়, যেনো আর কেউই ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশগ্রহণ না করে।
উমাইয়া ইবনে খালফ যখন জানতে পারলো তাঁরই দাস বিলাল তাঁকে না জানিয়ে 'মুহাম্মাদ (সা:)-এর আদর্শ গ্রহণ করেছে। তখন সে ক্রোধে উন্মাদ হয়ে পড়লো। তাঁকে ডেকে সে কর্কশ কণ্ঠে প্রশ্ন করলো, 'আমি জানতে পারলাম তুমি মুহাম্মাদ (সা:) এর আদর্শ গ্রহণ করেছো?'
তাওহীদের নির্ভীক সেনানী হযরত বিলাল (রা:) দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, 'আমি আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল মুহাম্মাদ (সা:) এর আদর্শ গ্রহণ করেছি'।
কোথায় কার সামনে কি ঘোষণা দিলেন হযরত বিলাল (রাঃ)। সামান্যতম ভীতিও তাঁকে স্পর্শ করলো না। এ কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করলে কি পরিণতি ঘটবে তাও তাঁর অজানা ছিল না। সবার ওপরে মহান আল্লাহই একমাত্র সত্য, ঈমানের এই দৃপ্ত প্রত্যয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তাঁর রব একমাত্র মহান আল্লাহ। তিনি আল্লাহ তা'য়ালা ব্যতীত পৃথিবীর অন্য কোনো শক্তির দাসত্ব করছেন না। হযরত বিলালের নির্ভীক উচ্চারণ উমাইয়ার অপবিত্র শরীরে যেন আগুন ধরিয়ে দিল। সে তাঁর চেহারা বিকৃত করে স্বভাবসূলভ ভঙ্গিতে চিৎকার করে বললো, 'তুমি আমাদের আদর্শ ত্যাগ করতে পারো না। এখনো সময় আছে মুহাম্মাদ (সা:) এর আদর্শ ত্যাগ করে আমাদের আদর্শে ফিরে এসো। আর যদি না আসো তাহলে জেনে রেখো, ভয়ংকর শাস্তি ভোগ করতে হবে'।
একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালা ব্যতীত যাঁর হৃদয়ে আর কারো ভয়ের কোনো স্থান নেই, সে কি আর উমাইয়ার মতো এক পাপীষ্ঠের হুমকির মুখে ইসলাম ত্যাগ করতে পারে! তাওহীদের প্রেম সুধায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত বিলাল (রা:) জড়তাহীন কণ্ঠে জবাব দিলেন, 'আমার এই রক্ত মাংসে গড়া দেহটির ওপর তোমার শক্তি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু আমার হৃদয় দিয়েছি আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (সা:) কে। সেখানে তোমার শক্তি কার্যকর হবে না। আমি এক আল্লাহ তা'য়ালার দাসত্ব বরণ করে নিয়েছি। তোমাদের হাতের বানানো মাটির মূর্তির সামনে আমি মাথানত করতে পারি না'।
সমাজের প্রভাব প্রতিপত্তি ও অর্থ বিত্তহীন সামান্য গোলামের দুঃসাহসী উচ্চারণে উমাইয়া প্রথমে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো। পরক্ষণেই সে ক্ষুধার্ত নেকড়ের ন্যায় গর্জন করে হযরত বিলাল (রা:) এর কালো দেহটার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়লো। নির্যাতনের এক পর্যায়ে অবশেষে নির্যাতক নিজেই ক্লান্ত হয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে শুরু করলো চাবুকের আঘাত। কঠিন চাবুকের প্রতিটি আঘাতে বিলাল (রা:) এর কালো শরীরটা রক্তের আলপনায় লাল হয়ে গেল। তিনি অবিশ্রান্তভাবে মহান আল্লাহ তা'য়ালার নাম উচ্চারণ করতে থাকলেন। আল্লাহ তা'য়ালার নাম যেন তাঁর সকল যন্ত্রণা তৎক্ষণাৎ মুছে দিচ্ছে। উমাইয়া তাঁকে আঘাতের পর আঘাত করেও যখন মুহাম্মাদ (সা:) এর আদর্শ ত্যাগ করাতে ব্যর্থ হলো, তখন সে লোহা আগুনে পুড়িয়ে তা হযরত বিলাল (রা:) এর পবিত্র শরীরে ছ্যাঁকা দিতে লাগলো।
আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হযরত বিলাল (রা:) এর দেহ থেকে রক্ত ঝরছে, দেহে অসহনীয় যন্ত্রণা। ঐ অবস্থাতেই তাঁকে উমাইয়া বেঁধে রাখলো। খাদ্য-পানীয় বন্ধ করে দিলো। সমগ্র রাত তাঁকে বেঁধে রেখে পরের দিন সকালে দু'হাত রশি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হলো মক্কার মরু প্রান্তরে। সূর্যের প্রচন্ড তাপে বালুকা রাশির ভেতর থেকে যেন অনল প্রবাহিত হচ্ছে। আগুনের মতো উত্তপ্ত বালুর ওপরে হযরত বিলাল (রা:) এর রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত দেহটা চিৎ করে শুইয়ে দেয়া হলো। তিনি যেন নড়তে না পারেন, তাঁর বুকের ওপরে বিশাল পাথর খন্ড চাপা দেয়া হলো। শরীর বালির উত্তাপে পুড়ে যাচ্ছে, বুকের ওপরে পাথর চাপা, শ্বাস গ্রহণ করা যাচ্ছে না। প্রাণভরে একবার শ্বাস নেয়ার জন্য বুকের ভেতরটা খাঁচায় আবদ্ধ পাখির মতই ছটফট করছে। দেহের ক্ষতগুলো আগুনের মতই জ্বলছে। এক ফোটা পানির জন্য বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে। আল্লাহর নবীর সাহাবী হযরত বিলাল (রা:) কে জীবনের এই কঠিন মুহূর্তেও উমাইয়া প্রস্তাব দিল, 'এখনো মুহাম্মাদ (সা:) এর আদর্শ ত্যাগ কর, অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবি'।
হযরত বিলাল (রা:) তাঁর জীবনের এই চরম মুহূর্তেও ব্যথায় জর্জরিত ক্ষত বিক্ষত হাতটি কোনো মতে উঁচু করে শাহাদাত আঙ্গুল দিয়ে আকাশের দিকে দেখিয়ে উচ্চারণ করলেন, 'আহাদ, আহাদ, আহাদ'। সমগ্র দিন তাঁর ওপরে এই লোমহর্ষক নির্যাতন করে শেষ বিকেলে উমাইয়া মক্কার উশৃংখল যুবকদের হাতে আল্লাহর এই সাহাবীকে উঠিয়ে দিল। ঐতিহাসিকগণ বলেছেন, হযরত বিলাল (রা:) কে মক্কার সন্ত্রাসী যুবকরা তাঁর গলায় রশি বেঁধে কন্টকাকীর্ণ ও পাহাড়ী পথ দিয়ে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে বেড়াতো। উটের পায়ের সাথে তাঁকে বেঁধে উটকে তাড়ানো হতো। ফলে তাঁর দেহের গোস্ত ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকতো। এভাবে দিনের পর দিন তাকে অনাহারে রেখে তাঁর ওপরে বর্ণনাতীত নির্যাতন করা হয়েছে কিন্তু তাঁকে আদর্শচ্যুত করা যায়নি।
ঘটনাক্রমে হযরত আবু বকর (রা:) হযরত বিলাল (রা:) এর এ করুণ অবস্থা জানতে পেরে তিনি উমাইয়ার কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, 'হে উমাইয়া! তুমি এই নির্দোষ দাসটির উপরে অত্যাচার করছো কেনো? সে যদি মুহাম্মাদ (সা:) এর আল্লাহর দাসত্ব করে এতে তোমার কোনো ক্ষতি সে করছে না। তুমি যদি তাঁর ওপরে দয়া করো তাহলে আখিরাতের দিন আল্লাহ তা'য়ালা তোমার প্রতি দয়া করবেন'। আল্লাহ তা'য়ালার দুশমন জালিম উমাইয়া বিদ্রুপ করে বললো, 'আমার দাস তাকে আমার যা ইচ্ছা আমি তাই করবো। এতে কারো কিছু বলার নেই। আমি ঐ আখিরাত বিশ্বাস করি না'। হযরত আবু বকর (রা:) উমাইয়ার কথার জবাবে বললেন, 'দেখো, তুমি একজন শক্তিশালী নেতা। এটা তোমার পক্ষে শোভা পায় না যে তুমি একজন অসহায় মানুষের ওপরে নির্যাতন করবে। এটা তোমার সম্মানের বিপরীত কাজ'।
এ কথায় উমাইয়া ক্রোধ প্রকাশ করে বললো, 'হে আবু বকর! তোমার দেখছি এই দাসটির প্রতি দারুণ মমতা! একে তুমি কিনে নিলেই পারো'। হযরত আবু বকর (রা:) এ সুযোগই কামনা করছিলেন। তিনি দ্রুত বললেন, 'আমি প্রস্তুত আছি। বলো এর বিনিময়ে তুমি কি চাও?' উমাইয়া জানালো, 'তোমার দাস ফুসতাতকে আমাকে দাও আর একে নিয়ে যাও'।
হযরত আবু বকর (রা:) তৎক্ষণাৎ রাজী হলেন। জালিম উমাইয়া অবাক হয়ে গেল। কারণ হযরত আবু বকরের দাস ফুসতাত অত্যন্ত মান সম্পন্ন দাস ছিল। মক্কার লোকদের কাছে তাঁর সুনাম ছিল। উমাইয়া ধারণা করেছিল, আবু বকর তাঁর প্রস্তাবে রাজী হবে না। একটি দক্ষ এবং বিশ্বস্ত লোকের সাথে বিলাল (রা:)-কে বিনিময় করতে রাজী দেখে উমাইয়ার লোভ বৃদ্ধি পেলো। সে জানালো, 'ফুসতাতকে দেবে আর চল্লিশ আওকিয়া রৌপ্য দিতে হবে'।
হযরত আবু বকর (রা:) এতেও রাজী হলেন। শুধু বিলাল (রা:) কেই নয়, তিনি দাসত্বের বন্ধনে বন্দী নির্যাতিত অনেক মুসলমানকে কিনে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। উমাইয়া আত্মতৃপ্তির হাসি হেসে বললো, 'আবু বকর! তোমাকে আমি একজন বুদ্ধিমান হিসাবেই জানতাম। তোমার স্থলে আমি হলে এই দাসটিকে সামান্য পয়সা দিয়েও কিনতাম না'।
হযরত আবু বকর (রা:) হযরত বিলাল (রা:) কে সাথে নিয়ে উমাইয়াকে বললেন, 'তুমি আসলে এর মূল্য জানো না। প্রয়োজনে আমি এই মানুষটিকে কিনে নেয়ার জন্য আমার সকল সম্পদ দিয়ে দিতাম। আমি যদি ইয়েমেনের বাদশাহ হতাম, সে বাদশাহীর বিনিময়েও আমি এই দাসকে গ্রহণ করতাম'।
তিনি হযরত বিলালকে সাথে নিয়ে নবী করীম (সা:) এর কাছে এসে সকল ঘটনা জানালেন। আল্লাহর নবী (সা:) খুশী হয়ে বললেন, 'তুমি আমাকেও এই কাজে অংশীদার বানিয়ে নাও'। হযরত আবু বকর (রা:) বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি বিলালকে মুক্ত করে দিয়েছি'। হযরত বিলাল (রা:) নবীর নির্দেশে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। নবী করীম (সা:) মদীনায় মসজিদ নির্মাণ করে হযরত বিলালকে আযান দেয়ার নির্দেশ দিলেন। তিনিই ছিলেন ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন।
মদীনার আউস গোত্রের প্রভাবশালী নেতা হযরত সায়াদ ইবনে মুয়াজ (রা:) মক্কায় উমরা করার উদ্দেশ্যে এসে আল্লাহর দুশমন উমাইয়ার মেহমান হয়েছিলেন। তার সাথে হযরত সায়াদ (রা:) এর পূর্ব থেকেই বন্ধুত্ব ছিল। উমাইয়া মদীনায় গেলে হযরত সায়াদ (রা:) এর মেহমান হত আর সায়াদ (রা:) মক্কায় এলে উমাইয়ার মেহমান হতেন। হযরত সায়াদ (রা:) ইসলাম গ্রহণের পরে প্রথম মক্কায় এসে উমাইয়ার মেহমান হলেন। তিনি উমাইয়ার সাথে কা'বাঘর তাওয়াফ করার জন্য বের হলেন। আবু জাহিল তাকে দেখে উমাইয়াকে জিজ্ঞাসা করলো, 'তোমার সাথের লোকটির পরিচয় কি?' উমাইয়া পরিচয় দেয়ার পরে আবু জাহিল রুক্ষ্ম কন্ঠে বলেছিল, 'তোমরা আদর্শ ও দেশদ্রোহীদের আশ্রয় দিয়েছো, বিষয়টি আমাদের কাছে অসহনীয়। এ অবস্থায় তোমরা মক্কায় আসবে এটাও আমরা পছন্দ করি না। খোদার কসম! তুমি যদি উমাইয়ার সাথে না থাকতে তাহলে জীবিত ফিরে যেতে না'।
হযরত সায়াদ (রা:) নির্ভীক কণ্ঠে জবাব দিলেন, 'তোমরা যদি আমাদেরকে মক্কায় হজ্জ আদায় করতে আসতে না দাও, আমরাও তোমাদের ব্যবসার পথ অর্থাৎ সিরিয়া যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিব'। উমাইয়া ইবনে খালফ তার বন্ধু হযরত সায়াদকে বললো, 'সায়াদ, আবু হাকামের (আবু জাহিল) সাথে নম্র ভাষায় কথা বলো, কারণ সে এখানের নেতা'। হযরত সায়াদ (রা:) উমাইয়াকে বললেন, 'উমাইয়া, আল্লাহর শপথ! আমি রাসূল (সা:) কে বলতে শুনেছি, আবু জাহিল তোমার হত্যাকারী'। উমাইয়া আতঙ্কিত কণ্ঠে জানতে চাইলো, 'সে কি আমাকে মক্কায় হত্যা করবে?' হযরত সায়াদ (রা:) বললেন, 'রাসূল (সা:) এ কথা বলেননি কোথায় সে তোমাকে হত্যা করবে'।
এ কথা শুনে উমাইয়া ইবনে খালফ আতঙ্কে বিচলিত হয়ে পড়লো। মুহাম্মাদ (সা:) এর ভবিষ্যদ্বাণী যে সত্য প্রমাণীত হয় তা মক্কার লোকগুলো ইতোপূর্বেও প্রমাণ পেয়েছে। এ কারণে ভয়ে সে কথাটা তার স্ত্রীকেও জানালো। উমাইয়া শপথ করেছিল, মক্কার বাইরে সে যাবে না। কিন্তু মক্কার বাইরে সে যেতে বাধ্য হয়েছিলো। আবু জাহিল তাকে বদরের যুদ্ধে যেতে বাধ্য করেছিলো। প্রথমে সে যেতে রাজী হয়নি, কিন্তু আবু জাহিল তাকে আত্মমর্যাদায় আঘাত দিয়ে কিছু কথা বলার পরই সে তার মৃত্যুস্থান বদরের প্রান্তরে গিয়েছিলো অর্থাৎ উমাইয়াকে চুম্বকের মতোই মৃত্যু সেখানে টেনে নিয়েছিলো। যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই নবী করীম (সা:) উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামের সম্মুখে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, শত্রুপক্ষের নেতৃবৃন্দ বদরের প্রান্তরে কে কোন্ স্থানে নিহত হবে। বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবায়ে কেরাম বলেন, আমরা দেখেছি নবী করীম (সা:) যেসব স্থান দেখিয়েছিলেন ঐসব স্থানেই তাদের লাশ পড়েছিলো। (মুসলিম)
বদরের প্রান্তরে ইসলামের দুশমনরা বিপর্যস্ত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলো। সমগ্র জীবন উমাইয়া ভোগ-বিলাসে মত্ত ছিলো, বিশাল বপু আর স্থূল দেহের অধিকারী ছিলো আল্লাহর এই দুশমন। আত্মরক্ষার্থে উমাইয়া বদরের প্রান্তর থেকে পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যাচ্ছিলো। হযরত বিলাল (রা:) এ সময় মুসলিম বাহিনীর আহারের জন্য ময়দা পিষছিলেন। তাঁর চোখেই পড়েছিল, উমাইয়া পাহাড়ের দিকে যাচ্ছে। তাছাড়া ইসলামের বিখ্যাত শত্রুগুলোর নাম মদীনার অলি গলিতে ছড়িয়েছিল। হযরত বিলাল (রা:) উচ্চকণ্ঠে মদীনার আনসারদেরকে উমাইয়ার কথা জানিয়ে দিলেন। আল্লাহর নবীর সাহায্যকারীরা শাণিত অস্ত্র হাতে উমাইয়ার দিকে উল্কার বেগে ছুটে গেল, মদীনার আনসাররা আল্লাহর দুশমন উমাইয়াকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলো। বুখারী শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, নিহত ইসলাম বিরোধীদের লাশ বদরের প্রান্তরে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে পড়েছিল এবং প্রচণ্ড রোদে বিকৃত দেখাচ্ছিল। উমাইয়ার শরীরে ছিল যুদ্ধের মূল্যবান পোষাক। তা খুলে নেয়ার জন্য সাহাবীরা চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ক্ষণিকের মধ্যেই এই জালিমের লাশ পচে ফুলে দেহের পোষাকের মধ্যে এমনভাবে আটকে গিয়েছিল যে, দেহ থেকে পোষাক খুলতে গেলে উমাইয়ার শরীরের গোস্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। পরে সাহাবায়ে কেরাম তাকে ঐ অবস্থাতেই মাটি ও পাথর দিয়ে চাপা দিয়েছিলেন। নবী করীম (সা:) এর ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে বাস্ত বায়িত হয়েছিলো।
📄 নবী করীম (সা:) এর ভবিষ্যৎ বাণী, নিহত পারস্য সম্রাট
নবী করীম (সা:) এর পত্র নিয়ে পারস্য সম্রাটের দরবারে পত্র গিয়েছিলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হুজায়ফা (রা:)। পারস্য সম্রাটের দরবারের নিয়ম ছিল সম্রাট যতক্ষণ আদেশ না করতেন ততক্ষণ কোনো ব্যক্তি মাথা উঠাতো না। হযরত আব্দুল্লাহ (রা:) দরবারে প্রবেশের সময় এই নিয়ম তাঁকে একজন জানিয়ে দিল। তিনি বললেন, 'আমার পক্ষে মাথানত করা সম্ভব নয়, কারণ আমরা এক আল্লাহ তা'য়ালা ব্যতীত আর কারো কাছে মাথানত করি না'।
প্রহরী তাঁকে জানালো, এই নিয়ম পালন না করলে সম্রাট কারো পত্র গ্রহণ করেন না। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হুজায়ফা (রা:) দরবারে প্রবেশ করলেন। সম্রাট দরবারে প্রবেশ করে সামনের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। উপস্থিত সকলেই নত মস্তকে রয়েছে কিন্তু একজন লোক মাথা সোজা রেখে গর্বিত ভঙ্গীতে বসে আছে। তিনি লোকটির পরিচয় জানতে চাইলেন। তাকে বলা হলো, লোকটি এসেছে সেই আরব থেকে। আপনার জন্য সে একটি বার্তা এনেছে।
সম্রাট তাঁকে কাছে আসতে বললেন। হযরত আব্দুল্লাহ (রা:) কাছে এসে তাকে সালাম জানিয়ে নবী করীম (সা:) এর পত্র তার হাতে হস্তান্তর করলেন। নবী করীম (সা:) সম্রাটের কাছে লিখেছিলেন-
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
মহান আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (সা:) এর পক্ষ থেকে পারস্য সম্রাট খসরুর কাছে। যারা আল্লাহ তা'য়ালার বিধান অনুসরণ করে এবং আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলকে বিশ্বাস করে তাদের প্রতি সালাম। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তা'য়ালা ব্যতীত আর কেউ দাসত্ব পাবার উপযুক্ত নয় এবং আমি তাঁর প্রেরিত রাসূল। জীবিত মানুষকে সতর্ক করার জন্য আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে। তোমার প্রতি আমার আহ্বান, তুমি ইসলাম গ্রহণ করো। তোমার ওপর আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে শান্তি বর্ষিত হবে। যদি না করো তাহলো তোমার শাসিত প্রজাদের যাবতীয় অন্যায় কাজের জন্য তুমি দায়ী হবে।
পত্রের শেষে নবী করীম (সা:) এর পবিত্র নাম মুবারক সীলমোহর করা ছিল। অর্থাৎ 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্' (সা:) সীল মোহর করা ছিল। পারস্যের সম্রাট খসরু ছিল চরম পাপাচারী। পৃথিবীর অন্য কোনো মানুষ তার সমমর্যাদার হতে পারে, এ বিষয়টি সে মানতো না। নবী করীম (সা:) এর পত্র পাঠ করার সাথে সাথে সে অহঙ্কারে গর্জে উঠলো। চিৎকার করে বললো, 'এতবড় সাহস কার! আরবের সামান্য একজন মানুষ আমাকে বলে আমার আদর্শ ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য? তারপরে সে আমার নামের পূর্বে নিজের নাম লিখেছে?'
চরম অহঙ্কারের বশবর্তী হয়ে সে নবী করীম (সা:) এর পত্র ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করলো। তার ধৃষ্টতার এখানেই শেষ হলো না। ইয়েমেনের গভর্ণর বাজানকে আদেশ দিল, 'আরবের সেই মুহাম্মাদ (সা:) কে গ্রেফতার করে তার দরবারে প্রেরণ করা হোক'।
নবী করীম (সা:) কে গ্রেফতার করার উদ্দেশ্যে পারস্য সম্রাটের আদেশ অনুযায়ী বাজান দুইজন রাজ কর্মচারীকে মদীনায় প্রেরণ করলো। নবী করীম (সা:) এর দরবারে তারা উপস্থিত হয়ে রাসূল (সা:) কে জানালো, 'আমরা পারস্য সম্রাটের আদেশ অনুযায়ী আপনাকে গ্রেফতার করতে এসেছি। আপনি স্বেচ্ছায় যদি আমাদের সাথে না যান তাহলে সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করতে বাধ্য হবে'।
নবী করীম (সা:) তাদেরকে অত্যন্ত সমাদর করে মেহমানদারী করলেন। রাসূল (সা:) এর সাথে তাঁর সাহাবায়ে কেরামের ব্যবহার দেখে পারস্য রাজের কর্মচারীবৃন্দ বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিলো। তারা পুনরায় জানালো, 'আপনি যদি আদেশ অনুসারে উপস্থিত হন তাহলে ইয়েমেনের গভর্ণর আপনার জন্য সুপারিশ করতে পারেন। আর তা যদি না করেন তাহলে আপনার শহর তিনি মাটির সাথে মিশিয়ে দিবেন'।
আল্লাহর নবী (সা:) তাদেরকে জানালেন, 'আপনাদের প্রশ্নের জবাব আমি আগামী কাল দিব'।
তাদেরকে রাষ্ট্রীয় মেহমান খানায় রাখা হলো। তারা অবাক হলো, পারস্য সম্রাটের আদেশে মানুষ থরথর করে কাঁপে। অথচ এই মানুষটির মধ্যে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া নেই। পরের দিন তারা নবী করীম (সা:) এর দরবারে এলেন। আল্লাহর রাসূল (সা:) তাদেরকে জানালেন, 'তোমাদের সম্রাট আর এই পৃথিবীতে জীবিত নেই। তার সন্তান তাকে গতরাতে নিহত করেছে। তোমাদের গভর্ণর বাজানকে বলবে, পারস্য সম্রাট যেমন আমার পত্র ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করেছে, মহান আল্লাহ তা'য়ালা পারস্য সাম্রাজ্যকে তেমনি টুকরো টুকরো করে দিবেন। বাজানকে বলবে, সে যদি ইসলাম কবুল করে তাহলে তাকে আমি তার পদেই বহাল রাখবো। কারণ অচিরেই ইসলাম পারস্যের সিংহাসনে বসবে'।
পারস্যের দূতগণ অবাক হয়ে ইয়েমেনে ফিরে গেল। সেখানেই তারা জানতে পারলো সম্রাট খসরুর সন্তান সিরওয়াহ পিতাকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেছে। সে বাজানের কাছে সংবাদ প্রেরণ করেছে, দ্বিতীয় আদেশ না দেয়া পর্যন্ত আরবের সেই নবীর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে না। ইয়েমেনের গভর্ণর তার দূতের মুখে নবী করীম (সা:) সম্পর্কে সংবাদ শুনে সে এবং রাজ দরবারের অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু কিছু দিন পর ইয়েমেনের গভর্ণর বাজানের মনে পৃথিবীর প্রতি বিতৃষ্ণা জেগে উঠেছিল। তাঁর ইচ্ছা ছিল, জীবনের বাকী দিনগুলো সে নবী করীম (সা:) এর সান্নিধ্যে কাটিয়ে দিবে। এ কারণে সে গভর্ণরের পদ হতে পদত্যাগ করে মদীনার পথে যাত্রা করেছিল। পথে তিনি এক গুপ্ত ঘাতকের হাতে শাহাদাতবরণ করেন। ইতিহাস সাক্ষী, নবী করীম (সা:) এর ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত হতে বেশি দেরী হয়নি।
📄 সুরাকা, সেদিন তোমাকে কতই না সুন্দর দেখাবে!
মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রিয় হাবীবকে মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ অনুসারে প্রস্তুতি নিতে থাকলেন। ইসলামের দুশমনরা সার্বক্ষণিক প্রহরার ব্যবস্থা করলো যাতে মুহাম্মাদ (সা:) মক্কা ত্যাগ করতে না পারেন। এমনকি জালিমের দল আল্লাহর নবীকে হত্যার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলো। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর হাবীবকে মদীনার পথে নিয়ে গেলেন। দুশমনরা নবী করীম (সা:) কে না পেয়ে ঘোষণা করেছিলো, তাঁর সন্ধানদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে। পুরস্কারের লোভে নির্বোধ কিছু মানুষ আল্লাহর নবীর সন্ধানে বের হয়েছিল। সুরাকা ইবনে মালিক (রা:), তিনি মক্কা বিজয়ের পরে মুসলমান হয়েছিলেন। তিনি স্বয়ং বর্ণনা করেন, একদিন আমি আমার গোত্রের পরামর্শ সভায় বসে আছি, এ সময় এক ব্যক্তি এসে বললো, 'আমি এই মাত্র একটি দলকে দেখে এলাম তাঁরা মদীনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আমার মনে হয় উক্ত দলে মুহাম্মাদ (সা:) আছেন'।
এ কথা আমার কানে প্রবেশ করতেই আমি তাকে ইশারা দিলাম সে যেন বিষয়টি আর কাউকে না বলে। তারপর আমি সেখান থেকে উঠে বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় অস্ত্র সাথে নিয়ে দ্রুত বের হয়ে পড়লাম। একস্থানে গিয়ে আমি আমার ভাগ্য পরীক্ষা করলাম যে, মুহাম্মাদ (সা:) এর কোনো ক্ষতি আমি করতে পারবো কিনা।
আমি 'না' বোধক চিহ্ন দেখতে পেলাম। তবুও আমি বিরত না হয়ে তাদের পিছনে ছুটলাম। অবশেষে তাঁরা আমার দৃষ্টি সীমার মধ্যে এসে গেল। এ সময় আমার ঘোড়াটি হোঁচট খেয়ে আমাকে ঘোড়ার পিঠ থেকে নিক্ষেপ করলো। আমি আবার আমার ভাগ্য পরীক্ষা করলাম। এবারেও অকৃতকার্যতার চিহ্ন বের হলো। তবুও আমি তাদেরকে ধরার জন্য অগ্রসর হলাম।
এবার আমার ঘোড়ার সামনের পা দুটো নীচে বসে গেল। আমি ঘোড়ার পা উঠাতেই সে গর্ত থেকে ধোঁয়া বের হতে থাকলো। তখন আমি বুঝলাম মুহাম্মাদ (সা:) কে ধরা যাবে না। তারপর তাদেরকে আহ্বান করে বললাম, খোদার শপথ! তোমাদের সম্পর্কে আমার আর কোনো সন্দেহ নেই। আমি জুসুমের সন্তান সুরাকা। আমি তোমাদের ক্ষতির কারণ হবো না। তোমরা একটু থামো, তোমাদের সাথে আমার কিছু কথা আছে।
নবী করীম (সা:) হযরত আবু বকর (রা:) কে বললেন, তাঁর কাছ থেকে জেনে নাও সে আমাদের কাছে কি চায়?
হযরত আবু বকর (রা:) জানতে চাইলেন আমি তাদের কাছে কি চাই। আমি বলেছিলাম, আমাকে কিছু লিখে দিন, যা আমার এবং আপনার মধ্যে একটা প্রমাণ হয়ে থাকবে।
তারপর আমি তাদেরকে মক্কার লোকদের ঘোষনা সম্পর্কে জানালাম। কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, হযরত আবু বকর (রা:) নবী (সা:) এর নির্দেশে 'মুক্তিনামা' লিখে দিয়েছিলেন। আবার কোনো বর্ণনায় এসেছে হযরত আবু বকর (রা:) এর গোলাম তা লিখে দিয়েছিলেন। কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, নবী করীম (সা:) সে সময় সুরাকাকে বলেছিলেন, 'সে সময় তোমাকে কতই না সুন্দর দেখাবে যখন পারস্য সম্রাটের অলংকারাদি তোমার দেহে শোভা পাবে'।
বিশ্বনবী (সা:) এর সেদিনের কথা বাস্তবে রূপলাভ করেছিল হযরত উমার (রা:) এর শাসনামলে। পারস্য সাম্রাজ্য জয় করার পরে হযরত উমার (রা:) পারস্য সম্রাটের অলংকারসমূহ হযরত সুরাকাকে পরিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। নবী করীম (সা:) আর হযরত আবু বকর (রা:) সে সময় পৃথিবীতে ছিলেন না। প্রায় তের চৌদ্দ বছর পূর্বের সে কথা স্মরণে এলে হযরত সুরাকা (রা:) এর আনন্দের পরিবর্তে তাঁর দু'চোখ অশ্রু সরোবরে প্লাবিত হয়ে পড়েছিল।