📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি দরূদ পাঠ করা আল্লাহর নির্দেশ

📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি দরূদ পাঠ করা আল্লাহর নির্দেশ


নবী করীম (সা:) এর প্রতি দরূদ পাঠের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব এতই অধিক যে, দরূদ পাঠ করা ব্যতীত নামাজ হয় না। নামাজ আদায় করতে হবে কেবলমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে, মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর এ মহান নবীকে মর্যাদার সর্বাধিক উচ্চস্তরে উপনীত করেছেন বিধায় নামাজের মধ্যেও তাঁর হাবীবের প্রতি দরূদ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার দরবারে দু'হাত উঠিয়ে দোয়া করার পূর্বেও নবী করীম (সা:) এর প্রতি দরূদ পাঠ করতে হয়। মৃত মানুষের আত্মার মাগফিরাতের জন্যে দোয়া করার পূর্বেও দরূদ পাঠ করতে হয়। এর কারণ হলো, রাসূলের প্রতি দরূদ পাঠ করলে মহান আল্লাহ তা'য়ালা খুবই খুশী হন এবং দরূদ পাঠকারীর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তার দোয়া কবুল করেন।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী করীম (সা:) এর প্রতি দরূদ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন-

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّوْنَ عَلَى النَّبِيِّ ط يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلَّمُوا تَسْلِيمًا -

নি:সন্দেহে আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরূদ পাঠান; (অতএব) হে ঈমানদার ব্যক্তিরা, তোমরাও নবীর প্রতি দরূদ পাঠাতে থাকো এবং (তাঁকে) উত্তম অভিবাদন (পেশ) করো। (সূরা আহযাব-৫৬)

পবিত্র কুরআনের গবেষকগণ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে নবীর প্রতি দরূদের অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর নবীর প্রতি সীমাহীন করুণা বর্ষণকারী। তিনি তাঁর প্রশংসা করেন। তাঁর কাজে বরকত দান করেন। তাঁর নাম বুলন্দ করেন। তাঁর প্রতি নিজের রহমতের বারি বর্ষণ করেন।

ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি দরূদের অর্থ হচ্ছে, তাঁরা তাঁকে সর্বাধিক ভালোবাসেন। তাঁর জন্য আল্লাহ তা'য়ালার কাছে দোয়া করেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন তাঁকে সর্বাধিক উচ্চ মর্যাদা দান করেন। তাঁর শরীয়াতকে প্রসার ও বিস্তৃতি দান করেন এবং তাঁকে মাকামে মাহমুদ তথা সর্বোচ্চ প্রশংসিত স্থানে পৌঁছে দেন।

মহান আল্লাহ তাঁর নবী সম্পর্কে এ কথা বলার কারণ হলো, বিশ্বনবী (সা:) যখন মক্কায় ইসলামী আন্দোলনের সূচনা করলেন তখন ইসলামের শত্রুরা নিজেদের মনের আক্রোশ প্রকাশের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক অপবাদ দিয়ে চলছিল এবং তারা নিজেরা এ কথা মনে করছিল যে, এভাবে কাদা ছিটিয়ে তারা তাঁর নৈতিক প্রভাব নির্মূল করে দেবে। অথচ এ নৈতিক প্রভাবের ফলে ইসলাম ও মুসলমানরা দিনের পর দিন এগিয়ে চলছিল। এ অবস্থায় মহান আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করে এ কথা জানিয়ে দিলেন, 'ইসলামের শত্রুরা আমার নবীর বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়ে তাঁকে অপদস্ত করার যতই প্রচেষ্টা করুক না কেনো, শেষ পর্যন্ত তারাই ব্যর্থ হবে। কারণ আমি আল্লাহ তাঁর প্রতি মেহেরবান এবং সমগ্র বিশ্বজাহানের আইন ও শৃংখলা ব্যবস্থা আমারই নির্দেশে যেসব ফেরেশতার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে তারা সবাই তাঁর সহায়ক ও প্রশংসাকারী। আমি যেখানে তাঁর নাম বুলন্দ করছি। আমার ফেরেশতারা তাঁর প্রশংসাবলীর আলোচনা করছে সেখানে তাঁর নিন্দাবাদ করে তারা কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। আমার রহমত ও বরকত তাঁর সহযোগী এবং আমার ফেরেশতারা দিনরাত দোয়া করছে, হে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন! মুহাম্মাদ (সা:) এর মর্যাদা আরো বেশি উঁচু করে দাও এবং তাঁর আদর্শকে আরো বেশি প্রসারিত ও বিকশিত করো। এ অবস্থায় ইসলাম বিরোধিরা মুহাম্মাদ (সা:) এর কি ক্ষতি করতে পারে'?

ঈমানদারদের প্রতি দরূদ পাঠানোর যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তার অর্থ হলো, 'হে লোকেরা! মুহাম্মাদ (সা:) এর বদৌলতে তোমরা যারা সঠিক পথের সন্ধান লাভ করেছো, তারা তাঁর মর্যাদা অনুধাবন করো এবং তাঁর মহাঅনুগ্রহের হক আদায় করো। তোমরা মূর্খতার অন্ধকারে পথ ভুলে বিপথে চলছিলে, এ মহান ব্যক্তি তোমাদের জ্ঞানের আলোক বর্তিকা দান করেছেন। তোমরা নৈতিক অধঃপতনের মধ্যে ডুবেছিলে, এ ব্যক্তি তোমাদের সেখান থেকে উঠিয়েছেন এবং তোমাদের এমন যোগ্যতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন যার ফলে আজ অন্যরা তোমাদের ঈর্ষা করে। তোমরা বর্বর ও পাশবিক জীবন যাপন করছিলে, এ ব্যক্তি তোমাদের সর্বোত্তম মানবিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাজে সুসজ্জিত করেছেন। তিনি তোমাদের ওপর এসব অনুগ্রহ করেছেন বলেই দুনিয়ার ইসলাম বিরোধিরা এ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আক্রোশে ফেটে পড়েছে। নয়তো দেখো, তিনি কারো সাথে ব্যক্তিগতভাবে কোনো অশোভন আচরণ করেননি। সুতরাং এখন তোমাদের কৃতজ্ঞতার অনিবার্য দাবি হচ্ছে এই যে, তারা এ আপাদ-মস্তক কল্যাণ ব্রতী ব্যক্তিত্বের প্রতি যে পরিমাণ বিদ্বেষ পোষণ করে ঠিক একই পরিমাণ বরং তাঁর চেয়ে বেশি ভালোবাসা তোমরা তাঁর প্রতি পোষণ করো। তারা তাঁকে যে পরিমাণ ঘৃণা করে ঠিক ততটাই বরং তাঁর চেয়ে বেশীই তোমরা তাঁর প্রতি অনুরক্ত হবে। তারা তাঁর যতটা নিন্দা করে ঠিক ততটাই বরং তার চেয়ে বেশী তোমরা তাঁর প্রশংসা করো। তারা তাঁর যতটা অশুভাকাংখী হয় তোমরা ঠিক ততটাই বরং তার চেয়ে বেশি শুভাকাংখী হয়ে যাও এবং তাঁর পক্ষে সেই একই দোয়া করো যা আল্লাহ তা'য়ালার ফেরেশতারা দিনরাত তাঁর জন্য করে যাচ্ছে, 'দুই জাহানের রব্ব! তোমার নবী যেমন আমাদের প্রতি বিপুল অনুগ্রহ করেছেন তেমনি তুমিও তাঁর প্রতি অসীম ও অগণিত রহমত বর্ষণ করো, তাঁর মর্যাদা পৃথিবীতেও সবচেয়ে বেশি উন্নত করো এবং আখেরাতেও তাঁকে সকল নৈকট্যলাভকারীদের তুলনায় অধিক নৈকট্য দান করো'।

উল্লেখিত আয়াতে মুসলমানদেরকে দু'টো বিষয়ের আদেশ দেয়া হয়েছে। একটি হচ্ছে, 'সাল্‌লু আলাইহি' অর্থাৎ তাঁর প্রতি দরূদ পড়ো। অন্যটি হচ্ছে, 'ওয়া সাল্লিমু তাসলিমা' অর্থাৎ তাঁর প্রতি সালাম ও প্রশান্তি দান করো।

'সালাত' শব্দটি যখন 'আলা' অব্যয় সহকারে বলা হয় তখন এর তিনটি অর্থ হয়।

এক. কারো অনুরক্ত হয়ে পড়া, ভালোবাসা সহকারে তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া এবং তার প্রতি ঝুঁকে পড়া।

দুই. কারো প্রশংসা করা।

তিন, কারো পক্ষে দোয়া করা।

'সালাত' শব্দটি যখন আল্লাহ তা'য়ালার জন্য বলা হবে তখন এ কথা সুস্পষ্ট যে, তৃতীয় অর্থটির জন্য এটি বলা হবে না। কারণ আল্লাহ তা'য়ালার অন্য কারো কাছে দোয়া করার ব্যাপারটি একেবারেই অকল্পনীয়। তাই সেখানে অবশ্যই তা হবে শুধুমাত্র প্রথম দু'টো অর্থের জন্য। কিন্তু যখন এ শব্দ বান্দাদের তথা মানুষ ও ফেরেশতাদের জন্য বলা হবে তখন তা তিনটি অর্থেই বলা হবে। তার মধ্যে ভালোবাসার অর্থও থাকবে, প্রশংসার অর্থও থাকবে এবং দোয়া ও রহমতের অর্থও থাকবে। সুতরাং মুমিনদের নবী করীম (সা:) এর পক্ষে 'সাল্লু আলাইহি'-এর আদেশ দেয়ার অর্থ হচ্ছে এই যে, তোমরা তাঁর ভক্ত-অনুরক্ত হয়ে যাও তাঁর প্রশংসা করো এবং তাঁর জন্য দোয়া করো।

'সালাম' শব্দেরও দু'টো অর্থ হয়। এক. সব ধরণের বিপদাপদ ও অভাব অনটন মুক্ত থাকা। এর প্রতিশব্দ হিসেবে আমাদের এখানে সালামতি বা নিরাপত্তা শব্দের ব্যবহার আছে। দুই. শান্তি, সন্ধি ও অবিরোধিতা। সুতরাং নবী করীম (সা:) এর পক্ষে 'সাল্লিমু তাসলিমা' বলার একটি অর্থ হচ্ছে যে, তোমরা তাঁর জন্য পূর্ণ নিরাপত্তার দোয়া করো। আর দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে যে, তোমরা পুরোপুরি মনে প্রাণে তাঁর আন্দোলনের কাজে সহযোগিতা করো, তাঁর বিরোধিতা করা থেকে দূরে থাকো এবং তাঁর আদেশ পালনকারীতে পরিণত হও।

এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরাম নবী করীম (সা:) কে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সালামের পদ্ধতি তো আপনি আমাদেরকে বলে দিয়েছেন, (অর্থাৎ নামাজে 'আস্সালামু আলাইকা ইয়া আইয়্যুহান নীবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ' এবং দেখা সাক্ষাতে আস্সালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ বলা) কিন্তু আপনার প্রতি সালাত পাঠানোর পদ্ধতি কি?

এসব প্রশ্নের উত্তরে নবী করীম (সা:) সাহাবায়ে কেরামকে বিভিন্ন ধরনের দরূদ শিক্ষা দিয়েছিলেন। বর্তমানে দরূদ সম্পর্কে বেশ কিছু বই-পুস্তক বাজারে দেখা যায় এবং এসব বই-পুস্তকে নানা ধরনের দরূদের উল্লেখ রয়েছে। যেমন দরূদে হাজারী, দরূদে লাখী, দরূদে মুস্তফা, দরূদে আকবর, দরূদে শেফা ইত্যাদি নামে বহু ধরনের দরূদ এবং এসব দরূদের ফযিলত উক্ত বই-পুস্তকে লিখা হয়েছে। হাদীস গবেষকগণ উল্লেখিত দরূদের একটি দরূদও হাদীসের সমগ্র কিতাবেও সন্ধান করে পাননি। তাঁরা বলেছেন, এসব দরূদ ও বর্ণিত ফযিলত সকল কিছুই কল্পিত বৈ আর কিছুই নয়। নবী করীম (সা:) সাহাবায়ে কেরামকে যে সকল দরূদ শিখিয়েছেন তা সকলই হাদীসের কিতাবসমূহে মওজুদ রয়েছে এবং আমরা হাদীসের বিভিন্ন কিতাব থেকে কয়েকটি দরূদ এখানে উল্লেখ করছি।

স্বয়ং আল্লাহর নবীর শেখানো দরূদের যে কি মর্যাদা, তা কল্পনাও করা যায় না। সুতরাং এসব দরুদের ফযীলত, কল্যাণকারীতা উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন মনে করি। কারণ এসব দরূদের ফযীলত ও সওয়াব অফুরন্ত। যে কোনো বিপদাপদে এসব দরূদ পাঠ করলে মহান আল্লাহ তা'য়ালা তার ওপরে অসীম রহমত অবতীর্ণ করবেন এবং নবী করীম (সা:) খুশী হবেন। হযরত কা'ব ইবনে উজরাহ্ (রা:) কে নবী করীম (সা:) এই দরূদ শিখিয়েছিলেন-

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيْدٌ - وَبَارِكَ عَلَى مُحَمَّدٍ وَّ عَلَى آلِ مُحَمَّدٌ كَمَا بَارِكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ

আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদান কামা বারিকতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।

এ দরূদটি সামান্য শাব্দিক পার্থক্য সহকারে হযরত কা'ব ইবনে উজরাহ্ (রা:) থেকে বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে ইমাম আহমদ, ইবনে আবী শাইবাহ, আব্দুর রাজ্জাক, ইবনে আবী হাতেম ও ইবনে জারীরে উল্লেখ করা হয়েছে।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) এর বর্ণনা থেকে ইবনে জারীর হযরত আবু হুমাইদ সা'ঈদী (রা:) থেকে বর্ণিত হয়েছে-

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَأَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِه كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَأَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ كَمَا بَارِكْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ

আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আয ওয়া জিহি ওয়া যুর রিয়াতিহি কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আয ওয়া জিহি ওয়া যুর রিয়াতিহি কামা বারাকতা আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। (মুআত্তা, ইমাম মালেক, মুসনাদে আহমাদ, বোখারী, মুসলিম, নাসাঈ, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)

হযরত আবু মাসউদ বদরী (রা:) থেকে এ দরূদ বর্ণিত হয়েছে-

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارِكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ فِي الْعَالَمِينَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ

আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা আলা ইবরাহীমা ফিল আলিমিনা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। (মালেক, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, আহমাদ, ইবনে জারীর, ইবনে হিব্বান ও হাকেম)

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা:) থেকে এ দরূদ বর্ণিত হয়েছে-

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبْدُكَ وَ رَسُولُكَ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارِكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ

আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন আব্দুকা ওয়া রাসূলুকা কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা আলা ইবরাহীম। (আহমাদ, বুখারী, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ)

হযরত বুরাইদাতাল খুযাই (রা:) থেকে এ দরূদ বর্ণিত হয়েছে-

اللَّهُمَّ اجْعَلْ صَلوتُكَ وَرَحْمَتِكَ وَبَرَكَاتِكَ عَلَى مُحَمَّدٍ وَّ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا جَعَلْتَهَا عَلَى إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ

আল্লাহুম্মাজ আল সলাতুকা ওয়া রাহমাতিকা ও বারকাতিকা আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা জাআলতাহা আলা ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। (আহমাদ, আব্দ ইবনে হুমাইদ ও ইবনে মারদুইয়া)

হযরত আবু হুরাইরা (রা:) থেকে এ দরূদ বর্ণিত হয়েছে- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ وَبَرَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ فِي الْعَالَمِينَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ -

আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিওঁ ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা ওয়া বারাকতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ফিল আলিমিনা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। (নাসাঈ)

হযরত তালহা (রা:) থেকে এ দরূদ বর্ণিত হয়েছে- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ وَ بَرِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارِكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ

আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ, ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা আলা ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। (ইবনে জারীর)

উল্লেখিত দরূদগুলোয় শব্দের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সবগুলোর অর্থ একই। এসব দরূদগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এ বিষয়গুলো ভালোভাবে অনুধাবন করতে হবে।

প্রথমত এসব দরূদ নবী করীম (সা:) মুসলমানদেরকে পাঠ করতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, 'আমার ওপরে দরূদ পাঠ করার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হচ্ছে এই যে, তোমরা আল্লাহ তা'য়ালার কাছে এ মর্মে দোয়া করো, হে আল্লাহ তা'য়ালা! তুমি মুহাম্মাদ (সা:) এর ওপর দরূদ পাঠাও'। এক শ্রেণীর স্বল্প জ্ঞানসম্পন্ন লোক এ ব্যাপারে আপত্তি করে বলে যে, 'এটা তো বড় অদ্ভুত ব্যাপার, আল্লাহ তা'য়ালা তো আমাদেরকে বলছেন, তোমরা নবীর ওপরে দরূদ পাঠ করো, কিন্তু অপর দিকে আমরা আল্লাহ তা'য়ালাকে বলছি যে, তুমি দরূদ পাঠাও'।

অথচ রাসূল (সা:) লোকদেরকে এ কথা বলেছেন যে, 'তোমরা আমার প্রতি সালাতের হক আদায় করতে চাইলেও করতে পারো না। তাই আল্লাহ তা'য়ালারই কাছে দোয়া চাও যেন তিনি আমার প্রতি দরূদ পাঠান'। এ কথা বলা নিষ্প্রয়োজন, আমরা নবী করীম (সা:) এর মর্যাদা বুলন্দ করতে পারি না। আল্লাহ তা'য়ালাই বুলন্দ করতে পারেন। আমরা তাঁর অনুগ্রহের প্রতিদান দিতে পারি না। আল্লাহ তা'য়ালাই তার প্রতিদান দিতে পারেন। আমরা তাঁর বাণীসমূহ উচ্চমাপে পৌঁছানোর এবং তাঁর আদর্শকে সম্প্রসারিত করার জন্য যতই চেষ্টা চালাই না কেনো, আল্লাহ তা'য়ালার মেহেরবানী এবং তাঁর দেয়া সুযোগ ও সহায়তা ব্যতীত তাতে কোনো প্রকার সাফল্য অর্জন করতে পারি না। এমন কি নবী করীম (সা:) এর প্রতি ভক্তি ভালোবাসাও আমাদের অন্তরে আল্লাহরই সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। অন্যথায় শয়তান কত রকম প্ররোচনা দিয়ে তাঁর প্রতি আমাদের মন-মস্তিষ্ক বিরূপ করে তুলতে পারে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা আমাদেরকে তা থেকে হেফাজত করুন।

সুতরাং নবী করীম (সা:) এর ওপর দরূদ পাঠের হক আদায় করার জন্য আল্লাহ তা'য়ালার কাছে তাঁর প্রতি সালাত বা দরূদের দোয়া করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন বলে সে যেন আল্লাহ তা'য়ালার সমীপে নিজের অক্ষমতা স্বীকার করতে গিয়ে বলে, হে আল্লাহ তা'য়ালা! তোমার নবীর ওপর সালাত বা দরূদ পাঠানোর যে কর্তব্য আমার প্রতি দেয়া হয়েছে, তা যথাযথভাবে সম্পন্ন করার সামর্থ আমার নেই। আমার পক্ষ থেকে তুমিই তা সম্পন্ন করে দাও এবং তা করার জন্য আমাকে যেভাবে কাজে নিয়োগ করতে হয় তা তুমি নিয়োগ করো।

দ্বিতীয়ত রাসূল (সা:) এর ভদ্রতা ও মহানুভবতার ফলে তিনি কেবল নিজেকেই এ দোয়ার জন্য নির্দিষ্ট করে নেননি। বরং নিজের সাথে তিনি নিজের পরিজন স্ত্রী ও পরিবারকেও শামিল করে নিয়েছেন। 'স্ত্রী ও পরিবার' অর্থ সুস্পষ্ট আর 'পরিজন' শব্দটি নিছক রাসূল (সা:) এর পরিবারের লোকদের জন্য নির্দিষ্ট নয়। বরং এসব শব্দের মধ্যে এমন সব লোকও এসে যায় যারা তাঁর অনুসারী এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে। পরিজন অর্থে মূলে আরবী 'আল' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আরবী ভাষার দৃষ্টিতে 'আল' ও 'আহল'-এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে এই যে, কোন ব্যক্তির 'আল' হচ্ছে এমনসব লোক যারা হয় তার সাথী, সাহায্যকারী ও অনুসারী, তারা তার আত্মীয় বা অনাত্মীয় হোক বা না হোক অবশ্যই তার আত্মীয়। পবিত্র কুরআনের ১৪ টি স্থানে 'আলে ফেরআউন' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে কোনো জায়গায়ও 'আলে' অর্থ ফেরাউনের পরিবারের লোকেরা নয়। বরং এমন সকল লোক যারা হযরত মূসার মুকাবিলায় ফেরাউনের সমর্থক ও সহযোগী ছিল। (দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখুন সূরা আল বাকারাহ, ৪৯-৫০, সূরা আলে ইমরান-১১, আরাফ-১৩০, মুমিনুন-৪৬)

সুতরাং এমন সমস্ত লোকই 'আলে' মুহাম্মাদ (সা:) এর বহির্ভূত হয়ে যায় যারা বিশ্বনবী (সা:) এর আদর্শ অনুসরণ করে না, হতে পারে সে নবীর রক্তের আত্মীয়। পক্ষান্তরে এমন সকল লোকও এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় যারা নবী করীম (সা:) এর আদর্শ অনুসরণ করে, কিন্তু তারা নবীর রক্তের কোনো আত্মীয় নয়, তবুও তারা নবীর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। তবে নবী পরিবারের এমন প্রত্যেকটি লোক সর্বতোভাবেই 'আলে' মুহাম্মাদ (সা:) এর অন্তর্ভুক্ত হবে যারা তাঁর সাথে রক্তের সম্পর্কও রাখে আবার তাঁর আদর্শও অনুসরণ করে।

নবী করীম (সা:) যেসব দরূদ শিখিয়েছেন তার প্রত্যেকটিতে অবশ্যই এ কথা রয়েছে যে, তাঁর প্রতি এমন অনুগ্রহ করা হোক যা ইবরাহীম (আ:) ও তাঁর পরিবার- পরিজনদের ওপর করা হয়েছিল। এ বিষয়টি বুঝতে এক শ্রেণীর লোকদের বিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। একশ্রেণীর লোক এর বিভিন্ন জটিল ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু গবেষকগণ এর কোনো একটি ব্যাখ্যাও গ্রহণ করেননি। তারা ব্যাখ্যা দেন যে, যারা নবুয়‍্যাত ওহী ও কিতাবকে হেদায়েতের উৎস বলে মেনে নেয় তারা সবাই হযরত ইবরাহীম (আ:) এর নেতৃত্বের প্রশ্নে একমত। এ ব্যাপারে মুসলমান, খৃষ্টান ও ইয়াহুদীদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। সুতরাং রাসূল (সা:) এর বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে, যেভাবে হযরত ইবরাহীম (আ:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা সকল নবীর অনুসারীদের নেতায় পরিণত করেছেন, অনুরূপভাবে আমাকেও পরিণত করুন। এমন কোনো ব্যক্তি যে নবুয়‍্যাত মেনে নিয়েছে সে যেন আমার নবুয়‍্যাতের প্রতি ঈমান আনা থেকে বঞ্চিত না হয়।

বিশ্বনবী (সা:) এর ওপরে দরূদ পাঠ করা সুন্নাত। তাঁর নাম উচ্চারিত হলে তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করা মুস্তাহাব। বিশেষ করে নামাযে দরূদ পড়া সুন্নাত। এ বিষয়ে আলেম সমাজ একমত। সমগ্র জীবনকালে নবী করীম (সা:) এর ওপরে একবার দরূদ পাঠ করা ফরজ। এ ব্যাপারে আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে। কারণ আল্লাহ তা'য়ালা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এর আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু এরপর দরূদের ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। ইমাম শাফেঈ (রাহ:) বলেন, নামাযে একজন মুসল্লী যখন শেষবার তাশাহুদ পড়ে তখন সেখানে সালাতুন আলান নবী পড়া ফরজ। কোনো ব্যক্তি এভাবে না পড়লে তার নামায হবে না। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে থেকে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:), হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রা:), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা:) ও হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা:), তাবেঈদের মধ্যে থেকে শা'বী (রাহ), ইমাম মুহাম্মাদ বাকের (রাহ:), মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কুরযী (রাহ:) ও মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রাহ:) এবং ফকীহদের মধ্যে থেকে ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রাহ:) ও এ মতের প্রবক্তা ছিলেন। শেষের দিকে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রাহ:) ও এ মত অবলম্বন করেন।

ইমাম আবু হানিফা (রাহ:), ইমাম মালেক (রাহ:) ও অধিকাংশ উলামা এ মত পোষণ করেন যে, দরূদ সমগ্র জীবনে শুধুমাত্র একবার পড়া ফরজ। এটি কালেমায়ে শাহাদাতের মত। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ইলাহ বলে মেনে নিয়েছে এবং নবী করীম (সা:) কে নবী বলে মেনে নিয়েছে সে ফরজ আদায় করেছে। অনুরূপভাবে যে একবার দরূদ পাঠ করেছে সে নবীর ওপর সালাত পাঠ করার ফরজ আদায়ের দায়িত্ব মুক্ত হয়ে গেছে। এরপর তার ওপর আর কালেমা পড়া ফরজ নয় এবং দরূদ পড়াও ফরজ নয়।

আলেমদের একটি দল নামাযে দরূদ পড়াকে সকল অবস্থায় ওয়াজিব বলে গণ্য করেন। কিন্তু তাঁরা তাশাহুদের সাথে তাকে শৃংখলিত করেন না।

আলেমদের আরেকটি দলের মতে প্রত্যেক দোয়ায় দরূদ পড়া ওয়াজিব। আরো কিছু চিন্তাবিদ নবী করীম (সা:) এর নাম উচ্চারিত হলে দরূদ পড়া ওয়াজিব বলে অভিমত পোষণ করেন। আরেক দল আলেমদের মতে এক মজলিশে রাসূল (সা:) এর নাম যতবারই উচ্চারিত হোক না কেনো, দরূদ পড়া কেবলমাত্র একবার ওয়াজিব হবে।

শুধুমাত্র ওয়াজিব হবার ব্যাপারে এ মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। তবে দরূদের ফযীলত ও তা পাঠ করলে প্রতিদান ও সওয়াব পাওয়া এবং তার একটি অনেক বড় সৎকাজ হবার ব্যাপারে তো সমস্ত মুসলিম উম্মাহ্ একমত। এমন প্রত্যেকটি মুসলমানের অন্তর থেকেই তো স্বাভাবিকভাবেই দরূদ বের হবে, যার মধ্যে এ অনুভূতি থাকবে যে, বিশ্বনবী (সা:) আল্লাহ তা'য়ালার পরে আমাদের প্রতি সবচেয়ে বড় অনুগ্রহকারী। মানুষের হৃদয়ে ঈমান ও ইসলামের মর্যাদা যত বেশী হবে তত বেশী মর্যাদা হবে তার হৃদয়ে বিশ্বনবী (সা:) এর অনুগ্রহেরও। আর মানুষ যত বেশী এ অনুগ্রহের মর্যাদা দিতে শিখবে তত বেশিই যে নবী করীম (সা:) এর ওপরে দরূদ পাঠ করবে। সুতরাং অধিক দরূদ পাঠ করা ঈমানের একটি মাপকাঠি। এটি পরিমাপ করে জানিয়ে দেয় বিশ্বনবী (সা:) এর আদর্শের সাথে মানুষের সম্পর্ক কতটা গভীর এবং ঈমানের নিয়ামতের কতটা সম্মান তার অন্তরে আছে। এ কারণেই নবী করীম (সা:) বলেছেন- مَنْ صَلَّى عَلَى صَلَواةَ لَّمْ تَزِلُ الْمَلَائِكَةُ تُصَلِّي عَلَيْهِ مَا صَلَّى عَلَى

যে ব্যক্তি আমার প্রতি দরূদ পাঠ করে ফেরেশতারা তার প্রতি দরূদ পাঠ করে যতক্ষণ সে দরূদ পাঠ করতে থাকে। (আহমাদ ও ইবনে মাজাহ) مَنْ صَلَّى عَلَى وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا -

যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করে আল্লাহ তা'য়ালা তার প্রতি দশবার দরূদ পাঠ করেন। (মুসলিম) অর্থাৎ আল্লাহ তা'য়ালা তার প্রতি দশটি রহমত নাযিল করেন। أُولَى النَّاسِ بِي يَوْمِ الْقِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ عَلَى صَلَواةٌ

কিয়ামতের দিন আমার সাথে থাকার সবচেয়ে বেশি হকদার হবে সেই ব্যক্তি যে আমার ওপর সবেচেয়ে বেশি দরূদ পড়বে। (তিরমিযী) الْبَخِيلُ الَّذِي ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَى

আমার কথা যে ব্যক্তির সামনে আলোচনা করা হয় এবং সে আমার ওপর দরূদ পাঠ করে না সে কৃপণ। (তিরমিযী)

সুতরাং সকল মুসলমানের উচিত নবী করীম (সা:) এর প্রতি অধিক দরূদ পাঠ করা। তবে এ দরূদ পাঠই শুধুমাত্র মুক্তির মাধ্যম নয়। মানুষকে অবশ্যই মহান আল্লাহর বিধান মেনে চলতে হবে, আল্লাহ তা'য়ালার বিধান প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। তাহলে দরূদ পাঠও উপকারে আসবে। আল্লাহ তা'য়ালার বিধান না মেনে বা ইসলামী বিধান ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, দেশে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম না করে শুধু মাত্র দরূদ পাঠ করলে কিয়ামতের দিন যদি রাসূল (সা:) এ কথা বলেন যে, 'যখন আমার আদর্শকে অপমানিত করা হচ্ছিলো, যখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দেয়া জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে উৎখাত করার জন্য ষড়যন্ত্র করা হচ্ছিলো, ইসলামের সৈনিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা কল্পিত অভিযোগ তুলে তাদের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছিলো, আর তোমরা ঘরের কোণে বা মসজিদে বসে বসে দরূদ পাঠ করছিলে, বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করোনি, আজ তোমাদের ওসব দরূদে আমার কোনোই প্রয়োজন নেই' তখন কি উপায় হবে? ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সংগ্রাম করা হলো ফরজ, এই ফরজ আদায় করে তারপর যতবেশি দরূদ পাঠ করা যাবে আল্লাহ তা'য়ালাও সন্তুষ্ট হবেন এবং জান্নাত ততবেশি তার কাছে এগিয়ে আসবে ইনশাআল্লাহ।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 জুলুম- নির্যাতনের কালো অধ্যায়

📄 জুলুম- নির্যাতনের কালো অধ্যায়


এ পার্থিব জগতে বিভিন্ন দেশ ও সমাজে জালিম ও স্বৈরাচারী যখন কোনো ব্যক্তি, দল বা সম্প্রদায়ের প্রতি নির্যাতন করে তখন যদি কেউ প্রতিবাদ না করে তাহলে জালিম ও স্বৈরাচার উৎসাহিত হয়ে নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধিই করে থাকে, পৃথিবীর ইতিহাস এ কথার সাক্ষ্য বহন করে। নবী করীম (সা:) এর মক্কী জীবনে ঠিক এমনটিই ঘটেছিলো। প্রতাবশালী চাচা আবু তালিবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সে সময় বিশ্বনবী (সা:) এর প্রতি শারীরিকভাবে অতটা নির্যাতন কেউ করতে পারেনি। আবু তালিবের অবর্তমানে ইসলামের শত্রুগোষ্ঠী মক্কায় নির্ভীক চিত্তে নবী করীম (সা:) এর প্রতি অত্যাচারের মাত্রা বৃদ্ধি করলো। তিনি যে পথ দিয়ে কা'বায় আসবেন সে পথে ময়লা আবর্জনা বা বিষাক্ত কাঁটা বিছিয়ে রাখতো দুশমনরা। তিনি কা'বায় নামাজ আদায় করছেন, তাঁকে নানাভাবে বিদ্রুপ করা হতো। নামাজে সিজদা দিয়েছেন এ সময় তাঁর পবিত্র মাথায় উটের পচা গলিত নাড়ি ভুড়ি চাপিয়ে দেয়া হতো। ছোট্ট মেয়ে ফাতিমা (রা:) পিতার এ অবস্থা দেখে করুণ কণ্ঠে কাঁদতেন আর পিতার মাথার ওপর থেকে আবর্জনা সরিয়ে মাথা ভার মুক্ত করতেন। তিনি নামাযে দাঁড়িয়েছেন, তাঁর পবিত্র গলায় কাপড় জড়িয়ে দু'দিক থেকে এমনভাবে টেনে ধরা হতো যে, তাঁর শ্বাস বন্ধ হয়ে যেত। ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেছেন, এতে করে নবী করীম (সা:) এর কন্ঠে দাগ হয়ে যেত। বর্তমান সময়েও যেমন ইসলামের অনুসারী নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে ভুল বুঝিয়ে বিভ্রান্ত করে তাদেরকে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়, ঠিক তেমনিভাবেই নবী করীম (সা:) এর বিরুদ্ধেও তৎকালে দুশমনরা কিশোর, তরুণ যুবকদের ব্যবহার করতো। তিনি বাইরে বের হলেই ইসলাম বিরোধী নেতৃবৃন্দ দুষ্ট প্রকৃতির ছেলেদের তাঁর পেছনে লেলিয়ে দিত। তাঁরা নবী করীম (সা:) এর পেছনে পেছনে যেত আর তাঁকে বিদ্রুপ করতো।

তিনি নামাযে মধুর কন্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করতেন আর আবু জাহিল তাঁর সাথিদের নিয়ে নবীকে গালাগালি দিতো। তিনি লোকালয়ে গিয়ে মানুষের কাছে ইসলামের আহ্বান প্রচার করতেন। আবু জাহিল লোকদেরকে ডেকে বলতো, 'তোমরা এই লোকটির কথায় কান দিও না। এই লোকের প্রতারণায় তোমরা নিপতিত হবে না। এ লোক ধোকাবাজ যাদুকর'। (নাউযুবিল্লাহ)

এসব কথা বলে আল্লাহ তা'য়ালার দুশমন আবু জাহিল লোকজনের সামনে আল্লাহ তা'য়ালার নবীর পবিত্র শরীরে নোংরা কাদা নিক্ষেপ করতো। একদিন নবী করীম (সা:) কা'বায় নামায আদায় করছিলেন। শত্রুর দল দূরে বসে তাঁকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করছিল। হঠাৎ আবু জাহিল বলে উঠলো, 'মুহাম্মাদ (সা:) যখন নামাযে সিজদা দেয় তখন তাঁর মাথার ওপর উটের নাড়ি-ভুড়ি চাপিয়ে দিলে ভালো হয়। তোমরা কি কেউ এ কাজ করতে পারবে?'

ইসলামের দুশমন ওকবা বললো, 'তোমরা দেখো, আমিই মুহাম্মাদ (সা:) এর মাথায় উটের নাড়ি ভুড়ি চাপিয়ে দিচ্ছি'।

এ কথা বলেই সে উটের নাড়ি-ভুড়ি এনে নবী করীম (সা:) এর মাথার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল। তিনি তখন নামাযে সিজদায় ছিলেন, মাথা উঠাতে পারলেন না। নবীর এই কষ্ট দেখে শত্রুর দল অট্ট হাসিতে হেসেছিল। পাঁচ বছরের শিশু মেয়ে ফাতিমা পিতার এই দুরাবস্থার সংবাদ পেয়ে করুণ কন্ঠে আর্তনাদ করে ছুটে এলেন। কচি হাত দু'টো দিয়ে পরম মমতায় পিতার মাথা থেকে আবর্জনা পরিষ্কার করে শত্রুদের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহর দরবারে বিচার দিলেন।

নবী করীম (সা:) কে নিজেরা তো ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতোই সেই সাথে মক্কায় নতুন যারা আসতো, তাদের সামনেও তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করতো আবু জাহিলের অনুসারীরা। মক্কার বাইরের একজন লোক একটি উট নিয়ে মক্কায় এসেছিল। আবু জাহিল সে উট নিয়ে উটের মালিককে অর্থ না দেয়ার ছুতো খুঁজতে থাকে। লোকটি যখন বুঝলো আবু জাহিল তাকে অর্থ না দিয়েই উট নিয়ে নেবে তখন সে কা'বাঘরে এসে উচ্চকণ্ঠে বলতে থাকে, 'আবু জাহিল আমার উট নিয়ে তার মূল্য পরিশোধ করছে না। সে আমার ওপর জুলুম করছে। আপনাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন যিনি এই জুলুমের প্রতিকার করবেন? আমার অধিকার আমাকে আদায় করে দিবেন?'

লোকটির কথা শুনে ইসলামের শত্রুরা নবী করীম (সা:) কে হাসির পাত্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করলো। মক্কার বাইরের ঐ লোকটির সামনে আবু জাহিল যেন আল্লাহ তা'য়ালার রাসূলকে অপমান করে, এ উদ্দেশ্যে লোকটিকে তারা ডেকে রাসূল (সা:) কে ইশারায় দেখিয়ে বললো, 'ঐ লোকটির কাছে যাও, সে তোমার অধিকার আদায় করে দিবে'।

নবী করীম (সা:) সে সময় কা'বায় অবস্থান করছিলেন। লোকটি কাফিরদের কথায় বিশ্বাস করে নবী (সা:) এর কাছে ঘটনা বিস্তারিত বলে আবেদন করলেন, 'হে আল্লাহর বান্দাহ! আপনার প্রতি আল্লাহ তা'য়ালা রহমত নাযিল করুন, আপনি আবু জাহিলের কাছ থেকে আমার অধিকার আদায় করে দিন'।

বিশ্বনবী (সা:) লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি আমার সাথে এসো, আমি তোমার অধিকার আদায় করে দিচ্ছি'।

কথা শেষ করে নবী করীম (সা:) উঠে আবু জাহিলের বাড়ির দিকে গেলেন। লোকটিও রাসূল (সা:) এর সাথে গেল। আল্লাহর দুশমন আবু জাহিল কিভাবে নবী করীম (সা:) কে অপমান করে তা দেখার জন্যে ইসলামের দুশমনরা একজন লোককে পাঠালো। বিশ্বনবী (সা:) আবু জাহিলের বাড়ির দরোজায় আঘাত করলেন। সে ভেতর থেকে জানতে চাইলো আগন্তুকের পরিচয়। নবী (সা:) নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, 'আমি মুহাম্মাদ (সা:), দরোজা খুলে বাইরে এসো'।

আবু জাহিল বাইরে এসে বিশ্বনবী (সা:) এর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই তার চেহারা এমন ভীতিগ্রস্থ বিবর্ণ হয়ে উঠেছিল যে, সে যেন তাঁর সামনে মৃত্যুদূত দেখছে। আল্লাহর নবী (সা:) কলিজায় কম্পন জাগানো কণ্ঠে আদেশ দিলেন, 'এই লোকের যে অধিকার রয়েছে তোমার কাছে, তাঁর অধিকার তাকে বুঝিয়ে দাও'।

আবু জাহিল আতংকগ্রস্ত কন্ঠে বললো, 'এখুনি দিচ্ছি'। এ কথা বলেই সে তাঁর ঘরে গিয়ে দ্রুত অর্থ এনে লোকটিকে দিয়ে দিল। নবী করীম (সা:) কা'বায় ফিরে এলেন।

সে লোকটি কা'বায় এসে কাফিরদেরকে বললো, 'মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ (সা:) এর ওপর রহমত নাযিল করুন, তিনি আমার অধিকার আদায় করে দিয়েছেন'।

আল্লাহর দুশমনরা ধারণা করেছিল তাদের নেতা আবু জাহিল বিদেশী লোকটির সামনে নবী করীম (সা:) কে অপমান করবে, তা না করে আবু জাহিল মুহাম্মাদ (সা:) এর কথায় উটের মূল্য পরিশোধ করলো, কারণ কি? ইতোমধ্যে আবু জাহিল সেখানে এলো। তাঁর চেহারা থেকে তখন পর্যন্ত ভয়ের চিহ্ন মুছে যায়নি। অন্যরা তাকে জিজ্ঞাসা করলো, 'বিষয়টি কি? তুমি মুহাম্মাদ (সা:) এর কথায় মূল্য দিয়ে দিলে যে?'

আবু জাহিল বললো, 'মুহাম্মাদ (সা:) এর কথায় মূল্য না দিলে সে ভয়ঙ্কর উট আমাকে খেয়ে ফেলতো। আমি দরোজা খোলার পরে দেখলাম মুহাম্মাদ (সা:) এর পেছনে একটি ভয়ঙ্কর দর্শন উট দাঁড়িয়ে আছে। খোদার শপথ! তেমন উট আমি কোথাও দেখিনি। উটের চেহারা বড় ভয়ঙ্কর, আমি ঐ লোকটির উটের মূল্য না দিলে মুহাম্মাদ (সা:) এর পিছনে দাঁড়ানো উট আমাকে খেয়ে ফেলতো'। (ইবনে হিশাম)

এভাবেই সেদিন মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) এর সর্বোচ্চ মর্যাদা সমুন্নত রেখে ইসলামের দুশমনদের ষড়যন্ত্র বানচাল করে দিয়েছিলেন। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা ইসলামের দুশমনরা ঘটিয়েছে। যারা প্রত্যক্ষভাবে বিশ্বনবী (সা:) এর সাথে শত্রুতা করেছে, মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তাদের অশুভ পরিণতি সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। নবী করীম (সা:) এর চাচা আবু লাহাব এবং তাঁর স্ত্রী উম্মে জামিল নবী করীম (সা:) কে নানাভাবে অত্যাচার করেছে। তাদের পরিণতি সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সূরা লাহাব অবতীর্ণ করেছেন। আবু লাহাব যখন জানতে পারলো তাঁর পরিণতি সম্পর্কে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, তখন সে একটি পাথর নিয়ে নবী করীম (সা:) কে আঘাত করার উদ্দেশ্যে কা'বায় এসে বসলো।

কিছুক্ষণ পরে নবী করীম (সা:) হযরত আবু বকর (রা:) কে সাথে নিয়ে কা'বায় এলেন। মহান আল্লাহ তা'য়ালা আবু লাহাবের চোখ থেকে বিশ্বনবী (সা:) কে অদৃশ্য করে দিলেন। আবু লাহাব হযরত আবু বকর (রা:) কে জিজ্ঞাসা করলো, 'কোথায় মুহাম্মাদ (সা:)? আমি জানতে পারলাম সে আমার সম্পর্কে শাস্তির কথা বলছে। এখন আমি কাছে পেলে এই পাথর দিয়ে তাকে আঘাত করতাম'।

কথা শেষ করে সে চলে গেল। হযরত আবু বকর (রা:) আল্লাহর নবী (সা:) কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আবু লাহাব আপনাকে দেখতে পেল না কেনো?'

নবী করীম (সা:) বললেন, 'সে আমাকে দেখতে পায়নি। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর চোখকে আদেশ দিয়েছিলেন যেন সে আমাকে দেখতে না পায়'।

বর্তমান যুগে একশ্রেণীর লোক যেমন নিজেদেরকে সুশিল নামে পরিচয় দিয়ে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালায় তেমনি সে যুগেও সুশিলদের এক নেতা উমাইয়া ইবনে খালফ নবী করীম (সা:) কে দেখলেই গালাগালি ও হৈচৈ করতো। বর্তমান যুগের একশ্রেণীর ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্টিং মিডিয়ার মতো ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কল্পিত অভিযোগ ও মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের মতো ভূমিকা সে যুগের উমাইয়া ইবনে খালফ এবং তার সমর্থকগণ আল্লাহ তা'য়ালার রাসূলের বিরুদ্ধে পালন করতো। ইসলামের দুশমন এ লোকটির অশুভ পরিণতি এবং তার ঘৃণিত স্বভাব সম্পর্কে মহান আল্লাহ সূরা হুমাজাহ্ অবতীর্ণ করেছেন। নবী করীম (সা:) এর মহান সাহাবী হযরত খাব্বাব (রা:) ছিলেন একজন লৌহকর্মকার। তিনি লৌহজাত অস্ত্র নির্মাণ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর কাছ থেকে তরবারী কিনেছিল আ'স ইবনে ওয়ায়েল নামক এক কাফির। সম্পূর্ণ অর্থ সে তখন পর্যন্ত পরিশোধ করেনি। হযরত খাব্বাব (রা:) তাঁর কাছে তরবারীর মূল্য চাইতে গেলেই সে বিদ্রুপ করে বলতো, 'হে খাব্বাব! তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ (সা:) তো প্রচার করে জান্নাতে যারা যাবে তাঁরা ইচ্ছে অনুযায়ী স্বর্ণ রৌপ্য হিরা জহরত ও অসংখ্য দাস-দাসী পাবে। এ কথা কি ঠিক?'

হযরত খাব্বাব (রা:) জবাব দিতেন, 'আল্লাহর নবী (সা:)-এর কথা অবশ্যই সত্য'।

আল্লাহ তা'য়ালার দুশমন আ'স ইবনে ওয়ায়েল বিদ্রুপ করে বলতো, 'হে খাব্বাব! তাহলে আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত সময় দাও! আমি তোমাদের ঐ জান্নাতে গিয়েই তোমার অর্থ পরিশোধ করবো। আমি খোদার শপথ করে বলছি, তুমি আর তোমার মুহাম্মাদ (সা:) আমার তুলনায় অধিক সম্মান পাবে না এবং সৌভাগ্যবানও হতে পারবে না'। (নাউযুবিল্লাহ)

এই কাফির সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে সূরা মরিয়মের আয়াত অবতীর্ণ করেন। নাদার ইবনে হারেস ছিলো ইসলামের আরেক ঘৃণিত শত্রু। নবী করীম (সা:) যখন কুরআন তিলাওয়াত করতেন, লোকদেরকে ইসলামের দিকে আহবান জানাতেন, ইসলামের সাথে যারা অতীতে বিরোধীতা করে আল্লাহ তা'য়ালার গযবে পড়ে ধ্বংস হয়েছে, তাদের ইতিহাস শোনাতেন তখন এই কাফির সে সমাবেশে উপস্থিত হয়ে নীরবে বসে থাকতো। রাসূল (সা:) চলে যাবার পরে সে লোকজনকে বলতো, 'মুহাম্মাদ (সা:) যা বলে তার কোনো ভিত্তি নেই। তাঁর বলা কাহিনী সেই প্রাচীন যুগের গল্প ছাড়া আর কিছুই না। মুহাম্মাদ (সা:) এর চেয়ে ভালো কাহিনী আমি জানি'।

মহান আল্লাহ তা'য়ালা সূরা ফুরকানের আয়াত অবতীর্ণ করে ঘৃণিত এ লোকটির পরিণতি বর্ণনা করেছেন। আরেকজন কাফির আখনাস ইবনে শুরাইক, সে ছিল তৎকালিন সুশিল সমাজের একজন গন্যমান্য ব্যক্তি। এই লোকটি নানাভাবে নবী করীম (সা:) কে অত্যাচার করতো। তাঁকে দেখলেই অশালীন ভাষায় গালাগালি দিত। মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর সম্পর্কে সূরা কলমের আয়াত অবতীর্ণ করে তাঁর পরিণতি কত খারাপ হবে তা জানিয়ে দিলেন। ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা নামক কাফির বলতো, 'আমি এবং আবু মাসউদের মতো প্রভাবশালী লোক থাকতে মুহাম্মাদ (সা:) এর মতো লোকের ওপরে ওহী নাযিল হলো? আল্লাহ আর লোক পাননি বুঝি?' (নাউযুবিল্লাহ)

সুশিল নামধারী ইসলামের এসব দুশমনদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ সূরা যুখরূফের আয়াত অবতীর্ণ করে তাদের কথার প্রতিবাদ করে নির্মম পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন। কাফিরদের ভেতরে উকবা এবং উবাই ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নবী করীম (সা:) এক সমাবেশে মানুষদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাচ্ছিলেন, সে সমাবেশে উকবা উপস্থিত ছিলো। উবাই এ সংবাদ জানতে পেরে ছুটে এসে তাঁর বন্ধু উকবাকে বললো, 'তুমি মুহাম্মাদ (সা:) এর কথা শুনছো? তুমি যদি তাঁকে অপমান না করো তাহলে তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্কে থাকবে না'।

মহান আল্লাহ তা'য়ালা উকবা এবং উবাইকে জাহান্নামের অতলে নিমজ্জিত করুন। তাদের কঠিন পরিণতি সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ করে তাদের ভয়ংকর অবস্থা সম্পর্কে জানিয়ে দিলেন। একদিন উবাই একটি পুরোনো হাড় এনে নবী করীম (সা:) কে বললো, 'হে মুহাম্মাদ (সাঃ)! তোমার কি বিশ্বাস হয় এই পচা হাড়কে আল্লাহ আবার জীবিত করবে?' এ কথা বলে সে হাড়টি গুড়ো করে বাতাসে উড়িয়ে দিল।

নবী করীম (সা:) দৃঢ় কন্ঠে বললেন, 'মহান আল্লাহ তা'য়ালা বাতাসে মিশ্রিত হাড়কে আবার জীবিত করবেন এবং জাহান্নামে প্রেরণ করবেন'। এই কাফির সম্পর্কে সূরা ইয়াছিনের আয়াত অবতীর্ণ হলো। মহান আল্লাহ বললেন, 'তাদেরকে বলে দাও, প্রথমবার যখন তাঁরা অস্তিত্বহীন ছিল তখন তাদেরকে কে অস্তিত্ব দান করেছিল? যে আল্লাহ প্রথমবার অস্তিত্বদান করেছিলেন সেই আল্লাহই যতবার খুশী অস্তিত্বদান করবেন'।

আরেকদিন নবী করীম (সা:) কা'বাঘর তাওয়াফ করছিলেন, এ সময় কাফির নেতারা বিশ্বনবী (সা:) এর কাছে আপোষ প্রস্তাব পেশ করে বললো, 'হে মুহাম্মদ (সা:)! এসো আমরা একটি প্রক্রিয়ায় আমাদের বিরোধ শেষ করে দেই। তা হলো, আমরা তোমার আল্লাহর দাসত্ব কিছুটা করি তুমিও আমাদের প্রতিপালক দেবতাদের দাসত্ব কিছুটা করো। তাহলে আর আমাদের ভেতরে কোনো বিরোধ থাকবে না'।

কাফিরদের কথার জবাবে মহান আল্লাহ সূরা কাফিরুন অবতীর্ণ করে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, 'হে নবী, আপনি তাদেরকে জানিয়ে দিন, আমি যার দাসত্ব করি তোমরা তাঁর দাসত্ব করো না। তোমরা যার দাসত্ব করো আমি তাঁর দাসত্ব করি না। তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন আর আমার জন্য আমার দ্বীন'।

ইসলামে বাতিল শক্তির সাথে আপোষের কোনো ব্যবস্থা নেই। ইসলামে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই। যার যার ধর্ম সে সে অবশ্যই পালন করবে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার স্থান ইসলামে নেই। পবিত্র কুরআনের এই আয়াত দিয়ে যারা ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে কথা বলেন তাদের উচিত আয়াতটির পটভূমি দেখা। পৃথিবীর কোনো নবী-রাসূলগণ এবং তাঁদের সাহাবায়ে কেরাম ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে ছিলেন না। কাফির এবং ধর্মনিরপেক্ষদের সাথেই তাদের সংঘর্ষ হয়েছে। নবীগণের আগমন ঘটেছেই মহান আল্লাহর বিধান রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে। সুতরাং কুরআনের আয়াতের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে যারা পার্থিব স্বার্থে ব্যবহার করে তাদের সতর্ক থাকা উচিত। মহান আল্লাহ তা'য়ালার ক্রোধ যে কোনো মুহূর্তে অবতীর্ণ হতে পারে।

ইসলামে শক্তি প্রয়োগের স্থান নেই। ইসলাম তার আকিদা বিশ্বাসকে গ্রহণ করতে কাউকে বাধ্য করে না। কারণ বিশ্বাস জিনিসটা কারো ওপর শক্তি প্রয়োগ করে চাপিয়ে দেয়া যায় না। একইভাবে, ইসলাম তার আকিদা বিশ্বাসের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পৃক্ত ইবাদাতকেও কোনো ব্যক্তির ওপর শক্তি প্রয়োগ করে চাপিয়ে দেয় না। কারণ দৃঢ় বিশ্বাস ব্যতীত ইসলামের ইবাদত সমূহ অর্থহীন। দৃঢ় বিশ্বাস অন্তরে পোষণ করেই নামায, রোযা, হজ্জ ইত্যাদী আদায় করতে হয়। এসব দিকে ইসলাম মানুষকে স্বাধীনতা দিতে চায়। পক্ষান্তরে ইসলাম এটা সহ্য করতে নারাজ যে, সমাজ ও সভ্যতা পরিচালনাকারী যে আইন ও বিধানের ওপর রাষ্ট্রের কাঠামো ও বিধিব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ব্যতীত অন্য কেউ রচনা করে দিক, আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি বিদ্রোহী মানুষজন আল্লাহর পৃথিবীতে আইনের প্রয়োগ করুক বা বাস্ত বায়ন করুক, মুসলিম জনগোষ্ঠী তা পালন করুক এবং তাদের দাস হয়ে থাকুক। এসব ঘৃণ্য সুযোগ ইসলাম দিতে নারাজ।

নবী করীম (সা:) যে বাড়িতে থাকতেন সে বাড়ির চারদিকে যারা বসবাস করতো অর্থাৎ আল্লাহর রাসূলের প্রতিবেশী যারা ছিল তাদের ভেতরে একমাত্র হাকাম ইবনে আ'স (রা:) ব্যতীত আর কেউ ইসলাম কবুল করেনি। রাসূল (সা:) যখন নিজের বাড়িতেই নামায আদায় করতেন তখন প্রতিবেশী উকবা, আদী এ ধরনের অনেকেই তাঁর প্রতি পশুর নাড়ি ভুড়ি ছুড়ে দিত। নবী করীম (সা:) বাধ্য হয়ে দেয়ালের আড়ালে নামায আদায় করতেন। তিনি রান্নার জন্য উনুনে হাড়ি উঠাতেন আর তারা সেই হাড়ির ভেতরেও আবর্জনা ছুড়ে দিত। বিশ্বনবী (সা:) নিজ হাতে সেসব আবর্জনা পরিষ্কার করতেন। বিশ্বমানবতার মহান মুক্তির দূত নবী করীম (সা:) এর প্রতি ইসলামের শত্রুরা নির্যাতনের চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেছে, কিন্তু শত্রুপক্ষের শেষ রক্ষা হয়নি। তাদের নাম-নিশানা মুছে গিয়েছে। ইনশাআল্লাহ ইসলামের এ যুগের দুশমনদের অস্তিত্বও ঘৃণা ও লাঞ্ছনার অতল তলদেশে হারিয়ে যাবে।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 শক্তি প্রয়োগে নয়- নবী করীম (সা:) এর স্নিগ্ধ সুরভিত আকর্ষণে

📄 শক্তি প্রয়োগে নয়- নবী করীম (সা:) এর স্নিগ্ধ সুরভিত আকর্ষণে


নবী করীম (সা:) প্রত্যেক হজ্জের মৌসুমে আরবের বিভিন্ন গোত্রের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যেতেন। নবুয়্যাতের দশম বছর রজব মাসে নবী করীম (সা:) বিভিন্ন গোত্রের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গেলেন। এ সময় মদীনা থেকে একদল লোক মক্কায় আগমন করেছিল। দলটি ছিল খাজরাজ গোত্রের। মক্কা ও মিনার মধ্যবর্তী একটি স্থানের নাম আকাবা। বর্তমানে এখানে মসজিদে আকাবা অবস্থিত। এই আকাবাতে তাঁর সাথে লোকগুলোর সাক্ষাৎ ঘটেছিল। তাদের সাথে দেখা হওয়া মাত্র তিনি তাদের পরিচয় জানতে আগ্রহী হলেন। তাঁরা নিজেদেরকে খাজরাজ গোত্রের লোক বলে পরিচয় দিল। তিনি বললেন, 'যারা ইয়াহুদীদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ আপনারা কি সেই গোত্রের?'

নবী করীম (সা:) এর কথার প্রতি তাঁরা ইতিবাচক জবাব দিল। তিনি তাদেরকে বললেন, 'আপনারা আমাকে একটু সময় দিলে আমি আপনাদের সাথে কিছু কথা বলতে ইচ্ছুক'।

আগন্তুক দল নবী করীম (সা:) এর কথায় সম্মত হয়ে সেখানে বসলো। তিনি তাদেরকে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করে শোনালেন এবং ইসলাম সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করার আহ্বান জানালেন। মদীনার অধিবাসীরা নানা ধরনের মূর্তির পূজা করতো এবং ইয়াহুদীদের সাথে তাঁরা এক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল। তৎকালীন ইয়াহুদীরা কিতাবের মাধ্যমে নবী করীম (সা:) সম্পর্কে পূর্ব হতেই অবগত ছিল। তাদের কাছ থেকে মদীনার অধিবাসীরাও নবী করীম (সা:) এর আগমন সম্পর্কে অনেক কিছুই জেনেছিলো।

মদীনার ইয়াহুদী এবং পৌত্তলিকদের মধ্যে মতানৈক্যের সূত্রপাত হলে ইয়াহুদীরা পৌত্তলিকদের ভয় দেখিয়ে বলতো, 'বর্তমানে নবী আগমনের আর দেরী নেই। আমরা ইতোপূর্বে আদ ও ইরাম জাতিকে নির্বিচারে হত্যা করেছিলাম। এখন যে নবী আগমন করবে সে নবীর নেতৃত্বে তোমাদেরকেও সেই একইভাবে হত্যা করবো'।

ইয়াহুদীদের এ ধরনের ভীতি প্রদর্শনের কারণে মদীনার পৌত্তলিকরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, নবীর সাথে সাক্ষাৎ ঘটলে তাঁরাই ইয়াহুদীদের আগে নবীর অনুসারী হবে। এভাবে মহান আল্লাহ তা'য়ালা মদীনায় ইসলামের জন্য ক্ষেত্র পূর্ব হতেই প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। নবী করীম (সা:) এর দাওয়াত শোনার সাথে সাথে তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো, যে নবী সম্পর্কে ইয়াহুদীরা তাদেরকে ভয় দেখায় এই মানুষটিই সেই নবী। সুতরাং ইয়াহুদীরা এই নবীর অনুসারী হবার পূর্বেই তাঁরা ইসলাম কবুল করে মুসলমান হবে এবং সিদ্ধান্ত তাঁরা তৎক্ষণাৎ কার্যকর করেছিল।

ইসলাম কবুল করেই তাঁরা নবী করীম (সা:) কে জানালো, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমরা আমাদের গোত্রকে শত্রু কর্তৃক পরিবেষ্টিত অবস্থায় রেখে এসেছি। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের গোত্রের সকল লোক আপনার সাথে থাকবে। আমরা আমাদের গোত্রে ফিরে গিয়ে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদেরকে জানাবো। মহান আল্লাহ তা'য়ালা যদি তাদেরকে আপনার সঙ্গী বানিয়ে দেন তাহলে আপনি হবেন সবচেয়ে সম্মানিত এবং শক্তিশালী'।

এই সৌভাগ্যবান মানুষগুলো ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় গিয়ে তাদের গোত্রের কাছে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করে তাদের ইসলাম গ্রহণ করার বিষয়টি জানিয়ে দেন। ফলে মদীনার সর্বত্র ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ তীব্র হয়ে ওঠে। এভাবেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর নবীর কার্যক্রমকে এক যৌক্তিক পরিণতির দিকে এগিয়ে নেন এবং ইসলাম বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছায়।

মহাকালের ঘূর্ণয়মান চক্রের আবর্তনে পুনরায় হজ্জের মৌসুম এসে উপস্থিত হলো। মদীনা থেকে সত্য পিপাসু ব্যক্তিগণ মক্কায় এলেন তাওহীদের সুরা পান করে তৃষ্ণা মিটানোর জন্য। তাঁরা নবী করীম (সা:) এর সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলাম গ্রহণ করলেন। হযরত উবাদা (রা:) বলেন, 'আমি আকাবার প্রথম বাইয়াতে উপস্থিত ছিলাম। আমরা মোট ১২ জন পুরুষ উপস্থিত ছিলাম। আমরা নবী করীম (সা:) এর কাছে ওয়াদা করেছিলাম, 'আল্লাহ তা'য়ালার সাথে কাউকে শরীক করবো না। সন্তান হত্যা করবো না। চুরি ডাকাতি করবো না। ব্যভিচার করবো না। কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ ছড়াবো না। ন্যায় সংগত বিষয়ে নবীর সাথে অবাধ্যতা প্রদর্শন করবো না'।

আমরা নবী করীম (সা:) এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করার পরে তিনি বললেন, 'তোমরা আমার সাথে যে ওয়াদা করলে, তা যদি পালন করো তাহলে তোমাদের জন্য আল্লাহর জান্নাত রয়েছে। আর যদি এই ওয়াদার মধ্যে কোনো একটিও অমান্য করো তাহলে তোমাদের পরিণতি আল্লাহ তা'য়ালার হাতেই অর্পিত থাকবে। তিনি ইচ্ছে করলে শাস্তি ও দিতে পারেন এবং ক্ষমাও করতে পারেন'।

'বাইয়াত' আরবী শব্দ, এর অর্থ হলো বিক্রি করে দেয়া। একজন মুসলমান তাঁর জীবনের সকল কিছুই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে বিক্রি করে দেয়। মুসলমানদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। এ কারণে তাঁরা তাদের জীবন, ধন-সম্পদ সকল কিছুই মহান আল্লাহর কাছে জান্নাতের বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়। মহান আল্লাহও পবিত্র কুরআনে বলেছেন, আমি তাদের প্রাণ এবং ধন-সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছি। সুতরাং বাইয়াত করার অর্থ হলো, মহান আল্লাহর কাছে নিজের সমগ্র সত্তাকে বিক্রি করে দেয়া।

মদীনায় এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, সেখানে এমন একজন প্রশিক্ষকের প্রয়োজন ছিল যিনি মানুষকে ইসলামী শিক্ষার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ দিবেন। নবী করীম (সা:) এই অভাব উপলব্ধি করে হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা:) কে প্রশিক্ষক হিসাবে মনোনীত করে মদীনায় প্রেরণ করেছিলেন। তাঁর এ মহান সাহাবীই ছিলেন ইসলামের প্রথম মুবাল্লিগ। তিনি ছিলেন প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন। তিনিই ছিলেন ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরের যুদ্ধে পতাকা বহনকারী। তিনি মদীনায় আগমন করে হযরত আসয়াদ ইবনে জুরারাহ (রা:) এর বাড়িতে অবস্থান করেন। হযরত আসয়াদ (রা:) মদীনার একজন সম্মানিত ব্যক্তি এবং তাঁর আর্থিক অবস্থা ছিল সচ্ছল।

হযরত মুসআব (রা:) একজন দক্ষ সংগঠক এবং ভারসাম্যমূলক মেজাজের অধিকারী ছিলেন। সাবলীল ভাষায় তিনি ইসলামী আদর্শ মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারতেন এবং তাঁর নেতৃত্বের গুণাবলীর কারণে নবী করীম (সা:) তাকেই মদীনায় ইসলামী কার্যক্রম শুরু ও আন্দোলনকে সংগঠিত করার জন্য মনোনয়ন দান করেছিলেন। হযরত মুসআব (রা:) মদীনায় গিয়ে ব্যাপকভাবে ইসলামের পক্ষে জনমত গঠন করেন এবং মদীনার মানুষকে ইসলামী বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করতে থাকেন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মদীনার ঘরে ঘরে ইসলামের বিজয় কেতন উড়তে থাকে। তিনি কতটা দক্ষ সংগঠক এবং তাঁর মেজাজ কতটা ভারসাম্যমূলক ছিল, তা একটি ঘটনা দ্বারা প্রমাণ হয়। এক জনসমাবেশে তিনি মানুষের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করছিলেন। এমন সময় বনী আবদিল আশহালের নেতা উসাইদ ইবনে হুদাইর অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে উত্তেজিতভাবে তাঁর কাছে এলো।

সমবেত মুসলমানগণ লোকটির রণমূর্তি দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়লো। হযরত মুসআব (রা:) তাঁর দিকে মুখে হাসি টেনে তাকিয়ে রইলেন। তিনি নির্ভীকভাবে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনলেন। উসাইদ ক্রোধ কম্পিত কন্ঠে বলতে লাগলো, 'তুমি আমার দেশের লোককে বিভ্রান্ত করছো। তোমার যদি জীবিত থাকার সাধ থাকে তাহলে এই মুহূর্তে মদীনা ত্যাগ করো'।

মুখে মধুর হাসি টেনে হযরত মুসআব (রা:) তাকে বললেন, 'আপনি আমার কথা একটু ধৈর্য ধরে শুনুন। যদি আপনার ভালো না লাগে তাহলে আমি চলে যাবো। আপনি দয়া করে একটু বসুন'।

তাঁর কথা যাদুর মতই ক্রিয়া করলো। উসাইদ নীরবে সে বৈঠকে উপবেশন করলো। হযরত মুসআব (রা:) প্রথমে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করে কুরআনের ব্যাখ্যা পেশ করলেন। উসাইদ তখন মনোযোগ দিয়ে আল্লাহ তা'য়ালার কুরআন শুনছেন। তাঁর চেহারায় আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেলো। তিনি বললেন, 'তুমি যা বলছো তা অত্যন্ত সুন্দর এবং যুক্তির কথা। তোমার এই আদর্শ গ্রহণ করতে হলে কি করতে হবে?' হযরত মুসআব (রা:) প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়ার পর তিনি ইসলাম কবুল করলেন।

আউস গোত্রের নেতার নাম ছিল সাদ ইবনে মায়াজ। সমগ্র গোত্রে তাঁর মতো প্রভাবশালী অন্য কোনো নেতা ছিল না। গোত্রের প্রতিটি মানুষ তাঁর ইশারায় প্রাণদান করার জন্য প্রস্তুত থাকতো। নবী করীম (সা:) এর প্রেরিত দূত হযরত মুসআব (রা:) তাঁর কাছে গেলেন ইসলামের আদর্শ নিয়ে। সাদ তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলো। হযরত মুসআব (রা:) পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করলেন। কুরআনের প্রভাবে সাদের ভেতরের জগৎ ইসলাম গ্রহণের জন্য উর্বর হয়ে উঠলো। মুহূর্তকাল অপেক্ষা না করে তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণ করার সাথে সাথে গোত্রের প্রতিটি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করার জন্য প্রতিযোগিতা আরম্ভ করে দিয়েছিল। (আল্-বিদায়াতু ওয়ান্নেহায়াহ্, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-১৪৯)

হযরত মুসআব (রা:) মদীনায় ইসলামী জীবন ব্যবস্থার পক্ষে অত্যন্ত শক্তিশালী জনমত গঠন করলেন। ইসলাম এবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দেশ পরিচালনা করবে, সে মুহূর্ত প্রায় সমাগত। ক্ষণিক পরেই যেন বিজয়ের সিংহদ্বার উন্মুক্ত হবে। সে লক্ষ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন প্রায়। হযরত মুসআব (রা:) তাঁর কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে নবী করীম (সা:) কে অবগত করার লক্ষ্যে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করলেন। পুনরায় হজ্জের মৌসুম সমাগত হলো। মদীনা থেকে লোকজন হজ্জ আদায়ের লক্ষ্যে মক্কার দিকে রওয়ানা দিল। তাদের মধ্যে এমন লোকও ছিল যারা ইসলাম গ্রহণ করে মদীনাতেই মুসলমান হয়েছিল। হজ্জ আদায় কালে তাঁরা নবী করীম (সা:) এর সাথে কথা বলে জানিয়ে দিলেন আকাবায় পুনরায় সাক্ষাৎ হবে।

আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াত সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শী হযরত কা'ব ইবনে মালিক (রা:) বলেন, 'মদীনা থেকে আমরা আমাদের গোত্রের অমুসলিমদের সাথে হজ্জ আদায়ের জন্য মক্কায় যাত্রা করলাম। সে সময় আমরা নামায আদায় করি এবং ইসলাম সম্পর্কে কিছু জ্ঞান অর্জন করেছি। আমাদের গোত্রপতি বয়সে প্রবীণ বারা ইবনে মারুর আমাদের বললো, 'আমি তোমাদেরকে একটি বিষয় জানাবো। তোমরা আমার সাথে একমত হবে কিনা জানি না। আমি এখন থেকে কা'বার দিকে পেছন ফিরে নামাজ আদায় করবো না, কা'বার দিকে মুখ করেই নামাজ আদায় করবো'।

আমরা তাকে জানালাম, 'আমাদের নবী বাইতুল মাকদিসের দিকে ফিরে নামায আদায় করে থাকেন। আমরাও তাঁর অনুসরণ করি'।

গোত্রপতি জানালেন, 'তাহলে আমি কা'বা এবং বাইতুল মাকদিস এই উভয় দিকেই মুখ করে নামাজ আদায় করবো'। আমরা তাকে জানালাম, 'আমরা তোমার মত করবো না। আমাদের নবী যেমন করেন আমরাও তেমন করে নামায আদায় করবো'।

পথে আমরা নবী করীম (সা:) এর অনুকরণে নামায আদায় করতাম আর তিনি তাঁর মত অনুযায়ী নামায আদায় করতেন। মক্কায় আসার পরে তিনি আমাদেরকে বললেন, 'তোমরা আমাকে নবীর কাছে নিয়ে চলো। তোমাদের কথায় আমার মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করবো আমি ভুল না ঠিক করেছি'।

হযরত কা'ব (রা:) বলেন, 'আমরা নবী করীম (সা:) এর সন্ধানে বের হলাম। তাঁকে আমরা চিনতাম না। কারণ ইতোপূর্বে আমরা কেউ তাঁকে দেখিনি। মক্কার একজন লোককে আমরা জানালাম, 'মুহাম্মাদ (সা:) কে আমরা চিনি না কিন্তু তাঁর সাথে আমরা সাক্ষাৎ করতে ইচ্ছুক'। লোকটি আমাদেরকে প্রশ্ন করলো, আমরা মুহাম্মাদ (সা:) এর চাচা আব্বাসকে চিনি কিনা। আমরা তাকে জানালাম, তাঁকে আমরা চিনি। কারণ সে আমাদের গোত্রের পাশ দিয়ে অনেক বার আসা যাওয়া করেছে। লোকটি আমাদেরকে জানালো, মক্কার ঘরে হযরত আব্বাসের পাশে যাকে বসে থাকতে দেখবে সেই হলো তোমাদের কাঙ্খিত ব্যক্তি।

আমরা কা'বাঘরে প্রবেশ করে হযরত আব্বাসকে দেখলাম এবং তাঁর পাশে অপূর্ব সুন্দর একজন মানুষকে বসে থাকতে দেখলাম। আমরা সালাম দিয়ে তাঁর পাশে বসলাম। নবী করীম (সা:) তাঁর চাচাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'চাচা, আপনি কি এদেরকে চিনেন?'

হযরত আব্বাস বললেন, 'আমি এদেরকে চিনি। এদের একজন হলেন কা'ব ইবনে মালিক আরেকজন হলেন গোত্রপতি বারা ইবনে মারুর'।

হযরত কা'ব (রা:) বলেন, এবার আমার অবাক হবার পালা। নবী করীম (সা:) আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, 'আপনি সেই বিখ্যাত কবি কা'ব ইবনে মালিক!' আমি কুণ্ঠিত কণ্ঠে জবাব দিলাম, 'আমিই সেই ব্যক্তি'।

এ সময় গোত্রপতি বারা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমি মক্কায় যাত্রা করার পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছি। তারপর আমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম আমি মক্কাকে পিছনে করে নামায আদায় করবো না। মক্কাকে সামনে করে নামায আদায় করবো। কিন্তু আমার সাথীরা আমার সাথে একমত নন। আমি সন্দেহের মধ্যে আছি। আপনি বলে দিন আমি ঠিক করেছি কিনা'।

নবী করীম (সা:) বললেন, 'তুমি একদিকে মুখ দিয়ে নামায আদায় করতে, ধৈর্যের সাথে সেদিকেই মুখ করে নামায আদায় করলে উত্তম হতো'।

এরপর গোত্রপতি বারা আমাদেরকে অনুসরণ করে বাইতুল মাকদিসের দিকে মুখ করে নামায আদায় করতে থাকলেন। আমরা হজ্জের অনুষ্ঠান আদায় করে পরবর্তী রাতে নবী করীম (সা:) এর সাথে আকাবায় মিলিত হবার জন্য প্রস্তুত হলাম। এ সময় আমাদের সাথে মদীনার প্রভাবশালী ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ছিলেন। আমরা তাঁকেও আমাদের সাথে নিলাম। জাবির নামে আরেকজন সম্মানিত ব্যক্তি আমাদের সাথে ছিল। আমারা কোথায় কি করতে যাচ্ছি তা কাউকে জানালাম না।

পরে আমি জাবিরকে বললাম, 'আপনি আমাদের মধ্যে একজন সম্মানিত ব্যক্তি। আপনি যে জীবন ব্যবস্থা মেনে চলেন তা ঠিক না। আপনি মৃত্যুর পরে জাহান্নামে যান এটা আমরা চাই না। আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন'।

তিনি তখনই ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং তাকে আমরা জানালাম, আজ রাতে আমরা নবী করীম (সা:) এর সাথে আকাবায় সাক্ষাৎ করবো। পরে তিনি আমাদের পথ প্রদর্শনকারী হয়েছিলেন। সেই রাতে আমরা আমাদের সাথীদের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকলাম এবং গভীর রাতে উঠে আমরা আকাবার দিকে গোপনে যাত্রা করলাম। সে সময় আমাদের সংখ্যা দুইজন নারীসহ মোট ৭৩ জন ছিল। আমরা সেখানে সমবেত হয়ে নবী করীম (সা:) এর জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর তিনি তাঁর চাচা হযরত আব্বাসকে সাথে নিয়ে এলেন। হযরত আব্বাস সে সময় পর্যন্তও ইসলাম গ্রহণ করেননি কিন্তু তিনি রাসূল (সা:) এর নিরাপত্তার জন্য তাঁর সাথে থেকে তাঁর কাজে সহায়তা করতেন।

এরপর হযরত আব্বাস সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, 'হে সমবেত মদীনাবাসী! আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, আমাদের কাছে মুহাম্মাদ (সা:) এর মর্যাদা কতটা উচ্চে। তাঁকে আমরা বিভিন্ন ধরনের বিপদ থেকে এ পর্যন্ত নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করেছি। তিনি তাঁর এলাকাবাসীর মধ্যে এক অভূতপূর্ব কর্ম সম্পাদন করেছেন। এ কারণে তিনি আমাদের মধ্যে সম্মান ও নিরাপত্তার অধিকারী। তবুও তিনি আপনাদের মধ্যে থাকতে পছন্দ করছেন এবং আপনাদের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ। এখন আপনারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন, আপনারা যে ওয়াদা তাঁকে দিচ্ছেন সে ওয়াদা শেষ পর্যন্ত পালন করতে পারবেন কিনা। তাঁর নিরাপত্তাদান করতে পারবেন কিনা। তাঁর সব ধরণের দায়িত্ব আপনারা গ্রহণ করতে পারবেন কিনা। কারণ তিনি আমাদের মধ্যে নিরাপত্তা এবং সম্মানের সাথেই অবস্থান করছেন'।

হযরত আব্বাস (রা:) এর কথা শেষ হতেই আমরা বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমরা সকল কিছুতেই রাজি আছি, আপনি আমাদের বাইয়াত গ্রহণ করুন'।

নবী করীম (সা:) পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করে উপস্থিত সবাইকে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য দাওয়াত দিয়ে বললেন, 'আমি তোমাদের কাছ থেকে একটি অঙ্গীকার চাই, তোমরা তোমাদেও পরিবার-পরিজনের যেভাবে দেখাশোনা করো, যেভাবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করো, আমার ক্ষেত্রে তেমনই করবে কিনা'।

আমাদের গোত্রপতি বারা তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে নবী করীম (সা:) এর হাত ধরে বললেন, 'যে মহান আল্লাহ তা'য়ালা আপনাকে সত্য জীবন ব্যবস্থাসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর নামে শপথ করে ওয়াদা করছি, আমরা আমাদের পরিবার-পরিজনের যেভাবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করি সেই একইভাবে আপনার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবো। আপনি আমাদের যেদিকে পরিচালিত করবেন সেদিকেই আমরা যাবো। আমরা যোদ্ধা জাতি, তরবারীর ছায়ায় আমরা লালিত পালিত। আমরা অস্ত্র এবং যুদ্ধের মধ্যেই জীবিত থাকি। আমরা আপনার অনুগত্য করবো'।

এরপর আরেকজন নেতা আবুল হাইসাম বললো, 'আমরা ইয়াহুদীদের সাথে মৈত্রী চুক্তি করেছিলাম এবং সে সম্পর্ক শেষ করে দিতে যাচ্ছি। (অর্থাৎ আপনাকে গ্রহণ করার অর্থই হলো ইয়াহুদীদের সাথে সম্পর্ক শেষ করে দেয়া) আপনার জন্য আমরা ত্যাগ স্বীকার করবো, এরপর আপনি যখন বিজয়ী হবেন তখন আমাদেরকে ছেড়ে যাবেন না তো?'

তাঁর কথা শুনে নবী করীম (সা:) মৃদু হেসে বললেন, 'আমি তোমাদের জীবন এবং মৃত্যু, সুখ এবং দুঃখের চিরদিনের সাথী হয়েই তোমাদের সাথে অবস্থান করবো। তোমাদের রক্তকে আমি আমার নিজের রক্ত বলে মনে করবো। আমি চিরকালের জন্য তোমাদের আর তোমরা আমার। তোমরা যার সাথে যুদ্ধ করবে আমিও তাদের সাথে যুদ্ধ করবো এবং তোমরা যার সাথে আপোষ করবে আমিও তার সাথে আপোষ করবো। যারা তোমাদের শত্রু তারা আমারও শত্রু, আর যারা আমার শত্রু তারা তোমাদেরও শত্রু'।

এরপর নবী নবী করীম (সা:) সমবেত লোকদের বললেন, 'তোমরা তোমাদের মধ্য থেকে ১২ জন লোককে প্রতিনিধি করে আমার কাছে প্রেরণ করো। তাঁরা তাদের লোকদের কাছ থেকে আমার পক্ষ থেকে ওয়াদা গ্রহণ করবে'। এরপর তিনি আমাদের প্রতি আদেশ দিলেন, আমরা যেন নিজেদের অবস্থানে চলে যাই। আমাদের মধ্যে থেকে আব্বাস ইবনে উবাদা বললো, 'হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনি আমাদেরকে আদেশ করলে আমরা ইসলামের শত্রুদের ওপরে আক্রমণ করতে পারি'।

নবী করীম (সা:) তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমাকে এ ধরনের কাজের জন্য প্রেরণ করা হয়নি। তোমরা নিজেদের অবস্থানে চলে যাও'।

নবী করীম (সা:) এর কাছে মদীনার লোকজন যখন বাইয়াত গ্রহণ করছিল, তখন তাদের মধ্য থেকে হযরত সা'দ (রা:) উঠে দাঁড়িয়ে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করেছিলেন, 'তোমরা কি জানো তোমরা কোন্ কথার ওপর বাইয়াত করছো? নবীর কাছে বাইয়াত করার অর্থ হলো সমগ্র পৃথিবীর মানুষ এবং জ্বীনকে নিজের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা। গোটা দুনিয়াকে নিজের শত্রুতে পরিণত করা'।

সমবেত লোকগুলো সমস্বরে বলে উঠেছিল, 'আমরা জেনে বুঝেই বাইয়াত করছি। এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো শক্তিকে আমরা ভয় করি না। আমরা তরবারীর ছায়ায় লালিত পালিত'।

যে ১২ জনকে নবী করীম (সা:) আহ্বায়ক নিযুক্ত করেছিলেন, তাঁরা সবাই ছিল বিভিন্ন গোত্রের গোত্রপতি। নিজের সমাজে সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তাদের মতো ব্যক্তিত্ব ইসলামের সহযোগী হওয়ার অর্থই ছিল গোত্রের সকল জনশক্তি ইসলামের পক্ষাবলম্বন করা। পৃথিবীতে মহাসত্য প্রাথমিক অবস্থায় নিঃসঙ্গ থাকে এ কথা সত্য, কিন্তু এ নিঃসঙ্গতার অবসান ঘটতে খুব একটা সময়ের প্রয়োজনও হয় না। একটি আদর্শের ক্ষেত্রে দশ বিশ বছর তেমন একটা সময় না। এই পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, একটি আন্দোলন বিজয়ী হতে কয়েক যুগ সময়ের প্রয়োজন হয়েছে। আন্দোলনের নেতা-কর্মীগণ চরম প্রতিকুল অবস্থা পাড়ি দিয়ে ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মুকাবিলা করে তারপর সাফল্যের সিংহদ্বারে উপনীত হয়েছেন।

ইসলামী আদর্শকে বিজয়ী আদর্শ হিসাবে দেখতে হলে দু'টো শর্ত পূরণের প্রয়োজন হয়। প্রথম শর্ত হলো, ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে গঠিত একদল নিষ্ঠাবান সুশৃংখল কর্মী বাহিনী প্রয়োজন। যারা আদর্শের জন্য যে কোনো ত্যাগ হাসি মুখে স্বীকার করতে পারে। যে কোনো ধরনের নির্যাতন থেকে শুরু করে অর্থ-সম্পদের শেষ তলানিটুকুও নিঃশেষে বিলিয়ে দিয়ে প্রাণদানও করতে পারে। যে কর্মী বাহিনী প্রশ্নাতীতভাবে নেতৃ আদেশ বাস্তবায়ন করতে পারে।

দ্বিতীয় যে শর্ত পূরণ করা প্রয়োজন তাহলো, আদর্শের পক্ষে বিপুল জনসমর্থন থাকতে হবে। কারণ ইসলামী আদর্শ কোনো জাতির ওপরে চাপিয়ে দেয়ার আদর্শ নয় এবং ইসলাম কোনো জাতির ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের ঘাড়ের ওপরে বসতে মোটেও আগ্রহী নয়। এ কারণে জনসমর্থন যোগাড় বা জনমত গঠনের জন্য এ আদর্শের কর্মীদের প্রতিটি মুহূর্তে তৎপর থাকতে হয়। মক্কা এবং মদীনার ইতিহাসে আমরা এ কথার বাস্তব প্রমাণ দেখতে পাই। নবী করীম (সা:) মক্কায় কর্মী গঠন করেছেন। ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়নে যে গুণ এবং মানসম্পন্ন কর্মী প্রয়োজন সে ধরনের কর্মী মক্কাতেই তৈরী হয়েছিল। কিন্তু মক্কায় ইসলামের পক্ষে জনমত গঠিত হয়নি। মদীনায় ইসলামের পক্ষে ক্রমশঃ জনমত গঠন হয়। ফলে যে বিপ্লব হবার কথা মক্কায় তা হয়েছিল মদীনায়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ প্রক্রিয়াতেই ইসলামকে বিজয়ী করে থাকেন এবং এটিই নবী করীম (সা:) এর সীরাত।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 চাঁদ নয়, আপনিই বেশী সুন্দর

📄 চাঁদ নয়, আপনিই বেশী সুন্দর


মদীনায় হিজরতকালে বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে সন্ত্রাসীদের দৃষ্টি এড়িয়ে নবী করীম (সা:) এবং হযরত আবু বকর (রা:) সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। সে পথ ধরেই হযরত যুবাইর (রা:) সিরিয়া থেকে ব্যবসায়িক পণ্যসহ মক্কায় ফিরছিলেন। নবী করীম (সা:) এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটলো। হযরত যুবাইর (রা:) তাঁদেরকে কয়েকটি কাপড় উপহার দিলেন। সেই দুঃসময়ে অসহায় অবস্থায় ঐ সামান্য কাপড় যেন অসামান্য হয়ে দেখা দিয়েছিল। কিছুদূর এগিয়ে যাবার পরে পুনরায় নবী করীম (সা:) বাধার মুখোমুখি হলেন। মক্কার ইসলাম বিরোধিরা বিশ্বনবী (সা:) কে গ্রেফতার করতে পারলে কি পুরস্কার পাওয়া যাবে তা দূর-দূরান্তেও প্রচার করে দিয়েছিল। পুরস্কারের লোভে অনেকেই নবী করীম (সা:) এর সন্ধানে বের হয়েছিল। আসলাম গোত্রের প্রধান বারিদা তাঁর অনুগত ৭০ জন সাহসী যোদ্ধাসহ অবরোধ করেছিলো। নবী করীম (সা:) সে পথেই মদীনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

সামনে একদল অস্ত্রে সজ্জিত লোক দেখে নবী করীম (সা:) মধুর কন্ঠে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াৎ করতে থাকলেন। পবিত্র কুরআনের জান্নাতি সুরের তরঙ্গ সম্মুখে দণ্ডায়মান মানুষগুলোর কানে প্রবেশ করে তাদের ভেতরের জগৎ সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দিল। যেখানে ছিল অন্ধকার সেখানে পবিত্র কুরআনের সুর মুহূর্তে তাওহীদের পবিত্র উজ্জ্বল শিখা জ্বালিয়ে দিল। আসলাম গোত্র প্রধান বারিদা বিনয়ের ভঙ্গিতে রাসূল (সা:) এর দিকে এগিয়ে এলেন।

নবীর পবিত্র মুখমণ্ডলের প্রতি কিছুক্ষণ নির্নিমেষে তাকিয়ে রইলেন। এই মানুষটি সম্পর্কে মক্কার আবু জাহিল আর তার দলবল যে মিথ্যে অপবাদ প্রচার করেছে তা যেন গোত্র প্রধান বিশ্বনবী (সা:) এর পবিত্র চেহারায় অনুসন্ধান করতে লাগলেন। দীর্ঘক্ষণ তিনি দেখলেন। পবিত্র চেহারা দেখে তাঁর যেন সাধ আর মিটে না। মানুষটির মুখে সামান্যতম কলংকের আঁচড় নেই। তাহলে আবু জাহিলরা যা প্রচার করেছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা! আকাশের চাঁদেও সামান্য কালো দাগ আছে, কিন্তু আল্লাহর নবীর চেহারায় তা-ও নেই।

বারিদা নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলেন না। দীন ভিখারীর মতই বিশ্বনবীর কাছে আত্মসমর্পণ করে জানালেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমাদের ক্ষমা করুন! অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে আমরা আপনার বিরুদ্ধে এখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমাদের আপনি মুসলমানদের দলে স্থান করে দিন'।

একথা বলেই আসলাম গোত্র প্রধান বারিদা কালিমা পাঠ করে মুসলমান হয়ে গেলেন। তাঁর কন্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে তাঁর সকল সাথী বজ্রকণ্ঠে কালেমা পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করলেন।

মহান আল্লাহর কি অদ্ভুত ব্যবস্থা! কোথায় নবী করীম (সা:) একাকী ছিলেন। মানুষের পক্ষ থেকে তাঁর কোনো নিরাপত্তার সামান্য ব্যবস্থা ছিল না। আর এখন তাঁর নিরাপত্তায় ৭০ জন বীর যোদ্ধা অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাঁকে প্রহরা দিচ্ছে। বারিদা (রা:) এর সাথের যোদ্ধারা তাদের শিরস্ত্রাণ বর্শার অগ্রভাগে বেঁধে পতাকা বানিয়ে নিয়ে সে পতাকা উড়িয়ে সামনে অগ্রসর হলো। এক বিশাল মিছিল মহাসত্যের বিজয় কেতন উড়িয়ে আল্লাহর নবীকে পরিবেষ্টন করে মদীনা অভিমুখে এগিয়ে চললো।

ইসলামপন্থীদের প্রাণপ্রিয় শ্লোগান 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনীতে দিগদিগন্ত মুখরিত হয়ে উঠলো। মহাত্রাসে বাতিল শক্তি থরথর করে কেঁপে উঠলো। ইসলাম বিদ্বেষী বন্ধুরা দেখুন, ইসলাম তরবারীর শক্তিতে নয়, কোন্ শক্তির কারণে ইসলাম পৃথিবী ব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা অনুধাবন করে অনুগ্রহ পূর্বক সত্য উপলব্ধি করে উদারতার পরিচয় দিন।

৭০ জন রক্ত পিপাসু ভয়ংকর সন্ত্রাসী কিভাবে কোন্ মায়াবলে মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবে পরিণত হলো! যারা নবী করীম (সা:) কে হত্যা করে ১০০ উট পুরস্কার গ্রহণ করবে, তাঁরাই তাঁর সামনে এসে নিজেদের ঘৃণ্য সন্ত্রাসী প্রবৃত্তিকে হত্যা করে এমন এক জীবন গ্রহণ করলো, পৃথিবী ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে শতকোটি মানুষ পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।

৭০ টি ঘোড়ার পিঠে ৭০ জন বীর যোদ্ধা, তাদের হাতের সুতীক্ষ্ম তরবারী সূর্য কিরণে ঝলসে উঠে ইসলামের বিজয় ঘোষণা করলো। বারিদা (রা:) সামনে অগ্রসর হচ্ছেন আর কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। তাঁর সে কবিতার অর্থ হলো, 'শান্তির সম্রাটের আগমন ঘটেছে। মুক্তিদাতা আগমন করছেন। যিনি সন্ধি স্থাপন করবেন তিনি আগমন করছেন। যিনি সত্য এবং ন্যায় স্থাপন করে পৃথিবীতে জান্নাতের শান্তি প্রতিষ্ঠিত করবেন তিনি আগমন করছেন। পৃথিবীবাসীর কাছে আজকের এটাই শুভ সংবাদ'। (ইবনে জওযী, আল ইসাবা, মাদারেজ)

বিশ্বনবী (সা:) মদীনা যাওয়ার সহজ পথ পরিহার করে গোপন পথে যাত্রা করেছিলেন। সে পথ ছিল বড় বন্ধুর। পথ প্রদর্শক তাদেরকে নিয়ে মক্কার নিম্ন অঞ্চল দিয়ে প্রথমে উপকূল এলাকায় গিয়েছিল। সেখান থেকে উসফান এলাকার নিম্ন অঞ্চল দিয়ে আমাজের নিম্ন এলাকা হয়ে কুসাইদ এলাকা অতিক্রম করে খাররার নামক স্থানে এসে থেমে ছিল। তারপর লেকফ এবং মাদলাজ লেকফ এলাকা অতিক্রম করে মাদলাজ মাহাম নামক স্থানে উপনীত হয়েছিল।

এরপর মারজাহ মাহাজ নামক স্থান, সেখান থেকে মারজাহ যিল গাদাওয়াইন নামক স্থান, সেখান থেকে বাতন যি, কাশর এবং জাদাজিদ, আজরাদ এসে থেমেছিল। তারপর মাদলাজা তিহিন এবং আবাবিদ আল ফাজ্জাহ অতিক্রম করেছিল। এরপর তাঁরা আরজ নামক স্থানে এসে উপনীত হয়েছিলেন।

এই স্থানের অধিবাসীরা নবী করীম (সা:) কে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য পূর্ব হতেই প্রতীক্ষার প্রহর গুনছিল। এখানে আসলাম গোত্রের হযরত আওস ইবনে হাজার (রা:) তাঁর নিজের উটে আরোহন করিয়ে এবং তাঁর এক গোলামকে নবী (সা:) এর সাথে দিয়ে মদীনা যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এরপর তাঁরা রুকুবার দক্ষিণ পাশ অতিক্রম করে সানিয়াতুল আয়ের পথ দিয়ে বাতনু রিম নামক স্থানে এসে উপনীত হয়েছিল। এখান থেকেই বিশ্বনবী (সা:) মদীনার কুবা এলাকায় বনী আমর ইবনে আউফ গোত্রে এসে পৌঁছেছিলেন। সেদিন তারিখ ছিল রবিউল আওয়াল মাসের ১২ তারিখ এবং সময় ছিল প্রখর রোদে ঝলসানো দুপুর। (ইবনে হিশাম এবং ইবনে ইসহাক)

ফন্ট সাইজ
15px
17px