📄 বিশ্বনবী (সা:) এর ঘোষণা পত্র
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
মুহাম্মাদ (সা:), কুরাইশ এবং মদীনার মুসলমানগণ, পরে যারা ইসলাম গ্রহণ করবে এবং তাদের সাথে একাকার হবে, জিহাদে যোগ দিবে তাদের পক্ষ থেকে এটি একটি সনদপত্র। সকল মানব জাতির মধ্যে তাঁরা একটি পৃথক এবং স্বতন্ত্র জাতি বা উম্মাহ। কুরাইশদের মধ্য থেকে যারা এসেছে, তাঁরা ইসলাম গ্রহণের সময় যেমন ছিল তেমনই থাকবে। তাদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার যে নীতি ছিল তা বহাল থাকবে। তাঁরা বন্দীদেরকে ন্যায়সঙ্গত উপায়ে একে অপরের কাছে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে মুক্তিপণ গ্রহণ করে মুক্তি দিতে পারবে।
বনী আউফ গোত্র ইসলাম গ্রহণ করার সময় যে অবস্থায় ছিল তাঁরা সে অবস্থাতেই বহাল থাকবে। তাদের একে অপরের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার পুরোনো নীতি বহাল থাকবে। প্রতিটি সম্প্রদায়ের মুসলমানদের মধ্যে মুক্তিপণ গ্রহণ করে বন্দীকে মুক্তি দেয়ার আইন বহাল থাকবে। বনী সায়েদা গোত্র যে অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাঁরা সে অবস্থাতেই থাকবে। তাদের প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মুসলমানদের মধ্যে মুক্তিপণ গ্রহণ করে বন্দীকে মুক্তি দেয়া যাবে।
বনী হারেস গোত্র যে অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাঁরা সেই অবস্থার ওপরেই থাকবে। তাদের পরস্পরের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার সাবেক নীতি বহাল থাকবে। তাদের প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মুসলমানদের মধ্যে মুক্তিপণ গ্রহণ করে বন্দীকে মুক্তি দেয়া যাবে। বনী জুশাম গোত্র যে অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাঁরা সেই অবস্থার ওপরেই থাকবে। তাদের প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মুসলমানদের মধ্যে মুক্তিপণ গ্রহণ করে বন্দীকে মুক্তি দেয়া যাবে। বনী নাজ্জার গোত্র ইসলাম গ্রহণ করার সময় যে অবস্থায় ছিল তাঁরা সে অবস্থাতেই বহাল থাকবে। তাদের একে অপরের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ন্যায়সঙ্গত, গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে মুক্তিপণ গ্রহণ করে মুক্তি দিতে পারবে।
বনী আমর ইবনে আউফ গোত্র যে অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাঁরা সেই অবস্থার ওপরেই থাকবে। তাদের একে অপরের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ন্যায়সঙ্গত, গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে মুক্তিপণ গ্রহণ করে মুক্তি দিতে পারবে। বনী নাবিত গোত্র ইসলাম গ্রহণ করার সময় যে অবস্থায় ছিল তাঁরা সে অবস্থাতেই বহাল থাকবে। তাদের একে অপরের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার পুরোনো নীতি বহাল থাকবে। ন্যায় সঙ্গত, গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে মুক্তিপণ গ্রহণ করে বন্দীকে মুক্তি দিতে পারবে।
বনী আওস গোত্র যে অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাঁরা সেই অবস্থার ওপরেই থাকবে। তাদের একে অপরের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ন্যায়সঙ্গত, গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে মুক্তিপণ গ্রহণ করে বন্দীকে মুক্তি দিতে পারবে। মুসলমানগণ তাদের ঋণগ্রস্ত এবং অধিক সন্তানের অধিকারী ব্যক্তিদেরকে ক্ষতিপূরণ ও মুক্তিপণ দিয়ে ন্যায়ানুগ পদ্ধতিতে অর্থ সাহায্য করবে। এক মুসলমান আরেক মুসলমানের মিত্রের বিরোধিতা করবে না। মুসলমানগণ তাদের বিদ্রোহী, অত্যাচারী, অপরাধী, সমাজ বিরোধি, সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী, সমাজের ক্ষতিকারীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ ক্ষেত্রে অপরাধী কার কে তা বিবেচনা করে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে না।
ইসলাম বিরোধিদের স্বার্থে এক মুসলমান আরেক মুসলমানকে হত্যা করবে না। কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধে ইসলামের শত্রুকে সাহায্য করা যাবে না। ইসলামী রাষ্ট্রে অনুগত অমুসলিমদের অধিকার সমানভাবে নিরাপদ। যে কোনো শ্রেণীর অমুসলিমকে মুসলমানরা পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে আশ্রয় দিবে। এক মুসলমান আরেক মুসলমানের মিত্র হয়ে থাকবে। তবে অন্যদের ক্ষেত্রে এ নীতি প্রযোজ্য নয়।
ইয়াহুদীদের মধ্যে যে ব্যক্তি মুসলমানদের আনুগত্য করবে এবং অনুসরণ করবে সে ব্যক্তি মুসলমানদের অনুরূপ অধিকার ভোগ করবে। এ ধরনের কোনো ব্যক্তির প্রতি অত্যাচার হতে দেয়া যাবে না। এ ধরনের ব্যক্তির ওপর কেউ আক্রমণ করলে আক্রমণকারীকে সাহায্য করা যাবে না। মুসলমানদের রক্ষাকবচ সকলের ক্ষেত্রে এক এবং অভিন্ন।
ইসলামের স্বার্থে যুদ্ধ সংঘটিত হলে সে যুদ্ধে মুসলমান কোনো অমুসলিমের সাথে সমতা ও ন্যায়ের ভিত্তি ব্যতীত আপোষ করবে না। মুসলমানদের মধ্য থেকে যুদ্ধের এক বাহিনী আরেক বাহিনীকে অনুসরণ করবে। মুসলমানগণ আল্লাহ তা'য়ালার আইন অনুসারে হত্যার বিনিময়ে হত্যা করতে পারবে।
আল্লাহভীরু মুসলমানগণ সর্বশ্রেষ্ঠ এবং শক্তিশালী আদর্শের ওপরে দণ্ডায়মান। মদীনার কোনো অমুসলিম মক্কার কোনো কুরাইশের প্রাণ বা সম্পদের রক্ষাকারী হতে পারবে না। কোনো মুসলমানের ক্ষতি করার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে না বা প্রশ্রয় দিবে না। কোনো মুসলমানকে ন্যায়সঙ্গত কারণ ব্যতীত হত্যা করলে এবং তা প্রমাণীত হলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। অবশ্য নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাদের কাছ থেকে ক্ষমা ভিক্ষা করলে প্রাণদণ্ড হবে না। তবে যে কোনো অবস্থায় মুসলমানগণ সবাই মুসলিম হত্যাকারীর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করবে এবং কোনো অবস্থাতেই হত্যাকারীর পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করা মুসলমানদের জন্য বৈধ হবে না।
এই সনদপত্রকে যারা গ্রহণ করেছে এবং যারা আল্লাহ তা'য়ালা ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এমন কোনো মুসলমানের পক্ষে ইসলামের মধ্যে নতুন কোনো প্রথা সংযোজনকারীকে (অর্থাৎ বিদয়াত সৃষ্টিকারীকে) কোনো প্রকার সাহায্য করা বা প্রশ্রয় বা আশ্রয় দেয়া হালাল নয়। বিদয়াত সৃষ্টিকারীকে যে ব্যক্তি কোনো ধরনের সাহায্য করবে বা আশ্রয়- প্রশ্রয় দিবে তার প্রতি আল্লাহ তা'য়ালার অভিশাপ এবং কিয়ামতের দিন তার প্রতি আল্লাহ তা'য়ালার গযব অবতীর্ণ হবে। তার পক্ষে (বিদয়াত সৃষ্টিকারীর) কোনো সুপারিশ বা পণ গ্রহণ করা হবে না।
তোমাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতানৈক্য দেখা দিলে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার জন্য তোমরা আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করবে। ('নবী করীম (সা:) এর অবর্তমানে কুরআন ও হাদীস থেকে সমাধান গ্রহণ করতে হবে')
মুসলমানরা যতদিন যুদ্ধ পরিচালনা করবে ততদিন ইয়াহুদীরা যুদ্ধের খরচ বহনে অংশগ্রহণ করবে। বনী আওফের ইয়াহুদীরা ও তাদের মিত্ররা মুসলমানদের সাথে একই উম্মাহ বলে পরিগণিত হবে। এ ক্ষেত্রে তারা যার যার ধর্ম পালন করবে। তবে যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় বা অপরাধমূলক কাজে অংশগ্রহণ করবে সে ব্যক্তি তার এবং তার পরিবার-পরিজনের ধ্বংস ডেকে আনবে।
বনী নাজ্জারভুক্ত ইয়াহুদীদের অধিকার বনী আওফের ইয়াহুদীদের অনুরূপ। এভাবে বনী শুতাইবা, বনী হারেস, বনী সালাবা, বনী সায়েদা, বনী আওস ও বনী জুশামের ইয়াহুদীদের অধিকার বনী আওফের ইয়াহুদীদের অনুরূপ। তবে যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় বা অপরাধমূলক কাজে অংশগ্রহণ করবে সে ব্যক্তি তার এবং তার পরিবার-পরিজনের ধ্বংস ডেকে আনবে। বনী সালাবার যে কোনো ধরনের প্রকাশ্য বিষয় তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের সমপর্যায়ে তাদের প্রাণের মতই সম্মানিত। আনুগত্য এবং অঙ্গিকার পালনে সকলকে যেন পাপের অনুষ্ঠান থেকে হেফাজত করে।
বনী সালাবার মিত্রদের অধিকার তাদের অধিকারের অনুরূপ। ইয়াহুদীদের অভ্যন্ত রীণ বিষয় তাদের প্রাণের মতই সম্মানিত। তবে ইয়াহুদীদের মধ্যে কেউই মুহাম্মাদ (সা:)-এর অনুমতি ব্যতীত মদীনার বাইরে গমন করতে পারবে না। প্রতিটি ব্যক্তির স্মরণে রাখা প্রয়োজন, কোনো ধরনের যুক্তিতর্ক দিয়ে আগুন থেকে নিরাপদ থাকা যাবে না। যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করলো, সে ব্যক্তি তার পরিবার-পরিজনের ধ্বংসের বিনিময়েই তা করলো। তবে নিহত ব্যক্তি যদি হত্যাযোগ্য অপরাধ করে থাকে তাহলে সেটা ভিন্ন বিষয়। মহান আল্লাহ তা'য়ালা এ ক্ষেত্রে ক্ষমা পছন্দ করেন। ইয়াহুদীদের ব্যয়ভার তারা স্বয়ং এবং মুসলমানদের ব্যয়ভার তারা স্বয়ং বহন করবে। অর্থাৎ যার যার ব্যয়ভার সেই বহন করবে।
এই ঘোষণাপত্র যারা গ্রহণ করেছে তাদের মধ্যে কেউ যুদ্ধরত থাকলে তাকে সবাই সাহায্য করবে, একে অপরের কল্যাণ কামনা করবে, একে অপরকে পরামর্শ দিবে, একে অপরের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে। কোনো অন্যায় বা পাপ কাজে কেউ কাউকে সাহায্য করবে না। নিজের মিত্রশক্তির ক্ষতিসাধন করা ভয়ংকর এবং ক্ষমাহীন অপরাধ, অত্যাচারিতকে সাহায্য করা সবার দায়িত্ব।
মুসলমানরা যতদিন যুদ্ধ পরিচালনা করবে ততদিন ইয়াহুদীরা যুদ্ধের খরচ বহনে অংশগ্রহণ করবে। (এখানে প্রকাশ থাকে যে, এই সনদপত্র প্রস্তুত করার সময় কোনো অমুসলিমের প্রতি জিজিয়া আরোপ করা হয়নি এমনকি ইয়াহুদীরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে তাদেরকে গণিমতের সম্পদে অংশ দেয়া হতো। এ কারণে এই সনদপত্রে ইয়াহুদীদের যুদ্ধের খরচে অংশগ্রহণ করা বাধ্যতামূলক ছিল) এই সনদ পত্রে যারা অংশগ্রহণ করেছে তাঁরা মদীনার অভ্যন্তরে সম্পূর্ণ নিরাপদ।
প্রতিবেশী যদি অপরাধী বলে প্রমাণীত না হয় এবং তার দ্বারা কোনো ক্ষতি না হয় তাহলে তার সকল কিছুই নিজের সকল কিছুর মতই নিরাপত্তার অধিকারী। কারো বাড়ির আঙ্গিনায় বাড়ির মালিকের অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করা যাবে না। এই সনদপত্রে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কোনোরূপ মতানৈক্য দেখা দিলে তা সমাধানের জন্য আল্লাহ তা'য়ালা এবং তাঁর রাসূলের কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা পরিপূর্ণ সততা ও সর্বাধিক সতর্কতার সাথে এই সনদপত্রের বাস্ত বায়ন দেখবেন।
আবারো স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে, মক্কার কুরাইশ ও তাদের সাহায্যকারীকে কোনোরূপ সহযোগিতা করা যাবে না। মদীনা আক্রান্ত হলে সকলেই ঐক্যবদ্ধভাবে মুকাবেলা করবে। সন্ধি ও মৈত্রী স্থাপনের জন্য আহ্বান জানানো হলে সকলেই তা পালন করবে এবং এ ব্যাপারে মুসলমানগণও বাধ্য। তবে যে বা যারা ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে, তার বা তাদের সাথে কোনো সন্ধি বা মৈত্রী স্থাপন করা যাবে না। সাধারণ কেউ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে সে তার প্রাপ্য অংশ তার কাছে থেকেই গ্রহণ করবে, যে তাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়েছে।
আওস গোত্রের ইয়াহুদীদের, তাদের মিত্রদের অধিকার এবং দায়-দায়িত্ব এই সনদপত্র গ্রহণকারীদের অধিকার ও দায়দায়িত্বেরই অনুরূপ। তারা এই সনদপত্র প্রস্তুতকারীদের কাছ থেকে পূর্ণ ন্যায়-সঙ্গতভাবে লাভ করতে পারবে। কেউ যখন সত্যে ফিরে আসবে তখন তার পূর্বের অপরাধ ক্ষমা করা হবে। কেউ অন্যায় করলে তা তার নিজেরই সর্বনাশ ডেকে আনবে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা পরিপূর্ণ সততা ও সর্বাধিক সতর্কতার সাথে এই সনদপত্রের বাস্তবায়ন দেখবেন।
এই সনদপত্র কোনো অপরাধীর রক্ষাকবচ নয়। কোনো ধরনের অপরাধ বা অত্যাচারের সাথে জড়িত না থাকলে যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরে আসা বা যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করা লোকও মদীনার সীমানার ভেতরে নিরাপত্তা লাভ করবে। যে ব্যক্তি ন্যায়ের পথে অবস্থান করবে এবং আল্লাহ তা'য়ালাকে ভয় করবে, ইসলামের পথে অটল থাকবে, স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা এবং তাঁর রাসূল সেই ব্যক্তির আশ্রয়দাতা হবেন এবং তাঁর সহায়তা করবেন। (সীরাতে ইবনে হিশাম)
তদানীন্তন পরিবেশ পরিস্থিতির অনুকূলে এই সনদপত্র প্রণয়ন করা হলেও বর্তমান পৃথিবীতে এর উপযোগীতা সমভাবে বিদ্যমান। রাষ্ট্র বিজ্ঞানীগণ এই সনদপত্র ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে নানা ধরণের ধারা-উপধারায় বিভক্ত করেছেন। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কত সুন্দর নীতিই না গ্রহণ করা হয়েছিল মদীনার ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র যতক্ষণ ক্ষতিকর বলে প্রমাণ না হবে, ততক্ষণ সে রাষ্ট্রের সকল কিছুই নিরাপত্তা লাভ করবে, যে ধরনের নিরাপত্তা ইসলামী রাষ্ট্র তার নিজের ব্যাপারে গ্রহণ করে থাকে。
কারো বাড়িতে বাড়ির মালিকের অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করা যাবে না। এ কথা দিয়ে যেমন ব্যক্তির বাড়ীকে বুঝানো হয়েছে তেমনি বুঝানো হয়েছে, কোনো রাষ্ট্রে আগ্রাসন চালানো যাবে না। কোনো অপরাধীকে সাহায্য সহযোগিতা করা যাবে না। যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে। তবে রাষ্ট্র এবং সমাজ এ সকল দিক পরিচালিত হবে মহান আল্লাহ তা'য়ালা দেয়া বিধান অনুযায়ী। ইসলামের শত্রুরা মদীনার সনদ দেখেও দেখে না। ইসলামের প্রতি অভিযোগ আরোপ করে, 'ইসলাম অন্য ধর্মকে সহ্য করতে পারে না'। ইসলামের প্রতি অন্ধ বিদ্বেষে যাদের অন্তর মেঘাচ্ছন্ন, তারা ব্যতীত এমন জ্ঞানপাপী সুলভ কথা আর কেউই বলতে পারে না।
📄 নবী করীম (সা:) এর সীরাত ও বিশ্বাসঘাতক জনগোষ্ঠী
মদীনায় ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের বনী কুরাইজা, বনী কাইনুকা ও বনী নজীর, এ গোত্রের বসবাস ছিলো এবং মদীনার শাসন দণ্ড ছিলো তাদেরই আয়ত্বে। মদীনার আনসাররা এক সময় নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে তাদের শক্তি এমনভাবে ক্ষয় করেছিল যে, ইয়াহুদীদের কাছে তারা বাধ্য হয়ে মাথানত করে থাকতো। মদীনার ইয়াহুদীরা ছিল ধনিক শ্রেণী। কৃষিকাজের জমি ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। ব্যবসাও ছিল তাদেরই অধীনে। নানা ধরনের শিল্পে তারা ছিল অগ্রগামী। বীরত্ব এবং যুদ্ধ বিদ্যাতেও তারা ছিল আনসারদের তুলনায় দক্ষ। এ কারণে তাদের কাছে সামরিক কাজে ব্যবহার করার মতো অস্ত্র বিপুল পরিমাণে মওজুদ থাকতো। স্বর্ণ শিল্প ছিলো ইয়াহুদী সম্প্রদায় বনী কাইনুকার নিয়ন্ত্রণে। স্বর্ণের অলংকার নির্মাণে মদীনায় তাদের সমকক্ষ কেউ ছিল না।
মদীনার সকল বিষয়ে নেতৃত্বের আসন ইয়াহুদীরাই নিয়ন্ত্রণ করতো। ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের ইতিহাস এ কথাই সাক্ষ্য দেয় যে, তারা চিরদিনই কুচক্রি এবং চরিত্রহারা নিষ্ঠুর প্রকৃতির। নগদ অর্থ মানুষকে ঋণ দিয়ে চারদিকে তারা মাকড়সার জালের মতই ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে রাখতো। কৌশলে তারা বিত্তের অধিকারী হয়ে সমাজের গরীব শ্রেণীকে পদানত করে রেখেছিল। নগদ অর্থের বিনিময়ে চড়া সুদে তারা মানুষের সহায় সম্পদের সাথে সাথে সন্তান-সন্ততি এমন কি তৎকালীন সমাজের নারীকেও বন্ধক রাখতো। ঋণ গ্রহীতাগণ ঋণ আদায়ে অক্ষম হলে বা নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হলে ঋণ গ্রহীতার অবোধ শিশুকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করতো।
ইয়াহূদী সম্প্রদায়ের নৈতিক চরিত্র বলতে কিছুই ছিল না। তারা তাদের ধনিক শ্রেণীর জন্য এক ধরনের আইন প্রয়োগ করতো এবং বিত্তহীনদের জন্য আরেক ধরনের আইন প্রয়োগ করতো। বিশেষ করে তাদের নেতাদের কোনো অপরাধের বিচার তারা করতো না। নবী করীম (সা:) এক ইয়াহুদীকে প্রশ্ন করেছিলেন, 'তোমাদের আইনে ব্যভিচারের শাস্তি কি শুধু দোররা দিয়ে আঘাত করা?'
ইয়াহূদী জবাব দিয়েছিল, 'না, আমাদের আইনে ব্যভিচারের শাস্তি পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা। কিন্তু আমাদের নেতৃবৃন্দের ক্ষেত্রে এ শাস্তি প্রযোজ্য নয়। সাধারণ মানুষের জন্য আমরা এই শাস্তি দিয়ে থাকি। নেতৃবৃন্দের কারো ব্যভিচার ধরা পড়লে তিনি অপরাধী হিসেবে গণ্য হন না'।
মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার পরে ইয়াহুদী সম্প্রদায় নানা ধরনের অসুবিধার সম্মুখিন হয়েছিল। তাদের পাপাচারের পথ রুদ্ধ হওয়া পড়েছিলো। বিকৃত ধর্মীয় প্রভাব ও নেতৃত্বের আসন ম্লান হয়ে গিয়েছিলো। মদীনার আনসারদের ঋণের জালে বন্দী করে সর্বগ্রাসী শোষণের পথও বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। মক্কার মুসলমানদের পরামর্শে আনসাররা পরিকল্পিত উপায়ে ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে নিজেদেরকে ইয়াহুদীদের কাছ থেকে ঋণ মুক্ত করেছিল। ইসলাম মদীনায় প্রতিষ্ঠিত হবার পরপরই ইয়াহুদীরা উপলব্ধি করেছিলো, তাদের নির্যাতনমূলক অর্থ লিপ্সার ব্যবসা চলবে না।
মদীনা সনদে তাদের যাবতীয় মানবিক ও ধর্মীয় অধিকার সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু তারা ধর্মের নামে যে অনাচার করতো, নবী করীম (সা:) এ সম্পর্কে সঠিক পথ অবলম্বনের নির্দেশনা দিতেন। তাদের দাবী ছিলো তারা হযরত মূসা (আ:) কর্তৃক প্রবর্তিত আইন-কানুন অনুসরণ করে। প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদের মনগড়া বিধান অনুসরণ করতো। বিষয়টি ওহী মারফত অবগত হয়ে রাসূল (সা:) তাদেরকে সংশোধন হওয়ার আহ্বান জানাতেন, এ কারণে তারা নবী করীম (সা:) ও ইসলামের কঠিন শত্রু হয়ে দাঁড়ালো। তাদের রক্তে ছিল মহাসত্যের বাহকদেরকে হত্যা করা এবং নিষ্ঠুরতা ও পাপাচারের প্রবণতা বিদ্যমান। বিশ্বাসঘাতকতা ছিল তাদের মজ্জাগত ব্যাপার। বিশ্বনবীর সাথে তারা মদীনা সনদে স্বাক্ষর করলেও গোপনে তারা মক্কার ইসলাম বিরোধী কুরাইশদের সাথে মিলিত হয়ে মদীনা থেকে ইসলাম উৎখাতের ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে ছিলো।
প্রকাশ্যে নবী করীম (সা:) সম্পর্কে কটুক্তি না করলেও রাসূল (সা:) এর শিখানো পদ্ধতিতে সালাম না দিয়ে বলতো, 'আসসামু আলায়কুম'। অর্থাৎ তোমার ওপরে মৃত্যু পতিত হোক।
হযরত আয়িশা (রা:) এর উপস্থিতিতে একবার এক ইয়াহুদী নবী করীম (সা:) কে ঐ কথা বললে তিনি ইয়াহূদীকে বললেন, 'অসভ্যের দল! তোদের ধবংস হোক'।
নবী করীম (সা:) এ কথা শুনে তাঁকে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিয়ে বললেন, 'আয়িশা, মধ্যম পথ গ্রহণ করো'।
হযরত আয়িশা (রা:) বললেন, 'ওরা কি বলে আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন?'
তিনি বললেন, 'আমি শুনেছি। তারা যখন ঐ কথা বলে আমিও তাদের কথার উত্তরে বলি, আলায়কুম। অর্থাৎ তোমাদের ওপরেও'।
ইয়াহুদীরা পূর্ববর্তী নবীর অনুসারী হবার দাবীদার ছিল, এ কারণে নবী করীম (সা:) পৌত্তলিকদের তুলনায় ইয়াহুদীদেরকে সম্মান করতেন। তাদের কোনো লাশ দেখলে তিনি দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতেন। তাদের অনাচার নবী করীম (সা:) নীরবে সহ্য করছিলেন। কারণ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তখন পর্যন্ত আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে নির্দেশ অবতীর্ণ হয়নি। নবীর এই নীরবতাকে তারা দুর্বলতা ভেবে চরম পথ অবলম্বন করেছিল।
বনী কাইনুকা গোত্রের ইয়াহুদীদের মধ্যে কা'ব ইবেন আশরাফ নামক লোকটি ছিল উঁচুস্তরের একজন কবি এবং বিত্তবান। মদীনার আনসারদের সে সুদের ব্যবসায় জড়িত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল। এই ব্যক্তি বদর যুদ্ধে কুরাইশদের পরাজয়ের ওপরে নানা ধরণের কবিতা রচনা করে মক্কায় পাঠিয়ে তাদের উত্তেজিত করতো। ইয়াহুদীদের একটি প্রতিনিধি দল গোপনে মক্কায় গিয়ে কুরাইশদের সাথে বৈঠক করে সার্বিক সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছিল। তাদের অঙ্গীকারের কারণে মক্কার কুরাইশরা নব উদ্যেমে ইসলামের বিরোধিতায় ঝাঁপিয়ে পড়লো। ইয়াহুদী কা'ব ইবনে আশরাফ নবী করীম (সা:) কে কৌশলে হত্যা করার জন্য তার বাড়িতে দাওয়াত দিয়েছিল।
মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবীকে তাদের ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে তাদের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করতে বললেন এবং নবী করীম (সা:) দাওয়াতে গেলেন না। কা'ব ইবনে আশরাফ ক্ষুব্ধ হয়ে নবী করীম (সা:) এর নামে বিদ্রুপাত্মক কবিতা রচনা করে মদীনার লোকদের মধ্যে প্রচার করতে থাকলো। এতে মুসলিম সম্প্রদায় ক্ষোভে উত্তেজিত হলেও রাসূল (সা:) তাদেরকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিলেন।
ইয়াহুদীরা ধারণা করেছিলো মদীনায় ইসলামের মূল শক্তি আউস ও খাজরাজ গোত্র। অতএব এই দুই গোত্রকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারলে ইসলাম বিকশিত হতে পারবে না। সে লক্ষ্যে মদীনার আনসারদের মধ্যে তারা তাদের চিরাচরিত ঘৃণ্য প্রথানুযায়ী বিভেদের বীজ তারা বপনের সূচনা করলো। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আউস গোত্র খাজরাজ গোত্রের কার কি ক্ষতি করেছিল এবং খাজরাজ গোত্র আউস গোত্রের কি ক্ষতি করেছিল, এসব পুরনো প্রসঙ্গ এই দুই গোত্রের মধ্যে ইয়াহুদীরা জাগিয়ে দিল। অবস্থা এমন এক পর্যায়ে উপনীত হলো যে, দুই গোত্রের আনসারদের মধ্যে দাঙ্গায় দুইজন আহত হলো এবং উভয় গোত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করলো।
নবী করীম (সা:) যথা সময় সংবাদ পেয়ে উভয় গোত্রে উপস্থিত হয়ে এই দাঙ্গার পরিণতি আদালতে আখিরাতে কি হবে, তা বর্ণনা করে উভয় দলকে শান্ত করে তাদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করলেন। ইয়াহুদীরা ঘৃণ্য মানসিকতা নিয়ে সাময়িক ইসলাম গ্রহণ করতো। দিন কয়েক পরেই তারা ইসলাম ত্যাগ করে মানুষের মধ্যে প্রচার করতো, 'ভালো মনে করেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু ভালোভাবে অনুসন্ধান করে দেখলাম ইসলামে খারাপ ছাড়া ভালো কিছুর অস্তিত্ব নেই। এ কারণে আবার ইসলাম ত্যাগ করে বাপ-দাদার আদর্শেই ফিরে এলাম'।
এভাবে ইয়াহুদীরা নবী করীম (সা:) ও ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসা ছড়াতে থাকলো। মদীনায় রাসূল (সা:) এর সাথে শান্তি চুক্তি করার পরেও তারা পদে পদে সেই চুক্তির ধারা লংঘন করতে থাকে। তাদের এসব জঘন্য আচরণের কথা মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের বহুস্থানে উল্লেখ করেছেন। মুসলমানদের ধৈর্যের সুযোগে তারা চরম হঠকারিতার পরিচয় দেয়া শুরু করেছিল। ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় তারা এমন এক ঘটনার জন্ম দিল যে, মুসলমানদের পক্ষে আর নীরবে দর্শকের ভূমিকা পালন করা সম্ভব হলো না।
নিরপেক্ষ সকল ঐতিহাসিকই সে জঘন্য ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেছেন। মুসলিম পরিবারের এক সম্ভ্রান্ত নারী তাঁর প্রয়োজনে একান্ত বাধ্য হয়েই ইয়াহূদী অধ্যুষিত বনী কাইনুকার বাজারে গিয়েছিলেন। মুসলিম নারীকে দেখে ইয়াহুদীরা তাঁকে নানাভাবে উত্যক্ত করতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা মুসলিম নারীকে পোষাক পরিত্যাগ করার আদেশ করে। মহিলা নিজের ইজ্জত রক্ষার জন্য এক ইয়াহূদী স্বর্ণকারের দোকানে আশ্রয় নিয়েছিল। একজন ইয়াহুদী ঐ মুসলিম মহিলার পরণের কাপড় তাঁর অলক্ষে এমনভাবে একটা কিছুর সাথে বেঁধে দেয় যে, মহিলা উঠতে গেলেই যেন তাঁর কাপড়ে টান লেগে মহিলা পর্দ্দাহীন হয়ে পড়ে।
মহিলা যখন উঠতে গেল ইয়াহুদীদের পরিকল্পনা অনুসারে যা হবার তাই হলো। একজন মুসলিম নারীকে পরিকল্পিত উপায়ে ইয়াহুদীরা বে-ইজ্জতি করলো এবং মহিলার আর্তচিৎকার শুনে ইয়াহুদী হায়েনার দল অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিল। মহিলা তখন বাধ্য হয়ে চিৎকার করে বলেছিল, 'কে আছো মুসলিম বীর সৈনিক! তোমাদের বোনের সম্মান রক্ষা করো!'
তাঁর আর্তনাদ শুনে একজন মুসলিম নওজোয়ান ছুটে এসে অপরাধী এক ইয়াহূদীকে হত্যা করলো। ইয়াহূদীরাও সংঘবদ্ধ হয়ে আক্রমন করে মুসলিম বীরকে হত্যা করলো। এ সংবাদ নবী করীম (সা:) শোনার পরে তিনি ঘটনা স্থলে গিয়ে ইয়াহুদীদের লক্ষ্য করে বলেছিলেন, 'ওহে ইয়াহূদী সমাজ! তোমরা যে অপরাধ করেছো তার প্রতিকার করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব নয়। কিন্তু তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ, তোমরা মহান আল্লাহ তা'য়ালাকে ভয় করো। তোমরা চুক্তি অনুসরণ করো। আর তা যদি না করো তাহলে তোমাদের ওপরেও বদরের মতই আযাব অবতীর্ণ হবে'।
যা ঘটেছিলো তা ছিল ইয়াহুদীদের পরিকল্পিত। তারা মক্কার কুরাইশদের সাথে পূর্বেই গোপন চুক্তি করে এসেছিল, কোনো উপলক্ষ্যে তারা মুহাম্মাদ (সা:) এর সাথে যুদ্ধ শুরু করবে। আর এই সুযোগে মক্কার কুরাইশরা মদীনা আক্রমন করে মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করে দিবে। সুতরাং রাসুলের কথায় তারা নমনীয়তা প্রদর্শন না করে নবী করীম (সা:) এর সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে ঘোষণা করলো, 'হে মুহাম্মাদ (সা:)! বদরের প্রান্তরে গোটা কতক কুরাইশদের হত্যা করে বেশি অহংকার দেখিয়ো না। আমাদের সাথে যুদ্ধ বাধিয়ে দেখো, যুদ্ধ কাকে বলে আমরা তা দেখিয়ে দিবো'। (সীরাতে ইবনে হিশাম, আত্ তাবারী, তাবাকাতে ইবনে সায়াদ)
ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র এবার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল। নবী করীম (সা:) বাধ্য হয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। বনী কাইনুকা গোত্র রাসূল (সা:) এর যুদ্ধ প্রস্তুতির সংবাদ পেয়ে তারা দ্রুত তাদের নির্মিত দূর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। এ সকল দূর্গ ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত। ফলে তারা নিরাপদেই দূর্গের মধ্যে আশ্রয় নিয়ে প্রাণ রক্ষা করলো এবং তাদের আশা ছিল এ সময়ের মধ্যে মক্কা থেকে কুরাইশরা মদীনা আক্রমন করবে। তখন তারা দূর্গ থেকে বের হয়ে মক্কার কুরাইশদের সাথে একত্রিত হয়ে মুসলিম নিধনযজ্ঞ অনুষ্ঠিত করবে।
কিন্তু তাদের সে আশা পূরণ হলো না। মক্কার কুরাইশরা মদীনা আক্রমনের কল্পনাও করতে পারলো না। কারণ তখন পর্যন্ত তারা বদরের ক্ষয়-ক্ষতিই সামলিয়ে উঠতে পারেনি। নবী করীম (সা:) মুসলিম বাহিনী নিয়ে বনী কুরাইজার দূর্গ অবরোধ করলেন। এভাবে পনের দিন পর্যন্ত অবরোধ করে রাখলেন। ইয়াহুদীদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে এলে তারা তাদের মুক্তির জন্য মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে তাদের হয়ে সুপারিশ করার জন্য নবীর কাছে প্রেরণ করেছিল।
মদীনার মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এসে নবী করীম (সা:) এর কাছে ইয়াহুদীদের পক্ষ থেকে সুপারিশ করতে থাকলো। রাসূল (সা:) প্রথমে তার কথায় কর্ণপাত করেননি। পরে এই মুনাফিক নেতা তাঁকে এমনভাবে ধরলেন যে, সীরাতে ইবনে হিশামে উল্লেখ করা হয়েছে, রাসূরে কাছে অনুনয় করতে করতে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই একরকম জাপটে ধরে বলেছিল, 'আপনি তাদের ব্যাপারে সুষ্ঠু সিদ্ধান্ত না করলে আপনাকে আমি ছাড়বো না'।
হাদীস শরীফে এসেছে, এ সময় নবী করীম (সা:) এতটা রাগান্বিত হয়েছিলেন যে, তাঁর পবিত্র চেহারা ভিন্ন আকার ধারণ করেছিল। অবশেষে রাসূল (সা:) অনুনয় রক্ষা করে কতকগুলো শর্তের অধীনে অবরোধ উঠিয়ে নিলেন। ইয়াহুদীরা নবী করীম (সা:) এর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো। হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রা:) এর সাথে ইয়াহূদীদের নিরাপত্তার ব্যাপারে চুক্তি ছিল। ইয়াহুদীরা যখন রাসূল (সা:) এর সাথে চুক্তি ভঙ্গ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিল, তখন হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রা:) এসে রাসূল (সা:) এর সামনে ঘোষণা দিয়েছিলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমার মিত্র এবং বন্ধু হলেন একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালা এবং তাঁর রাসূল ও মুসলমানগণ। আমি ইসলামের শত্রুদের মৈত্রী চুক্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তাদের সাথে আমার এখন থেকে আর কোনো ধরনের চুক্তি বলবৎ থাকলো না'।
রাসূল (সা:) এর এই সাহাবীর প্রশংসামূলক কাজের জন্য মহান আল্লাহ তা'য়ালা সূরা মায়িদার আয়াত অবতীর্ণ করেছিলেন। নবী করীম (সা:) বনী কাইনুকার সকল ইয়াহুদীদের গ্রেফতার করার আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সুপারিশের কারণে নবী (সা:) তাদেরকে গ্রেফতার না করে মদীনা থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। মদীনার আশেপাশেও তারা থাকতে পারবে না এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল।
ইয়াহূদী সম্প্রদায় সিরিয়ার দিকে চলে গিয়েছিল। এই ঘটনা ছিল হিজরী দ্বিতীয় সনের শাওয়াল মাসের। তাদের ধন-সম্পদ নবী করীম (সা:) বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ সময় তিনি গণীমতের সম্পদ থেকে পঞ্চমাংশ গ্রহণ এবং তিনটি তীর, দুটো বর্ম, তিনটি তরবারী ও তিনটি ধনুক গ্রহণ করেছিলেন। (যাদুল মায়াদ, পৃষ্ঠা নং-১৩৭, ১৩৮)
সে সময় ইয়াহুদীরা যে অপরাধ সংঘটিত করেছিল পৃথিবীর অন্য কোনো রাষ্ট্র প্রধান হলে তাদের একটি প্রাণীকেও জীবিত ছেড়ে দিত না। কিন্তু নবী করীম (সা:) তাদের একজনের গায়েও হাত উঠাতে দেননি। এমনকি তাদেরকে নিরাপত্তা দিয়ে মদীনা থেকে বের হয়ে যাবার সুব্যবস্থা করে দেন। মদীনা থেকে তাদের বিদায়ের জন্যে তিন দিন সময় নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। তাদের নিরাপত্তার জন্য তিনি তাদের সাথে হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রা:) কে দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
ইসলামের যে যুদ্ধনীতি রয়েছে, নবী করীম (সা:) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের কিছু ঘটনা সম্পর্কে ইউরোপিয় কতিপয় লেখক মন্তব্য করেছে, মুহাম্মাদ (সা:) মদীনার ইয়াহুদীদের সাথে প্রতারণা করেছেন। খ্রিষ্টান লেখকগণ ইয়াহূদী প্রেমে অন্ধ হয়ে বিশ্বনবীকে প্রতারক বলতেও দ্বিধা করেনি। ইয়াহুদীরা খ্রিষ্টানদের সাথে এবং খ্রিষ্টানরা ইয়াহুদীদের সাথে কি জঘন্য আচরণ করেছে, ইতিহাসের পাতায় সেসব ঘটনা লিপিবদ্ধ রয়েছে। তারা প্রকৃত সত্য উল্লেখ না করে মদীনার ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছে এভাবে যে, নবী করীম (সা:) হিজরত করে তাঁর প্রয়োজনে ইয়াহুদীদের সাথে চুক্তি করেছিলেন। তারপর তিনি যখন একটু শক্তিশালী হলেন, তখনই তিনি ইয়াহুদীদের সাথে চুক্তি ভঙ্গ করে তাদেরকে মদীনা থেকে নির্বাসিত করলেন।
ইয়াহুদীরা যে কি ধরনের মন-মাসিকতা সম্পন্ন এবং কতটা কুটিল জাতি, বিশ্বের কোথাও যে তাদের স্থান হয়নি এবং কেনো হয়নি তা ইতিহাসের পাঠক মাত্রই অবগত রয়েছেন, এ সম্পর্কে আমি আমার লেখা সূরা ফাতিহার তাফসীরে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। ইউরোপিয় কতিপয় লেখক ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পেশ না করেই পাঠককে বিভ্রান্ত করার জন্য বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করে থাকে। প্রকৃত ঘটনার দিকে দৃষ্টিপাত করলে, দেখা যাবে নবী করীম (সা:) যে ব্যবস্থা ইয়াহুদীদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করেছিলেন, তা ছিল সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত এবং আইনের দৃষ্টিতে বৈধ।
তিনি মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় আগমন করে যে চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন, সে চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ আমরা উল্লেখ করেছি। সে চুক্তির মূল কথা ছিল, উভয় পক্ষের কেউ কারো বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক বা শত্রুতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না। একে অপরের শত্রুদেরকেও কেউ সাহায্য করবে না। এ সম্পর্কে হাফেজ ইবনে হাজার (রাহ:) লিখেছেন, 'তিনি তাদের সাথে এই শর্তে মৈত্রী স্থাপন করেছিলেন যে, তারা তাঁর সাথে যুদ্ধও করবে না এবং তাঁর বিরুদ্ধে তাঁর শত্রুদেরকেও সাহায্য সহযোগীতা করবে না'। (ফতহুল বারী, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-১৩১)
মুসলমানদের সাথে ইয়াহুদীরা এই চুক্তি করার পরে স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানরা তাদের সাথে বন্ধুর অনুরূপ আচরণ করতে থাকে। কিন্তু ইয়াহুদীরা বিশ্বাসঘাতকতা করে চুক্তি বিরোধী কার্যকলাপ করতে থাকে। তারা গোপনে মক্কার কুরাইশদের কাছে মুসলমানদের গোপন তথ্য পাচার করতে থাকে। মুসা ইবনে উকবা তাঁর মাগাজীতে উল্লেখ করেছেন, 'বনী নজীর গোত্র মক্কার কুরাইশদের সাথে যোগাযোগ করে তাদেরকে নবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উস্কানী দিতো এবং ইসলামী রাষ্ট্রের গোপন তথ্য পাচার করতো'। (ফতহুল বারী, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-২৩৩)
ইয়াহুদীরা এখানেই তাদের অপতৎপরতা বন্ধ করেনি। বিশ্বনবী (সা:) কে তারা কয়েকবার হত্যার চেষ্টা করে। তারা ঈমান আনবে, এ সংবাদ দিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা:) কে তাদের আওতায় নিয়ে হত্যা করার লক্ষ্যে কয়েকবার প্রস্তুত হয়েছিল। ছাদ থেকে পাথর নিক্ষেপ করে নবীকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। (আত্ তাবারী, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৩৭, আবু দাউদ, ফতহুল বারী, সপ্তম খন্ড, পৃষ্ঠা নং-২৩৩, ফতহুল বুলদান, পৃষ্ঠা নং-২৪)
এখানেই ঘটনা শেষ নয়, তাদের উদ্ধত্য এতটা বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, প্রকাশ্যে তারা মুসলমানদেরকে হুমকি প্রদর্শন করতো। নবী করীম (সা:) এর ধৈর্যকে তারা দুর্বলতা ভেবেছিল। বাইরের কোনো শত্রু মদীনা আক্রমন করলে ইয়াহুদী আর মুনাফিকরা মুসলমানদেরকে অস্তিত্বহীন করে দিবে, এ আশঙ্কা তীব্র হয়ে দেখা দিল। গোপনে আল্লাহর রাসূল (সা:) কে হত্যা করতে পারে এ আশঙ্কাও মুসলমানদের মধ্যে বিরাজ করছিল। মদীনার মুসলমানদের ইয়াহুদীদের সম্পর্কে আশঙ্কা এতটা তীব্র হয়েছিল যে, একজন সাহাবী মৃত্যুর সময় বলে গেলেন, আমার ইন্তেকালের সংবাদ আল্লাহর রাসূল (সা:) কে রাতে দিও না। কারণ তিনি রাতে আমার জানাযায় অংশগ্রহণ করার জন্যে আসবেন আর সেই সুযোগে ইয়াহুদীরা তাঁকে হত্যা করতে পারে। (উসুদুল গাবা, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৫৭)
এই ইয়াহুদীদের উৎপাতের পরেও ইয়াহূদী প্রেমিকরা কি বলতে চান নবী করীম (সা:) এর জন্য নীরবতা পালন করা বাধ্যতামূলক ছিল? কিন্তু এরপরেও রাসূল (সা:) তাদের ওপরে হঠাৎ আক্রমন না করে দূত মারফত তাদেরকে জানিয়ে দিলেন, 'আমার সাথে তোমরা চুক্তি ভঙ্গ করে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছো। সুতরাং তোমরা দশদিনের মধ্যে মদীনা ত্যাগ করবে, যদি না করো তাহলে আমি তোমাদের সাথে' যুদ্ধ করতে বাধ্য হবো'।
নবী করীম (সা:) এর পক্ষ থেকে তারা এই সংবাদ পেয়ে মদীনার মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের সাথে যোগাযোগ করলো। মুনাফিক নেতা তাদেরকে অভয় দিয়ে বললো, তোমরা কিছুতেই মদীনা ত্যাগ করবে না। তোমাদের যা সাহায্য সহযোগীতা প্রয়োজন আমরা করবো। ইয়াহুদীরা এটা তলিয়ে দেখলো না যে, মুনাফিকরা সত্যই তাদেরকে সাহায্য করতে পারবে কিনা। তারা কঠিন ভাষায় নবী করীম (সা:) কে জানিয়ে দিল, 'আমরা মদীনা ত্যাগ করবো না, তোমাদের যা ইচ্ছা তাই করতে পারো'। (আত্ তাবারী, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৩৮, ফতহুল বারী, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-২৩৩, ফতহুল বুলদান, পৃষ্ঠা নং-২৪)
নবী করীম (সা:) তাদেরকে শেষ সুযোগ দিয়েছিলেন এবং তাদের অসহ্য উস্কানী ও চুক্তি ভঙ্গের পরেও উদারতার শেষ সীমা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। একান্ত বাধ্য হয়ে তিনি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে তাদেরকে অবরোধ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে যুদ্ধ করতে হয়নি। অবরোধের কারণেই ইয়াহুদীরা বলতে বাধ্য হয়েছিল, 'আপনি আমাদেরকে প্রাণে মারবেন না। আমরা মদীনা থেকে বের হয়ে সিরিয়ার দিকে চলে যাবো এবং আমাদের উটের পিটে যা নিতে পারি তাই নিয়ে যাবো। আর যা কিছু থাকে আমরা এখানে রেখে যাবো'।
এ সম্পর্কে ঐতিহাসিক বালাজুরী ও হাফেজ ইবনে হাজার লিখেছেন, 'ইয়াহুদীরা আবেদন করেছিল, আমাদের উট যতটা মালপত্র বহন করতে পারে আমরা ততটা নিয়ে যাবে, নবী করীম (সা:) তাদের এই আবেদন মঞ্জুর করলেন এবং তাদের সাথে সন্ধি করলেন। এখানে ইয়াহুদীদের সামান্য পরিমাণ ক্ষতি করা হয়নি। (আত্ তাবারী, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৩৮, ফতহুল বুলদান- পৃষ্ঠা নং-২৪, ফতহুল বারী- সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-২৩২)
বিশ্বনবী (সা:) অস্থাবর সম্পদসহ তাদেরকে মদীনা ত্যাগের সুযোগ দিলেন। সুযোগ থাকার পরও তিনি শত্রুদের একান্ত অনুগ্রহে মদীনা ত্যাগের অনুমতি দিলেন কিন্তু তাঁর উদারতা এবং মহত্ত্বের প্রতিদান ইয়াহুদীরা যেভাবে দিয়েছিল, সে অভিজ্ঞতা মুসলমানদের জন্য খুবই তিক্ত। ইয়াহুদীরা যে সময় মদীনা ছেড়ে যাচ্ছিল, তাদের যাওয়ার অবস্থাও ছিল মুসলমানদের প্রতি উপহাসমূলক। তাদের কয়েকজন নেতা খয়বরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো। সেখানেও তারা ষড়যন্ত্র করে নেতৃত্বের পদ দখল করেছিল। মদীনা ত্যাগের সময় তারা বিভিন্ন ধরনের বাদ্য বাজিয়ে, গায়িকাদের মাধ্যমে গান পরিবেশন ও নর্তন-কুর্দন করতে করতে মদীনা ত্যাগ করেছিল। ঐতিহাসিকগণ বলেন, 'ইয়াহুদীরা সম্পদসহ যে বিশাল জনবলসহ মদীনা ত্যাগ করেছিল, স্থানীয় অধিবাসীরা ইতোপূর্বে এ অবস্থা কখনো দেখেনি'। মদীনার আনসারদের মধ্যে যারা ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণ করেছিল ইয়াহুদীরা তাদেরকেও নিয়ে যেতে চাইলে আনসাররা বাধা দিয়েছিল। এ সময় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ অবতীর্ণ করা হলো-
لا إِكْرَاهَ فِي الدِّيْنِ قف قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ جِ فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوْتِ وَيُؤْمِنُم بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى ق لاَ انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوْرِ طَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا. أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوْتُ يُخْرِجُونَهُمْ مِّنَ النُّوْرِ إِلَى الظُّلُمَاتِ طِ أُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
(আল্লাহর) দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জোর জবরদস্তি নেই, (কারণ) সত্য (এখানে) মিথ্যা থেকে পরিষ্কার হয়ে গেছে, তোমাদের মধ্যে যদি কোনো ব্যক্তি বাতিল (মতাদর্শ)কে অস্বীকার করে, আল্লাহর (দেয়া জীবনাদর্শের) ওপর ঈমান আনে, সে যেন এর মাধ্যমে এমন এক শক্তিশালী রশি ধরলো, যা কোনোদিনই ছিঁড়ে যাবার নয়; আল্লাহ তা'য়ালা (সব কিছুই শোনেন) এবং (সবকিছুই) জানেন, যারা (আল্লাহর ওপর) ঈমান আনে, আল্লাহ তা'য়ালাই হচ্ছেন তাদের সাহায্যকারী (বন্ধু), তিনি (মূর্খতার) অন্ধকার থেকে তাদের (ঈমানের) আলোতে বের করে নিয়ে আসেন, (অপরদিকে) যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে, বাতিল (শক্তিসমূহ-ই) হয়ে থাকে তাদের সাহায্যকারী, তা তাদের (দ্বীনের) আলোক থেকে (কুফুরীর) অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়; এরাই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা চিরদিন থাকবে। (সূরা আল বাকারা-২৫৬-২৫৭)
খায়বরে যে সকল ইয়াহূদী গিয়েছিল তারাই পরবর্তীতে খায়বর যুদ্ধের অবস্থা সৃষ্টি করেছিল। এই ইয়াহূদী জাতি পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছে সেখানেই তারা অশান্তির আগুন প্রজ্জলিত করেছে। মদীনা থেকে তারা বের হয়ে সমগ্র আরবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছিল। মাত্র দু'বছরের ব্যবধানে তারা ২৪ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মদীনা আক্রমন করেছিল। সে সময়ই যদি ইয়াহূদী নামক বিষাক্ত সর্পসমূহের মস্তক চূর্ণ করা হতো তাহলে পরবর্তীতে ইয়াহুদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও খায়বর যুদ্ধের মুকাবিলা করতে হতো না। পক্ষান্তরে নবী করীম (সা:) ছিলেন করুণার সিন্ধু। পরাজিত শত্রুর করুণা ভিক্ষামূলক মিনতি তাঁর পক্ষে প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব হয়নি। তিনি জানতেন, এই ইয়াহুদীরা তাঁর জন্য প্রতি পদে পদে সমস্যা সৃষ্টি করবে। ইসলামী রাষ্ট্র উৎখাতের জন্য তারা সর্বত্র ষড়যন্তের জাল বিস্তার করবে। সুযোগ পেলে আল্লাহর রাসূল (সা:) কে এবং মুসলমানদের হত্যা করবে। তবুও নবী করীম (সা:) তাদের ক্ষমা করে নিরাপদে মদীনা ত্যাগ করার সুযোগ দিয়েছিলেন। মদীনা ত্যাগের সময় তারা যে গর্ব-অহঙ্কারের প্রদর্শনী করেছিলো তা কোনো করুণা ভিখারী ও পরাজিত জাতির নিদর্শন ছিল না।
📄 অঙ্গীকার পূরণ- নবী করীম (সা:) এর সীরাত
কিলাব গোত্রের নেতা আবু বারা (রা:) দরবারে নববীতে এসে আবেদন করেছিল, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমাদের সাথে কিছু লোক দিন, যারা আমাদের গোত্রে গিয়ে ইসলামের শিক্ষা দিবে'।
নবী করীম (সা:) তাকে বলেছিলেন, 'আমি নজদবাসীর দিক থেকে আশঙ্কা বোধ করি। তাদের গোত্র তো কুরাইশদের শুভাকাঙ্খী'।
আবু বারা (রা:) বলেছিল, 'আমরাই সেখানে প্রভাবশালী, আমরা যা বলবো তাই হবে। আমি তাদের জিম্মাদার হচ্ছি'।
আবু বারার আবেদনে সাড়া দিয়ে নবী করীম (সা:) ৭০ জন সাহাবীকে তাদের সাথে প্রেরণ করেছিলেন। এ সকল সাহাবী ছিলেন আসহাফে সুফফার দলভুক্ত। সংসার জীবন গঠন করার মতো তখন পর্যন্ত তাদের সুযোগ হয়নি। তাদের নৈতিক চরিত্র ছিল অতি উচ্চস্তরের। এই সাহাবায়ে কেরাম সারা দিন জঙ্গলে কাঠ কেটে তা বিক্রি করে যা উপার্জন করতেন তা অন্য সাহাবায়ে কেরামের জন্য ব্যয় করতেন এবং নিজের কাজে ব্যয় করতেন। এই লোকগুলো দিবারাত্রি নবী করীম (সা:) এর সাহচর্যে অবস্থান করে ইসলামী জ্ঞান এবং আল্লাহ তা'য়ালার নৈকট্যর দিক থেকে অন্যদের তুলনায় অগ্রগামী ছিলেন।
বনী আমের গোত্রের কাছে নবী করীম (সা:) একটি পত্রও প্রেরণ করলেন। বীরে মাওনা নামক স্থানে পৌঁছার পরে উক্ত পত্রসহ একজন লোক বনী আমের গোত্রের নেতা আমের ইবনে তুফায়েলের কাছে গিয়েছিল। তুফায়েল প্রচলিত সকল নীতি নৈতিকতার প্রতি পদাঘাত করে মুসলিম দূতকে হত্যা করলো এবং বনী সালেম গোত্রের সহযোগীতায় মুসলিম প্রচারকের দলকে হত্যা করার জন্য এগিয়ে এলো। যে সাহাবা রাসূল (সা:) এর কাছে মুসলমানদের জিম্মাদার হয়ে তাদেরকে এনেছিল, সেই আবু বারা (রা:) বনী আমের গোত্রের নেতা তুফায়েলকে বারবার অনুরোধ করলো, মুসলমানদেরকে হত্যা না করার জন্য। সে তাদেরকে জানালো যে, সে স্বয়ং জিম্মাদার হয়ে এই মুসলমানদেরকে সাথে এনেছে, সুতরাং তাদের যেন কোনো ধরনের ক্ষতি করা না হয়।
কিন্তু ইসলামের দুশমনরা তাঁর কোনো কথায় কর্ণপাত করলো না। আশেপাশের কুরাইশদের মিত্র গোত্রগুলোর সহায়তায় মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পৈশাচিকভাবে হত্যা করলো। একজন মাত্র সাহাবী হযরত আমের (রা:) কে বনী আমেরের নেতা তাঁর মাথার চুল কিছুটা কেটে এ কথা বলে ছেড়ে দিয়েছিল যে, 'আমার মা একজন দাস মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তোমাকে মুক্তি দিয়ে আমি আমার মায়ের মানত পূরণ করলাম'। বীরে মাওনার হত্যাকান্ডের সাথে বনী আমের গোত্রকে প্রকাশ্যে দেখা গেলেও এর পেছনে মদীনার এবং মদীনা থেকে বহিষ্কৃত ইয়াহুদীদের চক্রান্ত ক্রিয়াশীল ছিলো, ইতিহাসের পাঠক মাত্রই তা অবগত রয়েছেন।
প্রাণে বেঁচে যাওয়া সেই সাহাবীর ৬৯ জন সাথীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন এবং সাথীহারা বেদনা বুকে নিয়ে মদীনার দিকে আসছিলেন। পথে হত্যাকারী বনী আমের গোত্রের দু'জন লোককে সামনে দেখেই তাঁর মনে ক্ষোভের সৃষ্টি হলো এবং তিনি তাদেরকে হত্যা করলেন। কিন্তু তাঁর জানা ছিলো না, এই দুইজন লোককে নবী করীম (সা:) আমান অর্থাৎ নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। মাত্র একজন ব্যতীত প্রেরিত সকল মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে, এ সংবাদ জেনে নবী করীম (সা:) অত্যন্ত ব্যথিত হলেন। তারপরও তিনি হযরত আমের (রা:) কর্তৃক বনী আমের গোত্রের যে দু'জনকে হত্যা করেছিলেন তা সমর্থন করলেন না। তিনি তাদের রক্তপণ আদায় করলেন।
এটাই নবী করম (সা:) এর ক্ষমা ও উদারতার সীরাত। যে গোত্রের লোকজন মুসলমানদের ৬৯ জন লোককে নির্মমভাবে হত্যা করলো, অথচ তিনি কোনো ক্ষতিপূরণ দাবী করলেন না। আর সাহাবা কর্তৃক সেই গোত্রের মাত্র দু'জন লোককে হত্যা করার কারণে তিনি ক্ষতিপূরণ দিয়েছিলেন।
তিনি এই ক্ষতিপূরণ না দিলে নিহত গোত্রের করার কিছুই ছিল না। মুসলিমরা দাবী করতে পারতো, 'আমাদের ৬৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে, তাঁর বদলে আমাদের এক ভাই, যাকে তারা হত্যা না করলেও চুল কেটে লাঞ্ছিত করেছে, তিনি মাত্র দু'জনকে হত্যা করেছেন'। মুসলিমরা এমন দাবী করেনি, তাঁরা নবী করীম (সা:) এর সীরাতের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। নবী করীম (সা:) এগিয়ে গেলেন তাঁর ওয়াদা পালনের পথে। তিনি ঐ গোত্রের সাথে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা বাস্তবায়ন করলেন, নিহত দু'ব্যক্তির রক্তঋণ আদায় করলেন। নবী করীম (সা:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা মর্যাদার যে সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন, তিনি নিজ মর্যাদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ আচরণই করলেন বিশ্বাসঘাতক বনী আমের গোত্রের সাথে। ফল এটাই হলো যে, পরবর্তীতে বনী আমের গোত্রের সকল মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। ইসলাম বিদ্বেষী বন্ধুরা, বীরে মাওনার ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখুন, ইসলাম তরবারীর শক্তিতে পৃথিবীতে বিস্তৃতি লাভ করেছে, না তার আপন মহত্ত্বের কারণে পৃথিবীতে বিস্তৃতি লাভ করেছে।
📄 পরাজিত জনগোষ্ঠী ও নবী করীম (সা:) এর সীরাত
নবী করীম (সা:) অষ্টম হিজরী সনের রমজান মাসের দশ তারিখে মদীনা থেকে মক্কা অভিযানে বের হলেন। তিনি ইতোপূর্বে এমন বর্ণাঢ্য সাজে কোনো অভিযানেই বের হননি। মক্কা অভিযানে তিনি এমন সুসজ্জিত অবস্থায় বের হলেন, যেন ইসলামের শত্রুদের কলিজায় কম্পন জাগে। দশ হাজার সুসজ্জিত বাহিনী আল্লাহ তা'য়ালার রাসূলের সাথে। রাসূল (সা:) এগিয়ে যাচ্ছেন তাঁর মাতৃভূমির দিকে। যেখান থেকে একদিন তিনি অশ্রু বিসর্জন দিয়ে বের হয়ে এসেছিলেন। কা'বাঘরের দিকে তাকিয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, 'হে কা'বা! তোমার নিষ্ঠুর সন্তানরা আমাকে থাকতে দিল না'। তিনি বিশাল এক বাহিনী নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। এবার আর জনমানবহীন প্রান্তর দিয়ে নয়, জনপদ দিয়েই তিনি তাওহীদের বিজয় কেতন উড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিটি জনপদ থেকেই পতাকাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী তাঁর নেতৃত্বাধীন মিছিলে যোগ দিয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি করছে। বিশাল এক জনসমুদ্র তরঙ্গের ওপরে তরঙ্গ সৃষ্টি করে মক্কার দিকে প্রবল বেগে এগিয়ে চলেছে। বিভিন্ন গোত্রের দু'একজন তখন পর্যন্ত ইসলামের প্রতি শত্রুতা পোষণ করতো, তারা চক্ষু বিস্ফোরিত করে তাওহীদের এই তরঙ্গ দেখছে।
নবী করীম (সা:) মক্কার অনতিদূরে মাররুজ জাহরান নামক এলাকায় এসে যখন উপনীত হলেন রাতের নিকষ কালো অন্ধকার সমগ্র পরিবেশের ওপর অবগুণ্ঠন টেনে দিয়েছে। সেখানেই তিনি যাত্রা বিরতি করে সৈন্যবাহিনীকে শিবির স্থাপন করতে আদেশ দিলেন। অসংখ্য তাঁবু স্থাপন করা হলো। তিনি আদেশ দিলেন, প্রত্যেক তাঁবুতেই যেন পৃথকভাবে রান্নার আয়োজন করা হয়। এ কারণে প্রতিটি তাঁবুতেই পৃথকভাবে উনুন জ্বালানোর প্রয়োজন হলো। ক্ষণিকের মধ্যেই অগণিত উনুন জ্বলে উঠলো। রাতের অন্ধকার বিদীর্ণ করে বিশাল প্রান্তর আলোকিত হয়ে উঠলো। সে আলোয় মক্কা নগরী যেন উদ্ভাসিত হয়ে গেল।
ভয়ে আতঙ্কে ইসলাম বিরোধিদের কলিজা যেন কণ্ঠনালী দিয়ে বের হয়ে আসার উপক্রম হলো। নবী করীম (সা:) রাতের অন্ধকারে অধিক সংখ্যক উনুন প্রজ্জ্বলিত করার যে আদেশ দিয়েছিলেন, এর পেছনে ছিল সামরিক কৌশল। ইসলামের শত্রুগণ যেন ধারণা করে লক্ষ লক্ষ বাহিনী মক্কার দিকে এগিয়ে আসছে। ঘটেছিলও তাই, কুরাইশরা দেখতো যেন লক্ষ লক্ষ উনুন জ্বলছে। উনুনের সংখ্যা যখন নিরূপণ করা যাচ্ছে না তাহলে সৈন্য সংখ্যা নিশ্চয়ই কয়েক লক্ষ হবে। চরম আতংকে তাদের নিশ্বাস যেন বন্ধ হবার উপক্রমন হলো।
তারা নবী করীম (সা:) এর বাহিনীর সঠিক সংখ্যা জানার জন্য হযরত খাদিজা (রা:) এর ভাইয়ের সন্তান হাকিম ইবনে হিজাম, বুদাইল ইবনে ওরাকা ও তাদের নেতা স্বয়ং আবু সুফিয়ানকে প্রেরণ করলো। তারা ছদ্মবেশে মুসলিম বাহিনীর দিকে এগিয়ে গেলো প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য। ওদিকে বিশ্বনবী (সা:) এর চাচা আব্বাস (রা:) ইসলাম গ্রহণ করলেও তিনি মক্কাতেই অবস্থান করতেন। তিনি যেদিন পরিবার-পরিজনসহ মদীনার দিকে হিজরত করলেন, সেদিনই নবী করীম (সা:) মদীনা থেকে মক্কা অভিযানে বের হলেন। পথে চাচা ভাতিজার সাক্ষাৎ হলো। তিনিও মক্কা অভিযানে শামিল হলেন। হযরত আব্বাস (রা:) ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, যদি এমন কাউকে পেতেন তাহলে তার কাছে সংবাদ প্রেরণ করতেন, সে যেন মক্কায় গিয়ে কুরাইশদের কাছে বলে, যথা সময়ে এসে নবী করীম (সা:) এর কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজেদের নিরাপত্তা কামনা করে।
হযরত আব্বাস (রা:) নবী করীম (সা:) এর সাদা খচ্চড়ে আরোহন করে চারদিকে অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিচ্ছিলেন। এমন সময় তাঁর সাথে মক্কার বিখ্যাত নেতা আবু সুফিয়ানের দেখা হলো। তিনি তাঁকে বললেন, 'দেখতে পাচ্ছো তো, আল্লাহর রাসূল (সা:) বিশাল এক বাহিনী নিয়ে এসেছেন। মক্কার কুরাইশরা এবার ধূলার সাথে মিশে যাবে'। আবু সুফিয়ান ব্যগ্র কন্ঠে বললেন, 'আমার মা-বাবা তোমার জন্য কুরবান হোক! এই অবস্থায় কি করতে হবে আমাকে বলে দাও'। হযরত আব্বাস (রা:) বললেন, 'তোমাকে দেখলে নিশ্চয়ই মুসলিম বাহিনী মাথা কেটে নেবে এতে সন্দেহ নেই। তুমি আমার এই খচ্চড়ের পেছনে উঠে বসো। আল্লাহর রাসূল (সা:) এর কাছে চলো। আমি তোমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করছি'।
মক্কার ইসলাম বিরোধী কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান, যার দাপটে রণভূমি কেঁপে উঠেছে। সেই নেতা আজ নিজের প্রাণের মায়ায় কোনো কথা না বলে রাসূল (সা:) এর চাচার পেছনে উঠে বসলো। হযরত আব্বাস (রা:) দ্রুত গতিতে খচ্চর ছুটিয়ে নবী করীম (সা:) এর দিকে অগ্রসর হলেন। হযরত উমার (রা:) যে স্থানে উনুন জ্বালিয়ে ছিলেন তার পাশ দিয়েই হযরত আব্বাস (রা:) যাচ্ছিলেন। হযরত উমার (রা:) তাঁকে দেখে বললেন, 'আল্লাহর শোকর যে তিনি তাঁর দুশমনকে আমাদের মধ্যে এনে দিয়েছেন'।
কিন্তু তাঁকে হত্যা করতে হলে নবী করীম (সা:) এর অনুমতি প্রয়োজন, এ কারণে তিনি দ্রুত উঠে নবী করীম (সা:) এর দিকে গেলেন। হযরত আব্বাস (রা:) খচ্চর ছুটিয়ে রাসূল (সা:) এর কাছে উপস্থিত হয়ে আবু সুফিয়ানের প্রাণ ভিক্ষার আবেদন করলেন। হযরত উমার (রা:) ও তাঁকে হত্যার অনুমতি প্রার্থনা করলেন। নবী করীম (সা:) কোনো পক্ষেই সাড়া দিলেন না। হযরত আব্বাস (রা:) হযরত উমার (রা:) কে বললেন, 'হে উমার! এই লোক যদি তোমার কবিলার হতো তাহলে কি তুমি এতটা কঠোর হতে পারতে?' হযরত উমার (রা:) বললেন, 'আপনি এমন করে বলবেন না। আপনি যেদিন ইসলাম কবুল করেছিলেন, সেদিন আমি যা আনন্দিত হয়েছিলাম আমার পিতা খাত্তাব ইসলাম কবুল করলেও এতটা আনন্দিত হতাম না'।
এই সেই আবু সুফিয়ান, যার নেতৃত্বে নবী করীম (সা:) এর প্রিয় চাচা হযরত হামজা (রা:) কে হত্যা করে তাঁর বুক চিরে কলিজা বের করে চিবিয়ে ছিল আবু সুফিয়ানেরই স্ত্রী হিন্দা। স্বয়ং আবু সুফিয়ান হযরত হামজা (রা:) এর পবিত্র দেহে বর্শার আঘাত করে কটুক্তি করেছিল। তাঁর অতীত কর্ম তৎপরতা সকল মুসলমানের সামনে ছিল স্পষ্ট। অজস্র অপরাধে সে অপরাধী। তাঁর প্রতিটি অপরাধই ছিল মৃত্যুদণ্ডযোগ্য। কিন্তু যাঁর সামনে তিনি নত মস্তকে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি ছিলেন রাহমাতুল্লিল আলামীন। করুণার মূর্ত প্রতীক হিসাবে যিনি পৃথিবীতে আগমন করেছেন। নবী করীম (সা:) আবু সুফিয়ানের দিকে পবিত্র গ্রীবা বাড়িয়ে তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে অভয় দান করলেন, 'কোনো ভয় নেই, এটা ভয়ের জায়গা নয়'। প্রাণের দুশমনদের প্রতি এটাই ছিলো নবী করীম (সা:) এর সীরাত।
বুখারী শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রেফতার বরণের পরপরই আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ঐতিহাসিক আত তাবারী বলেন, আবু সুফিয়ানের সাথে নবী করীম (সা:) এর কিছু কথা হয়েছিল। রাসূল (সা:) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'হে আবু সুফিয়ান! এখনো কি তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না যে আল্লাহ তা'য়ালা ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই?' আবু সুফিয়ান বলেছিলেন, 'আজ যদি অন্য কোনো ইলাহ থাকতো, তাহলে তো আমাদের কাজেই আসতো'। নবী করীম (সা:) তাঁকে পুনরায় প্রশ্ন করেছিলেন, 'হে আবু সুফিয়ান আমি যে আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল এতে কি তোমার সন্দেহ আছে?' তিনি জবাব দিয়েছিলেন, 'সামান্য একটু সন্দেহ আছে'।
শেষ পর্যন্ত আবু সুফিয়ান ইসলাম কবুল করেছিলেন। নবী করীম (সা:) তাঁকে মর্যাদা দিয়েছিলেন এবং তিনি এক সময় প্রকৃত ঈমানাদার হয়েছিলেন। ইসলামের পক্ষে তিনি যুদ্ধও করেছেন। তায়েফের যুদ্ধে তাঁর একটি চোখ আহত হয়েছিল। ইয়ারমুকের যুদ্ধে উক্ত চোখটি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মক্কা বিজয়ের দিন নবী করীম (সা:) আবু সুফিয়ানকে লক্ষ্য করে বললেন, 'আপনি মক্কায় গিয়ে ঘোষণা করে দিন, যে ব্যক্তি অস্ত্র ত্যাগ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। যে ব্যক্তি কা'বায় আশ্রয় গ্রহণ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। যে ব্যক্তি নিজের গৃহের দরোজা বন্ধ রাখবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। আর ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের বাড়িতে থাকবে তারাও নিরাপত্তা লাভ করবে'। অথচ এই আবু সুফিয়ান ওহুদের ময়দানে নবী করীম (সা:) কে হত্যার উদ্দেশ্যে হন্যে হয়ে খুঁজে ছিলো। পক্ষান্তরে আল্লাহর রাসূল (সা:) তাঁকে এত বেশী মর্যাদা দিলেন যে, তাঁর বাড়িতে যারা আশ্রয় গ্রহণ করবে তারাও আজকের এই বিজয়ের দিনে নিরাপত্তা পাবে। তদানীন্তন আরবে কারো বাড়িকে নিরাপত্তার স্থল হিসাবে ঘোষণা দেয়ার অর্থ ছিল তাকে অধিক সম্মান প্রদর্শন করা। নবী করীম (সা:) আবু সুফিয়ানের ক্ষেত্রে তাই করেছিলেন। (ইবনে আল জাওযী, আল মুজতবা, পৃষ্ঠা নং-৮৩)
আবু সুফিয়ান (রা:) মক্কায় গিয়ে জনগণের মধ্যে নবী করীম (সা:) এর ঘোষনা শুনিয়ে দিলেন। তাঁর ঘোষনা শুনে মক্কার কুরাইশরা হতবিহ্বল হয়ে পড়লো। তিনি নিজের সম্পর্কে ঘোষনা দিলেন, 'আজ থেকে আমি তোমাদের আর নেতা নই, আমার পরিচয় শোনো, আমি মুসলমান'।
তাওহীদের সেনাবাহিনী মক্কার দিকে অগ্রসর হতে থাকলো। নবী করীম (সা:) তাঁর প্রিয় চাচা হযরত আব্বাস (রা:) কে বললেন, 'আবু সুফিয়ানকে উচ্চস্থানে দাঁড় করিয়ে দাও, তাওহীদের সেনাবাহিনীর রূপ চেহারা সে দু'চোখ ভরে উপভোগ করুক'।
নবী করীম (সা:) আল্লাহ তা'য়ালার পথের অকুতোভয় সৈনিকদের নিয়ে মক্কা নগরীতে প্রবেশ করছেন, কুরাইশরা ভয়ে আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়লো। কেউ আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করলো, কেউ বা কা'বাঘরে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। কয়েকজন মক্কা ত্যাগ করে পালিয়ে গেল। হযরত আব্বাস (রা:) নও মুসলিম হযরত আবু সুফিয়ান (রা:) কে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড় করিয়ে দিলেন। তাওহীদের বিশাল বাহিনী সমুদ্রের তরঙ্গের মতই মক্কা নগরীতে আছড়ে পড়লো।
এক নয়ানভিরাম বিস্ময়কর দৃশ্যের অবতারণা হলো। আরবের বিভিন্ন গোত্র তাদের নিজের গোত্রের পতাকা উড়িয়ে মক্কা নগরীতে প্রবেশ করছেন। প্রতিটি সৈন্যর চেহারায় তাওহীদের দ্যুতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আল কুরআনের সৈনিকরা আল্লাহু আকবর বলে তাকবীর দিয়ে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বীর দর্পে কুচকাওয়াজ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে। সর্বপ্রথম গিফারী গোত্রের মিছিল সামনের দিকে এগিয়ে গেল। তার পেছনে জুবায়না গোত্র। মহান আল্লাহ তা'য়ালা হুদায়বিয়া সন্ধিকে 'ফতহুম মুবিন' অর্থাৎ প্রকাশ্য বিজয় বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। আজ তার বাস্তব অবস্থা মানুষ দেখতে পাচ্ছে। এরপর বিভিন্ন গোত্রের মিছিল বজ্রকণ্ঠে তাওহীদের শ্লোগানে মক্কা নগরীকে প্রকম্পিত করে এগিয়ে গেল।
নও মুসলিম হযরত আবু সুফিয়ান (রা:) জান্নাতি দৃশ্য দেখতে দেখতে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলেন। তাঁর সাথে ছিলেন নবী করীম (সা:) এর চাচা হযরত আব্বাস (রা:)। সেদিন তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল তাঁরই ওপর। তিনি চিনতে পারছিলেন না, কোনটা কোন্ বাহিনী। হযরত আব্বাস (রা:) এর কাছ থেকে তিনি বিভিন্ন বাহিনীর পরিচয় তিনি জেনে নিচ্ছিলেন।
এবার এগিয়ে এলো বিশাল এক মিছিল নিয়ে সেনাপতি হযরত সায়াদ ইবনে উবায়দা (রা:)। আবু সুফিয়ান (রা:) জিজ্ঞাসা করলেন, 'বর্ণাঢ্য সাজে সজ্জিত এই বিশাল বাহিনীর পরিচয় কি?' হযরত আব্বাস (রা:) বললেন, 'এই বাহিনী মদীনার আনসারদের'।
হযরত উবায়দা (রা:) দেখলেন হযরত আবু সুফিয়ান (রা:) দাঁড়িয়ে আছেন আর তাঁর পাশেই রয়েছেন নবী করীম (সা:) এর প্রিয় চাচা হযরত আব্বাস (রা:)। তাঁকে দেখে তিনি বললেন, 'হে আবু সুফিয়ান! আজকের দিন রক্তপাতের দিন। কা'বাকে আজ উন্মুক্ত এবং বৈধ করে দেয়া হবে'।
অর্থাৎ আজ কা'বা এলাকায় রক্তপাত করা বৈধ। আবু সুফিয়ান বুঝলেন, আজ মক্কা নগরীতে রক্তের প্লাবন বইয়ে দেয়া হবে। তিনি শংকিত হয়ে পড়লেন। তাহলে তাঁর আত্মীয়-স্বজন এবং মক্কার অধিবাসীরা কেউ আজ জীবিত থাকবে না? এমন সময় তিনি দেখলেন নবী করীম (সা:) কে পরিবেষ্টন করে সাহাবায়ে কেরাম বিশাল মিছিল সহকারে মক্কা নগরীতে প্রবেশ করছেন। এই মিছিলের পতাকা ছিল হযরত যুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা:) এর হাতে।
হযরত আবু সুফিয়ান (রা:) উচ্চ কন্ঠে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আপনি শুনেছেন, উবায়দা কি বলে গেল!'
আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল (সা:) জানতে চাইলেন, 'কি বলেছে উবায়দা?'
হযরত আবু সুফিয়ান (রা:) জানালেন, 'উবায়দা বলে গেল আজকের দিন রক্তপাতের দিন। কা'বাকে আজ উন্মুক্ত এবং বৈধ করে দেয়া হবে'।
নবী করীম (সা:) তাঁকে অভয় দান করে বললেন, 'উবায়দাহ ভুল বলেছে। আজ কা'বা শরীফের মর্যাদা দেয়ার দিন'। অর্থাৎ কোনো রক্তপাত নয়, কা'বাঘরের প্রকৃত যে মর্যাদা আজ সেই মর্যাদা দেয়ার দিন।
পবিত্র মক্কা নগরীতে এক পথে মিছিল প্রবেশ করেনি। বিভিন্ন পথ ধরে মিছিল প্রবেশ করছিল। হযরত খালিদ (রা:) এর নেতৃত্বে এক বিশাল মিছিল নগরীতে প্রবেশ করছিল। বুখারী শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, বিজয়ী বীর বিশ্বনবী (সা:), যাঁকে এই নগরীর লোকজন অবর্ণনীয় অত্যাচার করেছে। তাদেরই মধ্যে তিনি বিজয়ী বীর হিসেবে প্রবেশ করছেন। অথচ তাঁর চেহারায় গর্ব অহংকারের কোনো চিহ্ন নেই। তাঁর সকল আচরণে ক্ষমা আর মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পাচ্ছে। সুললিত কণ্ঠে তিনি সূরা ফাত্হ্ তিলাওয়াত করছেন। সূরা ফাতহ-এ বিজয়ের সুসংবাদ দিয়ে হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় নাজিল হয়েছিল।
ইসলাম সম্পর্কে না জেনে অথবা বিদ্বেষ অন্তরে রেখে যারা বলেন, ইসলাম তরবারীর শক্তিতে প্রচার হয়েছে, তারা আজকের এই অভূতপূর্ব দৃশ্য কল্পনার দৃষ্টিতে একবার দেখুন, ইসলাম কোন্ শক্তির কারণে বিজয়ী হয়েছে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফ্ফাল (রা:) বলেন, আমি মক্কা বিজয়ের দিন আল্লাহর রাসূল (সা:)-কে উটের ওপর বসে মধুর কন্ঠে সুরা ফাত্হ্ পাঠ করতে দেখেছি। হযরত মুআবিয়া ইবনে কুররা (রা:) বলেন, যদি আমার পাশে লোকজন ভীড় করার আশংকা না থাকতো, তাহলে মুগাফ্ফালের মত আমিও আল্লাহর রাসূল (সা:) এর কুরআন তিলাওয়াত শুনতাম। (বুখারী)
নবী করীম (সা:) এর নির্দেশ ছিল, কোনো ধরনের বাধা না এলে কারো প্রতি আঘাত করা যাবে না। কিন্তু কুরাইশদের একটি হঠকারী দল হযরত খালেদ (রা:) এর মিছিলের ওপর আক্রমন করলো। তিনজন সাহাবা শাহাদাতবরণ করলেন। বাধ্য হয়ে হযরত খালেদ (রা:) আক্রমণ করলেন। কুরাইশদের বিভ্রান্ত দলের ১৩ জন নিহত হলো। নবী করীম (সা:) দূর থেকে যুদ্ধের দৃশ্য দেখে খালেদ (রা:) কে তলব করলেন। কৈফিয়ত চাইলেন, কেনো যুদ্ধ শুরু করা হলো। তিনি জানালেন, প্রতিপক্ষ তাদের ওপরে প্রথমে আক্রমন করে তিনজনকে শহীদ করেছে। তখন নবী করীম (সা:) বললেন, 'আল্লাহ তা'য়ালার ইচ্ছা এমনই ছিল'।
নবী করীম (সা:) এর পতাকা হাজুন নামক স্থানে রাখা হলো। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হলো, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আপনি আজ কোথায় থাকবেন? আপনি কি আপনার সেই পুরোনো বাড়িতেই থাকবেন?'
আল্লাহর রাসূল (সা:) বললেন, 'আকীল কি কোনো জায়গা রেখেছে!' তারপর তিনি বললেন, 'ঈমানদার ব্যক্তি কাফিরদের উত্তরাধিকারী হয় না। আর কাফিরও ঈমানদারের উত্তরাধিকারী হয় না'। (বুখারী)
ইসলামী বিধানে কোনো মুসলমান কোনো অমুসলিমের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারে না। নবী করীম (সা:) এর চাচা আবু তালিব যখন ইন্তেকাল করেছিলেন সে সময় হযরত আলী (রা:) এর ভাই আকীল অমুসলিম ছিলেন। তিনি রাসূল (সা:) এর এবং তাঁর পিতার সকল সম্পদ আবু সুফিয়ানের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলেন।
বিশ্বনবী (সা:) নিজের থাকার জন্যে কা'বার ঐ স্থানের কথা বললেন, যেখানে ইসলাম বিরোধিরা ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য একত্রিত হয়ে শপথ গ্রহণ করতো। তিনি মক্কা বিজয়ের সময় মক্কার উচ্চ এলাকা কাদা নামক স্থান দিয়ে প্রবেশ করেছিলেন। তিনি যে উটের আরোহী ছিলেন তাঁর পেছনে বসেছিলেন মুতার যুদ্ধে শাহাদাতপ্রাপ্ত হযরত যায়িদ ইবনে হারিসা (রা:) এর সন্তান হযরত উসামা (রা:)। বিশ্বনবী (সা:) এর পবিত্র মাথা মুবারকে এ সময় ছিল লোহার শিরস্ত্রাণ।