📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 যুদ্ধ বন্দীদের প্রতি নবী করীম (সা:) এর সীরাত

📄 যুদ্ধ বন্দীদের প্রতি নবী করীম (সা:) এর সীরাত


হুনাইনের প্রান্তরে মুসলিম বাহিনীর কাছে পরাজিত ইসলামের শত্রুদের কয়েক হাজার বাহিনী আওতাস নামক স্থানে এসে জমায়েত হয়েছিল। নবী করীম (সা:) দুশমনদের মুকাবেলায় হযরত আবু আমের আশয়ারী (রা:) কে কিছু সৈন্যসহ প্রেরণ করলেন। তিনি আওতাস নামক স্থানে পৌঁছার পর প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হলো। হযরত আবু আমের (রা:) প্রতিপক্ষের হাতে শাহাদাত বরণ করলেন। এমনকি তাঁর হাতের পতাকা শত্রুদের হাতে চলে গেল।

হযরত আবু আমের (রা:) এর চাচাত ভাই হযরত আবু মুসা আশয়ারী (রা:) এগিয়ে গিয়ে শত্রু পক্ষের ওপরে তীব্র আক্রমন করলেন। শত্রুপক্ষ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো। মুসলমানদের হাতে প্রচুর গণীমাতের সম্পদ জমা হলো। বহু সংখ্যক বন্দীও হলো। এই বন্দীদের মধ্যে নারী এবং শিশুও ছিল। হযরত হালিমা তুসসাদিয়া (রা:) এর বড় মেয়ে সায়মাও বন্দী হলেন, তিনি ছিলেন নবী করীম (সা:) এর দুধবোন। তাঁকে যখন বন্দী করা হয় তখন তিনি বলেছিলেন, 'আমি তোমাদের নবী মুহাম্মাদ (সা:) এর দুধবোন। আমি তাঁকে শিশুকালে কোলে রাখতাম'।

এ কথা শোনার পরে সাহাবায়ে কেরাম তাঁর কথার সততা প্রমাণের জন্য তাঁকে সম্মানের সাথে নবীর দরবারে উপস্থিত করলেন। সায়মা আল্লাহর রাসূলের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে বললো, 'হে মুহাম্মাদ (সাঃ)! আমি আপনার দুধবোন। আপনি যখন শিশু ছিলেন তখন আপনাকে আমি কোলে রাখতাম'।

মানবতার মহান মুক্তিদূত বিশ্বনবী (সা:) পলকহীন দৃষ্টিতে সায়মার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, তাঁর পবিত্র চোখ দু'টোয় অশ্রু টলমল করছে। স্মৃতিতে ভেসে উঠলো স্নেহময়ী দুধমাতা হযরত হালিমার কথা। আল্লাহর নবী উঠে দাঁড়িয়ে দুধবোন সায়মাকে সম্মান প্রদর্শন করলেন। শ্রদ্ধেয়া বড় বোনকে রেসালাতে নববীর পাশে বসার জন্য নিজের চাদর মুবারক বিছিয়ে দিলেন। নবী করীম (সা:) মমতা জড়ানো কণ্ঠে সায়মার কুশলাদি জানলেন। বোন সায়মা অবাক হয়ে শিশুকালে যাকে কোলে রাখতেন আর তাঁর প্রশংসা এবং দোয়া করে কবিতা পাঠ করতেন তাঁকে প্রাণভরে দেখলেন।

বিশ্বনবী (সা:) এর শিশুকালে সায়মা ছিলেন বয়সে কিশোরী। তিনিই শিশুনবীকে কোলে নিয়ে ঘুরতেন। শিশুনবীকে তিনি আদর করতেন আর কবিতা আকারে বলতেন, 'আমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ (সা:) জীবিত থাক। সে সুন্দর সুঠামদেহী বলিষ্ঠ যুবক হোক, আমরা তাকে দু'নয়নভরে দেখবো। নেতা হয়ে সে যেন ইয়েমেন নিজের অধিকারে নিতে পারে। তাঁর সাথে যারা শত্রুতা করবে তাদের যেন মঙ্গল না হয়। হে আল্লাহ, তাঁকে অসীম সম্মানের অধিকারী করে দাও'।

বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়লেন সায়মা। তাঁর সেই কিশোরী বয়সের প্রার্থনা মহান আল্লাহ কবুল করেছিলেন! তাঁর দুধভাই আজ আল্লাহর নবী, বিপুল ক্ষমতা এবং অতুলনীয় মর্যাদার অধিকারী। তাঁর দুধভাই তাকে ভুলে যাননি। নবী করীম (সা:) পরম মমতায় তাঁর বোনকে বললেন, 'বোন, তোমার যদি মন চায় তাহলে আমার কাছে বসবাস করতে পারো। আর যদি তুমি তোমার বাড়িতে ফিরে যেতে চাও তাহলে আমি তোমাকে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করছি'।

সায়মা নিজের পরিবার-পরিজনের কাছেই ফিরে যাবার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। আল্লাহর নবী (সা:) উপঢৌকন দিয়ে সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে দুধবোনকে যথাস্থানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলেন। শৈশবে যারাই নবী (সা:) কে স্নেহ-মমতা প্রদর্শন করেছে তিনি তাদেরকে অসীম শ্রদ্ধা করতেন এবং তাদের প্রতি তাঁর কর্তব্যবোধের কথা স্মরণ রাখতেন।

মানবতার শত্রু আবু লাহাবের দাসী সুয়ায়বার দুধ তিনি শিশুকালে কয়েক দিন পান করেছিলেন, এ কারণে সে জীবিত থাকা পর্যন্ত নবী করীম (সা:) তাঁর প্রতি যত্নের দৃষ্টি রেখেছেন, তেমনি হযরত হালিমার প্রতিও তিনি তাঁর কর্তব্য পালনে ছিলেন সজাগ। মক্কা ছেড়ে নবী করীম (সা:) যখন মদীনায় হিজরত করেছিলেন তখনও তিনি তাঁর দুধ মা সুয়ায়বার জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় ও অর্থ প্রেরণ করতেন। হযরত খাদিজার (রা:) এর সাথে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হবার পরে হযরত হালিমা রাসূল (সা:) এর কাছে এসেছিলেন। তাঁকে দেখেই তিনি নিজের পবিত্র শরীরের চাদর বিছিয়ে বসতে দিচ্ছিলেন আর বলছিলেন, 'আসুন আমার আম্মা আসুন!'

হযরত হালিমা (রা:) আল্লাহর নবীকে জানালেন, 'আমাদের অঞ্চলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ বিরাজ করছে এবং সে কারণে আমাদের পশু সম্পদ সব নিঃশেষ হয়ে গেছে'। দুধ মায়ের মুখে অভাবের কথা শুনে তিনি ৪০ টি ছাগল এবং একটি উটের ওপরে নানা ধরনের সামগ্রী দিয়ে দিলেন। ঐতিহাসিকগণ বলেছেন, হুনাইনের যুদ্ধের সময় নবীর দুধমাতা তাঁর কাছে যখন এসেছিলেন সে সময় রাসূল (সা:) নিজের পবিত্র চাদর বিছিয়ে তাকে বসতে দিয়েছিলেন। হযরত হালিমা (রা:) আল্লাহর নবীর কাছ থেকে শুনে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর কাছ থেকে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর (রা:) রেওয়ায়েত করেছেন। (ইবনুল বার-আল্ ইস্তিয়াব)

বনী সাআদ ছিল হাওয়াজেন গোত্রের একটি শাখা। সে সময় হাওয়াজেন গোত্রের খ্যাতি ছিল যে, তারা স্পষ্ট উচ্চারণে আরবী ভাষা বিশুদ্ধভাবে বলে থাকে। ইবনে সাআদ উল্লেখ করেছেন, বিশ্বনবী (সা:) বলেছেন, 'আমি তোমাদের মধ্যে উত্তম বিশুদ্ধ ভাষী। কারণ আমি কুরাইশ বংশের লোক এবং আমার ভাষা হচ্ছে হাওয়াজেন গোত্রের ভাষা'।

নবী করীম (সা:) যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন না। যদি তাদেরকে মুক্ত করার জন্য তাদের আত্মীয়-স্বজন আসে, এ জন্য তিনি কিছুদিন অপেক্ষা করলেন। অশেষে হাওয়াজেন গোত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এসে নবী করীম (সা:) এর কাছে করুণ আবেদন জানালো, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমরা ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছি কিন্তু আমাদের অপরাধ সীমাহীন। আপনি আমাদের অপরাধের দিকে অনুগ্রহ করে দৃষ্টি দিবেন না। আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের মা-বোন ও সন্তানদের ফেরৎ দিন'।

যারা বন্দীদের মুক্ত করতে এসেছিল তারা সকলেই ছিল হযরত হালিমা (রা:) এর গোত্রের। এই গোত্রের নেতা জুহায়ের ইবনে সুরাদ (রা:) আবেদন করলেন, 'বন্দীদের মধ্যে আপনার দুধমাতার আত্মীয়-স্বজন অর্থাৎ আপনার খালা, ফুফুগণ রয়েছেন। মহান আল্লাহর শপথ! আরবের রাজা-বাদশাহর মধ্যে কেউ যদি আমাদের বংশের কারো দুধপান করতো, তাহলে তার কাছে আমরা অনেক কিছুই আবদার করতে পারতাম। পক্ষান্তরে আমরা আপনার কাছে আমাদের প্রত্যাশা সবথেকে বেশি'। তাদের আরেকজন আবেদন জানালো, 'শিশুকালে আপনি আমাদের মাঝেই পালিত হয়েছেন। আজ আপনার অতুলনীয় মর্যাদা! শৈশবের কথা স্মরণ করে আপনার দুধমাতার আত্মীয়দের মুক্তি দিন'।

তাদের কথা শুনে শৈশবের স্মৃতি এসে নবী করীম (সা:) কে নাড়া দিয়ে গেল। তিনি তাদেরকে একদিন অপেক্ষা করতে বললেন। সাহাবায়ে কেরামের সাথে তিনি পরামর্শ করে বললেন, 'আমার গোত্রের যে দাবী আছে বন্দীদের ওপর আমি তা ত্যাগ করছি'। রাসূল (সা:) এর কথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম জানালেন, 'আমরাও বন্দীদের প্রতি আমাদের দাবী ত্যাগ করছি'।

দুইজন অমুসলিম তাদের দাবী ছাড়লো না। নবী করীম (সা:) তাদেরকে বললেন, 'তোমরা তোমাদের দাবী ত্যাগ করো, তোমাদের যা প্রাপ্য আমি আদায় করবো। আমিই তোমাদের প্রাপ্য শোধ করবো'।

আল্লামা শিবলী (রাহ:) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা:) হাওয়াজেন গোত্রের লোকদেরকে বলেছিলেন, 'আমি আমার গোত্রের লোকদের নির্ধারিত অংশ ত্যাগ করতে পারি। তোমরা এমন করতে পারো, নামাজ আদায় শেষে সমবেত লোকদের সামনে তোমাদের আবেদন পেশ করো'।

তাঁরা রাসূল (সা:) এর পরামর্শ অনুযায়ী যুহরের নামাজ শেষে আবেদন করলে নবী করীম (সা:) নিজের গোত্রের অধিকার ত্যাগ করার কথা ঘোষণা করেন। তাঁর ঘোষণা শুনে সকল সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের অধিকার ত্যাগের ঘোষণা দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রায় ছয় হাজার নারী, শিশু, বালক-বালিকা মুক্তি লাভ করেছিল। এতগুলো মানুষকে দীর্ঘ প্রায় এক মাস প্রতিপালন করতে গিয়ে মুসলমানদের প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়েছিল। নবী করীম (সা:) কোনো বিনিময় গ্রহণ করলেন না। শুধু তাই নয়, প্রতিটি বন্দীকে নতুন পোষাক দিয়ে তিনি বিদায় করেছিলেন। পৃথিবীতে যুদ্ধ বন্দীদের প্রতি এমন অপূর্ব ব্যবহার অন্য কোনো জাতির ইতিহাসে নেই। আধুনিক যুগের গণতন্ত্রের দাবীদাররা সম্পদের লোভে শুধু ভিন্ন দেশ দখলই করছে না, দেশ দখলে যেসকল দেশ প্রেমিকগণ বাধা দিয়েছে, যুদ্ধবন্দীর নামে তাদেরকে গ্রেফতার অবর্ণনীয় নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করছে। এরাই লুণ্ঠিত সম্পদ ব্যবহার করে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে সমগ্র পৃথিবীব্যাপী অপপ্রচার করছে।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী করীম (সা:) করুণার সিন্ধু

📄 নবী করীম (সা:) করুণার সিন্ধু


মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমগ্র সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা এবং একচ্ছত্র অধিপতি। আল্লাহ তা'য়ালা যা কিছুই সৃষ্টি করেছেন এসব সকল সৃষ্টির জন্যে তিনি যেমন পরম করুণাময় তেমনি তিনি যে মহান ব্যক্তিত্বকে সর্বশেষ ও বিশ্বনবী হিসাবে প্রেরণ করেছেন তাঁকেও তিনি সমগ্র সৃষ্টির জন্যে করুণা হিসাবেই প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রিয় নবীকে লক্ষ্য করে বলেছেন-

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ হে নবী, আমি আপনাকে সৃষ্টিকুলের 'জন্যে রহমত হিসাবে প্রেরণ করেছি। (সূরা আম্বিয়া-১০৭)

আক্ষরিক অর্থেই নবী করীম (সা:) ছিলেন সমগ্র সৃষ্টিকুলের জন্য করুণার মূর্ত প্রতীক তথা মহান আল্লাহর অসীম রহমত বিশেষ। মাতৃগর্ভে থাকাকালে পিতাকে হারিয়েছেন, শিশুকালে মমতাময়ী মা'কে হারিয়েছেন, মাত্র আট বছর বয়সে স্নেহদাতা দাদাকে হারিয়েছেন। পরম শ্রদ্ধেয় চাচা আবু তালেবের স্নেহের ছায়াতলে বড় হয়েছেন। তাঁর সারাটি জীবনই দুঃখ আর কষ্টের বাস্তব উপখ্যান। সকল দুঃখ তিনি ভোগ করেছেন, কিন্তু কখনো কাউকেই সামান্যতম কষ্ট দেননি। কাউকে আঘাত করা তো অনেক দূরের ব্যাপার, কারো প্রতি কখনো রূঢ় আচরণ করেননি। কখনো কটু কথা পবিত্র মুখে উচ্চারণ করেননি। কাউকে অভিশাপ বা বদদোয়া দেননি। অন্যের কষ্ট তিনি ভাগ করে নেননি বরং কষ্টের সবটুকুই তিনি নিজ কাঁধে উঠিয়ে অন্যকে ভারমুক্ত করে সকল কষ্ট লাঘব করেছেন।

নারী সমাজকে অমর্যাদা, ঘৃণা, লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের অতল গহ্বর থেকে উঠিয়ে মর্যাদার আসনে আসীন করে দিয়েছেন। ক্রীতদাসদের গোলামীর জিঞ্জির মুক্ত করে স্বাধীন করে দিয়েছেন। যুদ্ধবন্দীদের প্রতি করুণার বাহু বিছিয়ে দিয়েছেন। অভাবী দরিদ্রদের খাদ্য পৌঁছে দিয়ে নিজে অভুক্ত থেকেছেন। অবহেলিত বিধবাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন। ইয়াতিমদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করেছেন। রোগীর সেবা করেছেন এবং অসহায় মানুষের সহায় হয়েছেন। ছোটদের গভীর স্নেহের বাঁধনে বন্ধু বানিয়েছেন এবং বড়দের একান্ত সম্মানে আপুত করেছেন। জীবনের শত্রুকে হাতের নাগালে পেয়েও ক্ষমার অনুপম সাগরে সিক্ত করেছেন। অবলা প্রাণীর প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং অন্যদেরকেও প্রাণীর প্রতি মমতাপূর্ণ আচরণ করতে শিখিয়েছেন। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন। নবী করীম (সা:) এর এসব অতুলনীয় গুণ-বৈশিষ্টের বর্ণনা দিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন-

لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُوَلٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ فَإِنَّ تَوَلَّوْا فَقُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ ط عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ

(হে মানুষ,) তোমাদের কাছে তোমাদেরই মধ্য থেকে এক রাসূল এসেছেন, তোমাদের কোনোরকম কষ্ট ভোগ তাঁর কাছে দুঃসহ, তিনি তোমাদের একান্ত কল্যাণকামী, ঈমানদারদের প্রতি তিনি হচ্ছেন স্নেহপরায়ণ ও পরম দয়ালু। এরপরও যদি এরা (এমন একজন কল্যাণকামী রাসূলের কাছ থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে আপনি (তাদের খোলাখুলি) বলে দিন, আল্লাহ তা'য়ালাই আমার জন্যে যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত আর কোনো মাবুদ নেই; (সমস্যায় সঙ্কটে আমি তাঁর ওপরই ভরসা করি এবং তিনিই হচ্ছেন মহান আরশের একচ্ছত্র অধিপতি। (সূরা তাওবা-১২৮-১২৯)

মহান আল্লাহ তা'য়ালা অন্যান্য যেসকল নবী-রাসূল প্রেরণ করেছিলেন তাঁরা তাওদীদের দাওয়াত দিতে গিয়ে নিজ জাতি এমনকি সবথেকে নিকটতম লোকদের কাছ থেকেও অবর্ণনীয় নির্যাতন, নিপীড়ন ও লাঞ্ছনা সহ্য করেছেন। কিন্তু নির্যাতন যখন সকল সীমা অতিক্রম করেছে তখন কোনো কোনো নবী-রাসূল মহান আল্লাহর কাছে বদোয়া করতে বাধ্য হয়েছেন। যেমন হযরত নূহ (আ:) নিজ জাতির বিরুদ্ধে মহান আল্লাহর কাছে অভিযোগ করেছেন-

قَالَ نُوْحٌ رَّبِّ إِنَّهُمْ عَصَوْنِي وَاتَّبَعُوا مَنْ لَّمْ يَزِدْهُ مَالُهُ وَوَلَدُهُ إِلَّا خَسَارًا ج وَمَكَرُوا مَكْرًا كَبَّارًا ج

নূহ বললো, হে আমার মালিক, আমার জাতির লোকেরা আমার কথা অমান্য করেছে, (আমার বদলে) তারা এমন কিছু লোকের অনুসরণ করেছে যাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তাদের বিনাশই বৃদ্ধি করেছে, তারা সত্যের বিরুদ্ধে সাংঘাতিক ধরনের এক ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। (সূরা নূহ-২১-২২)

অবাধ্যতার চরম সীমা অতিক্রম করার পরে হেদায়াতের সকল আশা যখন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছে তখন হযরত নূহ (আ:) মহান আল্লাহর কাছে নিজ জাতির ধ্বংস কামনা করে আবেদন করেছেন-

وَقَالَ نُوْحٌ رَّبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا - إِنَّكَ إِنْ تَذَرْهُمْ يُضِلُّوا عِبَادَكَ وَلَا يَلِدُوا إِلَّا فَاجِرًا كَفَّارًا - رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَنْ دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ طَ وَلَا تَزِدِ الظَّالِمِينَ إِلَّا تَبَارَاعِ

নূহ (আরও) বললো, হে আমার মালিক, এ যমীনের অধিবাসী (যালিমদের) একজন (গৃহবাসী)-কেও তুমি (আজ শাস্তি থেকে) রেহাই দিয়ো না, (আজ) যদি তুমি এদের (শাস্তি থেকে) অব্যাহতি দাও, তাহলে এরা (পুনরায়) তোমার বান্দাদের পথভ্রষ্ট করে দেবে (শুধু তাই নয়), এরা (ভবিষ্যতেও) দুরাচার পাপী কাফির ছাড়া কাউকেই জন্ম দিবে না। হে আমার প্রতিপালক, তুমি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে তোমার ওপর ঈমান এনে যারা আমার (সাথে ঈমানের এই) ঘরে আশ্রয় নিয়েছে, এমন সব ব্যক্তিদের এবং সব ঈমানদার পুরুষ ও মহিলাদের ক্ষমা করে দাও, যালিমদের জন্যে চূড়ান্ত ধ্বংস ছাড়া কিছুই তুমি বৃদ্ধি করো না। (সূরা নূহ-২৬-২৮)

এবার নবী করীম (সা:), যাঁকে মহান আল্লাহ তা'য়ালা 'করুণার মূর্ত প্রতীক' হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন তাঁর জীবনের দিকে লক্ষ্য করি। নিজ জন্মস্থান মক্কায় অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শিয়াবে আবি তালেবে নির্যাতিত হলেন, তায়েফে গেলেন সেখানেও লোমহর্ষক নির্যাতনের শিকার হলেন। মদীনার জীবনে ওহূদ ও অন্যান্য স্থানে অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হলেন। মক্কায় পবিত্র কা'বা ঘরে তিনি নামাজে দাঁড়িয়েছেন, দুশমনরা তাঁর পবিত্র কন্ঠে রশি পেঁচিয়ে দু'দিক থেকে টেনে ধরেছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে চোখ দু'টো কোঠর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। নামাজে তিনি সিজদায় গিয়েছেন, উটের পচা নাড়িভূড়ি তাঁর মাথার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, তিনি যে পথ দিয়ে হেঁটেছেন সে পথে কাঁটা বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। ওহূদের ময়দানে দাঁত মুবারক শহীদ হয়েছে, তিনি রক্তাক্ত হয়েছেন। জীবনের এই চরম মুহূর্তেও তিনি নিজ জাতির জন্য আতঙ্কিত হয়েছেন, আল্লাহ তা'য়ালা তাদের ওপর গযব নাযিল করেন কিনা। এ আশঙ্কায় তিনি মহান মালিকের কাছে নিজ জাতির জন্যে দোয়া করেছেন-

اللَّهُمَّ اهْدِ قَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ

'হে আমার আল্লাহ, আমার জাতিকে হিদায়াত দাও, ওরা জানে না'।

অর্থাৎ আমি যে নবী, আমি ওদের কল্যাণকামী তা ওরা বুঝতে পারেনি, এ জন্যেই আমার প্রতি ওরা আঘাত করেছে। ওরা বুঝে না, তুমি ওদের ওপর গযব দিও না।

নবী করীম (সা:) মক্কা বিজয় করলেন। অত্যাচারী জালিমদের আঙ্গিনায় প্রতিশোধের খড়গ কৃপাণ নিয়ে তিনি এবং নির্যাতিত সাহাবায়ে কেরাম মক্কায় উপস্থিত হননি। এক সময় যারা ছিলেন জালিম অত্যাচারী তাদের আঙ্গিনায় করুণার সিন্ধু প্রবাহিত হলো। যারা তাঁকে হত্যা করার জন্য তাঁর ঘর পরিবেষ্টন করেছিল, তারাও সেদিন সেই করুণার সাগরে অবগাহন করার সুযোগ লাভ করলো। ইসলাম পূর্ব আরবে এক ঘৃণ্য প্রথা শতাব্দী ব‍্যাপী প্রতিষ্ঠিত ছিল, কোনো ব্যক্তি যদি নিহত হতো, তাহলে তার গোত্রের লোকজন মনে করতো যে, হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করা অবশ্য কর্তব্য। নিহত ব্যক্তির হত্যাকারীকে যদি তারা ধরতে না পারতো, তাহলে তার নাম পরিচয় তারা লিখে রাখতো। ক্ষেত্র বিশেষে তারা প্রতীজ্ঞা করতো, হত্যাকারীর মাথার খুলিতে তারা মদ পান করবে। বংশের লোকদেরকে তারা প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য অনুপ্রাণিত করতো। আরবদের বিশ্বাস ছিল, কেউ কাউকে হত্যা করলে সেই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ গ্রহণ না করলে নিহত ব্যক্তির আত্মা সাদা রংয়ের পাখি হয়ে পাহাড়-পর্বতে উড়তে থাকে আর বলতে থাকে, 'আমাকে পান করাও! আমাকে পান করাও!' আবার কারো ধারণা ছিল, যে ব্যক্তি নিহত হয় তার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করলে সে ঐ জগতে জীবিত থাকে। আর প্রতিশোধ গ্রহণ না করলে ঐ জগতে সে মরে যায়।

আবার কারো ধারণা ছিল, হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ না করলে নিহত ব্যক্তির কবর অন্ধকারে ছেয়ে থাকে। প্রতিশোধ গ্রহণ করা হলে তার কবর আলোকিত হয়। এই সকল অমূলক বিশ্বাসের কারণে যুদ্ধের আগুন কখনো নির্বাপিত হয়নি। এভাবে যুদ্ধ করা বা প্রতিশোধ গ্রহণ করা ছিল তাদের কাছে এক সম্মানজনক ব্যাপার।

বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে নবী করীম (সা:) ঘোষণা করলেন, 'এক আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক এবং অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আজ তিনি তাঁর অঙ্গিকার পূর্ণ করেছেন। তিনি তাঁর গোলামকে সাহায্য করেছেন এবং সত্যের শত্রুদেরকে স্তব্ধ করেছেন। সকল অহংকার এবং পূর্বের রক্তের বদলা, রক্তের বাঁধন সবই আমার পায়ের নীচে দলিত হলো। আজ এসব কিছুই আমার পায়ের নীচে কবর দিলাম'।

নবী করীম (সা:) তাঁর ভাষণের সমাপ্তিতে সামনে বিশাল জনসমুদ্রের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। তাঁর পবিত্র সুন্দর চোখ দু'টো যেন করুণার সিন্ধুর মতই হয়ে এলো। তিনি দেখলেন, ঐ লোকগুলো তাঁর মুখের দিকে আজ অসহায়ের মতই এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখের ভাষায় ফুটে উঠেছে অসহায়ত্ব আর ক্ষমার আকুতি।

নির্যাতিত নবী দেখছেন, ঐ তো-ঐ লোকগুলোর সাথেই তারা মিলে মিশে আজ একাকার হয়ে তাঁর সামনে বসে আছে, যে লোকগুলোকে সত্য গ্রহণের অপরাধে তারা জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপরে চিৎ করে শুইয়ে বুকের ওপর পাথর চাপা দিয়েছে। হযরত বিলাল (রা:) এর গলায় রশি বেঁধে কাঁটা ও পাথরের ওপর দিয়ে টেনে হিচড়ে নিয়ে গিয়েছে, বিলালের দেহের গোস্ত চামড়া ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়েছে। খাব্বাবের শরীরে এখনো সে ক্ষত দগদগ করছে। শিয়াবে আবু তালিবে দিনের পর দিন অনাহারে থাকতে বাধ্য করেছে। ঐ তো সেই লোকগুলো। অনাহারের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তাঁর প্রিয় খাদিজা ঐ যে ভেঙ্গে পড়লেন, তাঁর আশ্রয়দাতা চাচা আবু তালিব ভেঙ্গে পড়লেন, আর উঠতে পারলেন না। আবু জাহিলের সাথে মিলে সুমাইয়াকে যারা হত্যা করেছিল তারাও তো অবনত মস্তকে বসে আছে।

তাঁর প্রিয় চাচা হামজার কলিজা যারা চিবিয়ে ছিল, তারাও আছে। তাঁর গর্ভবতী মেয়ে যয়নবকে আঘাত করে উটের ওপর থেকে নীচে ফেলে গর্ভের সন্তানকে হত্যা করেছিল, তারাও বসে আছে। তাঁকে যারা সীমাহীন কষ্ট দিয়েছে তারাও মাথা নীচু করে বসে আছে। তাঁকে যারা হত্যা করার জন্য অগ্রসর হয়েছিল, তাঁর সেই প্রাণের শত্রুও অবনত মস্তকে বসে আছে। বদর ওহুদ খন্দকে যারা রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল, তারাও তাঁর সামনে বসে আছে।

বিশ্বনবী (সা:) তাদের দিকে তাঁর পবিত্র নয়নযুগল- করুণার সিন্ধু প্রবাহিত করলেন। তারপর গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করলেন, 'তোমাদের কি জানা আছে, আজ আমি তোমাদের সাথে কেমন ব্যবহার করবো?'

সমবেত অপরাধীগণ সমস্বরে বলে উঠলো, 'আপনি আমাদের সম্মানিত ভাই, আমাদের মর্যাদাবান ভাতিজা!'

করুণার সাগরে প্লাবন সৃষ্টি হলো। তরঙ্গের পরে তরঙ্গ আছড়ে পড়লো প্রাণের শত্রুদের ওপর। নবী করীম (সা:) মমতা সিক্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, 'আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আজ তোমরা সবাই মুক্ত'।

ইউরোপের লেখকদের চোখে এই দৃশ্য কি ধরা পড়েনি? আপনারা পরাজিত জাতির সাথে কি ধরনের আচরণ করেছেন এবং করেন, পৃথিবীবাসীর তা জানা আছে। যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে আমেরিকা হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে কি করেছে, পৃথিবীর মানুষ সে নৃশংস ঘটনা কি কখনো ভুলে যাবে? বিশ্বনবী (সা:) মক্কা বিজয় পর্যন্ত পৌঁছলেন, এর পেছনে কি তাঁর কোনো উচ্চাশা কার্যকর ছিল? আপনাদের একজন লেখক জোসেফ হেল বলেছেন, 'Thus Mohammad attained the summit of his ambition. অর্থাৎ এভাবে মুহাম্মাদ (সা:) তাঁর উচ্চাকাংখার চরম শিখরে উপনীত হন'।

ইসলাম বিদ্বেষী এ লোকটি কিভাবে নবী করীম (সা:) এর উচ্চাশার কথা বললেন, ভাবতে অবাক লাগে। আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব তিনি পালন করলেন মাত্র, এখানে উচ্চাকাংখা এলো কোত্থেকে? তিনি মক্কার লোকদের সাথে যে ব্যবহার করলেন, যে ভঙ্গিতে তিনি মক্কায় প্রবেশ করলেন, এগুলো কি একজন উচ্চাকাংখী মানুষের চারিত্রিক অলংকার? হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবু বকর (রা:) বলেন, 'আমি দেখলাম, রাসূল (সা:) বিজয়ী হতে যাচ্ছেন। এ সময়ে তিনি উটের ওপরে বসা অবস্থায় মহান আল্লাহর কাছে এতই কৃতজ্ঞশীল ছিলেন যে, তিনি মাথা নীচু করেছিলেন। তাঁর পবিত্র মাথা এতটাই নীচু হয়েছিল যে, তাঁর পবিত্র দাড়ি মোবারক উটের পিঠ স্পর্শ করছিলো'। একজন উচ্চাকাংখা পোষণকারী ব্যক্তি বিজিত এলাকায় কখনো এই ভঙ্গীতে প্রবেশ করেন?

তাঁর যদি উচ্চাকাংখাই থাকবে তাহলে তিনি অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার করলেন কেন? চাচা আবু তালিব জীবিত থাকতেই তো মক্কার নেতৃবৃন্দ তাকে অর্থ বিত্ত, সুন্দরী নারী দিতে চেয়েছিল। তাঁকে দেশের শাসকের পদে অভিষিক্ত করতে চেয়েছিল। উচ্চাকাংখা থাকলে তখনই তো তিনি তাদের প্রস্তাবে রাজী হতেন। তারা যে জেনে বুঝেই নবী করীম (সা:) এর ক্ষেত্রে এই ধরনের ধৃষ্টতা পূর্ণ বাক্য ব্যবহার করে থাকেন এতে কোন সন্দেহ নেই। বিশ্বনবী (সা:) এর ক্ষেত্রে ইংরেজি Ambition শব্দ বা বাংলা 'উচ্চাকাংখা' শব্দ ব্যবহার করা চরম ধৃষ্টতার শামিল।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 বিজিত মক্কায় নবী করীম (সা:) এর অনুপম ব্যবহার

📄 বিজিত মক্কায় নবী করীম (সা:) এর অনুপম ব্যবহার


মক্কা থেকে ইসলাম গ্রহণ করার পরে অত্যাচারিত হয়ে যারা মদীনায় হিজরত করেছিলেন, তাদের স্থাবর অস্থাবর সকল সম্পত্তি মক্কার ইসলাম বিরোধী লোকজন দখল করেছিল। সাহাবায়ে কেরাম ইচ্ছে করলে তাদের কষ্টার্জিত সে সব বাড়ি ঘর সহায় সম্পদ অধিকার করতে পারতেন। নবী করীম (সা:) সাহাবায়ে কেরামের প্রতি আদেশ করেছিলেন, 'তোমরা কোনো কিছুতেই হাত দিবে না'।

সাহাবায়ে কেরাম তাদের সম্পত্তির দিকে ফিরেও তাকালেন না। ইতোমধ্যে হযরত বিলাল (রা:) কা'বা ঘরের ছাদে আরোহণ করে আযান দিলেন। সে সময় এমন কিছু লোকজন উপস্থিত ছিল, যারা ছিল একেবারে মূর্খ শ্রেণীর এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন। এদের অন্তরে তাওহীদের আলো প্রবেশ করে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে সময়ের প্রয়োজন ছিল। হযরত বিলালের কন্ঠে তাওহীদের ঘোষণা শুনে আত্তাব ইবনে উসাইদ বললো, 'খোদা আমার পিতার সম্মান রক্ষা করেছে, সে এই আযানের শব্দ শোনার আগেই পৃথিবী ত্যাগ করেছে'।

কোনো এক মূর্খ বলেছিল, 'কা'বা ঘরের ছাদে দাঁড়িয়ে আযান দিচ্ছে! এখন তো আমাদের জীবিত থাকাই উচিত না'।

মক্কার জনগণ যা ভেবেছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যবহার পেয়েছিলো মুসলমানদের কাছ থেকে। ইসলামের প্রতি তাদের বিদ্বেষ অন্তর থেকে দূর হয়ে গেল। ইসলাম গ্রহণ করার জন্য কারো প্রতি সামান্য শক্তিও প্রয়োগ করা হয়নি। তারা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করার জন্য পাগলপারা হয়ে উঠেছিল। নবী করীম (সা:) সাফা পর্বতের উঁচ্চ স্থানে উপবেশন করলেন। চারদিকে মানুষের জোয়ার সৃষ্টি হলো। ঘোষণা করা হলো, প্রথমে পুরুষদের ইসলাম গ্রহণ শেষ হলে মহিলাগণ আগমন করবে।

পুরুষগণ আগমন করে নবী করীম (সা:) এর পবিত্র মুবারক হাতে হাত রেখে বাইয়াত গ্রহণ করতেন। আর মহিলাদের জন্য এমন ব্যবস্থা করা হলো, রাসূল (সা:) পানির পাত্রে নিজের পবিত্র হাত মুবারক ডুবিয়ে উঠিয়ে নিতেন। তারপর মহিলাগণ সে পানির পাত্রে তাদের হাত ডুবাতেন। এভাবে নারীদের বাইয়াত গ্রহণ করালেন। নারীগণ ইসলামের আদেশ-নিষেধ পালন করবে, তাদের চরিত্র ভালো রাখবে, তাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, এ সকল কথার ওপরে তাদের বাইয়াত গ্রহণ করা হয়েছিল।

ইতিহাসে যে মহিলাকে কলিজা ভক্ষণকারিণী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সে মহিলার নাম হিন্দা। মক্কার নেতা আবু সুফিয়ানের স্ত্রী সে। কারবালায় রাসূল (সা:) এর বংশ শেষ করতে ইচ্ছুক ছিল যে ইয়াজিদ, তাঁর দাদী হলো হিন্দা। আমীরে মুয়াবিয়া (রা:) এর মাতা হিন্দা। পদ্দা আবৃতা হয়ে এই নারী নবী করীম (সা:) এর সামনে এসেছিল। কারণ সে যে অপরাধ করেছিল তার গুরুত্ব সে অনুধাবন করছিল। এ কারণে তাঁর ভয় ছিল, কেউ তাকে চিনতে পারলে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্বনবী (সা:) এর সামনে সে যখন বাইয়াত গ্রহণ করতে এসেছিল, তখন তাঁর আচরণে নমনীয়তা ছিল না। তারা যে আজ পরাজিত, এ ধরণের মনোভাব তার ভেতরে ছিল না। নবী করীম (সা:) এর সাথে তাঁর কথাবার্তাও ভদ্রজনোচিত ছিল না। আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল (সা:) তাকে বললেন, 'বলো, আল্লাহ তা'য়ালার সাথে কাউকে অংশীদার স্থাপন করবে না'।

জবাবে হিন্দা বলেছিল, 'আপনি এ ধরনের অঙ্গীকার পুরুষদের কাছ থেকে আদায় করেননি। কিন্তু আমি সে অঙ্গীকার আপনার কাছে করছি'।

বিশ্বনবী (সা:) তাঁকে বললেন, 'অঙ্গীকার করো, কক্ষনো চুরি করবে না'।

আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বলেছিল, 'আমি আমার স্বামীর অর্থ সম্পদ থেকে মাঝে মধ্যে কিছু এদিক ওদিক করে থাকি। আমার জানা নেই এগুলো হারাম না হালাল'।

নবী করীম (সা:) বলেছিলেন, 'বলো, সন্তানদের হত্যা করবে না'।

হিন্দা বলেছিল, 'আমরা বহু কষ্টে বাচ্চাদের লালন পালন করে বড় করেছিলাম। আপনি বদরের প্রান্তরে তাদেরকে হত্যা করেছিলেন। এখন আপনি এবং তারা যা উত্তম তাই বুঝবেন'।

ইসলাম কবুল করার পরে হযরত হিন্দা (রা:) ইসলাম ও মুসলিমদের পক্ষে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। কয়েকটি যুদ্ধে তিনি ইসলাম বিরোধী শক্তির সাথে যুদ্ধ করেছেন। মুসলিম বাহিনীকে তিনি উৎসাহ উদ্দীপনা যুগিয়েছেন। নিজ হাতে অস্ত্রধারণ করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করেছেন। সঞ্চিত অর্থ-সম্পদ অকাতরে মহান আল্লাহর পথে বিলিয়ে দিয়েছেন। অতীতে তিনি না বুঝে যা কিছুই করেছেন আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে ক্ষমা করে তাঁর সৎ কর্মসমূহ করে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন।

প্রিয় চাচা হামজাকে হত্যা করেছিল ওয়াহ্শী। তাঁর বুক চিরে যে নারী কলিজা চিবিয়েছিল, দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটে মালা বানিয়ে গলায় পরিধান করেছিল যে নারী, সেই নারী বিশ্বনবী (সা:) এর সামনে। শুধু সামনেই নয়, নবীকে অভিযুক্ত করে গর্বভরে কথা বলছে সেই নারী। ধৈর্যের পাহাড় নবী করীম (সা:) তাঁকে কিছুই বললেন না। ইসলাম হুমকি ধমকি দিয়ে প্রসারিত হয়নি, ক্ষমা আর প্রেম দিয়েই ইসলাম দিকদিগন্তে বিস্তৃতি লাভ করেছে।

মক্কায় এমন দশজন লোক ছিল, যারা ছিল কুরাইশদের বিখ্যাত নেতা। ইসলামের বিরোধিতার ক্ষেত্রে তাদের নাম স্মরণীয় হয়েছিল। তারা মক্কা ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। হযরত ওমায়ের ইবনে ওহাব (রা:) রাসূলের সামনে এসে নিবেদন, করলেন, 'আরবের নেতৃবৃন্দ নিরাপত্তাজনিত কারণে মক্কা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাচ্ছে'।

বিশ্বনবী (সা:) তাঁর পবিত্র পাগড়ী মুবারক দিয়ে দিলেন, যা ছিল নিরাপত্তার প্রতীক। অভয় দান করলেন, তাদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। বিখ্যাত নেতা সাফওয়ান ইবনে ওমাইয়া জিদ্দায় পলায়ন করেছিল। আল্লাহর রাসূলের মাথা মুবারকের পাগড়ী দেখে সে ফিরে এলো। হুনাইন যুদ্ধ পর্যন্ত মক্কার একটি বিশাল জনগোষ্ঠী ইসলাম কবুল করেনি। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া ছিল তাদের অন্যতম। ইসলাম কবুল করেনি, অথচ তারা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধেও যোগ দিয়েছিল। তাদেরকে এমন কথা কেউ বলেনি, ইসলাম গ্রহণ না করলে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে গমন করা যাবে না।

মক্কার বিখ্যাত কবি আব্দুল্লাহ ইবনে জারয়া আতঙ্কে মক্কা ত্যাগ করে নাজরানে পালিয়েছিল। কবিতার ছন্দে সে বিশ্বনবী (সা:) ও পবিত্র কুরআনের বিরুদ্ধে কুৎসা গাইতো। সে ফিরে এসে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। নবী করীম (সা:) তাঁকে কিছুই জিজ্ঞাসা করেননি। ইসলামের ইতিহাস বিখ্যাত শত্রু আবু জাহিলের সন্তান ইকরামা মক্কা থেকে পালিয়ে ইয়েমেনে গিয়েছিল। তাঁর স্ত্রী উম্মে হাকিম রাসূল (সা:) এর দরবারে এসে মুসলমান হলেন এবং স্বামীর জন্য নিরাপত্তা কামনা করলেন।

করুণার সিন্ধু বিশ্বনবী (সা:) তাকেও নিরাপত্তা দিলেন। তিনি ইয়েমেন গিয়ে স্বামীকে ইসলামের প্রতি আহবান জানালেন। ইকরামা ইসলাম কবুল করে ফিরে এলো। আল্লাহর রাসূল (সা:) তাঁকে দেখে এত খুশী হলেন যে, তিনি উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। এ অবস্থায় নবী (সা:) এর শরীর মুবারক থেকে চাদর পড়ে গেল। ইকরামা রাসূল (সা:) এর হাতে বাইয়াত করেছিল। এরপর নবী করীম (সা:) মক্কায় পনের দিন অবস্থান করে মদীনায় ফিরে যান। এ সময় তিনি হযরত মা'য়াজ ইবনে জাবাল (রা:) কে মক্কার দায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনি মক্কার নওমুসলিমদেরকে ইসলামের বিধি-বিধান শিক্ষা দিতেন।

ইকরামা একজন উত্তম মুসলমান হিসাবে ইসলামের পক্ষে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করলেন। ইসলামের এ সব বিখ্যাত শত্রুকে ইসলাম গ্রহণ করতে কি, নবী করীম (সা:) বা সাহাবায়ে কেরাম বাধ্য করেছিল? ইউরোপিয় বন্ধুদের লেখা পড়লে মনে হয়, রাসূল (সা:) এবং সাহাবায়ে কেরাম মানুষের ঘাড়ের ওপরে তরবারী ধরে বলেছেন, 'ইসলাম গ্রহণ কর নতুবা দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দেবো'।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী করীম (সা:) এর অনুপম আদর্শের আকর্ষণ

📄 নবী করীম (সা:) এর অনুপম আদর্শের আকর্ষণ


সুদূর অতীতকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের ইসলাম বিদ্বেষী মহল, 'ইসলাম শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পৃথিবীতে বিস্তার লাভ করেছে এবং সন্ত্রাসই এর মূল লক্ষ্য'। এই আপ্তবাক্য প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে মুসলিম দেশ থেকে লুণ্ঠিত অগণিত অর্থ তারা ব্যয় করেছে এবং করছে। বিশেষ করে পত্র-পত্রিকা, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র এবং বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে তারা উল্লেখিত অবাঞ্ছিত কথাটি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রাণপন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর কারণ হলো, তাদের ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার ধ্বংসস্তূপের ওপরে একদিন ইসলামের বিজয় কেতন যে উড়বেই, এ সত্য তারা জানে। সুতরাং যতদিন ইসলাম সম্পর্কে মানুষকে বিভ্রান্তির বেড়াজালে রাখা যাবে, ততদিন পর্যন্ত তাদের যৌনতানির্ভর ঘৃণ্য সভ্যতা জীবীত থাকবে।

ইসলাম কিভাবে আপন মহিমায় মানুষের হৃদয়ে নিজের আসন করে নিয়েছে, কতকগুলো ঘটনার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই বিদ্বেষীদের মুখোশ উন্মোচন হয়ে যায়। নবী করীম (সা:) যখন মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানালেন, তখন তাঁর ডাকে সাড়া দেয়ার এবং তাঁকে সহযোগিতা করতে কেউই প্রস্তুত ছিল না। সমগ্র আরব তাঁর আহ্বানের বিরুদ্ধে শানিত অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে গেল। বিরোধিতার যতগুলো পন্থা ছিল, সবগুলোই তাঁর ওপরে প্রয়োগ করা হলো। কিন্তু বিশ্বনবী (সা:) ওহীভিত্তিক কৌশল দ্বারা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মহাসত্যের আহ্বান জানাতে থাকলেন।

তাদের কৃতকর্মের অসারতা এবং ক্ষতিকর দিকসমূহ তাদের সামনে বলিষ্ঠ যুক্তির মাধ্যমে তুলে ধরতে থাকলেন। তারা যে পথে চলছে, এ পথ যে তাদেরকে চরম এক ক্ষতিকর পরিণতির দিকেই নিয়ে যাচ্ছে, তা তাদেরকে বুঝাতে লাগলেন। তিনি সে সমাজের যাবতীয় অনাচার চিরতরে উৎখাত করতে আগ্রহী হলেন। কিন্তু এই কাজ সম্পাদন করার জন্য যে শক্তি সামর্থ প্রয়োজন, তা তাঁর হাতে তখন পর্যন্ত ছিলো না। তিনি এটাও জানতেন, তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দেয়ার অর্থ হলো চরম নির্যাতন সহ্য করা। এই দাওয়াত যারা কবুল করবে, তাদেরকে যে কোনো ধরনের অত্যাচার সহ্য করা ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা থাকবে না। জুলুম যখন অনুষ্ঠিত হবে তখন তা প্রতিহত করার মতো জাগতিক শক্তিও তাঁর নেই। সুতরাং সকল মুসিবত সহ্য করতে হবে।

নবী করীম (সা:) যেমন জানতেন এবং যারা তাঁর আহ্বান শুনছেন, তাঁরাও জানতেন ইসলাম গ্রহণ করার অর্থই হলো নিজের আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, দেশবাসীকে নিজের শত্রুতে পরিণত করা। নিজের যাবতীয় অধিকার হতে নিজেকে বঞ্চিত করা। যে কোনো ধরনের কঠিন শাস্তিকে বরণ করে নেয়া। এমনকি নিজের প্রাণও চলে যেতে পারে। এ কথা জেনে বুঝেই এক শ্রেণীর মানুষ সে সমাজে নবীর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল। বিভিন্ন এলাকা থেকে সত্যের সন্ধানকারী এক শ্রেণীর মানুষ এসে নবীর দাওয়াত গ্রহণ করতেন এবং নিজের এলাকায় গিয়ে সে দাওয়াত প্রচার করতেন। বিরোধিতার প্রচণ্ড সয়লাব তাদেরকে খড়কুটোর মতই উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইতো। নিজের কষ্টার্জিত সহায় সম্পদ থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করতো। লোমহর্ষক নির্যাতন করা হতো। দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হতো। তবুও তারা ইসলাম ত্যাগ করতেন না এবং এই কঠিন অবস্থা দেখেও যে কোনো নির্যাতন হাসি মুখে বরণ করে নেয়ার প্রস্তুতি নিয়েই মানুষ এই সত্য গ্রহণ করার জন্য এগিয়ে আসতেন। এসব ইতিহাস রূপকথার গল্প নয়, ইসলামের ইতিহাসের বাস্তব ঘটনা। এই ইতিহাস জীবন্ত থাকার পরেও এক শ্রেণীর ইয়াহুদী আর খ্রিষ্টান তথা অমুসলিমরা কি করে বলেন, ইসলাম শক্তি প্রয়োগ করে নিজের আসন পাকাপোক্ত করেছে?

পৃথিবীর কোনো স্বার্থ সামনে উপস্থিত নেই, অথচ চরম কঠিন অবস্থাকে স্বাগত জানিয়ে এক শ্রেণীর মানুষ স্রোতের মতই এসে রাসূলের পাশে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করেছেন। তাঁরা যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এই ত্যাগ স্বীকারে তাদেরকে কি নবী শক্তি প্রয়োগ করে বাধ্য করেছিলেন? তাঁরা তো কেবলমাত্র অন্তরের চাহিদা অনুযায়ী পঙ্গপালের মতই নবীর কাছে ছুটে আসতেন এবং ইসলামের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতেন। তাদের এই বিশ্বাসের ভেতরে সামান্যতম খাদ ছিল না, কোনো ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দু বা সংশয় সংকোচ ছিল না। স্বতস্ফুর্তভাবে তাঁরা দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করে নির্যাতনের লোমহর্ষক তাণ্ডব সহ্য করেছেন অথবা প্রাণদান করেছেন।

কিন্তু কেনো তাঁরা এভাবে তাদের বিশ্বাসের কারণে সীমাহীন নির্যাতন সহ্য করলেন বা কিসের মোহে তাঁরা নবীর ওপরে বিশ্বাসে অটল ছিলেন? অগণিত মানুষ কেনো এভাবে সকল কিছুই বিলিয়ে দিয়ে একটি বিশ্বাসকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছেন? এ সম্পর্কে চিন্তা করলে দেখা যায়, তাদের সবার বিশ্বাসের কারণ এক ও অভিন্ন ছিল না। শুধুমাত্র নবী করীম (সা:) এর অলৌকিক কর্মকাণ্ডের কারণেই মানুষ এভাবে তাঁর প্রতি আকর্ষিত হয়ে তাঁর আদর্শ গ্রহণ করেনি। বরং যাদের মন-মানসিকতা ছিল পরিচ্ছন্ন, চরিত্র ছিল উন্নত, পংকিলতার ভেতরে ডুবে থেকেও মন ও চিত্ত ছিল বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন, তাদের ইসলাম গ্রহণ করার ক্ষেত্রে নবুয়‍্যাতের সততার সপক্ষে নানা ধরনের যুক্তি প্রমাণ ও বাস্তবতা প্রধান ভূমিকা পালন করেছে এবং তাদেরকে মহাসত্যের প্রতি আকর্ষিত করেছে। তরবারী তাদেরকে সত্য গ্রহণে সামান্যতম আকর্ষিত করেনি।

তাঁদের সত্য গ্রহণ করার পেছনে ব্যক্তিভেদে বিভিন্ন কারণ ক্রিয়াশীল ছিল। হযরত আবু বকর (রা:) মহাসত্যের আহ্বান শ্রবণ করা মাত্র সত্য গ্রহণ করেছিলেন। সত্য তাঁকে আহ্বান করছে, এ প্রমাণই তাঁর মতো পূত-পবিত্র ব্যক্তির কাছে যথেষ্ট ছিল। কোনো ধরনের প্রমাণের আবশ্যক তাঁর ছিল না। সে সমাজে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যারা হযরত আবু বকরের অনুসরণ করেছিলেন মাত্র। হযরত আবু বকর (রা:) এর পবিত্র চরিত্র তাদের সামনে স্পষ্ট ছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, আবু বকর (রা:)-এর মতো মানুষ যখন একটি বিষয়ের ওপরে বিশ্বাস স্থাপন করেছে তখন তা অবশ্যই সত্য।

এদের মাঝে ছিলেন হযরত ওসমান (রা:), হযরত আব্দুর রহমান (রা:) ও হযরত ওবায়দাহ ইবনে জাররাহ (রা:)। নবীর কাছে এসে তাঁরা তাদের আকাংখা অনুযায়ী এমন কিছু দেখলেন যে, তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য হলেন। বিশ্বনবী (সা:) এর বিশাল হৃদয়, গরীবের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ, তাঁর চরিত্রের অনুপম সৌন্দর্য, তাঁর ক্ষমা, দুঃখী মানুষের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা এসব দেখে তাদের দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হলো, এই ধরনের অনুপম চরিত্রের একজন মানুষের ভেতরে কোনো অশুভ শক্তি কাজ করতে পারে না।

নবী করীম (সা:) এমন এক চরিত্র অনুসরণ করতে মানুষকে উৎসাহিত করেন, যে চরিত্র অনুসরণ করলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহামানব হওয়া যায়, এটা দেখে হযরত আমর ইবনে আস্বামা (রা:) ও হযরত উনাইস গিফারী (রা:) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। পবিত্র কুরআন শ্রবণ করেই হযরত উমার (রা:), হাবশার বাদশাহ, হযরত তুফায়েল ইবনে আমর দাওসী (রা:) ও হযরত যুবায়ের ইবনে মুতয়িম (রা:) ইসলাম গ্রহণ করলেন। হযরত দ্বাম্মাত ইবনে সালাবা তাবাজুদী (রা:) শুধুমাত্র কালিমায়ে তাইয়েবা শ্রবণ করেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা:) ছিলেন মদীনার ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের মধ্যে সবথেকে জ্ঞানী ব্যক্তি, তিনি নবী করীম (সা:) এর পবিত্র চেহারা মুবারক দেখেই উচ্চকণ্ঠে বলেছিলেন, 'মহান আল্লাহর কসম! এমন সুন্দর জান্নাতি চেহারা কোনো মিথ্যাবাদীর হতে পারে না'। শুধুমাত্র নবীর চেহারা দেখেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। হযরত দ্বাম্মাত ইবনে সালাবা (রা:) ছিলেন তাঁর গোত্র বনী সায়াদের নেতা। তিনি একদিন আনমনে নবী করীম (সা:) এর কাছে উপস্থিত হয়ে শপথ দিয়ে প্রশ্ন করলেন, 'আপনি কি প্রকৃত পক্ষেই আল্লাহর রাসূল?'

নবী করীম (সা:) জবাব দিলেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি সত্যই আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল'।

তিনি দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন না করেই ইসলাম গ্রহণ করলেন। মদীনার বিখ্যাত দুই গোত্র আউস এবং খাজরাজ, তাঁরা তাদের প্রতিবেশী ইয়াহূদীদের কাছে শুনেছিলেন, শেষ নবী বর্তমান সময়েই আগমন করবেন। এই কথা তাঁরা বিশ্বাস করে মক্কায় নবী করীম (সা:) এর মুখের কথা শুনেই বুঝলেন এই ব্যক্তিই শেষ নবী। তাঁরা কালবিলম্ব না করে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তারপর মক্কা বিজয়ের পরে মক্কার বিভিন্ন গোত্র ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাদের দীর্ঘ দিনের লালিত বিশ্বাসের কারণেই। তাদের বিশ্বাস ছিল, কা'বাঘর কোনো মিথ্যাবাদী কক্ষণোই নিয়ন্ত্রণ করবে না। দীর্ঘ দিন ধরে বিরোধিতা করেও যখন তারা সফল হতে পারলো না, নবী করীম (সা:) কা'বার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলেন, তখন তাদের বিশ্বাস হলো এই ব্যক্তি সত্যই আল্লাহ তা'য়ালার নবী।

আরবের অনেক গোত্রই নবী করীম (সা:) এর বদান্যতা দেখেই ইসলাম কবুল করেছিল। আরবের জ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী এবং কবি সাহিত্যিকগণ পবিত্র কুরআনের বিন্যাস দেখেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। যারা ছিল বিখ্যাত যোদ্ধা, বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের অলৌকিক বিজয় দেখেও যাদের অন্তরে সামান্য রেখাপাত হয়নি, তারা মুসলমানদের শিষ্টাচার ও চারিত্রিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। মুসলমানদের সাথে ইসলাম বিরোধিরা যখন একত্রে মেলামেশার সুযোগ লাভ করেছিল, তখন তারা ইসলামের বৈশিষ্ট দেখেই ইসলাম কবুল করেছিলেন।

মক্কায় নবী করীম (সা:) এর অসংখ্য মু'জিযা প্রকাশ পেয়েছে। আবু জাহিল অসংখ্য মু'জিযা দেখেছে। কিন্তু তার হৃদয় সত্য গ্রহনের জন্য মুক্ত ছিল না। সত্য সে গ্রহণ করতে পারেনি। আবু সুফিয়ান চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত ও বিভিন্ন ধরণের মু'জিযা দেখলো, কয়েকটি যুদ্ধে মুসলমানদের অলৌকিক বিজয় দেখলো, তার মেয়ে উম্মে হাবিবা (রা:) ছিলেন নবী করীম (সা:) এর পবিত্রা স্ত্রী, মেয়ের ভেতরে বিরাট পরিবর্তন দেখলো, কিন্তু তাঁর অন্তরে কিছুই রেখাপাত করলো না। কিন্তু সে যখন নিজের চোখে দেখলো এবং নিজের কানে শুনলো, রোম সম্রাট নবীর পা ধুয়ে দিতে আগ্রহী, তখন তার চিন্তার জগতে বিপ্লব সাধিত হলো।

খ্রিষ্টানদের নেতা আদী ইবনে হাতেম (রা:) নবীর দরবারে জাঁকজমকের সাথে আগমন করেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, তাঁর দেখা রাজা বাদশাহর মতই তিনি আচরণ করেন। কিন্তু তিনি যখন দেখলেন সমাজের নিম্ন শ্রেণীর লোকজন এলেও তার সাথে তিনি পরম আপনজনের মতই ব্যবহার করেন। তখন তাঁর অন্তর বলে উঠলো, এই ব্যক্তি অবশ্যই আল্লাহর নবী। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। অনেক ইয়াহুদী, যারা আসমানী কিতাব অধ্যয়ন করে জেনেছিলেন শেষ নবী কেমন হবেন। তারা নবীর কাছে এসে তাঁকে দেখেই চিনেছেন। কথা বলেছেন। প্রশ্নের পরে প্রশ্ন করে সন্তোষজনক উত্তর পেয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

কেউ নবীর কাছে এসে দাবী করেছেন, 'ঐ খেজুরগুলো যদি এসে আপনার নবী হওয়া সম্পর্কে সাক্ষী দেয় তাহলে আমি মুসলমান হবো'।

নবী করীম (সা:) মহান আল্লাহ তা'য়ালার নামে ইশারা করেছেন, খেজুর কাছে এসে সাক্ষী দিয়েছে, এই মু'জিযা দেখেই সে ইসলাম গ্রহণ করেছে। কেউ দাবী করেছে, ঐ গাছটি যদি কালেমা পাঠ করে তাহলে আমিও কালেমা পাঠ করে ইসলাম কবুল করবো। নবী করীম (সা:) এর কথায় গাছ কালেমা পাঠ করেছে, সে এই অলৌকিক ঘটনা দেখে ইসলাম কবুল করেছে। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। পক্ষান্তরে শক্তি প্রয়োগের কোনো একটি দৃষ্টান্তও নেই।

ফন্ট সাইজ
15px
17px