📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী করীম (সা:) এর ভাষণের নমুনা

📄 নবী করীম (সা:) এর ভাষণের নমুনা


নবী করীম (সা:) জনগণের উদ্দেশ্যে পথনির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়েছেন। তাঁর ভাষণ কখনোই এতটা দীর্ঘ হয়নি যে, শ্রোতাবৃন্দের মনে বিরক্তি সৃষ্টি করবে অথবা এমন সংক্ষিপ্তও হয়নি যে, শ্রোতাবৃন্দ সঠিক বিষয়টি বুঝতে অক্ষম হবে। তাঁর পবিত্র মুখ নিঃসৃত বাণীসমূহের প্রতিটি শব্দই ছিলো দুষ্প্রাপ্য মণি-মুক্তা সদৃশ। প্রত্যেকটি শব্দই ছিলো ব্যাপক অর্থবোধক অথচ সহজে বোধগম্য। ভাষণে তিনি কখনোই অনর্থক একটি শব্দও ব্যবহার করেননি। ভাষণ দানকালে তিনি এমন হৃদয়গ্রাহী শব্দসমূহ চয়ন করতেন যা শ্রোতাবৃন্দের হৃদয়স্পর্শ করতো। শ্রোতাবৃন্দের বুঝার সুবিধার্থে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বাক্যসমূহ তিনবার উচ্চারণ করতেন। নবুয়্যাতি জীবনে তিনি যতবার ভাষণ দিয়েছেন, তা হাদীসের কিতাব ও ইতিহাসের পাতায় স্বার্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাঁর ভাষণসমূহ থেকে কিছু বাক্য আমরা এখানে উদ্ধৃত করছি।

فَإِنَّ اصَدَقَ الْحَدِيْثِ كِتَابُ الله - 'কথার মধ্যে সর্বোত্তম সত্য কথা হচ্ছে কিতাবুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর কুরআন'।
وَ أَوْ شَقَ الْعُرِى كَلِمَةُ التَّقْوى 'সর্বোত্তম নির্ভরতার বিষয় হচ্ছে তাক্বওয়ার বিষয় অর্থাৎ আল্লাহভীতি'।
وَ خَيْرُ الْمَلَلِ مِلَّةُ إِبْرَاهِيمَ - 'সকল মিল্লাতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মিল্লাত হলো মিল্লাতে ইবরাহীম'।
وَ خَيْرُ السُّنَنِ سُنَّةِ مُحَمَّد صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- 'সকল পন্থার মধ্যে সর্বোত্তম পন্থা হলো মুহাম্মাদ (সা:) এর পন্থা'।
وَ أَشْرَفُ الْحَدِيْثِ ذكر الله - 'সকল কথার মধ্যে শ্রেষ্ঠ কথা হলো মহান আল্লাহর স্মরণমূলক কথা'।
وَ أَحْسَنُ الْقَصَصَ هَذَا الْقُرْآنِ 'সকল বর্ণনার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দর বর্ণনা হলো এই কুরআনুল কারীম'।
وَ خَيْرُ الْأَمُورِ عَوَازِمُهَا - 'সুচিন্তিত ও দৃঢ় সঙ্কল্পের কর্মই হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম কর্ম'।
وَ شَرِّ الْأَمْرِ مُحَدِّثًا تُهَا - 'বিদয়াত ও বানোয়াট কথাই হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ'।
وَ أَحْسَنُ الْهُدَى هُدَى الأَنْبِيَاء - 'আল্লাহর নবীগণ কর্তৃক প্রদর্শিত পথই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ অভ্রান্ত পথ'।
وَ أَشْرَفُ الْمَوْتِ قَتْلُ الشُّهَدَاءِ 'দ্বীনের পথে শহীদদের মৃত্যুই সর্বাধিক মর্যাদাকর মৃত্যু'।
وَ أَعْمَى الْعَمَى الضَّلَالَةُ بَعْدَ الْهُدَى 'সবথেকে বড় অন্ধত্ব হলো সেই পথভ্রষ্টতা যা সত্য সঠিক পথ দেখার পরও মানুষ গ্রহণ করে না'।
وَ خَيْرُ الْأَعْمَالِ مَا نُفِعَ 'সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ কর্ম সেটাই যার মাধ্যমে মানুষের নৈতিক উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পায় বা মানুষ উপকৃত হয়'।
وَ خَيْرُ الْهُدَى مَا تَبِعَ - 'সত্য সঠিক পথ সেটাই সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ মানুষ যে পথের অনুসরণ করতে পারে'।
وَ شَرِّ الْعَمِي عَمَى الْقَلْبِ 'সর্বাধিক নিকৃষ্টতম অন্ধত্ব হচ্ছে হৃদয়ের অন্ধত্ব'।
وَ الْيَدُ الْعُلَيَّا خَيْرٌ مِّنْ يَد السُّفْلَى - 'উপরের হাত (দাতার হাত) নীচের হাতের (গ্রহীতার হাত) তুলনায় উত্তম'।
و ماقل و كَفى خَيْرٌ مِّمَّا كَثُرُ وَالْهى - 'স্বল্পতম সম্পদ যা প্রয়োজন পূরণের জন্যে যথেষ্ট তা ঐ বিশাল সম্পদের তুলনায় উত্তম, যা মানুষকে (আল্লাহর দাসত্ব থেকে) অমনোযোগী করে দেয়'।
وَ شَرِّ الْمُعَذِّرَةِ حِيْنُ يَحْضَرُ الْمَوْتَ 'সর্বাধিক নিকৃষ্টতম তাওবা বা ওজর আপত্তি হচ্ছে তাই যা মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে করা হয়'।
وَ شَرِّ النَّدَامَةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ - 'কিয়ামতের ময়দানে যে লজ্জা অনুভূত হবে এবং যে অনুশোচনা জাগবে সেটাই হলো সর্বাধিক নিকৃষ্ট লজ্জা ও অনুশোচনা'।
وَ مِنَ النَّاسِ مَنْ لا يَأْتِي الْجُمُعَةَ الْأَدْبَرًا - 'কোনো কোনো মানুষ জুমুআর নামাজ আদায়ের লক্ষ্যে আসে কিন্তু তাদের হৃদয় মন (নামাজে স্থির থাকে না) পড়ে থাকে পেছনে'।
وَ مِنْ لَا يَذْكُرُ اللَّهَ إِلَّا هَجْرًا - 'কোনো কোনো মানুষ এমনও আছে যারা (নিজ স্রষ্টা) মহান আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে'।
وَ مِنْ أَعْظَمِ الْخَطَايَا اللِّسَانُ الْكَذِبِ 'পাপের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ পাপ হলো মিথ্যা বলা'।
خَيْرُ الْغَنِي غَنِيُّ النَّفْسِ 'আত্মার প্রাচুর্যতাই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাচুর্যতা'।
وَ خَيْرُ الزَّادِ التَّقْوَى 'মানুষের জন্যে সর্বোত্তম পাথেয় হচ্ছে তাক্বওয়া অর্থাৎ আল্লাহভীতি'।
وَ رَأْسُ الْحِكْمَةِ مُخَافَةُ اللَّهِ عَزَّ وَ جَلْ 'জ্ঞানীদের মাথার শ্রেষ্ঠ মুকুট হচ্ছে আল্লাহভীতি'।
وَ خَيْرُ مَا وَفَرِ فِي الْقُلُوبِ الْيَقِينِ 'মনের গভীরে প্রতিষ্ঠিত করার শ্রেষ্ঠ বিষয় হচ্ছে বিশ্বাস'।
وَ الإِرْتَيَابُ مِنَ الْكُفْرِ - 'সন্দেহ সংশয় হচ্ছে কুফুরীর শাখা'।
وَ النِّيَاحَةُ مِنْ عَمَلِ الْجَهِلِيَّةِ - 'মৃত ব্যক্তির জন্যে বিলাপ করা জাহেলী যুগের অনুকরণ'।
وَ الْخُلُوْلُ مِنْ حَرِّ جَهَنَّمِ 'খিয়ানত করা জাহান্নামের আগুন বিশেষ'।
السُّكَرُ كَيْرٌ مِّنَ النَّارِ - 'নেশা করা আগুনের দাগ (লাগানোর শামিল)'।
وَ الشعر من إبليس 'অশ্লীল অশালীন কাব্য চর্চা করা শয়তানের কর্ম'।
الْخَمْرُ جَمَاعَ الإِثْمِ 'মদ সকল গোনাহের উৎস'।
وَ شَرُّ الْمَأْكُلِ مَالُ الْيَتِيمِ 'জঘন্যতম খাদ্য হচ্ছে ইয়াতিমের সম্পদ ভক্ষণ করা'।
وَ السَّعِيدُ مَنْ وُعِظَ بِغَيْره - 'সৌভাগ্যবান হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে অন্যের কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ করে'।
وَ الشَّقِي مَنْ فِي بَطْنِ أُمِّه - 'প্রকৃত হতভাগ্য সে, যে তার মাতৃগর্ভেই দুর্ভাগা থাকে'।
وَ مَلَاكُ الْعَمَلِ خَوَاتِمُه - 'মানুষের কর্মের পুঁজি হচ্ছে তার উত্তম পরিণতি'।
وَ شَرُّ الرُّؤْيَا رُؤْيَا الْكَذَّب - 'নিকৃষ্ট স্বপ্ন হচ্ছে মিথ্যা স্বপ্ন'।
وَ كُلِّ مَا هَوَات قَرِيبٌ 'যে ঘটনা ঘটবে তা অতি নিকটবর্তী'।
وَ سَبَابُ الْمُؤْمِنِ فُسُوْقَ وَ قِتَالُهُ كُفْرٌ - 'মুমিনকে গালি দেয়া ফাসেকী আর তাকে হত্যা করা কুফুরী'।
وَ أَكُلُ لَحْمَةٌ مِنْ مُّعْصِيَةِ الله - 'মুমিনের গোস্ত খাওয়া (অর্থাৎ তার গীবত করা) নিকৃষ্ট গোনাহের মধ্যে অন্যতম'।
وَ حُرِّمَتْ مَالُهُ كَحُرْمَة دَمِّه - 'মুমিনের সম্পদ অন্যের জন্য ঠিক সেই রকম হারাম যেমন হারাম তার রক্ত'।
مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ 'যে দয়া করে না তাকেও দয়া করা হয় না'।
وَ مَنْ يَغْفِرُ يُغْفَرُ لَه - 'যে কাউকে ক্ষমা করে তাকেও ক্ষমা করা হয়'।
وَ مَنْ يَعْفُ يَعْفَ اللَّهُ عَنْهُ - 'যে অন্যকে ক্ষমা করে আল্লাহ তা'য়ালা তাকে ক্ষমা করেন'।
وَ يَكْظُمُ الْغَيْظَ يَأْجِرُهُ اللَّهُ - 'যে রাগ সংবরণ করে আল্লাহ তা'য়ালা তাকে পুরস্কৃত করেন'।
وَ مَنْ يَصْبِرُ عَلَى الرَّزِيَةُ يَعُوْضُهُ اللَّهُ - 'যে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবার পরও ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তা'য়ালা তাকে উত্তম বিনিময় দান করেন'।
وَ مَنْ يَتَّبِعُ السَّمَعَةِ يَسْمَعُ اللَّهِ - 'যে অন্যের দোষত্রুটি ছড়িয়ে বেড়ায় আল্লাহ তা'য়ালা তাকে অপমানিত করেন'।
وَ مَنْ يَصْبِرُ يُضْعَفُ اللَّهُ لَه - 'যে ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তা'য়ালা তাকে অনেকগুণ বেশি দান করেন'।
وَ مَنْ يَعْصِ اللَّهَ يُعَذِّبُهُ اللَّهُ - 'যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'য়ালার অবাধ্য হয় তিনি তাকে শাস্তি দেন'।
(সূত্র: যাদুল মায়া'দ, ২য় খণ্ড- আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম)

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী করীম (সা:) এর অতুলনীয় আচরণ

📄 নবী করীম (সা:) এর অতুলনীয় আচরণ


এ বিষয়টি আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) সম্পর্কে ঘোষণা দিয়েছেন, সমগ্র মানব জাতি যাঁকে একমাত্র আদর্শ ও একমাত্র অনুকরণীয় নেতা হিসাবে মেনে নিলে জীবনের প্রত্যেক দিক ও বিভাগে শান্তির ফল্গুধারা প্রবাহিত হবে, তিনি নবী করীম (সা:)। কারণ তিনি সকল দিক থেকে এতোই মহান যে, এই মহানত্বের কোনো সীমারেখা নেই এবং তলদেশও নেই। আর তলদেশ থাকলেও তা পরিমাপ করার মতো কোনো উপকরণ মানুষের হাতে নেই। তাঁর চরিত্র কেমন ছিলো, এ সম্পর্কে কিছু সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম হযরত আয়িশা (রা:) এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন। জবাবে হযরত আয়িশা (রা:) বলেছিলেন, 'তোমরা কি কুরআন তিলাওয়াত করো না, কুরআনই তাঁর চরিত্র'।

অর্থাৎ তিনি ছিলেন জীবন্ত কুরআন বা কুরআনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। পবিত্র কুরআন যে মহান আদর্শ পেশ করেছে সেই আদর্শের বাস্তব নমুনা ছিলেন নবী করীম (সা:)। তাঁর নবুয়্যতের ২৩ বছরের জীবনই ৩০ পারা কুরআন। পৃথিবীর সকল শ্রেণী ও বয়সের মানুষই তাঁর পবিত্র জীবনধারায় নিজের অনুকরণীয় সর্বোত্তম আদর্শ দেখতে পাবে। তাঁর আদর্শ যুগ বা কালের গণ্ডীতে আবদ্ধ নয়, তাঁর আদর্শ কালোত্তীর্ণ, কালজয়ী এবং কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য একমাত্র তিনিই সর্বোত্তম আদর্শের বাস্তব নমুনা। স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর মহান চরিত্র সম্পর্কে এভাবে সনদ দিয়েছেন-
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ নিঃসন্দেহে আপনি মহান চরিত্রের ওপর (প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন)। (সূরা কালাম-৪)

আরবী ভাষায় প্রশস্ততাকে বুঝানোর জন্য عریض শব্দ ব্যবহৃত হয় এবং গভীরতাকে বুঝানোর জন্য عمیق শব্দ ব্যবহৃত হয়। এ দু'টো শব্দ যে গভীরতা ও প্রশস্ততা পরিমাপ করা যায় সে গভীরতা ও প্রশস্ততার ক্ষেত্রে শব্দ দু'টো ব্যবহার করা হয়।

কিন্তু যে প্রশস্ততা পরিমাপ করা যায় না বা যে গভীরতার কোনো সীমারেখা নেই, যা পরিমাপ করা যায় না বা যে গভীরতার তলদেশ স্পর্শ করাও যায় না, ক্ষেত্র বিশেষে সেই গভীরতা বা প্রশস্ততাকে বুঝানোর জন্য আরবী عظیم শব্দ ব্যবহার হয়। মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল (সা:) এর মহান চরিত্র সম্পর্কে যে সনদ দান করেছেন সেই সনদের মধ্যে عظیم শব্দটি ব্যবহার করেছেন। সমগ্র মানব জাতি কল্পনাও করতে পারবে না মহান আল্লাহ তা'য়ালা মর্যাদার কোন্ উচ্চস্তরে নবী করীম (সা:) কে উপনীত করেছেন। তাঁর চরিত্রের মহানত্ব এতই গভীর যে, যার তলদেশ কখনো স্পর্শ করা যাবে না এবং পরিমাপও করা যাবে না।

নবী করীম (সা:) এর চারিত্রিক মাধুর্যতা এবং ব্যক্তিত্বের অনুপম আকর্ষণ এতই মধুর, চিত্তাকর্ষক ও প্রশান্তিদায়ক ছিলো যে, কোনো মানুষ যখন তাঁর সান্নিধ্যে আগমন করতো, তখন সে ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলে গিয়ে নবী করীম (সা:) এর দিকে অপলকনেত্রে তাকিয়ে থাকতো। অগণিত মানুষ সমবেত হয়ে তাঁর পবিত্র মুখের কথা শুনতো। এমন তন্ময় হয়ে কথা শুনতো যে, তাদের দেহের স্বাভাবিক স্পন্দনও অনুভব করা যেতো না। জড়পদার্থের ন্যায় অনড় অবিচল হয়ে সমবেত লোকজন বসে থাকতো। মাথার ওপর কোনো পাখী এসে বসলেও তাঁরা অনুভব করতো পারতো না। নবী করীম (সা:) এর মমতা ও প্রেমময় ব্যবহার সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন-

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللهِ لِنْتَ لَهُمْ ج وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلَيْظَ الْقَلْبِ لَأَنْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ص فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ جِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ طَ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ

এটা আল্লাহর এক (অসীম) দয়া যে, আপনি এদের সাথে ছিলেন কোমল প্রকৃতির (মানুষ, এর বিপরীতে) যদি আপনি নিষ্ঠুর ও পাষাণ হৃদয়ের (মানুষ) হতেন, তাহলে এসব লোক আপনার আশপাশ থেকে সরে যেতো, অতএব আপনি এদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দিন, এদের জন্যে (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কাজকর্মের ব্যাপারে এদের সাথে পরামর্শ করুন, অতঃপর (সে পরামর্শের ভিত্তিতে) সঙ্কল্প একবার যখন নিয়ে নিবেন তখন (তার সফলতার জন্যে) আল্লাহর ওপর ভরসা করুন; অবশ্যই আল্লাহ তা'য়ালা (তাঁর ওপর) নির্ভরশীল মানুষদের ভালোবাসেন। (সূরা আলে ইমরান- ১৫৯)

মানুষের সামান্যতম অসুবিধা দেখলে যাঁর নয়ন দু'টো অশ্রুসজল হয়ে উঠতো, যিনি ক্ষুদ্র প্রাণীর কষ্টও বরদাস্ত করতে পারতেন না, সেই করুণার সিন্ধু সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُوَلٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ

(হে মানুষ,) তোমাদের কাছে তোমাদেরই মধ্য থেকে এক রাসূল এসেছেন, তোমাদের কোনোরকম কষ্ট ভোগ তাঁর কাছে দুঃসহ, তিনি তোমাদের একান্ত কল্যাণকামী, ঈমানদারদের প্রতি তিনি হচ্ছেন স্নেহপরায়ণ ও পরম দয়ালু। (সূরা তাওবা-১২৮)

নবী করীম (সা:) স্বয়ং নিজের সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন-

قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّم إِنَّمَا بُعِثْتُ لاتمم مكارم الأخلاق নবী করীম (সা:) বলেন, অনুপম চরিত্রকে তার পূর্ণতায় পৌঁছে দেয়ার জন্যই আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে।

এখানে একটি ঘটনার উল্লেখ করছি, একদিন নবী করীম (সা:) মসজিদে নববীতে সাহাবায়ে কেরামের সমাবেশে বক্তব্য রাখছিলেন। এক অমুসলিম গ্রাম্য লোক, যারা বেদুঈন নামে পরিচিত। লোকটি এ দৃশ্য দেখে বিস্ময় অনুভব করলো, একজন মানুষ কথা বলছে আর এতগুলো মানুষ পিনপতন নীরবতার মধ্য দিয়ে তাঁর কথা শুনছে, এমন অবাক করা দৃশ্য তো জীবনে কখনো দেখিনি!

এ কথা চিন্তা করে লোকটি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলো নবী করীম (সা:) কি বলছেন তা শোনার জন্য। আল্লাহ তা'য়ালার রাসূলের পবিত্র কণ্ঠ নিঃসৃত অমীয় বাণী শুনে নীরব নিথর হয়ে গেলো। পর্বতের মতো স্থির হয়ে সে আল্লাহর রাসূলের চেহারা মুবারকের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কথা শুনতে থাকলো। অনেকক্ষণ পর লোকটি অনুভব করলো তাকে মুত্র ত্যাগ করতে হবে। পূর্বের অভ্যাস অনুযায়ী সে সকলের সম্মুখেই মসজিদের ভেতরে দেয়ালের দিকে ফিরে মুত্র ত্যাগ শুরু করলো。

সাহাবায়ে কেরাম এ দৃশ্য দেখে লোকটিকে প্রহার করতে উদ্যত হতেই নবী করীম (সা:) সাহাবায়ে কেরামকে থামিয়ে দিয়ে নিজে এগিয়ে গেলেন। মুত্র ত্যাগ শেষ হলে রাসূল (সা:) মধুর সম্ভাষণে লোকটিকে বললেন, 'দেখো, এটি মসজিদ। এখানে আমরা মহান আল্লাহ তা'য়ালাকে সিজদা দেই, এ কারণে এটি পবিত্র স্থান। ভবিষ্যতে তুমি এ ধরনের পবিত্র স্থানে ঐ কাজটি করো না যা তুমি এই মাত্র এখানে করলে। এবার তুমি যেতে পারো'।

লোকটি দেখেছিলো উপস্থিত লোকজন তাঁর ওপরে ক্ষিপ্ত হয়েছিলো শুধু মাত্র নবী করীম (সা:) ব্যতীত। এরপর আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল (সা:) এর অনুপম ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে লোকটির মুখ থেকে নির্গত হলো- اللَّهُمَّ ارْحَمْنِي وَ مُحَمَّدًا وَّ لَا تَرْحَمْ مَّعَنَا أَحَدًا -

হে আল্লাহ! তুমি আমার ও মুহাম্মাদ (সা:) এর প্রতি রহম করো, আর আমাদের দু'জনের বাইরে এদের কাউকে রহম করো না। কারণ এরা আমাকে প্রহারে উদ্যত হয়েছিলো'।

লোকটির দোয়ায় কার্পণ্যতা দেখে নবী করীম (সা:) এমনভাবে হেসে উঠলেন যে, তাঁর দন্ত মুবারকের উজ্জ্বলতা বিকশিত হয়েছিলো। লোকটি বিদায় নেয়ার পর তিনি উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে বললেন-

يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا إِنَّمَا بُعِثْتُمْ مُّيَسِّرِينَ
সহজ করো, কঠিন করো না। তোমাদের পাঠানোই হয়েছে সহজ করার জন্য। যাও, এখন ঐ মুত্র ত্যাগের স্থানে পানি ঢেলে দাও।

হযরত আলী (রা:) বলেছেন, নবী করীম (সা:) কর্কশ স্বভাব বা সঙ্কীর্ণমনা ছিলেন না। তাঁর পবিত্র জবান থেকে কখনো অশোভনীয় কথা বেরোতো না। কারও দোষ তিনি কখনো খুঁজেন নি। তিনি তর্কে বিতর্কে জড়াতেন না। কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতেন না যদি তা শরীয়ত সম্মত হতো। ব্যক্তিগত কারণে তিনি কারো ওপরে কক্ষণো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি এবং শাস্তিও দেননি। তাঁর সাথে কেউ অশোভন আচরণ করলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দিতেন। তিনি ছিলেন অতুলনীয় বিনয়ী এবং দয়ার্দ্র প্রকৃতির। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই ছিলো তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। পৃথিবী যখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন থাকতো তখন তিনি নির্ঘুম থেকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে নামাজ আদায় করতেন। নামাজে দাঁড়িয়ে ও সিজদায় তিনি রাতের এক বড় অংশ অতিবাহিত করতেন। নামাজে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তাঁর পবিত্র কদম মুবারক ফুলে যেতো।

হযরত আয়িশা (রা:) বলেন, 'আমি নবী করীম (সা:) এর কাছে একদিন জানতে চাইলাম, 'আপনি কেনো এত কষ্ট স্বীকার করেন, অথচ আল্লাহ তা'য়ালা আপনার পূর্বাপর, অগ্র-পশ্চাৎ সকল কিছুই ক্ষমা করে দিয়েছেন'।

নবী করীম (সা:) স্মিত হেসে আমাকে বলেছেন, আমি কি মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী বান্দাহ্ হবো না! (বুখারী, মুসলিম)

তাঁর পবিত্র চেহারা মুবারক ছিলো সদা হাস্যোজ্জ্বল এবং কথা ও কাজে ছিলো অপূর্ব সমন্বয়। এক কথায় সর্বোন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্টের সকল গুণাবলীর সমাবেশ ছিলো নবী করীম (সা:) এর মধ্যে। ইতোপূর্বেও পৃথিবীতে তাঁর কোনো তুলনা- ছিলো না এবং কিয়ামত পর্যন্তও তাঁর সাথে তুলনা করা যেতে পারে এমন মানুষের আবির্ভাব এ পৃথিবীতে ঘটবে না। কোনো একদিন হযরত আলী (রা:) নবী করীম (সা:) এর কাছে তাঁর রীতি-নীতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জবাবে তিনি বললেন-

الْمَعْرِفَةُ رَأْسِ مَلَىَ অর্থাৎ 'আল্লাহ তা'য়ালার পরিচয় লাভ আমার পুঁজি'। الْعَقل اصل دینی অর্থাৎ 'পরিশুদ্ধ জ্ঞান আমার দ্বীনের ভিত্তি'। الْحُبُّ أَساسي অর্থাৎ 'ভালোবাসা আমার মূলনীতি'। الشَّوْقُ مَرْكَبِي অর্থাৎ 'আগ্রহ আমার বাহন'। الذِّكْرُ أَنيسى অর্থাৎ 'মহান আল্লাহর স্মরণ আমার সঙ্গী'।
- الشَّقَةُ كُنْزِى অর্থাৎ 'আল্লাহ তা'য়ালার ওপর নির্ভরতা আমার ভান্ডার'।
- الْحُزْنَ رَفِيقى অর্থাৎ '(স্বজাতীর মুক্তির জন্য) হৃদয়ে কষ্টবোধ আমার সাথী'।
- الْعَلْمُ سَلَاحِي অর্থাৎ 'জ্ঞান আমার হাতিয়ার'।
- الصَّبْرُ رَدَائِي অর্থাৎ 'ধৈর্য আমার ভূষণ'।
- أَلرَّضَا عَنِيْمَتِي অর্থাৎ 'আল্লাহ তা'য়ালার সন্তুষ্টি আমার জন্য গণীমাত'।
-الْهُجْرُ فَخْرى অর্থাৎ 'বিনম্রতা আমার গৌরব'।
- أَلزَّهْدُ حُرْفَتى অর্থাৎ 'পার্থিব বস্তু নিচয়ের প্রতি অনাগ্রহ আমার পেশা'।
- أليَقين قُوَّتى অর্থাৎ 'বিশ্বাস আমার শক্তি'।
- أَلصَّدْقُ شَفَيْعِي অর্থাৎ 'ন্যায়-পরায়ণতা আমার সহচর'।
- وَالطَّاعَةِ حَسْبي অর্থাৎ 'আল্লাহ তা'য়ালার আনুগত্যের মধ্যেই আমার মর্যাদা'।
- وَالْجِهَادُ خُلُقى অর্থাৎ 'সত্যের পথে সংগ্রাম আমার প্রকৃতি'।
- وَ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلَواةِ অর্থাৎ 'নামাজের মধ্যেই রয়েছে আমার দৃষ্টির প্রশান্তি' ।

নবী করীম (সা:) ব্যতীত মানব সৃষ্টির সূচনা থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত একজন মানুষের মধ্যেও সর্বোত্তম চরিত্রের সকল গুণাবলীর সমাবেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না। মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর হাবীবের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের সকল গুণাবলীর সমাবেশ ঘটিয়ে ছিলেন। বয়োজ্যেষ্ঠ থেকে ছোট্ট শিশু পর্যন্ত কেউই কখনো নবী করীম (সা:) কে প্রথমে সালাম জানানোর সুযোগ পায়নি। যে কোনো বয়সের মানুষকে তিনি প্রথমে সালাম দিতেন। শিশুদের সালাম জানিয়ে তিনি মাথায় হাত বুলিয়ে গভীর মমতায় আদোর জানাতেন। এ কারণে মুসলিম ও অমুসলিম শিশুরাও নবী করীম (সা:) এর পাশে ভীড় জমাতো। নবী করীম (সা:) শিশুদের আদোর জানিয়ে চুমু দিচ্ছেন দেখতে পেয়ে একজন সাহাবী বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো আপনার নাতীসহ সকল শিশুদের আদোর করে চুমু দেন। আমার বেশ কয়েকটি বাচ্চা, আমি তাদের একজনকেও চুমু দিই না'।

নবী করীম (সা:) শিশুকে আদোর করতে করতে বললেন, 'আল্লাহ তা'য়ালা যদি তোমার হৃদয় থেকে দয়ামায়া তুলে নেন তাহলে আমি কি করতে পারি!'

নবী করীম (সা:) কিশোর, তরুণ ও যুবকদের প্রতি সর্বাধিক আগ্রহী ছিলেন এবং তিনি তাঁদের প্রতি গভীর মমতা পোষণ করতেন। কারণ এই কিশোর, তরুণ ও যুবকরাই আল্লাহর যমীনে মহান আল্লাহ তা'য়ালার অবতীর্ণ করা জীবন ব্যবস্থা ইসলাম প্রতিষ্ঠায় সকল প্রকার ত্যাগ স্বীকার করে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ভোগ বিলাসের জীবনে লাথি মেরে তাঁরা সীমাহীন কষ্টের জীবন বেছে নিয়েছে এবং দলে দলে শাহাদাত বরণ করেছে। নবী করীম (সা:) বক্তব্য রাখছেন, অগণিত মানুষের সমাবেশে বসার কোনো স্থান নেই। রাসূল (সা:) দেখলেন তরুণ সাহাবী হযরত জারীর (রা:) দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তব্য শুনছেন।

তাঁর দিকে গভীর মমতার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মহান আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল (সা:) নিজের চাদর মুবারক উঠিয়ে তরুণ সাহাবী হযরত জারীর (রা:) এর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, 'জারীর, তুমি দাঁড়িয়ে রয়েছো কেনো! এই নাও, আমার চাদরের ওপর বসো'।

হযরত জারীর (রা:) দ্রুত হাত বাড়িয়ে আল্লাহর রাসূল (সা:) এর চাদর মুবারক দু'হাতে নিয়ে বুকের মধ্যে জড়িয়ে বার বার চাদরে চুমু দিয়ে বলতে লাগলেন, 'আল্লাহ তা'য়ালা আপনার মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করে দিন হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমি কি পারি আপনার চাদরের ওপর বসতে! আপনার মর্যাদা কত বিশাল!'

নবী করীম (সা:) কিশোর, তরুণ ও যুবকদের কথা উল্লেখ করে লোকদেরকে বলেছেন- اُوصِيْكُمْ بِالشَّبَابِ خَيْرًا فَإِنَّهُمْ عَرَقُ أَفْئِدَة لَقَدْ بَعْشَنِيَ اللَّهُ بِالْحَنِيفِيَّةِ سَمْحًا مُحَالَفِنَ الشَّبَابَ وَ خَالَفْنَ الشَّيُوْحُ
'আমি তোমাদের তরুণদের ব্যাপারে কল্যাণকামী হবার জন্য নসীহত করছি। তাদের হৃদয় কোমল, আল্লাহ তা'য়ালা আমাকে আল্লাহমুখীতা ও উদারতা সহকারে প্রেরণ করেছেন। এ কাজে তরুণরা আমাকে সহযোগিতা করেছে আর বৃদ্ধরা করেছে বিরোধিতা'।

ইতিহাস কথা বলে, নবী করীম (সা:) নবুয়‍্যাত লাভ করার পরে যখন ইসলামী আন্দোলনের সূচনা করলেন তখন চরম প্রতিকুল পরিবেশে সকল প্রকার ভোগ বিলাসের মাথায় পদাঘাত করে কিশোর, তরুণ ও যুবকরাই প্রথমে সাড়া দিয়ে ইসলামের পতাকা তলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। এ সময় সকলের বয়স ছিলো ৪০ বছরের নীচে এবং ৮ বছর, ১৪ থেকে ২০ বছর বয়সের কিশোর তরুণদের ভীড় জমেছিলো নবী করীম (সা:) এর পবিত্র সান্নিধ্যে। আর যারা বিরোধিতা করেছিলো তাদের প্রায় সকলের বয়স ছিলো ৪০ এর ঊর্ধ্বে।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদার সীমা অতিক্রম না করা

📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদার সীমা অতিক্রম না করা


মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর সকল সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে সর্বাধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন। মানুষের মধ্যে সকল নবী-রাসূলকে সর্বাধিক মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে এবং সকল নবী-রাসূলের মধ্যে নবী করীম (সা:) কে সবথেকে বেশি মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে এ বিষয়ে আমরা এ ক্ষুদ্র পরিসরে পবিত্র কুরআন ও হাদীস থেকে সাধ্যানুযায়ী আলোচনা করেছি। পবিত্র কুরআন থেকে আমরা এ কথাও আলোচনা করেছি যে, নবী করীম (সা:) কে সৃষ্টি করেছেন মহান আল্লাহ তা'য়ালা এবং সৃষ্টি কোনোক্রমেই স্রষ্টার সমতুল্য হতে পারে না। স্বয়ং স্রষ্টার যে মর্যাদা ও আসন, সে মর্যাদায় কোনো সৃষ্টি কক্ষণোই উন্নীত হতে পারে না।

নবী ও রাসূলগণ কোন্ ধরনের সৃষ্টি ছিলেন এবং তাঁরা মানব জাতির বাইরে কোনো সৃষ্টি ছিলেন না, এ কথা পবিত্র কুরআনে একাধিকবার ঘোষণা করা হয়েছে। তবে তাঁরা অবশ্যই আমাদের মতো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তাঁদেরকে পরিচালনা করা হতো এবং তাঁদের কাছে প্রয়োজন অনুসারে ফিরিশতা প্রেরণ করা হতো। এক শ্রেণীর মানুষ ধারণা করতো, কোনো মানুষ কখনোই নবী-রাসূল হতে পারে না এবং তাঁরা মানুষের ন্যায় আচরণও করতে পারেন না। নবী-রাসূলকে হতে হবে অবশ্যই বিশেষ কোনো সৃষ্টি এবং তাঁরা হবেন মানব জাতির বাইরের কোনো সৃষ্টি বিশেষ। এ কারণে প্রেরিত নবী- রাসূল সম্পর্কে তাঁরা নানা ধরনের অযৌক্তিক ও উদ্ভট প্রশ্ন তুলেছে এবং আল্লাহ তা'য়ালা তাদেরকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, 'মানুষদের মধ্য থেকেই নবী-রাসূল নির্বাচিত করা হয়েছে, তিনিও মানুষ এবং নবুওয়্যাত-রিসালাতের জন্য আমি যাকে খুশী তাকেই নির্বাচিত করি'।

মানুষ নবী-রাসূল হতে পারে এ বিষয়টি পথভ্রষ্ট লোকদের কাছে বিস্ময়ের উদ্রেক করেছে এবং এ কারণেই তারা নবী-রাসূলদের সম্পর্কে অযৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছে। হযরত নূহ (আ:) যখন ইসলামী আন্দোলনের সূচনা করে মানুষকে মহান আল্লাহ তা'য়ালার দাসত্বের দিকে আহ্বান জানালেন তখন জাতির পথভ্রষ্ট নেতারা সমকালীন জনগণকে বলেছিলো-

فَقَالَ الْمَلَوُا الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَوْمِهِ مَا هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ لَا يُرِيدُ أَنْ يَتَفَضَّلَ عَلَيْكُمْ ط وَلَوْ شَاءَ اللهُ لأَنْزَلَ مَلَئِكَةٌ ج مَّا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي آبَائِنَا الْأَوَّلِينَ

তখন তার জাতির নেতারা, যারা (আগে থেকেই) কুফরী করছিলো- (এ কথা শুনে অন্যদের) বললো, এ (ব্যক্তি) তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ, (আসলে) এ ব্যক্তি তোমাদের ওপর নেতৃত্ব করতে চায়; আল্লাহ তা'য়ালা যদি (নবী পাঠাতেই) চাইতেন তাহলে ফিরিশতাদেরই (নবী করে) পাঠাতেন, আমরা তো এমন কোনো কথা আমাদের পূর্বপুরুষদের যামানায়ও (ঘটেছে বলে) শুনিনি। (সূরা মুমিনুন- ২৪)

হযরত নূহ (আ:) এর পরে আবার যাঁকে নবী-রাসূল হিসাবে প্রেরণ করা হয়েছিলো এবং তিনি যখন মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানালেন, তখন সমকালীন পথভ্রষ্ট নেতারা প্রশ্ন তুললো মানুষ কি কখনো নবী হতে পারে? তাদের অবস্থা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন-

وَقَالَ الْمَلَأُ مِنْ قَوْمِهِ الَّذِيْنَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِلِقَاءِ الْآخِرَةِ وَأَتْرَفْنَاهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لَا مَا هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ لَا يَأْكُلُ مِمَّا تَأْكُلُوْنَ مِنْهُ وَيَشْرَبُ مِمَّا تَشْرَبُوْنَ ص لَا وَلَئِنْ أَطَعْتُمْ بَشَرًا مِّثْلَكُمْ إِنَّكُمْ إِذًا لَّخَاسِرُوْنَ لَا

(নবীর কথা শুনে) তার জাতির নেতৃস্থানীয় লোকজন, যারা আল্লাহকে অস্বীকার করেছে, মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে পরকালে আল্লাহ তা'য়ালার সাথে সাক্ষাতের বিষয়টিকে, (সর্বোপরি) যাদের আমি দুনিয়ার জীবনে প্রচুর ভোগ সামগ্রী দিয়ে রেখেছিলাম, তারা (অন্য লোকদের) বললো, এ ব্যক্তিটি তোমাদের মতো মানুষ ছাড়া অন্য কিছু নয়, তোমরা যা খাও সেও তা খায়, তোমরা যা কিছু পান করো সেও তা পান করে, (এমতাবস্থায়) তোমরা যদি তোমাদেরই মতো একজন মানুষকে (নবী মনে করে তার কথা) মেনে চলো; তাহলে তোমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (সূরা মুমিনুন- ৩৩-৩৪)

মানুষকে পথ দেখানোর জন্য মানুষই প্রয়োজন এবং মানুষের অনুভূতি অনুভব করার জন্য অনুরূপ মানুষই প্রয়োজন। এ কারণে পথভ্রষ্ট লোকদের প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ তা'য়ালা জানিয়ে দিয়েছেন-

قُل لَّوْ كَانَ فِي الْأَرْضِ مَلَئِكَةٌ يَمْشُوْنَ مُطْمَئِنِّيْنَ لَنَزَّلْنَا عَلَيْهِم مِّنَ السَّمَاءِ مَلَكًا رَّسُوْلاً -

(হে নবী,) আপনি (তাদের) বলে দিন, (যদি এ) যমীনে ফিরিশতারাই (বসবাস করতো এবং তারা এখানে) নিশ্চিন্তভাবে ঘুরে বেড়াতো, তাহলে অবশ্যই আমি তাদের জন্যে আসমান থেকে কোনো ফিরিশতাকেই নবী করে পাঠাতাম। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৯৫)

এ সম্পর্কে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে বহু সংখ্যক স্থানে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে জানিয়েছেন-

وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ إِلَّا رِجَالاً تُوْحِي إِلَيْهِمْ فَاسْتَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ - وَمَا جَعَلْنَاهُمْ جَسَدًا لا يَأْكُلُوْنَ الطَّعَامَ وَمَا كَانُوْا خَالِدِينَ

আপনার পূর্বে আমি মানুষকেই (সব সময় নবী বানিয়ে) তাদের কাছে পাঠিয়েছি, তোমরা যদি (বিষয়টি) না জানো তাহলে (আগের) কিতাবওয়ালাদের কাছে জিজ্ঞেস করো। আমি তাদের এমন সব দেহাবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করিনি যে, তারা খেতে পারতো না, (তা ছাড়া) তারা কেউ (এ দুনিয়ায়) চিরস্থায়ী হয়েও থাকেনি! (সূরা আল আম্বিয়া-৭-৮)

নবী করীম (সা:) কে যে ভূখণ্ডে প্রেরণ করা হয়েছিলো সেখানে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা বর্তমান ছিলো এবং তাদের কাছে বিকৃত অবস্থায় পূর্বে অবতীর্ণ করা আসমানী কিতাবও ছিলো। সে কিতাবে নবী-রাসূলদের মানুষ হওয়া বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিলো বিধায় আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর রাসূলকে জানিয়ে দিলেন, 'যারা আপনার মানুষ হওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন তুলছে তাদেরকে বলুন, পূর্বে যাদের নবী-রাসূল নির্বাচিত করে তাদের প্রতি যেসকল কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে, তারাও তো মানুষই ছিলেন এবং বিষয়টি কিতাবে উল্লেখ রয়েছে'।

নবী-রাসূলগণ মানুষ ছিলেন এবং মানুষকে যে সকল বৈশিষ্ট মণ্ডিত করা হয়েছে সেসকল বৈশিষ্ট্য তাঁদের মধ্যেও বিদ্যমান ছিলো। তবে মানবীয় গুণ-বৈশিষ্ট প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাঁরা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের নীতি অবলম্বন করতেন না। তাঁরা মহান আল্লাহর নির্দেশিত পথে ও ক্ষেত্রে তাদের মানবীয় গুণ-বৈশিষ্ট, আবেগ-উচ্ছাস, দুঃখ- বেদনা, কামনা-বাসনা, ইচ্ছা- অনিচ্ছা, শক্তি-বীরত্ব ইত্যাদি প্রয়োগ ও প্রকাশ করতেন। তাঁরা সংসার জীবনে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়- স্বজন, প্রতিবেশী এবং সাধারণ মানুষের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করেছেন। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِّنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجًا وَذُرِّيَّةً طَ
(হে নবী,) আপনার পূর্বেও আমি (অনেক) রাসূল পাঠিয়েছি এবং তাদের জন্যে আমি স্ত্রী এবং সন্তান সন্ততিও বানিয়েছিলাম। (সূরা আর রা'দ- ৩৮)

সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে যাঁকে সর্বাধিক মর্যাদায় মহান আল্লাহ ভূষিত করেছেন, যিনি আল্লাহ তা'য়ালার কাছে সর্বাধিক প্রিয়, অযত্ন ও অবহেলাভরে যাঁর নাম উচ্চারণ করাও নিষেধ এবং করলে আল্লাহ তা'য়ালা নারাজ হন, জীবিত থাকাকালে যাঁর সম্মুখে উচ্চকণ্ঠে কথা বলা ছিলো নিষেধ এবং ইন্তেকালের পরও যাঁর রাওজা মুবারকের আশেপাশে উচ্চস্বরে কথা বলা নিষেধ, তাঁকেও মহান আল্লাহ তা'য়ালা মানবীয় বৈশিষ্ট দিয়ে মানুষ হিসাবেই সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর সম্পর্কে সমকালীন পথভ্রষ্ট লোকজন যখন প্রশ্ন তুললো-

وَقَالُوا مَالِ هَذَا الرَّسُوْلِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ وَيَمْشِي فِي الْأَسْوَاقِ طَ لَوْلَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مَلَكُ فَيَكُونَ مَعَه نَذِيرًا -

ওরা বলে, এ আবার কেমন (ধরনের) রাসূল যে (আমাদের মতো করেই) খাবার খায় এবং (আমাদের মতোই) হাটে বাজারে চলাফেরা করে? (সূরা ফুরকান- ৭)

এসব উদ্ভট প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্য মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রিয় হাবীবকে বলতে বললেন-
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوْحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا ع
(হে নবী,) আপনি (এদের) বলুন, আমি তো তোমাদের মতোই একজন (রক্ত মাংসের) মানুষ, তবে আমার ওপর ওহী অবতীর্ণ হয় (আর সে ওহীর মূল কথা হচ্ছে), তোমাদের মা'বুদ হচ্ছেন একজন, অতএব তোমাদের মাঝে যদি কেউ তার মালিকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন (সর্বদা) সৎ কাজ করে, সে যেন কখনো তার মালিকের দাসত্ব করতে গিয়ে অন্য কাউকে শরীক না করে। (সূরা আল কাহাফ- ১১০)

আল্লাহ তা'য়ালা স্বয়ং তাঁর নবীকে বলছেন, 'আপনি সকলকে জানিয়ে দিন, আমি তোমাদেরই অনুরূপ একজন মানুষ'। নবী করীম (সা:) মানুষ ছিলেন এ কথা অবশ্যই সত্য তবে তিনি ছিলেন অসাধারণ মানুষ। মানব তবে সাধারণ মানব নন, মহামানব। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তিনি অতিমানব ছিলেন না বা মানবীয় গুণ-বৈশিষ্টের সীমার বাইরেরও কিছু ছিলেন না।

কিন্তু এ কথা সুস্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে এবং তাঁর সম্পর্কে আলোচনার ক্ষেত্রে কথায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে যে, তিনি মানুষ ছিলেন তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। আমরা যে কোনো ধরনের কর্মকাণ্ড করতে পারি, যে কোনো ধরনের পাপের কাজে জড়িত হতে পারি। মুখে যে কোনো কথা উচ্চারণ করতে পারি। আমাদের চিন্তা-চেতনা, আবেগ-উচ্ছাস, দুঃখ-যন্ত্রণা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, কামনা-বাসনা, শক্তি-বীরত্ব ইত্যাদি যে কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারি। আমরা তাড়িত হই আমাদের চিন্তাধারা দিয়ে এবং সকল ক্ষেত্রে ভুল করতে পারি। আমরা যে কোনো মুহূর্তে আল্লাহ তা'য়ালার নির্দেশিত সীমা অতিক্রম করে পাপে জড়িত হতে পারি। আমরা নিদ্রা অবস্থায় পৃথিবীর সকল অনুভূতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই, জাগ্রত অবস্থায় দৃষ্টির বাইরের কিছুই দেখি না।

কিন্তু নবী করীম (সা:) এ সকল কিছুর ঊর্ধ্বে ছিলেন। তিনি নবুয়‍্যাত লাভ করার পূর্বেও সামান্যতম পাপের কাজে কখনো জড়িত হননি এবং নবুয়‍্যাত লাভ করার পরে তো প্রশ্নই উঠে না। তাঁর নিদ্রা অবস্থাতেও আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে অনুভূতিহীন করেননি এবং দৃষ্টির বাইরের সকল কিছুই আল্লাহ তাঁকে প্রয়োজন অনুযায়ী দেখা ও অনুভব করার শক্তি দান করেছিলেন। মানবীয় সকল গুণ-বৈশিষ্ট তিনি মহান আল্লাহ তা'য়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের পথে ও ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন। সার্বক্ষণিকভাবে মহান মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে আপন হেফাজতের চাদরে আবৃত রেখেছেন।

নবী করীম (সা:) কে মানুষ বলা যাবে না, তিনি মৃত্যুবরণ করেননি বরং কায়া পরিবর্তন করেছেন, তিনি অতি মানব ছিলেন বা নূরের তৈরী ছিলেন। তিনি আপন শক্তিবলে অদৃশ্যের সংবাদ জানতেন, তিনি নিজস্ব শক্তিবলে যা খুশী তাই করতে পারতেন, অন্যের ভাগ্য পরিবর্তন করার ক্ষমতা তাঁর ছিলো, ইন্তেকালের পরও তাঁর উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত হন, এ সকল ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস শুধু কুরআন-হাদীসের বিপরীতই নয়, স্বয়ং নবী করীম (সা:) এর মর্যাদার সাথে চরমভাবে সাংঘর্ষিক।

নবী করীম (সা:) এর মর্যাদা নিরুপণ করতে হবে কুরআন ও হাদীস দিয়ে, আবেগ-উচ্ছ্বাস ও প্রেম-ভালোবাসার ওপর নির্ভর করে তাঁর মর্যাদা নিরুপণ করা যাবে না। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাঁরা তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করেন, কথা-বার্তায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং কুরআন ও হাদীসে তাঁর সম্পর্কে যে সীমারেখা অঙ্কন করা হয়েছে, তা অতিক্রম করা যাবে না। আবেগ- উচ্ছ্বাস, ভক্তি-ভালোবাসার আতিশয্যে নবী করীম (সা:) সম্পর্কে এমন কোনো কথা মুখে উচ্চারণ দূরে থাক চিন্তার জগতেও স্থান দেয়া যাবে না, যা শুধুমাত্র মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা সম্পর্কেই প্রযোজ্য।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 সকল নবীর চাওয়া-পাওয়া ছিলো কেবলমাত্র আল্লাহর কাছে

📄 সকল নবীর চাওয়া-পাওয়া ছিলো কেবলমাত্র আল্লাহর কাছে


এ পৃথিবীতে মহান আল্লাহ সকল সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে সর্বাধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন এবং মানুষের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন নবী-রাসূলদের। সকল নবী-রাসূলদের মধ্যে কাউকে কাউকে আল্লাহ তা'য়ালা বিশেষ মর্যাদা দানে ধন্য করেছেন। নবী-রাসূলের সংখ্যা যতই হোক না কেনো, মর্যাদাবান নবী-রাসূলের কথা ওহীর মাধ্যমে আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে জানিয়েছেন এবং তাদের প্রসঙ্গ পবিত্র কুরআনে আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ যেনো নবী-রাসূলদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এ কারণেই আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে তাদের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন, (প্রকৃত কারণ মহান আল্লাহই ভালো জানেন) পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নবী-রাসূলের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, প্রত্যেক নবী রাসূলই পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন, বিপদ-আপদে নিপতিত হয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন এবং কাউকে বিরোধিরা হত্যা পর্যন্ত করেছে।

সাধারণ মানুষ ইসলামের বিধান অনুসারে নিজের জীবন পরিচালনা করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করবে এবং করতে পারবে বিধায় আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ মহান আল্লাহর নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে কোনোক্রমেই নবী-রাসূলের মর্যাদায় নিজেকে উন্নীত করতে পারবে না। নবী-রাসূলদের যে মর্যাদা ও ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছিলো, তার কোটি ভাগের এক ভাগও অর্জন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, নবী-রাসূলগণের যেসকল সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন, তাদের পবিত্র পায়ের ধূলির সমমর্যাদা অর্জনও সম্ভব নয়। নবী করীম (সা:) বলেছেন, 'সমগ্র পৃথিবীর মুসলমানদের দানের মর্যাদা আমার মদীনার আনসারদের এক মুষ্ঠি দানের মর্যাদাও অর্জন করতে পারবে না'। (বুখারী)

সুতরাং মর্যাদার দিক থেকে নবী-রাসূলগণ এবং সাহাবায়ে কেরাম সকল মানুষ, মুমিন, মুসলিম ও মহান আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনকারী (আউলিয়া নামে পরিচিত) লোকদের তুলনায় উত্তম। আবার সকল নবী-রাসূলদের মধ্যে নবী করীম (সা:) এর মর্যাদা সর্বাধিক। এখন আমরা পবিত্র কুরআন ও হাদীস থেকে জানার চেষ্টা করবো সকল নবী-রাসূল ও তাঁদের সাহাবায়ে কেরাম সকল বিষয়ে কার দরবারে ধর্ণা দিয়েছেন।

পৃথিবীর প্রথম মানুষ, প্রথম নবী-রাসূল এবং প্রথম বিজ্ঞানী হযরত আদম (আ:) বিপদগ্রস্থ হয়ে কেবলমাত্র মহান আল্লাহর দরবারে ধর্ণা দিয়েছেন। ইবলিশ শয়তানের প্রতারণার জালে প্রতারিত হয়ে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে হযরত আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:) উভয়েই মহান মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীদের দরবারে ফরিয়াদ জানালেন-

رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِنْ لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
হে আমাদের মালিক, আমরা আমাদের নিজেদের ওপর জুলুম করেছি, তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না করো তাহলে অবশ্যই আমরা চরম ক্ষতিগ্রস্তদের দলে শামিল হয়ে যাবো। (সূরা আল আ'রাফ-২৩)

পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ:) তাঁর এই আবেদনের মাধ্যমে পৃথিবীর অনাগত মানুষকে শিক্ষা দিলেন, সকল প্রয়োজনে কেবলমাত্র মহান আল্লাহর দরবারেই আবেদন করতে হবে। হযরত নূহ্ (আ:), যাঁকে অনেকেই বলে থাকেন 'ছানায়ে আদম' অর্থাৎ দ্বিতীয় আদম। এ কথা বলার কারণ হলো, মহাপ্লাবনের পর হযরত নূহ্ (আ:) থেকেই মানব বংশের বিস্তার ঘটেছে। তিনি তাঁর অবাধ্য জাতিকে সত্য পথে আনার লক্ষ্যে সকল প্রকার পন্থা অবলম্বন করার পরেও সে জাতি যখন মহান আল্লাহর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করলো না বরং আল্লাহর নবী হযরত নূহ (আ:) এর প্রতি অত্যাচারের মাত্রা বৃদ্ধিই করে চললো, তখন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সে জাতিকে ধ্বংস করে দেয়ার ফায়সালা এসে গেলো। তিনি মহান আল্লাহর কাছে আবেদন জানালেন-

وَقَالَ نُوْحٌ رَّبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا - إِنَّكَ إِنْ تَذَرْهُمْ يُضِلُّوا عِبَادَكَ وَلَا يَلِدُوا إِلَّا فَاجِرًا كَفَّارًا - رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَنْ دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ طَ وَلَا تَزِدِ الظَّالِمِينَ إِلَّا تَبَارَاعِ

নূহ্ বললো, হে আমার মালিক, এ যমীনের অধিবাসী (জালিমদের) একজন (গৃহবাসী)-কেও তুমি (আজ শাস্তি থেকে) রেহাই দিয়ো না, (আজ) যদি তুমি এদের (শাস্তি থেকে) অব্যাহতি দাও, তাহলে এরা (পুনরায়) তোমার বান্দাদের পথভ্রষ্ট করে দিবে (শুধু তাই নয়), এরা (ভবিষ্যতেও) দুরাচার পাপী কাফির ছাড়া কাউকেই জন্ম দিবে না। হে আমার প্রতিপালক, তুমি আমাকে, আমার পিতামাতাকে- তোমার ওপর ঈমান এনে যারা আমার (সাথে ঈমানের এই) ঘরে আশ্রয় নিয়েছে, এমন সব ব্যক্তিদের এবং সব ঈমানদার পুরুষ ও মহিলাদের ক্ষমা করে দাও, জালিমদের জন্যে তুমি চূড়ান্ত ধ্বংস ছাড়া কিছুই তুমি বৃদ্ধি করো না। (সূরা নূহ- ২৬-২৮)

নিজ জাতির কল্যাণ অকল্যাণ করার কোনো ক্ষমতা হযরত নূহ্ (আ:) এর ছিলো না এবং একমাত্র মহান আল্লাহ ব্যতীত এ ক্ষমতা কারোই নেই। ঠিক এ কারণেই মহান নবী হযরত নূহ (আ:) যা কিছু আবেদন করা প্রয়োজন তা মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা সমীপেই করেছিলেন। মহান আল্লাহ তা'য়ালার করুণা, রহমত ও ক্ষমা ব্যতীত একজন নবী-রাসূলের পক্ষেও মুহূর্তকাল টিকে থাকা সম্ভব ছিলো না। নিজ সন্তানকে অথৈ পানিতে ডুবতে দেখে পিতা হিসাবে হযরত নূহ্ (আ:) এর অন্তর পিতৃস্নেহে বিগলিত হয়ে গেলো। পবিত্র কুরআন বর্ণনা করছে-

وَنَادَى نُوحٌ رَّبَّه فَقَالَ رَبِّ إِنَّ ابْنِي مِنْ أَهْلِى جِ وَإِنَّ وَعْدَكَ الْحَقُّ وَأَنتَ أَحْكَمُ الْحَاكِمِينَ

নূহ্ (তার ছেলেকে ডুবতে দেখে) তার মালিককে ডেকে বললো, হে আমার মালিক, আমার ছেলে তো আমারই পরিবারের এক সদস্য, (আমার আপনজনদের ব্যাপারে) তোমার ওয়াদা অবশ্যই সত্য, আর তুমিই হচ্ছো সর্বোচ্চ বিচারক। (সূরা হৃদ-৪৫)

ইসলামের বিপরীত দলের অন্তর্ভুক্ত নিজের ঔরসজাত সন্তানকে নিজের পরিবারের একজন বলে উল্লেখ করা মহান আল্লাহর পছন্দ হয়নি। হযরত নূহ (আ:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা স্পষ্টই জানিয়ে দিলেন-

قَالَ يَا نُوحُ إِنَّهُ لَيْسَ مِنْ أَهْلِكَ جِ إِنَّهُ عَمَلٌ غَيْرُ صَالِحٍ رَ فَلَا تَسْأَلْنِ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ طَ إِنِّي أَعِظُكَ أَنَّ تَكُوْنَ مِنَ الْجَاهِلِينَ

আল্লাহ তা'য়ালা বললেন, হে নূহ, সে তোমার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নয়, সে তো হলো এক অসৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তি, অতএব তোমার যে বিষয়ের জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে আমার কাছে তুমি কিছু চেয়ো না; আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, নিজেকে কোনো অবস্থায় জাহিলদের দলে শামিল করো না। (সূরা হূদ-৪৬)

নিজের অবস্থান উপলব্ধি করে হযরত নূহ্ (আ:) সাথে সাথে মহান মালিক আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন- قَالَ رَبِّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ طَ وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُنْ مِّنَ الْخَاسِرِينَ সে বললো, হে আমার মালিক, যে বিষয় সম্পর্কে আমার কোনো জ্ঞান নেই, সে ব্যাপারে কিছু চাওয়া থেকে আমি তোমার কাছে পানাহ্ চাই; তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না করো এবং আমার ওপর দয়া না করো, তাহলে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো। (সূরা হৃদ-৪৭)

নিজের সন্তানের কল্যাণ অকল্যাণ করার কোনো ক্ষমতাই হযরত নূহ্ (আ:) কে দেয়া হয়নি এবং সে ক্ষমতা কেবলমাত্র মহান আল্লাহরই নিয়ন্ত্রণে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- وَنُوحًا إِذْ نَادَى مِنْ قَبْلُ فَاسْتَجَبْنَا لَه فَنَجَّيْنَاهُ وَأَهْلَهُ مِنَ الْكَرْبِ الْعَظِيمِ جِ নূহ্ যখন আমাকে ডেকেছিলো, তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে ও তার পরিবার পরিজনদের আমি এক মহাসঙ্কট থেকে উদ্ধার করেছিলাম। (সূরা আল আম্বিয়া-৭৬)

আল্লাহর নবী হযরত হূদ (আ:) এর বিরুদ্ধে ইসলাম বিরোধী গোষ্ঠী ভয়ঙ্কর যড়যন্ত্র শুরু করলো। বিষয়টি অনুভব করে হযরত হূদ (আ:) তাদেরকে স্পষ্টই জানিয়ে দিলেন- إِنِّي تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ رَبِّي وَرَبِّكُم ط مَّا مِنْ دَابَّةٍ إِلَّا هُوَ آخِذُمٍ بِنَاصِيَتِهَا إِنَّ رَبِّي عَلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ আমি তো আল্লাহ তা'য়ালার ওপরই ভরসা করি, (যিনি) আমার মালিক, তোমাদেরও মালিক; বিচরণশীল এমন কোনো প্রাণী নেই যার নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতের মুঠোয় নয়; অবশ্যই আমার মালিক সঠিক পথের ওপর রয়েছেন। (সূরা হৃদ- ৫৬)

শত্রু পক্ষের অপতৎপরতা দেখে হযরত হূদ (আ:) পৃথিবীর কোনো শক্তির ওপর নির্ভর করেননি বা কোনো শক্তিধর মানুষের কাছেও সাহায্য চাননি। তিনি শত্রুপক্ষকে জানিয়ে দিলেন, 'তোমরা যা খুশী তাই করতে পারো, আমার ও তোমাদের যিনি মালিক আমি কেবলমাত্র তাঁরও ওপরই নির্ভর করি এবং তাঁর কাছেই সাহায্য কামনা করি'। হযরত সালেহ (আ:) নিজ জাতিকে মহান আল্লাহ তা'য়ালা কর্তৃক প্রেরিত ইসলামী জীবন ব্যবস্থা অনুসরণের জন্যে আহ্বান জানালেন। তাঁর জাতি তাঁকে ইসলামী বিধান ত্যাগ করে নিজের আবিষ্কৃত মতবাদ-মতাদর্শের অনুসরণ করার আহ্বান করলো। হযরত সালেহ (আ:) নিজ জাতিকে জানিয়ে দিলেন-

قَالَ يَا قَوْمِ أَرَأَيْتُمْ إِنْ كُنتُ عَلَى بَيِّنَةٌ مِّن رَّبِّي وَآتَانِيْ مِنْهُ رَحْمَةً فَمَنْ يَنْصُرُنِي مِنَ اللَّهِ إِنْ عَصَيْتُه فَمَا تَزِيْدُونَنِي غَيْرَ تَخْسِيرٍ -

সে বললো, হে আমার জাতি, তোমরা কি এ বিষয়টি নিয়ে একটুও চিন্তা করে দেখোনি যে, যদি আমি আমার মালিকের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট দলীলের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং তিনি যদি আমাকে তাঁর অনুগ্রহ দিয়ে (ধন্য করে) থাকেন, (তা সত্ত্বেও) যদি আমি কোনো গোনাহ্ করে বসি তাহলে কে এমন আছে, যে আল্লাহ তা'য়ালার মুকাবিলায় আমাকে সাহায্য করবে? (আসলে অন্যায় আবদার করে) তোমরা আমার ক্ষতির (পরিমাণই) শুধু বৃদ্ধি করছো? (সূরা হূদ-৬৩)

হযরত সালেহ্ (আ:) প্রকৃত সত্য তুলে ধরে এ কথা স্পষ্ট করে দিলেন যে, মহান আল্লাহ ব্যতীত কেউই কল্যাণ অকল্যাণ করার ক্ষমতা রাখে না এবং আল্লাহর গ্রেফতারীর মোকাবেলায় কেউই সাহায্য করতে পারে না। হযরত ইবরাহীম (আ:), মহান আল্লাহ তা'য়ালা যাঁকে মুসলিম মিল্লাতের পিতা হিসাবে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন। নিজ পিতাকে তিনি জানিয়ে দিলেন, 'আপনি যার গোলামী করছেন, নিজের আশা আকাঙ্খার কথা যার কাছে প্রকাশ করছেন, অকল্যাণ থেকে যার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছেন, আমি কিন্তু তা করি না'। সন্তানের মুখ থেকে এ কথা শুনে পিতা হুমকি প্রদর্শন করলো, 'আমি যার গোলামী করি তুমি যদি তাকে না মানো তাহলে আমি তোমাকে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করবো'। এবার ইবরাহীম (আ:) নিজ পিতাকে জানিয়ে দিলেন-

وَأَعْتَزِلُكُمْ وَمَا تَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ وَأَدْعُوا رَبِّيْ ۖ عَسَى أَلا أَكُوْنَ بِدُعَاءِ رَبِّيْ شَقِيًّا -

আমি তোমাদের কাছ থেকে পৃথক হয়ে যাচ্ছি এবং আল্লাহ তা'য়ালাকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের ডাকো তাদের সবার কাছ থেকে (পৃথক হয়ে যাচ্ছি), আমি তো আমার মালিককেই ডাকতে থাকবো, আশা (করি) আমার মালিককে ডেকে আমি কখনো ব্যর্থকাম হবো না। (সূরা মারইয়াম-৪৮)

মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) কেবলমাত্র আল্লাহ তা'য়ালাকেই ডেকেছেন এবং সকল আবেদনও তাঁর কাছেই করেছেন। পবিত্র কা'বা শরীফ নির্মাণকালে নিজেদের উদ্দেশ্য ও শ্রম কবুল করার জন্যে তাঁরা পিতা-পুত্র মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার কাছে আবেদন জানালেন- رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا طَ إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ হে আমাদের মালিক, (আমরা যে উদ্দেশ্যে এ ঘর নির্মাণ করেছি, তা) তুমি আমাদের কাছ থেকে কবুল করো, একমাত্র তুমিই সব কিছু জানো এবং সব কিছু শোনো। (সূরা বাকারা-১২৭)

হযরত ইবরাহীম (আ:) এবং তাঁর সন্তান হযরত ইসমাঈল (আ:) নিজেদের কল্যাণ কামনায় উভয়ে সম্মিলিতভাবে মহান মালিকের কাছে এভাবে দোয়া করেছেন- رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ صَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا طَ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

হে আমাদের মালিক, আমাদের উভয়কেই তুমি তোমার (অনুগত) মুসলিম বান্দা বানাও এবং আমাদের (পরবর্তী) বংশধরদের মাঝ থেকেও তুমি তোমার একদল অনুগত (বান্দা) বানিয়ে দাও, (হে আমাদের মালিক), তুমি আমাদের (তোমার দাসত্বের) আনুষ্ঠানিকতাসমূহ দেখিয়ে দাও এবং তুমি আমাদের ওপর দয়াপরবশ হও, কারণ তুমি অত্যন্ত দয়াপরবশ ও পরম দয়ালু। (সূরা বাকারা-১২৮)

কোনো নবী-রাসূলই শান্তি ও নিরাপত্তা দেয়ার অধিকারী ছিলেন না, বরং তাঁরাই মহান আল্লাহ তা'য়ালার কাছে নিরাপত্তার জন্যে আবেদন করেছেন- وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ آمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَنْ تَعْبُدَ الْأَصْنَامَ (স্মরণ করো), যখন ইবরাহীম (আল্লাহর কাছে) দোয়া করলো, হে আমার মালিক, এ (মক্কা) শহরকে (শান্তি ও) নিরাপত্তার শহরে পরিণত করো এবং আমাকে ও আমার সন্ত ান সন্ততিদের মূর্তিপূজা করা থেকে দূরে রেখো। (সূরা ইবরাহীম-৩৫)

অনুর্বর ভূমিকে উর্বর করার ক্ষমতা, রিযকের ব্যবস্থা করা এবং মানুষের হৃদয়কে পরিবর্তন করার ক্ষমতা কেবলমাত্র মহান আল্লাহর। হযরত ইবরাহীম (আ:) মহান আল্লাহর কাছে এভাবে আবেদন করেছেন- رَبَّنَا إِنِّي أَسْكَنتُ مِنْ ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِندَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ لَا رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُمْ مِّنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ -

হে আমাদের মালিক, আমি আমার কিছু সন্তানকে তোমার পবিত্র ঘরের কাছে একটি অনুর্বর উপত্যকায় এনে আবাদ করলাম, যাতে করে-হে আমাদের মালিক, এরা নামায প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তুমি (তোমার দয়ায়) এমন ব্যবস্থা করো যেনো মানুষদের অন্তর এদের দিকে অনুরাগী হয়, তুমি ফলমূল দিয়ে তাদের রিযকের ব্যবস্থা করো, যাতে ওরা তোমার (নিয়ামতের) শোকর আদায় করতে পারে। (সূরা ইবরাহীম-৩৭)

সন্তান দেয়ার মালিক মহান আল্লাহ তা'য়ালা, প্রার্থনা কবুল করার মালিকও মহান আল্লাহ তা'য়ালা এবং কিয়ামতের ময়দানে মুসিবতের দিনে সাহায্যও করতে পারেন কেবলমাত্র মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। কোনো পীর বা বুযুর্গ নিজেদের অনুসারীদের বাঁচানো দূরে থাক, নবী-রাসূলও নিজেদের পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন বা নিজের অনুসারীদের কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহ তা'য়ালার গ্রেফতারী থেকে বাঁচাতে পারবেন না। আল্লাহ তা'য়ালা একান্ত অনুগ্রহ করে যদি কাউকে এ অধিকার দান করেন তাহলে সে কথা স্বতন্ত্র। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) মহান মালিক আল্লাহর কাছে এভাবে আবেদন জানিয়েছেন-

رَبَّنَا إِنَّكَ تَعْلَمُ مَا تُخْفِي وَمَا نُعْلِنُ ط وَمَا يَخْفَى عَلَى اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَهَبَ لِي عَلَى الْكِبَرِ إِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَقَ طَ إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ الدُّعَاءِ - رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي فِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ - رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُوْمُ الْحِسَابُ

হে আমাদের মালিক, আমরা যা কিছু গোপন করি এবং যা কিছু প্রকাশ করি, নিশ্চয়ই তুমি তা সব জানো; আসমানসমূহে কিংবা যমীনের (যেখানে যা কিছু ঘটে এর) কোনোটাই আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না। সব প্রশংসা আল্লাহ তা'য়ালার জন্যে, যিনি আমাকে আর (এ) বৃদ্ধ বয়সে ইসমাঈল ও ইসহাক (তুল্য দুটো নেক সন্তান) দান করেছেন; অবশ্যই আমার মালিক (তাঁর বান্দাদের) দোয়া শোনেন। হে আমার মালিক, তুমি আমাকে নামায প্রতিষ্ঠাকারী বানাও, আমার সন্তানদের মাঝ থেকেও (নামাযী বান্দা বানাও), হে আমাদের মালিক, আমার দোয়া তুমি কবুল করো। হে আমাদের মালিক, যেদিন (চূড়ান্ত) হিসাব কিতাব হবে, সেদিন তুমি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সকল ঈমানদার মানুষদের (তোমার অনুগ্রহ দ্বারা) ক্ষমা করে দিয়ো। (সূরা ইবরাহীম- ৩৮-৪১)

রোগাক্রান্ত হলে, বিপদে নিপতীত হয়ে বা মনের আশা পূরণের জন্যে একশ্রেণীর মানুষ পীর, বুযুর্গ বা মৃত কোনো মানুষের কবরে গিয়ে প্রার্থনা করে। কেউ কেউ মনে করে অমুক মাজারে মানত করলে জ্ঞান বিবেক-বুদ্ধি বৃদ্ধি পাবে বা পরীক্ষায় সফল হওয়া যাবে। আবার কেউ মনে করে অমুক পীর সাহেব কিয়ামতের দিন আমাকে উদ্ধার করবেন। অথচ দেখুন নবী-রাসূলগণের সীরাত কি ছিলো এবং তাঁরা কোন্ মহাশক্তির কাছে আবেদন করেছেন। হযরত ইবরাহীম (আ:) মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা সম্পর্কে কী বলছেন এবং কিভাবে আবেদন করছেন দেখুন-

الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِيْنِ لا وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِيْنَا وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِيْنِ ص وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينِ لا وَالَّذِي أَطْمَعُ أَنْ يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ طَ رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِيْنَ لَا

তিনি আমাকে পয়দা করেছেন, অতঃপর তিনিই আমাকে (অন্ধকারে) চলার পথ দেখিয়েছেন, তিনিই আমাকে আহার্য দেন, তিনিই (আমার) পানীয় সরবরাহ করেন, আর আমি যখন রোগাক্রান্ত হই তখন তিনিই আমাকে রোগমুক্ত করেন, তিনিই আমার মৃত্যু ঘটাবেন, তিনিই আমাকে আবার (নতুন) জীবন দিবেন, শেষ বিচারের দিন তাঁর কাছ থেকে আমি এ আশা করবো, তিনি আমার গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। (অত:পর ইবরাহীম দোয়া করলো,) হে আমার মালিক, তুমি আমাকে জ্ঞান দান করো এবং আমাকে নেককার মানুষদের সাথে মিলিয়ে রেখো। (সূরা আশ শুয়ারা-৭৮-৮৩)

নিজের কল্যাণ ও অকল্যাণ করার কোনো ক্ষমতা নবী-রাসূলেরই ছিলো না, তাঁরা সকলেই ছিলেন মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার মুখাপেক্ষী। হযরত ইবরাহীম (আ:)- কে যখন শত্রুপক্ষ প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করলো সে আগুনের প্রতি আল্লাহ তা'য়ালা নির্দেশ দিলেন-

قُلْنَا يَا نَارُ كُوْنِي بَرْدًا وَسَلَمًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ لَا

আমি (আগুনকে) বললাম, হে আগুন, তুমি ইবরাহীমের জন্যে শীতল ও শান্তিময় হয়ে যাও। (সূরা আল আম্বিয়া-৬৯)

নবী-রাসূলগণ নিজ আত্মীয়-স্বজন, অনুসারী ও সমকালীন সকল লোকদের কাছে এ কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাদের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই এবং মহান মালিক আল্লাহর গ্রেফতারী থেকে রক্ষা করার অধিকার তাদের নেই। ইবরাহীম (আ:) নিজ পিতাকে বললেন-

لأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ وَمَا أَمْلِكُ لَكَ مِنَ اللَّهِ مِنْ شَيْ طَ رَبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ -

আমি তোমার জন্যে (আল্লাহর দরবারে) অবশ্যই ক্ষমা প্রার্থনা করবো, অবশ্য আল্লাহর কাছে থেকে (ক্ষমা আদায় করার) আমার কোনোই ইখতিয়ার নেই, (ইবরাহীম ও তার অনুসারীরা বললো,) হে আমাদের মালিক, আমরা তো কেবল তোমার ওপর ভরসা করেছি এবং আমরা তোমার দিকেই ফিরে এসেছি এবং (আমাদের) তো তোমার দিকেই ফিরে যেতে হবে। (সূরা আল মুমতাহানা-৪)

নবী-রাসূলগণ জালিমের জুলুম থেকে নিজেদের হেফাজত করতে পারতেন না, বরং তাঁরা মহান মালিকের কাছে বিপদমুক্ত থাকার জন্যে আবেদন করেছেন। হযরত ইবরাহীম ও তাঁর অনুসারীগণ আল্লাহর কাছে এভাবে আবেদন করেছেন-

رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلَّذِيْنَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا جِ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

হে আমাদের মালিক, তুমি আমাদের (জীবনকে) কাফিরদের নিপীড়নের নিশানা বানিয়ো না, হে আমাদের মালিক, তুমি আমাদের গোনাহ্ খাতা ক্ষমা করে দাও, অবশ্যই তুমি পরাক্রমশালী ও পরম কুশলী। (সূরা আল মুমতাহানা-৫)

হযরত লূত (আ:) এর জাতি মহান আল্লাহর গযবে নিপতীত হবার মতো গর্হিত কর্মে লিপ্ত ছিলো এবং তাদের ওপর যখন গযব নেমে এলো সে গযব থেকে মুক্ত থাকার কোনো ক্ষমতাই তাঁর ছিলো না। আল্লাহ তা'য়ালা একান্ত অনুগ্রহ করে তাঁকে হেফাজত করেছিলেন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَلُوْطًا آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ تَعْمَلُ الْخَبَائِثَ طَ إِنَّهُمْ كَانُوْا قَوْمَ سَوْءٍ فَاسِقِينَ لَا

আমি দূতকেও প্রজ্ঞা দান করেছিলাম, তাকেও আমি এমন একটি জনপদ থেকে উদ্ধার করে এনেছি যার অধিবাসীরা অশ্লীল কাজ করতো; সত্যিই তারা ছিলো জঘন্য বদ ও গোনাহ্গার জাতি। (সূরা আল আম্বিয়া-৭৪)

পাহাড়-পর্বত ও পাখ-পাখালী হযরত দাউদ (আ:) এর অনুগত ছিলো কিন্তু এসব কিছুকে নিজের অনুগত রাখার কোনো ক্ষমতা তাঁর ছিলো না। আল্লাহ তা'য়ালা একান্ত অনুগ্রহ করে এসব ক্ষমতা তাঁকে দান করেছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন-

فَفَهَّمْنَاهَا سُلَيْمَانَ جِ وَكُلاً آتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا رَ وَّسَخَّرْنَا مَعَ دَاوِدَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَالطَّيْرَ طَ وَكُنَّا فَاعِلِينَ

আমি পাহাড়-পর্বত এবং পাখ-পাখালীকেও দাউদের অনুগত করে দিয়েছিলাম যেনো তারাও (তার সাথে) আল্লাহ তা'য়ালার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে পারে; আর আমিই (এসব কিছু) ঘটাচ্ছিলাম। (সূরা আল আম্বিয়া-৭৯)

তিনি হাতের সাহায্যে লোহার মতো কঠিন ধাতব পদার্থ গলিয়ে লৌহজাত দ্রব্য নির্মাণ করতে পারতেন। এ ক্ষমতাও তাঁকে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা দান করেছিলেন-

وَلَقَدْ آتَيْنَا دَاوُدَ مِنَّا فَضْلاً ط يَا جِبَالُ أَوِّبِي مَعَهُ وَالطَّيْرَجِ وَأَلَنَّا لَهُ الْحَدِيْدَلَا أَنِ اعْمَلْ سَابِغَاتٍ وَقَدَّرْ فِي السَّرْدِ وَاعْمَلُوا صَالِحًاطَ إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيْرٌ -

আমি দাউদকে আমার কাছ থেকে (অনেকগুলো) অনুগ্রহ দান করেছিলাম; (এমনকি আমি পাহাড়কেও এই বলে আদেশ দিয়েছিলাম,) হে পর্বতমালা, তোমরাও তার সাথে আমার তাসবীহ পাঠ করো, (একই আদেশ আমি) পাখীকুলকেও দিয়েছিলাম, আমি তার জন্যে লোহাকে নরম করে দিয়েছিলাম, (তাকে আমি বলেছিলাম, সে বিগলিত লোহা দ্বারা) তুমি পূর্ণ মাপের বর্ম তৈরী করো এবং সেগুলোর কড়াসমূহ যথাযথভাবে সংযুক্ত করে, (কিন্তু এ শিল্পগত কলাকৌশলের পাশাপাশি) তোমরা তোমাদের নেক কাজও অব্যাহত রাখো; তোমরা যা কিছুই করো না কেনো, আমি তার সবকিছুই পর্যবেক্ষণ করি। (সূরা আস সাবা-১০-১১)

বাতাস হযরত সুলাইমান (আঃ) এর অনুগত ছিলো, তামার খনি ছিলো ছিলো তাঁর আয়ত্বে। তিনি কোনো কিছুর ওপর উপবেশন করে বাতাসকে আদেশ দিতেন বাতাস তাঁকে নিয়ে মুহূর্তেই হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে চলে যেতো। অগণিত জ্বীন তাঁর অনুগত ছিলো এবং তাদের মাধ্যমে তিনি অসংখ্য কর্ম সম্পাদন করতেন। কিন্তু এসব ক্ষমতা কি তাঁর নিজস্ব ছিলো? মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيْحَ عَاصِفَةً تَجْرِى بِأَمْرِهِ إِلَى الأَرْضِ الَّتِي بَارَكْنَا فِيْهَا طَ وَكُنَّا بِكُلِّ شَيْ عَالِمِينَ، وَمِنَ الشَّيَاطِينِ مَنْ يَعُوْصُوْنَ لَهُ وَيَعْمَلُوْنَ عَمَلاً دُوْنَ ذَلِكَ جِ وَكُنَّا لَهُمْ حَافِظِينَ لَا

আমি প্রবল হাওয়াকে সুলাইমানের জন্যে বশীভূত করে দিয়েছিলাম, তা তার আদেশে সে দেশের দিকে ধাবিত হতো যেখানে আমি প্রভূত কল্যাণ রেখে দিয়েছি; (মূলত) আমি প্রতিটি বিষয়ের ব্যাপারেই সম্যক অবগত আছি। শয়তানদের মাঝে (তার) কিছু (জ্বীন অনুসারী) তার জন্যে (সমুদ্রে) ডুবুরীর কাজ করতো, তার জন্যে এ ছাড়াও এরা বহু কাজ আঞ্জাম দিতো, তাদের রক্ষক তো আমিই ছিলাম। (সূরা আল আম্বিয়া-৮১-৮২)

বাতাসকে ব্যবহার করে তিনি কত দূর যেতেন এবং জ্বীনদের দ্বারা তিনি কোন্ ধরনের কাজ করাতেন, এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيْحَ غُدُوهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ وَأَسَلْنَا لَهُ عَيْنَ الْقِطْرِ طَ وَمِنَ الْجِنِّ مَنْ يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّه ط وَمَنْ تَزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ السَّعِيرِ - يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاءُ مِنْ مَّحَارِيبَ وَتَمَاثِيْلَ وَجِفَانِ كَالْجَوَابِ وَقُدُوْرٍ رَّاسِيَاتٍ طَ إِعْمَلُوا آلَ دَاوِدَ شُكْرًا طَ وَقَلِيْلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ -

এমনিভাবে আমি সুলাইমানের জন্যে বাতাসকে (তার) অনুগত বানিয়ে দিয়েছিলাম, তার প্রাত:কালীন ভ্রমণ ছিলো এক মাসের পথ, আবার সন্ধ্যাকালীন ভ্রমণও ছিলো এক মাসের পথ, আমি তার জন্যে (গলিত) তামার একটি ঝর্ণা প্রবাহিত করেছিলাম; তার মালিকের অনুমতিক্রমে জ্বীনদের কিছু সংখ্যক (কর্মী) তার সামনে থেকে (তার জন্যে) কাজ করতো (আমি বলেছিলাম,) তাদের মধ্য থেকে কেউ যদি আমার (ও আমার নবীর) আদেশ অমান্য করে, তাহলে তাকে আমি জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি আস্বাদন করাবো। সুলাইমান যা কিছু চাইতো তারা (জ্বীনরা) তার জন্যে তাই তৈরী করে দিতো, (যেমন সুরম্য) প্রাসাদ, (নানা ধরনের) ছবি, (বড় বড়) পুকুরের ন্যায় থালা ও চুলার ওপর স্থাপন করার (জন্তু-জানোয়ারসহ সবার আতিথেয়তার উপযোগী) বৃহদাকারের ডেগ; আমি বলেছি, হে দাউদ পরিবারের লোকেরা, তোমরা (আমার) শোকরস্বরূপ নেক কাজ করো; (আসলে) আমার বান্দাদের মাঝে খুব অল্প সংখ্যক মানুষই (তাদের মালিকের) শোকর আদায় করে। (সূরা আস সাবা- ১২-১৩)

হযরত আইয়ুব (আ:) ভয়ঙ্কর ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত হন এবং ঘটনাক্রমে নিজ পরিবার-পরিজন থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। জীবনের এই চরম মুহূর্তে একান্ত অসহায় অবস্থায় তিনি কেবলমাত্র মহান আল্লাহর কাছেই সাহায্য ভিক্ষা করেছেন। মহান আল্লাহর কাছে তিনি এভাবে আবেদন করলেন-

وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ

(স্মরণ করো,) যখন আইয়ুব তার মালিককে ডেকে বলেছিলো (হে আল্লাহ), আমাকে এক কঠিন অসুখে পেয়ে বসেছে, (আমায় তুমি) নিরাময় করো, (কেননা) তুমিই হচ্ছো দয়ালুদের সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। (সূরা আল আম্বিয়া-৮৩)

একশ্রেণীর মানুষ রোগাক্রান্ত হলে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা বাদ দিয়ে বিভিন্ন মাজার বা পীর সাহেবের কাছে ধর্ণা দেয়, অথচ নবী- রাসূলগণের সীরাত হলো তাঁরা মহান আল্লাহর দরবারেই নিরাময় কামনা করেছেন। হযরত ইউনুস (আ:) ত্রীবিধ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে মহাবিপদে নিপতিত হলেন। এ অবস্থায় তিনি কেবলমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার কাছে এভাবে সাহায্য কামনা করেছেন-

لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ كَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ جِ

হে আল্লাহ তা'য়ালা, তুমি ব্যতীত কোনো মা'বুদ নেই, তুমি পবিত্র, তুমি মহান, অবশ্যই আমি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছি। (সূরা আল আম্বিয়া-৮৭)

আল্লাহ তা'য়ালার সাহায্য কামনা করে কেউই কখনো নিরাশ হয়নি। আল্লাহ তা'য়ালা হযরত ইউনুস (আ:) সম্পর্কে বলেন- فَاسْتَجَبْنَا لَهُ لا وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ طَ وَكَذَالِكَ نُنجِي الْمُؤْمِنِينَ

অত:পর আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম এবং তাকে (তার মানসিক) দুশ্চিন্তা থেকে উদ্ধার করলাম; আর এভাবেই আমি মুমিন বান্দাদের সব সময় উদ্ধার করি। (সূরা আল আম্বিয়া-৮৮)

সন্তান না হলে অনেককেই দেখা যায় তারা পীর সাহেবের দরবারে ধর্ণা দেয় অথবা মৃত মানুষের কবরে গিয়ে মানত মেনে সন্তান কামন করে। পক্ষান্তরে নবী- রাসূলগণের সীরাত হলো তাঁরা সকল বিষয়ে মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করেছেন। হযরত যাকারিয়া (আ:) এর স্ত্রী ছিলেন সন্তান ধারণে অক্ষম তথা বন্ধ্যা। হযরত যাকারিয়া (আ:) মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার দরবারে কিভাবে ফরিয়াদ জানালেন পবিত্র কুরআন বলছে- وَزَكَرِيَّا إِذْ نَادَى رَبَّهِ رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَجِ

আর (স্মরণ করো,) যাকারিয়া (-র কথা), যখন সে তার মালিককে ডেকে বলেছিলো, হে আমার মালিক, তুমি আমাকে একা (নিঃসন্তান করে) রেখে দিয়ো না, তুমিই হচ্ছো উৎকৃষ্ট মালিকানার অধিকারী। (সূরা আল আম্বিয়া-৮৯)

মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর নবী হযরত যাকারিয়া (আ:) এর ডাকে কিভাবে সাড়া দিলেন দেখুন- فَاسْتَجَبْنَا لَه رَ وَوَهَبْنَا لَه يَحْيِي وَأَصْلَحْنَا لَه زَوْجَهُ طَ إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُوْنَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِيْنَ

অত:পর আমি তার জন্যেও সাড়া দিয়েছিলাম, তাকে দান করেছিলাম (নেক সন্তান) ইয়াহইয়া এবং তার (মনের আশা পূরণের) জন্যে আম তার স্ত্রীকে (বন্ধ্যাত্বমুক্ত করে সম্পূর্ণ) সুস্থ (সন্তান ধারণোপযোগী) করে দিয়েছিলাম; (আসলে) এ লোকগুলো (সর্বদাই) সৎকাজে (একে অন্যের সাথে) প্রতিযোগিতা করতো, তারা আমাকে আশা ও ভীতির সাথে ডাকতো; তারা সবাই ছিলো আমার অনুগত (বান্দা)। (সূরা আল আম্বিয়া-৯০)

সন্তানহীন হযরত যাকারিয়া (আ:) মহান মালিক আল্লাহর কাছে সন্তান কামনা করলেন, আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর বন্ধ্যা স্ত্রীকে সন্তান ধারণে সক্ষম বানিয়ে পুত্র সন্তান দান করলেন, সন্তানের নামকরণও তিনিই করলেন 'ইয়াহ্ইয়া' এবং সেই সন্তানকে নবী হিসাবেও নির্বাচিত করে তাঁর ইতিহাস পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবীতে আগমন করবে তাদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px