📄 পবিত্র কুরআনের বিস্ময়কর মু'জিযা
হযরত উমার (রা:) এর মতো দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মানুষও কুরআনের প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কুরআনের প্রভাব তাঁকে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে। আল্লাহর রাসূলকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে একদিন রাতে তিনি রাসূলকে অনুসরণ করছিলেন। গভীর রাতে আল্লাহ তা'য়ালার নবী কা'বাঘরে নামাজে দাঁড়িয়ে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। হযরত উমার (রা:) তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি অন্ধকারে অদূরে দাঁড়িয়ে আল্লাহর নবীর পবিত্র জবান মুবারক থেকে কুরআন শুনছিলেন। কুরআনের বাণীর অপূর্ব সামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করে তাঁর মনে এ কথার উদয় হলো, 'মুহাম্মাদ (সা:) সম্ভবত উচ্চমানের কবি হয়েছেন'। তিনি মনে মনে এ কথাগুলো বলছিলেন আর সাথে সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর রাসূলের মুখ থেকে উচ্চারিত করালেন-
وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرٍ طَ قَلِيْلًا مَّا تُؤْمِنُوْنَ لَا
এটা কোনো কবির কাব্যকথা নয়, যদিও তোমরা খুব কমই বিশ্বাস করো। (সূরা হাক্কাহ্-৪১)
বিস্ময়ের ধাক্কায় স্তব্ধ অনড় হয়ে গেলেন হযরত উমার (রা:)। অবাক দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে রইলেন আল্লাহর রাসূল (সা:) এর দিকে। বিস্ময়ের ঘোর কেটে যেতেই তিনি মনে মনে বললেন, 'এই লোকটি শুধু উচ্চমানের কবিই হননি, সেই সাথে একজন উচ্চ পর্যায়ের গণৎকারও হয়েছেন। তা না হলে তিনি আমার মনের কথা জানলেন কেমন করে?' তাঁর মনে এ কথা উদিত হবার সাথে সাথে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর হাবীবের মুখ থেকে সূরা হাক্কাহ্-এর পরবর্তী আয়াত উচ্চারিত করালেন-
وَلَا بِقَوْلِ كَاهِنٍ طَ قَلِيْلًا مَّا تَذَكَّرُوْنَ طَ
এটা কোনো গণক বা জ্যোতিষির কথাও নয়; যদিও তোমরা খুব কমই বিবেক বিবেচনা করে চলো। (সূরা হাক্কাহ্-৪২)
হযরত উমার (রা:) বিস্ময়ের দ্বিতীয় ধাক্কা খেলেন। তিনি মনে মনে যা বলছেন, আর তার জবাব রাসূল দিচ্ছেন। বিষয়টি তাঁকে সত্য গ্রহণের পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে দিল। তাঁর মনে পুনরায় প্রশ্ন জাগলো, 'মুহাম্মাদ (সা:) যা পাঠ করছেন, তা কবির বা গণৎকারের কথা নয়। তাহলে তিনি এ কালাম কোথা থেকে লাভ করলেন?' তাঁর মনের এ প্রশ্নের উত্তরও রাসূল (সা:) এর মুখ থেকে শোনা গেল। তিনি সূরা হাক্কাহ্ এর পরবর্তী আয়াত তিলাওয়াত করলেন-
تَنْزِيلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعَالَمِينَ
(মূলত) এ কিতাব বিশ্বজগতের মালিক আল্লাহ তা'য়ালার কাছ থেকেই (তাঁর রাসুলের ওপর) অবতীর্ণ করা হয়েছে। (সূরা আল-হাক্কাহ্-৪৩)
অবশেষে কুরআন এমন প্রভাব হযরত উমার (রা:)-এর ওপর বিস্তার করেছিলো যে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কুরআনের পূর্বে যেসব কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছিল, তা যথাযথ বৈজ্ঞানিক পন্থায় সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা না থাকায় মূল কিতাব বিকৃত হয়েছিল। পক্ষান্তরে কুরআন অবতীর্ণ হবার সাথে সাথে আল্লাহর নির্দেশে নবী করীম (সা:) তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। এ জন্য কুরআনের মধ্যে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করার কোনো অবকাশ নেই। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে প্রচার মাধ্যমে কোনো একজন কুরআন তিলাওয়াত করছে, যদি সে কোথাও সামান্য একটু ভুল করে তাহলে পৃথিবীর অপর প্রান্তে বসে শ্রবণরত হাফেজে কুরআন তা শোনার সাথে সাথে বুঝতে পারবে তিলাওয়াতকারী অমক স্থানে ভুল উচ্চারণ করেছে। পরক্ষণেই সমগ্র পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে হাফেজে কুরআনগণ সেই তিলাওয়াতকারীকে জানিয়ে দেবে, অমুক আয়াতে সে ভুল উচ্চারণ করেছে বা তিলাওয়াতের সময় অমুক শব্দ বাদ পড়েছে। এভাবে পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকেই তাঁর কিতাব পাঠ করার একটি নিয়ম চিরপ্রতিষ্ঠিত করে দেয়া হয়েছে। সে নিয়মটি হলো, কুরআন যে ভাষায় যে ভঙ্গীতে অবতীর্ণ হয়েছে, ঐ ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় এই কিতাব তিলাওয়াত করা যাবে না। এ কিতাব যে কোনো ভাষায় অনুবাদ করা যেতে পারে, যে কোনো ভাষার মাধ্যমে তা অনুধাবন করা যেতে পারে এবং তা অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে কুরআনের অবিকৃত আরবী ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় তা তিলাওয়াত করার অনুমতি দেয়া হয়নি। এই সুযোগ যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে করে দেয়া হতো, তাহলে এ কিতাবে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করার সুযোগ থাকতো। যে কোনো ধরনের বিকৃতি থেকে হেফাজত করার লক্ষ্যেই আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে রাসূল (সা:) এর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন-
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُوْنَ
আমিই উপদেশ (সম্বলিত কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী। (সূরা হিজর-৯)
📄 আল্লাহর প্রতি ঈমান রাসূলের প্রতি ঈমানের সাথে শর্তযুক্ত
নবী-রাসূলদের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন বা উদাসীন থেকে মহান আল্লাহর প্রতি যদি কোনো মানুষ ঈমান আনে তাহলে তার সে ঈমানের সামান্যতম মূল্যও নেই। নবী-রাসূলের প্রতি ঈমান না এনে বা তাঁর আনুগত্য না করে কোনো মানুষের পক্ষে মহান আল্লাহর আনুগত্য করা সম্ভব নয়। কারণ, মানুষকে যে সীমিত জ্ঞান দেয়া হয়েছে তা প্রয়োগ করে মানুষের পক্ষে জানা কোনোক্রমেই সম্ভব নয় যে, তারা কিভাবে এবং কোন্ পদ্ধতিতে মহান আল্লাহর গোলামী বা দাসত্ব করবে। আর ঠিক এ কারণেই মহান মালিক আল্লাহ নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং এটা তাঁদেরই দায়িত্ব যে, মানুষকে আল্লাহর দাসত্ব সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া। তাঁদের কাছ থেকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণে কোনো মানুষ যদি অস্বীকার করে, তাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করে বা তাদেরকে সহযোগিতা না করে তাহলে সে মানুষের পক্ষে আল্লাহর গোলাম হওয়া সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ বলেন-
يَا بَنِي آدَمَ إِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ رُسُلٌ مِّنْكُمْ يَقُصُّوْنَ عَلَيْكُمْ آيَاتِي فَمَنِ اتَّقَى وَأَصْلَحَ لَا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُوْنَ
হে আদম সন্তানরা, যখনি তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকে এমন কোনো রাসূল আসবে, যারা তোমাদের কাছে আমার আয়াত পড়ে শোনাবে, তখন যারা (সে অনুযায়ী) আমাকে ভয় করবে এবং (নিজেদের) সংশোধন করে নিবে, তাদের কোনোই ভয় থাকবে না, তারা কখনো দুশ্চিন্তাগ্রস্তও হবে না। (সূরা আল আ'রাফ-৩৫)
সকল ব্যাপারে মানুষ যদি নবী-রাসূলের মুখাপেক্ষী না হয় এবং তাঁদের কাছ থেকে জীবনের প্রত্যেক দিক ও বিভাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে তাহলে সে মানুষ নিজেকে ঈমানদার বলে দাবী করলেও তা মহান আল্লাহ গ্রহণ করবেন না। না বুঝে বা যুক্তিহীনভাবে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ বলার অবকাশ ইসলাম দেয়নি, প্রেরিত নবী-রাসূলের নাম পরবর্তী অংশে অবশ্যই যুক্ত করতে হবে এবং প্রেরিত নবী-রাসূলকে স্বীকৃতি দিয়েই মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতে হবে। পবিত্র কুরআনে সূরা নামে উল্লেখ করা হয়েছে, সাবার রাণী ইসলামী জীবন বিধান পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন করার পর তিনি যখন মুসলমান হবেন তখন তিনি এভাবে ঘোষণা করলেন-
رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي وَأَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَانَ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
হে আমার মালিক, আমি এতদিন আমার নিজের ওপর জুলুম করে এসেছি, আজ আমি আনুগত্যের স্বীকৃতি দিয়ে সুলাইমানের সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ওপর ঈমান আনলাম। (সূরা নামল-৪৪)
তৎকালীন নবী হযরত সুলাইমান (আ:) কে অস্বীকার করে সাবার রাণী যদি মহান আল্লাহর ওপর ঈমান আনতেন তাহলে তার সে ঈমান গ্রহণ করা হতো না। ফিরআউনের যাদুকররা যখন অনুভব করলো, হযরত মূসা (আ:) মহান আল্লাহর নবী-রাসূল এবং তিনি যে পথের দিকে আহ্বান করছেন সেটিই একমাত্র সত্য পথ। তখনি তাঁরা ঈমান আনলো এবং ঘোষণা দিলো এভাবে-
قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ لَا رَبِّ مُوسَى وَهَارُوْنَ
তারা সবাই সমস্বরে বলে উঠলো, আমরা সৃষ্টিকুলের মালিকের ওপর ঈমান আনলাম, যিনি মূসা ও হরুনের মালিক। (সূরা আল আ'রাফ-১২১-১২২)
সুতরাং নবী-রাসূলের আনুগত্য না করে মহান আল্লাহর আনুগত্য করার অবকাশ নেই। আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার পূর্বশর্ত হলো নবী-রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। মানুষ মহান আল্লাহর বিধানের সম্মুখে নিজেকে সোপর্দ করে দিয়ে ‘মুসলিম’ হয়েছে, এ কথার সাক্ষীও দিবেন নবী-রাসূলগণ। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
مِنْ قَبْلُ وَفِي هَذَا لِيَكُوْنَ الرَّسُوْلُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ
যেনো তোমাদের রাসূল তোমাদের (মুসলিম হবার) ওপর সাক্ষ্য প্রদান করতে পারে। (সূরা হজ্জ-৭৮)
কিয়ামতের ময়দানে প্রত্যেক উম্মতকে দলে দলে বিভক্ত করে তাদের চূড়ান্ত হিসাব গ্রহণ করার সময় প্রত্যেক উম্মতের নবী-রাসূলকে সাক্ষী করা হবে। নবী-রাসূলগণ সাক্ষী দিবেন তাদের উম্মত তাদের প্রতি ঈমান এনে তাদের আনীত বিধান অনুসরণ করেছিলো কিনা। পবিত্র কুরআন ঘোষণা করছে-
وَإِذَا الرُّسُلُ أُقْتَتْ ط
যখন নবী-রাসূলদের সকলকে নির্ধারিত সময়ে (এক জায়গায়) একত্রিত করা হবে। (সূরা মুরসালাত-১১)
وَجَائَءَ بِالنَّبِيِّنَ وَالشُّهَدَاءِ وَقُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْحَقِّ وَهُمْ لَا يُظْلَمُوْنَ -
নবীদের ও অন্যান্য সাক্ষীদের এনে উপস্থিত করা হবে, তাদের সবার সাথে ন্যায়বিচার করা হবে, তাদের কারো ওপর জুলুম করা হবে না। (সূরা যুমার-৬৯)
নবী-রাসূলের আনীত বিধান মানুষ অনুসরণ করেছে কিনা এ ব্যাপারে কিয়ামতের দিন স্বয়ং নবী আল্লাহর দরবারে সাক্ষী দিবেন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
إِنَّا أَرْسَلْنَا إِلَيْكُمْ رَسُولاً لا شَاهِدًا عَلَيْكُمْ كَمَا أَرْسَلْنَا إِلَى فِرْعَوْنَ رَسُولًا
নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কাছে (তোমাদের কাজকর্মের) সাক্ষ্যদাতা হিসাবে একজন রাসূল পাঠিয়েছি, যেমনি করে ফিরআউনের কাছেও আমি একজন রাসূল পাঠিয়েছিলাম। (সূরা মুয্যাম্মিল-১৫)
নবী-রাসূলের দায়িত্ব হলো মানুষের কাছে মহান আল্লাহর বিধান পৌছে দেয়া আর মানুষের দায়িত্ব হলো নবী-রাসূলদের অনুসরণ করা। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُوْلَ جِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا عَلَيْهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيْكُم مَّا حُمِّلْتُمْ ط وَإِنْ تُطِيعُوهُ تَهْتَدُوا طَ وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَغُ الْمُبِينُ
(হে নবী) আপনি (এদের) বলে দিন, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, আনুগত্য করো আল্লাহর রাসূলের (হ্যাঁ), তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও (তাহলে জেনে রেখো), আল্লাহর দ্বীন পৌঁছানোর যে দায়িত্ব তার ওপর দেয়া হয়েছে তার জন্যে সে দায়ী, (অপরদিকে আনুগত্যের) যে দায়িত্ব তোমাদের ওপর দেয়া হয়েছে তার জন্যে তোমরা দায়ী, যদি তোমরা তার কথামতো চলো তাহলে তোমরা সঠিক পথ পাবে, রাসূলের কাজ হচ্ছে (আল্লাহর কথাগুলো) ঠিক ঠিক মতো পৌঁছে দেয়া। (সূরা আন্ নূর-৫৪)
মানুষ রাসূলের আনুগত্য করে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছে কিনা এ ব্যাপারে জবাবদীহী করতে হবে, রাসূলের আনুগত্য না করলে কারো পক্ষে শেষ বিচারের দিনে সফল হওয়া বা মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقْهِ فَأُولَائِكَ هُمُ الْفَائِزُوْنَ
যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর নাফরমানী করা থেকে বেঁচে থাকে, তারাই হচ্ছে সফলকাম। (সূরা আন্ নূর-৫২)
শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে তাঁর রাসূলের আনুগত্য না করলে এর পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। আল্লাহ তা'য়ালা বিষয়টি এভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছেন-
وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ جِ فَإِنْ عَصَوْكَ فَقُلْ إِنِّي بَرِيءٌ مِّمَّا تَعْمَلُوْنَ جِ
যে ব্যক্তি ঈমান নিয়ে আপনার অনুবর্তন করবে আপনি তার প্রতি স্নেহের আচরণ করুন, আবার যদি কেউ আপনার সাথে নাফরমানী করে তাহলে আপনি তাকে বলে দিন, তোমরা যে আচরণ করছো তার (পরিণামের) জন্যে আমি কিন্তু মোটেও দায়ী নই। (সূরা আশ্ শুআরা-২১৫-২১৬)
মুমিন হবার পূর্ব শর্তই হলো নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য করা, মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنْ كُنتُمْ مُّؤْمِنِينَ
আল্লাহ তা'য়ালা এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা সত্যিকার অর্থে মুমিন হয়ে থাকো। (সূরা আনফাল-১)
নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য থেকে মুহূর্তকালের জন্যেও মুখ ফিরিয়ে নেয়া যাবে না। শুধুমাত্র নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত এ ধরনের কিছু দিকে রাসূলের আনুগত্য করা হলো আর জীবনের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি ও অন্যান্য দিকে অন্য করো আনুগত্য করা হবে, এ ধরনের সুযোগ ইসলামে নেই। প্রত্যেক মুহূর্তে এবং জীবনের সকল দিক ও বিভাগে কেবলমাত্র নবী করীম (সা:) এরই আনুগত্য করতে হবে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَوَلَّوْا عَنْهُ وَأَنْتُمْ تَسْمَعُوْنَ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ তা'য়ালা ও রাসূলের আনুগত্য করো, কখনো তাঁর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না, বিশেষ করে যখন তোমরা সব কিছু শুনতেই পাচ্ছো। (সূরা আনফাল-২০)
পবিত্র কুরআনে যেখানেই মহান আল্লাহর আনুগত্য করার আদেশ দেয়া হয়েছে, সাথে সাথেই রাসূলেরও আনুগত্য করার আদেশ দেয়া হয়েছে। নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য না করে নিজেরা পরস্পরে মতপার্থক্য ও নানা দল উপদলে বিভক্ত হবার পরিণতি হলো বর্তমান পৃথিবীতে মুসলমানরা সবথেকে বেশি লাঞ্ছিত ও অপমানিত। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا طَ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
তোমরা আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, নিজেদের মধ্যে পরস্পর ঝগড়া বিবাদ করো না, অন্যথায় তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের প্রতিপত্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। (সূরা আনফাল-৪৬)
মহান আল্লাহকে ভয় করার এবং মুমিন হবার অনিবার্য দাবী হলো নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য করা। মুখে আল্লাহর আনুগত্যের ঘোষণা দিয়ে রাসূল (সা:) এর আনুগত্য থেকে বিরত থাকার অর্থ নিজেকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করা। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُوْلَ وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, আনুগত্য করো রাসূলের, (বিদ্রোহ করে) কখনো তোমরা নিজেদের কাজকর্ম বিফলে যেতে দিয়ো না। (সূরা মুহাম্মাদ-৩৩)
নবী করীম (সা:) যা কিছু আদেশ করেন তা থেকে বিরত থাকা এবং তিনি যা করতে আদেশ করেন তা অবশ্যই পালন করা ঈমানের মূল ভিত্তি আর এ বিষয়টি সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوهُ قِ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا جِ وَاتَّقُوا اللَّهَ طَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
আল্লাহর রাসূল তোমাদের যা কিছু অনুমতি দেয় তা তোমরা গ্রহণ করো এবং তিনি যা কিছু নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো। (সূরা হাশর-৭)
আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি ঈমান আনার সাথে শর্তযুক্ত করা হয়েছে নবী করীম (সা:) এর প্রতি ঈমান আনা। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ جِ وَإِن تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوْا فَلَكُمْ أَجْرٌ عَظِيمٌ
তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করো, তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে ঈমান আনো এবং নিজেরা সাবধান হয়ে চলতে পারো, তাহলে তোমাদের জন্যে মহাপুরস্কার রয়েছে। (সূরা আলে ইমরান-১৭৯)
মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার বিষয়টি নবী করীম (সা:) এর প্রতি ঈমান আনার সাথে শর্তযুক্ত করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُوْلِهِ -
(খাঁটি ঈমানদার তো হচ্ছে তারা,) যারা আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান আনে। (সূরা আন্ নূর-৬২)
মহান আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে যে সকল আয়াতে তাঁর প্রতি ঈমান আনার জন্যে নির্দেশ দিয়েছেন পাশাপাশি নবী করীম (সা:) এর প্রতিও ঈমান আনার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُوْلِهِ وَالنُّوْرِ الَّذِي أَنزَلْنَا طَ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِيرٌ -
অতএব তোমরা আল্লাহ তা'য়ালা, তাঁর রাসূল এবং আমি যে আলো (কুরআন) তোমাদের দিয়েছি তার ওপর ঈমান আনো, তোমরা যা কিছুই করো না কেনো আল্লাহ তা'য়ালা তা ভালো করেই জানেন। (সূরা তাগাবুন-৮)
পবিত্র কুরআনের এ ধরনের বহু আয়াত প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি ঈমান আনার সাথে সাথে নবী করীম (সা:)-এর প্রতি ঈমান আনাও বাধ্যতামূলক এবং আল্লাহর আনুগত্যের প্রশ্নেও রাসূল (সা:)-এর মর্যাদা মহান আল্লাহ এতটাই বৃদ্ধি করে দিয়েছেন যে, নবী করীম (সা:)-এর আনুগত্য করার অর্থই হচ্ছে মহান আল্লাহর আনুগত্য করা। আর তাঁর নাফরমানী করার অর্থই হলো আল্লাহ তা'য়ালার নাফরমানী করা। এ প্রসঙ্গে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে-
وَ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهُ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ عَصَى اللَّهِ -
হযরত আবু হুরাইরা (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করলো সে আল্লাহ তা'য়ালারই আনুগত্য করলো (পক্ষান্তরে) যে ব্যক্তি আমার সাথে নাফরমানী করলো সে আল্লাহ তা'য়ালার সাথেই নাফরমানী করলো। (বুখারী, মুসলিম)
যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে অথচ নবী করীম (সা:)-এর আনুগত্য করে না, তাদেরকে পবিত্র কুরআন কাফির বলে আখ্যায়িত করেছে। কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা ঘোষণা করেছেন-
قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ جِ فَإِن تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ
(হে রাসূল) আপনি বলুন, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথা মেনে চলো, এ আহ্বান সত্ত্বেও তারা যদি এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, (আপনি জেনে রাখুন) আল্লাহ তা'য়ালা কখনো কাফিরদের পছন্দ করেন না। (সূরা আলে ইমরান-৩২)
মহান আল্লাহকে ভালোবাসার পূর্ব শর্ত এবং নিজের গোনাহ মহান আল্লাহ তা'য়ালার কাছ থেকে ক্ষমা করিয়ে নেয়ার পূর্ব শর্তও নবী করীম (সা:) এর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য করা। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
قُلْ إِنْ كُنتُمْ تُحِبُّوْنَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
(হে নবী) আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার কথা মেনে চলো, তাহলে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তিনি তোমাদের গোনাহ ক্ষমা করে দিবেন। (সূরা আলে ইমরান-৩১)
📄 নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য পরিহারকারী মুমিন নয়
মহান আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি বিশ্বাস ও নবী করীম (সা:) এর প্রতি বিশ্বাস মুখে ঘোষণা করার পর কোনো ব্যক্তি যদি নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য না করে তাহলে সে ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম দাবী করলেও মহান আল্লাহর কুরআনের ভাষায় সে ব্যক্তি মুসলিম নয়। কারণ আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে যে সর্বোচ্চ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন, সে মর্যাদার সাথে কোনো ব্যক্তির মুসলিম থাকা বা না থাকার বিষয়টিও জড়িত। তাঁকে সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রদর্শন করে তাঁর আনুগত্য যে ব্যক্তি করবে, সে ব্যক্তিকেই পবিত্র কুরআন মুসলিম হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে এবং যে ব্যক্তি তাঁর আনুগত্য করবে না তথা তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করবে না, সে ব্যক্তি মুসলিম নয়। যে ব্যক্তি নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য করে সে প্রকৃত পক্ষে মহান আল্লাহরই আনুগত্য করে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
مَّنْ يُطِعِ الرَّسُوْلَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ ج وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيْظًا -
যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করে সে (যেন) আল্লাহরই আনুগত্য করে, আর যে ব্যক্তি (তাঁর আনুগত্য থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের ওপর আমি আপনাকে প্রহরী বানিয়ে পাঠাইনি। (সূরা আন্ নিসা-৮০)
সমগ্র সৃষ্টিজগৎ ও সৃষ্টিসমূহের যিনি মালিক, তিনি বলছেন 'আমার রাসূলের আনুগত্য করার অর্থই হলো আমার আনুগত্য করা'। নবী করীম (সা:) সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা'য়ালার বলা অন্যান্য সকল কথা একদিকে রেখে শুধুমাত্র উল্লেখিত আয়াতের কথাগুলোর প্রতি স্কুল দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই অনুধাবন করা যায় যে, আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর মহান নবীকে মর্যাদার কোন্ সোপানে উপনীত করেছেন। রাব্বুল আলামীন তাঁকে সৃষ্টিসমূহের মধ্যে এমনই অতুলনীয় মর্যাদা দান করেছেন যে, তাঁর আনুগত্য করার বিষয়টিকে তিনি নিজের আনুগত্য করার সাথে একাকার করে দিয়েছেন। তাঁর প্রতি বিদ্রোহ করার অর্থ মহান আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ করা বলে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা ঘোষণা দিয়েছেন।
নবী করীম (সা:) নবুয়্যাত লাভ করার পর থেকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পৃথিবীতে জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে মানব জাতিকে যে সিদ্ধান্তসমূহ দান করেছেন তা নিঃশর্তভাবে মেনে নিয়ে অনুসরণ করা মানব জাতির জন্যে অবশ্যকর্তব্য। সৃষ্টিসমূহের মধ্যে মর্যাদাগত কারণে নবী করীম (সা:) এর পবিত্র মুখ থেকে একবার যে কোনো বিষয়ে যে রায় ঘোষিত হয়েছে, তার সাথে দ্বিমত পোষণ করার ন্যূনতম অধিকারও কোনো মানুষকে দেয়া হয়নি। তিনি যা কিছু আদেশ নিষেধ করেছেন এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন তোলার অধিকারও কোনো মানুষকে দেয়া হয়নি। অকুণ্ঠ চিত্তে নিঃশর্তভাবে সন্তুষ্টির সাথে মেনে নিতে হবে। নিরুপায় হয়ে অসন্তুষ্টির সাথে কেউ যদি নবী করীম (সা:) এর কোনো আদেশ নিষেধ অনুসরণ করে বা মেনে নেয় তাহলে তার ঈমানের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করার অবকাশ রয়েছে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর রাসূল (সা:) এর অতুলনীয় মর্যাদার বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়ে ঘোষণা করেছেন-
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا -
(হে নবী) না, আমি আপনার মালিকের শপথ করে বলছি, এরা কিছুতেই ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের যাবতীয় মতবিরোধের ফয়সালায় আপনাকে (শর্তহীনভাবে) বিচারক মেনে নিবে, অতপর আপনি যা ফয়সালা করবেন সে ব্যাপারে তাদের মনে আর কোনো দ্বিধা-দ্বন্দু থাকবে না, বরং আপনার সিদ্ধান্ত তারা সর্বান্তকরণে মেনে নিবে। (সূরা আন্ নিসা-৬৫)
স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা নিজের শপথ করে ঘোষণা করেছেন, কোনো মানুষের পক্ষে ঈমানদার হওয়া তথা মুসলিম হওয়া কোনোক্রমেই সম্ভব নয়, যতক্ষণ সে ব্যক্তি জীবনের সকল ক্ষেত্রে নবী করীম (সা:) এর পেশ করা জীবন বিধান মেনে না নিবে। অর্থাৎ রাসূল (সা:) এর দেয়া সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া না নেয়ার ওপর মানুষের মুসলিম হওয়া তথা ঈমান নির্ভর করে। নবী করীম (সা:) মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগে যা কিছু প্রয়োজন সকল বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দান করেছেন। মুসলিম দাবীদার কোনো নারী-পুরুষকে সামান্যতম অধিকার দেয়া হয়নি যে, সে আল্লাহর রাসূলের দেয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণে ও বাস্তবায়নে অনীহা প্রকাশ করবে বা মেনে না নেয়ার লক্ষ্যে কোনো কূট কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করবে। কেউ যদি এমন করে তাহলে বুঝতে হবে, নবী করীম (সা:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা যে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেছেন, সে ব্যক্তি তাঁর উক্ত মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলো না।
কোনো মানুষ যদি রাজনীতি, অর্থনীতি, স্বরাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, শিক্ষানীতি, শ্রমনীতি, ভূমি ও রাজস্বনীতি, বিচারনীতি, সমরনীতি, শিল্প ও বাণিজ্যনীতি, বিবাহনীতিসহ যাবতীয় নীতিমালার ক্ষেত্রে নবী করীম (সা:) এর পেশকৃত নীতিমালা পরিহার করে অন্য কারো নীতিমালা অনুসরণ করে এবং শুধুমাত্র নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ইত্যাদি ক্ষেত্রে নবী করীম (সা:) এর সিদ্ধান্ত মেনে নেয় এবং সেই ব্যক্তিকে আল্লামা-মাওলানা, আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ নামে খ্যাত লোকজনও যদি 'পরহেজগার মুসলিম' বলে, ঘোষণা দেয়, তবুও সে ব্যক্তি মুসলিম নয়। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَّلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُوْنَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ط وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا -
যখন আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূল কোনো ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষনা করেন তখন কোনো মুমিন পুরুষ ও কোনো মুমিন নারীর এ অধিকার নেই যে, তারা সে ব্যাপারে নিজেদের এখতিয়ার প্রয়োগ করবে, যে কেউই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করবে সে নিঃসন্দেহে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত হয়ে যাবে। (সূরা আল আহযাব-৩৬)
যদিও উল্লেখিত আয়াত হযরত যয়নব ও হযরত যায়েদ (রা:)-এর বিয়ে উপলক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছিলো, কিন্তু আয়াতে বর্ণিত বিধান কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুসলিম নর-নারীর জন্যেই প্রযোজ্য। মুসলিম হওয়ার অর্থ বা মুসলিম হিসাবে দাবী করার মর্মার্থই হলো, জীবনের সকল ইচ্ছা-অনিচ্ছা, পছন্দ-অপছন্দ, স্বাধীনতা, দৃষ্টিভঙ্গি, মতামত, রুচি- অভ্যাসসহ সকল কিছু মহান আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূল (সা:) এর সিদ্ধান্তের অধীন করে দেয়া।
নিজের জীবনের ক্ষুদ্র পরিসর থেকে সূচনা করে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের বৃহত্তর পরিসরে সকল ক্ষেত্রে আনুগত্যের মাথানত করে দিতে হবে কেবলমাত্র নবী করীম (সা:) এর আনীত বিধানের সম্মুখে। মসজিদে বা নামাজে কিছু সময় ব্যয়ের ক্ষেত্রে মুসলিম হওয়া আর রাজনৈতিক ময়দানে বা পার্লামেন্টে জীবিত বা মৃত নেতার গোলামী করা, এ দু'টো সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী বিষয়। সকল ক্ষেত্রে গোলামীর মস্তক অবনত থাকতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহর সম্মুখে এবং নবী করীম (সা:) কে একমাত্র আদর্শ নেতা মেনে তাঁকেই অনুসরণ করতে হবে।
যে ব্যক্তি মুসলমান হিসাবে পৃথিবীতে জীবন যাপন ও আখিরাতের ময়দানে মুসলিম হিসাবে মহান মালিক আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান হতে চায়, তাকে অবশ্য অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সিদ্ধান্তের সম্মুখে আনুগত্যের মস্তক নত করে দিতেই হবে। মত প্রকাশ বা বাক স্বাধীনতার নামে যারা দম্ভ অহঙ্কারের চূড়ায় অবস্থান করতে চায়, মুসলিম হিসাবে দাবী করার তাদের কোনো অধিকার নেই বরং তারা স্বঘোষিত মুনাফিক।
📄 নবী করীম (সা:) এর প্রতি শত্রুদের অভিযোগ, জবাব দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা!
পৃথিবীতে প্রেরিত নবী-রাসূলদের প্রতি সমকালীন লোকদের মধ্যে যারা বিরোধিতা করেছে তারা আল্লাহ তা'য়ালা কর্তৃক প্রেরিত হিদায়াতকারীদের প্রতি নানা ধরনের কল্পিত অভিযোগ আরোপ করার বৃথা চেষ্টা করেছে। শুধু কল্পিত বিশেষণই আরোপ করেনি, নবী-রাসূলদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতেও তারা দ্বিধাবোধ করেনি। মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করার ও সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্যে যে মানুষগুলোকে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নির্বাচিত করে প্রেরণ করতেন, তাঁদের প্রতি মানুষ যে বর্বর আচরণ করতো সে কারণে আল্লাহ তা'য়ালা আফসোস করে বলেছেন-
يَا حَسْرَةً عَلَى الْعِبَادِ عِ مَا يَأْتِيهِم مِّنْ رَّسُوْلٍ إِلَّا كَانُوْا بِهِ يَسْتَهْزِؤُوْنَ
বড়োই আফসোস (এমন সব) বান্দাদের ওপর, তাদের কাছে এমন একজন রাসূলও আসেননি, যাদের তারা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেনি! (সূরা ইয়াছিন-৩০)
নবী করীম (সা:) এর পূর্বে যে সকল নবী-রাসূলদের প্রতি সমকালীন লোকজন ব্যঙ্গ-বিদ্রুপসহ নানা ধরনের কল্পিত অভিযোগ আরোপ করতো, এসবের জবাব স্বয়ং উক্ত নবী-রাসূলগণই দিতেন। হযরত নূহ (আ:)-এর প্রতি তাঁর জাতির নেতৃস্থানীয় লোকজন অভিযোগ করলো-
قَالَ الْمَلَأُ مِنْ قَوْمِهِ إِنَّا لَنَرَاكَ فِي ضَلَالٍ مُّبِيْنٍ
তার জাতির নেতারা বললো (হে নূহ), আমরা দেখতে পাচ্ছি তুমি এক সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় (নিমজ্জিত) রয়েছো। (সূরা আল আ'রাফ-৬০)
আল্লাহ তা'য়ালা হযরত নূহ (আ:) কে এক পথহারা জাতির কাছে প্রেরণ করলেন সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্যে, আর সেই জাতির নেতৃস্থানীয় লোকজন নিজেদের নেতৃত্ব হারানোর আতঙ্কে হযরত নূহ (আ:) এর প্রতিই অভিযোগ করলো যে, 'তুমি নিজেই ভুল পথে রয়েছো এবং জাতিকেও ভুল পথের দিকেই ডাকছো'।
আল্লাহ তা'য়ালা হযরত নূহ (আ:) কে প্রেরণ করলেন কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর প্রেরিত নবীর শত্রুদের আরোপিত অভিযোগের জবাব দিলেন না, জবাব দিলেন স্বয়ং সেই নবী। জবাবে হযরত নূহ (আ:) জাতীয় নেতৃবৃন্দকে বললেন- قَالَ يَا قَوْمِ لَيْسَ بِي ضَلَالَةٌ وَلَكِنِّي رَسُوْلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعَالَمِينَ
সে বললো, হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা, আমার মধ্যে কোনোই পথভ্রষ্টতা নেই, আমি তো হচ্ছি সৃষ্টিকুলের মালিক আল্লাহর পক্ষ থেকে (আসা) একজন রাসূল। (সূরা আ'রাফ-৬১)
হযরত হূদ (আ:) কে আল্লাহ তা'য়ালা প্রেরণ করলেন চরম ক্ষতির দিকে ধাবমান এক জাতির কাছে। তিনি সেই জাতিকে মহাক্ষতি থেকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যে সীমাহীন প্রচেষ্টা শুরু করলেন। জাতির নেতৃবৃন্দ নিজেদের নেতৃত্বের আসন টলটলায়মান হতে দেখে আল্লাহ নবী হযরত হূদ (আ:) এর প্রতি অভিযোগ আরোপ করলো- قَالَ الْمَلَأُ الَّذِيْنَ كَفَرُوا مِن قَوْمِهِ إِنَّا لَنَرَاكَ فِي سَفَاهَةٍ وَإِنَّا لَنَظُنُّكَ مِنَ الْكَاذِبِينَ
তার জাতির নেতৃবৃন্দ, যারা (তাকে) অস্বীকার করেছে, তারা বললো, আমরা তো দেখছি তুমি নির্বুদ্ধিতায় লিপ্ত আছো এবং আমরা মনে করি তুমি মিথ্যাবাদীদেরই একজন। (সূরা আল আ'রাফ-৬৬)
আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে বলছেন হযরত হূদ (আ:) এ অভিযোগের জবাব কিভাবে দিয়েছিলেন- قَالَ يَا قَوْمِ لَيْسَ بِي سَفَاهَةٌ وَلَكِنِّي رَسُوْلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعَالَمِينَ
সে বললো, হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা, আমার সাথে কোনোরকম নির্বুদ্ধিতা জড়িত নেই, বরং আমি (হচ্ছি) সৃষ্টিকুলের মালিক আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে (আগত) একজন রাসূল। (সূরা আল আ'রাফ-৬৭)
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নবী-রাসূলগণের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে প্রমাণ হয় যে, তাদের প্রতি সমকালীন লোকজন যে সকল অভিযোগ আরোপ করেছেন এবং তাদের ব্যাপারে কল্পিত যেসব আপত্তি উত্থাপন করেছে তার জবাব নবী-রাসূলগণ স্বয়ং দিয়েছেন। ব্যতিক্রম শুধুমাত্র নবী করীম (সা:) এর ক্ষেত্রে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন বিধায় সমকালীন বিরোধিগণ তাঁর পবিত্র সত্তার প্রতি যেসকল ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপন করেছে এবং যেসব কল্পিত বিশেষণে বিশেষিত করার অপচেষ্টা করেছে, এসব কিছুর জবাব দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। ইসলামী আন্দোলনের শত্রুরা নবী করীম (সা:) সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে বুঝানোর চেষ্টা করতো যে, এ লোকটি পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছে। তাদের এ অপবাদের জবাব নবী করীম (সা:) দিবেন, আল্লাহ তা'য়ালা তা পছন্দ করলেন না। স্বয়ং তিনি এভাবে জবাব দিলেন-
مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوى ط
তোমাদের সাথী পথ ভুলে যায়নি, সে পথভ্রষ্টও হয়নি। (সূরা আন নাজম-২)
ইসলামী জীবন বিধানের প্রতিপক্ষগণ নবী করীম (সা:)-কে গণবিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে তাঁকে সর্বসাধারণের কাছে উন্মাদ হিসাবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা করে প্রচার করেছে, 'মুহাম্মাদ (সা:)-এর মস্তিষ্কে ত্রুটি দেখা দিয়েছে, তিনি সুস্থ নন বরং পাগল হয়ে গিয়েছেন'। শত্রুদের এসব কল্পনাপ্রসূত অভিযোগের জবাব স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা শপথের মাধ্যমে দিয়েছেন-
وَالْقَلَمِ وَمَا يَسْطُرُوْنَ لا مَا أَنتَ بِنِعْمَةِ رَبِّكَ بِمَجْنُوْنَ
শপথ (লেখার মাধ্যম) কলমের, (আরো শপথ এ কলম দিয়ে) তারা যা লিখে রাখছে তার, আপনার মালিকের (অসীম) দয়ায় আপনি পাগল নন। (সূরা কালাম-১-২)
পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকে নবী করীম (সা:) যাদের মাঝে নিজের শৈশব, কৈশর, তারুণ্য ও যৌবন অতিক্রম করে চল্লিশ বছরে পদার্পণ করলেন, তারাই তো তাঁকে ভালোভাবে চিনেছে এ মানুষটি কেমন। চিনেছে বলেই তারা তাঁকে পরম শ্রদ্ধাভরে উপাধি দিয়েছে 'আল আমীন বা বিশ্বাসী'। নবী করীম (সা:) এর ইসলামী আন্দোলনের ঢেউ যখন তাদের প্রতিষ্ঠিত স্বার্থে আঘাত হানলো, তখন তারাই আল্লাহর রাসূল (সা:) কে পাগল হিসাবে আখ্যায়িত করার লক্ষ্যে প্রচার শুরু করলো। তিনি পাগল নন অথবা সকলের তুলনায় সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী এ কথা তারাই ভালো জানতো, যারা তাঁর প্রতি এ ঘৃণ্য অভিযোগ আরোপ করার চেষ্টা করছে। তারা অপবাদ দিয়েছে-
وَقَالُوا يَا أَيُّهَا الَّذِي نُزِّلَ عَلَيْهِ الذِّكْرُ إِنَّكَ لَمَجْنُونٌ طَ
তারা বলে, ওহে- যার ওপর কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে- তুমি অবশ্যই একজন উন্মাদ ব্যক্তি। (সূরা হিজর-৬)
স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা অভিযোগকারীদের লক্ষ্য করে জবাব দিলেন- وَمَا صَاحِبُكُمْ بِمَجْنُوْنٍ جِ তোমাদের সাথী (কিন্তু) পাগল নয়। (সূরা তাকবীর-২২)
দুশমনরা সাধারণ মানুষকে পবিত্র কুরআন থেকে দূরে রাখার লক্ষ্যে প্রচার করেছে, মুহাম্মাদ (সা:) আল্লাহ তা'য়ালার বাণী বলে যা দাবী করছেন তা মোটেও সত্য নয়, বরং এসব তাঁর নিজের রচনা করা কথা। শত্রুদের এসব অপবাদের জবাব স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা এভাবে দিয়েছেন- وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى طَ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى لا সে কখনো নিজের থেকে কোনো কথা বলে না, বরং তা হচ্ছে ওহী যা (তার কাছে) পাঠানো হয়। (সূরা আন নাজম-৩-৪)
দুশমনদের কেউ কেউ অভিযোগ কয়েছে, মুহাম্মাদ (সা:) যে সকল কথা কুরআন বলে প্রচার করছে তা আল্লাহ তা'য়ালা অবতীর্ণ করেননি, বরং শয়তান এসব কথা তাঁকে দিয়ে বলাচ্ছে। শত্রুদের এসব ভিত্তিহীন কথার জবাব আল্লাহ তা'য়ালা দিয়েছেন- وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَيْطَانٍ رَحِيمٍ لا এটা অভিশপ্ত শয়তানের কথাও নয়। (সূরা তাকবীর-২৫)
শত্রুপক্ষ প্রশ্ন তুলেছে, 'মুহাম্মাদ (সা:) একজন শ্রেষ্ঠ কবি অথবা তিনি উচ্চপর্যায়ের একজন গণক বা জ্যোতিষী'। তাদের এসব প্রশ্নের জবাব নবী করীম (সা:) দিতে গিয়ে সামান্যতম কষ্টানুভব করবেন আল্লাহ তা'য়ালা তা বরদাস্ত করেননি। তিনি স্বয়ং জবাব দিলেন- فَلَا أُقْسِمُ بِمَا تُبْصِرُوْنَ لا وَمَا لَا تُبْصِرُوْنَ لا إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُوْلٍ كَرِيمٍ جِ لَا وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرِط قَلِيْلًا مَّا تُؤْمِنُوْنَ لا وَلَا بِقَوْلِ كَاهِنِ طَ قَلِيْلًا مَّا تَذَكَّرُوْنَ طَ تَنْزِيلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعَالَمِينَ তোমরা যা কিছু দেখতে পাও আমি তার শপথ করে বলছি, (আরো শপথ করছি) সেসব বস্তুর যা তোমরা দেখতে পাও না, নিঃসন্দেহে এ কিতাব একজন সম্মানিত রাসূলের (আনীত) বাণী, এটা কোনো কবির কাব্যকথা নয়; যদিও তোমরা খুব কমই বিশ্বাস করো, এটা কোনো গণক বা জ্যোতিষীর কথাও নয়; যদিও তোমরা খুব কমই বিবেক-বিবেচনা করে চলো; (মূলত) এ কিতাব বিশ্বজগতের মালিক আল্লাহ তা'য়ালার কাছ থেকেই (তাঁর রাসূলের ওপর) অবতীর্ণ করা হয়েছে। (সূরা আল হাক্কাহ্ ৩৮-৪৩)
মহান আল্লাহ তা'য়ালার দ্বীনের বিরোধিগণ জনসাধারণকে বুঝাতো, 'মুহাম্মাদ (সা:) একজন পথহারা কবি এবং এমন একজন পথভ্রষ্ট কবিয়ালের কথায় কি শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যাপী যাদেরকে নিজের উপাস্য দেবতা হিসাবে পূজা দিয়ে আসছি, তাদেরকে কি আমরা ত্যাগ করতে পারি?' তাদের এসব উদ্ভট কথার জবাব আল্লাহ তা'য়ালা এভাবে দিয়েছেন-
وَيَقُولُوْنَ أَنَّا لَتَارِكُوْا آلِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَّجْنُوْنَ ط بَلْ جَاءَ بِالْحَقِّ وَصَدَّقَ الْمُرْسَلِينَ
এরা বলতো, আমরা কি একজন পাগল কবিয়ালের কথায় আমাদের মাবুদদের (আনুগত্য) ছেড়ে দিবো? (অথচ আমার নবী কোনো কাব্য নিয়ে আসেনি,) বরং তিনি এসেছেন সত্য (দ্বীন) নিয়ে এবং তিনি (আগের) নবীদের সত্যতাও স্বীকার করছেন। (সূরা আছ ছাফ্ফাত-৩৬-৩৭)
মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রদান করেছেন এবং মর্যাদার সাথে সঙ্গতি রেখে বিরোধিদের উত্থাপিত অভিযোগের জবাবে বলেছেন-
فَذَكِّرْ فَمَا أَنْتَ بِنِعْمَتِ رَبِّكَ بِكَاهِنِ وَلَا مَجْنُوْنَ
অতএব (হে নবী, মানুষদের) আপনি এ দিনের কথা স্মরণ করাতে থাকুন, আল্লাহ তা'য়ালার অনুগ্রহে আপনি কোনো গণক নন, আবার আপনি কোনো পাগলও নন (আপনি হচ্ছেন তাঁর বাণী বহনকারী একজন রাসূল মাত্র)। (সূরা আত তুর-২৯)
নবী করীম (সা:) এর মর্যাদার সাথে কাব্য রচনা সঙ্গতিপূর্ণ নয়, এ বিষয়টি মানুষের কাছে স্পষ্ট তুলে ধরে মহান আল্লাহ তা'য়ালা ঘোষণা করলেন-
وَمَا عَلَّمْنَاهُ الشِّعْرَ وَمَا يَنبَغِي لَه طَ إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ وَقُرْآنٌ مُّبِينٌ
(তোমরা এও জেনে রেখো,) আমি এ (রাসূল)-কে কাব্য (রচনা) শেখাইনি এবং এটা তার (নবী মর্যাদার) পক্ষে শোভনীয়ও নয়; (আর তার আনীত গ্রন্থ) তা হচ্ছে একটি উপদেশ ও সুস্পষ্ট কুরআন। (সূরা ইয়াছিন-৬৯)
নবী-রাসূলদের অস্বীকারকারীগণ তাদেরই অনুরূপ আরেকজন মানুষকে নবী-রাসূল হিসাবে দাবী করতে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতো। তাদের ধারণা ছিলো, নবী- রাসূলগণ হবেন মানুষ প্রজাতির বাইরের কেউ এবং নিতান্তই যদি সে মানুষ হয় তাহলে তো তাঁর সাথে অবশ্যই আল্লাহ তা'য়ালা একজন ফিরিশতা পাঠাবেন এবং তিনি নবী-রাসূলকে সাধারণ মানুষের কাছে এভাবে পরিচয় করিয়ে দিবেন যে, 'তিনি আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে প্রেরিত, তোমরা তাঁর অনুসরণ করো। যদি তাঁর অনুসরণ না করো তাহলে তোমাদের ওপর আযাব নিপতিত হবে'। এ ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা প্রশ্ন তুলতো, 'এ আবার কেমন নবী-রাসূল যে, তিনি আমাদের মতোই মানুষ এবং আমাদের মধ্যে যে মানবীয় গুণ-বৈশিষ্ট রয়েছে একজন নবীর মধ্যেও তা রয়েছে'।
নবী করীম (সা:) এর সম্পর্কে যখন অজ্ঞ লোকজন এমন প্রশ্ন তুললো, 'এ আবার কেমন (ধরনের) রাসূল যে (আমাদের মতো করেই) খাবার খায় এবং (আমাদের মতোই) হাটে বাজারে চলাফেরা করে। কেনো তাঁর সাথে কোনো ফিরিশতা নাযিল করা হলো না যে, তার সাথে (আযাবের) সতর্ককারী হয়ে থাকবে!' অস্বীকারকারীদের এসব উদ্ভট প্রশ্নের জবাবে মহান আল্লাহ বলেন-
وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِنَ الْمُرْسَلِينَ إِلَّا إِنَّهُمْ لَيَأْكُلُوْنَ الطَّعَامَ وَيَمْشُوْنَ فِي الْأَسْوَاقِ ط وَجَعَلْنَا بَعْضَكُمْ لِبَعْضٍ فِتْنَةٌ طَ أَتَصْبِرُوْنَ جِ وَكَانَ رَبُّكَ بَصِيرًاع
(হে নবী) আপনার পূর্বে আমি আরো যতো রাসূল প্রেরণ করেছি, তারা (মানুষের মতোই) আহার করতো, (অন্য মানুষদের মতোই) তারা হাটে বাজারে যেতো (আসল কথা হচ্ছে) মানুষদের মধ্য থেকে রাসূল পাঠিয়ে আমি তোমাদের একজনকে আরেকজনের জন্য পরীক্ষার (উপকরণ) বানিয়েছি; (এ পরীক্ষায়) তোমরা কি ধৈর্য ধারণ করবে না? তোমার মালিক (কিন্তু তোমাদের) সবকিছুই দেখছেন। (সূরা আল ফুরকান-২০)