📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য পরিহারকারী মুমিন নয়

📄 নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য পরিহারকারী মুমিন নয়


মহান আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি বিশ্বাস ও নবী করীম (সা:) এর প্রতি বিশ্বাস মুখে ঘোষণা করার পর কোনো ব্যক্তি যদি নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য না করে তাহলে সে ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম দাবী করলেও মহান আল্লাহর কুরআনের ভাষায় সে ব্যক্তি মুসলিম নয়। কারণ আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে যে সর্বোচ্চ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন, সে মর্যাদার সাথে কোনো ব্যক্তির মুসলিম থাকা বা না থাকার বিষয়টিও জড়িত। তাঁকে সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রদর্শন করে তাঁর আনুগত্য যে ব্যক্তি করবে, সে ব্যক্তিকেই পবিত্র কুরআন মুসলিম হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে এবং যে ব্যক্তি তাঁর আনুগত্য করবে না তথা তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করবে না, সে ব্যক্তি মুসলিম নয়। যে ব্যক্তি নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য করে সে প্রকৃত পক্ষে মহান আল্লাহরই আনুগত্য করে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

مَّنْ يُطِعِ الرَّسُوْلَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ ج وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيْظًا -

যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করে সে (যেন) আল্লাহরই আনুগত্য করে, আর যে ব্যক্তি (তাঁর আনুগত্য থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের ওপর আমি আপনাকে প্রহরী বানিয়ে পাঠাইনি। (সূরা আন্ নিসা-৮০)

সমগ্র সৃষ্টিজগৎ ও সৃষ্টিসমূহের যিনি মালিক, তিনি বলছেন 'আমার রাসূলের আনুগত্য করার অর্থই হলো আমার আনুগত্য করা'। নবী করীম (সা:) সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা'য়ালার বলা অন্যান্য সকল কথা একদিকে রেখে শুধুমাত্র উল্লেখিত আয়াতের কথাগুলোর প্রতি স্কুল দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই অনুধাবন করা যায় যে, আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর মহান নবীকে মর্যাদার কোন্ সোপানে উপনীত করেছেন। রাব্বুল আলামীন তাঁকে সৃষ্টিসমূহের মধ্যে এমনই অতুলনীয় মর্যাদা দান করেছেন যে, তাঁর আনুগত্য করার বিষয়টিকে তিনি নিজের আনুগত্য করার সাথে একাকার করে দিয়েছেন। তাঁর প্রতি বিদ্রোহ করার অর্থ মহান আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ করা বলে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা ঘোষণা দিয়েছেন।

নবী করীম (সা:) নবুয়্যাত লাভ করার পর থেকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পৃথিবীতে জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে মানব জাতিকে যে সিদ্ধান্তসমূহ দান করেছেন তা নিঃশর্তভাবে মেনে নিয়ে অনুসরণ করা মানব জাতির জন্যে অবশ্যকর্তব্য। সৃষ্টিসমূহের মধ্যে মর্যাদাগত কারণে নবী করীম (সা:) এর পবিত্র মুখ থেকে একবার যে কোনো বিষয়ে যে রায় ঘোষিত হয়েছে, তার সাথে দ্বিমত পোষণ করার ন্যূনতম অধিকারও কোনো মানুষকে দেয়া হয়নি। তিনি যা কিছু আদেশ নিষেধ করেছেন এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন তোলার অধিকারও কোনো মানুষকে দেয়া হয়নি। অকুণ্ঠ চিত্তে নিঃশর্তভাবে সন্তুষ্টির সাথে মেনে নিতে হবে। নিরুপায় হয়ে অসন্তুষ্টির সাথে কেউ যদি নবী করীম (সা:) এর কোনো আদেশ নিষেধ অনুসরণ করে বা মেনে নেয় তাহলে তার ঈমানের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করার অবকাশ রয়েছে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর রাসূল (সা:) এর অতুলনীয় মর্যাদার বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়ে ঘোষণা করেছেন-

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا -

(হে নবী) না, আমি আপনার মালিকের শপথ করে বলছি, এরা কিছুতেই ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের যাবতীয় মতবিরোধের ফয়সালায় আপনাকে (শর্তহীনভাবে) বিচারক মেনে নিবে, অতপর আপনি যা ফয়সালা করবেন সে ব্যাপারে তাদের মনে আর কোনো দ্বিধা-দ্বন্দু থাকবে না, বরং আপনার সিদ্ধান্ত তারা সর্বান্তকরণে মেনে নিবে। (সূরা আন্ নিসা-৬৫)

স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা নিজের শপথ করে ঘোষণা করেছেন, কোনো মানুষের পক্ষে ঈমানদার হওয়া তথা মুসলিম হওয়া কোনোক্রমেই সম্ভব নয়, যতক্ষণ সে ব্যক্তি জীবনের সকল ক্ষেত্রে নবী করীম (সা:) এর পেশ করা জীবন বিধান মেনে না নিবে। অর্থাৎ রাসূল (সা:) এর দেয়া সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া না নেয়ার ওপর মানুষের মুসলিম হওয়া তথা ঈমান নির্ভর করে। নবী করীম (সা:) মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগে যা কিছু প্রয়োজন সকল বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দান করেছেন। মুসলিম দাবীদার কোনো নারী-পুরুষকে সামান্যতম অধিকার দেয়া হয়নি যে, সে আল্লাহর রাসূলের দেয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণে ও বাস্তবায়নে অনীহা প্রকাশ করবে বা মেনে না নেয়ার লক্ষ্যে কোনো কূট কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করবে। কেউ যদি এমন করে তাহলে বুঝতে হবে, নবী করীম (সা:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা যে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেছেন, সে ব্যক্তি তাঁর উক্ত মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলো না।

কোনো মানুষ যদি রাজনীতি, অর্থনীতি, স্বরাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, শিক্ষানীতি, শ্রমনীতি, ভূমি ও রাজস্বনীতি, বিচারনীতি, সমরনীতি, শিল্প ও বাণিজ্যনীতি, বিবাহনীতিসহ যাবতীয় নীতিমালার ক্ষেত্রে নবী করীম (সা:) এর পেশকৃত নীতিমালা পরিহার করে অন্য কারো নীতিমালা অনুসরণ করে এবং শুধুমাত্র নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ইত্যাদি ক্ষেত্রে নবী করীম (সা:) এর সিদ্ধান্ত মেনে নেয় এবং সেই ব্যক্তিকে আল্লামা-মাওলানা, আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ নামে খ্যাত লোকজনও যদি 'পরহেজগার মুসলিম' বলে, ঘোষণা দেয়, তবুও সে ব্যক্তি মুসলিম নয়। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَّلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُوْنَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ط وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا -

যখন আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূল কোনো ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষনা করেন তখন কোনো মুমিন পুরুষ ও কোনো মুমিন নারীর এ অধিকার নেই যে, তারা সে ব্যাপারে নিজেদের এখতিয়ার প্রয়োগ করবে, যে কেউই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করবে সে নিঃসন্দেহে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত হয়ে যাবে। (সূরা আল আহযাব-৩৬)

যদিও উল্লেখিত আয়াত হযরত যয়নব ও হযরত যায়েদ (রা:)-এর বিয়ে উপলক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছিলো, কিন্তু আয়াতে বর্ণিত বিধান কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুসলিম নর-নারীর জন্যেই প্রযোজ্য। মুসলিম হওয়ার অর্থ বা মুসলিম হিসাবে দাবী করার মর্মার্থই হলো, জীবনের সকল ইচ্ছা-অনিচ্ছা, পছন্দ-অপছন্দ, স্বাধীনতা, দৃষ্টিভঙ্গি, মতামত, রুচি- অভ্যাসসহ সকল কিছু মহান আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূল (সা:) এর সিদ্ধান্তের অধীন করে দেয়া।

নিজের জীবনের ক্ষুদ্র পরিসর থেকে সূচনা করে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের বৃহত্তর পরিসরে সকল ক্ষেত্রে আনুগত্যের মাথানত করে দিতে হবে কেবলমাত্র নবী করীম (সা:) এর আনীত বিধানের সম্মুখে। মসজিদে বা নামাজে কিছু সময় ব্যয়ের ক্ষেত্রে মুসলিম হওয়া আর রাজনৈতিক ময়দানে বা পার্লামেন্টে জীবিত বা মৃত নেতার গোলামী করা, এ দু'টো সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী বিষয়। সকল ক্ষেত্রে গোলামীর মস্তক অবনত থাকতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহর সম্মুখে এবং নবী করীম (সা:) কে একমাত্র আদর্শ নেতা মেনে তাঁকেই অনুসরণ করতে হবে।

যে ব্যক্তি মুসলমান হিসাবে পৃথিবীতে জীবন যাপন ও আখিরাতের ময়দানে মুসলিম হিসাবে মহান মালিক আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান হতে চায়, তাকে অবশ্য অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সিদ্ধান্তের সম্মুখে আনুগত্যের মস্তক নত করে দিতেই হবে। মত প্রকাশ বা বাক স্বাধীনতার নামে যারা দম্ভ অহঙ্কারের চূড়ায় অবস্থান করতে চায়, মুসলিম হিসাবে দাবী করার তাদের কোনো অধিকার নেই বরং তারা স্বঘোষিত মুনাফিক।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি শত্রুদের অভিযোগ, জবাব দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা!

📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি শত্রুদের অভিযোগ, জবাব দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা!


পৃথিবীতে প্রেরিত নবী-রাসূলদের প্রতি সমকালীন লোকদের মধ্যে যারা বিরোধিতা করেছে তারা আল্লাহ তা'য়ালা কর্তৃক প্রেরিত হিদায়াতকারীদের প্রতি নানা ধরনের কল্পিত অভিযোগ আরোপ করার বৃথা চেষ্টা করেছে। শুধু কল্পিত বিশেষণই আরোপ করেনি, নবী-রাসূলদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতেও তারা দ্বিধাবোধ করেনি। মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করার ও সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্যে যে মানুষগুলোকে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নির্বাচিত করে প্রেরণ করতেন, তাঁদের প্রতি মানুষ যে বর্বর আচরণ করতো সে কারণে আল্লাহ তা'য়ালা আফসোস করে বলেছেন-

يَا حَسْرَةً عَلَى الْعِبَادِ عِ مَا يَأْتِيهِم مِّنْ رَّسُوْلٍ إِلَّا كَانُوْا بِهِ يَسْتَهْزِؤُوْنَ

বড়োই আফসোস (এমন সব) বান্দাদের ওপর, তাদের কাছে এমন একজন রাসূলও আসেননি, যাদের তারা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেনি! (সূরা ইয়াছিন-৩০)

নবী করীম (সা:) এর পূর্বে যে সকল নবী-রাসূলদের প্রতি সমকালীন লোকজন ব্যঙ্গ-বিদ্রুপসহ নানা ধরনের কল্পিত অভিযোগ আরোপ করতো, এসবের জবাব স্বয়ং উক্ত নবী-রাসূলগণই দিতেন। হযরত নূহ (আ:)-এর প্রতি তাঁর জাতির নেতৃস্থানীয় লোকজন অভিযোগ করলো-

قَالَ الْمَلَأُ مِنْ قَوْمِهِ إِنَّا لَنَرَاكَ فِي ضَلَالٍ مُّبِيْنٍ

তার জাতির নেতারা বললো (হে নূহ), আমরা দেখতে পাচ্ছি তুমি এক সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় (নিমজ্জিত) রয়েছো। (সূরা আল আ'রাফ-৬০)

আল্লাহ তা'য়ালা হযরত নূহ (আ:) কে এক পথহারা জাতির কাছে প্রেরণ করলেন সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্যে, আর সেই জাতির নেতৃস্থানীয় লোকজন নিজেদের নেতৃত্ব হারানোর আতঙ্কে হযরত নূহ (আ:) এর প্রতিই অভিযোগ করলো যে, 'তুমি নিজেই ভুল পথে রয়েছো এবং জাতিকেও ভুল পথের দিকেই ডাকছো'।

আল্লাহ তা'য়ালা হযরত নূহ (আ:) কে প্রেরণ করলেন কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রেরিত নবীর শত্রুদের আরোপিত অভিযোগের জবাব দিলেন না, জবাব দিলেন স্বয়ং সেই নবী। জবাবে হযরত নূহ (আ:) জাতীয় নেতৃবৃন্দকে বললেন- قَالَ يَا قَوْمِ لَيْسَ بِي ضَلَالَةٌ وَلَكِنِّي رَسُوْلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعَالَمِينَ

সে বললো, হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা, আমার মধ্যে কোনোই পথভ্রষ্টতা নেই, আমি তো হচ্ছি সৃষ্টিকুলের মালিক আল্লাহর পক্ষ থেকে (আসা) একজন রাসূল। (সূরা আ'রাফ-৬১)

হযরত হূদ (আ:) কে আল্লাহ তা'য়ালা প্রেরণ করলেন চরম ক্ষতির দিকে ধাবমান এক জাতির কাছে। তিনি সেই জাতিকে মহাক্ষতি থেকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যে সীমাহীন প্রচেষ্টা শুরু করলেন। জাতির নেতৃবৃন্দ নিজেদের নেতৃত্বের আসন টলটলায়মান হতে দেখে আল্লাহ নবী হযরত হূদ (আ:) এর প্রতি অভিযোগ আরোপ করলো- قَالَ الْمَلَأُ الَّذِيْنَ كَفَرُوا مِن قَوْمِهِ إِنَّا لَنَرَاكَ فِي سَفَاهَةٍ وَإِنَّا لَنَظُنُّكَ مِنَ الْكَاذِبِينَ

তার জাতির নেতৃবৃন্দ, যারা (তাকে) অস্বীকার করেছে, তারা বললো, আমরা তো দেখছি তুমি নির্বুদ্ধিতায় লিপ্ত আছো এবং আমরা মনে করি তুমি মিথ্যাবাদীদেরই একজন। (সূরা আল আ'রাফ-৬৬)

আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে বলছেন হযরত হূদ (আ:) এ অভিযোগের জবাব কিভাবে দিয়েছিলেন- قَالَ يَا قَوْمِ لَيْسَ بِي سَفَاهَةٌ وَلَكِنِّي رَسُوْلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعَالَمِينَ

সে বললো, হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা, আমার সাথে কোনোরকম নির্বুদ্ধিতা জড়িত নেই, বরং আমি (হচ্ছি) সৃষ্টিকুলের মালিক আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে (আগত) একজন রাসূল। (সূরা আল আ'রাফ-৬৭)

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নবী-রাসূলগণের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে প্রমাণ হয় যে, তাদের প্রতি সমকালীন লোকজন যে সকল অভিযোগ আরোপ করেছেন এবং তাদের ব্যাপারে কল্পিত যেসব আপত্তি উত্থাপন করেছে তার জবাব নবী-রাসূলগণ স্বয়ং দিয়েছেন। ব্যতিক্রম শুধুমাত্র নবী করীম (সা:) এর ক্ষেত্রে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন বিধায় সমকালীন বিরোধিগণ তাঁর পবিত্র সত্তার প্রতি যেসকল ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপন করেছে এবং যেসব কল্পিত বিশেষণে বিশেষিত করার অপচেষ্টা করেছে, এসব কিছুর জবাব দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। ইসলামী আন্দোলনের শত্রুরা নবী করীম (সা:) সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে বুঝানোর চেষ্টা করতো যে, এ লোকটি পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছে। তাদের এ অপবাদের জবাব নবী করীম (সা:) দিবেন, আল্লাহ তা'য়ালা তা পছন্দ করলেন না। স্বয়ং তিনি এভাবে জবাব দিলেন-

مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوى ط

তোমাদের সাথী পথ ভুলে যায়নি, সে পথভ্রষ্টও হয়নি। (সূরা আন নাজম-২)

ইসলামী জীবন বিধানের প্রতিপক্ষগণ নবী করীম (সা:)-কে গণবিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে তাঁকে সর্বসাধারণের কাছে উন্মাদ হিসাবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা করে প্রচার করেছে, 'মুহাম্মাদ (সা:)-এর মস্তিষ্কে ত্রুটি দেখা দিয়েছে, তিনি সুস্থ নন বরং পাগল হয়ে গিয়েছেন'। শত্রুদের এসব কল্পনাপ্রসূত অভিযোগের জবাব স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা শপথের মাধ্যমে দিয়েছেন-

وَالْقَلَمِ وَمَا يَسْطُرُوْنَ لا مَا أَنتَ بِنِعْمَةِ رَبِّكَ بِمَجْنُوْنَ

শপথ (লেখার মাধ্যম) কলমের, (আরো শপথ এ কলম দিয়ে) তারা যা লিখে রাখছে তার, আপনার মালিকের (অসীম) দয়ায় আপনি পাগল নন। (সূরা কালাম-১-২)

পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকে নবী করীম (সা:) যাদের মাঝে নিজের শৈশব, কৈশর, তারুণ্য ও যৌবন অতিক্রম করে চল্লিশ বছরে পদার্পণ করলেন, তারাই তো তাঁকে ভালোভাবে চিনেছে এ মানুষটি কেমন। চিনেছে বলেই তারা তাঁকে পরম শ্রদ্ধাভরে উপাধি দিয়েছে 'আল আমীন বা বিশ্বাসী'। নবী করীম (সা:) এর ইসলামী আন্দোলনের ঢেউ যখন তাদের প্রতিষ্ঠিত স্বার্থে আঘাত হানলো, তখন তারাই আল্লাহর রাসূল (সা:) কে পাগল হিসাবে আখ্যায়িত করার লক্ষ্যে প্রচার শুরু করলো। তিনি পাগল নন অথবা সকলের তুলনায় সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী এ কথা তারাই ভালো জানতো, যারা তাঁর প্রতি এ ঘৃণ্য অভিযোগ আরোপ করার চেষ্টা করছে। তারা অপবাদ দিয়েছে-

وَقَالُوا يَا أَيُّهَا الَّذِي نُزِّلَ عَلَيْهِ الذِّكْرُ إِنَّكَ لَمَجْنُونٌ طَ

তারা বলে, ওহে- যার ওপর কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে- তুমি অবশ্যই একজন উন্মাদ ব্যক্তি। (সূরা হিজর-৬)

স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা অভিযোগকারীদের লক্ষ্য করে জবাব দিলেন- وَمَا صَاحِبُكُمْ بِمَجْنُوْنٍ جِ তোমাদের সাথী (কিন্তু) পাগল নয়। (সূরা তাকবীর-২২)

দুশমনরা সাধারণ মানুষকে পবিত্র কুরআন থেকে দূরে রাখার লক্ষ্যে প্রচার করেছে, মুহাম্মাদ (সা:) আল্লাহ তা'য়ালার বাণী বলে যা দাবী করছেন তা মোটেও সত্য নয়, বরং এসব তাঁর নিজের রচনা করা কথা। শত্রুদের এসব অপবাদের জবাব স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা এভাবে দিয়েছেন- وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى طَ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى لا সে কখনো নিজের থেকে কোনো কথা বলে না, বরং তা হচ্ছে ওহী যা (তার কাছে) পাঠানো হয়। (সূরা আন নাজম-৩-৪)

দুশমনদের কেউ কেউ অভিযোগ কয়েছে, মুহাম্মাদ (সা:) যে সকল কথা কুরআন বলে প্রচার করছে তা আল্লাহ তা'য়ালা অবতীর্ণ করেননি, বরং শয়তান এসব কথা তাঁকে দিয়ে বলাচ্ছে। শত্রুদের এসব ভিত্তিহীন কথার জবাব আল্লাহ তা'য়ালা দিয়েছেন- وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَيْطَانٍ رَحِيمٍ لا এটা অভিশপ্ত শয়তানের কথাও নয়। (সূরা তাকবীর-২৫)

শত্রুপক্ষ প্রশ্ন তুলেছে, 'মুহাম্মাদ (সা:) একজন শ্রেষ্ঠ কবি অথবা তিনি উচ্চপর্যায়ের একজন গণক বা জ্যোতিষী'। তাদের এসব প্রশ্নের জবাব নবী করীম (সা:) দিতে গিয়ে সামান্যতম কষ্টানুভব করবেন আল্লাহ তা'য়ালা তা বরদাস্ত করেননি। তিনি স্বয়ং জবাব দিলেন- فَلَا أُقْسِمُ بِمَا تُبْصِرُوْنَ لا وَمَا لَا تُبْصِرُوْنَ لا إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُوْلٍ كَرِيمٍ جِ لَا وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرِط قَلِيْلًا مَّا تُؤْمِنُوْنَ لا وَلَا بِقَوْلِ كَاهِنِ طَ قَلِيْلًا مَّا تَذَكَّرُوْنَ طَ تَنْزِيلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعَالَمِينَ তোমরা যা কিছু দেখতে পাও আমি তার শপথ করে বলছি, (আরো শপথ করছি) সেসব বস্তুর যা তোমরা দেখতে পাও না, নিঃসন্দেহে এ কিতাব একজন সম্মানিত রাসূলের (আনীত) বাণী, এটা কোনো কবির কাব্যকথা নয়; যদিও তোমরা খুব কমই বিশ্বাস করো, এটা কোনো গণক বা জ্যোতিষীর কথাও নয়; যদিও তোমরা খুব কমই বিবেক-বিবেচনা করে চলো; (মূলত) এ কিতাব বিশ্বজগতের মালিক আল্লাহ তা'য়ালার কাছ থেকেই (তাঁর রাসূলের ওপর) অবতীর্ণ করা হয়েছে। (সূরা আল হাক্কাহ্ ৩৮-৪৩)

মহান আল্লাহ তা'য়ালার দ্বীনের বিরোধিগণ জনসাধারণকে বুঝাতো, 'মুহাম্মাদ (সা:) একজন পথহারা কবি এবং এমন একজন পথভ্রষ্ট কবিয়ালের কথায় কি শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যাপী যাদেরকে নিজের উপাস্য দেবতা হিসাবে পূজা দিয়ে আসছি, তাদেরকে কি আমরা ত্যাগ করতে পারি?' তাদের এসব উদ্ভট কথার জবাব আল্লাহ তা'য়ালা এভাবে দিয়েছেন-

وَيَقُولُوْنَ أَنَّا لَتَارِكُوْا آلِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَّجْنُوْنَ ط بَلْ جَاءَ بِالْحَقِّ وَصَدَّقَ الْمُرْسَلِينَ

এরা বলতো, আমরা কি একজন পাগল কবিয়ালের কথায় আমাদের মাবুদদের (আনুগত্য) ছেড়ে দিবো? (অথচ আমার নবী কোনো কাব্য নিয়ে আসেনি,) বরং তিনি এসেছেন সত্য (দ্বীন) নিয়ে এবং তিনি (আগের) নবীদের সত্যতাও স্বীকার করছেন। (সূরা আছ ছাফ্ফাত-৩৬-৩৭)

মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রদান করেছেন এবং মর্যাদার সাথে সঙ্গতি রেখে বিরোধিদের উত্থাপিত অভিযোগের জবাবে বলেছেন-

فَذَكِّرْ فَمَا أَنْتَ بِنِعْمَتِ رَبِّكَ بِكَاهِنِ وَلَا مَجْنُوْنَ

অতএব (হে নবী, মানুষদের) আপনি এ দিনের কথা স্মরণ করাতে থাকুন, আল্লাহ তা'য়ালার অনুগ্রহে আপনি কোনো গণক নন, আবার আপনি কোনো পাগলও নন (আপনি হচ্ছেন তাঁর বাণী বহনকারী একজন রাসূল মাত্র)। (সূরা আত তুর-২৯)

নবী করীম (সা:) এর মর্যাদার সাথে কাব্য রচনা সঙ্গতিপূর্ণ নয়, এ বিষয়টি মানুষের কাছে স্পষ্ট তুলে ধরে মহান আল্লাহ তা'য়ালা ঘোষণা করলেন-

وَمَا عَلَّمْنَاهُ الشِّعْرَ وَمَا يَنبَغِي لَه طَ إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ وَقُرْآنٌ مُّبِينٌ

(তোমরা এও জেনে রেখো,) আমি এ (রাসূল)-কে কাব্য (রচনা) শেখাইনি এবং এটা তার (নবী মর্যাদার) পক্ষে শোভনীয়ও নয়; (আর তার আনীত গ্রন্থ) তা হচ্ছে একটি উপদেশ ও সুস্পষ্ট কুরআন। (সূরা ইয়াছিন-৬৯)

নবী-রাসূলদের অস্বীকারকারীগণ তাদেরই অনুরূপ আরেকজন মানুষকে নবী-রাসূল হিসাবে দাবী করতে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতো। তাদের ধারণা ছিলো, নবী- রাসূলগণ হবেন মানুষ প্রজাতির বাইরের কেউ এবং নিতান্তই যদি সে মানুষ হয় তাহলে তো তাঁর সাথে অবশ্যই আল্লাহ তা'য়ালা একজন ফিরিশতা পাঠাবেন এবং তিনি নবী-রাসূলকে সাধারণ মানুষের কাছে এভাবে পরিচয় করিয়ে দিবেন যে, 'তিনি আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে প্রেরিত, তোমরা তাঁর অনুসরণ করো। যদি তাঁর অনুসরণ না করো তাহলে তোমাদের ওপর আযাব নিপতিত হবে'। এ ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা প্রশ্ন তুলতো, 'এ আবার কেমন নবী-রাসূল যে, তিনি আমাদের মতোই মানুষ এবং আমাদের মধ্যে যে মানবীয় গুণ-বৈশিষ্ট রয়েছে একজন নবীর মধ্যেও তা রয়েছে'।

নবী করীম (সা:) এর সম্পর্কে যখন অজ্ঞ লোকজন এমন প্রশ্ন তুললো, 'এ আবার কেমন (ধরনের) রাসূল যে (আমাদের মতো করেই) খাবার খায় এবং (আমাদের মতোই) হাটে বাজারে চলাফেরা করে। কেনো তাঁর সাথে কোনো ফিরিশতা নাযিল করা হলো না যে, তার সাথে (আযাবের) সতর্ককারী হয়ে থাকবে!' অস্বীকারকারীদের এসব উদ্ভট প্রশ্নের জবাবে মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِنَ الْمُرْسَلِينَ إِلَّا إِنَّهُمْ لَيَأْكُلُوْنَ الطَّعَامَ وَيَمْشُوْنَ فِي الْأَسْوَاقِ ط وَجَعَلْنَا بَعْضَكُمْ لِبَعْضٍ فِتْنَةٌ طَ أَتَصْبِرُوْنَ جِ وَكَانَ رَبُّكَ بَصِيرًاع

(হে নবী) আপনার পূর্বে আমি আরো যতো রাসূল প্রেরণ করেছি, তারা (মানুষের মতোই) আহার করতো, (অন্য মানুষদের মতোই) তারা হাটে বাজারে যেতো (আসল কথা হচ্ছে) মানুষদের মধ্য থেকে রাসূল পাঠিয়ে আমি তোমাদের একজনকে আরেকজনের জন্য পরীক্ষার (উপকরণ) বানিয়েছি; (এ পরীক্ষায়) তোমরা কি ধৈর্য ধারণ করবে না? তোমার মালিক (কিন্তু তোমাদের) সবকিছুই দেখছেন। (সূরা আল ফুরকান-২০)

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 বিশ্বনবীর মর্যাদাগত কারণে আল্লাহ তাঁর নবীর জীবনের শপথ করেছেন

📄 বিশ্বনবীর মর্যাদাগত কারণে আল্লাহ তাঁর নবীর জীবনের শপথ করেছেন


নবী করীম (সা:) এর পূর্বে প্রেরিত কোনো নবী-রাসূল এবং তাঁরা যে এলাকায় বসবাস করতেন সেই এলাকার নাম উল্লেখ পূর্বক অথবা উক্ত নবী-রাসূলদের জীবনের শপথ আল্লাহ তা'য়ালা করেছেন, এমন দৃষ্টান্ত পবিত্র কুরআনে কোথাও সন্ধান করে পাওয়া যাবে না। কিন্তু নবী করীম (সা:) এর মর্যাদা মহান আল্লাহ তা'য়ালা এতই উচ্চ করেছেন যে, স্বয়ং আরশে আযীমের মালিক- সমগ্র সৃষ্টিজগত ও সৃষ্টির মালিক আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রিয় হাবীবের জীবনের শপথ করেছেন-

لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُوْنَ -

(আল্লাহ তা'য়ালা বললেন, হে নবী,) আপনার জীবনের শপথ (করে বলছি, সেদিন) এরা নিদারুণ এক নেশায় বিভোর হয়ে পড়েছিলো (আল্লাহর গযবের কোনো কথাই এরা বিশ্বাস করলো না)। (সূরা হিজর-৭২)

মহান আল্লাহ তা'য়ালা মর্যাদাগত কারণে শুধু নবী করীম (সা:)-এর জীবনের শপথই করেননি, তাঁর মহান নবী যে নগরীতে জন্ম গ্রহণ করলেন, যে স্থান তাঁর শৈশব, কৈশর, তারুণ্য ও যৌবনের চারণভূমি সেই পবিত্র মক্কা নগীরও শপথ করেছেন- لَا أُقْسِمُ بِهَذَا الْبَلَدِ لَا وَأَنْتَ حِلْمٍ بِهَذَا الْبَلَدِ لا

আমি শপথ করছি এ (পবিত্র) নগরীর, এ নগরীতে আপনি (সম্পূর্ণ) স্বাধীন। (সূরা বালাদ-১-২)

পবিত্র মক্কা নগরী সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। এখানে সকল প্রাণী নিরাপত্তা লাভসহ স্বস্তি ও শান্তি লাভ করে। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় পবিত্র কুরআনের গবেষকগণ বলেছেন, 'নবী করীম (সা:) মক্কা নগরীতে প্রবাসী কোনো ব্যক্তি নন, তিনি ভিন্ন কোনো এলাকা থেকে এসেও এখানে বসতি স্থাপন করেননি। তিনি এই নগরীতেই জন্মগ্রহণ করেছেন, তাঁর শৈশব, কৈশর ও যৌবনের চারণভূমি এই নগরী। এখানেই তিনি নবুয়‍্যাত লাভ করেছেন এবং তিনি এখানে অবস্থান করছেন। এসব কারণে এই নগরীর মর্যাদা ও গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে'।

আল্লাহ তা'য়ালা সূরা বালাদের উক্ত আয়াতে বলছেন, 'এটা আপনার আপন এলাকা, আপনার পবিত্র জন্মভূমি। যেখানে আপনি সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং যে কোনো স্থানে গমন ও বিচরণ করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আপনার রয়েছে। অথচ এই নগরীর পরিবেশ আপনার জন্যে এক শ্বাসরুদ্ধকর করে তুলেছে ইসলাম বিরোধী গোষ্ঠী। আপনার প্রিয় স্মৃতি বিজড়িত মাতৃভূমি- আপনার চারণভূমিকে আপনারই জন্যে কন্টকাকীর্ণ করে তুলেছে মিথ্যার অন্ধ পূজারীরা। যে নগরীর প্রত্যেক ধূলিকণা আপনার জন্যে প্রশান্তি দায়ক, সেই নগরীর প্রতি ধূলিকণাকে আপনার জন্যে শাণিত অস্ত্রের রূপ দেয়া হয়েছে'।

যেখানে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রাতি একটি প্রাণীকেও নিরাপত্তা দিচ্ছে সত্যের শত্রুরা, পরম আপনজনের হত্যাকারীকেও যে এলাকায় নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। সেই পবিত্র এলাকায় আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল (সা:) এর এবং তাঁর কোনো অনুসারীর নিরাপত্তা নেই। সেই মহাপবিত্র এলাকায় বিশ্বনবী (সা:) এর পূত পবিত্র দেহের রক্ত ঝরানো বৈধ করা হয়েছে। হালাল করা হয়েছে তাঁদের রক্ত, যারা মহান আল্লাহর অনুগত বান্দাহ্। পবিত্র হারাম শরীফে আল্লাহর রাসূল মহান আল্লাহকে সিজদা দিচ্ছেন, সমগ্র সৃষ্টিজগতের রব-এর উদ্দেশ্যে সিজদায় লুটিয়ে পড়েছেন, এই অবস্থায় তাঁর মাথার ওপরে উটের পচা দুর্গন্ধযুক্ত নাড়িভূড়ি চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।

তাঁর পবিত্র কণ্ঠনালীতে কাপড় পেঁচিয়ে দু'দিক থেকে এমনভাবে টেনে ধরা হয়েছে, আল্লাহর রাসূলের শ্বাস বন্ধ হয়ে তাঁর চোখ মোবারক কোঠর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। আল্লাহর অনুগত বান্দাহ্ মুসলমানদেরকে এই পবিত্র স্থানে রক্তাক্ত করা হয়েছে। যে কোনো প্রাণী, উদ্ভিদ এবং চরম শত্রুর জন্যেও যে এলাকায় বৈধ অবৈধের সীমা অনুসরণ করা হয়েছে, সেই সীমা অনুসরণ করা হয় নি শুধু আল্লাহর রাসূল (সা:) ও তাঁর অনুসারীদের ক্ষেত্রে।

তাঁর অপরাধ (!) একটিই, তিনি মানুষকে মহাসত্যের দিকে আহ্বান জানাচ্ছেন। মানুষকে শোষণ, বঞ্চনা, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, অন্যায়-অত্যাচার থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে আন্দোলন করছেন। তাঁর অনুগত লোকদের অপরাধ (!) তাঁরা একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো গোলামী করতে রাজী হয়নি। এদের একমাত্র অপরাধ হলো, এরা মহা প্রশংসিত মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে। এই অপরাধেই মক্কার জাহিল লোকগুলো তাদের সহায়-সম্পদ, দেহের রক্ত ও প্রাণ পবিত্র এলাকায় বৈধ করে নিয়েছে। মক্কার লোকগুলোও যেমন কা'বা এলাকায় ক্ষুদ্র একটি মশাকে হত্যা করাও অপরাধ মনে করতো, কিন্তু সেই একই এলাকায় কোনো মুসলমানকে হত্যা করা অপরাধ মনে করতো না। অর্থাৎ এদের কাছে ক্ষুদ্র একটি প্রাণীর প্রাণের যে মূল্য ও মর্যাদা ছিল, একজন মুসলমানের প্রাণের সে মূল্য ছিল না।

বর্তমানে অমুসলিম শক্তির কাছেও মুসলমানদের প্রাণের কোনো মূল্য নেই। বনের হিংস্র প্রাণীর মূল্য তাদের কাছে অনেক বেশি এবং এসব প্রাণী সংরক্ষণের জন্যে তারা অকাতরে অর্থ ব্যয় করছে। হিংস্র পশুর চারণভূমি গ্রীষ্মের মৌসুমে প্রায় পানি শূন্য হয়ে পড়ে। অমুসলিম রাষ্ট্রসমূহ সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের কাছ থেকে শোষণকৃত অর্থ ব্যয় করে ঐসব এলাকায় জলাধার নির্মাণ করে দিচ্ছে, যেন কোনো পশু পানি সঙ্কটে না পড়ে। বাঘ, সিংহ, শৃগাল, কুকুর, শুকর থেকে শুরু করে সামান্য একটি টিকটিকির মতো প্রাণীকেও তারা আধুনিক চিকিৎসা উপকরণে সজ্জিত ক্লিনিকে অত্যন্ত যত্নের সাথে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলে।

একবার আটলান্টিক মহাসাগরে বেশ কয়েকটি তিমি বরফে আটকা পড়লো। ইউরোপ- আমেরিকার কয়েকটি দেশ তড়িঘড়ি করে সেখানে 'আইস কাটার' বরফ কাটা জাহাজ প্রেরণ করে তিমিগুলো উদ্ধার করে সাগরে ছেড়ে দিল। এভাবে বরফে আটকা পড়া তিমিকে উদ্ধার করে এবং এসব দৃশ্য প্রচার মাধ্যমে বার বার প্রচার করে তারা বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে থাকে, প্রাণীর প্রতি তারা কতটা দরদী।

দরদ নেই শুধু মুসলমানদের ক্ষেত্রে। সে যুগের মক্কার জাহিলদের অনুকরণে আধুনিক জাহিলরাও মুসলমানদের প্রাণের কোনো মূল্য দিচ্ছে না। এক আল্লাহ তা'য়ালাকে তারা বিশ্বাস করে, কুরআনকে তারা মহান আল্লাহর বাণী হিসেবে বিশ্বাস করে, শুধুমাত্র এই অপরাধে (!) মুসলিম নারীদের ইজ্জত-আব্রু হালাল করে নেয়া হয়েছে। মুসলিম শিশু, কিশোর, তরুণ-যুবকদেরকে পাখির মতো গুলী করে হত্যা করা হচ্ছে। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া হচ্ছে। বন্দী মুসলমানদেরকে পেছনের দিকে হাত দু'টো বেঁধে খাঁচায় আবদ্ধ করে রাখা হচ্ছে। গর্ভবতী মুসলিম নারীর পেট চিরে গর্ভের শিশুকেও হত্যা করা হচ্ছে। মাতা-পিতার শান্তির কোল থেকে শিশু ছিনিয়ে নিয়ে পাথরে আছড়ে হত্যা করা হচ্ছে। সামান্য একটি পিঁপড়ার যে মূল্য রয়েছে, বর্তমান পৃথিবীতে অমুসলিমদের কাছে মুসলমানের সেই মূল্য নেই। বর্তমান জাহিলদের পূর্বসূরী আরব জাহিলদের চরিত্রে যে গুণ ও বৈশিষ্ট ছিল, সেই একই গুণ ও বৈশিষ্ট বহন করছে আধুনিক জাহিলরা। আল্লাহ তা'য়ালার বিধানের শত্রুদের চারিত্রিক মান, গুণ ও বৈশিষ্ট প্রত্যেক যুগে একই রকম ছিল, এদের চরিত্র অপরিবর্তনীয়।

ইসলামের দুশমনরা নবী করীম (সা:) এর মর্যাদাক্ষুণ্ণকর কর্মকাণ্ড করছে আর মুসলিম নামধারী অগণিত জনগোষ্ঠী নীরবে দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা নির্দেশ দিচ্ছেন- لِتُؤْمِنُوْا بِاللَّهِ وَرَسُوْلِهِ وَتُعَزِّرُوْهُ وَتُوَقِّرُوْهُ ط وَتُسَبِّحُوْهُ بُكْرَةً وَأَصِيْلًا- যাতে করে তোমরা (একমাত্র) আল্লাহর ওপর এবং তাঁর নবীর ওপর (সর্বোতভাবে) ঈমান আনো, (দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে) তাঁকে সাহায্য করো, (আল্লাহর নবী হিসাবে) তাঁকে সম্মান করো; (সর্বোপরি) সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহ তা'য়ালার মাহাত্ম্য ঘোষণা করো! (সূরা আল ফাতাহ্-৯)

ইতোপূর্বে প্রেরিত নবী-রাসূলদের সাথে বিদ্রোহ করার অপরাধে মহান আল্লাহ তা'য়ালা সেসব এলাকায় বিদ্রোহী জাতির ওপর আযাব অবতীর্ণ করে জনপদ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন। মক্কা নগরীর ইসলাম বিরোধিদের ওপর আযাব অবতীর্ণ করে তাদের নিশ্চিহ্ন করেননি শুধু মাত্র নবী করীম (সা:) এর মর্যাদার খাতিরে। যে পবিত্র নগরীতে তাঁর প্রিয় হাবীব এবং সবথেকে বেশি মর্যাদাবান নবী জন্মগ্রহণ করেছেন, সেই নগরীর ওপর তিনি আযাব অবতীর্ণ করেননি। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيْهِمْ ط وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ- আল্লাহ তা'য়ালা এমন নন যে, তিনি তাদের কোনো আযাব দিবেন, অথচ আপনি (এখনো) তাদের মধ্যে (বর্তমান) রয়েছেন; আর আল্লাহ তা'য়ালা এমনও নন যে, কোনো (জাতির) মানুষদের তিনি শান্তি দিবেন, অথচ তারা (কিছু লোক) তখনও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছে। (সূরা আনফাল-৩৩)

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি প্রাণাধিক ভালোবাসা- ঈমানের অপরিহার্য দাবী

📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি প্রাণাধিক ভালোবাসা- ঈমানের অপরিহার্য দাবী


পবিত্র কুরআন ও হাদীসে নবী করীম (সা:) কে সর্বাধিক গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং সৃষ্টিসমূহের মধ্যে তাঁর যে অতুলনীয় মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে, এসব দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে স্পষ্টতই বুঝা যায়, একজন মুসলিম যদি পূর্ণ মুমিন হতে চায় তাহলে তাকে অবশ্য অবশ্যই নবী করীম (সা:) কে নিজ পরিবার পরিজন, সন্তান-সন্ততি, ধন-সম্পদ এমন কি নিজ প্রাণের তুলনায় অধিক ভালোবাসতে হবে। তাঁর প্রতি নিখাদ এবং সর্বাধিক ভালোবাসা না থাকলে কোনো মুসলিমের পক্ষে মুমিনের পূর্ণ স্তরে উপনীত হওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে -

عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُ كُمْ حَتَّى أَكُوْنَ اَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَ وَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ

হযরত আনাস (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন, তোমাদের কেউই ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যে পর্যন্ত না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান- সন্ততি ও সকল মানুষ অপেক্ষা অধিক প্রিয় হই। (বুখারী, মুসলিম)

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم لَا يُؤْمِنُ أَحَدُ كُمْ حَتَّى يَكُوْنَ هَوَاهُ تَبْعًا لِّمَا خِفْتُ بِهِ -

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ আকাংখিত মানের মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের প্রবৃত্তিকে আমার আনীত বিধানের অধীন করে। (শরহে সুন্নাহ্- মিশকাত)

নবী করীম (সা:) এর প্রতি ভালোবাসার অর্থ এটা নয় যে শুধুমাত্র কিছু সময় তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ করা। মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা, রবিউল মাসের আগমনে রং বেরংয়ের ফেস্টুন বানিয়ে বিশাল মিছিল করা, তাঁর জীবনী আলোচনার উদ্দেশ্যে মাহফিলের আয়োজন ইত্যাদি করে নবী করীম (সা:) এর ভালোবাসার হক আদায় হয়ে যাবে।

স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা রাসূল (সা:) এর প্রতি দরূদ প্রেরণ করেন, তিনি ফিরিশতা ও মানুষকে তাঁর রাসূলের প্রতি দরূদ প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন, সুতরাং রাসূলের প্রতি দরূদ পাঠ করা বাধ্যতামূলক এবং তাঁর নাম শোনামাত্র দরূদ পাঠ না করলে গোনাহগার হতে হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। নবী করীম (সা:) এর প্রতি ভালোবাসা পোষণকারী মুসলমানদের মধ্যে দু'টি শ্রেণী দেখা যায়। একটি শ্রেণী নবী করীম (সা:) এর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায় এভাবে, তিনি পাগড়ী, টুপি ও লম্বা জামা ব্যবহার করেছেন, এরাও তাই করে। তিনি নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজ্জ আদায় করেছেন, এরাও তাই করে। তিনি বিশেষ বিশেষ খাদ্য পছন্দ করেছেন, এরাও তাই পছন্দ করে। তিনি নফল নামাজ আদায় করেছেন, তাসবীহ-তাহলীল পাঠসহ কুরআন তিলাওয়াত করেছেন, এরাও তাই করে। এই শ্রেণীর মধ্যে কেউ কেউ রাসূলের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে রবিউল মাসের আগমনে তাঁর জীবনী আলোচনা, মিলাদ মাহফিল, নানা রংয়ের ফেস্টুন বানিয়ে মিছিল এবং রাসূল (সা:) এর উদ্দেশ্যে নানা ধরনের আবৃত্তি ও গান বা হামদ-নাতের আয়োজনও করে।

আরেকটি শ্রেণীকে আমরা দেখতে পাই, তাঁরা রাসূল (সা:) কে ভালোবেসে কেউ কেউ দাড়ি রাখে, লম্বা জামাও ব্যবহার এবং নামাজ আদায় করে সেই সাথে নামাজের শিক্ষা সাহাবায়ে কেরামের মতো সকল স্তরে বাস্তবায়নের চেষ্টাও করে। এরাও যাকাত আদায়ের মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরামের অনুরূপ যাকাত ভিত্তিক অর্থনীতি চালু করার লক্ষ্যে আন্দোলন করে। এরাও হজ্জ আদায় করে এবং হজ্জের শিক্ষানুসারে সমগ্র মুসলিম মিল্লাতকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করে। এরাও রাসূল (সা:) এর জীবনী পর্যালোচনার মাধ্যমে রাসূল (সা:) এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্যে আন্দোলন- সংগ্রাম করে। এরাও কুরআন তিলাওয়াত করে সেই সাথে কুরআন বুঝার চেষ্টা করে এবং কুরআনের নির্দেশসমূহ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল স্তরে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অর্থ ব্যয় করে, হাসিমুখে জেল-জুলুম বরণ করে এবং প্রয়োজনে প্রাণও দেয়। এরাও দরূদ পড়ে, হামদ-নাত আবৃত্তি করে এবং রাসূল (সা:) এর মর্যাদার প্রতি কেউ আঘাত করলে রাসূলের প্রতি সর্বাধিক ভালোবাসার কারণে বারুদের মতোই জ্বলে ওঠে।

নবী করীম (সা:) এর প্রতি ভালোবাসা পোষণকারী মুসলিমদের মধ্যে এই দুই শ্রেণীর লোকদের ভালোবাসা কি সমপর্যায়ের? অথবা এই দুই শ্রেণীর ভালোবাসার মূল্যমান কি এক? রাসূলের প্রতি ভালোবাসার মধ্যে যেমন একদিকে রয়েছে ধন- সম্পদ বিনষ্ট হওয়া, জেল-জুলুম সহ্য করা ও নিজ প্রাণ দেয়ার ঝুঁকি। অপরদিকে রয়েছে ঝুঁকিহীন ভালোবাসা। শুধুমাত্র কুরআন তিলাওয়াত এবং তসবীহ-তাহলীল, নামাজ, রোজা, হজ্জ ও যাকাত আদায়, টুপি ও লম্বা জামা ব্যবহার, মিলাদ ও রবিউল আউয়াল মাসে মিছিলের আয়োজন করে রাসূল (সা:) এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের মধ্যে কোনো ঝুঁকি নেই।

নবী করীম (সা:) এর প্রতি সাহাবায়ে কেরামের ভালোবাসা কেমন ছিলো তা জানা থাকলে বর্তমান মুসলিমদের মধ্যে এই দু'টি শ্রেণীর মধ্যে কোন্ শ্রেণীর ভালোবাসা প্রকৃত ভালোবাসা এবং সাহাবায়ে কেরামের ভালোবাসার কোটি ভাগের কিছু অংশ হলেও কোন্ শ্রেণীর মধ্যে রয়েছে তা জানা যাবে।

সাহাবায়ে কেরামের সম্মুখে আল্লাহর রাসূল (সা:) বর্তমান ছিলেন এবং তাঁদের সম্মুখেই পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। রাসূল (সা:) কুরআনের শিক্ষানীতি অনুসারে সাহাবায়ে কেরামকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁরা নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত আদায় করেছেন এবং বুঝে কুরআন তিলাওয়াত করেছেন। সেই সাথে তাঁরা নবী করীম (সা:) ও পবিত্র কুরআনের শিক্ষা জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও বাস্তবায়ন করেছেন। কুরআন ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁরা অকাতরে কষ্টার্জিত ধন-সম্পদ ব্যয় করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা ও রাসূলের মর্যাদার সাথে সাংঘর্ষিক কিছু দেখলে গর্জে উঠেছেন এবং দুশমনদের সাথে মুকাবেলা করতে গিয়ে তাঁরা পরিবার পরিজনসহ অকল্পনীয় অত্যাচার সহ্য করেছেন, প্রয়োজনে নিজের প্রাণ পর্যন্ত হাসিমুখে দান করেছেন। রাসূলের প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ হলো, তিনি মহান আল্লাহর নিকট থেকে যে আদর্শ নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেছেন, সেই আদর্শ সর্বাত্মক অনুসরণ করা এবং তা সমাজ ও দেশে বাস্তবায়ন করার জন্যে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও চেষ্টা করা। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

قُلْ إِنْ كُنتُمْ تُحِبُّوْنَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

(হে নবী,) আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহ তা'য়ালাকে ভালোবাসো তাহলে আমার কথা মেনে চলো, (এভাবে আমাকে ভালোবাসলে) আল্লাহ তা'য়ালাও তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তিনি তোমাদের গোনাহ্ ক্ষমা করে দিবেন; আল্লাহ তা'য়ালা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়াবান। (সূরা আলে ইমরাণ-৩১)

নবী করীম (সা:) কে ভালোবাসার অর্থই হলো জীবনের সকল দিকে একমাত্র তাঁকেই অনুসরণ করা, এখানে সহজ ও কঠিন দিক বলে কিছুই নেই এবং আংশিক অনুসরণেরও সুযোগ নেই। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুসারে রাসূল (সা:) এর জীবনের সকল দিকই অনুসরণ করতে হবে। যারা সুবিধাবাদী নীতি অনুসরণে সহজ দিক বা আংশিক তথা ঝুঁকিমুক্ত অনুসরণ করবে অথবা করবে না, তাদেরকে আল্লাহ তা'য়ালা কোন্ বিশেষণে বিশেষিত করেছেন দেখুন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُوْلَ جِ فَإِن تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ

(হে রাসূল) আপনি (আরো) বলুন, তোমরা যদি আল্লাহ তা'য়ালা ও (তাঁর) রাসূলের কথা মেনে চলো, (এ আহ্বান সত্ত্বেও) তারা যদি (এ থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয় (আপনি জেনে রাখুন), আল্লাহ তা'য়ালা কখনো কাফিরদের পছন্দ করেন না। (সূরা আলে ইমরান-৩২)

নবী করীম (সা:) কে একজন মানুষ যখন নিজ প্রাণেরও অধিক ভালোবাসতে সক্ষম হয় তখনই কেবল সেই মানুষের পক্ষে রাসূলের আদর্শের জন্যে নিজের কষ্টার্জিত ধন-সম্পদ অকাতরে ব্যয় করা সম্ভব হতে পারে। জেল-জুলুম অত্যাচার সহ্য করতে পারে এবং প্রয়োজনে নিজের প্রাণও কুরবান করতে পারে। একবার নবী করীম (সা:) এর সাথে কথোপকথনকালে হযরত উমার (রা:) বললেন-

لأَنْتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ كُلِّ شَيْ إِلَّا نَفْسِي - 'হে রাসূল (সা:)! আপনি আমার কাছে সকল কিছুর তুলনায় অধিক বেশি প্রিয় কিন্তু আমার প্রাণের চাইতে অধিক নয়'। এ কথা শুনে নবী করীম (সা:) বললেন-

وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُوْنَ أَحَبَّ إِلَيْكَ مِنْ نَفْسِكَ - 'শপথ ঐ মহান সত্তার যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের মধ্যে কেউ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ আমি তোমাদের কাছে তোমাদের প্রাণের তুলনায় অধিক প্রিয় না হই'। এ কথা শোনার সাথে সাথে হযরত উমার (রা:) বললেন-

أَنْتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ كُلِّ شَيْ حَتَّى نَفْسِي - 'আপনি আমার কাছে এখন সকল কিছুর তুলনায় এমনকি আমার প্রাণের তুলনায় অধিক প্রিয়'। এবার নবী করীম (সা:) হযরত উমার (রা:)-কে পূর্ণ ঈমানের সনদ দিয়ে বললেন-

'হে উমার! এখন তোমার ঈমান পূর্ণতা লাভ করলো'। الأَن يَا عُمَرُ -

পবিত্র কুরআন ও সমগ্র হাদীস পর্যালোচনা করলে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নবী করীম (সা:) কে ভালোবাসার অর্থই হলো তাঁর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার লক্ষ্যে তাঁর পূর্ণাঙ্গ আদর্শ জীবনের সকল ক্ষেত্রে অনুসরণ করা। নিজ সুবিধা অনুসারে সহজ দিক মেনে চলা এবং বিপদ-ক্ষতি হতে পারে এ কথা মনে করে কঠিন দিক অনুসরণ না করা ঈমানদারের লক্ষণ নয়। নবী করীম (সা:) যা কিছু আদেশ করেছেন তা অনুসরণ করা এবং যা কিছু নিষেধ করেছেন তা বর্জন করার অর্থই হলো তাঁর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা, এটা করতে পারলেই সীরাত মাহফিলের আয়োজন ও দরূদ পাঠ করা সার্থক হবে এবং আদালতে আখিরাতে তা নাজাতের উসিলা হবে। রাসূলের প্রতি ভালোবাসার নামে এমন কোনো ধরনের অনুষ্ঠান করা যাবে না বা এমন পদ্ধতিও অনুসরণ করা যাবে না, যা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা অনুমোদন করেনি। সাহাবায়ে কেরাম তাঁর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ যেভাবে ঘটিয়েছেন, সেই ভাবেই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতে হবে এবং এটাই পরিপূর্ণ মুমিনের স্তরে উপনীত হবার একমাত্র পন্থা।

ফন্ট সাইজ
15px
17px