📄 নবী করীম (সা:) নিজের কাজ নিজেই করতেন
নবী করীম (সা:) তাঁর নিজের কাজ নিজেই করতেন। সেবকদের ওপর কোনো কাজ তিনি চাপিয়ে দিতেন না। নিজের কাজ নিজেই সমাধা করার বিষয়টি ছিল তাঁর কাছে খুবই প্রিয়। বাড়িতে যতক্ষণ থাকতেন, কখনো অলস বসে থাকেননি। নিজের হাতে নিজের জামা সেলাই করতেন। জামায় বোতাম লাগাতেন। বাজার থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনতেন। পানি উঠানো বালতিতে রশি লাগাতেন। তিনি নিজে উট বাঁধতেন।
অথচ তাঁর বাড়িতে গোলামের অভাব ছিল না। সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর রাসূলের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কাজ করে দেয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করতেন। কিন্তু তাঁর কাজ অন্য কেউ করবে, এটা তিনি পছন্দ করতেন না। নিজের জুতা নিজেই সেলাই করতেন। নিজের পশুর যত্ন নিতেন। পশুকে খেতে দিতেন। রুটি বানানোর জন্য আটা মাখিয়ে দিতেন। নবী (সা:) তাঁর উটের শরীরে নিজেই তেল মাখিয়ে দিতেন।
একদিন মসজিদে নববীতে গিয়ে দেখলেন, কোনো এক ব্যক্তি নাক থেকে সর্দ্দিদ ফেলে রেখেছে। তিনি এ কথা কাউকে জিজ্ঞাসা করলেন না, এ কাজ কে করেছে। কাউকে আদেশ দিলেন না, এটা পরিষ্কার করো। তিনি নিজেই পরিষ্কার করে বললেন, মসজিদে এসব নিক্ষেপ করা যাবে না।
মাসজিদে নববী নির্মাণের সময় তিনি নিজে পাথর বহন করেছেন। মাটি খনন করেছেন। কোনো এক সফরের সময় রান্নার আয়োজন করা হলো। সবাই কাজে লেগে গেল। নবী করীম (সা:) কে কেউ কোনো দায়িত্ব দিল না। তিনি নিজেই দায়িত্ব উঠিয়ে নিলেন। বললেন, আমি জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে আনবো।
সাহাবায়ে কেরাম বাধা দিলে তিনি বললেন, আমি এ ধরনের শ্রেণী বৈষম্য পছন্দ করি না। একদিন ভ্রমণকালে তাঁর জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেল। তিনি নিজের হাতেই তা মেরামত করতে থাকলেন। একজন সাহাবা আবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে দিন, আমি মেরামত করে দিচ্ছি।
আল্লাহর নবী জবাব দিলেন, এটাও এক ধরনের শ্রেণী বৈষম্য যা আমি পছন্দ করি না।
তিনি শুধু নিজের কাজ যে নিজেই করতেন তা নয়, অন্যের কাজ পর্যন্ত করে দিতেন। মদীনার দাস-দাসীগণ নবীর কাছে এসে আপনজনের মত আবেদন করতো, হে আল্লাহর রাসূল! আমার অমুক কাজ পড়ে রয়েছে।
তিনি তাঁর সাথে গিয়ে তাঁর সে কাজ শেষ করে দিয়ে তবেই আসতেন। মদীনায় একজন পাগলী দাসী ছিল। সে একদিন নবী করীম (সা:) এর হাত ধরলো। তিনি তাঁকে বললেন, হে নারী! তুমি আমাকে যে রাস্তায় নিয়ে যেতে চাও আমি সেখানে গিয়েই তোমার কাজ করে দেব।
নবী করীম (সা:) তাঁর সাথে এক রাস্তায় গেলেন এবং তাঁর কাজ শেষ করে তবে ফিরলেন। একদিন তিনি নামাজের প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। এমন সময় একজন বেদুঈন এসে তাঁর কাপড় ধরে টেনে বললো, আমার কিছু কাজ রয়েছে, এমন যেন না হয় যে আমি তা ভুলে যাই। আপনি প্রথমে আমার কাজ করে দিন।
নবী করীম (সা:) মাসজিদ থেকে বের হয়ে তাঁর সাথে গিয়ে কাজ শেষ করে এসে নামাজ আদায় করলেন। হযরত জুন্নাব (রা:) যুদ্ধে গমন করলেন। তিনি ব্যতীত তাঁর বাড়িতে অন্য কোনো সক্ষম পুরুষ ছিল না। নবী (সা:) প্রতিদিন তাঁর বাড়িতে যেতেন এবং উটের দুধ দুইয়ে দিয়ে আসতেন। আবিসিনিয়া থেকে মেহমান এলে সাহাবায়ে কেরাম আবেদন করলেন, তাঁরা এই মেহমানদের সেবা-যত্ন করবেন। তিনি বললেন, তাঁরা আমার বন্ধুদের খেদমত করেছে। এ কারণে আমি তাদের খেদমত করবো।
তায়েফ অবরোধের সময় তায়েফের সাকিফ গোত্রের লোকজন নবী করীম (সা:) এর পবিত্র কদম মুবারক আহত করেছিল। তাঁরা যখন তাঁর কাছে এলো তখন তিনি তাদেরকে মাসজিদে নববীতে অবস্থান করতে দিলেন এবং নিজে তাদের মেহমানদারী করলেন। (বুখারী, মুসনাদে আহমাদ, নাসায়ী, যুরকানী, মুসনাদে ইবনে হাম্বল, ইবনে সায়াদ, আবু দাউদ, দারেমী)
📄 সেবকদের প্রতি নবী করীম (সা:) এর আচরণ
সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর নবীর জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করতেন। নবীর সামান্য কোনো কাজ, কে কার আগে করবে তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলতো। তবুও তিনজন ব্যক্তি এমন ছিলেন যে, তাঁরা রাসূল (সা:) এর একান্ত ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত ছিলেন। এই তিনজনের মধ্যে হযরত বিলাল (রা:) নবী পরিবারের দায়িত্ব পালন করতেন।
আরো যে দু'জন নবীর একান্ত কাজ করতেন, তাঁরা হলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) ও হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা:)। স্বয়ং নবী (সা:) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) সম্পর্কে বলেছেন, কেউ যদি কুরআন যেমনভাবে অবতীর্ণ হয়েছে তেমনভাবে পাঠ করতে চায় তাহলে সে যেন তাঁকে অনুসরণ করে।
মক্কার জীবনে কিশোর বয়সে তিনি সারা দিন পাহাড়ে ছাগল চরাতেন। নবী করীম (সা:) হযরত আবু বকর (রা:) কে সাথে নিয়ে মদীনায় হিজরত করার সময় সেই কিশোরের কাছে গিয়ে বললেন, এই ছাগল থেকে আমাদের কিছু দুধ দুইয়ে দাও, আমরা পিপার্সিত। দুধ পান করে পিপাসা নিবারণ করি।
বালক জবাব দিল, এ কাজ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, আমি ছাগলগুলোর মালিক নই। আমি এদের রাখাল। অপরের সম্পদ আমি কি করে দিতে পারি?
বালক আল্লাহর নবীকে চিনতো না। নবী (সা:) বালকের সততা দেখে মুগ্ধ হলেন। তিনি বললেন, ঠিক আছে, তুমি এমন একটি ছাগল দেখিয়ে দাও, যে ছাগল এখন পর্যন্ত কোনো বাচ্চা দেয়নি বা পাঁঠার সংস্পর্শে আসেনি।
বালক একটি ছোট্ট ছাগল দেখিয়ে দিল। নবী করীম (সা:) সে ছাগলের ওলানে আল্লাহর নাম নিয়ে পবিত্র হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন। ওলান দুধে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। দুধ দুইয়ে তিনি এবং আবু বকর (রা:) পান করলেন এবং বালককেও পান করতে দিলেন। বালক এমন অবাক কান্ড জীবনে কখনো দেখেনি। অবাক হয়ে সে এই দৃশ্য দেখলো। তারপর কিছু দিনের মধ্যেই সে নবীর পরিচয় লাভ করে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তিনি নিজেকে নবী (সা:) এর খাদেম হিসাবে উৎসর্গ করেছিলেন। যে বালক ছিল ছাগলের রাখাল, সে হয়ে গেল সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি বিশ্বনবী (সা:) এর একান্ত খাদেম।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) সেই কিশোর বয়স থেকেই নবী করীম (সা:) এর কাছে অবস্থান করতেন। আল্লাহর রাসূলের ঘরে প্রবেশ করার জন্য তাঁর অনুমতির প্রয়োজন ছিল না। নবী পরিবারের অনেক বিষয় তিনি অবগত ছিলেন। এ কারণে তাঁকে 'সাহিবুস্সির' বা নবীর গোপন বিষয়ের অধিকারী বলা হতো। নবী করীম (সা:) কোনো স্থানে গমন করলে তিনি রাসূলের ঘুমানোর, অজুর ব্যবস্থা করতেন এবং রাসূলের মিসওয়াক রাখতেন।
রাসূল (সা:) পথ চলতে থাকলে তিনি লাঠি হাতে আগে আগে যেতেন। নবীর পায়ে জুতা পরিয়ে দিতেন এবং রাসূল (সা:) জুতা খুলে রাখলে তা উঠিয়ে নিজের বোগলে রাখতেন। রাসূল (সা:) উঠে দাঁড়ালেই আবার সে জুতা পরিয়ে দিতেন। তিনি নবীর ঘরেই প্রতিপালিত হয়েছিলেন বলে তাঁর সমগ্র চরিত্র রাসূলের অনুকরণে গড়ে উঠেছিল। স্বয়ং নবী করীম (সা:) ছিলেন তাঁর মহান শিক্ষক। তাঁর মতো জ্ঞানী এবং কুরআন বুঝার অধিকারী সাহাবী খুব কমই ছিলেন।
হযরত আনাস (রা:) যখন আল্লাহর নবীর কাছে এলেন তখন তিনি ছিলেন একেবারে শিশু। তাঁর মা তাঁকে নবীর খেদমতে উৎসর্গ করে গেলেন। সেই শিশু বয়স থেকে তিনি দীর্ঘ দশ বছর নবীর কাছে কাটিয়ে দিলেন। আল্লাহর নবীর বহু কাজ তিনি করতেন। বিভিন্ন লোকজনকে ডেকে আনা বা সংবাদ দেয়া, অজুর পানি ভরে রাখা ইত্যাদি কাজ তিনি করতেন। তিনিও নবী পরিবারের একজন হয়েছিলেন।
শিশু বয়সে কতভাবে তিনি নবী করীম (সা:) কে বিরক্ত করতেন। কিন্তু আল্লাহর হাবিব কখনো তাঁর সাথে উচ্চকণ্ঠে কথা বলেননি বা তাঁকে এ প্রশ্ন করেননি, কেনো তুমি এই কাজ করলে? নবীর চেহারা মুবারকে তাঁরা হাসি ব্যতীত আর কিছুই দেখেননি। কখনো কৌতুক করে তিনি হযরত আনাস (রা:) কে 'হে দুই কানওয়ালা' বলে ডাকতেন। কারণ হযরত আনাস (রা:) আল্লাহর রাসূলের এতই ভক্ত ছিলেন যে, তাঁর কান সব সময় সজাগ থাকতো, কখন কোন্ কাজের জন্য আল্লাহর রাসূল তাঁকে আহ্বান করেন।
একদিন কিশোর বালক হযরত আনাস (রা:) কে বিশ্বনবী (সা:) কোথাও যাবার জন্য বললেন। তিনি কিশোরসুলভ চপলতার প্রকাশ ঘটিয়ে বলেছিলেন, আমি যেতে পারবো না।
নবী করীম (সা:) তাঁকে কিছু না বলে নীরব রইলেন। হযরত আনাস (রা:) ঘরের বাইরে চলে যেতে উদ্যত হলেন। আল্লাহর নবী (সা:) পেছন থেকে তাঁর ঘাড়ে হাত দিলেন। তিনি রাসূলের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সে মুখে রাগের প্রকাশ নেই। পূর্ণিমার চাঁদের হাসি পবিত্র মুখে তরঙ্গ তুলেছে। আল্লাহর রাসূল (সা:) বললেন, আমি যে কাজের কথা বলেছিলাম, এখন সে কাজে যাবে তো!
হযরত আনাস বলেছেন, আমি দীর্ঘ সাত বছরযাবৎ আল্লাহর রাসূলের খেদমতে অবস্থান করেছি। তিনি কখনো সামান্য বিরক্তি প্রকাশ করে বলেননি, কেনো তুমি এই কাজ করলে? (মুসলিম, আবু দাউদ)
📄 নবী করীম (সা:) কে দেয়া হয়েছিলো ঝিনুকের মাঝে মহাসমুদ্র
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমগ্র মানবগোষ্ঠীর জন্যে যাঁকে মুক্তির দূত হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন, তাঁকে অকল্পনীয় দৃষ্টিনন্দন শ্রুতিমধুর অলঙ্কারে সুসজ্জিত করেই সমগ্র সৃষ্টির সম্মুখে প্রেরণ করেছিলেন। ভাষাগত ক্ষেত্রে তাঁকে এমন অতুলনীয় অলঙ্কারে ভূষিত করা হয়েছিলো যে, তিনি ব্যাপক অর্থবোধক ও বিশ্লেষণ সাপেক্ষ বিষয়াদি অতি অল্প কথায় সহজে বোধগম্য ভাষায় ব্যক্ত করতেন। এই অতুলনীয় যোগ্যতা ইতোপূর্বে কাউকে দেয়া হয়নি এবং কিয়ামত পর্যন্ত কাউকে দেয়াও হবে না। পৃথিবীতে ভাষা ও বৈয়াকরণগণ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সাপেক্ষ বহু বিষয়াদি স্বল্প কথায় প্রকাশযোগ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যাক্য তৈরী করেছেন। কিন্তু নবী করীম (সা:) স্বল্প ভাষায় ক্ষুদ্র বাক্যে ব্যাপক অর্থবোধক যে সকল বাক্য মানব জাতিকে উপহার দিয়েছেন, তা অতুলনীয় এবং অলঙ্কার মণ্ডিত। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদের পক্ষে কিয়ামত পর্যন্ত চেষ্টা-সাধনা করেও এমন একটি বাক্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ নবী করীম (সা:) এর মর্যাদার সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণ যোগ্যতা দান করেছিলেন আরবী ভাষায় যাকে বলা হয়, 'জাওয়া মিউল কালিম'। এ সম্পর্কে স্বয়ং রাসূল (সা:) বলেছেন, (আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে) আমাকে 'জাওয়া মিউল কালিম' দান করা হয়েছে। (মুসলিম)
ক্ষুদ্রতম শব্দে, স্বল্প বাক্যে ব্যাপক অর্থবোধক অথচ সহজে বোধগম্য বাক্যকে 'জাওয়া মিউল কালিম' বলা হয়। হাদীসের কিতাবসমূহে অনুসন্ধান করলে এমন অসংখ্য অগণিত ক্ষুদ্রতম বাক্য পাওয়া যাবে যার অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক কিন্তু সহজে বোধগম্য। অর্থাৎ ভাষাগত ক্ষেত্রে ভাব প্রকাশের লক্ষ্যে কুল-কিনারাহীন অগাধ জলধী সমুদ্র মহাসমুদ্রকে ক্ষুদ্রতম একটি ঝিনুকের মধ্যে প্রবিষ্ট করিয়ে নবী করীম (সা:) কে দান করা হয়েছিলো। আমরা হাদীসের কিতাবসমূহ থেকে রাসূল (সা:) এর মর্যাদাপূর্ণ বাক্য এখানে তুলে ধরছি। নবী করীম (সা:) বলেছেন-
اتَّقِ اللَّهَ حَيْثُ مَا كُنْتَ - 'যে অবস্থায়ই থাকো আল্লাহ তা'য়ালাকে ভয় করো'।
নবী করীম (সা:) সমগ্র মানব মণ্ডলীকে লক্ষ্য করে বলছেন, যেখানে যে অবস্থায়ই অবস্থান করো না কেনো, সর্বাবস্থায় ঐ সত্তাকে ভয় করো যিনি তোমার অবস্থা দেখছেন এবং তোমার ভেতর বাইরের সকল বিষয়ে অবগত রয়েছেন। এমনকি তোমার মনের গহীনে যে কল্পনার উদ্রেক হচ্ছে আবার তা পানির বুদ্বুদের মতোই মিলিয়ে যাচ্ছে, সে সম্পর্কেও তিনি পূর্ণমাত্রায় অবগত আছেন। পরিবার পরিজন পরিবেষ্টিত থাকো, একাকী থাকো, বিপুল জনসমাবেশে থাকো, নির্জন পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ের কোনো নিভৃত গুহায় অবস্থান করো, মহাশূন্যের কোনো গ্রহে থাকো অথবা মহাসাগরের অতল তলদেশের কোনো পর্বতের গুহায় শৈবালদাম পরিবেষ্টিত অবস্থায় একাকী থাকো, সর্বাবস্থায় মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালাকে ভয় করো। তিনি তোমার সকল কিছুই দেখছেন। এ কারনেই হযরত আলী (রা:) বলেছেন, 'তুমি যখন একাকী থাকবে তখন আল্লাহকে সবথেকে বেশি ভয় করবে। কারন তুমি একাকী অবস্থায় যে কাজ করবে তার সাক্ষীও আল্লাহ তা'য়ালা এবং বিচারকও মহান আল্লাহ'। নবী করীম (সা:) বলেছেন-
مَنْ لا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ 'যে অনুগ্রহ করে না সে অনুগ্রহ পায় না'।
অনুগ্রহ বা করুণা প্রদর্শন শুধুমাত্র অন্যের প্রতি নয়, নিজের প্রতিও অনুগ্রহ করার বিষয়টি উল্লেখিত সংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যে শামিল রয়েছে। নিজের প্রতি অনুগ্রহ করার অর্থ হলো, মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা লংঘন করে নিজেকে ধ্বংস গহ্বরে নিক্ষেপ না করা এবং স্বাস্থ্য সচেতন থেকে নিজেকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করা। উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলসহ অন্য সকল মানুষের ক্ষেত্রে অনুগ্রহের বাহু বিছিয়ে দেয়া। সুতরাং যে মানুষ অনুগ্রহ করে সে স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালার অনুগ্রহের দৃষ্টি লাভে ধন্য হয়। নবী করীম (সা:) বলেছেন-
الْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةُ - 'উত্তম কথা বলাও সৎকর্ম সম্পাদনের অন্তর্গত'।
كُلُّ ذِي نَعْمَةٍ مَّحْسُودٌ - 'প্রত্যেক সৌভাগ্যশালী ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা পোষণ করা হয়'।
سَيِّدُ الْقَوْمِ خَادِمُهُمْ - 'জনগণের যে সেবা করে সেই তাদের নেতা'।
الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبُّ 'মানুষ যাকে ভালোবাসে কিয়ামতের ময়দানে সে তার সাথেই অবস্থান করবে'।
أَسْلِمْ تَسْلِمْ 'মুসলিম হও শান্তিতে থাকতে পারবে'।
নবী করীম (সা:) মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজা, বাদশাহ, সম্রাট তথা শাসকবৃন্দের কাছে পবিত্র কুরআনের আহ্বান পৌঁছানোর লক্ষ্যে দুতের মাধ্যমে পত্র প্রেরণ করতেন। রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে তিনি যে পত্র প্রেরণ করেছিলেন, সেই পত্রে তিনি লিখিয়েছিলেন, 'মুসলিম হও তাহলে শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারবে'।
মুসলিম আরবী শব্দ, এর অর্থ হলো মহান আল্লাহর বিধানের প্রতি আত্মসমর্পণকারী। আল্লাহর বিধান মেনে নিয়ে যারা তা অনুসরণ করে মাছ যেমন প্রশান্তিতে পানিতে বাস করে তেমনি তারাও শান্তিতে জীবন যাপন করে। এ জন্যই রোম সম্রাটের কাছে নবী করীম (সা:) যে পত্র প্রেরণ করেছিলেন উক্ত পত্রে উল্লেখ করেছিলেন, মুসলিম হও (আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করো) শান্তিতে জীবন-যাপন করতে পারবে।
لَيْسَ لِلْعَمِلِ مِنْ عَمَلِهِ إِلَّا مَانَوَ
'যে কাজ করে সে কেবল (নিজ কার্জের) উদ্দেশ্য অনুযায়ী ফলাফল লাভ করে'।
إِنَّمَا الْأَعْمَالُم بِالنَّيَّاتِ
'নিয়ত অনুযায়ী কাজের ফল পাবে'।
الْحَرْبُ خِدْعَةٌ
'যুদ্ধ একটি কৌশল'।
لَيْسَ الْخَبْرُ كَالْمُعَايَنَة -
'দেখা ও শোনা সমপর্যায়ের বিষয় নয়'।
الْمَجَالِسُ بالأمنة -
'একান্ত বিশ্বস্ততা বৈঠকের পূর্ব শর্ত'।
تَرْكُ الشَّرِّ صَدَقَةً -
'অসৎ কর্ম বর্জন করাও একটি সৎকর্ম'।
ব্যাপক অর্থবোধক ও সহজে বোধগম্য এমন অসংখ্য হাদীস রয়েছে, যে হাদীসসমূহের ব্যাখ্যা করতে গেলে বিশাল আকৃতির গ্রন্থ রচিত হবে। সংক্ষিপ্ত বাক্য সম্বলিত এসব হাদীস মানব জীবনকে সুন্দর সপ্নীল করার জন্যে যথেষ্ট, যদি বর্ণিত এসব হাদীসের আদেশ উপদেশ বাস্তব জীবনে অনুসরণ করা হয়।
📄 নবী করীম (সা:) এর ভাষণের নমুনা
নবী করীম (সা:) জনগণের উদ্দেশ্যে পথনির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়েছেন। তাঁর ভাষণ কখনোই এতটা দীর্ঘ হয়নি যে, শ্রোতাবৃন্দের মনে বিরক্তি সৃষ্টি করবে অথবা এমন সংক্ষিপ্তও হয়নি যে, শ্রোতাবৃন্দ সঠিক বিষয়টি বুঝতে অক্ষম হবে। তাঁর পবিত্র মুখ নিঃসৃত বাণীসমূহের প্রতিটি শব্দই ছিলো দুষ্প্রাপ্য মণি-মুক্তা সদৃশ। প্রত্যেকটি শব্দই ছিলো ব্যাপক অর্থবোধক অথচ সহজে বোধগম্য। ভাষণে তিনি কখনোই অনর্থক একটি শব্দও ব্যবহার করেননি। ভাষণ দানকালে তিনি এমন হৃদয়গ্রাহী শব্দসমূহ চয়ন করতেন যা শ্রোতাবৃন্দের হৃদয়স্পর্শ করতো। শ্রোতাবৃন্দের বুঝার সুবিধার্থে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বাক্যসমূহ তিনবার উচ্চারণ করতেন। নবুয়্যাতি জীবনে তিনি যতবার ভাষণ দিয়েছেন, তা হাদীসের কিতাব ও ইতিহাসের পাতায় স্বার্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাঁর ভাষণসমূহ থেকে কিছু বাক্য আমরা এখানে উদ্ধৃত করছি।
فَإِنَّ اصَدَقَ الْحَدِيْثِ كِتَابُ الله - 'কথার মধ্যে সর্বোত্তম সত্য কথা হচ্ছে কিতাবুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর কুরআন'।
وَ أَوْ شَقَ الْعُرِى كَلِمَةُ التَّقْوى 'সর্বোত্তম নির্ভরতার বিষয় হচ্ছে তাক্বওয়ার বিষয় অর্থাৎ আল্লাহভীতি'।
وَ خَيْرُ الْمَلَلِ مِلَّةُ إِبْرَاهِيمَ - 'সকল মিল্লাতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মিল্লাত হলো মিল্লাতে ইবরাহীম'।
وَ خَيْرُ السُّنَنِ سُنَّةِ مُحَمَّد صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- 'সকল পন্থার মধ্যে সর্বোত্তম পন্থা হলো মুহাম্মাদ (সা:) এর পন্থা'।
وَ أَشْرَفُ الْحَدِيْثِ ذكر الله - 'সকল কথার মধ্যে শ্রেষ্ঠ কথা হলো মহান আল্লাহর স্মরণমূলক কথা'।
وَ أَحْسَنُ الْقَصَصَ هَذَا الْقُرْآنِ 'সকল বর্ণনার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দর বর্ণনা হলো এই কুরআনুল কারীম'।
وَ خَيْرُ الْأَمُورِ عَوَازِمُهَا - 'সুচিন্তিত ও দৃঢ় সঙ্কল্পের কর্মই হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম কর্ম'।
وَ شَرِّ الْأَمْرِ مُحَدِّثًا تُهَا - 'বিদয়াত ও বানোয়াট কথাই হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ'।
وَ أَحْسَنُ الْهُدَى هُدَى الأَنْبِيَاء - 'আল্লাহর নবীগণ কর্তৃক প্রদর্শিত পথই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ অভ্রান্ত পথ'।
وَ أَشْرَفُ الْمَوْتِ قَتْلُ الشُّهَدَاءِ 'দ্বীনের পথে শহীদদের মৃত্যুই সর্বাধিক মর্যাদাকর মৃত্যু'।
وَ أَعْمَى الْعَمَى الضَّلَالَةُ بَعْدَ الْهُدَى 'সবথেকে বড় অন্ধত্ব হলো সেই পথভ্রষ্টতা যা সত্য সঠিক পথ দেখার পরও মানুষ গ্রহণ করে না'।
وَ خَيْرُ الْأَعْمَالِ مَا نُفِعَ 'সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ কর্ম সেটাই যার মাধ্যমে মানুষের নৈতিক উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পায় বা মানুষ উপকৃত হয়'।
وَ خَيْرُ الْهُدَى مَا تَبِعَ - 'সত্য সঠিক পথ সেটাই সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ মানুষ যে পথের অনুসরণ করতে পারে'।
وَ شَرِّ الْعَمِي عَمَى الْقَلْبِ 'সর্বাধিক নিকৃষ্টতম অন্ধত্ব হচ্ছে হৃদয়ের অন্ধত্ব'।
وَ الْيَدُ الْعُلَيَّا خَيْرٌ مِّنْ يَد السُّفْلَى - 'উপরের হাত (দাতার হাত) নীচের হাতের (গ্রহীতার হাত) তুলনায় উত্তম'।
و ماقل و كَفى خَيْرٌ مِّمَّا كَثُرُ وَالْهى - 'স্বল্পতম সম্পদ যা প্রয়োজন পূরণের জন্যে যথেষ্ট তা ঐ বিশাল সম্পদের তুলনায় উত্তম, যা মানুষকে (আল্লাহর দাসত্ব থেকে) অমনোযোগী করে দেয়'।
وَ شَرِّ الْمُعَذِّرَةِ حِيْنُ يَحْضَرُ الْمَوْتَ 'সর্বাধিক নিকৃষ্টতম তাওবা বা ওজর আপত্তি হচ্ছে তাই যা মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে করা হয়'।
وَ شَرِّ النَّدَامَةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ - 'কিয়ামতের ময়দানে যে লজ্জা অনুভূত হবে এবং যে অনুশোচনা জাগবে সেটাই হলো সর্বাধিক নিকৃষ্ট লজ্জা ও অনুশোচনা'।
وَ مِنَ النَّاسِ مَنْ لا يَأْتِي الْجُمُعَةَ الْأَدْبَرًا - 'কোনো কোনো মানুষ জুমুআর নামাজ আদায়ের লক্ষ্যে আসে কিন্তু তাদের হৃদয় মন (নামাজে স্থির থাকে না) পড়ে থাকে পেছনে'।
وَ مِنْ لَا يَذْكُرُ اللَّهَ إِلَّا هَجْرًا - 'কোনো কোনো মানুষ এমনও আছে যারা (নিজ স্রষ্টা) মহান আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে'।
وَ مِنْ أَعْظَمِ الْخَطَايَا اللِّسَانُ الْكَذِبِ 'পাপের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ পাপ হলো মিথ্যা বলা'।
خَيْرُ الْغَنِي غَنِيُّ النَّفْسِ 'আত্মার প্রাচুর্যতাই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাচুর্যতা'।
وَ خَيْرُ الزَّادِ التَّقْوَى 'মানুষের জন্যে সর্বোত্তম পাথেয় হচ্ছে তাক্বওয়া অর্থাৎ আল্লাহভীতি'।
وَ رَأْسُ الْحِكْمَةِ مُخَافَةُ اللَّهِ عَزَّ وَ جَلْ 'জ্ঞানীদের মাথার শ্রেষ্ঠ মুকুট হচ্ছে আল্লাহভীতি'।
وَ خَيْرُ مَا وَفَرِ فِي الْقُلُوبِ الْيَقِينِ 'মনের গভীরে প্রতিষ্ঠিত করার শ্রেষ্ঠ বিষয় হচ্ছে বিশ্বাস'।
وَ الإِرْتَيَابُ مِنَ الْكُفْرِ - 'সন্দেহ সংশয় হচ্ছে কুফুরীর শাখা'।
وَ النِّيَاحَةُ مِنْ عَمَلِ الْجَهِلِيَّةِ - 'মৃত ব্যক্তির জন্যে বিলাপ করা জাহেলী যুগের অনুকরণ'।
وَ الْخُلُوْلُ مِنْ حَرِّ جَهَنَّمِ 'খিয়ানত করা জাহান্নামের আগুন বিশেষ'।
السُّكَرُ كَيْرٌ مِّنَ النَّارِ - 'নেশা করা আগুনের দাগ (লাগানোর শামিল)'।
وَ الشعر من إبليس 'অশ্লীল অশালীন কাব্য চর্চা করা শয়তানের কর্ম'।
الْخَمْرُ جَمَاعَ الإِثْمِ 'মদ সকল গোনাহের উৎস'।
وَ شَرُّ الْمَأْكُلِ مَالُ الْيَتِيمِ 'জঘন্যতম খাদ্য হচ্ছে ইয়াতিমের সম্পদ ভক্ষণ করা'।
وَ السَّعِيدُ مَنْ وُعِظَ بِغَيْره - 'সৌভাগ্যবান হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে অন্যের কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ করে'।
وَ الشَّقِي مَنْ فِي بَطْنِ أُمِّه - 'প্রকৃত হতভাগ্য সে, যে তার মাতৃগর্ভেই দুর্ভাগা থাকে'।
وَ مَلَاكُ الْعَمَلِ خَوَاتِمُه - 'মানুষের কর্মের পুঁজি হচ্ছে তার উত্তম পরিণতি'।
وَ شَرُّ الرُّؤْيَا رُؤْيَا الْكَذَّب - 'নিকৃষ্ট স্বপ্ন হচ্ছে মিথ্যা স্বপ্ন'।
وَ كُلِّ مَا هَوَات قَرِيبٌ 'যে ঘটনা ঘটবে তা অতি নিকটবর্তী'।
وَ سَبَابُ الْمُؤْمِنِ فُسُوْقَ وَ قِتَالُهُ كُفْرٌ - 'মুমিনকে গালি দেয়া ফাসেকী আর তাকে হত্যা করা কুফুরী'।
وَ أَكُلُ لَحْمَةٌ مِنْ مُّعْصِيَةِ الله - 'মুমিনের গোস্ত খাওয়া (অর্থাৎ তার গীবত করা) নিকৃষ্ট গোনাহের মধ্যে অন্যতম'।
وَ حُرِّمَتْ مَالُهُ كَحُرْمَة دَمِّه - 'মুমিনের সম্পদ অন্যের জন্য ঠিক সেই রকম হারাম যেমন হারাম তার রক্ত'।
مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ 'যে দয়া করে না তাকেও দয়া করা হয় না'।
وَ مَنْ يَغْفِرُ يُغْفَرُ لَه - 'যে কাউকে ক্ষমা করে তাকেও ক্ষমা করা হয়'।
وَ مَنْ يَعْفُ يَعْفَ اللَّهُ عَنْهُ - 'যে অন্যকে ক্ষমা করে আল্লাহ তা'য়ালা তাকে ক্ষমা করেন'।
وَ يَكْظُمُ الْغَيْظَ يَأْجِرُهُ اللَّهُ - 'যে রাগ সংবরণ করে আল্লাহ তা'য়ালা তাকে পুরস্কৃত করেন'।
وَ مَنْ يَصْبِرُ عَلَى الرَّزِيَةُ يَعُوْضُهُ اللَّهُ - 'যে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবার পরও ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তা'য়ালা তাকে উত্তম বিনিময় দান করেন'।
وَ مَنْ يَتَّبِعُ السَّمَعَةِ يَسْمَعُ اللَّهِ - 'যে অন্যের দোষত্রুটি ছড়িয়ে বেড়ায় আল্লাহ তা'য়ালা তাকে অপমানিত করেন'।
وَ مَنْ يَصْبِرُ يُضْعَفُ اللَّهُ لَه - 'যে ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তা'য়ালা তাকে অনেকগুণ বেশি দান করেন'।
وَ مَنْ يَعْصِ اللَّهَ يُعَذِّبُهُ اللَّهُ - 'যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'য়ালার অবাধ্য হয় তিনি তাকে শাস্তি দেন'।
(সূত্র: যাদুল মায়া'দ, ২য় খণ্ড- আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম)