📄 নবী করীম (সা:) এর জীবনকালে গাজওয়া-সারিয়ার
নবী করীম (সা:) তাঁর সমগ্র জীবনকালে কতগুলো যুদ্ধে স্বয়ং অংশগ্রহণ করেছেন বা সাহাবায়ে কেরামকে কতগুলো অভিযানে প্রেরণ করেছেন, এ সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এমনকি অভিযানের কারণসমূহ ও সন তারিখ নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। বিভিন্ন সীরাত গ্রন্থে এ সম্পর্কে সন তারিখসহ আলোচনা করা হয়েছে। তিনি স্বয়ং যে যুদ্ধসমূহে অংশগ্রহণ করেছেন ঐতিহাসিকগণ সেগুলোকে গাজওয়া হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। আর যে যুদ্ধে বা কোনো অভিযানে তিনি স্বয়ং অংশগ্রহণ না করে কোন সাহাবীর নেতৃত্বে বাহিনী প্রেরণ করেছেন, ঐতিহাসিকগণ সেগুলোকে সারিয়াহ নামে চিহ্নিত করেছেন। সারিয়াসমূহের সংখা প্রচুর। কোনো বর্ণনায় তা প্রায় ৫৭ টি উল্লেখ করা হয়েছে। সন তারিখ ইত্যাদী সম্পর্কেও মতভেদ রয়েছে। সারিয়াসমূহের নামকরণ অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব যাঁর প্রতি অর্পণ করা হয়েছে তাঁর নামে বা স্থানের নামেও পরিচিতি লাভ করেছে।
নবী করীম (সা:) কতটি যুদ্ধে স্বয়ং অংশগ্রহণ করেছেন, এ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে ২৯ টি। আবার কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে ২৭ টি। পক্ষান্তরে বোখারী এবং মুসলিম শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে ১৯ টি। প্রকৃত বিষয় হলো, এমন কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা কখনো ঘটেছে, যা কোনো ঐতিহাসিক বা বর্ণনাকারী ধর্তব্যের মধ্যে আনেননি। উল্লেখযোগ্য বিষয় নয় হিসাবে গণনা করেননি। এ কারণে সংখ্যার তারতম্য ঘটেছে। তায়েফ অভিযান বা গাজওয়ায়ে তায়েফ অনুষ্ঠিত হয়েছিল হিজরী অষ্টম সনের শাওয়াল মাসে। নবী করীম (সা:) তাঁর জীবনের শেষ সৈন্যবাহিনী পরিচালিত করেছিলেন তাবুকের ময়দানে বা গাজওয়ায়ে তাবুকে। এ ঘটনা ছিল হিজরী নবম সালের রজব মাসে।
📄 বিদায় হজ্জে নবী করীম (সা:) ঐতিহাসিক ভাষণ
এই পৃথিবীতে মহান আল্লাহ তা'য়ালা মানুষকে সত্য পথ প্রদর্শন করার লক্ষ্যে যে সকল নবী-রাসূল প্রেরণ করেছিলেন, তাঁদেরকে বিশেষ দায়িত্ব ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। দায়িত্ব পালন শেষে তাঁরা এই পৃথিবীতে অতিরিক্ত সময় অবস্থান করবেন না কুদরতের এটাই ছিল সিদ্ধান্ত। পৃথিবীর জীবন হতে তাদের কাছে ঐ পবিত্রজগৎ ছিল অধিক প্রিয়। ঐ জগতে মহান আল্লাহর সাথে মিলিত হবার জন্য তাঁরা ব্যাকুল থাকতেন। কোনো নবীকে যখন আল্লাহ তা'য়ালার সাথে মিলিত হবার কথা জানানো হয়েছে, তাঁরা সামান্যতম দ্বিধা না করে অতি দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন。
নবী করীম (সা:) এর প্রতি যে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল তিনি তা পালন করলেন। এমন লোক যখন প্রস্তুত হলো যে লোকগুলো স্বেচ্ছায় অন্তরের তাগিদে আল্লাহ তা'য়ালার বিধান সমুন্নত রাখবে, আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজনে নিজের জান-মাল কুরবান করবে, যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করবে, তখন মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রিয় বন্ধুকে নিজের সান্নিধ্যে নেয়ার ইচ্ছা তাঁর হাবীবকে জানিয়ে দিলেন।
বিশ্বনবী (সা:) হিজরতের পরে ফরজ হজ্জ আদায় করার সুযোগ পাননি। হিজরতের পূর্বে তিনি দুই বার হজ্জ আদায় করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো বর্ণনায় একবারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দশম হিজরীতে নবী করীম (সা:) তাঁর জীবনের শেষ হজ্জ আদায় করার নিয়ত করলেন। জিলকদ মাসে ঘোষণা করা হলো তিনি হজ্জ আদায় করতে যাবেন। এই ঘোষণা সমগ্র আরবে বাতাসের গতিতে ছড়িয়ে পড়েছিলো। দূরে অবস্থানরত মুসলমানগণ যখন জানতে পারলেন নবী করীম (সা:) এই বছর হজ্জ আদায় করতে যাবেন। যার সামান্য সামর্থও আছে সে ব্যক্তিও হজ্জ আদায় করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলো।
তাছাড়া এমন অনেক গোত্র ছিলো যাঁরা সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু আল্লাহর রাসূল (সা:) কে দেখার সৌভাগ্য তাদের হয়নি। হজ্জ আদায় উপলক্ষ্যে নবীকে দেখা যাবে, এ কারণেও অনেকে হজ্জ আদায়ের নিয়ত করেছিলেন। বিশ্বনবী (সা:) জিলকদ মাসের শনিবারের দিন গোসল করে তহবন্দ এবং চাদর পরিধান করলেন। যুহরের নামাজ আদায় করে তিনি পবিত্র স্ত্রীদেরকে সাথে নিয়ে মদীনা থেকে বের হলেন।
মদীনা থেকে দুই মাইল দূরে জুল হুলাইফা নামক স্থানে এসে প্রথম রাত অতিবাহিত করলেন। এই স্থান থেকেই মদীনাবাসীগণ হজ্জের ইহরাম বাঁধেন। নবী করীম (সা:) এখানে গোছল করলেন। হযরত আয়িশা (রা:) নিজ হাতে প্রিয় নবী (সা:) এর পবিত্র শরীর মুবারকে আতর মাখিয়ে দিলেন। তারপর দুই রাকায়াত নামাজ আদায় করে উটের ওপর আরোহণ করে হজ্জের ইহরাম বাঁধলেন। এই উট ছিল স্ত্রী জাতিয় এবং নাম ছিল ক্কাসওয়া। ইহরাম বেঁধেই তিনি বিনয় অবনত চিত্তে উচ্চকণ্ঠে বলতে থাকলেন-
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ - لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَ النِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ
হে আল্লাহ তা'য়ালা! আমি উপস্থিত হয়েছি! হে আল্লাহ তা'য়ালা! আমি উপস্থিত হয়েছি! হে আল্লাহ তা'য়ালা! আমি উপস্থিত হয়েছি এবং ঘোষণা করছি, তোমার কোনো অংশীদার নেই। হে আল্লাহ তা'য়ালা! আমি উপস্থিত হয়েছি! নিশ্চয়ই যাবতীয় প্রশংসা এবং নিয়ামত আপনারই জন্য নির্দিষ্ট এবং আধিপত্য ও সার্বভৌমত্ব শুধুমাত্র আপনারই জন্য, আপনার কোনো অংশীদার নেই।
নবী করীম (সা:) তাঁর জীবনের শেষ হজ্জ আদায় করতে চলেছেন। প্রিয় সঙ্গী সাথী এ সংবাদ তখন পর্যন্ত কেউ-ই জানেন না, আর মাত্র কিছুদিন পরেই প্রিয় নবী তাদের মধ্যে থাকবেন না। আগামী বছর নবীর সাথে হজ্জ করার ভাগ্য তাঁদের আর হবে না। রাসূল (সা:) এগিয়ে চলেছেন মক্কার দিকে। জনতার ঢল নেমেছে চারদিকে। রাসূলের দুই দিকে অগণিত জনতা। নবী করীম (সা:) এর কন্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে লাব্বাইকা ধ্বনি আকাশ বাতাস মুখরিত করে উচ্চারিত হচ্ছে।
পথের পাশের বৃক্ষ তরু-লতা তথা সকল অনু পরমানু যেন রাসূলের সাথে সাথে মহান আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবার ঘোষণা দিচ্ছে। লক্ষ কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে লাব্বাইকা, আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা। আমি উপস্থিত হয়েছি! হে আল্লাহ তা'য়ালা! আমি উপস্থিত হয়েছি! সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের মতই অগণিত জনতা মধুর গুঞ্জন তুলে এগিয়ে যাচ্ছেন। মক্কা বিজয়কালে তিনি যেসব স্থানে অবস্থান করেছিলেন প্রিয় সাহাবায়ে কেরাম সেসব স্থানে পরম শ্রদ্ধাভরে মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।
নবী করীম (সা:) সেসব মসজিদে যাত্রা বিরতি করে নামাজ আদায় করলেন। পথের পাশের অগণিত জনতা তাঁকে দেখে আবেগে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল। তাঁরাও হজ্জ আদায় করার জন্য কাফেলায় শামিল হয়ে গেলেন। কাফেলা এক সময় সরফ নামক স্থানে উপনীত হলো। নবী করীম (সা:) সেখানে যাত্রা বিরতি করে গোছল করলেন। তারপর তিনি জিলহজ্জ মাসের চার তারিখে ফজরের নামাজের সময় পবিত্র মক্কায় প্রবেশ করলেন। মদীনা থেকে মক্কায় পৌঁছতে তাঁর নয় দিন সময় লেগেছিল।
নবী করীম (সা:) মক্কায় এসেছেন, এ সংবাদ শোনার পরে দলে দলে মুসলমানগণ তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে এসেছিল। বিশেষ করে তাঁর নিজের গোত্র বনী হাশেমের শিশুরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে রাস্তায় বের হয়ে এসেছিল। আল্লাহর নবী শিশুদেরকে ভালোবাসতেন। তিনি শিশুদেরকে উটের সামনে পিছনে বসিয়ে এগিয়ে গেলেন কা'বার দিকে। কা'বার প্রতি দৃষ্টি পড়তেই তিনি আল্লাহ তা'য়ালাকে বললেন, 'হে আল্লাহ তা'য়ালা! এই ঘরের সম্মান মর্যাদা আপনি বৃদ্ধি করে দিন'।
এরপর তিনি কা'বা তাওয়াফ করলেন। মাকামে ইবরাহীমে দাঁড়িয়ে দু'রাকায়াত নামাজ আদায় করলেন। তারপর সাফা এবং মারওয়া পাহাড়ে পৌঁছে বললেন, 'সাফা এবং মারওয়া পাহাড় আল্লাহ তা'য়ালার নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভূক্ত'। এরপর কা'বা ঘরের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আল্লাহ তা'য়ালা ব্যতীত দাসত্ব লাভের উপযোগী কেউ নেই। কেউ তাঁর অংশীদার নেই। সকল ক্ষমতা তাঁরই, তাঁরই জন্য সকল ক্ষমতা, শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রশংসা। তিনিই জীবন ও মৃত্যু দান করেন। সকল কিছুর ওপরে তিনিই শক্তিশালী। তিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। আল্লাহ তা'য়ালা নিজের অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন এবং নিজের বান্দাকে সাহায্য করেছেন, সকল গোত্রকে পরাজিত করেছেন'।
আরববাসীরা হজ্জের সময় ওমরাহ করতো না। সাফা-মারওয়া তাওয়াফ করে তিনি সায়ী শেষ করলেন। যাদের সাথে কুরবানীর পশু ছিল তাদেরকে তিনি ইহরামমুক্ত হবার নির্দেশ দিলেন। কোনো কোনো নতুন সাহাবী অতীতের অভ্যাস অনুয়ায়ী রাসুলের নির্দেশ পালনে দ্বিধা করছিল। নবী করীম (সা:) তাদের অবস্থা অনুভব করে বললেন, 'যদি আমার সাথে কুরবানীর পশু না থকতো তাহলে আমিও তাই করতাম' '।
কুরাইশরা প্রথা বানিয়ে নিয়েছিল যে, তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠ ধারণা করে অন্য হাজীদের মত আরাফাতে অবস্থান না করে মুজদালিফায় অবস্থান করতো। এই মুজদালিফা ছিল কা'বা শরীফের সীমানায় অবস্থিত। তারা হজ্জের সময় কা'বার সীমানা অতিক্রম করতো না এ কারণে যে, অন্যদের আর তাদের মধ্যে পার্থক্য থাকবে না। পার্থক্য বজায় রাখতে তারা অনুরূপ করতো।
নবী করীম (সা:) এই কু-প্রথার কবর দিলেন। তিনি সকল বিভেদ এবং অহংকারের মাথায় পদাঘাত করলেন। তিনি সাধারণ হাজীদের সাথে আরাফাতে গিয়ে ঘোষণা করলেন, 'তোমরা নিজেদের পবিত্র স্থানসমূহে অবস্থান করো। কারণ তোমরা তোমাদের পূর্ব পুরুষ ইবরাহীমের উত্তরাধিকারী হিসাবে পরিচিত'। (বুখারী ও আবু দাউদ)
আরাফাতে অবস্থান করা হযরত ইবরাহীম (আ:) এর পবিত্র স্মৃতি বিজড়িত। তিনিই এই স্থানকে হাজীদের অবস্থানের জন্যই নির্বাচন করেছিলেন। এই জায়গার একটি স্থানের নাম নামিরাহ, পরবর্তীতে সেখানে এক সুদৃশ্য বিশাল মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। নবী করীম (সা:) এখানে অবস্থান করলেন এবং সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ার পরে তিনি আরফাতের ময়দানে গেলেন। এই ময়দানেই তিনি তাঁর উটনী ক্কাসওয়ার ওপরে বসে বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক ভাষন দিয়েছিলেন। তিনি যে উঁচু স্থানে উটের পিঠে বসে ভাষণ দিয়েছিলেন সে স্থানে একটি সাদা পিলার দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশ্বনবী (সা:) ভাষণে বললেন, হে জনমণ্ডলী! আজ আমি তোমাদের যে কথা বলবো তা মনোযোগ দিয়ে শুনো। আমার ধারণা, আর বোধহয় তোমাদের সাথে একত্রে হজ্জ করার সুযোগ নাও হতে পারে। জেনে রেখো, জাহেলী যুগের সকল অন্ধ বিশ্বাস, প্রথা, অনাচার, কুসংস্কার আমার পায়ের নীচে দলিত মথিত হলো। অজ্ঞতার যুগের রক্ত প্রতিশোধ গ্রহণ আজ থেকে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। আমি সর্বাগ্রে আমার বংশের রাবিয়া ইবনে হারিসের রক্ত প্রতিশোধ গ্রহণ রহিত করলাম। সে যুগের সুদ প্রথাও রহিত করলাম। আমি প্রথমে আমার বংশের আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের সুদের দাবী নাকচ করে দিলাম। (আরবে প্রথা ছিল, কেউ কাউকে নিহত করলে প্রতিশোধ গ্রহণ করতেই হবে। এই প্রতিশোধের পালা বংশ পরম্পরায় চলতো। রাবিয়া ইবনে হারিসের সন্তান আরেক গোত্রের হাতে নিহত হয়েছিল। বিচারের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে, কিন্তু নিজেরা আইন হাতে উঠিয়ে নিতে পারবে না। আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের সুদের ব্যবসা ছিল। তিনি অর্থ ঋণ দিয়ে সুদ আদায় করতেন। তখন পর্যন্ত আরবের অনেক লোকের কাছেই তিনি সুদের অর্থ পেতেন)
একজন অপরাধ করলে আরেকজনকে শাস্তি দেয়া তথা পিতার অপরাধের কারণে সন্তানকে বা সন্তানের অপরাধের কারণে পিতাকে শাস্তি দেয়া যাবে না। (এই নিষ্ঠুর প্রথা সে সময় সমগ্র আরবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। অপরাধীকে ধরতে না পারলে তার নির্দোষ আত্মীয়কে শাস্তি দেয়া হতো) যদি কোনো নাক কাটা হাবশী গোলামকেও তোমাদের নেতা নির্বাচন করা হয় এবং সে যদি তোমাদের মধ্যে আল্লাহ তা'য়ালার বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে, তাহলে তোমরা তাঁর আনুগত্য করবে। তাঁর নির্দেশ পালন করবে।
সাবধান! দ্বীনের ব্যাপারে সীমা লংঘন করো না। এই সীমা লংঘনের কারণে অতীতে বহু জাতি ধ্বংস হয়েছে। মনে রেখো, তোমাদের সবাইকে আল্লাহ তা'য়ালার কাছে উপস্থিত হতে হবে এবং সকল কর্মের হিসাব তাঁর কাছে দিতে হবে। সাবধান! আমার পরে তোমরা পথ ভ্রষ্ট হয়ে কাফিরদের মতো একে অপরের রক্তপাত করো না। সাবাধান! তোমাদের পরস্পরের ধন-সম্পদ পরস্পরের কাছে আজকের পবিত্র দিনের মতো, এই পবিত্র মাসের মতো এবং এই পবিত্র মক্কার মতোই পবিত্র।
জেনে রেখো, আরবদের ওপরে অনারবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। অনারবদের ওপরে আরবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সকলেই আদমের সন্তান আর আদম হলো মাটি থেকে সৃষ্টি। মনে রেখো, এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই এবং সকল মুসলমানদের নিয়ে একটি অবিচ্ছেদ্য সমাজ। হে মানুষ! আমার পরে আর কোনো নবীর আগমন ঘটবে না। তোমাদের পরে আর কোনো নতুন উম্মাহ্ সৃষ্টি হবে না। এই বছরের পরে তোমাদের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়তো আর হবে না। সুতরাং জ্ঞান বিলীন হবার পূর্বেই আমার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো。
বিশেষ করে চারটি কথা ভালো করে স্মরণ রেখো, আল্লাহ তা'য়ালার সাথে কাউকে শরিক করো না। ন্যায়ের ভিত্তি ব্যতীত তোমরা কাউকে হত্যা করো না। অপরের দ্রব্য আত্মসাৎ করো না। ব্যভিচারের ধারে কাছেও যেও না। আমি তোমাদের কাছে যা রেখে যাচ্ছি, তা যদি দৃঢ়ভাবে ধারণ করে রাখো, তাহলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। আমি তোমাদের কাছে আল্লাহ তা'য়ালার কিতাব এবং আমার প্রদর্শিত পথ রেখে যাচ্ছি। (অর্থাৎ তাঁর সুন্নাত)
হে উপস্থিত জনমণ্ডলী! শয়তান হতাশ হয়েছে। কারণ আরবে সে আর কখনো পূজা পাবে না। কিন্তু সাবধান! তোমরা যাকে ছোট মনে করো, তার ভেতর দিয়েই শয়তান তোমাদের মহাক্ষতি সাধন করে। তোমরা এ সম্পর্কে সতর্ক হও। নারীদের সম্পর্কে আমি তোমাদের সতর্ক করছি, তাদের সাথে নিষ্ঠুর ব্যবহার করার ব্যাপারে আল্লাহ তা'য়ালার আযাবকে ভয় করো। তোমরা তাদেরকে আল্লাহ তা'য়ালার জিম্মাদারীতে গ্রহণ করেছো। আল্লাহ তা'য়ালার নির্দেশের আওতায় তোমরা নিজেদের জন্য তাদেরকে বৈধ করে নিয়েছো। তোমাদের স্ত্রীর ওপর যেমন তোমাদের অধিকার রয়েছে তেমনি তাদেরও তোমাদের ওপর অধিকার রয়েছে। মনে রেখো, তোমরাই তাদের আশ্রয়।
আমি তোমাদেরকে তোমাদের দাস-দাসী সম্পর্কে সাবধান করছি। তাদের প্রতি কোনো ধরনের নির্যাতন করবে না। তাদের সাথে এমন ব্যবহার করো না যে, তারা মনে আঘাত পায়। তোমরা যা আহার করবে, তোমরা যা পরিধান করবে তাদেরকেও তাই আহার ও পরিধান করাবে। তোমরা যারা এখানে উপস্থিত আছো, আমার কাছ থেকে যা শুনলে, যারা উপস্থিত নেই তাদের কাছে তা পৌঁছে দিও। তাদের ভেতরে কেউ কেউ শ্রোতাদের থেকেও অধিক স্মৃতি ও বোধ শক্তিসম্পন্ন হতে পারে।
নবী করীম (সা:) এর ভাষণ একত্রে পাওয়া কষ্টকর। কারণ যিনি যতটুকু শুনেছেন এবং স্মরণে রেখেছেন ততটুকুই তিনি বর্ণনা করেছেন। বিভিন্ন হাদীসে ভাষণের বিভিন্ন অংশ বর্ণনা করা হয়েছে। বিশ্বনবী (সা:) এর ভাষণ একত্রে উপস্থিত সকল মানুষ শুনতে পায়নি। কারণ বর্তমান সময়ের মতো সে যুগে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা ছিল না। এ কারণে বিভিন্ন স্থানে ঘোষক নিযুক্ত করা হয়েছিল। তাঁরা রাসূলের ভাষণ উপস্থিত মানুষকে জানিয়ে দিচ্ছিলেন।
এরপর নবী করীম (সা:) আরাফাত এবং মিনায় উপস্থিত মানুষদের লক্ষ্য করে বললেন, আমি আমার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছি কিনা, এ সম্পর্কে তোমাদের আল্লাহ তা'য়ালা প্রশ্ন করবেন। তখন তোমরা কি সাক্ষ্য দিবে?
লক্ষ মানুষের বজ্রকণ্ঠ শোনা গেল, হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আপনি আপনার প্রতি অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছেন, আল্লাহ তা'য়ালার বাণী আপনি আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। আমরা আল্লাহ তা'য়ালার কাছে এই সাক্ষ্য দিবো।
নবী করীম (সা:) আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ তা'য়ালা! আপনি সাক্ষী থাকুন'। (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজী, ইবনে মাজাহ, বায়হাকী, মুসনাদে আহমাদ, কানযুল উম্মাল, আত্ তাবারী, ইবনে কাসীর)
এরপর নবী করীম (সা:) হযরত বিলাল (রা:) কে আযান দিতে বললেন। তারপর যুহর ও আসরের নামাজ একত্রে আদায় করলেন। নামাজ শেষ হলে তিনি নিজের অবস্থানের কাছে এসে দীর্ঘক্ষণ আল্লাহ তা'য়ালার কাছে দোয়া করে সূর্য অস্ত গেলে তিনি যাত্রা করলেন। এ সময় তাঁর উটনীর পেছনে হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা:) বসেছিলেন। বিশাল এক জনসমুদ্রের মাঝ দিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন। হাতের ছড়ি দিয়ে তিনি ইশারা করছিলেন আর মৃদু কণ্ঠে বলছিলেন, হে জনমণ্ডলী! শান্তির সাথে।
বারবার এই কথাটি বলছিলেন। অর্থাৎ কোনো বিশৃংখলা যেন না হয়। পথে এক সময় তিনি পবিত্রতা অর্জন করলেন। হযরত উসামা (রা:) তাঁকে জানালেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! নামাজের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।
নবী (সা:) জানালেন, নামাজ আদায়ের জায়গা সামনে আসছে।
তিনি মুজদালিফায় এসে মাগরিবের নামাজ আদায় করলেন। তারপর সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের তাঁবুতে গিয়ে তাদের জিনিস পত্র খুলবেন এমন সময় ইশার নামাজের আযান হলো। অর্থাৎ মাগরিব ও ইশার নামাজের মধ্যে সেদিন সময়ের তেমন ব্যবধান ছিল না। সেদিন রাতে নবী করীম (সা:) বিশ্রাম গ্রহণ করেছিলেন। অন্যান্য রাতের ন্যায় রাত জেগে নামাজ আদায় বা আল্লাহ তা'য়ালা সমীপে সিজদায় থাকেননি। হাদীস বিশারদগণ বলেন, এই একটি মাত্র রাতই নবী করীম (সা:) তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করেননি।
ইতোপূর্বে কুরাইশরা সূর্য উদয়ের পরে মুজদালিফা ত্যাগ করতো। নবী করীম (সা:) সে প্রথা রহিত করে সূর্য উদিত হবার পূর্বেই মুজদালিফা ত্যাগ করলেন। এ সময় তাঁর সাথে তাঁর চাচাত ভাই হযরত ফজল ইবনে আব্বাস (রা:) ছিলেন। এই দিনটি ছিল জিলহজ্জ মাসের দশ তারিখ শনিবার। তারপর তিনি মীনায় জামরার কাছে উপস্থিত হয়ে কিশোর বালক হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) কে পাথর কুড়িয়ে আনতে বললেন। তিনি পাথর এনে দিলে নবী করীম (সা:) পাথর নিক্ষেপ করলেন। এরপর তিনি মীনায় গেলেন। সাথে তাঁর লক্ষ জনতা।
তিনি অগণিত জনতার দিকে তাকিয়ে দেখছেন। নয়ন বোধহয় তাঁর বারবার অশ্রু সজল হয়ে উঠছিল। এই লোকগুলোকে ইসলামের পথে নিয়ে আসতে তাঁকে অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে, সাহাবায়ে কেরাম অর্থ-সম্পদ কুরবানী দিয়ে অবশেষে প্রাণও দান করেছেন, প্রিয় জীবন সঙ্গিনী খাদিজা (রা:) নিজের সহায়-সম্পদ কুরবানী দিয়ে কষ্টের জীবন বেছে নিয়েছিলেন। ওহূদের ময়দানে তাঁর দাঁত মুবারক শাহাদাতবরণ করেছে, তাঁর পবিত্র শরীরে কাফিররা আঘাতে আঘাতে রক্তাক্ত করেছে। প্রিয় চাচার কলিজা ছিন্ন হয়েছে। সীমাহীন যন্ত্রণা আর অসীম ত্যাগের কিনারাহীন সাগর পাড়ি দেয়ার পরে আজ এই লোকগুলো এখানে সমবেত হয়েছে।
নবী করীম (সা:) আল্লাহ তা'য়ালার শুকরিয়া জ্ঞাপন করলেন। এরপর তিনি কুরবানী দিয়ে মাথা মুড়ালেন। পবিত্র চুল মুবারক তাঁর নির্দেশে মুসলমানদের মধ্যে বন্টন করা হলো। এরপর তিনি মক্কায় গিয়ে কা'বা শরীফ তাওয়াফ করে জমজমের পানি পান করলেন। পানি পান করার পূর্বে তিনি নিজ বংশের লোকদেরকে ডেকে বললেন, আমার যদি এই ভয় না হতো যে, আমাকে এমন করতে দেখে লোকেরা তোমাদের হাত থেকে বালতি কেড়ে নিয়ে পানি উঠিয়ে পান করবে, তাহলে আমি নিজ হাতে পানি উঠিয়ে পান করতাম।
হযরত আব্বাস (রা:) পানি উঠিয়ে দিয়েছিলেন। নবী করীম (সা:) কা'বা শরীফের দিকে দাঁড়িয়ে পানি পান করেছিলেন। এরপর সেখান থেকে মীনায় গিয়ে যুহরের নামাজ আদায় করেছিলেন। তবে এ সম্পর্কে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন মক্কাতেই যুহরের নামাজ আদায় করেছিলেন। বিশ্বনবী (সা:) হজ্জ আদায় করলেন। তাঁর উম্মতদের তিনি বারবার দেখছিলেন। তাদের প্রতি নবী করীম (সা:) শেষবারের মতোই করুণ কন্ঠে বলেছিলেন, 'বিদায়! বন্ধুগণ বিদায়!' এই হজ্জই ছিল নবী করীম (সা:) এর পবিত্র জীবনের শেষ হজ্জ。
📄 নিজ প্রাণের শত্রুদের প্রতি নবী করীম (সা:)-এর আচরণ
কতিপয় অমুসলিম লেখক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে লিখেছে, মুহাম্মাদ (সা:) খায়বার, বনী নজীর ও বনী কুরাইজার ইয়াহুদীদের ওপরে ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করেছেন। (নাউযুবিল্লাহ) সকল সীরাত গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে, রাসূল (সা:) কারো ওপরে ব্যক্তিগত কোনো বিষয়ে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। হযরত আয়িশা (রা:) বলেন, নবী করীম (সা:) ব্যক্তিগত বিষয়ে কারো ওপর কোনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালার আইনের সাথে কেউ বেয়াদবি করলে তাকে ক্ষমা করতেন না। (বুখারী, মুসলিম)
দুশমনরা তাঁকে অসহনীয় কষ্ট দিয়েছে, ঐ মানুষগুলো যখন তাঁর সামনে এসেছে তিনি হাসি মুখে তাদেরকে নিজের বুকে টেনে নিয়েছেন। তায়েফের মানুষগুলো তাঁকে আঘাতে আঘাতে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল, জ্ঞান হারিয়েছিলেন তিনি। তায়েফের যুদ্ধের সময় তাঁরা ক্ষেপণাস্ত্রের দ্বারা পাথর নিক্ষেপ করে মুসলমানদের জান-মালের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছিল। ঐ তায়েফবাসীর কল্যাণের জন্য তিনি দোয়া করেছিলেন। তায়েফবাসী যখন তাদের প্রতিনিধি দল মদীনায় প্রেরণ করেছিল, নবী করীম (সা:) তাদেরকে মসজিদে নববীতে স্থান দিয়ে তাদেরকে পরম আদোরে বরণ করে কোমলতা এবং স্নেহের বাহু বিছিয়ে দিয়েছিলেন। (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ)
মক্কা বিজয়ের পরে তিনি ঘোষণা করলেন, 'সকল মানুষ আদম থেকে সৃষ্টি এবং আদম মাটি থেকে সৃষ্টি'। অর্থাৎ কোনো ভেদাভেদ নেই। সবাই এক ও অবিচ্ছিন্ন। কেউ কারো ওপরে শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করতে পারবে না। তবে ঐ ব্যক্তি হবে বেশি সম্মানিত এবং মর্যাদাবান, আল্লাহ তা'য়ালাকে যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি ভয় করে। যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি আল্লাহ তা'য়ালার আইন পালন করে। লম্বা জুব্বা আর লম্বা দাড়ি থাকলেই অধিক সম্মান লাভ করবে বা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হতে পারলে বা শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তির অধিকারী হতে পারলে তাকেই অধিক সম্মান করতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। ইসলামী রাষ্ট্রে সম্মান আর মর্যাদার বিষয়টি নির্ভর করে আল্লাহভীতির ওপরে। নামের পূর্বে চার পাঁচটা ডিগ্রী থাকলেই সম্মান লাভ করা যাবে না।
প্রিয়তম স্ত্রী হযরত আয়িশা (রা:) এর ওপর ভয়ংকর অপবাদ দিয়েছিল মদীনার মুনাফিকরা, তাতেও রাসূল (সা:) প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। মদীনায় ইয়াহুদী লবীদ ইবনে আসাম নবী (সা:) এর ওপরে যাদু করেছিল, তিনি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। যায়েদ ইবনে সানা নামক একজন ইয়াহুদীর কাছ থেকে তিনি ঋণ গ্রহণ করেছিলেন। ঋণ পরিশোধের তারিখ তখন পর্যন্ত আসেনি। অকারণে সেই ইয়াহুদী অপমান করার জন্য লোকজনের মধ্যে নবী (সা:)-এর জামা টেনে আপত্তিকর দৃশ্য ঘটিয়ে বলেছিল, 'হে আব্দুল মুত্তালিবের বংশধর! তোমরা সব সময় ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে নানা বাহানা করো'।
অথচ ঋণ পরিশোধের তারিখ তখন পর্যন্ত আসেনি। রাসুল (সা:) কে এভাবে অপ্রস্তুত করতে দেখে হযরত উমার (রা:) প্রচণ্ড ক্রোধে ফেটে পড়লেন। তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর শত্রু! তুই আল্লাহর রাসূলের সাথে বেয়াদবি করিস!'
হযরত উমার (রা:) কে আল্লাহর রাসূল (সা:) মুখে হাসি টেনে বললেন, 'হে উমার! আমি তোমার কাছ থেকে এ ধরনের ব্যবহার আশা করিনি। তাকে তাগাদা করার ধরণ বুঝিয়ে দেয়া দরকার ছিল। যাও, তার ঋণ আদায় করার ব্যবস্থা করো এবং বেশি দিয়ে দাও'।
নবী করীম (সা:) এর একটি মাত্র পরিধেয় বস্ত্র ছিলো। তা ঘামে ভিজে আরো ভারি হয়ে যেত। হযরত আয়িশা (রা:) জানতে পারলেন, সিরিয়া থেকে একজন ইয়াহূদী কিছু কাপড় আমদানী করেছে। তাঁর কাছ থেকে তিনি কাপড় ঋণ হিসাবে গ্রহণের জন্য আল্লাহর রাসূলকে বললেন। রাসূল (সা:) সে ইয়াহুদীর কাছে কাপড়ের জন্য একজন লোক প্রেরণ করলেন। ইয়াহুদী তাঁর সাথে চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করে বলেছিল, 'তোমাদের উদ্দেশ্য আমার কাছ থেকে বিনামূল্যে কাপড় গ্রহণ করা। কোনদিনই তোমরা এর মূল্য দিবে না'।
লোকটি ফিরে এসে আল্লাহর রাসূল (সা:) কে ঘটনা জানালে তিনি বলেছিলেন, 'লোকটি জানে আমি সবচেয়ে আমানতদার এবং ঋণ আদায়কারী'। অর্থাৎ জেনে বুঝেই লোকটি অপমান করার জন্য এমন অশোভনীয় আচরণ করেছে。
মদীনার মাসজিদে নববীতে একদিন এক বেদুঈন এসে তাদের অভ্যাস মতো দাঁড়িয়ে প্রসাব করা শুরু করেছিল। তখন পর্যন্ত সে মাসজিদের মর্যাদা সম্পর্কে কিছুই জানতো না। সাহাবায়ে কেরাম ছুটে এলেন তাঁকে মারধর করার জন্য। নবী করীম (সা:) তাদেরকে বাধা দিয়ে বললেন, 'যাও, এক পাত্র পানি এনে সেখানে ঢেলে দাও। মনে রেখো, মানুষের অসুবিধা সৃষ্টি করার জন্য মহান আল্লাহ তোমাদের প্রেরণ করেননি। বরং মানুষের কাজ সহজ সরল করে দেয়ার জন্য প্রেরণ করেছেন'। (বুখারী)
মক্কার কুরাইশরা বিশ্বনবী (সা:) এর নাম মুবারক বিকৃত করেছিল। মুহাম্মাদ অর্থাৎ অতি প্রশংসিত। তারা বলতো মুজাম্মাম অর্থাৎ ধিকৃত। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে বললেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরাইশদের গালির জবাব কিভাবে দিচ্ছেন তা ভেবে তোমরা আশ্চর্য হচ্ছো! তারা মুজাম্মামকে গালি দেয়, অভিশাপ করে। আর আমিতো মুহাম্মাদ, প্রশংসিত। (মিশকাত)
ফুরাত ইবনে হাইয়ান নামক একজন লোক নবী করীম (সা:) এর বিরুদ্ধে কুৎসামূলক কবিতা রচনা করতো। সে লোক ইসলাম গ্রহণ করার পরে নবী করীম (সা:) তাঁকে ইয়ামামাতে একটি বিশাল জমি দান করেছিলেন। তিনি নিজের ঘরে অভাব রেখে শত্রুর অভাব এইভাবেই মোচন করেছেন।
হুদায়বিয়া সন্ধির সময় প্রায় ৮০ জনের একটি সশস্ত্র দল তাঁকে হত্যা করার জন্য গিয়েছিল। তারা সাহাবায়ে কেরাম কর্তৃক গ্রেফতার হয়েছিলো। নবীর সামনে তাদেরকে উপস্থিত করা হলো। তিনি তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। একজন শত্রু তাঁর ওপর আক্রমন করেছিল। তিনি শত্রুর দিকে তাকানো মাত্র তার হাত থেকে তরবারী মাটিতে পড়ে গেল। তিনি তাকে ক্ষমা করে দিলেন। (মুসনাদে আহমাদ)
মক্কায় শিয়াবে আবু তালিবে মক্কার শত্রুরা মুসলমানদের দীর্ঘ তিনটি বছর বন্দী করে রেখেছিল। ক্ষুধার্ত সাহাবায়ে কেরাম গাছের পাতা, মৃত পশুর চামড়া আহার করেছেন। অনাহারে মায়ের বুকের দুধ শুকিয়ে গেছে। শিশুরা ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে যখন করুণ কন্ঠে আর্তনাদ করেছে, শত্রুরা অট্টহাসি হেসেছে। মক্কায় খাদ্য শস্য সরবরাহকারী ইয়ামামা মুসলমান হলেন। তিনি মক্কায় যাওয়ার পরে ইসলামের শত্রুরা তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি দিল। তিনিও রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন, আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাসূলের অনুমতি ব্যতীত একদানা খাদ্য শস্য মক্কায় সরবরাহ করা হবে না।
ফলে অচিরেই মক্কায় তীব্র খাদ্য সঙ্কট দেখা দিল। কুরাইশরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে মদীনায় করুণার সিন্ধুর দিকে হস্ত প্রসারিত করলো। আল্লাহর রাসূল বিষয়টি জানতেন না। তিনি শোনা মাত্র ইয়ামামা (রা:) কে আদেশ দিলেন, অতি দ্রুত যেন মক্কায় খাদ্য সরবরাহ করা হয়। নবীর আদেশে মক্কায় দ্রুত খাদ্য প্রেরণের ব্যবস্থা করা হলো। (বুখারী)
বনী হানিফা গোত্র আল্লাহর রাসূলের প্রাণের শত্রু ছিল। তাদের নেতা সাম্মামা ইবনে আসাল মুসলমানদের হাতে বন্দী হলো। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে নির্দেশ দিলেন, তাকে মাসজিদের সাথে যেন বেঁধে রাখা হয়। রাসূল (সা:) মাসজিদে যাবার সময় তাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি আমার কাছে কি ধরনের ব্যবহার আশা করো?
গোত্রপতি সাম্মামা ইবনে আসাল বললো, হে মুহাম্মাদ (সা:)! যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন, তাহলে একজন হত্যাকারীকেই হত্যা করা হবে। আর যদি আমাকে মুক্তি দেন, তাহলে আমার প্রতি অনুগ্রহ করে আমাকে কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ করা হবে। আর যদি মুক্তিপণের বিনিময়ে আমাকে মুক্তি দিতে চান তাহলে আমি তা আদায় করতে পারি।
নবী করীম (সা:) তার কথার জবাব না দিয়ে নীরব রইলেন। দ্বিতীয় দিনও নবীর সাথে তার একই কথাবর্তা হলো। তৃতীয় দিনও একই কথাবার্তা হলো এবং রাসূল (সা:) সাহাবায়ে কেরামের প্রতি নির্দেশ দিলেন, তাকে মুক্ত করে দেয়া হোক। মুক্তি লাভ করে সে একটি বৃক্ষের আড়ালে গিয়ে গোছল করলো। তারপর মাসজিদে নববীতে এসে রাসূলের হাতে হাত রেখে মুসলমান হলো।
ইসলাম গ্রহণ করার পরে সে বললো, 'পৃথিবীতে আমি আপনাকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করতাম, এখন এই পৃথিবীতে আপনি আমার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। আপনার চেয়ে প্রিয়জন আমার কাছে আর কেউ নেই। আমি সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করতাম ইসলামকে। এখন আমার কাছে সবচেয়ে অধিক প্রিয় হলো ইসলাম। আপনার শহর ছিল আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণার, এখন আপনার শহরের তুলনায় আমার কাছে এতো প্রিয় শহর আর একটিও নেই'। বিশ্বনবী (সা:) তাঁর অনুপম আদর্শ দিয়ে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন, তরবারীর শক্তিতে অবশ্যই নয়।
📄 অমুসলিমদের প্রতি নবী করীম (সা:) এর আচরণ
নবী করীম (সা:) কে আল্লাহ তা'য়ালা সমগ্র আরবের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী বানিয়েছিলেন। যার আঙ্গুলী হেলনে লক্ষ তরবারী মুহূর্তে কোষমুক্ত হতো। সে সময় তিনি অমুসলিম এবং শত্রুদের সাথে কি ধরণের আচরণ করেছেন, তা অমুসলিম লেখকদের চোখে পড়লেও তারা স্বভাবসুলভ কারণে চোখ বন্ধ করে তাঁর প্রতি কল্পিত অভিযোগ দাঁড় করিয়েছেন।
ইসলামের শত্রুদের যদি শ্রেণী বিন্যাস করা হয় তাহলে দেখা যাবে, কপট বা মুনাফিকদের থেকে ইসলামের বড় শত্রু আর দ্বিতীয়টি নেই। বর্তমানেও সমগ্র পৃথিবীতে ইসলাম ও মুসলমানদের এই করুণ অবস্থার মূলে রয়েছে মুনাফিক শ্রেণীর কূটিল ষড়যন্ত্র। বলা বাহুল্য বর্তমান পৃথিবীতে মুসলিম দেশসমূহের নেতৃত্ব রয়েছে ঐ শ্রেণীর লোকজনের হাতে, যারা ইসলাম ও মুসলমানদের যোগ্য প্রতিনিধি নয়, যাদের অন্তরে ইসলামের প্রতি মমত্ববোধ নেই।
মদীনায় আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ছিল মুনাফিকদের নেতা। বিশ্বনবী (সা:) মদীনায় হিজরত করে না এলে মদীনাবাসী তাকেই মদীনার প্রশাসক নিযুক্ত করতো। মূলত সে ছিল কাফিরের তুলনায় জঘন্য। কিন্তু তার বাইরের অবয়ব ছিল মুসলমানের মতো। ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান এবং মক্কার কুরাঈশদের সাথে তার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিলো। মদীনার মুসলমানদের সকল সংবাদ সে ইসলামের শত্রুদের হাতে উঠিয়ে দিয়ে মুসলমানদের ধ্বংসসাধন করার ব্যাপারে তৎপর ছিল। মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য এমন কোনো চেষ্টা নেই যা সে করেনি।
মদীনা থেকে মক্কার মুহাজির মুসলমানদের বের করে দেয়ার জন্য মদীনার আনসারদের সে উস্কানী দিয়েছে। হযরত আয়িশা (রা:) এর ওপরে সে অপবাদ দিয়েছে। নবী (সা:) এর সম্মুখে অপমানজনক কথা বলেছে। যুদ্ধের ময়দানে সে তার সাথীদের নিয়ে নবী (সা:) কে ত্যাগ করেছে। বিশ্বনবী (সা:) কে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে। হযরত উমার (রা:) এই লোকগুলোকে শায়েস্তা করার জন্য নবী (সা:) এর কাছে বারবার অনুমতি প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু দয়ার সাগর আল্লাহর রাসূল (সা:) তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। এমনকি সে মারা গেলে তিনি তাঁর নিজের শরীরের পবিত্র জামা দিয়েছেন কাফনের জন্য।
আবু বাসরাহ নামক একজন কাফির নবী (সা:) এর ঘরে মেহমান হলো। গোটা পরিবারের জন্য রাতের খাবার যা ছিল আবু বাসরাহ তা খেয়ে শেষ করে দিলো। নবী (সা:) স্বয়ং এবং তাঁর পবিত্রা স্ত্রীগণ রাত অনাহারে কাটিয়ে দিলেন। (মুসনাদে ইবনে হাম্বল)
বিশ্বনবীর সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা:) হিজরতকালে পবিত্র মক্কা থেকে মদীনায় আসার সময় তাঁর মা'কেও সাথে করে এনেছিলেন। তাঁর মায়ের নাম ছিল হযরত মাইমুনাহ অথবা উমাইমাহ (রা:)। কিন্তু তিনি তাঁর সন্তান আবু হুরায়রা (রা:) এর সাথে যখন মদীনায় এসেছিলেন তখন পযর্ন্ত তিনি ইসলাম কবুল করেননি। সন্তান আবু হুরায়রা (রা:) যখন অল্পবয়স্ক বালক সে সময় তিনি বিধবা হন। তারপর তিনি আর বিয়ে করেননি। সন্তানকে নিয়ে তিনি অত্যন্ত দুঃখ কষ্টের মধ্যে দিন পার করতেন। এ কারণে হযরত আবু হুরায়রা (রা:) মায়ের প্রতি খুবই অনুগত ছিলেন।
সন্তান ইসলাম কবুল করেছিল, এ জন্য তাঁর মা মনের দিক দিয়ে চরম অসন্তুষ্ট ছিলেন। মা ইসলাম গ্রহণ করছে না- শিরকের কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে, এ কারণে হযরত আবু হুরায়রা (রা:) প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণায় ছিলেন। প্রায়ই তিনি তাঁর মা'কে ইসলাম সম্পর্কে বুঝাতেন। তাঁর মা ইসলামের নাম শুনলেই ভীষণ রেগে উঠতেন। বিশেষ করে বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা:) এর পবিত্র নাম মুবারক তাঁর কানে যাওয়া মাত্র তিনি জ্বলে উঠতেন।
এভাবে একদিন হযরত আবু হুরায়রা (রা:) তাঁর মা'কে ইসলাম এবং বিশ্বনবী (সা:) সম্পর্কে বুঝাচ্ছিলেন। তাঁর মা কোনো কথাই শুনতে ইচ্ছুক ছিলেন না। এমনকি সেদিন তিনি বিশ্বনবী (সা:) সম্পর্কে কটুক্তি করে সন্তানকে প্রহার করলেন। মা মেরেছে- এ কারণে আবু হুরায়রা (রা:) এর মনে সামান্য প্রতিক্রিয়া ছিল না। কিন্তু বিশ্বনবী (সা:) সম্পর্কে কটুক্তি তিনি সহ্য করতে পারলেন না। মনে প্রচণ্ড আঘাত পেলেন। তাঁর দু'চোখ দিয়ে পানির ধারা নেমে এলো।
তিনি কাঁদতে কাঁদতে দরবারে রেসালাতের দিকে রওয়ানা দিলেন। আল্লাহর হাবিব দেখলেন তাঁর প্রিয় সাহাবী আবু হুরায়রা কাঁদতে কাঁদতে তাঁর কাছে আসছে। কাছাকাছি এলে তিনি জানতে চাইলেন, আবু হুরায়রা! তুমি কাঁদছো কেনো?
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) ঘটনা বর্ণনা করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা আমাকে মেরেছে।
আল্লাহর রাসূল (সা:) বললেন, মা মেরেছে আর তুমি আমার কাছে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করছো? তোমার মা মেরেছে তা আমি কি করতে পারি?
আবু হুরায়রা (রা:) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! মা মেরেছে আমি সে কারণে কোনো অভিযোগ করছি না। আমার মনে বড়ই যন্ত্রণা, আমার মা এখনও ইসলাম কবুল করলেন না! আপনি দোয়া করুন, আমার মা যেন ইসলাম কবুল করেন।
আল্লাহর নবী (সা:) তৎক্ষণাত দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আপনি আবু হুরায়রার মা'কে হেদায়েত করুন।
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) নিজের বাড়ির দিকে দ্রুত ছুটলেন। পথে লোকজন তাকে ধরলো, আপনি এমন করে ছুটে যাচ্ছেন কেনো?
তিনি জবাব দিলেন, আমাকে যেতে দাও, আমি দেখতে চাই! আমি বাড়িতে পৌঁছানোর আগে আমার নবীর দোয়া পৌঁছলো কি না!
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বাড়িতে গিয়ে দেখলেন, বাড়ির দরোজা বন্ধ। তিনি অনুভব করলেন তাঁর মা গোছল করছেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর মা বের হয়ে এসে সন্তানকে বললেন, হে আমার সন্তান! তুমি সাক্ষী থেকো, আমি আল্লাহ এবং তার রাসূলের ওপর ঈমান আনলাম।
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন, এবার তাঁর চোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু নির্গত হলো। তিনি আবার ছুটে গেলেন দরবারে নববীতে। আনন্দে বিগলিত হয়ে জানালেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনার দোয়া কবুল করেছেন, আমার মা ঈমান এনেছেন।
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) এর সাথে তাঁর মায়ের এক অপূর্ব সম্পর্ক ছিল। একদিন তিনি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত ছিলেন। পেটে ক্ষুধার যন্ত্রণা নিয়ে তিনি নবীর দরবারে এলেন। এ সময় সেখানে আরো কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। আল্লাহর নবী (সা:) তাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি এখানে কিভাবে এলে?
তিনি জবাব দিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! প্রচণ্ড ক্ষুধা আমাকে এখানে টেনে এনেছে।
নবী করীম (সা:) খেজুরের কাঁদি আনালেন এবং উপস্থিত সবার হাতে দু'টো করে দিয়ে বললেন, এই খেজুর দু'টো খাও এবং তারপর পানি পান করো। এই দু'টো খেজুরই আজকের জন্য তোমাদের যথেষ্ট হবে।
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) একটি খেজুর খেলেন এবং অন্যটি রেখে দিলেন। বিষয়টি নবী করীম (সা:) দেখেছিলেন। তিনি জানতে চাইলেন, আবু হুরায়রা! খেজুর রেখে দিলে কেনো?
তিনি লাজনম্র কন্ঠে জবাব দিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মায়ের জন্য রেখেছি। আল্লাহর নবী (সা:) বললেন, তুমি খেয়ে নাও, আমি তোমার মায়ের জন্য আরো দু'টো খেজুর দিচ্ছি।
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) খেজুর খেলেন। নবী (সা:) তাঁকে আরো দু'টো খেজুর দিলেন তাঁর মায়ের জন্যে। হযরত আবু বকর (রা:)-এর মেয়ে হযরত আসমা (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা:) এর যুগে আমার অমুসলিম মা আমার কাছে আসলেন। আমি তখন নবী (সা:) এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, 'আমি কি আমার মায়ের সাথে রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয়তার ব্যবহার করবো? আল্লাহর নবী (সা:) বললেন, 'অবশ্যই করবে'।
ইবনে উয়াইনা (রা:) বলেন, আল্লাহ তা'য়ালা তারই ব্যাপারে এই আয়াত নাজিল করেন, 'আল্লাহ তা'য়ালা তোমাদেরকে এমন লোকদের সাথে রক্ত সম্পর্ক অনুযায়ী ব্যবহার করতে নিষেধ করছেন না, যারা তোমাদের সাথে দ্বীনের ব্যাপারে যুদ্ধ করে না। (বুখারী)
এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন-
لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّيْنِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِّنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوْهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ ط إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ إِنَّمَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قَاتَلُوكُمْ فِي الدِّيْنِ وَأَخْرَجُوكُم مِّنْ دِيَارِكُمْ وَظَاهَرُوا عَلَى إِخْرَاجِكُمْ أَنْ تَوَلَّوْهُمْ ج وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং কখনো তোমাদের নিজেদের বাড়িঘর থেকেও বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি দয়া দেখাতে ও তাদের সাথে ন্যায় আচরণ করতে আল্লাহ তা'য়ালা কখনো নিষেধ করেন না; অবশ্যই আল্লাহ তা'য়ালা ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন। আল্লাহ তা'য়ালা কেবল তাদের সাথেই বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেছে এবং (একই কারণে) তোমাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে দিয়েছে এবং তোমাদের উচ্ছেদ করার ব্যাপারে একে অন্যকে সাহায্য সহযোগিতা করেছে, (এরপরও) যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে তারা অবশ্যই জালিম। (সূরা মুমতাহিনা-৮-৯)
মুসলমানদের যারা ধ্বংস করে দিতে চায় এবং এই কুকর্মে যারা সাহায্য সহযোগিতা করে তাদের সাথে কোনো ধরনের সম্পর্ক রাখা যাবে না। যারা সম্পর্ক রাখবে তারাই আল্লাহ তা'য়ালার দৃষ্টিতে জালিম হিসাবে পরিচিতি লাভ করবে। মহান আল্লাহর এই কথা শুধু নিজের দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়- সমগ্র বিশ্বের যে কোনো দেশের মুসলমানদের সাথে যদি কোনো অমুসলিম রাষ্ট্র অন্যায় ব্যবহার করে, তাদের সাথে শত্রুতা করে, তাদের রক্ত ঝরায় তাহলে সে সকল রাষ্ট্র ও অমুসলিম নেতৃবৃন্দের সাথে যদি কোনো মুসলিম নামধারী নেতা সম্পর্ক রাখে, আল কুরআনের দৃষ্টিতে সে অবশ্যই জালিম।
কিন্তু অমুসলিমের সাথে অকারণে কোনো ধরনের খারাপ আচরণ করা যাবে না। তাদের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা ইসলাম স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করেছে। শুধু হারামই ঘোষণা করেনি, আল্লাহর নবী (সা:) বলেছেন, যে মুসলমান কোনো অমুসলিমকে কষ্ট দেয় বা যন্ত্রণা দেয় সে যেন আমাকে যন্ত্রণা দিল। আর যে লোক আমাকে জ্বালা-যন্ত্রণা দিল, সে যেন মহান আল্লাহকে যন্ত্রণা কষ্ট দিল। (তাবারাণী)
বিশ্বভ্রাতৃত্বের বাণী বাহক আল্লাহর নবী করীম (সা:) স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, 'যদি কোনো মুসলমান কোনো অমুসলিমকে কষ্ট দেয় তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে আমি আল্লাহ তা'য়ালার আদালতে মামলা দায়ের করবো। আর আমি যার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবো কিয়ামতের দিন আমি আল্লাহ তা'য়ালার আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলায় লড়াই করবো। (আল খতীব)
আল্লাহর নবী (সা:) বসেছিলেন। লোকজন একটি লাশ নিয়ে যাচ্ছে দেখে তিনি দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন। সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে জানালেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! ওটা তো ইয়াহূদীর লাশ, আপনি সে লাশের সম্মানে দাঁড়ালেন?'
মানবতার নবী (সা:) বললেন, 'কেনো, ইয়াহুদী কি মানুষ নয়!'
হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা:) বর্ণনা করেন, একদিন আমাদের পাশ দিয়ে একটি জানাযা যাচ্ছিলো। তা দেখে নবী করীম (সা:) উঠে দাঁড়ালেন, তখন আমরাও দাঁড়িয়ে গেলাম। পরে আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! এটা তো একজন ইয়াহূদীর লাশ। তিনি বললেন, তোমরা যখনই কোনো জানাযা দেখবে তখনই দাঁড়িয়ে যাবে। (বুখারী হাদীস নং ১২২৬)
হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আবু লাইলা (রা:) বর্ণনা করেন, সহল ইবনে হুনাইফ এবং কায়েস ইবনে সা'য়াদ কাদেসিয়াহ নামক এক স্থানে বসেছিলেন। এমন সময় তাঁদের পাশ দিয়ে একটি জানাযা যাচ্ছিলো, তা দেখে উভয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। কেউ তাঁদেরকে বললো, এ হচ্ছে যিম্মির (অমুসলিমের) জানাযা। তাঁরা বললেন, একদিন নবী, করীম (সা:) এর পাশ দিয়ে একটি জানাযা যাচ্ছিলো। তা দেখে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ তাঁকে বলেছিলো যে, এ তো ইয়াহূদীর জানাযা। তার উত্তরে তিনি বলেছিলেন, তবে সেটা কি মানবদেহ নয়? (বুখারী হাদীস নং ১২২৭)
একমাত্র ইসলামই অসাম্প্রদায়িক আদর্শ, যে আদর্শে মানুষকে মানুষ হিসেবেই সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া পৃথিবীতে এমন কোনো আদর্শ নেই, তথাকথিত ধর্ম নেই যেখানে সাম্প্রদায়িকতা নেই। ইসলাম ব্যতীত সাম্প্রদায়িকতামুক্ত কোনো আদর্শ পৃথিবীতে নেই।
তিরমিজী শরীফের একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, একজন কাফির নবী করীম (সা:) এর মেহমান হলো। তিনি লোকটির সামনে ছাগলের দুধ পেশ করলেন। লোকটি দুধ পান করলো। এভাবে সে সাতটি ছাগলের দুধ পান করলো। বিশ্বনবী (সা:) সামান্যতম বিরক্তি প্রকাশ করলেন না। পরের দিন সকালে সে ইসলাম কবুল করলো। মুসলিম অবস্থায় সে একটি ছাগলের দুধের অধিক দুধ পান করতে পারলো না। বিশ্বনবী (সা:) যখন অসীম ক্ষমতাধর, তখনও তাঁকে অমুসলিমরা গালাগালি দিয়েছে, তাঁর বাড়িতে এসে তাঁকে নানাভাবে কষ্ট দিয়েছে, তিনি তাদের কল্যাণের জন্য দোয়া করেছেন কিন্তু কখনো সামান্য বিরক্তি প্রকাশ করেননি।
ইসলাম তখন সমগ্র আরব শাসন করছে। মসজিদে নববী থেকে বিশ্বনবী (সা:) রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। সেই মাসজিদে নববীর সম্মানিত মুয়াজ্জিন হযরত বিলাল (রা:)। যিনি বিশ্বনবী (সা:) এর পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতেন। তদানীন্তন বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন একটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পারিবারিক ব্যয় নির্বাহের জন্য তাঁকে অমুসলিমদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হতো। নবী পরিবারের খরচ চালানোর জন্য তিনি এক পৌত্তলিকের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করেছিলেন।
ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত সময় তখন পর্যন্ত আসেনি। হযরত বিলাল (রা:) সবেমাত্র আজান দেয়ার জন্য দাঁড়িয়েছেন। এমন সময় সেই পৌত্তলিক এসে বিদ্রুপ করে হযরত বিলাল (রা:) কে বললো, হে কালো মায়ের সন্তান!
ইচ্ছা করলে তৎক্ষণাত সে পৌত্তলিকের দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দেয়া যেত। কিন্তু বিশ্বনবী (সা:) এর আদর্শের অনুসারী হযরত বিলাল বিনয়ের সাথে জবাব দিলেন, আমি উপস্থিত, আমাকে কিছু বলবে?
নির্লজ্জ লোকটি উদ্যতভাবে বললো, আমার পাওনা পরিশোধ করার আর মাত্র কয়েকটি দিন বাকী আছে। যথা সময়ে আমার পাওনা যদি পরিশোধ না করো, তাহলে তোমাকে দিয়ে আমি ছাগল চরিয়ে নেব।
হযরত বিলাল (রা:) এর মন বড় খারাপ হয়ে গেল। তিনি ইশার নামাজ আদায় করে নবী করীম (সা:) কে ঘটনা জানালেন। ঋণ পরিশোধ করার পূর্বদিন রাতে তিনি নবী (সা:) কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আগামী কাল তার ঋণ পরিশোধের দিন। এদিকে ঘরে কিছুই নেই। সেই লোকটি এসে আমাকে অপমান করবে। আপনি আমাকে অনুমতি দিন, আমি কোথাও চলে যাই। তারপর ঋণ পরিশোধ করার মতো ব্যবস্থা হলে আমি ফিরে আসবো।
নবী করীম (সা:) কোনো মন্তব্য করলেন না। হযরত বিলাল (রা:) তাঁর সামান্য জিনিসপত্র বেঁধে মাথার কাছে নিয়ে রাতে ঘুমিয়ে পড়লেন। ফজরের নামাজ আদায় করে তিনি বের হয়ে যাবার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। এমন সময় রাসূল (সা:) এক লোকের মারফত বিলাল (রা:) এর কাছে সংবাদ প্রেরণ করলেন। তিনি রাসূলের ঘরের সামনে গিয়ে দেখলেন, খাদ্য-শস্য বোঝাই চারটি উট দাঁড়িয়ে রয়েছে। নবী করীম (সা:) তাঁকে বললেন, বিলাল, আল্লাহ তা'য়ালার শোকর আদায় করো। ফদকের সর্দার এগুলো প্রেরণ করেছে। এগুলো বিক্রি করে ঋণ আদায় করো।
হযরত বিলাল (রা:) সেগুলো বিক্রি করে সকল ঋণ পরিশোধ করে নবী করীম (সা:) এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সকল ঋণ আদায় করা হয়েছে। (আবু দাউদ)
একবার একজন ইয়াহুদী মদীনার বাজারে প্রকাশ্যে ঘোষনা করলো, ঐ মহান আল্লাহর শপথ! যিনি সকল নবীদের মধ্যে আমাদের নবী হযরত মুসা (আ:) কে অধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন।
একজন সাহাবী এ কথা শুনে বললো, নবী করীম (সা:) এর চেয়েও কি অধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন?
ইয়াহুদী বললো, অবশ্যই বেশি মর্যাদা প্রদান করেছেন。
এ কথা শুনে সাহাবী রাগে অধির হয়ে ইয়াহুদীর গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিল। ইয়াহুদী বেচারীর চোখ থেকে পানি বের হয়ে এলো। সে জানতো নবী মুহাম্মাদ (সা:) এর কাছে এই নালিশ জানালে তিনি ন্যায় বিচার করবেন। ইয়াহুদী এসে নবী করীম (সা:) এর কাছে ঘটনা জানালো। বিশ্বনবী (সা:) উক্ত সাহাবীকে শাসন করেছিলেন। (বুখারী)
একজন ইয়াহূদীর সন্তান অসুস্থ হয়েছে, তদানীন্তন পরাশক্তি বিশাল ইসলামী রাষ্ট্রের অধিপতি এ সংবাদ পেয়ে সেই ইয়াহূদীর সন্তানকে দেখতে গেলেন। স্বয়ং রাষ্ট্রপতি তার অসুস্থ সন্তানকে দেখতে এসেছেন! ইয়াহুদী অবাক হয়ে গেল। নবী করীম (সা:) সেই অসুস্থ সন্তানকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানালেন। সন্তান তার পিতার মুখের দিকে তাকালো। পিতা সন্তানকে ইশারা দিলেন, নবী যেদিকে তোমাকে ডাকছে তুমি সেদিকে যাও। ইয়াহুদীর অসুস্থ সন্তান ইসলাম গ্রহণ করলো। (বুখারী)
ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানগণ নবীর দরবারে এসেছে, তিনি তাদেরকে মসজিদে নববীতে স্থান দিয়েছেন। তারা নিজের প্রথা অনুযায়ী সেই মাসজিদের ভেতরেই তাদের ধর্ম পালন করেছে। সাহাবায়ে কেরাম বাধা দিতে চেয়েছেন। কিন্তু নবী করীম (সা:) তাদেরকে বলেছেন, বাধা দিও না। (মুসলিম)
বিশ্বনবী (সা:) খিষ্টান ও ইয়াহুদীদেরকে কোন্ দৃষ্টিতে দেখতেন ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করুন। মদীনার সিনাই পাহাড়ের কাছে (Saint Catharin) সেন্ট ক্যাথারিন নামক মঠের ধর্ম যাজকদেরকে লিখিত সনদ দান করেছিলেন। এই সনদে তাদেরকে নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা দান করে আদেশ জারি করেছিলেন, কোনো মুসলমান খৃষ্টানদের সাথে এই সনদের বিপরীত কোনো কাজ করলে তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে।
বিশ্বনবী (সা:) ঘোষণা করেছিলেন, তারা সাহায্য প্রার্থী হলে অবশ্যই সাহায্য করতে হবে। তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর গ্রহণ করা যাবে না। তাদের ওপরে শক্তি প্রয়োগ বা কোনো ধরনের লোভ লালসা দেখিয়ে ধর্ম ত্যাগ করানো যাবে না। তাদের কোনো ধর্ম নেতাকে তার পদ থেকে অপসারণ করা যাবে না। কোনো তীর্থযাত্রীকে বাধা প্রদান করা যাবে না। কোনো ধর্মনেতাকে তার মঠ থেকে বিতাড়ন করা যাবে না। কোনো গির্জা ধ্বংস করে সেখানে কোনো মুসলমান কিছু করতে পারবে না। তাদের ধর্ম তারা স্বাধীনভাবে পালন করবে।
নবী করীম (সা:) এর এই সনদ সম্পর্কে ঐতিহাসিক আমীর আলী বলেন, It is a monument of enlightened tolerance. অর্থাৎ এই সনদ অসাধারণ পরধর্মসহিষ্ণুতার কীর্তি স্তম্ভস্বরূপ।
অমুসলিম লেখকগণ বিশ্বনবী (সা:) এর প্রতি যে অভিয়োগ করেছে, মুহাম্মাদ (সা:) তাঁর প্রতিপক্ষের সাথে সদ্ব্যবহার করেছেন সত্য কথা। কিন্তু তিনি ঐ পর্যন্ত সদ্ব্যবহার করেছেন, যখন তিনি ছিলেন দুর্বল অসহায়, একেবারে ক্ষমতাহীন। যখনই তিনি ক্ষমতা হাতে পেলেন, তখন তাঁর আসল রূপ প্রকাশ পেল, শত্রুদের ওপরে তিনি নির্মমভাবে আঘাত করলেন। (নাউযুবিল্লাহ) এ সকল কথা সত্যের চরম অপলাপ বৈ আর কিছু নয়। হিংসা বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে তারা এ ধরনের বহু কষ্ট কল্পনা করেছেন।