📄 অমুসলিমদের প্রতি নবী করীম (সা:) এর আচরণ
নবী করীম (সা:) কে আল্লাহ তা'য়ালা সমগ্র আরবের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী বানিয়েছিলেন। যার আঙ্গুলী হেলনে লক্ষ তরবারী মুহূর্তে কোষমুক্ত হতো। সে সময় তিনি অমুসলিম এবং শত্রুদের সাথে কি ধরণের আচরণ করেছেন, তা অমুসলিম লেখকদের চোখে পড়লেও তারা স্বভাবসুলভ কারণে চোখ বন্ধ করে তাঁর প্রতি কল্পিত অভিযোগ দাঁড় করিয়েছেন।
ইসলামের শত্রুদের যদি শ্রেণী বিন্যাস করা হয় তাহলে দেখা যাবে, কপট বা মুনাফিকদের থেকে ইসলামের বড় শত্রু আর দ্বিতীয়টি নেই। বর্তমানেও সমগ্র পৃথিবীতে ইসলাম ও মুসলমানদের এই করুণ অবস্থার মূলে রয়েছে মুনাফিক শ্রেণীর কূটিল ষড়যন্ত্র। বলা বাহুল্য বর্তমান পৃথিবীতে মুসলিম দেশসমূহের নেতৃত্ব রয়েছে ঐ শ্রেণীর লোকজনের হাতে, যারা ইসলাম ও মুসলমানদের যোগ্য প্রতিনিধি নয়, যাদের অন্তরে ইসলামের প্রতি মমত্ববোধ নেই।
মদীনায় আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ছিল মুনাফিকদের নেতা। বিশ্বনবী (সা:) মদীনায় হিজরত করে না এলে মদীনাবাসী তাকেই মদীনার প্রশাসক নিযুক্ত করতো। মূলত সে ছিল কাফিরের তুলনায় জঘন্য। কিন্তু তার বাইরের অবয়ব ছিল মুসলমানের মতো। ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান এবং মক্কার কুরাঈশদের সাথে তার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিলো। মদীনার মুসলমানদের সকল সংবাদ সে ইসলামের শত্রুদের হাতে উঠিয়ে দিয়ে মুসলমানদের ধ্বংসসাধন করার ব্যাপারে তৎপর ছিল। মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য এমন কোনো চেষ্টা নেই যা সে করেনি।
মদীনা থেকে মক্কার মুহাজির মুসলমানদের বের করে দেয়ার জন্য মদীনার আনসারদের সে উস্কানী দিয়েছে। হযরত আয়িশা (রা:) এর ওপরে সে অপবাদ দিয়েছে। নবী (সা:) এর সম্মুখে অপমানজনক কথা বলেছে। যুদ্ধের ময়দানে সে তার সাথীদের নিয়ে নবী (সা:) কে ত্যাগ করেছে। বিশ্বনবী (সা:) কে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে। হযরত উমার (রা:) এই লোকগুলোকে শায়েস্তা করার জন্য নবী (সা:) এর কাছে বারবার অনুমতি প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু দয়ার সাগর আল্লাহর রাসূল (সা:) তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। এমনকি সে মারা গেলে তিনি তাঁর নিজের শরীরের পবিত্র জামা দিয়েছেন কাফনের জন্য।
আবু বাসরাহ নামক একজন কাফির নবী (সা:) এর ঘরে মেহমান হলো। গোটা পরিবারের জন্য রাতের খাবার যা ছিল আবু বাসরাহ তা খেয়ে শেষ করে দিলো। নবী (সা:) স্বয়ং এবং তাঁর পবিত্রা স্ত্রীগণ রাত অনাহারে কাটিয়ে দিলেন। (মুসনাদে ইবনে হাম্বল)
বিশ্বনবীর সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা:) হিজরতকালে পবিত্র মক্কা থেকে মদীনায় আসার সময় তাঁর মা'কেও সাথে করে এনেছিলেন। তাঁর মায়ের নাম ছিল হযরত মাইমুনাহ অথবা উমাইমাহ (রা:)। কিন্তু তিনি তাঁর সন্তান আবু হুরায়রা (রা:) এর সাথে যখন মদীনায় এসেছিলেন তখন পযর্ন্ত তিনি ইসলাম কবুল করেননি। সন্তান আবু হুরায়রা (রা:) যখন অল্পবয়স্ক বালক সে সময় তিনি বিধবা হন। তারপর তিনি আর বিয়ে করেননি। সন্তানকে নিয়ে তিনি অত্যন্ত দুঃখ কষ্টের মধ্যে দিন পার করতেন। এ কারণে হযরত আবু হুরায়রা (রা:) মায়ের প্রতি খুবই অনুগত ছিলেন।
সন্তান ইসলাম কবুল করেছিল, এ জন্য তাঁর মা মনের দিক দিয়ে চরম অসন্তুষ্ট ছিলেন। মা ইসলাম গ্রহণ করছে না- শিরকের কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে, এ কারণে হযরত আবু হুরায়রা (রা:) প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণায় ছিলেন। প্রায়ই তিনি তাঁর মা'কে ইসলাম সম্পর্কে বুঝাতেন। তাঁর মা ইসলামের নাম শুনলেই ভীষণ রেগে উঠতেন। বিশেষ করে বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা:) এর পবিত্র নাম মুবারক তাঁর কানে যাওয়া মাত্র তিনি জ্বলে উঠতেন।
এভাবে একদিন হযরত আবু হুরায়রা (রা:) তাঁর মা'কে ইসলাম এবং বিশ্বনবী (সা:) সম্পর্কে বুঝাচ্ছিলেন। তাঁর মা কোনো কথাই শুনতে ইচ্ছুক ছিলেন না। এমনকি সেদিন তিনি বিশ্বনবী (সা:) সম্পর্কে কটুক্তি করে সন্তানকে প্রহার করলেন। মা মেরেছে- এ কারণে আবু হুরায়রা (রা:) এর মনে সামান্য প্রতিক্রিয়া ছিল না। কিন্তু বিশ্বনবী (সা:) সম্পর্কে কটুক্তি তিনি সহ্য করতে পারলেন না। মনে প্রচণ্ড আঘাত পেলেন। তাঁর দু'চোখ দিয়ে পানির ধারা নেমে এলো।
তিনি কাঁদতে কাঁদতে দরবারে রেসালাতের দিকে রওয়ানা দিলেন। আল্লাহর হাবিব দেখলেন তাঁর প্রিয় সাহাবী আবু হুরায়রা কাঁদতে কাঁদতে তাঁর কাছে আসছে। কাছাকাছি এলে তিনি জানতে চাইলেন, আবু হুরায়রা! তুমি কাঁদছো কেনো?
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) ঘটনা বর্ণনা করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা আমাকে মেরেছে।
আল্লাহর রাসূল (সা:) বললেন, মা মেরেছে আর তুমি আমার কাছে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করছো? তোমার মা মেরেছে তা আমি কি করতে পারি?
আবু হুরায়রা (রা:) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! মা মেরেছে আমি সে কারণে কোনো অভিযোগ করছি না। আমার মনে বড়ই যন্ত্রণা, আমার মা এখনও ইসলাম কবুল করলেন না! আপনি দোয়া করুন, আমার মা যেন ইসলাম কবুল করেন।
আল্লাহর নবী (সা:) তৎক্ষণাত দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আপনি আবু হুরায়রার মা'কে হেদায়েত করুন।
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) নিজের বাড়ির দিকে দ্রুত ছুটলেন। পথে লোকজন তাকে ধরলো, আপনি এমন করে ছুটে যাচ্ছেন কেনো?
তিনি জবাব দিলেন, আমাকে যেতে দাও, আমি দেখতে চাই! আমি বাড়িতে পৌঁছানোর আগে আমার নবীর দোয়া পৌঁছলো কি না!
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বাড়িতে গিয়ে দেখলেন, বাড়ির দরোজা বন্ধ। তিনি অনুভব করলেন তাঁর মা গোছল করছেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর মা বের হয়ে এসে সন্তানকে বললেন, হে আমার সন্তান! তুমি সাক্ষী থেকো, আমি আল্লাহ এবং তার রাসূলের ওপর ঈমান আনলাম।
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন, এবার তাঁর চোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু নির্গত হলো। তিনি আবার ছুটে গেলেন দরবারে নববীতে। আনন্দে বিগলিত হয়ে জানালেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনার দোয়া কবুল করেছেন, আমার মা ঈমান এনেছেন।
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) এর সাথে তাঁর মায়ের এক অপূর্ব সম্পর্ক ছিল। একদিন তিনি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত ছিলেন। পেটে ক্ষুধার যন্ত্রণা নিয়ে তিনি নবীর দরবারে এলেন। এ সময় সেখানে আরো কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। আল্লাহর নবী (সা:) তাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি এখানে কিভাবে এলে?
তিনি জবাব দিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! প্রচণ্ড ক্ষুধা আমাকে এখানে টেনে এনেছে।
নবী করীম (সা:) খেজুরের কাঁদি আনালেন এবং উপস্থিত সবার হাতে দু'টো করে দিয়ে বললেন, এই খেজুর দু'টো খাও এবং তারপর পানি পান করো। এই দু'টো খেজুরই আজকের জন্য তোমাদের যথেষ্ট হবে।
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) একটি খেজুর খেলেন এবং অন্যটি রেখে দিলেন। বিষয়টি নবী করীম (সা:) দেখেছিলেন। তিনি জানতে চাইলেন, আবু হুরায়রা! খেজুর রেখে দিলে কেনো?
তিনি লাজনম্র কন্ঠে জবাব দিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মায়ের জন্য রেখেছি। আল্লাহর নবী (সা:) বললেন, তুমি খেয়ে নাও, আমি তোমার মায়ের জন্য আরো দু'টো খেজুর দিচ্ছি।
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) খেজুর খেলেন। নবী (সা:) তাঁকে আরো দু'টো খেজুর দিলেন তাঁর মায়ের জন্যে। হযরত আবু বকর (রা:)-এর মেয়ে হযরত আসমা (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা:) এর যুগে আমার অমুসলিম মা আমার কাছে আসলেন। আমি তখন নবী (সা:) এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, 'আমি কি আমার মায়ের সাথে রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয়তার ব্যবহার করবো? আল্লাহর নবী (সা:) বললেন, 'অবশ্যই করবে'।
ইবনে উয়াইনা (রা:) বলেন, আল্লাহ তা'য়ালা তারই ব্যাপারে এই আয়াত নাজিল করেন, 'আল্লাহ তা'য়ালা তোমাদেরকে এমন লোকদের সাথে রক্ত সম্পর্ক অনুযায়ী ব্যবহার করতে নিষেধ করছেন না, যারা তোমাদের সাথে দ্বীনের ব্যাপারে যুদ্ধ করে না। (বুখারী)
এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন-
لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّيْنِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِّنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوْهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ ط إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ إِنَّمَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قَاتَلُوكُمْ فِي الدِّيْنِ وَأَخْرَجُوكُم مِّنْ دِيَارِكُمْ وَظَاهَرُوا عَلَى إِخْرَاجِكُمْ أَنْ تَوَلَّوْهُمْ ج وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং কখনো তোমাদের নিজেদের বাড়িঘর থেকেও বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি দয়া দেখাতে ও তাদের সাথে ন্যায় আচরণ করতে আল্লাহ তা'য়ালা কখনো নিষেধ করেন না; অবশ্যই আল্লাহ তা'য়ালা ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন। আল্লাহ তা'য়ালা কেবল তাদের সাথেই বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেছে এবং (একই কারণে) তোমাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে দিয়েছে এবং তোমাদের উচ্ছেদ করার ব্যাপারে একে অন্যকে সাহায্য সহযোগিতা করেছে, (এরপরও) যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে তারা অবশ্যই জালিম। (সূরা মুমতাহিনা-৮-৯)
মুসলমানদের যারা ধ্বংস করে দিতে চায় এবং এই কুকর্মে যারা সাহায্য সহযোগিতা করে তাদের সাথে কোনো ধরনের সম্পর্ক রাখা যাবে না। যারা সম্পর্ক রাখবে তারাই আল্লাহ তা'য়ালার দৃষ্টিতে জালিম হিসাবে পরিচিতি লাভ করবে। মহান আল্লাহর এই কথা শুধু নিজের দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়- সমগ্র বিশ্বের যে কোনো দেশের মুসলমানদের সাথে যদি কোনো অমুসলিম রাষ্ট্র অন্যায় ব্যবহার করে, তাদের সাথে শত্রুতা করে, তাদের রক্ত ঝরায় তাহলে সে সকল রাষ্ট্র ও অমুসলিম নেতৃবৃন্দের সাথে যদি কোনো মুসলিম নামধারী নেতা সম্পর্ক রাখে, আল কুরআনের দৃষ্টিতে সে অবশ্যই জালিম।
কিন্তু অমুসলিমের সাথে অকারণে কোনো ধরনের খারাপ আচরণ করা যাবে না। তাদের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা ইসলাম স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করেছে। শুধু হারামই ঘোষণা করেনি, আল্লাহর নবী (সা:) বলেছেন, যে মুসলমান কোনো অমুসলিমকে কষ্ট দেয় বা যন্ত্রণা দেয় সে যেন আমাকে যন্ত্রণা দিল। আর যে লোক আমাকে জ্বালা-যন্ত্রণা দিল, সে যেন মহান আল্লাহকে যন্ত্রণা কষ্ট দিল। (তাবারাণী)
বিশ্বভ্রাতৃত্বের বাণী বাহক আল্লাহর নবী করীম (সা:) স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, 'যদি কোনো মুসলমান কোনো অমুসলিমকে কষ্ট দেয় তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে আমি আল্লাহ তা'য়ালার আদালতে মামলা দায়ের করবো। আর আমি যার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবো কিয়ামতের দিন আমি আল্লাহ তা'য়ালার আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলায় লড়াই করবো। (আল খতীব)
আল্লাহর নবী (সা:) বসেছিলেন। লোকজন একটি লাশ নিয়ে যাচ্ছে দেখে তিনি দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন। সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে জানালেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! ওটা তো ইয়াহূদীর লাশ, আপনি সে লাশের সম্মানে দাঁড়ালেন?'
মানবতার নবী (সা:) বললেন, 'কেনো, ইয়াহুদী কি মানুষ নয়!'
হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা:) বর্ণনা করেন, একদিন আমাদের পাশ দিয়ে একটি জানাযা যাচ্ছিলো। তা দেখে নবী করীম (সা:) উঠে দাঁড়ালেন, তখন আমরাও দাঁড়িয়ে গেলাম। পরে আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! এটা তো একজন ইয়াহূদীর লাশ। তিনি বললেন, তোমরা যখনই কোনো জানাযা দেখবে তখনই দাঁড়িয়ে যাবে। (বুখারী হাদীস নং ১২২৬)
হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আবু লাইলা (রা:) বর্ণনা করেন, সহল ইবনে হুনাইফ এবং কায়েস ইবনে সা'য়াদ কাদেসিয়াহ নামক এক স্থানে বসেছিলেন। এমন সময় তাঁদের পাশ দিয়ে একটি জানাযা যাচ্ছিলো, তা দেখে উভয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। কেউ তাঁদেরকে বললো, এ হচ্ছে যিম্মির (অমুসলিমের) জানাযা। তাঁরা বললেন, একদিন নবী, করীম (সা:) এর পাশ দিয়ে একটি জানাযা যাচ্ছিলো। তা দেখে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ তাঁকে বলেছিলো যে, এ তো ইয়াহূদীর জানাযা। তার উত্তরে তিনি বলেছিলেন, তবে সেটা কি মানবদেহ নয়? (বুখারী হাদীস নং ১২২৭)
একমাত্র ইসলামই অসাম্প্রদায়িক আদর্শ, যে আদর্শে মানুষকে মানুষ হিসেবেই সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া পৃথিবীতে এমন কোনো আদর্শ নেই, তথাকথিত ধর্ম নেই যেখানে সাম্প্রদায়িকতা নেই। ইসলাম ব্যতীত সাম্প্রদায়িকতামুক্ত কোনো আদর্শ পৃথিবীতে নেই।
তিরমিজী শরীফের একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, একজন কাফির নবী করীম (সা:) এর মেহমান হলো। তিনি লোকটির সামনে ছাগলের দুধ পেশ করলেন। লোকটি দুধ পান করলো। এভাবে সে সাতটি ছাগলের দুধ পান করলো। বিশ্বনবী (সা:) সামান্যতম বিরক্তি প্রকাশ করলেন না। পরের দিন সকালে সে ইসলাম কবুল করলো। মুসলিম অবস্থায় সে একটি ছাগলের দুধের অধিক দুধ পান করতে পারলো না। বিশ্বনবী (সা:) যখন অসীম ক্ষমতাধর, তখনও তাঁকে অমুসলিমরা গালাগালি দিয়েছে, তাঁর বাড়িতে এসে তাঁকে নানাভাবে কষ্ট দিয়েছে, তিনি তাদের কল্যাণের জন্য দোয়া করেছেন কিন্তু কখনো সামান্য বিরক্তি প্রকাশ করেননি।
ইসলাম তখন সমগ্র আরব শাসন করছে। মসজিদে নববী থেকে বিশ্বনবী (সা:) রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। সেই মাসজিদে নববীর সম্মানিত মুয়াজ্জিন হযরত বিলাল (রা:)। যিনি বিশ্বনবী (সা:) এর পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতেন। তদানীন্তন বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন একটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পারিবারিক ব্যয় নির্বাহের জন্য তাঁকে অমুসলিমদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হতো। নবী পরিবারের খরচ চালানোর জন্য তিনি এক পৌত্তলিকের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করেছিলেন।
ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত সময় তখন পর্যন্ত আসেনি। হযরত বিলাল (রা:) সবেমাত্র আজান দেয়ার জন্য দাঁড়িয়েছেন। এমন সময় সেই পৌত্তলিক এসে বিদ্রুপ করে হযরত বিলাল (রা:) কে বললো, হে কালো মায়ের সন্তান!
ইচ্ছা করলে তৎক্ষণাত সে পৌত্তলিকের দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দেয়া যেত। কিন্তু বিশ্বনবী (সা:) এর আদর্শের অনুসারী হযরত বিলাল বিনয়ের সাথে জবাব দিলেন, আমি উপস্থিত, আমাকে কিছু বলবে?
নির্লজ্জ লোকটি উদ্যতভাবে বললো, আমার পাওনা পরিশোধ করার আর মাত্র কয়েকটি দিন বাকী আছে। যথা সময়ে আমার পাওনা যদি পরিশোধ না করো, তাহলে তোমাকে দিয়ে আমি ছাগল চরিয়ে নেব।
হযরত বিলাল (রা:) এর মন বড় খারাপ হয়ে গেল। তিনি ইশার নামাজ আদায় করে নবী করীম (সা:) কে ঘটনা জানালেন। ঋণ পরিশোধ করার পূর্বদিন রাতে তিনি নবী (সা:) কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আগামী কাল তার ঋণ পরিশোধের দিন। এদিকে ঘরে কিছুই নেই। সেই লোকটি এসে আমাকে অপমান করবে। আপনি আমাকে অনুমতি দিন, আমি কোথাও চলে যাই। তারপর ঋণ পরিশোধ করার মতো ব্যবস্থা হলে আমি ফিরে আসবো।
নবী করীম (সা:) কোনো মন্তব্য করলেন না। হযরত বিলাল (রা:) তাঁর সামান্য জিনিসপত্র বেঁধে মাথার কাছে নিয়ে রাতে ঘুমিয়ে পড়লেন। ফজরের নামাজ আদায় করে তিনি বের হয়ে যাবার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। এমন সময় রাসূল (সা:) এক লোকের মারফত বিলাল (রা:) এর কাছে সংবাদ প্রেরণ করলেন। তিনি রাসূলের ঘরের সামনে গিয়ে দেখলেন, খাদ্য-শস্য বোঝাই চারটি উট দাঁড়িয়ে রয়েছে। নবী করীম (সা:) তাঁকে বললেন, বিলাল, আল্লাহ তা'য়ালার শোকর আদায় করো। ফদকের সর্দার এগুলো প্রেরণ করেছে। এগুলো বিক্রি করে ঋণ আদায় করো।
হযরত বিলাল (রা:) সেগুলো বিক্রি করে সকল ঋণ পরিশোধ করে নবী করীম (সা:) এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সকল ঋণ আদায় করা হয়েছে। (আবু দাউদ)
একবার একজন ইয়াহুদী মদীনার বাজারে প্রকাশ্যে ঘোষনা করলো, ঐ মহান আল্লাহর শপথ! যিনি সকল নবীদের মধ্যে আমাদের নবী হযরত মুসা (আ:) কে অধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন।
একজন সাহাবী এ কথা শুনে বললো, নবী করীম (সা:) এর চেয়েও কি অধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন?
ইয়াহুদী বললো, অবশ্যই বেশি মর্যাদা প্রদান করেছেন。
এ কথা শুনে সাহাবী রাগে অধির হয়ে ইয়াহুদীর গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিল। ইয়াহুদী বেচারীর চোখ থেকে পানি বের হয়ে এলো। সে জানতো নবী মুহাম্মাদ (সা:) এর কাছে এই নালিশ জানালে তিনি ন্যায় বিচার করবেন। ইয়াহুদী এসে নবী করীম (সা:) এর কাছে ঘটনা জানালো। বিশ্বনবী (সা:) উক্ত সাহাবীকে শাসন করেছিলেন। (বুখারী)
একজন ইয়াহূদীর সন্তান অসুস্থ হয়েছে, তদানীন্তন পরাশক্তি বিশাল ইসলামী রাষ্ট্রের অধিপতি এ সংবাদ পেয়ে সেই ইয়াহূদীর সন্তানকে দেখতে গেলেন। স্বয়ং রাষ্ট্রপতি তার অসুস্থ সন্তানকে দেখতে এসেছেন! ইয়াহুদী অবাক হয়ে গেল। নবী করীম (সা:) সেই অসুস্থ সন্তানকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানালেন। সন্তান তার পিতার মুখের দিকে তাকালো। পিতা সন্তানকে ইশারা দিলেন, নবী যেদিকে তোমাকে ডাকছে তুমি সেদিকে যাও। ইয়াহুদীর অসুস্থ সন্তান ইসলাম গ্রহণ করলো। (বুখারী)
ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানগণ নবীর দরবারে এসেছে, তিনি তাদেরকে মসজিদে নববীতে স্থান দিয়েছেন। তারা নিজের প্রথা অনুযায়ী সেই মাসজিদের ভেতরেই তাদের ধর্ম পালন করেছে। সাহাবায়ে কেরাম বাধা দিতে চেয়েছেন। কিন্তু নবী করীম (সা:) তাদেরকে বলেছেন, বাধা দিও না। (মুসলিম)
বিশ্বনবী (সা:) খিষ্টান ও ইয়াহুদীদেরকে কোন্ দৃষ্টিতে দেখতেন ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করুন। মদীনার সিনাই পাহাড়ের কাছে (Saint Catharin) সেন্ট ক্যাথারিন নামক মঠের ধর্ম যাজকদেরকে লিখিত সনদ দান করেছিলেন। এই সনদে তাদেরকে নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা দান করে আদেশ জারি করেছিলেন, কোনো মুসলমান খৃষ্টানদের সাথে এই সনদের বিপরীত কোনো কাজ করলে তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে।
বিশ্বনবী (সা:) ঘোষণা করেছিলেন, তারা সাহায্য প্রার্থী হলে অবশ্যই সাহায্য করতে হবে। তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর গ্রহণ করা যাবে না। তাদের ওপরে শক্তি প্রয়োগ বা কোনো ধরনের লোভ লালসা দেখিয়ে ধর্ম ত্যাগ করানো যাবে না। তাদের কোনো ধর্ম নেতাকে তার পদ থেকে অপসারণ করা যাবে না। কোনো তীর্থযাত্রীকে বাধা প্রদান করা যাবে না। কোনো ধর্মনেতাকে তার মঠ থেকে বিতাড়ন করা যাবে না। কোনো গির্জা ধ্বংস করে সেখানে কোনো মুসলমান কিছু করতে পারবে না। তাদের ধর্ম তারা স্বাধীনভাবে পালন করবে।
নবী করীম (সা:) এর এই সনদ সম্পর্কে ঐতিহাসিক আমীর আলী বলেন, It is a monument of enlightened tolerance. অর্থাৎ এই সনদ অসাধারণ পরধর্মসহিষ্ণুতার কীর্তি স্তম্ভস্বরূপ।
অমুসলিম লেখকগণ বিশ্বনবী (সা:) এর প্রতি যে অভিয়োগ করেছে, মুহাম্মাদ (সা:) তাঁর প্রতিপক্ষের সাথে সদ্ব্যবহার করেছেন সত্য কথা। কিন্তু তিনি ঐ পর্যন্ত সদ্ব্যবহার করেছেন, যখন তিনি ছিলেন দুর্বল অসহায়, একেবারে ক্ষমতাহীন। যখনই তিনি ক্ষমতা হাতে পেলেন, তখন তাঁর আসল রূপ প্রকাশ পেল, শত্রুদের ওপরে তিনি নির্মমভাবে আঘাত করলেন। (নাউযুবিল্লাহ) এ সকল কথা সত্যের চরম অপলাপ বৈ আর কিছু নয়। হিংসা বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে তারা এ ধরনের বহু কষ্ট কল্পনা করেছেন।
📄 নবী করীম (সা:) নিজের কাজ নিজেই করতেন
নবী করীম (সা:) তাঁর নিজের কাজ নিজেই করতেন। সেবকদের ওপর কোনো কাজ তিনি চাপিয়ে দিতেন না। নিজের কাজ নিজেই সমাধা করার বিষয়টি ছিল তাঁর কাছে খুবই প্রিয়। বাড়িতে যতক্ষণ থাকতেন, কখনো অলস বসে থাকেননি। নিজের হাতে নিজের জামা সেলাই করতেন। জামায় বোতাম লাগাতেন। বাজার থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনতেন। পানি উঠানো বালতিতে রশি লাগাতেন। তিনি নিজে উট বাঁধতেন।
অথচ তাঁর বাড়িতে গোলামের অভাব ছিল না। সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর রাসূলের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কাজ করে দেয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করতেন। কিন্তু তাঁর কাজ অন্য কেউ করবে, এটা তিনি পছন্দ করতেন না। নিজের জুতা নিজেই সেলাই করতেন। নিজের পশুর যত্ন নিতেন। পশুকে খেতে দিতেন। রুটি বানানোর জন্য আটা মাখিয়ে দিতেন। নবী (সা:) তাঁর উটের শরীরে নিজেই তেল মাখিয়ে দিতেন।
একদিন মসজিদে নববীতে গিয়ে দেখলেন, কোনো এক ব্যক্তি নাক থেকে সর্দ্দিদ ফেলে রেখেছে। তিনি এ কথা কাউকে জিজ্ঞাসা করলেন না, এ কাজ কে করেছে। কাউকে আদেশ দিলেন না, এটা পরিষ্কার করো। তিনি নিজেই পরিষ্কার করে বললেন, মসজিদে এসব নিক্ষেপ করা যাবে না।
মাসজিদে নববী নির্মাণের সময় তিনি নিজে পাথর বহন করেছেন। মাটি খনন করেছেন। কোনো এক সফরের সময় রান্নার আয়োজন করা হলো। সবাই কাজে লেগে গেল। নবী করীম (সা:) কে কেউ কোনো দায়িত্ব দিল না। তিনি নিজেই দায়িত্ব উঠিয়ে নিলেন। বললেন, আমি জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে আনবো।
সাহাবায়ে কেরাম বাধা দিলে তিনি বললেন, আমি এ ধরনের শ্রেণী বৈষম্য পছন্দ করি না। একদিন ভ্রমণকালে তাঁর জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেল। তিনি নিজের হাতেই তা মেরামত করতে থাকলেন। একজন সাহাবা আবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে দিন, আমি মেরামত করে দিচ্ছি।
আল্লাহর নবী জবাব দিলেন, এটাও এক ধরনের শ্রেণী বৈষম্য যা আমি পছন্দ করি না।
তিনি শুধু নিজের কাজ যে নিজেই করতেন তা নয়, অন্যের কাজ পর্যন্ত করে দিতেন। মদীনার দাস-দাসীগণ নবীর কাছে এসে আপনজনের মত আবেদন করতো, হে আল্লাহর রাসূল! আমার অমুক কাজ পড়ে রয়েছে।
তিনি তাঁর সাথে গিয়ে তাঁর সে কাজ শেষ করে দিয়ে তবেই আসতেন। মদীনায় একজন পাগলী দাসী ছিল। সে একদিন নবী করীম (সা:) এর হাত ধরলো। তিনি তাঁকে বললেন, হে নারী! তুমি আমাকে যে রাস্তায় নিয়ে যেতে চাও আমি সেখানে গিয়েই তোমার কাজ করে দেব।
নবী করীম (সা:) তাঁর সাথে এক রাস্তায় গেলেন এবং তাঁর কাজ শেষ করে তবে ফিরলেন। একদিন তিনি নামাজের প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। এমন সময় একজন বেদুঈন এসে তাঁর কাপড় ধরে টেনে বললো, আমার কিছু কাজ রয়েছে, এমন যেন না হয় যে আমি তা ভুলে যাই। আপনি প্রথমে আমার কাজ করে দিন।
নবী করীম (সা:) মাসজিদ থেকে বের হয়ে তাঁর সাথে গিয়ে কাজ শেষ করে এসে নামাজ আদায় করলেন। হযরত জুন্নাব (রা:) যুদ্ধে গমন করলেন। তিনি ব্যতীত তাঁর বাড়িতে অন্য কোনো সক্ষম পুরুষ ছিল না। নবী (সা:) প্রতিদিন তাঁর বাড়িতে যেতেন এবং উটের দুধ দুইয়ে দিয়ে আসতেন। আবিসিনিয়া থেকে মেহমান এলে সাহাবায়ে কেরাম আবেদন করলেন, তাঁরা এই মেহমানদের সেবা-যত্ন করবেন। তিনি বললেন, তাঁরা আমার বন্ধুদের খেদমত করেছে। এ কারণে আমি তাদের খেদমত করবো।
তায়েফ অবরোধের সময় তায়েফের সাকিফ গোত্রের লোকজন নবী করীম (সা:) এর পবিত্র কদম মুবারক আহত করেছিল। তাঁরা যখন তাঁর কাছে এলো তখন তিনি তাদেরকে মাসজিদে নববীতে অবস্থান করতে দিলেন এবং নিজে তাদের মেহমানদারী করলেন। (বুখারী, মুসনাদে আহমাদ, নাসায়ী, যুরকানী, মুসনাদে ইবনে হাম্বল, ইবনে সায়াদ, আবু দাউদ, দারেমী)
📄 সেবকদের প্রতি নবী করীম (সা:) এর আচরণ
সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর নবীর জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করতেন। নবীর সামান্য কোনো কাজ, কে কার আগে করবে তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলতো। তবুও তিনজন ব্যক্তি এমন ছিলেন যে, তাঁরা রাসূল (সা:) এর একান্ত ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত ছিলেন। এই তিনজনের মধ্যে হযরত বিলাল (রা:) নবী পরিবারের দায়িত্ব পালন করতেন।
আরো যে দু'জন নবীর একান্ত কাজ করতেন, তাঁরা হলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) ও হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা:)। স্বয়ং নবী (সা:) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) সম্পর্কে বলেছেন, কেউ যদি কুরআন যেমনভাবে অবতীর্ণ হয়েছে তেমনভাবে পাঠ করতে চায় তাহলে সে যেন তাঁকে অনুসরণ করে।
মক্কার জীবনে কিশোর বয়সে তিনি সারা দিন পাহাড়ে ছাগল চরাতেন। নবী করীম (সা:) হযরত আবু বকর (রা:) কে সাথে নিয়ে মদীনায় হিজরত করার সময় সেই কিশোরের কাছে গিয়ে বললেন, এই ছাগল থেকে আমাদের কিছু দুধ দুইয়ে দাও, আমরা পিপার্সিত। দুধ পান করে পিপাসা নিবারণ করি।
বালক জবাব দিল, এ কাজ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, আমি ছাগলগুলোর মালিক নই। আমি এদের রাখাল। অপরের সম্পদ আমি কি করে দিতে পারি?
বালক আল্লাহর নবীকে চিনতো না। নবী (সা:) বালকের সততা দেখে মুগ্ধ হলেন। তিনি বললেন, ঠিক আছে, তুমি এমন একটি ছাগল দেখিয়ে দাও, যে ছাগল এখন পর্যন্ত কোনো বাচ্চা দেয়নি বা পাঁঠার সংস্পর্শে আসেনি।
বালক একটি ছোট্ট ছাগল দেখিয়ে দিল। নবী করীম (সা:) সে ছাগলের ওলানে আল্লাহর নাম নিয়ে পবিত্র হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন। ওলান দুধে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। দুধ দুইয়ে তিনি এবং আবু বকর (রা:) পান করলেন এবং বালককেও পান করতে দিলেন। বালক এমন অবাক কান্ড জীবনে কখনো দেখেনি। অবাক হয়ে সে এই দৃশ্য দেখলো। তারপর কিছু দিনের মধ্যেই সে নবীর পরিচয় লাভ করে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তিনি নিজেকে নবী (সা:) এর খাদেম হিসাবে উৎসর্গ করেছিলেন। যে বালক ছিল ছাগলের রাখাল, সে হয়ে গেল সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি বিশ্বনবী (সা:) এর একান্ত খাদেম।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) সেই কিশোর বয়স থেকেই নবী করীম (সা:) এর কাছে অবস্থান করতেন। আল্লাহর রাসূলের ঘরে প্রবেশ করার জন্য তাঁর অনুমতির প্রয়োজন ছিল না। নবী পরিবারের অনেক বিষয় তিনি অবগত ছিলেন। এ কারণে তাঁকে 'সাহিবুস্সির' বা নবীর গোপন বিষয়ের অধিকারী বলা হতো। নবী করীম (সা:) কোনো স্থানে গমন করলে তিনি রাসূলের ঘুমানোর, অজুর ব্যবস্থা করতেন এবং রাসূলের মিসওয়াক রাখতেন।
রাসূল (সা:) পথ চলতে থাকলে তিনি লাঠি হাতে আগে আগে যেতেন। নবীর পায়ে জুতা পরিয়ে দিতেন এবং রাসূল (সা:) জুতা খুলে রাখলে তা উঠিয়ে নিজের বোগলে রাখতেন। রাসূল (সা:) উঠে দাঁড়ালেই আবার সে জুতা পরিয়ে দিতেন। তিনি নবীর ঘরেই প্রতিপালিত হয়েছিলেন বলে তাঁর সমগ্র চরিত্র রাসূলের অনুকরণে গড়ে উঠেছিল। স্বয়ং নবী করীম (সা:) ছিলেন তাঁর মহান শিক্ষক। তাঁর মতো জ্ঞানী এবং কুরআন বুঝার অধিকারী সাহাবী খুব কমই ছিলেন।
হযরত আনাস (রা:) যখন আল্লাহর নবীর কাছে এলেন তখন তিনি ছিলেন একেবারে শিশু। তাঁর মা তাঁকে নবীর খেদমতে উৎসর্গ করে গেলেন। সেই শিশু বয়স থেকে তিনি দীর্ঘ দশ বছর নবীর কাছে কাটিয়ে দিলেন। আল্লাহর নবীর বহু কাজ তিনি করতেন। বিভিন্ন লোকজনকে ডেকে আনা বা সংবাদ দেয়া, অজুর পানি ভরে রাখা ইত্যাদি কাজ তিনি করতেন। তিনিও নবী পরিবারের একজন হয়েছিলেন।
শিশু বয়সে কতভাবে তিনি নবী করীম (সা:) কে বিরক্ত করতেন। কিন্তু আল্লাহর হাবিব কখনো তাঁর সাথে উচ্চকণ্ঠে কথা বলেননি বা তাঁকে এ প্রশ্ন করেননি, কেনো তুমি এই কাজ করলে? নবীর চেহারা মুবারকে তাঁরা হাসি ব্যতীত আর কিছুই দেখেননি। কখনো কৌতুক করে তিনি হযরত আনাস (রা:) কে 'হে দুই কানওয়ালা' বলে ডাকতেন। কারণ হযরত আনাস (রা:) আল্লাহর রাসূলের এতই ভক্ত ছিলেন যে, তাঁর কান সব সময় সজাগ থাকতো, কখন কোন্ কাজের জন্য আল্লাহর রাসূল তাঁকে আহ্বান করেন।
একদিন কিশোর বালক হযরত আনাস (রা:) কে বিশ্বনবী (সা:) কোথাও যাবার জন্য বললেন। তিনি কিশোরসুলভ চপলতার প্রকাশ ঘটিয়ে বলেছিলেন, আমি যেতে পারবো না।
নবী করীম (সা:) তাঁকে কিছু না বলে নীরব রইলেন। হযরত আনাস (রা:) ঘরের বাইরে চলে যেতে উদ্যত হলেন। আল্লাহর নবী (সা:) পেছন থেকে তাঁর ঘাড়ে হাত দিলেন। তিনি রাসূলের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সে মুখে রাগের প্রকাশ নেই। পূর্ণিমার চাঁদের হাসি পবিত্র মুখে তরঙ্গ তুলেছে। আল্লাহর রাসূল (সা:) বললেন, আমি যে কাজের কথা বলেছিলাম, এখন সে কাজে যাবে তো!
হযরত আনাস বলেছেন, আমি দীর্ঘ সাত বছরযাবৎ আল্লাহর রাসূলের খেদমতে অবস্থান করেছি। তিনি কখনো সামান্য বিরক্তি প্রকাশ করে বলেননি, কেনো তুমি এই কাজ করলে? (মুসলিম, আবু দাউদ)
📄 নবী করীম (সা:) কে দেয়া হয়েছিলো ঝিনুকের মাঝে মহাসমুদ্র
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমগ্র মানবগোষ্ঠীর জন্যে যাঁকে মুক্তির দূত হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন, তাঁকে অকল্পনীয় দৃষ্টিনন্দন শ্রুতিমধুর অলঙ্কারে সুসজ্জিত করেই সমগ্র সৃষ্টির সম্মুখে প্রেরণ করেছিলেন। ভাষাগত ক্ষেত্রে তাঁকে এমন অতুলনীয় অলঙ্কারে ভূষিত করা হয়েছিলো যে, তিনি ব্যাপক অর্থবোধক ও বিশ্লেষণ সাপেক্ষ বিষয়াদি অতি অল্প কথায় সহজে বোধগম্য ভাষায় ব্যক্ত করতেন। এই অতুলনীয় যোগ্যতা ইতোপূর্বে কাউকে দেয়া হয়নি এবং কিয়ামত পর্যন্ত কাউকে দেয়াও হবে না। পৃথিবীতে ভাষা ও বৈয়াকরণগণ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সাপেক্ষ বহু বিষয়াদি স্বল্প কথায় প্রকাশযোগ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যাক্য তৈরী করেছেন। কিন্তু নবী করীম (সা:) স্বল্প ভাষায় ক্ষুদ্র বাক্যে ব্যাপক অর্থবোধক যে সকল বাক্য মানব জাতিকে উপহার দিয়েছেন, তা অতুলনীয় এবং অলঙ্কার মণ্ডিত। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদের পক্ষে কিয়ামত পর্যন্ত চেষ্টা-সাধনা করেও এমন একটি বাক্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ নবী করীম (সা:) এর মর্যাদার সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণ যোগ্যতা দান করেছিলেন আরবী ভাষায় যাকে বলা হয়, 'জাওয়া মিউল কালিম'। এ সম্পর্কে স্বয়ং রাসূল (সা:) বলেছেন, (আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে) আমাকে 'জাওয়া মিউল কালিম' দান করা হয়েছে। (মুসলিম)
ক্ষুদ্রতম শব্দে, স্বল্প বাক্যে ব্যাপক অর্থবোধক অথচ সহজে বোধগম্য বাক্যকে 'জাওয়া মিউল কালিম' বলা হয়। হাদীসের কিতাবসমূহে অনুসন্ধান করলে এমন অসংখ্য অগণিত ক্ষুদ্রতম বাক্য পাওয়া যাবে যার অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক কিন্তু সহজে বোধগম্য। অর্থাৎ ভাষাগত ক্ষেত্রে ভাব প্রকাশের লক্ষ্যে কুল-কিনারাহীন অগাধ জলধী সমুদ্র মহাসমুদ্রকে ক্ষুদ্রতম একটি ঝিনুকের মধ্যে প্রবিষ্ট করিয়ে নবী করীম (সা:) কে দান করা হয়েছিলো। আমরা হাদীসের কিতাবসমূহ থেকে রাসূল (সা:) এর মর্যাদাপূর্ণ বাক্য এখানে তুলে ধরছি। নবী করীম (সা:) বলেছেন-
اتَّقِ اللَّهَ حَيْثُ مَا كُنْتَ - 'যে অবস্থায়ই থাকো আল্লাহ তা'য়ালাকে ভয় করো'।
নবী করীম (সা:) সমগ্র মানব মণ্ডলীকে লক্ষ্য করে বলছেন, যেখানে যে অবস্থায়ই অবস্থান করো না কেনো, সর্বাবস্থায় ঐ সত্তাকে ভয় করো যিনি তোমার অবস্থা দেখছেন এবং তোমার ভেতর বাইরের সকল বিষয়ে অবগত রয়েছেন। এমনকি তোমার মনের গহীনে যে কল্পনার উদ্রেক হচ্ছে আবার তা পানির বুদ্বুদের মতোই মিলিয়ে যাচ্ছে, সে সম্পর্কেও তিনি পূর্ণমাত্রায় অবগত আছেন। পরিবার পরিজন পরিবেষ্টিত থাকো, একাকী থাকো, বিপুল জনসমাবেশে থাকো, নির্জন পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ের কোনো নিভৃত গুহায় অবস্থান করো, মহাশূন্যের কোনো গ্রহে থাকো অথবা মহাসাগরের অতল তলদেশের কোনো পর্বতের গুহায় শৈবালদাম পরিবেষ্টিত অবস্থায় একাকী থাকো, সর্বাবস্থায় মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালাকে ভয় করো। তিনি তোমার সকল কিছুই দেখছেন। এ কারনেই হযরত আলী (রা:) বলেছেন, 'তুমি যখন একাকী থাকবে তখন আল্লাহকে সবথেকে বেশি ভয় করবে। কারন তুমি একাকী অবস্থায় যে কাজ করবে তার সাক্ষীও আল্লাহ তা'য়ালা এবং বিচারকও মহান আল্লাহ'। নবী করীম (সা:) বলেছেন-
مَنْ لا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ 'যে অনুগ্রহ করে না সে অনুগ্রহ পায় না'।
অনুগ্রহ বা করুণা প্রদর্শন শুধুমাত্র অন্যের প্রতি নয়, নিজের প্রতিও অনুগ্রহ করার বিষয়টি উল্লেখিত সংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যে শামিল রয়েছে। নিজের প্রতি অনুগ্রহ করার অর্থ হলো, মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা লংঘন করে নিজেকে ধ্বংস গহ্বরে নিক্ষেপ না করা এবং স্বাস্থ্য সচেতন থেকে নিজেকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করা। উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলসহ অন্য সকল মানুষের ক্ষেত্রে অনুগ্রহের বাহু বিছিয়ে দেয়া। সুতরাং যে মানুষ অনুগ্রহ করে সে স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালার অনুগ্রহের দৃষ্টি লাভে ধন্য হয়। নবী করীম (সা:) বলেছেন-
الْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةُ - 'উত্তম কথা বলাও সৎকর্ম সম্পাদনের অন্তর্গত'।
كُلُّ ذِي نَعْمَةٍ مَّحْسُودٌ - 'প্রত্যেক সৌভাগ্যশালী ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা পোষণ করা হয়'।
سَيِّدُ الْقَوْمِ خَادِمُهُمْ - 'জনগণের যে সেবা করে সেই তাদের নেতা'।
الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبُّ 'মানুষ যাকে ভালোবাসে কিয়ামতের ময়দানে সে তার সাথেই অবস্থান করবে'।
أَسْلِمْ تَسْلِمْ 'মুসলিম হও শান্তিতে থাকতে পারবে'।
নবী করীম (সা:) মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজা, বাদশাহ, সম্রাট তথা শাসকবৃন্দের কাছে পবিত্র কুরআনের আহ্বান পৌঁছানোর লক্ষ্যে দুতের মাধ্যমে পত্র প্রেরণ করতেন। রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে তিনি যে পত্র প্রেরণ করেছিলেন, সেই পত্রে তিনি লিখিয়েছিলেন, 'মুসলিম হও তাহলে শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারবে'।
মুসলিম আরবী শব্দ, এর অর্থ হলো মহান আল্লাহর বিধানের প্রতি আত্মসমর্পণকারী। আল্লাহর বিধান মেনে নিয়ে যারা তা অনুসরণ করে মাছ যেমন প্রশান্তিতে পানিতে বাস করে তেমনি তারাও শান্তিতে জীবন যাপন করে। এ জন্যই রোম সম্রাটের কাছে নবী করীম (সা:) যে পত্র প্রেরণ করেছিলেন উক্ত পত্রে উল্লেখ করেছিলেন, মুসলিম হও (আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করো) শান্তিতে জীবন-যাপন করতে পারবে।
لَيْسَ لِلْعَمِلِ مِنْ عَمَلِهِ إِلَّا مَانَوَ
'যে কাজ করে সে কেবল (নিজ কার্জের) উদ্দেশ্য অনুযায়ী ফলাফল লাভ করে'।
إِنَّمَا الْأَعْمَالُم بِالنَّيَّاتِ
'নিয়ত অনুযায়ী কাজের ফল পাবে'।
الْحَرْبُ خِدْعَةٌ
'যুদ্ধ একটি কৌশল'।
لَيْسَ الْخَبْرُ كَالْمُعَايَنَة -
'দেখা ও শোনা সমপর্যায়ের বিষয় নয়'।
الْمَجَالِسُ بالأمنة -
'একান্ত বিশ্বস্ততা বৈঠকের পূর্ব শর্ত'।
تَرْكُ الشَّرِّ صَدَقَةً -
'অসৎ কর্ম বর্জন করাও একটি সৎকর্ম'।
ব্যাপক অর্থবোধক ও সহজে বোধগম্য এমন অসংখ্য হাদীস রয়েছে, যে হাদীসসমূহের ব্যাখ্যা করতে গেলে বিশাল আকৃতির গ্রন্থ রচিত হবে। সংক্ষিপ্ত বাক্য সম্বলিত এসব হাদীস মানব জীবনকে সুন্দর সপ্নীল করার জন্যে যথেষ্ট, যদি বর্ণিত এসব হাদীসের আদেশ উপদেশ বাস্তব জীবনে অনুসরণ করা হয়।