📄 নবী করীম (সা:) এর সর্বশ্রেষ্ঠ মু'জিযা
নবী করীম (সা:) কে আল্লাহ তা'য়ালা যেসকল মু'জিযা দান করে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন তার মধ্যে পবিত্র কুরআন মাজীদ হলো সর্বশ্রেষ্ঠ মু'জিযা। তিনি প্রায় চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বে পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করেছেন, কিন্তু তাঁর আনীত কুরআন অবিকৃতই রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত অবিকৃতই থাকবে ইনশাআল্লাহ। কুরআন নামক যে শ্রেষ্ঠ মু'জিযা আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে দান করেছিলেন, সে কুরআন পৃথিবী ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকবে। কুরআনের পূর্বে যে সকল কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছিলো, যেসব ভাষায় তা অবতীর্ণ করা হয়েছিলো সেসব ভাষার অস্তিত্বও পৃথিবী থেকে বহু পূর্বে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। ধর্মগ্রন্থের নামে যেসব কিতাব বর্তমান পৃথিবীতে প্রদর্শন করা হয়, এসব গ্রন্থের মধ্যে স্রষ্টার অবতীর্ণ করা শব্দ কোন্টি তা নির্ণয় করতে সক্ষম এমন কেউ ঐসব ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেও নেই। বিকৃতি ঘটিয়ে এসব গ্রন্থের বিষয়বস্তু এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে যে, প্রকৃত সত্য জানার কোনো উপায়ই নেই।
পৃথিবীতে এমন একটি গ্রন্থেরও অস্তিত্ব নেই, যে গ্রন্থের দাড়ি, কমা, সেমিক্লোন মুখস্থ করে রাখা যেতে পারে। ব্যতিক্রম শুধু পবিত্র কুরআনের ক্ষেত্রে। কুরআন নামক সুবিশাল এ অলৌকিক গ্রন্থটি যাঁর ওপর অবতীর্ণ করা হলো, তাঁকে বলা হয়েছিলো, 'আপনি শুধু শুনুন, আপনার হৃদয়পটে এ কুরআন অঙ্কিত করার দায়িত্ব আমার এবং এর ব্যাখ্যা জানিয়ে দেয়ার দায়িত্বও আমার'।
নবী করীম (সা:) শুধু কুরআন শুনলেন, মাত্র একবার শোনার সাথে সাথেই তিনি তা হুবহু তিলাওয়াত করার মর্যাদা অর্জন করলেন এবং উপস্থিত লোকদেরকে তা তিলাওয়াত করে শুনিয়ে দিলেন। আল্লাহ প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ মু'জিযা মহাগ্রন্থ আল কুরআন। তাঁর মুখ থেকে সমকালীন নারী-পুরুষ যাঁরাই এ কুরআন শুনলেন তাঁরাই এ গ্রন্থটি হুবহু মুখস্থ করলেন।
সেই ধারাবাহিকতায় বিগত চৌদ্দশত বছরব্যাপী অসংখ্য অগণিত নারী-পুরুষ এ কুরআন স্মৃতিতে ধারণ করেছে, বর্তমানেও করছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত করতে থাকবে। এ কুরআন এক জীবন্ত মু'জিযা এবং এই বিস্ময়কর কিতাব যাঁর প্রতি অবতীর্ণ করা হলো, তিনিই এ কিতাব সম্পর্কে মন্তব্য করলেন-
لَا تُحْصَى عَجَائِبُه وَلَا تُبْلَى غَرَائِبُه فِيْهِ مَصَابِيحُ الْهُدَى وَمَنَارِ الْحِكْمَةِ
'এ কুরআন কখনো পুরাতন বা জীর্ণ হবে না, এর আশ্চর্য ধরনের বিস্ময়কারিতা কখনো শেষ হবে না, কুরআন হচ্ছে হিদায়াতের মশাল এবং এই কিতাব জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সুউচ্চ মিনার যেনো কূল-কিনারাহীন এক অগাধ জলধী। এর ভেতরে রয়েছে অফুরন্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের তত্ত্ব ও অনায়ত্ব অসংখ্য দিক-দিগন্ত। মানবীয় অনুসন্ধিৎসা অফুরন্ত এই জ্ঞান-ভাণ্ডার থেকে নিত্য-নতুন তত্ত্ব উদ্ধার করতে সক্ষম। প্রত্যেক অনুসন্ধানেই প্রতিটি যুগের সুক্ষ্ম চিন্তাবিদ ও গবেষকগণ মানব জীবনের জন্য যুগোপযোগী আইন-বিধান ও তত্ত্ব উদ্ধার করতে সক্ষম হবেন, যদি তাঁরা প্রতিটি পর্যায়ে অভ্রান্ত পথে দৃঢ় থাকেন'।
এটা সেই বিস্ময়কর কিতাব যা নিজেই নিজের ব্যাখ্যা প্রদান করে। এই কুরআন নামক জীবন্ত মু'জিযা থেকে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তা অবশ্যই সত্য সঠিক এবং বক্রতামুক্ত। নবী করীম (সা:) বলেছেন-
مَنْ قَلَ بِهِ صَدَقَ وَ مَنْ عَمِلَ بِهِ أُجِرَ وَ مَنْ حَكَمَ بِهِ عَدَلَ وَ مَنْ دَعَا إِلَيْهِ هُدِى إِلَى صِرَاطِ الْمُسْتَقِيمَ
'এই কুরআন থেকে যে লোক কথা বলে সে সত্য কথা বলে। যে এর ওপর আমল করবে সে প্রতিদান লাভ করবে। যে এর সাহায্যে বিচার-মীমাংসা করবে সে ন্যায় বিচার করবে। যে এর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সে সহজ সরল পথের দিকে আহ্বান জানিয়েছে'।
মহান আল্লাহ তা'য়ালা এ কুরআন তাঁর রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন এবং এ কুরআন সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন-
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُّدَّكِرٍ ع
আমি এ কুরআন উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ মাধ্যম বানিয়েছি। এখন উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? (সূরা ক্বামার-৪০)
মানুষের জন্য এ কুরআন হৃদয়ঙ্গম করা সহজ করা হয়েছে এবং পবিত্র কুরআন আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হলেও তার বর্ণনাশৈলী, বাচনভঙ্গী পৃথিবীতে প্রচলিত আরবী ভাষার অনুরূপ নয়। এই কিতাবের ভাষা প্রচলিত আরবী ভাষা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং কুরআনের ভাষা নির্ধারণ করেছেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। এই কুরআনের ভাষা যেমন আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে এসেছে তেমনি কুরআন যে ভাব প্রকাশ করে, সে ভাবও এসেছে আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকেই। পবিত্র কুরআন তার বিবৃত বিষয়, তথ্য ও তত্ত্ব সম্পর্কে সকল সন্দেহ ও সংশয়মুক্ত বলে স্পষ্ট ঘোষণাই শুধু দেয়নি, এ ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে-
وَإِنْ كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّنْ مِّثْلِهِ ص
আমার বান্দার প্রতি যে কিতাব অবতীর্ণ করেছি, তা আমার প্রেরিত কি-না, সে বিষয়ে তোমাদের মনে যদি কোনো প্রকার সন্দেহ সৃষ্টি হয়ে থাকে তবে এর অনুরূপ একটি সূরা রচনা করে আন। (সূরা বাকারা-২৩)
কোনো কোনো মানুষ এ ধারণা পোষণ করে যে কুরআনের ব্যাপারে আল্লাহ তা'য়ালা যে চ্যালেঞ্জ প্রদান করেছেন, সে চ্যালেঞ্জ শুধুমাত্র পবিত্র কুরআনের আঙ্গিক বৈশিষ্ট, সাহিত্যিক মান ও সৌন্দর্য এবং উচ্চাঙ্গের ভাষার ব্যাপারে প্রযোজ্য। এ ধরনের ভুল ধারণা যারা পোষণ করে, তারা মূলতঃ কুরআনের গভীরে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই বিভ্রান্তিকর চিন্তাধারায় আবর্তিত হয়। প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর কুরআনের মর্যাদা এসব ক্ষুদ্র চিন্তা-চেতনা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। কুরআনের শব্দ, ভাষা এবং সাহিত্যিক মান, বর্ণনাশৈলীর দিক দিয়ে যে অনবদ্য, অতুলনীয় এ ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। পক্ষান্তরে যে কারণে এ কথা বলা হয়েছে যে, 'মানবীয় চিন্তা-চেতনা, জ্ঞান, বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করে এ ধরনের কিতাব রচনা করা সম্ভব নয়' সে কারণগুলো পবিত্র কুরআনে আলোচিত বিষয়াদি, কুরআন কর্তৃক উপস্থাপিত জীবনাদর্শ, জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্য ও তত্ত্বসমূহ। কুরআন যেসব বিষয়ে আলোচনা করেছে, যে শিক্ষা মানব জাতির সম্মুখে পেশ করেছে, যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের দ্বার মানব সভ্যতার সামনে উন্মোচন করেছে, যে আদর্শের দিকে মানব জাতিকে আহ্বান জানাচ্ছে, তা কোনো মানবীয় মন- মস্তিষ্ক কল্পনাও করতে পারে না।
শুধু মানব জাতিই নয়, জ্বিন ও মানব জাতি সম্মিলিতভাবে কিয়ামত পর্যন্তও যদি চেষ্টা- সাধনা করতে থাকে, তবুও আল্লাহ তা'য়ালার নাযিলকৃত কুরআনের অনুরূপ কোনো কিতাব রচনা করতে সক্ষম হবে না। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُوْنَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا -
আপনি বলে দিন, মানব ও জ্বিন জাতি সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে কুরআনের মতো একটি জিনিস আনার চেষ্টা করে তবুও তারা আনতে সক্ষম হবে না, তারা পরস্পরের সহযোগী হয়ে গেলেও। (সূরা বনী ইসরাঈল-৮৮)
মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে এমন একটি বিস্ময়কর কিতাব দান করলেন, যে কিতাবের সামনে পৃথিবীর সকল কবি-সাহিত্যিকদের কাব্য ও সাহিত্য প্রতিভা চিরদিনের জন্য ম্লান হয়ে গেল। আল্লাহ পবিত্র কুরআন সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ করলেন-
أَمْ يَقُولُوْنَ افْتَرَاهُ ط قُلْ فَأْتُوْا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِّثْلِهِ مُفْتَرَيَاتٍ وَادْعُوْا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِّنْ دُوْنِ اللَّهِ إِنْ كُنتُمْ صَادِقِينَ ط
অথবা এরা কি এ কথা বলে, (মুহাম্মাদ স. নামের ব্যক্তি) কুরআন নিজে নিজে রচনা করে নিয়েছে! (হে নবী) আপনি তাদেরকে বলুন, তোমরা যদি তাই মনে করো তাহলে নিয়ে এসো এর অনুরূপ মাত্র দশটি স্বরচিত সূরা এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য যাদের তোমরা সাহায্যের জন্য ডাকতে পারো তাদের ডেকে নাও, যদি তোমরা তোমাদের দাবীতে সত্যবাদী হও। (সূরা হুদ-১৩)
فَلْيَأْ تُوْا بِحَدِيْثِ مِّثْلِهِ إِنْ كَانُوْا صَادِقِينَ
তারা নিজেদের কথায় যদি সত্যবাদী হয় তাহলে তারাও এ কুরআনের মতো কিছু একটা রচনা করে নিয়ে আসুক না! (সূরা আত্ তুর- ৩৪)
মানুষ যে জ্ঞান, বিবেক-বুদ্ধি ও প্রতিভার অধিকারী তা প্রয়োগ করে এ ধরনের মর্যাদাপূর্ণ ও বিস্ময়কর একটি কিতাব প্রণয়ন করা আদৌ সম্ভব নয়। এ ধরনের একটি কালাম রচনা করা মানুষের শক্তি ও প্রতিভা সীমার বাইরের বিষয়। আল্লাহর এই চ্যালেঞ্জ কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা কোনো দেশের জনগণের জন্যই শুধু নয়- নয় তা কালের গণ্ডীতে আবদ্ধ। আল্লাহর চ্যালেঞ্জ সারা পৃথিবীবাসীর জন্য এবং অনন্তকালব্যাপী। এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার মতো সাহস সেই অতীতকাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্তও কেউ প্রদর্শন করেনি, অনাগত কালেও কেউ প্রদর্শন করতে সক্ষম হবে না। মহান আল্লাহ যে শব্দ, অক্ষর, বর্ণনাশৈলী, রচনারীতি, বাচনভঙ্গী সহযোগে যখন অবতীর্ণ করেছিলেন, বর্তমান কাল পর্যন্তও তার একটি অক্ষরও পরিত্যক্ত হয়নি, কিয়ামত পর্যন্তও হবে না।
এই পৃথিবীতে আল কুরআনই হলো একমাত্র গ্রন্থ যা মানব জাতির সমুদয় চিন্তা-চেতনা, চরিত্র-নৈতিকতা, সভ্যতা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি এক কথায় মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতির ওপর যে ব্যাপকতর, সুগভীর ও বিপ্লবাত্মক প্রভাব বিস্তার করেছে, এ ধরনের সর্বব্যাপক ও সর্বাত্মক প্রভাব বিস্তারকারী গ্রন্থের অস্তিত্ব পৃথিবীতে আর একটিও নেই। প্রথম পর্যায়ে এই কুরআন পৃথিবীর একটি জাতির ওপরে প্রভাব বিস্তার করে তাদের জীবন ধারার আমূল পরিবর্তন সাধন করেছে। তারপর কুরআনের রঙে রঙিন সেই জাতি গোটা পৃথিবীর একটি বিরাট অংশের মানুষের জীবন পরিবর্তন করে দিয়েছে এবং পৃথিবীর সকল জাতির ওপরে কম-বেশি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
এই কুরআন পৃথিবীতে যে বিপ্লবাত্মক ভূমিকা পালন করেছে এবং করছে, তা পৃথিবীর কোনো একটি আদর্শ বা গ্রন্থের পক্ষে পালন করা সম্ভব হয়নি। কুরআন শুধুমাত্র সজ্জিত অক্ষরের আকারে কাগজের পৃষ্ঠায় আবদ্ধ হয়ে থাকে না, বরং মানুষের বাস্তব কর্মের পৃথিবীতে এর এক একটি শব্দ, প্রভাব, শিক্ষা, চিন্তাদর্শ ও মতবাদের অনুপম রূপায়নে সম্পূর্ণ ভিন্নতর একটি সভ্যতা ও সংস্কৃতি নির্মাণ করে এক দৃষ্টান্তহীন কর্ম সম্পাদন করেছে এবং এখনো করছে। কুরআন যখন অবর্তীর্ণ হয়েছিল তখন তার যে প্রভাব ও বিপ্লবাত্মক ভূমিকা ছিল, আজও তা বিদ্যমান রয়েছে। সে যুগে কুরআনের শিক্ষা বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে যে পাঠক পাঠ করতো, কুরআন তার পাঠককে সে ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে বাধ্য করতো, কুরআনের এই অতুলনীয় মু'জিযা, প্রভাব ও ক্ষমতা বর্তমানেও যেমন বিদ্যমান রয়েছে, অনাদিকাল পর্যন্তও বিদ্যমান থাকবে।
সে যুগে যারা কুরআনের বিরোধিতায় নেতৃত্ব দিচ্ছিলো, তারা এটা স্পষ্ট অনুভব করেছিল যে, মুহাম্মাদ (সা:) কুরআনের যে বাণী প্রচার করছেন তার প্রভাব অপ্রতিরোধ্য। এ কারণে তারা সাধারণ মানুষকে এই কুরআন শোনা থেকে বিরত থাকতে উপদেশ দিতো। মক্কার ইসলাম বিরোধিদের ইসলাম নির্মূলের অগণিত পরিকল্পনার মধ্যে একটি পরিকল্পনা ছিল এই যে, রাসূল যখনই কোনো সমাবেশে মানুষকে কুরআনের কথা শোনাবেন, তখনই সেখানে শোরগোল সৃষ্টি করে কুরআন শোনানোর পরিবেশ নষ্ট করে দেয়া। নানাভাবে কুরআনের মাহফিলে বাধা সৃষ্টি করা, যেন মানুষের ওপরে এই কুরআন প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। ইসলাম বিরোধী শক্তি এই অস্ত্র শুধু সে যুগেই প্রয়োগ করেনি, বর্তমানেও তারা তাদের সেই পুরনো অস্ত্র প্রয়োগ করে কুরআন শোনা থেকে মানুষকে বিরত রাখার অপচেষ্টা করে। ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তারা কুরআনের মাহফিল অনুষ্ঠিত হবার পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করে থাকে। সে যুগে ইসলাম বিরোধিরা সাধারণ মানুষকে কুরআনের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার জন্য বলতো-
وَقَالَ الَّذِيْنَ كَفَرُوا لَا تَسْمَعُوْا لِهَذَا الْقُرْآنِ وَالْغَوْا فِيْهِ لَعَلَّكُمْ تَغْلِبُوْنَ
এসব কাফেররা বলে, এ কুরআন তোমরা কখনো শুনবে না। আর যখন তা শুনানো হবে তখন শোরগোল সৃষ্টি করবে। হয়তো এভাবে তোমরা বিজয়ী হবে। (হা-মীম আস্ সেজদা-২৬)
কুরআন কী অসাধারণ প্রভাব ক্ষমতার অধিকারী বিস্ময়কর কিতাব, এই কিতাবের দাওয়াত যিনি দিচ্ছেন তিনি কেমন অতুলনীয় সম্মান ও মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি এবং তাঁর এই ব্যক্তিত্বের সাথে উপস্থাপনার ভঙ্গি কেমন বিস্ময়করভাবে কার্যকর হচ্ছে, তা ইসলাম বিরোধী নেতারা স্পষ্ট অনুভব করতে পারতো। তারা এ কথা বিশ্বাস করতো, এ ধরনের উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তির মুখ থেকে এমন চিত্তাকর্ষক, হৃদয়গ্রাহী মনোমুগ্ধকর ভঙ্গিতে এই দৃষ্টান্তহীন কালাম যার কর্ণকুহরে প্রবেশ করবে, সে ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত কুরআনের আন্দোলনের প্রতি দুর্বল হবেই হবে। অতএব যে প্রকারেই হোক, কুরআনের মাহফিল অনুষ্ঠিত হতে দেয়া যাবে না। কিন্তু যারা এ ধরনের পরিকল্পনা প্রণয়ন করতো, স্বয়ং তারাই নিজেদের অজান্তে আল্লাহর কুরআনের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়তো।
📄 পবিত্র কুরআনের বিস্ময়কর মু'জিযা
হযরত উমার (রা:) এর মতো দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মানুষও কুরআনের প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কুরআনের প্রভাব তাঁকে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে। আল্লাহর রাসূলকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে একদিন রাতে তিনি রাসূলকে অনুসরণ করছিলেন। গভীর রাতে আল্লাহ তা'য়ালার নবী কা'বাঘরে নামাজে দাঁড়িয়ে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। হযরত উমার (রা:) তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি অন্ধকারে অদূরে দাঁড়িয়ে আল্লাহর নবীর পবিত্র জবান মুবারক থেকে কুরআন শুনছিলেন। কুরআনের বাণীর অপূর্ব সামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করে তাঁর মনে এ কথার উদয় হলো, 'মুহাম্মাদ (সা:) সম্ভবত উচ্চমানের কবি হয়েছেন'। তিনি মনে মনে এ কথাগুলো বলছিলেন আর সাথে সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর রাসূলের মুখ থেকে উচ্চারিত করালেন-
وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرٍ طَ قَلِيْلًا مَّا تُؤْمِنُوْنَ لَا
এটা কোনো কবির কাব্যকথা নয়, যদিও তোমরা খুব কমই বিশ্বাস করো। (সূরা হাক্কাহ্-৪১)
বিস্ময়ের ধাক্কায় স্তব্ধ অনড় হয়ে গেলেন হযরত উমার (রা:)। অবাক দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে রইলেন আল্লাহর রাসূল (সা:) এর দিকে। বিস্ময়ের ঘোর কেটে যেতেই তিনি মনে মনে বললেন, 'এই লোকটি শুধু উচ্চমানের কবিই হননি, সেই সাথে একজন উচ্চ পর্যায়ের গণৎকারও হয়েছেন। তা না হলে তিনি আমার মনের কথা জানলেন কেমন করে?' তাঁর মনে এ কথা উদিত হবার সাথে সাথে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর হাবীবের মুখ থেকে সূরা হাক্কাহ্-এর পরবর্তী আয়াত উচ্চারিত করালেন-
وَلَا بِقَوْلِ كَاهِنٍ طَ قَلِيْلًا مَّا تَذَكَّرُوْنَ طَ
এটা কোনো গণক বা জ্যোতিষির কথাও নয়; যদিও তোমরা খুব কমই বিবেক বিবেচনা করে চলো। (সূরা হাক্কাহ্-৪২)
হযরত উমার (রা:) বিস্ময়ের দ্বিতীয় ধাক্কা খেলেন। তিনি মনে মনে যা বলছেন, আর তার জবাব রাসূল দিচ্ছেন। বিষয়টি তাঁকে সত্য গ্রহণের পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে দিল। তাঁর মনে পুনরায় প্রশ্ন জাগলো, 'মুহাম্মাদ (সা:) যা পাঠ করছেন, তা কবির বা গণৎকারের কথা নয়। তাহলে তিনি এ কালাম কোথা থেকে লাভ করলেন?' তাঁর মনের এ প্রশ্নের উত্তরও রাসূল (সা:) এর মুখ থেকে শোনা গেল। তিনি সূরা হাক্কাহ্ এর পরবর্তী আয়াত তিলাওয়াত করলেন-
تَنْزِيلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعَالَمِينَ
(মূলত) এ কিতাব বিশ্বজগতের মালিক আল্লাহ তা'য়ালার কাছ থেকেই (তাঁর রাসুলের ওপর) অবতীর্ণ করা হয়েছে। (সূরা আল-হাক্কাহ্-৪৩)
অবশেষে কুরআন এমন প্রভাব হযরত উমার (রা:)-এর ওপর বিস্তার করেছিলো যে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কুরআনের পূর্বে যেসব কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছিল, তা যথাযথ বৈজ্ঞানিক পন্থায় সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা না থাকায় মূল কিতাব বিকৃত হয়েছিল। পক্ষান্তরে কুরআন অবতীর্ণ হবার সাথে সাথে আল্লাহর নির্দেশে নবী করীম (সা:) তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। এ জন্য কুরআনের মধ্যে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করার কোনো অবকাশ নেই। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে প্রচার মাধ্যমে কোনো একজন কুরআন তিলাওয়াত করছে, যদি সে কোথাও সামান্য একটু ভুল করে তাহলে পৃথিবীর অপর প্রান্তে বসে শ্রবণরত হাফেজে কুরআন তা শোনার সাথে সাথে বুঝতে পারবে তিলাওয়াতকারী অমক স্থানে ভুল উচ্চারণ করেছে। পরক্ষণেই সমগ্র পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে হাফেজে কুরআনগণ সেই তিলাওয়াতকারীকে জানিয়ে দেবে, অমুক আয়াতে সে ভুল উচ্চারণ করেছে বা তিলাওয়াতের সময় অমুক শব্দ বাদ পড়েছে। এভাবে পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকেই তাঁর কিতাব পাঠ করার একটি নিয়ম চিরপ্রতিষ্ঠিত করে দেয়া হয়েছে। সে নিয়মটি হলো, কুরআন যে ভাষায় যে ভঙ্গীতে অবতীর্ণ হয়েছে, ঐ ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় এই কিতাব তিলাওয়াত করা যাবে না। এ কিতাব যে কোনো ভাষায় অনুবাদ করা যেতে পারে, যে কোনো ভাষার মাধ্যমে তা অনুধাবন করা যেতে পারে এবং তা অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে কুরআনের অবিকৃত আরবী ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় তা তিলাওয়াত করার অনুমতি দেয়া হয়নি। এই সুযোগ যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে করে দেয়া হতো, তাহলে এ কিতাবে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করার সুযোগ থাকতো। যে কোনো ধরনের বিকৃতি থেকে হেফাজত করার লক্ষ্যেই আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে রাসূল (সা:) এর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন-
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُوْنَ
আমিই উপদেশ (সম্বলিত কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী। (সূরা হিজর-৯)
📄 আল্লাহর প্রতি ঈমান রাসূলের প্রতি ঈমানের সাথে শর্তযুক্ত
নবী-রাসূলদের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন বা উদাসীন থেকে মহান আল্লাহর প্রতি যদি কোনো মানুষ ঈমান আনে তাহলে তার সে ঈমানের সামান্যতম মূল্যও নেই। নবী-রাসূলের প্রতি ঈমান না এনে বা তাঁর আনুগত্য না করে কোনো মানুষের পক্ষে মহান আল্লাহর আনুগত্য করা সম্ভব নয়। কারণ, মানুষকে যে সীমিত জ্ঞান দেয়া হয়েছে তা প্রয়োগ করে মানুষের পক্ষে জানা কোনোক্রমেই সম্ভব নয় যে, তারা কিভাবে এবং কোন্ পদ্ধতিতে মহান আল্লাহর গোলামী বা দাসত্ব করবে। আর ঠিক এ কারণেই মহান মালিক আল্লাহ নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং এটা তাঁদেরই দায়িত্ব যে, মানুষকে আল্লাহর দাসত্ব সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া। তাঁদের কাছ থেকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণে কোনো মানুষ যদি অস্বীকার করে, তাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করে বা তাদেরকে সহযোগিতা না করে তাহলে সে মানুষের পক্ষে আল্লাহর গোলাম হওয়া সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ বলেন-
يَا بَنِي آدَمَ إِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ رُسُلٌ مِّنْكُمْ يَقُصُّوْنَ عَلَيْكُمْ آيَاتِي فَمَنِ اتَّقَى وَأَصْلَحَ لَا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُوْنَ
হে আদম সন্তানরা, যখনি তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকে এমন কোনো রাসূল আসবে, যারা তোমাদের কাছে আমার আয়াত পড়ে শোনাবে, তখন যারা (সে অনুযায়ী) আমাকে ভয় করবে এবং (নিজেদের) সংশোধন করে নিবে, তাদের কোনোই ভয় থাকবে না, তারা কখনো দুশ্চিন্তাগ্রস্তও হবে না। (সূরা আল আ'রাফ-৩৫)
সকল ব্যাপারে মানুষ যদি নবী-রাসূলের মুখাপেক্ষী না হয় এবং তাঁদের কাছ থেকে জীবনের প্রত্যেক দিক ও বিভাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে তাহলে সে মানুষ নিজেকে ঈমানদার বলে দাবী করলেও তা মহান আল্লাহ গ্রহণ করবেন না। না বুঝে বা যুক্তিহীনভাবে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ বলার অবকাশ ইসলাম দেয়নি, প্রেরিত নবী-রাসূলের নাম পরবর্তী অংশে অবশ্যই যুক্ত করতে হবে এবং প্রেরিত নবী-রাসূলকে স্বীকৃতি দিয়েই মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতে হবে। পবিত্র কুরআনে সূরা নামে উল্লেখ করা হয়েছে, সাবার রাণী ইসলামী জীবন বিধান পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন করার পর তিনি যখন মুসলমান হবেন তখন তিনি এভাবে ঘোষণা করলেন-
رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي وَأَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَانَ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
হে আমার মালিক, আমি এতদিন আমার নিজের ওপর জুলুম করে এসেছি, আজ আমি আনুগত্যের স্বীকৃতি দিয়ে সুলাইমানের সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ওপর ঈমান আনলাম। (সূরা নামল-৪৪)
তৎকালীন নবী হযরত সুলাইমান (আ:) কে অস্বীকার করে সাবার রাণী যদি মহান আল্লাহর ওপর ঈমান আনতেন তাহলে তার সে ঈমান গ্রহণ করা হতো না। ফিরআউনের যাদুকররা যখন অনুভব করলো, হযরত মূসা (আ:) মহান আল্লাহর নবী-রাসূল এবং তিনি যে পথের দিকে আহ্বান করছেন সেটিই একমাত্র সত্য পথ। তখনি তাঁরা ঈমান আনলো এবং ঘোষণা দিলো এভাবে-
قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ لَا رَبِّ مُوسَى وَهَارُوْنَ
তারা সবাই সমস্বরে বলে উঠলো, আমরা সৃষ্টিকুলের মালিকের ওপর ঈমান আনলাম, যিনি মূসা ও হরুনের মালিক। (সূরা আল আ'রাফ-১২১-১২২)
সুতরাং নবী-রাসূলের আনুগত্য না করে মহান আল্লাহর আনুগত্য করার অবকাশ নেই। আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার পূর্বশর্ত হলো নবী-রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। মানুষ মহান আল্লাহর বিধানের সম্মুখে নিজেকে সোপর্দ করে দিয়ে ‘মুসলিম’ হয়েছে, এ কথার সাক্ষীও দিবেন নবী-রাসূলগণ। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
مِنْ قَبْلُ وَفِي هَذَا لِيَكُوْنَ الرَّسُوْلُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ
যেনো তোমাদের রাসূল তোমাদের (মুসলিম হবার) ওপর সাক্ষ্য প্রদান করতে পারে। (সূরা হজ্জ-৭৮)
কিয়ামতের ময়দানে প্রত্যেক উম্মতকে দলে দলে বিভক্ত করে তাদের চূড়ান্ত হিসাব গ্রহণ করার সময় প্রত্যেক উম্মতের নবী-রাসূলকে সাক্ষী করা হবে। নবী-রাসূলগণ সাক্ষী দিবেন তাদের উম্মত তাদের প্রতি ঈমান এনে তাদের আনীত বিধান অনুসরণ করেছিলো কিনা। পবিত্র কুরআন ঘোষণা করছে-
وَإِذَا الرُّسُلُ أُقْتَتْ ط
যখন নবী-রাসূলদের সকলকে নির্ধারিত সময়ে (এক জায়গায়) একত্রিত করা হবে। (সূরা মুরসালাত-১১)
وَجَائَءَ بِالنَّبِيِّنَ وَالشُّهَدَاءِ وَقُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْحَقِّ وَهُمْ لَا يُظْلَمُوْنَ -
নবীদের ও অন্যান্য সাক্ষীদের এনে উপস্থিত করা হবে, তাদের সবার সাথে ন্যায়বিচার করা হবে, তাদের কারো ওপর জুলুম করা হবে না। (সূরা যুমার-৬৯)
নবী-রাসূলের আনীত বিধান মানুষ অনুসরণ করেছে কিনা এ ব্যাপারে কিয়ামতের দিন স্বয়ং নবী আল্লাহর দরবারে সাক্ষী দিবেন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
إِنَّا أَرْسَلْنَا إِلَيْكُمْ رَسُولاً لا شَاهِدًا عَلَيْكُمْ كَمَا أَرْسَلْنَا إِلَى فِرْعَوْنَ رَسُولًا
নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কাছে (তোমাদের কাজকর্মের) সাক্ষ্যদাতা হিসাবে একজন রাসূল পাঠিয়েছি, যেমনি করে ফিরআউনের কাছেও আমি একজন রাসূল পাঠিয়েছিলাম। (সূরা মুয্যাম্মিল-১৫)
নবী-রাসূলের দায়িত্ব হলো মানুষের কাছে মহান আল্লাহর বিধান পৌছে দেয়া আর মানুষের দায়িত্ব হলো নবী-রাসূলদের অনুসরণ করা। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُوْلَ جِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا عَلَيْهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيْكُم مَّا حُمِّلْتُمْ ط وَإِنْ تُطِيعُوهُ تَهْتَدُوا طَ وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَغُ الْمُبِينُ
(হে নবী) আপনি (এদের) বলে দিন, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, আনুগত্য করো আল্লাহর রাসূলের (হ্যাঁ), তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও (তাহলে জেনে রেখো), আল্লাহর দ্বীন পৌঁছানোর যে দায়িত্ব তার ওপর দেয়া হয়েছে তার জন্যে সে দায়ী, (অপরদিকে আনুগত্যের) যে দায়িত্ব তোমাদের ওপর দেয়া হয়েছে তার জন্যে তোমরা দায়ী, যদি তোমরা তার কথামতো চলো তাহলে তোমরা সঠিক পথ পাবে, রাসূলের কাজ হচ্ছে (আল্লাহর কথাগুলো) ঠিক ঠিক মতো পৌঁছে দেয়া। (সূরা আন্ নূর-৫৪)
মানুষ রাসূলের আনুগত্য করে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছে কিনা এ ব্যাপারে জবাবদীহী করতে হবে, রাসূলের আনুগত্য না করলে কারো পক্ষে শেষ বিচারের দিনে সফল হওয়া বা মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقْهِ فَأُولَائِكَ هُمُ الْفَائِزُوْنَ
যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর নাফরমানী করা থেকে বেঁচে থাকে, তারাই হচ্ছে সফলকাম। (সূরা আন্ নূর-৫২)
শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে তাঁর রাসূলের আনুগত্য না করলে এর পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। আল্লাহ তা'য়ালা বিষয়টি এভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছেন-
وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ جِ فَإِنْ عَصَوْكَ فَقُلْ إِنِّي بَرِيءٌ مِّمَّا تَعْمَلُوْنَ جِ
যে ব্যক্তি ঈমান নিয়ে আপনার অনুবর্তন করবে আপনি তার প্রতি স্নেহের আচরণ করুন, আবার যদি কেউ আপনার সাথে নাফরমানী করে তাহলে আপনি তাকে বলে দিন, তোমরা যে আচরণ করছো তার (পরিণামের) জন্যে আমি কিন্তু মোটেও দায়ী নই। (সূরা আশ্ শুআরা-২১৫-২১৬)
মুমিন হবার পূর্ব শর্তই হলো নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য করা, মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنْ كُنتُمْ مُّؤْمِنِينَ
আল্লাহ তা'য়ালা এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা সত্যিকার অর্থে মুমিন হয়ে থাকো। (সূরা আনফাল-১)
নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য থেকে মুহূর্তকালের জন্যেও মুখ ফিরিয়ে নেয়া যাবে না। শুধুমাত্র নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত এ ধরনের কিছু দিকে রাসূলের আনুগত্য করা হলো আর জীবনের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি ও অন্যান্য দিকে অন্য করো আনুগত্য করা হবে, এ ধরনের সুযোগ ইসলামে নেই। প্রত্যেক মুহূর্তে এবং জীবনের সকল দিক ও বিভাগে কেবলমাত্র নবী করীম (সা:) এরই আনুগত্য করতে হবে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَوَلَّوْا عَنْهُ وَأَنْتُمْ تَسْمَعُوْنَ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ তা'য়ালা ও রাসূলের আনুগত্য করো, কখনো তাঁর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না, বিশেষ করে যখন তোমরা সব কিছু শুনতেই পাচ্ছো। (সূরা আনফাল-২০)
পবিত্র কুরআনে যেখানেই মহান আল্লাহর আনুগত্য করার আদেশ দেয়া হয়েছে, সাথে সাথেই রাসূলেরও আনুগত্য করার আদেশ দেয়া হয়েছে। নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য না করে নিজেরা পরস্পরে মতপার্থক্য ও নানা দল উপদলে বিভক্ত হবার পরিণতি হলো বর্তমান পৃথিবীতে মুসলমানরা সবথেকে বেশি লাঞ্ছিত ও অপমানিত। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا طَ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
তোমরা আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, নিজেদের মধ্যে পরস্পর ঝগড়া বিবাদ করো না, অন্যথায় তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের প্রতিপত্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। (সূরা আনফাল-৪৬)
মহান আল্লাহকে ভয় করার এবং মুমিন হবার অনিবার্য দাবী হলো নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য করা। মুখে আল্লাহর আনুগত্যের ঘোষণা দিয়ে রাসূল (সা:) এর আনুগত্য থেকে বিরত থাকার অর্থ নিজেকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করা। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُوْلَ وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, আনুগত্য করো রাসূলের, (বিদ্রোহ করে) কখনো তোমরা নিজেদের কাজকর্ম বিফলে যেতে দিয়ো না। (সূরা মুহাম্মাদ-৩৩)
নবী করীম (সা:) যা কিছু আদেশ করেন তা থেকে বিরত থাকা এবং তিনি যা করতে আদেশ করেন তা অবশ্যই পালন করা ঈমানের মূল ভিত্তি আর এ বিষয়টি সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوهُ قِ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا جِ وَاتَّقُوا اللَّهَ طَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
আল্লাহর রাসূল তোমাদের যা কিছু অনুমতি দেয় তা তোমরা গ্রহণ করো এবং তিনি যা কিছু নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো। (সূরা হাশর-৭)
আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি ঈমান আনার সাথে শর্তযুক্ত করা হয়েছে নবী করীম (সা:) এর প্রতি ঈমান আনা। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ جِ وَإِن تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوْا فَلَكُمْ أَجْرٌ عَظِيمٌ
তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করো, তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে ঈমান আনো এবং নিজেরা সাবধান হয়ে চলতে পারো, তাহলে তোমাদের জন্যে মহাপুরস্কার রয়েছে। (সূরা আলে ইমরান-১৭৯)
মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার বিষয়টি নবী করীম (সা:) এর প্রতি ঈমান আনার সাথে শর্তযুক্ত করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُوْلِهِ -
(খাঁটি ঈমানদার তো হচ্ছে তারা,) যারা আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান আনে। (সূরা আন্ নূর-৬২)
মহান আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে যে সকল আয়াতে তাঁর প্রতি ঈমান আনার জন্যে নির্দেশ দিয়েছেন পাশাপাশি নবী করীম (সা:) এর প্রতিও ঈমান আনার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُوْلِهِ وَالنُّوْرِ الَّذِي أَنزَلْنَا طَ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِيرٌ -
অতএব তোমরা আল্লাহ তা'য়ালা, তাঁর রাসূল এবং আমি যে আলো (কুরআন) তোমাদের দিয়েছি তার ওপর ঈমান আনো, তোমরা যা কিছুই করো না কেনো আল্লাহ তা'য়ালা তা ভালো করেই জানেন। (সূরা তাগাবুন-৮)
পবিত্র কুরআনের এ ধরনের বহু আয়াত প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি ঈমান আনার সাথে সাথে নবী করীম (সা:)-এর প্রতি ঈমান আনাও বাধ্যতামূলক এবং আল্লাহর আনুগত্যের প্রশ্নেও রাসূল (সা:)-এর মর্যাদা মহান আল্লাহ এতটাই বৃদ্ধি করে দিয়েছেন যে, নবী করীম (সা:)-এর আনুগত্য করার অর্থই হচ্ছে মহান আল্লাহর আনুগত্য করা। আর তাঁর নাফরমানী করার অর্থই হলো আল্লাহ তা'য়ালার নাফরমানী করা। এ প্রসঙ্গে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে-
وَ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهُ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ عَصَى اللَّهِ -
হযরত আবু হুরাইরা (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করলো সে আল্লাহ তা'য়ালারই আনুগত্য করলো (পক্ষান্তরে) যে ব্যক্তি আমার সাথে নাফরমানী করলো সে আল্লাহ তা'য়ালার সাথেই নাফরমানী করলো। (বুখারী, মুসলিম)
যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে অথচ নবী করীম (সা:)-এর আনুগত্য করে না, তাদেরকে পবিত্র কুরআন কাফির বলে আখ্যায়িত করেছে। কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা ঘোষণা করেছেন-
قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ جِ فَإِن تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ
(হে রাসূল) আপনি বলুন, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথা মেনে চলো, এ আহ্বান সত্ত্বেও তারা যদি এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, (আপনি জেনে রাখুন) আল্লাহ তা'য়ালা কখনো কাফিরদের পছন্দ করেন না। (সূরা আলে ইমরান-৩২)
মহান আল্লাহকে ভালোবাসার পূর্ব শর্ত এবং নিজের গোনাহ মহান আল্লাহ তা'য়ালার কাছ থেকে ক্ষমা করিয়ে নেয়ার পূর্ব শর্তও নবী করীম (সা:) এর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য করা। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
قُلْ إِنْ كُنتُمْ تُحِبُّوْنَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
(হে নবী) আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার কথা মেনে চলো, তাহলে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তিনি তোমাদের গোনাহ ক্ষমা করে দিবেন। (সূরা আলে ইমরান-৩১)
📄 নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য পরিহারকারী মুমিন নয়
মহান আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি বিশ্বাস ও নবী করীম (সা:) এর প্রতি বিশ্বাস মুখে ঘোষণা করার পর কোনো ব্যক্তি যদি নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য না করে তাহলে সে ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম দাবী করলেও মহান আল্লাহর কুরআনের ভাষায় সে ব্যক্তি মুসলিম নয়। কারণ আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে যে সর্বোচ্চ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন, সে মর্যাদার সাথে কোনো ব্যক্তির মুসলিম থাকা বা না থাকার বিষয়টিও জড়িত। তাঁকে সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রদর্শন করে তাঁর আনুগত্য যে ব্যক্তি করবে, সে ব্যক্তিকেই পবিত্র কুরআন মুসলিম হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে এবং যে ব্যক্তি তাঁর আনুগত্য করবে না তথা তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করবে না, সে ব্যক্তি মুসলিম নয়। যে ব্যক্তি নবী করীম (সা:) এর আনুগত্য করে সে প্রকৃত পক্ষে মহান আল্লাহরই আনুগত্য করে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
مَّنْ يُطِعِ الرَّسُوْلَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ ج وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيْظًا -
যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করে সে (যেন) আল্লাহরই আনুগত্য করে, আর যে ব্যক্তি (তাঁর আনুগত্য থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের ওপর আমি আপনাকে প্রহরী বানিয়ে পাঠাইনি। (সূরা আন্ নিসা-৮০)
সমগ্র সৃষ্টিজগৎ ও সৃষ্টিসমূহের যিনি মালিক, তিনি বলছেন 'আমার রাসূলের আনুগত্য করার অর্থই হলো আমার আনুগত্য করা'। নবী করীম (সা:) সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা'য়ালার বলা অন্যান্য সকল কথা একদিকে রেখে শুধুমাত্র উল্লেখিত আয়াতের কথাগুলোর প্রতি স্কুল দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই অনুধাবন করা যায় যে, আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর মহান নবীকে মর্যাদার কোন্ সোপানে উপনীত করেছেন। রাব্বুল আলামীন তাঁকে সৃষ্টিসমূহের মধ্যে এমনই অতুলনীয় মর্যাদা দান করেছেন যে, তাঁর আনুগত্য করার বিষয়টিকে তিনি নিজের আনুগত্য করার সাথে একাকার করে দিয়েছেন। তাঁর প্রতি বিদ্রোহ করার অর্থ মহান আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ করা বলে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা ঘোষণা দিয়েছেন।
নবী করীম (সা:) নবুয়্যাত লাভ করার পর থেকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পৃথিবীতে জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে মানব জাতিকে যে সিদ্ধান্তসমূহ দান করেছেন তা নিঃশর্তভাবে মেনে নিয়ে অনুসরণ করা মানব জাতির জন্যে অবশ্যকর্তব্য। সৃষ্টিসমূহের মধ্যে মর্যাদাগত কারণে নবী করীম (সা:) এর পবিত্র মুখ থেকে একবার যে কোনো বিষয়ে যে রায় ঘোষিত হয়েছে, তার সাথে দ্বিমত পোষণ করার ন্যূনতম অধিকারও কোনো মানুষকে দেয়া হয়নি। তিনি যা কিছু আদেশ নিষেধ করেছেন এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন তোলার অধিকারও কোনো মানুষকে দেয়া হয়নি। অকুণ্ঠ চিত্তে নিঃশর্তভাবে সন্তুষ্টির সাথে মেনে নিতে হবে। নিরুপায় হয়ে অসন্তুষ্টির সাথে কেউ যদি নবী করীম (সা:) এর কোনো আদেশ নিষেধ অনুসরণ করে বা মেনে নেয় তাহলে তার ঈমানের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করার অবকাশ রয়েছে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর রাসূল (সা:) এর অতুলনীয় মর্যাদার বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়ে ঘোষণা করেছেন-
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا -
(হে নবী) না, আমি আপনার মালিকের শপথ করে বলছি, এরা কিছুতেই ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের যাবতীয় মতবিরোধের ফয়সালায় আপনাকে (শর্তহীনভাবে) বিচারক মেনে নিবে, অতপর আপনি যা ফয়সালা করবেন সে ব্যাপারে তাদের মনে আর কোনো দ্বিধা-দ্বন্দু থাকবে না, বরং আপনার সিদ্ধান্ত তারা সর্বান্তকরণে মেনে নিবে। (সূরা আন্ নিসা-৬৫)
স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা নিজের শপথ করে ঘোষণা করেছেন, কোনো মানুষের পক্ষে ঈমানদার হওয়া তথা মুসলিম হওয়া কোনোক্রমেই সম্ভব নয়, যতক্ষণ সে ব্যক্তি জীবনের সকল ক্ষেত্রে নবী করীম (সা:) এর পেশ করা জীবন বিধান মেনে না নিবে। অর্থাৎ রাসূল (সা:) এর দেয়া সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া না নেয়ার ওপর মানুষের মুসলিম হওয়া তথা ঈমান নির্ভর করে। নবী করীম (সা:) মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগে যা কিছু প্রয়োজন সকল বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দান করেছেন। মুসলিম দাবীদার কোনো নারী-পুরুষকে সামান্যতম অধিকার দেয়া হয়নি যে, সে আল্লাহর রাসূলের দেয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণে ও বাস্তবায়নে অনীহা প্রকাশ করবে বা মেনে না নেয়ার লক্ষ্যে কোনো কূট কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করবে। কেউ যদি এমন করে তাহলে বুঝতে হবে, নবী করীম (সা:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা যে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেছেন, সে ব্যক্তি তাঁর উক্ত মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলো না।
কোনো মানুষ যদি রাজনীতি, অর্থনীতি, স্বরাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, শিক্ষানীতি, শ্রমনীতি, ভূমি ও রাজস্বনীতি, বিচারনীতি, সমরনীতি, শিল্প ও বাণিজ্যনীতি, বিবাহনীতিসহ যাবতীয় নীতিমালার ক্ষেত্রে নবী করীম (সা:) এর পেশকৃত নীতিমালা পরিহার করে অন্য কারো নীতিমালা অনুসরণ করে এবং শুধুমাত্র নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ইত্যাদি ক্ষেত্রে নবী করীম (সা:) এর সিদ্ধান্ত মেনে নেয় এবং সেই ব্যক্তিকে আল্লামা-মাওলানা, আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ নামে খ্যাত লোকজনও যদি 'পরহেজগার মুসলিম' বলে, ঘোষণা দেয়, তবুও সে ব্যক্তি মুসলিম নয়। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَّلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُوْنَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ط وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا -
যখন আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূল কোনো ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষনা করেন তখন কোনো মুমিন পুরুষ ও কোনো মুমিন নারীর এ অধিকার নেই যে, তারা সে ব্যাপারে নিজেদের এখতিয়ার প্রয়োগ করবে, যে কেউই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করবে সে নিঃসন্দেহে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত হয়ে যাবে। (সূরা আল আহযাব-৩৬)
যদিও উল্লেখিত আয়াত হযরত যয়নব ও হযরত যায়েদ (রা:)-এর বিয়ে উপলক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছিলো, কিন্তু আয়াতে বর্ণিত বিধান কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুসলিম নর-নারীর জন্যেই প্রযোজ্য। মুসলিম হওয়ার অর্থ বা মুসলিম হিসাবে দাবী করার মর্মার্থই হলো, জীবনের সকল ইচ্ছা-অনিচ্ছা, পছন্দ-অপছন্দ, স্বাধীনতা, দৃষ্টিভঙ্গি, মতামত, রুচি- অভ্যাসসহ সকল কিছু মহান আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূল (সা:) এর সিদ্ধান্তের অধীন করে দেয়া।
নিজের জীবনের ক্ষুদ্র পরিসর থেকে সূচনা করে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের বৃহত্তর পরিসরে সকল ক্ষেত্রে আনুগত্যের মাথানত করে দিতে হবে কেবলমাত্র নবী করীম (সা:) এর আনীত বিধানের সম্মুখে। মসজিদে বা নামাজে কিছু সময় ব্যয়ের ক্ষেত্রে মুসলিম হওয়া আর রাজনৈতিক ময়দানে বা পার্লামেন্টে জীবিত বা মৃত নেতার গোলামী করা, এ দু'টো সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী বিষয়। সকল ক্ষেত্রে গোলামীর মস্তক অবনত থাকতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহর সম্মুখে এবং নবী করীম (সা:) কে একমাত্র আদর্শ নেতা মেনে তাঁকেই অনুসরণ করতে হবে।
যে ব্যক্তি মুসলমান হিসাবে পৃথিবীতে জীবন যাপন ও আখিরাতের ময়দানে মুসলিম হিসাবে মহান মালিক আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান হতে চায়, তাকে অবশ্য অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সিদ্ধান্তের সম্মুখে আনুগত্যের মস্তক নত করে দিতেই হবে। মত প্রকাশ বা বাক স্বাধীনতার নামে যারা দম্ভ অহঙ্কারের চূড়ায় অবস্থান করতে চায়, মুসলিম হিসাবে দাবী করার তাদের কোনো অধিকার নেই বরং তারা স্বঘোষিত মুনাফিক।