📄 দোয়া- নবী করীম (সা:) এর সীরাত
নবী করীম (সা:) সকল বিষয়ে মহান আল্লাহ তা'য়ালার মুখাপেক্ষী ছিলেন এবং সর্বাবস্থায় "কেবলমাত্র তাঁরই কাছে সাহায্যের আবেদন করেছেন। তিনি জীবিতাবস্থায় যতো দোয়া করেছেন তা সবই হাদীসের কিতাবসমূহে মওজুদ রয়েছে। সকল নবী-রাসূলগণের মধ্যে তিনিই সকলের তুলনায় সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী, তবুও তিনি কিভাবে মহান আল্লাহ তা'য়ালার কাছে আবেদন-নিবেদন ও কাকুতি-মিনতি করেছেন সেদিকে দৃষ্টিপাত করি।
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَهْدِنِي وَاجْبُرْنِي وَعَفِنِي وَارْزُقْنِي وَارْفَعْنِي হে আল্লাহ তা'য়ালা, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও, তুমি আমার প্রতি রহম করো, তুমি আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করো, তুমি আমার জীবনের সকল ক্ষতির পূরণ করে দাও, তুমি আমাকে নিরাপত্তা দান করো এবং তুমি আমাকে রিযিক দান করো ও আমার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দাও। (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ্)
اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِّنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি আমার নিজের প্রতি অনেক বেশি যুলুম করেছি, আর তুমি ব্যতীত গোনাহসমূহ কেউ-ই ক্ষমা করতে পারে না, সুতরাং তুমি তোমার নিজগুণে আমাকে ক্ষমা করে দাও এবং আমার প্রতি তুমি রহম করো, তুমিই ক্ষমাকারী দয়ালু। (বুখারী, মুসলিম)
اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ كَسَوْتَنِيْهِ أَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِهِ وَخَيْرِ مَا صُنِعَ لَهُ وَأَعُوْذُبِكَ مِنْ شَرِّهِ وَشَرِّ مَا صُنِعَ لَهُ - হে আল্লাহ তা'য়ালা, তোমারই জন্য সকল প্রশংসা। তুমিই এ কাপড় আমাকে পরিয়েছো। আমি তোমার কাছে এর মধ্যে নিহিত কল্যাণ ও এটি যে জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে সেসব কল্যাণ প্রার্থনা করি। আমি এর অনিষ্ট এবং এটি তৈরীর অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে আশ্রয় কামনা করি। (আবু দাউদ, তিরমিযী)
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنَ الْبُخْلِ وَأَعُوْذُبِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَأَعُوْذُبِكَ مِنْ أَنْ أَرَدَّ إِلى أَرْذَلِ الْعُمُرِ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الدُّنْيَا وَعَذَابِ الْقَبْرِ -
হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি আশ্রয় চাই কার্পণ্যতা থেকে এবং আশ্রয় চাই কাপুরুষতা থেকে, আর আশ্রয় চাই বার্ধক্যের চরম দুঃখ-কষ্ট থেকে, দুনিয়ার ফিৎনা-ফাসাদ ও কবরের আযাব থেকে আশ্রয় চাই। (বুখারী ফতহুলবারী)
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا طَيِّبًا وَّ عَمَلًا مُّتَقَبَّلاً -
হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি তোমার কাছে উপকারী বিদ্যা, পবিত্র জীবিকা এবং গ্রহণযোগ্য কর্ম প্রার্থনা করি। (ইবনে মাজাহ্)
اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي بَدَنِي اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي سَمْعِى اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي بَصَرِي لَا إِلَهَ إلَّا أَنْتَ أَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنَ الْكُفْرِ وَالْفَكْرِ وَ أَعُوْذُبِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ لَا إله إلا أنت
হে আল্লাহ তা'য়ালা, তুমি আমার দেহের নিরাপত্তা দান করো, আমার কর্ণের নিরাপত্তা দান করো, আমার চক্ষুতে নিরাপত্তা প্রদান দান করো। হে আল্লাহ তা'য়ালা, তুমি ব্যতীত দাসত্ব লাভের যোগ্য কোনো মাবুদ নেই। হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি তোমার আশ্রয় চাচ্ছি, কুফুরী এবং দারিদ্রতা হতে, আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি কবর আযাব থেকে, তুমি ব্যতীত দাসত্ব লাভের যোগ্য কোনো মাবুদ নেই। (আবু দাউদ, আত্মাদ)
أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ-
আল্লাহ তা'য়ালার পূর্ণ গুণাবলীর বাক্য দ্বারা তাঁর কাছে আমি অনিষ্ঠকর সৃষ্টির অপকার থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। (মুসলিম, তিরমিযী, আহমদ)
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي دِينِي وَدُنْيَايَ وَأَهْلِي وَمَلِى اللَّهُمَّ اسْتُرْ عَوْرَتِي وَ آمِنْ رَوْعَاتِي اللَّهُمَّ حفِظْنِي مِنْ بَيْنِ يَدَيَّ وَمِنْ خَلْفِي وَعَنْ يَمِينِي وَعَنْ شِمَالِي وَمِنْ فَوْقِي وَأَعُوْذُ بِعَظْمَتِكَ أَنْ اغْتَالَ مِنْ تَحْتِي-
হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি তোমার কাছে দুনিয়া ও আখেরাতের নিরাপত্তা কামনা করছি। হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি এবং স্বীয় দ্বীন ও দুনিয়ার নিরাপত্তা কামনা করছি, হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি ক্ষমার আর কামনা করছি আমার দ্বীন ও দুনিয়ার, আমার পরিবার পরিজনের এবং আমার সম্পদের নিরাপত্তার। হে আল্লাহ তা'য়ালা, তুমি আমার গোপন দোষত্রুটিসমূহ ঢেকে রাখো, চিন্তা ও উদ্বিগ্নতাকে শান্তি ও নিরাপত্তায় রূপান্তরিত করে দাও। হে আল্লাহ তা'য়ালা, তুমি আমাকে নিরাপদে রাখো আমার সম্মুখের বিপদ হতে এবং পশ্চাতের বিপদ হতে, আমার ডানের বিপদ হতে এবং বামের বিপদ হতে, আর উর্ধ্ব জগতের গযব হতে। তোমার মহত্বের দোহাই দিয়ে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি আমার নিম্নদেশ হতে আগত বিপদ হতে, তথা মাটি ধ্বসে আকস্মিক মৃত্যু হতে। (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ্)
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحُزْنِ وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি চিন্তা-ভাবনা, অপারগতা, অলসতা, কৃপণতা এবং কাপুরুষতা থেকে, অধিক ঋণ থেকে ও দুষ্ট লোকের প্রাধান্য থেকে। (বুখারী-ফতহুলবারী)
اللَّهُمَّ إِنَّا نَجْعَلُكَ فِي نُحُوْرِ هِمْ وَ نَعُوْذُبِكَ مِنْ شُرُوْرِهِمْ
হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি শত্রুদের শত্রুতা ও তাদের ক্ষতিসাধনের মুকাবিলায় তোমাকে স্থাপন করছি এবং তাদের অনিষ্ট হতে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (আবু দাউদ, হাকেম)
اللَّهُمَّ مُنْزِلَ الْكِتَابِ سَرِيْعَ الْحِسَابِ اهْزِمِ الأَحْزَابَ اللَّهُمَّ اهْزِمْهُمْ وَزَلْزِلْهُمْ
হে আল্লাহ তা'য়ালা, কিতাব নাযিলকারী, ত্বড়িত হিসাব গ্রহণকারী, শত্রুবাহিনীকে পরাজিত ও প্রতিহত করো, তাদেরকে দমন ও পরাজিত করো, তাদের মধ্যে কম্পন সৃষ্টি করে দাও। (মুসলিম)
اللَّهُمَّ اكْفِيْنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَ أَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ -
হে আল্লাহ তা'য়ালা, তুমি তোমার হারাম বস্তু হতে বাঁচিয়ে তোমার হালাল রিযিক দ্বারা আমাকে পরিতুষ্ট করে দাও। হালাল রুযিই যেনো আমার জন্য যথেষ্ট হয় এবং হারামের দিকে যাওয়ার প্রয়োজন ও প্রবণতাবোধ না করি। এবং তোমার অনুগ্রহ অবদান দ্বারা তুমি ভিন্ন অন্য সকল কিছু হতে আমাকে অমুখাপেক্ষী করে দাও। তুমি ছাড়া যেনো আমাকে আর কারো মুখাপেক্ষী হতে না হয়। (তিরমিযী)
اللَّهُمَّ لَا سَهْلَ إلَّا مَا جَعَلْتَهُ سَهْلاً وَ أَنْتَ تَجْعَلُ الْحُزْنَ إِذَا شَيْتَ سُهْلاً -
হে আল্লাহ তা'য়ালা! কোনো কাজই সহজসাধ্য নয় তুমি যা সহজসাধ্য করোনি, যখন তুমি ইচ্ছা করো দুশ্চিন্তাকেও সহজসাধ্য করতে পারো। (ইবনে হিব্বান, ইবনে সুন্নী)
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَ أَعُوْذُبِكَ مِنْ شَرِّهَا -
হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি তোমার কাছে এর (ঝড় ও বাতাসের) কল্যাণটুকু চাই, আর আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি এর অনিষ্ট হতে। (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ্)
اللَّهُمَّ أَسْقِنَا غَيْئًا مَرِيئًا مَرِيعًا نَافِعًا غَيْرَ ضَارٌ عَاجِلا غَيْرَ آحِلٍ
হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমাদেরকে এমন বৃষ্টির পানি দান করো যা সুপেয়, ফসল উৎপাদনকারী, কল্যাণকর, ক্ষতিকর নয়, দ্রুত যা আসবে, বিলম্ব করবে না। (আবু দাউদ)
اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِيْهِ وَ أَطْعِمْنَا خَيْرًا مِّنْهُ -
হে আল্লাহ তা'য়ালা, তুমি আমাদের এই খাদ্যে বরকত দাও এবং এর চেয়ে উত্তম খাবারের ব্যবস্থা করে দাও। (তিরমিযী)
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنِي هَذَا وَا رْزُقْنِيْهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِّنِّى وَ لَاقُوَّةٍ
সকল প্রশংসা সেই আল্লাহ তা'য়ালার জন্য যিনি আমাকে এই পানাহার করালেন এবং এর সামর্থ প্রদান করলেন, যাতে ছিলো না আমার পক্ষ থেকে কোনো উপায়-উদ্যোগ, ছিলো না কোনো শক্তি সামর্থ। (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ্, আহমদ)
اعُوْذُ بِاللهِ وَ قُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِدُ وَ أَحَاذِزُ -
যে ক্ষতি আমি অনুভব করছি এবং আমি যার আশঙ্কা করছি তা হতে আমি আল্লাহ তা'য়ালার মর্যাদা এবং তাঁর কুদরতের মাধ্যমে আল্লাহ তা'য়ালার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (মুসলিম)
📄 চাইতে হবে কেবলমাত্র আল্লাহ তা'য়ালারই কাছে
একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইবাদাত, দাসত্ব ও বন্দেগী করা জ্ঞান-বিবেক, বুদ্ধি ও প্রকৃতিরই দাবী। মানুষের সৃষ্টি ও তার প্রতিপালনের ব্যাপারে যাদের কোনোই ভূমিকা নেই এবং থাকতে পারে না, তাদের ইবাদাত করা মূর্খতার নামান্তর এবং অযৌক্তিক। মানুষকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, মানুষ কেবলমাত্র তাঁরই বন্দেগী করবে এটাই হলো যুক্তি ও বিবেকের দাবী। বিশ্ব-জাহানের প্রকৃত মালিক ও শাসনকর্তাই হলেন আল্লাহ তা'য়ালা এবং তিনিই হলেন প্রকৃত মা'বুদ। তিনিই প্রকৃত মা'বুদ হতে পারেন এবং তাঁরই মা'বুদ হওয়া উচিত।
রব অর্থাৎ মালিক, মুনিব, শাসনকর্তা এবং প্রতিপালক হবেন একজন আর ইলাহ্ অর্থাৎ আনুগত্য, বন্দেগী ও দাসত্ব বা ইবাদাত লাভের অধিকারী হবেন অন্যজন, এটা একেবারেই জ্ঞান, বিবেক-বুদ্ধির অগম্য যুক্তি। মানুষের লাভ ও ক্ষতি, তার কল্যাণ ও অকল্যাণ, তার অভাব ও প্রয়োজন পূরণ হওয়া, তার ভাগ্য ভাঙা-গড়া, তার নিজের অস্তিত্ব ও স্থায়িত্বই যার ক্ষমতার অধীন, তাঁরই শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য স্বীকার করা এবং তাঁরই সামনে আনুগত্যের মাথা নত করা মানুষের প্রকৃতিরই মৌলিক দাবী। এটাই তার ইবাদাত তথা দাসত্বের মৌলিক কারণ। ক্ষমতার অধিকারীর ইবাদাত বা দাসত্ব না করা এবং ক্ষমতাহীনের আনুগত্য বা ইবাদাত করা দুটোই জ্ঞান, বিবেক-বুদ্ধি ও প্রকৃতির সুস্পষ্ট বিরোধী। কর্তৃত্বশালী-ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োগকারী আনুগত্য, দাসত্ব বা ইবাদাত লাভের অধিকারী হন। যাদের কোনো ক্ষমতা নেই, কর্তৃত্ব নেই, কোনো কিছু করার স্বাধীন ক্ষমতা নেই, তারা আনুগত্য বা দাসত্ব লাভের অধিকারী হন না। এসব দুর্বল সত্তার দাসত্ব বা আনুগত্য করে এবং তাদের কাছে কিছু প্রার্থনা করে শুধু নিরাশই হতে হয়, কিছু পাওয়া যায় না। কারণ একজন ভিখারী আরেকজন ভিখারীকে ভিক্ষা দিতে পারে না। মানুষের আবেদনের ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার কোনো ক্ষমতাই দুর্বল সত্তাদের নেই। এদের সামনে বিনয়, দীনতা ও কৃতজ্ঞতা সহাকরে মাথানত করা এবং তাদের কাছে প্রার্থনা করা ঠিক তেমনিই নির্বুদ্ধিতার কাজ, যেমন কোনো ব্যক্তি শাসনকর্তার সামনে উপস্থিত হয়ে তার কাছে আবেদন পেশ করার পরিবর্তে তারই মতো অন্য আবেদনকারীগণ সেখানে আবেদনপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাদের মধ্য থেকে কারো সামনে দু'হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকা।
দাসত্ব লাভ ও প্রার্থনা মঞ্জুর করার একমাত্র অধিকারী হলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তিনি শুধু পৃথিবী সৃষ্টিই করেননি, বরং তিনিই এর সব জিনিসের তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। পৃথিবীর সকল বস্তু যেমন তাঁর সৃষ্টি করার কারণেই অস্তিত্ব লাভ করেছে তেমনি তাঁর টিকিয়ে রাখার কারণেই টিকে আছে। তাঁর প্রতিপালনের কারণেই সকল কিছু বিকশিত হচ্ছে এবং তাঁর রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের অসীম কল্যাণে তা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। পবিত্র কুরআন ঘোষণা করেছে-
اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ زَ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكَيْلٌ لَهُ مَقَالِيْدُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِ اللَّهِ أُوْلَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُوْنَ عِ আল্লাহ তা'য়ালাই হচ্ছেন সব কিছুর (একক) স্রষ্টা, তিনিই হচ্ছেন সব কিছুর ওপর নেগাহবান। আসমানসমূহ ও যমীনের মূল চাবি তো তাঁরই কাছে। (সূরা আয যুমার-৬২-৬৩)
যিনি সকলকিছুর সৃষ্টিকর্তা, রক্ষক, প্রতিপালক এবং যাঁর হাতে রয়েছে সবকিছুর চাবিকাঠি, তাঁরই ইবাদাত লাভের যোগ্যতা রয়েছে, আর মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে যাদের ইবাদাত করছে, তারা সবই ঐ আল্লাহ তা'য়ালারই গোলাম। গোলাম হয়ে যারা গোলামদের সামনে আনুগত্যের মাথা নত করে দিয়েছে, এদেরকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মূর্খ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
قُلْ أَفَغَيْرَ اللَّهِ تَأْمُرُونِّي أَعْبُدُ أَيُّهَا الْجَاهِلُوْنَ
(হে নবী) আপনি এদের বলে দিন, হে মূর্খরা, তোমরা কি এরপরও আমাকে আল্লাহ তা'য়ালা ছাড়া অন্য কারো গোলামী বরণ করে নিতে বলছো? (সূরা আয যুমার-৬৪)
মহান আল্লাহ তা'য়ালার ক্ষমতা, সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কে মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। তিনি সকলকিছুর একচ্ছত্র অধিকারী, প্রার্থনা মঞ্জুরকারী এবং এ জন্যই তাঁরই দাসত্ব করতে হবে। তাঁরই কাছে প্রার্থনা করতে হবে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُوْنِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ ط إِنَّ الَّذِيْنَ يَسْتَكْبِرُوْنَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُوْنَ جَهَنَّمَ دَاخِرِيْنَ عِ
তোমাদের মালিক বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো; যারা অহঙ্কারের কারণে আমার দাসত্ব থেকে না-ফরমানী করে, অচিরেই তারা অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (সূরা আল মু'মিন-৬০)
নামাজ আদায়কালে মানুষ সূরা ফাতিহার মাধ্যমে আল্লাহ তা'য়ালার কাছে নিজেকে নিবেদন করে বলে, 'আমরা একমাত্র তোমারই কাছে সাহায্য কামনা করি' অর্থাৎ যে কোনো ব্যাপারে আমরা তোমারই কাছে দোয়া করি, তোমারই কাছে সাহায্য চাই, অন্য কারো কাছে নয়। আসলে মানুষ দোয়া করে কেবল সেই শক্তিরই কাছে, যে শক্তি সম্পর্কে সে ধারণা করে, 'আমি যার কাছে দোয়া করছি, তিনি সকল কিছুই শোনেন, দেখেন এবং অতি প্রাকৃতিক ক্ষমতার অধিকারী। নীরবে-সরবে, নির্জনে, প্রকাশ্যে, মনে মনে যেকোনো অবস্থায়ই দোয়া করি না কেনো, তিনি তা দেখছেন এবং শুনছেন'। মূলতঃ মানুষের আভ্যন্তরীণ এই অনুভূতি, এই চেতনাই তাকে দোয়া করতে প্রেরণা যোগায়- উদ্বুদ্ধ করে থাকে।
এই পৃথিবী তথা বস্তুজগতের প্রাকৃতিক উপায়-উপকরণ যখন মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা, কষ্ট নিবারণ অথবা কোনো প্রয়োজন পূরণ করার জন্য যথেষ্ট নয় বা যথেষ্ট বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না তখন কোনো অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতার অধিকারী সত্তার কাছে ধর্ণা দেয়ার জন্য মানুষের অবচেতন মন অস্থির হয়ে ওঠে। বিষয়টি সেসময় মানুষের জন্য একান্তই অপরিহার্য হয়ে ওঠে। তখনই মানুষ দোয়া করে এবং সেই অদৃশ্য অথচ সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী সত্তাকে ডাকতে থাকে, সময়ের প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি স্থানে এবং সর্বাবস্থায় ডাকে। নির্জনে একাকী ডাকে, উচ্চস্বরে ডাকে, নীরবে নিভৃতে ডাকে এবং মনে মনে একান্ত তাঁরই কাছে সাহায্য কামনা করে। একটি বিশ্বাসের ভিত্তিতেই মানুষ এভাবে তাঁর স্রষ্টাকে ডাকতে থাকে। সেই বিশ্বাসটি হলো, সে যে সত্তাকে ডাকছে সেই সত্তা তাকে সর্বত্র সর্বাবস্থায় দেখছেন এবং তাঁর মনের গহীনে যে কথামালার গুঞ্জরণ সৃষ্টি হচ্ছে, সাহায্যের প্রত্যাশায় তার মন যেভাবে আর্তনাদ করছে, মনের জগতের এই আর্তচিৎকার পৃথিবীর কোনো কান না শুনলেও তাঁর স্রষ্টার কুদরতী কান অবশ্যই শুনতে পাচ্ছে। সে যে সত্তাকে ডাকছে, তিনি এমন অসীম ক্ষমতার অধিকারী যে, তাঁর কাছে প্রার্থনাকারী যেখানেই অবস্থান করুকনা কেনো, তিনি তাকে সাহায্য কতে সক্ষম। তার বিপর্যস্ত ভাগ্যকে পুনরায় কল্যাণে পরিপূর্ণ করতে সক্ষম।
আল্লাহ তা'য়ালার কাছে দোয়া করার, তাঁরই কাছে সাহায্য কামনা করার এই তাৎপর্য অনুধাবন করার পর মানুষের জন্য এ বিষয়টির মধ্যে আর কোনো জটিলতা থাকে না, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'য়ালা ব্যতীত অন্য কোনো সত্তার কাছে দোয়া করে বা সাহায্যের আশায় ডাকে, তার নামে মানত করে সে প্রকৃত পক্ষেই নিরেট বোকা এবং সে নির্ভেজাল শিরকে লিপ্ত হয়। কারণ যেসব বৈশিষ্ট ও গুণাবলী শুধুমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার জন্যই নির্দিষ্ট তা সেসব সত্তার মধ্যেও রয়েছে বলে সে বিশ্বাস করে। আল্লাহ তা'য়ালার জন্য যেসব গুণাবলী নির্দিষ্ট, সে তাদেরকে ঐসব গুণাবলীর ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'য়ালার সাথে শরীক না করতো তাহলে তার কাছে দোয়া করতো না এবং সাহায্য চাওয়ার কল্পনা পর্যন্ত তার মনে কখনো উদয় হতো না।
দোয়া ও সাহায্য প্রার্থনা করার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে যে, কোনো ব্যক্তি যদি কারো সম্পর্কে নিজের থেকেই এ কথা মনে করে বসে যে, সে প্রচণ্ড ক্ষমতা ও ইখতিয়ারের মালিক, তাহলে অনিবার্যভাবেই তার কল্পিত ব্যক্তি বা সত্তা ক্ষমতা ও ইখতিয়ারের মালিক হয়ে যায় না। ক্ষমতা ও ইখতিয়ারের মালিক হওয়া একটি অবিচল বাস্তবতা, একটি দৃশ্যমান বাস্তব বিষয় যা কারো মনে করা বা না করার ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রকৃত ক্ষমতার মালিককে কেউ মালিক মনে করুক বা না করুক, স্বীকৃতি দিক বা না দিক, তাতে কিছু হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটবে না, প্রকৃতই যে ক্ষমতা ও ইখতিয়ারের মালিক সে সর্বাবস্থায়ই মালিক থাকবে। আর যে সত্তা কোনো ক্ষমতার মালিক নয়, কেউ তাকে ক্ষমতার মালিক মনে করলেও তার মনে করার কারণে সে সত্তা প্রকৃত অর্থেই ক্ষমতাবান হবে না।
এটাই অটল বাস্তবতা যে, একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সত্তাই সর্বশক্তিমান, সমগ্র বিশ্ব-জাহানের ব্যবস্থাপক, শাসক, প্রতিপালক, সংরক্ষণকারী, তিনিই সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা, তিনিই সামগ্রিকভাবে যাবতীয় ক্ষমতা ও ইখতিয়ারের অধিপতি। সমগ্র বিশ্বজগতে দ্বিতীয় এমন কোনো সত্তার অস্তিত্ব নেই, যে সত্তা দোয়া শোনার সামান্য যোগ্যতা রাখে, সাহায্য করার যোগ্যতা রাখে বা তা মঞ্জুর করা বা না করার ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে।
মানুষ যদি এই অটল বাস্তবতার পরিপন্থী কোনো কাজ করে নিজের পক্ষ থেকে নবী-রাসূল, পীর-দরবেশ, অলী-মাওলানা, জ্বিন-ফেরেশতা, গ্রহ-উপগ্রহ ও মাটির তৈরী দেব-দেবীদেরকে ক্ষমতা ও ইখতিয়ারের অংশীদার কল্পনা করে, তাহলে প্রকৃত বাস্ত বতার কোনো ধরনের পরিবর্তন ঘটবে না। ক্ষমতার অধিকারী মালিক যিনি, তিনি মালিকই থাকবেন, তাঁর মালিকানায় এসব ব্যর্থ ও বাস্তবতা বর্জিত কল্পনা বিন্দুমাত্র দাগ কাটতে পারে না। আর নির্বোধদের কল্পনা শক্তি কখনো ক্ষমতা ও ইখতিয়ারহীন গোলামকে মালিক বানাতে পারে না, গোলাম গোলামই থাকে।
দোয়া করা ও সাহায্য কামনা করার বিষয়টি সম্পর্কে একটি দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে। মনে করা যাক কোনো রাজার দরবার থেকে সাহায্য দান করা হয় এবং রাজা প্রার্থনা শুনে থাকেন। সেখানে প্রজাদের মধ্য থেকে যার যে প্রয়োজন অনুসারে সাহায্যের আবেদন নিয়ে অনেকেই উপস্থিত হয়েছে। এই প্রজাদেরই একজন যদি সাহায্যের আবেদন নিয়ে রাজার দরবারে উপস্থিত হয়ে রাজার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সাহায্য প্রত্যাশী অন্য প্রজাদের একজনের সামনে দু'হাত জৌড় করে দাঁড়িয়ে তার গুণকীর্তন করতে থাকে এবং সাহায্যের জন্য তার কাছে কাতর কণ্ঠে অনুনয়-বিনয় করতে থাকে, তাহলে ঐ ব্যক্তির এই ধরনের আচরণকে কি বলা যেতে পারে? এর থেকে চরম ধৃষ্টতা কি আর হতে পারে?
বিষয়টি আরেকটু তলিয়ে দেখা যাক, রাজার দরবারে রাজার উপস্থিতিতে তাঁরই একজন প্রজা আরেকজন প্রজাকে রাজা কল্পনা করে তার কাছে কাতর কণ্ঠে দোয়া করছে, সাহায্য প্রার্থনা করছে, রাজার মধ্যে যেসব গুণাবলী রয়েছে তা ঐ প্রজা সম্পর্কে উল্লেখ করে তার কাছে সাহায্য চাচ্ছে। আর যে প্রজার কাছে এভাবে ঐ নির্বোধ প্রজা সাহায্য চাচ্ছে, সেই প্রজা বেচারী রাজার সামনে লজ্জায় ম্রিয়মান হয়ে পড়ছে, বিব্রতবোধ করছে এবং বারবার নির্বোধ প্রজাকে বলছে, 'তুমি আমার গুণকীর্তন কেনো করছো, আমার কাছে কেনো প্রার্থনা করছো, কেনো আমার কাছে সাহায্য চাচ্ছো, আমি তো রাজা নই, তোমার মতো আমিও এই রাজার একজন প্রজামাত্র এবং রাজ দরবারে তোমার মতো আমিও একজন সাহায্য প্রার্থী। আমাকে বাদ দিয়ে তোমার চোখের সামনে যে আসল রাজা দরবারে অধিষ্ঠিত আছেন, সাহায্য তার কাছে চাও'। বেচারী এভাবে ঐ নির্বোধ প্রজাকে বার বার বুঝাচ্ছে, কিন্তু কে শোনে কার কথা! হতভাগা তবুও চোখ-কান বন্ধ করে তারই মতো সেই প্রজার কাছে স্বয়ং রাজার সামনে সাহায্য প্রার্থনা করেই যাচ্ছে। বর্তমানে অধিকাংশ মানুষের অবস্থা হয়েছে ঐ নির্বোধ হতভাগা প্রজার মতোই। আল্লাহ তা'য়ালার যেসব বাকহীন গোলামদের দাসত্ব, আনুগত্য, বন্দেগী, পূজা-উপাসনা এরা করছে, তারা নীরবে অঙ্গুলি সঙ্কেতে জানিয়ে দিচ্ছে, 'আমরা তোমারই মতো এক গোলাম। আমাদের আনুগত্য না করে, আমাদের কাছে প্রার্থনা না করে, আমরা যার আনুগত্য করছি, যার কাছে সাহায্য কামনা করছি, সেই আল্লাহ তা'য়ালার আনুগত্য করো এবং তাঁরই কাছে সাহায্য চাও'।
সুতরাং সকল নবী-রাসূলেরই চাওয়া পাওয়া ছিলো কেবলমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার কাছেই এবং সকল নবী-রাসূলের সাহাবায়ে কেরামের চাওয়া পাওয়া ছিলো শুধু মাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছেই। তাঁরা কখনো তাদেরই অনুরূপ আরেকজন মানুষের কাছে বা মৃত মানুষের কবরে গিয়ে সাহায্য কামনা করেননি, যে কাজ বর্তমানে একশ্রেণীর মানুষ করে থাকে। মানুষ তারই অনুরূপ আরেকজন মানুষের কাছে গিয়ে ঐ ধরনের সাহায্য কামনা করবে যে ধরনের সাহায্য করতে পারেন কেবলমাত্র আল্লাহ তা'য়ালা, নিজের স্রষ্টা ও প্রতিপালককে বাদ দিয়ে আরেকজন জীবিত বা মৃত মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়া মানবীয় মর্যাদার সম্পূর্ণ বিপরীত। বড় ধরনের গোনাহ ও মর্যাদাহানীকর সকল কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থেকে একমাত্র মহান আল্লাহর কাছেই সকল বিষয়ে সাহায্য কামনা করে নিজেকে মুমিনের মর্যাদায় উন্নীত করাই মুসলমানদের কাজ।
মানুষদের মধ্যে যারা আল্লাহ তা'য়ালার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে এবং একমাত্র তাঁর দাসত্ব না করে অন্যান্য শক্তিরও দাসত্ব করে আল্লাহ তা'য়ালা সম্পর্কে তাদের ধারণা একটু ভিন্ন ধরনের। এই ভিন্ন ধারণাই তাদেরকে বিরাট এক ভুলের ভেতরে নিমজ্জিত করে রেখেছে এবং তারা শিরক-এ লিপ্ত রয়েছে। এই শ্রেণীর লোকগুলোর বিশ্বাস হলো, মহান আল্লাহ তা'য়ালা হলেন এই পৃথিবীর রাজা-বাদশা এবং সম্রাটদের অনুরূপ। পৃথিবীর শাসকরা যেমন দেশের সাধারণ জনগণের ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বহুদূরে রাজ-প্রাসাদে অবস্থান করে ভোগ-বিলাসে মাতোয়ারা হয়ে থাকে। সাধারণ মানুষের পক্ষে যেমন তাদের সাথে সাক্ষাৎ করা সম্ভব হয় না। তাদের সামনে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। তাদের কাছে কোনো দরখাস্ত প্রেরণ করতে হলে তাদের সভাষদ, হোমড়া-চোমড়া, শাসকবৃন্দের যারা প্রিয়জন বা তাদের কোনো নিকট আত্মীয়দের দ্বারস্থ হতে হয়। সৌভাগ্যবশতঃ কারো দরখাস্ত যদি শাসকদের কাছে পৌঁছে যায় তবুও শাসকগণ সে দরখাস্তের আবেদন সম্পর্কে স্বয়ং ব্যবস্থা গ্রহণ না করে কোনো কর্মচারীকে বা নিজের অধীনস্থ কাউকে দায়িত্ব প্রদান করেন যে, আবেদনকারীর আবেদন বিবেচনা করা যায় কিনা তা দেখা হোক। এক শ্রেণীর মানুষ মহান আল্লাহ তা'য়ালাকেও পৃথিবীর এই শাসকদের মতই মনে করেছে এবং এর ফল হয়েছে অত্যন্ত মারাত্মক।
পৃথিবীর এক শ্রেণীর কৌশলী মানুষ উল্লেখিত ধারণা অনুসরণকারী মানুষদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করেছে যে, সকল শাসকের শাসক, সকল সম্রাটের সম্রাট আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের কাছ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেন, সাধারণ মানুষের নাগাল হতে তিনি বহুদূরে। একজন সাধারণ মানুষের আবেদন সরাসরি আল্লাহ তা'য়ালার দরবারে কোনোক্রমেই পৌঁছতে পারে না। তাঁর কাছে সাধারণ মানুষের প্রার্থনা পৌঁছা এবং তার জবাব লাভ করা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়।
আল্লাহ তা'য়ালার কাছে কোন প্রার্থনা পেশ করতে হলে এবং তার জবাব পেতে হলে কি করতে হবে? ওসীলা অনুসন্ধান করতে হবে। পবিত্র কুরআনের সূরা মায়েদার ৩৫ নম্বর আয়াতের অপব্যাখ্যা দিয়ে তারা সাধারণ মানুষকে বুঝিয়ে দিল, আল্লাহ তা'য়ালার কাছে কোনো প্রার্থনা পৌঁছাতে হলে অবশ্যই কোনো ওসীলা ধরতেই হবে। সে ওসীলা আবার কি? এই ওসীলার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নানাজন নানা ধরনের ওসীলার প্রবর্তন করে সাধারণ মানুষকে ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত রেখে শোষণ শুরু করলো।
কেউ বললো, ওসীলা মানে হলো ঐ সকল পবিত্র আত্মা যারা পৃথিবীতে আল্লাহর ওলী বা কামেল নামে পরিচিত ছিল। তাদের মাজারই হলো সেই ওসীলা। মাজারে গিয়ে সিজদা দিয়ে হোক বা দু'হাত তুলে হোক, মাজারে শায়িত ব্যক্তির কাছে আবেদন করতে হবে, তিনি যেন আল্লাহ তা'য়ালার কাছে তার দরখাস্ত পৌঁছে দেন। এখন মাজারে শায়িত ব্যক্তি তো আর খালি মুখে আল্লাহ তা'য়ালার কাছে তোমার দরখাস্ত পৌঁছাবেন না। পৃথিবীর শাসকের কাছের কোনো লোক শুধু হাতে কোনো আবেদন যেমন পৌঁছায় না, ঘুষ দিতে হয়, তেমনি এই মাজারেও ঘুষ দিতে হবে। তাহলে তোমার আবেদন তিনি আল্লাহ তা'য়ালার কাছে পৌঁছে দিবেন।
সে ঘুষের ধরণ হলো, নগদ অর্থ থেকে শুরু করে পৃথিবীর কোনো নিম্ন মূল্যের বস্তুও হতে পারে। হতে পারে তা মুরগীর বাচ্চা, উট, গরু, ছাগল, গাছের ফল ইত্যাদী। এ ধরনের বস্তু বা নগদ অর্থ মাজারে মানত করতে হবে। তাহলে তিনি তোমাদের আবেদন আল্লাহর কাছে পৌঁছে দিবেন। এসব বস্তু এবং নগদ অর্থ মাজারের সেবক যারা আছেন তারা ভোগ করবেন। মাজারের খাদেমগণ ভোগ করার অর্থই হলো মাজারে শায়িত ব্যক্তির ভোগ করা।
আরেক ধরনের ধুরন্ধর লোক ওসীলা বলতে কি বুঝায় তা এভাবে বুঝিয়ে দিল যে, যারা ওসীলা বলতে মাজারে শায়িত ব্যক্তিকে বুঝিয়েছে তারা আসলে ধান্দাবাজ। ওরা ধান্দাবাজি করে তোমাদের পকেটের টাকা নিজের পকেটে ঢোকাতে চায়। তোমাদের পশু সম্পদ ও গাছের ফলমূল খেতে চায়। কারণ মাজারে যিনি শুয়ে আছেন তিনি মৃত। আর মৃত মানুষ কি কোনো কিছু খেতে পারে? তাহলে তোমরা কেনো মৃত মানুষের কবরে এসব জিনিস দান করো? টাকাই বা কেনো দাও? মৃত মানুষের তো টাকা দরকার হয় না। টাকা দরকার হয় জীবিত মানুষের।
সুতরাং ওসীলা হলো তোমাদের চোখের সামনে নাদুস-নুদুস নূরানী চেহারার অধিকারী পীর নামক ব্যক্তিগণ। এদের কাছে রয়েছে ওপরের জগতে যাবার সিঁড়ি, যখন খুশী তখনই এরা ওপরের জগতে যাতায়াত করতে পারে, এদের সাথে মহান আল্লাহর সম্পর্ক খুবই উষ্ণ। তিনি তোমার যে কোনো আবেদন আল্লাহ তা'য়ালার কাছে পৌঁছে দিবেন। পীরের মুরীদ হয়ে যাও এবং পীরকে সন্তুষ্ট রাখো। পীর সাহেব তোমার প্রতি আল্লাহ তা'য়ালাকে সন্তুষ্ট রাখবেন।
এখন পীরকে সন্তুষ্ট রাখার পথ কি? পথ ঐ একটিই। এতদিন তোমরা মাজারে যা দিতে তা এখন পীর সাহেবকে দিতে হবে। তবে সাবধান! পীর সাহেবকে সরাসরি কিছুই দেয়া যাবে না। তার যারা লোকজন রয়েছে, তাদের মাধ্যম দিয়ে দাও, তিনি পীর সাহেবকে গিয়ে তোমার কথা জানাবেন, তারপর পীর সাহেব তোমার দরখাস্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে দিবেন।
আরেক দল চালাক লোক বললো, এসব পীর মাজার সব কিছুই বাতিল। এগুলো কোনো ওসীলাই না। আসলে ওসীলা বলতে বুঝায় হলো, নিজের হাতে মাটি বা অন্য কিছু দিয়ে মূর্তি নির্মাণ করতে হবে বা কোনো মূর্তির ছবি অঙ্কন করতে হবে। তারপর সেই মূর্তির সামনে দু'হাত ভরে দান করতে হবে। তবে এই দানের কাজও তোমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাদের কাছে কোনো কিছু দান করার অধিকার হলো আমাদের। তোমরা আমাদের কাছে তোমাদের দান পৌঁছে দিবে, আমরা তা পৌঁছে দিবো মূর্তির সামনে। তিনি তা পৌঁছে দিবেন স্বয়ং স্রষ্টার কাছে।
এভাবেই মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'য়ালা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ ভুল ধারণায় নিমজ্জিত হবার ফলে বান্দাহ ও আল্লাহ তা'য়ালার মাঝখানে অসংখ্য ছোট বড় রব্ব, ইলাহ আর মাবুদ ও সুপারিশকারীর এক বিশাল দল নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নিয়েছে। সেই সাথে পাদ্রী ও পুরোহিত তন্ত্রের একটি বাহিনী দাঁড়িয়ে গিয়েছে। যাদের মাধ্যম ব্যতীত কোনো কোনো ধর্মের অনুসারীরা তাদের জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত নিজেদের কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানও পালন করতে পারে না。
📄 নবী করীম (সা:) কি গায়েব জানতেন?
একশ্রেণীর লোক প্রচার করে থাকে নবী করীম (সা:) গায়েব জানতেন অর্থাৎ তিনি অদৃশ্যের সংবাদ অবগত ছিলেন। নবী-রাসূলদের জীবনে ঘটে যাওয়া অগণিত ঘটনাবলীর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মহান আল্লাহ তা'য়ালা প্রয়োজন অনুযায়ী নবী-রাসূলদের অদৃশ্যের সংবাদ অবহিত করেছেন। কোনো নবী-রাসূলকেই এমন কোনো ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি যে, তারা অদৃশ্যের সংবাদ রাখবেন। অর্থাৎ অদৃশ্যকে জানার নিজস্ব কোনো ক্ষমতা কোনো নবী- রাসূলেরই ছিলো না। আল্লাহ তা'য়ালা প্রয়োজন অনুযায়ী যতটুকু তাদেরকে জানিয়েছেন ততটুকুই তাঁরা জানতেন।
সকল মর্যাদার দিক থেকে সর্বাধিক ও সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে নবী করীম (সা:) কে। তিনি কি গায়েব বা অদৃশ্যের সংবাদ জানতেন?
এ প্রশ্নের জবাব আমরা পবিত্র কুরআন মাজীদে সন্ধান করি, কুরআন কি বলে তা প্রথমে জেনে নেই। মহান আল্লাহ তা'য়ালা যাঁকে মর্যাদার সুউচ্চ আসনে আসীন করেছেন, তাঁকেই তিনি ঘোষণা দিতে বলছেন- قُل لَّا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ طَ وَمَا يَشْعُرُونَ أَيَّانَ يبعثون -
(হে নবী) আপনি বলুন, আল্লাহ তা'য়ালা ব্যতীত আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে, এদের কেউই অদৃশ্য জগতের কিছু জানে না; তারা এও জানে না, কবে তাদের আবার (কবর থেকে) উঠানো হবে! (সূরা আন নাম্ল- ৬৫)
যারা প্রচার করে থাকেন যে, নবী করীম (সা:) গায়েবের সংবাদ জানতেন, পবিত্র কুরআনের উল্লেখিত আয়াত তাদের কাছে প্রশ্ন করছে, নবী করীম (সা:) কি আসমানসমূহ ও যমীনের বাইরের কোনো শক্তি? সমগ্র সৃষ্টির যিনি স্রষ্টা সেই আল্লাহ তা'য়ালা স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিচ্ছেন, সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে কেউই গায়েব জানে না। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর হাবীবকে ঘোষণা করতে বলছেন- قُل لا أَقُولُ لَكُمْ عِندِي خَزَائِنُ اللهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُوْلُ لَكُمْ إِنِّي مَلَكٌ جِ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوْحَى إِلَيَّ طَ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ ط أَفَلَا تَتَفَكَّرُوْنَ عِ
(হে রাসূল) আপনি বলে দিন, আমি তো তোমাদের (এ কথা) বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহ তা'য়ালার বিপুল ধনভাণ্ডার রয়েছে, না (এ কথা বলি,) আমি গায়েবের কোনো সংবাদ রাখি! আর এ কথাও বলি না যে, আমি একজন ফিরিশতা, (আসলে) আমি তো সেই ওহীরই অনুসরণ করি যা আমার ওপর নাযিল করা হয়। (সূরা আল আনয়াম- ৫০)
অন্য কোনো নবী-রাসূল দূরে থাক, স্বয়ং নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা:) কেও আল্লাহ তা'য়ালা নিজের কল্যাণ-অকল্যাণ করার ক্ষমতা প্রদান করেননি। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে বলতে বলেছেন- قُل لا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلاَ ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ طَ وَلَوْ كُنتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ ج وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ جِ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُوْنَ عِ لاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ .
(হে রাসূল) আপনি (আরো) বলুন, আমার নিজের ভালো- মন্দের মালিকও তো আমি নই, তবে আল্লাহ তা'য়ালা যা চান তাই হয়; যদি আমি অজানা বিষয় সম্পর্কে জানতাম, তাহলে আমি (নিজের জন্যে সে জ্ঞানের জোরে) অনেক ফায়দাই হাসিল করে নিতে পারতাম এবং (এ কারণে) কোনো অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করতে পারতো না, আমি তো শুধু (একজন নবী, জাহান্নামের) সতর্ককারী ও (জান্নাতের) সুসংবাদবাহী মাত্র, শুধু সে জাতির জন্যে যারা আমার ওপর ঈমান আনে। (সূরা আল আ'রাফ- ১৮৮)
পবিত্র কুরআনে এ ধরনের বহু আয়াতে আল্লাহ তা'য়ালা ঘোষণা করেছেন, নবী করীম (সা:) গায়েব জানতেন না। গায়েবের সংবাদ কেবলমাত্র মহান আল্লাহ তা'য়ালার নিয়ন্ত্রণে। তিনি যদি গায়েব জানতেন তাহলে তায়েফে যাবার সময় ঐ রাস্তা তিনি পরিহার করে চলতেন, যে রাস্তায় তাঁকে মারাত্মকভাবে আহত করা হয়েছিলো। গায়েবের সংবাদ জানা থাকলে ওহূদের যে স্থানে তিনি গুরুতর আহত হলেন, সে মর্মান্তিক ঘটনা তিনি এড়িয়ে যেতে পারতেন। খায়বরে এক ইয়াহুদী নারী তাঁর খাদ্যে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিলো, গায়েবের সংবাদ জানা থাকলে তিনি উক্ত বিষ মিশ্রিত খাদ্য খেয়ে তিনি অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করতেন না।
বুখারী শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, নবী করীম (সা:) পবিত্র কদম মুবারকের মোজা খুলে রেখেছিলেন। একটি বিষধর বিচ্ছু উক্ত মোজার মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। তিনি প্রয়োজনে মোজা পরিধান করতেই বিচ্ছু তাঁর পবিত্র কদমে দংশন করলে তিনি যন্ত্রণা কাতর কণ্ঠে বলেছিলেন, 'এ বিচ্ছু আল্লাহ তা'য়ালার নবীকেও দংশন থেকে বিরত থাকে না'। গায়েবের সংবাদ জানা থাকলে বিচ্ছু তাঁকে দংশন করতে পারতো না। তাঁর পরম শ্রদ্ধেয় চাচা হযরত হামজা (রা:) ওহূদে মর্মান্তিকভাবে শাহাদাতবরণ করলেন। গায়েবের সংবাদ জানা থাকলে তিনি আপন চাচাকে সাবধান করতেন। ইয়ারমুকের ময়দানে আপন চাচাত ভাই হযরত জাফর ইবনে আবি তালেব (রা:) শাহাদাতবরণ করলেন। গায়েবের সংবাদ জানা থাকলে তিনি নিজ ভাইকে সতর্ক হতে বলতেন।
গায়েবের সংবাদ জানা থাকলে তিনি নিজ সন্তান-সন্ততি, প্রাণাধিক প্রিয় স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা:) ও আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুর সংবাদ আগেই পেতেন। পরম প্রিয় স্ত্রী হযরত আয়িশা (রা:) এর ওপর যখন ভিত্তিহীন অপবাদ আরোপ করা হলো, নবী করীম (সা:) স্ত্রীকে প্রায় এক মাসের জন্যে পিতার বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। আল্লাহ তা'য়ালা যখন প্রকৃত বিষয় ওহীর মাধ্যমে তাঁকে অবগত করলেন তখন তিনি প্রকৃত সত্য জানতে পারলেন। তিনি যদি গায়েব জানতেন তাহলে প্রিয় স্ত্রীর বিচ্ছেদ যাতনা সহ্য করতেন না। তিনি গায়েব জানতেন না বিধায় নিকটাত্মীয়দের এভাবে সাবধান করেছেন- لَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا - 'আমি তোমাদেরকে আল্লাহর পাকড়াও থেকে রক্ষা করতে পারবো না'। একই কথা তিনি নিজ ফুফু হযরত সাফিয়্যা (রা:) ও প্রাণাধিক প্রিয় কন্যা ফাতিমা (রা:) কেও বলেছেন। (বুখারী)
নবী করীম (সা:) কে এ ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি যে, তিনি কারো কল্যাণ বা অকল্যাণ সাধন করবেন অথবা নিজেরই কল্যাণ বা অকল্যাণ সাধন করবেন। মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রিয় হাবীবকে ঘোষণা করতে বলছেন-
قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَّ لَا رَشَدًا - قُلْ إِنِّي لَنْ يُحِيْرَنِي مِنَ اللَّهِ أَحَدٌ لا وَلَنْ أَجِدَ مِنْ دُوْنِهِ مُلْتَحَدًا لا
আপনি বলে দিন, আমি তোমাদের কোনো ক্ষতিসাধনের যেমন ক্ষমতা রাখি না, তেমনি আমি তোমাদের কোনো ভালো করার ক্ষমতাও রাখি না। আপনি (তাদের) বলে দিন, (কোনো সঙ্কট দেখা দিলে) আমাকেই বা আল্লাহর পাকড়াও থেকে কে রক্ষা করবে? তিনি ছাড়া আর কোনো আশ্রয়স্থলও তো আমি (খুঁজে) পাবো না। (সূরা জ্বীন- ২১-২২)
নবী করীম (সা:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলতে বলছেন, 'আপনি মানুষদের জানিয়ে দিন, আল্লাহ তা'য়ালা যদি আমাকে গ্রেফতার করতে চান তাহলে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউই আমাকে রক্ষা করতে পারবে না এবং আল্লাহ ছাড়া এমন কেউ নেই যার প্রতি নির্ভর করা যায়'। এটাই যখন বাস্তব অবস্থা তাহলে এ কথা কিভাবে বলা যায় যে, 'আমি অমুক পীরের মুরীদ, তিনিই আমাকে রক্ষা করবেন'!
নবী করীম (সা:) স্বয়ং জানেন না কিয়ামতের ময়দানে তাঁর সাথে কেমন আচরণ করা হবে-
قُلْ مَا كُنْتُ بِدْعًا مِّنْ الرُّسُلِ وَمَا أَدْرِي مَا يُفْعَلُ بِي وَلَا بِكُمْ طَ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوْحَى إِلَيَّ وَمَا أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ مُّبِينٌ
(হে রাসূল) আপনি বলে দিন, রাসূলদের মাঝে আমি তো নতুন নই, আমি এও জানি না, আমার সাথে কি (ধরনের আচরণ) করা হবে এবং তোমাদের সাথেই বা কী (ব্যবহার করা) হবে; আমি শুধু সেটুকুরই অনুসরণ করি যেটুকু আমার কাছে ওহী করে পাঠানো হয়, আর আমি তোমাদের জন্যে সতর্ককারী বৈ কিছুই নই। (সূরা আল আত্কাফ- ৯)
কিয়ামত কবে কখন সংঘটিত হবে এ সংবাদও নবী করীম (সা:) জানতেন না। তাঁকে আল্লাহ তা'য়ালা যতটুকু জানিয়েছেন ঠিক ততটুকুই তিনি সাধারণ মানুষকে জানিয়েছেন। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে বলতে বলছেন-
قُلْ إِنْ أَدْرِى أَقَرِيبٌ مَّا تُوْعَدُوْنَ أَمْ يَجْعَلُ لَه رَبِّي أَمَدًا عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا لا إِلا مَنِ ارْتَضى مِنْ رَّسُولٍ فَإِنَّه يَسْلُكُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ رَصَدًا لا
(হে নবী,) আপনি (এদের) বলে দিন, আমি (নিজেই) জানি না, তোমাদের (কিয়ামত দিবসের) যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে তা কি (আসলেই) সন্নিকটে, না আমার প্রতিপালক তার (আগমনের) জন্যে কোনো (দীর্ঘ) মেয়াদ ঠিক করে রেখেছেন। তিনি (সমগ্র) অদৃশ্য জগতের (জ্ঞানের একক) জ্ঞানী, তাঁর সে অদৃশ্য জগতের কোনো কিছুই তিনি কারো কাছে প্রকাশ করেন না, অবশ্য তাঁর রাসূল ছাড়া- যাকে তিনি (এ কাজের জন্যে) বাছাই করে নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর আগে পিছেও তিনি (অতন্দ্র) প্রহরী নিযুক্ত করে রেখেছেন। (সূরা আল জ্বীন- ২৫-২৭)
নবী করীম (সা:) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্য হলো, 'আপনি এ কথা সকল মানুষকে জানিয়ে দিন, ইতোপূর্বে যে সকল রাসূল আগমন করেছিলেন আমি তাদের থেকে ভিন্ন কোনো কিছু নই বা আমিই এই পৃথিবীতে প্রথম রাসূল নই। এ পৃথিবী থেকে এমন বহু রাসূল গত হয়ে গিয়েছেন যারা পানাহার করতেন, বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সংসার জীবন যাপন করেছেন। তাদের সন্তান-সন্ততি জন্মগ্রহণ করেছে এবং তাঁরা কর্মের মাধ্যমে জীবীকাও অর্জন করেছেন। আমি আলেমুল গায়েব নই বা গায়েবের কোনো সংবাদ আমি জানি না। তোমাদের কারো ভবিষ্যৎ জানা তো দূরের কথা, আমার নিজের ভবিষ্যৎ আমার জানা নেই। আমাকে ওহীর মাধ্যমে যে জিনিস সম্পর্কে অবহিত করা হয় বা যে জ্ঞান দান করা হয় আমি শুধু সেটুকুই জানি। এর থেকে বেশি কিছু জানার দাবী আমি কখনো করিনি। হারানো বস্তুর সন্ধান জানানো, রোগী সুস্থ হবে না ইন্তেকাল করবে, কখন ইন্তেকাল করবে বা মাতৃগর্ভে পুত্র না কন্যা রয়েছে এসব গায়েবী কথা বলার ক্ষমতা আমার নেই'।
গায়েবের সংবাদ জানা সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لاَ يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ ط وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ طَ وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إلا فِي كِتَابٍ مُّبِين-
যাবতীয় অদৃশ্য বিষয়ের চাবি তাঁর হাতেই নিবদ্ধ রয়েছে, সেই (অদৃশ্য) খবর তো তিনি ছাড়া আর কারোই জানা নেই; জলে-স্থলে (যেখানে) যা কিছু আছে তা শুধু তিনিই জানেন; (এই সৃষ্টিরাজির মধ্যে) একটি পাতা কোথাও ঝরে না যার (খবর) তিনি জানেন না, মাটির অন্ধকারে একটি শস্যকণাও নেই- নেই কোনো তাজা সবুজ, (বা ক্ষয়িষ্ণু) শুকনো (কিছু), যার (পূর্ণাঙ্গ) বিবরণ একটি সুস্পষ্ট গ্রন্থে মজুদ নেই। (সূরা আল আনয়াম- ৫৯)
সুতরাং নবী করীম (সা:) এর প্রতি ভালোবাসার আবেগে তাঁর প্রতি এমন কোনো শব্দ, বিশেষণ, উপনাম প্রয়োগ করা যাবে না যা শুধুমাত্র মহান আল্লাহরই জন্যে প্রযোজ্য। মুসলিম হিসাবে বিশ্বাস রাখতে হবে, আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে প্রয়োজন অনুসারে অদৃশ্যের সংবাদ জানিয়ে দিতেন, এর বাইরে স্বয়ং রাসূল (সা:) গায়েব জানতেন না। তাঁর প্রশংসা করতে গিয়ে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে যে সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রদান করেছেন, সে মর্যাদার গণ্ডী অতিক্রম করা যাবে না। এ সম্পর্কে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে-
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ سَمِعَ عُمَرَ يَقُوْلُ عَلَى الْمِنْبَرِ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمُ يَقُوْلُ لَا تَطْرُوْنِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنِ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُه -
হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন, তিনি হযরত উমার (রা:) কে মিম্বারে দাঁড়িয়ে বর্ণনা করতে শুনেছেন যে, আমি নবী করীম (সা:) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলছেন, (সাবধান) আমার প্রশংসা করতে অতিরঞ্জিত করো না, যেমন মারইয়াম পুত্র ঈসা সম্পর্কে করেছিলো খ্রিষ্টানরা। আমি একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার বান্দাহ্। তবে তোমরা (আমার সম্পর্কে) বলবে, আল্লাহর বান্দাহ্ তাঁর রাসূল। (বুখারী, ৩ খণ্ড, হাদীস নং ৩১৯০- আধুনিক প্রকাশনী)
📄 নবী করীম (সা:) কর্তৃক দূরের সংবাদ পরিবেশন
মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে প্রয়োজন অনুসারে অদৃশ্যের সংবাদ প্রদান করেছেন এবং তিনি তা সাহাবায়ে কেরামের সম্মুখে প্রকাশ করেছেন। এর অর্থ এটা নয় যে, তিনি সকল অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখতেন বা গায়েবের সংবাদ তাঁর জানা ছিলো। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তিনি কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি এবং অদৃশ্যের সংবাদও প্রকাশ করেননি। শরাব নিষিদ্ধকালে সাহাবায়ে কেরাম নবী করীম (সা:) এর কাছে জানতে চেয়েছেন কিন্তু তিনি কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা যখন ওহী অবতীর্ণ করেছেন তখনই তিনি শরাব নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রিয় হাবীব সম্পর্কে স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছেন-
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى طَ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى لا তিনি কখনো নিজের থেকে কোনো কথা বলেন না, বরং তা হচ্ছে 'ওহী' যা (তাঁর কাছে) পাঠানো হয়। (সূরা আন নাজম-৩-৪)
وَیَقُولُوْنَ لَوْلَا أُنْزِلَ عَلَیْهِ آيَةٌ مِّنْ رَّبِّهِ جِ فَقُلْ إِنَّمَا الْغَيْبُ لِلَّهِ فَانْتَظِرُوا جِ إِنِّي مَعَكُم مِّنَ الْمُنْتَظِرِينَ ع
আপনি তাদের বলে দিন, গায়েব সংক্রান্ত যাবতীয় জ্ঞান তো একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার কাছে। (সূরা ইউনুস-২০)
وَلِلَّهِ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَ আসমানসমূহ ও যমীনের যাবতীয় অদৃশ্য জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার জন্যেই (নির্দিষ্ট রয়েছে)। সূরা আন নাহল-৭৭)
قُل لا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ طَ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ جِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ جِ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُوْنَ عِ আপনি বলে দিন, আমার নিজের ভালো-মন্দের মালিকও তো আমি নই, তবে আল্লাহ তা'য়ালা যা চান তাই হয়; যদি আমি অজানা বিষয় সম্পর্কে জানতাম, তাহলে আমি (নিজের জন্যে সে জ্ঞানের জোরে) অনেক ফায়দাই হাসিল করে নিতে পারতাম এবং (এ কারণে) কোনো অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করতে পারতো না, আমি তো শুধু (একজন নবী, জাহান্নামের) সতর্ককারী ও (জান্নাতের) সুসংবাদবাহী মাত্র, শুধু সে জাতির জন্যে যারা আমার ওপর ঈমান আনে। (সূরা আল আ'রাফ-১৮৮)
عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا لا إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَّسُوْلٍ فَإِنَّه يَسْلُكُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ رَصَدًا لا তিনি (সমগ্র) অদৃশ্য জগতের (জ্ঞানের একক) জ্ঞানী, তাঁর সে অদৃশ্য জগতের কোনো কিছুই তিনি কারো কাছে প্রকাশ করেন না, অবশ্য তাঁর রাসূল ছাড়া-যাকে তিনি (এ কাজের জন্যে) বাছাই করে নিয়েছেন, কিন্তু তার আগে-পিছেও তিনি (অতন্দ্র) প্রহরী নিযুক্ত করে রেখেছেন। (সূরা আল জ্বিন-২৬-২৭)
হাদীসে জিবরাঈল নামে খ্যাত একটি বহুল পরিচিত হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, মানুষের রূপ ধারণ করে মানুষকে শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে হযরত জিবরাঈল (আ:) নবী করীম (সা:)-এর কাছে জানতে চাইলেন, 'কিয়ামত কোন্দিন অনুষ্ঠিত হবে?' জবাবে তিনি বলেছিলেন, 'যার কাছে এ প্রশ্ন করা হয়েছে তিনি এ বিষয়ে প্রশ্নকারীর তুলনায় অধিক অবহিত নন। তবে আমি কিয়ামতের আলামতসমূহ আপনাকে বলতে পারি'। (বুখারী, মুসলিম)
হযরত আয়িশা (রা:) বলেছেন, 'তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ কথা বলে যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) গায়েব জানতেন সে মিথ্যুক'। (বুখারী)
কোনো একদিন কিছু সংখ্যক বালিকা নবী করীম (সা:)-এর পাশেই কবিতা আবৃত্তি করছিলো, তাদের একজন আবৃত্তি করলো, 'আমাদের মধ্যে এমন একজন নবী রয়েছেন যিনি আগামী দিনের কথা জানেন'। নবী করীম (সা:) এ কথা শুনে দ্রুত তাদেরকে এমন কথা বলতে নিষেধ করলেন। (বুখারী)
সুতরাং নবী করীম (সা:) গায়েবের যেসকল সংবাদ জানিয়েছেন তা সবই মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে জানিয়েছেন বলেই তিনি প্রকাশ করেছেন। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অদৃশ্যের বা ভবিষ্যতে ঘটিতব্য যে সকল বিষয় তাঁকে জানানো ও প্রকাশ করার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে, তা তিনি জানিয়েছেন এবং সে সকল বিষয় থেকে এখানে আমরা কতিপয় ঘটনা ও ভবিষ্যদ্বাণী উল্লেখ করছি।
ইতিহাসের পাঠক মাত্রই অবগত আছেন যে, বিশ্বনবী (সা:) এর সমগ্র জীবনই দুঃখ আর যন্ত্রণায় পরিপূর্ণ। মায়ের গর্ভে যখন ছিলেন তখন থেকেই তাঁর জীবন থেকে একের পর এক প্রিয়জন হারিয়ে যাচ্ছিলো। ইন্তেকালের সময় পর্যন্তও এই প্রিয়হারানোর ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। বদরের যুদ্ধে জয়ী হয়ে এলেন মদীনায়, দেখলেন তাঁর কলিজার টুকরা বড় মেয়ের দাফন কাফনের আয়োজন চলছে, তাঁর কলিজার টুকরা কন্যার ইন্তেকালের মর্মান্তিক সংবাদ পথিমধ্যে আল্লাহ তাঁকে জানাননি। ওহূদের ময়দানে প্রিয় চাচা হামজা (রা:) ও সাহাবায়ে কেরামের একটি অংশকে হারাতে হবে ভবিষ্যতে ঘটিতব্য এ ঘটনা তাঁকে পূর্বে জানানো হয়নি।
মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার অনেক বছর পর তিনি পবিত্র মক্কায় প্রবেশ করার সুযোগ পেলেন, আল্লাহ তা'য়ালার ঘর তাওয়াফ ও নামাজ আদায়ের সুযোগ পেলেন। এ ঘটনায় সাহাবায়ে কেরামের হৃদয়-মন আনন্দে ভরপুর পরিপূর্ণ ছিলো। কিন্তু এই আনন্দ বেশী দিন স্থায়ী হলো না। যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো। নবী করীম (সা:) এই যুদ্ধে প্রিয় ভাই জাফরকে হারালেন। শিশুকাল থেকে যে যায়িদকে তিনি লালন পালন করে বড় করেছেন, সেই যায়িদকে হারালেন, আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার মত প্রিয়জনকে হারালেন। এ সংবাদ তাঁকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিলো।
মক্কা থেকে প্রত্যাবর্তনের পরে নবী করীম (সা:) বেশ কয়েকটি দেশের নেতার কাছে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে পত্র প্রেরণ করেছিলেন। সিরিয়ার সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় রোম সম্রাটের অধীনে বেশ কয়েকজন নেতা শাসন কাজ পরিচালনা করতো। বালক্কা এলাকায় যে নেতা শাসন করতো তার নাম ছিল শোরহাবিল। নবী করীম (সা:) এর দূত হারিস ইবনে ওমায়ের (রা:) নবীর পত্র নিয়ে তার কাছে গিয়েছিলেন। বর্তমানেই শুধু নয়, সে সময়েও দূত হত্যা করা সকল দেশেই নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু শুরহাবিল আন্তর্জাতিক সকল রীতি-নীতি ভঙ্গ করে মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের দূতকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিলো।
এই ঘটনার কিসাস হিসাবে নবী করীম (সা:) তিনহাজারের এক মুসলিম বাহিনী সেখানে প্রেরণ করেছিলেন। রোম সম্রাট নবীর পত্র পেয়ে সাময়িকের জন্য ইসলামের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়েছিল বটে, কিন্তু বৈষয়িক স্বার্থের কারণে ইসলামের কঠিন শত্রুর ভূমিকায় সে অবতীর্ণ হয়েছিল। তার অধীনস্ত নেতা শুরহাবিলকে মদীনা আক্রমনের উৎসাহ সে-ই দিয়েছিল। উদিয়মান ইসলামী শক্তিকে অঙ্কুরে ধ্বংস করাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। কারণ তার বেশ কয়েকটি মিত্র রাষ্ট্র ইসলামের প্রতি ছিল সহানুভূতিশীল। অনেকে ইসলাম কবুল করেছিল। তার সাম্রাজ্য কখন ইসলামের শক্তির কাছে নত হয়ে যায় এই ভয়েই সে ছিল কম্পমান।
তার শাসনাধীন সিরিয়ার মায়ান প্রদেশের গভর্ণর ফারুয়া ইতোমধ্যেই ইসলাম কবুল করেছিল। ফারোয়াকে সে তার দরবারে ডেকে নিয়ে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখালো ইসলাম ত্যাগ করে পুনরায় খ্রিষ্টান হবার জন্য। তিনি ইসলাম ত্যাগ করলেন না। তারপর তাকে প্রলোভন দেখানো হলো। তবুও তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। তারপর তাঁকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল। ভয় পেয়ে গিয়েছিল রোম সম্রাট হোরাক্লিয়াস। তার শাসনাধীন এলাকার নেতারা যদি ইসলাম কবুল করতে থাকে, তাহলে তো তার সাম্রাজ্যই টিকবে না। সুতরাং শোরহাবিলকে সে উৎসাহ দিল, সৈন্য বাহিনী যা প্রয়োজন আমার কাছে থেকে গ্রহণ করো, তবুও মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রকে উৎখাত করতেই হবে।
বিশ্বনবী (সা:) এবার ভিন্ন ধরনের ব্যাবস্থাধীনে ইসলামের সেনাবহিনী প্রেরণ করেছিলেন। মাত্র তিন হাজার সেনা সদস্য। সকলেই তাওহীদের অতন্দ্র সিপাহসালার। এক সময়ের ক্রীতদাস, হযরত যায়িদ (রা:), যাকে রাসূল (সা:) নিজের সন্তানের মতই দেখতেন। সেই শিশুকাল থেকেই তিনি নবীর সাহচর্যে রয়েছেন। তাঁকেই এই বাহিনীর প্রথম সেনাপতি নিযুক্ত করলেন। প্রতিটি যুদ্ধেই একজন করে সেনাবাহিনী নিযুক্ত করা হতো। এই যুদ্ধে পরপর তিনজন সেনাবাহিনী রাসূল (সা:) নিযুক্ত করলেন। বিষয়টি ছিলো অন্য যুদ্ধের তুলনায় একটু ব্যতিক্রমধর্মী। দ্বিতীয় প্রধান করা হলো হযরত জাফর ইবনে আবি তালেব (রা:) কে। তৃতীয় প্রধান করা হলো হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা:) কে।
নবী করীম (সা:) ঘোষণা করলেন, 'যায়িদ শাহাদাতবরণ করলে দায়িত্ব গ্রহণ করবে জাফর, জাফর শাহাদাতবরণ করলে দায়িত্ব গ্রহণ করবে আব্দুল্লাহ। সেও যদি শাহাদাতবরণ করে তাহলে মুসলিম বাহিনী যাকে ইচ্ছা তাকে সেনবাহিনী প্রধান নিযুক্ত করবে'।
কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, একজন ইয়াহুদী নবী করীম (সা:) এর কথা শুনে মন্তব্য করেছিল, 'খোদার শপথ! এই তিনজনই আজ শাহাদাতবরণ করবে'।
হযরত যায়িদ ইবনে হারিসা (রা:) কে প্রথম সেনাপতি নিযুক্ত করায় কোনো কোনো সাহাবায়ে কেরামের ভেতরে জল্পনা কল্পনা সৃষ্টি হয়েছিল। একজন দাস শ্রেণীর লোককে সেনাপতি নিযুক্ত করা হলো। কিন্তু নবী করীম (সা:) তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থেকে প্রমাণ করে দিলেন, আল্লাহর বিধানের সামনে উচ্চনীচ আর মনিব এবং দাসের ভেতরে মানুষ হিসাবে কোনো প্রভেদ নেই। মানুষের সম্মান আর মর্যাদা নির্ধারণ করা হয় একমাত্র আল্লাহ ভীতির দ্বারা। যে ব্যক্তি আল্লাহকে যতো বেশি ভয় করে, সে ততবেশি মর্যাদাবান।
সেনাবাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে, নবী করীম (সা:) সাথে সাথেই যাচ্ছেন। তিনি সেনা প্রধানকে বললেন, 'প্রথমে তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাবে, যদি তারা ইসলাম কবুল করে তাহলে যুদ্ধের কোনো প্রয়োজন নেই। তোমরা অগ্রসর হবে ঐ পর্যন্ত যেখানে হারিস তাঁর মহান কর্তব্য পালন করার সময় শাহাদাতবরণ করেছে'।
নবী করীম (সা:) সানিয়াতুল বিদা পর্বত পর্যন্ত গিয়ে তাদের জন্য আল্লাহ তা'য়ালার কাছে দোয়া করে মদীনায় তিনি ফিরে এলেন। সেনাবাহিনী সামনের দিকে এগিয়ে গেল। মুসলিম বাহিনী মদীনা হতে বের হয়েছে, এ সংবাদ গুপ্তচর মাধ্যমে শুরহাবিল জানতে পেরে এক লক্ষ সৈন্যের এক বাহিনী প্রস্তুত করলো। রোম সম্রাট এবং আরব গোত্রগুলোর ভেতর থেকে আরো প্রায় এক লক্ষ সৈন্য প্রস্তুত রাখলো। প্রথম এক লক্ষ ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় এক লক্ষের দলকে সামনের দিকে এগিয়ে দেয়া হবে।
মুসলিম বাহিনী সিরিয়া প্রদেশে উপনীত হয়ে জানতে পারলো, তাদেরকে মুকাবেলা করার জন্য শোরহাবিল এক লক্ষ সৈন্যবাহিনী নিয়ে প্রস্তুত রয়েছে এবং আরো এক লক্ষ সৈন্য তাদেরকে সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। মুসলিম বাহিনী সেখানেই যাত্রা'বিরতি করে নিজেদের ভেতরে আলোচনায় বসলেন। সেনাপতি হযরত যায়িদ (রা:) বললেন, 'এ অবস্থায় সামনের দিকে আর অগ্রসর না হয়ে এখানেই অবস্থান করা উচিত। মদীনায় সংবাদ প্রেরণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করি'।
শাহাদাতের আকাংখায় উদ্দীপ্ত মুসলিম বাহিনী তাদের সেনাপতির কথায় সন্তুষ্ট হলেন না। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা:) দীপ্ত কণ্ঠে বললেন, 'আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তা'য়ালার পথে শাহাদাতবরণ করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা। শাহাদাতের মধ্যেই রয়েছে জীবনে পরম সাফল্য। শাহাদাত আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামত হিসাবেই এসে থাকে। এই নিয়ামত সবার ভাগ্যে হয় না। আর সংখ্যা বিচারে মুসলমানগণ বিজয়ের আশা করে না। বিজয় দানের মালিক মহান আল্লাহ'।
আল্লাহ তা'য়ালার পথের নির্ভীক সৈনিক হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা:) এর তোজোদৃপ্ত কথা শুনে মুসলিম বাহিনীর ভেতরে শাহাদাতের অদম্য কামনা তীব্র হয়ে উঠলো। তাঁরা বীরদর্পে সামনের দিকেই এগিয়ে গেলেন। এ ধরনের একটি ঘটনা হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা:) এর জীবনে একবার ঘটেছিল। এই সিরিয়াতেই তিনি রোমক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করতে এসেছিলেন। রোমান সেনাপতি ক্লিভাস সমরাস্ত্রে সজ্জিত বিশাল বাহিনীসহ দুর্গের অভ্যন্তরে অবস্থান করছিল। মদমত্ত ক্লিভাস তার সুশিক্ষিত রণকৌশলি বিপুল বাহিনী নিয়ে বড় গর্ব করছিল। মহাসত্যের পতাকাবাহী তৌহিদের নিশানবরদার হযরত খালিদ (রা:) তাঁর স্বল্প সংখ্যক বাহিনী নিয়ে দামেস্ক নগরী অবরোধ করেছিলেন।
ইসলামের ঐতিহ্যানুযায়ী বীর কেশরী খালেদ (রা:) সত্যের উজ্জ্বল শিখায় আলোকিত করার ইচ্ছায় কয়েকজন সাথীকে নিয়ে ক্লিভাসের প্রাসাদে গমন করলেন। বাতিল শক্তির প্রতিভূ সম্রাট হিরাক্লিয়াসের গর্বিত সেনাপতি শক্তির দর্পে তার দোভাষীর মাধ্যমে বিশ্ব ইতিহাসের বীর সম্রাট তাওহীদের অতন্দ্র প্রহরী ইসলামের বিপ্লবী সিপাহসালার বীর কেশরী খালিদকে ভীতি প্রদর্শন করছিল। কালিমার আওয়াজ বুলন্দ করার দৃপ্ত শপথ নিয়ে খালিদ আগমন করেছেন দামেস্কে।
ক্লিভাসের দোভাষী জারজিসের কথা শুনে আল্লাহর তরবারী খালিদ (রা:) আহত সিংহের মতই গর্জন করে উঠলেন, 'ঐ আল্লাহ তা'য়ালার নামে শপথ করেই ঘোষনা করছি, তোমাদের সৈন্য সংখ্যাকে আমরা ঐ ক্ষুদ্র পাখির ঝাঁকের সাথেই তুলনা করি, শিকারী যে ঝাঁক ধরে খায়। শিকারী কখনো পাখির বৃহৎ ঝাঁক দেখে ভয় পায় না বরং আনন্দিত হয়। পাখির বিশাল ঝাঁক শিকারীর মনে আনন্দ বৃদ্ধি করে। পাখির ঝাঁকের চারদিকে জালের বেষ্টনী দিয়ে শিকারী অনায়াসে সে পাখি ধরে ফেলে। হে জারজিস! তুমি তোমার সেনাপতি ক্লিভাসকে জানিয়ে দাও! তাওহীদের সেনাবাহিনী আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। তাঁরা শাহাদাতবরণকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিয়ামত মনে করে যুদ্ধের ময়দানে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। শাহাদাত নামক নিয়ামতের জন্য এই বাহিনী কতটা ব্যাকুল তা তোমরা একটু পরেই নিজের চোখে দেখতে পাবে। তাঁরা শাহাদাতের অলিন্দে জীবনের সফলতার সন্ধান লাভ করে। সত্যের পতাকাধারীদের সিদ্ধান্তই শাহাদাতবরণ করা। তাঁরা শাহাদাতের মৃত্যুকে হন্যে হয়েই খুঁজে ফিরে। মৃত্যু যাদের পায়ের ভৃত্য তাদেরকে তোমরা মৃত্যুর ভয় দেখাও? শাহাদাতবরণ করার জন্যই যারা যুদ্ধের ময়দানে আগমন করেছে, পৃথিবীতে জীবিত থাকা তাদের কাছে একটি আপদ ব্যতীত আর কিছুই নয়। যাও, তুমি তোমার সেনাপতিকে আমার কথাগুলো জানিয়ে দাও'।
সেই খালিদ (রা:) ও মুতার প্রান্তরে এসেছেন। যদিও তিনি সামান্য কিছু দিন পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি হযরত যায়িদ (রা:) দক্ষতার সাথে সৈন্য বিন্যাস করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে এক সময় তিনি শাহাদাতের সুধা পান করলেন। এরপর হযরত জাফর (রা:) পতাকা হাতে উঠিয়ে নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। একলক্ষের এক বাহিনীর সাথে মাত্র তিন হাজার সৈন্যর এক অসম যুদ্ধ হচ্ছে। ময়দানের অবস্থা তখন ভয়ঙ্কর। হযরত জাফর (রা:) এর ঘোড়া আহত হলো।
তিনি পদাতিক অবস্থায় যুদ্ধ করতে লাগলেন। শত্রু পক্ষ তাঁর বাম হাত কেটে ফেললে তিনি ডান হাতে পতাকা তুলে ধরলেন। ডান হাত কেটে ফেললে তিনি কাটা বাহু দিয়ে পতাকা উড্ডীন রাখলেন। শত্রু পক্ষ তাঁকে শহীদ করে ফেললো। কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি মুখ দিয়ে পতাকা উড্ডীন রেখেছিলেন। হযরত জাফর (রা:) সম্পর্কে নবী করীম (সা:) বলেছেন, 'তাঁকে জান্নাতে এমন দু'টো পাখা দান করা হয়েছে যে, সে পাখার সাহায্যে তিনি জান্নাতের যেখানে খুশী সেখানে উড়ে বেড়াচ্ছেন'।
এ কারণে হযরত জাফর (রা:) এর উপাধি হয়েছে, তাইয়্যার। অর্থাৎ যে উড়ে বেড়ায়। চাচাত ভাই জাফরকে নবী করীম (সা:) খুবই ভালোবাসতেন। তাঁর শাহাদাতে নবী করীম (সা:) অত্যন্ত ব্যথা পেয়েছিলেন। তিনি বেদনাহত হয়ে মসজিদে নববীতে বসেছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম এসে তাঁকে জানিয়েছিলেন, মহিলাগণ হযরত জাফরের জন্য মাতম করছে। নবী করীম (সা:) তাদেরকে সেই জাহেলি প্রথায় মাতম করতে নিষেধ করেছিলেন।
এবার এগিয়ে এলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা:)। প্রচণ্ড বেগে সে সময় যুদ্ধ চলছে। তরবারী চালনা করতে করতে তিনি বেশ ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লেন। একজন সাহাবী তাঁকে একটুকরা গোস্ত দিয়ে বললেন, 'আপনি বড় ক্ষুধার্ত, এইটুকু খেয়ে তরবারী চালনা করুন'।
গোস্তের টুকরা তিনি মুখে দিয়েছেন। এমন সময় তিনি দেখলেন একজন মুসলিম সৈন্য বড় বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তিনি গোস্তের টুকরো ফেলে দিয়ে বললেন, 'এ পৃথিবীতে আমার খাবারের কোনো প্রয়োজন আর নেই'।
ছুটে গেলেন তিনি রণাঙ্গনে। এক সময় তিনিও শাহাদাতের পেয়ালা পান করলেন। মুতার যুদ্ধে তিনজন সেনাপতির অধীনে হযরত খালিদ (রা:) জেনারেলের সকল অহংকার বিসর্জন দিয়ে একজন সাধারণ সৈনিক হিসাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন। পরপর তিনজনই যখন শাহাদাতবরণ করলেন তখন হযরত সাবিত ইবনে আকরাম (রা:) যুদ্ধের পতাকা উঠিয়ে নিলেন, যেন মুসলিম বাহিনীর ভেতরে কোনো ধরনের বিশৃংখলা সৃষ্টি না হয়।
পতাকা হাতে তিনি ছুটে এলেন হযরত খালিদ (রা:) এর কাছে। তিনি বললেন, 'হে খালিদ! এই পতাকা তুমি ধরো'।
দুই লক্ষের বিরুদ্ধে মাত্র দুই হাজার সৈন্য। যাদের ভেতরে প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা বেশি। বদর, ওহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবায়ে কেরাম এই বাহিনীতে শামিল রয়েছেন। তাদের ওপরে নও মুসলিম খালিদের যে নেতৃত্ব দেবার কোনো অধিকার নেই এ কথা হযরত খালিদের থেকে আর কে ভালো বুঝতো! তিনি আপত্তি জানিয়ে শ্রদ্ধাভরে বললেন, 'অসম্ভব! আমি এ পতাকা গ্রহণ করতে পারি না। আপনি আমার থেকে বয়সে অনেক বড়। আপনি বদর ওহুদে অংশগ্রহণ করেছেন। আপনিই এই পতাকার যোগ্যতম ব্যক্তি'।
হযরত সাবিত (রা:) বললেন, 'আমি এই পতাকা তোমার জন্যই উঠিয়ে এনেছি। আমার থেকে তোমার সামরিক দিক দিয়ে যোগ্যতা অধিক। তুমি এ পতাকা ধরো'।
এবার হযরত সাবিত (রা:) মুসলিম বাহিনীর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোমরা কি খালিদের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে রাজি আছো?'
সমবেত বাহিনী সম্মতি জানিয়ে বলেছিল, 'অবশ্যই আমরা রাজি আছি'।
হযরত খালিদ (রা:) জেনারেলের দায়িত্ব গ্রহণ করার পরে দুই হাজার মুসলিম বাহিনী দুই লক্ষের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিল। হযরত খালিদ (রা:) বলেন, 'সেদিনের যুদ্ধে আমার হাতে সাতটি তরবারী ভেঙ্গেছিল। সর্বশেষে একটি ইয়েমেনী তরবারী টিকে ছিল'।
বুখারীর বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে আটটি তরবারীর কথা। নবী করীম (সা:) হযরত খালিদ (রা:) এর উপাধি দান করেছিলেন, সাইফুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর তরবারী। তিনি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে যেমন ছিলেন ইসলামের কট্টর শত্রু, তেমনি ইসলাম গ্রহণ করার পরে হয়েছিলেন ইসলামের পরম বন্ধু। (উসুদুল গাবা, দ্বিতীয় খণ্ড, ৯৪, রিজানুল হাওলার রাসুল, পৃষ্ঠা নং-২৮৬-২৮৭, আল ইসাবা, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৪১৩)
হযরত জাফর (রা:) এর গোটা দেহ অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছিল। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা:) বলেন, 'আমি তাঁর শরীরে তরবারী এবং বর্শার ৯০টি আঘাত দেখেছি। সকল আঘাতগুলো ছিল সামনের দিকে'।
এই যুদ্ধের ময়দানের সংবাদ নবী করীম (সা:) কে মদীনাতেই ফেরেশতার মাধ্যমে দেয়া হচ্ছিলো। কে কখন শাহাদাত বরণ করছেন, নবী করীম (সা:) সে সংবাদ অবগত হয়ে তাঁর সাহাবায়ে কেরামকে শোনাচ্ছিলেন। হাদীসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, নবী করীম (সা:) এর সামনে যেন মৃতার প্রান্তর তুলে ধরা হয়েছিল। যুদ্ধের দৃশ্য দেখে দেখে তিনি বর্ণনা করছিলেন। যুদ্ধের ময়দানের সংবাদ নিয়ে এসেছিলেন হযরত ইয়ালী ইবনে মাম্বাহ (রা:)। তিনি সংবাদ বলার আগেই নবী করীম (সা:) বলেছিলেন, 'তুমিই সংবাদ বলবে না আমি তোমাকে শোনাবো?'
সংবাদ আনয়নকারী সাহাবী আল্লাহর রাসূল (সা:) এর পবিত্র মুখ থেকে যুদ্ধের ঘটনা শুনে বললেন, 'আল্লাহর শপথ! আপনি বাড়িয়েও বলেননি কিছু কমও বলেননি'।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা:) শাহাদাতবরণ করার পরে মুসলিম বাহিনীর ভেতরে কিছুটা বিশৃংখল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এ কারণে কিছু সংখ্যক সৈন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে মদীনায় চলে এসেছিল। মদীনাবাসী তাদেরকে ময়দান ত্যাগ করে চলে আসার জন্য লজ্জিত করেছিল। নবী করীম (সা:) আরো সৈন্য সংগ্রহ করে মৃতার প্রান্তরে মুসলিম বাহিনীর সাহায্যে প্রেরণ করেছিলেন।
যুদ্ধের প্রথম দিনে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করা হলো। হযরত খালিদ (রা:) নতুন এক কৌশলে পরের দিন সৈন্য সমাবেশ করেছিলেন। তাঁর এই কৌশলের কারণে রোমক বাহিনী ধারণা করেছিল, মদীনা থেকে বহু সৈন্য মুসলমানদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। ফলে তাদের মনে ভীতি সঞ্চার হয়ে তারা ময়দান ত্যাগ করে পালিয়েছিল। হযরত খালিদ (রা:) প্রচুর গণীমতের সম্পদসহ যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে মদীনায় আগমন করেছিলেন।
যারা ময়দান ত্যাগ করে মদীনায় চলে এসেছিল, তাদের সম্পর্কে নবী করীম (সা:) বলেছিলেন, 'এরা পলাতক নয়, আল্লাহ তা'য়ালার ইচ্ছায় এরা পুনরায় যুদ্ধে যোগদান করবে'। (বুখারী)
কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই মৃতার যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয় ঘটেছিল। কিন্তু এই বর্ণনা ঠিক নয়। কারণ, যে সময় মৃতার প্রান্তরে যুদ্ধ চলছে, সে সময় নবী করীম (সা:) ওহীর মাধ্যমে অবগত হয়ে বলেছিলেন, 'আল্লাহ তা'য়ালার তরবারী খালিদ এই মাত্র মুসলিম বাহিনীর পতাকা ধারণ করেছে, আল্লাহ তা'য়ালা মুসলিম বাহিনীকে শত্রুর ওপর বিজয় দান করেছেন'। (বুখারী)