📄 মদীনার নীলিমায় মক্কার সূর্য
মহাকাশের সূর্যের সাথে বাসযোগ্য ক্ষুদ্রগ্রহ এ পৃথিবীর বন্ধন রজ্জু অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না। কিন্তু ধরা না পড়লেও সূর্য তাপেই পৃথিবী ফলে ফুলে সুশোভিত হয়। যে স্থান থেকে সূর্য উদিত হয় সে স্থান মেঘমালা আচ্ছাদিত থাকলেও সূর্যের উদয় পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। আপন গতি পথেই সূর্য এগিয়ে যেতে থাকে। পূর্বাকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে পশ্চিমাকাশে সূর্য আপন প্রভা বিকিরণ করে। মদীনার সাথে বুঝি নবী করীম (সা:) এর নাড়ির সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। তিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করে মক্কায় অবস্থান করেন কিন্তু তাঁর সে সম্পর্ক কারো দৃষ্টিতে ধরা না পড়লেও তাঁরই প্রভাবে মদীনার আনসাররা আলোকিত হয়ে উঠেছিল। মক্কা থেকে তিনি মহাসত্যের যে তাপ বিকিরণ করতেন, সে তাপে মদীনা ফলে ফুলে সুশোভিত হয়েছিল।
মক্কার আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন, মহাসত্যের সূর্য উদিত হলো কিন্তু সে সূর্য ঘন নিকষ কালো মেঘের কারণে মক্কার আকাশে স্বাধীনভাবে তাঁর তাপ বিকিরণ করতে সক্ষম হলো না। দুর্ভাগ্য মক্কাবাসীর। তারপর কালক্রমে মক্কার সে সূর্য মদীনার আকাশে এসে উদিত হয়েছিল। মদীনার মেঘমুক্ত আকাশে মহাসত্যের সে সূর্য স্বাধীনভাবে তাপ বিকিরণ করেছিল। সময়ের ব্যবধানে সে তাপ সমগ্র পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল।
আজ নবী করীম (সা:) শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, তিনি আর কোনোদিন এ পৃথিবীতে মানুষের সামনে শারীরিকভাবে মানুষের জাগ্রত অবস্থায় সবার সামনে আসবেন না। কিন্তু তিনি যে তাপ বিকিরণ করেছেন, তাঁর অবর্তমানে তাঁরই অনুসারীগণ শত সহস্রগুণ শক্তিশালী করে পৃথিবীময় বিকিরণ করেছিল। ইতিহাসের ধারা পরিক্রমায় সে তাপ ছড়িয়ে পড়ার গতি কিছুটা হ্রাস পেলেও মহাসত্যের তাপের গতি যে পুনরায় বৃদ্ধি লাভ করবে তার সকল নিদর্শন পৃথিবীব্যাপী সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সে শুভ মুহূর্ত আগত প্রায় যখন হেরার রাজ তোরণ পুনরায় বিশ্বব্যাপী প্রজ্জ্বলিত হবে। সাম্প্রতিককালে মধ্যপ্রাচ্যে ও আফ্রিকার অন্তর্ভুক্ত লিবিয়ার ঘটনাবলী এ কথারই স্বাক্ষর বহন করছে।
হিজরতকালে দীর্ঘ চৌদ্দদিন কুবায় অবস্থান করে একটি মসজিদ নির্মাণের পরে বিশ্বনবী (সা:) মদীনা শহরের দিকে যাত্রা শুরু করলেন। তিনি যে পথ দিয়ে শহরের দিকে যাচ্ছেন সে পথের দু'ধারে উৎসুক জনতা আল্লাহর নবীর পবিত্র চেহারা মুবারক একটি বার দেখার জন্য গভীর আগ্রহে দাঁড়িয়েছিল। তাঁকে দেখার সাথে সাথে জনতা আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলছিল। নবী করীম (সা:) উটের পিঠে, ধীর মন্থর পায়ে উট এগিয়ে যাচ্ছে মদীনার দিকে, রাসূলের শেষ বিশ্রামস্থলের দিকে।
সেদিন ছিল পবিত্র জুমুয়াবার। পথে জুমা নামাজের সময় হলে নবী করীম (সা:) বনী সালেম গোত্রে জুমা নামাজ আদায় করলেন তাঁর অনুসারী মুসলমানদের জীবনে এটাই ছিল প্রথম জুমা নামাজ। এখানেই তিনি জুমার প্রথম খুত্বাদান করেছিলেন। এই মসজিদের নাম হয়েছে বাতনুল ওয়াদির মসজিদ বা ওয়াদিয়ে রানুনার মসজিদ। নবী করীম (সা:) এর প্রথম জুমা নামাজ আদায়ের স্মৃতি বিজড়িত মসজিদ।
বনী সালেম গোত্রের আবাল বৃদ্ধ বনিতাদের হৃদয়ের স্বপ্ন, যদি আল্লাহর রাসূল তাদের মাঝে থাকতেন! তাঁরা দলবদ্ধভাবে এসে নবীর সামনে নিবেদন করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমাদের যা কিছু আছে সবই আপনার পবিত্র কদমে উৎসর্গিত। আপনি যদি সন্তুষ্ট হয়ে আমাদের মধ্যে চিরদিনের জন্য থাকতেন'!
দুর্ভাগ্য তৎকালীন মক্কাবাসীর, কি অমূল্য রত্ন তারা হারালো বুঝতে পারলো না। যখন বুঝলো তখন সে রত্ন হাতছাড়া হয়ে গেছে। তখন সে অমূল্য সম্পদের অধিকারী মদীনাবাসী। আল্লাহর রাসূলের মুখে মধুর হাসি। তিনি বললেন, 'আমার উটকে তোমরা যেতে দাও, মহান আল্লাহ এই উটকে নির্দেশ দান করেছেন কোথায় আমাকে নিয়ে যেতে হবে'।
মহান আল্লাহ তা'য়ালাই এই ব্যবস্থা করেছিলেন। এই ব্যবস্থা অবলম্বন না করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও রাসূল (সা:) কে নিজেদের অধিকারে রাখার জন্যে গোত্রে গোত্রে দাঙ্গা সৃষ্টি হতো। উট এগিয়ে যাচ্ছে, পথে যে গোত্রই পড়ছে সেই গোত্রই ঐ একই আবেদন পেশ করছে। নবী করীম (সা:) মুখে চাঁদের হাসি ফুটিয়ে সবাইকে একই কথা বলছেন। অবশেষে উট তাঁকে বহন করে মদীনা শহরে পৌঁছলো।
পূর্বেই শহরে সংবাদ এসেছিল, ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মাদ (সা:) আজ এই শহরে তাঁর পবিত্র কদম রাখবেন। মদীনার আনাচে কানাচে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছিল। কুবা থেকে মদীনা শহর পর্যন্ত কোনো একটি স্থান শূন্য ছিল না। পথের দু'পাশে ছিল মানব বন্ধন আর অগণিত জনতার ভীড়। মানুষ উঁচু স্থানে আরোহন করে প্রতিযোগিতা করছিল, কে আগে আল্লাহর নবীকে দেখে নিজের তৃষ্ণার্ত নয়ন সার্থক করবে।
মদীনার অবরোধপুরবাসিনী নারী গোষ্ঠী, শিশু, বালক-বালিকারা গৃহের ছাদে উঠে মধুর কণ্ঠে তালে তালে তাদের স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করছিল। এ সকল কবিতা ছিল রাসূলের প্রশংসায় নিবেদিত। কিয়ামত পর্যন্ত মানুষ সে কবিতা আবৃত্তি করতে থাকবে। তাঁরা মধুর কন্ঠে আবৃত্তি করছিল-
طَلَعَ الْبَدْرُ عَلَيْنَا - مَنْ ثَنِيَاتِ الْوَدَاعِ - وَجَبَ الشَّكْرُ عَلَيْنَا - مَادَ عَى لِلَّهِ دَاعٍ -
'চন্দ্র হয়েছে উদয় বিদা পর্বতের ঘাঁটি হতে, মোদের প্রতি আল্লাহর প্রশংসা করা বাধ্যতামূলক, যে পর্যন্ত প্রার্থনাকারী প্রার্থনা করবে'।
মদীনার বালিকাগণ বিশেষ এক প্রকার বাদ্যযন্ত্র যাকে বলা হয় 'দক্', এই দফ বাজিয়ে কোরাশ কণ্ঠে কবিতা আবৃত্তি করছিল-
نَحْنُ جَوَارِ مِنْ بَنِي النَّجَّارِ - يَا حُبَنَا مُحَمَّدًا مِنْ جَارِ -
'নাজ্জার বংশের বালিকা আমরা, মুহাম্মাদ (সা:) আমাদের সর্বোত্তম প্রতিবেশী'।
আল্লাহর নবী (সা:) পরম মমতাভরা দৃষ্টিতে শিশু মেয়েদের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। মধুর কণ্ঠে তাদেরকে বললেন, 'আমাকে কি তোমরা চাও?'
শিশু মেয়েরা আত্মহারা হয়ে উঠলো। তাঁরা সমবেত কণ্ঠে খুশীর আবেগ প্রকাশ করলো, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:) আপনাকে আমরা চাই'।
বিশ্বনবী (সা:) তাদের প্রতি স্নেহ প্রকাশ করে বললেন, 'আমিও তোমাদেরকে চাই'।
উট এগিয়ে গেল, সামনে পড়লো বিশ্বনবী (সা:) এর মামাদের পরিবার বনী আদী নাজ্জারের গোত্র। এই গোত্রেরই মেয়ে ছিলেন নবী করীম (সা:) এর দাদার মাতা সালামা বিনতে আমর। এই গোত্রের লোকজন নবীর উটের সামনে দাঁড়িয়ে করুণ কন্ঠে আবেদন পেশ করলো, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমাদের সবকিছুই আপনার, আপনি আমাদের সাথে অবস্থান করুন!'
নবী করীম (সা:) তাদেরকেও বললেন, 'উটের প্রতিই আল্লাহ তা'য়ালা আদেশ করেছেন, সে আমাকে যথাস্থানে নিয়ে যাবে। তোমরা উটকে পথ করে দাও'।
উট এবার এগিয়ে গিয়ে বনী মালিক ইবনে নাজ্জারের বাসস্থানের সামনে এসে আস্তে আস্তে হাঁটু ভাঁজ করে বসলো। মসজিদে নববীর প্রবেশ দ্বার এখানেই বানানো হয়েছিল। সে সময় ঐ স্থানটি ছিল বনী নাজ্জার গোত্রের সাহল ও সুহাইল নামক দু'জন ইয়াতিম শিশুর। তাদেরকে লালন পালন করতো হযরত মায়াজ ইবনে আকরা। এ স্থানে বাচ্চা দু'টো তাদের খেজুর শুকাতো।
উট বসে পড়লেও নবী করীম (সা:) উট থেকে অবতরণ করলেন না। কিছুক্ষণ পরে উট উঠে কিছুদূর এগিয়ে গেল। তারপর উট সেখান থেকে পেছনের দিকে তাকালো যেখানে সে প্রথম বসেছিল। তারপর পুনরায় সে পূর্বের স্থানে ফিরে এসে বসে পড়লো। এবার সে একটু শব্দ করে তার গলা এবং বুক মাটির সাথে স্পর্শ করলো। আল্লাহর রাসূল (সা:) অনুভব করলেন, মহান আল্লাহ উটকে এই স্থানেই থেমে যেতে আদেশ করেছেন।
সামনেই ছিল হযরত আবু আইউব আনসারী (রা:) এর বাড়ি। তাঁর প্রকৃত নাম আবু আইউব খালিদ ইবনে যায়িদ আনসারী (রা:)। তিনি দ্রুত এগিয়ে এসে নবী করীম (সা:) এর সামান্য আসবাব-পত্র নামিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। মহাসৌভাগ্যবান ব্যক্তি তিনিই হলেন যার ঘরে মেহমান হলেন সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা:)।
আরেক বর্ণনায় এসেছে, বর্তমানে যেখানে মাসজিদে নববী অবস্থিত সেখানেই ছিল হযরত আবু আইউব (রা:) এর ঘর। এখানে উট এসে পৌঁছলে রাসূল (সা:) কার মেহমান হবেন তা নিয়ে বেশ বিতর্কের সৃষ্টি হলো। শেষ পর্যন্ত সমাধান করা হলো এভাবে যে, উট যার ঘরের সামনে থামবে রাসূল (সা:) তাঁরই মেহমান হবেন। উট এসে থেমেছিল হযরত আবু আইউব (রা:) এর ঘরের সামনে।
পক্ষান্তরে মুসলিম শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মদীনার আনসারদের মধ্যে রাসূলের মেহমানদারী করা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে নবী করীম (সা:) স্বয়ং বলেছিলেন, 'আমি বনী নাজ্জার গোত্রে থামবো। কারণ তাঁরা আমার দাদার মামা'।
সুতরাং নবী করীম (সা:) তাঁর দাদার আত্মীয়তার কারণে হযরত আবু আইউব (রা:) এর মেহমান হয়েছিলেন। ইমাম বুখারী তাঁর তারিখে ছগীরে লিখেছেন, নবী করীম (সা:) তাঁর দাদার আত্মীয়তার কারণে হযরত আবু আইউব (রা:) এর মেহমান হয়েছিলেন।
এই বাড়িতে বিশ্বনবী (সা:) প্রায় সাত মাস অতিবাহিত করেন। তাঁরপর মাসজিদে নববী এবং উম্মাহাতুল মুমেনিনের জন্য বাসগৃহ নির্মাণ করা হলে তিনি সেখান থেকে মাসজিদে নববীর পাশে চলে আসেন।
হযরত আবু আইউব (রা:) এর বাড়িটা ছিল দোতলা। সে সময় একতলা আর দোতলার মধ্যবর্তী অংশ বর্তমানের দোতলা বাড়ির মত ছিল না। হয়তঃ কাঠ দিয়ে মাঝের অংশ প্রস্তুত করে তার ওপরে মাটির প্রলেপ দেয়া হত। এ কারণে ওপরের অংশে পানি পড়লে সে পানি গড়িয়ে নিচের তলায় পৌঁছতো। হযরত আবু আইউব (রা:) বিশ্বনবী (সা:) এর মর্যাদার দিক লক্ষ্য করে তাঁর কাছে আবেদন করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমার মাতা-পিতা আপনার কদম মুবারকে উৎসর্গিত হোক, আপনি ওপরের তলায় অবস্থান করুন!'
নবী করীম (সা:) তাঁকে বললেন, 'আমার সাথে লোকজন দেখা সাক্ষাৎ করতে আসবে, দোতলায় থাকলে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করা অসুবিধা হবে। আমি নিচের তলাতেই অবস্থান করি'।
এভাবে তিনি সে বাড়ির নিচের তলাতেই অবস্থান করতে থাকলেন। হযরত আবু আইউব (রা:) তাঁর নিজের অনুভূতির কথা এভাবে বলেন যে, 'আমরা তাঁর জন্য খাবার প্রস্তুত করে সবটুকু খাবারই তাঁর কাছে প্রেরণ করতাম। আল্লাহর রাসূল আহার করে অবশিষ্টাংশ ফেরৎ পাঠাতেন। আমরা লক্ষ্য করতাম খাদ্য পাত্রের কোনো কোনো স্থানে রাসূলের পবিত্র আঙ্গুলের চিহ্ন পাওয়া যায়। যেসব স্থানে চিহ্ন দেখতাম সে স্থান থেকেই আমরা আহার করতাম। আমরা অধিক বরকতের আশায় এমন করতাম। একদিন আমরা খাবার প্রস্তুত করার সময় একটু রসুন বা পিঁয়াজ দিয়েছিলাম। সে খাবার রাসূলের কাছ থেকে যখন ফেরৎ এলো তখন দেখলাম, রাসূলের পবিত্র আঙ্গুলের চিহ্ন নেই খাদ্য পাত্রে। আমরা অনুভব করলাম তিনি খাদ্য আহার করেননি। আমরা অস্থির হয়ে পড়লাম। জানি না আমাদের দ্বারা এমন কী ভুল হয়ে গেল যে, তিনি আহার করলেন না?
আমি দ্রুত তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে আবেদন করলাম, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আপনার জন্য আমাদের মাতা-পিতা কুরবান হোক! আপনি খাদ্য ফেরৎ পাঠিয়েছেন অথচ আপনার হাতের চিহ্ন নেই। আমরা বরকতের আশায় আপনার হাতের চিহ্ন দেখে সেখান থেকে আহার করতাম। হে আল্লাহর রাসূল! আমরা বুঝতে পারছি না আমাদের কি অপরাধ!'
নবী করীম (সা:) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে পরম স্নেহের স্বরে বললেন, 'অন্য কোনো কারণ নয়, আমি আজ খাবারের মধ্যে একটি গাছের গন্ধ পেয়েছি। তা আহার করলে মুখে গন্ধ হয়। অনেকের সাথে আমাকে কথা বলতে হয়, মুখ থেকে গন্ধ বের হবে। এ কারণে আমি আহার করিনি। তোমরা আহার করতে পারো'।
হযরত আবু আইউব (রা:) জবাবে বলেছিলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল (সাঃ)! আপনি যা পছন্দ করেন না, আমরাও তা পছন্দ করবো না'। (উসুদুল গাবা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৮১, মুসলিম শরীফ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-১৯৮, সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৪৯৯)
নবী করীম (সা:) জিবরাঈল (আ:) সহ অন্যান্য ফেরেশতাদের সাথে ক্ষেত্র বিশেষে মহান আল্লাহ তা'য়ালার সাথে কথা বলতেন। এ কারণে তিনি কোনো গন্ধযুক্ত খাবার পছন্দ করতেন না। এই ঘটনার পর থেকে তাঁর কাছে কোনো ধরনের গন্ধযুক্ত খাদ্য প্রেরণ করা হতো না। কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই ঘটনার পর থেকে হযরত আবু আইউব (রা:) ও তাঁর পরিবার পরিজন রসুন বা পিঁয়াজ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
হযরত আবু আইউব আনসারী (রা:) বলেন, 'তখন আমরা বাধ্য হয়েই ওপর তলায় অবস্থান করি। একদিন রাতে হঠাৎ করেই পানির পাত্রটা ভেঙ্গে গেল। নিচের তলায় রাসূল (সা:) অবস্থান করছেন। পানি এখন গড়িয়ে নিচের তলায় চলে যাবে। আমরা বিচলিত হয়ে পড়লাম। অবশেষে আমাদের শোবার মত যে কম্বলটা ছিল তা পানির ওপর বিছিয়ে দিয়ে সে পানি শোষণ করালাম। তারপর আমরা ঘরের এক কোণে সমগ্র রাত ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে অতিবাহিত করলাম। সকালে নবী করীম (সা:) এর সামনে উপস্থিত হয়ে আমরা আমাদের অনুভুতির কথা ব্যক্ত করে তাঁকে অনুরোধ করলাম তিনি যেন ওপর তলায় চলে যান। আমাদের অনুরোধে তিনি আমাদের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে ওপরে চলে গেলেন'। (উসুদুল গাবা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৮১, হায়াতুস সাহাবা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৩২৮-৩২৯, সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৪৯৮)
বিশ্বনবী (সা:) ইসলামের প্রথম শিক্ষক, মুবাল্লিগ, প্রথম দূত হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা:) এর সাথে হযরত আবু আইউব (রা:) এর ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক স্থাপন করে দেন। ইতিহাসে বর্ণনা করা হয়েছে, তাদের উভয়ের চরিত্রে অপূর্ব সাদৃশ্য ছিল। উভয়ের মধ্যেই প্রাণ প্রাচুর্য এবং উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল অদ্ভুত ধরনের। (তাবাকাতে ইবনে সাআদ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৪৮৪)
বিশ্বনবী (সা:) মদীনায় আগমন করেই হযরত যায়েদ (রা:) কে দু'টো উট এবং পাঁচশত দেরহাম দিয়ে মক্কায় প্রেরণ করলেন পরিবারের সদস্যদের মদীনায় নিয়ে আসার জন্য। হযরত আবু বকর (রা:)ও পত্র প্রেরণ করেছিলেন তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মদীনায় চলে আসার জন্য। তাঁর সন্তান হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবু বকর (রা:) পরিবারের সকল সদস্যদের নিয়ে হযরত যায়েদ (রা:) এর সাথেই অর্থাৎ নবী পরিবারের সদস্য এবং হযরত আবু বকর (রা:) এর পরিবারের সদস্যগণ একত্রেই মদীনায় আগমন করেন। পক্ষান্তরে নবী করীম (সা:) এর এক কন্যা সে সময় আসতে পারেননি। তিনি তাঁর স্বামী হযরত উসমান (রা:) এর সাথে সে সময় হাবশায় অবস্থান করছিলেন।
নবী করীম (সা:) কে ঘীরে মদীনার বালক-বালিকাগণ যে কবিতা আবৃত্তি করছিলো, তার মধ্যে 'বদর' শব্দ উল্লেখ রয়েছে। পূর্ণীমার পূর্ণ শশীকে আরবী ভাষায় 'বদর' বলা হয়। সাধারণত চন্দ্রকে আরবী ভাষায় 'ক্বামার' বলা হয়। মদীনায় হিজরতকালে নবী করীম (সা:) কে শুধু চাঁদের সাথে তুলনা না করে তাঁরা পূর্ণীমার পূর্ণ চন্দ্রের সাথে তুলনা করে আবৃত্তি করছিলো, 'আজ আমাদের ওপর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক হয়েছে'। মদীনায় হিজরতকালে নবী করীম (সা:) কে দেখে মদীনার শিশু-কিশোররা যে কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলো তা কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীব্যাপী প্রতিদিন কোথাও না কোথাও আবৃত্তি হতে থাকবে, এটি কখনো পুরনো হবে না।
পূর্ণীমা ব্যতীত চাঁদকে কখনোই পূর্ণ অবয়বে দেখা যায় না, পূর্ণীমার তিথীতেই চাঁদকে পৃথিবীর মানুষ পূর্ণ অবয়বে দেখে থাকে। এ সময় চন্দ্রের কিরণচ্ছটা পূর্ণরূপে বিকশিত হয়। মক্কার একশ্রেণীর মানুষ সে সময় নবী করীম (সা:) এর মর্যাদা উপলব্ধি করতে না পারলেও মদীনার ঐ মানুষগুলো ঠিকই উপলব্ধি করেছিলো, এই মহামানবের অনুসরণের মধ্যেই রয়েছে শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন, গৃহযুদ্ধ ও সকল প্রকার লাঞ্ছনা, অবহেলা, অমর্যাদা এবং অপমান থেকে মুক্তি। কেবলমাত্র তাঁর অনুসরণই মর্যাদার সুউচ্চ স্থানে আরোহণের সোপান। ইতিহাস কথা বলে, নবী করীম (সা:) কে ঘীরে তাঁদের উপলব্ধি, তাঁদের মায়া- মমতা, প্রেম-ভালোবাসা, ত্যাগ-তিতীক্ষা, উৎসর্গ কল্পনার কোনো বিষয় ছিলো না, পৃথিবীর ইতিহাসে সকল মানব গোষ্ঠীর মধ্যে মদীনার আনসারগণ যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে অতুলনীয় সম্মান অর্জন করেছে, সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসে এর একটি দৃষ্টান্তও নেই।
মদীনার হিজরতপূর্ব ইতিহাস যাঁরা জানেন, তাঁরা অবশ্যই অবগত রয়েছেন যে, গৃহযুদ্ধ আর ইয়াহুদীদের নির্যাতন মদীনার অধিবাসীদের প্রায় নিঃশেষ করে এনেছিলো। নবী করীম (সা:) এর আগমন তাঁদের নিঃশেষিত ক্ষয়িষ্ণু অস্তিত্বে প্রাণের সঞ্চার করেছিলো ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে চিরতরে মুছে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছিলো। আর এ জন্যেই বোধহয় তাঁরা সেদিন নবী করীম (সা:) কে পূর্ণীমার পূর্ণ শশীর সাথে তুলনা করে কবিতা আবৃত্তি করেছিলো।
মহান আল্লাহ তা'য়ালা মদীনার আনসারদের ওপর রহম করুন, তাঁরা শুধুমাত্র নবীপ্রেম ও আদর্শের কারণে যে ত্যাগ স্বীকার করেছে এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কোনো একটি জাতির মধ্যে নেই। মক্কা থেকে যেসব অসহায় মুসলমান শূন্য হাতে তাদের কাছে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল, তাঁরা এসব অসহায় মানুষদের জন্য নিজেদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে দিয়েছে। যে জাতি নিজের অধিকার ব্যতীত অন্যের অধিকারের ব্যাপারে এক মুহূর্তের জন্য মাথা ঘামাতে প্রস্তুত ছিল না, সেই জাতি ইসলামের সংস্পর্শে এসে নিজে অনাহারে থেকে অপরিচিত ব্যক্তিকে খাদ্য দিয়েছে। অন্যের সুবিধার জন্য নিজের বাড়ি-ঘর ছেড়ে দিয়েছে। নিজের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জন করা অর্থ-সম্পদ আরেকজনকে দিয়ে দিয়েছে। এমনকি নিজের দুইজন স্ত্রী থাকলে একজনকে তালাক দিয়ে তাঁর দ্বীনি ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছে।
ত্যাগের এই মহান দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্য কোনো জাতির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে? ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী অমুসলিম বন্ধুগণ মুসলিম ব্যতীত অন্য কোনো জাতির ইতিহাস থেকে এ ধরনের একটা দৃষ্টান্ত উপস্থিত করতে পারবেন? গর্ভধারিণী মায়ের জন্য রেষ্টুরেন্টে মাত্র একটি ডলার ব্যয় করার মত হৃদয় যাদের নেই, তাদের পক্ষে এমন ধরণের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা কষ্টকরই বৈকি। 'ইসলাম শক্তি প্রয়োগ করে এবং তরবারীর জোরে বিস্তার লাভ করেছে' এ সব কথা যারা বলেন এবং লিখেন, তাঁরা যে লজ্জার শেষ আবরণ, বিবেকের অবগুণ্ঠন ছুড়ে ফেলেই তা বলেন তাতে সন্দেহ নেই। অপরের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়ার মধ্যেই যাদের গৌরব নিহিত ছিল, সেই জাতি কোন্ যাদুর স্পর্শে ত্যাগের অনুপম মহিমায় এমন তুলনাহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, এ সম্পর্কে অমুসলিম বন্ধুদেরকে ক্ষণিকের জন্য হলেও চিন্তা করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।
📄 নবী করীম (সা:) এর মদীনার ভাষণ, মানবতার মুক্তি সনদ
নবী করীম (সা:) হিজরত করে মদীনা পৌঁছার পরপরই সেখানে একটি আদর্শিক বিপ্লব সাধিত হয়েছিল। মদীনার সিংহভাগ মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এর মধ্যেও দু'চারটি গোত্র ছিল যারা প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করেনি। আউস গোত্রের একটি ছোট অংশ নবী করীম (সা:)-এর আগমনের পরও তাদের ভ্রান্ত আদর্শ আঁকড়ে ধরেছিল। পরবর্তীতে অবশ্য সকলেই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল।
সার্বিক পরিস্থিতি কিছুটা নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে নবী করীম (সা:) মদীনার জনগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে ভাষণ পেশ করেছিলেন। ভাষণের সূচনায় তিনি মহান আল্লাহ তা'য়ালার প্রশংসা করে বললেন, 'হে মানুষ! তোমরা আখিরাতের জন্য পূজি অর্জন করো। মনে রেখো, তোমাদের মধ্যে হয়তঃ কোনো ব্যক্তি দ্রুতই ইন্তেকাল করবে। তার পশু সম্পদ পরিচালনা করার মতো কেউ থাকবে না। তখন তাকে তার প্রতিপালক প্রশ্ন করবেন, তোমার কাছে কি আমি রাসুল প্রেরণ করিনি? তোমার প্রতি অনুগ্রহ করে আমি তোমাকে ধন-সম্পদ দান করিনি? সে সকল সম্পদ থেকে তুমি আখিরাতের জন্য কি প্রেরণ করেছো?'
নবী করীম (সা:) বললেন, 'তখন সে ব্যক্তি তাঁর চারদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে। কিন্তু একমাত্র জাহান্নাম ব্যতীত আর কিছুই দেখতে পাবে না। সুতরাং তোমাদের উচিত ঐ জাহান্নাম থেকে নিজেকে রক্ষা করা। একটি খুরমা দান করে হলেও আখিরাতের পূজি অর্জন করা। যার দান করার মতো কিছুই নেই, তাঁর উচিত ভালো কথা বলে নিজেকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করা। কারণ মহান আল্লাহ তা'য়ালা ভালো কাজের পুরস্কার দশগুণ থেকে সাতশত গুণ বৃদ্ধি করে দেন'। (ইবনে হিশাম)
একটি বিষয় লক্ষনীয়, নবী করীম (সা:) তাঁর প্রথম ভাষণে মানুষকে আখিরাতের কথা বলেছেন। মানুষের মধ্যে আল্লাহর কাছে জবাবদিহীর অনুভূতি সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীর জীবনে আরাম আয়েশ ভোগ করার জন্য মানুষ প্রচুর অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে থাকে। কিন্তু এই জীবন ক্ষণস্থায়ী, পক্ষান্তরে পরকালের জীবন অনন্ত, যার কোনো শেষ নেই। সে অফুরন্ত জীবনে মানুষ যেন অনাবিল সুখ-শান্তিতে থাকতে পারে, এ কারণে তিনি মানুষকে আল্লাহ তা'য়ালার রাস্তায় দান করতে অনুপ্রাণিত করেছেন।
যাদের অর্থ-সম্পদ দান করার মতো সামর্থ নেই তাদেরকে বলা হয়েছে, দান সামান্য হলেও মহান আল্লাহ তা'য়ালা তার পুরস্কার বৃদ্ধি করে দিবেন। এভাবে সামান্য কোনো কিছু দান করতে অসমর্থ হলে তার উচিত মানুষকে সৎ উপদেশ দেয়া ও মানুষের সাথে উত্তম ব্যবহার করা। এসবের বিনিময়েও মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন।
পৃথিবীতে মানুষকে সৎ বানানোর কোনো টেক্সোলজি আবিষ্কার হয়নি এবং হবেও না। একমাত্র আখিরাতের ভয় ব্যতীত মানুষ কোনোক্রমেই সৎ হতে পারে না। মানুষের মাথায় যখন এই চিন্তা ক্রিয়াশীল থাকে যে, তাঁর সকল কাজের হিসাব মহান আল্লাহর কাছে পেশ করতে হবে। তখন সে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সৎ হতে বাধ্য। এ কারনেই নবী করীম (সা:) প্রথমে মানুষের অন্তরে আখিরাতের ভয় বা আল্লাহ ভীতি প্রবেশ করিয়েছিলেন। অপরদিকে সমগ্র ত্রিশপারা কুরআনে সর্বাধিক আলোচিত বিষয় হলো আখিরাত। আখিরাতের আলোচনা সম্বলিত আয়াতসমূহ একত্রিত করলে তা প্রায় দশ পারার সমান হবে বলে কুরআন বিশেষজ্ঞগণ মতামত দিয়েছেন। একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে দীর্ঘ আলোচনার একটিই উদ্দেশ্য, তাহলো মানুষের মনে পরকালের জবাবদীহী জাগ্রত করে মানুষকে সৎ মানুষে পরিণত করা।
নবী করীম (সা:) তাঁর আরেক ভাষণে বলেছেন, 'সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তা'য়ালার। আমি তাঁরই প্রশংসা করছি এবং তাঁর কাছেই সাহায্য কামনা করছি। আমরা যাবতীয় নিষিদ্ধ কর্ম এবং আমাদের নফসের প্ররোচনা 'থেকে তাঁর কাছেই আশ্রয় কামনা করছি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাকে সত্য পথ প্রদর্শন করেন তাকে কোনো শক্তি ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে না। মহান আল্লাহ এক এবং তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো আইন দাতা, বিধান দাতা, ইলাহ নেই। মহান আল্লাহ তা'য়ালার কুরআনই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ বাণী। যার অন্তরে কুরআনের প্রতি আকর্ষণ রয়েছে, কুফুরির অন্ধকারের অধিবাসী হয়েও যে ব্যক্তি কুরআনের আলোর অধিবাসী হয়েছে, মানুষের মনগড়া কথা তথা আদর্শ ত্যাগ করে যে ব্যক্তি কুরআনকে আঁকড়ে ধরেছে, সে ব্যক্তি অবশ্যই সফল হয়েছে। কারণ কুরআনের আদর্শের তুলনায় ভিন্ন কোনো আদর্শ বা কথা সুন্দর নয়'।
তিনি তাঁর ভাষণে বলেন, 'মহান আল্লাহ তা'য়ালা যা পছন্দ করেন তোমরা তা গ্রহণ করো এবং নিজের সমগ্র সত্তা দিয়ে আল্লাহ তা'য়ালাকে ভালোবাসো। আল্লাহ তা'য়ালার কুরআন তিলাওয়াত করো, তাঁকে স্বরণে রাখো, নিজের হৃদয়কে কঠিন হতে দিওনা। কারণ মহান আল্লাহ তাঁর সকল সৃষ্টি থেকে কাউকে নির্বাচিত করবেন এবং সৃষ্টির সকল কর্ম থেকেও কিছু কর্ম নির্বাচিত করবেন। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকেও কিছু বান্দাকে নির্বাচিত করেছেন। মহান আল্লাহ সর্বোত্তম কথা ভালোবাসেন'।
আল্লাহ তা'য়ালার নবী (সা:) আরো বলেন, 'মানুষকে যা কিছু দান করা হয়েছে, তার ভেতরে হালালও আছে এবং হারামও আছে। সুতরাং তোমরা মহান আল্লাহর দাসত্ব করো এবং তাঁর সাথে কারো শরীক করো না। সত্যিকার অর্থেই আল্লাহ তা'য়ালাকে ভয় করো। তোমরা যে কথা বলবে তা কাজে পরিণত করবে। এভাবে আল্লাহ তা'য়ালার কাছে সত্যবাদী হবে। মহান আল্লাহর রহমত দিয়ে একে অপরের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাথে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করলে তিনি নারাজ হন'।
বিশ্বনবী (সা:) তাঁর ভাষণে একটি কথা এভাবে বলেছেন যে, 'তোমাদেরকে যা কিছু দান করা হয়েছে তার ভেতর যেমন হালাল আছে এবং হারামও আছে, সুতরাং তোমরা আল্লাহ তা'য়ালার দাসত্ব করো এবং তাঁর সাথে কারো শরীক করো না'। এ কথার তাৎপর্য হলো, হারাম হালাল তথা যাবতীয় বিষয়ে মহান আল্লাহ তা'য়ালা যে বিধান দান করেছেন তাই অনুসরণ করবে। এ ব্যাপারে অন্য কারো বিধান অনুসরণ করবে না। যদি করো তাহলে যার বিধান অনুসরণ করবে তাকে স্রষ্টার আসনে বসানো হলো, আর এটাই শিরক করা। এই শিরক থেকে মুসলিমগণ নিজেদেরকে অবশ্যই রক্ষা করবে।
নবী করীম (সা:) এর হিজরতকালে মদীনায় তিন শ্রেণীর মানুষ ছিল। মদীনায় এক শ্রেণীর মানুষের অস্তিত্ব তখন পর্যন্ত ছিল যারা মদীনারই অধিবাসী এবং মূর্তিপূজক। অন্য স্থান থেকে ইয়াহুদীরা এসে মদীনায় বাসস্থান গড়ে তুলেছিল। আর মক্কা থেকে হিজরতকারী মুসলমানরা এবং মদীনার আনসাররা। যাদের মধ্যে চিন্তার ঐক্য ছিল না। মূর্তিপূজকদের চিন্তা চেতনা ছিল এক ধরনের, ইয়াহুদীদের চিন্তা ছিল আরেক ধরনের আর মুসলমানদের চিন্তা ছিল সে সময় সমগ্র পৃথিবীর অন্য মানুষদের চিন্তা থেকে ভিন্ন।
এই তিন গোষ্ঠীকে একত্রিত করে তাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী জাতিতে পরিণত করা এবং বিশ্বের মানচিত্রে একটি অজেয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে নবী করীম (সা:) মনোনিবেশ করলেন। মদীনায় যে সকল মূর্তিপূজক ছিল তাদের শক্তি ক্রমশঃ ক্ষয় হয়ে আসছিল। কারণ প্রতিদিনই দু'একজন করে ইসলাম গ্রহণ করছিল, ফলে তাদের সংখ্যা ক্রমশঃ হ্রাস পাচ্ছিল। ইয়াহুদীরা যদিও ইসলাম এবং মুসলমানদের শত্রু ছিল তবুও তারা প্রকাশ্যে শত্রুতা করতে সাহস পেত না।
নবী করীম (সা:) ইসলামী বিধান পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে মূর্তিপূজক এবং ইয়াহুদীদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আহ্বান করে একটি বৈঠক করলেন। কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি মদীনার ভেতরের এবং আশেপাশের সকল গোত্রপতিদের আহ্বান করেছিলেন সে বৈঠকে। তিনি তাদের কাছে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন এবং অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক ঐক্য ও সম্প্রীতির প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করলেন। দীর্ঘ আলোচনার পর সকলের সম্মতির ভিত্তিতে একটি ঘোষণাপত্র বা সনদপত্র প্রস্তুত করা হয়।
সে সনদ পত্রে প্রথমেই লেখা হলো মুহাজির, আনসার ও অন্য মুসলমানদের সম্পর্ক, তাদের অধিকার এবং দায়িত্ব কর্তব্য, বিচার ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন দিক। গুরুত্বসহকারে একটি কথা লেখা হলো, 'সকল বিষয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার থাকবে নবী করীম (সা:) এর এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর ইখতিয়ারে'।
ইয়াহূদীদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঘোষণা, সকল গোত্রের ধর্মীয় স্বাধীনতার ঘোষণা এবং তাদের সম্পদের মালিকানার প্রতি স্বীকৃতি ইত্যাদী বিষয় সম্পর্কে ঘোষণা করা হলো। সকল গোত্র বা সম্প্রদায়ের ওপর প্রযোজ্য পরিকল্পিত এই সাধারণতন্ত্রের সংবিধানে সকল গোত্রের প্রতিনিধিবর্গ নিজ নিজ নাম স্বাক্ষর করেন। আমরা সে ঘোষণাপত্র বা সনদপত্রের বিস্তারিত বিবরণ সীরাতে ইবনে হিশাম থেকে উদ্ধৃত করলাম।
📄 বিশ্বনবী (সা:) এর ঘোষণা পত্র
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
মুহাম্মাদ (সা:), কুরাইশ এবং মদীনার মুসলমানগণ, পরে যারা ইসলাম গ্রহণ করবে এবং তাদের সাথে একাকার হবে, জিহাদে যোগ দিবে তাদের পক্ষ থেকে এটি একটি সনদপত্র। সকল মানব জাতির মধ্যে তাঁরা একটি পৃথক এবং স্বতন্ত্র জাতি বা উম্মাহ। কুরাইশদের মধ্য থেকে যারা এসেছে, তাঁরা ইসলাম গ্রহণের সময় যেমন ছিল তেমনই থাকবে। তাদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার যে নীতি ছিল তা বহাল থাকবে। তাঁরা বন্দীদেরকে ন্যায়সঙ্গত উপায়ে একে অপরের কাছে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে মুক্তিপণ গ্রহণ করে মুক্তি দিতে পারবে।
বনী আউফ গোত্র ইসলাম গ্রহণ করার সময় যে অবস্থায় ছিল তাঁরা সে অবস্থাতেই বহাল থাকবে। তাদের একে অপরের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার পুরোনো নীতি বহাল থাকবে। প্রতিটি সম্প্রদায়ের মুসলমানদের মধ্যে মুক্তিপণ গ্রহণ করে বন্দীকে মুক্তি দেয়ার আইন বহাল থাকবে। বনী সায়েদা গোত্র যে অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাঁরা সে অবস্থাতেই থাকবে। তাদের প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মুসলমানদের মধ্যে মুক্তিপণ গ্রহণ করে বন্দীকে মুক্তি দেয়া যাবে।
বনী হারেস গোত্র যে অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাঁরা সেই অবস্থার ওপরেই থাকবে। তাদের পরস্পরের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার সাবেক নীতি বহাল থাকবে। তাদের প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মুসলমানদের মধ্যে মুক্তিপণ গ্রহণ করে বন্দীকে মুক্তি দেয়া যাবে। বনী জুশাম গোত্র যে অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাঁরা সেই অবস্থার ওপরেই থাকবে। তাদের প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মুসলমানদের মধ্যে মুক্তিপণ গ্রহণ করে বন্দীকে মুক্তি দেয়া যাবে। বনী নাজ্জার গোত্র ইসলাম গ্রহণ করার সময় যে অবস্থায় ছিল তাঁরা সে অবস্থাতেই বহাল থাকবে। তাদের একে অপরের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ন্যায়সঙ্গত, গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে মুক্তিপণ গ্রহণ করে মুক্তি দিতে পারবে।
বনী আমর ইবনে আউফ গোত্র যে অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাঁরা সেই অবস্থার ওপরেই থাকবে। তাদের একে অপরের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ন্যায়সঙ্গত, গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে মুক্তিপণ গ্রহণ করে মুক্তি দিতে পারবে। বনী নাবিত গোত্র ইসলাম গ্রহণ করার সময় যে অবস্থায় ছিল তাঁরা সে অবস্থাতেই বহাল থাকবে। তাদের একে অপরের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার পুরোনো নীতি বহাল থাকবে। ন্যায় সঙ্গত, গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে মুক্তিপণ গ্রহণ করে বন্দীকে মুক্তি দিতে পারবে।
বনী আওস গোত্র যে অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাঁরা সেই অবস্থার ওপরেই থাকবে। তাদের একে অপরের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ন্যায়সঙ্গত, গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে মুক্তিপণ গ্রহণ করে বন্দীকে মুক্তি দিতে পারবে। মুসলমানগণ তাদের ঋণগ্রস্ত এবং অধিক সন্তানের অধিকারী ব্যক্তিদেরকে ক্ষতিপূরণ ও মুক্তিপণ দিয়ে ন্যায়ানুগ পদ্ধতিতে অর্থ সাহায্য করবে। এক মুসলমান আরেক মুসলমানের মিত্রের বিরোধিতা করবে না। মুসলমানগণ তাদের বিদ্রোহী, অত্যাচারী, অপরাধী, সমাজ বিরোধি, সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী, সমাজের ক্ষতিকারীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ ক্ষেত্রে অপরাধী কার কে তা বিবেচনা করে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে না।
ইসলাম বিরোধিদের স্বার্থে এক মুসলমান আরেক মুসলমানকে হত্যা করবে না। কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধে ইসলামের শত্রুকে সাহায্য করা যাবে না। ইসলামী রাষ্ট্রে অনুগত অমুসলিমদের অধিকার সমানভাবে নিরাপদ। যে কোনো শ্রেণীর অমুসলিমকে মুসলমানরা পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে আশ্রয় দিবে। এক মুসলমান আরেক মুসলমানের মিত্র হয়ে থাকবে। তবে অন্যদের ক্ষেত্রে এ নীতি প্রযোজ্য নয়।
ইয়াহুদীদের মধ্যে যে ব্যক্তি মুসলমানদের আনুগত্য করবে এবং অনুসরণ করবে সে ব্যক্তি মুসলমানদের অনুরূপ অধিকার ভোগ করবে। এ ধরনের কোনো ব্যক্তির প্রতি অত্যাচার হতে দেয়া যাবে না। এ ধরনের ব্যক্তির ওপর কেউ আক্রমণ করলে আক্রমণকারীকে সাহায্য করা যাবে না। মুসলমানদের রক্ষাকবচ সকলের ক্ষেত্রে এক এবং অভিন্ন।
ইসলামের স্বার্থে যুদ্ধ সংঘটিত হলে সে যুদ্ধে মুসলমান কোনো অমুসলিমের সাথে সমতা ও ন্যায়ের ভিত্তি ব্যতীত আপোষ করবে না। মুসলমানদের মধ্য থেকে যুদ্ধের এক বাহিনী আরেক বাহিনীকে অনুসরণ করবে। মুসলমানগণ আল্লাহ তা'য়ালার আইন অনুসারে হত্যার বিনিময়ে হত্যা করতে পারবে।
আল্লাহভীরু মুসলমানগণ সর্বশ্রেষ্ঠ এবং শক্তিশালী আদর্শের ওপরে দণ্ডায়মান। মদীনার কোনো অমুসলিম মক্কার কোনো কুরাইশের প্রাণ বা সম্পদের রক্ষাকারী হতে পারবে না। কোনো মুসলমানের ক্ষতি করার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে না বা প্রশ্রয় দিবে না। কোনো মুসলমানকে ন্যায়সঙ্গত কারণ ব্যতীত হত্যা করলে এবং তা প্রমাণীত হলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। অবশ্য নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাদের কাছ থেকে ক্ষমা ভিক্ষা করলে প্রাণদণ্ড হবে না। তবে যে কোনো অবস্থায় মুসলমানগণ সবাই মুসলিম হত্যাকারীর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করবে এবং কোনো অবস্থাতেই হত্যাকারীর পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করা মুসলমানদের জন্য বৈধ হবে না।
এই সনদপত্রকে যারা গ্রহণ করেছে এবং যারা আল্লাহ তা'য়ালা ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এমন কোনো মুসলমানের পক্ষে ইসলামের মধ্যে নতুন কোনো প্রথা সংযোজনকারীকে (অর্থাৎ বিদয়াত সৃষ্টিকারীকে) কোনো প্রকার সাহায্য করা বা প্রশ্রয় বা আশ্রয় দেয়া হালাল নয়। বিদয়াত সৃষ্টিকারীকে যে ব্যক্তি কোনো ধরনের সাহায্য করবে বা আশ্রয়- প্রশ্রয় দিবে তার প্রতি আল্লাহ তা'য়ালার অভিশাপ এবং কিয়ামতের দিন তার প্রতি আল্লাহ তা'য়ালার গযব অবতীর্ণ হবে। তার পক্ষে (বিদয়াত সৃষ্টিকারীর) কোনো সুপারিশ বা পণ গ্রহণ করা হবে না।
তোমাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতানৈক্য দেখা দিলে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার জন্য তোমরা আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করবে। ('নবী করীম (সা:) এর অবর্তমানে কুরআন ও হাদীস থেকে সমাধান গ্রহণ করতে হবে')
মুসলমানরা যতদিন যুদ্ধ পরিচালনা করবে ততদিন ইয়াহুদীরা যুদ্ধের খরচ বহনে অংশগ্রহণ করবে। বনী আওফের ইয়াহুদীরা ও তাদের মিত্ররা মুসলমানদের সাথে একই উম্মাহ বলে পরিগণিত হবে। এ ক্ষেত্রে তারা যার যার ধর্ম পালন করবে। তবে যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় বা অপরাধমূলক কাজে অংশগ্রহণ করবে সে ব্যক্তি তার এবং তার পরিবার-পরিজনের ধ্বংস ডেকে আনবে।
বনী নাজ্জারভুক্ত ইয়াহুদীদের অধিকার বনী আওফের ইয়াহুদীদের অনুরূপ। এভাবে বনী শুতাইবা, বনী হারেস, বনী সালাবা, বনী সায়েদা, বনী আওস ও বনী জুশামের ইয়াহুদীদের অধিকার বনী আওফের ইয়াহুদীদের অনুরূপ। তবে যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় বা অপরাধমূলক কাজে অংশগ্রহণ করবে সে ব্যক্তি তার এবং তার পরিবার-পরিজনের ধ্বংস ডেকে আনবে। বনী সালাবার যে কোনো ধরনের প্রকাশ্য বিষয় তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের সমপর্যায়ে তাদের প্রাণের মতই সম্মানিত। আনুগত্য এবং অঙ্গিকার পালনে সকলকে যেন পাপের অনুষ্ঠান থেকে হেফাজত করে।
বনী সালাবার মিত্রদের অধিকার তাদের অধিকারের অনুরূপ। ইয়াহুদীদের অভ্যন্ত রীণ বিষয় তাদের প্রাণের মতই সম্মানিত। তবে ইয়াহুদীদের মধ্যে কেউই মুহাম্মাদ (সা:)-এর অনুমতি ব্যতীত মদীনার বাইরে গমন করতে পারবে না। প্রতিটি ব্যক্তির স্মরণে রাখা প্রয়োজন, কোনো ধরনের যুক্তিতর্ক দিয়ে আগুন থেকে নিরাপদ থাকা যাবে না। যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করলো, সে ব্যক্তি তার পরিবার-পরিজনের ধ্বংসের বিনিময়েই তা করলো। তবে নিহত ব্যক্তি যদি হত্যাযোগ্য অপরাধ করে থাকে তাহলে সেটা ভিন্ন বিষয়। মহান আল্লাহ তা'য়ালা এ ক্ষেত্রে ক্ষমা পছন্দ করেন। ইয়াহুদীদের ব্যয়ভার তারা স্বয়ং এবং মুসলমানদের ব্যয়ভার তারা স্বয়ং বহন করবে। অর্থাৎ যার যার ব্যয়ভার সেই বহন করবে।
এই ঘোষণাপত্র যারা গ্রহণ করেছে তাদের মধ্যে কেউ যুদ্ধরত থাকলে তাকে সবাই সাহায্য করবে, একে অপরের কল্যাণ কামনা করবে, একে অপরকে পরামর্শ দিবে, একে অপরের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে। কোনো অন্যায় বা পাপ কাজে কেউ কাউকে সাহায্য করবে না। নিজের মিত্রশক্তির ক্ষতিসাধন করা ভয়ংকর এবং ক্ষমাহীন অপরাধ, অত্যাচারিতকে সাহায্য করা সবার দায়িত্ব।
মুসলমানরা যতদিন যুদ্ধ পরিচালনা করবে ততদিন ইয়াহুদীরা যুদ্ধের খরচ বহনে অংশগ্রহণ করবে। (এখানে প্রকাশ থাকে যে, এই সনদপত্র প্রস্তুত করার সময় কোনো অমুসলিমের প্রতি জিজিয়া আরোপ করা হয়নি এমনকি ইয়াহুদীরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে তাদেরকে গণিমতের সম্পদে অংশ দেয়া হতো। এ কারণে এই সনদপত্রে ইয়াহুদীদের যুদ্ধের খরচে অংশগ্রহণ করা বাধ্যতামূলক ছিল) এই সনদ পত্রে যারা অংশগ্রহণ করেছে তাঁরা মদীনার অভ্যন্তরে সম্পূর্ণ নিরাপদ।
প্রতিবেশী যদি অপরাধী বলে প্রমাণীত না হয় এবং তার দ্বারা কোনো ক্ষতি না হয় তাহলে তার সকল কিছুই নিজের সকল কিছুর মতই নিরাপত্তার অধিকারী। কারো বাড়ির আঙ্গিনায় বাড়ির মালিকের অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করা যাবে না। এই সনদপত্রে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কোনোরূপ মতানৈক্য দেখা দিলে তা সমাধানের জন্য আল্লাহ তা'য়ালা এবং তাঁর রাসূলের কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা পরিপূর্ণ সততা ও সর্বাধিক সতর্কতার সাথে এই সনদপত্রের বাস্ত বায়ন দেখবেন।
আবারো স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে, মক্কার কুরাইশ ও তাদের সাহায্যকারীকে কোনোরূপ সহযোগিতা করা যাবে না। মদীনা আক্রান্ত হলে সকলেই ঐক্যবদ্ধভাবে মুকাবেলা করবে। সন্ধি ও মৈত্রী স্থাপনের জন্য আহ্বান জানানো হলে সকলেই তা পালন করবে এবং এ ব্যাপারে মুসলমানগণও বাধ্য। তবে যে বা যারা ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে, তার বা তাদের সাথে কোনো সন্ধি বা মৈত্রী স্থাপন করা যাবে না। সাধারণ কেউ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে সে তার প্রাপ্য অংশ তার কাছে থেকেই গ্রহণ করবে, যে তাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়েছে।
আওস গোত্রের ইয়াহুদীদের, তাদের মিত্রদের অধিকার এবং দায়-দায়িত্ব এই সনদপত্র গ্রহণকারীদের অধিকার ও দায়দায়িত্বেরই অনুরূপ। তারা এই সনদপত্র প্রস্তুতকারীদের কাছ থেকে পূর্ণ ন্যায়-সঙ্গতভাবে লাভ করতে পারবে। কেউ যখন সত্যে ফিরে আসবে তখন তার পূর্বের অপরাধ ক্ষমা করা হবে। কেউ অন্যায় করলে তা তার নিজেরই সর্বনাশ ডেকে আনবে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা পরিপূর্ণ সততা ও সর্বাধিক সতর্কতার সাথে এই সনদপত্রের বাস্তবায়ন দেখবেন।
এই সনদপত্র কোনো অপরাধীর রক্ষাকবচ নয়। কোনো ধরনের অপরাধ বা অত্যাচারের সাথে জড়িত না থাকলে যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরে আসা বা যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করা লোকও মদীনার সীমানার ভেতরে নিরাপত্তা লাভ করবে। যে ব্যক্তি ন্যায়ের পথে অবস্থান করবে এবং আল্লাহ তা'য়ালাকে ভয় করবে, ইসলামের পথে অটল থাকবে, স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা এবং তাঁর রাসূল সেই ব্যক্তির আশ্রয়দাতা হবেন এবং তাঁর সহায়তা করবেন। (সীরাতে ইবনে হিশাম)
তদানীন্তন পরিবেশ পরিস্থিতির অনুকূলে এই সনদপত্র প্রণয়ন করা হলেও বর্তমান পৃথিবীতে এর উপযোগীতা সমভাবে বিদ্যমান। রাষ্ট্র বিজ্ঞানীগণ এই সনদপত্র ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে নানা ধরণের ধারা-উপধারায় বিভক্ত করেছেন। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কত সুন্দর নীতিই না গ্রহণ করা হয়েছিল মদীনার ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র যতক্ষণ ক্ষতিকর বলে প্রমাণ না হবে, ততক্ষণ সে রাষ্ট্রের সকল কিছুই নিরাপত্তা লাভ করবে, যে ধরনের নিরাপত্তা ইসলামী রাষ্ট্র তার নিজের ব্যাপারে গ্রহণ করে থাকে。
কারো বাড়িতে বাড়ির মালিকের অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করা যাবে না। এ কথা দিয়ে যেমন ব্যক্তির বাড়ীকে বুঝানো হয়েছে তেমনি বুঝানো হয়েছে, কোনো রাষ্ট্রে আগ্রাসন চালানো যাবে না। কোনো অপরাধীকে সাহায্য সহযোগিতা করা যাবে না। যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে। তবে রাষ্ট্র এবং সমাজ এ সকল দিক পরিচালিত হবে মহান আল্লাহ তা'য়ালা দেয়া বিধান অনুযায়ী। ইসলামের শত্রুরা মদীনার সনদ দেখেও দেখে না। ইসলামের প্রতি অভিযোগ আরোপ করে, 'ইসলাম অন্য ধর্মকে সহ্য করতে পারে না'। ইসলামের প্রতি অন্ধ বিদ্বেষে যাদের অন্তর মেঘাচ্ছন্ন, তারা ব্যতীত এমন জ্ঞানপাপী সুলভ কথা আর কেউই বলতে পারে না।
📄 নবী করীম (সা:) এর সীরাত ও বিশ্বাসঘাতক জনগোষ্ঠী
মদীনায় ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের বনী কুরাইজা, বনী কাইনুকা ও বনী নজীর, এ গোত্রের বসবাস ছিলো এবং মদীনার শাসন দণ্ড ছিলো তাদেরই আয়ত্বে। মদীনার আনসাররা এক সময় নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে তাদের শক্তি এমনভাবে ক্ষয় করেছিল যে, ইয়াহুদীদের কাছে তারা বাধ্য হয়ে মাথানত করে থাকতো। মদীনার ইয়াহুদীরা ছিল ধনিক শ্রেণী। কৃষিকাজের জমি ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। ব্যবসাও ছিল তাদেরই অধীনে। নানা ধরনের শিল্পে তারা ছিল অগ্রগামী। বীরত্ব এবং যুদ্ধ বিদ্যাতেও তারা ছিল আনসারদের তুলনায় দক্ষ। এ কারণে তাদের কাছে সামরিক কাজে ব্যবহার করার মতো অস্ত্র বিপুল পরিমাণে মওজুদ থাকতো। স্বর্ণ শিল্প ছিলো ইয়াহুদী সম্প্রদায় বনী কাইনুকার নিয়ন্ত্রণে। স্বর্ণের অলংকার নির্মাণে মদীনায় তাদের সমকক্ষ কেউ ছিল না।
মদীনার সকল বিষয়ে নেতৃত্বের আসন ইয়াহুদীরাই নিয়ন্ত্রণ করতো। ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের ইতিহাস এ কথাই সাক্ষ্য দেয় যে, তারা চিরদিনই কুচক্রি এবং চরিত্রহারা নিষ্ঠুর প্রকৃতির। নগদ অর্থ মানুষকে ঋণ দিয়ে চারদিকে তারা মাকড়সার জালের মতই ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে রাখতো। কৌশলে তারা বিত্তের অধিকারী হয়ে সমাজের গরীব শ্রেণীকে পদানত করে রেখেছিল। নগদ অর্থের বিনিময়ে চড়া সুদে তারা মানুষের সহায় সম্পদের সাথে সাথে সন্তান-সন্ততি এমন কি তৎকালীন সমাজের নারীকেও বন্ধক রাখতো। ঋণ গ্রহীতাগণ ঋণ আদায়ে অক্ষম হলে বা নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হলে ঋণ গ্রহীতার অবোধ শিশুকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করতো।
ইয়াহূদী সম্প্রদায়ের নৈতিক চরিত্র বলতে কিছুই ছিল না। তারা তাদের ধনিক শ্রেণীর জন্য এক ধরনের আইন প্রয়োগ করতো এবং বিত্তহীনদের জন্য আরেক ধরনের আইন প্রয়োগ করতো। বিশেষ করে তাদের নেতাদের কোনো অপরাধের বিচার তারা করতো না। নবী করীম (সা:) এক ইয়াহুদীকে প্রশ্ন করেছিলেন, 'তোমাদের আইনে ব্যভিচারের শাস্তি কি শুধু দোররা দিয়ে আঘাত করা?'
ইয়াহূদী জবাব দিয়েছিল, 'না, আমাদের আইনে ব্যভিচারের শাস্তি পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা। কিন্তু আমাদের নেতৃবৃন্দের ক্ষেত্রে এ শাস্তি প্রযোজ্য নয়। সাধারণ মানুষের জন্য আমরা এই শাস্তি দিয়ে থাকি। নেতৃবৃন্দের কারো ব্যভিচার ধরা পড়লে তিনি অপরাধী হিসেবে গণ্য হন না'।
মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার পরে ইয়াহুদী সম্প্রদায় নানা ধরনের অসুবিধার সম্মুখিন হয়েছিল। তাদের পাপাচারের পথ রুদ্ধ হওয়া পড়েছিলো। বিকৃত ধর্মীয় প্রভাব ও নেতৃত্বের আসন ম্লান হয়ে গিয়েছিলো। মদীনার আনসারদের ঋণের জালে বন্দী করে সর্বগ্রাসী শোষণের পথও বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। মক্কার মুসলমানদের পরামর্শে আনসাররা পরিকল্পিত উপায়ে ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে নিজেদেরকে ইয়াহুদীদের কাছ থেকে ঋণ মুক্ত করেছিল। ইসলাম মদীনায় প্রতিষ্ঠিত হবার পরপরই ইয়াহুদীরা উপলব্ধি করেছিলো, তাদের নির্যাতনমূলক অর্থ লিপ্সার ব্যবসা চলবে না।
মদীনা সনদে তাদের যাবতীয় মানবিক ও ধর্মীয় অধিকার সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু তারা ধর্মের নামে যে অনাচার করতো, নবী করীম (সা:) এ সম্পর্কে সঠিক পথ অবলম্বনের নির্দেশনা দিতেন। তাদের দাবী ছিলো তারা হযরত মূসা (আ:) কর্তৃক প্রবর্তিত আইন-কানুন অনুসরণ করে। প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদের মনগড়া বিধান অনুসরণ করতো। বিষয়টি ওহী মারফত অবগত হয়ে রাসূল (সা:) তাদেরকে সংশোধন হওয়ার আহ্বান জানাতেন, এ কারণে তারা নবী করীম (সা:) ও ইসলামের কঠিন শত্রু হয়ে দাঁড়ালো। তাদের রক্তে ছিল মহাসত্যের বাহকদেরকে হত্যা করা এবং নিষ্ঠুরতা ও পাপাচারের প্রবণতা বিদ্যমান। বিশ্বাসঘাতকতা ছিল তাদের মজ্জাগত ব্যাপার। বিশ্বনবীর সাথে তারা মদীনা সনদে স্বাক্ষর করলেও গোপনে তারা মক্কার ইসলাম বিরোধী কুরাইশদের সাথে মিলিত হয়ে মদীনা থেকে ইসলাম উৎখাতের ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে ছিলো।
প্রকাশ্যে নবী করীম (সা:) সম্পর্কে কটুক্তি না করলেও রাসূল (সা:) এর শিখানো পদ্ধতিতে সালাম না দিয়ে বলতো, 'আসসামু আলায়কুম'। অর্থাৎ তোমার ওপরে মৃত্যু পতিত হোক।
হযরত আয়িশা (রা:) এর উপস্থিতিতে একবার এক ইয়াহুদী নবী করীম (সা:) কে ঐ কথা বললে তিনি ইয়াহূদীকে বললেন, 'অসভ্যের দল! তোদের ধবংস হোক'।
নবী করীম (সা:) এ কথা শুনে তাঁকে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিয়ে বললেন, 'আয়িশা, মধ্যম পথ গ্রহণ করো'।
হযরত আয়িশা (রা:) বললেন, 'ওরা কি বলে আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন?'
তিনি বললেন, 'আমি শুনেছি। তারা যখন ঐ কথা বলে আমিও তাদের কথার উত্তরে বলি, আলায়কুম। অর্থাৎ তোমাদের ওপরেও'।
ইয়াহুদীরা পূর্ববর্তী নবীর অনুসারী হবার দাবীদার ছিল, এ কারণে নবী করীম (সা:) পৌত্তলিকদের তুলনায় ইয়াহুদীদেরকে সম্মান করতেন। তাদের কোনো লাশ দেখলে তিনি দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতেন। তাদের অনাচার নবী করীম (সা:) নীরবে সহ্য করছিলেন। কারণ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তখন পর্যন্ত আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে নির্দেশ অবতীর্ণ হয়নি। নবীর এই নীরবতাকে তারা দুর্বলতা ভেবে চরম পথ অবলম্বন করেছিল।
বনী কাইনুকা গোত্রের ইয়াহুদীদের মধ্যে কা'ব ইবেন আশরাফ নামক লোকটি ছিল উঁচুস্তরের একজন কবি এবং বিত্তবান। মদীনার আনসারদের সে সুদের ব্যবসায় জড়িত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল। এই ব্যক্তি বদর যুদ্ধে কুরাইশদের পরাজয়ের ওপরে নানা ধরণের কবিতা রচনা করে মক্কায় পাঠিয়ে তাদের উত্তেজিত করতো। ইয়াহুদীদের একটি প্রতিনিধি দল গোপনে মক্কায় গিয়ে কুরাইশদের সাথে বৈঠক করে সার্বিক সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছিল। তাদের অঙ্গীকারের কারণে মক্কার কুরাইশরা নব উদ্যেমে ইসলামের বিরোধিতায় ঝাঁপিয়ে পড়লো। ইয়াহুদী কা'ব ইবনে আশরাফ নবী করীম (সা:) কে কৌশলে হত্যা করার জন্য তার বাড়িতে দাওয়াত দিয়েছিল।
মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবীকে তাদের ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে তাদের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করতে বললেন এবং নবী করীম (সা:) দাওয়াতে গেলেন না। কা'ব ইবনে আশরাফ ক্ষুব্ধ হয়ে নবী করীম (সা:) এর নামে বিদ্রুপাত্মক কবিতা রচনা করে মদীনার লোকদের মধ্যে প্রচার করতে থাকলো। এতে মুসলিম সম্প্রদায় ক্ষোভে উত্তেজিত হলেও রাসূল (সা:) তাদেরকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিলেন।
ইয়াহুদীরা ধারণা করেছিলো মদীনায় ইসলামের মূল শক্তি আউস ও খাজরাজ গোত্র। অতএব এই দুই গোত্রকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারলে ইসলাম বিকশিত হতে পারবে না। সে লক্ষ্যে মদীনার আনসারদের মধ্যে তারা তাদের চিরাচরিত ঘৃণ্য প্রথানুযায়ী বিভেদের বীজ তারা বপনের সূচনা করলো। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আউস গোত্র খাজরাজ গোত্রের কার কি ক্ষতি করেছিল এবং খাজরাজ গোত্র আউস গোত্রের কি ক্ষতি করেছিল, এসব পুরনো প্রসঙ্গ এই দুই গোত্রের মধ্যে ইয়াহুদীরা জাগিয়ে দিল। অবস্থা এমন এক পর্যায়ে উপনীত হলো যে, দুই গোত্রের আনসারদের মধ্যে দাঙ্গায় দুইজন আহত হলো এবং উভয় গোত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করলো।
নবী করীম (সা:) যথা সময় সংবাদ পেয়ে উভয় গোত্রে উপস্থিত হয়ে এই দাঙ্গার পরিণতি আদালতে আখিরাতে কি হবে, তা বর্ণনা করে উভয় দলকে শান্ত করে তাদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করলেন। ইয়াহুদীরা ঘৃণ্য মানসিকতা নিয়ে সাময়িক ইসলাম গ্রহণ করতো। দিন কয়েক পরেই তারা ইসলাম ত্যাগ করে মানুষের মধ্যে প্রচার করতো, 'ভালো মনে করেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু ভালোভাবে অনুসন্ধান করে দেখলাম ইসলামে খারাপ ছাড়া ভালো কিছুর অস্তিত্ব নেই। এ কারণে আবার ইসলাম ত্যাগ করে বাপ-দাদার আদর্শেই ফিরে এলাম'।
এভাবে ইয়াহুদীরা নবী করীম (সা:) ও ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসা ছড়াতে থাকলো। মদীনায় রাসূল (সা:) এর সাথে শান্তি চুক্তি করার পরেও তারা পদে পদে সেই চুক্তির ধারা লংঘন করতে থাকে। তাদের এসব জঘন্য আচরণের কথা মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের বহুস্থানে উল্লেখ করেছেন। মুসলমানদের ধৈর্যের সুযোগে তারা চরম হঠকারিতার পরিচয় দেয়া শুরু করেছিল। ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় তারা এমন এক ঘটনার জন্ম দিল যে, মুসলমানদের পক্ষে আর নীরবে দর্শকের ভূমিকা পালন করা সম্ভব হলো না।
নিরপেক্ষ সকল ঐতিহাসিকই সে জঘন্য ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেছেন। মুসলিম পরিবারের এক সম্ভ্রান্ত নারী তাঁর প্রয়োজনে একান্ত বাধ্য হয়েই ইয়াহূদী অধ্যুষিত বনী কাইনুকার বাজারে গিয়েছিলেন। মুসলিম নারীকে দেখে ইয়াহুদীরা তাঁকে নানাভাবে উত্যক্ত করতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা মুসলিম নারীকে পোষাক পরিত্যাগ করার আদেশ করে। মহিলা নিজের ইজ্জত রক্ষার জন্য এক ইয়াহূদী স্বর্ণকারের দোকানে আশ্রয় নিয়েছিল। একজন ইয়াহুদী ঐ মুসলিম মহিলার পরণের কাপড় তাঁর অলক্ষে এমনভাবে একটা কিছুর সাথে বেঁধে দেয় যে, মহিলা উঠতে গেলেই যেন তাঁর কাপড়ে টান লেগে মহিলা পর্দ্দাহীন হয়ে পড়ে।
মহিলা যখন উঠতে গেল ইয়াহুদীদের পরিকল্পনা অনুসারে যা হবার তাই হলো। একজন মুসলিম নারীকে পরিকল্পিত উপায়ে ইয়াহুদীরা বে-ইজ্জতি করলো এবং মহিলার আর্তচিৎকার শুনে ইয়াহুদী হায়েনার দল অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিল। মহিলা তখন বাধ্য হয়ে চিৎকার করে বলেছিল, 'কে আছো মুসলিম বীর সৈনিক! তোমাদের বোনের সম্মান রক্ষা করো!'
তাঁর আর্তনাদ শুনে একজন মুসলিম নওজোয়ান ছুটে এসে অপরাধী এক ইয়াহূদীকে হত্যা করলো। ইয়াহূদীরাও সংঘবদ্ধ হয়ে আক্রমন করে মুসলিম বীরকে হত্যা করলো। এ সংবাদ নবী করীম (সা:) শোনার পরে তিনি ঘটনা স্থলে গিয়ে ইয়াহুদীদের লক্ষ্য করে বলেছিলেন, 'ওহে ইয়াহূদী সমাজ! তোমরা যে অপরাধ করেছো তার প্রতিকার করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব নয়। কিন্তু তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ, তোমরা মহান আল্লাহ তা'য়ালাকে ভয় করো। তোমরা চুক্তি অনুসরণ করো। আর তা যদি না করো তাহলে তোমাদের ওপরেও বদরের মতই আযাব অবতীর্ণ হবে'।
যা ঘটেছিলো তা ছিল ইয়াহুদীদের পরিকল্পিত। তারা মক্কার কুরাইশদের সাথে পূর্বেই গোপন চুক্তি করে এসেছিল, কোনো উপলক্ষ্যে তারা মুহাম্মাদ (সা:) এর সাথে যুদ্ধ শুরু করবে। আর এই সুযোগে মক্কার কুরাইশরা মদীনা আক্রমন করে মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করে দিবে। সুতরাং রাসুলের কথায় তারা নমনীয়তা প্রদর্শন না করে নবী করীম (সা:) এর সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে ঘোষণা করলো, 'হে মুহাম্মাদ (সা:)! বদরের প্রান্তরে গোটা কতক কুরাইশদের হত্যা করে বেশি অহংকার দেখিয়ো না। আমাদের সাথে যুদ্ধ বাধিয়ে দেখো, যুদ্ধ কাকে বলে আমরা তা দেখিয়ে দিবো'। (সীরাতে ইবনে হিশাম, আত্ তাবারী, তাবাকাতে ইবনে সায়াদ)
ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র এবার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল। নবী করীম (সা:) বাধ্য হয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। বনী কাইনুকা গোত্র রাসূল (সা:) এর যুদ্ধ প্রস্তুতির সংবাদ পেয়ে তারা দ্রুত তাদের নির্মিত দূর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। এ সকল দূর্গ ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত। ফলে তারা নিরাপদেই দূর্গের মধ্যে আশ্রয় নিয়ে প্রাণ রক্ষা করলো এবং তাদের আশা ছিল এ সময়ের মধ্যে মক্কা থেকে কুরাইশরা মদীনা আক্রমন করবে। তখন তারা দূর্গ থেকে বের হয়ে মক্কার কুরাইশদের সাথে একত্রিত হয়ে মুসলিম নিধনযজ্ঞ অনুষ্ঠিত করবে।
কিন্তু তাদের সে আশা পূরণ হলো না। মক্কার কুরাইশরা মদীনা আক্রমনের কল্পনাও করতে পারলো না। কারণ তখন পর্যন্ত তারা বদরের ক্ষয়-ক্ষতিই সামলিয়ে উঠতে পারেনি। নবী করীম (সা:) মুসলিম বাহিনী নিয়ে বনী কুরাইজার দূর্গ অবরোধ করলেন। এভাবে পনের দিন পর্যন্ত অবরোধ করে রাখলেন। ইয়াহুদীদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে এলে তারা তাদের মুক্তির জন্য মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে তাদের হয়ে সুপারিশ করার জন্য নবীর কাছে প্রেরণ করেছিল।
মদীনার মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এসে নবী করীম (সা:) এর কাছে ইয়াহুদীদের পক্ষ থেকে সুপারিশ করতে থাকলো। রাসূল (সা:) প্রথমে তার কথায় কর্ণপাত করেননি। পরে এই মুনাফিক নেতা তাঁকে এমনভাবে ধরলেন যে, সীরাতে ইবনে হিশামে উল্লেখ করা হয়েছে, রাসূরে কাছে অনুনয় করতে করতে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই একরকম জাপটে ধরে বলেছিল, 'আপনি তাদের ব্যাপারে সুষ্ঠু সিদ্ধান্ত না করলে আপনাকে আমি ছাড়বো না'।
হাদীস শরীফে এসেছে, এ সময় নবী করীম (সা:) এতটা রাগান্বিত হয়েছিলেন যে, তাঁর পবিত্র চেহারা ভিন্ন আকার ধারণ করেছিল। অবশেষে রাসূল (সা:) অনুনয় রক্ষা করে কতকগুলো শর্তের অধীনে অবরোধ উঠিয়ে নিলেন। ইয়াহুদীরা নবী করীম (সা:) এর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো। হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রা:) এর সাথে ইয়াহূদীদের নিরাপত্তার ব্যাপারে চুক্তি ছিল। ইয়াহুদীরা যখন রাসূল (সা:) এর সাথে চুক্তি ভঙ্গ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিল, তখন হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রা:) এসে রাসূল (সা:) এর সামনে ঘোষণা দিয়েছিলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমার মিত্র এবং বন্ধু হলেন একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালা এবং তাঁর রাসূল ও মুসলমানগণ। আমি ইসলামের শত্রুদের মৈত্রী চুক্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তাদের সাথে আমার এখন থেকে আর কোনো ধরনের চুক্তি বলবৎ থাকলো না'।
রাসূল (সা:) এর এই সাহাবীর প্রশংসামূলক কাজের জন্য মহান আল্লাহ তা'য়ালা সূরা মায়িদার আয়াত অবতীর্ণ করেছিলেন। নবী করীম (সা:) বনী কাইনুকার সকল ইয়াহুদীদের গ্রেফতার করার আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সুপারিশের কারণে নবী (সা:) তাদেরকে গ্রেফতার না করে মদীনা থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। মদীনার আশেপাশেও তারা থাকতে পারবে না এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল।
ইয়াহূদী সম্প্রদায় সিরিয়ার দিকে চলে গিয়েছিল। এই ঘটনা ছিল হিজরী দ্বিতীয় সনের শাওয়াল মাসের। তাদের ধন-সম্পদ নবী করীম (সা:) বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ সময় তিনি গণীমতের সম্পদ থেকে পঞ্চমাংশ গ্রহণ এবং তিনটি তীর, দুটো বর্ম, তিনটি তরবারী ও তিনটি ধনুক গ্রহণ করেছিলেন। (যাদুল মায়াদ, পৃষ্ঠা নং-১৩৭, ১৩৮)
সে সময় ইয়াহুদীরা যে অপরাধ সংঘটিত করেছিল পৃথিবীর অন্য কোনো রাষ্ট্র প্রধান হলে তাদের একটি প্রাণীকেও জীবিত ছেড়ে দিত না। কিন্তু নবী করীম (সা:) তাদের একজনের গায়েও হাত উঠাতে দেননি। এমনকি তাদেরকে নিরাপত্তা দিয়ে মদীনা থেকে বের হয়ে যাবার সুব্যবস্থা করে দেন। মদীনা থেকে তাদের বিদায়ের জন্যে তিন দিন সময় নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। তাদের নিরাপত্তার জন্য তিনি তাদের সাথে হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রা:) কে দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
ইসলামের যে যুদ্ধনীতি রয়েছে, নবী করীম (সা:) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের কিছু ঘটনা সম্পর্কে ইউরোপিয় কতিপয় লেখক মন্তব্য করেছে, মুহাম্মাদ (সা:) মদীনার ইয়াহুদীদের সাথে প্রতারণা করেছেন। খ্রিষ্টান লেখকগণ ইয়াহূদী প্রেমে অন্ধ হয়ে বিশ্বনবীকে প্রতারক বলতেও দ্বিধা করেনি। ইয়াহুদীরা খ্রিষ্টানদের সাথে এবং খ্রিষ্টানরা ইয়াহুদীদের সাথে কি জঘন্য আচরণ করেছে, ইতিহাসের পাতায় সেসব ঘটনা লিপিবদ্ধ রয়েছে। তারা প্রকৃত সত্য উল্লেখ না করে মদীনার ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছে এভাবে যে, নবী করীম (সা:) হিজরত করে তাঁর প্রয়োজনে ইয়াহুদীদের সাথে চুক্তি করেছিলেন। তারপর তিনি যখন একটু শক্তিশালী হলেন, তখনই তিনি ইয়াহুদীদের সাথে চুক্তি ভঙ্গ করে তাদেরকে মদীনা থেকে নির্বাসিত করলেন।
ইয়াহুদীরা যে কি ধরনের মন-মাসিকতা সম্পন্ন এবং কতটা কুটিল জাতি, বিশ্বের কোথাও যে তাদের স্থান হয়নি এবং কেনো হয়নি তা ইতিহাসের পাঠক মাত্রই অবগত রয়েছেন, এ সম্পর্কে আমি আমার লেখা সূরা ফাতিহার তাফসীরে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। ইউরোপিয় কতিপয় লেখক ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পেশ না করেই পাঠককে বিভ্রান্ত করার জন্য বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করে থাকে। প্রকৃত ঘটনার দিকে দৃষ্টিপাত করলে, দেখা যাবে নবী করীম (সা:) যে ব্যবস্থা ইয়াহুদীদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করেছিলেন, তা ছিল সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত এবং আইনের দৃষ্টিতে বৈধ।
তিনি মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় আগমন করে যে চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন, সে চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ আমরা উল্লেখ করেছি। সে চুক্তির মূল কথা ছিল, উভয় পক্ষের কেউ কারো বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক বা শত্রুতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না। একে অপরের শত্রুদেরকেও কেউ সাহায্য করবে না। এ সম্পর্কে হাফেজ ইবনে হাজার (রাহ:) লিখেছেন, 'তিনি তাদের সাথে এই শর্তে মৈত্রী স্থাপন করেছিলেন যে, তারা তাঁর সাথে যুদ্ধও করবে না এবং তাঁর বিরুদ্ধে তাঁর শত্রুদেরকেও সাহায্য সহযোগীতা করবে না'। (ফতহুল বারী, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-১৩১)
মুসলমানদের সাথে ইয়াহুদীরা এই চুক্তি করার পরে স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানরা তাদের সাথে বন্ধুর অনুরূপ আচরণ করতে থাকে। কিন্তু ইয়াহুদীরা বিশ্বাসঘাতকতা করে চুক্তি বিরোধী কার্যকলাপ করতে থাকে। তারা গোপনে মক্কার কুরাইশদের কাছে মুসলমানদের গোপন তথ্য পাচার করতে থাকে। মুসা ইবনে উকবা তাঁর মাগাজীতে উল্লেখ করেছেন, 'বনী নজীর গোত্র মক্কার কুরাইশদের সাথে যোগাযোগ করে তাদেরকে নবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উস্কানী দিতো এবং ইসলামী রাষ্ট্রের গোপন তথ্য পাচার করতো'। (ফতহুল বারী, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-২৩৩)
ইয়াহুদীরা এখানেই তাদের অপতৎপরতা বন্ধ করেনি। বিশ্বনবী (সা:) কে তারা কয়েকবার হত্যার চেষ্টা করে। তারা ঈমান আনবে, এ সংবাদ দিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা:) কে তাদের আওতায় নিয়ে হত্যা করার লক্ষ্যে কয়েকবার প্রস্তুত হয়েছিল। ছাদ থেকে পাথর নিক্ষেপ করে নবীকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। (আত্ তাবারী, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৩৭, আবু দাউদ, ফতহুল বারী, সপ্তম খন্ড, পৃষ্ঠা নং-২৩৩, ফতহুল বুলদান, পৃষ্ঠা নং-২৪)
এখানেই ঘটনা শেষ নয়, তাদের উদ্ধত্য এতটা বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, প্রকাশ্যে তারা মুসলমানদেরকে হুমকি প্রদর্শন করতো। নবী করীম (সা:) এর ধৈর্যকে তারা দুর্বলতা ভেবেছিল। বাইরের কোনো শত্রু মদীনা আক্রমন করলে ইয়াহুদী আর মুনাফিকরা মুসলমানদেরকে অস্তিত্বহীন করে দিবে, এ আশঙ্কা তীব্র হয়ে দেখা দিল। গোপনে আল্লাহর রাসূল (সা:) কে হত্যা করতে পারে এ আশঙ্কাও মুসলমানদের মধ্যে বিরাজ করছিল। মদীনার মুসলমানদের ইয়াহুদীদের সম্পর্কে আশঙ্কা এতটা তীব্র হয়েছিল যে, একজন সাহাবী মৃত্যুর সময় বলে গেলেন, আমার ইন্তেকালের সংবাদ আল্লাহর রাসূল (সা:) কে রাতে দিও না। কারণ তিনি রাতে আমার জানাযায় অংশগ্রহণ করার জন্যে আসবেন আর সেই সুযোগে ইয়াহুদীরা তাঁকে হত্যা করতে পারে। (উসুদুল গাবা, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৫৭)
এই ইয়াহুদীদের উৎপাতের পরেও ইয়াহূদী প্রেমিকরা কি বলতে চান নবী করীম (সা:) এর জন্য নীরবতা পালন করা বাধ্যতামূলক ছিল? কিন্তু এরপরেও রাসূল (সা:) তাদের ওপরে হঠাৎ আক্রমন না করে দূত মারফত তাদেরকে জানিয়ে দিলেন, 'আমার সাথে তোমরা চুক্তি ভঙ্গ করে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছো। সুতরাং তোমরা দশদিনের মধ্যে মদীনা ত্যাগ করবে, যদি না করো তাহলে আমি তোমাদের সাথে' যুদ্ধ করতে বাধ্য হবো'।
নবী করীম (সা:) এর পক্ষ থেকে তারা এই সংবাদ পেয়ে মদীনার মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের সাথে যোগাযোগ করলো। মুনাফিক নেতা তাদেরকে অভয় দিয়ে বললো, তোমরা কিছুতেই মদীনা ত্যাগ করবে না। তোমাদের যা সাহায্য সহযোগীতা প্রয়োজন আমরা করবো। ইয়াহুদীরা এটা তলিয়ে দেখলো না যে, মুনাফিকরা সত্যই তাদেরকে সাহায্য করতে পারবে কিনা। তারা কঠিন ভাষায় নবী করীম (সা:) কে জানিয়ে দিল, 'আমরা মদীনা ত্যাগ করবো না, তোমাদের যা ইচ্ছা তাই করতে পারো'। (আত্ তাবারী, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৩৮, ফতহুল বারী, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-২৩৩, ফতহুল বুলদান, পৃষ্ঠা নং-২৪)
নবী করীম (সা:) তাদেরকে শেষ সুযোগ দিয়েছিলেন এবং তাদের অসহ্য উস্কানী ও চুক্তি ভঙ্গের পরেও উদারতার শেষ সীমা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। একান্ত বাধ্য হয়ে তিনি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে তাদেরকে অবরোধ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে যুদ্ধ করতে হয়নি। অবরোধের কারণেই ইয়াহুদীরা বলতে বাধ্য হয়েছিল, 'আপনি আমাদেরকে প্রাণে মারবেন না। আমরা মদীনা থেকে বের হয়ে সিরিয়ার দিকে চলে যাবো এবং আমাদের উটের পিটে যা নিতে পারি তাই নিয়ে যাবো। আর যা কিছু থাকে আমরা এখানে রেখে যাবো'।
এ সম্পর্কে ঐতিহাসিক বালাজুরী ও হাফেজ ইবনে হাজার লিখেছেন, 'ইয়াহুদীরা আবেদন করেছিল, আমাদের উট যতটা মালপত্র বহন করতে পারে আমরা ততটা নিয়ে যাবে, নবী করীম (সা:) তাদের এই আবেদন মঞ্জুর করলেন এবং তাদের সাথে সন্ধি করলেন। এখানে ইয়াহুদীদের সামান্য পরিমাণ ক্ষতি করা হয়নি। (আত্ তাবারী, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৩৮, ফতহুল বুলদান- পৃষ্ঠা নং-২৪, ফতহুল বারী- সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-২৩২)
বিশ্বনবী (সা:) অস্থাবর সম্পদসহ তাদেরকে মদীনা ত্যাগের সুযোগ দিলেন। সুযোগ থাকার পরও তিনি শত্রুদের একান্ত অনুগ্রহে মদীনা ত্যাগের অনুমতি দিলেন কিন্তু তাঁর উদারতা এবং মহত্ত্বের প্রতিদান ইয়াহুদীরা যেভাবে দিয়েছিল, সে অভিজ্ঞতা মুসলমানদের জন্য খুবই তিক্ত। ইয়াহুদীরা যে সময় মদীনা ছেড়ে যাচ্ছিল, তাদের যাওয়ার অবস্থাও ছিল মুসলমানদের প্রতি উপহাসমূলক। তাদের কয়েকজন নেতা খয়বরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো। সেখানেও তারা ষড়যন্ত্র করে নেতৃত্বের পদ দখল করেছিল। মদীনা ত্যাগের সময় তারা বিভিন্ন ধরনের বাদ্য বাজিয়ে, গায়িকাদের মাধ্যমে গান পরিবেশন ও নর্তন-কুর্দন করতে করতে মদীনা ত্যাগ করেছিল। ঐতিহাসিকগণ বলেন, 'ইয়াহুদীরা সম্পদসহ যে বিশাল জনবলসহ মদীনা ত্যাগ করেছিল, স্থানীয় অধিবাসীরা ইতোপূর্বে এ অবস্থা কখনো দেখেনি'। মদীনার আনসারদের মধ্যে যারা ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণ করেছিল ইয়াহুদীরা তাদেরকেও নিয়ে যেতে চাইলে আনসাররা বাধা দিয়েছিল। এ সময় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ অবতীর্ণ করা হলো-
لا إِكْرَاهَ فِي الدِّيْنِ قف قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ جِ فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوْتِ وَيُؤْمِنُم بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى ق لاَ انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوْرِ طَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا. أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوْتُ يُخْرِجُونَهُمْ مِّنَ النُّوْرِ إِلَى الظُّلُمَاتِ طِ أُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
(আল্লাহর) দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জোর জবরদস্তি নেই, (কারণ) সত্য (এখানে) মিথ্যা থেকে পরিষ্কার হয়ে গেছে, তোমাদের মধ্যে যদি কোনো ব্যক্তি বাতিল (মতাদর্শ)কে অস্বীকার করে, আল্লাহর (দেয়া জীবনাদর্শের) ওপর ঈমান আনে, সে যেন এর মাধ্যমে এমন এক শক্তিশালী রশি ধরলো, যা কোনোদিনই ছিঁড়ে যাবার নয়; আল্লাহ তা'য়ালা (সব কিছুই শোনেন) এবং (সবকিছুই) জানেন, যারা (আল্লাহর ওপর) ঈমান আনে, আল্লাহ তা'য়ালাই হচ্ছেন তাদের সাহায্যকারী (বন্ধু), তিনি (মূর্খতার) অন্ধকার থেকে তাদের (ঈমানের) আলোতে বের করে নিয়ে আসেন, (অপরদিকে) যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে, বাতিল (শক্তিসমূহ-ই) হয়ে থাকে তাদের সাহায্যকারী, তা তাদের (দ্বীনের) আলোক থেকে (কুফুরীর) অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়; এরাই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা চিরদিন থাকবে। (সূরা আল বাকারা-২৫৬-২৫৭)
খায়বরে যে সকল ইয়াহূদী গিয়েছিল তারাই পরবর্তীতে খায়বর যুদ্ধের অবস্থা সৃষ্টি করেছিল। এই ইয়াহূদী জাতি পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছে সেখানেই তারা অশান্তির আগুন প্রজ্জলিত করেছে। মদীনা থেকে তারা বের হয়ে সমগ্র আরবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছিল। মাত্র দু'বছরের ব্যবধানে তারা ২৪ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মদীনা আক্রমন করেছিল। সে সময়ই যদি ইয়াহূদী নামক বিষাক্ত সর্পসমূহের মস্তক চূর্ণ করা হতো তাহলে পরবর্তীতে ইয়াহুদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও খায়বর যুদ্ধের মুকাবিলা করতে হতো না। পক্ষান্তরে নবী করীম (সা:) ছিলেন করুণার সিন্ধু। পরাজিত শত্রুর করুণা ভিক্ষামূলক মিনতি তাঁর পক্ষে প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব হয়নি। তিনি জানতেন, এই ইয়াহুদীরা তাঁর জন্য প্রতি পদে পদে সমস্যা সৃষ্টি করবে। ইসলামী রাষ্ট্র উৎখাতের জন্য তারা সর্বত্র ষড়যন্তের জাল বিস্তার করবে। সুযোগ পেলে আল্লাহর রাসূল (সা:) কে এবং মুসলমানদের হত্যা করবে। তবুও নবী করীম (সা:) তাদের ক্ষমা করে নিরাপদে মদীনা ত্যাগ করার সুযোগ দিয়েছিলেন। মদীনা ত্যাগের সময় তারা যে গর্ব-অহঙ্কারের প্রদর্শনী করেছিলো তা কোনো করুণা ভিখারী ও পরাজিত জাতির নিদর্শন ছিল না।