📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদার সীমা অতিক্রম না করা
মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর সকল সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে সর্বাধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন। মানুষের মধ্যে সকল নবী-রাসূলকে সর্বাধিক মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে এবং সকল নবী-রাসূলের মধ্যে নবী করীম (সা:) কে সবথেকে বেশি মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে এ বিষয়ে আমরা এ ক্ষুদ্র পরিসরে পবিত্র কুরআন ও হাদীস থেকে সাধ্যানুযায়ী আলোচনা করেছি। পবিত্র কুরআন থেকে আমরা এ কথাও আলোচনা করেছি যে, নবী করীম (সা:) কে সৃষ্টি করেছেন মহান আল্লাহ তা'য়ালা এবং সৃষ্টি কোনোক্রমেই স্রষ্টার সমতুল্য হতে পারে না। স্বয়ং স্রষ্টার যে মর্যাদা ও আসন, সে মর্যাদায় কোনো সৃষ্টি কক্ষণোই উন্নীত হতে পারে না।
নবী ও রাসূলগণ কোন্ ধরনের সৃষ্টি ছিলেন এবং তাঁরা মানব জাতির বাইরে কোনো সৃষ্টি ছিলেন না, এ কথা পবিত্র কুরআনে একাধিকবার ঘোষণা করা হয়েছে। তবে তাঁরা অবশ্যই আমাদের মতো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তাঁদেরকে পরিচালনা করা হতো এবং তাঁদের কাছে প্রয়োজন অনুসারে ফিরিশতা প্রেরণ করা হতো। এক শ্রেণীর মানুষ ধারণা করতো, কোনো মানুষ কখনোই নবী-রাসূল হতে পারে না এবং তাঁরা মানুষের ন্যায় আচরণও করতে পারেন না। নবী-রাসূলকে হতে হবে অবশ্যই বিশেষ কোনো সৃষ্টি এবং তাঁরা হবেন মানব জাতির বাইরের কোনো সৃষ্টি বিশেষ। এ কারণে প্রেরিত নবী- রাসূল সম্পর্কে তাঁরা নানা ধরনের অযৌক্তিক ও উদ্ভট প্রশ্ন তুলেছে এবং আল্লাহ তা'য়ালা তাদেরকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, 'মানুষদের মধ্য থেকেই নবী-রাসূল নির্বাচিত করা হয়েছে, তিনিও মানুষ এবং নবুওয়্যাত-রিসালাতের জন্য আমি যাকে খুশী তাকেই নির্বাচিত করি'।
মানুষ নবী-রাসূল হতে পারে এ বিষয়টি পথভ্রষ্ট লোকদের কাছে বিস্ময়ের উদ্রেক করেছে এবং এ কারণেই তারা নবী-রাসূলদের সম্পর্কে অযৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছে। হযরত নূহ (আ:) যখন ইসলামী আন্দোলনের সূচনা করে মানুষকে মহান আল্লাহ তা'য়ালার দাসত্বের দিকে আহ্বান জানালেন তখন জাতির পথভ্রষ্ট নেতারা সমকালীন জনগণকে বলেছিলো-
فَقَالَ الْمَلَوُا الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَوْمِهِ مَا هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ لَا يُرِيدُ أَنْ يَتَفَضَّلَ عَلَيْكُمْ ط وَلَوْ شَاءَ اللهُ لأَنْزَلَ مَلَئِكَةٌ ج مَّا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي آبَائِنَا الْأَوَّلِينَ
তখন তার জাতির নেতারা, যারা (আগে থেকেই) কুফরী করছিলো- (এ কথা শুনে অন্যদের) বললো, এ (ব্যক্তি) তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ, (আসলে) এ ব্যক্তি তোমাদের ওপর নেতৃত্ব করতে চায়; আল্লাহ তা'য়ালা যদি (নবী পাঠাতেই) চাইতেন তাহলে ফিরিশতাদেরই (নবী করে) পাঠাতেন, আমরা তো এমন কোনো কথা আমাদের পূর্বপুরুষদের যামানায়ও (ঘটেছে বলে) শুনিনি। (সূরা মুমিনুন- ২৪)
হযরত নূহ (আ:) এর পরে আবার যাঁকে নবী-রাসূল হিসাবে প্রেরণ করা হয়েছিলো এবং তিনি যখন মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানালেন, তখন সমকালীন পথভ্রষ্ট নেতারা প্রশ্ন তুললো মানুষ কি কখনো নবী হতে পারে? তাদের অবস্থা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন-
وَقَالَ الْمَلَأُ مِنْ قَوْمِهِ الَّذِيْنَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِلِقَاءِ الْآخِرَةِ وَأَتْرَفْنَاهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لَا مَا هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ لَا يَأْكُلُ مِمَّا تَأْكُلُوْنَ مِنْهُ وَيَشْرَبُ مِمَّا تَشْرَبُوْنَ ص لَا وَلَئِنْ أَطَعْتُمْ بَشَرًا مِّثْلَكُمْ إِنَّكُمْ إِذًا لَّخَاسِرُوْنَ لَا
(নবীর কথা শুনে) তার জাতির নেতৃস্থানীয় লোকজন, যারা আল্লাহকে অস্বীকার করেছে, মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে পরকালে আল্লাহ তা'য়ালার সাথে সাক্ষাতের বিষয়টিকে, (সর্বোপরি) যাদের আমি দুনিয়ার জীবনে প্রচুর ভোগ সামগ্রী দিয়ে রেখেছিলাম, তারা (অন্য লোকদের) বললো, এ ব্যক্তিটি তোমাদের মতো মানুষ ছাড়া অন্য কিছু নয়, তোমরা যা খাও সেও তা খায়, তোমরা যা কিছু পান করো সেও তা পান করে, (এমতাবস্থায়) তোমরা যদি তোমাদেরই মতো একজন মানুষকে (নবী মনে করে তার কথা) মেনে চলো; তাহলে তোমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (সূরা মুমিনুন- ৩৩-৩৪)
মানুষকে পথ দেখানোর জন্য মানুষই প্রয়োজন এবং মানুষের অনুভূতি অনুভব করার জন্য অনুরূপ মানুষই প্রয়োজন। এ কারণে পথভ্রষ্ট লোকদের প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ তা'য়ালা জানিয়ে দিয়েছেন-
قُل لَّوْ كَانَ فِي الْأَرْضِ مَلَئِكَةٌ يَمْشُوْنَ مُطْمَئِنِّيْنَ لَنَزَّلْنَا عَلَيْهِم مِّنَ السَّمَاءِ مَلَكًا رَّسُوْلاً -
(হে নবী,) আপনি (তাদের) বলে দিন, (যদি এ) যমীনে ফিরিশতারাই (বসবাস করতো এবং তারা এখানে) নিশ্চিন্তভাবে ঘুরে বেড়াতো, তাহলে অবশ্যই আমি তাদের জন্যে আসমান থেকে কোনো ফিরিশতাকেই নবী করে পাঠাতাম। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৯৫)
এ সম্পর্কে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে বহু সংখ্যক স্থানে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে জানিয়েছেন-
وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ إِلَّا رِجَالاً تُوْحِي إِلَيْهِمْ فَاسْتَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ - وَمَا جَعَلْنَاهُمْ جَسَدًا لا يَأْكُلُوْنَ الطَّعَامَ وَمَا كَانُوْا خَالِدِينَ
আপনার পূর্বে আমি মানুষকেই (সব সময় নবী বানিয়ে) তাদের কাছে পাঠিয়েছি, তোমরা যদি (বিষয়টি) না জানো তাহলে (আগের) কিতাবওয়ালাদের কাছে জিজ্ঞেস করো। আমি তাদের এমন সব দেহাবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করিনি যে, তারা খেতে পারতো না, (তা ছাড়া) তারা কেউ (এ দুনিয়ায়) চিরস্থায়ী হয়েও থাকেনি! (সূরা আল আম্বিয়া-৭-৮)
নবী করীম (সা:) কে যে ভূখণ্ডে প্রেরণ করা হয়েছিলো সেখানে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা বর্তমান ছিলো এবং তাদের কাছে বিকৃত অবস্থায় পূর্বে অবতীর্ণ করা আসমানী কিতাবও ছিলো। সে কিতাবে নবী-রাসূলদের মানুষ হওয়া বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিলো বিধায় আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর রাসূলকে জানিয়ে দিলেন, 'যারা আপনার মানুষ হওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন তুলছে তাদেরকে বলুন, পূর্বে যাদের নবী-রাসূল নির্বাচিত করে তাদের প্রতি যেসকল কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে, তারাও তো মানুষই ছিলেন এবং বিষয়টি কিতাবে উল্লেখ রয়েছে'।
নবী-রাসূলগণ মানুষ ছিলেন এবং মানুষকে যে সকল বৈশিষ্ট মণ্ডিত করা হয়েছে সেসকল বৈশিষ্ট্য তাঁদের মধ্যেও বিদ্যমান ছিলো। তবে মানবীয় গুণ-বৈশিষ্ট প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাঁরা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের নীতি অবলম্বন করতেন না। তাঁরা মহান আল্লাহর নির্দেশিত পথে ও ক্ষেত্রে তাদের মানবীয় গুণ-বৈশিষ্ট, আবেগ-উচ্ছাস, দুঃখ- বেদনা, কামনা-বাসনা, ইচ্ছা- অনিচ্ছা, শক্তি-বীরত্ব ইত্যাদি প্রয়োগ ও প্রকাশ করতেন। তাঁরা সংসার জীবনে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়- স্বজন, প্রতিবেশী এবং সাধারণ মানুষের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করেছেন। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِّنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجًا وَذُرِّيَّةً طَ
(হে নবী,) আপনার পূর্বেও আমি (অনেক) রাসূল পাঠিয়েছি এবং তাদের জন্যে আমি স্ত্রী এবং সন্তান সন্ততিও বানিয়েছিলাম। (সূরা আর রা'দ- ৩৮)
সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে যাঁকে সর্বাধিক মর্যাদায় মহান আল্লাহ ভূষিত করেছেন, যিনি আল্লাহ তা'য়ালার কাছে সর্বাধিক প্রিয়, অযত্ন ও অবহেলাভরে যাঁর নাম উচ্চারণ করাও নিষেধ এবং করলে আল্লাহ তা'য়ালা নারাজ হন, জীবিত থাকাকালে যাঁর সম্মুখে উচ্চকণ্ঠে কথা বলা ছিলো নিষেধ এবং ইন্তেকালের পরও যাঁর রাওজা মুবারকের আশেপাশে উচ্চস্বরে কথা বলা নিষেধ, তাঁকেও মহান আল্লাহ তা'য়ালা মানবীয় বৈশিষ্ট দিয়ে মানুষ হিসাবেই সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর সম্পর্কে সমকালীন পথভ্রষ্ট লোকজন যখন প্রশ্ন তুললো-
وَقَالُوا مَالِ هَذَا الرَّسُوْلِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ وَيَمْشِي فِي الْأَسْوَاقِ طَ لَوْلَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مَلَكُ فَيَكُونَ مَعَه نَذِيرًا -
ওরা বলে, এ আবার কেমন (ধরনের) রাসূল যে (আমাদের মতো করেই) খাবার খায় এবং (আমাদের মতোই) হাটে বাজারে চলাফেরা করে? (সূরা ফুরকান- ৭)
এসব উদ্ভট প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্য মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রিয় হাবীবকে বলতে বললেন-
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوْحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا ع
(হে নবী,) আপনি (এদের) বলুন, আমি তো তোমাদের মতোই একজন (রক্ত মাংসের) মানুষ, তবে আমার ওপর ওহী অবতীর্ণ হয় (আর সে ওহীর মূল কথা হচ্ছে), তোমাদের মা'বুদ হচ্ছেন একজন, অতএব তোমাদের মাঝে যদি কেউ তার মালিকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন (সর্বদা) সৎ কাজ করে, সে যেন কখনো তার মালিকের দাসত্ব করতে গিয়ে অন্য কাউকে শরীক না করে। (সূরা আল কাহাফ- ১১০)
আল্লাহ তা'য়ালা স্বয়ং তাঁর নবীকে বলছেন, 'আপনি সকলকে জানিয়ে দিন, আমি তোমাদেরই অনুরূপ একজন মানুষ'। নবী করীম (সা:) মানুষ ছিলেন এ কথা অবশ্যই সত্য তবে তিনি ছিলেন অসাধারণ মানুষ। মানব তবে সাধারণ মানব নন, মহামানব। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তিনি অতিমানব ছিলেন না বা মানবীয় গুণ-বৈশিষ্টের সীমার বাইরেরও কিছু ছিলেন না।
কিন্তু এ কথা সুস্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে এবং তাঁর সম্পর্কে আলোচনার ক্ষেত্রে কথায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে যে, তিনি মানুষ ছিলেন তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। আমরা যে কোনো ধরনের কর্মকাণ্ড করতে পারি, যে কোনো ধরনের পাপের কাজে জড়িত হতে পারি। মুখে যে কোনো কথা উচ্চারণ করতে পারি। আমাদের চিন্তা-চেতনা, আবেগ-উচ্ছাস, দুঃখ-যন্ত্রণা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, কামনা-বাসনা, শক্তি-বীরত্ব ইত্যাদি যে কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারি। আমরা তাড়িত হই আমাদের চিন্তাধারা দিয়ে এবং সকল ক্ষেত্রে ভুল করতে পারি। আমরা যে কোনো মুহূর্তে আল্লাহ তা'য়ালার নির্দেশিত সীমা অতিক্রম করে পাপে জড়িত হতে পারি। আমরা নিদ্রা অবস্থায় পৃথিবীর সকল অনুভূতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই, জাগ্রত অবস্থায় দৃষ্টির বাইরের কিছুই দেখি না।
কিন্তু নবী করীম (সা:) এ সকল কিছুর ঊর্ধ্বে ছিলেন। তিনি নবুয়্যাত লাভ করার পূর্বেও সামান্যতম পাপের কাজে কখনো জড়িত হননি এবং নবুয়্যাত লাভ করার পরে তো প্রশ্নই উঠে না। তাঁর নিদ্রা অবস্থাতেও আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে অনুভূতিহীন করেননি এবং দৃষ্টির বাইরের সকল কিছুই আল্লাহ তাঁকে প্রয়োজন অনুযায়ী দেখা ও অনুভব করার শক্তি দান করেছিলেন। মানবীয় সকল গুণ-বৈশিষ্ট তিনি মহান আল্লাহ তা'য়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের পথে ও ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন। সার্বক্ষণিকভাবে মহান মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে আপন হেফাজতের চাদরে আবৃত রেখেছেন।
নবী করীম (সা:) কে মানুষ বলা যাবে না, তিনি মৃত্যুবরণ করেননি বরং কায়া পরিবর্তন করেছেন, তিনি অতি মানব ছিলেন বা নূরের তৈরী ছিলেন। তিনি আপন শক্তিবলে অদৃশ্যের সংবাদ জানতেন, তিনি নিজস্ব শক্তিবলে যা খুশী তাই করতে পারতেন, অন্যের ভাগ্য পরিবর্তন করার ক্ষমতা তাঁর ছিলো, ইন্তেকালের পরও তাঁর উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত হন, এ সকল ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস শুধু কুরআন-হাদীসের বিপরীতই নয়, স্বয়ং নবী করীম (সা:) এর মর্যাদার সাথে চরমভাবে সাংঘর্ষিক।
নবী করীম (সা:) এর মর্যাদা নিরুপণ করতে হবে কুরআন ও হাদীস দিয়ে, আবেগ-উচ্ছ্বাস ও প্রেম-ভালোবাসার ওপর নির্ভর করে তাঁর মর্যাদা নিরুপণ করা যাবে না। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাঁরা তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করেন, কথা-বার্তায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং কুরআন ও হাদীসে তাঁর সম্পর্কে যে সীমারেখা অঙ্কন করা হয়েছে, তা অতিক্রম করা যাবে না। আবেগ- উচ্ছ্বাস, ভক্তি-ভালোবাসার আতিশয্যে নবী করীম (সা:) সম্পর্কে এমন কোনো কথা মুখে উচ্চারণ দূরে থাক চিন্তার জগতেও স্থান দেয়া যাবে না, যা শুধুমাত্র মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা সম্পর্কেই প্রযোজ্য।
📄 সকল নবীর চাওয়া-পাওয়া ছিলো কেবলমাত্র আল্লাহর কাছে
এ পৃথিবীতে মহান আল্লাহ সকল সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে সর্বাধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন এবং মানুষের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন নবী-রাসূলদের। সকল নবী-রাসূলদের মধ্যে কাউকে কাউকে আল্লাহ তা'য়ালা বিশেষ মর্যাদা দানে ধন্য করেছেন। নবী-রাসূলের সংখ্যা যতই হোক না কেনো, মর্যাদাবান নবী-রাসূলের কথা ওহীর মাধ্যমে আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে জানিয়েছেন এবং তাদের প্রসঙ্গ পবিত্র কুরআনে আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ যেনো নবী-রাসূলদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এ কারণেই আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে তাদের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন, (প্রকৃত কারণ মহান আল্লাহই ভালো জানেন) পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নবী-রাসূলের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, প্রত্যেক নবী রাসূলই পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন, বিপদ-আপদে নিপতিত হয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন এবং কাউকে বিরোধিরা হত্যা পর্যন্ত করেছে।
সাধারণ মানুষ ইসলামের বিধান অনুসারে নিজের জীবন পরিচালনা করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করবে এবং করতে পারবে বিধায় আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ মহান আল্লাহর নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে কোনোক্রমেই নবী-রাসূলের মর্যাদায় নিজেকে উন্নীত করতে পারবে না। নবী-রাসূলদের যে মর্যাদা ও ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছিলো, তার কোটি ভাগের এক ভাগও অর্জন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, নবী-রাসূলগণের যেসকল সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন, তাদের পবিত্র পায়ের ধূলির সমমর্যাদা অর্জনও সম্ভব নয়। নবী করীম (সা:) বলেছেন, 'সমগ্র পৃথিবীর মুসলমানদের দানের মর্যাদা আমার মদীনার আনসারদের এক মুষ্ঠি দানের মর্যাদাও অর্জন করতে পারবে না'। (বুখারী)
সুতরাং মর্যাদার দিক থেকে নবী-রাসূলগণ এবং সাহাবায়ে কেরাম সকল মানুষ, মুমিন, মুসলিম ও মহান আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনকারী (আউলিয়া নামে পরিচিত) লোকদের তুলনায় উত্তম। আবার সকল নবী-রাসূলদের মধ্যে নবী করীম (সা:) এর মর্যাদা সর্বাধিক। এখন আমরা পবিত্র কুরআন ও হাদীস থেকে জানার চেষ্টা করবো সকল নবী-রাসূল ও তাঁদের সাহাবায়ে কেরাম সকল বিষয়ে কার দরবারে ধর্ণা দিয়েছেন।
পৃথিবীর প্রথম মানুষ, প্রথম নবী-রাসূল এবং প্রথম বিজ্ঞানী হযরত আদম (আ:) বিপদগ্রস্থ হয়ে কেবলমাত্র মহান আল্লাহর দরবারে ধর্ণা দিয়েছেন। ইবলিশ শয়তানের প্রতারণার জালে প্রতারিত হয়ে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে হযরত আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:) উভয়েই মহান মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীদের দরবারে ফরিয়াদ জানালেন-
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِنْ لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
হে আমাদের মালিক, আমরা আমাদের নিজেদের ওপর জুলুম করেছি, তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না করো তাহলে অবশ্যই আমরা চরম ক্ষতিগ্রস্তদের দলে শামিল হয়ে যাবো। (সূরা আল আ'রাফ-২৩)
পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ:) তাঁর এই আবেদনের মাধ্যমে পৃথিবীর অনাগত মানুষকে শিক্ষা দিলেন, সকল প্রয়োজনে কেবলমাত্র মহান আল্লাহর দরবারেই আবেদন করতে হবে। হযরত নূহ্ (আ:), যাঁকে অনেকেই বলে থাকেন 'ছানায়ে আদম' অর্থাৎ দ্বিতীয় আদম। এ কথা বলার কারণ হলো, মহাপ্লাবনের পর হযরত নূহ্ (আ:) থেকেই মানব বংশের বিস্তার ঘটেছে। তিনি তাঁর অবাধ্য জাতিকে সত্য পথে আনার লক্ষ্যে সকল প্রকার পন্থা অবলম্বন করার পরেও সে জাতি যখন মহান আল্লাহর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করলো না বরং আল্লাহর নবী হযরত নূহ (আ:) এর প্রতি অত্যাচারের মাত্রা বৃদ্ধিই করে চললো, তখন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সে জাতিকে ধ্বংস করে দেয়ার ফায়সালা এসে গেলো। তিনি মহান আল্লাহর কাছে আবেদন জানালেন-
وَقَالَ نُوْحٌ رَّبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا - إِنَّكَ إِنْ تَذَرْهُمْ يُضِلُّوا عِبَادَكَ وَلَا يَلِدُوا إِلَّا فَاجِرًا كَفَّارًا - رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَنْ دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ طَ وَلَا تَزِدِ الظَّالِمِينَ إِلَّا تَبَارَاعِ
নূহ্ বললো, হে আমার মালিক, এ যমীনের অধিবাসী (জালিমদের) একজন (গৃহবাসী)-কেও তুমি (আজ শাস্তি থেকে) রেহাই দিয়ো না, (আজ) যদি তুমি এদের (শাস্তি থেকে) অব্যাহতি দাও, তাহলে এরা (পুনরায়) তোমার বান্দাদের পথভ্রষ্ট করে দিবে (শুধু তাই নয়), এরা (ভবিষ্যতেও) দুরাচার পাপী কাফির ছাড়া কাউকেই জন্ম দিবে না। হে আমার প্রতিপালক, তুমি আমাকে, আমার পিতামাতাকে- তোমার ওপর ঈমান এনে যারা আমার (সাথে ঈমানের এই) ঘরে আশ্রয় নিয়েছে, এমন সব ব্যক্তিদের এবং সব ঈমানদার পুরুষ ও মহিলাদের ক্ষমা করে দাও, জালিমদের জন্যে তুমি চূড়ান্ত ধ্বংস ছাড়া কিছুই তুমি বৃদ্ধি করো না। (সূরা নূহ- ২৬-২৮)
নিজ জাতির কল্যাণ অকল্যাণ করার কোনো ক্ষমতা হযরত নূহ্ (আ:) এর ছিলো না এবং একমাত্র মহান আল্লাহ ব্যতীত এ ক্ষমতা কারোই নেই। ঠিক এ কারণেই মহান নবী হযরত নূহ (আ:) যা কিছু আবেদন করা প্রয়োজন তা মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা সমীপেই করেছিলেন। মহান আল্লাহ তা'য়ালার করুণা, রহমত ও ক্ষমা ব্যতীত একজন নবী-রাসূলের পক্ষেও মুহূর্তকাল টিকে থাকা সম্ভব ছিলো না। নিজ সন্তানকে অথৈ পানিতে ডুবতে দেখে পিতা হিসাবে হযরত নূহ্ (আ:) এর অন্তর পিতৃস্নেহে বিগলিত হয়ে গেলো। পবিত্র কুরআন বর্ণনা করছে-
وَنَادَى نُوحٌ رَّبَّه فَقَالَ رَبِّ إِنَّ ابْنِي مِنْ أَهْلِى جِ وَإِنَّ وَعْدَكَ الْحَقُّ وَأَنتَ أَحْكَمُ الْحَاكِمِينَ
নূহ্ (তার ছেলেকে ডুবতে দেখে) তার মালিককে ডেকে বললো, হে আমার মালিক, আমার ছেলে তো আমারই পরিবারের এক সদস্য, (আমার আপনজনদের ব্যাপারে) তোমার ওয়াদা অবশ্যই সত্য, আর তুমিই হচ্ছো সর্বোচ্চ বিচারক। (সূরা হৃদ-৪৫)
ইসলামের বিপরীত দলের অন্তর্ভুক্ত নিজের ঔরসজাত সন্তানকে নিজের পরিবারের একজন বলে উল্লেখ করা মহান আল্লাহর পছন্দ হয়নি। হযরত নূহ (আ:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা স্পষ্টই জানিয়ে দিলেন-
قَالَ يَا نُوحُ إِنَّهُ لَيْسَ مِنْ أَهْلِكَ جِ إِنَّهُ عَمَلٌ غَيْرُ صَالِحٍ رَ فَلَا تَسْأَلْنِ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ طَ إِنِّي أَعِظُكَ أَنَّ تَكُوْنَ مِنَ الْجَاهِلِينَ
আল্লাহ তা'য়ালা বললেন, হে নূহ, সে তোমার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নয়, সে তো হলো এক অসৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তি, অতএব তোমার যে বিষয়ের জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে আমার কাছে তুমি কিছু চেয়ো না; আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, নিজেকে কোনো অবস্থায় জাহিলদের দলে শামিল করো না। (সূরা হূদ-৪৬)
নিজের অবস্থান উপলব্ধি করে হযরত নূহ্ (আ:) সাথে সাথে মহান মালিক আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন- قَالَ رَبِّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ طَ وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُنْ مِّنَ الْخَاسِرِينَ সে বললো, হে আমার মালিক, যে বিষয় সম্পর্কে আমার কোনো জ্ঞান নেই, সে ব্যাপারে কিছু চাওয়া থেকে আমি তোমার কাছে পানাহ্ চাই; তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না করো এবং আমার ওপর দয়া না করো, তাহলে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো। (সূরা হৃদ-৪৭)
নিজের সন্তানের কল্যাণ অকল্যাণ করার কোনো ক্ষমতাই হযরত নূহ্ (আ:) কে দেয়া হয়নি এবং সে ক্ষমতা কেবলমাত্র মহান আল্লাহরই নিয়ন্ত্রণে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- وَنُوحًا إِذْ نَادَى مِنْ قَبْلُ فَاسْتَجَبْنَا لَه فَنَجَّيْنَاهُ وَأَهْلَهُ مِنَ الْكَرْبِ الْعَظِيمِ جِ নূহ্ যখন আমাকে ডেকেছিলো, তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে ও তার পরিবার পরিজনদের আমি এক মহাসঙ্কট থেকে উদ্ধার করেছিলাম। (সূরা আল আম্বিয়া-৭৬)
আল্লাহর নবী হযরত হূদ (আ:) এর বিরুদ্ধে ইসলাম বিরোধী গোষ্ঠী ভয়ঙ্কর যড়যন্ত্র শুরু করলো। বিষয়টি অনুভব করে হযরত হূদ (আ:) তাদেরকে স্পষ্টই জানিয়ে দিলেন- إِنِّي تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ رَبِّي وَرَبِّكُم ط مَّا مِنْ دَابَّةٍ إِلَّا هُوَ آخِذُمٍ بِنَاصِيَتِهَا إِنَّ رَبِّي عَلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ আমি তো আল্লাহ তা'য়ালার ওপরই ভরসা করি, (যিনি) আমার মালিক, তোমাদেরও মালিক; বিচরণশীল এমন কোনো প্রাণী নেই যার নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতের মুঠোয় নয়; অবশ্যই আমার মালিক সঠিক পথের ওপর রয়েছেন। (সূরা হৃদ- ৫৬)
শত্রু পক্ষের অপতৎপরতা দেখে হযরত হূদ (আ:) পৃথিবীর কোনো শক্তির ওপর নির্ভর করেননি বা কোনো শক্তিধর মানুষের কাছেও সাহায্য চাননি। তিনি শত্রুপক্ষকে জানিয়ে দিলেন, 'তোমরা যা খুশী তাই করতে পারো, আমার ও তোমাদের যিনি মালিক আমি কেবলমাত্র তাঁরও ওপরই নির্ভর করি এবং তাঁর কাছেই সাহায্য কামনা করি'। হযরত সালেহ (আ:) নিজ জাতিকে মহান আল্লাহ তা'য়ালা কর্তৃক প্রেরিত ইসলামী জীবন ব্যবস্থা অনুসরণের জন্যে আহ্বান জানালেন। তাঁর জাতি তাঁকে ইসলামী বিধান ত্যাগ করে নিজের আবিষ্কৃত মতবাদ-মতাদর্শের অনুসরণ করার আহ্বান করলো। হযরত সালেহ (আ:) নিজ জাতিকে জানিয়ে দিলেন-
قَالَ يَا قَوْمِ أَرَأَيْتُمْ إِنْ كُنتُ عَلَى بَيِّنَةٌ مِّن رَّبِّي وَآتَانِيْ مِنْهُ رَحْمَةً فَمَنْ يَنْصُرُنِي مِنَ اللَّهِ إِنْ عَصَيْتُه فَمَا تَزِيْدُونَنِي غَيْرَ تَخْسِيرٍ -
সে বললো, হে আমার জাতি, তোমরা কি এ বিষয়টি নিয়ে একটুও চিন্তা করে দেখোনি যে, যদি আমি আমার মালিকের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট দলীলের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং তিনি যদি আমাকে তাঁর অনুগ্রহ দিয়ে (ধন্য করে) থাকেন, (তা সত্ত্বেও) যদি আমি কোনো গোনাহ্ করে বসি তাহলে কে এমন আছে, যে আল্লাহ তা'য়ালার মুকাবিলায় আমাকে সাহায্য করবে? (আসলে অন্যায় আবদার করে) তোমরা আমার ক্ষতির (পরিমাণই) শুধু বৃদ্ধি করছো? (সূরা হূদ-৬৩)
হযরত সালেহ্ (আ:) প্রকৃত সত্য তুলে ধরে এ কথা স্পষ্ট করে দিলেন যে, মহান আল্লাহ ব্যতীত কেউই কল্যাণ অকল্যাণ করার ক্ষমতা রাখে না এবং আল্লাহর গ্রেফতারীর মোকাবেলায় কেউই সাহায্য করতে পারে না। হযরত ইবরাহীম (আ:), মহান আল্লাহ তা'য়ালা যাঁকে মুসলিম মিল্লাতের পিতা হিসাবে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন। নিজ পিতাকে তিনি জানিয়ে দিলেন, 'আপনি যার গোলামী করছেন, নিজের আশা আকাঙ্খার কথা যার কাছে প্রকাশ করছেন, অকল্যাণ থেকে যার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছেন, আমি কিন্তু তা করি না'। সন্তানের মুখ থেকে এ কথা শুনে পিতা হুমকি প্রদর্শন করলো, 'আমি যার গোলামী করি তুমি যদি তাকে না মানো তাহলে আমি তোমাকে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করবো'। এবার ইবরাহীম (আ:) নিজ পিতাকে জানিয়ে দিলেন-
وَأَعْتَزِلُكُمْ وَمَا تَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ وَأَدْعُوا رَبِّيْ ۖ عَسَى أَلا أَكُوْنَ بِدُعَاءِ رَبِّيْ شَقِيًّا -
আমি তোমাদের কাছ থেকে পৃথক হয়ে যাচ্ছি এবং আল্লাহ তা'য়ালাকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের ডাকো তাদের সবার কাছ থেকে (পৃথক হয়ে যাচ্ছি), আমি তো আমার মালিককেই ডাকতে থাকবো, আশা (করি) আমার মালিককে ডেকে আমি কখনো ব্যর্থকাম হবো না। (সূরা মারইয়াম-৪৮)
মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) কেবলমাত্র আল্লাহ তা'য়ালাকেই ডেকেছেন এবং সকল আবেদনও তাঁর কাছেই করেছেন। পবিত্র কা'বা শরীফ নির্মাণকালে নিজেদের উদ্দেশ্য ও শ্রম কবুল করার জন্যে তাঁরা পিতা-পুত্র মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার কাছে আবেদন জানালেন- رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا طَ إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ হে আমাদের মালিক, (আমরা যে উদ্দেশ্যে এ ঘর নির্মাণ করেছি, তা) তুমি আমাদের কাছ থেকে কবুল করো, একমাত্র তুমিই সব কিছু জানো এবং সব কিছু শোনো। (সূরা বাকারা-১২৭)
হযরত ইবরাহীম (আ:) এবং তাঁর সন্তান হযরত ইসমাঈল (আ:) নিজেদের কল্যাণ কামনায় উভয়ে সম্মিলিতভাবে মহান মালিকের কাছে এভাবে দোয়া করেছেন- رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ صَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا طَ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
হে আমাদের মালিক, আমাদের উভয়কেই তুমি তোমার (অনুগত) মুসলিম বান্দা বানাও এবং আমাদের (পরবর্তী) বংশধরদের মাঝ থেকেও তুমি তোমার একদল অনুগত (বান্দা) বানিয়ে দাও, (হে আমাদের মালিক), তুমি আমাদের (তোমার দাসত্বের) আনুষ্ঠানিকতাসমূহ দেখিয়ে দাও এবং তুমি আমাদের ওপর দয়াপরবশ হও, কারণ তুমি অত্যন্ত দয়াপরবশ ও পরম দয়ালু। (সূরা বাকারা-১২৮)
কোনো নবী-রাসূলই শান্তি ও নিরাপত্তা দেয়ার অধিকারী ছিলেন না, বরং তাঁরাই মহান আল্লাহ তা'য়ালার কাছে নিরাপত্তার জন্যে আবেদন করেছেন- وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ آمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَنْ تَعْبُدَ الْأَصْنَامَ (স্মরণ করো), যখন ইবরাহীম (আল্লাহর কাছে) দোয়া করলো, হে আমার মালিক, এ (মক্কা) শহরকে (শান্তি ও) নিরাপত্তার শহরে পরিণত করো এবং আমাকে ও আমার সন্ত ান সন্ততিদের মূর্তিপূজা করা থেকে দূরে রেখো। (সূরা ইবরাহীম-৩৫)
অনুর্বর ভূমিকে উর্বর করার ক্ষমতা, রিযকের ব্যবস্থা করা এবং মানুষের হৃদয়কে পরিবর্তন করার ক্ষমতা কেবলমাত্র মহান আল্লাহর। হযরত ইবরাহীম (আ:) মহান আল্লাহর কাছে এভাবে আবেদন করেছেন- رَبَّنَا إِنِّي أَسْكَنتُ مِنْ ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِندَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ لَا رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُمْ مِّنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ -
হে আমাদের মালিক, আমি আমার কিছু সন্তানকে তোমার পবিত্র ঘরের কাছে একটি অনুর্বর উপত্যকায় এনে আবাদ করলাম, যাতে করে-হে আমাদের মালিক, এরা নামায প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তুমি (তোমার দয়ায়) এমন ব্যবস্থা করো যেনো মানুষদের অন্তর এদের দিকে অনুরাগী হয়, তুমি ফলমূল দিয়ে তাদের রিযকের ব্যবস্থা করো, যাতে ওরা তোমার (নিয়ামতের) শোকর আদায় করতে পারে। (সূরা ইবরাহীম-৩৭)
সন্তান দেয়ার মালিক মহান আল্লাহ তা'য়ালা, প্রার্থনা কবুল করার মালিকও মহান আল্লাহ তা'য়ালা এবং কিয়ামতের ময়দানে মুসিবতের দিনে সাহায্যও করতে পারেন কেবলমাত্র মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। কোনো পীর বা বুযুর্গ নিজেদের অনুসারীদের বাঁচানো দূরে থাক, নবী-রাসূলও নিজেদের পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন বা নিজের অনুসারীদের কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহ তা'য়ালার গ্রেফতারী থেকে বাঁচাতে পারবেন না। আল্লাহ তা'য়ালা একান্ত অনুগ্রহ করে যদি কাউকে এ অধিকার দান করেন তাহলে সে কথা স্বতন্ত্র। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) মহান মালিক আল্লাহর কাছে এভাবে আবেদন জানিয়েছেন-
رَبَّنَا إِنَّكَ تَعْلَمُ مَا تُخْفِي وَمَا نُعْلِنُ ط وَمَا يَخْفَى عَلَى اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَهَبَ لِي عَلَى الْكِبَرِ إِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَقَ طَ إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ الدُّعَاءِ - رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي فِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ - رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُوْمُ الْحِسَابُ
হে আমাদের মালিক, আমরা যা কিছু গোপন করি এবং যা কিছু প্রকাশ করি, নিশ্চয়ই তুমি তা সব জানো; আসমানসমূহে কিংবা যমীনের (যেখানে যা কিছু ঘটে এর) কোনোটাই আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না। সব প্রশংসা আল্লাহ তা'য়ালার জন্যে, যিনি আমাকে আর (এ) বৃদ্ধ বয়সে ইসমাঈল ও ইসহাক (তুল্য দুটো নেক সন্তান) দান করেছেন; অবশ্যই আমার মালিক (তাঁর বান্দাদের) দোয়া শোনেন। হে আমার মালিক, তুমি আমাকে নামায প্রতিষ্ঠাকারী বানাও, আমার সন্তানদের মাঝ থেকেও (নামাযী বান্দা বানাও), হে আমাদের মালিক, আমার দোয়া তুমি কবুল করো। হে আমাদের মালিক, যেদিন (চূড়ান্ত) হিসাব কিতাব হবে, সেদিন তুমি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সকল ঈমানদার মানুষদের (তোমার অনুগ্রহ দ্বারা) ক্ষমা করে দিয়ো। (সূরা ইবরাহীম- ৩৮-৪১)
রোগাক্রান্ত হলে, বিপদে নিপতীত হয়ে বা মনের আশা পূরণের জন্যে একশ্রেণীর মানুষ পীর, বুযুর্গ বা মৃত কোনো মানুষের কবরে গিয়ে প্রার্থনা করে। কেউ কেউ মনে করে অমুক মাজারে মানত করলে জ্ঞান বিবেক-বুদ্ধি বৃদ্ধি পাবে বা পরীক্ষায় সফল হওয়া যাবে। আবার কেউ মনে করে অমুক পীর সাহেব কিয়ামতের দিন আমাকে উদ্ধার করবেন। অথচ দেখুন নবী-রাসূলগণের সীরাত কি ছিলো এবং তাঁরা কোন্ মহাশক্তির কাছে আবেদন করেছেন। হযরত ইবরাহীম (আ:) মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা সম্পর্কে কী বলছেন এবং কিভাবে আবেদন করছেন দেখুন-
الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِيْنِ لا وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِيْنَا وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِيْنِ ص وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينِ لا وَالَّذِي أَطْمَعُ أَنْ يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ طَ رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِيْنَ لَا
তিনি আমাকে পয়দা করেছেন, অতঃপর তিনিই আমাকে (অন্ধকারে) চলার পথ দেখিয়েছেন, তিনিই আমাকে আহার্য দেন, তিনিই (আমার) পানীয় সরবরাহ করেন, আর আমি যখন রোগাক্রান্ত হই তখন তিনিই আমাকে রোগমুক্ত করেন, তিনিই আমার মৃত্যু ঘটাবেন, তিনিই আমাকে আবার (নতুন) জীবন দিবেন, শেষ বিচারের দিন তাঁর কাছ থেকে আমি এ আশা করবো, তিনি আমার গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। (অত:পর ইবরাহীম দোয়া করলো,) হে আমার মালিক, তুমি আমাকে জ্ঞান দান করো এবং আমাকে নেককার মানুষদের সাথে মিলিয়ে রেখো। (সূরা আশ শুয়ারা-৭৮-৮৩)
নিজের কল্যাণ ও অকল্যাণ করার কোনো ক্ষমতা নবী-রাসূলেরই ছিলো না, তাঁরা সকলেই ছিলেন মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার মুখাপেক্ষী। হযরত ইবরাহীম (আ:)- কে যখন শত্রুপক্ষ প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করলো সে আগুনের প্রতি আল্লাহ তা'য়ালা নির্দেশ দিলেন-
قُلْنَا يَا نَارُ كُوْنِي بَرْدًا وَسَلَمًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ لَا
আমি (আগুনকে) বললাম, হে আগুন, তুমি ইবরাহীমের জন্যে শীতল ও শান্তিময় হয়ে যাও। (সূরা আল আম্বিয়া-৬৯)
নবী-রাসূলগণ নিজ আত্মীয়-স্বজন, অনুসারী ও সমকালীন সকল লোকদের কাছে এ কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাদের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই এবং মহান মালিক আল্লাহর গ্রেফতারী থেকে রক্ষা করার অধিকার তাদের নেই। ইবরাহীম (আ:) নিজ পিতাকে বললেন-
لأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ وَمَا أَمْلِكُ لَكَ مِنَ اللَّهِ مِنْ شَيْ طَ رَبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ -
আমি তোমার জন্যে (আল্লাহর দরবারে) অবশ্যই ক্ষমা প্রার্থনা করবো, অবশ্য আল্লাহর কাছে থেকে (ক্ষমা আদায় করার) আমার কোনোই ইখতিয়ার নেই, (ইবরাহীম ও তার অনুসারীরা বললো,) হে আমাদের মালিক, আমরা তো কেবল তোমার ওপর ভরসা করেছি এবং আমরা তোমার দিকেই ফিরে এসেছি এবং (আমাদের) তো তোমার দিকেই ফিরে যেতে হবে। (সূরা আল মুমতাহানা-৪)
নবী-রাসূলগণ জালিমের জুলুম থেকে নিজেদের হেফাজত করতে পারতেন না, বরং তাঁরা মহান মালিকের কাছে বিপদমুক্ত থাকার জন্যে আবেদন করেছেন। হযরত ইবরাহীম ও তাঁর অনুসারীগণ আল্লাহর কাছে এভাবে আবেদন করেছেন-
رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلَّذِيْنَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا جِ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
হে আমাদের মালিক, তুমি আমাদের (জীবনকে) কাফিরদের নিপীড়নের নিশানা বানিয়ো না, হে আমাদের মালিক, তুমি আমাদের গোনাহ্ খাতা ক্ষমা করে দাও, অবশ্যই তুমি পরাক্রমশালী ও পরম কুশলী। (সূরা আল মুমতাহানা-৫)
হযরত লূত (আ:) এর জাতি মহান আল্লাহর গযবে নিপতীত হবার মতো গর্হিত কর্মে লিপ্ত ছিলো এবং তাদের ওপর যখন গযব নেমে এলো সে গযব থেকে মুক্ত থাকার কোনো ক্ষমতাই তাঁর ছিলো না। আল্লাহ তা'য়ালা একান্ত অনুগ্রহ করে তাঁকে হেফাজত করেছিলেন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَلُوْطًا آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ تَعْمَلُ الْخَبَائِثَ طَ إِنَّهُمْ كَانُوْا قَوْمَ سَوْءٍ فَاسِقِينَ لَا
আমি দূতকেও প্রজ্ঞা দান করেছিলাম, তাকেও আমি এমন একটি জনপদ থেকে উদ্ধার করে এনেছি যার অধিবাসীরা অশ্লীল কাজ করতো; সত্যিই তারা ছিলো জঘন্য বদ ও গোনাহ্গার জাতি। (সূরা আল আম্বিয়া-৭৪)
পাহাড়-পর্বত ও পাখ-পাখালী হযরত দাউদ (আ:) এর অনুগত ছিলো কিন্তু এসব কিছুকে নিজের অনুগত রাখার কোনো ক্ষমতা তাঁর ছিলো না। আল্লাহ তা'য়ালা একান্ত অনুগ্রহ করে এসব ক্ষমতা তাঁকে দান করেছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন-
فَفَهَّمْنَاهَا سُلَيْمَانَ جِ وَكُلاً آتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا رَ وَّسَخَّرْنَا مَعَ دَاوِدَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَالطَّيْرَ طَ وَكُنَّا فَاعِلِينَ
আমি পাহাড়-পর্বত এবং পাখ-পাখালীকেও দাউদের অনুগত করে দিয়েছিলাম যেনো তারাও (তার সাথে) আল্লাহ তা'য়ালার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে পারে; আর আমিই (এসব কিছু) ঘটাচ্ছিলাম। (সূরা আল আম্বিয়া-৭৯)
তিনি হাতের সাহায্যে লোহার মতো কঠিন ধাতব পদার্থ গলিয়ে লৌহজাত দ্রব্য নির্মাণ করতে পারতেন। এ ক্ষমতাও তাঁকে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা দান করেছিলেন-
وَلَقَدْ آتَيْنَا دَاوُدَ مِنَّا فَضْلاً ط يَا جِبَالُ أَوِّبِي مَعَهُ وَالطَّيْرَجِ وَأَلَنَّا لَهُ الْحَدِيْدَلَا أَنِ اعْمَلْ سَابِغَاتٍ وَقَدَّرْ فِي السَّرْدِ وَاعْمَلُوا صَالِحًاطَ إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيْرٌ -
আমি দাউদকে আমার কাছ থেকে (অনেকগুলো) অনুগ্রহ দান করেছিলাম; (এমনকি আমি পাহাড়কেও এই বলে আদেশ দিয়েছিলাম,) হে পর্বতমালা, তোমরাও তার সাথে আমার তাসবীহ পাঠ করো, (একই আদেশ আমি) পাখীকুলকেও দিয়েছিলাম, আমি তার জন্যে লোহাকে নরম করে দিয়েছিলাম, (তাকে আমি বলেছিলাম, সে বিগলিত লোহা দ্বারা) তুমি পূর্ণ মাপের বর্ম তৈরী করো এবং সেগুলোর কড়াসমূহ যথাযথভাবে সংযুক্ত করে, (কিন্তু এ শিল্পগত কলাকৌশলের পাশাপাশি) তোমরা তোমাদের নেক কাজও অব্যাহত রাখো; তোমরা যা কিছুই করো না কেনো, আমি তার সবকিছুই পর্যবেক্ষণ করি। (সূরা আস সাবা-১০-১১)
বাতাস হযরত সুলাইমান (আঃ) এর অনুগত ছিলো, তামার খনি ছিলো ছিলো তাঁর আয়ত্বে। তিনি কোনো কিছুর ওপর উপবেশন করে বাতাসকে আদেশ দিতেন বাতাস তাঁকে নিয়ে মুহূর্তেই হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে চলে যেতো। অগণিত জ্বীন তাঁর অনুগত ছিলো এবং তাদের মাধ্যমে তিনি অসংখ্য কর্ম সম্পাদন করতেন। কিন্তু এসব ক্ষমতা কি তাঁর নিজস্ব ছিলো? মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيْحَ عَاصِفَةً تَجْرِى بِأَمْرِهِ إِلَى الأَرْضِ الَّتِي بَارَكْنَا فِيْهَا طَ وَكُنَّا بِكُلِّ شَيْ عَالِمِينَ، وَمِنَ الشَّيَاطِينِ مَنْ يَعُوْصُوْنَ لَهُ وَيَعْمَلُوْنَ عَمَلاً دُوْنَ ذَلِكَ جِ وَكُنَّا لَهُمْ حَافِظِينَ لَا
আমি প্রবল হাওয়াকে সুলাইমানের জন্যে বশীভূত করে দিয়েছিলাম, তা তার আদেশে সে দেশের দিকে ধাবিত হতো যেখানে আমি প্রভূত কল্যাণ রেখে দিয়েছি; (মূলত) আমি প্রতিটি বিষয়ের ব্যাপারেই সম্যক অবগত আছি। শয়তানদের মাঝে (তার) কিছু (জ্বীন অনুসারী) তার জন্যে (সমুদ্রে) ডুবুরীর কাজ করতো, তার জন্যে এ ছাড়াও এরা বহু কাজ আঞ্জাম দিতো, তাদের রক্ষক তো আমিই ছিলাম। (সূরা আল আম্বিয়া-৮১-৮২)
বাতাসকে ব্যবহার করে তিনি কত দূর যেতেন এবং জ্বীনদের দ্বারা তিনি কোন্ ধরনের কাজ করাতেন, এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيْحَ غُدُوهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ وَأَسَلْنَا لَهُ عَيْنَ الْقِطْرِ طَ وَمِنَ الْجِنِّ مَنْ يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّه ط وَمَنْ تَزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ السَّعِيرِ - يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاءُ مِنْ مَّحَارِيبَ وَتَمَاثِيْلَ وَجِفَانِ كَالْجَوَابِ وَقُدُوْرٍ رَّاسِيَاتٍ طَ إِعْمَلُوا آلَ دَاوِدَ شُكْرًا طَ وَقَلِيْلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ -
এমনিভাবে আমি সুলাইমানের জন্যে বাতাসকে (তার) অনুগত বানিয়ে দিয়েছিলাম, তার প্রাত:কালীন ভ্রমণ ছিলো এক মাসের পথ, আবার সন্ধ্যাকালীন ভ্রমণও ছিলো এক মাসের পথ, আমি তার জন্যে (গলিত) তামার একটি ঝর্ণা প্রবাহিত করেছিলাম; তার মালিকের অনুমতিক্রমে জ্বীনদের কিছু সংখ্যক (কর্মী) তার সামনে থেকে (তার জন্যে) কাজ করতো (আমি বলেছিলাম,) তাদের মধ্য থেকে কেউ যদি আমার (ও আমার নবীর) আদেশ অমান্য করে, তাহলে তাকে আমি জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি আস্বাদন করাবো। সুলাইমান যা কিছু চাইতো তারা (জ্বীনরা) তার জন্যে তাই তৈরী করে দিতো, (যেমন সুরম্য) প্রাসাদ, (নানা ধরনের) ছবি, (বড় বড়) পুকুরের ন্যায় থালা ও চুলার ওপর স্থাপন করার (জন্তু-জানোয়ারসহ সবার আতিথেয়তার উপযোগী) বৃহদাকারের ডেগ; আমি বলেছি, হে দাউদ পরিবারের লোকেরা, তোমরা (আমার) শোকরস্বরূপ নেক কাজ করো; (আসলে) আমার বান্দাদের মাঝে খুব অল্প সংখ্যক মানুষই (তাদের মালিকের) শোকর আদায় করে। (সূরা আস সাবা- ১২-১৩)
হযরত আইয়ুব (আ:) ভয়ঙ্কর ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত হন এবং ঘটনাক্রমে নিজ পরিবার-পরিজন থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। জীবনের এই চরম মুহূর্তে একান্ত অসহায় অবস্থায় তিনি কেবলমাত্র মহান আল্লাহর কাছেই সাহায্য ভিক্ষা করেছেন। মহান আল্লাহর কাছে তিনি এভাবে আবেদন করলেন-
وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
(স্মরণ করো,) যখন আইয়ুব তার মালিককে ডেকে বলেছিলো (হে আল্লাহ), আমাকে এক কঠিন অসুখে পেয়ে বসেছে, (আমায় তুমি) নিরাময় করো, (কেননা) তুমিই হচ্ছো দয়ালুদের সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। (সূরা আল আম্বিয়া-৮৩)
একশ্রেণীর মানুষ রোগাক্রান্ত হলে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা বাদ দিয়ে বিভিন্ন মাজার বা পীর সাহেবের কাছে ধর্ণা দেয়, অথচ নবী- রাসূলগণের সীরাত হলো তাঁরা মহান আল্লাহর দরবারেই নিরাময় কামনা করেছেন। হযরত ইউনুস (আ:) ত্রীবিধ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে মহাবিপদে নিপতিত হলেন। এ অবস্থায় তিনি কেবলমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার কাছে এভাবে সাহায্য কামনা করেছেন-
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ كَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ جِ
হে আল্লাহ তা'য়ালা, তুমি ব্যতীত কোনো মা'বুদ নেই, তুমি পবিত্র, তুমি মহান, অবশ্যই আমি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছি। (সূরা আল আম্বিয়া-৮৭)
আল্লাহ তা'য়ালার সাহায্য কামনা করে কেউই কখনো নিরাশ হয়নি। আল্লাহ তা'য়ালা হযরত ইউনুস (আ:) সম্পর্কে বলেন- فَاسْتَجَبْنَا لَهُ لا وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ طَ وَكَذَالِكَ نُنجِي الْمُؤْمِنِينَ
অত:পর আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম এবং তাকে (তার মানসিক) দুশ্চিন্তা থেকে উদ্ধার করলাম; আর এভাবেই আমি মুমিন বান্দাদের সব সময় উদ্ধার করি। (সূরা আল আম্বিয়া-৮৮)
সন্তান না হলে অনেককেই দেখা যায় তারা পীর সাহেবের দরবারে ধর্ণা দেয় অথবা মৃত মানুষের কবরে গিয়ে মানত মেনে সন্তান কামন করে। পক্ষান্তরে নবী- রাসূলগণের সীরাত হলো তাঁরা সকল বিষয়ে মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করেছেন। হযরত যাকারিয়া (আ:) এর স্ত্রী ছিলেন সন্তান ধারণে অক্ষম তথা বন্ধ্যা। হযরত যাকারিয়া (আ:) মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার দরবারে কিভাবে ফরিয়াদ জানালেন পবিত্র কুরআন বলছে- وَزَكَرِيَّا إِذْ نَادَى رَبَّهِ رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَجِ
আর (স্মরণ করো,) যাকারিয়া (-র কথা), যখন সে তার মালিককে ডেকে বলেছিলো, হে আমার মালিক, তুমি আমাকে একা (নিঃসন্তান করে) রেখে দিয়ো না, তুমিই হচ্ছো উৎকৃষ্ট মালিকানার অধিকারী। (সূরা আল আম্বিয়া-৮৯)
মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর নবী হযরত যাকারিয়া (আ:) এর ডাকে কিভাবে সাড়া দিলেন দেখুন- فَاسْتَجَبْنَا لَه رَ وَوَهَبْنَا لَه يَحْيِي وَأَصْلَحْنَا لَه زَوْجَهُ طَ إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُوْنَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِيْنَ
অত:পর আমি তার জন্যেও সাড়া দিয়েছিলাম, তাকে দান করেছিলাম (নেক সন্তান) ইয়াহইয়া এবং তার (মনের আশা পূরণের) জন্যে আম তার স্ত্রীকে (বন্ধ্যাত্বমুক্ত করে সম্পূর্ণ) সুস্থ (সন্তান ধারণোপযোগী) করে দিয়েছিলাম; (আসলে) এ লোকগুলো (সর্বদাই) সৎকাজে (একে অন্যের সাথে) প্রতিযোগিতা করতো, তারা আমাকে আশা ও ভীতির সাথে ডাকতো; তারা সবাই ছিলো আমার অনুগত (বান্দা)। (সূরা আল আম্বিয়া-৯০)
সন্তানহীন হযরত যাকারিয়া (আ:) মহান মালিক আল্লাহর কাছে সন্তান কামনা করলেন, আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর বন্ধ্যা স্ত্রীকে সন্তান ধারণে সক্ষম বানিয়ে পুত্র সন্তান দান করলেন, সন্তানের নামকরণও তিনিই করলেন 'ইয়াহ্ইয়া' এবং সেই সন্তানকে নবী হিসাবেও নির্বাচিত করে তাঁর ইতিহাস পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবীতে আগমন করবে তাদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
📄 সাহায্য কামনা- নবী করীম (সা:)-এর সীরাত
নবী করীম (সা:) ও সকল অবস্থাতে এবং সকল কিছুর জন্যেই আল্লাহ তা'য়ালার কাছেই সাহায্য চেয়েছেন। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে মানুষদের জানিয়ে দিতে বলেছেন- قُلْ إِنَّمَا أَدْعُوْ رَبِّي وَلَا أُشْرِكُ بِهِ أَحَدًا -
(এদের) আপনি বলে দিন, আমি শুধু আমার মনিবকেই ডাকি, আর আমি তো (কখনো) তাঁর সাথে কাউকে শরীক করি না। (সূরা জ্বীন- ২০)
আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে, সাহায্য চাইতে হবে। তাঁর কাছে দোয়া না করা, সাহায্য না চাওয়া চরম অপরাধ। হযরত নু'মান ইবনে বাশীর (রা:) বলেন, আল্লাহর রাসূল (সা:) বলেছেন, দোয়াই ইবাদাত। আরেক হাদীসে হযরত আনাস (রা:) বর্ণনা করেছেন- নবী করীম (সা:) বলেছেন, দোয়া হচ্ছে ইবাদাতের সারবস্তু। আরেক হাদীসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করে না, আল্লাহ তার প্রতি ক্রদ্ধ হন। (তিরমিজী)
দোয়া বা সাহায্য প্রার্থনার ক্ষেত্রে একশ্রেণীর মানুষের মনে তাকদীর সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়ে থাকে। কিছু সংখ্যক মানুষ ধারণা করে, 'কল্যাণ ও অকল্যাণ যাবতীয় কিছু আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে, তিনিই তাকদীরের সমস্ত কিছু নির্ধারণ করে রেখেছেন, তিনি তাঁর অসীম জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে যে ফায়সালা করেছেন সেটাই তো অনিবার্যভাবে মানুষের জীবনে ঘটবেই। অতএব নতুন করে আবার আমরা দোয়া করবো কেনো এবং দোয়া করলে কি আমাদের তাকদীরের কোনো পরিবর্তন ঘটবে?' এটি একটি মারাত্মক ভুল ধারণা। এই ভুল ধারণা মানুষের মন থেকে সাহায্য চাওয়া ও দোয়ার সমস্ত গুরুত্ব মুছে দেয়। এই ভুল ধারণা হৃদয়-মনে পালন করে মানুষ যদি আল্লাহর কাছে সাহায্য চায়, দোয়া করে, তাহলে সেসব দোয়ার মধ্যেও যেমন আন্তরিকতা সৃষ্টি হয় না তেমনি কোনো প্রাণও থাকে না।
পবিত্র কুরআনে অনেক স্থানেই বলা হয়েছে, আমি বান্দার অত্যন্ত কাছে অবস্থান করি, বান্দাহ্ যখন আমাকে ডাকে আমি সে ডাকের সাড়া দিয়ে থাকি। কুরআনের ঘোষণা থেকে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বান্দার দোয়া ও আবেদন, নিবেদন ও কাকুতি-মিনতি শুনে আল্লাহ তা'য়ালা নিজে তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ক্ষমতা অবশ্যই সংরক্ষণ করেন। এ কথা চিরসত্য যে, বান্দাহ আল্লাহ তা'য়ালার সিদ্ধান্তসমূহ এড়িয়ে যেতে পারে না বা তাঁর কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার সামান্যতম ক্ষমতাও রাখে না। আল্লাহ তা'য়ালা স্বয়ং তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখেন।
সুতরাং দোয়া কবুল হোক বা না হোক, সর্বাবস্থায় দোয়ার অসংখ্য কল্যাণ রয়েছে। কোন দোয়াই বৃথা যায় না। একটি না একটি কল্যাণ অবশ্যই লাভ করা যায়। সে কল্যাণের ধরণ হলো, বান্দাহ্ তার মালিক, মনিব, প্রভু, প্রতিপালকের সামনে নিজের অভাব ও প্রয়োজন পেশ এবং দোয়া করে, সাহায্য কামনা করে তাঁর প্রভুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেয় এবং নিজের দাসত্ব ও অক্ষমতা, অপারগতা ও দুর্বলতার কথা স্বীকার করে। নিজের দাসত্বের এই স্বীকৃতিই যথাস্থানে একটি ইবাদাত বা ইবাদাতের প্রাণসত্তা। বান্দাহ্ যে সাহায্য কামনা করলো বা যে উদ্দেশ্যে দোয়া করলো সেই বিশেষ জিনিসটি তাকে দেয়া হোক বা না হোক, তার আশা পূরণ হোক বা না হোক, কোনো অবস্থায়ই তার দোয়ার প্রতিদান থেকে সে বঞ্চিত হবে না। হযরত সালমান ফারসী (রা:) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন-
لا يرد القضاء إلا الدعاء দোয়া ব্যতীত আর কোনো কিছুই তাকদীরকে পরিবর্তন করতে পারে না। (তিরমিযী)
এ হাদীস থেকে বুঝা গেল, কোনো কিছুর মধ্যেই আল্লাহর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ক্ষমতা নেই। কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালা স্বয়ং তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন। আর আল্লাহ তা'য়ালার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের একমাত্র উপায়ই হলো দোয়া, যখন বান্দাহ্ কাতর কণ্ঠে তাঁর কাছে দোয়া করে, সাহায্য চায়। হযরত জাবের (রা:) বলেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন-
مَا مِنْ أَحَدٍ يَدْعُوْ بِدُعَاءِ إِلَّا أَتَاهُ اللَّهُ مَا سَأَلَ أَوْ كَفَّ عَنْهُ مِنَ السَّوْءِ مِثْلِهِ مَالَمْ يَدْعُ بِاهِمْ أَوْ قَطِيعَةُ رَحْمٍ
বান্দাহ্ যখন আল্লাহ তা'য়ালার কাছে দোয়া করে আল্লাহ তখন হয় তার প্রার্থিত জিনিস তাকে দান করেন অথবা তার ওপরে সে পর্যায়ের বিপদ আসা বন্ধ করে দেন, যদি সে গোনাহের কাজে বা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার দোয়া না করে। (তিরমিযী)
হযরত আবু সা'ঈদ খুদরী (রা:) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন-
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَدْعُوْةَ لَيْسَ فِيْهَا إِثْمٌ وَلَا قَطِيعَةُ رَحْمٍ إِلَّا أَعْطَاهُ اللَّهُ إِحْدَى ثَلث - إِمَّا أَنْ يَجْعَلُ لَه دَعْوَتَه - وَإِمَّا أَنْ يَدَّ خِرُهَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ وَإِمَّا أَنَّ يَصْرِفَ عَنْهُ مِنَ السُّوْءِ مِثْلهَا
একজন মুসলমান যখনই কোনো দোয়া করে তা যদি গোনাহ বা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার দোয়া না হয় তাহলে আল্লাহ তা'য়ালা তা তিনটি অবস্থার যে কোনো এক অবস্থায় কবুল করে থাকেন। হয় তার দোয়া এই পৃথিবীতেই কবুল করা হয়, নয় তো আখিরাতে প্রতিদান দেয়ার জন্য সংরক্ষিত রাখা হয় অথবা তার ওপরে ঐ পর্যায়ের কোনো বিপদ আসা বন্ধ করা হয়। (আহমাদ)
হযরত আবু হুরাইরা (রা:) নবী করীম (সা:) থেকে বর্ণনা করেন- إِذَا دَعَا أَحَدُكُمْ فَلَا يَقُلْ أَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي إِنْ شِئْتَ ارْحَمْنِي إِنْ شِئْتَ ارْزُقْنِي إِنْ شِئْتَ وَلِيَعْزِمْ مَسْأَلَتَه -
তোমাদের কোনো ব্যক্তি দোয়া করলে সে যেন এভাবে না বলে, হে আল্লাহ! তুমি চাইলে আমাকে ক্ষমা করে দাও, তুমি চাইলে আমার প্রতি রহম করো এবং তুমি চাইলে আমাকে রিযিক দাও। বরং তাকে নির্দিষ্ট করে দৃঢ়তার সাথে বলতে হবে, হে আল্লাহ! আমার অমুক প্রয়োজন পূরণ করো। (বুখারী)
হযরত আবু হুরাইরা (রা:) নবী করীম (সা:) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি এভাবে আদেশ দিয়েছেন- ادْعُوا اللَّهَ وَأَنتُمْ مُوْقِنُوْنَ بِالا جَابَةِ -
আল্লাহ তা'য়ালা দোয়া কবুল করবেন এই দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে দোয়া করো। (তিরমিযী)
হযরত আবু হুরাইরা (রা:) বলেছেন যে, নবী করীম (সা:) জানিয়েছেন- يُسْتَجَابُ لِلْعَبْدِ مَا لَمْ يَدْعُ بِاثْمٍ أَوْ قَطِيعَةُ رِحْمٍ مَالَمْ يَسْتَعْجَلْ - قَبْلَ يَارَسُوْلَ اللَّهِ مَا إِلا سَتَعْجَالَ - قَالَ يَقُوْلُ قَدْ دَعَوْتَ وَقَدْ دَعَوْتُ فَلَمْ أَرَ يُسْتَجَابُ لِي فَيَسْتَحْسِرُ عِنْدَ ذَلِكَ وَيَدْعُ الدُّعَاءَ
যদি গোনাহ বা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার দোয়া না হয় এবং তাড়াহুড়া না করা হয় তাহলে বান্দার দোয়া কবুল করা হয়। রাসূল (সা:) এর কাছে জানতে চাওয়া হলো, হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াহুড়োর বিষয়টি কি? তিনি জানালেন, তাড়াহুড়ো হচ্ছে ব্যক্তির এ কথা বলা যে, আমি অনেক দোয়া করেছি, কিন্তু দেখছি আমার কোনো দোয়াই কবুল হচ্ছে না। এভাবে সে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং দোয়া করা থেকে বিরত থাকে। (তিরমিযী)
হযরত আনাস (রা:) বলেছেন যে, নবী করীম (সা:) জানিয়েছেন- يَسْأَلُ أَحَدُكُمْ رَبَّهُ حَاجَتَهُ كُلُّه حَتَّى يَسْأَلَ شِسْعَ نَعْلِهِ إِذَا انْقَطَعَ -
তোমাদের প্রত্যেকের উচিত তার রব্ব-এর কাছে নিজের প্রয়োজন প্রার্থনা করা। এমনকি জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলেও তা আল্লাহ তা'য়ালার কাছে প্রার্থনা করবে। (তিরমিযী)
হযরত আবু হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা:) ঘোষণা করেছেন- لَيْسَ شَيْ أَكْرَمُ عَلَى اللَّهِ مِنَ الدُّعَاءِ আল্লাহ তা'য়ালার কাছে দোয়ার চেয়ে অধিক সম্মানের জিনিস আর কিছুই নেই। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
হযরত ইবনে উমার ও মু'আয ইবনে জাবাল (রা:) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা:) জানিয়েছেন- إِنَّ الدُّعَاءَ يَنْفَعُ مِمَّا نَزَّلَ وَ مِمَّا لَمْ يَنْزِلْ فَعَلَيْكُمْ عِبَادَ اللَّهِ بِالدُّعَاءِ যে বিপদ আপতিত হয়েছে তার ব্যাপারেও দোয়া উপকারী এবং যে বিপদ এখনো আপতিত হয়নি তার ব্যাপারেও দোয়া উপকারী। সুতরাং হে আল্লাহ তা'য়ালার বান্দারা, তোমাদের দোয়া করা কর্তব্য। (তিরমিযী)
হযরত ইবনে মাসউদ (রা:) বলেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন- سَلُوا اللَّهَ مُفْضَلَهُ فَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ أَنْ يَسْأَلَ - আল্লাহ তা'য়ালার কাছে তার করুণা ও রহমত প্রার্থনা করো। কারণ, আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর কাছে প্রার্থনা করা পছন্দ করেন। (তিরমিযী)
দোয়া ও সাহায্য প্রার্থনা করার ব্যাপারে এ ধরনের অনেক হাদীস রয়েছে। আল্লাহ তা'য়ালার কাছে কিভাবে কোন্ পদ্ধতিতে দোয়া করতে হবে, সাহায্য চাইতে হবে তা অনুগ্রহ করে তিনি তাঁর বান্দাকে শিখিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে এমন অনেক দোয়া রয়েছে। মানুষ যে বিষয়গুলো বাহ্যিক দৃষ্টিতে নিজের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে বলে ধারণা করে সে বিষয়েও ব্যবস্থা গ্রহণ বা কর্মে নিয়োজিত হওয়ার পূর্বে আল্লাহ তা'য়ালার সাহায্য কামনা করবে। কারণ, কোনো বিষয়ে মানুষের চেষ্টা-সাধনা, তদবীরই আল্লাহ তা'য়ালার রহমত, তাঁর সহযোগিতা ও তাওফিক এবং সাহায্য ব্যতীত সফল হতে পারে না। চেষ্টা-সাধনা শুরু করার পূর্বে আল্লাহ তা'য়ালার কাছে সাহায্য চাওয়ার অর্থ হলো, বান্দাহ্ সর্বাবস্থায় তার নিজের অক্ষমতা ও আল্লাহ তা'য়ালার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করছে। সে যে আল্লাহর বান্দাহ্, একমাত্র আল্লাহরই দাসত্ব, আনুগত্য, বন্দেগী, ইবাদাত ও উপাসনা করছে এবং সেই সাথে মহান আল্লাহর কল্পনাতীত ক্ষমতা, সম্মান-মর্যাদার কথা দোয়া ও সাহায্য প্রার্থনার মধ্য দিয়ে অকপটে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এই কথাগুলোই সূরা ফাতিহার মধ্য দিয়ে বান্দাহ্ আল্লাহ তা'য়ালার সামনে দাঁড়িয়ে নামাজে বারবার বিনয়ের সাথে বলতে থাকে, হে আল্লাহ! আমরা একমাত্র তোমারই দাসত্ব করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য কামনা করি।
যে কোনো ব্যাপারে সাহায্য কামনা করতে হবে একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার কাছে। আল্লাহর রাসূল (সা:) কে প্রশ্ন করা হয়েছে, কখন মানুষ আল্লাহ তা'য়ালার কাছে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে যায়। তিনি বলেছেন, মানুষ যখন আল্লাহকে সিজদা দেয় তখন মানুষ আল্লাহর সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয়ে যায়। সুতরাং কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার কাছেই চাইতে হবে। সম্রাট শাহজাহানের জীবনীর মধ্যে একটি ঘটনার উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। কোন একজন ভিক্ষুক কিছু পাবার আশায় তার দরবারে আগমন করেছিল। অভাবী লোকটি সম্রাটকে না পেয়ে অনুসন্ধান করে জানতে পারলো তিনি মসজিদে নামাজ আদায় করছেন। লোকটি মসজিদের দরজার সামনে উপস্থিত হয়ে দেখতে পেলো, দোর্দন্ড প্রতাপশালী শাসক সম্রাট শাহ্জাহান নামাজ শেষে দু'হাত তুলে আল্লাহ তা'য়ালার দরবারে কাকুতি-মিনতি করছেন, তার দু'চোখের কোণ বেয়ে শ্রাবণের বারি ধারার মতই অশ্রু ঝরছে। অশ্রু ধারায় তার দাড়ি সিক্ত হয়ে বুকের কাছে শরীরের জামাও ভিজে গিয়েছে।
মুনাজাত শেষ করে সম্রাট মসজিদ থেকে বাইরে এলেন। ভিক্ষুক লোকটি সম্রাটকে সালাম জানালো, তিনি সালামের জবাব দিলেন। এরপর লোকটি সম্রাটের কাছে কোনো কিছু আবেদন না করে ঘুরে দাঁড়িয়ে চলে যেতে লাগলো। সম্রাট অবাক হলেন। তার মনে প্রশ্ন জাগলো, তার কাছে এসে কেউ তো কোনো নিবেদন না করে ফিরে যায় না, কিন্তু এ লোকটিকে দেখতে তো অভাবী মনে হয়। কিন্তু লোকটি কিছু না চেয়ে ফিরে যাচ্ছে কেনো? ভিখারী লোকটি চলে যাচ্ছে আর সম্রাট বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন। সম্বিৎ ফিরে পেতেই তিনি লোকটিকে ডাক দিলেন। লোকটির কানে সম্রাটের আহ্বান পৌঁছা মাত্র সে ঘুরে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে সম্রাটের সামনে এসে স্থির হয়ে দাঁড়ালো।
ক্ষমতাধর সম্রাট লোকটির চোখের ওপরে চোখ রেখে মমতাভরে প্রশ্ন করলেন, আমার কাছে এসে কোনো ব্যক্তি কিছু না চেয়ে তো চলে যায় না, তোমাকে দেখে তো অভাবী মনে হচ্ছে। তুমি আমার কাছে কিছু না চেয়ে কেনো চলে যাচ্ছিলে?
লোকটি দৃঢ় কণ্ঠে জানালো, সত্যই আমি অভাবী। ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করি। আপনার কাছেও এসেছিলাম ভিক্ষার আশায়। আপনার কাছ থেকে বড় রকমের কিছু সাহায্য পাবো, যেন বাকি জীবনে আমাকে আর ভিক্ষা করতে না হয়। কিন্তু আপনার কাছে এসে আমার জ্ঞানচক্ষু উন্মোচিত হয়ে গিয়েছে। আমি দেখলাম, আপনি আমার থেকে নগণ্য ভিক্ষুকের মতো মহান আল্লাহর কাছে দু'হাত তুলে ভিখারীর মতো অনুনয়- বিনয় করে কাঁদছেন। এই দৃশ্য দেখে আমি স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম, সম্রাট কাঁদে যে সম্রাটের কাছে আমিও তাঁরই কাছে কাঁদবো। আমি বাকি জীবনে ঐ রাজাধিরাজ মহান আল্লাহ ব্যতীত আর কারো কাছে কখনো কিছুই চাইবো না।
📄 দোয়া- নবী করীম (সা:) এর সীরাত
নবী করীম (সা:) সকল বিষয়ে মহান আল্লাহ তা'য়ালার মুখাপেক্ষী ছিলেন এবং সর্বাবস্থায় "কেবলমাত্র তাঁরই কাছে সাহায্যের আবেদন করেছেন। তিনি জীবিতাবস্থায় যতো দোয়া করেছেন তা সবই হাদীসের কিতাবসমূহে মওজুদ রয়েছে। সকল নবী-রাসূলগণের মধ্যে তিনিই সকলের তুলনায় সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী, তবুও তিনি কিভাবে মহান আল্লাহ তা'য়ালার কাছে আবেদন-নিবেদন ও কাকুতি-মিনতি করেছেন সেদিকে দৃষ্টিপাত করি।
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَهْدِنِي وَاجْبُرْنِي وَعَفِنِي وَارْزُقْنِي وَارْفَعْنِي হে আল্লাহ তা'য়ালা, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও, তুমি আমার প্রতি রহম করো, তুমি আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করো, তুমি আমার জীবনের সকল ক্ষতির পূরণ করে দাও, তুমি আমাকে নিরাপত্তা দান করো এবং তুমি আমাকে রিযিক দান করো ও আমার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দাও। (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ্)
اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِّنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি আমার নিজের প্রতি অনেক বেশি যুলুম করেছি, আর তুমি ব্যতীত গোনাহসমূহ কেউ-ই ক্ষমা করতে পারে না, সুতরাং তুমি তোমার নিজগুণে আমাকে ক্ষমা করে দাও এবং আমার প্রতি তুমি রহম করো, তুমিই ক্ষমাকারী দয়ালু। (বুখারী, মুসলিম)
اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ كَسَوْتَنِيْهِ أَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِهِ وَخَيْرِ مَا صُنِعَ لَهُ وَأَعُوْذُبِكَ مِنْ شَرِّهِ وَشَرِّ مَا صُنِعَ لَهُ - হে আল্লাহ তা'য়ালা, তোমারই জন্য সকল প্রশংসা। তুমিই এ কাপড় আমাকে পরিয়েছো। আমি তোমার কাছে এর মধ্যে নিহিত কল্যাণ ও এটি যে জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে সেসব কল্যাণ প্রার্থনা করি। আমি এর অনিষ্ট এবং এটি তৈরীর অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে আশ্রয় কামনা করি। (আবু দাউদ, তিরমিযী)
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنَ الْبُخْلِ وَأَعُوْذُبِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَأَعُوْذُبِكَ مِنْ أَنْ أَرَدَّ إِلى أَرْذَلِ الْعُمُرِ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الدُّنْيَا وَعَذَابِ الْقَبْرِ -
হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি আশ্রয় চাই কার্পণ্যতা থেকে এবং আশ্রয় চাই কাপুরুষতা থেকে, আর আশ্রয় চাই বার্ধক্যের চরম দুঃখ-কষ্ট থেকে, দুনিয়ার ফিৎনা-ফাসাদ ও কবরের আযাব থেকে আশ্রয় চাই। (বুখারী ফতহুলবারী)
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا طَيِّبًا وَّ عَمَلًا مُّتَقَبَّلاً -
হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি তোমার কাছে উপকারী বিদ্যা, পবিত্র জীবিকা এবং গ্রহণযোগ্য কর্ম প্রার্থনা করি। (ইবনে মাজাহ্)
اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي بَدَنِي اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي سَمْعِى اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي بَصَرِي لَا إِلَهَ إلَّا أَنْتَ أَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنَ الْكُفْرِ وَالْفَكْرِ وَ أَعُوْذُبِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ لَا إله إلا أنت
হে আল্লাহ তা'য়ালা, তুমি আমার দেহের নিরাপত্তা দান করো, আমার কর্ণের নিরাপত্তা দান করো, আমার চক্ষুতে নিরাপত্তা প্রদান দান করো। হে আল্লাহ তা'য়ালা, তুমি ব্যতীত দাসত্ব লাভের যোগ্য কোনো মাবুদ নেই। হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি তোমার আশ্রয় চাচ্ছি, কুফুরী এবং দারিদ্রতা হতে, আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি কবর আযাব থেকে, তুমি ব্যতীত দাসত্ব লাভের যোগ্য কোনো মাবুদ নেই। (আবু দাউদ, আত্মাদ)
أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ-
আল্লাহ তা'য়ালার পূর্ণ গুণাবলীর বাক্য দ্বারা তাঁর কাছে আমি অনিষ্ঠকর সৃষ্টির অপকার থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। (মুসলিম, তিরমিযী, আহমদ)
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي دِينِي وَدُنْيَايَ وَأَهْلِي وَمَلِى اللَّهُمَّ اسْتُرْ عَوْرَتِي وَ آمِنْ رَوْعَاتِي اللَّهُمَّ حفِظْنِي مِنْ بَيْنِ يَدَيَّ وَمِنْ خَلْفِي وَعَنْ يَمِينِي وَعَنْ شِمَالِي وَمِنْ فَوْقِي وَأَعُوْذُ بِعَظْمَتِكَ أَنْ اغْتَالَ مِنْ تَحْتِي-
হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি তোমার কাছে দুনিয়া ও আখেরাতের নিরাপত্তা কামনা করছি। হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি এবং স্বীয় দ্বীন ও দুনিয়ার নিরাপত্তা কামনা করছি, হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি ক্ষমার আর কামনা করছি আমার দ্বীন ও দুনিয়ার, আমার পরিবার পরিজনের এবং আমার সম্পদের নিরাপত্তার। হে আল্লাহ তা'য়ালা, তুমি আমার গোপন দোষত্রুটিসমূহ ঢেকে রাখো, চিন্তা ও উদ্বিগ্নতাকে শান্তি ও নিরাপত্তায় রূপান্তরিত করে দাও। হে আল্লাহ তা'য়ালা, তুমি আমাকে নিরাপদে রাখো আমার সম্মুখের বিপদ হতে এবং পশ্চাতের বিপদ হতে, আমার ডানের বিপদ হতে এবং বামের বিপদ হতে, আর উর্ধ্ব জগতের গযব হতে। তোমার মহত্বের দোহাই দিয়ে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি আমার নিম্নদেশ হতে আগত বিপদ হতে, তথা মাটি ধ্বসে আকস্মিক মৃত্যু হতে। (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ্)
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحُزْنِ وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি চিন্তা-ভাবনা, অপারগতা, অলসতা, কৃপণতা এবং কাপুরুষতা থেকে, অধিক ঋণ থেকে ও দুষ্ট লোকের প্রাধান্য থেকে। (বুখারী-ফতহুলবারী)
اللَّهُمَّ إِنَّا نَجْعَلُكَ فِي نُحُوْرِ هِمْ وَ نَعُوْذُبِكَ مِنْ شُرُوْرِهِمْ
হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি শত্রুদের শত্রুতা ও তাদের ক্ষতিসাধনের মুকাবিলায় তোমাকে স্থাপন করছি এবং তাদের অনিষ্ট হতে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (আবু দাউদ, হাকেম)
اللَّهُمَّ مُنْزِلَ الْكِتَابِ سَرِيْعَ الْحِسَابِ اهْزِمِ الأَحْزَابَ اللَّهُمَّ اهْزِمْهُمْ وَزَلْزِلْهُمْ
হে আল্লাহ তা'য়ালা, কিতাব নাযিলকারী, ত্বড়িত হিসাব গ্রহণকারী, শত্রুবাহিনীকে পরাজিত ও প্রতিহত করো, তাদেরকে দমন ও পরাজিত করো, তাদের মধ্যে কম্পন সৃষ্টি করে দাও। (মুসলিম)
اللَّهُمَّ اكْفِيْنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَ أَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ -
হে আল্লাহ তা'য়ালা, তুমি তোমার হারাম বস্তু হতে বাঁচিয়ে তোমার হালাল রিযিক দ্বারা আমাকে পরিতুষ্ট করে দাও। হালাল রুযিই যেনো আমার জন্য যথেষ্ট হয় এবং হারামের দিকে যাওয়ার প্রয়োজন ও প্রবণতাবোধ না করি। এবং তোমার অনুগ্রহ অবদান দ্বারা তুমি ভিন্ন অন্য সকল কিছু হতে আমাকে অমুখাপেক্ষী করে দাও। তুমি ছাড়া যেনো আমাকে আর কারো মুখাপেক্ষী হতে না হয়। (তিরমিযী)
اللَّهُمَّ لَا سَهْلَ إلَّا مَا جَعَلْتَهُ سَهْلاً وَ أَنْتَ تَجْعَلُ الْحُزْنَ إِذَا شَيْتَ سُهْلاً -
হে আল্লাহ তা'য়ালা! কোনো কাজই সহজসাধ্য নয় তুমি যা সহজসাধ্য করোনি, যখন তুমি ইচ্ছা করো দুশ্চিন্তাকেও সহজসাধ্য করতে পারো। (ইবনে হিব্বান, ইবনে সুন্নী)
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَ أَعُوْذُبِكَ مِنْ شَرِّهَا -
হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমি তোমার কাছে এর (ঝড় ও বাতাসের) কল্যাণটুকু চাই, আর আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি এর অনিষ্ট হতে। (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ্)
اللَّهُمَّ أَسْقِنَا غَيْئًا مَرِيئًا مَرِيعًا نَافِعًا غَيْرَ ضَارٌ عَاجِلا غَيْرَ آحِلٍ
হে আল্লাহ তা'য়ালা, আমাদেরকে এমন বৃষ্টির পানি দান করো যা সুপেয়, ফসল উৎপাদনকারী, কল্যাণকর, ক্ষতিকর নয়, দ্রুত যা আসবে, বিলম্ব করবে না। (আবু দাউদ)
اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِيْهِ وَ أَطْعِمْنَا خَيْرًا مِّنْهُ -
হে আল্লাহ তা'য়ালা, তুমি আমাদের এই খাদ্যে বরকত দাও এবং এর চেয়ে উত্তম খাবারের ব্যবস্থা করে দাও। (তিরমিযী)
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنِي هَذَا وَا رْزُقْنِيْهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِّنِّى وَ لَاقُوَّةٍ
সকল প্রশংসা সেই আল্লাহ তা'য়ালার জন্য যিনি আমাকে এই পানাহার করালেন এবং এর সামর্থ প্রদান করলেন, যাতে ছিলো না আমার পক্ষ থেকে কোনো উপায়-উদ্যোগ, ছিলো না কোনো শক্তি সামর্থ। (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ্, আহমদ)
اعُوْذُ بِاللهِ وَ قُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِدُ وَ أَحَاذِزُ -
যে ক্ষতি আমি অনুভব করছি এবং আমি যার আশঙ্কা করছি তা হতে আমি আল্লাহ তা'য়ালার মর্যাদা এবং তাঁর কুদরতের মাধ্যমে আল্লাহ তা'য়ালার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (মুসলিম)