📄 মু'জিযা- মিরাজুন্নবী (সা:)
মিরাজের পূর্বে নবী করীম (সা:) এর মাধ্যমে বহু সংখ্যক মু'জিযা আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর বান্দাদের দেখিয়েছেন। অগণিত মানুষ দেখেছে আল্লাহর রাসূলের পবিত্র হাতের ইশারায় আকাশের চন্দ্র দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পুনরায় তা পূর্বের ন্যায় ধারণ করেছে। এ সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন-
اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ - কিয়ামত নিকটবর্তী হয়ে গেছে এবং চাঁদ বিদীর্ণ হয়ে গেছে। (সূরা ক্বামার-১)
অসংখ্য অগণিত মু'জিযার মধ্যে নবী করীম (সা:) এর জীবনে মিরাজ ছিলো অন্যতম মু'জিযা এবং এটি তাঁর জীবনেতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শুধু তাঁকেই নয়, মহান আল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ নবী-রাসূলদের এমন অসংখ্য নিদর্শন দেখিয়েছেন, যা সাধারণ কোনো মানুষের পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। এসব নিদর্শনের মাধ্যমে নবীদেরকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রত্যক্ষভাবে সৃষ্টি জগৎ ও বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞানদান করেছেন। যে সকল নবী-রাসূলকে অতিন্দ্রীয় নিদর্শন দেখানো হয়েছে তাদের সকলের বিষয়টির ধরন একরূপ ছিল না। বিভিন্ন পদ্ধতিতে তাদেরকে প্রত্যক্ষ নিদর্শন দেখানো হয়েছে। তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যে নিয়োজিত করার সময় দর্শনের যাবতীয় বস্তুভিত্তিক শর্তাবলীর আবরণ তাদের দৃষ্টির সামনে থেকে অপসারিত করা হয়েছে। স্থান এবং সময়ের সকল ধরনের প্রতিবন্ধকতা তাদের দৃষ্টিপথ ও যাত্রা পথ থেকে অপসারিত করা হয়েছে। ফলে তাঁরা এই মাটির পৃথিবীতে অবস্থান করে মহান আল্লাহর সৃষ্টি এমন অনেক কিছুই দেখেছেন যা সাধারণ মানুষের পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। আল্লাহ তা'য়ালা তাদেরকে পৃথিবীর বাইরের জগতের সংবাদ অনুগ্রহ করে অবগত করেছেন এবং অনেক গোপন দৃশ্য দেখিয়েছেন।
এ ধরনের প্রত্যক্ষ দর্শনের মাধ্যমে একজন নবী-রাসূল মহান আল্লাহর ঐ সকল ক্ষমতা এবং সৃষ্টি দর্শন করেছেন যা সাধারণ মানুষ কখনো কল্পনাও করতে পারে না। তাঁরা ফেরেশতার সান্নিধ্য অনুভব করেছেন। মহান আল্লাহর অসংখ কুদরত দর্শন করেছেন। আকাশ এবং পৃথিবীর রহস্য তাদের সামনে উন্মোচন করা হয়েছে। হযরত ইবরাহীম (আ:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা এই পৃথিবী এবং পৃথিবীর বাইরের বহু কিছু দর্শন করিয়েছেন। তিনি তাঁর পিতাকে সত্য পথ প্রদর্শনের লক্ষ্যে বলেছিলেন-
يَا أَبَتِ إِنِّي قَدْ جَاءَنِي مِنَ الْعِلْمِ مَا لَمْ يَأْتِكَ فَاتَّبِعْنِي أَهْدِكَ صِرَاطًا سَوِيًّا - হে আমার পিতা, আমার কাছে (আল্লাহ তা'য়ালার সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে) যে জ্ঞান এসেছে তা তোমার কাছে আসেনি, অতঃএব তুমি আমার কথা শোনো, আমি তোমাকে অভ্রান্ত পথ প্রদর্শন করবো। (সূরা মারইয়াম-৪৩)
এ পৃথিবীতে সাধারণ ঈমানদার লোকদের জন্য যে কাজ করতে হয় তাহলো, ঈমান বিল গায়েব বা অদৃশ্যের প্রতি ঈমান আনা। পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর নবী-রাসূলদের প্রতি যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তা যথাযথভাবে পালন করার জন্য তাদেরকে সেইসব নিগূঢ় সত্যকে নিজেদের চোখে বাস্তবে দর্শন করানো একান্ত কাম্য ছিলো, যে সকল বিষয়ে তাঁরা সাধারণ মানুষকে বলে থাকেন এবং যেদিকে তাঁরা মানুষকে আহ্বান জানাতেন। সমগ্র পৃথিবীবাসীকে লক্ষ্য করে তাঁরা এ ঘোষণা দিয়েছেন, 'তোমরা যারা কেবলমাত্র ধারণা ও অনুমানের পেছনে ছুটে থাকো, আমরা কিন্তু ধারণা বা অনুমানের পেছনে ছুটি না। আমরা যা নিজ চোখে দেখেছি তাই তোমাদের সম্মুখে উপস্থাপন করছি। তোমাদের কাছে রয়েছে অমূলক ধারণা, আর আমাদের কাছে রয়েছে অভ্রান্ত জ্ঞান। তোমরা অন্ধ আর আমরা প্রত্যক্ষদর্শী দৃষ্টিমান'।
আর ঠিক এ কারণেই নবী-রাসূলগণের কাছে ফিরিশতাগণ প্রকাশ্যভাবে এসেছেন, সমগ্র আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীব্যাপী বিস্তৃত মহান আল্লাহর অকল্পনীয় বিশাল শাসন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় অংশ তাঁদেরকে প্রত্যক্ষ করানো হয়েছে। তাঁদেরকে জান্নাত- জাহান্নাম, নিজেদের চোখে দেখার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের চিত্র তাঁদের দৃষ্টির সম্মুখে তুলে ধরা হয়েছে। নবুয়্যাতের পদে অভিষিক্ত হবার পূর্বেই তাঁরা ঈমান বিল গায়েবের পর্যায় অতিক্রম করেছেন এবং নবুয়্যাত লাভ করার পরে তাঁদেরকে ঈমান বিশ্ শাহাদাত তথা প্রত্যক্ষ ঈমানের নিয়ামত দানে ধন্য করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা মৃতকে কিভাবে জীবিত করবেন এ বিষয়টি হযরত ইবরাহীম (আ:) কে দেখানো হয়েছে। এ ঘটনা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন বর্ণনা করছে-
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِى كَيْفَ تُحْيِ الْمَوْتَى ط قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ طَ قَالَ بَلَى وَلَكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي طَ قَالَ فَخُذْ أَرْبَعَةً مِّنَ الطَّيْرِ فَصُرْهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلْ عَلَى كُلِّ جَبَلٍ مِّنْهُنَّ جُزْءًا ثُمَّ ادْعُهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعْيًا طَ وَاعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
(আরো স্মরণ করো) যখন ইবরাহীম বললো, হে মালিক, মৃতকে তুমি কিভাবে (পুনরায়) জীবন দাও তা আমাকে একটু দেখিয়ে দাও; আল্লাহ তা'য়ালা বললেন, কেনো (না দেখে) তুমি কি বিশ্বাস করো না? ইবরাহীম বললো, হ্যাঁ (প্রভু, আমি বিশ্বাস করি), কিন্তু (এর দ্বারা) আমার মন একটু সান্ত্বনা পাবে (এই যা); আল্লাহ তা'য়ালা বললেন, (তুমি বরং এক কাজ করো), চারটি পাখী ধরে আনো, অত:পর (আস্তে আস্তে) এই পাখীগুলোকে তোমার কাছে পোষ মানিয়ে নাও (যাতে ওদের নাম তোমার কাছে পরিচিত হয়ে যায়), তারপর (তাদের শরীর কেটে কয়েক টুকরায় ভাগ করো,) তাদের (কাটা) এক একটি টুকরো এক একটি পাহাড়ের ওপর রেখে এসো, অত:পর ওদের (সবার নাম ধরে) তুমি ডাকো, (দেখবে জীবন্ত পাখীতে পরিণত হয়ে) ওরা তোমার কাছে দৌড়ে আসবে; তুমি জেনে রাখো, আল্লাহ তা'য়ালা মহাশক্তিশালী, বিজ্ঞ ও কুশলী। (সূরা আল বাকারা-২৬০)
মহান মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে নির্দেশ দিলেন মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) তা বাস্তবায়ন করার পর পাখীগুলোর নাম ধরে ডাক দিলেন, পাখীগুলো জীবন্ত হয়ে তাঁর কাছে ফিরে এলো। মহান আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে একজন মানুষের কথা আলোচনা করেছেন কিন্তু তাঁর নাম পরিচয় উল্লেখ করেননি।
কোনো কোনো গবেষক সে ব্যক্তিকে নবী বলে অনুমান করেছেন। এ মানুষটি নিজ বাহন গাধায় আরোহণ করে একটি বিধ্বস্ত জনপদ অতিক্রম করছিলো। এক পর্যায়ে তিনি বাহন থেকে নেমে সাথে থাকা খাদ্য ও পানীয় একদিকে রেখে গাধাটি পাশেই বেঁধে একস্থানে বসলেন। চারদিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'ধ্বংসপ্রাপ্ত এ জনপদকে মহান খালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পুনরায় কিভাবে জীবনদান করবেন!' আল্লাহ তা'য়ালা সে ব্যক্তি সম্পর্কে বলছেন-
أَوْ كَالَّذِي مَرَّ عَلَى قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَى عُرُوْشِهَاجٍ قَالَ أَنِّي يُحْيِ هَذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَاجِ فَأَمَاتَهُ اللهُ مِئَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَه ط قَالَ كَمْ لَبِثْتَ طَ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ ط قَالَ بَل لَبِثْتَ مِئَةً عَامٍ فَانْظُرْ إِلَى طَعَامِكَ وَشَرَابِكَ لَمْ يَتَسَنَّهُ جِ وَانْظُرْ إِلى حِمَارِكَ قف وَلِنَجْعَلَكَ آيَةً لِّلنَّاسِ وَانْظُرْ إِلَى العِظَامِ كَيْفَ تُنْشِرُهَا ثُمَّ نَكْسُوْهَا لَحْمَاطَ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ لا قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ -
অথবা (ঘটনাটি) কি সেই ব্যক্তির মতো যে একটি বস্তির পাশ দিয়ে যাবার সময় যখন দেখলো, তা (বিধ্বস্ত হয়ে) আপন অস্তিত্বের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, (তখন) সে ব্যক্তি বললো, এ মৃত জনপদকে কিভাবে আল্লাহ তা'য়ালা আবার পুনর্জীবন দান করবেন, এক পর্যায়ে আল্লাহ তা'য়ালা (সত্যি সত্যিই) তাকে মৃত্যু দান করলেন এবং (এভাবেই তাকে) একশ বছর ধরে মৃত (ফেলে) রাখলেন, অত:পর তাকে পুনরায় জীবিত করলেন; এবার জিজ্ঞেস করলেন, (বলতে পারো) তুমি কতোকাল (মৃত অবস্থায়) কাটিয়েছো? সে বললো, আমি একদিন কিংবা একদিনের কিছু অংশ (মৃত অবস্থায়) কাটিয়েছি, আল্লাহ তা'য়ালা বললেন, বরং এমনি অবস্থায় তুমি একশ বছর কাটিয়ে দিয়েছো, তাকিয়ে দেখো তোমার নিজস্ব খাবার ও পানীয়ের দিকে, (দেখবে) তা বিন্দুমাত্র পচেনি, তোমার গাধাটির দিকেও দেখো (তাও একই অবস্থায় আছে, আমি এসব এ জন্যেই দেখালাম), যেনো আমি তোমাকে মানুষদের জন্যে (পরকালীন জীবনের) একটি (জীবন্ত) প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারি, এ (মৃত জীবের) হাড় পাঁজরগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখো, (তুমি নিজেই দেখতে পাবে) আমি কিভাবে তা একটার সাথে আরেকটার জোড়া লাগিয়ে (নতুন জীবন) দিয়েছি, অত:পর কিভাবে তাকে আমি গোস্তের পোশাক পরিয়ে দিয়েছি, অত:পর (এভাবে আল্লাহর দেখানো) এ বিষয়টি যখন তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেলো তখন বলে উঠলো, আমি (এটা) জানি, অবশ্যই আল্লাহ তা'য়ালা সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। (সূরা আল বাকারা-২৫৯)
হযরত মূসা (আ:) এর সামনে থেকে জ্ঞানের জগতের আবরণ সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। ফলে তিনি এমন জ্ঞানের অধিকারী হয়েছিলেন, যে জ্ঞান সম্পর্কে সাধারণ মানুষ সামান্যতম ধারণাও করতে পারে না। মহান আল্লাহ তা'য়ালার অসীম ক্ষমতার ক্ষুদ্রতম একটি হযরত মূসা (আ:) এর সম্মুখে প্রকাশ করার সাথে সাথে তিনি জ্ঞানহারা হয়ে পড়েছিলেন। এরপর তাঁর হাতের লাঠিকে যখন বিশাল সর্পে পরিণত করা হলো তখন তিনি প্রথম দিকে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তখনকার সে দৃশ্য মহান আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে এভাবে অঙ্কন করেছেন- وَأَنْ أَلْقِ عَصَاكَ ط فَلَمَّا رَآهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌ وَلَّى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَذِّبْ طَ يَا مُوسَى أَقْبِلْ وَلَا تَخَفْ قِفَ إِنَّكَ مِنَ الْآمِنِينَ (তাকে আরো বল হলো,) তুমি তোমার হাতের লাঠিটি যমীনে নিক্ষেপ করো; যখন সে তাকে দেখলো, তা (জীবন্ত) সাপের মতোই ছুটাছুটি করছে, তখন সে উল্টো দিকে ছুটতে লাগলো, পেছনের দিকে তাকিয়েও দেখলো না; (তার প্রতি তখন আদেশ করা হলো,) হে মূসা, তুমি এগিয়ে এসো, ভয় পেয়ো না। তুমি হচ্ছো নিরাপদ মানুষদেরই একজন। (সূরা আল কাছাছ-৩১)
এভাবে হযরত ইউসুফ (আ:), হযরত ইয়াকুব (আ:), হযরত নূহ (আ:) অর্থাৎ মহান আল্লাহ যে নবী-রাসূলকেই ইচ্ছা করেছেন তাদের দৃষ্টির সামনে থেকে প্রয়োজন অনুসারে আবরণ সরিয়ে দিয়েছেন। ফলে তাঁরা অদৃশ্য জগতের বহু কিছু নিজ চোখে দেখে তাদের অনুসারীদেরকে সাবধান এবং সুসংবাদ প্রদান করেছেন।
কিন্তু নবী করীম (সা:) এর ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিলো ভিন্ন ধরনের। সকল নবী-রাসূলদের নেতা ছিলেন তিনি। বিশেষ কোনো এলাকা বা জাতির জন্য তাঁকে প্রেরণ করা হয়নি। নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডীতেও তাঁর নবুয়্যাত আবদ্ধ করা হয়নি। তাঁর নবুয়্যাত পৃথিবী থেকে কিয়ামতের ময়দানে অনন্তকাল পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনি বিশ্বনবী নবী, তাঁকে সমগ্র পৃথিবীর মানুষের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। সমগ্র পৃথিবীর মানুষের ওপরে যিনি সকল বিষয়ে নেতৃত্ব প্রদান করবেন, তাঁকে তাঁর পদের উপযুক্ত করে গড়ার জন্য যে ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করা প্রয়োজন ছিলো মহান আল্লাহ তা-ই করেছিলেন। বিশ্বের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তাঁর জ্ঞানের পরিধি যতদূর বিস্তৃতি ঘটানো আবশ্যক ছিল মহান আল্লাহ তাই ঘটিয়েছেন। এ কারণেই তাঁর মিরাজ ছিল অন্য নবী-রাসূলের প্রত্যক্ষ দর্শনের থেকে ভিন্ন ধরনের। অন্য নবীদের ক্ষেত্রে যা করা হয়নি তাঁর ক্ষেত্রে তাঁর সর্বোচ্চ মর্যাদার সাথে সঙ্গতি রেখে তাই করা হয়েছে।
📄 নবী করীম (সা:) এর মিরাজ দৈহিক না স্বাপ্নিক
আমরা মিরাজের বিষয়টিকে এভাবে উল্লেখ করতে চাই, পবিত্র কুরআনের সূরা বনী ইসরাঈল-এ মহান আল্লাহ মিরাজের প্রসঙ্গে এভাবে বর্ণনা করেছেন- سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَا الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهِ مِنْ آيَاتِنَا طَ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ -
পবিত্র ও মহিমান্বিত (সেই আল্লাহ তা'য়ালা) যিনি তাঁর (এক) বান্দাহকে রাতের বেলায় মাসজিদে হারাম থেকে মাসজিদে আকসায় নিয়ে গেলেন, যার পারিপার্শ্বিকতাকে আমি (আগেই) বরকতপূর্ণ করে রেখেছিলাম, যেন আমি তাকে আমার (অদৃশ্য জগতের) কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। (সূরা বনী ইসরাঈল-১)
পবিত্র কুরআনের এই আয়াতে বাহ্যিক দিক দিয়ে এ কথা প্রমাণীত হয় না যে, বিশ্বনবী (সা:)-কে শারীরিকভাবে উর্ধ্ব আকাশ পাড়ি দিয়ে বিশেষ কোনো স্থানে নেয়া হয়েছিল। এ আয়াতে এ কথাই বাহ্যিক দিক দিয়ে বুঝা যায়, তাঁকে রাতের এক বিশেষ অংশে মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে জেরুজালিমের মসজিদুল আক্কসা পর্যন্ত ভ্রমণ করানো হয়েছে।
পক্ষান্তরে এই আয়াতের প্রথম শব্দ দিয়েই মহান আল্লাহ তা'য়ালা এই পৃথিবীর মানুষের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁর পক্ষে বিশ্বনবীকে শারীরিকভাবে মিরাজ করানো সম্ভব এবং তিনি তা করিয়েছেন। এই আয়াতের তাৎপর্য অনুধাবন না করার কারণ হলো, যে সময়ে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা পৃথিবীকে গ্রাস করছিল, বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারে পৃথিবীর মানুষ চমকিৎ হচ্ছিল, সে সময়ে গোটা পৃথিবীতে মুসলমানরা কোথাও ছিল ঘুমিয়ে, কোথাও ছিল তাঁরা পদানত, কোথাও ছিল তাঁরা ভিন্ন জাতির গোলামী করতে ব্যস্ত, কোথাও তাঁরা বিলাসিতার গড্ডালিকা প্রবাহে শরীর ভাসিয়ে দিয়েছিল, কোথাও তাঁরা আপন ভাইয়ের রক্তপাতে ছিল ব্যস্ত, কোথাও একে অপরের বিরুদ্ধে ফতোওয়াবাজীতে লিপ্ত ছিলো। আবিষ্কারের অবসর তাদের ভাগ্যে জোটেনি। আবিষ্কার করা তো দূরে থাক, তাঁরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে এই অবসর তাদের হয়নি।
ইসলাম বিরোধী শক্তি সমস্ত পৃথিবী নিজেদের নিয়ন্ত্রণে গ্রহণ করে শক্ত হাতে শাসনদণ্ড ধারণ করেছিল। পৃথিবীর নেতৃত্বও ছিলো ইসলাম বিদ্বেষীদের হাতে। আবিষ্কারের যাবতীয় উপকরণ তাদেরই হাতে। শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের হাতে। কোন্ পদ্ধতিতে এবং কিভাবে কোন্ কোন্ বিষয় শিক্ষা দিতে হবে, এ সব কিছুই তাদের হাতে। কুরআনের শিক্ষকও ছিল তাঁরা বাইবেলের শিক্ষকও ছিল তাঁরাই। মুসলমান মুল্লাদের ক্ষীণ দাবীর কারণে এবং নিজেদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে কতক স্থানে ইসলাম শিক্ষার নামে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ দিল বটে, কিন্তু সে সব মাদ্রাসায় কি শিক্ষা দেয়া হবে সেটা আড়ালে বা প্রকাশ্যে থেকে তাঁরাই নির্ধারণ করে দিল।
এ অবস্থা অবলোকন করেই ডক্টর আল্লামা ইকবাল বলেছিলেন, 'মুল্লাকে মসজিদে নামাজ আদায়ের সুযোগ দেয়া হয়েছে আর মূর্খের দল ভেবেছে ভারতে বোধহয় ইসলামের স্বাধীনতা রয়েছে'।
আবার কোথাও যদিও বা ইসলামের প্রেমিকগণ নিজেদের উদ্যোগে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করেছিল, সে সকল মাদ্রসায় কুরআনের আলোকে বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করে শিক্ষার্থীকে বুঝানো হবে, এমন শিক্ষকের ছিল তীব্র অভাব। স্কুল কলেজে যারা অধ্যয়ন করছিল তাঁরা তো পুরোপুরি ইসলাম বিরোধী শিক্ষাই লাভ করছিল। ইসলাম বিরোধিদের প্রচেষ্টায় মুসলমানদের ভেতরে দুই ধরণের শিক্ষায় দুটো দল সৃষ্টি হলো। মাদ্রাসা থেকে যারা বের হলো তাঁরা দেশ পরিচালনার অযোগ্য কিন্তু চরিত্রবান। তাদের চরিত্রে আল্লাহর ভয় কিছুটা পাওয়া গেল। আর স্কুল কলেজ থেকে যাঁরা বের হলো তাঁরা পাশ্চাত্যের অনুকরণে দেশ পরিচালনার যোগ্য বটে কিন্তু চরিত্রহারা। তাদের ভেতরে আল্লাহভীতি দূরে থাক, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের অনুপস্থিতি ছিল প্রকট।
ইসলাম বিরোধিদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কুরআন হাদীসের প্রচার প্রসার কিভাবে সম্ভব তা আমাদের বোধের অগম্য। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা ছিল তাই। পঞ্চাশ জন মানুষ একস্থানে সমবেত হয়ে আল্লাহ রাসূলের কথা শুনবে কি শুনবে না সেটাও ছিল ইসলাম বৈরীদের করুণার ওপর নির্ভরশীল। এই অবস্থায় ও পরিবেশে কুরআন ভিত্তিক গবেষণা ও কুরআনের বিজ্ঞান সম্পর্কিত আয়াতের রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব ছিলো না। বর্তমানে যা সম্ভব তা সে সময়ে সম্ভব ছিল না। ফলে এমন লোক তৈরী হতে পারেনি, যারা কুরআনের শব্দ দিয়েই প্রমাণ করে দিবে, ইসলাম যা বলে এবং বিশ্বনবী যা বলেছেন, করেছেন, তাঁর পবিত্র জীবনে যা ঘটেছে তার কোনটিই যুক্তিহীন বা অবৈজ্ঞানিক নয়।
মিরাজ সম্পর্কিত আলোচনায় আমরা বিজ্ঞানের নানা জটিল বিষয়ের অবতারণা করে অযথা গ্রন্থের কলেবর বৃদ্ধি করতে ইচ্ছুক নই। আমরা স্পষ্ট কথা বলতে চাই, এই পৃথিবী থেকে মানব শরীর কোনো কিছুর মাধ্যম ব্যতীত আকাশ ভ্রমণ করতে পারে না, তা অসম্ভব। মহান আল্লাহ উর্ধ্বাকাশে মানুষের কল্যাণের জন্যই নানা ধরনের স্তর ও মধ্যাকর্ষণ শক্তি সৃষ্টি করেছেন। রয়েছে মারাত্মক ক্ষতিকর গ্যাস ও বায়বীয় স্তর, প্রতি মুহূর্তে উল্কাপাত ঘটছে, রয়েছে ভাসমান পাথরের সাম্রাজ্য। এ সকল স্তর অতিক্রম করে আকাশ পর্যন্ত পৌঁছা বা আকাশ অতিক্রম করে ভিন্ন কোনো জগতে পৌঁছা অসম্ভব। এই চর্মদেহ নিয়ে ঐ সকল স্তর অতিক্রম করা কল্পনাও করা যায় না। পক্ষান্তরে বিজ্ঞান স্বীকার করে, 'যা আজ কল্পনার অতীত তাই আগামী কাল বাস্তবে দেখা যায়'।
এ কথাটি সর্বক্ষেত্রেই যেন প্রযোজ্য। আজ এক দলের সাথে বৈরী সম্পর্ক কাল আবার তা স্বাভাবিক। মিস্টার জুলভার্ণ যে সময় তাঁর পাতাল সম্পর্কিত কল্পনা প্রসূত লেখা লিখেছিলেন বর্তমানে তা বাস্তব। সুতরাং কিছু কল্পনা বাস্তবে পরিণত হওয়া সময় ও সাধনার বিষয় মাত্র। মিরাজ সম্পর্কে আজও মানুষের কাছে যা কল্পনার বিষয় কাল তা বাস্তবে রূপলাভ করবে না তা নিশ্চয়তা দিয়ে বলা সম্ভব নয়।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ মিরাজ সম্পর্কিত আয়াতের শুরুতে যদি বলতেন, 'আল্লাযি আস্রা' অথবা 'হুওয়াল্লাযি আস্রা' অর্থাৎ যিনি বা তিনিই আল্লাহ যিনি তাঁর বান্দাহকে। কিন্তু এভাবে আল্লাহ তা'য়ালা বলেননি। তিনি বলেছেন, 'সুবহানাল্লাযি আস্রা' অর্থাৎ পাক পবিত্র ও মহিমান্বিত। আয়াত শুরু হয়েছে 'সুবহান' শব্দ দিয়ে। যার অর্থ হলো তিনি দুর্বলতা ও অক্ষমতা নামক নাপাকি বা অপবিত্রতা থেকে মুক্ত।
অর্থাৎ মানুষ যা অসম্ভব বলে চিন্তা করে তিনি সেই অসম্ভব থেকে মুক্ত। তাঁর কাছে অসম্ভব বলে কিছুই নেই। সৃষ্টি জগতে দৃশ্য অদৃশ্য যা কিছু আছে সব তাঁরই সৃষ্টি। যেখানে যে শক্তির অস্তিত্ব রয়েছে সবই তাঁর আজ্ঞাধীন। মানুষ যে শক্তিকে বড় বাধা বলে বিবেচনা করে তা মহান আল্লাহর গোলাম। আল্লাহর আদেশ ব্যতীত সে সব শক্তি বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। আল্লাহ তাদেরকে সক্রিয় হতে বললে তারা সক্রিয় হয় আর নিষ্ক্রীয় হতে বললে তারা নিষ্ক্রীয় হয়। সুতরাং নবী করীম (সা:) এর যে শারীরিকভাবে মিরাজ হয়েছিল এতে অসম্ভবের কিছুই নেই।
মহাকাশে ভ্রমণ ও বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে ভিন্ন জগতে পৌঁছার জন্য যে বাধা রয়েছে, সে বাধা তো মহান আল্লাহরই আজ্ঞাবহ। এ সব আজ্ঞাবহ সৃষ্টিসমূহ মানুষের ন্যায় স্বাধীন ক্ষমতা সম্পন্ন অবাধ্য গোলাম নয়। আল্লাহর আদেশের বিপরীত কিছু করার ক্ষমতাই ঐসব সৃষ্টিসমূহকে দেয়া হয়নি। মহান আল্লাহর প্রিয় এবং শ্রেষ্ঠ বন্ধু তাঁরই আদেশে পথ প্রদর্শক হযরত জিবরাঈল (আ:) এর মাধ্যমে এমন জগতে ভ্রমণে যাবেন, যে জগৎ সম্পর্কে মানুষ কল্পনাও করতে পারে না।
এরপরেও সাধারণ মানুষ যদি তা অসম্ভব বলে চিন্তা করে এ কারণে মহান আল্লাহ মানুষের সে ধারণাকে খণ্ডন করে বলেছেন, 'তোমরা যা অসম্ভব বলে চিন্তা করছো, যে সম্পর্কে তোমরা দুর্বল, তোমরা যা করতে অক্ষম, আমি আল্লাহ ঐ সকল দুর্বলতা, অক্ষমতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং ভ্রমণ পথের পারিপার্শ্বিকতাকে আমি (আগেই) বরকতপূর্ণ করে রেখেছিলাম'।
এরপরেও আরেকটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করা যেতে পারে। পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রেই রাস্তায় ট্রাফিক ব্যবস্থা রয়েছে। যান-বাহন থামতে হবে এ জন্য একটি Signal এর ব্যবস্থা রয়েছে। চলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে এ জন্য আরেকটি ওধথভটফ-এর ব্যবস্থা রয়েছে। চলতে হবে এ জন্য আরেকটি Signal এর ব্যবস্থা আছে। এ সব Signal এর মুখোমুখি হলে যান-বাহনের চালক অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। যান-বাহন চলতে হবে, এ ধরনের Signal পেলেও কারণ বিশেষে যান-বাহন চলে না। ট্রাফিক পুলিশ চলতে দেয় না। রাষ্ট্রের সম্মানিত ব্যক্তির জন্য বা বিদেশী সম্মানিত অতিথির ক্ষেত্রে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশে ট্রাফিক পুলিশ প্রচলিত নিয়মের ব্যতিক্রম করে। বিশেষ বিশেষ রাস্তায় যান-বাহন এবং সাধারণের চলাচল সাময়িকের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। যান-বাহনের গতি স্তব্ধ হয়ে যায়। সম্মানিত মেহমান চলে যাবার পরে গতি আবার সচল হয়।
মহান আল্লাহর সর্বোচ্চ মর্যাদায় আসীন সর্ব শ্রেষ্ঠ মেহমান আগমন করবেন। এমনও তো হতে পারে, মহান আল্লাহ পৃথিবীর সকল গতি সে সময় স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন। বৃক্ষের পাতা যেদিকে হেলেছিল গতি না থাকার কারণে পাতা ঐ অবস্থায় ছিল। চন্দ্র-সূর্য তারকা, বাতাস, মধ্যাকর্ষণ শক্তি, উর্ধ্ব জগতের যাবতীয় শক্তির গতি তিনি থামিয়ে দিয়ে তাঁর মর্যাদাবান সম্মানিত মেহমান বিশ্বনবী (সা:) কে তাঁর একান্ত সান্নিধ্যে নিয়েছিলেন। নিয়ে যাবার পথে যে সকল বাধার বিষয় রয়েছে, সে সম্পর্কে কুরআনের এ কথাও তো প্রযোজ্য যে, 'পারিপার্শ্বিকতাকে আমি (আগেই) বরকতপূর্ণ করে রেখেছিলাম' অর্থাৎ যা কিছু বাধা সৃষ্টি করে বলে তোমাদের ধারণা তা আমি পূর্বেই অপসারিত করেছিলাম। সুতরাং রুহানীভাবে মিরাজ হয়েছে না স্বাপ্নীকভাবে মিরাজ হয়েছে, এ সব কথা বলে বিতর্ক সৃষ্টির প্রয়োজন নেই।
📄 সর্বশ্রেষ্ঠ মাকামে নবী করীম (সা:)
নবী করীম (সা:) এর জীবনে কখন মিরাজ অনুষ্ঠিত হয়েছিল এ সম্পর্কে ইতিহাসে মত পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। মদীনায় হিজরতের পূর্বে মক্কায় মিরাজ অনুষ্ঠিত হয়েছিল এ সম্পর্কে মতপার্থক্য নেই। সে সময় নির্দিষ্ট কোনো বছর বা সনের প্রচলন ছিল না বিধায় কোন্ মাসের কোন্ তারিখে মিরাজ অনুষ্ঠিত হয়েছিল তা নিয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। তবে কুরআন ও হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী মিরাজ রাতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মাস সম্পর্কে কেউ বলেছেন রমজান মাসের ১৭ তারিখ, কেউ বলেছেন রবিউল আউয়াল, আবার কেউ বলেছেন রজব মাসের ২৭ তারিখ বা শাওয়াল মাসে।
বছর সম্পর্কে বলা হয়েছে হিজরতের তিন বছর পূর্বে। হযরত আবু তালিব এবং হযরত খাদিজা (রা:) এর ইন্তেকালের পরে যে মিরাজ হয়েছিল এ কথার সমর্থন পাওয়া যায় হযরত আয়িশা (রা:) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসে। তিনি বলেছেন 'পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হবার পূর্বেই হজরত খাদিজা (রা:) ইন্তেকাল করেছিলেন এবং হিজরতের তিন বছর পূর্বে মিরাজ অনুষ্ঠিত হয়েছিল'।
হাদীস ও সিরাতের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে এটা বুঝা যায়, হিজরতের এক বছর পূর্বে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল। এ ধরণের আরো কিছু বর্ণনা থেকে জানা যায় হিজরতের পূর্বেই মিরাজ হয়েছিল। আর এই সময় মিরাজ হওয়াও ছিল সময়ের দাবী। কারণ আর মাত্র এক বছর বাকী ছিল ইসলামকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার। রাষ্ট্র প্রধানের কি দায়িত্ব এবং কর্তব্য তা নবী করীম (সা:) কে শিক্ষা দেয়ার প্রয়োজন ছিল। ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার মত লোক মক্কাতেই নানা ঘাত- প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে প্রস্তুত হচ্ছিল। নবী করীম (সা:) জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সাড়ে বারো লক্ষ বর্গ মাইল এলাকা ব্যাপী বিস্তৃত একটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
হিজরতের পরপরই তাঁর জীবন ধারায় মহান আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে বিরাট পরিবর্তন আসবে, দীর্ঘ তেরো বছর ধরে তিনি নির্মম নির্যাতন সহ্য করেছেন, তাঁর চোখের সামনে তাঁরই প্রাণ প্রিয় সাহাবায়ে কেরাম নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতিত হয়েছে, প্রতিকার করতে পারেননি, এ সবের অবসান ঘটবে এবং এবার আঘাত এলে প্রতিঘাত করা হবে, বিশাল একটি রাষ্ট্রের- যে রাষ্ট্রে নানা রঙের, বর্ণের, ভাষার, ধর্মের, জাতির লোক বাস করবে, এমন একটি রাষ্ট্রের খুটিনাটি আইন-কানুনের প্রয়োজন। এ সকল দিক সামনে রেখেই তাঁর মিরাজ যথা সময়েই মহান আল্লাহ সংঘটিত করেছিলেন। বিশাল সে রাষ্ট্রের মূলনীতি কি কি, মহান আল্লাহ তাঁকে জানিয়ে দিলেন।
নবী করীম (সা:) এবং মুসলমানগণ যে চরম সমস্যার মুকাবিলা করছিলেন এবং সে সমস্যা অচিরেই দূরীভূত হয়ে সৌভাগ্য- শশী উদিত হবে, তারই শুভ ইঙ্গিত ছিল পবিত্র মিরাজ। হিজরতের পর হতে সার্বিক কল্যাণ, শান্তি ও নিরাপত্তার এক নতুন পৃথিবীর দ্বার উদঘাটন হবে, ঠিক সে সময়েই এমন এক মহিমান্বিত রাতের আগমন ঘটলো, যে রাত ছিল মহান আরশে আজীমে পৌঁছার গৌরবময় রাত। এ রাতে মহান আল্লাহ পৃথিবীতে যত কার্যকরী উপাদান রয়েছে সে সব উপাদানসমূহকে নির্দেশ দিলেন, আকাশ ও পৃথিবীর যাবতীয় নিয়ম পদ্ধতি যেন পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় থাকে। জান্নাতের দ্বাররক্ষীকে আদেশ করা হলো, সম্মানিত মেহমান আগমন করবেন, সকল কিছুই নবসাজে সজ্জিত করা হোক। যে পথে মেহমান আগমন করবেন এবং যে সকল এলাকা পরিদর্শন করবেন, সে পথসমূহ এবং এলাকাসমূহ সজ্জিত করা হোক। হযরত জিবরাঈল (আ:) কে আদেশ করা হলো, দ্রুতগামী যা কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে তার তুলনায়ও অধিক দ্রুতগামী বাহন মেহমানের জন্য প্রস্তুত করে যথাস্থানে প্রস্তুত রাখা হোক।
মহামান্য অতিথিকে স্বাগত জানানোর জন্য উর্ধ্ব জগতের সকল কিছু প্রস্তুত হয়ে গেল। যাত্রা পথে জান্নাতি সুরের তরঙ্গ সৃষ্টি করা হলো। সর্বত্র জান্নাতের আনন্দ সমিরণ প্রবাহিত হতে থাকলো। মানুষ যে জগতের স্পর্শ সহ্য করতে সক্ষম সে শক্তি নবী করীম (সা:) কে দান করার জন্য হযরত জিবরাঈল (আ:) মর্ত্যধামে পবিত্র মক্কায় উপস্থিত হলেন। বুখারী, মুসলিম হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে, হযরত আবুজার (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা:) যে গৃহে অবস্থান করছিলেন সে গৃহের ওপরের আবরণ উন্মুক্ত করা হলো। জিবরাঈল (আ:) প্রবেশ করে রাসূল (সা:) এর বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। প্রয়োজনীয় কাজ সমাপ্ত করে তাঁর বুকের ভেতরে পবিত্র জমজমের পানি দিয়ে পরিষ্কার করলেন। তারপর বিশ্বাস এবং যাবতীয় জ্ঞান তাঁর ভেতরে প্রবেশ করানো হলো। এরপর নেয়া হলো মাসজিদুল আকসায় এবং সেখান থেকে হযরত জিবরাঈল (আ:) তাঁকে নিয়ে প্রথম আকাশে এসে দ্বার রক্ষককে বললেন, 'দ্বার উন্মুক্ত করো'।
রক্ষী জানতে চাইলেন, 'কে?' জিবরাঈল (আ:) নিজের পরিচয় দিলেন। তাঁকে আবার প্রশ্ন করা হলো, 'আপনার সাথীর পরিচয় দিন?' উত্তর দেয়া হলো, 'আমার সাথী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা:)'।
এভাবে বিশ্বনবী (সা:)-এর পরিচয় জানার পরে দ্বার উন্মুক্ত করা হলো। এরপর তাঁকে নিয়ে জিবরাঈল (আ:) প্রথম আকাশে আরোহণ করলেন। সেখানে তিনি একজন মানুষকে বসে থাকতে দেখলেন, তাঁর দক্ষিণ পাশে একদল মানুষ এবং তিনি তাদেরকে দেখে হাসেন এবং তাঁর বাম পাশে একদল মানুষ তিনি তাদেরকে দেখে কাঁদেন। রাসূল (সা:) কে দেখে তিনি বললেন, 'হে মর্যাদাবান সন্তান! সম্মানিত নবী! স্বাগতম!'
নবী করীম (সা:) সঙ্গীকে সে ব্যক্তির পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন, সঙ্গী তাঁকে জানালো তিনি হযরত আদম (আ:)। তাঁর ডানদিকে যাদেরকে দেখলেন তাঁরা জান্নাতি আর বামদিকে যাদেরকে দেখলেন তারা জাহান্নামী। এ কারণে তিনি ডানদিকে তাকিয়ে হাসেন আর বাম দিকে তাকিয়ে কাঁদেন। এরপর তাঁকে দ্বিতীয় আকাশে আরোহণ করানো হলো। সেখানেও তাঁর সাথে নবীদের সাক্ষাৎ ঘটলো। এভাবে একটির পরে আরেকটি আকাশ পার হয়ে তিনি ষষ্ঠ আকাশে কতক নবীদের সাক্ষাৎ পেলেন। সকল নবী-রাসূল তাঁকে স্বাগত জানালেন। এরপর আকাশের সকল স্তর অতিক্রম করে জিবরাঈল (আ:) তাকে আল্লাহর আরশে আজীমের কাছে পৌঁছে দিলেন। মহান আল্লাহর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় উপহার নিয়ে তিনি নিচের দিকে এলেন।
নবী করীম (সা:) তাঁর উম্মতের জন্য দিনে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজসহ ফিরছিলেন। হযরত মূসা (আ:) এর সাথে সাক্ষাৎ ঘটলে তিনি জানতে চাইলেন, 'আপনার উম্মতের জন্য কি উপহার দেয়া হলো?' তিনি জানালেন নামাজের কথা। মূসা (আ:) বললেন, 'আপনি আল্লাহর কাছে ফিরে যান, আপনার উম্মত পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারবে না'।
নবী করীম (সা:) আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে আবেদন জানালেন, মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে নামাজ কমিয়ে দিলেন। মূসা (আ:) তাঁকে পরামর্শ দিলেন, 'আপনার উম্মত নামাজের এই সংখ্যাও আদায় করতে পারবে না। আপনি ফিরে গিয়ে আরও কমিয়ে আনুন'। এ ধরনের ঘটনা কয়েকবার ঘটলো। শেষে যখন মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত অবশিষ্ট রইলো তখন মহান আল্লাহ জানালেন, আমার আদেশের পরিবর্তন হয় না। এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করলেই পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব দেয়া হবে। এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও মূসা (আ:) পরামর্শ দিলেন কমিয়ে আনার জন্য। নবী করীম (সা:) তাঁকে জানালেন, 'আল্লাহ তা'য়ালাকে এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কমিয়ে দেয়ার কথা বলতে আমি ভীষণ লজ্জা অনুভব করছি'।
এবার তাঁকে সুসজ্জিত সিদরাতুল মুনতাহা পরিদর্শন করানো হলো। জান্নাত দেখানো হলো, জান্নাতে মোতির তৈরী প্রাসাদসমূহ দেখলেন এবং সেখানের মাটি ছিল মিল্ক দিয়ে নির্মাণ করা।
একটি বিষয় উল্লেখ করা আবশ্যক যে, মিরাজের পূর্ণাঙ্গ ঘটনা কোনো একটি হাদীসেও উল্লেখ করা হয়নি। অনেকগুলো হাদীস একত্রিত করলে তারপর সম্পূর্ণ ঘটনা একত্রিত করা যায়। এর কারণ হলো, বর্ণনাকারীদের ভেতরে যিনি ঘটনার যতটুকু শুনেছেন ততটুকুই বর্ণনা করেছেন। কোনো বর্ণনায় আছে, নবী করীম (সা:) কা'বাঘরের হাতিম এলাকায় ঘুমিয়ে ছিলেন। কুরাইশরা যখন কা'বা মেরামত করেছিল সে সময় তারা অর্থের অভাবে একটি অংশ বাদ রেখে কা'বার পুন:নির্মাণ করেছিল। ঐ বাদ দেয়া অংশকেই হাতিম বলে। বর্তমানেও সে অংশ রয়েছে। এখানেই তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। আরেক বর্ণনায় রয়েছে, তিনি হযরত উম্মে হানি (রা:) এর ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন।
হজরত জিবরাঈল (আ:) নবী করীম (সা:) কে ঘুম থেকে জাগিয়ে তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। তারপর প্রয়োজনীয় কাজ সেরে তাঁকে একটি অদ্ভুত দর্শন পশুর ওপরে আরোহণ করালেন। পশুটি ছিল গাধা এবং ঘোড়ার আকৃতির মাঝামাঝি এবং দু'পাখা বিশিষ্ট। যার নাম বর্ণনা করা হয়েছে বুরাক। আরবী বুরাক শব্দ বারকুন শব্দ থেকে এসেছে। এ শব্দের অর্থ হলো, বিদ্যুৎ। এই পশুটির রং ছিল সাদা। হযরত জিবরাঈল (আ:) এর ইশারায় উক্ত বুরাক মুহূর্তের মধ্যে বাইতুল মাকদিসে এসে উপনীত হলো। সেখানে বিশ্বনবী (সা:) অসংখ্য নবী-রাসূল ও ফেরেশতা দেখলেন, তাঁরা তাঁকে স্বাগত জানালেন। তিনি তাদের সাথে কুশল বিনিময়ের পরে তাঁরা সকলেই নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। ইমামের স্থান ছিল শূন্য, বিশ্বনবীকে সেখানে এগিয়ে দেয়া হলো। এভাবে সকল নবী-রাসূল এবং ফেরেশেতাগণ বিশ্বনবীর নেতৃত্বে নামাজ আদায় করলেন।
আরেক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, বাইতুল মাকদিসে নামাজ আদায় করা হয়েছিল মিরাজ থেকে প্রত্যাবর্তনের সময়। উর্ধ্ব জগতে যাবার সময় বাইতুল মাকদিসে তাঁর সামনে দু'টো পানীয় পূর্ণ পাত্র উপস্থিত করা হলো। একপাত্রে ছিল শরাব অন্যটিতে দুধ। নবী করীম (সা:) দুধের পাত্র উঠিয়ে পান করলেন। হযরত জিবরাইল (আ:) বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! উন্নত চরিত্র আপনার মধ্যে বিদ্যমান। আপনার উম্মতের মধ্যেও এমন হবে। শরাব আপনার জন্য নিষিদ্ধ'।
আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁকে উর্ধ্ব জগতে উঠানো হয়। আকাশের বিভিন্ন স্তরে সম্মানিত নবী-রাসূলদের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে। এরপর তাঁকে উপস্থিত করা হয় সিদরাতুল মুনতাহায়। এখানে পৌঁছার পরে হযরত জিবরাইল (আ:) তাঁকে বিনীতভাবে অবগত করেন, 'আমাদের জন্যে এই সীমা অতিক্রম করার অনুমতি নেই'।
প্রমাণ হয়ে গেল যেখানে হযরত জিবরাঈল (আ:) যেতে পারেন না, সেখানে নবী করীম (সা:) এর অবাধ পদচারণা। তারপর তিনি বাইতুল মামুরে পৌঁছলেন। এই বাইতুল মামুর হলো কা'বার মৌলিক ভবন। এখান থেকে তাঁকে মহান আল্লাহ নিজের সান্নিধ্যে ডেকে নেন। তিনি মহান আল্লাহকে দেখেছিলেন কিনা এ সম্পর্কে আলোচনা না করাই উত্তম। তাঁর দেখা না দেখার সাথে পৃথিবীর মানুষের জীবনের কোনো সমস্যা জড়িত নয়। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে কল্পকাহিনী রচনা করা বা তা নিয়ে মস্তিষ্ক উত্তপ্ত করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ব্যাপার। আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে নিজের সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন, 'কোনো মানব চক্ষু আমাকে দেখতে পারে না'। নবী করীম (সা:) ও মহান আল্লাহর ঘোষণা অনুযায়ী মানুষ ছিলেন, তবে তিনি আমাদের মতো মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার বিশেষ সৃষ্টি মহামানব। আল্লাহ তা'য়ালার ঘোষণা তাঁর জন্যেও প্রযোজ্য।
এরপর জান্নাত- জাহান্নাম এবং মহান আল্লাহর নানা কুদরত তাঁকে পরিদর্শন করানো হলো। সৎ কর্মের কি পুরস্কার এবং আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করলে কি ধরনের শাস্তি ভোগ করতে হবে তা দেখানো হলো। মহান আল্লাহ যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে তাঁকে নিজের সান্নিধ্যে আহ্বান করেছিলেন তা পূর্ণ হবার পরে তাঁকে পুনরায় এই পৃথিবীতে প্রেরণ করা হলো। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কতটুকু সময়ের প্রয়োজন হয়েছিল তা মহান আল্লাহই অবগত আছেন। তবে বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখা যায়, রাতের কিছু অংশে তা সংঘটিত হয়েছিল। অনেকের কাছে বিষয়টি বোধগম্য নয়, রাতের সামান্য অংশে এতকিছু পরিদর্শন করা কি করে সম্ভব?
নবী করীম (সা:) কে মিরাজে নেয়ার সময় যদি পৃথিবীর গতি হরণ করা হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই এটা সম্ভব। একটি ঘড়িকে যদি রাত বারোটার সময় বন্ধ করে রাত চারটায় পুনরায় চালু করা হয়, তাহলে ঘড়ির কাঁটা ঐ রাত বারোটার স্থান থেকেই ঘুরতে থাকবে, রাত চারটার স্থান থেকে ঘুরবে না। তিনি যদি রাত একটার সময় যাত্রা আরম্ভ করে থাকেন আর সে সময়েই যদি সকল সৃষ্টির গতি মহান আল্লাহ বন্ধ করে দিয়ে থাকেন, তাহলে পৃথিবীর সময় তো স্থির হয়েছিল। সময় সামনের দিকে এগিয়ে যায়নি। তিনি যখন পৃথিবীতে পদার্পণ করেছেন তখন পুনরায় পৃথিবীকে গতিদান করা হয়েছে, স্থির সময় পুনরায় সামনের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। বিষয়টি যদি এমনই হয়ে থাকে তাহলে অবাক হবার কিছুই নেই। সে সময়ে কি ঘটেছিল মহান আল্লাহ তা'য়ালাই ভালো জানেন।
আজ থেকে শতকোটি বছর পূর্বে মহাকাশে, সাগরের অতল তলদেশে তথা পৃথিবীর কোথায় কি ঘটেছিল, গবেষণায় তা উদ্ঘাটন হচ্ছে। মিরাজ সংঘটিত হবার কালে পৃথিবীর সময় স্থির হয়ে পড়েছিল কিনা তা হয়তঃ একদিন গবেষণায় জানাও যেতে পারে। চাঁদে কবে কোন্ দিন কোন্ সময় ফাটল ধরেছিল তা যদি বর্তমানে বলে দেয়া সম্ভব হয়, তাহলে পৃথিবীর সময় কোনো এক শুভ মুহূর্তে স্থির হয়েছিল কিনা তা বলে দেয়া অসম্ভবের কিছুই নেই।
নবী করীম (সা:) মানুষকে মিরাজের কথা শোনানোর পরে ইসলাম বিরোধী গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের নতুন খোরাক পেয়েছিল এতে সন্দেহ নেই। কতক দুর্বল মুসলমানের ঈমান নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা:) শোনার সাথে সাথেই মন্তব্য করেছিলেন, 'আল্লাহর রাসূল যদি এ কথা বলে থাকেন যে তাঁর মি'রাজ হয়েছিল, তাহলে তা অবশ্যই সত্য'। এ কারনেই নবী করীম (সা:) হযরত আবু বকর (রা:) কে সিদ্দীক-এ আকবার উপাধী দান করেছিলেন।
সে সময় মক্কা থেকে জেরুজালিমে আসার যেসব বাহন ছিল, সেসব বাহন ব্যবহার করেও বাইতুল মাকদিসে আসতে কয়েক দিনের রাস্তা অতিক্রম করতে হতো। রাসূল (সা:) ইতোপূর্বে কখনো বাইতুল মাকদিস দেখেননি। তাঁকে যখন বাইতুল মাকদিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বাইতুল মাকদিস সম্পর্কে এমনভাবে বর্ণনা করেছিলেন যে, তিনি বোধহয় সে ভবনটির সামনে দাঁড়িয়ে ভবনটির খুটিনাটি দিক সম্পর্কে বর্ণনা করছেন। ভবনটির কোথায় কি আছে না আছে সম্পূর্ণ তিনি বলেছিলেন। তিনি যাত্রা পথে ব্যবসায়ীদের কিছু কাফেলাকে দেখেছিলেন, তাদের সম্পর্কে তিনি যা বলেছিলেন ব্যবসায়ী কাফেলা মক্কায় এলে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁর বর্ণনা আর তাদের বলা কথার ভেতরে পার্থক্য সূচিত হলো না। সুতরাং মিরাজের ঘটনা সে সময়েই ছিল প্রমাণীত সত্য। বর্তমানে মিরাজের বিষয় নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে তা একান্তই উদ্দেশ্যমূলক।
মিরাজ সম্পর্কে যে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে এর জন্য দায়ী আমরা মুসলমানরাই। কারণ আমরা গাছের শিকড় না ধরে তার শাখা প্রশাখা ধরে টানা হেঁচড়া করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। কি উদ্দেশ্যে তাঁর মিরাজ হলো, এর কেন্দ্রীয় লক্ষ্য কি, এর শিক্ষা কি, মিরাজ থেকে নবী করীম (সা:) মানব জাতির জন্য কি কল্যাণ বহন করে এনেছিলেন, এ সম্পর্কে লেখনিতে বা বক্তৃতায় আলোচনা না করে, মিরাজে তিনি কি কি দেখলেন, কোন্ পথে গেলেন, কার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটলো এসব গৌণ বিষয় নিয়ে আলোচনায় সময় অতিবাহিত করা হয়। ফল যা হবার তাই হয়েছে। এসব অলৌকিক বর্ণনা আধুনিক নাস্তিক্যবাদী শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়নি। মিরাজের মূল লক্ষ্যও অধিকাংশ মানুষ জানতে পারেনি। শোষিত বঞ্চিত মানুষের জন্য মিরাজ থেকে নবী করীম (সা:) মুক্তির কোন্ উপহার বহন করে আনলেন তা সাধারণ মানুষ জানতে পারেনি। বিষয়টি চিন্তাবিদ, গবেষক ও উচ্চ পর্যায়ের আলেমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
📄 উদ্ভূত প্রশ্ন ও তার জবাব
হাদীসের গ্রন্থসমূহে নবী করীম (সা:) এর মিরাজের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ২৫ বা ২৬ জনের এক বিরাট সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম মিরাজ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। এদের মধ্যে হযরত আয়িশা (রাঃ), হযরত আনাস (রাঃ), হযরত আবু জার (রাঃ), হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত হুজাইফা (রাঃ), হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত মালিক (রা:) সহ সাহাবায়ে কেরাম মিরাজের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। পবিত্র কুরআনে শুধুমাত্র মক্কার বাইতুল্লাহ শরীফ থেকে জেরুজালিমের বাইতুল মাকদাস পর্যন্ত ভ্রমণের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর নবীকে নিদর্শন দেখাবেন।
পবিত্র কুরআনে এর বেশি কিছু বিস্তারিত আলোচনা করা হয়নি। হাদীসে এই ঘটনার যে বিস্তারিত বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ হচ্ছে, গভীর রজনীতে হযরত জিবরাঈল (আ:) এসে তাঁকে উঠিয়ে বক্ষ বিদীর্ণ করে বুরাকে সওয়ার করিয়ে মক্কা থেকে মাসজিদুল আক্কসায় নিয়ে যান। সেখানে তিনি সকল নবী-রাসূলের সাথে নামাজ আদায় করেন। তারপর তাঁকে উর্ধ্ব জগতে নিয়ে যান। মহাকাশের বিভিন্ন স্তরে তাঁর সাথে সম্মানিত নবী-রাসূলের সাথে সাক্ষাৎ ঘটে। এরপর আরো উচ্চতায় তাঁকে আরোহণ করানো হয়। সেখান থেকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নিদের্শ গ্রহণ করেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এ সময় ফরজ করা হয়। এরপর তিনি পুনরায় বাইতুল মাকদাসে এসে পরে মক্কায় কা'বাঘরে আসেন।
বিভিন্ন হাদীস শরীফ থেকে জানা যায়, উর্ধ্ব জগতে তাঁকে জান্নাত ও জাহান্নাম প্রদর্শন করানো হয়। তিনি জাহান্নামে অপরাধীদের নানা ধরনের শাস্তি ভোগ করতে দেখেন। পুরস্কার প্রাপ্তদের জান্নাতে বিভিন্নভাবে ভোগ বিলাসে মগ্ন দেখেন। হাদীস শরীফ থেকে এ কথাও জানা যায় যে, নবী করীম (সা:) মিরাজের ঘটনা বর্ণনা করার পরে ইসলাম বিরোধীগণ তাঁকে বিদ্রুপ করতে থাকে এবং কিছু সংখ্যক দুর্বল মুসলমানের বিশ্বাসের ভিত্তি কেঁপে ওঠে। হাদীসের এই যে বিস্তারিত বর্ণনা, তা পবিত্র কুরআনের বিপরীত নয় বরং কুরআনের বর্ণনার সম্প্রসারিত রূপ হাদীস শরীফের বিস্তারিত বর্ণনা। সুতরাং হাদীসের বর্ণনা অবিশ্বাস করে তা এড়িয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই।
আমরা ইতোপূর্বেই আলোচনা করেছি, এ বিষয়টি ধ্যান যোগে বা স্বপ্ন যোগে ঘটেনি। সম্পূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় শারীরিকভাবে মিরাজের ঘটনা ঘটেছে। পবিত্র কুরআনের 'সুবহান' শব্দের মধ্যেই এ কথা স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে যদি মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর একস্থান থেকে আরেক স্থানে সংবাদ প্রেরণ করা যায়, হাজার হাজার মাইল ব্যবধানে থেকে অবিকল কন্ঠে পরস্পরে কথা বলা যায়, মুহূর্তের মধ্যে একস্থান থেকে আরেক স্থানে গমন করা যায়, তাহলে হাদীসের বর্ণনাকে কিভাবে অস্বীকার করা যায়? একটি বিষয় সামনে রেখে নবীদের জীবনের অলৌকিক ঘটনাসমূহ আলোচনা করতে হবে। বিষয়টি হলো সম্ভব এবং অসম্ভব, এই দু'টো বিষয় সামনে রাখতে হবে।
সম্ভব এবং অসম্ভব- এই শব্দ দু'টো কার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা প্রথমে বিবেচনায় আনতে হবে। সৃষ্টির ক্ষেত্রে এ দু'টো শব্দ প্রয়োগ করা যায়। কিন্তু স্রষ্টার ক্ষেত্রে কি এ শব্দ দু'টো প্রযোজ্য? মানুষ যদি স্রষ্টার ক্ষেত্রেও সম্ভব অসম্ভবের প্রশ্ন উঠায় তাহলে বলতে হয়, সে ব্যক্তি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী, শক্তিধর, অসীম ক্ষমতাবান বলে বিশ্বাস করে না। হযরত আবু বকর (রা:) এবং অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম যেমন বিশ্বাস করতেন, আরশে আজীম থেকে নবী করীম (সা:) এর কাছে ওহীর আগমন যদি অসম্ভব না হয়, তাহলে মিরাজ কি করে অসম্ভব হতে পারে?
এক শ্রেণীর মানুষ প্রশ্ন তোলে হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনা সম্পর্কে। তাদের প্রথম প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহর কুদরত সর্বত্র বিরাজমান। তাঁর কুদরত সসীম নয় অসীম এবং কোথাও সীমাবদ্ধ নয়, নির্দিষ্ট কোনো স্থানে তাঁর ক্ষমতা অবস্থান করে না। কিন্তু বিশ্বনবী (সা:) কে আরশে আজীমে ডেকে নিয়ে তাঁর সাথে আল্লাহ কথোপকথন করলেন, এ থেকে তো এ কথাই প্রতীয়মান হয় আল্লাহ নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করছেন। নতুবা নবী করীম (সা:) কে আরশে আজীমে ডেকে নেয়া হলো কেনো? তিনি তো যে কোনো স্থান থেকেই নবীর সাথে কথা বলতে পারতেন? দ্বিতীয় যে প্রশ্ন করা হয়, বিশ্বনবী (সা:) কে জাহান্নামের শাস্তি প্রদর্শন করা হলো। বিভিন্ন অপরাধে মানুষ শাস্তি ভোগ করছে তা তিনি দেখে বর্ণনাও করেছেন। সৎ কাজের পুরস্কার হিসাবে জান্নাতে কে কিভাবে ভোগ বিলাসে মগ্ন আছে তা তিনি দেখে বর্ণনাও করেছেন। এখন পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হলো না, মানুষের বিচার হলো না, তাঁর পূর্বেই মানুষকে কিভাবে জান্নাতে পুরস্কার দেয়া হলো এবং কিভাবেই বা জাহান্নামে শাস্তি দেয়া হলো?
এমন প্রশ্নকারীদের চিন্তার দৈন্যতার কারণেই তাঁরা এ ধরনের প্রশ্ন করে। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রথম প্রশ্নের জবাব হচ্ছে, মহান আল্লাহর ক্ষমতা নিঃসন্দেহে অসীম। পক্ষান্তরে সৃষ্টির সাথে আচরণ করার সময় তিনি স্বীয় কোনো অক্ষমতা বা দুর্বলতার কারণে নয়, বরং সৃষ্টির দুর্বলতা বা অক্ষমতার কারণে সৃষ্টিকে বিশেষ স্থানে নিতে হয় এবং এটি সেই সৃষ্টির সর্বোচ্চ মর্যাদারই প্রমাণ বহন করে। মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির সাথে যখন কথা বলেছেন, সৃষ্টির অক্ষমতার কারণে বিশেষ সীমাবদ্ধ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়েছে, যেন তাঁর সৃষ্টি তাঁর সকল কথা শুনতে এবং বুঝতে পারে।
আল্লাহ তা'য়ালা সৃষ্টি জগতের অণু-পরমাণু বা তার থেকেও ক্ষুদ্র যদি কিছু থেকে থাকে সকল কিছুই দেখার ক্ষমতার অধিকারী। এই দেখার জন্য তাঁকে সময় ক্ষেপণ বা পৃথকভাবে দেখার প্রয়োজন হয় না। সকল সৃষ্টি তিনি তাঁর ক্ষমতা দিয়ে একবারেই দেখতে পান। কিন্তু মানুষ এর বিপরীত। মানুষকে কোনো কিছু দেখার জন্য সে স্থানে যেতে হয় বা দূরের কিছু দেখার জন্য কোনো কিছুর সাহায্য গ্রহণ করতে হয়। মানুষ একবারে এক দৃষ্টে একশতটি জিনিস দেখতে পারে না। তাকে পৃথকভাবে দেখতে হয়। মানুষের এই অক্ষমতার জন্যই তাঁকে মহান আল্লাহর দরবারে নির্দিষ্ট স্থানে যেতে হয়েছিল। মহান আল্লাহ কিছু দেখার জন্য কোনো স্থানের মুখাপেক্ষী নন। কিন্তু মানুষ স্থানের মুখাপেক্ষী। সীমাবদ্ধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের জন্য অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন সত্তার সাথে দেখা করা সম্ভব নয়। মানুষের এই দূর্বলতার কারণেই মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাহকে নির্দিষ্ট স্থানে আহ্বান করে বান্দাহর সাথে কথা বলেছিলেন।
মাটিতে দাঁড়ানো তিন বছর বয়স্ক শিশুর কপালে স্নেহভরে চুমো দিতে হলে একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষকে অবশ্যই নিচু হয়ে সে শিশুর কপালের কাছে তাঁর মুখ নিয়ে যেতে হবে। নতুবা শিশুর কপালের নাগাল পাওয়া যাবে না। বয়স্ক লোককে নিচু হয়ে শিশুর কপালের কাছে মুখ নিতে হলো, এ পদ্ধতি তাঁর দূর্বলতার কারণে গ্রহণ করতে হলো না, শিশুর দূর্বলতার কারণেই বয়স্ক লোকটিকে বসে বা কুজো হয়ে শিশুর কপালের কাছে নিজের মুখ নিতে হলো। শিশুর প্রতি স্নেহের বশে বয়স্ক ক্ষমতাবান মানুষকে তাঁর ক্ষমতার পরিধি সংকুচিত করে শিশুর কপালের কাছে নিজের মুখ নিতে হলো শিশুর অক্ষমতার কারণে, নিজের অক্ষমতার কারণে নয়।
এবার দ্বিতীয় যে বিষয়টি পুরস্কার এবং শাস্তির বিষয়। এসব বিষয়ে নবী করীম (সা:) কে যা দেখানো হয়েছিল তা প্রকৃত বিষয়ের প্রতীকী রূপমাত্র। এখানে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর অসীম ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাঁরই সৃষ্টি মানুষের কর্মের পরিণতি কি হবে তার প্রতীকী রূপ দেখিয়েছিলেন। জান্নাতে কিভাবে মানুষ আল্লাহ তা'য়ালার নেয়ামত ভোগ করবে এর প্রতীকী রূপ এবং জাহান্নামেও বাস্তব অবস্থার প্রতীকী রূপ তাঁকে দেখানো হয়েছিল। সুতরাং এ সকল বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অবকাশ নেই। আবারও ঐ পুরোনো কথারই পুনরাবৃত্তি করতে হচ্ছে, স্রষ্টার ক্ষমতা অসীম। তাঁর কাছে অসম্ভব বলে কিছুই নেই। অসম্ভব শব্দটি মানুষের জন্য প্রযোজ্য, স্রষ্টার জন্য নয়।