📄 সর্বশ্রেষ্ঠ মাকামে নবী করীম (সা:)
নবী করীম (সা:) এর জীবনে কখন মিরাজ অনুষ্ঠিত হয়েছিল এ সম্পর্কে ইতিহাসে মত পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। মদীনায় হিজরতের পূর্বে মক্কায় মিরাজ অনুষ্ঠিত হয়েছিল এ সম্পর্কে মতপার্থক্য নেই। সে সময় নির্দিষ্ট কোনো বছর বা সনের প্রচলন ছিল না বিধায় কোন্ মাসের কোন্ তারিখে মিরাজ অনুষ্ঠিত হয়েছিল তা নিয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। তবে কুরআন ও হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী মিরাজ রাতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মাস সম্পর্কে কেউ বলেছেন রমজান মাসের ১৭ তারিখ, কেউ বলেছেন রবিউল আউয়াল, আবার কেউ বলেছেন রজব মাসের ২৭ তারিখ বা শাওয়াল মাসে।
বছর সম্পর্কে বলা হয়েছে হিজরতের তিন বছর পূর্বে। হযরত আবু তালিব এবং হযরত খাদিজা (রা:) এর ইন্তেকালের পরে যে মিরাজ হয়েছিল এ কথার সমর্থন পাওয়া যায় হযরত আয়িশা (রা:) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসে। তিনি বলেছেন 'পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হবার পূর্বেই হজরত খাদিজা (রা:) ইন্তেকাল করেছিলেন এবং হিজরতের তিন বছর পূর্বে মিরাজ অনুষ্ঠিত হয়েছিল'।
হাদীস ও সিরাতের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে এটা বুঝা যায়, হিজরতের এক বছর পূর্বে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল। এ ধরণের আরো কিছু বর্ণনা থেকে জানা যায় হিজরতের পূর্বেই মিরাজ হয়েছিল। আর এই সময় মিরাজ হওয়াও ছিল সময়ের দাবী। কারণ আর মাত্র এক বছর বাকী ছিল ইসলামকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার। রাষ্ট্র প্রধানের কি দায়িত্ব এবং কর্তব্য তা নবী করীম (সা:) কে শিক্ষা দেয়ার প্রয়োজন ছিল। ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার মত লোক মক্কাতেই নানা ঘাত- প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে প্রস্তুত হচ্ছিল। নবী করীম (সা:) জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সাড়ে বারো লক্ষ বর্গ মাইল এলাকা ব্যাপী বিস্তৃত একটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
হিজরতের পরপরই তাঁর জীবন ধারায় মহান আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে বিরাট পরিবর্তন আসবে, দীর্ঘ তেরো বছর ধরে তিনি নির্মম নির্যাতন সহ্য করেছেন, তাঁর চোখের সামনে তাঁরই প্রাণ প্রিয় সাহাবায়ে কেরাম নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতিত হয়েছে, প্রতিকার করতে পারেননি, এ সবের অবসান ঘটবে এবং এবার আঘাত এলে প্রতিঘাত করা হবে, বিশাল একটি রাষ্ট্রের- যে রাষ্ট্রে নানা রঙের, বর্ণের, ভাষার, ধর্মের, জাতির লোক বাস করবে, এমন একটি রাষ্ট্রের খুটিনাটি আইন-কানুনের প্রয়োজন। এ সকল দিক সামনে রেখেই তাঁর মিরাজ যথা সময়েই মহান আল্লাহ সংঘটিত করেছিলেন। বিশাল সে রাষ্ট্রের মূলনীতি কি কি, মহান আল্লাহ তাঁকে জানিয়ে দিলেন।
নবী করীম (সা:) এবং মুসলমানগণ যে চরম সমস্যার মুকাবিলা করছিলেন এবং সে সমস্যা অচিরেই দূরীভূত হয়ে সৌভাগ্য- শশী উদিত হবে, তারই শুভ ইঙ্গিত ছিল পবিত্র মিরাজ। হিজরতের পর হতে সার্বিক কল্যাণ, শান্তি ও নিরাপত্তার এক নতুন পৃথিবীর দ্বার উদঘাটন হবে, ঠিক সে সময়েই এমন এক মহিমান্বিত রাতের আগমন ঘটলো, যে রাত ছিল মহান আরশে আজীমে পৌঁছার গৌরবময় রাত। এ রাতে মহান আল্লাহ পৃথিবীতে যত কার্যকরী উপাদান রয়েছে সে সব উপাদানসমূহকে নির্দেশ দিলেন, আকাশ ও পৃথিবীর যাবতীয় নিয়ম পদ্ধতি যেন পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় থাকে। জান্নাতের দ্বাররক্ষীকে আদেশ করা হলো, সম্মানিত মেহমান আগমন করবেন, সকল কিছুই নবসাজে সজ্জিত করা হোক। যে পথে মেহমান আগমন করবেন এবং যে সকল এলাকা পরিদর্শন করবেন, সে পথসমূহ এবং এলাকাসমূহ সজ্জিত করা হোক। হযরত জিবরাঈল (আ:) কে আদেশ করা হলো, দ্রুতগামী যা কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে তার তুলনায়ও অধিক দ্রুতগামী বাহন মেহমানের জন্য প্রস্তুত করে যথাস্থানে প্রস্তুত রাখা হোক।
মহামান্য অতিথিকে স্বাগত জানানোর জন্য উর্ধ্ব জগতের সকল কিছু প্রস্তুত হয়ে গেল। যাত্রা পথে জান্নাতি সুরের তরঙ্গ সৃষ্টি করা হলো। সর্বত্র জান্নাতের আনন্দ সমিরণ প্রবাহিত হতে থাকলো। মানুষ যে জগতের স্পর্শ সহ্য করতে সক্ষম সে শক্তি নবী করীম (সা:) কে দান করার জন্য হযরত জিবরাঈল (আ:) মর্ত্যধামে পবিত্র মক্কায় উপস্থিত হলেন। বুখারী, মুসলিম হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে, হযরত আবুজার (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা:) যে গৃহে অবস্থান করছিলেন সে গৃহের ওপরের আবরণ উন্মুক্ত করা হলো। জিবরাঈল (আ:) প্রবেশ করে রাসূল (সা:) এর বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। প্রয়োজনীয় কাজ সমাপ্ত করে তাঁর বুকের ভেতরে পবিত্র জমজমের পানি দিয়ে পরিষ্কার করলেন। তারপর বিশ্বাস এবং যাবতীয় জ্ঞান তাঁর ভেতরে প্রবেশ করানো হলো। এরপর নেয়া হলো মাসজিদুল আকসায় এবং সেখান থেকে হযরত জিবরাঈল (আ:) তাঁকে নিয়ে প্রথম আকাশে এসে দ্বার রক্ষককে বললেন, 'দ্বার উন্মুক্ত করো'।
রক্ষী জানতে চাইলেন, 'কে?' জিবরাঈল (আ:) নিজের পরিচয় দিলেন। তাঁকে আবার প্রশ্ন করা হলো, 'আপনার সাথীর পরিচয় দিন?' উত্তর দেয়া হলো, 'আমার সাথী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা:)'।
এভাবে বিশ্বনবী (সা:)-এর পরিচয় জানার পরে দ্বার উন্মুক্ত করা হলো। এরপর তাঁকে নিয়ে জিবরাঈল (আ:) প্রথম আকাশে আরোহণ করলেন। সেখানে তিনি একজন মানুষকে বসে থাকতে দেখলেন, তাঁর দক্ষিণ পাশে একদল মানুষ এবং তিনি তাদেরকে দেখে হাসেন এবং তাঁর বাম পাশে একদল মানুষ তিনি তাদেরকে দেখে কাঁদেন। রাসূল (সা:) কে দেখে তিনি বললেন, 'হে মর্যাদাবান সন্তান! সম্মানিত নবী! স্বাগতম!'
নবী করীম (সা:) সঙ্গীকে সে ব্যক্তির পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন, সঙ্গী তাঁকে জানালো তিনি হযরত আদম (আ:)। তাঁর ডানদিকে যাদেরকে দেখলেন তাঁরা জান্নাতি আর বামদিকে যাদেরকে দেখলেন তারা জাহান্নামী। এ কারণে তিনি ডানদিকে তাকিয়ে হাসেন আর বাম দিকে তাকিয়ে কাঁদেন। এরপর তাঁকে দ্বিতীয় আকাশে আরোহণ করানো হলো। সেখানেও তাঁর সাথে নবীদের সাক্ষাৎ ঘটলো। এভাবে একটির পরে আরেকটি আকাশ পার হয়ে তিনি ষষ্ঠ আকাশে কতক নবীদের সাক্ষাৎ পেলেন। সকল নবী-রাসূল তাঁকে স্বাগত জানালেন। এরপর আকাশের সকল স্তর অতিক্রম করে জিবরাঈল (আ:) তাকে আল্লাহর আরশে আজীমের কাছে পৌঁছে দিলেন। মহান আল্লাহর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় উপহার নিয়ে তিনি নিচের দিকে এলেন।
নবী করীম (সা:) তাঁর উম্মতের জন্য দিনে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজসহ ফিরছিলেন। হযরত মূসা (আ:) এর সাথে সাক্ষাৎ ঘটলে তিনি জানতে চাইলেন, 'আপনার উম্মতের জন্য কি উপহার দেয়া হলো?' তিনি জানালেন নামাজের কথা। মূসা (আ:) বললেন, 'আপনি আল্লাহর কাছে ফিরে যান, আপনার উম্মত পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারবে না'।
নবী করীম (সা:) আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে আবেদন জানালেন, মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে নামাজ কমিয়ে দিলেন। মূসা (আ:) তাঁকে পরামর্শ দিলেন, 'আপনার উম্মত নামাজের এই সংখ্যাও আদায় করতে পারবে না। আপনি ফিরে গিয়ে আরও কমিয়ে আনুন'। এ ধরনের ঘটনা কয়েকবার ঘটলো। শেষে যখন মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত অবশিষ্ট রইলো তখন মহান আল্লাহ জানালেন, আমার আদেশের পরিবর্তন হয় না। এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করলেই পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব দেয়া হবে। এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও মূসা (আ:) পরামর্শ দিলেন কমিয়ে আনার জন্য। নবী করীম (সা:) তাঁকে জানালেন, 'আল্লাহ তা'য়ালাকে এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কমিয়ে দেয়ার কথা বলতে আমি ভীষণ লজ্জা অনুভব করছি'।
এবার তাঁকে সুসজ্জিত সিদরাতুল মুনতাহা পরিদর্শন করানো হলো। জান্নাত দেখানো হলো, জান্নাতে মোতির তৈরী প্রাসাদসমূহ দেখলেন এবং সেখানের মাটি ছিল মিল্ক দিয়ে নির্মাণ করা।
একটি বিষয় উল্লেখ করা আবশ্যক যে, মিরাজের পূর্ণাঙ্গ ঘটনা কোনো একটি হাদীসেও উল্লেখ করা হয়নি। অনেকগুলো হাদীস একত্রিত করলে তারপর সম্পূর্ণ ঘটনা একত্রিত করা যায়। এর কারণ হলো, বর্ণনাকারীদের ভেতরে যিনি ঘটনার যতটুকু শুনেছেন ততটুকুই বর্ণনা করেছেন। কোনো বর্ণনায় আছে, নবী করীম (সা:) কা'বাঘরের হাতিম এলাকায় ঘুমিয়ে ছিলেন। কুরাইশরা যখন কা'বা মেরামত করেছিল সে সময় তারা অর্থের অভাবে একটি অংশ বাদ রেখে কা'বার পুন:নির্মাণ করেছিল। ঐ বাদ দেয়া অংশকেই হাতিম বলে। বর্তমানেও সে অংশ রয়েছে। এখানেই তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। আরেক বর্ণনায় রয়েছে, তিনি হযরত উম্মে হানি (রা:) এর ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন।
হজরত জিবরাঈল (আ:) নবী করীম (সা:) কে ঘুম থেকে জাগিয়ে তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। তারপর প্রয়োজনীয় কাজ সেরে তাঁকে একটি অদ্ভুত দর্শন পশুর ওপরে আরোহণ করালেন। পশুটি ছিল গাধা এবং ঘোড়ার আকৃতির মাঝামাঝি এবং দু'পাখা বিশিষ্ট। যার নাম বর্ণনা করা হয়েছে বুরাক। আরবী বুরাক শব্দ বারকুন শব্দ থেকে এসেছে। এ শব্দের অর্থ হলো, বিদ্যুৎ। এই পশুটির রং ছিল সাদা। হযরত জিবরাঈল (আ:) এর ইশারায় উক্ত বুরাক মুহূর্তের মধ্যে বাইতুল মাকদিসে এসে উপনীত হলো। সেখানে বিশ্বনবী (সা:) অসংখ্য নবী-রাসূল ও ফেরেশতা দেখলেন, তাঁরা তাঁকে স্বাগত জানালেন। তিনি তাদের সাথে কুশল বিনিময়ের পরে তাঁরা সকলেই নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। ইমামের স্থান ছিল শূন্য, বিশ্বনবীকে সেখানে এগিয়ে দেয়া হলো। এভাবে সকল নবী-রাসূল এবং ফেরেশেতাগণ বিশ্বনবীর নেতৃত্বে নামাজ আদায় করলেন।
আরেক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, বাইতুল মাকদিসে নামাজ আদায় করা হয়েছিল মিরাজ থেকে প্রত্যাবর্তনের সময়। উর্ধ্ব জগতে যাবার সময় বাইতুল মাকদিসে তাঁর সামনে দু'টো পানীয় পূর্ণ পাত্র উপস্থিত করা হলো। একপাত্রে ছিল শরাব অন্যটিতে দুধ। নবী করীম (সা:) দুধের পাত্র উঠিয়ে পান করলেন। হযরত জিবরাইল (আ:) বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! উন্নত চরিত্র আপনার মধ্যে বিদ্যমান। আপনার উম্মতের মধ্যেও এমন হবে। শরাব আপনার জন্য নিষিদ্ধ'।
আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁকে উর্ধ্ব জগতে উঠানো হয়। আকাশের বিভিন্ন স্তরে সম্মানিত নবী-রাসূলদের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে। এরপর তাঁকে উপস্থিত করা হয় সিদরাতুল মুনতাহায়। এখানে পৌঁছার পরে হযরত জিবরাইল (আ:) তাঁকে বিনীতভাবে অবগত করেন, 'আমাদের জন্যে এই সীমা অতিক্রম করার অনুমতি নেই'।
প্রমাণ হয়ে গেল যেখানে হযরত জিবরাঈল (আ:) যেতে পারেন না, সেখানে নবী করীম (সা:) এর অবাধ পদচারণা। তারপর তিনি বাইতুল মামুরে পৌঁছলেন। এই বাইতুল মামুর হলো কা'বার মৌলিক ভবন। এখান থেকে তাঁকে মহান আল্লাহ নিজের সান্নিধ্যে ডেকে নেন। তিনি মহান আল্লাহকে দেখেছিলেন কিনা এ সম্পর্কে আলোচনা না করাই উত্তম। তাঁর দেখা না দেখার সাথে পৃথিবীর মানুষের জীবনের কোনো সমস্যা জড়িত নয়। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে কল্পকাহিনী রচনা করা বা তা নিয়ে মস্তিষ্ক উত্তপ্ত করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ব্যাপার। আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে নিজের সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন, 'কোনো মানব চক্ষু আমাকে দেখতে পারে না'। নবী করীম (সা:) ও মহান আল্লাহর ঘোষণা অনুযায়ী মানুষ ছিলেন, তবে তিনি আমাদের মতো মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার বিশেষ সৃষ্টি মহামানব। আল্লাহ তা'য়ালার ঘোষণা তাঁর জন্যেও প্রযোজ্য।
এরপর জান্নাত- জাহান্নাম এবং মহান আল্লাহর নানা কুদরত তাঁকে পরিদর্শন করানো হলো। সৎ কর্মের কি পুরস্কার এবং আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করলে কি ধরনের শাস্তি ভোগ করতে হবে তা দেখানো হলো। মহান আল্লাহ যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে তাঁকে নিজের সান্নিধ্যে আহ্বান করেছিলেন তা পূর্ণ হবার পরে তাঁকে পুনরায় এই পৃথিবীতে প্রেরণ করা হলো। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কতটুকু সময়ের প্রয়োজন হয়েছিল তা মহান আল্লাহই অবগত আছেন। তবে বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখা যায়, রাতের কিছু অংশে তা সংঘটিত হয়েছিল। অনেকের কাছে বিষয়টি বোধগম্য নয়, রাতের সামান্য অংশে এতকিছু পরিদর্শন করা কি করে সম্ভব?
নবী করীম (সা:) কে মিরাজে নেয়ার সময় যদি পৃথিবীর গতি হরণ করা হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই এটা সম্ভব। একটি ঘড়িকে যদি রাত বারোটার সময় বন্ধ করে রাত চারটায় পুনরায় চালু করা হয়, তাহলে ঘড়ির কাঁটা ঐ রাত বারোটার স্থান থেকেই ঘুরতে থাকবে, রাত চারটার স্থান থেকে ঘুরবে না। তিনি যদি রাত একটার সময় যাত্রা আরম্ভ করে থাকেন আর সে সময়েই যদি সকল সৃষ্টির গতি মহান আল্লাহ বন্ধ করে দিয়ে থাকেন, তাহলে পৃথিবীর সময় তো স্থির হয়েছিল। সময় সামনের দিকে এগিয়ে যায়নি। তিনি যখন পৃথিবীতে পদার্পণ করেছেন তখন পুনরায় পৃথিবীকে গতিদান করা হয়েছে, স্থির সময় পুনরায় সামনের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। বিষয়টি যদি এমনই হয়ে থাকে তাহলে অবাক হবার কিছুই নেই। সে সময়ে কি ঘটেছিল মহান আল্লাহ তা'য়ালাই ভালো জানেন।
আজ থেকে শতকোটি বছর পূর্বে মহাকাশে, সাগরের অতল তলদেশে তথা পৃথিবীর কোথায় কি ঘটেছিল, গবেষণায় তা উদ্ঘাটন হচ্ছে। মিরাজ সংঘটিত হবার কালে পৃথিবীর সময় স্থির হয়ে পড়েছিল কিনা তা হয়তঃ একদিন গবেষণায় জানাও যেতে পারে। চাঁদে কবে কোন্ দিন কোন্ সময় ফাটল ধরেছিল তা যদি বর্তমানে বলে দেয়া সম্ভব হয়, তাহলে পৃথিবীর সময় কোনো এক শুভ মুহূর্তে স্থির হয়েছিল কিনা তা বলে দেয়া অসম্ভবের কিছুই নেই।
নবী করীম (সা:) মানুষকে মিরাজের কথা শোনানোর পরে ইসলাম বিরোধী গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের নতুন খোরাক পেয়েছিল এতে সন্দেহ নেই। কতক দুর্বল মুসলমানের ঈমান নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা:) শোনার সাথে সাথেই মন্তব্য করেছিলেন, 'আল্লাহর রাসূল যদি এ কথা বলে থাকেন যে তাঁর মি'রাজ হয়েছিল, তাহলে তা অবশ্যই সত্য'। এ কারনেই নবী করীম (সা:) হযরত আবু বকর (রা:) কে সিদ্দীক-এ আকবার উপাধী দান করেছিলেন।
সে সময় মক্কা থেকে জেরুজালিমে আসার যেসব বাহন ছিল, সেসব বাহন ব্যবহার করেও বাইতুল মাকদিসে আসতে কয়েক দিনের রাস্তা অতিক্রম করতে হতো। রাসূল (সা:) ইতোপূর্বে কখনো বাইতুল মাকদিস দেখেননি। তাঁকে যখন বাইতুল মাকদিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বাইতুল মাকদিস সম্পর্কে এমনভাবে বর্ণনা করেছিলেন যে, তিনি বোধহয় সে ভবনটির সামনে দাঁড়িয়ে ভবনটির খুটিনাটি দিক সম্পর্কে বর্ণনা করছেন। ভবনটির কোথায় কি আছে না আছে সম্পূর্ণ তিনি বলেছিলেন। তিনি যাত্রা পথে ব্যবসায়ীদের কিছু কাফেলাকে দেখেছিলেন, তাদের সম্পর্কে তিনি যা বলেছিলেন ব্যবসায়ী কাফেলা মক্কায় এলে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁর বর্ণনা আর তাদের বলা কথার ভেতরে পার্থক্য সূচিত হলো না। সুতরাং মিরাজের ঘটনা সে সময়েই ছিল প্রমাণীত সত্য। বর্তমানে মিরাজের বিষয় নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে তা একান্তই উদ্দেশ্যমূলক।
মিরাজ সম্পর্কে যে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে এর জন্য দায়ী আমরা মুসলমানরাই। কারণ আমরা গাছের শিকড় না ধরে তার শাখা প্রশাখা ধরে টানা হেঁচড়া করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। কি উদ্দেশ্যে তাঁর মিরাজ হলো, এর কেন্দ্রীয় লক্ষ্য কি, এর শিক্ষা কি, মিরাজ থেকে নবী করীম (সা:) মানব জাতির জন্য কি কল্যাণ বহন করে এনেছিলেন, এ সম্পর্কে লেখনিতে বা বক্তৃতায় আলোচনা না করে, মিরাজে তিনি কি কি দেখলেন, কোন্ পথে গেলেন, কার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটলো এসব গৌণ বিষয় নিয়ে আলোচনায় সময় অতিবাহিত করা হয়। ফল যা হবার তাই হয়েছে। এসব অলৌকিক বর্ণনা আধুনিক নাস্তিক্যবাদী শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়নি। মিরাজের মূল লক্ষ্যও অধিকাংশ মানুষ জানতে পারেনি। শোষিত বঞ্চিত মানুষের জন্য মিরাজ থেকে নবী করীম (সা:) মুক্তির কোন্ উপহার বহন করে আনলেন তা সাধারণ মানুষ জানতে পারেনি। বিষয়টি চিন্তাবিদ, গবেষক ও উচ্চ পর্যায়ের আলেমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
📄 উদ্ভূত প্রশ্ন ও তার জবাব
হাদীসের গ্রন্থসমূহে নবী করীম (সা:) এর মিরাজের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ২৫ বা ২৬ জনের এক বিরাট সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম মিরাজ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। এদের মধ্যে হযরত আয়িশা (রাঃ), হযরত আনাস (রাঃ), হযরত আবু জার (রাঃ), হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত হুজাইফা (রাঃ), হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত মালিক (রা:) সহ সাহাবায়ে কেরাম মিরাজের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। পবিত্র কুরআনে শুধুমাত্র মক্কার বাইতুল্লাহ শরীফ থেকে জেরুজালিমের বাইতুল মাকদাস পর্যন্ত ভ্রমণের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর নবীকে নিদর্শন দেখাবেন।
পবিত্র কুরআনে এর বেশি কিছু বিস্তারিত আলোচনা করা হয়নি। হাদীসে এই ঘটনার যে বিস্তারিত বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ হচ্ছে, গভীর রজনীতে হযরত জিবরাঈল (আ:) এসে তাঁকে উঠিয়ে বক্ষ বিদীর্ণ করে বুরাকে সওয়ার করিয়ে মক্কা থেকে মাসজিদুল আক্কসায় নিয়ে যান। সেখানে তিনি সকল নবী-রাসূলের সাথে নামাজ আদায় করেন। তারপর তাঁকে উর্ধ্ব জগতে নিয়ে যান। মহাকাশের বিভিন্ন স্তরে তাঁর সাথে সম্মানিত নবী-রাসূলের সাথে সাক্ষাৎ ঘটে। এরপর আরো উচ্চতায় তাঁকে আরোহণ করানো হয়। সেখান থেকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নিদের্শ গ্রহণ করেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এ সময় ফরজ করা হয়। এরপর তিনি পুনরায় বাইতুল মাকদাসে এসে পরে মক্কায় কা'বাঘরে আসেন।
বিভিন্ন হাদীস শরীফ থেকে জানা যায়, উর্ধ্ব জগতে তাঁকে জান্নাত ও জাহান্নাম প্রদর্শন করানো হয়। তিনি জাহান্নামে অপরাধীদের নানা ধরনের শাস্তি ভোগ করতে দেখেন। পুরস্কার প্রাপ্তদের জান্নাতে বিভিন্নভাবে ভোগ বিলাসে মগ্ন দেখেন। হাদীস শরীফ থেকে এ কথাও জানা যায় যে, নবী করীম (সা:) মিরাজের ঘটনা বর্ণনা করার পরে ইসলাম বিরোধীগণ তাঁকে বিদ্রুপ করতে থাকে এবং কিছু সংখ্যক দুর্বল মুসলমানের বিশ্বাসের ভিত্তি কেঁপে ওঠে। হাদীসের এই যে বিস্তারিত বর্ণনা, তা পবিত্র কুরআনের বিপরীত নয় বরং কুরআনের বর্ণনার সম্প্রসারিত রূপ হাদীস শরীফের বিস্তারিত বর্ণনা। সুতরাং হাদীসের বর্ণনা অবিশ্বাস করে তা এড়িয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই।
আমরা ইতোপূর্বেই আলোচনা করেছি, এ বিষয়টি ধ্যান যোগে বা স্বপ্ন যোগে ঘটেনি। সম্পূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় শারীরিকভাবে মিরাজের ঘটনা ঘটেছে। পবিত্র কুরআনের 'সুবহান' শব্দের মধ্যেই এ কথা স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে যদি মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর একস্থান থেকে আরেক স্থানে সংবাদ প্রেরণ করা যায়, হাজার হাজার মাইল ব্যবধানে থেকে অবিকল কন্ঠে পরস্পরে কথা বলা যায়, মুহূর্তের মধ্যে একস্থান থেকে আরেক স্থানে গমন করা যায়, তাহলে হাদীসের বর্ণনাকে কিভাবে অস্বীকার করা যায়? একটি বিষয় সামনে রেখে নবীদের জীবনের অলৌকিক ঘটনাসমূহ আলোচনা করতে হবে। বিষয়টি হলো সম্ভব এবং অসম্ভব, এই দু'টো বিষয় সামনে রাখতে হবে।
সম্ভব এবং অসম্ভব- এই শব্দ দু'টো কার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা প্রথমে বিবেচনায় আনতে হবে। সৃষ্টির ক্ষেত্রে এ দু'টো শব্দ প্রয়োগ করা যায়। কিন্তু স্রষ্টার ক্ষেত্রে কি এ শব্দ দু'টো প্রযোজ্য? মানুষ যদি স্রষ্টার ক্ষেত্রেও সম্ভব অসম্ভবের প্রশ্ন উঠায় তাহলে বলতে হয়, সে ব্যক্তি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী, শক্তিধর, অসীম ক্ষমতাবান বলে বিশ্বাস করে না। হযরত আবু বকর (রা:) এবং অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম যেমন বিশ্বাস করতেন, আরশে আজীম থেকে নবী করীম (সা:) এর কাছে ওহীর আগমন যদি অসম্ভব না হয়, তাহলে মিরাজ কি করে অসম্ভব হতে পারে?
এক শ্রেণীর মানুষ প্রশ্ন তোলে হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনা সম্পর্কে। তাদের প্রথম প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহর কুদরত সর্বত্র বিরাজমান। তাঁর কুদরত সসীম নয় অসীম এবং কোথাও সীমাবদ্ধ নয়, নির্দিষ্ট কোনো স্থানে তাঁর ক্ষমতা অবস্থান করে না। কিন্তু বিশ্বনবী (সা:) কে আরশে আজীমে ডেকে নিয়ে তাঁর সাথে আল্লাহ কথোপকথন করলেন, এ থেকে তো এ কথাই প্রতীয়মান হয় আল্লাহ নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করছেন। নতুবা নবী করীম (সা:) কে আরশে আজীমে ডেকে নেয়া হলো কেনো? তিনি তো যে কোনো স্থান থেকেই নবীর সাথে কথা বলতে পারতেন? দ্বিতীয় যে প্রশ্ন করা হয়, বিশ্বনবী (সা:) কে জাহান্নামের শাস্তি প্রদর্শন করা হলো। বিভিন্ন অপরাধে মানুষ শাস্তি ভোগ করছে তা তিনি দেখে বর্ণনাও করেছেন। সৎ কাজের পুরস্কার হিসাবে জান্নাতে কে কিভাবে ভোগ বিলাসে মগ্ন আছে তা তিনি দেখে বর্ণনাও করেছেন। এখন পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হলো না, মানুষের বিচার হলো না, তাঁর পূর্বেই মানুষকে কিভাবে জান্নাতে পুরস্কার দেয়া হলো এবং কিভাবেই বা জাহান্নামে শাস্তি দেয়া হলো?
এমন প্রশ্নকারীদের চিন্তার দৈন্যতার কারণেই তাঁরা এ ধরনের প্রশ্ন করে। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রথম প্রশ্নের জবাব হচ্ছে, মহান আল্লাহর ক্ষমতা নিঃসন্দেহে অসীম। পক্ষান্তরে সৃষ্টির সাথে আচরণ করার সময় তিনি স্বীয় কোনো অক্ষমতা বা দুর্বলতার কারণে নয়, বরং সৃষ্টির দুর্বলতা বা অক্ষমতার কারণে সৃষ্টিকে বিশেষ স্থানে নিতে হয় এবং এটি সেই সৃষ্টির সর্বোচ্চ মর্যাদারই প্রমাণ বহন করে। মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির সাথে যখন কথা বলেছেন, সৃষ্টির অক্ষমতার কারণে বিশেষ সীমাবদ্ধ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়েছে, যেন তাঁর সৃষ্টি তাঁর সকল কথা শুনতে এবং বুঝতে পারে।
আল্লাহ তা'য়ালা সৃষ্টি জগতের অণু-পরমাণু বা তার থেকেও ক্ষুদ্র যদি কিছু থেকে থাকে সকল কিছুই দেখার ক্ষমতার অধিকারী। এই দেখার জন্য তাঁকে সময় ক্ষেপণ বা পৃথকভাবে দেখার প্রয়োজন হয় না। সকল সৃষ্টি তিনি তাঁর ক্ষমতা দিয়ে একবারেই দেখতে পান। কিন্তু মানুষ এর বিপরীত। মানুষকে কোনো কিছু দেখার জন্য সে স্থানে যেতে হয় বা দূরের কিছু দেখার জন্য কোনো কিছুর সাহায্য গ্রহণ করতে হয়। মানুষ একবারে এক দৃষ্টে একশতটি জিনিস দেখতে পারে না। তাকে পৃথকভাবে দেখতে হয়। মানুষের এই অক্ষমতার জন্যই তাঁকে মহান আল্লাহর দরবারে নির্দিষ্ট স্থানে যেতে হয়েছিল। মহান আল্লাহ কিছু দেখার জন্য কোনো স্থানের মুখাপেক্ষী নন। কিন্তু মানুষ স্থানের মুখাপেক্ষী। সীমাবদ্ধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের জন্য অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন সত্তার সাথে দেখা করা সম্ভব নয়। মানুষের এই দূর্বলতার কারণেই মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাহকে নির্দিষ্ট স্থানে আহ্বান করে বান্দাহর সাথে কথা বলেছিলেন।
মাটিতে দাঁড়ানো তিন বছর বয়স্ক শিশুর কপালে স্নেহভরে চুমো দিতে হলে একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষকে অবশ্যই নিচু হয়ে সে শিশুর কপালের কাছে তাঁর মুখ নিয়ে যেতে হবে। নতুবা শিশুর কপালের নাগাল পাওয়া যাবে না। বয়স্ক লোককে নিচু হয়ে শিশুর কপালের কাছে মুখ নিতে হলো, এ পদ্ধতি তাঁর দূর্বলতার কারণে গ্রহণ করতে হলো না, শিশুর দূর্বলতার কারণেই বয়স্ক লোকটিকে বসে বা কুজো হয়ে শিশুর কপালের কাছে নিজের মুখ নিতে হলো। শিশুর প্রতি স্নেহের বশে বয়স্ক ক্ষমতাবান মানুষকে তাঁর ক্ষমতার পরিধি সংকুচিত করে শিশুর কপালের কাছে নিজের মুখ নিতে হলো শিশুর অক্ষমতার কারণে, নিজের অক্ষমতার কারণে নয়।
এবার দ্বিতীয় যে বিষয়টি পুরস্কার এবং শাস্তির বিষয়। এসব বিষয়ে নবী করীম (সা:) কে যা দেখানো হয়েছিল তা প্রকৃত বিষয়ের প্রতীকী রূপমাত্র। এখানে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর অসীম ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাঁরই সৃষ্টি মানুষের কর্মের পরিণতি কি হবে তার প্রতীকী রূপ দেখিয়েছিলেন। জান্নাতে কিভাবে মানুষ আল্লাহ তা'য়ালার নেয়ামত ভোগ করবে এর প্রতীকী রূপ এবং জাহান্নামেও বাস্তব অবস্থার প্রতীকী রূপ তাঁকে দেখানো হয়েছিল। সুতরাং এ সকল বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অবকাশ নেই। আবারও ঐ পুরোনো কথারই পুনরাবৃত্তি করতে হচ্ছে, স্রষ্টার ক্ষমতা অসীম। তাঁর কাছে অসম্ভব বলে কিছুই নেই। অসম্ভব শব্দটি মানুষের জন্য প্রযোজ্য, স্রষ্টার জন্য নয়।
📄 নবী করীম (সা:) এর মিরাজ-মানবতার মুক্তি সনদ
নবী করীম (সা:) মহান আল্লাহ তা'য়ালার নির্দেশে পবিত্র মক্কার বুকে ইসলামী আন্দোলনের সূচনা করার প্রায় এক যুগ অতিবাহিত হবার পরে দিকে দিকে তাওহীদের স্রোত নীরবে প্রবাহিত হচ্ছিল। সামান্য সময়ের ব্যবধানেই সে স্রোত দু'কুল প্লাবিত বন্যার রূপ ধারণ করবে। ইসলাম বিরোধিরা তাওহীদের এই অদম্য স্রোতধারা বন্ধ করে দেয়ার লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালালেও তাওহীদের দুর্দমনীয় স্রোতধারার সম্মুখে তারা বাধার বিন্ধাচল দাঁড় করাতে পারেনি। নানা প্রচেষ্টায় এই স্রোতের কেন্দ্রবিন্দু নবী করীম (সা:) কে নিস্তব্ধ নিথর করার তৎপরতা চালিয়েছে।
কিন্তু তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তাওহীদের এই স্রোতধারা আরব ভূমির প্রত্যন্ত অঞ্চল প্লাবিত করেছে। এমন একটি গোত্রের অস্তিত্ব সে সময় ছিল না, যে গোত্রে দু'একজন মানুষ ইসলামী কাফেলার কর্মী ছিলেন না। আরবের আনাচে কানাচে সৃষ্টি হয়েছিল ইসলামী আন্দোলনের সক্রিয় সমর্থক। এ আন্দোলনের প্রভাবে প্রতিটি গোত্র ছিলো প্রভাবিত। এক যুগ পূর্বে নবী করীম (সা:) মাত্র একজন কর্মী হযরত খাদিজা (রা:) কে সাথে নিয়ে যে কার্যক্রমের পুনরাবৃত্তি করেছিলেন, আজ সে আন্দোলনের কর্মী প্রত্যেক ঘরে ঘরে।
খোদ মক্কাতেই অত্যন্ত নিষ্ঠাবান একদল মানুষ গড়ে উঠেছিল যারা এ মহান আন্দোলনের সাফল্যের জন্য যে কোনো বিপদের ঝুকি গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলেন। তাঁরা নিজের প্রাণ, কষ্টার্জিত ধন-সম্পদ অকাতরে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। সুদূর মদীনায় শক্তিশালী বিরাট দু'টি'গোত্র এই মহান কার্যক্রমের সমর্থক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সে সময় এটা একান্ত প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল, নবী করীম (সা:) কে মক্কা থেকে মদীনায় যেতে হবে এবং চারদিকে ছড়িয়ে থাকা বিক্ষিপ্ত মুসলিমকে একত্রিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করা। তিমিরাচ্ছন্ন রজনীর অবসান ছিল অত্যাসন্ন। পূর্ব গগণে তরুণ তপনের ইশারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ঠিক এই সময়েই মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর প্রিয় বান্দাহকে তাঁর কাছে ডেকে নিলেন। এ সময়েই তাঁর ওপর অবতীর্ণ করা হলো সূরা বনী ইসরাঈল। মহান ইসলামী রাষ্ট্রের ১৪ টি মূলনীতি দান করা হলো। শিক্ষাদান পর্যায়ে নৈতিকতা ও সমাজতত্বের এমন বড় বড় কতকগুলো মৌলনীতি উপস্থাপিত করা হলো, যার ওপরে ভিত্তি করে মানব জীবনের যাবতীয় সাংগঠনিক কাঠামো কায়েম করাই নবী করীম (সা:)-এর আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল। ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষকগণ এই ১৪টি মূলনীতিকে 'ইসলামের ঘোষণাপত্র' নামে আখ্যায়িত করেছেন।
এই ঘোষণাপত্র ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার এক বছর পূর্বেই সমগ্র আরববাসীর সামনে তুলে ধরা হয়েছিল। মিরাজের উপহার, বিশ্ব মানবতার এই মুক্তি সনদে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল, যে মহান উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য সামনে রেখে হযরত মুহাম্মাদ (সা:) সীমাহীন অত্যাচার ও নির্যাতন হাসি মুখে বরণ করে নিচ্ছেন, সে উদ্দেশ্য হলো সমগ্র মানব সমাজের কল্যাণ সাধন করা। এই ১৪টি মূলনীতির মধ্যেই নিহিত রয়েছে সমগ্র বিশ্বের মানবতার মহাকল্যাণ। এই মূলনীতির ভিত্তিতে যে সমাজ এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, সে সমাজ এবং রাষ্ট্রই হবে আকাশের নিচে আর মাটির বুকে একমাত্র আদর্শ রাষ্ট্র।
এই নীতির বাইরে অন্য কোনো নীতি অবলম্বন করা হলেই অশান্তি আর হাহাকার অনিবার্য। মানুষ প্রতি মুহূর্তে যে শান্তির জন্য লালায়িত, সে শান্তি এই মিরাজের উপহারের মধ্যেই নিহিত। মানুষের মুক্তির এটাই একমাত্র সনদপত্র। পবিত্র কুরআনে সূরা বনী ইসরাঈলে মিরাজের উপহার, মানব জাতির মুক্তির মহাসনদ পেশ করা হয়েছে। আমরা সে ১৪টি দফা এবং তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এখানে পেশ করবো। উল্লেখ্য এ সকল দফা উক্ত সূরার ২৩ নং আয়াত থেকে ৩৭ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।
وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ -
এক. 'তোমার মালিক ফায়সালা করে দিয়েছেন, একমাত্র তাঁর দাসত্ব ব্যতীত আর কারো দাসত্ব করো না'। (সূরা বনী ইসরাঈল-২৩)
প্রথম দফার তাৎপর্য হলো, আল্লাহ তা'য়ালা ব্যতীত আর কারো পূজা, উপাসনা, বন্দেগী, দাসত্ব তথা গোলামী এবং শর্তহীন আনুগত্য করা যাবে না। একমাত্র তাঁরই আদেশকে আদেশ এবং তাঁরই আইনকে আইন বলে গ্রহণ করতে হবে। তাঁর আইন ব্যতীত আর কারো আইন গ্রহণ ও অনুসরণ করা যাবে না। ইসলামী রাষ্ট্রের সকল আইনের উৎস হলেন মহান আল্লাহ তা'য়ালা। অন্য কথায় পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহ। নবী করীম (সা:) হিজরত করে মদীনায় যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, সে রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল এই কথাটির ওপরে যে, মহান আল্লাহই হলেন একমাত্র আইনদাতা। মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের বুনিয়াদ স্থাপিত হয়েছিল এ মতাদর্শের ভিত্তিতে যে, একমাত্র মহান আল্লাহই হলেন সমগ্র বিশ্বের মালিক এবং শাসক, তাঁর দেয়া আইনই এই পৃথিবী নামক রাষ্ট্রের আইন। একমাত্র মহান আল্লাহ তা'য়ালার দেয়া আইনই সকল ভুল-ভ্রান্তির উর্ধ্বে, এই আইনই মানব জাতির একমাত্র অনুসরণীয় আইন এবং সকল মানুষ শর্তহীনভাবে তাঁরই বিধান অনুসরণ করবে।
وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ط إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلاً كَرِيمًا - وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا -
দুই. 'তোমাদের পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো, তাদের একজন বা উভয়ই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয় তাহলে তাদের সাথে বিরক্তিসূচক কিছু বলো না এবং কখনো তাদের ধমক দিয়ো না, তাদের সাথে সম্মানজনক ভদ্রজনোচিত কথা বলবে। অনুকম্পায় তুমি তাঁদের প্রতি বিনয়াবনত থেকো এবং বলো, হে আমার মালিক, তাঁদের প্রতি ঠিক সেভাবেই তুমি দয়া করো, যেমন করে শৈশবে তাঁরা আমাকে লালন পালন করেছিলো'। (সূরা বনী ইসরাঈল-২৩-২৪)
অর্থাৎ শিশুকালে আমি যেমন অসহায় ছিলাম, আমার সেই অসহায় অবস্থায় আমার মাতা-পিতা আমার প্রতি যেমন মমতাভরে যত্ন নিয়েছেন, তারা আমার প্রতি যত্ন ও মমতা পোষণ না করলে কোনোক্রমেই আমার পক্ষে এই পৃথিবীতে জীবিত থাকা ও আমার পক্ষে বেড়ে ওঠা সম্ভব হতো না। আমার সেই মাতা-পিতা আজ বৃদ্ধাবস্থায় উপনীত হয়েছে, তারা অসহায়, হে আল্লাহ! আপনি তাদের প্রতি করুণা করুন!
দ্বিতীয় দফায় বলা হয়েছে, ইসলামী সমাজের মানসিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণ এবং মুসলমানদের সাংস্কৃতিক শিষ্টাচারের ক্ষেত্রে মাতা-পিতার প্রতি আচরণ ও আনুগত্য এবং তাদের অধিকারের রক্ষণাবেক্ষণকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ জিনিসগুলো চিরকালের জন্য এই নীতি প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছে যে, ইসলামী রাষ্ট্র নিজের আইন-কানুন, ব্যবস্থাপনামূলক বিধান ও শিক্ষানীতির মাধ্যমে পরিবার প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী ও সংরক্ষিত করার চেষ্টা ও পরিবারের ভিত্তি দৃঢ় করবে। কারণ, দেশের আদর্শ নাগরিক সরবরাহ করে আদর্শ পরিবার। পরিবারে যে শিশুর জন্ম হবে সে শিশুকে যদি ইসলামী আদর্শের ধাঁচে গঠন করা হয়, তাহলে সেই শিশুই হয় দেশের আদর্শ নাগরিক। এ কারণে দ্বিতীয় দফাতেই আদর্শ পরিবারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
কুরআনের গবেষকগণ উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, একজন মুসলমানের উপরে যেমন ফরজ মহান আল্লাহর আইন কানুন মেনে চলা তেমনিভাবে ফরজ মাতা-পিতার খেদমত করা। আল্লাহর অধিকারের পরেই মাতা-পিতার অধিকার। মাতা-পিতার সাথে সর্বোত্তম ব্যবহার করতে হবে। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর নিজের অধিকারের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে যেভাবে তাগিদ করেছেন ঠিক একইভাবে তাগিদ করেছেন মাতা-পিতার ব্যাপারে। মাতা-পিতা যখন বয়সের প্রান্তে পৌঁছে যায় তখন স্বাভাবিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়েন, আর দূর্বল মানুষ নিজেদেরকে অসহায় বোধ করেন। সে সময় সন্তানকে স্মরণ করতে হবে নিজের শৈশবের কথা।
শিশু বয়সে সে ছিল অসহায়, নড়াচড়া করার ক্ষমতাও ছিল না, ক্ষুধার যন্ত্রণায় মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেলেও বলার ক্ষমতা ছিলনা। মলমুত্র ত্যাগ করে শরীরে মাখামাখি করলেও নিজের ক্ষমতা ছিল না ঐ অবস্থা থেকে নিজেকে পরিচ্ছন্ন করার। সন্তানকে স্মরণ করতে হবে সে সময় মাতা ব্যতীত তার কোনো উপায় ছিল না। সেই মুহূর্তে পিতা-মাতা অসীম স্নেহ মমতা ভালোবাসা দিয়ে, আন্তরিকতার সাথে অবর্ণনীয় দুঃখ যন্ত্রণা সহ্য করে তাকে প্রতিপালিত করেছেন। তাঁরা সন্তানের আনন্দে আনন্দিত হয়েছেন আর কষ্ট দেখলে বিচলিত হয়েছেন।
এসব কারণে সন্তানকে নিজের শৈশবের কথা স্মরণ করে মাতা-পিতার জন্য আন্ত রিকতার সাথে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে, 'রাব্বুল আলামীন! আমার শৈশব কালে তাঁরা যেমন আমাকে অসীম মায়া-মমতা ও ধন-সম্পদ ব্যয় করে প্রতিপালিত করেছেন, তাদের এই বৃদ্ধাবস্থায় তুমি তাদের প্রতি করুণা বর্ষণ কর'!
মানুষ বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হলে শারীরিক পরিবর্তনের সাথে সাথে মানসিক পরিবর্তনও সাধিত হয়। মানুষের মন মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, অল্পতেই মানুষ বিরক্ত হয়ে পড়ে। মাতা-পিতার ক্ষেত্রেও এমনটি হয়। সন্তানকে বুঝতে হবে, বয়সের কারণে মা-বাপ নানা ধরনের অনাকাঙ্খিত কথা-বার্তা বলবে। সুতরাং সন্তানের কর্তব্য হচ্ছে বয়সের কারণে তাদের রূক্ষ মন-মানসিকতার প্রতি সদা সতর্ক সজাগ দৃষ্টি রাখা। এ সময় মা-বাপ যত কথাই বলুন না কেনো, তাদের প্রতিটি কথাই পরম খুশী ও ধৈর্যের সাথে গ্রহন করা, তাদের কথায় বিরক্তি প্রকাশ বা তাদের সাথে ক্রোধভরে কথা না বলা। তাদের সাথে কথাবার্তায় আচার আচরণে, চলা ফেরায় সন্তানকে হতে হবে বিনয়ী এবং কোমল স্বভাবের। তাদের আদেশ সন্তুষ্টির সাথে পালন করতে হবে। তাদের সামনে অনুগত হয়ে থাকতে হবে, বৃদ্ধ বয়সে মাতাপিতা যখন দূর্বল হয়ে অপরের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েন, সে সময় সন্তানকে একজন অনুগত ভৃত্যের ন্যায় তাদের সাথে আচরণ করতে হবে। মাতা-পিতার খেদমত করে তাদের প্রতি সন্তান করুণা বা অনুগ্রহ করছে এই ধারণা মনে স্থান দেয়া যাবে না। বরং তাদের খেদমত করে অন্তরে তৃপ্তি অনুভব করতে হবে, সন্তান তার মাতা-পিতার খেদমত করার সুযোগ পেয়েছে, এ কারণে সে মহান আল্লাহর দরবারে সেজদাবনত হয়ে শুকরিয়া আদায় করবে।
বৃদ্ধ বয়সে মাতা-পিতা নানা ধরনের অনাকাঙ্খিত, অবাঞ্ছিত, বিরক্তিকর কথা বলতে পারে। এ সময়ে সন্তান মোটেও বিরক্ত হবে না। তাকে স্মরণ করতে হবে তার নিজের শৈশব কালের কথা, সে সময়ে স্বয়ং সে শিশু অবস্থায় নানা ধরনের বিরক্তিকর প্রশ্ন করেছে, প্রশ্নের পরে প্রশ্ন করে তাঁদেরকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে, মা-বাপ তার শিশুসুলভ সকল আচরণ ধৈর্যের সাথে, হাসি মুখে মেনে নিয়েছেন, মমতাসিক্ত কণ্ঠে শিশু সন্তানের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। এ সকল কথা স্মরণে রেখে মা-বাপের সাথে উত্তম আচরণ করতে হবে। সন্তানকে প্রত্যেক মুহূর্তে মাতা- পিতার মর্যাদার প্রতি সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
কেননা বৃদ্ধ বয়সে মানুষের মান অভিমান, ক্রোধ বৃদ্ধি পায় বা মানসিক ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটে। বৃদ্ধ বয়সে মা-বাপ নিজের মান-মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য, নিজের গুরুত্ব প্রকাশ করার জন্য নানা কথা বলতে থাকেন। কারণে অকারণে ক্রোধ প্রকাশ করতে থাকেন, কোনো বিষয়ে মতামত দিলে তার মতামতই মেনে নেয়ার জন্য অহেতুক চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। সন্তানদের প্রতি তিনি যে অসন্তুষ্ট এ ব্যাপারে মত প্রকাশ করেন। সন্তানকে তাদের এ সকল অহেতুক আচরণ হাসি মুখে সহ্য করতে হবে। কোনক্রমেই বিরক্তি প্রকাশ করা যাবে না। সন্তানকে মনে রাখতে হবে, সেও একদিন মা-বাপের মত বৃদ্ধ হয়ে তার নিজের সন্তানের মুখাপেক্ষী হবে।
মাতা-পিতা সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের উল্লেখিত আয়াতের সারমর্ম ইসলামী চিন্ত াবিদগণ যেভাবে বর্ণনা করেছেন, সেভাবেই উল্লেখ করা হলো। কুরআন- হাদীসের আলোকে নিজের সন্তনের ওপরে মাতা-পিতার দশটি হক বা অধিকার রয়েছে। সে অধিকারগুলো-
১। মাতা-পিতা যদি নিঃস্ব অভাবী হন তাহলে তাদের অভাব দূর করার আন্তরিক চেষ্টা এবং তাদের সকল প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করবে সন্তান।
২। যদি তাদের সেবাযত্নের প্রয়োজন হয় তাহলে সন্তান তাদের সেবাযত্ন করবে।
৩। তাদের যদি বাসস্থান বা পোষাক না থাকে তাহলে সন্তান তাদের বাসস্থান ও পোষাকের ব্যবস্থা করে দিবে।
৪। মাতা-পিতা আহবান করার সাথে সাথে তৎক্ষণাৎ সন্তান তাদের সামনে উপস্থিত 'হবে।
৫। তাঁদের সামনে ভদ্র ও নম্র ভাষায় কথা বলতে হবে। কোনো অবস্থাতেই তাদের সাথে কর্কশ ভাষায় কথা বলা যাবে না।
৬। যে কোনো কারণই ঘটুক না কেনো তাদের সাথে সামান্যতম বেয়াদবি করা যাবে না।
৭। মাতা-পিতার সাথে একই সঙ্গে পথ চলতে গিয়ে তাদের সামনে চলা যাবে না, অপ্রয়োজনে তাদের ডানে বামে যাওয়া যাবে না।
৮। সন্তান নিজের জন্য যা পছন্দ-অপছন্দ করবে মা-বাপের জন্যও তাই করবে।
৯। সন্তান মাতা-পিতার জন্য নামাজ আদায় করে দোয়া করবে। যে সকল সন্তান মা-বাপের জন্য দোয়া করে না তাদের জীবনযাত্রা সমস্যা সংকুল হয়। অপরদিকে যে কোনো সমস্যা দেখা দিলে মাতা-পিতার জন্য দোয়া করলে সমস্যা দূর হয়ে যায়।
১০। মাতা-পিতা আদেশ দিলে তৎক্ষণাৎ পালন করতে হবে। অবশ্য তাদের আদেশ আল্লাহ- রাসূলের আদেশের বিপরীত হলে সে আদেশ পালন করা যাবে না।
মাতা-পিতা ব্যতীত যেমন কোনো মানুষের পক্ষে এই পৃথিবীতে আগমন করা অসম্ভব ঠিক তেমনি অসম্ভব পরকালে মুক্তি অর্জন করা। এ কারণে কোনো মানুষ নিজের মাতা-পিতা হতে সম্পর্কহীন হতে পারে না। পৃথিবীর জীবনে তাদের গুরুত্ব যেমন অপরিসীম ঠিক তেমনি আখেরাতের জীবনে সফলতা ও মুক্তির জন্যও তাদের গুরুত্ব সীমাহীন। মা-বাপকে খুশী করে এই পৃথিবীর জীবনে যেমন কল্যাণ পাওয়া যাবে তেমনি পরকালেও জান্নাত পাওয়া যাবে। সুতরাং কোনো অবস্থাতেই মাতা-পিতার অধিকার পদদলিত করা যাবে না।
وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيْلِ -
তিন. আত্মীয়-স্বজনকে তাদের যথার্থ পাওনা আদায় করে দিবে এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদেরও তাদের অধিকার বুঝিয়ে দিবে। (সূরা বনী ইসরাঈল-২৬)
وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا - إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ طَ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا -
চার. অপব্যয় করো না। অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অকৃতজ্ঞ। (সূরা বনী ইসরাঈল-২৬-২৭)
وَإِمَّا تُعْرِضَنَّ عَنْهُمُ ابْتِغَاءَ رَحْمَةٍ مِّنْ رَّبِّكَ تَرْجُوْهَا فَقُل لَّهُمْ قَوْلًا مَّيْسُوْرًا -
পাঁচ. যদি তাদের থেকে (অভাবী আত্মীয়, অসহায় মানুষ, মুসাফির এবং বিপদগ্রস্ত মানুষ) তোমাকে মুখ ফিরিয়ে নিতে হয় এ কারণে যে, বর্তমানে তুমি আল্লাহ তা'য়ালার দেয়া করুণার সন্ধানে ব্যস্ত রয়েছো, তাহলে তাদেরকে কোমল কন্ঠে উত্তর দাও। (সূরা বনী ইসরাঈল-২৮)
এই কয়েকটি দফার মূল উদ্দেশ্যে হলো রাষ্ট্রের নাগরিক তাঁর স্বীয় রোজগার এবং অর্থ-সম্পদ একমাত্র নিজের ভোগ-বিলাসের জন্যই নির্দিষ্ট করে নিবে না। বরং ভারসাম্যমূলক ও ইনসাফের সাথে নিজের প্রয়োজন পূর্ণ করার পরে তাঁর নিজের আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং অভাবী মানুষদের অধিকার প্রদান করবে। রাষ্ট্রের সমাজ জীবনে পারস্পরিক সাহায্য, সহানুভূতি ও সহযোগিতা, অপরের অভাব উপলব্ধি করা এবং তা দূর করার মানসিকতা জীবন্ত থাকবে। সচ্ছল ব্যক্তি অসচ্ছল ব্যক্তিকে সাহায্য করবে। ধনী আত্মীয় তাঁর গরীব আত্মীয়কে সাহায্য করবে। ইসলামী রাষ্ট্রে একজন মুসাফির যেখানেই যাবে, সেখানেই সে নিজেকে অতিথি বৎসল মানুষ কর্তৃক পরিবেষ্টিত দেখতে পাবে। ইসলামী সমাজে মানুষ অধিকার সচেতন হবে। ধনী ব্যক্তি সচেতন হবে তাঁর এ ধন-সম্পদে অভাবী মানুষদের অধিকার রয়েছে।
একজনের সম্পদ বিনষ্ট হতে দেখলে আরেকজন তা রক্ষা করবে। ধনী ব্যক্তি কাউকে কিছু দিলে তাঁর মনে এ ধারণা জাগবে না যে, সে গরীবের প্রতি অনুগ্রহ করছে। বরং তাঁর মনে এ ধারণা জাগ্রত থাকবে যে, সে তাঁর অধিকার আদায় করছে। কোনো মানুষের যদি দান করার ক্ষমতা না থাকে তাহলে সে মহান আল্লাহর কাছে দান করার ক্ষমতা প্রার্থনা করবে। কোনো অভাবী তাঁর কাছে এলে সে তাঁর কাছে বিনয়ের সাথে ক্ষমা চাইবে।
ইসলামের ঘোষণাপত্রের এই দফাগুলোর ভিত্তিতেই মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রে ওয়াজিব ও নফল সাদকার বিধানসমূহ কার্যকরী করা হয়। এ সকল দফার ভিত্তিতেই ওয়াকফ, অসিয়ত ও মীরাসের নিয়ম-কানুন নির্ধারিত হয়। ইয়াতিমের অধিকার সংরক্ষণ করা হয়। প্রত্যেক জনবসতীর ওপর মুসাফিরের নিম্নপক্ষে তিনদিন পর্যন্ত মেহমানদারী করার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
সমাজের নৈতিক ব্যবস্থা কার্যত এমন পর্যায়ে উন্নীত করা হয় যে, যার ফলে সমাজের সর্বস্তরে একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা, সহানুভূতি, সাহায্য-সহযোগিতা, দানশীলতার মন-মানসিকতা প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। এমনকি সমাজের জনগোষ্ঠীর মধ্যে দান করার প্রবণতা এমন তীব্র হয়ে ওঠে যে, স্বতস্ফূর্তভাবে আইনগত অধিকারসমূহ আদায় করা ছাড়াও আইনের জোরে যে সব নৈতিক অধিকার আদায় ও প্রদান করা যায় না, সে সব অধিকারসমূহ মানুষ উপলব্ধি করে তা আদায় করতে থাকে। এসব দফার ভিত্তিতে নবী করীম (সা:) এমনই এক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের মন-মানসিকতা এমন এক স্তরে উপনীত করেছিলেন যে, মানুষ অন্যের অধিকার আদায় না করা পর্যন্ত মনে শান্তি স্বস্তি অনুভব করতো না।
وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلى عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطُهَا كُلُّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُوْمًا مَّحْسُورًا -
ছয়. নিজের হাত গলার সাথে বেঁধে রেখো না এবং তা একেবারে খোলাও ছেড়ে দিও না, এমন করলে স্বয়ং তুমি নিন্দিত এবং দুর্বল হয়ে পড়বে। (সূরা বনী ইসরাঈল-২৯)
গলায় হাত বেঁধে রাখা, এটি রূপক কথামাত্র। এ কথাটি কৃপণতার অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর হাত খোলা ছেড়ে দেয়ার অর্থ হলো, হিসাব না করে খরচ করা, ভবিষ্যৎ চিন্তা না করে ব্যয় করা। ওপরের দফাগুলোর সাথে এই দফাটি একত্রে পড়লে এটা উপলব্ধি করা যায় যে, মানুষের মধ্যে এতটা ভারসাম্য থাকতে হবে, তাঁরা কৃপণ হয়ে অর্থ নিজের হাতে কুক্ষিগত না করে, অর্থের আবর্তন বন্ধ করে না দেয়, অপব্যয়ী হয়ে নিজের অর্থের সর্বনাশ না ঘটায়, নিজের অর্থশক্তি নিঃশেষ করে না দেয়। মানুষের ভেতরে ভারসাম্যের এমন সঠিক উপলব্ধিবোধ থাকতে হবে যে, মানুষ ব্যয় করার ক্ষেত্রে ব্যয় করবে এবং অপব্যয় করে নিজের অর্থশক্তি ধ্বংস করবে না।
অহংকার ও প্রদর্শনেচ্ছামূলক এবং লোক দেখানো ব্যয়, বিলাসিতা, নোংরা ও অশ্লীল কর্মে ব্যয়, এমন ধরনের খরচ যা মানুষের প্রকৃত প্রয়োজনে ও কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের বদলে অর্থ ভ্রান্ত পথে ব্যয় করে, এমন করা মহান আল্লাহ তা'য়ালার অনুগ্রহের সাথে অকৃতজ্ঞতা প্রদর্শনের শামিল। আর এসব যারা করে তাঁদেরকেই বলা হয়েছে শয়তানের ভাই।
এই দফা মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল। প্রকৃত বিষয়ও এটাই যে, একটি সৎ ও সত্যনিষ্ঠ সমাজকে নৈতিক অনুশীলন, সামষ্টিক চাপ প্রয়োগ ও আইনগত বাধা-নিষেধ আরোপের মাধ্যমে অযথা অর্থ ব্যয় থেকে বিরত রাখা উচিত। মদীনার রাষ্ট্রে প্রথমত অপব্যয় ও বিলাসিতার বহু নীতি প্রথাকে আইন প্রয়োগ করে উচ্ছেদ করা হয় এবং তা হারাম বলে ঘোষিত হয়। দ্বিতীয়ত পরোক্ষভাবে আইনগত কৌশল অবলম্বন করে বৃথা অর্থ ক্ষয়ের রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়।
সে সময় সমাজে এমন অনেক ধরনের প্রথা ও রসম রেওয়াজ চালু ছিল যা উদযাপন করতে প্রচুর অর্থ ব্যয় হত। ব্যয়ের এ সকল বাহুল্য পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ইসলামী রাষ্ট্রকে বিশেষ ক্ষমতা বলে এবং বিশেষ ব্যবস্থাপনায় বিধান জারী করে সুস্পষ্ট অপব্যয়ের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টির ক্ষমতা দেয়া হয়। যাকাত ও সাদকার বিধানের মাধ্যমে কৃপণতার অভ্যাসকে ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া হয়। মানুষ অর্থ-সম্পদ কুক্ষিগত করে অর্থের আবর্তনের পথ রুদ্ধ করে দেবে এ সম্ভাবনাও নির্মূল করে দেয়া হয়। এসব কৌশল গ্রহণ করার পাশাপাশি সমাজে এমন সাধারণ জনমত গঠন করা হয়, মানুষকে এমনভাবে শিক্ষিত করা হয় যে, দানশীলতা ও অপব্যয়ের মধ্যকার পার্থক্য নাগরিক সঠিকভাবে জানতো এবং কৃপণতা ও ভারসাম্যমূলক ব্যয়ের মধ্যে উত্তম রূপেই পার্থক্য করতে সক্ষম হত।
মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে যে জনমত গঠন করা হয়েছিল, সে জনমত কৃপণদেরকে অপমানিত করে, ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষাকারীদের সম্মানিত করে, অপব্যয়কারীকে নিন্দা করে, দানকারীদের সমাজের উঁচু স্তরে স্থান করে দেয়। মদীনার রাষ্ট্রে যে শিক্ষা দেয়া হয়েছিল, সে নৈতিক ও মানসিক প্রশিক্ষণের প্রভাব বর্তমানেও মুসলিম সমাজে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। বর্তমানেও পৃথিবীর সকল দেশে মুসলমানরা কৃপণদের ঘৃণার দৃষ্টিতে এবং অর্থ-সম্পদ কুক্ষিগতকারীকে ঘৃণার চোখে দেখে। দানশীল ব্যক্তিগণ বর্তমানেও মুসলমানদের দৃষ্টিতে মর্যাদাবান। কৃপণ যারা, তাদের সম্মান বর্তমানেও মুসলমানদের কাছে নেই।
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ ط نَّحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ ط إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خطرًا كبيرًا
সাত. দারিদ্রতার ভয়ে নিজেদের সন্তান হত্যা করো না। আমি তাদেরকেও রিযিক দান করবো এবং তোমাদেরকেও। প্রকৃত পক্ষে তাদেরকে হত্যা করা এক ভয়ংকর অপরাধ। (সূরা বনী ইসরাঈল-৩১)
সন্তান যাতে পৃথিবীতেই আসতে না পারে এ কারণে প্রাচীন কাল থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা ও উপায় উদ্ভাবন করা হয়েছে। জন্ম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সে যুগে আজল করা হতো। আজল করার অর্থ হলো, 'পুরুষের জনন ইন্দ্রিয় মিলন কালে শুক্র নির্গত হবার মুহূর্তে স্ত্রীর যৌনাঙ্গ থেকে বাইরে বের করে শুক্রপাত করা'।
এরূপ করলে সন্তান গর্ভে আসবে না এ ধরনের নিশ্চয়তা ছিলো না। অধিক সন্তানের কারণে অথবা সন্তান প্রয়োজন নেই এ কারণে মানুষ সন্তান জন্ম লাভের সাথে সাথে অথবা কিছুটা বড় হলে তাকে হত্যা করতো। শুধু কন্যা সন্তানকেই হত্যা করা হতো না, পুত্র সন্তানকেও হত্যা করা হত। এ যুগে সন্তান হত্যা করার পদ্ধতি আধুনিক রূপে পরিবর্তিত হয়েছে মাত্র। বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা প্রয়োগ করে সন্তান হত্যা করার বহুবিধ উপায় উদ্ভাবন এবং বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করে সন্তানকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জন্ম নিরোধের যত ধরনের উপায় এ পর্যন্ত উদ্ভাবন করা হয়েছে এসবের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে সন্তানকে এই পৃথিবীতে আসতে না দেয়া। এ ধরনের যাবতীয় কর্মকাণ্ড মানব জাতির জন্য মহাবিপদই ডেকে আনছে। জন্ম নিয়ন্ত্রণ তথা গর্ভনিরোধ, গর্ভপাত, সদ্যপ্রসূত সন্তান হত্যা বা ভ্রূণ হত্যা করা ইসলাম পরিপূর্ণভাবে হারাম ঘোষণা করেছে। ডাক্তার যদি স্বাস্থ্যগত বা অন্য কোনো বৈধ কারণে পরামর্শ দেন তাহলে সে কথা স্বতন্ত্র।
ঈমানদার ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত ইসলাম অন্য কোনো কারণে তথাকথিত জন্ম নিয়ন্ত্রণ বৈধ করেনি। নৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক তথা মানবিক সকল দিক দিয়েই তথাকথিত গর্ভনিরোধ অত্যন্ত অশুভ। যে মাতা-পিতা সন্তান কামনা করে না তারা স্বয়ং সন্তানের শত্রু হয়ে দাঁড়ায় এবং তারা যে গোটা মানব জাতির শত্রু হয়ে দাঁড়াবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? যে পিতামাতা স্বয়ং নিজের সন্তানের প্রাণের শত্রু হয়, তারা যে সকল মানুষের সাথে শত্রুতা করতে সামান্যতম দ্বিধা করবে না এ কথা নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায়।
এর কারণ, নিজ ঔরসজাত, নিজ গর্ভস্থ অথবা নিজের গর্ভের সন্তানকে স্বয়ং নিজের হাতেই নিঃশেষ করার জন্য সর্বপ্রথম নিজের মধ্যে চরম নিষ্ঠুরতা, অমানুষিকতা, কঠোরতা, নির্মমতা ও নিতান্তই পশুপ্রবৃত্তির উদ্ভব হওয়া আবশ্যক। নতুবা এমন ধরনের কাজ কোনো ব্যক্তির দ্বারা সম্ভব হতে পারে না। সমাজের মানুষের এই নিষ্ঠুরতা ও সন্তানের প্রতি কঠোর মনোভাব সংক্রমিত হয়ে সমগ্র জাতিকে গ্রাস করে এবং সমগ্র জাতির প্রতিই তা অবশেষে আরোপিত হয়।
অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও একথা সত্য, গোটা প্রাণী জগতে এমন দৃষ্টান্ত নেই, তারা নিজের সন্তানকে নিজেরাই ধ্বংস করে। ভাবতে বড় আশ্চর্য লাগে, যে কাজ পশু করে না সেই নোংরা কাজ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ কিভাবে করে? আজল প্রথা প্রাচীন আরব সমাজে প্রচলিত থাকলেও ইসলামী জীবন দর্শন তা মোটেও সমর্থন করেনি।
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلاً -
আট. ব্যভিচারের ধারে কাছেও অগ্রসর হয়ো না, তা অত্যন্ত গর্হিত কর্ম এবং খুবই নোংরা পথ। (সূরা বনী ইসরাঈল-৩২)
এই দফাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের আদিম রিপুর মুখে লাগাম দেয়া হয়েছে এই দফার মাধ্যমে। 'যিনা ব্যভিচার করো না' এ কথা বলা হয়নি, বলা হয়েছে যিনা ব্যভিচারের ধারে কাছেও যেও না। এই আদেশ যেমন ব্যক্তির জন্য তেমনি সমগ্র জাতির জন্য। একজন মানুষ ব্যভিচার থেকে দূরে থাকবে শুধু এমন নয়, বরং ব্যভিচারের দিকে একজন মানুষকে টেনে নিয়ে যায় ব্যভিচারের এমন সব সূচনাকারী এবং প্রাথমিক উদ্যোগ ও আকর্ষণ সৃষ্টিকারী বিষয়সমূহ থেকেও সে দূরে অবস্থান করবে। যিনা ব্যভিচার নারী ধর্ষণ এসব গর্হিত কাজ এমনিতেই ঘটে না। এসব কাজের পেছনে কিছু কার্যকারণ সক্রীয় থাকে। এই দফার প্রেক্ষিতে সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে ব্যভিচার, ব্যভিচারের উদ্যোগ এবং তার কারণসমূহের পথ বন্ধ করে দেয়া রাষ্ট্রের জন্য আবশ্যক হয়ে পড়ে। এ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে আইন প্রণয়ন, শিক্ষা ও অনুশীলন দান, সামাজিক পরিবেশের সংস্কার সাধন, রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের যথাযোগ্য বিন্যাস সাধন এবং অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যবস্থা অবলম্বন করবে। মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রে এই ধারা রাষ্ট্রের বুনিয়াদে পরিণত হয়। এই ধারা বলে ব্যভিচার এবং ব্যভিচারের অপবাদকে ফৌজদারী অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়।
ব্যভিচার বাস্তবায়নে উদ্যোগকারী অবাধ মেলামেশার বিরুদ্ধে নারী-পুরুষদের জন্য পর্দার আইন জারী করা হয়। নগ্নতা অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতার প্রচার ও প্রসার কঠোর হাতে দমন করা হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে এসবের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হয়। ব্যভিচারের নিকট আত্মীয় মদ, নাচ, যৌন উদ্দীপনামূলক গান ও ছবির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। সমাজের সর্বস্তর থেকে অপবিত্রতা বিদায় করা হয়। অর্থাৎ যেসকল কাজ মানুষকে ব্যভিচারের দিকে আকর্ষণ করে, সেসব কাজের শিকড় সমূলে উৎপটিত করা হয়। সেই সাথে বিয়ে সম্পর্কিত সহজ আইন প্রণয়ন করা হয়। নারীর অধিকার রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের মনে এমন আল্লাহভীতি সৃষ্টি করা হয় যে, মানুষ নিজের উদ্যেগেই ব্যভিচার সংঘটিত হবার কারণসমূহ উৎখাত করে।
وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالحَقِّ ط وَمَنْ قُتِلَ مَظْلُومًا فَقَدْ جَعَلْنَا لِوَلِيِّهِ سُلْطَانًا فَلَا يُسْرِفْ فِي الْقَتْلِ طَ إِنَّهُ كَانَ مَنْصُوْرًا -
নয়, কোনো জীবনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করো না, যা আল্লাহ তা'য়ালা হারাম করেছেন; যে ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয় আমি তার উত্তরাধিকারীকে (এ) অধিকার দিয়েছি (সে চাইলে রক্তের বিনিময় দাবী করতে পারে), তবে সে যেনো হত্যার (প্রতিশোধ নেয়ার) ব্যাপারে বাড়াবাড়ি না করে; কেননা (হত্যার মামলায় যে ব্যক্তি মযলুম) তাকেই সাহায্য করা হবে। (সূরা বনী ইসরাঈল-৩৩)
'প্রাণদণ্ডের শাস্তি প্রয়োগের অধিকার একমাত্র আদালতের' কোনো ব্যক্তি বা সমাজ এ শাস্তি প্রয়োগ করতে পারবে না। ভয়ঙ্কর অপরাধ যে কোনো ব্যক্তিই সংঘটিত করুক না কেনো, হত্যা করার মত শাস্তি প্রয়োগ আদালতের হাতে। 'সত্যের ভিত্তি ব্যতীত' বলতে প্রমাণ বুঝানো হয়েছে। অপরাধীর অপরাধ প্রমাণ হলে ইসলাম যে সকল অপরাধের শাস্তি হিসাবে প্রাণদণ্ড দিয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া যায়। এই দফায় আত্মহত্যাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ মানুষ নিজেকে নিজের মনিব এবং নিজের মালিকানাকে সে নিজেই শেষ করে দিতে পারে, এমন ধারণা করা মারাত্মক ভুল। সে নিজেকে শেষ বা নিজেকে অন্যায় কাজে নিয়োজিত করবে এ অধিকার তাকে দেয়া হয়নি। এই পৃথিবী একটি পরীক্ষা কেন্দ্র, এখানে পরীক্ষা যে ধরনেরই হোকনা কেনো, এ পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে সে পালিয়ে যাবে এ অধিকার তাকে দেয়া হয়নি।
وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّه ص
দশ. ইয়াতিমের ধন-সম্পদের কাছেও যেয়ো না, তবে এমন কোনো পন্থায় যা (ইয়াতিমের জন্যে) উত্তম (বলে প্রমাণিত) হয় তা বাদে- যতোক্ষণ পর্যন্ত সে (ইয়াতিমের) তার বয়োপ্রাপ্তির পর্যায়ে উপনীত হয়। (সূরা বনী ইসরাঈল-৩৪)
وَأَوْفُوْا بِالْعَهْدِ جِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْؤُولاً -
এগার, প্রতিশ্রুতি মেনে চলো, কেননা (কিয়ামতের দিন এ) প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে (তোমাদের) জিজ্ঞাবাদ করা হবে। (সূরা বনী ইসরাঈল-৩৪)
وَأَوْفُوا الْكَيْلَ إِذَا كِلْتُمْ وَزِنُوا بِالقِسْطَاسِ الْمُسْتَقِيمِ طَ ذَالِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً -
বার. কোনো কিছু পরিমাপ করার সময় মাপ কিন্তু পুরোপুরিই করবে, আর (ওযন করার জিনিস হলে) দাঁড়িপাল্লা সোজা করে ধরবে; (লেনদেনের ব্যাপারে) এই হচ্ছে উত্তম পন্থা এবং পরিণামের (দিক থেকে) এটাই হচ্ছে উৎকৃষ্ট। (সূরা বনী ইসরাঈল-৩৫)
ইয়াতিমের সম্পদ আত্মসাতের ব্যাপারে কুরআন-হাদীসে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রে অক্ষম সম্পর্কিত নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, এই রাষ্ট্রের যেসব নাগরিক তাদের নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণ করার ক্ষমতা এবং যোগ্যতা নেই বা হয়নি, ইসলামী রাষ্ট্রই তাদের স্বার্থের সংরক্ষক। নবী করীম (সা:) ইসলামী রাষ্ট্রের কর্ণধার হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন, 'যার কোনো অভিভাবক নেই আমিই তাঁর অভিভাবক'। অসহায়, ইয়াতিম এবং অক্ষম মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রশাসন। প্রশাসনিকভাবে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হবে।
চুক্তি অনুসরণ করার ব্যাপারে ইসলামী রাষ্ট্র দৃঢ়তা অবলম্বন করবে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ইসলামী রাষ্ট্র কোনক্রমেই অন্য রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি ভঙ্গ করবে না। মানুষ ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক জীবন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে ওয়াদা পালন করবে। এ পর্যায়ে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটলে মহান আল্লাহর দরবারে এ সম্পর্কে জবাবদিহী করতে হবে।
অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সততা বজায় রাখার ব্যাপারে রাষ্ট্র তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা পালন করবে। দেশের ভেতরে ব্যবসা বা ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো নাগরিক যেন প্রতারিত না হয়, বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও যেন কোনো ধরনের বৈষম্য বা প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করা না হয়, ইসলামী রাষ্ট্র আইন প্রয়োগ করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ব্যবসার ক্ষেত্রে অন্যের অধিকারে যেন কেউ হস্তক্ষেপ করতে না পারে, রাষ্ট্র সেদিকে দৃষ্টি রাখবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, যেন ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই উভয়ের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে। কারো মনে যেন এ ধারণা সৃষ্টি না হয় সে প্রতারিত হবে।
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ ط إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَائِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا -
তের, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, (অযথা) তার পেছনে পড়ো না; কেননা (কিয়ামতের দিন) কান, চোখ ও অন্তর, এ সব কয়টির (ব্যবহার) সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে। (সূরা বনী ইসরাঈল-৩৬)
অনুমান বা কল্পনা নির্ভরতা ইসলামী রাষ্ট্রে প্রশ্রয় পাবে না। অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেফতার বা দোষারোপ করা যাবে না। সন্দেহের বশে কোনো মানুষকে গ্রেফতার করা যাবে না। তদন্তে দোষী প্রমাণীত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেয়া যাবে না। এই দফায় এ কথা স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে যে, ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক নিজেদের ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনে নিছক সন্দেহ বা অনুমানের পেছনে না চলে জ্ঞানের পেছনে চলবে। নৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে, আইনের ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, দেশ শাসনের ক্ষেত্রে, জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে, শিক্ষার ক্ষেত্রে তথা জীবনের সকল ক্ষেত্রে অনুমান নির্ভর কিছু গ্রহণ করা যাবে না।
সঠিক জ্ঞানের পরিবর্তে অনুমানের পেছনে চলার কারণে মানুষের জীবনে যে অসংখ্য ক্ষতিকর মতামতের সৃষ্টি হয়, ইসলাম এসব ক্ষতি থেকে মানুষের চিন্তা এবং কর্ম মুক্ত রাখতে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করে। নৈতিকতার ক্ষেত্রে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, অমূলক ধারণা বা কল্পনা থেকে দূরে অবস্থান করবে। কোনো দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কুধারণা বা সন্দেহের কারণে অনুসন্ধান ব্যতীত দোষারোপ করবে না। ইসলামী আইনের ক্ষেত্রে এই দফার ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন করা হয়, শুধুমাত্র অনুমান বা সন্দেহের বশে কোনো ব্যক্তি বা দেশ বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে না। অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, সন্দেহের বা অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেফতার বা মারধর করা বা আটক রাখা সম্পূর্ণ অবৈধ।
অমুসলিমদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার তদন্ত ব্যতীত কোনো কথা সমাজে ছড়িয়ে দেয়া যাবে না। প্রমাণ ব্যতীত তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, যেসব তথাকথিত জ্ঞান শুধুমাত্র সন্দেহ অনুমান এবং দীর্ঘসূত্রিতাময় ধারণা ও কল্পনানির্ভর, এসবের ভিত্তিতে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা যাবে না। পাঠ্য তালিকায় এসব কিছু অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে, অনুমান করে বা কল্পনা করে কোনো কিছুর অনুসরণ করা যাবে না। যা অনুসরণ করতে হবে আল্লাহ তা'য়ালা এবং তাঁর রাসূল তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কুরআন- হাদীসের জ্ঞানের ভিত্তিতে যা প্রমাণীত তাই অনুসরণ করতে হবে।
وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا جِ إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُوْلاً -
চৌদ্দ, আল্লাহর যমীনে (কখনোই) দম্ভভরে চলো না, কেননা (যতোই অহঙ্কার করোনা কেনো), তুমি কখনো এ যমীন বিদীর্ণ করতে পারবে না, আর উচ্চতায়ও তুমি কখনো পর্বত সমান হতে পারবে না। (সূরা বনী ইসরাঈল-৩৭)
এমনভাবে চলাফেরা করবে না, এমন ভাষায় এবং ভঙ্গিতে কথা বলবে না যে, তোমার চলাফেরায় বা কথায় অহংকার প্রকাশ পায়। তোমার সকল আচরণে অহংকার বা দম্ভের চিহ্নমাত্র যেন না থাকে। সমাজের কোনো ব্যক্তি না এমন আচরণ করবে না রাষ্ট্র এমন আচরণ করবে। বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অধিকারে হস্তক্ষেপ করবে না। তাদের সাথে বন্ধুর মত আচরণ করবে। তাদের সাথে ওয়াদা বা চুক্তি করলে তা পালন করবে। এই ১৪ দফার ভিত্তিতে মদীনায় যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সে রাষ্ট্র ক্রমশঃ বিশাল আকার ধারণ করেছিল। হযরত উমার (রা:) এর শাসনামলে প্রায় অর্ধপৃথিবী তাঁর শাসনাধীনে ছিল। নবী করীম (সা:) যে সময় রাষ্ট্রের শাসক ছিলেন এবং তাঁর পরে চার খলীফা, হযরত হুসাইন (রা:) এর স্বল্প মেয়াদী শাসনকাল, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা:) এর শাসনকাল, হযরত উমার ইবনে আব্দুল আজিজ (রাহ:) এর শাসনকাল, এ সকল শাসকদের শাসনামলে রাষ্ট্রের কোনো মন্ত্রী বা চাপরাসির আচরণেও সামান্য অহংকার দেখা যায়নি।
রাষ্ট্রের শাসকবর্গ, গভর্নর এবং সেনাপতিদের জীবনে ক্ষমতাগর্ব ও অহংকারের বিন্দুমাত্র অংশ ছিল না। সে সময় যুদ্ধের ময়দানে একদল আরেকদলের বিরুদ্ধে ক্রোধ উদ্রেককারী কথা বলতো। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর মুখ থেকে দম্ভ অহংকারের একটি শব্দও নির্গত হত না। তাদের চলাফেরা, ওঠাবসা, কথাবার্তা, পোষাক-পরিচ্ছদ, চলার বাহন, বাসস্থান, আচার আচরণ কোনো কিছুর ভেতর থেকেই তাদের বিপুল ক্ষমতার সামান্যতম লক্ষণ প্রকাশ পেত না। মুসলিম বাহিনী যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে কোনো দেশে প্রবেশ করলে, তাদের হাঁটা বা কথার মধ্যে অহংকারের চিহ্ন থাকতো না। তাঁরা যে একটি দুঃসাহসী বাহিনী এ কথা প্রতিপক্ষের দেশের নাগরিকদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করার সামান্যতম প্রচেষ্টা তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়নি। তাদের আচরণ, ব্যবহার ছিল কোমল, মমতার মাধুরী মিশ্রিত এবং সৃষ্টিসমূহের প্রতি সহানুভূতিশীল। প্রত্যেক সৃষ্টির প্রতি তাঁরা ছিলেন সজাগ-সতর্ক, অতি ক্ষুদ্র একটি পিপীলিকার প্রতি নিজের অজান্তেও যেনো রূঢ় আচরণ না করেন এ ব্যাপারে তাঁরা সজাগ থাকতেন।
📄 নবী করীম (সা:) এর সর্বশ্রেষ্ঠ মু'জিযা
নবী করীম (সা:) কে আল্লাহ তা'য়ালা যেসকল মু'জিযা দান করে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন তার মধ্যে পবিত্র কুরআন মাজীদ হলো সর্বশ্রেষ্ঠ মু'জিযা। তিনি প্রায় চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বে পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করেছেন, কিন্তু তাঁর আনীত কুরআন অবিকৃতই রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত অবিকৃতই থাকবে ইনশাআল্লাহ। কুরআন নামক যে শ্রেষ্ঠ মু'জিযা আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে দান করেছিলেন, সে কুরআন পৃথিবী ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকবে। কুরআনের পূর্বে যে সকল কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছিলো, যেসব ভাষায় তা অবতীর্ণ করা হয়েছিলো সেসব ভাষার অস্তিত্বও পৃথিবী থেকে বহু পূর্বে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। ধর্মগ্রন্থের নামে যেসব কিতাব বর্তমান পৃথিবীতে প্রদর্শন করা হয়, এসব গ্রন্থের মধ্যে স্রষ্টার অবতীর্ণ করা শব্দ কোন্টি তা নির্ণয় করতে সক্ষম এমন কেউ ঐসব ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেও নেই। বিকৃতি ঘটিয়ে এসব গ্রন্থের বিষয়বস্তু এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে যে, প্রকৃত সত্য জানার কোনো উপায়ই নেই।
পৃথিবীতে এমন একটি গ্রন্থেরও অস্তিত্ব নেই, যে গ্রন্থের দাড়ি, কমা, সেমিক্লোন মুখস্থ করে রাখা যেতে পারে। ব্যতিক্রম শুধু পবিত্র কুরআনের ক্ষেত্রে। কুরআন নামক সুবিশাল এ অলৌকিক গ্রন্থটি যাঁর ওপর অবতীর্ণ করা হলো, তাঁকে বলা হয়েছিলো, 'আপনি শুধু শুনুন, আপনার হৃদয়পটে এ কুরআন অঙ্কিত করার দায়িত্ব আমার এবং এর ব্যাখ্যা জানিয়ে দেয়ার দায়িত্বও আমার'।
নবী করীম (সা:) শুধু কুরআন শুনলেন, মাত্র একবার শোনার সাথে সাথেই তিনি তা হুবহু তিলাওয়াত করার মর্যাদা অর্জন করলেন এবং উপস্থিত লোকদেরকে তা তিলাওয়াত করে শুনিয়ে দিলেন। আল্লাহ প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ মু'জিযা মহাগ্রন্থ আল কুরআন। তাঁর মুখ থেকে সমকালীন নারী-পুরুষ যাঁরাই এ কুরআন শুনলেন তাঁরাই এ গ্রন্থটি হুবহু মুখস্থ করলেন।
সেই ধারাবাহিকতায় বিগত চৌদ্দশত বছরব্যাপী অসংখ্য অগণিত নারী-পুরুষ এ কুরআন স্মৃতিতে ধারণ করেছে, বর্তমানেও করছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত করতে থাকবে। এ কুরআন এক জীবন্ত মু'জিযা এবং এই বিস্ময়কর কিতাব যাঁর প্রতি অবতীর্ণ করা হলো, তিনিই এ কিতাব সম্পর্কে মন্তব্য করলেন-
لَا تُحْصَى عَجَائِبُه وَلَا تُبْلَى غَرَائِبُه فِيْهِ مَصَابِيحُ الْهُدَى وَمَنَارِ الْحِكْمَةِ
'এ কুরআন কখনো পুরাতন বা জীর্ণ হবে না, এর আশ্চর্য ধরনের বিস্ময়কারিতা কখনো শেষ হবে না, কুরআন হচ্ছে হিদায়াতের মশাল এবং এই কিতাব জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সুউচ্চ মিনার যেনো কূল-কিনারাহীন এক অগাধ জলধী। এর ভেতরে রয়েছে অফুরন্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের তত্ত্ব ও অনায়ত্ব অসংখ্য দিক-দিগন্ত। মানবীয় অনুসন্ধিৎসা অফুরন্ত এই জ্ঞান-ভাণ্ডার থেকে নিত্য-নতুন তত্ত্ব উদ্ধার করতে সক্ষম। প্রত্যেক অনুসন্ধানেই প্রতিটি যুগের সুক্ষ্ম চিন্তাবিদ ও গবেষকগণ মানব জীবনের জন্য যুগোপযোগী আইন-বিধান ও তত্ত্ব উদ্ধার করতে সক্ষম হবেন, যদি তাঁরা প্রতিটি পর্যায়ে অভ্রান্ত পথে দৃঢ় থাকেন'।
এটা সেই বিস্ময়কর কিতাব যা নিজেই নিজের ব্যাখ্যা প্রদান করে। এই কুরআন নামক জীবন্ত মু'জিযা থেকে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তা অবশ্যই সত্য সঠিক এবং বক্রতামুক্ত। নবী করীম (সা:) বলেছেন-
مَنْ قَلَ بِهِ صَدَقَ وَ مَنْ عَمِلَ بِهِ أُجِرَ وَ مَنْ حَكَمَ بِهِ عَدَلَ وَ مَنْ دَعَا إِلَيْهِ هُدِى إِلَى صِرَاطِ الْمُسْتَقِيمَ
'এই কুরআন থেকে যে লোক কথা বলে সে সত্য কথা বলে। যে এর ওপর আমল করবে সে প্রতিদান লাভ করবে। যে এর সাহায্যে বিচার-মীমাংসা করবে সে ন্যায় বিচার করবে। যে এর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সে সহজ সরল পথের দিকে আহ্বান জানিয়েছে'।
মহান আল্লাহ তা'য়ালা এ কুরআন তাঁর রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন এবং এ কুরআন সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন-
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُّدَّكِرٍ ع
আমি এ কুরআন উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ মাধ্যম বানিয়েছি। এখন উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? (সূরা ক্বামার-৪০)
মানুষের জন্য এ কুরআন হৃদয়ঙ্গম করা সহজ করা হয়েছে এবং পবিত্র কুরআন আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হলেও তার বর্ণনাশৈলী, বাচনভঙ্গী পৃথিবীতে প্রচলিত আরবী ভাষার অনুরূপ নয়। এই কিতাবের ভাষা প্রচলিত আরবী ভাষা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং কুরআনের ভাষা নির্ধারণ করেছেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। এই কুরআনের ভাষা যেমন আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে এসেছে তেমনি কুরআন যে ভাব প্রকাশ করে, সে ভাবও এসেছে আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকেই। পবিত্র কুরআন তার বিবৃত বিষয়, তথ্য ও তত্ত্ব সম্পর্কে সকল সন্দেহ ও সংশয়মুক্ত বলে স্পষ্ট ঘোষণাই শুধু দেয়নি, এ ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে-
وَإِنْ كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّنْ مِّثْلِهِ ص
আমার বান্দার প্রতি যে কিতাব অবতীর্ণ করেছি, তা আমার প্রেরিত কি-না, সে বিষয়ে তোমাদের মনে যদি কোনো প্রকার সন্দেহ সৃষ্টি হয়ে থাকে তবে এর অনুরূপ একটি সূরা রচনা করে আন। (সূরা বাকারা-২৩)
কোনো কোনো মানুষ এ ধারণা পোষণ করে যে কুরআনের ব্যাপারে আল্লাহ তা'য়ালা যে চ্যালেঞ্জ প্রদান করেছেন, সে চ্যালেঞ্জ শুধুমাত্র পবিত্র কুরআনের আঙ্গিক বৈশিষ্ট, সাহিত্যিক মান ও সৌন্দর্য এবং উচ্চাঙ্গের ভাষার ব্যাপারে প্রযোজ্য। এ ধরনের ভুল ধারণা যারা পোষণ করে, তারা মূলতঃ কুরআনের গভীরে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই বিভ্রান্তিকর চিন্তাধারায় আবর্তিত হয়। প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর কুরআনের মর্যাদা এসব ক্ষুদ্র চিন্তা-চেতনা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। কুরআনের শব্দ, ভাষা এবং সাহিত্যিক মান, বর্ণনাশৈলীর দিক দিয়ে যে অনবদ্য, অতুলনীয় এ ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। পক্ষান্তরে যে কারণে এ কথা বলা হয়েছে যে, 'মানবীয় চিন্তা-চেতনা, জ্ঞান, বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করে এ ধরনের কিতাব রচনা করা সম্ভব নয়' সে কারণগুলো পবিত্র কুরআনে আলোচিত বিষয়াদি, কুরআন কর্তৃক উপস্থাপিত জীবনাদর্শ, জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্য ও তত্ত্বসমূহ। কুরআন যেসব বিষয়ে আলোচনা করেছে, যে শিক্ষা মানব জাতির সম্মুখে পেশ করেছে, যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের দ্বার মানব সভ্যতার সামনে উন্মোচন করেছে, যে আদর্শের দিকে মানব জাতিকে আহ্বান জানাচ্ছে, তা কোনো মানবীয় মন- মস্তিষ্ক কল্পনাও করতে পারে না।
শুধু মানব জাতিই নয়, জ্বিন ও মানব জাতি সম্মিলিতভাবে কিয়ামত পর্যন্তও যদি চেষ্টা- সাধনা করতে থাকে, তবুও আল্লাহ তা'য়ালার নাযিলকৃত কুরআনের অনুরূপ কোনো কিতাব রচনা করতে সক্ষম হবে না। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُوْنَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا -
আপনি বলে দিন, মানব ও জ্বিন জাতি সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে কুরআনের মতো একটি জিনিস আনার চেষ্টা করে তবুও তারা আনতে সক্ষম হবে না, তারা পরস্পরের সহযোগী হয়ে গেলেও। (সূরা বনী ইসরাঈল-৮৮)
মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে এমন একটি বিস্ময়কর কিতাব দান করলেন, যে কিতাবের সামনে পৃথিবীর সকল কবি-সাহিত্যিকদের কাব্য ও সাহিত্য প্রতিভা চিরদিনের জন্য ম্লান হয়ে গেল। আল্লাহ পবিত্র কুরআন সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ করলেন-
أَمْ يَقُولُوْنَ افْتَرَاهُ ط قُلْ فَأْتُوْا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِّثْلِهِ مُفْتَرَيَاتٍ وَادْعُوْا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِّنْ دُوْنِ اللَّهِ إِنْ كُنتُمْ صَادِقِينَ ط
অথবা এরা কি এ কথা বলে, (মুহাম্মাদ স. নামের ব্যক্তি) কুরআন নিজে নিজে রচনা করে নিয়েছে! (হে নবী) আপনি তাদেরকে বলুন, তোমরা যদি তাই মনে করো তাহলে নিয়ে এসো এর অনুরূপ মাত্র দশটি স্বরচিত সূরা এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য যাদের তোমরা সাহায্যের জন্য ডাকতে পারো তাদের ডেকে নাও, যদি তোমরা তোমাদের দাবীতে সত্যবাদী হও। (সূরা হুদ-১৩)
فَلْيَأْ تُوْا بِحَدِيْثِ مِّثْلِهِ إِنْ كَانُوْا صَادِقِينَ
তারা নিজেদের কথায় যদি সত্যবাদী হয় তাহলে তারাও এ কুরআনের মতো কিছু একটা রচনা করে নিয়ে আসুক না! (সূরা আত্ তুর- ৩৪)
মানুষ যে জ্ঞান, বিবেক-বুদ্ধি ও প্রতিভার অধিকারী তা প্রয়োগ করে এ ধরনের মর্যাদাপূর্ণ ও বিস্ময়কর একটি কিতাব প্রণয়ন করা আদৌ সম্ভব নয়। এ ধরনের একটি কালাম রচনা করা মানুষের শক্তি ও প্রতিভা সীমার বাইরের বিষয়। আল্লাহর এই চ্যালেঞ্জ কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা কোনো দেশের জনগণের জন্যই শুধু নয়- নয় তা কালের গণ্ডীতে আবদ্ধ। আল্লাহর চ্যালেঞ্জ সারা পৃথিবীবাসীর জন্য এবং অনন্তকালব্যাপী। এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার মতো সাহস সেই অতীতকাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্তও কেউ প্রদর্শন করেনি, অনাগত কালেও কেউ প্রদর্শন করতে সক্ষম হবে না। মহান আল্লাহ যে শব্দ, অক্ষর, বর্ণনাশৈলী, রচনারীতি, বাচনভঙ্গী সহযোগে যখন অবতীর্ণ করেছিলেন, বর্তমান কাল পর্যন্তও তার একটি অক্ষরও পরিত্যক্ত হয়নি, কিয়ামত পর্যন্তও হবে না।
এই পৃথিবীতে আল কুরআনই হলো একমাত্র গ্রন্থ যা মানব জাতির সমুদয় চিন্তা-চেতনা, চরিত্র-নৈতিকতা, সভ্যতা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি এক কথায় মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতির ওপর যে ব্যাপকতর, সুগভীর ও বিপ্লবাত্মক প্রভাব বিস্তার করেছে, এ ধরনের সর্বব্যাপক ও সর্বাত্মক প্রভাব বিস্তারকারী গ্রন্থের অস্তিত্ব পৃথিবীতে আর একটিও নেই। প্রথম পর্যায়ে এই কুরআন পৃথিবীর একটি জাতির ওপরে প্রভাব বিস্তার করে তাদের জীবন ধারার আমূল পরিবর্তন সাধন করেছে। তারপর কুরআনের রঙে রঙিন সেই জাতি গোটা পৃথিবীর একটি বিরাট অংশের মানুষের জীবন পরিবর্তন করে দিয়েছে এবং পৃথিবীর সকল জাতির ওপরে কম-বেশি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
এই কুরআন পৃথিবীতে যে বিপ্লবাত্মক ভূমিকা পালন করেছে এবং করছে, তা পৃথিবীর কোনো একটি আদর্শ বা গ্রন্থের পক্ষে পালন করা সম্ভব হয়নি। কুরআন শুধুমাত্র সজ্জিত অক্ষরের আকারে কাগজের পৃষ্ঠায় আবদ্ধ হয়ে থাকে না, বরং মানুষের বাস্তব কর্মের পৃথিবীতে এর এক একটি শব্দ, প্রভাব, শিক্ষা, চিন্তাদর্শ ও মতবাদের অনুপম রূপায়নে সম্পূর্ণ ভিন্নতর একটি সভ্যতা ও সংস্কৃতি নির্মাণ করে এক দৃষ্টান্তহীন কর্ম সম্পাদন করেছে এবং এখনো করছে। কুরআন যখন অবর্তীর্ণ হয়েছিল তখন তার যে প্রভাব ও বিপ্লবাত্মক ভূমিকা ছিল, আজও তা বিদ্যমান রয়েছে। সে যুগে কুরআনের শিক্ষা বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে যে পাঠক পাঠ করতো, কুরআন তার পাঠককে সে ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে বাধ্য করতো, কুরআনের এই অতুলনীয় মু'জিযা, প্রভাব ও ক্ষমতা বর্তমানেও যেমন বিদ্যমান রয়েছে, অনাদিকাল পর্যন্তও বিদ্যমান থাকবে।
সে যুগে যারা কুরআনের বিরোধিতায় নেতৃত্ব দিচ্ছিলো, তারা এটা স্পষ্ট অনুভব করেছিল যে, মুহাম্মাদ (সা:) কুরআনের যে বাণী প্রচার করছেন তার প্রভাব অপ্রতিরোধ্য। এ কারণে তারা সাধারণ মানুষকে এই কুরআন শোনা থেকে বিরত থাকতে উপদেশ দিতো। মক্কার ইসলাম বিরোধিদের ইসলাম নির্মূলের অগণিত পরিকল্পনার মধ্যে একটি পরিকল্পনা ছিল এই যে, রাসূল যখনই কোনো সমাবেশে মানুষকে কুরআনের কথা শোনাবেন, তখনই সেখানে শোরগোল সৃষ্টি করে কুরআন শোনানোর পরিবেশ নষ্ট করে দেয়া। নানাভাবে কুরআনের মাহফিলে বাধা সৃষ্টি করা, যেন মানুষের ওপরে এই কুরআন প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। ইসলাম বিরোধী শক্তি এই অস্ত্র শুধু সে যুগেই প্রয়োগ করেনি, বর্তমানেও তারা তাদের সেই পুরনো অস্ত্র প্রয়োগ করে কুরআন শোনা থেকে মানুষকে বিরত রাখার অপচেষ্টা করে। ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তারা কুরআনের মাহফিল অনুষ্ঠিত হবার পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করে থাকে। সে যুগে ইসলাম বিরোধিরা সাধারণ মানুষকে কুরআনের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার জন্য বলতো-
وَقَالَ الَّذِيْنَ كَفَرُوا لَا تَسْمَعُوْا لِهَذَا الْقُرْآنِ وَالْغَوْا فِيْهِ لَعَلَّكُمْ تَغْلِبُوْنَ
এসব কাফেররা বলে, এ কুরআন তোমরা কখনো শুনবে না। আর যখন তা শুনানো হবে তখন শোরগোল সৃষ্টি করবে। হয়তো এভাবে তোমরা বিজয়ী হবে। (হা-মীম আস্ সেজদা-২৬)
কুরআন কী অসাধারণ প্রভাব ক্ষমতার অধিকারী বিস্ময়কর কিতাব, এই কিতাবের দাওয়াত যিনি দিচ্ছেন তিনি কেমন অতুলনীয় সম্মান ও মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি এবং তাঁর এই ব্যক্তিত্বের সাথে উপস্থাপনার ভঙ্গি কেমন বিস্ময়করভাবে কার্যকর হচ্ছে, তা ইসলাম বিরোধী নেতারা স্পষ্ট অনুভব করতে পারতো। তারা এ কথা বিশ্বাস করতো, এ ধরনের উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তির মুখ থেকে এমন চিত্তাকর্ষক, হৃদয়গ্রাহী মনোমুগ্ধকর ভঙ্গিতে এই দৃষ্টান্তহীন কালাম যার কর্ণকুহরে প্রবেশ করবে, সে ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত কুরআনের আন্দোলনের প্রতি দুর্বল হবেই হবে। অতএব যে প্রকারেই হোক, কুরআনের মাহফিল অনুষ্ঠিত হতে দেয়া যাবে না। কিন্তু যারা এ ধরনের পরিকল্পনা প্রণয়ন করতো, স্বয়ং তারাই নিজেদের অজান্তে আল্লাহর কুরআনের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়তো।