📄 জুলুম- নির্যাতনের কালো অধ্যায়
এ পার্থিব জগতে বিভিন্ন দেশ ও সমাজে জালিম ও স্বৈরাচারী যখন কোনো ব্যক্তি, দল বা সম্প্রদায়ের প্রতি নির্যাতন করে তখন যদি কেউ প্রতিবাদ না করে তাহলে জালিম ও স্বৈরাচার উৎসাহিত হয়ে নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধিই করে থাকে, পৃথিবীর ইতিহাস এ কথার সাক্ষ্য বহন করে। নবী করীম (সা:) এর মক্কী জীবনে ঠিক এমনটিই ঘটেছিলো। প্রতাবশালী চাচা আবু তালিবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সে সময় বিশ্বনবী (সা:) এর প্রতি শারীরিকভাবে অতটা নির্যাতন কেউ করতে পারেনি। আবু তালিবের অবর্তমানে ইসলামের শত্রুগোষ্ঠী মক্কায় নির্ভীক চিত্তে নবী করীম (সা:) এর প্রতি অত্যাচারের মাত্রা বৃদ্ধি করলো। তিনি যে পথ দিয়ে কা'বায় আসবেন সে পথে ময়লা আবর্জনা বা বিষাক্ত কাঁটা বিছিয়ে রাখতো দুশমনরা। তিনি কা'বায় নামাজ আদায় করছেন, তাঁকে নানাভাবে বিদ্রুপ করা হতো। নামাজে সিজদা দিয়েছেন এ সময় তাঁর পবিত্র মাথায় উটের পচা গলিত নাড়ি ভুড়ি চাপিয়ে দেয়া হতো। ছোট্ট মেয়ে ফাতিমা (রা:) পিতার এ অবস্থা দেখে করুণ কণ্ঠে কাঁদতেন আর পিতার মাথার ওপর থেকে আবর্জনা সরিয়ে মাথা ভার মুক্ত করতেন। তিনি নামাযে দাঁড়িয়েছেন, তাঁর পবিত্র গলায় কাপড় জড়িয়ে দু'দিক থেকে এমনভাবে টেনে ধরা হতো যে, তাঁর শ্বাস বন্ধ হয়ে যেত। ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেছেন, এতে করে নবী করীম (সা:) এর কন্ঠে দাগ হয়ে যেত। বর্তমান সময়েও যেমন ইসলামের অনুসারী নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে ভুল বুঝিয়ে বিভ্রান্ত করে তাদেরকে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়, ঠিক তেমনিভাবেই নবী করীম (সা:) এর বিরুদ্ধেও তৎকালে দুশমনরা কিশোর, তরুণ যুবকদের ব্যবহার করতো। তিনি বাইরে বের হলেই ইসলাম বিরোধী নেতৃবৃন্দ দুষ্ট প্রকৃতির ছেলেদের তাঁর পেছনে লেলিয়ে দিত। তাঁরা নবী করীম (সা:) এর পেছনে পেছনে যেত আর তাঁকে বিদ্রুপ করতো।
তিনি নামাযে মধুর কন্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করতেন আর আবু জাহিল তাঁর সাথিদের নিয়ে নবীকে গালাগালি দিতো। তিনি লোকালয়ে গিয়ে মানুষের কাছে ইসলামের আহ্বান প্রচার করতেন। আবু জাহিল লোকদেরকে ডেকে বলতো, 'তোমরা এই লোকটির কথায় কান দিও না। এই লোকের প্রতারণায় তোমরা নিপতিত হবে না। এ লোক ধোকাবাজ যাদুকর'। (নাউযুবিল্লাহ)
এসব কথা বলে আল্লাহ তা'য়ালার দুশমন আবু জাহিল লোকজনের সামনে আল্লাহ তা'য়ালার নবীর পবিত্র শরীরে নোংরা কাদা নিক্ষেপ করতো। একদিন নবী করীম (সা:) কা'বায় নামায আদায় করছিলেন। শত্রুর দল দূরে বসে তাঁকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করছিল। হঠাৎ আবু জাহিল বলে উঠলো, 'মুহাম্মাদ (সা:) যখন নামাযে সিজদা দেয় তখন তাঁর মাথার ওপর উটের নাড়ি-ভুড়ি চাপিয়ে দিলে ভালো হয়। তোমরা কি কেউ এ কাজ করতে পারবে?'
ইসলামের দুশমন ওকবা বললো, 'তোমরা দেখো, আমিই মুহাম্মাদ (সা:) এর মাথায় উটের নাড়ি ভুড়ি চাপিয়ে দিচ্ছি'।
এ কথা বলেই সে উটের নাড়ি-ভুড়ি এনে নবী করীম (সা:) এর মাথার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল। তিনি তখন নামাযে সিজদায় ছিলেন, মাথা উঠাতে পারলেন না। নবীর এই কষ্ট দেখে শত্রুর দল অট্ট হাসিতে হেসেছিল। পাঁচ বছরের শিশু মেয়ে ফাতিমা পিতার এই দুরাবস্থার সংবাদ পেয়ে করুণ কন্ঠে আর্তনাদ করে ছুটে এলেন। কচি হাত দু'টো দিয়ে পরম মমতায় পিতার মাথা থেকে আবর্জনা পরিষ্কার করে শত্রুদের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহর দরবারে বিচার দিলেন।
নবী করীম (সা:) কে নিজেরা তো ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতোই সেই সাথে মক্কায় নতুন যারা আসতো, তাদের সামনেও তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করতো আবু জাহিলের অনুসারীরা। মক্কার বাইরের একজন লোক একটি উট নিয়ে মক্কায় এসেছিল। আবু জাহিল সে উট নিয়ে উটের মালিককে অর্থ না দেয়ার ছুতো খুঁজতে থাকে। লোকটি যখন বুঝলো আবু জাহিল তাকে অর্থ না দিয়েই উট নিয়ে নেবে তখন সে কা'বাঘরে এসে উচ্চকণ্ঠে বলতে থাকে, 'আবু জাহিল আমার উট নিয়ে তার মূল্য পরিশোধ করছে না। সে আমার ওপর জুলুম করছে। আপনাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন যিনি এই জুলুমের প্রতিকার করবেন? আমার অধিকার আমাকে আদায় করে দিবেন?'
লোকটির কথা শুনে ইসলামের শত্রুরা নবী করীম (সা:) কে হাসির পাত্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করলো। মক্কার বাইরের ঐ লোকটির সামনে আবু জাহিল যেন আল্লাহ তা'য়ালার রাসূলকে অপমান করে, এ উদ্দেশ্যে লোকটিকে তারা ডেকে রাসূল (সা:) কে ইশারায় দেখিয়ে বললো, 'ঐ লোকটির কাছে যাও, সে তোমার অধিকার আদায় করে দিবে'।
নবী করীম (সা:) সে সময় কা'বায় অবস্থান করছিলেন। লোকটি কাফিরদের কথায় বিশ্বাস করে নবী (সা:) এর কাছে ঘটনা বিস্তারিত বলে আবেদন করলেন, 'হে আল্লাহর বান্দাহ! আপনার প্রতি আল্লাহ তা'য়ালা রহমত নাযিল করুন, আপনি আবু জাহিলের কাছ থেকে আমার অধিকার আদায় করে দিন'।
বিশ্বনবী (সা:) লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি আমার সাথে এসো, আমি তোমার অধিকার আদায় করে দিচ্ছি'।
কথা শেষ করে নবী করীম (সা:) উঠে আবু জাহিলের বাড়ির দিকে গেলেন। লোকটিও রাসূল (সা:) এর সাথে গেল। আল্লাহর দুশমন আবু জাহিল কিভাবে নবী করীম (সা:) কে অপমান করে তা দেখার জন্যে ইসলামের দুশমনরা একজন লোককে পাঠালো। বিশ্বনবী (সা:) আবু জাহিলের বাড়ির দরোজায় আঘাত করলেন। সে ভেতর থেকে জানতে চাইলো আগন্তুকের পরিচয়। নবী (সা:) নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, 'আমি মুহাম্মাদ (সা:), দরোজা খুলে বাইরে এসো'।
আবু জাহিল বাইরে এসে বিশ্বনবী (সা:) এর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই তার চেহারা এমন ভীতিগ্রস্থ বিবর্ণ হয়ে উঠেছিল যে, সে যেন তাঁর সামনে মৃত্যুদূত দেখছে। আল্লাহর নবী (সা:) কলিজায় কম্পন জাগানো কণ্ঠে আদেশ দিলেন, 'এই লোকের যে অধিকার রয়েছে তোমার কাছে, তাঁর অধিকার তাকে বুঝিয়ে দাও'।
আবু জাহিল আতংকগ্রস্ত কন্ঠে বললো, 'এখুনি দিচ্ছি'। এ কথা বলেই সে তাঁর ঘরে গিয়ে দ্রুত অর্থ এনে লোকটিকে দিয়ে দিল। নবী করীম (সা:) কা'বায় ফিরে এলেন।
সে লোকটি কা'বায় এসে কাফিরদেরকে বললো, 'মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ (সা:) এর ওপর রহমত নাযিল করুন, তিনি আমার অধিকার আদায় করে দিয়েছেন'।
আল্লাহর দুশমনরা ধারণা করেছিল তাদের নেতা আবু জাহিল বিদেশী লোকটির সামনে নবী করীম (সা:) কে অপমান করবে, তা না করে আবু জাহিল মুহাম্মাদ (সা:) এর কথায় উটের মূল্য পরিশোধ করলো, কারণ কি? ইতোমধ্যে আবু জাহিল সেখানে এলো। তাঁর চেহারা থেকে তখন পর্যন্ত ভয়ের চিহ্ন মুছে যায়নি। অন্যরা তাকে জিজ্ঞাসা করলো, 'বিষয়টি কি? তুমি মুহাম্মাদ (সা:) এর কথায় মূল্য দিয়ে দিলে যে?'
আবু জাহিল বললো, 'মুহাম্মাদ (সা:) এর কথায় মূল্য না দিলে সে ভয়ঙ্কর উট আমাকে খেয়ে ফেলতো। আমি দরোজা খোলার পরে দেখলাম মুহাম্মাদ (সা:) এর পেছনে একটি ভয়ঙ্কর দর্শন উট দাঁড়িয়ে আছে। খোদার শপথ! তেমন উট আমি কোথাও দেখিনি। উটের চেহারা বড় ভয়ঙ্কর, আমি ঐ লোকটির উটের মূল্য না দিলে মুহাম্মাদ (সা:) এর পিছনে দাঁড়ানো উট আমাকে খেয়ে ফেলতো'। (ইবনে হিশাম)
এভাবেই সেদিন মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) এর সর্বোচ্চ মর্যাদা সমুন্নত রেখে ইসলামের দুশমনদের ষড়যন্ত্র বানচাল করে দিয়েছিলেন। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা ইসলামের দুশমনরা ঘটিয়েছে। যারা প্রত্যক্ষভাবে বিশ্বনবী (সা:) এর সাথে শত্রুতা করেছে, মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তাদের অশুভ পরিণতি সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। নবী করীম (সা:) এর চাচা আবু লাহাব এবং তাঁর স্ত্রী উম্মে জামিল নবী করীম (সা:) কে নানাভাবে অত্যাচার করেছে। তাদের পরিণতি সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সূরা লাহাব অবতীর্ণ করেছেন। আবু লাহাব যখন জানতে পারলো তাঁর পরিণতি সম্পর্কে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, তখন সে একটি পাথর নিয়ে নবী করীম (সা:) কে আঘাত করার উদ্দেশ্যে কা'বায় এসে বসলো।
কিছুক্ষণ পরে নবী করীম (সা:) হযরত আবু বকর (রা:) কে সাথে নিয়ে কা'বায় এলেন। মহান আল্লাহ তা'য়ালা আবু লাহাবের চোখ থেকে বিশ্বনবী (সা:) কে অদৃশ্য করে দিলেন। আবু লাহাব হযরত আবু বকর (রা:) কে জিজ্ঞাসা করলো, 'কোথায় মুহাম্মাদ (সা:)? আমি জানতে পারলাম সে আমার সম্পর্কে শাস্তির কথা বলছে। এখন আমি কাছে পেলে এই পাথর দিয়ে তাকে আঘাত করতাম'।
কথা শেষ করে সে চলে গেল। হযরত আবু বকর (রা:) আল্লাহর নবী (সা:) কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আবু লাহাব আপনাকে দেখতে পেল না কেনো?'
নবী করীম (সা:) বললেন, 'সে আমাকে দেখতে পায়নি। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর চোখকে আদেশ দিয়েছিলেন যেন সে আমাকে দেখতে না পায়'।
বর্তমান যুগে একশ্রেণীর লোক যেমন নিজেদেরকে সুশিল নামে পরিচয় দিয়ে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালায় তেমনি সে যুগেও সুশিলদের এক নেতা উমাইয়া ইবনে খালফ নবী করীম (সা:) কে দেখলেই গালাগালি ও হৈচৈ করতো। বর্তমান যুগের একশ্রেণীর ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্টিং মিডিয়ার মতো ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কল্পিত অভিযোগ ও মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের মতো ভূমিকা সে যুগের উমাইয়া ইবনে খালফ এবং তার সমর্থকগণ আল্লাহ তা'য়ালার রাসূলের বিরুদ্ধে পালন করতো। ইসলামের দুশমন এ লোকটির অশুভ পরিণতি এবং তার ঘৃণিত স্বভাব সম্পর্কে মহান আল্লাহ সূরা হুমাজাহ্ অবতীর্ণ করেছেন। নবী করীম (সা:) এর মহান সাহাবী হযরত খাব্বাব (রা:) ছিলেন একজন লৌহকর্মকার। তিনি লৌহজাত অস্ত্র নির্মাণ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর কাছ থেকে তরবারী কিনেছিল আ'স ইবনে ওয়ায়েল নামক এক কাফির। সম্পূর্ণ অর্থ সে তখন পর্যন্ত পরিশোধ করেনি। হযরত খাব্বাব (রা:) তাঁর কাছে তরবারীর মূল্য চাইতে গেলেই সে বিদ্রুপ করে বলতো, 'হে খাব্বাব! তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ (সা:) তো প্রচার করে জান্নাতে যারা যাবে তাঁরা ইচ্ছে অনুযায়ী স্বর্ণ রৌপ্য হিরা জহরত ও অসংখ্য দাস-দাসী পাবে। এ কথা কি ঠিক?'
হযরত খাব্বাব (রা:) জবাব দিতেন, 'আল্লাহর নবী (সা:)-এর কথা অবশ্যই সত্য'।
আল্লাহ তা'য়ালার দুশমন আ'স ইবনে ওয়ায়েল বিদ্রুপ করে বলতো, 'হে খাব্বাব! তাহলে আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত সময় দাও! আমি তোমাদের ঐ জান্নাতে গিয়েই তোমার অর্থ পরিশোধ করবো। আমি খোদার শপথ করে বলছি, তুমি আর তোমার মুহাম্মাদ (সা:) আমার তুলনায় অধিক সম্মান পাবে না এবং সৌভাগ্যবানও হতে পারবে না'। (নাউযুবিল্লাহ)
এই কাফির সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে সূরা মরিয়মের আয়াত অবতীর্ণ করেন। নাদার ইবনে হারেস ছিলো ইসলামের আরেক ঘৃণিত শত্রু। নবী করীম (সা:) যখন কুরআন তিলাওয়াত করতেন, লোকদেরকে ইসলামের দিকে আহবান জানাতেন, ইসলামের সাথে যারা অতীতে বিরোধীতা করে আল্লাহ তা'য়ালার গযবে পড়ে ধ্বংস হয়েছে, তাদের ইতিহাস শোনাতেন তখন এই কাফির সে সমাবেশে উপস্থিত হয়ে নীরবে বসে থাকতো। রাসূল (সা:) চলে যাবার পরে সে লোকজনকে বলতো, 'মুহাম্মাদ (সা:) যা বলে তার কোনো ভিত্তি নেই। তাঁর বলা কাহিনী সেই প্রাচীন যুগের গল্প ছাড়া আর কিছুই না। মুহাম্মাদ (সা:) এর চেয়ে ভালো কাহিনী আমি জানি'।
মহান আল্লাহ তা'য়ালা সূরা ফুরকানের আয়াত অবতীর্ণ করে ঘৃণিত এ লোকটির পরিণতি বর্ণনা করেছেন। আরেকজন কাফির আখনাস ইবনে শুরাইক, সে ছিল তৎকালিন সুশিল সমাজের একজন গন্যমান্য ব্যক্তি। এই লোকটি নানাভাবে নবী করীম (সা:) কে অত্যাচার করতো। তাঁকে দেখলেই অশালীন ভাষায় গালাগালি দিত। মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর সম্পর্কে সূরা কলমের আয়াত অবতীর্ণ করে তাঁর পরিণতি কত খারাপ হবে তা জানিয়ে দিলেন। ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা নামক কাফির বলতো, 'আমি এবং আবু মাসউদের মতো প্রভাবশালী লোক থাকতে মুহাম্মাদ (সা:) এর মতো লোকের ওপরে ওহী নাযিল হলো? আল্লাহ আর লোক পাননি বুঝি?' (নাউযুবিল্লাহ)
সুশিল নামধারী ইসলামের এসব দুশমনদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ সূরা যুখরূফের আয়াত অবতীর্ণ করে তাদের কথার প্রতিবাদ করে নির্মম পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন। কাফিরদের ভেতরে উকবা এবং উবাই ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নবী করীম (সা:) এক সমাবেশে মানুষদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাচ্ছিলেন, সে সমাবেশে উকবা উপস্থিত ছিলো। উবাই এ সংবাদ জানতে পেরে ছুটে এসে তাঁর বন্ধু উকবাকে বললো, 'তুমি মুহাম্মাদ (সা:) এর কথা শুনছো? তুমি যদি তাঁকে অপমান না করো তাহলে তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্কে থাকবে না'।
মহান আল্লাহ তা'য়ালা উকবা এবং উবাইকে জাহান্নামের অতলে নিমজ্জিত করুন। তাদের কঠিন পরিণতি সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ করে তাদের ভয়ংকর অবস্থা সম্পর্কে জানিয়ে দিলেন। একদিন উবাই একটি পুরোনো হাড় এনে নবী করীম (সা:) কে বললো, 'হে মুহাম্মাদ (সাঃ)! তোমার কি বিশ্বাস হয় এই পচা হাড়কে আল্লাহ আবার জীবিত করবে?' এ কথা বলে সে হাড়টি গুড়ো করে বাতাসে উড়িয়ে দিল।
নবী করীম (সা:) দৃঢ় কন্ঠে বললেন, 'মহান আল্লাহ তা'য়ালা বাতাসে মিশ্রিত হাড়কে আবার জীবিত করবেন এবং জাহান্নামে প্রেরণ করবেন'। এই কাফির সম্পর্কে সূরা ইয়াছিনের আয়াত অবতীর্ণ হলো। মহান আল্লাহ বললেন, 'তাদেরকে বলে দাও, প্রথমবার যখন তাঁরা অস্তিত্বহীন ছিল তখন তাদেরকে কে অস্তিত্ব দান করেছিল? যে আল্লাহ প্রথমবার অস্তিত্বদান করেছিলেন সেই আল্লাহই যতবার খুশী অস্তিত্বদান করবেন'।
আরেকদিন নবী করীম (সা:) কা'বাঘর তাওয়াফ করছিলেন, এ সময় কাফির নেতারা বিশ্বনবী (সা:) এর কাছে আপোষ প্রস্তাব পেশ করে বললো, 'হে মুহাম্মদ (সা:)! এসো আমরা একটি প্রক্রিয়ায় আমাদের বিরোধ শেষ করে দেই। তা হলো, আমরা তোমার আল্লাহর দাসত্ব কিছুটা করি তুমিও আমাদের প্রতিপালক দেবতাদের দাসত্ব কিছুটা করো। তাহলে আর আমাদের ভেতরে কোনো বিরোধ থাকবে না'।
কাফিরদের কথার জবাবে মহান আল্লাহ সূরা কাফিরুন অবতীর্ণ করে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, 'হে নবী, আপনি তাদেরকে জানিয়ে দিন, আমি যার দাসত্ব করি তোমরা তাঁর দাসত্ব করো না। তোমরা যার দাসত্ব করো আমি তাঁর দাসত্ব করি না। তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন আর আমার জন্য আমার দ্বীন'।
ইসলামে বাতিল শক্তির সাথে আপোষের কোনো ব্যবস্থা নেই। ইসলামে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই। যার যার ধর্ম সে সে অবশ্যই পালন করবে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার স্থান ইসলামে নেই। পবিত্র কুরআনের এই আয়াত দিয়ে যারা ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে কথা বলেন তাদের উচিত আয়াতটির পটভূমি দেখা। পৃথিবীর কোনো নবী-রাসূলগণ এবং তাঁদের সাহাবায়ে কেরাম ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে ছিলেন না। কাফির এবং ধর্মনিরপেক্ষদের সাথেই তাদের সংঘর্ষ হয়েছে। নবীগণের আগমন ঘটেছেই মহান আল্লাহর বিধান রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে। সুতরাং কুরআনের আয়াতের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে যারা পার্থিব স্বার্থে ব্যবহার করে তাদের সতর্ক থাকা উচিত। মহান আল্লাহ তা'য়ালার ক্রোধ যে কোনো মুহূর্তে অবতীর্ণ হতে পারে।
ইসলামে শক্তি প্রয়োগের স্থান নেই। ইসলাম তার আকিদা বিশ্বাসকে গ্রহণ করতে কাউকে বাধ্য করে না। কারণ বিশ্বাস জিনিসটা কারো ওপর শক্তি প্রয়োগ করে চাপিয়ে দেয়া যায় না। একইভাবে, ইসলাম তার আকিদা বিশ্বাসের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পৃক্ত ইবাদাতকেও কোনো ব্যক্তির ওপর শক্তি প্রয়োগ করে চাপিয়ে দেয় না। কারণ দৃঢ় বিশ্বাস ব্যতীত ইসলামের ইবাদত সমূহ অর্থহীন। দৃঢ় বিশ্বাস অন্তরে পোষণ করেই নামায, রোযা, হজ্জ ইত্যাদী আদায় করতে হয়। এসব দিকে ইসলাম মানুষকে স্বাধীনতা দিতে চায়। পক্ষান্তরে ইসলাম এটা সহ্য করতে নারাজ যে, সমাজ ও সভ্যতা পরিচালনাকারী যে আইন ও বিধানের ওপর রাষ্ট্রের কাঠামো ও বিধিব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ব্যতীত অন্য কেউ রচনা করে দিক, আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি বিদ্রোহী মানুষজন আল্লাহর পৃথিবীতে আইনের প্রয়োগ করুক বা বাস্ত বায়ন করুক, মুসলিম জনগোষ্ঠী তা পালন করুক এবং তাদের দাস হয়ে থাকুক। এসব ঘৃণ্য সুযোগ ইসলাম দিতে নারাজ।
নবী করীম (সা:) যে বাড়িতে থাকতেন সে বাড়ির চারদিকে যারা বসবাস করতো অর্থাৎ আল্লাহর রাসূলের প্রতিবেশী যারা ছিল তাদের ভেতরে একমাত্র হাকাম ইবনে আ'স (রা:) ব্যতীত আর কেউ ইসলাম কবুল করেনি। রাসূল (সা:) যখন নিজের বাড়িতেই নামায আদায় করতেন তখন প্রতিবেশী উকবা, আদী এ ধরনের অনেকেই তাঁর প্রতি পশুর নাড়ি ভুড়ি ছুড়ে দিত। নবী করীম (সা:) বাধ্য হয়ে দেয়ালের আড়ালে নামায আদায় করতেন। তিনি রান্নার জন্য উনুনে হাড়ি উঠাতেন আর তারা সেই হাড়ির ভেতরেও আবর্জনা ছুড়ে দিত। বিশ্বনবী (সা:) নিজ হাতে সেসব আবর্জনা পরিষ্কার করতেন। বিশ্বমানবতার মহান মুক্তির দূত নবী করীম (সা:) এর প্রতি ইসলামের শত্রুরা নির্যাতনের চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেছে, কিন্তু শত্রুপক্ষের শেষ রক্ষা হয়নি। তাদের নাম-নিশানা মুছে গিয়েছে। ইনশাআল্লাহ ইসলামের এ যুগের দুশমনদের অস্তিত্বও ঘৃণা ও লাঞ্ছনার অতল তলদেশে হারিয়ে যাবে।
📄 শক্তি প্রয়োগে নয়- নবী করীম (সা:) এর স্নিগ্ধ সুরভিত আকর্ষণে
নবী করীম (সা:) প্রত্যেক হজ্জের মৌসুমে আরবের বিভিন্ন গোত্রের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যেতেন। নবুয়্যাতের দশম বছর রজব মাসে নবী করীম (সা:) বিভিন্ন গোত্রের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গেলেন। এ সময় মদীনা থেকে একদল লোক মক্কায় আগমন করেছিল। দলটি ছিল খাজরাজ গোত্রের। মক্কা ও মিনার মধ্যবর্তী একটি স্থানের নাম আকাবা। বর্তমানে এখানে মসজিদে আকাবা অবস্থিত। এই আকাবাতে তাঁর সাথে লোকগুলোর সাক্ষাৎ ঘটেছিল। তাদের সাথে দেখা হওয়া মাত্র তিনি তাদের পরিচয় জানতে আগ্রহী হলেন। তাঁরা নিজেদেরকে খাজরাজ গোত্রের লোক বলে পরিচয় দিল। তিনি বললেন, 'যারা ইয়াহুদীদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ আপনারা কি সেই গোত্রের?'
নবী করীম (সা:) এর কথার প্রতি তাঁরা ইতিবাচক জবাব দিল। তিনি তাদেরকে বললেন, 'আপনারা আমাকে একটু সময় দিলে আমি আপনাদের সাথে কিছু কথা বলতে ইচ্ছুক'।
আগন্তুক দল নবী করীম (সা:) এর কথায় সম্মত হয়ে সেখানে বসলো। তিনি তাদেরকে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করে শোনালেন এবং ইসলাম সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করার আহ্বান জানালেন। মদীনার অধিবাসীরা নানা ধরনের মূর্তির পূজা করতো এবং ইয়াহুদীদের সাথে তাঁরা এক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল। তৎকালীন ইয়াহুদীরা কিতাবের মাধ্যমে নবী করীম (সা:) সম্পর্কে পূর্ব হতেই অবগত ছিল। তাদের কাছ থেকে মদীনার অধিবাসীরাও নবী করীম (সা:) এর আগমন সম্পর্কে অনেক কিছুই জেনেছিলো।
মদীনার ইয়াহুদী এবং পৌত্তলিকদের মধ্যে মতানৈক্যের সূত্রপাত হলে ইয়াহুদীরা পৌত্তলিকদের ভয় দেখিয়ে বলতো, 'বর্তমানে নবী আগমনের আর দেরী নেই। আমরা ইতোপূর্বে আদ ও ইরাম জাতিকে নির্বিচারে হত্যা করেছিলাম। এখন যে নবী আগমন করবে সে নবীর নেতৃত্বে তোমাদেরকেও সেই একইভাবে হত্যা করবো'।
ইয়াহুদীদের এ ধরনের ভীতি প্রদর্শনের কারণে মদীনার পৌত্তলিকরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, নবীর সাথে সাক্ষাৎ ঘটলে তাঁরাই ইয়াহুদীদের আগে নবীর অনুসারী হবে। এভাবে মহান আল্লাহ তা'য়ালা মদীনায় ইসলামের জন্য ক্ষেত্র পূর্ব হতেই প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। নবী করীম (সা:) এর দাওয়াত শোনার সাথে সাথে তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো, যে নবী সম্পর্কে ইয়াহুদীরা তাদেরকে ভয় দেখায় এই মানুষটিই সেই নবী। সুতরাং ইয়াহুদীরা এই নবীর অনুসারী হবার পূর্বেই তাঁরা ইসলাম কবুল করে মুসলমান হবে এবং সিদ্ধান্ত তাঁরা তৎক্ষণাৎ কার্যকর করেছিল।
ইসলাম কবুল করেই তাঁরা নবী করীম (সা:) কে জানালো, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমরা আমাদের গোত্রকে শত্রু কর্তৃক পরিবেষ্টিত অবস্থায় রেখে এসেছি। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের গোত্রের সকল লোক আপনার সাথে থাকবে। আমরা আমাদের গোত্রে ফিরে গিয়ে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদেরকে জানাবো। মহান আল্লাহ তা'য়ালা যদি তাদেরকে আপনার সঙ্গী বানিয়ে দেন তাহলে আপনি হবেন সবচেয়ে সম্মানিত এবং শক্তিশালী'।
এই সৌভাগ্যবান মানুষগুলো ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় গিয়ে তাদের গোত্রের কাছে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করে তাদের ইসলাম গ্রহণ করার বিষয়টি জানিয়ে দেন। ফলে মদীনার সর্বত্র ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ তীব্র হয়ে ওঠে। এভাবেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর নবীর কার্যক্রমকে এক যৌক্তিক পরিণতির দিকে এগিয়ে নেন এবং ইসলাম বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছায়।
মহাকালের ঘূর্ণয়মান চক্রের আবর্তনে পুনরায় হজ্জের মৌসুম এসে উপস্থিত হলো। মদীনা থেকে সত্য পিপাসু ব্যক্তিগণ মক্কায় এলেন তাওহীদের সুরা পান করে তৃষ্ণা মিটানোর জন্য। তাঁরা নবী করীম (সা:) এর সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলাম গ্রহণ করলেন। হযরত উবাদা (রা:) বলেন, 'আমি আকাবার প্রথম বাইয়াতে উপস্থিত ছিলাম। আমরা মোট ১২ জন পুরুষ উপস্থিত ছিলাম। আমরা নবী করীম (সা:) এর কাছে ওয়াদা করেছিলাম, 'আল্লাহ তা'য়ালার সাথে কাউকে শরীক করবো না। সন্তান হত্যা করবো না। চুরি ডাকাতি করবো না। ব্যভিচার করবো না। কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ ছড়াবো না। ন্যায় সংগত বিষয়ে নবীর সাথে অবাধ্যতা প্রদর্শন করবো না'।
আমরা নবী করীম (সা:) এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করার পরে তিনি বললেন, 'তোমরা আমার সাথে যে ওয়াদা করলে, তা যদি পালন করো তাহলে তোমাদের জন্য আল্লাহর জান্নাত রয়েছে। আর যদি এই ওয়াদার মধ্যে কোনো একটিও অমান্য করো তাহলে তোমাদের পরিণতি আল্লাহ তা'য়ালার হাতেই অর্পিত থাকবে। তিনি ইচ্ছে করলে শাস্তি ও দিতে পারেন এবং ক্ষমাও করতে পারেন'।
'বাইয়াত' আরবী শব্দ, এর অর্থ হলো বিক্রি করে দেয়া। একজন মুসলমান তাঁর জীবনের সকল কিছুই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে বিক্রি করে দেয়। মুসলমানদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। এ কারণে তাঁরা তাদের জীবন, ধন-সম্পদ সকল কিছুই মহান আল্লাহর কাছে জান্নাতের বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়। মহান আল্লাহও পবিত্র কুরআনে বলেছেন, আমি তাদের প্রাণ এবং ধন-সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছি। সুতরাং বাইয়াত করার অর্থ হলো, মহান আল্লাহর কাছে নিজের সমগ্র সত্তাকে বিক্রি করে দেয়া।
মদীনায় এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, সেখানে এমন একজন প্রশিক্ষকের প্রয়োজন ছিল যিনি মানুষকে ইসলামী শিক্ষার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ দিবেন। নবী করীম (সা:) এই অভাব উপলব্ধি করে হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা:) কে প্রশিক্ষক হিসাবে মনোনীত করে মদীনায় প্রেরণ করেছিলেন। তাঁর এ মহান সাহাবীই ছিলেন ইসলামের প্রথম মুবাল্লিগ। তিনি ছিলেন প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন। তিনিই ছিলেন ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরের যুদ্ধে পতাকা বহনকারী। তিনি মদীনায় আগমন করে হযরত আসয়াদ ইবনে জুরারাহ (রা:) এর বাড়িতে অবস্থান করেন। হযরত আসয়াদ (রা:) মদীনার একজন সম্মানিত ব্যক্তি এবং তাঁর আর্থিক অবস্থা ছিল সচ্ছল।
হযরত মুসআব (রা:) একজন দক্ষ সংগঠক এবং ভারসাম্যমূলক মেজাজের অধিকারী ছিলেন। সাবলীল ভাষায় তিনি ইসলামী আদর্শ মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারতেন এবং তাঁর নেতৃত্বের গুণাবলীর কারণে নবী করীম (সা:) তাকেই মদীনায় ইসলামী কার্যক্রম শুরু ও আন্দোলনকে সংগঠিত করার জন্য মনোনয়ন দান করেছিলেন। হযরত মুসআব (রা:) মদীনায় গিয়ে ব্যাপকভাবে ইসলামের পক্ষে জনমত গঠন করেন এবং মদীনার মানুষকে ইসলামী বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করতে থাকেন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মদীনার ঘরে ঘরে ইসলামের বিজয় কেতন উড়তে থাকে। তিনি কতটা দক্ষ সংগঠক এবং তাঁর মেজাজ কতটা ভারসাম্যমূলক ছিল, তা একটি ঘটনা দ্বারা প্রমাণ হয়। এক জনসমাবেশে তিনি মানুষের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করছিলেন। এমন সময় বনী আবদিল আশহালের নেতা উসাইদ ইবনে হুদাইর অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে উত্তেজিতভাবে তাঁর কাছে এলো।
সমবেত মুসলমানগণ লোকটির রণমূর্তি দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়লো। হযরত মুসআব (রা:) তাঁর দিকে মুখে হাসি টেনে তাকিয়ে রইলেন। তিনি নির্ভীকভাবে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনলেন। উসাইদ ক্রোধ কম্পিত কন্ঠে বলতে লাগলো, 'তুমি আমার দেশের লোককে বিভ্রান্ত করছো। তোমার যদি জীবিত থাকার সাধ থাকে তাহলে এই মুহূর্তে মদীনা ত্যাগ করো'।
মুখে মধুর হাসি টেনে হযরত মুসআব (রা:) তাকে বললেন, 'আপনি আমার কথা একটু ধৈর্য ধরে শুনুন। যদি আপনার ভালো না লাগে তাহলে আমি চলে যাবো। আপনি দয়া করে একটু বসুন'।
তাঁর কথা যাদুর মতই ক্রিয়া করলো। উসাইদ নীরবে সে বৈঠকে উপবেশন করলো। হযরত মুসআব (রা:) প্রথমে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করে কুরআনের ব্যাখ্যা পেশ করলেন। উসাইদ তখন মনোযোগ দিয়ে আল্লাহ তা'য়ালার কুরআন শুনছেন। তাঁর চেহারায় আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেলো। তিনি বললেন, 'তুমি যা বলছো তা অত্যন্ত সুন্দর এবং যুক্তির কথা। তোমার এই আদর্শ গ্রহণ করতে হলে কি করতে হবে?' হযরত মুসআব (রা:) প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়ার পর তিনি ইসলাম কবুল করলেন।
আউস গোত্রের নেতার নাম ছিল সাদ ইবনে মায়াজ। সমগ্র গোত্রে তাঁর মতো প্রভাবশালী অন্য কোনো নেতা ছিল না। গোত্রের প্রতিটি মানুষ তাঁর ইশারায় প্রাণদান করার জন্য প্রস্তুত থাকতো। নবী করীম (সা:) এর প্রেরিত দূত হযরত মুসআব (রা:) তাঁর কাছে গেলেন ইসলামের আদর্শ নিয়ে। সাদ তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলো। হযরত মুসআব (রা:) পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করলেন। কুরআনের প্রভাবে সাদের ভেতরের জগৎ ইসলাম গ্রহণের জন্য উর্বর হয়ে উঠলো। মুহূর্তকাল অপেক্ষা না করে তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণ করার সাথে সাথে গোত্রের প্রতিটি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করার জন্য প্রতিযোগিতা আরম্ভ করে দিয়েছিল। (আল্-বিদায়াতু ওয়ান্নেহায়াহ্, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-১৪৯)
হযরত মুসআব (রা:) মদীনায় ইসলামী জীবন ব্যবস্থার পক্ষে অত্যন্ত শক্তিশালী জনমত গঠন করলেন। ইসলাম এবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দেশ পরিচালনা করবে, সে মুহূর্ত প্রায় সমাগত। ক্ষণিক পরেই যেন বিজয়ের সিংহদ্বার উন্মুক্ত হবে। সে লক্ষ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন প্রায়। হযরত মুসআব (রা:) তাঁর কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে নবী করীম (সা:) কে অবগত করার লক্ষ্যে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করলেন। পুনরায় হজ্জের মৌসুম সমাগত হলো। মদীনা থেকে লোকজন হজ্জ আদায়ের লক্ষ্যে মক্কার দিকে রওয়ানা দিল। তাদের মধ্যে এমন লোকও ছিল যারা ইসলাম গ্রহণ করে মদীনাতেই মুসলমান হয়েছিল। হজ্জ আদায় কালে তাঁরা নবী করীম (সা:) এর সাথে কথা বলে জানিয়ে দিলেন আকাবায় পুনরায় সাক্ষাৎ হবে।
আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াত সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শী হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রা:) বলেন, 'মদীনা থেকে আমরা আমাদের গোত্রের অমুসলিমদের সাথে হজ্জ আদায়ের জন্য মক্কায় যাত্রা করলাম। সে সময় আমরা নামায আদায় করি এবং ইসলাম সম্পর্কে কিছু জ্ঞান অর্জন করেছি। আমাদের গোত্রপতি বয়সে প্রবীণ বারা ইবনে মারুর আমাদের বললো, 'আমি তোমাদেরকে একটি বিষয় জানাবো। তোমরা আমার সাথে একমত হবে কিনা জানি না। আমি এখন থেকে কা'বার দিকে পেছন ফিরে নামাজ আদায় করবো না, কা'বার দিকে মুখ করেই নামাজ আদায় করবো'।
আমরা তাকে জানালাম, 'আমাদের নবী বাইতুল মাকদিসের দিকে ফিরে নামায আদায় করে থাকেন। আমরাও তাঁর অনুসরণ করি'।
গোত্রপতি জানালেন, 'তাহলে আমি কা'বা এবং বাইতুল মাকদিস এই উভয় দিকেই মুখ করে নামাজ আদায় করবো'। আমরা তাকে জানালাম, 'আমরা তোমার মত করবো না। আমাদের নবী যেমন করেন আমরাও তেমন করে নামায আদায় করবো'।
পথে আমরা নবী করীম (সা:) এর অনুকরণে নামায আদায় করতাম আর তিনি তাঁর মত অনুযায়ী নামায আদায় করতেন। মক্কায় আসার পরে তিনি আমাদেরকে বললেন, 'তোমরা আমাকে নবীর কাছে নিয়ে চলো। তোমাদের কথায় আমার মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করবো আমি ভুল না ঠিক করেছি'।
হযরত কা'ব (রা:) বলেন, 'আমরা নবী করীম (সা:) এর সন্ধানে বের হলাম। তাঁকে আমরা চিনতাম না। কারণ ইতোপূর্বে আমরা কেউ তাঁকে দেখিনি। মক্কার একজন লোককে আমরা জানালাম, 'মুহাম্মাদ (সা:) কে আমরা চিনি না কিন্তু তাঁর সাথে আমরা সাক্ষাৎ করতে ইচ্ছুক'। লোকটি আমাদেরকে প্রশ্ন করলো, আমরা মুহাম্মাদ (সা:) এর চাচা আব্বাসকে চিনি কিনা। আমরা তাকে জানালাম, তাঁকে আমরা চিনি। কারণ সে আমাদের গোত্রের পাশ দিয়ে অনেক বার আসা যাওয়া করেছে। লোকটি আমাদেরকে জানালো, মক্কার ঘরে হযরত আব্বাসের পাশে যাকে বসে থাকতে দেখবে সেই হলো তোমাদের কাঙ্খিত ব্যক্তি।
আমরা কা'বাঘরে প্রবেশ করে হযরত আব্বাসকে দেখলাম এবং তাঁর পাশে অপূর্ব সুন্দর একজন মানুষকে বসে থাকতে দেখলাম। আমরা সালাম দিয়ে তাঁর পাশে বসলাম। নবী করীম (সা:) তাঁর চাচাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'চাচা, আপনি কি এদেরকে চিনেন?'
হযরত আব্বাস বললেন, 'আমি এদেরকে চিনি। এদের একজন হলেন কা'ব ইবনে মালিক আরেকজন হলেন গোত্রপতি বারা ইবনে মারুর'।
হযরত কা'ব (রা:) বলেন, এবার আমার অবাক হবার পালা। নবী করীম (সা:) আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, 'আপনি সেই বিখ্যাত কবি কা'ব ইবনে মালিক!' আমি কুণ্ঠিত কণ্ঠে জবাব দিলাম, 'আমিই সেই ব্যক্তি'।
এ সময় গোত্রপতি বারা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমি মক্কায় যাত্রা করার পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছি। তারপর আমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম আমি মক্কাকে পিছনে করে নামায আদায় করবো না। মক্কাকে সামনে করে নামায আদায় করবো। কিন্তু আমার সাথীরা আমার সাথে একমত নন। আমি সন্দেহের মধ্যে আছি। আপনি বলে দিন আমি ঠিক করেছি কিনা'।
নবী করীম (সা:) বললেন, 'তুমি একদিকে মুখ দিয়ে নামায আদায় করতে, ধৈর্যের সাথে সেদিকেই মুখ করে নামায আদায় করলে উত্তম হতো'।
এরপর গোত্রপতি বারা আমাদেরকে অনুসরণ করে বাইতুল মাকদিসের দিকে মুখ করে নামায আদায় করতে থাকলেন। আমরা হজ্জের অনুষ্ঠান আদায় করে পরবর্তী রাতে নবী করীম (সা:) এর সাথে আকাবায় মিলিত হবার জন্য প্রস্তুত হলাম। এ সময় আমাদের সাথে মদীনার প্রভাবশালী ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ছিলেন। আমরা তাঁকেও আমাদের সাথে নিলাম। জাবির নামে আরেকজন সম্মানিত ব্যক্তি আমাদের সাথে ছিল। আমারা কোথায় কি করতে যাচ্ছি তা কাউকে জানালাম না।
পরে আমি জাবিরকে বললাম, 'আপনি আমাদের মধ্যে একজন সম্মানিত ব্যক্তি। আপনি যে জীবন ব্যবস্থা মেনে চলেন তা ঠিক না। আপনি মৃত্যুর পরে জাহান্নামে যান এটা আমরা চাই না। আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন'।
তিনি তখনই ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং তাকে আমরা জানালাম, আজ রাতে আমরা নবী করীম (সা:) এর সাথে আকাবায় সাক্ষাৎ করবো। পরে তিনি আমাদের পথ প্রদর্শনকারী হয়েছিলেন। সেই রাতে আমরা আমাদের সাথীদের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকলাম এবং গভীর রাতে উঠে আমরা আকাবার দিকে গোপনে যাত্রা করলাম। সে সময় আমাদের সংখ্যা দুইজন নারীসহ মোট ৭৩ জন ছিল। আমরা সেখানে সমবেত হয়ে নবী করীম (সা:) এর জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর তিনি তাঁর চাচা হযরত আব্বাসকে সাথে নিয়ে এলেন। হযরত আব্বাস সে সময় পর্যন্তও ইসলাম গ্রহণ করেননি কিন্তু তিনি রাসূল (সা:) এর নিরাপত্তার জন্য তাঁর সাথে থেকে তাঁর কাজে সহায়তা করতেন।
এরপর হযরত আব্বাস সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, 'হে সমবেত মদীনাবাসী! আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, আমাদের কাছে মুহাম্মাদ (সা:) এর মর্যাদা কতটা উচ্চে। তাঁকে আমরা বিভিন্ন ধরনের বিপদ থেকে এ পর্যন্ত নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করেছি। তিনি তাঁর এলাকাবাসীর মধ্যে এক অভূতপূর্ব কর্ম সম্পাদন করেছেন। এ কারণে তিনি আমাদের মধ্যে সম্মান ও নিরাপত্তার অধিকারী। তবুও তিনি আপনাদের মধ্যে থাকতে পছন্দ করছেন এবং আপনাদের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ। এখন আপনারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন, আপনারা যে ওয়াদা তাঁকে দিচ্ছেন সে ওয়াদা শেষ পর্যন্ত পালন করতে পারবেন কিনা। তাঁর নিরাপত্তাদান করতে পারবেন কিনা। তাঁর সব ধরণের দায়িত্ব আপনারা গ্রহণ করতে পারবেন কিনা। কারণ তিনি আমাদের মধ্যে নিরাপত্তা এবং সম্মানের সাথেই অবস্থান করছেন'।
হযরত আব্বাস (রা:) এর কথা শেষ হতেই আমরা বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমরা সকল কিছুতেই রাজি আছি, আপনি আমাদের বাইয়াত গ্রহণ করুন'।
নবী করীম (সা:) পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করে উপস্থিত সবাইকে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য দাওয়াত দিয়ে বললেন, 'আমি তোমাদের কাছ থেকে একটি অঙ্গীকার চাই, তোমরা তোমাদেও পরিবার-পরিজনের যেভাবে দেখাশোনা করো, যেভাবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করো, আমার ক্ষেত্রে তেমনই করবে কিনা'।
আমাদের গোত্রপতি বারা তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে নবী করীম (সা:) এর হাত ধরে বললেন, 'যে মহান আল্লাহ তা'য়ালা আপনাকে সত্য জীবন ব্যবস্থাসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর নামে শপথ করে ওয়াদা করছি, আমরা আমাদের পরিবার-পরিজনের যেভাবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করি সেই একইভাবে আপনার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবো। আপনি আমাদের যেদিকে পরিচালিত করবেন সেদিকেই আমরা যাবো। আমরা যোদ্ধা জাতি, তরবারীর ছায়ায় আমরা লালিত পালিত। আমরা অস্ত্র এবং যুদ্ধের মধ্যেই জীবিত থাকি। আমরা আপনার অনুগত্য করবো'।
এরপর আরেকজন নেতা আবুল হাইসাম বললো, 'আমরা ইয়াহুদীদের সাথে মৈত্রী চুক্তি করেছিলাম এবং সে সম্পর্ক শেষ করে দিতে যাচ্ছি। (অর্থাৎ আপনাকে গ্রহণ করার অর্থই হলো ইয়াহুদীদের সাথে সম্পর্ক শেষ করে দেয়া) আপনার জন্য আমরা ত্যাগ স্বীকার করবো, এরপর আপনি যখন বিজয়ী হবেন তখন আমাদেরকে ছেড়ে যাবেন না তো?'
তাঁর কথা শুনে নবী করীম (সা:) মৃদু হেসে বললেন, 'আমি তোমাদের জীবন এবং মৃত্যু, সুখ এবং দুঃখের চিরদিনের সাথী হয়েই তোমাদের সাথে অবস্থান করবো। তোমাদের রক্তকে আমি আমার নিজের রক্ত বলে মনে করবো। আমি চিরকালের জন্য তোমাদের আর তোমরা আমার। তোমরা যার সাথে যুদ্ধ করবে আমিও তাদের সাথে যুদ্ধ করবো এবং তোমরা যার সাথে আপোষ করবে আমিও তার সাথে আপোষ করবো। যারা তোমাদের শত্রু তারা আমারও শত্রু, আর যারা আমার শত্রু তারা তোমাদেরও শত্রু'।
এরপর নবী নবী করীম (সা:) সমবেত লোকদের বললেন, 'তোমরা তোমাদের মধ্য থেকে ১২ জন লোককে প্রতিনিধি করে আমার কাছে প্রেরণ করো। তাঁরা তাদের লোকদের কাছ থেকে আমার পক্ষ থেকে ওয়াদা গ্রহণ করবে'। এরপর তিনি আমাদের প্রতি আদেশ দিলেন, আমরা যেন নিজেদের অবস্থানে চলে যাই। আমাদের মধ্যে থেকে আব্বাস ইবনে উবাদা বললো, 'হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনি আমাদেরকে আদেশ করলে আমরা ইসলামের শত্রুদের ওপরে আক্রমণ করতে পারি'।
নবী করীম (সা:) তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমাকে এ ধরনের কাজের জন্য প্রেরণ করা হয়নি। তোমরা নিজেদের অবস্থানে চলে যাও'।
নবী করীম (সা:) এর কাছে মদীনার লোকজন যখন বাইয়াত গ্রহণ করছিল, তখন তাদের মধ্য থেকে হযরত সা'দ (রা:) উঠে দাঁড়িয়ে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করেছিলেন, 'তোমরা কি জানো তোমরা কোন্ কথার ওপর বাইয়াত করছো? নবীর কাছে বাইয়াত করার অর্থ হলো সমগ্র পৃথিবীর মানুষ এবং জ্বীনকে নিজের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা। গোটা দুনিয়াকে নিজের শত্রুতে পরিণত করা'।
সমবেত লোকগুলো সমস্বরে বলে উঠেছিল, 'আমরা জেনে বুঝেই বাইয়াত করছি। এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো শক্তিকে আমরা ভয় করি না। আমরা তরবারীর ছায়ায় লালিত পালিত'।
যে ১২ জনকে নবী করীম (সা:) আহ্বায়ক নিযুক্ত করেছিলেন, তাঁরা সবাই ছিল বিভিন্ন গোত্রের গোত্রপতি। নিজের সমাজে সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তাদের মতো ব্যক্তিত্ব ইসলামের সহযোগী হওয়ার অর্থই ছিল গোত্রের সকল জনশক্তি ইসলামের পক্ষাবলম্বন করা। পৃথিবীতে মহাসত্য প্রাথমিক অবস্থায় নিঃসঙ্গ থাকে এ কথা সত্য, কিন্তু এ নিঃসঙ্গতার অবসান ঘটতে খুব একটা সময়ের প্রয়োজনও হয় না। একটি আদর্শের ক্ষেত্রে দশ বিশ বছর তেমন একটা সময় না। এই পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, একটি আন্দোলন বিজয়ী হতে কয়েক যুগ সময়ের প্রয়োজন হয়েছে। আন্দোলনের নেতা-কর্মীগণ চরম প্রতিকুল অবস্থা পাড়ি দিয়ে ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মুকাবিলা করে তারপর সাফল্যের সিংহদ্বারে উপনীত হয়েছেন।
ইসলামী আদর্শকে বিজয়ী আদর্শ হিসাবে দেখতে হলে দু'টো শর্ত পূরণের প্রয়োজন হয়। প্রথম শর্ত হলো, ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে গঠিত একদল নিষ্ঠাবান সুশৃংখল কর্মী বাহিনী প্রয়োজন। যারা আদর্শের জন্য যে কোনো ত্যাগ হাসি মুখে স্বীকার করতে পারে। যে কোনো ধরনের নির্যাতন থেকে শুরু করে অর্থ-সম্পদের শেষ তলানিটুকুও নিঃশেষে বিলিয়ে দিয়ে প্রাণদানও করতে পারে। যে কর্মী বাহিনী প্রশ্নাতীতভাবে নেতৃ আদেশ বাস্তবায়ন করতে পারে।
দ্বিতীয় যে শর্ত পূরণ করা প্রয়োজন তাহলো, আদর্শের পক্ষে বিপুল জনসমর্থন থাকতে হবে। কারণ ইসলামী আদর্শ কোনো জাতির ওপরে চাপিয়ে দেয়ার আদর্শ নয় এবং ইসলাম কোনো জাতির ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের ঘাড়ের ওপরে বসতে মোটেও আগ্রহী নয়। এ কারণে জনসমর্থন যোগাড় বা জনমত গঠনের জন্য এ আদর্শের কর্মীদের প্রতিটি মুহূর্তে তৎপর থাকতে হয়। মক্কা এবং মদীনার ইতিহাসে আমরা এ কথার বাস্তব প্রমাণ দেখতে পাই। নবী করীম (সা:) মক্কায় কর্মী গঠন করেছেন। ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়নে যে গুণ এবং মানসম্পন্ন কর্মী প্রয়োজন সে ধরনের কর্মী মক্কাতেই তৈরী হয়েছিল। কিন্তু মক্কায় ইসলামের পক্ষে জনমত গঠিত হয়নি। মদীনায় ইসলামের পক্ষে ক্রমশঃ জনমত গঠন হয়। ফলে যে বিপ্লব হবার কথা মক্কায় তা হয়েছিল মদীনায়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ প্রক্রিয়াতেই ইসলামকে বিজয়ী করে থাকেন এবং এটিই নবী করীম (সা:) এর সীরাত।
📄 চাঁদ নয়, আপনিই বেশী সুন্দর
মদীনায় হিজরতকালে বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে সন্ত্রাসীদের দৃষ্টি এড়িয়ে নবী করীম (সা:) এবং হযরত আবু বকর (রা:) সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। সে পথ ধরেই হযরত যুবাইর (রা:) সিরিয়া থেকে ব্যবসায়িক পণ্যসহ মক্কায় ফিরছিলেন। নবী করীম (সা:) এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটলো। হযরত যুবাইর (রা:) তাঁদেরকে কয়েকটি কাপড় উপহার দিলেন। সেই দুঃসময়ে অসহায় অবস্থায় ঐ সামান্য কাপড় যেন অসামান্য হয়ে দেখা দিয়েছিল। কিছুদূর এগিয়ে যাবার পরে পুনরায় নবী করীম (সা:) বাধার মুখোমুখি হলেন। মক্কার ইসলাম বিরোধিরা বিশ্বনবী (সা:) কে গ্রেফতার করতে পারলে কি পুরস্কার পাওয়া যাবে তা দূর-দূরান্তেও প্রচার করে দিয়েছিল। পুরস্কারের লোভে অনেকেই নবী করীম (সা:) এর সন্ধানে বের হয়েছিল। আসলাম গোত্রের প্রধান বারিদা তাঁর অনুগত ৭০ জন সাহসী যোদ্ধাসহ অবরোধ করেছিলো। নবী করীম (সা:) সে পথেই মদীনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
সামনে একদল অস্ত্রে সজ্জিত লোক দেখে নবী করীম (সা:) মধুর কন্ঠে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াৎ করতে থাকলেন। পবিত্র কুরআনের জান্নাতি সুরের তরঙ্গ সম্মুখে দণ্ডায়মান মানুষগুলোর কানে প্রবেশ করে তাদের ভেতরের জগৎ সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দিল। যেখানে ছিল অন্ধকার সেখানে পবিত্র কুরআনের সুর মুহূর্তে তাওহীদের পবিত্র উজ্জ্বল শিখা জ্বালিয়ে দিল। আসলাম গোত্র প্রধান বারিদা বিনয়ের ভঙ্গিতে রাসূল (সা:) এর দিকে এগিয়ে এলেন।
নবীর পবিত্র মুখমণ্ডলের প্রতি কিছুক্ষণ নির্নিমেষে তাকিয়ে রইলেন। এই মানুষটি সম্পর্কে মক্কার আবু জাহিল আর তার দলবল যে মিথ্যে অপবাদ প্রচার করেছে তা যেন গোত্র প্রধান বিশ্বনবী (সা:) এর পবিত্র চেহারায় অনুসন্ধান করতে লাগলেন। দীর্ঘক্ষণ তিনি দেখলেন। পবিত্র চেহারা দেখে তাঁর যেন সাধ আর মিটে না। মানুষটির মুখে সামান্যতম কলংকের আঁচড় নেই। তাহলে আবু জাহিলরা যা প্রচার করেছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা! আকাশের চাঁদেও সামান্য কালো দাগ আছে, কিন্তু আল্লাহর নবীর চেহারায় তা-ও নেই।
বারিদা নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলেন না। দীন ভিখারীর মতই বিশ্বনবীর কাছে আত্মসমর্পণ করে জানালেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমাদের ক্ষমা করুন! অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে আমরা আপনার বিরুদ্ধে এখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমাদের আপনি মুসলমানদের দলে স্থান করে দিন'।
একথা বলেই আসলাম গোত্র প্রধান বারিদা কালিমা পাঠ করে মুসলমান হয়ে গেলেন। তাঁর কন্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে তাঁর সকল সাথী বজ্রকণ্ঠে কালেমা পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করলেন।
মহান আল্লাহর কি অদ্ভুত ব্যবস্থা! কোথায় নবী করীম (সা:) একাকী ছিলেন। মানুষের পক্ষ থেকে তাঁর কোনো নিরাপত্তার সামান্য ব্যবস্থা ছিল না। আর এখন তাঁর নিরাপত্তায় ৭০ জন বীর যোদ্ধা অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাঁকে প্রহরা দিচ্ছে। বারিদা (রা:) এর সাথের যোদ্ধারা তাদের শিরস্ত্রাণ বর্শার অগ্রভাগে বেঁধে পতাকা বানিয়ে নিয়ে সে পতাকা উড়িয়ে সামনে অগ্রসর হলো। এক বিশাল মিছিল মহাসত্যের বিজয় কেতন উড়িয়ে আল্লাহর নবীকে পরিবেষ্টন করে মদীনা অভিমুখে এগিয়ে চললো।
ইসলামপন্থীদের প্রাণপ্রিয় শ্লোগান 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনীতে দিগদিগন্ত মুখরিত হয়ে উঠলো। মহাত্রাসে বাতিল শক্তি থরথর করে কেঁপে উঠলো। ইসলাম বিদ্বেষী বন্ধুরা দেখুন, ইসলাম তরবারীর শক্তিতে নয়, কোন্ শক্তির কারণে ইসলাম পৃথিবী ব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা অনুধাবন করে অনুগ্রহ পূর্বক সত্য উপলব্ধি করে উদারতার পরিচয় দিন।
৭০ জন রক্ত পিপাসু ভয়ংকর সন্ত্রাসী কিভাবে কোন্ মায়াবলে মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবে পরিণত হলো! যারা নবী করীম (সা:) কে হত্যা করে ১০০ উট পুরস্কার গ্রহণ করবে, তাঁরাই তাঁর সামনে এসে নিজেদের ঘৃণ্য সন্ত্রাসী প্রবৃত্তিকে হত্যা করে এমন এক জীবন গ্রহণ করলো, পৃথিবী ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে শতকোটি মানুষ পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
৭০ টি ঘোড়ার পিঠে ৭০ জন বীর যোদ্ধা, তাদের হাতের সুতীক্ষ্ম তরবারী সূর্য কিরণে ঝলসে উঠে ইসলামের বিজয় ঘোষণা করলো। বারিদা (রা:) সামনে অগ্রসর হচ্ছেন আর কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। তাঁর সে কবিতার অর্থ হলো, 'শান্তির সম্রাটের আগমন ঘটেছে। মুক্তিদাতা আগমন করছেন। যিনি সন্ধি স্থাপন করবেন তিনি আগমন করছেন। যিনি সত্য এবং ন্যায় স্থাপন করে পৃথিবীতে জান্নাতের শান্তি প্রতিষ্ঠিত করবেন তিনি আগমন করছেন। পৃথিবীবাসীর কাছে আজকের এটাই শুভ সংবাদ'। (ইবনে জওযী, আল ইসাবা, মাদারেজ)
বিশ্বনবী (সা:) মদীনা যাওয়ার সহজ পথ পরিহার করে গোপন পথে যাত্রা করেছিলেন। সে পথ ছিল বড় বন্ধুর। পথ প্রদর্শক তাদেরকে নিয়ে মক্কার নিম্ন অঞ্চল দিয়ে প্রথমে উপকূল এলাকায় গিয়েছিল। সেখান থেকে উসফান এলাকার নিম্ন অঞ্চল দিয়ে আমাজের নিম্ন এলাকা হয়ে কুসাইদ এলাকা অতিক্রম করে খাররার নামক স্থানে এসে থেমে ছিল। তারপর লেকফ এবং মাদলাজ লেকফ এলাকা অতিক্রম করে মাদলাজ মাহাম নামক স্থানে উপনীত হয়েছিল।
এরপর মারজাহ মাহাজ নামক স্থান, সেখান থেকে মারজাহ যিল গাদাওয়াইন নামক স্থান, সেখান থেকে বাতন যি, কাশর এবং জাদাজিদ, আজরাদ এসে থেমেছিল। তারপর মাদলাজা তিহিন এবং আবাবিদ আল ফাজ্জাহ অতিক্রম করেছিল। এরপর তাঁরা আরজ নামক স্থানে এসে উপনীত হয়েছিলেন।
এই স্থানের অধিবাসীরা নবী করীম (সা:) কে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য পূর্ব হতেই প্রতীক্ষার প্রহর গুনছিল। এখানে আসলাম গোত্রের হযরত আওস ইবনে হাজার (রা:) তাঁর নিজের উটে আরোহন করিয়ে এবং তাঁর এক গোলামকে নবী (সা:) এর সাথে দিয়ে মদীনা যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এরপর তাঁরা রুকুবার দক্ষিণ পাশ অতিক্রম করে সানিয়াতুল আয়ের পথ দিয়ে বাতনু রিম নামক স্থানে এসে উপনীত হয়েছিল। এখান থেকেই বিশ্বনবী (সা:) মদীনার কুবা এলাকায় বনী আমর ইবনে আউফ গোত্রে এসে পৌঁছেছিলেন। সেদিন তারিখ ছিল রবিউল আওয়াল মাসের ১২ তারিখ এবং সময় ছিল প্রখর রোদে ঝলসানো দুপুর। (ইবনে হিশাম এবং ইবনে ইসহাক)
📄 মদীনার নীলিমায় মক্কার সূর্য
মহাকাশের সূর্যের সাথে বাসযোগ্য ক্ষুদ্রগ্রহ এ পৃথিবীর বন্ধন রজ্জু অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না। কিন্তু ধরা না পড়লেও সূর্য তাপেই পৃথিবী ফলে ফুলে সুশোভিত হয়। যে স্থান থেকে সূর্য উদিত হয় সে স্থান মেঘমালা আচ্ছাদিত থাকলেও সূর্যের উদয় পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। আপন গতি পথেই সূর্য এগিয়ে যেতে থাকে। পূর্বাকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে পশ্চিমাকাশে সূর্য আপন প্রভা বিকিরণ করে। মদীনার সাথে বুঝি নবী করীম (সা:) এর নাড়ির সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। তিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করে মক্কায় অবস্থান করেন কিন্তু তাঁর সে সম্পর্ক কারো দৃষ্টিতে ধরা না পড়লেও তাঁরই প্রভাবে মদীনার আনসাররা আলোকিত হয়ে উঠেছিল। মক্কা থেকে তিনি মহাসত্যের যে তাপ বিকিরণ করতেন, সে তাপে মদীনা ফলে ফুলে সুশোভিত হয়েছিল।
মক্কার আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন, মহাসত্যের সূর্য উদিত হলো কিন্তু সে সূর্য ঘন নিকষ কালো মেঘের কারণে মক্কার আকাশে স্বাধীনভাবে তাঁর তাপ বিকিরণ করতে সক্ষম হলো না। দুর্ভাগ্য মক্কাবাসীর। তারপর কালক্রমে মক্কার সে সূর্য মদীনার আকাশে এসে উদিত হয়েছিল। মদীনার মেঘমুক্ত আকাশে মহাসত্যের সে সূর্য স্বাধীনভাবে তাপ বিকিরণ করেছিল। সময়ের ব্যবধানে সে তাপ সমগ্র পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল।
আজ নবী করীম (সা:) শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, তিনি আর কোনোদিন এ পৃথিবীতে মানুষের সামনে শারীরিকভাবে মানুষের জাগ্রত অবস্থায় সবার সামনে আসবেন না। কিন্তু তিনি যে তাপ বিকিরণ করেছেন, তাঁর অবর্তমানে তাঁরই অনুসারীগণ শত সহস্রগুণ শক্তিশালী করে পৃথিবীময় বিকিরণ করেছিল। ইতিহাসের ধারা পরিক্রমায় সে তাপ ছড়িয়ে পড়ার গতি কিছুটা হ্রাস পেলেও মহাসত্যের তাপের গতি যে পুনরায় বৃদ্ধি লাভ করবে তার সকল নিদর্শন পৃথিবীব্যাপী সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সে শুভ মুহূর্ত আগত প্রায় যখন হেরার রাজ তোরণ পুনরায় বিশ্বব্যাপী প্রজ্জ্বলিত হবে। সাম্প্রতিককালে মধ্যপ্রাচ্যে ও আফ্রিকার অন্তর্ভুক্ত লিবিয়ার ঘটনাবলী এ কথারই স্বাক্ষর বহন করছে।
হিজরতকালে দীর্ঘ চৌদ্দদিন কুবায় অবস্থান করে একটি মসজিদ নির্মাণের পরে বিশ্বনবী (সা:) মদীনা শহরের দিকে যাত্রা শুরু করলেন। তিনি যে পথ দিয়ে শহরের দিকে যাচ্ছেন সে পথের দু'ধারে উৎসুক জনতা আল্লাহর নবীর পবিত্র চেহারা মুবারক একটি বার দেখার জন্য গভীর আগ্রহে দাঁড়িয়েছিল। তাঁকে দেখার সাথে সাথে জনতা আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলছিল। নবী করীম (সা:) উটের পিঠে, ধীর মন্থর পায়ে উট এগিয়ে যাচ্ছে মদীনার দিকে, রাসূলের শেষ বিশ্রামস্থলের দিকে।
সেদিন ছিল পবিত্র জুমুয়াবার। পথে জুমা নামাজের সময় হলে নবী করীম (সা:) বনী সালেম গোত্রে জুমা নামাজ আদায় করলেন তাঁর অনুসারী মুসলমানদের জীবনে এটাই ছিল প্রথম জুমা নামাজ। এখানেই তিনি জুমার প্রথম খুত্বাদান করেছিলেন। এই মসজিদের নাম হয়েছে বাতনুল ওয়াদির মসজিদ বা ওয়াদিয়ে রানুনার মসজিদ। নবী করীম (সা:) এর প্রথম জুমা নামাজ আদায়ের স্মৃতি বিজড়িত মসজিদ।
বনী সালেম গোত্রের আবাল বৃদ্ধ বনিতাদের হৃদয়ের স্বপ্ন, যদি আল্লাহর রাসূল তাদের মাঝে থাকতেন! তাঁরা দলবদ্ধভাবে এসে নবীর সামনে নিবেদন করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমাদের যা কিছু আছে সবই আপনার পবিত্র কদমে উৎসর্গিত। আপনি যদি সন্তুষ্ট হয়ে আমাদের মধ্যে চিরদিনের জন্য থাকতেন'!
দুর্ভাগ্য তৎকালীন মক্কাবাসীর, কি অমূল্য রত্ন তারা হারালো বুঝতে পারলো না। যখন বুঝলো তখন সে রত্ন হাতছাড়া হয়ে গেছে। তখন সে অমূল্য সম্পদের অধিকারী মদীনাবাসী। আল্লাহর রাসূলের মুখে মধুর হাসি। তিনি বললেন, 'আমার উটকে তোমরা যেতে দাও, মহান আল্লাহ এই উটকে নির্দেশ দান করেছেন কোথায় আমাকে নিয়ে যেতে হবে'।
মহান আল্লাহ তা'য়ালাই এই ব্যবস্থা করেছিলেন। এই ব্যবস্থা অবলম্বন না করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও রাসূল (সা:) কে নিজেদের অধিকারে রাখার জন্যে গোত্রে গোত্রে দাঙ্গা সৃষ্টি হতো। উট এগিয়ে যাচ্ছে, পথে যে গোত্রই পড়ছে সেই গোত্রই ঐ একই আবেদন পেশ করছে। নবী করীম (সা:) মুখে চাঁদের হাসি ফুটিয়ে সবাইকে একই কথা বলছেন। অবশেষে উট তাঁকে বহন করে মদীনা শহরে পৌঁছলো।
পূর্বেই শহরে সংবাদ এসেছিল, ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মাদ (সা:) আজ এই শহরে তাঁর পবিত্র কদম রাখবেন। মদীনার আনাচে কানাচে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছিল। কুবা থেকে মদীনা শহর পর্যন্ত কোনো একটি স্থান শূন্য ছিল না। পথের দু'পাশে ছিল মানব বন্ধন আর অগণিত জনতার ভীড়। মানুষ উঁচু স্থানে আরোহন করে প্রতিযোগিতা করছিল, কে আগে আল্লাহর নবীকে দেখে নিজের তৃষ্ণার্ত নয়ন সার্থক করবে।
মদীনার অবরোধপুরবাসিনী নারী গোষ্ঠী, শিশু, বালক-বালিকারা গৃহের ছাদে উঠে মধুর কণ্ঠে তালে তালে তাদের স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করছিল। এ সকল কবিতা ছিল রাসূলের প্রশংসায় নিবেদিত। কিয়ামত পর্যন্ত মানুষ সে কবিতা আবৃত্তি করতে থাকবে। তাঁরা মধুর কন্ঠে আবৃত্তি করছিল-
طَلَعَ الْبَدْرُ عَلَيْنَا - مَنْ ثَنِيَاتِ الْوَدَاعِ - وَجَبَ الشَّكْرُ عَلَيْنَا - مَادَ عَى لِلَّهِ دَاعٍ -
'চন্দ্র হয়েছে উদয় বিদা পর্বতের ঘাঁটি হতে, মোদের প্রতি আল্লাহর প্রশংসা করা বাধ্যতামূলক, যে পর্যন্ত প্রার্থনাকারী প্রার্থনা করবে'।
মদীনার বালিকাগণ বিশেষ এক প্রকার বাদ্যযন্ত্র যাকে বলা হয় 'দক্', এই দফ বাজিয়ে কোরাশ কণ্ঠে কবিতা আবৃত্তি করছিল-
نَحْنُ جَوَارِ مِنْ بَنِي النَّجَّارِ - يَا حُبَنَا مُحَمَّدًا مِنْ جَارِ -
'নাজ্জার বংশের বালিকা আমরা, মুহাম্মাদ (সা:) আমাদের সর্বোত্তম প্রতিবেশী'।
আল্লাহর নবী (সা:) পরম মমতাভরা দৃষ্টিতে শিশু মেয়েদের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। মধুর কণ্ঠে তাদেরকে বললেন, 'আমাকে কি তোমরা চাও?'
শিশু মেয়েরা আত্মহারা হয়ে উঠলো। তাঁরা সমবেত কণ্ঠে খুশীর আবেগ প্রকাশ করলো, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:) আপনাকে আমরা চাই'।
বিশ্বনবী (সা:) তাদের প্রতি স্নেহ প্রকাশ করে বললেন, 'আমিও তোমাদেরকে চাই'।
উট এগিয়ে গেল, সামনে পড়লো বিশ্বনবী (সা:) এর মামাদের পরিবার বনী আদী নাজ্জারের গোত্র। এই গোত্রেরই মেয়ে ছিলেন নবী করীম (সা:) এর দাদার মাতা সালামা বিনতে আমর। এই গোত্রের লোকজন নবীর উটের সামনে দাঁড়িয়ে করুণ কন্ঠে আবেদন পেশ করলো, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমাদের সবকিছুই আপনার, আপনি আমাদের সাথে অবস্থান করুন!'
নবী করীম (সা:) তাদেরকেও বললেন, 'উটের প্রতিই আল্লাহ তা'য়ালা আদেশ করেছেন, সে আমাকে যথাস্থানে নিয়ে যাবে। তোমরা উটকে পথ করে দাও'।
উট এবার এগিয়ে গিয়ে বনী মালিক ইবনে নাজ্জারের বাসস্থানের সামনে এসে আস্তে আস্তে হাঁটু ভাঁজ করে বসলো। মসজিদে নববীর প্রবেশ দ্বার এখানেই বানানো হয়েছিল। সে সময় ঐ স্থানটি ছিল বনী নাজ্জার গোত্রের সাহল ও সুহাইল নামক দু'জন ইয়াতিম শিশুর। তাদেরকে লালন পালন করতো হযরত মায়াজ ইবনে আকরা। এ স্থানে বাচ্চা দু'টো তাদের খেজুর শুকাতো।
উট বসে পড়লেও নবী করীম (সা:) উট থেকে অবতরণ করলেন না। কিছুক্ষণ পরে উট উঠে কিছুদূর এগিয়ে গেল। তারপর উট সেখান থেকে পেছনের দিকে তাকালো যেখানে সে প্রথম বসেছিল। তারপর পুনরায় সে পূর্বের স্থানে ফিরে এসে বসে পড়লো। এবার সে একটু শব্দ করে তার গলা এবং বুক মাটির সাথে স্পর্শ করলো। আল্লাহর রাসূল (সা:) অনুভব করলেন, মহান আল্লাহ উটকে এই স্থানেই থেমে যেতে আদেশ করেছেন।
সামনেই ছিল হযরত আবু আইউব আনসারী (রা:) এর বাড়ি। তাঁর প্রকৃত নাম আবু আইউব খালিদ ইবনে যায়িদ আনসারী (রা:)। তিনি দ্রুত এগিয়ে এসে নবী করীম (সা:) এর সামান্য আসবাব-পত্র নামিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। মহাসৌভাগ্যবান ব্যক্তি তিনিই হলেন যার ঘরে মেহমান হলেন সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা:)।
আরেক বর্ণনায় এসেছে, বর্তমানে যেখানে মাসজিদে নববী অবস্থিত সেখানেই ছিল হযরত আবু আইউব (রা:) এর ঘর। এখানে উট এসে পৌঁছলে রাসূল (সা:) কার মেহমান হবেন তা নিয়ে বেশ বিতর্কের সৃষ্টি হলো। শেষ পর্যন্ত সমাধান করা হলো এভাবে যে, উট যার ঘরের সামনে থামবে রাসূল (সা:) তাঁরই মেহমান হবেন। উট এসে থেমেছিল হযরত আবু আইউব (রা:) এর ঘরের সামনে।
পক্ষান্তরে মুসলিম শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মদীনার আনসারদের মধ্যে রাসূলের মেহমানদারী করা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে নবী করীম (সা:) স্বয়ং বলেছিলেন, 'আমি বনী নাজ্জার গোত্রে থামবো। কারণ তাঁরা আমার দাদার মামা'।
সুতরাং নবী করীম (সা:) তাঁর দাদার আত্মীয়তার কারণে হযরত আবু আইউব (রা:) এর মেহমান হয়েছিলেন। ইমাম বুখারী তাঁর তারিখে ছগীরে লিখেছেন, নবী করীম (সা:) তাঁর দাদার আত্মীয়তার কারণে হযরত আবু আইউব (রা:) এর মেহমান হয়েছিলেন।
এই বাড়িতে বিশ্বনবী (সা:) প্রায় সাত মাস অতিবাহিত করেন। তাঁরপর মাসজিদে নববী এবং উম্মাহাতুল মুমেনিনের জন্য বাসগৃহ নির্মাণ করা হলে তিনি সেখান থেকে মাসজিদে নববীর পাশে চলে আসেন।
হযরত আবু আইউব (রা:) এর বাড়িটা ছিল দোতলা। সে সময় একতলা আর দোতলার মধ্যবর্তী অংশ বর্তমানের দোতলা বাড়ির মত ছিল না। হয়তঃ কাঠ দিয়ে মাঝের অংশ প্রস্তুত করে তার ওপরে মাটির প্রলেপ দেয়া হত। এ কারণে ওপরের অংশে পানি পড়লে সে পানি গড়িয়ে নিচের তলায় পৌঁছতো। হযরত আবু আইউব (রা:) বিশ্বনবী (সা:) এর মর্যাদার দিক লক্ষ্য করে তাঁর কাছে আবেদন করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমার মাতা-পিতা আপনার কদম মুবারকে উৎসর্গিত হোক, আপনি ওপরের তলায় অবস্থান করুন!'
নবী করীম (সা:) তাঁকে বললেন, 'আমার সাথে লোকজন দেখা সাক্ষাৎ করতে আসবে, দোতলায় থাকলে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করা অসুবিধা হবে। আমি নিচের তলাতেই অবস্থান করি'।
এভাবে তিনি সে বাড়ির নিচের তলাতেই অবস্থান করতে থাকলেন। হযরত আবু আইউব (রা:) তাঁর নিজের অনুভূতির কথা এভাবে বলেন যে, 'আমরা তাঁর জন্য খাবার প্রস্তুত করে সবটুকু খাবারই তাঁর কাছে প্রেরণ করতাম। আল্লাহর রাসূল আহার করে অবশিষ্টাংশ ফেরৎ পাঠাতেন। আমরা লক্ষ্য করতাম খাদ্য পাত্রের কোনো কোনো স্থানে রাসূলের পবিত্র আঙ্গুলের চিহ্ন পাওয়া যায়। যেসব স্থানে চিহ্ন দেখতাম সে স্থান থেকেই আমরা আহার করতাম। আমরা অধিক বরকতের আশায় এমন করতাম। একদিন আমরা খাবার প্রস্তুত করার সময় একটু রসুন বা পিঁয়াজ দিয়েছিলাম। সে খাবার রাসূলের কাছ থেকে যখন ফেরৎ এলো তখন দেখলাম, রাসূলের পবিত্র আঙ্গুলের চিহ্ন নেই খাদ্য পাত্রে। আমরা অনুভব করলাম তিনি খাদ্য আহার করেননি। আমরা অস্থির হয়ে পড়লাম। জানি না আমাদের দ্বারা এমন কী ভুল হয়ে গেল যে, তিনি আহার করলেন না?
আমি দ্রুত তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে আবেদন করলাম, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আপনার জন্য আমাদের মাতা-পিতা কুরবান হোক! আপনি খাদ্য ফেরৎ পাঠিয়েছেন অথচ আপনার হাতের চিহ্ন নেই। আমরা বরকতের আশায় আপনার হাতের চিহ্ন দেখে সেখান থেকে আহার করতাম। হে আল্লাহর রাসূল! আমরা বুঝতে পারছি না আমাদের কি অপরাধ!'
নবী করীম (সা:) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে পরম স্নেহের স্বরে বললেন, 'অন্য কোনো কারণ নয়, আমি আজ খাবারের মধ্যে একটি গাছের গন্ধ পেয়েছি। তা আহার করলে মুখে গন্ধ হয়। অনেকের সাথে আমাকে কথা বলতে হয়, মুখ থেকে গন্ধ বের হবে। এ কারণে আমি আহার করিনি। তোমরা আহার করতে পারো'।
হযরত আবু আইউব (রা:) জবাবে বলেছিলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল (সাঃ)! আপনি যা পছন্দ করেন না, আমরাও তা পছন্দ করবো না'। (উসুদুল গাবা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৮১, মুসলিম শরীফ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-১৯৮, সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৪৯৯)
নবী করীম (সা:) জিবরাঈল (আ:) সহ অন্যান্য ফেরেশতাদের সাথে ক্ষেত্র বিশেষে মহান আল্লাহ তা'য়ালার সাথে কথা বলতেন। এ কারণে তিনি কোনো গন্ধযুক্ত খাবার পছন্দ করতেন না। এই ঘটনার পর থেকে তাঁর কাছে কোনো ধরনের গন্ধযুক্ত খাদ্য প্রেরণ করা হতো না। কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই ঘটনার পর থেকে হযরত আবু আইউব (রা:) ও তাঁর পরিবার পরিজন রসুন বা পিঁয়াজ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
হযরত আবু আইউব আনসারী (রা:) বলেন, 'তখন আমরা বাধ্য হয়েই ওপর তলায় অবস্থান করি। একদিন রাতে হঠাৎ করেই পানির পাত্রটা ভেঙ্গে গেল। নিচের তলায় রাসূল (সা:) অবস্থান করছেন। পানি এখন গড়িয়ে নিচের তলায় চলে যাবে। আমরা বিচলিত হয়ে পড়লাম। অবশেষে আমাদের শোবার মত যে কম্বলটা ছিল তা পানির ওপর বিছিয়ে দিয়ে সে পানি শোষণ করালাম। তারপর আমরা ঘরের এক কোণে সমগ্র রাত ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে অতিবাহিত করলাম। সকালে নবী করীম (সা:) এর সামনে উপস্থিত হয়ে আমরা আমাদের অনুভুতির কথা ব্যক্ত করে তাঁকে অনুরোধ করলাম তিনি যেন ওপর তলায় চলে যান। আমাদের অনুরোধে তিনি আমাদের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে ওপরে চলে গেলেন'। (উসুদুল গাবা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৮১, হায়াতুস সাহাবা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৩২৮-৩২৯, সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৪৯৮)
বিশ্বনবী (সা:) ইসলামের প্রথম শিক্ষক, মুবাল্লিগ, প্রথম দূত হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা:) এর সাথে হযরত আবু আইউব (রা:) এর ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক স্থাপন করে দেন। ইতিহাসে বর্ণনা করা হয়েছে, তাদের উভয়ের চরিত্রে অপূর্ব সাদৃশ্য ছিল। উভয়ের মধ্যেই প্রাণ প্রাচুর্য এবং উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল অদ্ভুত ধরনের। (তাবাকাতে ইবনে সাআদ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-৪৮৪)
বিশ্বনবী (সা:) মদীনায় আগমন করেই হযরত যায়েদ (রা:) কে দু'টো উট এবং পাঁচশত দেরহাম দিয়ে মক্কায় প্রেরণ করলেন পরিবারের সদস্যদের মদীনায় নিয়ে আসার জন্য। হযরত আবু বকর (রা:)ও পত্র প্রেরণ করেছিলেন তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মদীনায় চলে আসার জন্য। তাঁর সন্তান হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবু বকর (রা:) পরিবারের সকল সদস্যদের নিয়ে হযরত যায়েদ (রা:) এর সাথেই অর্থাৎ নবী পরিবারের সদস্য এবং হযরত আবু বকর (রা:) এর পরিবারের সদস্যগণ একত্রেই মদীনায় আগমন করেন। পক্ষান্তরে নবী করীম (সা:) এর এক কন্যা সে সময় আসতে পারেননি। তিনি তাঁর স্বামী হযরত উসমান (রা:) এর সাথে সে সময় হাবশায় অবস্থান করছিলেন।
নবী করীম (সা:) কে ঘীরে মদীনার বালক-বালিকাগণ যে কবিতা আবৃত্তি করছিলো, তার মধ্যে 'বদর' শব্দ উল্লেখ রয়েছে। পূর্ণীমার পূর্ণ শশীকে আরবী ভাষায় 'বদর' বলা হয়। সাধারণত চন্দ্রকে আরবী ভাষায় 'ক্বামার' বলা হয়। মদীনায় হিজরতকালে নবী করীম (সা:) কে শুধু চাঁদের সাথে তুলনা না করে তাঁরা পূর্ণীমার পূর্ণ চন্দ্রের সাথে তুলনা করে আবৃত্তি করছিলো, 'আজ আমাদের ওপর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক হয়েছে'। মদীনায় হিজরতকালে নবী করীম (সা:) কে দেখে মদীনার শিশু-কিশোররা যে কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলো তা কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীব্যাপী প্রতিদিন কোথাও না কোথাও আবৃত্তি হতে থাকবে, এটি কখনো পুরনো হবে না।
পূর্ণীমা ব্যতীত চাঁদকে কখনোই পূর্ণ অবয়বে দেখা যায় না, পূর্ণীমার তিথীতেই চাঁদকে পৃথিবীর মানুষ পূর্ণ অবয়বে দেখে থাকে। এ সময় চন্দ্রের কিরণচ্ছটা পূর্ণরূপে বিকশিত হয়। মক্কার একশ্রেণীর মানুষ সে সময় নবী করীম (সা:) এর মর্যাদা উপলব্ধি করতে না পারলেও মদীনার ঐ মানুষগুলো ঠিকই উপলব্ধি করেছিলো, এই মহামানবের অনুসরণের মধ্যেই রয়েছে শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন, গৃহযুদ্ধ ও সকল প্রকার লাঞ্ছনা, অবহেলা, অমর্যাদা এবং অপমান থেকে মুক্তি। কেবলমাত্র তাঁর অনুসরণই মর্যাদার সুউচ্চ স্থানে আরোহণের সোপান। ইতিহাস কথা বলে, নবী করীম (সা:) কে ঘীরে তাঁদের উপলব্ধি, তাঁদের মায়া- মমতা, প্রেম-ভালোবাসা, ত্যাগ-তিতীক্ষা, উৎসর্গ কল্পনার কোনো বিষয় ছিলো না, পৃথিবীর ইতিহাসে সকল মানব গোষ্ঠীর মধ্যে মদীনার আনসারগণ যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে অতুলনীয় সম্মান অর্জন করেছে, সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসে এর একটি দৃষ্টান্তও নেই।
মদীনার হিজরতপূর্ব ইতিহাস যাঁরা জানেন, তাঁরা অবশ্যই অবগত রয়েছেন যে, গৃহযুদ্ধ আর ইয়াহুদীদের নির্যাতন মদীনার অধিবাসীদের প্রায় নিঃশেষ করে এনেছিলো। নবী করীম (সা:) এর আগমন তাঁদের নিঃশেষিত ক্ষয়িষ্ণু অস্তিত্বে প্রাণের সঞ্চার করেছিলো ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে চিরতরে মুছে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছিলো। আর এ জন্যেই বোধহয় তাঁরা সেদিন নবী করীম (সা:) কে পূর্ণীমার পূর্ণ শশীর সাথে তুলনা করে কবিতা আবৃত্তি করেছিলো।
মহান আল্লাহ তা'য়ালা মদীনার আনসারদের ওপর রহম করুন, তাঁরা শুধুমাত্র নবীপ্রেম ও আদর্শের কারণে যে ত্যাগ স্বীকার করেছে এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কোনো একটি জাতির মধ্যে নেই। মক্কা থেকে যেসব অসহায় মুসলমান শূন্য হাতে তাদের কাছে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল, তাঁরা এসব অসহায় মানুষদের জন্য নিজেদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে দিয়েছে। যে জাতি নিজের অধিকার ব্যতীত অন্যের অধিকারের ব্যাপারে এক মুহূর্তের জন্য মাথা ঘামাতে প্রস্তুত ছিল না, সেই জাতি ইসলামের সংস্পর্শে এসে নিজে অনাহারে থেকে অপরিচিত ব্যক্তিকে খাদ্য দিয়েছে। অন্যের সুবিধার জন্য নিজের বাড়ি-ঘর ছেড়ে দিয়েছে। নিজের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জন করা অর্থ-সম্পদ আরেকজনকে দিয়ে দিয়েছে। এমনকি নিজের দুইজন স্ত্রী থাকলে একজনকে তালাক দিয়ে তাঁর দ্বীনি ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছে।
ত্যাগের এই মহান দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্য কোনো জাতির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে? ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী অমুসলিম বন্ধুগণ মুসলিম ব্যতীত অন্য কোনো জাতির ইতিহাস থেকে এ ধরনের একটা দৃষ্টান্ত উপস্থিত করতে পারবেন? গর্ভধারিণী মায়ের জন্য রেষ্টুরেন্টে মাত্র একটি ডলার ব্যয় করার মত হৃদয় যাদের নেই, তাদের পক্ষে এমন ধরণের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা কষ্টকরই বৈকি। 'ইসলাম শক্তি প্রয়োগ করে এবং তরবারীর জোরে বিস্তার লাভ করেছে' এ সব কথা যারা বলেন এবং লিখেন, তাঁরা যে লজ্জার শেষ আবরণ, বিবেকের অবগুণ্ঠন ছুড়ে ফেলেই তা বলেন তাতে সন্দেহ নেই। অপরের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়ার মধ্যেই যাদের গৌরব নিহিত ছিল, সেই জাতি কোন্ যাদুর স্পর্শে ত্যাগের অনুপম মহিমায় এমন তুলনাহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, এ সম্পর্কে অমুসলিম বন্ধুদেরকে ক্ষণিকের জন্য হলেও চিন্তা করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।