📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি শত্রুদের অভিযোগ, জবাব দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা!
পৃথিবীতে প্রেরিত নবী-রাসূলদের প্রতি সমকালীন লোকদের মধ্যে যারা বিরোধিতা করেছে তারা আল্লাহ তা'য়ালা কর্তৃক প্রেরিত হিদায়াতকারীদের প্রতি নানা ধরনের কল্পিত অভিযোগ আরোপ করার বৃথা চেষ্টা করেছে। শুধু কল্পিত বিশেষণই আরোপ করেনি, নবী-রাসূলদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতেও তারা দ্বিধাবোধ করেনি। মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করার ও সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্যে যে মানুষগুলোকে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নির্বাচিত করে প্রেরণ করতেন, তাঁদের প্রতি মানুষ যে বর্বর আচরণ করতো সে কারণে আল্লাহ তা'য়ালা আফসোস করে বলেছেন-
يَا حَسْرَةً عَلَى الْعِبَادِ عِ مَا يَأْتِيهِم مِّنْ رَّسُوْلٍ إِلَّا كَانُوْا بِهِ يَسْتَهْزِؤُوْنَ
বড়োই আফসোস (এমন সব) বান্দাদের ওপর, তাদের কাছে এমন একজন রাসূলও আসেননি, যাদের তারা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেনি! (সূরা ইয়াছিন-৩০)
নবী করীম (সা:) এর পূর্বে যে সকল নবী-রাসূলদের প্রতি সমকালীন লোকজন ব্যঙ্গ-বিদ্রুপসহ নানা ধরনের কল্পিত অভিযোগ আরোপ করতো, এসবের জবাব স্বয়ং উক্ত নবী-রাসূলগণই দিতেন। হযরত নূহ (আ:)-এর প্রতি তাঁর জাতির নেতৃস্থানীয় লোকজন অভিযোগ করলো-
قَالَ الْمَلَأُ مِنْ قَوْمِهِ إِنَّا لَنَرَاكَ فِي ضَلَالٍ مُّبِيْنٍ
তার জাতির নেতারা বললো (হে নূহ), আমরা দেখতে পাচ্ছি তুমি এক সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় (নিমজ্জিত) রয়েছো। (সূরা আল আ'রাফ-৬০)
আল্লাহ তা'য়ালা হযরত নূহ (আ:) কে এক পথহারা জাতির কাছে প্রেরণ করলেন সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্যে, আর সেই জাতির নেতৃস্থানীয় লোকজন নিজেদের নেতৃত্ব হারানোর আতঙ্কে হযরত নূহ (আ:) এর প্রতিই অভিযোগ করলো যে, 'তুমি নিজেই ভুল পথে রয়েছো এবং জাতিকেও ভুল পথের দিকেই ডাকছো'।
আল্লাহ তা'য়ালা হযরত নূহ (আ:) কে প্রেরণ করলেন কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রেরিত নবীর শত্রুদের আরোপিত অভিযোগের জবাব দিলেন না, জবাব দিলেন স্বয়ং সেই নবী। জবাবে হযরত নূহ (আ:) জাতীয় নেতৃবৃন্দকে বললেন- قَالَ يَا قَوْمِ لَيْسَ بِي ضَلَالَةٌ وَلَكِنِّي رَسُوْلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعَالَمِينَ
সে বললো, হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা, আমার মধ্যে কোনোই পথভ্রষ্টতা নেই, আমি তো হচ্ছি সৃষ্টিকুলের মালিক আল্লাহর পক্ষ থেকে (আসা) একজন রাসূল। (সূরা আ'রাফ-৬১)
হযরত হূদ (আ:) কে আল্লাহ তা'য়ালা প্রেরণ করলেন চরম ক্ষতির দিকে ধাবমান এক জাতির কাছে। তিনি সেই জাতিকে মহাক্ষতি থেকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যে সীমাহীন প্রচেষ্টা শুরু করলেন। জাতির নেতৃবৃন্দ নিজেদের নেতৃত্বের আসন টলটলায়মান হতে দেখে আল্লাহ নবী হযরত হূদ (আ:) এর প্রতি অভিযোগ আরোপ করলো- قَالَ الْمَلَأُ الَّذِيْنَ كَفَرُوا مِن قَوْمِهِ إِنَّا لَنَرَاكَ فِي سَفَاهَةٍ وَإِنَّا لَنَظُنُّكَ مِنَ الْكَاذِبِينَ
তার জাতির নেতৃবৃন্দ, যারা (তাকে) অস্বীকার করেছে, তারা বললো, আমরা তো দেখছি তুমি নির্বুদ্ধিতায় লিপ্ত আছো এবং আমরা মনে করি তুমি মিথ্যাবাদীদেরই একজন। (সূরা আল আ'রাফ-৬৬)
আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে বলছেন হযরত হূদ (আ:) এ অভিযোগের জবাব কিভাবে দিয়েছিলেন- قَالَ يَا قَوْمِ لَيْسَ بِي سَفَاهَةٌ وَلَكِنِّي رَسُوْلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعَالَمِينَ
সে বললো, হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা, আমার সাথে কোনোরকম নির্বুদ্ধিতা জড়িত নেই, বরং আমি (হচ্ছি) সৃষ্টিকুলের মালিক আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে (আগত) একজন রাসূল। (সূরা আল আ'রাফ-৬৭)
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নবী-রাসূলগণের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে প্রমাণ হয় যে, তাদের প্রতি সমকালীন লোকজন যে সকল অভিযোগ আরোপ করেছেন এবং তাদের ব্যাপারে কল্পিত যেসব আপত্তি উত্থাপন করেছে তার জবাব নবী-রাসূলগণ স্বয়ং দিয়েছেন। ব্যতিক্রম শুধুমাত্র নবী করীম (সা:) এর ক্ষেত্রে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন বিধায় সমকালীন বিরোধিগণ তাঁর পবিত্র সত্তার প্রতি যেসকল ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপন করেছে এবং যেসব কল্পিত বিশেষণে বিশেষিত করার অপচেষ্টা করেছে, এসব কিছুর জবাব দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। ইসলামী আন্দোলনের শত্রুরা নবী করীম (সা:) সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে বুঝানোর চেষ্টা করতো যে, এ লোকটি পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছে। তাদের এ অপবাদের জবাব নবী করীম (সা:) দিবেন, আল্লাহ তা'য়ালা তা পছন্দ করলেন না। স্বয়ং তিনি এভাবে জবাব দিলেন-
مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوى ط
তোমাদের সাথী পথ ভুলে যায়নি, সে পথভ্রষ্টও হয়নি। (সূরা আন নাজম-২)
ইসলামী জীবন বিধানের প্রতিপক্ষগণ নবী করীম (সা:)-কে গণবিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে তাঁকে সর্বসাধারণের কাছে উন্মাদ হিসাবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা করে প্রচার করেছে, 'মুহাম্মাদ (সা:)-এর মস্তিষ্কে ত্রুটি দেখা দিয়েছে, তিনি সুস্থ নন বরং পাগল হয়ে গিয়েছেন'। শত্রুদের এসব কল্পনাপ্রসূত অভিযোগের জবাব স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা শপথের মাধ্যমে দিয়েছেন-
وَالْقَلَمِ وَمَا يَسْطُرُوْنَ لا مَا أَنتَ بِنِعْمَةِ رَبِّكَ بِمَجْنُوْنَ
শপথ (লেখার মাধ্যম) কলমের, (আরো শপথ এ কলম দিয়ে) তারা যা লিখে রাখছে তার, আপনার মালিকের (অসীম) দয়ায় আপনি পাগল নন। (সূরা কালাম-১-২)
পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকে নবী করীম (সা:) যাদের মাঝে নিজের শৈশব, কৈশর, তারুণ্য ও যৌবন অতিক্রম করে চল্লিশ বছরে পদার্পণ করলেন, তারাই তো তাঁকে ভালোভাবে চিনেছে এ মানুষটি কেমন। চিনেছে বলেই তারা তাঁকে পরম শ্রদ্ধাভরে উপাধি দিয়েছে 'আল আমীন বা বিশ্বাসী'। নবী করীম (সা:) এর ইসলামী আন্দোলনের ঢেউ যখন তাদের প্রতিষ্ঠিত স্বার্থে আঘাত হানলো, তখন তারাই আল্লাহর রাসূল (সা:) কে পাগল হিসাবে আখ্যায়িত করার লক্ষ্যে প্রচার শুরু করলো। তিনি পাগল নন অথবা সকলের তুলনায় সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী এ কথা তারাই ভালো জানতো, যারা তাঁর প্রতি এ ঘৃণ্য অভিযোগ আরোপ করার চেষ্টা করছে। তারা অপবাদ দিয়েছে-
وَقَالُوا يَا أَيُّهَا الَّذِي نُزِّلَ عَلَيْهِ الذِّكْرُ إِنَّكَ لَمَجْنُونٌ طَ
তারা বলে, ওহে- যার ওপর কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে- তুমি অবশ্যই একজন উন্মাদ ব্যক্তি। (সূরা হিজর-৬)
স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা অভিযোগকারীদের লক্ষ্য করে জবাব দিলেন- وَمَا صَاحِبُكُمْ بِمَجْنُوْنٍ جِ তোমাদের সাথী (কিন্তু) পাগল নয়। (সূরা তাকবীর-২২)
দুশমনরা সাধারণ মানুষকে পবিত্র কুরআন থেকে দূরে রাখার লক্ষ্যে প্রচার করেছে, মুহাম্মাদ (সা:) আল্লাহ তা'য়ালার বাণী বলে যা দাবী করছেন তা মোটেও সত্য নয়, বরং এসব তাঁর নিজের রচনা করা কথা। শত্রুদের এসব অপবাদের জবাব স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা এভাবে দিয়েছেন- وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى طَ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى لا সে কখনো নিজের থেকে কোনো কথা বলে না, বরং তা হচ্ছে ওহী যা (তার কাছে) পাঠানো হয়। (সূরা আন নাজম-৩-৪)
দুশমনদের কেউ কেউ অভিযোগ কয়েছে, মুহাম্মাদ (সা:) যে সকল কথা কুরআন বলে প্রচার করছে তা আল্লাহ তা'য়ালা অবতীর্ণ করেননি, বরং শয়তান এসব কথা তাঁকে দিয়ে বলাচ্ছে। শত্রুদের এসব ভিত্তিহীন কথার জবাব আল্লাহ তা'য়ালা দিয়েছেন- وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَيْطَانٍ رَحِيمٍ لا এটা অভিশপ্ত শয়তানের কথাও নয়। (সূরা তাকবীর-২৫)
শত্রুপক্ষ প্রশ্ন তুলেছে, 'মুহাম্মাদ (সা:) একজন শ্রেষ্ঠ কবি অথবা তিনি উচ্চপর্যায়ের একজন গণক বা জ্যোতিষী'। তাদের এসব প্রশ্নের জবাব নবী করীম (সা:) দিতে গিয়ে সামান্যতম কষ্টানুভব করবেন আল্লাহ তা'য়ালা তা বরদাস্ত করেননি। তিনি স্বয়ং জবাব দিলেন- فَلَا أُقْسِمُ بِمَا تُبْصِرُوْنَ لا وَمَا لَا تُبْصِرُوْنَ لا إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُوْلٍ كَرِيمٍ جِ لَا وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرِط قَلِيْلًا مَّا تُؤْمِنُوْنَ لا وَلَا بِقَوْلِ كَاهِنِ طَ قَلِيْلًا مَّا تَذَكَّرُوْنَ طَ تَنْزِيلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعَالَمِينَ তোমরা যা কিছু দেখতে পাও আমি তার শপথ করে বলছি, (আরো শপথ করছি) সেসব বস্তুর যা তোমরা দেখতে পাও না, নিঃসন্দেহে এ কিতাব একজন সম্মানিত রাসূলের (আনীত) বাণী, এটা কোনো কবির কাব্যকথা নয়; যদিও তোমরা খুব কমই বিশ্বাস করো, এটা কোনো গণক বা জ্যোতিষীর কথাও নয়; যদিও তোমরা খুব কমই বিবেক-বিবেচনা করে চলো; (মূলত) এ কিতাব বিশ্বজগতের মালিক আল্লাহ তা'য়ালার কাছ থেকেই (তাঁর রাসূলের ওপর) অবতীর্ণ করা হয়েছে। (সূরা আল হাক্কাহ্ ৩৮-৪৩)
মহান আল্লাহ তা'য়ালার দ্বীনের বিরোধিগণ জনসাধারণকে বুঝাতো, 'মুহাম্মাদ (সা:) একজন পথহারা কবি এবং এমন একজন পথভ্রষ্ট কবিয়ালের কথায় কি শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যাপী যাদেরকে নিজের উপাস্য দেবতা হিসাবে পূজা দিয়ে আসছি, তাদেরকে কি আমরা ত্যাগ করতে পারি?' তাদের এসব উদ্ভট কথার জবাব আল্লাহ তা'য়ালা এভাবে দিয়েছেন-
وَيَقُولُوْنَ أَنَّا لَتَارِكُوْا آلِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَّجْنُوْنَ ط بَلْ جَاءَ بِالْحَقِّ وَصَدَّقَ الْمُرْسَلِينَ
এরা বলতো, আমরা কি একজন পাগল কবিয়ালের কথায় আমাদের মাবুদদের (আনুগত্য) ছেড়ে দিবো? (অথচ আমার নবী কোনো কাব্য নিয়ে আসেনি,) বরং তিনি এসেছেন সত্য (দ্বীন) নিয়ে এবং তিনি (আগের) নবীদের সত্যতাও স্বীকার করছেন। (সূরা আছ ছাফ্ফাত-৩৬-৩৭)
মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রদান করেছেন এবং মর্যাদার সাথে সঙ্গতি রেখে বিরোধিদের উত্থাপিত অভিযোগের জবাবে বলেছেন-
فَذَكِّرْ فَمَا أَنْتَ بِنِعْمَتِ رَبِّكَ بِكَاهِنِ وَلَا مَجْنُوْنَ
অতএব (হে নবী, মানুষদের) আপনি এ দিনের কথা স্মরণ করাতে থাকুন, আল্লাহ তা'য়ালার অনুগ্রহে আপনি কোনো গণক নন, আবার আপনি কোনো পাগলও নন (আপনি হচ্ছেন তাঁর বাণী বহনকারী একজন রাসূল মাত্র)। (সূরা আত তুর-২৯)
নবী করীম (সা:) এর মর্যাদার সাথে কাব্য রচনা সঙ্গতিপূর্ণ নয়, এ বিষয়টি মানুষের কাছে স্পষ্ট তুলে ধরে মহান আল্লাহ তা'য়ালা ঘোষণা করলেন-
وَمَا عَلَّمْنَاهُ الشِّعْرَ وَمَا يَنبَغِي لَه طَ إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ وَقُرْآنٌ مُّبِينٌ
(তোমরা এও জেনে রেখো,) আমি এ (রাসূল)-কে কাব্য (রচনা) শেখাইনি এবং এটা তার (নবী মর্যাদার) পক্ষে শোভনীয়ও নয়; (আর তার আনীত গ্রন্থ) তা হচ্ছে একটি উপদেশ ও সুস্পষ্ট কুরআন। (সূরা ইয়াছিন-৬৯)
নবী-রাসূলদের অস্বীকারকারীগণ তাদেরই অনুরূপ আরেকজন মানুষকে নবী-রাসূল হিসাবে দাবী করতে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতো। তাদের ধারণা ছিলো, নবী- রাসূলগণ হবেন মানুষ প্রজাতির বাইরের কেউ এবং নিতান্তই যদি সে মানুষ হয় তাহলে তো তাঁর সাথে অবশ্যই আল্লাহ তা'য়ালা একজন ফিরিশতা পাঠাবেন এবং তিনি নবী-রাসূলকে সাধারণ মানুষের কাছে এভাবে পরিচয় করিয়ে দিবেন যে, 'তিনি আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে প্রেরিত, তোমরা তাঁর অনুসরণ করো। যদি তাঁর অনুসরণ না করো তাহলে তোমাদের ওপর আযাব নিপতিত হবে'। এ ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা প্রশ্ন তুলতো, 'এ আবার কেমন নবী-রাসূল যে, তিনি আমাদের মতোই মানুষ এবং আমাদের মধ্যে যে মানবীয় গুণ-বৈশিষ্ট রয়েছে একজন নবীর মধ্যেও তা রয়েছে'।
নবী করীম (সা:) এর সম্পর্কে যখন অজ্ঞ লোকজন এমন প্রশ্ন তুললো, 'এ আবার কেমন (ধরনের) রাসূল যে (আমাদের মতো করেই) খাবার খায় এবং (আমাদের মতোই) হাটে বাজারে চলাফেরা করে। কেনো তাঁর সাথে কোনো ফিরিশতা নাযিল করা হলো না যে, তার সাথে (আযাবের) সতর্ককারী হয়ে থাকবে!' অস্বীকারকারীদের এসব উদ্ভট প্রশ্নের জবাবে মহান আল্লাহ বলেন-
وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِنَ الْمُرْسَلِينَ إِلَّا إِنَّهُمْ لَيَأْكُلُوْنَ الطَّعَامَ وَيَمْشُوْنَ فِي الْأَسْوَاقِ ط وَجَعَلْنَا بَعْضَكُمْ لِبَعْضٍ فِتْنَةٌ طَ أَتَصْبِرُوْنَ جِ وَكَانَ رَبُّكَ بَصِيرًاع
(হে নবী) আপনার পূর্বে আমি আরো যতো রাসূল প্রেরণ করেছি, তারা (মানুষের মতোই) আহার করতো, (অন্য মানুষদের মতোই) তারা হাটে বাজারে যেতো (আসল কথা হচ্ছে) মানুষদের মধ্য থেকে রাসূল পাঠিয়ে আমি তোমাদের একজনকে আরেকজনের জন্য পরীক্ষার (উপকরণ) বানিয়েছি; (এ পরীক্ষায়) তোমরা কি ধৈর্য ধারণ করবে না? তোমার মালিক (কিন্তু তোমাদের) সবকিছুই দেখছেন। (সূরা আল ফুরকান-২০)
📄 বিশ্বনবীর মর্যাদাগত কারণে আল্লাহ তাঁর নবীর জীবনের শপথ করেছেন
নবী করীম (সা:) এর পূর্বে প্রেরিত কোনো নবী-রাসূল এবং তাঁরা যে এলাকায় বসবাস করতেন সেই এলাকার নাম উল্লেখ পূর্বক অথবা উক্ত নবী-রাসূলদের জীবনের শপথ আল্লাহ তা'য়ালা করেছেন, এমন দৃষ্টান্ত পবিত্র কুরআনে কোথাও সন্ধান করে পাওয়া যাবে না। কিন্তু নবী করীম (সা:) এর মর্যাদা মহান আল্লাহ তা'য়ালা এতই উচ্চ করেছেন যে, স্বয়ং আরশে আযীমের মালিক- সমগ্র সৃষ্টিজগত ও সৃষ্টির মালিক আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রিয় হাবীবের জীবনের শপথ করেছেন-
لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُوْنَ -
(আল্লাহ তা'য়ালা বললেন, হে নবী,) আপনার জীবনের শপথ (করে বলছি, সেদিন) এরা নিদারুণ এক নেশায় বিভোর হয়ে পড়েছিলো (আল্লাহর গযবের কোনো কথাই এরা বিশ্বাস করলো না)। (সূরা হিজর-৭২)
মহান আল্লাহ তা'য়ালা মর্যাদাগত কারণে শুধু নবী করীম (সা:)-এর জীবনের শপথই করেননি, তাঁর মহান নবী যে নগরীতে জন্ম গ্রহণ করলেন, যে স্থান তাঁর শৈশব, কৈশর, তারুণ্য ও যৌবনের চারণভূমি সেই পবিত্র মক্কা নগীরও শপথ করেছেন- لَا أُقْسِمُ بِهَذَا الْبَلَدِ لَا وَأَنْتَ حِلْمٍ بِهَذَا الْبَلَدِ لا
আমি শপথ করছি এ (পবিত্র) নগরীর, এ নগরীতে আপনি (সম্পূর্ণ) স্বাধীন। (সূরা বালাদ-১-২)
পবিত্র মক্কা নগরী সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। এখানে সকল প্রাণী নিরাপত্তা লাভসহ স্বস্তি ও শান্তি লাভ করে। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় পবিত্র কুরআনের গবেষকগণ বলেছেন, 'নবী করীম (সা:) মক্কা নগরীতে প্রবাসী কোনো ব্যক্তি নন, তিনি ভিন্ন কোনো এলাকা থেকে এসেও এখানে বসতি স্থাপন করেননি। তিনি এই নগরীতেই জন্মগ্রহণ করেছেন, তাঁর শৈশব, কৈশর ও যৌবনের চারণভূমি এই নগরী। এখানেই তিনি নবুয়্যাত লাভ করেছেন এবং তিনি এখানে অবস্থান করছেন। এসব কারণে এই নগরীর মর্যাদা ও গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে'।
আল্লাহ তা'য়ালা সূরা বালাদের উক্ত আয়াতে বলছেন, 'এটা আপনার আপন এলাকা, আপনার পবিত্র জন্মভূমি। যেখানে আপনি সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং যে কোনো স্থানে গমন ও বিচরণ করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আপনার রয়েছে। অথচ এই নগরীর পরিবেশ আপনার জন্যে এক শ্বাসরুদ্ধকর করে তুলেছে ইসলাম বিরোধী গোষ্ঠী। আপনার প্রিয় স্মৃতি বিজড়িত মাতৃভূমি- আপনার চারণভূমিকে আপনারই জন্যে কন্টকাকীর্ণ করে তুলেছে মিথ্যার অন্ধ পূজারীরা। যে নগরীর প্রত্যেক ধূলিকণা আপনার জন্যে প্রশান্তি দায়ক, সেই নগরীর প্রতি ধূলিকণাকে আপনার জন্যে শাণিত অস্ত্রের রূপ দেয়া হয়েছে'।
যেখানে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রাতি একটি প্রাণীকেও নিরাপত্তা দিচ্ছে সত্যের শত্রুরা, পরম আপনজনের হত্যাকারীকেও যে এলাকায় নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। সেই পবিত্র এলাকায় আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল (সা:) এর এবং তাঁর কোনো অনুসারীর নিরাপত্তা নেই। সেই মহাপবিত্র এলাকায় বিশ্বনবী (সা:) এর পূত পবিত্র দেহের রক্ত ঝরানো বৈধ করা হয়েছে। হালাল করা হয়েছে তাঁদের রক্ত, যারা মহান আল্লাহর অনুগত বান্দাহ্। পবিত্র হারাম শরীফে আল্লাহর রাসূল মহান আল্লাহকে সিজদা দিচ্ছেন, সমগ্র সৃষ্টিজগতের রব-এর উদ্দেশ্যে সিজদায় লুটিয়ে পড়েছেন, এই অবস্থায় তাঁর মাথার ওপরে উটের পচা দুর্গন্ধযুক্ত নাড়িভূড়ি চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।
তাঁর পবিত্র কণ্ঠনালীতে কাপড় পেঁচিয়ে দু'দিক থেকে এমনভাবে টেনে ধরা হয়েছে, আল্লাহর রাসূলের শ্বাস বন্ধ হয়ে তাঁর চোখ মোবারক কোঠর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। আল্লাহর অনুগত বান্দাহ্ মুসলমানদেরকে এই পবিত্র স্থানে রক্তাক্ত করা হয়েছে। যে কোনো প্রাণী, উদ্ভিদ এবং চরম শত্রুর জন্যেও যে এলাকায় বৈধ অবৈধের সীমা অনুসরণ করা হয়েছে, সেই সীমা অনুসরণ করা হয় নি শুধু আল্লাহর রাসূল (সা:) ও তাঁর অনুসারীদের ক্ষেত্রে।
তাঁর অপরাধ (!) একটিই, তিনি মানুষকে মহাসত্যের দিকে আহ্বান জানাচ্ছেন। মানুষকে শোষণ, বঞ্চনা, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, অন্যায়-অত্যাচার থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে আন্দোলন করছেন। তাঁর অনুগত লোকদের অপরাধ (!) তাঁরা একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো গোলামী করতে রাজী হয়নি। এদের একমাত্র অপরাধ হলো, এরা মহা প্রশংসিত মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে। এই অপরাধেই মক্কার জাহিল লোকগুলো তাদের সহায়-সম্পদ, দেহের রক্ত ও প্রাণ পবিত্র এলাকায় বৈধ করে নিয়েছে। মক্কার লোকগুলোও যেমন কা'বা এলাকায় ক্ষুদ্র একটি মশাকে হত্যা করাও অপরাধ মনে করতো, কিন্তু সেই একই এলাকায় কোনো মুসলমানকে হত্যা করা অপরাধ মনে করতো না। অর্থাৎ এদের কাছে ক্ষুদ্র একটি প্রাণীর প্রাণের যে মূল্য ও মর্যাদা ছিল, একজন মুসলমানের প্রাণের সে মূল্য ছিল না।
বর্তমানে অমুসলিম শক্তির কাছেও মুসলমানদের প্রাণের কোনো মূল্য নেই। বনের হিংস্র প্রাণীর মূল্য তাদের কাছে অনেক বেশি এবং এসব প্রাণী সংরক্ষণের জন্যে তারা অকাতরে অর্থ ব্যয় করছে। হিংস্র পশুর চারণভূমি গ্রীষ্মের মৌসুমে প্রায় পানি শূন্য হয়ে পড়ে। অমুসলিম রাষ্ট্রসমূহ সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের কাছ থেকে শোষণকৃত অর্থ ব্যয় করে ঐসব এলাকায় জলাধার নির্মাণ করে দিচ্ছে, যেন কোনো পশু পানি সঙ্কটে না পড়ে। বাঘ, সিংহ, শৃগাল, কুকুর, শুকর থেকে শুরু করে সামান্য একটি টিকটিকির মতো প্রাণীকেও তারা আধুনিক চিকিৎসা উপকরণে সজ্জিত ক্লিনিকে অত্যন্ত যত্নের সাথে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলে।
একবার আটলান্টিক মহাসাগরে বেশ কয়েকটি তিমি বরফে আটকা পড়লো। ইউরোপ- আমেরিকার কয়েকটি দেশ তড়িঘড়ি করে সেখানে 'আইস কাটার' বরফ কাটা জাহাজ প্রেরণ করে তিমিগুলো উদ্ধার করে সাগরে ছেড়ে দিল। এভাবে বরফে আটকা পড়া তিমিকে উদ্ধার করে এবং এসব দৃশ্য প্রচার মাধ্যমে বার বার প্রচার করে তারা বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে থাকে, প্রাণীর প্রতি তারা কতটা দরদী।
দরদ নেই শুধু মুসলমানদের ক্ষেত্রে। সে যুগের মক্কার জাহিলদের অনুকরণে আধুনিক জাহিলরাও মুসলমানদের প্রাণের কোনো মূল্য দিচ্ছে না। এক আল্লাহ তা'য়ালাকে তারা বিশ্বাস করে, কুরআনকে তারা মহান আল্লাহর বাণী হিসেবে বিশ্বাস করে, শুধুমাত্র এই অপরাধে (!) মুসলিম নারীদের ইজ্জত-আব্রু হালাল করে নেয়া হয়েছে। মুসলিম শিশু, কিশোর, তরুণ-যুবকদেরকে পাখির মতো গুলী করে হত্যা করা হচ্ছে। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া হচ্ছে। বন্দী মুসলমানদেরকে পেছনের দিকে হাত দু'টো বেঁধে খাঁচায় আবদ্ধ করে রাখা হচ্ছে। গর্ভবতী মুসলিম নারীর পেট চিরে গর্ভের শিশুকেও হত্যা করা হচ্ছে। মাতা-পিতার শান্তির কোল থেকে শিশু ছিনিয়ে নিয়ে পাথরে আছড়ে হত্যা করা হচ্ছে। সামান্য একটি পিঁপড়ার যে মূল্য রয়েছে, বর্তমান পৃথিবীতে অমুসলিমদের কাছে মুসলমানের সেই মূল্য নেই। বর্তমান জাহিলদের পূর্বসূরী আরব জাহিলদের চরিত্রে যে গুণ ও বৈশিষ্ট ছিল, সেই একই গুণ ও বৈশিষ্ট বহন করছে আধুনিক জাহিলরা। আল্লাহ তা'য়ালার বিধানের শত্রুদের চারিত্রিক মান, গুণ ও বৈশিষ্ট প্রত্যেক যুগে একই রকম ছিল, এদের চরিত্র অপরিবর্তনীয়।
ইসলামের দুশমনরা নবী করীম (সা:) এর মর্যাদাক্ষুণ্ণকর কর্মকাণ্ড করছে আর মুসলিম নামধারী অগণিত জনগোষ্ঠী নীরবে দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা নির্দেশ দিচ্ছেন- لِتُؤْمِنُوْا بِاللَّهِ وَرَسُوْلِهِ وَتُعَزِّرُوْهُ وَتُوَقِّرُوْهُ ط وَتُسَبِّحُوْهُ بُكْرَةً وَأَصِيْلًا- যাতে করে তোমরা (একমাত্র) আল্লাহর ওপর এবং তাঁর নবীর ওপর (সর্বোতভাবে) ঈমান আনো, (দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে) তাঁকে সাহায্য করো, (আল্লাহর নবী হিসাবে) তাঁকে সম্মান করো; (সর্বোপরি) সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহ তা'য়ালার মাহাত্ম্য ঘোষণা করো! (সূরা আল ফাতাহ্-৯)
ইতোপূর্বে প্রেরিত নবী-রাসূলদের সাথে বিদ্রোহ করার অপরাধে মহান আল্লাহ তা'য়ালা সেসব এলাকায় বিদ্রোহী জাতির ওপর আযাব অবতীর্ণ করে জনপদ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন। মক্কা নগরীর ইসলাম বিরোধিদের ওপর আযাব অবতীর্ণ করে তাদের নিশ্চিহ্ন করেননি শুধু মাত্র নবী করীম (সা:) এর মর্যাদার খাতিরে। যে পবিত্র নগরীতে তাঁর প্রিয় হাবীব এবং সবথেকে বেশি মর্যাদাবান নবী জন্মগ্রহণ করেছেন, সেই নগরীর ওপর তিনি আযাব অবতীর্ণ করেননি। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيْهِمْ ط وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ- আল্লাহ তা'য়ালা এমন নন যে, তিনি তাদের কোনো আযাব দিবেন, অথচ আপনি (এখনো) তাদের মধ্যে (বর্তমান) রয়েছেন; আর আল্লাহ তা'য়ালা এমনও নন যে, কোনো (জাতির) মানুষদের তিনি শান্তি দিবেন, অথচ তারা (কিছু লোক) তখনও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছে। (সূরা আনফাল-৩৩)
📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি প্রাণাধিক ভালোবাসা- ঈমানের অপরিহার্য দাবী
পবিত্র কুরআন ও হাদীসে নবী করীম (সা:) কে সর্বাধিক গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং সৃষ্টিসমূহের মধ্যে তাঁর যে অতুলনীয় মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে, এসব দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে স্পষ্টতই বুঝা যায়, একজন মুসলিম যদি পূর্ণ মুমিন হতে চায় তাহলে তাকে অবশ্য অবশ্যই নবী করীম (সা:) কে নিজ পরিবার পরিজন, সন্তান-সন্ততি, ধন-সম্পদ এমন কি নিজ প্রাণের তুলনায় অধিক ভালোবাসতে হবে। তাঁর প্রতি নিখাদ এবং সর্বাধিক ভালোবাসা না থাকলে কোনো মুসলিমের পক্ষে মুমিনের পূর্ণ স্তরে উপনীত হওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে -
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُ كُمْ حَتَّى أَكُوْنَ اَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَ وَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ
হযরত আনাস (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন, তোমাদের কেউই ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যে পর্যন্ত না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান- সন্ততি ও সকল মানুষ অপেক্ষা অধিক প্রিয় হই। (বুখারী, মুসলিম)
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم لَا يُؤْمِنُ أَحَدُ كُمْ حَتَّى يَكُوْنَ هَوَاهُ تَبْعًا لِّمَا خِفْتُ بِهِ -
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ আকাংখিত মানের মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের প্রবৃত্তিকে আমার আনীত বিধানের অধীন করে। (শরহে সুন্নাহ্- মিশকাত)
নবী করীম (সা:) এর প্রতি ভালোবাসার অর্থ এটা নয় যে শুধুমাত্র কিছু সময় তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ করা। মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা, রবিউল মাসের আগমনে রং বেরংয়ের ফেস্টুন বানিয়ে বিশাল মিছিল করা, তাঁর জীবনী আলোচনার উদ্দেশ্যে মাহফিলের আয়োজন ইত্যাদি করে নবী করীম (সা:) এর ভালোবাসার হক আদায় হয়ে যাবে।
স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা রাসূল (সা:) এর প্রতি দরূদ প্রেরণ করেন, তিনি ফিরিশতা ও মানুষকে তাঁর রাসূলের প্রতি দরূদ প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন, সুতরাং রাসূলের প্রতি দরূদ পাঠ করা বাধ্যতামূলক এবং তাঁর নাম শোনামাত্র দরূদ পাঠ না করলে গোনাহগার হতে হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। নবী করীম (সা:) এর প্রতি ভালোবাসা পোষণকারী মুসলমানদের মধ্যে দু'টি শ্রেণী দেখা যায়। একটি শ্রেণী নবী করীম (সা:) এর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায় এভাবে, তিনি পাগড়ী, টুপি ও লম্বা জামা ব্যবহার করেছেন, এরাও তাই করে। তিনি নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজ্জ আদায় করেছেন, এরাও তাই করে। তিনি বিশেষ বিশেষ খাদ্য পছন্দ করেছেন, এরাও তাই পছন্দ করে। তিনি নফল নামাজ আদায় করেছেন, তাসবীহ-তাহলীল পাঠসহ কুরআন তিলাওয়াত করেছেন, এরাও তাই করে। এই শ্রেণীর মধ্যে কেউ কেউ রাসূলের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে রবিউল মাসের আগমনে তাঁর জীবনী আলোচনা, মিলাদ মাহফিল, নানা রংয়ের ফেস্টুন বানিয়ে মিছিল এবং রাসূল (সা:) এর উদ্দেশ্যে নানা ধরনের আবৃত্তি ও গান বা হামদ-নাতের আয়োজনও করে।
আরেকটি শ্রেণীকে আমরা দেখতে পাই, তাঁরা রাসূল (সা:) কে ভালোবেসে কেউ কেউ দাড়ি রাখে, লম্বা জামাও ব্যবহার এবং নামাজ আদায় করে সেই সাথে নামাজের শিক্ষা সাহাবায়ে কেরামের মতো সকল স্তরে বাস্তবায়নের চেষ্টাও করে। এরাও যাকাত আদায়ের মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরামের অনুরূপ যাকাত ভিত্তিক অর্থনীতি চালু করার লক্ষ্যে আন্দোলন করে। এরাও হজ্জ আদায় করে এবং হজ্জের শিক্ষানুসারে সমগ্র মুসলিম মিল্লাতকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করে। এরাও রাসূল (সা:) এর জীবনী পর্যালোচনার মাধ্যমে রাসূল (সা:) এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্যে আন্দোলন- সংগ্রাম করে। এরাও কুরআন তিলাওয়াত করে সেই সাথে কুরআন বুঝার চেষ্টা করে এবং কুরআনের নির্দেশসমূহ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল স্তরে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অর্থ ব্যয় করে, হাসিমুখে জেল-জুলুম বরণ করে এবং প্রয়োজনে প্রাণও দেয়। এরাও দরূদ পড়ে, হামদ-নাত আবৃত্তি করে এবং রাসূল (সা:) এর মর্যাদার প্রতি কেউ আঘাত করলে রাসূলের প্রতি সর্বাধিক ভালোবাসার কারণে বারুদের মতোই জ্বলে ওঠে।
নবী করীম (সা:) এর প্রতি ভালোবাসা পোষণকারী মুসলিমদের মধ্যে এই দুই শ্রেণীর লোকদের ভালোবাসা কি সমপর্যায়ের? অথবা এই দুই শ্রেণীর ভালোবাসার মূল্যমান কি এক? রাসূলের প্রতি ভালোবাসার মধ্যে যেমন একদিকে রয়েছে ধন- সম্পদ বিনষ্ট হওয়া, জেল-জুলুম সহ্য করা ও নিজ প্রাণ দেয়ার ঝুঁকি। অপরদিকে রয়েছে ঝুঁকিহীন ভালোবাসা। শুধুমাত্র কুরআন তিলাওয়াত এবং তসবীহ-তাহলীল, নামাজ, রোজা, হজ্জ ও যাকাত আদায়, টুপি ও লম্বা জামা ব্যবহার, মিলাদ ও রবিউল আউয়াল মাসে মিছিলের আয়োজন করে রাসূল (সা:) এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের মধ্যে কোনো ঝুঁকি নেই।
নবী করীম (সা:) এর প্রতি সাহাবায়ে কেরামের ভালোবাসা কেমন ছিলো তা জানা থাকলে বর্তমান মুসলিমদের মধ্যে এই দু'টি শ্রেণীর মধ্যে কোন্ শ্রেণীর ভালোবাসা প্রকৃত ভালোবাসা এবং সাহাবায়ে কেরামের ভালোবাসার কোটি ভাগের কিছু অংশ হলেও কোন্ শ্রেণীর মধ্যে রয়েছে তা জানা যাবে।
সাহাবায়ে কেরামের সম্মুখে আল্লাহর রাসূল (সা:) বর্তমান ছিলেন এবং তাঁদের সম্মুখেই পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। রাসূল (সা:) কুরআনের শিক্ষানীতি অনুসারে সাহাবায়ে কেরামকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁরা নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত আদায় করেছেন এবং বুঝে কুরআন তিলাওয়াত করেছেন। সেই সাথে তাঁরা নবী করীম (সা:) ও পবিত্র কুরআনের শিক্ষা জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও বাস্তবায়ন করেছেন। কুরআন ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁরা অকাতরে কষ্টার্জিত ধন-সম্পদ ব্যয় করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা ও রাসূলের মর্যাদার সাথে সাংঘর্ষিক কিছু দেখলে গর্জে উঠেছেন এবং দুশমনদের সাথে মুকাবেলা করতে গিয়ে তাঁরা পরিবার পরিজনসহ অকল্পনীয় অত্যাচার সহ্য করেছেন, প্রয়োজনে নিজের প্রাণ পর্যন্ত হাসিমুখে দান করেছেন। রাসূলের প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ হলো, তিনি মহান আল্লাহর নিকট থেকে যে আদর্শ নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেছেন, সেই আদর্শ সর্বাত্মক অনুসরণ করা এবং তা সমাজ ও দেশে বাস্তবায়ন করার জন্যে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও চেষ্টা করা। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
قُلْ إِنْ كُنتُمْ تُحِبُّوْنَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
(হে নবী,) আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহ তা'য়ালাকে ভালোবাসো তাহলে আমার কথা মেনে চলো, (এভাবে আমাকে ভালোবাসলে) আল্লাহ তা'য়ালাও তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তিনি তোমাদের গোনাহ্ ক্ষমা করে দিবেন; আল্লাহ তা'য়ালা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়াবান। (সূরা আলে ইমরাণ-৩১)
নবী করীম (সা:) কে ভালোবাসার অর্থই হলো জীবনের সকল দিকে একমাত্র তাঁকেই অনুসরণ করা, এখানে সহজ ও কঠিন দিক বলে কিছুই নেই এবং আংশিক অনুসরণেরও সুযোগ নেই। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুসারে রাসূল (সা:) এর জীবনের সকল দিকই অনুসরণ করতে হবে। যারা সুবিধাবাদী নীতি অনুসরণে সহজ দিক বা আংশিক তথা ঝুঁকিমুক্ত অনুসরণ করবে অথবা করবে না, তাদেরকে আল্লাহ তা'য়ালা কোন্ বিশেষণে বিশেষিত করেছেন দেখুন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُوْلَ جِ فَإِن تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ
(হে রাসূল) আপনি (আরো) বলুন, তোমরা যদি আল্লাহ তা'য়ালা ও (তাঁর) রাসূলের কথা মেনে চলো, (এ আহ্বান সত্ত্বেও) তারা যদি (এ থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয় (আপনি জেনে রাখুন), আল্লাহ তা'য়ালা কখনো কাফিরদের পছন্দ করেন না। (সূরা আলে ইমরান-৩২)
নবী করীম (সা:) কে একজন মানুষ যখন নিজ প্রাণেরও অধিক ভালোবাসতে সক্ষম হয় তখনই কেবল সেই মানুষের পক্ষে রাসূলের আদর্শের জন্যে নিজের কষ্টার্জিত ধন-সম্পদ অকাতরে ব্যয় করা সম্ভব হতে পারে। জেল-জুলুম অত্যাচার সহ্য করতে পারে এবং প্রয়োজনে নিজের প্রাণও কুরবান করতে পারে। একবার নবী করীম (সা:) এর সাথে কথোপকথনকালে হযরত উমার (রা:) বললেন-
لأَنْتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ كُلِّ شَيْ إِلَّا نَفْسِي - 'হে রাসূল (সা:)! আপনি আমার কাছে সকল কিছুর তুলনায় অধিক বেশি প্রিয় কিন্তু আমার প্রাণের চাইতে অধিক নয়'। এ কথা শুনে নবী করীম (সা:) বললেন-
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُوْنَ أَحَبَّ إِلَيْكَ مِنْ نَفْسِكَ - 'শপথ ঐ মহান সত্তার যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের মধ্যে কেউ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ আমি তোমাদের কাছে তোমাদের প্রাণের তুলনায় অধিক প্রিয় না হই'। এ কথা শোনার সাথে সাথে হযরত উমার (রা:) বললেন-
أَنْتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ كُلِّ شَيْ حَتَّى نَفْسِي - 'আপনি আমার কাছে এখন সকল কিছুর তুলনায় এমনকি আমার প্রাণের তুলনায় অধিক প্রিয়'। এবার নবী করীম (সা:) হযরত উমার (রা:)-কে পূর্ণ ঈমানের সনদ দিয়ে বললেন-
'হে উমার! এখন তোমার ঈমান পূর্ণতা লাভ করলো'। الأَن يَا عُمَرُ -
পবিত্র কুরআন ও সমগ্র হাদীস পর্যালোচনা করলে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নবী করীম (সা:) কে ভালোবাসার অর্থই হলো তাঁর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার লক্ষ্যে তাঁর পূর্ণাঙ্গ আদর্শ জীবনের সকল ক্ষেত্রে অনুসরণ করা। নিজ সুবিধা অনুসারে সহজ দিক মেনে চলা এবং বিপদ-ক্ষতি হতে পারে এ কথা মনে করে কঠিন দিক অনুসরণ না করা ঈমানদারের লক্ষণ নয়। নবী করীম (সা:) যা কিছু আদেশ করেছেন তা অনুসরণ করা এবং যা কিছু নিষেধ করেছেন তা বর্জন করার অর্থই হলো তাঁর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা, এটা করতে পারলেই সীরাত মাহফিলের আয়োজন ও দরূদ পাঠ করা সার্থক হবে এবং আদালতে আখিরাতে তা নাজাতের উসিলা হবে। রাসূলের প্রতি ভালোবাসার নামে এমন কোনো ধরনের অনুষ্ঠান করা যাবে না বা এমন পদ্ধতিও অনুসরণ করা যাবে না, যা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা অনুমোদন করেনি। সাহাবায়ে কেরাম তাঁর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ যেভাবে ঘটিয়েছেন, সেই ভাবেই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতে হবে এবং এটাই পরিপূর্ণ মুমিনের স্তরে উপনীত হবার একমাত্র পন্থা।
📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি দরূদ পাঠ করা আল্লাহর নির্দেশ
নবী করীম (সা:) এর প্রতি দরূদ পাঠের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব এতই অধিক যে, দরূদ পাঠ করা ব্যতীত নামাজ হয় না। নামাজ আদায় করতে হবে কেবলমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে, মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর এ মহান নবীকে মর্যাদার সর্বাধিক উচ্চস্তরে উপনীত করেছেন বিধায় নামাজের মধ্যেও তাঁর হাবীবের প্রতি দরূদ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার দরবারে দু'হাত উঠিয়ে দোয়া করার পূর্বেও নবী করীম (সা:) এর প্রতি দরূদ পাঠ করতে হয়। মৃত মানুষের আত্মার মাগফিরাতের জন্যে দোয়া করার পূর্বেও দরূদ পাঠ করতে হয়। এর কারণ হলো, রাসূলের প্রতি দরূদ পাঠ করলে মহান আল্লাহ তা'য়ালা খুবই খুশী হন এবং দরূদ পাঠকারীর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তার দোয়া কবুল করেন।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী করীম (সা:) এর প্রতি দরূদ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন-
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّوْنَ عَلَى النَّبِيِّ ط يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلَّمُوا تَسْلِيمًا -
নি:সন্দেহে আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরূদ পাঠান; (অতএব) হে ঈমানদার ব্যক্তিরা, তোমরাও নবীর প্রতি দরূদ পাঠাতে থাকো এবং (তাঁকে) উত্তম অভিবাদন (পেশ) করো। (সূরা আহযাব-৫৬)
পবিত্র কুরআনের গবেষকগণ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে নবীর প্রতি দরূদের অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর নবীর প্রতি সীমাহীন করুণা বর্ষণকারী। তিনি তাঁর প্রশংসা করেন। তাঁর কাজে বরকত দান করেন। তাঁর নাম বুলন্দ করেন। তাঁর প্রতি নিজের রহমতের বারি বর্ষণ করেন।
ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি দরূদের অর্থ হচ্ছে, তাঁরা তাঁকে সর্বাধিক ভালোবাসেন। তাঁর জন্য আল্লাহ তা'য়ালার কাছে দোয়া করেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন তাঁকে সর্বাধিক উচ্চ মর্যাদা দান করেন। তাঁর শরীয়াতকে প্রসার ও বিস্তৃতি দান করেন এবং তাঁকে মাকামে মাহমুদ তথা সর্বোচ্চ প্রশংসিত স্থানে পৌঁছে দেন।
মহান আল্লাহ তাঁর নবী সম্পর্কে এ কথা বলার কারণ হলো, বিশ্বনবী (সা:) যখন মক্কায় ইসলামী আন্দোলনের সূচনা করলেন তখন ইসলামের শত্রুরা নিজেদের মনের আক্রোশ প্রকাশের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক অপবাদ দিয়ে চলছিল এবং তারা নিজেরা এ কথা মনে করছিল যে, এভাবে কাদা ছিটিয়ে তারা তাঁর নৈতিক প্রভাব নির্মূল করে দেবে। অথচ এ নৈতিক প্রভাবের ফলে ইসলাম ও মুসলমানরা দিনের পর দিন এগিয়ে চলছিল। এ অবস্থায় মহান আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করে এ কথা জানিয়ে দিলেন, 'ইসলামের শত্রুরা আমার নবীর বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়ে তাঁকে অপদস্ত করার যতই প্রচেষ্টা করুক না কেনো, শেষ পর্যন্ত তারাই ব্যর্থ হবে। কারণ আমি আল্লাহ তাঁর প্রতি মেহেরবান এবং সমগ্র বিশ্বজাহানের আইন ও শৃংখলা ব্যবস্থা আমারই নির্দেশে যেসব ফেরেশতার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে তারা সবাই তাঁর সহায়ক ও প্রশংসাকারী। আমি যেখানে তাঁর নাম বুলন্দ করছি। আমার ফেরেশতারা তাঁর প্রশংসাবলীর আলোচনা করছে সেখানে তাঁর নিন্দাবাদ করে তারা কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। আমার রহমত ও বরকত তাঁর সহযোগী এবং আমার ফেরেশতারা দিনরাত দোয়া করছে, হে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন! মুহাম্মাদ (সা:) এর মর্যাদা আরো বেশি উঁচু করে দাও এবং তাঁর আদর্শকে আরো বেশি প্রসারিত ও বিকশিত করো। এ অবস্থায় ইসলাম বিরোধিরা মুহাম্মাদ (সা:) এর কি ক্ষতি করতে পারে'?
ঈমানদারদের প্রতি দরূদ পাঠানোর যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তার অর্থ হলো, 'হে লোকেরা! মুহাম্মাদ (সা:) এর বদৌলতে তোমরা যারা সঠিক পথের সন্ধান লাভ করেছো, তারা তাঁর মর্যাদা অনুধাবন করো এবং তাঁর মহাঅনুগ্রহের হক আদায় করো। তোমরা মূর্খতার অন্ধকারে পথ ভুলে বিপথে চলছিলে, এ মহান ব্যক্তি তোমাদের জ্ঞানের আলোক বর্তিকা দান করেছেন। তোমরা নৈতিক অধঃপতনের মধ্যে ডুবেছিলে, এ ব্যক্তি তোমাদের সেখান থেকে উঠিয়েছেন এবং তোমাদের এমন যোগ্যতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন যার ফলে আজ অন্যরা তোমাদের ঈর্ষা করে। তোমরা বর্বর ও পাশবিক জীবন যাপন করছিলে, এ ব্যক্তি তোমাদের সর্বোত্তম মানবিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাজে সুসজ্জিত করেছেন। তিনি তোমাদের ওপর এসব অনুগ্রহ করেছেন বলেই দুনিয়ার ইসলাম বিরোধিরা এ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আক্রোশে ফেটে পড়েছে। নয়তো দেখো, তিনি কারো সাথে ব্যক্তিগতভাবে কোনো অশোভন আচরণ করেননি। সুতরাং এখন তোমাদের কৃতজ্ঞতার অনিবার্য দাবি হচ্ছে এই যে, তারা এ আপাদ-মস্তক কল্যাণ ব্রতী ব্যক্তিত্বের প্রতি যে পরিমাণ বিদ্বেষ পোষণ করে ঠিক একই পরিমাণ বরং তাঁর চেয়ে বেশি ভালোবাসা তোমরা তাঁর প্রতি পোষণ করো। তারা তাঁকে যে পরিমাণ ঘৃণা করে ঠিক ততটাই বরং তাঁর চেয়ে বেশীই তোমরা তাঁর প্রতি অনুরক্ত হবে। তারা তাঁর যতটা নিন্দা করে ঠিক ততটাই বরং তার চেয়ে বেশী তোমরা তাঁর প্রশংসা করো। তারা তাঁর যতটা অশুভাকাংখী হয় তোমরা ঠিক ততটাই বরং তার চেয়ে বেশি শুভাকাংখী হয়ে যাও এবং তাঁর পক্ষে সেই একই দোয়া করো যা আল্লাহ তা'য়ালার ফেরেশতারা দিনরাত তাঁর জন্য করে যাচ্ছে, 'দুই জাহানের রব্ব! তোমার নবী যেমন আমাদের প্রতি বিপুল অনুগ্রহ করেছেন তেমনি তুমিও তাঁর প্রতি অসীম ও অগণিত রহমত বর্ষণ করো, তাঁর মর্যাদা পৃথিবীতেও সবচেয়ে বেশি উন্নত করো এবং আখেরাতেও তাঁকে সকল নৈকট্যলাভকারীদের তুলনায় অধিক নৈকট্য দান করো'।
উল্লেখিত আয়াতে মুসলমানদেরকে দু'টো বিষয়ের আদেশ দেয়া হয়েছে। একটি হচ্ছে, 'সাল্লু আলাইহি' অর্থাৎ তাঁর প্রতি দরূদ পড়ো। অন্যটি হচ্ছে, 'ওয়া সাল্লিমু তাসলিমা' অর্থাৎ তাঁর প্রতি সালাম ও প্রশান্তি দান করো।
'সালাত' শব্দটি যখন 'আলা' অব্যয় সহকারে বলা হয় তখন এর তিনটি অর্থ হয়।
এক. কারো অনুরক্ত হয়ে পড়া, ভালোবাসা সহকারে তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া এবং তার প্রতি ঝুঁকে পড়া।
দুই. কারো প্রশংসা করা।
তিন, কারো পক্ষে দোয়া করা।
'সালাত' শব্দটি যখন আল্লাহ তা'য়ালার জন্য বলা হবে তখন এ কথা সুস্পষ্ট যে, তৃতীয় অর্থটির জন্য এটি বলা হবে না। কারণ আল্লাহ তা'য়ালার অন্য কারো কাছে দোয়া করার ব্যাপারটি একেবারেই অকল্পনীয়। তাই সেখানে অবশ্যই তা হবে শুধুমাত্র প্রথম দু'টো অর্থের জন্য। কিন্তু যখন এ শব্দ বান্দাদের তথা মানুষ ও ফেরেশতাদের জন্য বলা হবে তখন তা তিনটি অর্থেই বলা হবে। তার মধ্যে ভালোবাসার অর্থও থাকবে, প্রশংসার অর্থও থাকবে এবং দোয়া ও রহমতের অর্থও থাকবে। সুতরাং মুমিনদের নবী করীম (সা:) এর পক্ষে 'সাল্লু আলাইহি'-এর আদেশ দেয়ার অর্থ হচ্ছে এই যে, তোমরা তাঁর ভক্ত-অনুরক্ত হয়ে যাও তাঁর প্রশংসা করো এবং তাঁর জন্য দোয়া করো।
'সালাম' শব্দেরও দু'টো অর্থ হয়। এক. সব ধরণের বিপদাপদ ও অভাব অনটন মুক্ত থাকা। এর প্রতিশব্দ হিসেবে আমাদের এখানে সালামতি বা নিরাপত্তা শব্দের ব্যবহার আছে। দুই. শান্তি, সন্ধি ও অবিরোধিতা। সুতরাং নবী করীম (সা:) এর পক্ষে 'সাল্লিমু তাসলিমা' বলার একটি অর্থ হচ্ছে যে, তোমরা তাঁর জন্য পূর্ণ নিরাপত্তার দোয়া করো। আর দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে যে, তোমরা পুরোপুরি মনে প্রাণে তাঁর আন্দোলনের কাজে সহযোগিতা করো, তাঁর বিরোধিতা করা থেকে দূরে থাকো এবং তাঁর আদেশ পালনকারীতে পরিণত হও।
এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরাম নবী করীম (সা:) কে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সালামের পদ্ধতি তো আপনি আমাদেরকে বলে দিয়েছেন, (অর্থাৎ নামাজে 'আস্সালামু আলাইকা ইয়া আইয়্যুহান নীবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ' এবং দেখা সাক্ষাতে আস্সালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ বলা) কিন্তু আপনার প্রতি সালাত পাঠানোর পদ্ধতি কি?
এসব প্রশ্নের উত্তরে নবী করীম (সা:) সাহাবায়ে কেরামকে বিভিন্ন ধরনের দরূদ শিক্ষা দিয়েছিলেন। বর্তমানে দরূদ সম্পর্কে বেশ কিছু বই-পুস্তক বাজারে দেখা যায় এবং এসব বই-পুস্তকে নানা ধরনের দরূদের উল্লেখ রয়েছে। যেমন দরূদে হাজারী, দরূদে লাখী, দরূদে মুস্তফা, দরূদে আকবর, দরূদে শেফা ইত্যাদি নামে বহু ধরনের দরূদ এবং এসব দরূদের ফযিলত উক্ত বই-পুস্তকে লিখা হয়েছে। হাদীস গবেষকগণ উল্লেখিত দরূদের একটি দরূদও হাদীসের সমগ্র কিতাবেও সন্ধান করে পাননি। তাঁরা বলেছেন, এসব দরূদ ও বর্ণিত ফযিলত সকল কিছুই কল্পিত বৈ আর কিছুই নয়। নবী করীম (সা:) সাহাবায়ে কেরামকে যে সকল দরূদ শিখিয়েছেন তা সকলই হাদীসের কিতাবসমূহে মওজুদ রয়েছে এবং আমরা হাদীসের বিভিন্ন কিতাব থেকে কয়েকটি দরূদ এখানে উল্লেখ করছি।
স্বয়ং আল্লাহর নবীর শেখানো দরূদের যে কি মর্যাদা, তা কল্পনাও করা যায় না। সুতরাং এসব দরুদের ফযীলত, কল্যাণকারীতা উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন মনে করি। কারণ এসব দরূদের ফযীলত ও সওয়াব অফুরন্ত। যে কোনো বিপদাপদে এসব দরূদ পাঠ করলে মহান আল্লাহ তা'য়ালা তার ওপরে অসীম রহমত অবতীর্ণ করবেন এবং নবী করীম (সা:) খুশী হবেন। হযরত কা'ব ইবনে উজরাহ্ (রা:) কে নবী করীম (সা:) এই দরূদ শিখিয়েছিলেন-
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيْدٌ - وَبَارِكَ عَلَى مُحَمَّدٍ وَّ عَلَى آلِ مُحَمَّدٌ كَمَا بَارِكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদান কামা বারিকতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।
এ দরূদটি সামান্য শাব্দিক পার্থক্য সহকারে হযরত কা'ব ইবনে উজরাহ্ (রা:) থেকে বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে ইমাম আহমদ, ইবনে আবী শাইবাহ, আব্দুর রাজ্জাক, ইবনে আবী হাতেম ও ইবনে জারীরে উল্লেখ করা হয়েছে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) এর বর্ণনা থেকে ইবনে জারীর হযরত আবু হুমাইদ সা'ঈদী (রা:) থেকে বর্ণিত হয়েছে-
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَأَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِه كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَأَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ كَمَا بَارِكْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আয ওয়া জিহি ওয়া যুর রিয়াতিহি কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আয ওয়া জিহি ওয়া যুর রিয়াতিহি কামা বারাকতা আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। (মুআত্তা, ইমাম মালেক, মুসনাদে আহমাদ, বোখারী, মুসলিম, নাসাঈ, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)
হযরত আবু মাসউদ বদরী (রা:) থেকে এ দরূদ বর্ণিত হয়েছে-
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارِكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ فِي الْعَالَمِينَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা আলা ইবরাহীমা ফিল আলিমিনা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। (মালেক, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, আহমাদ, ইবনে জারীর, ইবনে হিব্বান ও হাকেম)
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা:) থেকে এ দরূদ বর্ণিত হয়েছে-
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبْدُكَ وَ رَسُولُكَ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارِكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন আব্দুকা ওয়া রাসূলুকা কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা আলা ইবরাহীম। (আহমাদ, বুখারী, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ)
হযরত বুরাইদাতাল খুযাই (রা:) থেকে এ দরূদ বর্ণিত হয়েছে-
اللَّهُمَّ اجْعَلْ صَلوتُكَ وَرَحْمَتِكَ وَبَرَكَاتِكَ عَلَى مُحَمَّدٍ وَّ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا جَعَلْتَهَا عَلَى إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ
আল্লাহুম্মাজ আল সলাতুকা ওয়া রাহমাতিকা ও বারকাতিকা আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা জাআলতাহা আলা ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। (আহমাদ, আব্দ ইবনে হুমাইদ ও ইবনে মারদুইয়া)
হযরত আবু হুরাইরা (রা:) থেকে এ দরূদ বর্ণিত হয়েছে- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ وَبَرَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ فِي الْعَالَمِينَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ -
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিওঁ ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা ওয়া বারাকতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীমা ফিল আলিমিনা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। (নাসাঈ)
হযরত তালহা (রা:) থেকে এ দরূদ বর্ণিত হয়েছে- اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ وَ بَرِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ عَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارِكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ, ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা আলা ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। (ইবনে জারীর)
উল্লেখিত দরূদগুলোয় শব্দের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সবগুলোর অর্থ একই। এসব দরূদগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এ বিষয়গুলো ভালোভাবে অনুধাবন করতে হবে।
প্রথমত এসব দরূদ নবী করীম (সা:) মুসলমানদেরকে পাঠ করতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, 'আমার ওপরে দরূদ পাঠ করার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হচ্ছে এই যে, তোমরা আল্লাহ তা'য়ালার কাছে এ মর্মে দোয়া করো, হে আল্লাহ তা'য়ালা! তুমি মুহাম্মাদ (সা:) এর ওপর দরূদ পাঠাও'। এক শ্রেণীর স্বল্প জ্ঞানসম্পন্ন লোক এ ব্যাপারে আপত্তি করে বলে যে, 'এটা তো বড় অদ্ভুত ব্যাপার, আল্লাহ তা'য়ালা তো আমাদেরকে বলছেন, তোমরা নবীর ওপরে দরূদ পাঠ করো, কিন্তু অপর দিকে আমরা আল্লাহ তা'য়ালাকে বলছি যে, তুমি দরূদ পাঠাও'।
অথচ রাসূল (সা:) লোকদেরকে এ কথা বলেছেন যে, 'তোমরা আমার প্রতি সালাতের হক আদায় করতে চাইলেও করতে পারো না। তাই আল্লাহ তা'য়ালারই কাছে দোয়া চাও যেন তিনি আমার প্রতি দরূদ পাঠান'। এ কথা বলা নিষ্প্রয়োজন, আমরা নবী করীম (সা:) এর মর্যাদা বুলন্দ করতে পারি না। আল্লাহ তা'য়ালাই বুলন্দ করতে পারেন। আমরা তাঁর অনুগ্রহের প্রতিদান দিতে পারি না। আল্লাহ তা'য়ালাই তার প্রতিদান দিতে পারেন। আমরা তাঁর বাণীসমূহ উচ্চমাপে পৌঁছানোর এবং তাঁর আদর্শকে সম্প্রসারিত করার জন্য যতই চেষ্টা চালাই না কেনো, আল্লাহ তা'য়ালার মেহেরবানী এবং তাঁর দেয়া সুযোগ ও সহায়তা ব্যতীত তাতে কোনো প্রকার সাফল্য অর্জন করতে পারি না। এমন কি নবী করীম (সা:) এর প্রতি ভক্তি ভালোবাসাও আমাদের অন্তরে আল্লাহরই সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। অন্যথায় শয়তান কত রকম প্ররোচনা দিয়ে তাঁর প্রতি আমাদের মন-মস্তিষ্ক বিরূপ করে তুলতে পারে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা আমাদেরকে তা থেকে হেফাজত করুন।
সুতরাং নবী করীম (সা:) এর ওপর দরূদ পাঠের হক আদায় করার জন্য আল্লাহ তা'য়ালার কাছে তাঁর প্রতি সালাত বা দরূদের দোয়া করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন বলে সে যেন আল্লাহ তা'য়ালার সমীপে নিজের অক্ষমতা স্বীকার করতে গিয়ে বলে, হে আল্লাহ তা'য়ালা! তোমার নবীর ওপর সালাত বা দরূদ পাঠানোর যে কর্তব্য আমার প্রতি দেয়া হয়েছে, তা যথাযথভাবে সম্পন্ন করার সামর্থ আমার নেই। আমার পক্ষ থেকে তুমিই তা সম্পন্ন করে দাও এবং তা করার জন্য আমাকে যেভাবে কাজে নিয়োগ করতে হয় তা তুমি নিয়োগ করো।
দ্বিতীয়ত রাসূল (সা:) এর ভদ্রতা ও মহানুভবতার ফলে তিনি কেবল নিজেকেই এ দোয়ার জন্য নির্দিষ্ট করে নেননি। বরং নিজের সাথে তিনি নিজের পরিজন স্ত্রী ও পরিবারকেও শামিল করে নিয়েছেন। 'স্ত্রী ও পরিবার' অর্থ সুস্পষ্ট আর 'পরিজন' শব্দটি নিছক রাসূল (সা:) এর পরিবারের লোকদের জন্য নির্দিষ্ট নয়। বরং এসব শব্দের মধ্যে এমন সব লোকও এসে যায় যারা তাঁর অনুসারী এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে। পরিজন অর্থে মূলে আরবী 'আল' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আরবী ভাষার দৃষ্টিতে 'আল' ও 'আহল'-এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে এই যে, কোন ব্যক্তির 'আল' হচ্ছে এমনসব লোক যারা হয় তার সাথী, সাহায্যকারী ও অনুসারী, তারা তার আত্মীয় বা অনাত্মীয় হোক বা না হোক অবশ্যই তার আত্মীয়। পবিত্র কুরআনের ১৪ টি স্থানে 'আলে ফেরআউন' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে কোনো জায়গায়ও 'আলে' অর্থ ফেরাউনের পরিবারের লোকেরা নয়। বরং এমন সকল লোক যারা হযরত মূসার মুকাবিলায় ফেরাউনের সমর্থক ও সহযোগী ছিল। (দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখুন সূরা আল বাকারাহ, ৪৯-৫০, সূরা আলে ইমরান-১১, আরাফ-১৩০, মুমিনুন-৪৬)
সুতরাং এমন সমস্ত লোকই 'আলে' মুহাম্মাদ (সা:) এর বহির্ভূত হয়ে যায় যারা বিশ্বনবী (সা:) এর আদর্শ অনুসরণ করে না, হতে পারে সে নবীর রক্তের আত্মীয়। পক্ষান্তরে এমন সকল লোকও এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় যারা নবী করীম (সা:) এর আদর্শ অনুসরণ করে, কিন্তু তারা নবীর রক্তের কোনো আত্মীয় নয়, তবুও তারা নবীর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। তবে নবী পরিবারের এমন প্রত্যেকটি লোক সর্বতোভাবেই 'আলে' মুহাম্মাদ (সা:) এর অন্তর্ভুক্ত হবে যারা তাঁর সাথে রক্তের সম্পর্কও রাখে আবার তাঁর আদর্শও অনুসরণ করে।
নবী করীম (সা:) যেসব দরূদ শিখিয়েছেন তার প্রত্যেকটিতে অবশ্যই এ কথা রয়েছে যে, তাঁর প্রতি এমন অনুগ্রহ করা হোক যা ইবরাহীম (আ:) ও তাঁর পরিবার- পরিজনদের ওপর করা হয়েছিল। এ বিষয়টি বুঝতে এক শ্রেণীর লোকদের বিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। একশ্রেণীর লোক এর বিভিন্ন জটিল ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু গবেষকগণ এর কোনো একটি ব্যাখ্যাও গ্রহণ করেননি। তারা ব্যাখ্যা দেন যে, যারা নবুয়্যাত ওহী ও কিতাবকে হেদায়েতের উৎস বলে মেনে নেয় তারা সবাই হযরত ইবরাহীম (আ:) এর নেতৃত্বের প্রশ্নে একমত। এ ব্যাপারে মুসলমান, খৃষ্টান ও ইয়াহুদীদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। সুতরাং রাসূল (সা:) এর বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে, যেভাবে হযরত ইবরাহীম (আ:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা সকল নবীর অনুসারীদের নেতায় পরিণত করেছেন, অনুরূপভাবে আমাকেও পরিণত করুন। এমন কোনো ব্যক্তি যে নবুয়্যাত মেনে নিয়েছে সে যেন আমার নবুয়্যাতের প্রতি ঈমান আনা থেকে বঞ্চিত না হয়।
বিশ্বনবী (সা:) এর ওপরে দরূদ পাঠ করা সুন্নাত। তাঁর নাম উচ্চারিত হলে তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করা মুস্তাহাব। বিশেষ করে নামাযে দরূদ পড়া সুন্নাত। এ বিষয়ে আলেম সমাজ একমত। সমগ্র জীবনকালে নবী করীম (সা:) এর ওপরে একবার দরূদ পাঠ করা ফরজ। এ ব্যাপারে আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে। কারণ আল্লাহ তা'য়ালা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এর আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু এরপর দরূদের ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। ইমাম শাফেঈ (রাহ:) বলেন, নামাযে একজন মুসল্লী যখন শেষবার তাশাহুদ পড়ে তখন সেখানে সালাতুন আলান নবী পড়া ফরজ। কোনো ব্যক্তি এভাবে না পড়লে তার নামায হবে না। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে থেকে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:), হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রা:), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা:) ও হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা:), তাবেঈদের মধ্যে থেকে শা'বী (রাহ), ইমাম মুহাম্মাদ বাকের (রাহ:), মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কুরযী (রাহ:) ও মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রাহ:) এবং ফকীহদের মধ্যে থেকে ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রাহ:) ও এ মতের প্রবক্তা ছিলেন। শেষের দিকে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রাহ:) ও এ মত অবলম্বন করেন।
ইমাম আবু হানিফা (রাহ:), ইমাম মালেক (রাহ:) ও অধিকাংশ উলামা এ মত পোষণ করেন যে, দরূদ সমগ্র জীবনে শুধুমাত্র একবার পড়া ফরজ। এটি কালেমায়ে শাহাদাতের মত। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ইলাহ বলে মেনে নিয়েছে এবং নবী করীম (সা:) কে নবী বলে মেনে নিয়েছে সে ফরজ আদায় করেছে। অনুরূপভাবে যে একবার দরূদ পাঠ করেছে সে নবীর ওপর সালাত পাঠ করার ফরজ আদায়ের দায়িত্ব মুক্ত হয়ে গেছে। এরপর তার ওপর আর কালেমা পড়া ফরজ নয় এবং দরূদ পড়াও ফরজ নয়।
আলেমদের একটি দল নামাযে দরূদ পড়াকে সকল অবস্থায় ওয়াজিব বলে গণ্য করেন। কিন্তু তাঁরা তাশাহুদের সাথে তাকে শৃংখলিত করেন না।
আলেমদের আরেকটি দলের মতে প্রত্যেক দোয়ায় দরূদ পড়া ওয়াজিব। আরো কিছু চিন্তাবিদ নবী করীম (সা:) এর নাম উচ্চারিত হলে দরূদ পড়া ওয়াজিব বলে অভিমত পোষণ করেন। আরেক দল আলেমদের মতে এক মজলিশে রাসূল (সা:) এর নাম যতবারই উচ্চারিত হোক না কেনো, দরূদ পড়া কেবলমাত্র একবার ওয়াজিব হবে।
শুধুমাত্র ওয়াজিব হবার ব্যাপারে এ মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। তবে দরূদের ফযীলত ও তা পাঠ করলে প্রতিদান ও সওয়াব পাওয়া এবং তার একটি অনেক বড় সৎকাজ হবার ব্যাপারে তো সমস্ত মুসলিম উম্মাহ্ একমত। এমন প্রত্যেকটি মুসলমানের অন্তর থেকেই তো স্বাভাবিকভাবেই দরূদ বের হবে, যার মধ্যে এ অনুভূতি থাকবে যে, বিশ্বনবী (সা:) আল্লাহ তা'য়ালার পরে আমাদের প্রতি সবচেয়ে বড় অনুগ্রহকারী। মানুষের হৃদয়ে ঈমান ও ইসলামের মর্যাদা যত বেশী হবে তত বেশী মর্যাদা হবে তার হৃদয়ে বিশ্বনবী (সা:) এর অনুগ্রহেরও। আর মানুষ যত বেশী এ অনুগ্রহের মর্যাদা দিতে শিখবে তত বেশিই যে নবী করীম (সা:) এর ওপরে দরূদ পাঠ করবে। সুতরাং অধিক দরূদ পাঠ করা ঈমানের একটি মাপকাঠি। এটি পরিমাপ করে জানিয়ে দেয় বিশ্বনবী (সা:) এর আদর্শের সাথে মানুষের সম্পর্ক কতটা গভীর এবং ঈমানের নিয়ামতের কতটা সম্মান তার অন্তরে আছে। এ কারণেই নবী করীম (সা:) বলেছেন- مَنْ صَلَّى عَلَى صَلَواةَ لَّمْ تَزِلُ الْمَلَائِكَةُ تُصَلِّي عَلَيْهِ مَا صَلَّى عَلَى
যে ব্যক্তি আমার প্রতি দরূদ পাঠ করে ফেরেশতারা তার প্রতি দরূদ পাঠ করে যতক্ষণ সে দরূদ পাঠ করতে থাকে। (আহমাদ ও ইবনে মাজাহ) مَنْ صَلَّى عَلَى وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا -
যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করে আল্লাহ তা'য়ালা তার প্রতি দশবার দরূদ পাঠ করেন। (মুসলিম) অর্থাৎ আল্লাহ তা'য়ালা তার প্রতি দশটি রহমত নাযিল করেন। أُولَى النَّاسِ بِي يَوْمِ الْقِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ عَلَى صَلَواةٌ
কিয়ামতের দিন আমার সাথে থাকার সবচেয়ে বেশি হকদার হবে সেই ব্যক্তি যে আমার ওপর সবেচেয়ে বেশি দরূদ পড়বে। (তিরমিযী) الْبَخِيلُ الَّذِي ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَى
আমার কথা যে ব্যক্তির সামনে আলোচনা করা হয় এবং সে আমার ওপর দরূদ পাঠ করে না সে কৃপণ। (তিরমিযী)
সুতরাং সকল মুসলমানের উচিত নবী করীম (সা:) এর প্রতি অধিক দরূদ পাঠ করা। তবে এ দরূদ পাঠই শুধুমাত্র মুক্তির মাধ্যম নয়। মানুষকে অবশ্যই মহান আল্লাহর বিধান মেনে চলতে হবে, আল্লাহ তা'য়ালার বিধান প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। তাহলে দরূদ পাঠও উপকারে আসবে। আল্লাহ তা'য়ালার বিধান না মেনে বা ইসলামী বিধান ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, দেশে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম না করে শুধু মাত্র দরূদ পাঠ করলে কিয়ামতের দিন যদি রাসূল (সা:) এ কথা বলেন যে, 'যখন আমার আদর্শকে অপমানিত করা হচ্ছিলো, যখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দেয়া জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে উৎখাত করার জন্য ষড়যন্ত্র করা হচ্ছিলো, ইসলামের সৈনিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা কল্পিত অভিযোগ তুলে তাদের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছিলো, আর তোমরা ঘরের কোণে বা মসজিদে বসে বসে দরূদ পাঠ করছিলে, বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করোনি, আজ তোমাদের ওসব দরূদে আমার কোনোই প্রয়োজন নেই' তখন কি উপায় হবে? ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সংগ্রাম করা হলো ফরজ, এই ফরজ আদায় করে তারপর যতবেশি দরূদ পাঠ করা যাবে আল্লাহ তা'য়ালাও সন্তুষ্ট হবেন এবং জান্নাত ততবেশি তার কাছে এগিয়ে আসবে ইনশাআল্লাহ।