📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 বিশ্বনবীর মর্যাদাগত কারণে আল্লাহ তাঁর নবীর জীবনের শপথ করেছেন

📄 বিশ্বনবীর মর্যাদাগত কারণে আল্লাহ তাঁর নবীর জীবনের শপথ করেছেন


নবী করীম (সা:) এর পূর্বে প্রেরিত কোনো নবী-রাসূল এবং তাঁরা যে এলাকায় বসবাস করতেন সেই এলাকার নাম উল্লেখ পূর্বক অথবা উক্ত নবী-রাসূলদের জীবনের শপথ আল্লাহ তা'য়ালা করেছেন, এমন দৃষ্টান্ত পবিত্র কুরআনে কোথাও সন্ধান করে পাওয়া যাবে না। কিন্তু নবী করীম (সা:) এর মর্যাদা মহান আল্লাহ তা'য়ালা এতই উচ্চ করেছেন যে, স্বয়ং আরশে আযীমের মালিক- সমগ্র সৃষ্টিজগত ও সৃষ্টির মালিক আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রিয় হাবীবের জীবনের শপথ করেছেন-

لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُوْنَ -

(আল্লাহ তা'য়ালা বললেন, হে নবী,) আপনার জীবনের শপথ (করে বলছি, সেদিন) এরা নিদারুণ এক নেশায় বিভোর হয়ে পড়েছিলো (আল্লাহর গযবের কোনো কথাই এরা বিশ্বাস করলো না)। (সূরা হিজর-৭২)

মহান আল্লাহ তা'য়ালা মর্যাদাগত কারণে শুধু নবী করীম (সা:)-এর জীবনের শপথই করেননি, তাঁর মহান নবী যে নগরীতে জন্ম গ্রহণ করলেন, যে স্থান তাঁর শৈশব, কৈশর, তারুণ্য ও যৌবনের চারণভূমি সেই পবিত্র মক্কা নগীরও শপথ করেছেন- لَا أُقْسِمُ بِهَذَا الْبَلَدِ لَا وَأَنْتَ حِلْمٍ بِهَذَا الْبَلَدِ لا

আমি শপথ করছি এ (পবিত্র) নগরীর, এ নগরীতে আপনি (সম্পূর্ণ) স্বাধীন। (সূরা বালাদ-১-২)

পবিত্র মক্কা নগরী সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। এখানে সকল প্রাণী নিরাপত্তা লাভসহ স্বস্তি ও শান্তি লাভ করে। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় পবিত্র কুরআনের গবেষকগণ বলেছেন, 'নবী করীম (সা:) মক্কা নগরীতে প্রবাসী কোনো ব্যক্তি নন, তিনি ভিন্ন কোনো এলাকা থেকে এসেও এখানে বসতি স্থাপন করেননি। তিনি এই নগরীতেই জন্মগ্রহণ করেছেন, তাঁর শৈশব, কৈশর ও যৌবনের চারণভূমি এই নগরী। এখানেই তিনি নবুয়‍্যাত লাভ করেছেন এবং তিনি এখানে অবস্থান করছেন। এসব কারণে এই নগরীর মর্যাদা ও গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে'।

আল্লাহ তা'য়ালা সূরা বালাদের উক্ত আয়াতে বলছেন, 'এটা আপনার আপন এলাকা, আপনার পবিত্র জন্মভূমি। যেখানে আপনি সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং যে কোনো স্থানে গমন ও বিচরণ করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আপনার রয়েছে। অথচ এই নগরীর পরিবেশ আপনার জন্যে এক শ্বাসরুদ্ধকর করে তুলেছে ইসলাম বিরোধী গোষ্ঠী। আপনার প্রিয় স্মৃতি বিজড়িত মাতৃভূমি- আপনার চারণভূমিকে আপনারই জন্যে কন্টকাকীর্ণ করে তুলেছে মিথ্যার অন্ধ পূজারীরা। যে নগরীর প্রত্যেক ধূলিকণা আপনার জন্যে প্রশান্তি দায়ক, সেই নগরীর প্রতি ধূলিকণাকে আপনার জন্যে শাণিত অস্ত্রের রূপ দেয়া হয়েছে'।

যেখানে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রাতি একটি প্রাণীকেও নিরাপত্তা দিচ্ছে সত্যের শত্রুরা, পরম আপনজনের হত্যাকারীকেও যে এলাকায় নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। সেই পবিত্র এলাকায় আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল (সা:) এর এবং তাঁর কোনো অনুসারীর নিরাপত্তা নেই। সেই মহাপবিত্র এলাকায় বিশ্বনবী (সা:) এর পূত পবিত্র দেহের রক্ত ঝরানো বৈধ করা হয়েছে। হালাল করা হয়েছে তাঁদের রক্ত, যারা মহান আল্লাহর অনুগত বান্দাহ্। পবিত্র হারাম শরীফে আল্লাহর রাসূল মহান আল্লাহকে সিজদা দিচ্ছেন, সমগ্র সৃষ্টিজগতের রব-এর উদ্দেশ্যে সিজদায় লুটিয়ে পড়েছেন, এই অবস্থায় তাঁর মাথার ওপরে উটের পচা দুর্গন্ধযুক্ত নাড়িভূড়ি চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।

তাঁর পবিত্র কণ্ঠনালীতে কাপড় পেঁচিয়ে দু'দিক থেকে এমনভাবে টেনে ধরা হয়েছে, আল্লাহর রাসূলের শ্বাস বন্ধ হয়ে তাঁর চোখ মোবারক কোঠর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। আল্লাহর অনুগত বান্দাহ্ মুসলমানদেরকে এই পবিত্র স্থানে রক্তাক্ত করা হয়েছে। যে কোনো প্রাণী, উদ্ভিদ এবং চরম শত্রুর জন্যেও যে এলাকায় বৈধ অবৈধের সীমা অনুসরণ করা হয়েছে, সেই সীমা অনুসরণ করা হয় নি শুধু আল্লাহর রাসূল (সা:) ও তাঁর অনুসারীদের ক্ষেত্রে।

তাঁর অপরাধ (!) একটিই, তিনি মানুষকে মহাসত্যের দিকে আহ্বান জানাচ্ছেন। মানুষকে শোষণ, বঞ্চনা, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, অন্যায়-অত্যাচার থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে আন্দোলন করছেন। তাঁর অনুগত লোকদের অপরাধ (!) তাঁরা একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো গোলামী করতে রাজী হয়নি। এদের একমাত্র অপরাধ হলো, এরা মহা প্রশংসিত মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে। এই অপরাধেই মক্কার জাহিল লোকগুলো তাদের সহায়-সম্পদ, দেহের রক্ত ও প্রাণ পবিত্র এলাকায় বৈধ করে নিয়েছে। মক্কার লোকগুলোও যেমন কা'বা এলাকায় ক্ষুদ্র একটি মশাকে হত্যা করাও অপরাধ মনে করতো, কিন্তু সেই একই এলাকায় কোনো মুসলমানকে হত্যা করা অপরাধ মনে করতো না। অর্থাৎ এদের কাছে ক্ষুদ্র একটি প্রাণীর প্রাণের যে মূল্য ও মর্যাদা ছিল, একজন মুসলমানের প্রাণের সে মূল্য ছিল না।

বর্তমানে অমুসলিম শক্তির কাছেও মুসলমানদের প্রাণের কোনো মূল্য নেই। বনের হিংস্র প্রাণীর মূল্য তাদের কাছে অনেক বেশি এবং এসব প্রাণী সংরক্ষণের জন্যে তারা অকাতরে অর্থ ব্যয় করছে। হিংস্র পশুর চারণভূমি গ্রীষ্মের মৌসুমে প্রায় পানি শূন্য হয়ে পড়ে। অমুসলিম রাষ্ট্রসমূহ সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের কাছ থেকে শোষণকৃত অর্থ ব্যয় করে ঐসব এলাকায় জলাধার নির্মাণ করে দিচ্ছে, যেন কোনো পশু পানি সঙ্কটে না পড়ে। বাঘ, সিংহ, শৃগাল, কুকুর, শুকর থেকে শুরু করে সামান্য একটি টিকটিকির মতো প্রাণীকেও তারা আধুনিক চিকিৎসা উপকরণে সজ্জিত ক্লিনিকে অত্যন্ত যত্নের সাথে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলে।

একবার আটলান্টিক মহাসাগরে বেশ কয়েকটি তিমি বরফে আটকা পড়লো। ইউরোপ- আমেরিকার কয়েকটি দেশ তড়িঘড়ি করে সেখানে 'আইস কাটার' বরফ কাটা জাহাজ প্রেরণ করে তিমিগুলো উদ্ধার করে সাগরে ছেড়ে দিল। এভাবে বরফে আটকা পড়া তিমিকে উদ্ধার করে এবং এসব দৃশ্য প্রচার মাধ্যমে বার বার প্রচার করে তারা বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে থাকে, প্রাণীর প্রতি তারা কতটা দরদী।

দরদ নেই শুধু মুসলমানদের ক্ষেত্রে। সে যুগের মক্কার জাহিলদের অনুকরণে আধুনিক জাহিলরাও মুসলমানদের প্রাণের কোনো মূল্য দিচ্ছে না। এক আল্লাহ তা'য়ালাকে তারা বিশ্বাস করে, কুরআনকে তারা মহান আল্লাহর বাণী হিসেবে বিশ্বাস করে, শুধুমাত্র এই অপরাধে (!) মুসলিম নারীদের ইজ্জত-আব্রু হালাল করে নেয়া হয়েছে। মুসলিম শিশু, কিশোর, তরুণ-যুবকদেরকে পাখির মতো গুলী করে হত্যা করা হচ্ছে। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া হচ্ছে। বন্দী মুসলমানদেরকে পেছনের দিকে হাত দু'টো বেঁধে খাঁচায় আবদ্ধ করে রাখা হচ্ছে। গর্ভবতী মুসলিম নারীর পেট চিরে গর্ভের শিশুকেও হত্যা করা হচ্ছে। মাতা-পিতার শান্তির কোল থেকে শিশু ছিনিয়ে নিয়ে পাথরে আছড়ে হত্যা করা হচ্ছে। সামান্য একটি পিঁপড়ার যে মূল্য রয়েছে, বর্তমান পৃথিবীতে অমুসলিমদের কাছে মুসলমানের সেই মূল্য নেই। বর্তমান জাহিলদের পূর্বসূরী আরব জাহিলদের চরিত্রে যে গুণ ও বৈশিষ্ট ছিল, সেই একই গুণ ও বৈশিষ্ট বহন করছে আধুনিক জাহিলরা। আল্লাহ তা'য়ালার বিধানের শত্রুদের চারিত্রিক মান, গুণ ও বৈশিষ্ট প্রত্যেক যুগে একই রকম ছিল, এদের চরিত্র অপরিবর্তনীয়।

ইসলামের দুশমনরা নবী করীম (সা:) এর মর্যাদাক্ষুণ্ণকর কর্মকাণ্ড করছে আর মুসলিম নামধারী অগণিত জনগোষ্ঠী নীরবে দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা নির্দেশ দিচ্ছেন- لِتُؤْمِنُوْا بِاللَّهِ وَرَسُوْلِهِ وَتُعَزِّرُوْهُ وَتُوَقِّرُوْهُ ط وَتُسَبِّحُوْهُ بُكْرَةً وَأَصِيْلًا- যাতে করে তোমরা (একমাত্র) আল্লাহর ওপর এবং তাঁর নবীর ওপর (সর্বোতভাবে) ঈমান আনো, (দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে) তাঁকে সাহায্য করো, (আল্লাহর নবী হিসাবে) তাঁকে সম্মান করো; (সর্বোপরি) সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহ তা'য়ালার মাহাত্ম্য ঘোষণা করো! (সূরা আল ফাতাহ্-৯)

ইতোপূর্বে প্রেরিত নবী-রাসূলদের সাথে বিদ্রোহ করার অপরাধে মহান আল্লাহ তা'য়ালা সেসব এলাকায় বিদ্রোহী জাতির ওপর আযাব অবতীর্ণ করে জনপদ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন। মক্কা নগরীর ইসলাম বিরোধিদের ওপর আযাব অবতীর্ণ করে তাদের নিশ্চিহ্ন করেননি শুধু মাত্র নবী করীম (সা:) এর মর্যাদার খাতিরে। যে পবিত্র নগরীতে তাঁর প্রিয় হাবীব এবং সবথেকে বেশি মর্যাদাবান নবী জন্মগ্রহণ করেছেন, সেই নগরীর ওপর তিনি আযাব অবতীর্ণ করেননি। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيْهِمْ ط وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ- আল্লাহ তা'য়ালা এমন নন যে, তিনি তাদের কোনো আযাব দিবেন, অথচ আপনি (এখনো) তাদের মধ্যে (বর্তমান) রয়েছেন; আর আল্লাহ তা'য়ালা এমনও নন যে, কোনো (জাতির) মানুষদের তিনি শান্তি দিবেন, অথচ তারা (কিছু লোক) তখনও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছে। (সূরা আনফাল-৩৩)

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি প্রাণাধিক ভালোবাসা- ঈমানের অপরিহার্য দাবী

📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি প্রাণাধিক ভালোবাসা- ঈমানের অপরিহার্য দাবী


পবিত্র কুরআন ও হাদীসে নবী করীম (সা:) কে সর্বাধিক গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং সৃষ্টিসমূহের মধ্যে তাঁর যে অতুলনীয় মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে, এসব দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে স্পষ্টতই বুঝা যায়, একজন মুসলিম যদি পূর্ণ মুমিন হতে চায় তাহলে তাকে অবশ্য অবশ্যই নবী করীম (সা:) কে নিজ পরিবার পরিজন, সন্তান-সন্ততি, ধন-সম্পদ এমন কি নিজ প্রাণের তুলনায় অধিক ভালোবাসতে হবে। তাঁর প্রতি নিখাদ এবং সর্বাধিক ভালোবাসা না থাকলে কোনো মুসলিমের পক্ষে মুমিনের পূর্ণ স্তরে উপনীত হওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে -

عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُ كُمْ حَتَّى أَكُوْنَ اَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَ وَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ

হযরত আনাস (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন, তোমাদের কেউই ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যে পর্যন্ত না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান- সন্ততি ও সকল মানুষ অপেক্ষা অধিক প্রিয় হই। (বুখারী, মুসলিম)

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم لَا يُؤْمِنُ أَحَدُ كُمْ حَتَّى يَكُوْنَ هَوَاهُ تَبْعًا لِّمَا خِفْتُ بِهِ -

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ আকাংখিত মানের মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের প্রবৃত্তিকে আমার আনীত বিধানের অধীন করে। (শরহে সুন্নাহ্- মিশকাত)

নবী করীম (সা:) এর প্রতি ভালোবাসার অর্থ এটা নয় যে শুধুমাত্র কিছু সময় তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ করা। মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা, রবিউল মাসের আগমনে রং বেরংয়ের ফেস্টুন বানিয়ে বিশাল মিছিল করা, তাঁর জীবনী আলোচনার উদ্দেশ্যে মাহফিলের আয়োজন ইত্যাদি করে নবী করীম (সা:) এর ভালোবাসার হক আদায় হয়ে যাবে।

স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা রাসূল (সা:) এর প্রতি দরূদ প্রেরণ করেন, তিনি ফিরিশতা ও মানুষকে তাঁর রাসূলের প্রতি দরূদ প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন, সুতরাং রাসূলের প্রতি দরূদ পাঠ করা বাধ্যতামূলক এবং তাঁর নাম শোনামাত্র দরূদ পাঠ না করলে গোনাহগার হতে হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। নবী করীম (সা:) এর প্রতি ভালোবাসা পোষণকারী মুসলমানদের মধ্যে দু'টি শ্রেণী দেখা যায়। একটি শ্রেণী নবী করীম (সা:) এর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায় এভাবে, তিনি পাগড়ী, টুপি ও লম্বা জামা ব্যবহার করেছেন, এরাও তাই করে। তিনি নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজ্জ আদায় করেছেন, এরাও তাই করে। তিনি বিশেষ বিশেষ খাদ্য পছন্দ করেছেন, এরাও তাই পছন্দ করে। তিনি নফল নামাজ আদায় করেছেন, তাসবীহ-তাহলীল পাঠসহ কুরআন তিলাওয়াত করেছেন, এরাও তাই করে। এই শ্রেণীর মধ্যে কেউ কেউ রাসূলের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে রবিউল মাসের আগমনে তাঁর জীবনী আলোচনা, মিলাদ মাহফিল, নানা রংয়ের ফেস্টুন বানিয়ে মিছিল এবং রাসূল (সা:) এর উদ্দেশ্যে নানা ধরনের আবৃত্তি ও গান বা হামদ-নাতের আয়োজনও করে।

আরেকটি শ্রেণীকে আমরা দেখতে পাই, তাঁরা রাসূল (সা:) কে ভালোবেসে কেউ কেউ দাড়ি রাখে, লম্বা জামাও ব্যবহার এবং নামাজ আদায় করে সেই সাথে নামাজের শিক্ষা সাহাবায়ে কেরামের মতো সকল স্তরে বাস্তবায়নের চেষ্টাও করে। এরাও যাকাত আদায়ের মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরামের অনুরূপ যাকাত ভিত্তিক অর্থনীতি চালু করার লক্ষ্যে আন্দোলন করে। এরাও হজ্জ আদায় করে এবং হজ্জের শিক্ষানুসারে সমগ্র মুসলিম মিল্লাতকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করে। এরাও রাসূল (সা:) এর জীবনী পর্যালোচনার মাধ্যমে রাসূল (সা:) এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্যে আন্দোলন- সংগ্রাম করে। এরাও কুরআন তিলাওয়াত করে সেই সাথে কুরআন বুঝার চেষ্টা করে এবং কুরআনের নির্দেশসমূহ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল স্তরে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অর্থ ব্যয় করে, হাসিমুখে জেল-জুলুম বরণ করে এবং প্রয়োজনে প্রাণও দেয়। এরাও দরূদ পড়ে, হামদ-নাত আবৃত্তি করে এবং রাসূল (সা:) এর মর্যাদার প্রতি কেউ আঘাত করলে রাসূলের প্রতি সর্বাধিক ভালোবাসার কারণে বারুদের মতোই জ্বলে ওঠে।

নবী করীম (সা:) এর প্রতি ভালোবাসা পোষণকারী মুসলিমদের মধ্যে এই দুই শ্রেণীর লোকদের ভালোবাসা কি সমপর্যায়ের? অথবা এই দুই শ্রেণীর ভালোবাসার মূল্যমান কি এক? রাসূলের প্রতি ভালোবাসার মধ্যে যেমন একদিকে রয়েছে ধন- সম্পদ বিনষ্ট হওয়া, জেল-জুলুম সহ্য করা ও নিজ প্রাণ দেয়ার ঝুঁকি। অপরদিকে রয়েছে ঝুঁকিহীন ভালোবাসা। শুধুমাত্র কুরআন তিলাওয়াত এবং তসবীহ-তাহলীল, নামাজ, রোজা, হজ্জ ও যাকাত আদায়, টুপি ও লম্বা জামা ব্যবহার, মিলাদ ও রবিউল আউয়াল মাসে মিছিলের আয়োজন করে রাসূল (সা:) এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের মধ্যে কোনো ঝুঁকি নেই।

নবী করীম (সা:) এর প্রতি সাহাবায়ে কেরামের ভালোবাসা কেমন ছিলো তা জানা থাকলে বর্তমান মুসলিমদের মধ্যে এই দু'টি শ্রেণীর মধ্যে কোন্ শ্রেণীর ভালোবাসা প্রকৃত ভালোবাসা এবং সাহাবায়ে কেরামের ভালোবাসার কোটি ভাগের কিছু অংশ হলেও কোন্ শ্রেণীর মধ্যে রয়েছে তা জানা যাবে।

সাহাবায়ে কেরামের সম্মুখে আল্লাহর রাসূল (সা:) বর্তমান ছিলেন এবং তাঁদের সম্মুখেই পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। রাসূল (সা:) কুরআনের শিক্ষানীতি অনুসারে সাহাবায়ে কেরামকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁরা নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত আদায় করেছেন এবং বুঝে কুরআন তিলাওয়াত করেছেন। সেই সাথে তাঁরা নবী করীম (সা:) ও পবিত্র কুরআনের শিক্ষা জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও বাস্তবায়ন করেছেন। কুরআন ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁরা অকাতরে কষ্টার্জিত ধন-সম্পদ ব্যয় করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা ও রাসূলের মর্যাদার সাথে সাংঘর্ষিক কিছু দেখলে গর্জে উঠেছেন এবং দুশমনদের সাথে মুকাবেলা করতে গিয়ে তাঁরা পরিবার পরিজনসহ অকল্পনীয় অত্যাচার সহ্য করেছেন, প্রয়োজনে নিজের প্রাণ পর্যন্ত হাসিমুখে দান করেছেন। রাসূলের প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ হলো, তিনি মহান আল্লাহর নিকট থেকে যে আদর্শ নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেছেন, সেই আদর্শ সর্বাত্মক অনুসরণ করা এবং তা সমাজ ও দেশে বাস্তবায়ন করার জন্যে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও চেষ্টা করা। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

قُلْ إِنْ كُنتُمْ تُحِبُّوْنَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

(হে নবী,) আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহ তা'য়ালাকে ভালোবাসো তাহলে আমার কথা মেনে চলো, (এভাবে আমাকে ভালোবাসলে) আল্লাহ তা'য়ালাও তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তিনি তোমাদের গোনাহ্ ক্ষমা করে দিবেন; আল্লাহ তা'য়ালা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়াবান। (সূরা আলে ইমরাণ-৩১)

নবী করীম (সা:) কে ভালোবাসার অর্থই হলো জীবনের সকল দিকে একমাত্র তাঁকেই অনুসরণ করা, এখানে সহজ ও কঠিন দিক বলে কিছুই নেই এবং আংশিক অনুসরণেরও সুযোগ নেই। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুসারে রাসূল (সা:) এর জীবনের সকল দিকই অনুসরণ করতে হবে। যারা সুবিধাবাদী নীতি অনুসরণে সহজ দিক বা আংশিক তথা ঝুঁকিমুক্ত অনুসরণ করবে অথবা করবে না, তাদেরকে আল্লাহ তা'য়ালা কোন্ বিশেষণে বিশেষিত করেছেন দেখুন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُوْلَ جِ فَإِن تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ

(হে রাসূল) আপনি (আরো) বলুন, তোমরা যদি আল্লাহ তা'য়ালা ও (তাঁর) রাসূলের কথা মেনে চলো, (এ আহ্বান সত্ত্বেও) তারা যদি (এ থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয় (আপনি জেনে রাখুন), আল্লাহ তা'য়ালা কখনো কাফিরদের পছন্দ করেন না। (সূরা আলে ইমরান-৩২)

নবী করীম (সা:) কে একজন মানুষ যখন নিজ প্রাণেরও অধিক ভালোবাসতে সক্ষম হয় তখনই কেবল সেই মানুষের পক্ষে রাসূলের আদর্শের জন্যে নিজের কষ্টার্জিত ধন-সম্পদ অকাতরে ব্যয় করা সম্ভব হতে পারে। জেল-জুলুম অত্যাচার সহ্য করতে পারে এবং প্রয়োজনে নিজের প্রাণও কুরবান করতে পারে। একবার নবী করীম (সা:) এর সাথে কথোপকথনকালে হযরত উমার (রা:) বললেন-

لأَنْتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ كُلِّ شَيْ إِلَّا نَفْسِي - 'হে রাসূল (সা:)! আপনি আমার কাছে সকল কিছুর তুলনায় অধিক বেশি প্রিয় কিন্তু আমার প্রাণের চাইতে অধিক নয়'। এ কথা শুনে নবী করীম (সা:) বললেন-

وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُوْنَ أَحَبَّ إِلَيْكَ مِنْ نَفْسِكَ - 'শপথ ঐ মহান সত্তার যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের মধ্যে কেউ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ আমি তোমাদের কাছে তোমাদের প্রাণের তুলনায় অধিক প্রিয় না হই'। এ কথা শোনার সাথে সাথে হযরত উমার (রা:) বললেন-

أَنْتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ كُلِّ شَيْ حَتَّى نَفْسِي - 'আপনি আমার কাছে এখন সকল কিছুর তুলনায় এমনকি আমার প্রাণের তুলনায় অধিক প্রিয়'। এবার নবী করীম (সা:) হযরত উমার (রা:)-কে পূর্ণ ঈমানের সনদ দিয়ে বললেন-

'হে উমার! এখন তোমার ঈমান পূর্ণতা লাভ করলো'। الأَن يَا عُمَرُ -

পবিত্র কুরআন ও সমগ্র হাদীস পর্যালোচনা করলে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নবী করীম (সা:) কে ভালোবাসার অর্থই হলো তাঁর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার লক্ষ্যে তাঁর পূর্ণাঙ্গ আদর্শ জীবনের সকল ক্ষেত্রে অনুসরণ করা। নিজ সুবিধা অনুসারে সহজ দিক মেনে চলা এবং বিপদ-ক্ষতি হতে পারে এ কথা মনে করে কঠিন দিক অনুসরণ না করা ঈমানদারের লক্ষণ নয়। নবী করীম (সা:) যা কিছু আদেশ করেছেন তা অনুসরণ করা এবং যা কিছু নিষেধ করেছেন তা বর্জন করার অর্থই হলো তাঁর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা, এটা করতে পারলেই সীরাত মাহফিলের আয়োজন ও দরূদ পাঠ করা সার্থক হবে এবং আদালতে আখিরাতে তা নাজাতের উসিলা হবে। রাসূলের প্রতি ভালোবাসার নামে এমন কোনো ধরনের অনুষ্ঠান করা যাবে না বা এমন পদ্ধতিও অনুসরণ করা যাবে না, যা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা অনুমোদন করেনি। সাহাবায়ে কেরাম তাঁর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ যেভাবে ঘটিয়েছেন, সেই ভাবেই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতে হবে এবং এটাই পরিপূর্ণ মুমিনের স্তরে উপনীত হবার একমাত্র পন্থা।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি দরূদ পাঠ করা আল্লাহর নির্দেশ

📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি দরূদ পাঠ করা আল্লাহর নির্দেশ


নবী করীম (সা:) এর প্রতি দরূদ পাঠের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব এতই অধিক যে, দরূদ পাঠ করা ব্যতীত নামাজ হয় না। নামাজ আদায় করতে হবে কেবলমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে, মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর এ মহান নবীকে মর্যাদার সর্বাধিক উচ্চস্তরে উপনীত করেছেন বিধায় নামাজের মধ্যেও তাঁর হাবীবের প্রতি দরূদ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার দরবারে দু'হাত উঠিয়ে দোয়া করার পূর্বেও নবী করীম (সা:) এর প্রতি দরূদ পাঠ করতে হয়। মৃত মানুষের আত্মার মাগফিরাতের জন্যে দোয়া করার পূর্বেও দরূদ পাঠ করতে হয়। এর কারণ হলো, রাসূলের প্রতি দরূদ পাঠ করলে মহান আল্লাহ তা'য়ালা খুবই খুশী হন এবং দরূদ পাঠকারীর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তার দোয়া কবুল করেন।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী করীম (সা:) এর প্রতি দরূদ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন-

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّوْنَ عَلَى النَّبِيِّ ط يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلَّمُوا تَسْلِيمًا -

নি:সন্দেহে আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরূদ পাঠান; (অতএব) হে ঈমানদার ব্যক্তিরা, তোমরাও নবীর প্রতি দরূদ পাঠাতে থাকো এবং (তাঁকে) উত্তম অভিবাদন (পেশ) করো। (সূরা আহযাব-৫৬)

পবিত্র কুরআনের গবেষকগণ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে নবীর প্রতি দরূদের অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর নবীর প্রতি সীমাহীন করুণা বর্ষণকারী। তিনি তাঁর প্রশংসা করেন। তাঁর কাজে বরকত দান করেন। তাঁর নাম বুলন্দ করেন। তাঁর প্রতি নিজের রহমতের বারি বর্ষণ করেন।

ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি দরূদের অর্থ হচ্ছে, তাঁরা তাঁকে সর্বাধিক ভালোবাসেন। তাঁর জন্য আল্লাহ তা'য়ালার কাছে দোয়া করেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন তাঁকে সর্বাধিক উচ্চ মর্যাদা দান করেন। তাঁর শরীয়াতকে প্রসার ও বিস্তৃতি দান করেন এবং তাঁকে মাকামে মাহমুদ তথা সর্বোচ্চ প্রশংসিত স্থানে পৌঁছে দেন।

মহান আল্লাহ তাঁর নবী সম্পর্কে এ কথা বলার কারণ হলো, বিশ্বনবী (সা:) যখন মক্কায় ইসলামী আন্দোলনের সূচনা করলেন তখন ইসলামের শত্রুরা নিজেদের মনের আক্রোশ প্রকাশের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক অপবাদ দিয়ে চলছিল এবং তারা নিজেরা এ কথা মনে করছিল যে, এভাবে কাদা ছিটিয়ে তারা তাঁর নৈতিক প্রভাব নির্মূল করে দেবে। অথচ এ নৈতিক প্রভাবের ফলে ইসলাম ও মুসলমানরা দিনের পর দিন এগিয়ে চলছিল। এ অবস্থায় মহান আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করে এ কথা জানিয়ে দিলেন, 'ইসলামের শত্রুরা আমার নবীর বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়ে তাঁকে অপদস্ত করার যতই প্রচেষ্টা করুক না কেনো, শেষ পর্যন্ত তারাই ব্যর্থ হবে। কারণ আমি আল্লাহ তাঁর প্রতি মেহেরবান এবং সমগ্র বিশ্বজাহানের আইন ও শৃংখলা ব্যবস্থা আমারই নির্দেশে যেসব ফেরেশতার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে তারা সবাই তাঁর সহায়ক ও প্রশংসাকারী। আমি যেখানে তাঁর নাম বুলন্দ করছি। আমার ফেরেশতারা তাঁর প্রশংসাবলীর আলোচনা করছে সেখানে তাঁর নিন্দাবাদ করে তারা কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। আমার রহমত ও বরকত তাঁর সহযোগী এবং আমার ফেরেশতারা দিনরাত দোয়া করছে, হে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন! মুহাম্মাদ (সা:) এর মর্যাদা আরো বেশি উঁচু করে দাও এবং তাঁর আদর্শকে আরো বেশি প্রসারিত ও বিকশিত করো। এ অবস্থায় ইসলাম বিরোধিরা মুহাম্মাদ (সা:) এর কি ক্ষতি করতে পারে'?

ঈমানদারদের প্রতি দরূদ পাঠানোর যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তার অর্থ হলো, 'হে লোকেরা! মুহাম্মাদ (সা:) এর বদৌলতে তোমরা যারা সঠিক পথের সন্ধান লাভ করেছো, তারা তাঁর মর্যাদা অনুধাবন করো এবং তাঁর মহাঅনুগ্রহের হক আদায় করো। তোমরা মূর্খতার অন্ধকারে পথ ভুলে বিপথে চলছিলে, এ মহান ব্যক্তি তোমাদের জ্ঞানের আলোক বর্তিকা দান করেছেন। তোমরা নৈতিক অধঃপতনের মধ্যে ডুবেছিলে, এ ব্যক্তি তোমাদের সেখান থেকে উঠিয়েছেন এবং তোমাদের এমন যোগ্যতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন যার ফলে আজ অন্যরা তোমাদের ঈর্ষা করে। তোমরা বর্বর ও পাশবিক জীবন যাপন করছিলে, এ ব্যক্তি তোমাদের সর্বোত্তম মানবিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাজে সুসজ্জিত করেছেন। তিনি তোমাদের ওপর এসব অনুগ্রহ করেছেন বলেই দুনিয়ার ইসলাম বিরোধিরা এ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আক্রোশে ফেটে পড়েছে। নয়তো দেখো, তিনি কারো সাথে ব্যক্তিগতভাবে কোনো অশোভন আচরণ করেননি। সুতরাং এখন তোমাদের কৃতজ্ঞতার অনিবার্য দাবি হচ্ছে এই যে, তারা এ আপাদ-মস্তক কল্যাণ ব্রতী ব্যক্তিত্বের প্রতি যে পরিমাণ বিদ্বেষ পোষণ করে ঠিক একই পরিমাণ বরং তাঁর চেয়ে বেশি ভালোবাসা তোমরা তাঁর প্রতি পোষণ করো। তারা তাঁকে যে পরিমাণ ঘৃণা করে ঠিক ততটাই বরং তাঁর চেয়ে বেশীই তোমরা তাঁর প্রতি অনুরক্ত হবে। তারা তাঁর যতটা নিন্দা করে ঠিক ততটাই বরং তার চেয়ে বেশী তোমরা তাঁর প্রশংসা করো। তারা তাঁর যতটা অশুভাকাংখী হয় তোমরা ঠিক ততটাই বরং তার চেয়ে বেশি শুভাকাংখী হয়ে যাও এবং তাঁর পক্ষে সেই একই দোয়া করো যা আল্লাহ তা'য়ালার ফেরেশতারা দিনরাত তাঁর জন্য করে যাচ্ছে, 'দুই জাহানের রব্ব! তোমার নবী যেমন আমাদের প্রতি বিপুল অনুগ্রহ করেছেন তেমনি তুমিও তাঁর প্রতি অসীম ও অগণিত রহমত বর্ষণ করো, তাঁর মর্যাদা পৃথিবীতেও সবচেয়ে বেশি উন্নত করো এবং আখেরাতেও তাঁকে সকল নৈকট্যলাভকারীদের তুলনায় অধিক নৈকট্য দান করো'।

উল্লেখিত আয়াতে মুসলমানদেরকে দু'টো বিষয়ের আদেশ দেয়া হয়েছে। একটি হচ্ছে, 'সাল্‌লু আলাইহি' অর্থাৎ তাঁর প্রতি দরূদ পড়ো। অন্যটি হচ্ছে, 'ওয়া সাল্লিমু তাসলিমা' অর্থাৎ তাঁর প্রতি সালাম ও প্রশান্তি দান করো।

'সালাত' শব্দটি যখন 'আলা' অব্যয় সহকারে বলা হয় তখন এর তিনটি অর্থ হয়।

এক. কারো অনুরক্ত হয়ে পড়া, ভালোবাসা সহকারে তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া এবং তার প্রতি ঝুঁকে পড়া।

দুই. কারো প্রশংসা করা।

তিন, কারো পক্ষে দোয়া করা।

'সালাত' শব্দটি যখন আল্লাহ তা'য়ালার জন্য বলা হবে তখন এ কথা সুস্পষ্ট যে, তৃতীয় অর্থটির জন্য এটি বলা হবে না। কারণ আল্লাহ তা'য়ালার অন্য কারো কাছে দোয়া করার ব্যাপারটি একেবারেই অকল্পনীয়। তাই সেখানে অবশ্যই তা হবে শুধুমাত্র প্রথম দু'টো অর্থের জন্য। কিন্তু যখন এ শব্দ বান্দাদের তথা মানুষ ও ফেরেশতাদের জন্য বলা হবে তখন তা তিনটি অর্থেই বলা হবে। তার মধ্যে ভালোবাসার অর্থও থাকবে, প্রশংসার অর্থও থাকবে এবং দোয়া ও রহমতের অর্থও থাকবে। সুতরাং মুমিনদের নবী করীম (সা:) এর পক্ষে 'সাল্লু আলাইহি'-এর আদেশ দেয়ার অর্থ হচ্ছে এই যে, তোমরা তাঁর ভক্ত-অনুরক্ত হয়ে যাও তাঁর প্রশংসা করো এবং তাঁর জন্য দোয়া করো।

'সালাম' শব্দেরও দু'টো অর্থ হয়। এক. সব ধরণের বিপদাপদ ও অভাব অনটন মুক্ত থাকা। এর প্রতিশব্দ হিসেবে আমাদের এখানে সালামতি বা নিরাপত্তা শব্দের ব্যবহার আছে। দুই. শান্তি, সন্ধি ও অবিরোধিতা। সুতরাং নবী করীম (সা:) এর পক্ষে 'সাল্লিমু তাসলিমা' বলার একটি অর্থ হচ্ছে যে, তোমরা তাঁর জন্য পূর্ণ নিরাপত্তার দোয়া করো। আর দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে যে, তোমরা পুরোপুরি মনে প্রাণে তাঁর আন্দোলনের কাজে সহযোগিতা করো, তাঁর বিরোধিতা করা থেকে দূরে থাকো এবং তাঁর আদেশ পালনকারীতে পরিণত হও।

এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরাম নবী করীম (সা:) কে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সালামের পদ্ধতি তো আপনি আমাদেরকে বলে দিয়েছেন, (অর্থাৎ নামাজে 'আস্সালামু আলাইকা ইয়া আইয়্যুহান নীবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ' এবং দেখা সাক্ষাতে আস্সালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ বলা) কিন্তু আপনার প্রতি সালাত পাঠানোর পদ্ধতি কি?

এসব প্রশ্নের উত্তরে নবী করীম (সা:) সাহাবায়ে কেরামকে বিভিন্ন ধরনের দরূদ শিক্ষা দিয়েছিলেন। বর্তমানে দরূদ সম্পর্কে বেশ কিছু বই-পুস্তক বাজারে দেখা যায় এবং এসব বই-পুস্তকে নানা ধরনের দরূদের উল্লেখ রয়েছে। যেমন দরূদে হাজারী, দরূদে লাখী, দরূদে মুস্তফা, দরূদে আকবর, দরূদে শেফা ইত্যাদি নামে বহু ধরনের দরূদ এবং এসব দরূদের ফযিলত উক্ত বই-পুস্তকে লিখা হয়েছে। হাদীস গবেষকগণ উল্লেখিত দরূদের একটি দরূদও হাদীসের সমগ্র কিতাবেও সন্ধান করে পাননি। তাঁরা বলেছেন, এসব দরূদ ও বর্ণিত ফযিলত সকল কিছুই কল্পিত বৈ আর কিছুই নয়। নবী করীম (সা:) সাহাবায়ে কেরামকে যে সকল দরূদ শিখিয়েছেন তা সকলই হাদীসের কিতাবসমূহে মওজুদ রয়েছে এবং আমরা হাদীসের বিভিন্ন কিতাব থেকে কয়েকটি দরূদ এখানে উল্লেখ করছি।

স্বয়ং আল্লাহর নবীর শেখানো দরূদের যে কি মর্যাদা, তা কল্পনাও করা যায় না। সুতরাং এসব দরুদের ফযীলত, কল্যাণকারীতা উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন মনে করি। কারণ এসব দরূদের ফযীলত ও সওয়াব অফুরন্ত। যে কোনো বিপদাপদে এসব দরূদ পাঠ করলে মহান আল্লাহ তা'য়ালা তার ওপরে অসীম রহমত অবতীর্ণ করবেন এবং নবী করীম (সা:) খুশী হবেন। হযরত কা'ব ইবনে উজরাহ্ (রা:) কে নবী করীম (সা:) এই দরূদ শিখিয়েছিলেন-

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيْدٌ - وَبَارِكَ عَلَى مُحَمَّدٍ وَّ عَلَى آلِ مُحَمَّدٌ كَمَا بَارِكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ

আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদান কামা বারিকতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।

এ দরূদটি সামান্য শাব্দিক পার্থক্য সহকারে হযরত কা'ব ইবনে উজরাহ্ (রা:) থেকে বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে ইমাম আহমদ, ইবনে আবী শাইবাহ, আব্দুর রাজ্জাক, ইবনে আবী হাতেম ও ইবনে জারীরে উল্লেখ করা হয়েছে।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) এর বর্ণনা থেকে ইবনে জারীর হযরত আবু হুমাইদ সা'ঈদী (রা:) থেকে বর্ণিত হয়েছে-

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَأَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِه كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَأَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ كَمَا بَارِكْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ

আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আয ওয়া জিহি ওয়া যুর রিয়াতিহি কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আয ওয়া জিহি ওয়া যুর রিয়াতিহি কামা বারাকতা আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। (মুআত্তা, ইমাম মালেক, মুসনাদে আহমাদ, বোখারী, মুসলিম, নাসাঈ, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)

হযরত আবু মাসউদ বদরী (রা:) থেকে এ দরূদ বর্ণিত হয়েছে-

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارِكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ فِي الْعَالَمِينَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ

আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা আলা ইবরাহীমা ফিল আলিমিনা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। (মালেক, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, আহমাদ, ইবনে জারীর, ইবনে হিব্বান ও হাকেম)

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা:) থেকে এ দরূদ বর্ণিত হয়েছে-

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبْدُكَ وَ رَسُولُكَ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارِكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ

আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন আব্দুকা ওয়া রাসূলুকা কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা আলা ইবরাহীম। (আহমাদ, বুখারী, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ)

হযরত বুরাইদাতাল খুযাই (রা:) থেকে এ দরূদ বর্ণিত হয়েছে-

اللَّهُمَّ اجْعَلْ صَلوتُكَ وَرَحْمَتِكَ وَبَرَكَاتِكَ عَلَى مُحَمَّدٍ وَّ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا جَعَلْتَهَا عَلَى إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ

আল্লাহুম্মাজ আল সলাতুকা ওয়া রাহমাতিকা ও বারকাতিকা আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা জাআলতাহা আলা ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। (আহমাদ, আব্দ ইবনে হুমাইদ ও ইবনে মারদুইয়া)

হযরত আবু হুরাইরা (রা:) থেকে এ দরূদ বর্ণিত হয়েছে- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ وَبَرَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ فِي الْعَالَمِينَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ -

আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিওঁ ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা ওয়া বারাকতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ফিল আলিমিনা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। (নাসাঈ)

হযরত তালহা (রা:) থেকে এ দরূদ বর্ণিত হয়েছে- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ وَ بَرِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارِكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ

আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ, ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা আলা ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। (ইবনে জারীর)

উল্লেখিত দরূদগুলোয় শব্দের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সবগুলোর অর্থ একই। এসব দরূদগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এ বিষয়গুলো ভালোভাবে অনুধাবন করতে হবে।

প্রথমত এসব দরূদ নবী করীম (সা:) মুসলমানদেরকে পাঠ করতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, 'আমার ওপরে দরূদ পাঠ করার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হচ্ছে এই যে, তোমরা আল্লাহ তা'য়ালার কাছে এ মর্মে দোয়া করো, হে আল্লাহ তা'য়ালা! তুমি মুহাম্মাদ (সা:) এর ওপর দরূদ পাঠাও'। এক শ্রেণীর স্বল্প জ্ঞানসম্পন্ন লোক এ ব্যাপারে আপত্তি করে বলে যে, 'এটা তো বড় অদ্ভুত ব্যাপার, আল্লাহ তা'য়ালা তো আমাদেরকে বলছেন, তোমরা নবীর ওপরে দরূদ পাঠ করো, কিন্তু অপর দিকে আমরা আল্লাহ তা'য়ালাকে বলছি যে, তুমি দরূদ পাঠাও'।

অথচ রাসূল (সা:) লোকদেরকে এ কথা বলেছেন যে, 'তোমরা আমার প্রতি সালাতের হক আদায় করতে চাইলেও করতে পারো না। তাই আল্লাহ তা'য়ালারই কাছে দোয়া চাও যেন তিনি আমার প্রতি দরূদ পাঠান'। এ কথা বলা নিষ্প্রয়োজন, আমরা নবী করীম (সা:) এর মর্যাদা বুলন্দ করতে পারি না। আল্লাহ তা'য়ালাই বুলন্দ করতে পারেন। আমরা তাঁর অনুগ্রহের প্রতিদান দিতে পারি না। আল্লাহ তা'য়ালাই তার প্রতিদান দিতে পারেন। আমরা তাঁর বাণীসমূহ উচ্চমাপে পৌঁছানোর এবং তাঁর আদর্শকে সম্প্রসারিত করার জন্য যতই চেষ্টা চালাই না কেনো, আল্লাহ তা'য়ালার মেহেরবানী এবং তাঁর দেয়া সুযোগ ও সহায়তা ব্যতীত তাতে কোনো প্রকার সাফল্য অর্জন করতে পারি না। এমন কি নবী করীম (সা:) এর প্রতি ভক্তি ভালোবাসাও আমাদের অন্তরে আল্লাহরই সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। অন্যথায় শয়তান কত রকম প্ররোচনা দিয়ে তাঁর প্রতি আমাদের মন-মস্তিষ্ক বিরূপ করে তুলতে পারে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা আমাদেরকে তা থেকে হেফাজত করুন।

সুতরাং নবী করীম (সা:) এর ওপর দরূদ পাঠের হক আদায় করার জন্য আল্লাহ তা'য়ালার কাছে তাঁর প্রতি সালাত বা দরূদের দোয়া করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন বলে সে যেন আল্লাহ তা'য়ালার সমীপে নিজের অক্ষমতা স্বীকার করতে গিয়ে বলে, হে আল্লাহ তা'য়ালা! তোমার নবীর ওপর সালাত বা দরূদ পাঠানোর যে কর্তব্য আমার প্রতি দেয়া হয়েছে, তা যথাযথভাবে সম্পন্ন করার সামর্থ আমার নেই। আমার পক্ষ থেকে তুমিই তা সম্পন্ন করে দাও এবং তা করার জন্য আমাকে যেভাবে কাজে নিয়োগ করতে হয় তা তুমি নিয়োগ করো।

দ্বিতীয়ত রাসূল (সা:) এর ভদ্রতা ও মহানুভবতার ফলে তিনি কেবল নিজেকেই এ দোয়ার জন্য নির্দিষ্ট করে নেননি। বরং নিজের সাথে তিনি নিজের পরিজন স্ত্রী ও পরিবারকেও শামিল করে নিয়েছেন। 'স্ত্রী ও পরিবার' অর্থ সুস্পষ্ট আর 'পরিজন' শব্দটি নিছক রাসূল (সা:) এর পরিবারের লোকদের জন্য নির্দিষ্ট নয়। বরং এসব শব্দের মধ্যে এমন সব লোকও এসে যায় যারা তাঁর অনুসারী এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে। পরিজন অর্থে মূলে আরবী 'আল' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আরবী ভাষার দৃষ্টিতে 'আল' ও 'আহল'-এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে এই যে, কোন ব্যক্তির 'আল' হচ্ছে এমনসব লোক যারা হয় তার সাথী, সাহায্যকারী ও অনুসারী, তারা তার আত্মীয় বা অনাত্মীয় হোক বা না হোক অবশ্যই তার আত্মীয়। পবিত্র কুরআনের ১৪ টি স্থানে 'আলে ফেরআউন' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে কোনো জায়গায়ও 'আলে' অর্থ ফেরাউনের পরিবারের লোকেরা নয়। বরং এমন সকল লোক যারা হযরত মূসার মুকাবিলায় ফেরাউনের সমর্থক ও সহযোগী ছিল। (দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখুন সূরা আল বাকারাহ, ৪৯-৫০, সূরা আলে ইমরান-১১, আরাফ-১৩০, মুমিনুন-৪৬)

সুতরাং এমন সমস্ত লোকই 'আলে' মুহাম্মাদ (সা:) এর বহির্ভূত হয়ে যায় যারা বিশ্বনবী (সা:) এর আদর্শ অনুসরণ করে না, হতে পারে সে নবীর রক্তের আত্মীয়। পক্ষান্তরে এমন সকল লোকও এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় যারা নবী করীম (সা:) এর আদর্শ অনুসরণ করে, কিন্তু তারা নবীর রক্তের কোনো আত্মীয় নয়, তবুও তারা নবীর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। তবে নবী পরিবারের এমন প্রত্যেকটি লোক সর্বতোভাবেই 'আলে' মুহাম্মাদ (সা:) এর অন্তর্ভুক্ত হবে যারা তাঁর সাথে রক্তের সম্পর্কও রাখে আবার তাঁর আদর্শও অনুসরণ করে।

নবী করীম (সা:) যেসব দরূদ শিখিয়েছেন তার প্রত্যেকটিতে অবশ্যই এ কথা রয়েছে যে, তাঁর প্রতি এমন অনুগ্রহ করা হোক যা ইবরাহীম (আ:) ও তাঁর পরিবার- পরিজনদের ওপর করা হয়েছিল। এ বিষয়টি বুঝতে এক শ্রেণীর লোকদের বিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। একশ্রেণীর লোক এর বিভিন্ন জটিল ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু গবেষকগণ এর কোনো একটি ব্যাখ্যাও গ্রহণ করেননি। তারা ব্যাখ্যা দেন যে, যারা নবুয়‍্যাত ওহী ও কিতাবকে হেদায়েতের উৎস বলে মেনে নেয় তারা সবাই হযরত ইবরাহীম (আ:) এর নেতৃত্বের প্রশ্নে একমত। এ ব্যাপারে মুসলমান, খৃষ্টান ও ইয়াহুদীদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। সুতরাং রাসূল (সা:) এর বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে, যেভাবে হযরত ইবরাহীম (আ:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা সকল নবীর অনুসারীদের নেতায় পরিণত করেছেন, অনুরূপভাবে আমাকেও পরিণত করুন। এমন কোনো ব্যক্তি যে নবুয়‍্যাত মেনে নিয়েছে সে যেন আমার নবুয়‍্যাতের প্রতি ঈমান আনা থেকে বঞ্চিত না হয়।

বিশ্বনবী (সা:) এর ওপরে দরূদ পাঠ করা সুন্নাত। তাঁর নাম উচ্চারিত হলে তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করা মুস্তাহাব। বিশেষ করে নামাযে দরূদ পড়া সুন্নাত। এ বিষয়ে আলেম সমাজ একমত। সমগ্র জীবনকালে নবী করীম (সা:) এর ওপরে একবার দরূদ পাঠ করা ফরজ। এ ব্যাপারে আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে। কারণ আল্লাহ তা'য়ালা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এর আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু এরপর দরূদের ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। ইমাম শাফেঈ (রাহ:) বলেন, নামাযে একজন মুসল্লী যখন শেষবার তাশাহুদ পড়ে তখন সেখানে সালাতুন আলান নবী পড়া ফরজ। কোনো ব্যক্তি এভাবে না পড়লে তার নামায হবে না। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে থেকে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:), হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রা:), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা:) ও হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা:), তাবেঈদের মধ্যে থেকে শা'বী (রাহ), ইমাম মুহাম্মাদ বাকের (রাহ:), মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কুরযী (রাহ:) ও মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রাহ:) এবং ফকীহদের মধ্যে থেকে ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রাহ:) ও এ মতের প্রবক্তা ছিলেন। শেষের দিকে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রাহ:) ও এ মত অবলম্বন করেন।

ইমাম আবু হানিফা (রাহ:), ইমাম মালেক (রাহ:) ও অধিকাংশ উলামা এ মত পোষণ করেন যে, দরূদ সমগ্র জীবনে শুধুমাত্র একবার পড়া ফরজ। এটি কালেমায়ে শাহাদাতের মত। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ইলাহ বলে মেনে নিয়েছে এবং নবী করীম (সা:) কে নবী বলে মেনে নিয়েছে সে ফরজ আদায় করেছে। অনুরূপভাবে যে একবার দরূদ পাঠ করেছে সে নবীর ওপর সালাত পাঠ করার ফরজ আদায়ের দায়িত্ব মুক্ত হয়ে গেছে। এরপর তার ওপর আর কালেমা পড়া ফরজ নয় এবং দরূদ পড়াও ফরজ নয়।

আলেমদের একটি দল নামাযে দরূদ পড়াকে সকল অবস্থায় ওয়াজিব বলে গণ্য করেন। কিন্তু তাঁরা তাশাহুদের সাথে তাকে শৃংখলিত করেন না।

আলেমদের আরেকটি দলের মতে প্রত্যেক দোয়ায় দরূদ পড়া ওয়াজিব। আরো কিছু চিন্তাবিদ নবী করীম (সা:) এর নাম উচ্চারিত হলে দরূদ পড়া ওয়াজিব বলে অভিমত পোষণ করেন। আরেক দল আলেমদের মতে এক মজলিশে রাসূল (সা:) এর নাম যতবারই উচ্চারিত হোক না কেনো, দরূদ পড়া কেবলমাত্র একবার ওয়াজিব হবে।

শুধুমাত্র ওয়াজিব হবার ব্যাপারে এ মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। তবে দরূদের ফযীলত ও তা পাঠ করলে প্রতিদান ও সওয়াব পাওয়া এবং তার একটি অনেক বড় সৎকাজ হবার ব্যাপারে তো সমস্ত মুসলিম উম্মাহ্ একমত। এমন প্রত্যেকটি মুসলমানের অন্তর থেকেই তো স্বাভাবিকভাবেই দরূদ বের হবে, যার মধ্যে এ অনুভূতি থাকবে যে, বিশ্বনবী (সা:) আল্লাহ তা'য়ালার পরে আমাদের প্রতি সবচেয়ে বড় অনুগ্রহকারী। মানুষের হৃদয়ে ঈমান ও ইসলামের মর্যাদা যত বেশী হবে তত বেশী মর্যাদা হবে তার হৃদয়ে বিশ্বনবী (সা:) এর অনুগ্রহেরও। আর মানুষ যত বেশী এ অনুগ্রহের মর্যাদা দিতে শিখবে তত বেশিই যে নবী করীম (সা:) এর ওপরে দরূদ পাঠ করবে। সুতরাং অধিক দরূদ পাঠ করা ঈমানের একটি মাপকাঠি। এটি পরিমাপ করে জানিয়ে দেয় বিশ্বনবী (সা:) এর আদর্শের সাথে মানুষের সম্পর্ক কতটা গভীর এবং ঈমানের নিয়ামতের কতটা সম্মান তার অন্তরে আছে। এ কারণেই নবী করীম (সা:) বলেছেন- مَنْ صَلَّى عَلَى صَلَواةَ لَّمْ تَزِلُ الْمَلَائِكَةُ تُصَلِّي عَلَيْهِ مَا صَلَّى عَلَى

যে ব্যক্তি আমার প্রতি দরূদ পাঠ করে ফেরেশতারা তার প্রতি দরূদ পাঠ করে যতক্ষণ সে দরূদ পাঠ করতে থাকে। (আহমাদ ও ইবনে মাজাহ) مَنْ صَلَّى عَلَى وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا -

যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করে আল্লাহ তা'য়ালা তার প্রতি দশবার দরূদ পাঠ করেন। (মুসলিম) অর্থাৎ আল্লাহ তা'য়ালা তার প্রতি দশটি রহমত নাযিল করেন। أُولَى النَّاسِ بِي يَوْمِ الْقِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ عَلَى صَلَواةٌ

কিয়ামতের দিন আমার সাথে থাকার সবচেয়ে বেশি হকদার হবে সেই ব্যক্তি যে আমার ওপর সবেচেয়ে বেশি দরূদ পড়বে। (তিরমিযী) الْبَخِيلُ الَّذِي ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَى

আমার কথা যে ব্যক্তির সামনে আলোচনা করা হয় এবং সে আমার ওপর দরূদ পাঠ করে না সে কৃপণ। (তিরমিযী)

সুতরাং সকল মুসলমানের উচিত নবী করীম (সা:) এর প্রতি অধিক দরূদ পাঠ করা। তবে এ দরূদ পাঠই শুধুমাত্র মুক্তির মাধ্যম নয়। মানুষকে অবশ্যই মহান আল্লাহর বিধান মেনে চলতে হবে, আল্লাহ তা'য়ালার বিধান প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। তাহলে দরূদ পাঠও উপকারে আসবে। আল্লাহ তা'য়ালার বিধান না মেনে বা ইসলামী বিধান ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, দেশে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম না করে শুধু মাত্র দরূদ পাঠ করলে কিয়ামতের দিন যদি রাসূল (সা:) এ কথা বলেন যে, 'যখন আমার আদর্শকে অপমানিত করা হচ্ছিলো, যখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দেয়া জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে উৎখাত করার জন্য ষড়যন্ত্র করা হচ্ছিলো, ইসলামের সৈনিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা কল্পিত অভিযোগ তুলে তাদের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছিলো, আর তোমরা ঘরের কোণে বা মসজিদে বসে বসে দরূদ পাঠ করছিলে, বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করোনি, আজ তোমাদের ওসব দরূদে আমার কোনোই প্রয়োজন নেই' তখন কি উপায় হবে? ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সংগ্রাম করা হলো ফরজ, এই ফরজ আদায় করে তারপর যতবেশি দরূদ পাঠ করা যাবে আল্লাহ তা'য়ালাও সন্তুষ্ট হবেন এবং জান্নাত ততবেশি তার কাছে এগিয়ে আসবে ইনশাআল্লাহ।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 জুলুম- নির্যাতনের কালো অধ্যায়

📄 জুলুম- নির্যাতনের কালো অধ্যায়


এ পার্থিব জগতে বিভিন্ন দেশ ও সমাজে জালিম ও স্বৈরাচারী যখন কোনো ব্যক্তি, দল বা সম্প্রদায়ের প্রতি নির্যাতন করে তখন যদি কেউ প্রতিবাদ না করে তাহলে জালিম ও স্বৈরাচার উৎসাহিত হয়ে নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধিই করে থাকে, পৃথিবীর ইতিহাস এ কথার সাক্ষ্য বহন করে। নবী করীম (সা:) এর মক্কী জীবনে ঠিক এমনটিই ঘটেছিলো। প্রতাবশালী চাচা আবু তালিবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সে সময় বিশ্বনবী (সা:) এর প্রতি শারীরিকভাবে অতটা নির্যাতন কেউ করতে পারেনি। আবু তালিবের অবর্তমানে ইসলামের শত্রুগোষ্ঠী মক্কায় নির্ভীক চিত্তে নবী করীম (সা:) এর প্রতি অত্যাচারের মাত্রা বৃদ্ধি করলো। তিনি যে পথ দিয়ে কা'বায় আসবেন সে পথে ময়লা আবর্জনা বা বিষাক্ত কাঁটা বিছিয়ে রাখতো দুশমনরা। তিনি কা'বায় নামাজ আদায় করছেন, তাঁকে নানাভাবে বিদ্রুপ করা হতো। নামাজে সিজদা দিয়েছেন এ সময় তাঁর পবিত্র মাথায় উটের পচা গলিত নাড়ি ভুড়ি চাপিয়ে দেয়া হতো। ছোট্ট মেয়ে ফাতিমা (রা:) পিতার এ অবস্থা দেখে করুণ কণ্ঠে কাঁদতেন আর পিতার মাথার ওপর থেকে আবর্জনা সরিয়ে মাথা ভার মুক্ত করতেন। তিনি নামাযে দাঁড়িয়েছেন, তাঁর পবিত্র গলায় কাপড় জড়িয়ে দু'দিক থেকে এমনভাবে টেনে ধরা হতো যে, তাঁর শ্বাস বন্ধ হয়ে যেত। ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেছেন, এতে করে নবী করীম (সা:) এর কন্ঠে দাগ হয়ে যেত। বর্তমান সময়েও যেমন ইসলামের অনুসারী নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে ভুল বুঝিয়ে বিভ্রান্ত করে তাদেরকে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়, ঠিক তেমনিভাবেই নবী করীম (সা:) এর বিরুদ্ধেও তৎকালে দুশমনরা কিশোর, তরুণ যুবকদের ব্যবহার করতো। তিনি বাইরে বের হলেই ইসলাম বিরোধী নেতৃবৃন্দ দুষ্ট প্রকৃতির ছেলেদের তাঁর পেছনে লেলিয়ে দিত। তাঁরা নবী করীম (সা:) এর পেছনে পেছনে যেত আর তাঁকে বিদ্রুপ করতো।

তিনি নামাযে মধুর কন্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করতেন আর আবু জাহিল তাঁর সাথিদের নিয়ে নবীকে গালাগালি দিতো। তিনি লোকালয়ে গিয়ে মানুষের কাছে ইসলামের আহ্বান প্রচার করতেন। আবু জাহিল লোকদেরকে ডেকে বলতো, 'তোমরা এই লোকটির কথায় কান দিও না। এই লোকের প্রতারণায় তোমরা নিপতিত হবে না। এ লোক ধোকাবাজ যাদুকর'। (নাউযুবিল্লাহ)

এসব কথা বলে আল্লাহ তা'য়ালার দুশমন আবু জাহিল লোকজনের সামনে আল্লাহ তা'য়ালার নবীর পবিত্র শরীরে নোংরা কাদা নিক্ষেপ করতো। একদিন নবী করীম (সা:) কা'বায় নামায আদায় করছিলেন। শত্রুর দল দূরে বসে তাঁকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করছিল। হঠাৎ আবু জাহিল বলে উঠলো, 'মুহাম্মাদ (সা:) যখন নামাযে সিজদা দেয় তখন তাঁর মাথার ওপর উটের নাড়ি-ভুড়ি চাপিয়ে দিলে ভালো হয়। তোমরা কি কেউ এ কাজ করতে পারবে?'

ইসলামের দুশমন ওকবা বললো, 'তোমরা দেখো, আমিই মুহাম্মাদ (সা:) এর মাথায় উটের নাড়ি ভুড়ি চাপিয়ে দিচ্ছি'।

এ কথা বলেই সে উটের নাড়ি-ভুড়ি এনে নবী করীম (সা:) এর মাথার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল। তিনি তখন নামাযে সিজদায় ছিলেন, মাথা উঠাতে পারলেন না। নবীর এই কষ্ট দেখে শত্রুর দল অট্ট হাসিতে হেসেছিল। পাঁচ বছরের শিশু মেয়ে ফাতিমা পিতার এই দুরাবস্থার সংবাদ পেয়ে করুণ কন্ঠে আর্তনাদ করে ছুটে এলেন। কচি হাত দু'টো দিয়ে পরম মমতায় পিতার মাথা থেকে আবর্জনা পরিষ্কার করে শত্রুদের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহর দরবারে বিচার দিলেন।

নবী করীম (সা:) কে নিজেরা তো ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতোই সেই সাথে মক্কায় নতুন যারা আসতো, তাদের সামনেও তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করতো আবু জাহিলের অনুসারীরা। মক্কার বাইরের একজন লোক একটি উট নিয়ে মক্কায় এসেছিল। আবু জাহিল সে উট নিয়ে উটের মালিককে অর্থ না দেয়ার ছুতো খুঁজতে থাকে। লোকটি যখন বুঝলো আবু জাহিল তাকে অর্থ না দিয়েই উট নিয়ে নেবে তখন সে কা'বাঘরে এসে উচ্চকণ্ঠে বলতে থাকে, 'আবু জাহিল আমার উট নিয়ে তার মূল্য পরিশোধ করছে না। সে আমার ওপর জুলুম করছে। আপনাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন যিনি এই জুলুমের প্রতিকার করবেন? আমার অধিকার আমাকে আদায় করে দিবেন?'

লোকটির কথা শুনে ইসলামের শত্রুরা নবী করীম (সা:) কে হাসির পাত্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করলো। মক্কার বাইরের ঐ লোকটির সামনে আবু জাহিল যেন আল্লাহ তা'য়ালার রাসূলকে অপমান করে, এ উদ্দেশ্যে লোকটিকে তারা ডেকে রাসূল (সা:) কে ইশারায় দেখিয়ে বললো, 'ঐ লোকটির কাছে যাও, সে তোমার অধিকার আদায় করে দিবে'।

নবী করীম (সা:) সে সময় কা'বায় অবস্থান করছিলেন। লোকটি কাফিরদের কথায় বিশ্বাস করে নবী (সা:) এর কাছে ঘটনা বিস্তারিত বলে আবেদন করলেন, 'হে আল্লাহর বান্দাহ! আপনার প্রতি আল্লাহ তা'য়ালা রহমত নাযিল করুন, আপনি আবু জাহিলের কাছ থেকে আমার অধিকার আদায় করে দিন'।

বিশ্বনবী (সা:) লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি আমার সাথে এসো, আমি তোমার অধিকার আদায় করে দিচ্ছি'।

কথা শেষ করে নবী করীম (সা:) উঠে আবু জাহিলের বাড়ির দিকে গেলেন। লোকটিও রাসূল (সা:) এর সাথে গেল। আল্লাহর দুশমন আবু জাহিল কিভাবে নবী করীম (সা:) কে অপমান করে তা দেখার জন্যে ইসলামের দুশমনরা একজন লোককে পাঠালো। বিশ্বনবী (সা:) আবু জাহিলের বাড়ির দরোজায় আঘাত করলেন। সে ভেতর থেকে জানতে চাইলো আগন্তুকের পরিচয়। নবী (সা:) নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, 'আমি মুহাম্মাদ (সা:), দরোজা খুলে বাইরে এসো'।

আবু জাহিল বাইরে এসে বিশ্বনবী (সা:) এর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই তার চেহারা এমন ভীতিগ্রস্থ বিবর্ণ হয়ে উঠেছিল যে, সে যেন তাঁর সামনে মৃত্যুদূত দেখছে। আল্লাহর নবী (সা:) কলিজায় কম্পন জাগানো কণ্ঠে আদেশ দিলেন, 'এই লোকের যে অধিকার রয়েছে তোমার কাছে, তাঁর অধিকার তাকে বুঝিয়ে দাও'।

আবু জাহিল আতংকগ্রস্ত কন্ঠে বললো, 'এখুনি দিচ্ছি'। এ কথা বলেই সে তাঁর ঘরে গিয়ে দ্রুত অর্থ এনে লোকটিকে দিয়ে দিল। নবী করীম (সা:) কা'বায় ফিরে এলেন।

সে লোকটি কা'বায় এসে কাফিরদেরকে বললো, 'মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ (সা:) এর ওপর রহমত নাযিল করুন, তিনি আমার অধিকার আদায় করে দিয়েছেন'।

আল্লাহর দুশমনরা ধারণা করেছিল তাদের নেতা আবু জাহিল বিদেশী লোকটির সামনে নবী করীম (সা:) কে অপমান করবে, তা না করে আবু জাহিল মুহাম্মাদ (সা:) এর কথায় উটের মূল্য পরিশোধ করলো, কারণ কি? ইতোমধ্যে আবু জাহিল সেখানে এলো। তাঁর চেহারা থেকে তখন পর্যন্ত ভয়ের চিহ্ন মুছে যায়নি। অন্যরা তাকে জিজ্ঞাসা করলো, 'বিষয়টি কি? তুমি মুহাম্মাদ (সা:) এর কথায় মূল্য দিয়ে দিলে যে?'

আবু জাহিল বললো, 'মুহাম্মাদ (সা:) এর কথায় মূল্য না দিলে সে ভয়ঙ্কর উট আমাকে খেয়ে ফেলতো। আমি দরোজা খোলার পরে দেখলাম মুহাম্মাদ (সা:) এর পেছনে একটি ভয়ঙ্কর দর্শন উট দাঁড়িয়ে আছে। খোদার শপথ! তেমন উট আমি কোথাও দেখিনি। উটের চেহারা বড় ভয়ঙ্কর, আমি ঐ লোকটির উটের মূল্য না দিলে মুহাম্মাদ (সা:) এর পিছনে দাঁড়ানো উট আমাকে খেয়ে ফেলতো'। (ইবনে হিশাম)

এভাবেই সেদিন মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) এর সর্বোচ্চ মর্যাদা সমুন্নত রেখে ইসলামের দুশমনদের ষড়যন্ত্র বানচাল করে দিয়েছিলেন। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা ইসলামের দুশমনরা ঘটিয়েছে। যারা প্রত্যক্ষভাবে বিশ্বনবী (সা:) এর সাথে শত্রুতা করেছে, মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তাদের অশুভ পরিণতি সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। নবী করীম (সা:) এর চাচা আবু লাহাব এবং তাঁর স্ত্রী উম্মে জামিল নবী করীম (সা:) কে নানাভাবে অত্যাচার করেছে। তাদের পরিণতি সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সূরা লাহাব অবতীর্ণ করেছেন। আবু লাহাব যখন জানতে পারলো তাঁর পরিণতি সম্পর্কে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, তখন সে একটি পাথর নিয়ে নবী করীম (সা:) কে আঘাত করার উদ্দেশ্যে কা'বায় এসে বসলো।

কিছুক্ষণ পরে নবী করীম (সা:) হযরত আবু বকর (রা:) কে সাথে নিয়ে কা'বায় এলেন। মহান আল্লাহ তা'য়ালা আবু লাহাবের চোখ থেকে বিশ্বনবী (সা:) কে অদৃশ্য করে দিলেন। আবু লাহাব হযরত আবু বকর (রা:) কে জিজ্ঞাসা করলো, 'কোথায় মুহাম্মাদ (সা:)? আমি জানতে পারলাম সে আমার সম্পর্কে শাস্তির কথা বলছে। এখন আমি কাছে পেলে এই পাথর দিয়ে তাকে আঘাত করতাম'।

কথা শেষ করে সে চলে গেল। হযরত আবু বকর (রা:) আল্লাহর নবী (সা:) কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আবু লাহাব আপনাকে দেখতে পেল না কেনো?'

নবী করীম (সা:) বললেন, 'সে আমাকে দেখতে পায়নি। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর চোখকে আদেশ দিয়েছিলেন যেন সে আমাকে দেখতে না পায়'।

বর্তমান যুগে একশ্রেণীর লোক যেমন নিজেদেরকে সুশিল নামে পরিচয় দিয়ে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালায় তেমনি সে যুগেও সুশিলদের এক নেতা উমাইয়া ইবনে খালফ নবী করীম (সা:) কে দেখলেই গালাগালি ও হৈচৈ করতো। বর্তমান যুগের একশ্রেণীর ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্টিং মিডিয়ার মতো ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কল্পিত অভিযোগ ও মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের মতো ভূমিকা সে যুগের উমাইয়া ইবনে খালফ এবং তার সমর্থকগণ আল্লাহ তা'য়ালার রাসূলের বিরুদ্ধে পালন করতো। ইসলামের দুশমন এ লোকটির অশুভ পরিণতি এবং তার ঘৃণিত স্বভাব সম্পর্কে মহান আল্লাহ সূরা হুমাজাহ্ অবতীর্ণ করেছেন। নবী করীম (সা:) এর মহান সাহাবী হযরত খাব্বাব (রা:) ছিলেন একজন লৌহকর্মকার। তিনি লৌহজাত অস্ত্র নির্মাণ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর কাছ থেকে তরবারী কিনেছিল আ'স ইবনে ওয়ায়েল নামক এক কাফির। সম্পূর্ণ অর্থ সে তখন পর্যন্ত পরিশোধ করেনি। হযরত খাব্বাব (রা:) তাঁর কাছে তরবারীর মূল্য চাইতে গেলেই সে বিদ্রুপ করে বলতো, 'হে খাব্বাব! তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ (সা:) তো প্রচার করে জান্নাতে যারা যাবে তাঁরা ইচ্ছে অনুযায়ী স্বর্ণ রৌপ্য হিরা জহরত ও অসংখ্য দাস-দাসী পাবে। এ কথা কি ঠিক?'

হযরত খাব্বাব (রা:) জবাব দিতেন, 'আল্লাহর নবী (সা:)-এর কথা অবশ্যই সত্য'।

আল্লাহ তা'য়ালার দুশমন আ'স ইবনে ওয়ায়েল বিদ্রুপ করে বলতো, 'হে খাব্বাব! তাহলে আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত সময় দাও! আমি তোমাদের ঐ জান্নাতে গিয়েই তোমার অর্থ পরিশোধ করবো। আমি খোদার শপথ করে বলছি, তুমি আর তোমার মুহাম্মাদ (সা:) আমার তুলনায় অধিক সম্মান পাবে না এবং সৌভাগ্যবানও হতে পারবে না'। (নাউযুবিল্লাহ)

এই কাফির সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে সূরা মরিয়মের আয়াত অবতীর্ণ করেন। নাদার ইবনে হারেস ছিলো ইসলামের আরেক ঘৃণিত শত্রু। নবী করীম (সা:) যখন কুরআন তিলাওয়াত করতেন, লোকদেরকে ইসলামের দিকে আহবান জানাতেন, ইসলামের সাথে যারা অতীতে বিরোধীতা করে আল্লাহ তা'য়ালার গযবে পড়ে ধ্বংস হয়েছে, তাদের ইতিহাস শোনাতেন তখন এই কাফির সে সমাবেশে উপস্থিত হয়ে নীরবে বসে থাকতো। রাসূল (সা:) চলে যাবার পরে সে লোকজনকে বলতো, 'মুহাম্মাদ (সা:) যা বলে তার কোনো ভিত্তি নেই। তাঁর বলা কাহিনী সেই প্রাচীন যুগের গল্প ছাড়া আর কিছুই না। মুহাম্মাদ (সা:) এর চেয়ে ভালো কাহিনী আমি জানি'।

মহান আল্লাহ তা'য়ালা সূরা ফুরকানের আয়াত অবতীর্ণ করে ঘৃণিত এ লোকটির পরিণতি বর্ণনা করেছেন। আরেকজন কাফির আখনাস ইবনে শুরাইক, সে ছিল তৎকালিন সুশিল সমাজের একজন গন্যমান্য ব্যক্তি। এই লোকটি নানাভাবে নবী করীম (সা:) কে অত্যাচার করতো। তাঁকে দেখলেই অশালীন ভাষায় গালাগালি দিত। মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর সম্পর্কে সূরা কলমের আয়াত অবতীর্ণ করে তাঁর পরিণতি কত খারাপ হবে তা জানিয়ে দিলেন। ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা নামক কাফির বলতো, 'আমি এবং আবু মাসউদের মতো প্রভাবশালী লোক থাকতে মুহাম্মাদ (সা:) এর মতো লোকের ওপরে ওহী নাযিল হলো? আল্লাহ আর লোক পাননি বুঝি?' (নাউযুবিল্লাহ)

সুশিল নামধারী ইসলামের এসব দুশমনদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ সূরা যুখরূফের আয়াত অবতীর্ণ করে তাদের কথার প্রতিবাদ করে নির্মম পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন। কাফিরদের ভেতরে উকবা এবং উবাই ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নবী করীম (সা:) এক সমাবেশে মানুষদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাচ্ছিলেন, সে সমাবেশে উকবা উপস্থিত ছিলো। উবাই এ সংবাদ জানতে পেরে ছুটে এসে তাঁর বন্ধু উকবাকে বললো, 'তুমি মুহাম্মাদ (সা:) এর কথা শুনছো? তুমি যদি তাঁকে অপমান না করো তাহলে তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্কে থাকবে না'।

মহান আল্লাহ তা'য়ালা উকবা এবং উবাইকে জাহান্নামের অতলে নিমজ্জিত করুন। তাদের কঠিন পরিণতি সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ করে তাদের ভয়ংকর অবস্থা সম্পর্কে জানিয়ে দিলেন। একদিন উবাই একটি পুরোনো হাড় এনে নবী করীম (সা:) কে বললো, 'হে মুহাম্মাদ (সাঃ)! তোমার কি বিশ্বাস হয় এই পচা হাড়কে আল্লাহ আবার জীবিত করবে?' এ কথা বলে সে হাড়টি গুড়ো করে বাতাসে উড়িয়ে দিল।

নবী করীম (সা:) দৃঢ় কন্ঠে বললেন, 'মহান আল্লাহ তা'য়ালা বাতাসে মিশ্রিত হাড়কে আবার জীবিত করবেন এবং জাহান্নামে প্রেরণ করবেন'। এই কাফির সম্পর্কে সূরা ইয়াছিনের আয়াত অবতীর্ণ হলো। মহান আল্লাহ বললেন, 'তাদেরকে বলে দাও, প্রথমবার যখন তাঁরা অস্তিত্বহীন ছিল তখন তাদেরকে কে অস্তিত্ব দান করেছিল? যে আল্লাহ প্রথমবার অস্তিত্বদান করেছিলেন সেই আল্লাহই যতবার খুশী অস্তিত্বদান করবেন'।

আরেকদিন নবী করীম (সা:) কা'বাঘর তাওয়াফ করছিলেন, এ সময় কাফির নেতারা বিশ্বনবী (সা:) এর কাছে আপোষ প্রস্তাব পেশ করে বললো, 'হে মুহাম্মদ (সা:)! এসো আমরা একটি প্রক্রিয়ায় আমাদের বিরোধ শেষ করে দেই। তা হলো, আমরা তোমার আল্লাহর দাসত্ব কিছুটা করি তুমিও আমাদের প্রতিপালক দেবতাদের দাসত্ব কিছুটা করো। তাহলে আর আমাদের ভেতরে কোনো বিরোধ থাকবে না'।

কাফিরদের কথার জবাবে মহান আল্লাহ সূরা কাফিরুন অবতীর্ণ করে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, 'হে নবী, আপনি তাদেরকে জানিয়ে দিন, আমি যার দাসত্ব করি তোমরা তাঁর দাসত্ব করো না। তোমরা যার দাসত্ব করো আমি তাঁর দাসত্ব করি না। তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন আর আমার জন্য আমার দ্বীন'।

ইসলামে বাতিল শক্তির সাথে আপোষের কোনো ব্যবস্থা নেই। ইসলামে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই। যার যার ধর্ম সে সে অবশ্যই পালন করবে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার স্থান ইসলামে নেই। পবিত্র কুরআনের এই আয়াত দিয়ে যারা ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে কথা বলেন তাদের উচিত আয়াতটির পটভূমি দেখা। পৃথিবীর কোনো নবী-রাসূলগণ এবং তাঁদের সাহাবায়ে কেরাম ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে ছিলেন না। কাফির এবং ধর্মনিরপেক্ষদের সাথেই তাদের সংঘর্ষ হয়েছে। নবীগণের আগমন ঘটেছেই মহান আল্লাহর বিধান রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে। সুতরাং কুরআনের আয়াতের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে যারা পার্থিব স্বার্থে ব্যবহার করে তাদের সতর্ক থাকা উচিত। মহান আল্লাহ তা'য়ালার ক্রোধ যে কোনো মুহূর্তে অবতীর্ণ হতে পারে।

ইসলামে শক্তি প্রয়োগের স্থান নেই। ইসলাম তার আকিদা বিশ্বাসকে গ্রহণ করতে কাউকে বাধ্য করে না। কারণ বিশ্বাস জিনিসটা কারো ওপর শক্তি প্রয়োগ করে চাপিয়ে দেয়া যায় না। একইভাবে, ইসলাম তার আকিদা বিশ্বাসের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পৃক্ত ইবাদাতকেও কোনো ব্যক্তির ওপর শক্তি প্রয়োগ করে চাপিয়ে দেয় না। কারণ দৃঢ় বিশ্বাস ব্যতীত ইসলামের ইবাদত সমূহ অর্থহীন। দৃঢ় বিশ্বাস অন্তরে পোষণ করেই নামায, রোযা, হজ্জ ইত্যাদী আদায় করতে হয়। এসব দিকে ইসলাম মানুষকে স্বাধীনতা দিতে চায়। পক্ষান্তরে ইসলাম এটা সহ্য করতে নারাজ যে, সমাজ ও সভ্যতা পরিচালনাকারী যে আইন ও বিধানের ওপর রাষ্ট্রের কাঠামো ও বিধিব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ব্যতীত অন্য কেউ রচনা করে দিক, আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি বিদ্রোহী মানুষজন আল্লাহর পৃথিবীতে আইনের প্রয়োগ করুক বা বাস্ত বায়ন করুক, মুসলিম জনগোষ্ঠী তা পালন করুক এবং তাদের দাস হয়ে থাকুক। এসব ঘৃণ্য সুযোগ ইসলাম দিতে নারাজ।

নবী করীম (সা:) যে বাড়িতে থাকতেন সে বাড়ির চারদিকে যারা বসবাস করতো অর্থাৎ আল্লাহর রাসূলের প্রতিবেশী যারা ছিল তাদের ভেতরে একমাত্র হাকাম ইবনে আ'স (রা:) ব্যতীত আর কেউ ইসলাম কবুল করেনি। রাসূল (সা:) যখন নিজের বাড়িতেই নামায আদায় করতেন তখন প্রতিবেশী উকবা, আদী এ ধরনের অনেকেই তাঁর প্রতি পশুর নাড়ি ভুড়ি ছুড়ে দিত। নবী করীম (সা:) বাধ্য হয়ে দেয়ালের আড়ালে নামায আদায় করতেন। তিনি রান্নার জন্য উনুনে হাড়ি উঠাতেন আর তারা সেই হাড়ির ভেতরেও আবর্জনা ছুড়ে দিত। বিশ্বনবী (সা:) নিজ হাতে সেসব আবর্জনা পরিষ্কার করতেন। বিশ্বমানবতার মহান মুক্তির দূত নবী করীম (সা:) এর প্রতি ইসলামের শত্রুরা নির্যাতনের চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেছে, কিন্তু শত্রুপক্ষের শেষ রক্ষা হয়নি। তাদের নাম-নিশানা মুছে গিয়েছে। ইনশাআল্লাহ ইসলামের এ যুগের দুশমনদের অস্তিত্বও ঘৃণা ও লাঞ্ছনার অতল তলদেশে হারিয়ে যাবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px