📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে নবী করীম (সা:) এর উচ্চ মর্যাদা

📄 মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে নবী করীম (সা:) এর উচ্চ মর্যাদা


ইতোপূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি, ব্যক্তির অনন্য অসাধারণ যোগ্যতা, দক্ষতা, কর্ম সম্পাদন এবং ব্যাপক পরিধিতে দায়িত্ব পালন ইত্যাদির কারণেই ব্যক্তি মর্যাদার আসনে আসীন হয় এবং এটাই পৃথিবীতে প্রচলিত সাধারণ নিয়ম। অনন্য সাধারণ গুরুত্বের কারণে পৃথিবীতে কতিপয় স্থানও মানুষের কাছে মর্যাদাকর স্থান বলে বিবেচিত হয়। এসব স্থানে যাতায়াত করাও মানুষ আভিজাত্যের প্রতীক ও সম্মানজনক বলে মনে করে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও স্থাপনাসমূহ, শাসকবৃন্দের বাসভবন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মিলনায়তন ও দ্রব্যাদি ক্রয়ের বিপনীসমূহ, অবকাশ যাপন কেন্দ্র, চিত্তবিনোদনের স্থানসমূহ, ব্যয়বহুল হোটেলসমূহ ইত্যাদি মানুষের কাছে বিশেষ মর্যাদাকর স্থান বলে বিবেচিত হয়।

ব্যক্তির অবস্থান ভেদেও কতিপয় ব্যক্তি সাধারণ মানুষের কাছে সম্মানিত ব্যক্তি বলে বিবেচিত। এসব ব্যক্তিবর্গের সাথে কথা বলা, সান্নিধ্যে যাওয়া, সম্পর্ক রাখা ও একত্রে ছবি তোলাও সাধারণ মানুষ মর্যাদাকর কাজ বলে মনে করে। এসব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ধরনের বিষয় হলো, সম্মানিত ব্যক্তি ও মর্যাদাবান স্থান নির্বাচনে মানুষ মূখ্য ভূমিকা পালন করে এবং নির্বাচকদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন ঘটলে সম্মানিত ব্যক্তিকে আস্তা কুড়োয় নিক্ষেপ করে এবং মর্যাদাবান স্থানও নিকৃষ্ট স্থানে পরিণত হয়।

কোনো ব্যক্তি বা স্থানকে মর্যাদা প্রদান করা না করার ক্ষেত্রেও মানুষ দ্বিধা-বিভক্ত এবং মনোনয়ন সিদ্ধান্তে ঐক্য থাকে না। যেমন প্রাকৃতিক আশ্চর্যজনক বিষয় বা স্থান নির্বাচনে মানুষের মধ্যে ব্যাপক মত-পার্থক্য রয়েছে, এ বিষয়টি সুরাহা করার জন্যে বর্তমানে অনলাইনে ভোটের ব্যবস্থা করে সংখ্যা গরিষ্ঠের সমর্থনকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষা, জ্ঞান-বিবেক, বুদ্ধি-প্রজ্ঞা, অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিবর্গ কোনো ব্যক্তি বা স্থানকে যখন মর্যাদা দেয় তখন, সাধারণ মানুষ ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক সে স্থান বা ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং এটাই সাধারণ মানুষের রীতি। মানুষের ক্ষেত্রে যদি এই রীতি-নীতি অনুসৃত হয়ে থাকে, তাহলে সকল বিষয়ে যিনি একক ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী এবং সমগ্র সৃষ্টিসমূহের যিনি স্রষ্টা ও প্রতিপালক এবং নিয়ন্ত্রক, সেই মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁরই সৃষ্টি কতিপয় ব্যক্তিবর্গ, স্থান ও সময়কে যখন সর্বাধিক মর্যাদাবান বলে ঘোষণা করেন, সেই মর্যাদার গুরুত্ব ও উচ্চতা কতটা বিশাল তা মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোন্ ব্যক্তিকে সর্বাধিক মর্যাদা দিবেন এবং কোন্ স্থান ও সময়কে মর্যাদায় ভূষিত করবেন, এ ব্যাপারে নিরঙ্কুশ একক ক্ষমতা কেবলমাত্র তাঁরই। কতিপয় ব্যক্তিবর্গ, স্থান ও সময়কে মর্যাদাকর মনে করা এবং সম্মান প্রদর্শন করা মানুষের 'সৃষ্টিগত স্বভাব। আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের স্বভাব- প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে কতিপয় ব্যক্তি, স্থান ও সময়কে সর্বাধিক সম্মানিত বলে ঘোষণা করেছেন। মহান আল্লাহ এ পৃথিবীতে কতক স্থানকে বিশেষত্ব প্রদান করে সর্বাধিক মর্যাদায় ভূষিত করেছেন।

যেমন মক্কা ও মদীনা নগরীকে মহান আল্লাহ অনন্য সাধারণ বিশেষত্ব দিয়ে মর্যাদা প্রদান করেছেন। এ দু'টো স্থান সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা কর্তৃক সর্বাধিক মর্যাদায় ভূষিত স্থান। আবার এ দু'টো স্থানের মধ্যেও এমন কতকগুলো বিশেষ স্থান রয়েছে, যেগুলো আরো অধিক মর্যাদা লাভ করেছে। যেমন এ দুটো স্থানের মসজিদ- মসজিদুল হারাম এবং মসজিদে নববী। মক্কায় বায়তুল্লাহ্ শরীফ, এর সাথে সংশ্লিষ্ট হাজরে আসওয়াদ, এর দরজা যার নাম মুলতাজিম, বায়তুল্লাহর উত্তর দিকের স্থান যার নাম হাতিম, মীজাবে রহমত অর্থাৎ বৃষ্টি বর্ষণকালে বায়তুল্লাহর ছাদ থেকে যে স্থান থেকে বৃষ্টির পানি ঝরে, পশ্চিম- দক্ষিণ কোণে রুকুনে ইয়ামানী, পূর্ব পাশে মাক্কামে ইবরাহীম, কা'বা শরীফের চার দিকে যে স্থান দিয়ে তাওয়াফ করা হয়, এর নাম মাতাফ এবং ফিলিস্তীনে অবস্থিত মসজিদুল আক্কসা।

পবিত্র মদীনা নগরীর সম্মানিত এলাকা, মসজিদে নববী, পবিত্র রওজা মুবারক, রিয়াজুল জান্নাত, পবিত্র মিম্বার শরীফ, মসজিদে কুবা, জাবালে ওহুদ বা ওহুদ পাহাড়, দারুস সালামসহ ইত্যাদি স্থান। মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা কয়েকটি দিন, কিছু সময় ও মাসকেও সর্বাধিক মর্যাদায় ভূষিত করে বিশেষত্ব দান করেছেন। যেমন মাসের মধ্যে সর্বাধিক মার্যাদাবান মাস রামাদান, এই রামাদান মাসের শেষ দশদিনের মধ্যে নিহিত রয়েছে সেই কদরের রাত- যে রাতকে মহান আল্লাহ অগণিত রাতের তুলনায় সর্বাধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন। পবিত্র জুমুয়ার দিন এবং এ জুমুয়ার দিনে আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত বিশেষ এক সময়কে। এ জুমুয়ার দিনে এমন কতক মুহূর্ত রয়েছে যখন দোয়া কবুল করা হয়ে থাকে। আশুরার দিন, হজ্বের মৌসুমে আরাফার দিন, যিলহজ্ব মাসের দশদিন এবং প্রতি রাতের তৃতীয়াংশ অর্থাৎ শেষ রাতের মর্যাদা অধিক। হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, রাতের শেষ অংশে মহান আল্লাহ একান্ত অনুগ্রহ করে প্রথম আকাশে অবতরণ করে বান্দাদের নানা সমস্যার কথা উল্লেখপূর্বক আহ্বান করে একমাত্র তাঁরই কাছে আবেদন জানাতে বলেন।

মহান আল্লাহ যা কিছুই সৃষ্টি করেছেন, এ সকল সৃষ্টির মধ্যে একমাত্র মানুষকেই তিনি সর্বাধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন। আবার এ মানুষের মধ্য থেকে নির্বাচিত নবীগণকে অধিক মর্যাদা দান করেছেন। নবীগণের মধ্য থেকে যাঁরা রাসূল নির্বাচিত হয়েছেন তাঁদের মর্যাদা আরো অধিক। আবার নবী-রাসূলদের মধ্য থেকে মহান আল্লাহ কতক নবী-রাসূলকে বিশেষত্ব প্রদানপূর্বক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন এবং আরবী ভাষায় যাঁদেরকে 'উলুল আযম' বলা হয়।

নবী-রাসূলদের মধ্যে 'উলুল আযম' বৈশিষ্ট্যমন্ডিত অধিকারীদের মধ্যে কেবলমাত্র নবী করীম (সা:) কে বিশেষত্ব প্রদানপূর্বক সর্বাধিক মর্যাদায় অলংকৃত করেছেন। আবার ঠিক এ কারনেই অন্যান্য নবী-রাসূলের অনুসারীদের তুলনায় নবী করীম (সা:) এর অনুসারী তথা মুসলিম মিল্লাতকে বিশেষত্ব দিয়ে মর্যাদা প্রদান করেছেন। আবার মানবজাতির প্রথম প্রজন্ম ও পরের প্রজন্মের মধ্যে মুসলিম মিল্লাতকে বিশেষ বৈশিষ্টের অধিকারী নির্বাচিত করেছেন। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ এভাবে বর্ণনা করেছেন-

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلاً

আমি অবশ্যই আদম সন্তানদের মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে আমি ওদের চলাচলের বাহন দিয়েছি এবং তাদের পবিত্র (জিনিসসমূহ দিয়ে) আমি রিফ্ট দান করেছি, অতপর আমি অন্য যতো কিছু সৃষ্টি করেছি তার অধিকাংশের ওপরই আমি তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। (সূরা বনী ইসরাঈল-৭০)

আবার এ আদম সন্তান তথা মানুষের মধ্যে নবী হিসাবে নির্বাচিত করে যাঁদেরকে নবুয়‍্যাত দান করা হয়েছে, তাঁদের মর্যাদা মানুষদের মধ্যে সর্বাধিক। হযরত ইবরাহীম (আ:) এর প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَقَ وَيَعْقُوْبَ ط كُلاً هَدَيْنَاج وَنُوْحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ دَاودَ وَسُلَيْمَانَ وَأَيُّوْبَ وَيُوْسُفَ وَمُوسَى وَهَارُوْنَ طَ وَكَذَلِكَ نَجْزِى الْمُحْسِنِينَ وَزَكَرِيَّا وَيَحْى وَعِيسَى وَإِلْيَاسَ ط كُلٌّ مِّنَ الصَّالِحِيْنَ وَإِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوْطًا طَ وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ

অত:পর আমি তাকে দান করেছি ইসহাক ও ইয়াকুব (এর মতো দুই জন সুপুত্র); এদের সবাইকেই আমি সঠিক পথের দিশা দিয়েছিলাম, (এদের) আগে আমি নূহকেও হিদায়াতের পথ দেখিয়েছি, অত:পর তার বংশের মাঝে দাউদ, সুলাইমান, আইয়ুব, ইফসুফ, মূসা এবং হারুনকেও (আমি হিদায়াত দান করেছি); আর এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কার দিয়ে থাকি। যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা এবং ইলইয়াসকেও (আছি সঠিক পথ দেখিয়েছিলাম); এরা সবাই ছিলো নেককারদের দলভুক্ত। (আরো পথ দেখিয়েছিলাম) ইসমাঈল, ইয়াসা, ইউনুস এবং লুতকেও; এদের সবাইকে আমি (নবুয়‍্যাত দিয়ে) সৃষ্টিকুলের ওপর বিশেষ মর্যাদা দান করেছি। (সূরা আল আনয়াম-৮৪-৮৬)

অপরদিকে নবীদের মধ্যেও কতক নবীকে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী বানানো হয়েছে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّنَ عَلَى بَعْضٍ - আমি একেকজন নবীকে একেকজনের ওপর মর্যাদা দান করেছি। (সূরা বনী ইসরাঈল-৫৫)

বিশেষভাবে রাসূল মনোনীত করা প্রসঙ্গে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- اللَّهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلَائِكَةِ رُسُلاً وَمِنَ النَّاسِ طَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيْعُم بَصِيْرٌج আল্লাহ তা'য়ালা (তাঁর ওহী বহন করার জন্যে) ফিরিশতাদের মধ্য থেকে বাণীবাহক মনোনীত করেন, মানুষদের ভেতর থেকেও তিনি রাসূল মনোনীত করেন। অবশ্যই আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও সবকিছু দেখেন। (সূরা হজ্ব-৭৫)

রাসূলদের মধ্যেও একের ওপর আরেকজনকে মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِّنْهُم مَّنْ كَلَّمَ اللَّهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ ط এই (যে) নবী-রাসূলরা (রয়েছে), এদের কাউকে কারো ওপর আমি বেশি মর্যাদা দান করেছি। এদের মধ্যে এমনও (কেউ) ছিলো যাদের সাথে আল্লাহ তা'য়ালা কথা বলেছেন এবং (এর মাধ্যমে) কারো মার্যাদা তিনি বাড়িয়ে দিয়েছেন। (সূরা বাকারা-২৫৩)

সকল নবী-রাসূলের মধ্যে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী করীম (সা:) কে অনন্য বৈশিষ্ট্য প্রদানপূর্বক সর্বাধিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। মহান মালিক আল্লাহর দৃষ্টিতে তাঁর মতো ব্যক্তিত্বের মর্যাদা আলোচনা করা অত্যন্ত কঠিন বিষয়। বিশেষ সীমাবদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী মানুষের পক্ষে তা নিতান্তই দূরহ বিষয়। তবে পবিত্র কুরআন-হাদীসে এ সম্পর্কে যতোটুকু আলোচনা করা হয়েছে, তার কিছু অংশ আমরা এ গ্রন্থে তুলে ধরবো ইন্‌শাআল্লাহ।

ইতোপূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি, ব্যক্তির অনন্য অসাধারণ যোগ্যতা, দক্ষতা, কর্ম সম্পাদন এবং ব্যাপক পরিধিতে দায়িত্ব পালন ইত্যাদির কারণেই ব্যক্তি মর্যাদার আসনে আসীন হয় এবং এটাই পৃথিবীতে প্রচলিত সাধারণ নিয়ম। অনন্য সাধারণ গুরুত্বের কারণে পৃথিবীতে কতিপয় স্থানও মানুষের কাছে মর্যাদাকর স্থান বলে বিবেচিত হয়। এসব স্থানে যাতায়াত করাও মানুষ আভিজাত্যের প্রতীক ও সম্মানজনক বলে মনে করে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও স্থাপনাসমূহ, শাসকবৃন্দের বাসভবন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মিলনায়তন ও দ্রব্যাদি ক্রয়ের বিপনীসমূহ, অবকাশ যাপন কেন্দ্র, চিত্তবিনোদনের স্থানসমূহ, ব্যয়বহুল হোটেলসমূহ ইত্যাদি মানুষের কাছে বিশেষ মর্যাদাকর স্থান বলে বিবেচিত হয়।

ব্যক্তির অবস্থান ভেদেও কতিপয় ব্যক্তি সাধারণ মানুষের কাছে সম্মানিত ব্যক্তি বলে বিবেচিত। এসব ব্যক্তিবর্গের সাথে কথা বলা, সান্নিধ্যে যাওয়া, সম্পর্ক রাখা ও একত্রে ছবি তোলাও সাধারণ মানুষ মর্যাদাকর কাজ বলে মনে করে। এসব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ধরনের বিষয় হলো, সম্মানিত ব্যক্তি ও মর্যাদাবান স্থান নির্বাচনে মানুষ মূখ্য ভূমিকা পালন করে এবং নির্বাচকদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন ঘটলে সম্মানিত ব্যক্তিকে আস্তা কুড়োয় নিক্ষেপ করে এবং মর্যাদাবান স্থানও নিকৃষ্ট স্থানে পরিণত হয়।

কোনো ব্যক্তি বা স্থানকে মর্যাদা প্রদান করা না করার ক্ষেত্রেও মানুষ দ্বিধা-বিভক্ত এবং মনোনয়ন সিদ্ধান্তে ঐক্য থাকে না। যেমন প্রাকৃতিক আশ্চর্যজনক বিষয় বা স্থান নির্বাচনে মানুষের মধ্যে ব্যাপক মত-পার্থক্য রয়েছে, এ বিষয়টি সুরাহা করার জন্যে বর্তমানে অনলাইনে ভোটের ব্যবস্থা করে সংখ্যা গরিষ্ঠের সমর্থনকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষা, জ্ঞান-বিবেক, বুদ্ধি-প্রজ্ঞা, অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিবর্গ কোনো ব্যক্তি বা স্থানকে যখন মর্যাদা দেয় তখন, সাধারণ মানুষ ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক সে স্থান বা ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং এটাই সাধারণ মানুষের রীতি। মানুষের ক্ষেত্রে যদি এই রীতি-নীতি অনুসৃত হয়ে থাকে, তাহলে সকল বিষয়ে যিনি একক ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী এবং সমগ্র সৃষ্টিসমূহের যিনি স্রষ্টা ও প্রতিপালক এবং নিয়ন্ত্রক, সেই মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁরই সৃষ্টি কতিপয় ব্যক্তিবর্গ, স্থান ও সময়কে যখন সর্বাধিক মর্যাদাবান বলে ঘোষণা করেন, সেই মর্যাদার গুরুত্ব ও উচ্চতা কতটা বিশাল তা মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোন্ ব্যক্তিকে সর্বাধিক মর্যাদা দিবেন এবং কোন্ স্থান ও সময়কে মর্যাদায় ভূষিত করবেন, এ ব্যাপারে নিরঙ্কুশ একক ক্ষমতা কেবলমাত্র তাঁরই। কতিপয় ব্যক্তিবর্গ, স্থান ও সময়কে মর্যাদাকর মনে করা এবং সম্মান প্রদর্শন করা মানুষের 'সৃষ্টিগত স্বভাব। আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের স্বভাব-প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে কতিপয় ব্যক্তি, স্থান ও সময়কে সর্বাধিক সম্মানিত বলে ঘোষণা করেছেন। মহান আল্লাহ এ পৃথিবীতে কতক স্থানকে বিশেষত্ব প্রদান করে সর্বাধিক মর্যাদায় ভূষিত করেছেন।

যেমন মক্কা ও মদীনা নগরীকে মহান আল্লাহ অনন্য সাধারণ বিশেষত্ব দিয়ে মর্যাদা প্রদান করেছেন। এ দু'টো স্থান সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা কর্তৃক সর্বাধিক মর্যাদায় ভূষিত স্থান। আবার এ দু'টো স্থানের মধ্যেও এমন কতকগুলো বিশেষ স্থান রয়েছে, যেগুলো আরো অধিক মর্যাদা লাভ করেছে। যেমন এ দুটো স্থানের মসজিদ- মসজিদুল হারাম এবং মসজিদে নববী। মক্কায় বায়তুল্লাহ্ শরীফ, এর সাথে সংশ্লিষ্ট হাজরে আসওয়াদ, এর দরজা যার নাম মুলতাজিম, বায়তুল্লাহর উত্তর দিকের স্থান যার নাম হাতিম, মীজাবে রহমত অর্থাৎ বৃষ্টি বর্ষণকালে বায়তুল্লাহর ছাদ থেকে যে স্থান থেকে বৃষ্টির পানি ঝরে, পশ্চিম- দক্ষিণ কোণে রুকুনে ইয়ামানী, পূর্ব পাশে মাক্কামে ইবরাহীম, কা'বা শরীফের চার দিকে যে স্থান দিয়ে তাওয়াফ করা হয়, এর নাম মাতাফ এবং ফিলিস্তীনে অবস্থিত মসজিদুল আক্কসা।

পবিত্র মদীনা নগরীর সম্মানিত এলাকা, মসজিদে নববী, পবিত্র রওজা মুবারক, রিয়াজুল জান্নাত, পবিত্র মিম্বার শরীফ, মসজিদে কুবা, জাবালে ওহুদ বা ওহুদ পাহাড়, দারুস সালামসহ ইত্যাদি স্থান। মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা কয়েকটি দিন, কিছু সময় ও মাসকেও সর্বাধিক মর্যাদায় ভূষিত করে বিশেষত্ব দান করেছেন। যেমন মাসের মধ্যে সর্বাধিক মার্যাদাবান মাস রামাদান, এই রামাদান মাসের শেষ দশদিনের মধ্যে নিহিত রয়েছে সেই কদরের রাত- যে রাতকে মহান আল্লাহ অগণিত রাতের তুলনায় সর্বাধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন। পবিত্র জুমুয়ার দিন এবং এ জুমুয়ার দিনে আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত বিশেষ এক সময়কে। এ জুমুয়ার দিনে এমন কতক মুহূর্ত রয়েছে যখন দোয়া কবুল করা হয়ে থাকে। আশুরার দিন, হজ্বের মৌসুমে আরাফার দিন, যিলহজ্ব মাসের দশদিন এবং প্রতি রাতের তৃতীয়াংশ অর্থাৎ শেষ রাতের মর্যাদা অধিক। হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, রাতের শেষ অংশে মহান আল্লাহ একান্ত অনুগ্রহ করে প্রথম আকাশে অবতরণ করে বান্দাদের নানা সমস্যার কথা উল্লেখপূর্বক আহ্বান করে একমাত্র তাঁরই কাছে আবেদন জানাতে বলেন।

মহান আল্লাহ যা কিছুই সৃষ্টি করেছেন, এ সকল সৃষ্টির মধ্যে একমাত্র মানুষকেই তিনি সর্বাধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন। আবার এ মানুষের মধ্য থেকে নির্বাচিত নবীগণকে অধিক মর্যাদা দান করেছেন। নবীগণের মধ্য থেকে যাঁরা রাসূল নির্বাচিত হয়েছেন তাঁদের মর্যাদা আরো অধিক। আবার নবী-রাসূলদের মধ্য থেকে মহান আল্লাহ কতক নবী-রাসূলকে বিশেষত্ব প্রদানপূর্বক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন এবং আরবী ভাষায় যাঁদেরকে 'উলুল আযম' বলা হয়।

নবী-রাসূলদের মধ্যে 'উলুল আযম' বৈশিষ্ট্যমন্ডিত অধিকারীদের মধ্যে কেবলমাত্র নবী করীম (সা:) কে বিশেষত্ব প্রদানপূর্বক সর্বাধিক মর্যাদায় অলংকৃত করেছেন। আবার ঠিক এ কারনেই অন্যান্য নবী-রাসূলের অনুসারীদের তুলনায় নবী করীম (সা:) এর অনুসারী তথা মুসলিম মিল্লাতকে বিশেষত্ব দিয়ে মর্যাদা প্রদান করেছেন। আবার মানবজাতির প্রথম প্রজন্ম ও পরের প্রজন্মের মধ্যে মুসলিম মিল্লাতকে বিশেষ বৈশিষ্টের অধিকারী নির্বাচিত করেছেন। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ এভাবে বর্ণনা করেছেন-

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلاً

আমি অবশ্যই আদম সন্তানদের মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে আমি ওদের চলাচলের বাহন দিয়েছি এবং তাদের পবিত্র (জিনিসসমূহ দিয়ে) আমি রিফ্ট দান করেছি, অতপর আমি অন্য যতো কিছু সৃষ্টি করেছি তার অধিকাংশের ওপরই আমি তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। (সূরা বনী ইসরাঈল-৭০)

আবার এ আদম সন্তান তথা মানুষের মধ্যে নবী হিসাবে নির্বাচিত করে যাঁদেরকে নবুয়‍্যাত দান করা হয়েছে, তাঁদের মর্যাদা মানুষদের মধ্যে সর্বাধিক। হযরত ইবরাহীম (আ:) এর প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَقَ وَيَعْقُوْبَ ط كُلاً هَدَيْنَاج وَنُوْحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ دَاودَ وَسُلَيْمَانَ وَأَيُّوْبَ وَيُوْسُفَ وَمُوسَى وَهَارُوْنَ طَ وَكَذَلِكَ نَجْزِى الْمُحْسِنِينَ وَزَكَرِيَّا وَيَحْى وَعِيسَى وَإِلْيَاسَ ط كُلٌّ مِّنَ الصَّالِحِيْنَ وَإِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوْطًا طَ وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ

অত:পর আমি তাকে দান করেছি ইসহাক ও ইয়াকুব (এর মতো দুই জন সুপুত্র); এদের সবাইকেই আমি সঠিক পথের দিশা দিয়েছিলাম, (এদের) আগে আমি নূহকেও হিদায়াতের পথ দেখিয়েছি, অত:পর তার বংশের মাঝে দাউদ, সুলাইমান, আইয়ুব, ইফসুফ, মূসা এবং হারুনকেও (আমি হিদায়াত দান করেছি); আর এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কার দিয়ে থাকি। যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা এবং ইলইয়াসকেও (আছি সঠিক পথ দেখিয়েছিলাম); এরা সবাই ছিলো নেককারদের দলভুক্ত। (আরো পথ দেখিয়েছিলাম) ইসমাঈল, ইয়াসা, ইউনুস এবং লুতকেও; এদের সবাইকে আমি (নবুয়‍্যাত দিয়ে) সৃষ্টিকুলের ওপর বিশেষ মর্যাদা দান করেছি। (সূরা আল আনয়াম-৮৪-৮৬)

অপরদিকে নবীদের মধ্যেও কতক নবীকে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী বানানো হয়েছে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّنَ عَلَى بَعْضٍ - আমি একেকজন নবীকে একেকজনের ওপর মর্যাদা দান করেছি। (সূরা বনী ইসরাঈল-৫৫)

বিশেষভাবে রাসূল মনোনীত করা প্রসঙ্গে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- اللَّهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلَائِكَةِ رُسُلاً وَمِنَ النَّاسِ طَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيْعُم بَصِيْرٌج আল্লাহ তা'য়ালা (তাঁর ওহী বহন করার জন্যে) ফিরিশতাদের মধ্য থেকে বাণীবাহক মনোনীত করেন, মানুষদের ভেতর থেকেও তিনি রাসূল মনোনীত করেন। অবশ্যই আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও সবকিছু দেখেন। (সূরা হজ্ব-৭৫)

রাসূলদের মধ্যেও একের ওপর আরেকজনকে মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِّنْهُم مَّنْ كَلَّمَ اللَّهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ ط এই (যে) নবী-রাসূলরা (রয়েছে), এদের কাউকে কারো ওপর আমি বেশি মর্যাদা দান করেছি। এদের মধ্যে এমনও (কেউ) ছিলো যাদের সাথে আল্লাহ তা'য়ালা কথা বলেছেন এবং (এর মাধ্যমে) কারো মার্যাদা তিনি বাড়িয়ে দিয়েছেন। (সূরা বাকারা-২৫৩)

সকল নবী-রাসূলের মধ্যে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী করীম (সা:) কে অনন্য বৈশিষ্ট্য প্রদানপূর্বক সর্বাধিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। মহান মালিক আল্লাহর দৃষ্টিতে তাঁর মতো ব্যক্তিত্বের মর্যাদা আলোচনা করা অত্যন্ত কঠিন বিষয়। বিশেষ সীমাবদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী মানুষের পক্ষে তা নিতান্তই দূরহ বিষয়। তবে পবিত্র কুরআন-হাদীসে এ সম্পর্কে যতোটুকু আলোচনা করা হয়েছে, তার কিছু অংশ আমরা এ গ্রন্থে তুলে ধরবো ইন্‌শাআল্লাহ।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী করীম (সা:) আল্লাহ তা'য়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ বান্দাহ্

📄 নবী করীম (সা:) আল্লাহ তা'য়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ বান্দাহ্


পবিত্র কুরআনে তিনটি শব্দ একাধিক স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি শব্দ 'মা'বুদ' দ্বিতীয়টি 'আব্দ' আর তৃতীয়টি হলো 'ইবাদাহ্' বা ইবাদাত। 'মা'বুদ' শব্দের অর্থ হলো মুনিব, মালিক, যিনি পূজা আরাধনা লাভের যোগ্য, যার কাছে আবেদন পেশ করা হয় বা যাঁর দাসত্ব করা হয় ইত্যাদি। 'আব্দ' শব্দের অর্থ হলো, যে দাসত্ব করে, চাকর, গোলাম, দাস, কারো আদেশে যে ব্যক্তি সকল কর্ম সম্পাদন করে ইত্যাদি। আর 'ইবাদাহ্ বা ইবাদাত' শব্দের অর্থ হলো, দাসত্ব করা, গোলামী করা, আদেশকৃত কর্ম সম্পাদন করা, দায়িত্ব পালন করা, মুনিবের নির্দেশে চাকর যে দায়িত্ব পালন করে বা মুনিব কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব সন্তুষ্ট চিত্তে পালন করা অথবা প্রতিপালককে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে তাঁর নির্দেশ অনুসারে সম্পাদিত কর্ম সমষ্টি। অর্থাৎ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হলেন সমগ্র সৃষ্টির মা'বুদ বা মুনিব, সৃষ্টি হলো তাঁর দাস বা আব্দ এবং স্রষ্টার নির্দেশে সৃষ্টি যে কর্ম সম্পাদন করে সে কর্মই হলো ইবাদাত।

প্রশ্ন হলো, পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) এর ক্ষেত্রে যে 'আব্দ' শব্দ ব্যবহার করেছেন তা কোন্ অর্থে ব্যবহার করেছেন?

এ প্রশ্নের জবাব কিছুটা ব্যাখ্যার দাবী রাখে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা স্বয়ং 'ইলাহ্' এবং সমগ্র সৃষ্টিলোকের তিনিই একমাত্র ইলাহ্। তাঁর উলুহিয়াত সমগ্র সৃষ্টিব্যাপী বিস্তৃত এবং তা কোথাও সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর উলুহিয়াতে কারো সামান্যতম অংশ নেই, তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই, কেউ ইচ্ছে করলে তাঁর উলুহিয়াতের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশও দাবী করতে পারে না। কেউ দাবী করলেও তা কার্যকর করার ন্যূনতম ক্ষমতাও দাবীকারী প্রয়োগ করতে সক্ষম নয়। আল্লাহ তা'য়ালা এমন এক অদ্বিতীয় ইলাহ্- যিনি তাঁর উলুহিয়াত যেমনভাবে এবং যখন খুশী তা প্রয়োগ করে থাকেন। তাঁর অনুমতি ব্যতীত কেউ তাঁর কাছে কোনো সুপারিশও করতে পারে না বা উলুহিয়াত প্রয়োগের ক্ষেত্রে কেউ তাঁকে প্রশ্ন করার কোনো অবকাশও পায় না। সকল কিছুর ক্ষেত্রে একমাত্র তিনিই নিরঙ্কুশ উলুহিয়াত প্রয়োগকারী এবং তাঁর সমপর্যায়ের কোনো কিছুর অস্তিত্ব সমগ্র সৃষ্টিলোকে নেই।

মহান আল্লাহ তা'য়ালা যখন তাঁর সৃষ্টি কোনো মানুষকে 'আমার আব্দ বা বান্দাহ্' বলে পরিচয় দেন তখন তা সাধারণ কোনো অর্থে ব্যবহৃত হয় না। অথবা আল্লাহর ব্যবহৃত 'আব্দ' শব্দ থেকে সাধারণ কোনো অর্থ গ্রহণ করা যায় না বা সাধারণ মানুষকে যে অর্থে 'আব্দ বা বান্দাহ্' বলা হয় সে অর্থেও তা প্রয়োগ হয় না। স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা যাঁকে 'আমার আব্দ বা বান্দাহ' বলে পরিচয় দেন তখন সে বান্দাহ্ বা আব্দ-এর 'আবদিয়্যাত'-ও অদ্বিতীয় তুলনাহীন হয়ে যায়।

মহান আল্লাহ তা'য়ালা যখন তাঁর কোনো বান্দাহকে 'আমার বান্দাহ্ বা আব্দ' বলে সমগ্র সৃষ্টির কাছে পরিচয় করিয়ে দেন, তখন বুঝতে হয় সে বান্দাহ্ 'আদিয়্যাত' এর সকল স্তর অতিক্রম করে মা'বুদ বা মহান মুনিবের সান্নিধ্যে নিজের অবস্থান করে নিয়েছেন। নবী করীম (সা:) মহান আল্লাহ তা'য়ালার সেই একক ও অদ্বিতীয় তুলনাহীন 'আব্দ' যিনি 'আদিয়্যাত' এর সকল সোপান অতিক্রম করে মহান মা'বুদ আল্লাহ তা'য়ালার সান্নিধ্যে পৌঁছে গিয়েছেন। 'আদিয়্যাত' এর পূর্ণতার সকল স্তর অতিক্রম করে তিনি আল্লাহ তা'য়ালার সান্নিধ্যে উপনীত হয়েছেন- যেখানে সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে তিনিই এক, অদ্বিতীয় ও তাঁর সমকক্ষ কেউই অতীতে ছিলেন না, বর্তমানেও নেই এবং ভবিষ্যতেও উক্ত স্তর কেউ অতিক্রম করতে সক্ষম হবে না।

পবিত্র কুরআন হলো সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টা মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার আদেশ নিষেধ, পছন্দ অপছন্দ ও অন্যান্য নিয়ম পদ্ধতির সমষ্টি এবং এটি একটি অতি মর্যাদাবান কিতাব। আর নবী করীম (সা:) হলেন এ কিতাবের বাহক এবং জীবন্ত কুরআন। তিনি ছিলেন চলমান কুরআন এবং এরই বাস্তব প্রতিচ্ছবি। হযরত আয়িশা (রা:) এর কাছে কেউ কেউ জানতে চেয়েছিলেন, 'আল্লাহর রাসূলের জীবনধারা সম্পর্কে কিছু বলুন'। জবাবে তিনি বলেছিলেন, 'তোমরা কি কুরআন পড়ো না? কুরআনই তো তাঁর জীবনধারা'। অর্থাৎ সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার যে অধিকারসমূহ রয়েছে, স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টিকে যেমন দেখতে চান এবং যে স্তরে তিনি সৃষ্টিকে উপনীত করতে চান, নবী করীম (সা:) সে অধিকারসমূহ এমনভাবে আদায় করেন যে, তিনি পূর্ণতার অতি উচ্চে উপনীত হয়েছেন।

মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) এর প্রতি যে ভালোবাসা প্রদর্শন করেছেন এবং মর্যাদার সর্বোচ্চ সোপানে স্থান দিয়েছেন, এরই বাস্তব প্রকাশ হলো তিনি তাঁকে 'আবদ' বলে পরিচয় দিয়েছেন। যেমন-

وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُوْرَةٍ مِّنْ مِّثْلِهِ ص

আমি আমার (আব্দ) বান্দার ওপর যে কিতাব অবতীর্ণ করেছি, তার (সত্যতার) ব্যাপারে যদি তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকে তাহলে যাও, তার মতো (করে) একটি সূরা তোমরাও (রচনা করে) নিয়ে এসো। (সূরা বাকারা-২৩)

নবী করীম (সা:) কে মহান আল্লাহ মিরাজে নিয়েছিলেন, নিয়ে যাবার সে বিষয়টি আল্লাহ তা'য়ালা এভাবে উল্লেখ করেছেন-

سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَا الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا طَ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ -

পবিত্র ও মহিমান্বিত (সেই আল্লাহ তা'য়ালা) যিনি তাঁর (এক) বান্দাকে রাতের বেলায় মাসজিদে হারাম থেকে মাসজিদে আকসায় নিয়ে গেলেন, যার পারিপার্শ্বিকতাকে আমি (আগেই) বরকতপূর্ণ করে রেখেছিলাম। যেনো আমি তাঁকে আমার (অদৃশ্য জগতের) কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি, (মূলত) সর্বশ্রোতা ও সর্বস্রষ্টা তো স্বয়ং তিনিই। (সূরা বনী ইসরাঈল-১)

কল্পনাও করা যায় না নবী করীম (সা:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা মর্যাদার কোন্ উচ্চ সোপানে উঠিয়েছেন। সম্মানিত মেহমান যে পথ বেয়ে যাবেন বা যে পথে তাঁকে আনা হবে, সেই পথের পরিবেশ আল্লাহ তা'য়ালা কিভাবে নিয়ামতে পূর্ণ করেছিলেন, কেমন ছিলো দৃষ্টিনন্দন সেই দৃশ্য, যে সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন, 'যার পারিপার্শ্বিকতাকে আমি আগেই বরকতপূর্ণ করে রেখেছিলাম'।

জাগতিক নিয়মের দিকে লক্ষ্য করলে মানুষের যে আয়োজন থাকে মেহমানের সম্মানে, তা থেকেই মহান রাব্বুল আলামীনের ব্যবস্থাপনা কেমন হতে পারে তা কিছুটা অনুমান করা যায়। সাধারণ মানুষ প্রিয় অতিথি, সম্মানিত মেহমান বা ভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে কিভাবে সম্মান প্রদর্শন করে। সাধারণ বিমান নয়, বিশেষ বিমানে তাঁকে আনা হয়। বিমান বন্দরে বিমান অবতরণ করার পূর্বেই বিমান বাহিনীর বিশেষ বিশেষ বিমান আকাশেই তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করে। অবতরণ করার পরে তাঁকে লাল গালিচা সম্বর্ধনা দিয়ে এর পর গার্ড অব অনার দেয়া হয়। বিমান বন্দর থেকে বের হয়ে তিনি যে পথে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে যাবেন এবং ওখান থেকে যে সকল স্থান তাঁকে পরিদর্শন করানো হবে, এসব পথ সজ্জিত করা হয়। মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ মেহমানকে নিয়ে যাচ্ছেন, তাঁর মর্যাদার কারণেই তাঁর ভ্রমণ পথের পারিপার্শ্বিকতাকে তিনি এমনভাবে সজ্জিত করেছিলেন যা কোনো মানুষের পক্ষেই কল্পনা করা সম্ভব নয়। শুধু সজ্জিতই নয়, তিনি ভ্রমণ পথের পারিপার্শ্বিকতাকে অত্যন্ত বরকতপূর্ণও করেছিলেন। নবী করীম (সা:) কে নিয়ে যাবার পূর্বেই মহান আল্লাহ তা'য়ালা যাবতীয় ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করেছিলেন।

আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর এ সম্মানিত বান্দার প্রতি এমন কোনো কিতাব অবতীর্ণ করেননি, যে কিতাব বোধগম্য নয়। অথবা যে কিতাবের বিধি-বিধান অনুসরণ করা কষ্টসাধ্য। অথবা যে কিতাব মানুষের জন্যে বোঝা বিশেষ। এমন ধরনের কোনো কিতাব যদি তাঁর প্রতি অবতীর্ণ করা হতো তাহলে মানুষ আপত্তি তুলতো, 'বাহক এমনি এক কিতাব বহন করে এনেছেন যা বোধগম্য নয় এবং এর বিধি-বিধান অনুসরণযোগ্যও নয়'। এ অভিযোগ নবী করীম (সা:) এর উচ্চ মর্যাদার সাথে সাংঘর্ষিক। এ কারণেই মহান আল্লাহ তা'য়ালা ঘোষণা করলেন, 'আমি আমার এ বান্দার প্রতি এমনি এক কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যার মধ্যে কোনো ধরনের বক্রতা নেই'। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَى عَبْدِهِ الْكِتَابَ وَلَمْ يَجْعَل لَّهُ عِوَجًا ط

সকল প্রশংসা আল্লাহ তা'য়ালার জন্যে, যিনি তাঁর (আব্দ) বান্দার প্রতি গ্রন্থ নাযিল করেছেন এবং তার কোথাও তিনি কোনোরকম বক্রতা রাখেননি। (সূরা কাহাফ-১)

নবী করীম (সা:) এর প্রতি যা কিছু অবতীর্ণ করার তা আল্লাহ তা'য়ালা অবতীর্ণ করলেন। এ কথাটিও বলতে গিয়ে আল্লাহ আব্দ বা বান্দাহ্ শব্দ ব্যবহার করেছেন-

فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى ط

অতপর সে তাঁর (আল্লাহর) বান্দার (আব্দ) কাছে ওহী পৌঁছে দিলো, যা তার পৌঁছানোর (দায়িত্ব) ছিলো। (সূরা নাজম-১০)

সর্বোচ্চ মর্যাদাবান ব্যক্তির প্রতি এমনই এক সম্মানিত কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে, যে কিতাব মানুষকে মূর্খতার অন্ধকার থেকে বের করে আলোর জগতে নিয়ে আসে। সকল ধরনের জ্ঞান ভাণ্ডারের খনি যে কিতাবের মধ্যে নিহিত রয়েছে সেই কিতাবই নবী করীম (সা:) এর প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

هُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ عَلَى عَبْدِهِ آيَاتِم بَيِّنَاتٍ لِيُخْرِجَكُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوْرِطَ وَإِنَّ اللَّهَ بِكُمْ لَرَؤُوفٌ رَّحِيمٌ

তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি তাঁর (আব্দ) বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াত অবতীর্ণ করেছেন, যেনো তিনি তোমাদের (জাহিলিয়াতের) অন্ধকার থেকে (ঈমানের) আলোর দিকে বের করে নিতে পারেন। (সূরা হাদীদ-৯)

إِن كُنتُمْ آمَنْتُمْ بِاللَّهِ وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَى عَبْدِنَا يَوْمَ الْفُرْقَانِ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ طَ

তোমরা যদি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করো, (আরো) বিশ্বাস করো সে (বিজয় ঘটিত) বিষয়টির প্রতি, যা আমি হক ও বাতিলের চূড়ান্ত মীমাংসার দিন এবং একে অপরের মুখোমুখি হবার দিন আমার (আব্দ) বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছিলাম। (সূরা আনফাল-৪১)

وَأَنَّهُ لَمَّا قَامَ عَبْدُ اللَّهِ يَدْعُوهُ كَادُوا يَكُونُوْنَ عَلَيْهِ لِبَدَاعِ

যখন আল্লাহর এক (আব্দ) বান্দাহ্ তাকে ডাকার জন্যে দাঁড়ালো, তখন (মানুষ বা জ্বিনের) অনেক সদস্যই তার আশেপাশে ভীড় জমাতে লাগলো। (সূরা জ্বিন-১৯)

أَرَأَيْتَ الَّذِي يَنْهَى لَا عَبْدًا إِذَا صَلَّى ط

তুমি কি সে (দাম্ভিক) লোকটিকে দেখেছো যে তাঁকে বাধা দিলো (বাধা দিলো আল্লাহর) এক (আব্দ) বান্দাকে যে নামাজ আদায় করছিলো। (সূরা আলাক-৯-১০)

হযরত ঈসা (আ:) শিশু বয়সে দোলনায় শুয়ে মহান আল্লাহ তা'য়ালার নির্দেশে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছিলেন-

إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ - 'আমি আল্লাহ তা'য়ালার বান্দাহ্'।

অপরদিকে নবী করীম (সা:) স্বয়ং যেমন নিজেকে আল্লাহর বান্দাহ্ বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেছেন তেমনি আল্লাহ তা'য়ালাও তাঁকে পরম স্নেহে পরিচয় করে দিয়েছেন 'আমার বান্দাহ্' বলে।

পবিত্র কুরআনের এসব আয়াতে নবী করীম (সা:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা 'আব্দ' বা বান্দাহ্ বলে উল্লেখ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে যে বার্তাটি পৌঁছানো হয়েছে তাহলো, নবী করীম (সা:) মহান আল্লাহর একজন বান্দাহ্, আল্লাহই তাঁকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই একান্ত অনুগ্রহ করে তাঁকে নবী-রাসূল নির্বাচিত করেছেন। তিনিই তাঁকে প্রতিপালন করছেন, যেমনটি অন্যান্য সৃষ্টিকেও তিনি প্রতিপালন করেন। প্রথমে তিনি আল্লাহর বান্দাহ্ তারপরে তিনি তাঁর রাসূল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মর্যাদার সাথে তাঁকে কখনোই তুলনা করা যাবে না এবং তাঁর উলুহিয়াতের অংশও তিনি নন। যেসব গুণ-বৈশিষ্ট মহান আল্লাহর জন্যে প্রযোজ্য সেসব গুণ-বৈশিষ্টের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম অংশেরও অধিকারী তিনি নন।

এসব ব্যাপারে যারা সাধারণ মুসলমানদের সম্মুখে কথা বলেন, তাদেরকে অবশ্যই সতর্ক হয়ে কথা বলতে হবে। নবী করীম (সা:) সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তা যেনো মহান আল্লাহর দেয়া সম্মান-মর্যাদার স্তর অতিক্রম করে আল্লাহ জাল্লাশানুহুর মর্যাদার স্তর স্পর্শ না করে। আল্লাহ তা'য়ালা যে সীমারেখা অঙ্কন করে দিয়েছেন তাঁর নবীর ক্ষেত্রে, সে সীমারেখার মধ্যে অবস্থান করেই রাসূল (সা:) এর প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন করতে হবে।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী করীম (সা:) এর রিসালাত ও অন্যান্য নবী-রাসূলের অঙ্গীকার

📄 নবী করীম (সা:) এর রিসালাত ও অন্যান্য নবী-রাসূলের অঙ্গীকার


মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে মর্যাদার কোন্ উচ্চ শিখরে উপনীত করেছেন দেখুন, পৃথিবীতে নবী-রাসূল প্রেরণের সূচনা যখন করেন তখন আদম (আ:) এর পর থেকে বিশ্বনবীর পূর্বে প্রেরিত সকল নবী-রাসূলের কাছ থেকেই এ অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন যে, 'তোমার পূর্বে যে নবী প্রেরণ করা হয়েছিলো এবং পরে যাঁকে প্রেরণ করা হবে, তাঁর প্রতি স্বীকৃতি দিতে হবে এবং তাঁকে সহযোগিতা করতে হবে'। কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন নবী করীম (সা:), যাঁকে এ ধরনের কিছু বলার প্রয়োজন আল্লাহ তা'য়ালা রাখেননি। কারণ তাঁর পরে আর কোনো নবী-রাসূল প্রেরণ করা হবে না। তাঁকে দিয়েই নবুয়াতের ধারার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে তাঁকে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে আসীন করা হবে বিধায় তাঁর কাছ থেকে এমন প্রতিশ্রুতি গ্রহণের প্রযোজন হয়নি। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبَيِّنَ لَمَا آتَيْتُكُم مِّنْ كتاب وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُوْلٌ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنْصُرُنَّه ط قَالَ أَ أَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَالِكُمْ إِصْرِى طَ قَالُوا أَقْرَرْنَا طَ قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُم مِّنَ الشَّاهِدِيْنَ

আল্লাহ তা'য়ালা যখন তাঁর নবীদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন (তখন তিনি বলেছিলেন, এ হচ্ছে) কিতাব ও (তার ব্যবহারিক) জ্ঞান কৌশল, যা আমি তোমাদের দান করলাম। অতপর তোমাদের কাছে যখন (আমার কোনো) রাসূল আসবে, যে তোমাদের কাছে রক্ষিত (আগের) কিতাবের সত্যায়ন করবে, তখন তোমরা অবশ্যই তার (আনীত বিধানের) ওপর ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে। আল্লাহ তা'য়ালা জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি (এ কথার) ওপর (আমার এ) অঙ্গীকার গ্রহণ করছো? তাঁরা বললো, হ্যাঁ আমরা (মেনে চলার) অঙ্গীকার করছি, আল্লাহ তা'য়ালা বললেন, তাহলে তোমরা সাক্ষী থেকো এবং আমিও তোমাদের সাথে (এ অঙ্গীকারের) সাক্ষী হয়ে রইলাম। (সূরা আলে ইমরান-৮১)

নবী করীম (সা:) এর পূর্বে সকল নবী-রাসূলের কাছ থেকেই মহান আল্লাহ প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছেন এবং এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই তাঁর পরবর্তী নবী-রাসূল সম্পর্কে নিজেদের অনুসারীদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন, 'আমার পরে যিনি আসবেন তোমরা তাঁকে অনুসরণ করবে'।

আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) এর পূর্বের সকল নবী-রাসূলের কাছ থেকে এ অঙ্গীকার গ্রহণ করে বিষয়টির গুরুত্ব সম্পর্কে এ কথাও স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন-

فَمَنْ تَوَلَّى بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَآئِكَ هُمُ الْفَاسِقُوْنَ

অতপর যারা তা (অঙ্গীকার) ভঙ্গ করে (এ থেকে) মুখ ফিরিয়ে নিবে, তারা অবশ্যই বিদ্রোহী (বলে পরিগণিত) হবে। (সূরা আলে ইমরান-৮২)

কিন্তু বিশ্বনবী (সা:) এর কাছ থেকে এই ধরনের কোনো অঙ্গীকার গ্রহণ করা হয়নি যে, 'আপনার পরে যিনি আসবেন আপনি আপনার অনুসারীদের জানিয়ে দিন, তাঁকে অনুসরণ করতে হবে'। এ ধরনের প্রতিশ্রুতি না নেয়াই এ কথার অকাট্য প্রমাণ যে, নবী করীম (সা:) এর পরে আর কোনো নবীর আগমন ঘটবে না এবং তিনিই সমগ্র পৃথিবীর জন্যে শেষ নবী-রাসূল। নবী-রাসূলের সিল মোহরের উচ্চ মর্যাদা মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে দান করেছেন। হযরত মূসা ও হযরত ঈসা (আ:) এর কাছ থেকেও এই প্রতিশ্রুতি আল্লাহ গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁরা তাদের অনুসারীদের এ কথা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, 'আমার পরে যিনি আসবেন তোমরা তাঁকে সমর্থন করবে, তাঁর প্রতি ঈমান এনে তাঁর আনীত বিধান অনুসরণ করবে'।

হযরত জাবির (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন-

وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَوْ بَدَالَكُمْ مُوسَى فَاتَّبَعْتُمُوْهُ وَتَرَكْتُمُونِي لَضَلَلْتُمْ عَنْ سَوَاءِ السَّبِيلِ وَلَوْ كَانَ مُوسَى حَيًّا وَأَدْرَكَ نُبُوَّتِي لَاتَّبَعَنِي وَفِي رِوَايَةٍ مَّا وَسَّعَه إلَّا إِتَّبَاعِي

সে মহান সত্তার শপথ যার মুষ্ঠিতে মুহাম্মাদের প্রাণ রয়েছে, মূসাও যদি তোমাদের সম্মুখে আত্মপ্রকাশ করেন এবং তোমরা তাঁর অনুসরণ করো, আর আমাকে পরিত্যাগ করো তাহলে তোমরা নিশ্চিতভাবে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। বাস্তবিকই মূসা যদি এখন জীবিত থাকতেন এবং আমার নবুয়‍্যাতের সময় পেতেন, তাহলে তিনিও আমার অনুসরণ করতেন। অপর একটি সূত্রে বলা হয়েছে, তাঁর পক্ষে আমার অনুসরণ ভিন্ন কোনো উপায় থাকতো না। (দারেমী, মুসনাদে আহমদ)

নবী করীম (সা:) সম্পর্কে তাঁর পূর্বের নবী-রাসূলগণ নিজ অনুসারীদের যে নির্দেশ দিয়ে গেলেন, তা না মেনে তাঁরা নিজেদের নবীর নির্দেশও যেমন অস্বীকার করেছে এবং নবী করীম (সা:) কে অনুসরণ না করে বিদ্রোহীদের দলে শামিল হয়েছে। রাসূল (আ:) এর আনীত ইসলামী জীবন বিধান গ্রহণ না করে যারা বিকৃত আদর্শ অনুসরণ করছে বা নিজেদের আবিষ্কৃত জীবন বিধান অনুসরণ করছে, তাদের প্রতি সাবধান বাণী উচ্চারণ করে আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন-

أَفَغَيْرَ دِيْنِ اللَّهِ يَبْغُوْنَ وَلَهُ أَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُرْجَعُونَ

তারা কি আল্লাহর (দেয়া জীবন) ব্যবস্থার পরিবর্তে অন্য কোনো বিধানের সন্ধান করছে? অথচ আকাশ ও যমীনে যা কিছু আছে ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, আল্লাহ তা'য়ালার (বিধানের) সামনে আত্মসমর্পণ করে আছে এবং প্রত্যেককে তো তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। (সূরা আলে ইমরান-৮৩)

এবার দেখুন নবী করীম (সা:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা সাম্প্রদায়িকতা ও সকল সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে তুলে মর্যাদার সর্বোচ্চ সোপানে পৌঁছে দিলেন। তিনি তাঁকে ঘোষণা করতে বললেন-

قُلْ آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَالأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَالنَّبِيُّوْنَ مِنْ رَّبِّهِمْ ص لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ زِ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُوْنَ

(হে নবী), আপনি বলে দিন, আমরা আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি, ঈমান এনেছি আমাদের ওপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তার ওপর, ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাদের অন্যান্য বংশধরদের প্রতি যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে তার ওপরও (আমরা আরো ঈমান এনেছি), আমরা আরো ঈমান এনেছি, মূসা, ঈসা এবং অন্য নবীদের তাদের মালিকের পক্ষ থেকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তার ওপরও, (আল্লাহর) এ নবীদের কারো মাঝেই আমরা কোনো ধরনের পার্থক্য করি না, (মূলত) আমরা সবাই হচ্ছি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী (মুসলমান) (সূরা আলে ইমরান-৮৪)

আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:)-এর মাধ্যমে সমগ্র মুসলিম মিল্লাতকেই এ নির্দেশ দিলেন যে, তাঁরা যেনো পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূলের প্রতি ঈমান পোষণ করে ঔদার্যতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে নিজেদেরকে সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে রাখে। মুসলিম মিল্লাত পবিত্র কুরআনের এ শিক্ষা অনুসরণ করে বলেই এ পৃথিবীতে তাঁরা সবথেকে পরধর্ম সহিষ্ণু জাতি এবং অমুসলিম প্রতিবেশীকে এরা অতি সহজেই নিজেদের প্রতিবেশীর অধিকার বুঝিয়ে দেয়। নিজেদের নবীর নির্দেশ অমান্য করে যারা নবী করীম (সা:) এর আনীত আদর্শ ইসলামী জীবন বিধান গ্রহণ না করে ভিন্ন বিধান গ্রহণ করেছে, তাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন-

وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ ج وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ

যদি কেউ ইসলাম ছাড়া (নিজের জন্যে) অন্য কোনো জীবন বিধান অনুসন্ধান করে তবে তার কাছ থেকে সে (উদ্ভাবিত) ব্যবস্থা কখনো গ্রহণ করা হবে না, আখিরাতে সে চরমভাবে ব্যর্থ হবে। (সূরা আলে ইমরান-৮৫)

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী করীম (সা:) এর মু'জিযা

📄 নবী করীম (সা:) এর মু'জিযা


মহান আল্লাহ তা'য়ালা এ পৃথিবীতে যে সকল নবী-রাসূল প্রেরণ করেছিলেন, তাদের জন্যে তিনটি বিষয় ছিলো অপরিহার্য এবং এ তিনটি বিষয়ই তাঁদেরকে দান করা হয়েছিলো। সে তিনটি বিষয় (এক) ওহী (দুই) উন্নত চরিত্র এবং (তিন) মু'জিযা বা অলৌকিক ক্ষমতা। একান্ত অপরিহার্য এ তিনটি বিষয় দিয়েই আল্লাহ তা'য়ালা সকল নবী-রাসূলকে প্রেরণ করেছিলেন।

এক. ওহী মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী-রাসূলদের প্রতি অবতীর্ণ করেন এবং প্রত্যেক নবী-রাসূলের জন্যে ওহী ছিলো একান্তই অপরিহার্য বিষয়। কারণ তাদেরকে যে মিশন দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছিলো, তা পূর্ণ করার জন্যেই তাঁদের প্রতি ওহী অবতীর্ণ করা হতো। ওহী ব্যতীত তাঁদের মিশন পূর্ণ হতো না।

নবী-রাসূলকে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত করার জন্যে আল্লাহ তা'য়ালার এটা নিয়ম ছিলো না যে, তিনি তাঁদের সাথে আকাশ থেকে কোনো ফিরিশতা অবতীর্ণ করবেন এবং সে ফিরিশতা সকল মানুষকে আহ্বান জানিয়ে বলবেন, 'এ ব্যক্তিকে তোমাদের সকলের জন্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী নির্বাচিত করা হয়েছে, তোমরা এ ব্যক্তির আনুগত্য করো'।

দুই. সৃষ্টিগতভাবে এটি সকল মানুষের সহজাত ধারণা যে, নবী-রাসূলের চরিত্র হয় নিষ্কলুষ, সর্বাধিক উন্নত গুণ-বৈশিষ্টের অধিকারী এবং অপার্থিব জ্ঞান বিবেকের অধিকারী। আল্লাহ তা'য়ালা পৃথিবীতে যাদেরকে নবী-রাসূল হিসাবে মনোনীত করেছেন, সর্বাধিক উন্নত নৈতিক চরিত্রের গুণ-বৈশিষ্ট দান করেছেন। তাঁদের তুলনায় সমগ্র পৃথিবীতে উন্নত নৈতিক চরিত্র ও অভ্রান্ত জ্ঞানের অধিকারী আর কেউই ছিলেন না। আর এসব উন্নত বৈশিষ্ট আল্লাহ তা'য়ালা পূর্ব থেকেই তাদের স্বভাব-প্রকৃতির মধ্যে দান করেছিলেন।

নবী-রাসূলগণ যখনই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন, তখন ইসলামের দুশমনরা তাদের প্রতি নানা ধরনের কল্পিত অপবাদ দিলেও তাঁদের স্বভাব, প্রকৃতি, অভ্যাস ও নৈতিক চরিত্র সম্পর্কে বিন্দুমাত্র অভিযোগ তোলার সাহস করেনি। কারণ তারা এ কথা ভালো করেই জানতো যে, এই ব্যক্তি আমাদের সকলের থেকে উন্নত বৈশিষ্টের অধিকারী।

তিন. মু'জিযা বা অলৌকিক ক্ষমতা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সকল নবী- রাসূলকেই তাঁদের কর্মপরিধি এবং পরিবেশ পরিস্থিতির গুরুত্বানুযায়ী প্রয়োজন অনুপাতে মু'জিযা বা অলৌকিক ক্ষমতা দান করেছিলেন। এই মু'জিযা বা অলৌকিক ক্ষমতা সকলকেই একই ধরনের দান করা হয়নি। এর ধরন ছিলো ভিন্ন এবং পদ্ধতিও ছিলো ভিন্ন।

এ পৃথিবীতে সাধারণ মুসলমানের জন্যে 'অদৃশ্যের প্রতি ঈমান' আনাই যথেষ্ট, কিন্তু নবী-রাসূলদের যে দায়িত্ব সহকারে এ পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছিলো, তাদের জন্যে বিষয়টি 'অদৃশ্যের প্রতি ঈমান' পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিলো না। অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার জন্যে সৃষ্টির নিগূঢ় রহস্য ও মহাসত্য এত্যক্ষভাবে দর্শন করার প্রয়োজন ছিলো, এই প্রয়োজনের জন্যেই তাঁদেরকে মু'জিযা দান করা হয়েছিলো। পৃথিবীতে সাধারণ মানুষকে সত্য জানার জন্যে যেমন পরীক্ষা-নীরিক্ষা, আন্দাজ-অনুমান ও গবেষণা করতে হয়, তারপরেও সত্য উদঘাটন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। বর্তমানে যা সত্য বলে ধারণা করে পরবর্তীতে সে ধারণা পরিবর্তন করতে এ মানুষ বাধ্য হয়। অর্থাৎ পরিপূর্ণ সত্য জ্ঞান অনুধাবনের অভ্রান্ত ক্ষমতা মানুষের নেই বিধায় তারা তাদের ধারণা বার বার পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় এবং সত্যের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়।

একজন নবী-রাসূলকেও আল্লাহ তা'য়ালা সাধারণ মানুষের অবস্থার ওপর ছেড়ে দেননি। তাঁদেরকে সৃষ্টি রহস্য নিজ চোখে দেখানো হয়েছে এবং আল্লাহ তা'য়ালা এ প্রক্রিয়াতেই তাঁদেরকে অভ্রান্ত জ্ঞান দান করেছেন। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) এর মু'জিযা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে সূরা বাকারার ২৬০ নং আয়াতে, হযরত সালেহ (আ:) এর মু'জিযা সম্পর্কে সূরা আ'রাফের ৭৩ নং আয়াতে, হযরত মূসা (আ:) এর মু'জিযা সম্পর্কে সূরা আ'রাফের ১১৬, ১১৭ নং আয়াত, সূরা ত্বাহা-এর ১৭ থেকে ২৩ ও ৭৭ নং আয়াত এবং অন্যান্য সূরায়, হযরত সুলাইমান (আ:) এর মু'জিযা সম্পর্কে সূরা আন্ নাম্ল-এর ১৬, ৩৮ ও ৪০ নং আয়াত, হযরত ঈসা (আ:) এর মু'জিযা সম্পর্কে সূরা মারইয়াম এর ২৭ ও ৩০ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব আয়াতের বিস্তারিত তাফসীর পড়লে নবী-রাসূলদের মু'জিযা সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করা যাবে। এ ছাড়াও পবিত্র কুরআনের অন্যান্য সূরাতেও বিভিন্ন নবী- রাসূলের মু'জিযা সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে।

অন্যান্য সকল নবী-রাসূলদের যেসকল মু'জিযা দান করা হয়েছিলো, তা ছিলো তাঁদের জীবনকালের সাথে সম্পর্কিত। তাঁরা যতদিন পর্যন্ত এ পৃথিবীতে জীবিত ছিলেন ততদিন পর্যন্ত তাঁদের মু'জিযার কার্যকারিতা ছিলো। ইন্তেকালের সাথে সাথে তাঁদের প্রতি দানকৃত মু'জিযারও কার্যকারিতার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। হযরত দাউদ (আ:) যে কোনো ধরনের লোহা হাতের সাহায্যে গলিয়ে তা দিয়ে ইচ্ছানুযায়ী লৌহজাত দ্রব্য প্রস্তুত করতে পারতেন এবং এ মু'জিযা মহান আল্লাহ তাঁকে দান করেছিলেন। তাঁর ইন্তেকালের পরে এ ধরনের মু'জিযা আজ পর্যন্তও কেউ দেখাতে পারেনি এবং কিয়ামত পর্যন্তও পারবে না। লোহা ঠিকই আছে কিন্তু সেই মু'জিযা নেই।

হযরত সুলাইমান (আ:) সকল প্রাণীর ভাষা বুঝতেন এবং বাতাসকে তাঁর অনুগত করে দেয়া হয়েছিলো। কাঠের তক্তার ওপর বসে বাতাসকে তিনি আদেশ করতেন উড়িয়ে নিয়ে যাবার জন্যে। বাতাস তাঁকে উড়িয়ে নিয়ে যেতো। তাঁর ইন্তেকালের পরে এ মু'জিযা আর কাউকে দেয়া হয়নি, আজও বাতাস ও তক্তা রয়েছে কিন্তু সেই মু'জিযা আর নেই। তাঁর ইন্তেকালের সাথে সাথে ঐ মু'জিযার পরিসমাপ্তি ঘটেছে।

হযরত ইবরাহীম (আ:) পাখি যবেহ করে তা আহার করার পর পাখীর হাড় কোনো এক পাহাড়ের ওপর রেখে আসলেন, তারপর পাখিগুলোকে ডাক দিতেই হাড়গুলো পুনরায় জীবন্ত পাখি হয়ে তাঁর কাছে ফিরে এলো। তাঁর ইন্তেকালের সাথে সাথে এ মু'জিযার সমাপ্তি ঘটলো। কিয়ামত পর্যন্ত এ ক্ষমতা কারো হবে না যে, পাখি যবেহ করে আহার করার পর তার হাড় দিয়ে পুনরায় জীবিত পাখি তৈরী করা।

হযরত মূসা (আ:) হাতের লাঠি মাটিতে নিক্ষেপ করতেন তা এক বিশাল আকারের সর্পে পরিণত হতো। লাঠি সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে রয়েছে, কিন্তু মূসা (আ:) নেই বিধায় লাঠি সর্পে পরিণত হয় না। হযরত সালেহ (আ:) পাথুরে পাহাড় থেকে উস্ত্রী বের করে আনলেন সাথে সাথে সেই উন্ত্রী শাবকও প্রসব করলো। পৃথিবীতে অসংখ্য পাথুরে পাহাড় রয়েছে, কিন্তু এসব পাহাড় থেকে কেউ উট বের করা দূরে থাক, ক্ষুদ্র একটি পিপীলিকাও বের করতে পারে না। এভাবে সকল নবী-রাসূলের ইন্তেকালের সাথে সাথে তাঁদেরকে প্রদত্ত মু'জিজাও আল্লাহ তা'য়ালা উঠিয়ে নিয়েছেন।

ব্যতিক্রম শুধু নবী করীম (সা:) এবং তাঁকে প্রদত্ত মু'জিযা। মহান আল্লাহ তাঁকে অগণিত মু'জিযা দানে ধন্য করেছিলেন। পৃথিবীতে তাঁর আগমনের লক্ষণ দেখা দেয়ার পর থেকে মাতৃগর্ভে আসা, ভূমিষ্ঠ হওয়া, তাঁর শৈশব-কৈশোর, তারুণ্য, যৌবনকাল এবং ইন্তেকালের মুহূর্ত পর্যন্ত আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর মাধ্যমে যে সকল মু'জিযা ঘটিয়েছেন, তা একত্রিত করতে গেলে বিশাল আকৃতির গ্রন্থ রচনা প্রয়োজন। নবী করীম (সা:) বয়সে যখন কয়েক বছরের বালক, সমগ্র দেশে অনাবৃষ্টি দেখা দিলো। লোকজন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো, তারা বায়তুল্লাহর ছায়াতলে গিয়ে আল্লাহর দরবারে বৃষ্টির জন্যে দোয়া করবেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকলেই কা'বা শরীফে গিয়ে উপস্থিত হলো। চাচা আবু তালিব বালক নবী করীম (সা:) কে নিজের ঘাড়ে বসিয়ে কা'বা শরীফের ছায়াতলে গিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে বৃষ্টির জন্যে দোয়া করতে থাকলেন। দোয়ার মধ্যে এক পর্যায়ে তিনি বালক মুহাম্মাদ (সা:) এর দিকে ইশারা দিয়ে আল্লাহ তা'য়ালাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'এই চেহারা দেখেও কি তুমি বৃষ্টি দিবে না!'

ইতিহাস কথা বলে, এভাবে বালক মুহাম্মাদ (সা:) কে দেখিয়ে বৃষ্টির জন্যে আবেদন করার পরে লোকজন নিজেদের ঘরে ফিরে যাবারও সময় পায়নি। ক্ষণিকের মধ্যে মক্কার আকাশ মেঘে ছেয়ে গেলো তারপর শুরু হলো প্রবল বর্ষণ।

নবী করীম (সা:) তখন ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি। অনাবৃষ্টির কারণে প্রাণীজগৎ এবং মানুষ ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বৃক্ষ তরুলতা শুকিয়ে যাচ্ছে। মসজিদে নববীতে সাহাবায়ে কেরাম নবী করীম (সা:) এর কাছে আবেদন জানালেন, তিনি যেনো বৃষ্টির জন্যে দোয়া করেন। বুখারী শরীফের হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহর রাসূল দোয়া করলেন উপস্থিত লোকজন বাড়িতে ফিরে যাবার সুযোগও পেলেন না। মুষলধারায় বৃষ্টি শুরু হলো।

একাধারে কয়েকদিন বৃষ্টি বর্ষণ হতে থাকলো। সাহাবায়ে কেরাম আবেদন জানালো, 'হে আল্লাহর রাসূল! বৃষ্টি বন্ধের জন্যে দোয়া করুন'। নবী করীম (সা:) মসজিদে নববীর মিম্বারে বসে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন আল্লাহ তা'য়ালা একান্ত দয়া করে বৃষ্টি বন্ধ করে দিলেন।

সে সময় মক্কায় কুস্তি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। দৈহিক শক্তির অধিকারী বীরগণ কুস্তি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতো। নবী করীম (সা:) এসব প্রতিযোগিতায় কখনো অংশগ্রহণ করেননি। নবুয়‍্যাত লাভের পূর্বে আরবের খ্যাতিমান শ্রেষ্ঠ কুস্তিগীর তাঁর সাথে লড়াই করার জন্যে বার বার বলতে থাকলে তিনি সেই কুস্তিগীরকে এমন শিক্ষা দিয়ে ছিলেন যে, জীবিত থাকা পর্যন্ত সে আর কখনো নবী করীম (সা:) কে উত্যক্ত করেনি। দৈহিক শক্তির দিক থেকেও আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর রাসূলকে এমন মু'জিযা দান করেছিলেন যা কল্পনাও করা যায় না।

হযরত আলী (রা:) বলেছেন, 'আমি মক্কা নগরীর সেই সব পাহাড় আর বিশাল পাথরগুলোকে এখনো দেখলে চিনতে পারবো, যেসব পাহাড় আর পাথরের পাশ দিয়ে নবী করীম (সা:) এর সাথে পথ চলার সময় আমি দেখতাম, গাছগুলো তাঁর প্রতি ঝুঁকে আসছে আর বৃক্ষ ও পাথর থেকে আওয়াজ শুনতাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার প্রতি মহান আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক'। (তিরমিযী)

নবী করীম (সা:) বলেছেন, 'আমি মক্কার ঐসব পাথরগুলোকে চিনি, নবুয়‍্যাত লাভ করার পূর্বে ঐসব পাথরের পাশ দিয়ে পথচলার সময় পাথরগুলোর মধ্য থেকে সালামের আওয়াজ ভেসে আসতো'। (মুসলিম, তিরমিযী, আহমাদ, দারেমী)

মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে এতে মিম্বার ছিলো না। নবী করীম (সা:) একটি খেজুর গাছের খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে ইসলামী জীবন বিধানের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বক্তব্য রাখতেন। মিম্বার বানানোর পরে তিনি মিম্বারে বসে বক্তব্য দিতে থাকলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম এবং আল্লাহর রাসূল (সা:) শুনতে পেলেন, কেউ যেনো করুণ কণ্ঠে কাঁদছে। কান্নার উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখা গেলো, সেই খেজুর গাছের খুঁটি থেকে কান্নার আওয়াজ নির্গত হচ্ছে। আল্লাহর হাবীবের স্পর্শ বঞ্চিত হয়ে বিরহ কাতর স্বরে শুকনো খেজুর গাছটি করুণ স্বরে কেঁদেছিলো। নবী করীম (সা:) উক্ত গাছটির দিকে এগিয়ে গিয়ে আদর জানানোর পরে গাছটির কান্না বন্ধ হলো। (বুখারী, তিরমিযী, আহমাদ, ইবনে মাজাহ্, দারেমী, নাসাঈ, আবু ইয়ালী, তাবরাণী, বায়হাকী)

খন্দক যুদ্ধের সময় পরীখা খননকালে বিশাল একটি পাথরের চাঁই পরীখা খননে বাধার সৃষ্টি করলো। সাহাবায়ে কেরামের সম্মিলিত চেষ্টাতেও পাথরের চাঁই ভাঙ্গা গেলো না। নবী করীম (সা:) এগিয়ে এসে গাঁইতি দিয়ে আঘাত করার সাথে সাথে বিশাল পাথরের চাঁইটি খণ্ড বিখণ্ড হয়ে গেলো। (বুখারী, নাসাঈ, বায়হাকী, আবু নাঈম, ইবনে সায়াদ, ইবনে ইসহাক, ইবনে জারীর)

নবী করীম (সা:) হযরত আবু বকর, হযরত উমার, হযরত উসমান, হযরত আলী, হযরত তালহা এবং হযরত যুবাইর রাদিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহুম আজমাঈন, তাঁদেরকে সাথে নিয়ে একটি পাহাড়ের ওপর উঠলে পাহাড়টি আন্দোলিত হতে থাকে। আল্লাহর নবী (সা:) পাহাড়ের ওপর পবিত্র কদম মুবারক দিয়ে আঘাত করে বললেন, 'স্থির হও, তোমার ওপর আল্লাহর রাসূল, সিদ্দীক এবং শহীদ আরোহণ করেছে'। পাহাড় স্থির হয়ে গেলো। (বুখারী, মুসলিম, ইবনে হাম্বল, তিরমিযী, নাসাঈ, দারে কুতনী, আবু ইয়ালী, বায়হাকী)

নবী করীম (সা:) সাহাবায়ে কেরাম সমভিব্যাহারে ভ্রমণে ছিলেন। প্রাকৃতিক প্রয়োজন হলে তিনি দেখলেন পর্দা করার মতো কোনো আড়াল নেই। তিনি হযরত জাবের (রা:) কে সাথে নিয়ে খোলা ময়দানের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখলেন ময়দানের এক পাশে দু'টো বৃক্ষ। তিনি বৃক্ষ দু'টোকে লক্ষ্য করে বললেন, 'মহান আল্লাহর আদেশে আমার আনুগত্য করো'। এরপর তিনি যেমনটি চাইলেন বৃক্ষ দু'টো তেমনি হয়ে গেলো এবং বৃক্ষ দু'টোকে আড়াল করে তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন শেষ করলেন। তারপর পুনরায় বৃক্ষ দু'টো পূর্বের অনুরূপ হয়ে গেলো। (মুসলিম, আহমাদ, বায়হাকী)

হিজরতের সময়ের ঘটনা, প্রিয় বন্ধু হযরত আবু বকর (রা:) কে সাথে নিয়ে নবী করীম (সা:) মদীনার দিকে যাচ্ছেন। খাদ্য ফুরিয়ে যাওয়ায় পথিমধ্যে তাঁরা ক্ষুধা অনুভব করলেন। দেখলেন সুদর্শন এক কিশোর অনেকগুলো ছাগল চরাচ্ছে। নবী করীম (সা:) বালককে ডেকে জানতে চাইলেন, 'ছাগলের কি দুধ আছে?'

বালক জবাব দিলো, 'এ ছাগল আমার নয়, আমি অন্যের ছাগল চরাই। আমি এ ছাগলের মালিকের অনুমতি ব্যতীত আপনাদেরকে দুধ দিতে পারবো না'।

রাসূল (সা:) বললেন, 'ঠিক আছে, তুমি এমন একটি কম বয়সী ছাগী আমার কাছে নিয়ে এসো, যা এখনো বাচ্চা দেয়ার বয়সে উপনীত হয়নি'।

বালক অল্প বয়সী একটি ছাগী আনলো। হযরত আবু বকর (রা:) গর্তযুক্ত একটি পাথর যোগাড় করলেন যা দেখতে অনেকটা পাত্রের মতো। নবী করীম (সা:) কম বয়সী ছাগীর স্তনে বিস্মিল্লাহ বলে হাত দিতেই স্তন দুধে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো। বালকসহ তাঁরা দুধ পান করলেন এবং ছাগীর স্তন যেমন ছিলো পুনরায় তেমনি হয়ে গেলো। (ইবনে সায়াদ)

একজন মরুচারী বেদুঈন নবী করীম (সা:) এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে বললো, 'আপনি যে আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল তা আমি কিভাবে বিশ্বাস করবো?'

নবী করীম (সা:) সম্মুখের দিকে একটি খেজুর গাছের দিকে ডান হাতের ইশারা করে বললেন, 'ঐ খেজুর গাছটি যদি আমার নির্দেশ মেনে নেয় তাহলে কি তুমি আমার প্রতি ঈমান আনবে?'

বেদুঈন জানালো, এমন ঘটনা ঘটলে সে ঈমান আনবে। রাসূল (সা:) গাছের খেজুর গুচ্ছের দিকে ইশারা করা মাত্র খেজুর গুচ্ছ গাছ থেকে পৃথক হয়ে তাঁর সম্মুখে এসে উপস্থিত হলো। তিনি পুনরায় ইশারা করতেই তা স্বস্থানে চলে গেলো। এ দৃশ্য দেখে বেদুঈন তখনি ইসলাম গ্রহণ করলো। (তিরমিযী, তারিখ-ই বুখারী)

হযরত আবু তালহা (রা:) এর বাহন ঘোড়াটি ছিলো অত্যন্ত দুর্বল ও রোগা। চলতে ফিরতে ছিলো খুবই দুর্বল। নবী করীম (সা:) একদিন সে ঘোড়ায় সওয়ার হওয়া মাত্র ঘোড়াটি ক্ষিপ্র গতিসম্পন্ন হয়ে গেলো। তিনি মদীনা শহর ঘুরে এসে বললেন, 'এই ঘোড়াটি খুবই কোমল এবং আরামদায়ক'। এরপর থেকে উক্ত ঘোড়াটির মুকাবিলায় অন্য ঘোড়াগুলো দুর্বল মনে হতো। (বুখারী)

সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে অনেকেই এমন ছিলেন যে তাঁরা নবী করীম (সা:)-এর খেদমতে গভীর রাত পর্যন্ত উপস্থিত থাকতেন। তারপর অন্ধকার রাতে বাড়ী ফিরতে তাঁদের চলার পথে দেখতে পেতেন, তীব্র আলো পথের অন্ধকার দূর করে দিচ্ছে। তাঁরা গন্তব্যে পৌঁছা পর্যন্ত আলো তাদের সাথী হয়ে থাকতো। রাতের অন্ধকারে রাসূল (সা:) এর কাছ থেকে বাড়ী ফিরে যাবার সময় কোনো সাহাবীর হাতের লাঠি থেকেও আলো নির্গত হতো এবং সে আলোয় পথ দেখে তাঁরা বাড়ী ফিরতেন। (বুখারী, হাকেম, ইবনে সায়াদ, বায়হাকী)

একজন সাহাবীর একটি উট হঠাৎ উন্মাদের মতোই আচরণ করতে লাগলো। এলাকার লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়লো, এ বিষয়টি নবী করীম (সা:) শোনামাত্র সেখানে গেলেন। সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে অনুরোধ জানিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! পশুটির কাছে যাবেন না। মানুষকে আঘাত করা এ উটটির স্বভাবে পরিণত হয়েছে'।

নবী করীম বললেন, 'চিন্তা করো না'। কথা শেষ করেই তিনি উটটির দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁকে দেখামাত্র উটটির মধ্যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গেলো। ক্ষণপূর্বের সেই উন্মাদনা দূর হয়ে গেলো। শান্ত ভঙ্গিতে উটটি নীচু হতে হতে রেসালাতে নববীর পবিত্র কদমে লুটিয়ে পড়লো। আল্লাহর রাসূল পবিত্র হাত মুবারক দিয়ে উটের মাথা মুখ স্পর্শ করে উটটি তার মালিককে ফেরৎ দিয়ে বললেন, 'আল্লাহর প্রত্যেক সৃষ্টিই জানে যে আমি আল্লাহর রাসূল, শুধু মানুষই নাফরমানী করে'। (দারেমী, আহমাদ, নাসাঈ, ইবনে আবি শাইবা, বায়হাকী, তাবারাণী, বিদায়া ওয়ান নিহায়া)

নবী করীম (সা:) মদীনার এক সাহাবীর বাগানে গিয়ে দেখলেন, একটি উট বাঁধা রয়েছে আর উটটি করুণ কণ্ঠে আওয়াজ করছে। আল্লাহর রাসূল (সা:) কে দেখে উটটি রেসালাতে নববীর দিকে অশ্রু সজল দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুখ নাড়াতে থাকলো। তিনি উটটির কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। উটটি নীরব হয়ে আদর জানাতে লাগলো। তিনি উপস্থিত লোকদের কাছে জানতে চাইলেন, 'এ উটটির মালিক কে?' একজন সাহাবী এগিয়ে এসে জানালো সে এটির মালিক। নবী করীম (সা:) বললেন, 'আল্লাহ তা'য়ালা তোমাদেরকে এই নিরীহ প্রাণীর অধিকারী করেছেন। তোমাদের দায়িত্ব হলো এদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা। এই উটটি আমার কাছে অভিযোগ করছে যে, তুমি একে নির্যাতন করো এবং ক্ষুধার্ত রাখো'। (আবু দাউদ, আহমাদ, মুসলিম, আবু নাঈম)

নবী করীম (সা:) এর বলা কথাগুলো হযরত আবু হুরাইরা (রা:) স্মরণে রাখার জন্যে একদিন নিজের কাপড় বিছিয়ে দরবারে নববীতে বসলেন। রাসূল (সা:) এর কথা শেষ হতেই তিনি কাপড় গুটিয়ে নিজের বুকের সাথে মিশালেন। তিনি বলেন, এরপর থেকে আমি আর কখনো কোনো হাদীস ভুলিনি। (বুখারী, মুসলিম)

হযরত আবু তালহা (রা:) একদিন নবী করীম (সা:)-এর কণ্ঠস্বর শুনে অনুভব করলেন তিনি ক্ষুধার্ত। নিজ বাড়িতে গিয়ে স্ত্রী উম্মে সুলাইম (রা:) এর কাছে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, মাত্র কয়েকটি রুটি রয়েছে এবং এগুলো সন্তানদের খাওয়াতে হবে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, সন্তানরা ক্ষুধার্ত থাক- আল্লাহর রাসূলের জন্যে এ রুটি পাঠাতে হবে। উম্মে সুলাইম সন্তান হযরত আনাস (রা:) এর হাতে রুটিগুলো দিয়ে দরবারে নববীতে পাঠিয়ে দিলেন。

বালক আনাস (রা:) রুটিগুলো নিয়ে এসে দেখলেন, দরবারে নববীতে অনেক মানুষ। এখন এ রুটি দিলে রাসূল (সা:) কিছুই খেতে পাবেন না, সবগুলো লোকদের দিয়ে দিবেন। তিনি অপেক্ষা করতে থাকলেন, লোকগুলো বিদায় নিলে তিনি রুটিগুলো দিবেন। কিন্তু আল্লাহর রাসূল (সা:) এর দৃষ্টি হযরত আনাসের ওপর পতিত হলো। তিনি বললেন, 'তালহা তোমার মাধ্যমে খাবার পাঠিয়েছে?'

হযরত আনাস সম্মতিসূচক জবাব দিলেন। নবী করীম (সা:) সাহাবায়ে কেরামসহ হযরত তালহার বাড়ির দিকে যাত্রা করলেন। হযরত আনাসও নিজ বাড়িতে ফিরে এসে মায়ের কাছে রুটিগুলো দিলেন। এ দৃশ্য দেখে হযরত তালহা (রা:) বিস্মিত দৃষ্টিতে রাসূল (সা:) এর দিকে তাকিয়ে রইলেন। রাসূল (সা:) হযরত উম্মে সুলাইমকে বললেন, 'যা কিছু আছে নিয়ে এসো'।

হযরত আনাস (রা:) এর নিয়ে যাওয়া ঐ রুটিগুলো এবং সামান্য ঘী তাঁর সম্মুখে উপস্থিত করা হলো। নবী করীম (সা:) নিজ হাতে রুটিগুলো ছিঁড়ে টুকরো করে ঘী দিয়ে মাখালেন। তারপর দশজন দশজন করে সাহাবাকে ঘরে প্রবেশ করে খেতে বললেন। প্রত্যেক সাহাবা পেটপুরে আহার করলেন, আল্লাহর রাসূলের পবিত্র হাতের স্পর্শে মহান আল্লাহ এতই বরকত দিয়েছিলেন যে, মাত্র একজনের খাদ্য প্রায় আশিজন মানুষ খাবার পরও উদ্বৃত্ত রয়ে গেলো। (বুখারী)

তরুণ সাহাবী হযরত জাবের (রা:) এর পিতা অনেক ঋণ রেখে মৃত্যুবরণ করলে সকল ঋণের বোঝা এসে তাঁর কাঁধে চাপলো। ঋণ দাতাদের মধ্যে সকলেই ছিলো ইয়াহুদী। সেবার বাগানে যে খেজুর হলো তা সবগুলো দিয়েও ঋণ পরিশোধ হবে না। বিষয়টি তিনি আল্লাহর রাসূল (সা:) কে জানালেন। তিনি বললেন, 'গাছের খেজুরগুলো পেড়ে তুমি একস্থানে জমা করো'। হযরত জাবের (রা:) পরামর্শ মতো তাই করলেন। নবী করীম (সা:) এসে একস্থানে জমা করা খেজুরগুলোর চারপাশে ঘুরলেন। তারপর ঋণ দাতাদেরকে খেজুর দিয়ে ঋণ পরিশোধের আদেশ দিলেন। সকলের ঋণ পরিশোধের পরও দেখা গেলো, প্রথমে খেজুর যে পরিমাণ ছিলো সেই পরিমাণই রয়ে গিয়েছে। (বুখারী)

একজন সাহাবী নবী করীম (সা:) এর কাছ থেকে কিছু যব চেয়ে নিলেন। এরপর প্রত্যেক দিন তিনি তাঁর পরিবার পরিজন নিয়ে উক্ত যবের পাত্র থেকে যব নিয়ে খেতে থাকলেন। কয়েক দিন খাবার পরও পাত্রে যব যেমন ছিলো তেমনি রয়ে গেলো। তিনি যবের পরিমাণ ওজন করে দেখে বিষয়টি রাসূল (সা:) কে জানালেন। আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তুমি যদি যব ওজন না করতে তাহলে পূর্বে যেমন তা বরকত দিচ্ছিলো, তা-ই দিতে থাকতো'। (মুসলিম, আহমাদ)

খন্দক যুদ্ধের সময় পরীখা খনন করতে করতে নবী করীম (সা:) সহ সকল সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন ক্ষুধার্ত। হযরত জাবের (রা:) নবী করীম (সা:) এর অবস্থা দেখে বাড়িতে গিয়ে নিজ স্ত্রীকে বিষয়টি জানালেন। তিনি একটি ছোট্ট ছাগল যবেহ করে যব দিয়ে তা রান্না করলেন। হযরত জাবের (রা:) চুপি চুপি নবী করীম (সা:) কে খেতে যাবার অনুরোধ করলেন। রাসূল (সা:) সকল সাহাবায়ে কেরামকে খুশীর সংবাদ জানিয়ে বললেন, 'জাবের আমাদের খাবার প্রস্তুত করেছে, তোমরা আমার সাথে চলো'।

সকলেই নবী করীম (সা:) এর সাথে এসে উপস্থিত হলেন। হযরত জাবের (রা:) ও তাঁর স্ত্রী বিব্রতবোধ করছেন। এ অবস্থা দেখে আল্লাহর রাসূল (সা:) বরকতের জন্যে দোয়া করে খাদ্য পরিবেশন করতে আদেশ করলেন। বিশাল এক বাহিনী খাওয়ার পরেও খাদ্য পাত্রে যেমন ছিলো তেমনি রয়ে গেলো। (বুখারী)

হুদাইবিয়ার সন্ধিকালে সাহাবায়ে কেরাম কুয়া থেকে পানি উত্তোলন করতে থাকলেন। এক পর্যায়ে কুয়ার পানি নিঃশেষ হয়ে গেলো। নবী করীম (সা:) এর কাছে সংবাদ পৌঁছলে তিনি পবিত্র মুখ মুবারকে কিছুটা পানি নিয়ে তা পানিহীন কুয়ায় নিক্ষেপ করা মাত্র কুয়া পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো। (বুখারী)

সাহাবায়ে কেরাম সমভিব্যাহারে ভ্রমণে থাকা অবস্থায় পানি ফুরিয়ে গেলো। নবী করীম (সা:) এর জন্যে কিছুটা অজুর পানির ব্যবস্থা করা হলে তিনি নিজে অজু করে সে পানির পাত্রে হাত মুবারক রাখলেন। পবিত্র হাতের বরকতে প্রত্যেক আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে পানির ফোয়ারা ছুটতে লাগলো। অগণিত সাহাবায়ে কেরাম সে পানি দ্বারা নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করলেন। (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী)

এ ধরনের অসংখ্য মু'জিযা সম্পর্কিত ঘটনা হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে রয়েছে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে যে কত উচ্চে মর্যাদা দান করেছিলেন তা এসব মু'জিযাসমূহের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপে অনুভব করা যায়। তবে যারা আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলকেই বিশ্বাস করে না, কোনো মু'জিযাই তাদের কপাট বদ্ধ অন্ধকার হৃদয়ে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px