📄 সেবকদের প্রতি নবী করীম (সা:) এর আচরণ
সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর নবীর জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করতেন। নবীর সামান্য কোনো কাজ, কে কার আগে করবে তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলতো। তবুও তিনজন ব্যক্তি এমন ছিলেন যে, তাঁরা রাসূল (সা:) এর একান্ত ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত ছিলেন। এই তিনজনের মধ্যে হযরত বিলাল (রা:) নবী পরিবারের দায়িত্ব পালন করতেন।
আরো যে দু'জন নবীর একান্ত কাজ করতেন, তাঁরা হলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) ও হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা:)। স্বয়ং নবী (সা:) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) সম্পর্কে বলেছেন, কেউ যদি কুরআন যেমনভাবে অবতীর্ণ হয়েছে তেমনভাবে পাঠ করতে চায় তাহলে সে যেন তাঁকে অনুসরণ করে।
মক্কার জীবনে কিশোর বয়সে তিনি সারা দিন পাহাড়ে ছাগল চরাতেন। নবী করীম (সা:) হযরত আবু বকর (রা:) কে সাথে নিয়ে মদীনায় হিজরত করার সময় সেই কিশোরের কাছে গিয়ে বললেন, এই ছাগল থেকে আমাদের কিছু দুধ দুইয়ে দাও, আমরা পিপার্সিত। দুধ পান করে পিপাসা নিবারণ করি।
বালক জবাব দিল, এ কাজ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, আমি ছাগলগুলোর মালিক নই। আমি এদের রাখাল। অপরের সম্পদ আমি কি করে দিতে পারি?
বালক আল্লাহর নবীকে চিনতো না। নবী (সা:) বালকের সততা দেখে মুগ্ধ হলেন। তিনি বললেন, ঠিক আছে, তুমি এমন একটি ছাগল দেখিয়ে দাও, যে ছাগল এখন পর্যন্ত কোনো বাচ্চা দেয়নি বা পাঁঠার সংস্পর্শে আসেনি।
বালক একটি ছোট্ট ছাগল দেখিয়ে দিল। নবী করীম (সা:) সে ছাগলের ওলানে আল্লাহর নাম নিয়ে পবিত্র হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন। ওলান দুধে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। দুধ দুইয়ে তিনি এবং আবু বকর (রা:) পান করলেন এবং বালককেও পান করতে দিলেন। বালক এমন অবাক কান্ড জীবনে কখনো দেখেনি। অবাক হয়ে সে এই দৃশ্য দেখলো। তারপর কিছু দিনের মধ্যেই সে নবীর পরিচয় লাভ করে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তিনি নিজেকে নবী (সা:) এর খাদেম হিসাবে উৎসর্গ করেছিলেন। যে বালক ছিল ছাগলের রাখাল, সে হয়ে গেল সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি বিশ্বনবী (সা:) এর একান্ত খাদেম।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) সেই কিশোর বয়স থেকেই নবী করীম (সা:) এর কাছে অবস্থান করতেন। আল্লাহর রাসূলের ঘরে প্রবেশ করার জন্য তাঁর অনুমতির প্রয়োজন ছিল না। নবী পরিবারের অনেক বিষয় তিনি অবগত ছিলেন। এ কারণে তাঁকে 'সাহিবুস্সির' বা নবীর গোপন বিষয়ের অধিকারী বলা হতো। নবী করীম (সা:) কোনো স্থানে গমন করলে তিনি রাসূলের ঘুমানোর, অজুর ব্যবস্থা করতেন এবং রাসূলের মিসওয়াক রাখতেন।
রাসূল (সা:) পথ চলতে থাকলে তিনি লাঠি হাতে আগে আগে যেতেন। নবীর পায়ে জুতা পরিয়ে দিতেন এবং রাসূল (সা:) জুতা খুলে রাখলে তা উঠিয়ে নিজের বোগলে রাখতেন। রাসূল (সা:) উঠে দাঁড়ালেই আবার সে জুতা পরিয়ে দিতেন। তিনি নবীর ঘরেই প্রতিপালিত হয়েছিলেন বলে তাঁর সমগ্র চরিত্র রাসূলের অনুকরণে গড়ে উঠেছিল। স্বয়ং নবী করীম (সা:) ছিলেন তাঁর মহান শিক্ষক। তাঁর মতো জ্ঞানী এবং কুরআন বুঝার অধিকারী সাহাবী খুব কমই ছিলেন।
হযরত আনাস (রা:) যখন আল্লাহর নবীর কাছে এলেন তখন তিনি ছিলেন একেবারে শিশু। তাঁর মা তাঁকে নবীর খেদমতে উৎসর্গ করে গেলেন। সেই শিশু বয়স থেকে তিনি দীর্ঘ দশ বছর নবীর কাছে কাটিয়ে দিলেন। আল্লাহর নবীর বহু কাজ তিনি করতেন। বিভিন্ন লোকজনকে ডেকে আনা বা সংবাদ দেয়া, অজুর পানি ভরে রাখা ইত্যাদি কাজ তিনি করতেন। তিনিও নবী পরিবারের একজন হয়েছিলেন।
শিশু বয়সে কতভাবে তিনি নবী করীম (সা:) কে বিরক্ত করতেন। কিন্তু আল্লাহর হাবিব কখনো তাঁর সাথে উচ্চকণ্ঠে কথা বলেননি বা তাঁকে এ প্রশ্ন করেননি, কেনো তুমি এই কাজ করলে? নবীর চেহারা মুবারকে তাঁরা হাসি ব্যতীত আর কিছুই দেখেননি। কখনো কৌতুক করে তিনি হযরত আনাস (রা:) কে 'হে দুই কানওয়ালা' বলে ডাকতেন। কারণ হযরত আনাস (রা:) আল্লাহর রাসূলের এতই ভক্ত ছিলেন যে, তাঁর কান সব সময় সজাগ থাকতো, কখন কোন্ কাজের জন্য আল্লাহর রাসূল তাঁকে আহ্বান করেন।
একদিন কিশোর বালক হযরত আনাস (রা:) কে বিশ্বনবী (সা:) কোথাও যাবার জন্য বললেন। তিনি কিশোরসুলভ চপলতার প্রকাশ ঘটিয়ে বলেছিলেন, আমি যেতে পারবো না।
নবী করীম (সা:) তাঁকে কিছু না বলে নীরব রইলেন। হযরত আনাস (রা:) ঘরের বাইরে চলে যেতে উদ্যত হলেন। আল্লাহর নবী (সা:) পেছন থেকে তাঁর ঘাড়ে হাত দিলেন। তিনি রাসূলের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সে মুখে রাগের প্রকাশ নেই। পূর্ণিমার চাঁদের হাসি পবিত্র মুখে তরঙ্গ তুলেছে। আল্লাহর রাসূল (সা:) বললেন, আমি যে কাজের কথা বলেছিলাম, এখন সে কাজে যাবে তো!
হযরত আনাস বলেছেন, আমি দীর্ঘ সাত বছরযাবৎ আল্লাহর রাসূলের খেদমতে অবস্থান করেছি। তিনি কখনো সামান্য বিরক্তি প্রকাশ করে বলেননি, কেনো তুমি এই কাজ করলে? (মুসলিম, আবু দাউদ)
📄 নবী করীম (সা:) কে দেয়া হয়েছিলো ঝিনুকের মাঝে মহাসমুদ্র
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমগ্র মানবগোষ্ঠীর জন্যে যাঁকে মুক্তির দূত হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন, তাঁকে অকল্পনীয় দৃষ্টিনন্দন শ্রুতিমধুর অলঙ্কারে সুসজ্জিত করেই সমগ্র সৃষ্টির সম্মুখে প্রেরণ করেছিলেন। ভাষাগত ক্ষেত্রে তাঁকে এমন অতুলনীয় অলঙ্কারে ভূষিত করা হয়েছিলো যে, তিনি ব্যাপক অর্থবোধক ও বিশ্লেষণ সাপেক্ষ বিষয়াদি অতি অল্প কথায় সহজে বোধগম্য ভাষায় ব্যক্ত করতেন। এই অতুলনীয় যোগ্যতা ইতোপূর্বে কাউকে দেয়া হয়নি এবং কিয়ামত পর্যন্ত কাউকে দেয়াও হবে না। পৃথিবীতে ভাষা ও বৈয়াকরণগণ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সাপেক্ষ বহু বিষয়াদি স্বল্প কথায় প্রকাশযোগ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যাক্য তৈরী করেছেন। কিন্তু নবী করীম (সা:) স্বল্প ভাষায় ক্ষুদ্র বাক্যে ব্যাপক অর্থবোধক যে সকল বাক্য মানব জাতিকে উপহার দিয়েছেন, তা অতুলনীয় এবং অলঙ্কার মণ্ডিত। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদের পক্ষে কিয়ামত পর্যন্ত চেষ্টা-সাধনা করেও এমন একটি বাক্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ নবী করীম (সা:) এর মর্যাদার সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণ যোগ্যতা দান করেছিলেন আরবী ভাষায় যাকে বলা হয়, 'জাওয়া মিউল কালিম'। এ সম্পর্কে স্বয়ং রাসূল (সা:) বলেছেন, (আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে) আমাকে 'জাওয়া মিউল কালিম' দান করা হয়েছে। (মুসলিম)
ক্ষুদ্রতম শব্দে, স্বল্প বাক্যে ব্যাপক অর্থবোধক অথচ সহজে বোধগম্য বাক্যকে 'জাওয়া মিউল কালিম' বলা হয়। হাদীসের কিতাবসমূহে অনুসন্ধান করলে এমন অসংখ্য অগণিত ক্ষুদ্রতম বাক্য পাওয়া যাবে যার অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক কিন্তু সহজে বোধগম্য। অর্থাৎ ভাষাগত ক্ষেত্রে ভাব প্রকাশের লক্ষ্যে কুল-কিনারাহীন অগাধ জলধী সমুদ্র মহাসমুদ্রকে ক্ষুদ্রতম একটি ঝিনুকের মধ্যে প্রবিষ্ট করিয়ে নবী করীম (সা:) কে দান করা হয়েছিলো। আমরা হাদীসের কিতাবসমূহ থেকে রাসূল (সা:) এর মর্যাদাপূর্ণ বাক্য এখানে তুলে ধরছি। নবী করীম (সা:) বলেছেন-
اتَّقِ اللَّهَ حَيْثُ مَا كُنْتَ - 'যে অবস্থায়ই থাকো আল্লাহ তা'য়ালাকে ভয় করো'।
নবী করীম (সা:) সমগ্র মানব মণ্ডলীকে লক্ষ্য করে বলছেন, যেখানে যে অবস্থায়ই অবস্থান করো না কেনো, সর্বাবস্থায় ঐ সত্তাকে ভয় করো যিনি তোমার অবস্থা দেখছেন এবং তোমার ভেতর বাইরের সকল বিষয়ে অবগত রয়েছেন। এমনকি তোমার মনের গহীনে যে কল্পনার উদ্রেক হচ্ছে আবার তা পানির বুদ্বুদের মতোই মিলিয়ে যাচ্ছে, সে সম্পর্কেও তিনি পূর্ণমাত্রায় অবগত আছেন। পরিবার পরিজন পরিবেষ্টিত থাকো, একাকী থাকো, বিপুল জনসমাবেশে থাকো, নির্জন পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ের কোনো নিভৃত গুহায় অবস্থান করো, মহাশূন্যের কোনো গ্রহে থাকো অথবা মহাসাগরের অতল তলদেশের কোনো পর্বতের গুহায় শৈবালদাম পরিবেষ্টিত অবস্থায় একাকী থাকো, সর্বাবস্থায় মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালাকে ভয় করো। তিনি তোমার সকল কিছুই দেখছেন। এ কারনেই হযরত আলী (রা:) বলেছেন, 'তুমি যখন একাকী থাকবে তখন আল্লাহকে সবথেকে বেশি ভয় করবে। কারন তুমি একাকী অবস্থায় যে কাজ করবে তার সাক্ষীও আল্লাহ তা'য়ালা এবং বিচারকও মহান আল্লাহ'। নবী করীম (সা:) বলেছেন-
مَنْ لا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ 'যে অনুগ্রহ করে না সে অনুগ্রহ পায় না'।
অনুগ্রহ বা করুণা প্রদর্শন শুধুমাত্র অন্যের প্রতি নয়, নিজের প্রতিও অনুগ্রহ করার বিষয়টি উল্লেখিত সংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যে শামিল রয়েছে। নিজের প্রতি অনুগ্রহ করার অর্থ হলো, মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা লংঘন করে নিজেকে ধ্বংস গহ্বরে নিক্ষেপ না করা এবং স্বাস্থ্য সচেতন থেকে নিজেকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করা। উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলসহ অন্য সকল মানুষের ক্ষেত্রে অনুগ্রহের বাহু বিছিয়ে দেয়া। সুতরাং যে মানুষ অনুগ্রহ করে সে স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালার অনুগ্রহের দৃষ্টি লাভে ধন্য হয়। নবী করীম (সা:) বলেছেন-
الْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةُ - 'উত্তম কথা বলাও সৎকর্ম সম্পাদনের অন্তর্গত'।
كُلُّ ذِي نَعْمَةٍ مَّحْسُودٌ - 'প্রত্যেক সৌভাগ্যশালী ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা পোষণ করা হয়'।
سَيِّدُ الْقَوْمِ خَادِمُهُمْ - 'জনগণের যে সেবা করে সেই তাদের নেতা'।
الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبُّ 'মানুষ যাকে ভালোবাসে কিয়ামতের ময়দানে সে তার সাথেই অবস্থান করবে'।
أَسْلِمْ تَسْلِمْ 'মুসলিম হও শান্তিতে থাকতে পারবে'।
নবী করীম (সা:) মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজা, বাদশাহ, সম্রাট তথা শাসকবৃন্দের কাছে পবিত্র কুরআনের আহ্বান পৌঁছানোর লক্ষ্যে দুতের মাধ্যমে পত্র প্রেরণ করতেন। রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে তিনি যে পত্র প্রেরণ করেছিলেন, সেই পত্রে তিনি লিখিয়েছিলেন, 'মুসলিম হও তাহলে শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারবে'।
মুসলিম আরবী শব্দ, এর অর্থ হলো মহান আল্লাহর বিধানের প্রতি আত্মসমর্পণকারী। আল্লাহর বিধান মেনে নিয়ে যারা তা অনুসরণ করে মাছ যেমন প্রশান্তিতে পানিতে বাস করে তেমনি তারাও শান্তিতে জীবন যাপন করে। এ জন্যই রোম সম্রাটের কাছে নবী করীম (সা:) যে পত্র প্রেরণ করেছিলেন উক্ত পত্রে উল্লেখ করেছিলেন, মুসলিম হও (আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করো) শান্তিতে জীবন-যাপন করতে পারবে।
لَيْسَ لِلْعَمِلِ مِنْ عَمَلِهِ إِلَّا مَانَوَ
'যে কাজ করে সে কেবল (নিজ কার্জের) উদ্দেশ্য অনুযায়ী ফলাফল লাভ করে'।
إِنَّمَا الْأَعْمَالُم بِالنَّيَّاتِ
'নিয়ত অনুযায়ী কাজের ফল পাবে'।
الْحَرْبُ خِدْعَةٌ
'যুদ্ধ একটি কৌশল'।
لَيْسَ الْخَبْرُ كَالْمُعَايَنَة -
'দেখা ও শোনা সমপর্যায়ের বিষয় নয়'।
الْمَجَالِسُ بالأمنة -
'একান্ত বিশ্বস্ততা বৈঠকের পূর্ব শর্ত'।
تَرْكُ الشَّرِّ صَدَقَةً -
'অসৎ কর্ম বর্জন করাও একটি সৎকর্ম'।
ব্যাপক অর্থবোধক ও সহজে বোধগম্য এমন অসংখ্য হাদীস রয়েছে, যে হাদীসসমূহের ব্যাখ্যা করতে গেলে বিশাল আকৃতির গ্রন্থ রচিত হবে। সংক্ষিপ্ত বাক্য সম্বলিত এসব হাদীস মানব জীবনকে সুন্দর সপ্নীল করার জন্যে যথেষ্ট, যদি বর্ণিত এসব হাদীসের আদেশ উপদেশ বাস্তব জীবনে অনুসরণ করা হয়।
📄 নবী করীম (সা:) এর ভাষণের নমুনা
নবী করীম (সা:) জনগণের উদ্দেশ্যে পথনির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়েছেন। তাঁর ভাষণ কখনোই এতটা দীর্ঘ হয়নি যে, শ্রোতাবৃন্দের মনে বিরক্তি সৃষ্টি করবে অথবা এমন সংক্ষিপ্তও হয়নি যে, শ্রোতাবৃন্দ সঠিক বিষয়টি বুঝতে অক্ষম হবে। তাঁর পবিত্র মুখ নিঃসৃত বাণীসমূহের প্রতিটি শব্দই ছিলো দুষ্প্রাপ্য মণি-মুক্তা সদৃশ। প্রত্যেকটি শব্দই ছিলো ব্যাপক অর্থবোধক অথচ সহজে বোধগম্য। ভাষণে তিনি কখনোই অনর্থক একটি শব্দও ব্যবহার করেননি। ভাষণ দানকালে তিনি এমন হৃদয়গ্রাহী শব্দসমূহ চয়ন করতেন যা শ্রোতাবৃন্দের হৃদয়স্পর্শ করতো। শ্রোতাবৃন্দের বুঝার সুবিধার্থে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বাক্যসমূহ তিনবার উচ্চারণ করতেন। নবুয়্যাতি জীবনে তিনি যতবার ভাষণ দিয়েছেন, তা হাদীসের কিতাব ও ইতিহাসের পাতায় স্বার্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাঁর ভাষণসমূহ থেকে কিছু বাক্য আমরা এখানে উদ্ধৃত করছি।
فَإِنَّ اصَدَقَ الْحَدِيْثِ كِتَابُ الله - 'কথার মধ্যে সর্বোত্তম সত্য কথা হচ্ছে কিতাবুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর কুরআন'।
وَ أَوْ شَقَ الْعُرِى كَلِمَةُ التَّقْوى 'সর্বোত্তম নির্ভরতার বিষয় হচ্ছে তাক্বওয়ার বিষয় অর্থাৎ আল্লাহভীতি'।
وَ خَيْرُ الْمَلَلِ مِلَّةُ إِبْرَاهِيمَ - 'সকল মিল্লাতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মিল্লাত হলো মিল্লাতে ইবরাহীম'।
وَ خَيْرُ السُّنَنِ سُنَّةِ مُحَمَّد صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- 'সকল পন্থার মধ্যে সর্বোত্তম পন্থা হলো মুহাম্মাদ (সা:) এর পন্থা'।
وَ أَشْرَفُ الْحَدِيْثِ ذكر الله - 'সকল কথার মধ্যে শ্রেষ্ঠ কথা হলো মহান আল্লাহর স্মরণমূলক কথা'।
وَ أَحْسَنُ الْقَصَصَ هَذَا الْقُرْآنِ 'সকল বর্ণনার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দর বর্ণনা হলো এই কুরআনুল কারীম'।
وَ خَيْرُ الْأَمُورِ عَوَازِمُهَا - 'সুচিন্তিত ও দৃঢ় সঙ্কল্পের কর্মই হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম কর্ম'।
وَ شَرِّ الْأَمْرِ مُحَدِّثًا تُهَا - 'বিদয়াত ও বানোয়াট কথাই হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ'।
وَ أَحْسَنُ الْهُدَى هُدَى الأَنْبِيَاء - 'আল্লাহর নবীগণ কর্তৃক প্রদর্শিত পথই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ অভ্রান্ত পথ'।
وَ أَشْرَفُ الْمَوْتِ قَتْلُ الشُّهَدَاءِ 'দ্বীনের পথে শহীদদের মৃত্যুই সর্বাধিক মর্যাদাকর মৃত্যু'।
وَ أَعْمَى الْعَمَى الضَّلَالَةُ بَعْدَ الْهُدَى 'সবথেকে বড় অন্ধত্ব হলো সেই পথভ্রষ্টতা যা সত্য সঠিক পথ দেখার পরও মানুষ গ্রহণ করে না'।
وَ خَيْرُ الْأَعْمَالِ مَا نُفِعَ 'সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ কর্ম সেটাই যার মাধ্যমে মানুষের নৈতিক উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পায় বা মানুষ উপকৃত হয়'।
وَ خَيْرُ الْهُدَى مَا تَبِعَ - 'সত্য সঠিক পথ সেটাই সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ মানুষ যে পথের অনুসরণ করতে পারে'।
وَ شَرِّ الْعَمِي عَمَى الْقَلْبِ 'সর্বাধিক নিকৃষ্টতম অন্ধত্ব হচ্ছে হৃদয়ের অন্ধত্ব'।
وَ الْيَدُ الْعُلَيَّا خَيْرٌ مِّنْ يَد السُّفْلَى - 'উপরের হাত (দাতার হাত) নীচের হাতের (গ্রহীতার হাত) তুলনায় উত্তম'।
و ماقل و كَفى خَيْرٌ مِّمَّا كَثُرُ وَالْهى - 'স্বল্পতম সম্পদ যা প্রয়োজন পূরণের জন্যে যথেষ্ট তা ঐ বিশাল সম্পদের তুলনায় উত্তম, যা মানুষকে (আল্লাহর দাসত্ব থেকে) অমনোযোগী করে দেয়'।
وَ شَرِّ الْمُعَذِّرَةِ حِيْنُ يَحْضَرُ الْمَوْتَ 'সর্বাধিক নিকৃষ্টতম তাওবা বা ওজর আপত্তি হচ্ছে তাই যা মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে করা হয়'।
وَ شَرِّ النَّدَامَةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ - 'কিয়ামতের ময়দানে যে লজ্জা অনুভূত হবে এবং যে অনুশোচনা জাগবে সেটাই হলো সর্বাধিক নিকৃষ্ট লজ্জা ও অনুশোচনা'।
وَ مِنَ النَّاسِ مَنْ لا يَأْتِي الْجُمُعَةَ الْأَدْبَرًا - 'কোনো কোনো মানুষ জুমুআর নামাজ আদায়ের লক্ষ্যে আসে কিন্তু তাদের হৃদয় মন (নামাজে স্থির থাকে না) পড়ে থাকে পেছনে'।
وَ مِنْ لَا يَذْكُرُ اللَّهَ إِلَّا هَجْرًا - 'কোনো কোনো মানুষ এমনও আছে যারা (নিজ স্রষ্টা) মহান আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে'।
وَ مِنْ أَعْظَمِ الْخَطَايَا اللِّسَانُ الْكَذِبِ 'পাপের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ পাপ হলো মিথ্যা বলা'।
خَيْرُ الْغَنِي غَنِيُّ النَّفْسِ 'আত্মার প্রাচুর্যতাই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাচুর্যতা'।
وَ خَيْرُ الزَّادِ التَّقْوَى 'মানুষের জন্যে সর্বোত্তম পাথেয় হচ্ছে তাক্বওয়া অর্থাৎ আল্লাহভীতি'।
وَ رَأْسُ الْحِكْمَةِ مُخَافَةُ اللَّهِ عَزَّ وَ جَلْ 'জ্ঞানীদের মাথার শ্রেষ্ঠ মুকুট হচ্ছে আল্লাহভীতি'।
وَ خَيْرُ مَا وَفَرِ فِي الْقُلُوبِ الْيَقِينِ 'মনের গভীরে প্রতিষ্ঠিত করার শ্রেষ্ঠ বিষয় হচ্ছে বিশ্বাস'।
وَ الإِرْتَيَابُ مِنَ الْكُفْرِ - 'সন্দেহ সংশয় হচ্ছে কুফুরীর শাখা'।
وَ النِّيَاحَةُ مِنْ عَمَلِ الْجَهِلِيَّةِ - 'মৃত ব্যক্তির জন্যে বিলাপ করা জাহেলী যুগের অনুকরণ'।
وَ الْخُلُوْلُ مِنْ حَرِّ جَهَنَّمِ 'খিয়ানত করা জাহান্নামের আগুন বিশেষ'।
السُّكَرُ كَيْرٌ مِّنَ النَّارِ - 'নেশা করা আগুনের দাগ (লাগানোর শামিল)'।
وَ الشعر من إبليس 'অশ্লীল অশালীন কাব্য চর্চা করা শয়তানের কর্ম'।
الْخَمْرُ جَمَاعَ الإِثْمِ 'মদ সকল গোনাহের উৎস'।
وَ شَرُّ الْمَأْكُلِ مَالُ الْيَتِيمِ 'জঘন্যতম খাদ্য হচ্ছে ইয়াতিমের সম্পদ ভক্ষণ করা'।
وَ السَّعِيدُ مَنْ وُعِظَ بِغَيْره - 'সৌভাগ্যবান হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে অন্যের কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ করে'।
وَ الشَّقِي مَنْ فِي بَطْنِ أُمِّه - 'প্রকৃত হতভাগ্য সে, যে তার মাতৃগর্ভেই দুর্ভাগা থাকে'।
وَ مَلَاكُ الْعَمَلِ خَوَاتِمُه - 'মানুষের কর্মের পুঁজি হচ্ছে তার উত্তম পরিণতি'।
وَ شَرُّ الرُّؤْيَا رُؤْيَا الْكَذَّب - 'নিকৃষ্ট স্বপ্ন হচ্ছে মিথ্যা স্বপ্ন'।
وَ كُلِّ مَا هَوَات قَرِيبٌ 'যে ঘটনা ঘটবে তা অতি নিকটবর্তী'।
وَ سَبَابُ الْمُؤْمِنِ فُسُوْقَ وَ قِتَالُهُ كُفْرٌ - 'মুমিনকে গালি দেয়া ফাসেকী আর তাকে হত্যা করা কুফুরী'।
وَ أَكُلُ لَحْمَةٌ مِنْ مُّعْصِيَةِ الله - 'মুমিনের গোস্ত খাওয়া (অর্থাৎ তার গীবত করা) নিকৃষ্ট গোনাহের মধ্যে অন্যতম'।
وَ حُرِّمَتْ مَالُهُ كَحُرْمَة دَمِّه - 'মুমিনের সম্পদ অন্যের জন্য ঠিক সেই রকম হারাম যেমন হারাম তার রক্ত'।
مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ 'যে দয়া করে না তাকেও দয়া করা হয় না'।
وَ مَنْ يَغْفِرُ يُغْفَرُ لَه - 'যে কাউকে ক্ষমা করে তাকেও ক্ষমা করা হয়'।
وَ مَنْ يَعْفُ يَعْفَ اللَّهُ عَنْهُ - 'যে অন্যকে ক্ষমা করে আল্লাহ তা'য়ালা তাকে ক্ষমা করেন'।
وَ يَكْظُمُ الْغَيْظَ يَأْجِرُهُ اللَّهُ - 'যে রাগ সংবরণ করে আল্লাহ তা'য়ালা তাকে পুরস্কৃত করেন'।
وَ مَنْ يَصْبِرُ عَلَى الرَّزِيَةُ يَعُوْضُهُ اللَّهُ - 'যে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবার পরও ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তা'য়ালা তাকে উত্তম বিনিময় দান করেন'।
وَ مَنْ يَتَّبِعُ السَّمَعَةِ يَسْمَعُ اللَّهِ - 'যে অন্যের দোষত্রুটি ছড়িয়ে বেড়ায় আল্লাহ তা'য়ালা তাকে অপমানিত করেন'।
وَ مَنْ يَصْبِرُ يُضْعَفُ اللَّهُ لَه - 'যে ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তা'য়ালা তাকে অনেকগুণ বেশি দান করেন'।
وَ مَنْ يَعْصِ اللَّهَ يُعَذِّبُهُ اللَّهُ - 'যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'য়ালার অবাধ্য হয় তিনি তাকে শাস্তি দেন'।
(সূত্র: যাদুল মায়া'দ, ২য় খণ্ড- আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম)
📄 নবী করীম (সা:) এর অতুলনীয় আচরণ
এ বিষয়টি আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) সম্পর্কে ঘোষণা দিয়েছেন, সমগ্র মানব জাতি যাঁকে একমাত্র আদর্শ ও একমাত্র অনুকরণীয় নেতা হিসাবে মেনে নিলে জীবনের প্রত্যেক দিক ও বিভাগে শান্তির ফল্গুধারা প্রবাহিত হবে, তিনি নবী করীম (সা:)। কারণ তিনি সকল দিক থেকে এতোই মহান যে, এই মহানত্বের কোনো সীমারেখা নেই এবং তলদেশও নেই। আর তলদেশ থাকলেও তা পরিমাপ করার মতো কোনো উপকরণ মানুষের হাতে নেই। তাঁর চরিত্র কেমন ছিলো, এ সম্পর্কে কিছু সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম হযরত আয়িশা (রা:) এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন। জবাবে হযরত আয়িশা (রা:) বলেছিলেন, 'তোমরা কি কুরআন তিলাওয়াত করো না, কুরআনই তাঁর চরিত্র'।
অর্থাৎ তিনি ছিলেন জীবন্ত কুরআন বা কুরআনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। পবিত্র কুরআন যে মহান আদর্শ পেশ করেছে সেই আদর্শের বাস্তব নমুনা ছিলেন নবী করীম (সা:)। তাঁর নবুয়্যতের ২৩ বছরের জীবনই ৩০ পারা কুরআন। পৃথিবীর সকল শ্রেণী ও বয়সের মানুষই তাঁর পবিত্র জীবনধারায় নিজের অনুকরণীয় সর্বোত্তম আদর্শ দেখতে পাবে। তাঁর আদর্শ যুগ বা কালের গণ্ডীতে আবদ্ধ নয়, তাঁর আদর্শ কালোত্তীর্ণ, কালজয়ী এবং কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য একমাত্র তিনিই সর্বোত্তম আদর্শের বাস্তব নমুনা। স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর মহান চরিত্র সম্পর্কে এভাবে সনদ দিয়েছেন-
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ নিঃসন্দেহে আপনি মহান চরিত্রের ওপর (প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন)। (সূরা কালাম-৪)
আরবী ভাষায় প্রশস্ততাকে বুঝানোর জন্য عریض শব্দ ব্যবহৃত হয় এবং গভীরতাকে বুঝানোর জন্য عمیق শব্দ ব্যবহৃত হয়। এ দু'টো শব্দ যে গভীরতা ও প্রশস্ততা পরিমাপ করা যায় সে গভীরতা ও প্রশস্ততার ক্ষেত্রে শব্দ দু'টো ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু যে প্রশস্ততা পরিমাপ করা যায় না বা যে গভীরতার কোনো সীমারেখা নেই, যা পরিমাপ করা যায় না বা যে গভীরতার তলদেশ স্পর্শ করাও যায় না, ক্ষেত্র বিশেষে সেই গভীরতা বা প্রশস্ততাকে বুঝানোর জন্য আরবী عظیم শব্দ ব্যবহার হয়। মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল (সা:) এর মহান চরিত্র সম্পর্কে যে সনদ দান করেছেন সেই সনদের মধ্যে عظیم শব্দটি ব্যবহার করেছেন। সমগ্র মানব জাতি কল্পনাও করতে পারবে না মহান আল্লাহ তা'য়ালা মর্যাদার কোন্ উচ্চস্তরে নবী করীম (সা:) কে উপনীত করেছেন। তাঁর চরিত্রের মহানত্ব এতই গভীর যে, যার তলদেশ কখনো স্পর্শ করা যাবে না এবং পরিমাপও করা যাবে না।
নবী করীম (সা:) এর চারিত্রিক মাধুর্যতা এবং ব্যক্তিত্বের অনুপম আকর্ষণ এতই মধুর, চিত্তাকর্ষক ও প্রশান্তিদায়ক ছিলো যে, কোনো মানুষ যখন তাঁর সান্নিধ্যে আগমন করতো, তখন সে ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলে গিয়ে নবী করীম (সা:) এর দিকে অপলকনেত্রে তাকিয়ে থাকতো। অগণিত মানুষ সমবেত হয়ে তাঁর পবিত্র মুখের কথা শুনতো। এমন তন্ময় হয়ে কথা শুনতো যে, তাদের দেহের স্বাভাবিক স্পন্দনও অনুভব করা যেতো না। জড়পদার্থের ন্যায় অনড় অবিচল হয়ে সমবেত লোকজন বসে থাকতো। মাথার ওপর কোনো পাখী এসে বসলেও তাঁরা অনুভব করতো পারতো না। নবী করীম (সা:) এর মমতা ও প্রেমময় ব্যবহার সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন-
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللهِ لِنْتَ لَهُمْ ج وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلَيْظَ الْقَلْبِ لَأَنْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ص فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ جِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ طَ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
এটা আল্লাহর এক (অসীম) দয়া যে, আপনি এদের সাথে ছিলেন কোমল প্রকৃতির (মানুষ, এর বিপরীতে) যদি আপনি নিষ্ঠুর ও পাষাণ হৃদয়ের (মানুষ) হতেন, তাহলে এসব লোক আপনার আশপাশ থেকে সরে যেতো, অতএব আপনি এদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দিন, এদের জন্যে (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কাজকর্মের ব্যাপারে এদের সাথে পরামর্শ করুন, অতঃপর (সে পরামর্শের ভিত্তিতে) সঙ্কল্প একবার যখন নিয়ে নিবেন তখন (তার সফলতার জন্যে) আল্লাহর ওপর ভরসা করুন; অবশ্যই আল্লাহ তা'য়ালা (তাঁর ওপর) নির্ভরশীল মানুষদের ভালোবাসেন। (সূরা আলে ইমরান- ১৫৯)
মানুষের সামান্যতম অসুবিধা দেখলে যাঁর নয়ন দু'টো অশ্রুসজল হয়ে উঠতো, যিনি ক্ষুদ্র প্রাণীর কষ্টও বরদাস্ত করতে পারতেন না, সেই করুণার সিন্ধু সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُوَلٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ
(হে মানুষ,) তোমাদের কাছে তোমাদেরই মধ্য থেকে এক রাসূল এসেছেন, তোমাদের কোনোরকম কষ্ট ভোগ তাঁর কাছে দুঃসহ, তিনি তোমাদের একান্ত কল্যাণকামী, ঈমানদারদের প্রতি তিনি হচ্ছেন স্নেহপরায়ণ ও পরম দয়ালু। (সূরা তাওবা-১২৮)
নবী করীম (সা:) স্বয়ং নিজের সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন-
قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّم إِنَّمَا بُعِثْتُ لاتمم مكارم الأخلاق নবী করীম (সা:) বলেন, অনুপম চরিত্রকে তার পূর্ণতায় পৌঁছে দেয়ার জন্যই আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে।
এখানে একটি ঘটনার উল্লেখ করছি, একদিন নবী করীম (সা:) মসজিদে নববীতে সাহাবায়ে কেরামের সমাবেশে বক্তব্য রাখছিলেন। এক অমুসলিম গ্রাম্য লোক, যারা বেদুঈন নামে পরিচিত। লোকটি এ দৃশ্য দেখে বিস্ময় অনুভব করলো, একজন মানুষ কথা বলছে আর এতগুলো মানুষ পিনপতন নীরবতার মধ্য দিয়ে তাঁর কথা শুনছে, এমন অবাক করা দৃশ্য তো জীবনে কখনো দেখিনি!
এ কথা চিন্তা করে লোকটি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলো নবী করীম (সা:) কি বলছেন তা শোনার জন্য। আল্লাহ তা'য়ালার রাসূলের পবিত্র কণ্ঠ নিঃসৃত অমীয় বাণী শুনে নীরব নিথর হয়ে গেলো। পর্বতের মতো স্থির হয়ে সে আল্লাহর রাসূলের চেহারা মুবারকের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কথা শুনতে থাকলো। অনেকক্ষণ পর লোকটি অনুভব করলো তাকে মুত্র ত্যাগ করতে হবে। পূর্বের অভ্যাস অনুযায়ী সে সকলের সম্মুখেই মসজিদের ভেতরে দেয়ালের দিকে ফিরে মুত্র ত্যাগ শুরু করলো。
সাহাবায়ে কেরাম এ দৃশ্য দেখে লোকটিকে প্রহার করতে উদ্যত হতেই নবী করীম (সা:) সাহাবায়ে কেরামকে থামিয়ে দিয়ে নিজে এগিয়ে গেলেন। মুত্র ত্যাগ শেষ হলে রাসূল (সা:) মধুর সম্ভাষণে লোকটিকে বললেন, 'দেখো, এটি মসজিদ। এখানে আমরা মহান আল্লাহ তা'য়ালাকে সিজদা দেই, এ কারণে এটি পবিত্র স্থান। ভবিষ্যতে তুমি এ ধরনের পবিত্র স্থানে ঐ কাজটি করো না যা তুমি এই মাত্র এখানে করলে। এবার তুমি যেতে পারো'।
লোকটি দেখেছিলো উপস্থিত লোকজন তাঁর ওপরে ক্ষিপ্ত হয়েছিলো শুধু মাত্র নবী করীম (সা:) ব্যতীত। এরপর আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল (সা:) এর অনুপম ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে লোকটির মুখ থেকে নির্গত হলো- اللَّهُمَّ ارْحَمْنِي وَ مُحَمَّدًا وَّ لَا تَرْحَمْ مَّعَنَا أَحَدًا -
হে আল্লাহ! তুমি আমার ও মুহাম্মাদ (সা:) এর প্রতি রহম করো, আর আমাদের দু'জনের বাইরে এদের কাউকে রহম করো না। কারণ এরা আমাকে প্রহারে উদ্যত হয়েছিলো'।
লোকটির দোয়ায় কার্পণ্যতা দেখে নবী করীম (সা:) এমনভাবে হেসে উঠলেন যে, তাঁর দন্ত মুবারকের উজ্জ্বলতা বিকশিত হয়েছিলো। লোকটি বিদায় নেয়ার পর তিনি উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে বললেন-
يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا إِنَّمَا بُعِثْتُمْ مُّيَسِّرِينَ
সহজ করো, কঠিন করো না। তোমাদের পাঠানোই হয়েছে সহজ করার জন্য। যাও, এখন ঐ মুত্র ত্যাগের স্থানে পানি ঢেলে দাও।
হযরত আলী (রা:) বলেছেন, নবী করীম (সা:) কর্কশ স্বভাব বা সঙ্কীর্ণমনা ছিলেন না। তাঁর পবিত্র জবান থেকে কখনো অশোভনীয় কথা বেরোতো না। কারও দোষ তিনি কখনো খুঁজেন নি। তিনি তর্কে বিতর্কে জড়াতেন না। কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতেন না যদি তা শরীয়ত সম্মত হতো। ব্যক্তিগত কারণে তিনি কারো ওপরে কক্ষণো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি এবং শাস্তিও দেননি। তাঁর সাথে কেউ অশোভন আচরণ করলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দিতেন। তিনি ছিলেন অতুলনীয় বিনয়ী এবং দয়ার্দ্র প্রকৃতির। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই ছিলো তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। পৃথিবী যখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন থাকতো তখন তিনি নির্ঘুম থেকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে নামাজ আদায় করতেন। নামাজে দাঁড়িয়ে ও সিজদায় তিনি রাতের এক বড় অংশ অতিবাহিত করতেন। নামাজে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তাঁর পবিত্র কদম মুবারক ফুলে যেতো।
হযরত আয়িশা (রা:) বলেন, 'আমি নবী করীম (সা:) এর কাছে একদিন জানতে চাইলাম, 'আপনি কেনো এত কষ্ট স্বীকার করেন, অথচ আল্লাহ তা'য়ালা আপনার পূর্বাপর, অগ্র-পশ্চাৎ সকল কিছুই ক্ষমা করে দিয়েছেন'।
নবী করীম (সা:) স্মিত হেসে আমাকে বলেছেন, আমি কি মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী বান্দাহ্ হবো না! (বুখারী, মুসলিম)
তাঁর পবিত্র চেহারা মুবারক ছিলো সদা হাস্যোজ্জ্বল এবং কথা ও কাজে ছিলো অপূর্ব সমন্বয়। এক কথায় সর্বোন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্টের সকল গুণাবলীর সমাবেশ ছিলো নবী করীম (সা:) এর মধ্যে। ইতোপূর্বেও পৃথিবীতে তাঁর কোনো তুলনা- ছিলো না এবং কিয়ামত পর্যন্তও তাঁর সাথে তুলনা করা যেতে পারে এমন মানুষের আবির্ভাব এ পৃথিবীতে ঘটবে না। কোনো একদিন হযরত আলী (রা:) নবী করীম (সা:) এর কাছে তাঁর রীতি-নীতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জবাবে তিনি বললেন-
الْمَعْرِفَةُ رَأْسِ مَلَىَ অর্থাৎ 'আল্লাহ তা'য়ালার পরিচয় লাভ আমার পুঁজি'। الْعَقل اصل دینی অর্থাৎ 'পরিশুদ্ধ জ্ঞান আমার দ্বীনের ভিত্তি'। الْحُبُّ أَساسي অর্থাৎ 'ভালোবাসা আমার মূলনীতি'। الشَّوْقُ مَرْكَبِي অর্থাৎ 'আগ্রহ আমার বাহন'। الذِّكْرُ أَنيسى অর্থাৎ 'মহান আল্লাহর স্মরণ আমার সঙ্গী'।
- الشَّقَةُ كُنْزِى অর্থাৎ 'আল্লাহ তা'য়ালার ওপর নির্ভরতা আমার ভান্ডার'।
- الْحُزْنَ رَفِيقى অর্থাৎ '(স্বজাতীর মুক্তির জন্য) হৃদয়ে কষ্টবোধ আমার সাথী'।
- الْعَلْمُ سَلَاحِي অর্থাৎ 'জ্ঞান আমার হাতিয়ার'।
- الصَّبْرُ رَدَائِي অর্থাৎ 'ধৈর্য আমার ভূষণ'।
- أَلرَّضَا عَنِيْمَتِي অর্থাৎ 'আল্লাহ তা'য়ালার সন্তুষ্টি আমার জন্য গণীমাত'।
-الْهُجْرُ فَخْرى অর্থাৎ 'বিনম্রতা আমার গৌরব'।
- أَلزَّهْدُ حُرْفَتى অর্থাৎ 'পার্থিব বস্তু নিচয়ের প্রতি অনাগ্রহ আমার পেশা'।
- أليَقين قُوَّتى অর্থাৎ 'বিশ্বাস আমার শক্তি'।
- أَلصَّدْقُ شَفَيْعِي অর্থাৎ 'ন্যায়-পরায়ণতা আমার সহচর'।
- وَالطَّاعَةِ حَسْبي অর্থাৎ 'আল্লাহ তা'য়ালার আনুগত্যের মধ্যেই আমার মর্যাদা'।
- وَالْجِهَادُ خُلُقى অর্থাৎ 'সত্যের পথে সংগ্রাম আমার প্রকৃতি'।
- وَ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلَواةِ অর্থাৎ 'নামাজের মধ্যেই রয়েছে আমার দৃষ্টির প্রশান্তি' ।
নবী করীম (সা:) ব্যতীত মানব সৃষ্টির সূচনা থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত একজন মানুষের মধ্যেও সর্বোত্তম চরিত্রের সকল গুণাবলীর সমাবেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না। মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর হাবীবের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের সকল গুণাবলীর সমাবেশ ঘটিয়ে ছিলেন। বয়োজ্যেষ্ঠ থেকে ছোট্ট শিশু পর্যন্ত কেউই কখনো নবী করীম (সা:) কে প্রথমে সালাম জানানোর সুযোগ পায়নি। যে কোনো বয়সের মানুষকে তিনি প্রথমে সালাম দিতেন। শিশুদের সালাম জানিয়ে তিনি মাথায় হাত বুলিয়ে গভীর মমতায় আদোর জানাতেন। এ কারণে মুসলিম ও অমুসলিম শিশুরাও নবী করীম (সা:) এর পাশে ভীড় জমাতো। নবী করীম (সা:) শিশুদের আদোর জানিয়ে চুমু দিচ্ছেন দেখতে পেয়ে একজন সাহাবী বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো আপনার নাতীসহ সকল শিশুদের আদোর করে চুমু দেন। আমার বেশ কয়েকটি বাচ্চা, আমি তাদের একজনকেও চুমু দিই না'।
নবী করীম (সা:) শিশুকে আদোর করতে করতে বললেন, 'আল্লাহ তা'য়ালা যদি তোমার হৃদয় থেকে দয়ামায়া তুলে নেন তাহলে আমি কি করতে পারি!'
নবী করীম (সা:) কিশোর, তরুণ ও যুবকদের প্রতি সর্বাধিক আগ্রহী ছিলেন এবং তিনি তাঁদের প্রতি গভীর মমতা পোষণ করতেন। কারণ এই কিশোর, তরুণ ও যুবকরাই আল্লাহর যমীনে মহান আল্লাহ তা'য়ালার অবতীর্ণ করা জীবন ব্যবস্থা ইসলাম প্রতিষ্ঠায় সকল প্রকার ত্যাগ স্বীকার করে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ভোগ বিলাসের জীবনে লাথি মেরে তাঁরা সীমাহীন কষ্টের জীবন বেছে নিয়েছে এবং দলে দলে শাহাদাত বরণ করেছে। নবী করীম (সা:) বক্তব্য রাখছেন, অগণিত মানুষের সমাবেশে বসার কোনো স্থান নেই। রাসূল (সা:) দেখলেন তরুণ সাহাবী হযরত জারীর (রা:) দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তব্য শুনছেন।
তাঁর দিকে গভীর মমতার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মহান আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল (সা:) নিজের চাদর মুবারক উঠিয়ে তরুণ সাহাবী হযরত জারীর (রা:) এর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, 'জারীর, তুমি দাঁড়িয়ে রয়েছো কেনো! এই নাও, আমার চাদরের ওপর বসো'।
হযরত জারীর (রা:) দ্রুত হাত বাড়িয়ে আল্লাহর রাসূল (সা:) এর চাদর মুবারক দু'হাতে নিয়ে বুকের মধ্যে জড়িয়ে বার বার চাদরে চুমু দিয়ে বলতে লাগলেন, 'আল্লাহ তা'য়ালা আপনার মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করে দিন হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমি কি পারি আপনার চাদরের ওপর বসতে! আপনার মর্যাদা কত বিশাল!'
নবী করীম (সা:) কিশোর, তরুণ ও যুবকদের কথা উল্লেখ করে লোকদেরকে বলেছেন- اُوصِيْكُمْ بِالشَّبَابِ خَيْرًا فَإِنَّهُمْ عَرَقُ أَفْئِدَة لَقَدْ بَعْشَنِيَ اللَّهُ بِالْحَنِيفِيَّةِ سَمْحًا مُحَالَفِنَ الشَّبَابَ وَ خَالَفْنَ الشَّيُوْحُ
'আমি তোমাদের তরুণদের ব্যাপারে কল্যাণকামী হবার জন্য নসীহত করছি। তাদের হৃদয় কোমল, আল্লাহ তা'য়ালা আমাকে আল্লাহমুখীতা ও উদারতা সহকারে প্রেরণ করেছেন। এ কাজে তরুণরা আমাকে সহযোগিতা করেছে আর বৃদ্ধরা করেছে বিরোধিতা'।
ইতিহাস কথা বলে, নবী করীম (সা:) নবুয়্যাত লাভ করার পরে যখন ইসলামী আন্দোলনের সূচনা করলেন তখন চরম প্রতিকুল পরিবেশে সকল প্রকার ভোগ বিলাসের মাথায় পদাঘাত করে কিশোর, তরুণ ও যুবকরাই প্রথমে সাড়া দিয়ে ইসলামের পতাকা তলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। এ সময় সকলের বয়স ছিলো ৪০ বছরের নীচে এবং ৮ বছর, ১৪ থেকে ২০ বছর বয়সের কিশোর তরুণদের ভীড় জমেছিলো নবী করীম (সা:) এর পবিত্র সান্নিধ্যে। আর যারা বিরোধিতা করেছিলো তাদের প্রায় সকলের বয়স ছিলো ৪০ এর ঊর্ধ্বে।