📄 পরাজিত জনগোষ্ঠী ও নবী করীম (সা:) এর সীরাত
নবী করীম (সা:) অষ্টম হিজরী সনের রমজান মাসের দশ তারিখে মদীনা থেকে মক্কা অভিযানে বের হলেন। তিনি ইতোপূর্বে এমন বর্ণাঢ্য সাজে কোনো অভিযানেই বের হননি। মক্কা অভিযানে তিনি এমন সুসজ্জিত অবস্থায় বের হলেন, যেন ইসলামের শত্রুদের কলিজায় কম্পন জাগে। দশ হাজার সুসজ্জিত বাহিনী আল্লাহ তা'য়ালার রাসূলের সাথে। রাসূল (সা:) এগিয়ে যাচ্ছেন তাঁর মাতৃভূমির দিকে। যেখান থেকে একদিন তিনি অশ্রু বিসর্জন দিয়ে বের হয়ে এসেছিলেন। কা'বাঘরের দিকে তাকিয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, 'হে কা'বা! তোমার নিষ্ঠুর সন্তানরা আমাকে থাকতে দিল না'। তিনি বিশাল এক বাহিনী নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। এবার আর জনমানবহীন প্রান্তর দিয়ে নয়, জনপদ দিয়েই তিনি তাওহীদের বিজয় কেতন উড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিটি জনপদ থেকেই পতাকাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী তাঁর নেতৃত্বাধীন মিছিলে যোগ দিয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি করছে। বিশাল এক জনসমুদ্র তরঙ্গের ওপরে তরঙ্গ সৃষ্টি করে মক্কার দিকে প্রবল বেগে এগিয়ে চলেছে। বিভিন্ন গোত্রের দু'একজন তখন পর্যন্ত ইসলামের প্রতি শত্রুতা পোষণ করতো, তারা চক্ষু বিস্ফোরিত করে তাওহীদের এই তরঙ্গ দেখছে।
নবী করীম (সা:) মক্কার অনতিদূরে মাররুজ জাহরান নামক এলাকায় এসে যখন উপনীত হলেন রাতের নিকষ কালো অন্ধকার সমগ্র পরিবেশের ওপর অবগুণ্ঠন টেনে দিয়েছে। সেখানেই তিনি যাত্রা বিরতি করে সৈন্যবাহিনীকে শিবির স্থাপন করতে আদেশ দিলেন। অসংখ্য তাঁবু স্থাপন করা হলো। তিনি আদেশ দিলেন, প্রত্যেক তাঁবুতেই যেন পৃথকভাবে রান্নার আয়োজন করা হয়। এ কারণে প্রতিটি তাঁবুতেই পৃথকভাবে উনুন জ্বালানোর প্রয়োজন হলো। ক্ষণিকের মধ্যেই অগণিত উনুন জ্বলে উঠলো। রাতের অন্ধকার বিদীর্ণ করে বিশাল প্রান্তর আলোকিত হয়ে উঠলো। সে আলোয় মক্কা নগরী যেন উদ্ভাসিত হয়ে গেল।
ভয়ে আতঙ্কে ইসলাম বিরোধিদের কলিজা যেন কণ্ঠনালী দিয়ে বের হয়ে আসার উপক্রম হলো। নবী করীম (সা:) রাতের অন্ধকারে অধিক সংখ্যক উনুন প্রজ্জ্বলিত করার যে আদেশ দিয়েছিলেন, এর পেছনে ছিল সামরিক কৌশল। ইসলামের শত্রুগণ যেন ধারণা করে লক্ষ লক্ষ বাহিনী মক্কার দিকে এগিয়ে আসছে। ঘটেছিলও তাই, কুরাইশরা দেখতো যেন লক্ষ লক্ষ উনুন জ্বলছে। উনুনের সংখ্যা যখন নিরূপণ করা যাচ্ছে না তাহলে সৈন্য সংখ্যা নিশ্চয়ই কয়েক লক্ষ হবে। চরম আতংকে তাদের নিশ্বাস যেন বন্ধ হবার উপক্রমন হলো।
তারা নবী করীম (সা:) এর বাহিনীর সঠিক সংখ্যা জানার জন্য হযরত খাদিজা (রা:) এর ভাইয়ের সন্তান হাকিম ইবনে হিজাম, বুদাইল ইবনে ওরাকা ও তাদের নেতা স্বয়ং আবু সুফিয়ানকে প্রেরণ করলো। তারা ছদ্মবেশে মুসলিম বাহিনীর দিকে এগিয়ে গেলো প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য। ওদিকে বিশ্বনবী (সা:) এর চাচা আব্বাস (রা:) ইসলাম গ্রহণ করলেও তিনি মক্কাতেই অবস্থান করতেন। তিনি যেদিন পরিবার-পরিজনসহ মদীনার দিকে হিজরত করলেন, সেদিনই নবী করীম (সা:) মদীনা থেকে মক্কা অভিযানে বের হলেন। পথে চাচা ভাতিজার সাক্ষাৎ হলো। তিনিও মক্কা অভিযানে শামিল হলেন। হযরত আব্বাস (রা:) ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, যদি এমন কাউকে পেতেন তাহলে তার কাছে সংবাদ প্রেরণ করতেন, সে যেন মক্কায় গিয়ে কুরাইশদের কাছে বলে, যথা সময়ে এসে নবী করীম (সা:) এর কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজেদের নিরাপত্তা কামনা করে।
হযরত আব্বাস (রা:) নবী করীম (সা:) এর সাদা খচ্চড়ে আরোহন করে চারদিকে অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিচ্ছিলেন। এমন সময় তাঁর সাথে মক্কার বিখ্যাত নেতা আবু সুফিয়ানের দেখা হলো। তিনি তাঁকে বললেন, 'দেখতে পাচ্ছো তো, আল্লাহর রাসূল (সা:) বিশাল এক বাহিনী নিয়ে এসেছেন। মক্কার কুরাইশরা এবার ধূলার সাথে মিশে যাবে'। আবু সুফিয়ান ব্যগ্র কন্ঠে বললেন, 'আমার মা-বাবা তোমার জন্য কুরবান হোক! এই অবস্থায় কি করতে হবে আমাকে বলে দাও'। হযরত আব্বাস (রা:) বললেন, 'তোমাকে দেখলে নিশ্চয়ই মুসলিম বাহিনী মাথা কেটে নেবে এতে সন্দেহ নেই। তুমি আমার এই খচ্চড়ের পেছনে উঠে বসো। আল্লাহর রাসূল (সা:) এর কাছে চলো। আমি তোমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করছি'।
মক্কার ইসলাম বিরোধী কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান, যার দাপটে রণভূমি কেঁপে উঠেছে। সেই নেতা আজ নিজের প্রাণের মায়ায় কোনো কথা না বলে রাসূল (সা:) এর চাচার পেছনে উঠে বসলো। হযরত আব্বাস (রা:) দ্রুত গতিতে খচ্চর ছুটিয়ে নবী করীম (সা:) এর দিকে অগ্রসর হলেন। হযরত উমার (রা:) যে স্থানে উনুন জ্বালিয়ে ছিলেন তার পাশ দিয়েই হযরত আব্বাস (রা:) যাচ্ছিলেন। হযরত উমার (রা:) তাঁকে দেখে বললেন, 'আল্লাহর শোকর যে তিনি তাঁর দুশমনকে আমাদের মধ্যে এনে দিয়েছেন'।
কিন্তু তাঁকে হত্যা করতে হলে নবী করীম (সা:) এর অনুমতি প্রয়োজন, এ কারণে তিনি দ্রুত উঠে নবী করীম (সা:) এর দিকে গেলেন। হযরত আব্বাস (রা:) খচ্চর ছুটিয়ে রাসূল (সা:) এর কাছে উপস্থিত হয়ে আবু সুফিয়ানের প্রাণ ভিক্ষার আবেদন করলেন। হযরত উমার (রা:) ও তাঁকে হত্যার অনুমতি প্রার্থনা করলেন। নবী করীম (সা:) কোনো পক্ষেই সাড়া দিলেন না। হযরত আব্বাস (রা:) হযরত উমার (রা:) কে বললেন, 'হে উমার! এই লোক যদি তোমার কবিলার হতো তাহলে কি তুমি এতটা কঠোর হতে পারতে?' হযরত উমার (রা:) বললেন, 'আপনি এমন করে বলবেন না। আপনি যেদিন ইসলাম কবুল করেছিলেন, সেদিন আমি যা আনন্দিত হয়েছিলাম আমার পিতা খাত্তাব ইসলাম কবুল করলেও এতটা আনন্দিত হতাম না'।
এই সেই আবু সুফিয়ান, যার নেতৃত্বে নবী করীম (সা:) এর প্রিয় চাচা হযরত হামজা (রা:) কে হত্যা করে তাঁর বুক চিরে কলিজা বের করে চিবিয়ে ছিল আবু সুফিয়ানেরই স্ত্রী হিন্দা। স্বয়ং আবু সুফিয়ান হযরত হামজা (রা:) এর পবিত্র দেহে বর্শার আঘাত করে কটুক্তি করেছিল। তাঁর অতীত কর্ম তৎপরতা সকল মুসলমানের সামনে ছিল স্পষ্ট। অজস্র অপরাধে সে অপরাধী। তাঁর প্রতিটি অপরাধই ছিল মৃত্যুদণ্ডযোগ্য। কিন্তু যাঁর সামনে তিনি নত মস্তকে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি ছিলেন রাহমাতুল্লিল আলামীন। করুণার মূর্ত প্রতীক হিসাবে যিনি পৃথিবীতে আগমন করেছেন। নবী করীম (সা:) আবু সুফিয়ানের দিকে পবিত্র গ্রীবা বাড়িয়ে তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে অভয় দান করলেন, 'কোনো ভয় নেই, এটা ভয়ের জায়গা নয়'। প্রাণের দুশমনদের প্রতি এটাই ছিলো নবী করীম (সা:) এর সীরাত।
বুখারী শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রেফতার বরণের পরপরই আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ঐতিহাসিক আত তাবারী বলেন, আবু সুফিয়ানের সাথে নবী করীম (সা:) এর কিছু কথা হয়েছিল। রাসূল (সা:) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'হে আবু সুফিয়ান! এখনো কি তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না যে আল্লাহ তা'য়ালা ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই?' আবু সুফিয়ান বলেছিলেন, 'আজ যদি অন্য কোনো ইলাহ থাকতো, তাহলে তো আমাদের কাজেই আসতো'। নবী করীম (সা:) তাঁকে পুনরায় প্রশ্ন করেছিলেন, 'হে আবু সুফিয়ান আমি যে আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল এতে কি তোমার সন্দেহ আছে?' তিনি জবাব দিয়েছিলেন, 'সামান্য একটু সন্দেহ আছে'।
শেষ পর্যন্ত আবু সুফিয়ান ইসলাম কবুল করেছিলেন। নবী করীম (সা:) তাঁকে মর্যাদা দিয়েছিলেন এবং তিনি এক সময় প্রকৃত ঈমানাদার হয়েছিলেন। ইসলামের পক্ষে তিনি যুদ্ধও করেছেন। তায়েফের যুদ্ধে তাঁর একটি চোখ আহত হয়েছিল। ইয়ারমুকের যুদ্ধে উক্ত চোখটি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মক্কা বিজয়ের দিন নবী করীম (সা:) আবু সুফিয়ানকে লক্ষ্য করে বললেন, 'আপনি মক্কায় গিয়ে ঘোষণা করে দিন, যে ব্যক্তি অস্ত্র ত্যাগ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। যে ব্যক্তি কা'বায় আশ্রয় গ্রহণ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। যে ব্যক্তি নিজের গৃহের দরোজা বন্ধ রাখবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। আর ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের বাড়িতে থাকবে তারাও নিরাপত্তা লাভ করবে'। অথচ এই আবু সুফিয়ান ওহুদের ময়দানে নবী করীম (সা:) কে হত্যার উদ্দেশ্যে হন্যে হয়ে খুঁজে ছিলো। পক্ষান্তরে আল্লাহর রাসূল (সা:) তাঁকে এত বেশী মর্যাদা দিলেন যে, তাঁর বাড়িতে যারা আশ্রয় গ্রহণ করবে তারাও আজকের এই বিজয়ের দিনে নিরাপত্তা পাবে। তদানীন্তন আরবে কারো বাড়িকে নিরাপত্তার স্থল হিসাবে ঘোষণা দেয়ার অর্থ ছিল তাকে অধিক সম্মান প্রদর্শন করা। নবী করীম (সা:) আবু সুফিয়ানের ক্ষেত্রে তাই করেছিলেন। (ইবনে আল জাওযী, আল মুজতবা, পৃষ্ঠা নং-৮৩)
আবু সুফিয়ান (রা:) মক্কায় গিয়ে জনগণের মধ্যে নবী করীম (সা:) এর ঘোষনা শুনিয়ে দিলেন। তাঁর ঘোষনা শুনে মক্কার কুরাইশরা হতবিহ্বল হয়ে পড়লো। তিনি নিজের সম্পর্কে ঘোষনা দিলেন, 'আজ থেকে আমি তোমাদের আর নেতা নই, আমার পরিচয় শোনো, আমি মুসলমান'।
তাওহীদের সেনাবাহিনী মক্কার দিকে অগ্রসর হতে থাকলো। নবী করীম (সা:) তাঁর প্রিয় চাচা হযরত আব্বাস (রা:) কে বললেন, 'আবু সুফিয়ানকে উচ্চস্থানে দাঁড় করিয়ে দাও, তাওহীদের সেনাবাহিনীর রূপ চেহারা সে দু'চোখ ভরে উপভোগ করুক'।
নবী করীম (সা:) আল্লাহ তা'য়ালার পথের অকুতোভয় সৈনিকদের নিয়ে মক্কা নগরীতে প্রবেশ করছেন, কুরাইশরা ভয়ে আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়লো। কেউ আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করলো, কেউ বা কা'বাঘরে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। কয়েকজন মক্কা ত্যাগ করে পালিয়ে গেল। হযরত আব্বাস (রা:) নও মুসলিম হযরত আবু সুফিয়ান (রা:) কে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড় করিয়ে দিলেন। তাওহীদের বিশাল বাহিনী সমুদ্রের তরঙ্গের মতই মক্কা নগরীতে আছড়ে পড়লো।
এক নয়ানভিরাম বিস্ময়কর দৃশ্যের অবতারণা হলো। আরবের বিভিন্ন গোত্র তাদের নিজের গোত্রের পতাকা উড়িয়ে মক্কা নগরীতে প্রবেশ করছেন। প্রতিটি সৈন্যর চেহারায় তাওহীদের দ্যুতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আল কুরআনের সৈনিকরা আল্লাহু আকবর বলে তাকবীর দিয়ে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বীর দর্পে কুচকাওয়াজ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে। সর্বপ্রথম গিফারী গোত্রের মিছিল সামনের দিকে এগিয়ে গেল। তার পেছনে জুবায়না গোত্র। মহান আল্লাহ তা'য়ালা হুদায়বিয়া সন্ধিকে 'ফতহুম মুবিন' অর্থাৎ প্রকাশ্য বিজয় বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। আজ তার বাস্তব অবস্থা মানুষ দেখতে পাচ্ছে। এরপর বিভিন্ন গোত্রের মিছিল বজ্রকণ্ঠে তাওহীদের শ্লোগানে মক্কা নগরীকে প্রকম্পিত করে এগিয়ে গেল।
নও মুসলিম হযরত আবু সুফিয়ান (রা:) জান্নাতি দৃশ্য দেখতে দেখতে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলেন। তাঁর সাথে ছিলেন নবী করীম (সা:) এর চাচা হযরত আব্বাস (রা:)। সেদিন তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল তাঁরই ওপর। তিনি চিনতে পারছিলেন না, কোনটা কোন্ বাহিনী। হযরত আব্বাস (রা:) এর কাছ থেকে তিনি বিভিন্ন বাহিনীর পরিচয় তিনি জেনে নিচ্ছিলেন।
এবার এগিয়ে এলো বিশাল এক মিছিল নিয়ে সেনাপতি হযরত সায়াদ ইবনে উবায়দা (রা:)। আবু সুফিয়ান (রা:) জিজ্ঞাসা করলেন, 'বর্ণাঢ্য সাজে সজ্জিত এই বিশাল বাহিনীর পরিচয় কি?' হযরত আব্বাস (রা:) বললেন, 'এই বাহিনী মদীনার আনসারদের'।
হযরত উবায়দা (রা:) দেখলেন হযরত আবু সুফিয়ান (রা:) দাঁড়িয়ে আছেন আর তাঁর পাশেই রয়েছেন নবী করীম (সা:) এর প্রিয় চাচা হযরত আব্বাস (রা:)। তাঁকে দেখে তিনি বললেন, 'হে আবু সুফিয়ান! আজকের দিন রক্তপাতের দিন। কা'বাকে আজ উন্মুক্ত এবং বৈধ করে দেয়া হবে'।
অর্থাৎ আজ কা'বা এলাকায় রক্তপাত করা বৈধ। আবু সুফিয়ান বুঝলেন, আজ মক্কা নগরীতে রক্তের প্লাবন বইয়ে দেয়া হবে। তিনি শংকিত হয়ে পড়লেন। তাহলে তাঁর আত্মীয়-স্বজন এবং মক্কার অধিবাসীরা কেউ আজ জীবিত থাকবে না? এমন সময় তিনি দেখলেন নবী করীম (সা:) কে পরিবেষ্টন করে সাহাবায়ে কেরাম বিশাল মিছিল সহকারে মক্কা নগরীতে প্রবেশ করছেন। এই মিছিলের পতাকা ছিল হযরত যুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা:) এর হাতে।
হযরত আবু সুফিয়ান (রা:) উচ্চ কন্ঠে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আপনি শুনেছেন, উবায়দা কি বলে গেল!'
আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল (সা:) জানতে চাইলেন, 'কি বলেছে উবায়দা?'
হযরত আবু সুফিয়ান (রা:) জানালেন, 'উবায়দা বলে গেল আজকের দিন রক্তপাতের দিন। কা'বাকে আজ উন্মুক্ত এবং বৈধ করে দেয়া হবে'।
নবী করীম (সা:) তাঁকে অভয় দান করে বললেন, 'উবায়দাহ ভুল বলেছে। আজ কা'বা শরীফের মর্যাদা দেয়ার দিন'। অর্থাৎ কোনো রক্তপাত নয়, কা'বাঘরের প্রকৃত যে মর্যাদা আজ সেই মর্যাদা দেয়ার দিন।
পবিত্র মক্কা নগরীতে এক পথে মিছিল প্রবেশ করেনি। বিভিন্ন পথ ধরে মিছিল প্রবেশ করছিল। হযরত খালিদ (রা:) এর নেতৃত্বে এক বিশাল মিছিল নগরীতে প্রবেশ করছিল। বুখারী শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, বিজয়ী বীর বিশ্বনবী (সা:), যাঁকে এই নগরীর লোকজন অবর্ণনীয় অত্যাচার করেছে। তাদেরই মধ্যে তিনি বিজয়ী বীর হিসেবে প্রবেশ করছেন। অথচ তাঁর চেহারায় গর্ব অহংকারের কোনো চিহ্ন নেই। তাঁর সকল আচরণে ক্ষমা আর মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পাচ্ছে। সুললিত কণ্ঠে তিনি সূরা ফাত্হ্ তিলাওয়াত করছেন। সূরা ফাতহ-এ বিজয়ের সুসংবাদ দিয়ে হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় নাজিল হয়েছিল।
ইসলাম সম্পর্কে না জেনে অথবা বিদ্বেষ অন্তরে রেখে যারা বলেন, ইসলাম তরবারীর শক্তিতে প্রচার হয়েছে, তারা আজকের এই অভূতপূর্ব দৃশ্য কল্পনার দৃষ্টিতে একবার দেখুন, ইসলাম কোন্ শক্তির কারণে বিজয়ী হয়েছে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফ্ফাল (রা:) বলেন, আমি মক্কা বিজয়ের দিন আল্লাহর রাসূল (সা:)-কে উটের ওপর বসে মধুর কন্ঠে সুরা ফাত্হ্ পাঠ করতে দেখেছি। হযরত মুআবিয়া ইবনে কুররা (রা:) বলেন, যদি আমার পাশে লোকজন ভীড় করার আশংকা না থাকতো, তাহলে মুগাফ্ফালের মত আমিও আল্লাহর রাসূল (সা:) এর কুরআন তিলাওয়াত শুনতাম। (বুখারী)
নবী করীম (সা:) এর নির্দেশ ছিল, কোনো ধরনের বাধা না এলে কারো প্রতি আঘাত করা যাবে না। কিন্তু কুরাইশদের একটি হঠকারী দল হযরত খালেদ (রা:) এর মিছিলের ওপর আক্রমন করলো। তিনজন সাহাবা শাহাদাতবরণ করলেন। বাধ্য হয়ে হযরত খালেদ (রা:) আক্রমণ করলেন। কুরাইশদের বিভ্রান্ত দলের ১৩ জন নিহত হলো। নবী করীম (সা:) দূর থেকে যুদ্ধের দৃশ্য দেখে খালেদ (রা:) কে তলব করলেন। কৈফিয়ত চাইলেন, কেনো যুদ্ধ শুরু করা হলো। তিনি জানালেন, প্রতিপক্ষ তাদের ওপরে প্রথমে আক্রমন করে তিনজনকে শহীদ করেছে। তখন নবী করীম (সা:) বললেন, 'আল্লাহ তা'য়ালার ইচ্ছা এমনই ছিল'।
নবী করীম (সা:) এর পতাকা হাজুন নামক স্থানে রাখা হলো। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হলো, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আপনি আজ কোথায় থাকবেন? আপনি কি আপনার সেই পুরোনো বাড়িতেই থাকবেন?'
আল্লাহর রাসূল (সা:) বললেন, 'আকীল কি কোনো জায়গা রেখেছে!' তারপর তিনি বললেন, 'ঈমানদার ব্যক্তি কাফিরদের উত্তরাধিকারী হয় না। আর কাফিরও ঈমানদারের উত্তরাধিকারী হয় না'। (বুখারী)
ইসলামী বিধানে কোনো মুসলমান কোনো অমুসলিমের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারে না। নবী করীম (সা:) এর চাচা আবু তালিব যখন ইন্তেকাল করেছিলেন সে সময় হযরত আলী (রা:) এর ভাই আকীল অমুসলিম ছিলেন। তিনি রাসূল (সা:) এর এবং তাঁর পিতার সকল সম্পদ আবু সুফিয়ানের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলেন।
বিশ্বনবী (সা:) নিজের থাকার জন্যে কা'বার ঐ স্থানের কথা বললেন, যেখানে ইসলাম বিরোধিরা ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য একত্রিত হয়ে শপথ গ্রহণ করতো। তিনি মক্কা বিজয়ের সময় মক্কার উচ্চ এলাকা কাদা নামক স্থান দিয়ে প্রবেশ করেছিলেন। তিনি যে উটের আরোহী ছিলেন তাঁর পেছনে বসেছিলেন মুতার যুদ্ধে শাহাদাতপ্রাপ্ত হযরত যায়িদ ইবনে হারিসা (রা:) এর সন্তান হযরত উসামা (রা:)। বিশ্বনবী (সা:) এর পবিত্র মাথা মুবারকে এ সময় ছিল লোহার শিরস্ত্রাণ।
📄 অধীনস্থ অমুসলিমের ধৃষ্টতা ও নবী করীম (সা:) এর সীরাত
হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রত্যক্ষ ফসল ছিলো মক্কা বিজয়। মক্কায় ইসলামের পতাকা উড্ডীন হবার অর্থই ছিলো সমগ্র আরব ইসলামের প্রভাবাধীনে আসা। মক্কা বিজয়ের পরে আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে মানুষ এসে ইসলাম গ্রহণ করছিল। আরবে একটি বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, মক্কায় আল্লাহর ঘর কোনো মিথ্যাবাদীর নিয়ন্ত্রণে কখনোই যাবে না। নবী করীম (সা:) এর আন্দোলনের প্রতি সজাগ সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিল তারা অপেক্ষায় ছিল, কুরাইশরা পরাজিত হলেই তারা বিজয়ী নবীর আনুগত্য করবে। মক্কা বিজয়ের পরে তারা বিশ্বনবী (সা:) এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
কিন্তু হাওয়াজেন গোত্র ও ছাকিফ গোত্র ইসলাম গ্রহণ করলো না। তারা ছিল যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী। তাদের মধ্যে যাদু বিদ্যারও চর্চা ছিল। তারা ধারণা করেছিল, মুহাম্মাদ (সা:) প্রায় সমগ্র আরবই নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। এবার তাদের এলাকা দখল করলে তাদের নিজস্ব কর্তৃত্ব আর থাকবে না। যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী হিসাবে তারা হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো, উভয় গোত্র একত্রিত হয়ে মুসলমানদের ওপর আক্রমন করে তাদেরকে পর্যদুস্ত করবে।
নবী করীম (সা:) সংবাদ পেলেন হাওয়াজেন গোত্র ও ছাকিফ গোত্র একত্রিত হয়ে এক বিশাল বাহিনী সংগ্রহ করে মুসলমানদের ওপর আক্রমন করার লক্ষ্যে এগিয়ে আসছে। তিনিও দ্রুত শত্রুপক্ষের সংবাদ সংগ্রহ করার জন্য লোক প্রেরণ করলেন। নবী করীম (সা:) এর প্রেরিত লোকজন ছদ্মবেশে প্রতিপক্ষের সেনাবাহিনীর সাথে মিশে গেলো। কয়েকদিন তাদের ভেতরে অবস্থান করে তাদের গোপন সংবাদ সংগ্রহ করে ফিরে এসে তাঁরা নবী করীম (সা:) কে সংবাদ জানালেন।
আল্লাহর রাসূল (সা:) ও প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বাধ্য হলেন। এই যুদ্ধই ইতিহাসে হুনাইনের যুদ্ধ নামে পরিচিত। চাপিয়ে দেয়া এই যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করা মুসলমানদের জন্য খুবই কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়লো। সবেমাত্র রাসূল (সা:) মক্কা বিজয় করেছেন। তিনি ইচ্ছা করলে মক্কার কুরাইশদের কাছ থেকে হুনাইন যুদ্ধের খরচ বাধ্যতামূলক ভাবে আদায় করতে পারতেন এবং পরাজিত কুরাইশরা যুদ্ধের খরচ দিতে বাধ্য ছিলো। কিন্তু নবী করীম (সা:) পরাজিত ও নিয়ন্ত্রিত জনগোষ্ঠীর কাছে যুদ্ধের খচর দাবী করেননি। ইসলাম বিদ্বেষী জ্ঞানপাপীরা নবী করীম (সা:) এর এই মহত্বের দিকে চোখ বন্ধ করে থাকে, এসব ইতিহাস তারা সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়।
নবী করীম (সা:) বাধ্য হলেন ঋণ করতে। আবু জাহিলের বৈমাত্রেয় ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে রবিয়া ছিল মক্কার ধনাঢ্য লোকদের একজন। রাসূল (সা:) তার কাছে থেকে ৩০ হাজার দিরহাম ঋণ নিয়েছিলেন। মক্কার কুরাইশদের বিখ্যাত নেতা সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, মক্কা বিজয়ের পরেও তখন পর্যন্ত ধনাঢ্য সে লোকটি ইসলাম গ্রহণ করেনি। এ লোকটির কাছে অস্ত্রের ভাণ্ডার ছিল। নবী করীম (সা:) এই অমুসলিমের কাছে গেলেন অস্ত্র সংগ্রহের জন্য। বিজয়ী নেতা বিজিত দেশের এক সাধারণ নাগরিকের কাছে গেলেন অস্ত্র ঋণ হিসাবে গ্রহণ করার জন্য। তিনি স্বয়ং না গিয়েও লোক মারফত তাকে সংবাদ দিয়ে নিজের কাছে আসতে বাধ্য করতে পারতেন। রাসূল (সা:) যা আদেশ করতেন তা মানতে তাকে বাধ্য করতে পারতেন।
কিন্তু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মানবতার মুক্তিদুত নবী করীম (সা:) স্বয়ং পরাজিত সেই অমুসলিমের কাছে গেলেন। তাকে অনুরোধ করলেন, 'আমাকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র সরবরাহ করো'।
অমুসলিম সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া আল্লাহর রাসূল (সা:) এর দিকে তাকিয়ে বললো, 'হে মুহাম্মাদ (সা:)! তুমি কি আমার অস্ত্র কেড়ে নিতে এসেছো?'
স্মিতহাস্যে আল্লাহর হাবিব বললেন, 'না কেড়ে নিতে আসিনি। আমি তোমার অস্ত্র পুনরায় ফেরৎ দিবো। ঋণ হিসাবে দাও'।
বিজয়ী নেতার সাথে বিজিত দেশের একজন অমুসলিম কি ভাষায় কথা বলছে আর বিজয়ী নেতা কি জবাব দিচ্ছেন, এদিকে দৃষ্টি দিলেও কি ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষীদের মনে হয়, নবী করীম (সা:) তরবারীর জোরে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন? প্রকৃতপক্ষে হিংসা আর বিদ্বেষ যাদের দৃষ্টি আচ্ছন্ন করেছে, তারা কখনোই স্বচ্ছ দৃষ্টি দিয়ে রাসূল (সা:) এর পবিত্র সীরাত ও ইসলামপন্থীদের মহত্ব দেখতে পায় না। প্রকৃত সত্য আড়াল করার লক্ষ্যে তারা কৌশলী পন্থা অবলম্বন করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। তাদের নিয়ন্ত্রিত পত্র-পত্রিকা, রেডিও ও টিভি চ্যানেল এবং অন্যান্য প্রচার মাধ্যমের দিকে দৃষ্টি দিলেই স্পষ্ট অনুভব করা যায়, কিভাবে তারা অসত্য প্রচার করছে, প্রকৃত ঘটনার বিপরীত ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করছে, লেখা ও বলার ক্ষেত্রে ভাষার কৌশলী শব্দ ব্যবহার করছে। সুদূর অতীতকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইসলাম ও মুসলিম চেতনা বিদ্বেষী লোকজন মিথ্যা ব্যতীত সততা ও স্বচ্ছতার পরিচয় দিতে পারেনি। আল্লাহ তা'য়ালা তাদেরকে হিদায়াত দান করুন।
📄 যুদ্ধ বন্দীদের প্রতি নবী করীম (সা:) এর সীরাত
হুনাইনের প্রান্তরে মুসলিম বাহিনীর কাছে পরাজিত ইসলামের শত্রুদের কয়েক হাজার বাহিনী আওতাস নামক স্থানে এসে জমায়েত হয়েছিল। নবী করীম (সা:) দুশমনদের মুকাবেলায় হযরত আবু আমের আশয়ারী (রা:) কে কিছু সৈন্যসহ প্রেরণ করলেন। তিনি আওতাস নামক স্থানে পৌঁছার পর প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হলো। হযরত আবু আমের (রা:) প্রতিপক্ষের হাতে শাহাদাত বরণ করলেন। এমনকি তাঁর হাতের পতাকা শত্রুদের হাতে চলে গেল।
হযরত আবু আমের (রা:) এর চাচাত ভাই হযরত আবু মুসা আশয়ারী (রা:) এগিয়ে গিয়ে শত্রু পক্ষের ওপরে তীব্র আক্রমন করলেন। শত্রুপক্ষ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো। মুসলমানদের হাতে প্রচুর গণীমাতের সম্পদ জমা হলো। বহু সংখ্যক বন্দীও হলো। এই বন্দীদের মধ্যে নারী এবং শিশুও ছিল। হযরত হালিমা তুসসাদিয়া (রা:) এর বড় মেয়ে সায়মাও বন্দী হলেন, তিনি ছিলেন নবী করীম (সা:) এর দুধবোন। তাঁকে যখন বন্দী করা হয় তখন তিনি বলেছিলেন, 'আমি তোমাদের নবী মুহাম্মাদ (সা:) এর দুধবোন। আমি তাঁকে শিশুকালে কোলে রাখতাম'।
এ কথা শোনার পরে সাহাবায়ে কেরাম তাঁর কথার সততা প্রমাণের জন্য তাঁকে সম্মানের সাথে নবীর দরবারে উপস্থিত করলেন। সায়মা আল্লাহর রাসূলের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে বললো, 'হে মুহাম্মাদ (সাঃ)! আমি আপনার দুধবোন। আপনি যখন শিশু ছিলেন তখন আপনাকে আমি কোলে রাখতাম'।
মানবতার মহান মুক্তিদূত বিশ্বনবী (সা:) পলকহীন দৃষ্টিতে সায়মার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, তাঁর পবিত্র চোখ দু'টোয় অশ্রু টলমল করছে। স্মৃতিতে ভেসে উঠলো স্নেহময়ী দুধমাতা হযরত হালিমার কথা। আল্লাহর নবী উঠে দাঁড়িয়ে দুধবোন সায়মাকে সম্মান প্রদর্শন করলেন। শ্রদ্ধেয়া বড় বোনকে রেসালাতে নববীর পাশে বসার জন্য নিজের চাদর মুবারক বিছিয়ে দিলেন। নবী করীম (সা:) মমতা জড়ানো কণ্ঠে সায়মার কুশলাদি জানলেন। বোন সায়মা অবাক হয়ে শিশুকালে যাকে কোলে রাখতেন আর তাঁর প্রশংসা এবং দোয়া করে কবিতা পাঠ করতেন তাঁকে প্রাণভরে দেখলেন।
বিশ্বনবী (সা:) এর শিশুকালে সায়মা ছিলেন বয়সে কিশোরী। তিনিই শিশুনবীকে কোলে নিয়ে ঘুরতেন। শিশুনবীকে তিনি আদর করতেন আর কবিতা আকারে বলতেন, 'আমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ (সা:) জীবিত থাক। সে সুন্দর সুঠামদেহী বলিষ্ঠ যুবক হোক, আমরা তাকে দু'নয়নভরে দেখবো। নেতা হয়ে সে যেন ইয়েমেন নিজের অধিকারে নিতে পারে। তাঁর সাথে যারা শত্রুতা করবে তাদের যেন মঙ্গল না হয়। হে আল্লাহ, তাঁকে অসীম সম্মানের অধিকারী করে দাও'।
বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়লেন সায়মা। তাঁর সেই কিশোরী বয়সের প্রার্থনা মহান আল্লাহ কবুল করেছিলেন! তাঁর দুধভাই আজ আল্লাহর নবী, বিপুল ক্ষমতা এবং অতুলনীয় মর্যাদার অধিকারী। তাঁর দুধভাই তাকে ভুলে যাননি। নবী করীম (সা:) পরম মমতায় তাঁর বোনকে বললেন, 'বোন, তোমার যদি মন চায় তাহলে আমার কাছে বসবাস করতে পারো। আর যদি তুমি তোমার বাড়িতে ফিরে যেতে চাও তাহলে আমি তোমাকে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করছি'।
সায়মা নিজের পরিবার-পরিজনের কাছেই ফিরে যাবার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। আল্লাহর নবী (সা:) উপঢৌকন দিয়ে সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে দুধবোনকে যথাস্থানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলেন। শৈশবে যারাই নবী (সা:) কে স্নেহ-মমতা প্রদর্শন করেছে তিনি তাদেরকে অসীম শ্রদ্ধা করতেন এবং তাদের প্রতি তাঁর কর্তব্যবোধের কথা স্মরণ রাখতেন।
মানবতার শত্রু আবু লাহাবের দাসী সুয়ায়বার দুধ তিনি শিশুকালে কয়েক দিন পান করেছিলেন, এ কারণে সে জীবিত থাকা পর্যন্ত নবী করীম (সা:) তাঁর প্রতি যত্নের দৃষ্টি রেখেছেন, তেমনি হযরত হালিমার প্রতিও তিনি তাঁর কর্তব্য পালনে ছিলেন সজাগ। মক্কা ছেড়ে নবী করীম (সা:) যখন মদীনায় হিজরত করেছিলেন তখনও তিনি তাঁর দুধ মা সুয়ায়বার জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় ও অর্থ প্রেরণ করতেন। হযরত খাদিজার (রা:) এর সাথে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হবার পরে হযরত হালিমা রাসূল (সা:) এর কাছে এসেছিলেন। তাঁকে দেখেই তিনি নিজের পবিত্র শরীরের চাদর বিছিয়ে বসতে দিচ্ছিলেন আর বলছিলেন, 'আসুন আমার আম্মা আসুন!'
হযরত হালিমা (রা:) আল্লাহর নবীকে জানালেন, 'আমাদের অঞ্চলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ বিরাজ করছে এবং সে কারণে আমাদের পশু সম্পদ সব নিঃশেষ হয়ে গেছে'। দুধ মায়ের মুখে অভাবের কথা শুনে তিনি ৪০ টি ছাগল এবং একটি উটের ওপরে নানা ধরনের সামগ্রী দিয়ে দিলেন। ঐতিহাসিকগণ বলেছেন, হুনাইনের যুদ্ধের সময় নবীর দুধমাতা তাঁর কাছে যখন এসেছিলেন সে সময় রাসূল (সা:) নিজের পবিত্র চাদর বিছিয়ে তাকে বসতে দিয়েছিলেন। হযরত হালিমা (রা:) আল্লাহর নবীর কাছ থেকে শুনে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর কাছ থেকে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর (রা:) রেওয়ায়েত করেছেন। (ইবনুল বার-আল্ ইস্তিয়াব)
বনী সাআদ ছিল হাওয়াজেন গোত্রের একটি শাখা। সে সময় হাওয়াজেন গোত্রের খ্যাতি ছিল যে, তারা স্পষ্ট উচ্চারণে আরবী ভাষা বিশুদ্ধভাবে বলে থাকে। ইবনে সাআদ উল্লেখ করেছেন, বিশ্বনবী (সা:) বলেছেন, 'আমি তোমাদের মধ্যে উত্তম বিশুদ্ধ ভাষী। কারণ আমি কুরাইশ বংশের লোক এবং আমার ভাষা হচ্ছে হাওয়াজেন গোত্রের ভাষা'।
নবী করীম (সা:) যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন না। যদি তাদেরকে মুক্ত করার জন্য তাদের আত্মীয়-স্বজন আসে, এ জন্য তিনি কিছুদিন অপেক্ষা করলেন। অশেষে হাওয়াজেন গোত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এসে নবী করীম (সা:) এর কাছে করুণ আবেদন জানালো, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমরা ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছি কিন্তু আমাদের অপরাধ সীমাহীন। আপনি আমাদের অপরাধের দিকে অনুগ্রহ করে দৃষ্টি দিবেন না। আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের মা-বোন ও সন্তানদের ফেরৎ দিন'।
যারা বন্দীদের মুক্ত করতে এসেছিল তারা সকলেই ছিল হযরত হালিমা (রা:) এর গোত্রের। এই গোত্রের নেতা জুহায়ের ইবনে সুরাদ (রা:) আবেদন করলেন, 'বন্দীদের মধ্যে আপনার দুধমাতার আত্মীয়-স্বজন অর্থাৎ আপনার খালা, ফুফুগণ রয়েছেন। মহান আল্লাহর শপথ! আরবের রাজা-বাদশাহর মধ্যে কেউ যদি আমাদের বংশের কারো দুধপান করতো, তাহলে তার কাছে আমরা অনেক কিছুই আবদার করতে পারতাম। পক্ষান্তরে আমরা আপনার কাছে আমাদের প্রত্যাশা সবথেকে বেশি'। তাদের আরেকজন আবেদন জানালো, 'শিশুকালে আপনি আমাদের মাঝেই পালিত হয়েছেন। আজ আপনার অতুলনীয় মর্যাদা! শৈশবের কথা স্মরণ করে আপনার দুধমাতার আত্মীয়দের মুক্তি দিন'।
তাদের কথা শুনে শৈশবের স্মৃতি এসে নবী করীম (সা:) কে নাড়া দিয়ে গেল। তিনি তাদেরকে একদিন অপেক্ষা করতে বললেন। সাহাবায়ে কেরামের সাথে তিনি পরামর্শ করে বললেন, 'আমার গোত্রের যে দাবী আছে বন্দীদের ওপর আমি তা ত্যাগ করছি'। রাসূল (সা:) এর কথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম জানালেন, 'আমরাও বন্দীদের প্রতি আমাদের দাবী ত্যাগ করছি'।
দুইজন অমুসলিম তাদের দাবী ছাড়লো না। নবী করীম (সা:) তাদেরকে বললেন, 'তোমরা তোমাদের দাবী ত্যাগ করো, তোমাদের যা প্রাপ্য আমি আদায় করবো। আমিই তোমাদের প্রাপ্য শোধ করবো'।
আল্লামা শিবলী (রাহ:) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা:) হাওয়াজেন গোত্রের লোকদেরকে বলেছিলেন, 'আমি আমার গোত্রের লোকদের নির্ধারিত অংশ ত্যাগ করতে পারি। তোমরা এমন করতে পারো, নামাজ আদায় শেষে সমবেত লোকদের সামনে তোমাদের আবেদন পেশ করো'।
তাঁরা রাসূল (সা:) এর পরামর্শ অনুযায়ী যুহরের নামাজ শেষে আবেদন করলে নবী করীম (সা:) নিজের গোত্রের অধিকার ত্যাগ করার কথা ঘোষণা করেন। তাঁর ঘোষণা শুনে সকল সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের অধিকার ত্যাগের ঘোষণা দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রায় ছয় হাজার নারী, শিশু, বালক-বালিকা মুক্তি লাভ করেছিল। এতগুলো মানুষকে দীর্ঘ প্রায় এক মাস প্রতিপালন করতে গিয়ে মুসলমানদের প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়েছিল। নবী করীম (সা:) কোনো বিনিময় গ্রহণ করলেন না। শুধু তাই নয়, প্রতিটি বন্দীকে নতুন পোষাক দিয়ে তিনি বিদায় করেছিলেন। পৃথিবীতে যুদ্ধ বন্দীদের প্রতি এমন অপূর্ব ব্যবহার অন্য কোনো জাতির ইতিহাসে নেই। আধুনিক যুগের গণতন্ত্রের দাবীদাররা সম্পদের লোভে শুধু ভিন্ন দেশ দখলই করছে না, দেশ দখলে যেসকল দেশ প্রেমিকগণ বাধা দিয়েছে, যুদ্ধবন্দীর নামে তাদেরকে গ্রেফতার অবর্ণনীয় নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করছে। এরাই লুণ্ঠিত সম্পদ ব্যবহার করে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে সমগ্র পৃথিবীব্যাপী অপপ্রচার করছে।
📄 নবী করীম (সা:) করুণার সিন্ধু
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমগ্র সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা এবং একচ্ছত্র অধিপতি। আল্লাহ তা'য়ালা যা কিছুই সৃষ্টি করেছেন এসব সকল সৃষ্টির জন্যে তিনি যেমন পরম করুণাময় তেমনি তিনি যে মহান ব্যক্তিত্বকে সর্বশেষ ও বিশ্বনবী হিসাবে প্রেরণ করেছেন তাঁকেও তিনি সমগ্র সৃষ্টির জন্যে করুণা হিসাবেই প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রিয় নবীকে লক্ষ্য করে বলেছেন-
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ হে নবী, আমি আপনাকে সৃষ্টিকুলের 'জন্যে রহমত হিসাবে প্রেরণ করেছি। (সূরা আম্বিয়া-১০৭)
আক্ষরিক অর্থেই নবী করীম (সা:) ছিলেন সমগ্র সৃষ্টিকুলের জন্য করুণার মূর্ত প্রতীক তথা মহান আল্লাহর অসীম রহমত বিশেষ। মাতৃগর্ভে থাকাকালে পিতাকে হারিয়েছেন, শিশুকালে মমতাময়ী মা'কে হারিয়েছেন, মাত্র আট বছর বয়সে স্নেহদাতা দাদাকে হারিয়েছেন। পরম শ্রদ্ধেয় চাচা আবু তালেবের স্নেহের ছায়াতলে বড় হয়েছেন। তাঁর সারাটি জীবনই দুঃখ আর কষ্টের বাস্তব উপখ্যান। সকল দুঃখ তিনি ভোগ করেছেন, কিন্তু কখনো কাউকেই সামান্যতম কষ্ট দেননি। কাউকে আঘাত করা তো অনেক দূরের ব্যাপার, কারো প্রতি কখনো রূঢ় আচরণ করেননি। কখনো কটু কথা পবিত্র মুখে উচ্চারণ করেননি। কাউকে অভিশাপ বা বদদোয়া দেননি। অন্যের কষ্ট তিনি ভাগ করে নেননি বরং কষ্টের সবটুকুই তিনি নিজ কাঁধে উঠিয়ে অন্যকে ভারমুক্ত করে সকল কষ্ট লাঘব করেছেন।
নারী সমাজকে অমর্যাদা, ঘৃণা, লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের অতল গহ্বর থেকে উঠিয়ে মর্যাদার আসনে আসীন করে দিয়েছেন। ক্রীতদাসদের গোলামীর জিঞ্জির মুক্ত করে স্বাধীন করে দিয়েছেন। যুদ্ধবন্দীদের প্রতি করুণার বাহু বিছিয়ে দিয়েছেন। অভাবী দরিদ্রদের খাদ্য পৌঁছে দিয়ে নিজে অভুক্ত থেকেছেন। অবহেলিত বিধবাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন। ইয়াতিমদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করেছেন। রোগীর সেবা করেছেন এবং অসহায় মানুষের সহায় হয়েছেন। ছোটদের গভীর স্নেহের বাঁধনে বন্ধু বানিয়েছেন এবং বড়দের একান্ত সম্মানে আপুত করেছেন। জীবনের শত্রুকে হাতের নাগালে পেয়েও ক্ষমার অনুপম সাগরে সিক্ত করেছেন। অবলা প্রাণীর প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং অন্যদেরকেও প্রাণীর প্রতি মমতাপূর্ণ আচরণ করতে শিখিয়েছেন। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন। নবী করীম (সা:) এর এসব অতুলনীয় গুণ-বৈশিষ্টের বর্ণনা দিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন-
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُوَلٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ فَإِنَّ تَوَلَّوْا فَقُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ ط عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ
(হে মানুষ,) তোমাদের কাছে তোমাদেরই মধ্য থেকে এক রাসূল এসেছেন, তোমাদের কোনোরকম কষ্ট ভোগ তাঁর কাছে দুঃসহ, তিনি তোমাদের একান্ত কল্যাণকামী, ঈমানদারদের প্রতি তিনি হচ্ছেন স্নেহপরায়ণ ও পরম দয়ালু। এরপরও যদি এরা (এমন একজন কল্যাণকামী রাসূলের কাছ থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে আপনি (তাদের খোলাখুলি) বলে দিন, আল্লাহ তা'য়ালাই আমার জন্যে যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত আর কোনো মাবুদ নেই; (সমস্যায় সঙ্কটে আমি তাঁর ওপরই ভরসা করি এবং তিনিই হচ্ছেন মহান আরশের একচ্ছত্র অধিপতি। (সূরা তাওবা-১২৮-১২৯)
মহান আল্লাহ তা'য়ালা অন্যান্য যেসকল নবী-রাসূল প্রেরণ করেছিলেন তাঁরা তাওদীদের দাওয়াত দিতে গিয়ে নিজ জাতি এমনকি সবথেকে নিকটতম লোকদের কাছ থেকেও অবর্ণনীয় নির্যাতন, নিপীড়ন ও লাঞ্ছনা সহ্য করেছেন। কিন্তু নির্যাতন যখন সকল সীমা অতিক্রম করেছে তখন কোনো কোনো নবী-রাসূল মহান আল্লাহর কাছে বদোয়া করতে বাধ্য হয়েছেন। যেমন হযরত নূহ (আ:) নিজ জাতির বিরুদ্ধে মহান আল্লাহর কাছে অভিযোগ করেছেন-
قَالَ نُوْحٌ رَّبِّ إِنَّهُمْ عَصَوْنِي وَاتَّبَعُوا مَنْ لَّمْ يَزِدْهُ مَالُهُ وَوَلَدُهُ إِلَّا خَسَارًا ج وَمَكَرُوا مَكْرًا كَبَّارًا ج
নূহ বললো, হে আমার মালিক, আমার জাতির লোকেরা আমার কথা অমান্য করেছে, (আমার বদলে) তারা এমন কিছু লোকের অনুসরণ করেছে যাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তাদের বিনাশই বৃদ্ধি করেছে, তারা সত্যের বিরুদ্ধে সাংঘাতিক ধরনের এক ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। (সূরা নূহ-২১-২২)
অবাধ্যতার চরম সীমা অতিক্রম করার পরে হেদায়াতের সকল আশা যখন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছে তখন হযরত নূহ (আ:) মহান আল্লাহর কাছে নিজ জাতির ধ্বংস কামনা করে আবেদন করেছেন-
وَقَالَ نُوْحٌ رَّبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا - إِنَّكَ إِنْ تَذَرْهُمْ يُضِلُّوا عِبَادَكَ وَلَا يَلِدُوا إِلَّا فَاجِرًا كَفَّارًا - رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَنْ دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ طَ وَلَا تَزِدِ الظَّالِمِينَ إِلَّا تَبَارَاعِ
নূহ (আরও) বললো, হে আমার মালিক, এ যমীনের অধিবাসী (যালিমদের) একজন (গৃহবাসী)-কেও তুমি (আজ শাস্তি থেকে) রেহাই দিয়ো না, (আজ) যদি তুমি এদের (শাস্তি থেকে) অব্যাহতি দাও, তাহলে এরা (পুনরায়) তোমার বান্দাদের পথভ্রষ্ট করে দেবে (শুধু তাই নয়), এরা (ভবিষ্যতেও) দুরাচার পাপী কাফির ছাড়া কাউকেই জন্ম দিবে না। হে আমার প্রতিপালক, তুমি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে তোমার ওপর ঈমান এনে যারা আমার (সাথে ঈমানের এই) ঘরে আশ্রয় নিয়েছে, এমন সব ব্যক্তিদের এবং সব ঈমানদার পুরুষ ও মহিলাদের ক্ষমা করে দাও, যালিমদের জন্যে চূড়ান্ত ধ্বংস ছাড়া কিছুই তুমি বৃদ্ধি করো না। (সূরা নূহ-২৬-২৮)
এবার নবী করীম (সা:), যাঁকে মহান আল্লাহ তা'য়ালা 'করুণার মূর্ত প্রতীক' হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন তাঁর জীবনের দিকে লক্ষ্য করি। নিজ জন্মস্থান মক্কায় অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শিয়াবে আবি তালেবে নির্যাতিত হলেন, তায়েফে গেলেন সেখানেও লোমহর্ষক নির্যাতনের শিকার হলেন। মদীনার জীবনে ওহূদ ও অন্যান্য স্থানে অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হলেন। মক্কায় পবিত্র কা'বা ঘরে তিনি নামাজে দাঁড়িয়েছেন, দুশমনরা তাঁর পবিত্র কন্ঠে রশি পেঁচিয়ে দু'দিক থেকে টেনে ধরেছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে চোখ দু'টো কোঠর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। নামাজে তিনি সিজদায় গিয়েছেন, উটের পচা নাড়িভূড়ি তাঁর মাথার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, তিনি যে পথ দিয়ে হেঁটেছেন সে পথে কাঁটা বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। ওহূদের ময়দানে দাঁত মুবারক শহীদ হয়েছে, তিনি রক্তাক্ত হয়েছেন। জীবনের এই চরম মুহূর্তেও তিনি নিজ জাতির জন্য আতঙ্কিত হয়েছেন, আল্লাহ তা'য়ালা তাদের ওপর গযব নাযিল করেন কিনা। এ আশঙ্কায় তিনি মহান মালিকের কাছে নিজ জাতির জন্যে দোয়া করেছেন-
اللَّهُمَّ اهْدِ قَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ
'হে আমার আল্লাহ, আমার জাতিকে হিদায়াত দাও, ওরা জানে না'।
অর্থাৎ আমি যে নবী, আমি ওদের কল্যাণকামী তা ওরা বুঝতে পারেনি, এ জন্যেই আমার প্রতি ওরা আঘাত করেছে। ওরা বুঝে না, তুমি ওদের ওপর গযব দিও না।
নবী করীম (সা:) মক্কা বিজয় করলেন। অত্যাচারী জালিমদের আঙ্গিনায় প্রতিশোধের খড়গ কৃপাণ নিয়ে তিনি এবং নির্যাতিত সাহাবায়ে কেরাম মক্কায় উপস্থিত হননি। এক সময় যারা ছিলেন জালিম অত্যাচারী তাদের আঙ্গিনায় করুণার সিন্ধু প্রবাহিত হলো। যারা তাঁকে হত্যা করার জন্য তাঁর ঘর পরিবেষ্টন করেছিল, তারাও সেদিন সেই করুণার সাগরে অবগাহন করার সুযোগ লাভ করলো। ইসলাম পূর্ব আরবে এক ঘৃণ্য প্রথা শতাব্দী ব্যাপী প্রতিষ্ঠিত ছিল, কোনো ব্যক্তি যদি নিহত হতো, তাহলে তার গোত্রের লোকজন মনে করতো যে, হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করা অবশ্য কর্তব্য। নিহত ব্যক্তির হত্যাকারীকে যদি তারা ধরতে না পারতো, তাহলে তার নাম পরিচয় তারা লিখে রাখতো। ক্ষেত্র বিশেষে তারা প্রতীজ্ঞা করতো, হত্যাকারীর মাথার খুলিতে তারা মদ পান করবে। বংশের লোকদেরকে তারা প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য অনুপ্রাণিত করতো। আরবদের বিশ্বাস ছিল, কেউ কাউকে হত্যা করলে সেই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ গ্রহণ না করলে নিহত ব্যক্তির আত্মা সাদা রংয়ের পাখি হয়ে পাহাড়-পর্বতে উড়তে থাকে আর বলতে থাকে, 'আমাকে পান করাও! আমাকে পান করাও!' আবার কারো ধারণা ছিল, যে ব্যক্তি নিহত হয় তার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করলে সে ঐ জগতে জীবিত থাকে। আর প্রতিশোধ গ্রহণ না করলে ঐ জগতে সে মরে যায়।
আবার কারো ধারণা ছিল, হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ না করলে নিহত ব্যক্তির কবর অন্ধকারে ছেয়ে থাকে। প্রতিশোধ গ্রহণ করা হলে তার কবর আলোকিত হয়। এই সকল অমূলক বিশ্বাসের কারণে যুদ্ধের আগুন কখনো নির্বাপিত হয়নি। এভাবে যুদ্ধ করা বা প্রতিশোধ গ্রহণ করা ছিল তাদের কাছে এক সম্মানজনক ব্যাপার।
বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে নবী করীম (সা:) ঘোষণা করলেন, 'এক আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক এবং অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আজ তিনি তাঁর অঙ্গিকার পূর্ণ করেছেন। তিনি তাঁর গোলামকে সাহায্য করেছেন এবং সত্যের শত্রুদেরকে স্তব্ধ করেছেন। সকল অহংকার এবং পূর্বের রক্তের বদলা, রক্তের বাঁধন সবই আমার পায়ের নীচে দলিত হলো। আজ এসব কিছুই আমার পায়ের নীচে কবর দিলাম'।
নবী করীম (সা:) তাঁর ভাষণের সমাপ্তিতে সামনে বিশাল জনসমুদ্রের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। তাঁর পবিত্র সুন্দর চোখ দু'টো যেন করুণার সিন্ধুর মতই হয়ে এলো। তিনি দেখলেন, ঐ লোকগুলো তাঁর মুখের দিকে আজ অসহায়ের মতই এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখের ভাষায় ফুটে উঠেছে অসহায়ত্ব আর ক্ষমার আকুতি।
নির্যাতিত নবী দেখছেন, ঐ তো-ঐ লোকগুলোর সাথেই তারা মিলে মিশে আজ একাকার হয়ে তাঁর সামনে বসে আছে, যে লোকগুলোকে সত্য গ্রহণের অপরাধে তারা জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপরে চিৎ করে শুইয়ে বুকের ওপর পাথর চাপা দিয়েছে। হযরত বিলাল (রা:) এর গলায় রশি বেঁধে কাঁটা ও পাথরের ওপর দিয়ে টেনে হিচড়ে নিয়ে গিয়েছে, বিলালের দেহের গোস্ত চামড়া ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়েছে। খাব্বাবের শরীরে এখনো সে ক্ষত দগদগ করছে। শিয়াবে আবু তালিবে দিনের পর দিন অনাহারে থাকতে বাধ্য করেছে। ঐ তো সেই লোকগুলো। অনাহারের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তাঁর প্রিয় খাদিজা ঐ যে ভেঙ্গে পড়লেন, তাঁর আশ্রয়দাতা চাচা আবু তালিব ভেঙ্গে পড়লেন, আর উঠতে পারলেন না। আবু জাহিলের সাথে মিলে সুমাইয়াকে যারা হত্যা করেছিল তারাও তো অবনত মস্তকে বসে আছে।
তাঁর প্রিয় চাচা হামজার কলিজা যারা চিবিয়ে ছিল, তারাও আছে। তাঁর গর্ভবতী মেয়ে যয়নবকে আঘাত করে উটের ওপর থেকে নীচে ফেলে গর্ভের সন্তানকে হত্যা করেছিল, তারাও বসে আছে। তাঁকে যারা সীমাহীন কষ্ট দিয়েছে তারাও মাথা নীচু করে বসে আছে। তাঁকে যারা হত্যা করার জন্য অগ্রসর হয়েছিল, তাঁর সেই প্রাণের শত্রুও অবনত মস্তকে বসে আছে। বদর ওহুদ খন্দকে যারা রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল, তারাও তাঁর সামনে বসে আছে।
বিশ্বনবী (সা:) তাদের দিকে তাঁর পবিত্র নয়নযুগল- করুণার সিন্ধু প্রবাহিত করলেন। তারপর গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করলেন, 'তোমাদের কি জানা আছে, আজ আমি তোমাদের সাথে কেমন ব্যবহার করবো?'
সমবেত অপরাধীগণ সমস্বরে বলে উঠলো, 'আপনি আমাদের সম্মানিত ভাই, আমাদের মর্যাদাবান ভাতিজা!'
করুণার সাগরে প্লাবন সৃষ্টি হলো। তরঙ্গের পরে তরঙ্গ আছড়ে পড়লো প্রাণের শত্রুদের ওপর। নবী করীম (সা:) মমতা সিক্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, 'আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আজ তোমরা সবাই মুক্ত'।
ইউরোপের লেখকদের চোখে এই দৃশ্য কি ধরা পড়েনি? আপনারা পরাজিত জাতির সাথে কি ধরনের আচরণ করেছেন এবং করেন, পৃথিবীবাসীর তা জানা আছে। যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে আমেরিকা হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে কি করেছে, পৃথিবীর মানুষ সে নৃশংস ঘটনা কি কখনো ভুলে যাবে? বিশ্বনবী (সা:) মক্কা বিজয় পর্যন্ত পৌঁছলেন, এর পেছনে কি তাঁর কোনো উচ্চাশা কার্যকর ছিল? আপনাদের একজন লেখক জোসেফ হেল বলেছেন, 'Thus Mohammad attained the summit of his ambition. অর্থাৎ এভাবে মুহাম্মাদ (সা:) তাঁর উচ্চাকাংখার চরম শিখরে উপনীত হন'।
ইসলাম বিদ্বেষী এ লোকটি কিভাবে নবী করীম (সা:) এর উচ্চাশার কথা বললেন, ভাবতে অবাক লাগে। আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব তিনি পালন করলেন মাত্র, এখানে উচ্চাকাংখা এলো কোত্থেকে? তিনি মক্কার লোকদের সাথে যে ব্যবহার করলেন, যে ভঙ্গিতে তিনি মক্কায় প্রবেশ করলেন, এগুলো কি একজন উচ্চাকাংখী মানুষের চারিত্রিক অলংকার? হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবু বকর (রা:) বলেন, 'আমি দেখলাম, রাসূল (সা:) বিজয়ী হতে যাচ্ছেন। এ সময়ে তিনি উটের ওপরে বসা অবস্থায় মহান আল্লাহর কাছে এতই কৃতজ্ঞশীল ছিলেন যে, তিনি মাথা নীচু করেছিলেন। তাঁর পবিত্র মাথা এতটাই নীচু হয়েছিল যে, তাঁর পবিত্র দাড়ি মোবারক উটের পিঠ স্পর্শ করছিলো'। একজন উচ্চাকাংখা পোষণকারী ব্যক্তি বিজিত এলাকায় কখনো এই ভঙ্গীতে প্রবেশ করেন?
তাঁর যদি উচ্চাকাংখাই থাকবে তাহলে তিনি অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার করলেন কেন? চাচা আবু তালিব জীবিত থাকতেই তো মক্কার নেতৃবৃন্দ তাকে অর্থ বিত্ত, সুন্দরী নারী দিতে চেয়েছিল। তাঁকে দেশের শাসকের পদে অভিষিক্ত করতে চেয়েছিল। উচ্চাকাংখা থাকলে তখনই তো তিনি তাদের প্রস্তাবে রাজী হতেন। তারা যে জেনে বুঝেই নবী করীম (সা:) এর ক্ষেত্রে এই ধরনের ধৃষ্টতা পূর্ণ বাক্য ব্যবহার করে থাকেন এতে কোন সন্দেহ নেই। বিশ্বনবী (সা:) এর ক্ষেত্রে ইংরেজি Ambition শব্দ বা বাংলা 'উচ্চাকাংখা' শব্দ ব্যবহার করা চরম ধৃষ্টতার শামিল।