📄 নবী করীম (সা:) কে পৃথিবীতে প্রেরণের উদ্দেশ্য
পৃথিবীতে এটি বাস্তব সত্য যে, কোনো আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে সে আদর্শের ভিত্তিতে একটি সুসংগঠিত দল বা সংস্থা গঠন করতে হয়। সে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থাকে। সমগ্র দেশে থাকে স্থানীয় কার্যালয়। কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন সময় যে সকল নির্দেশ ঐ স্থানীয় কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয় তা ঐ আদর্শের অনুসারী নেতা-কর্মীগণ বাস্তবায়ন করে থাকেন। তেমনি মুসলিম একটি মিল্লাতের নাম এবং এ মিল্লাতের আদর্শ ইসলাম। এই মিল্লাতের জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:)।
আল্লাহ তা'য়ালার নির্দেশে তিনি এই মিল্লাতের জন্য একটি কেন্দ্র নির্মাণ করলেন। কেননা, এই মিল্লাতের যিনি বিশ্বনেতা তাঁর আগমনের সময় সমাগত। হযরত ইবরাহীম (আ:) ও তাঁর আগমনের জন্য আল্লাহ তা'য়ালার কাছে এভাবে দোয়া করলেন-
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ . وَيُزَكِّيهِمْ طَ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
হে আমাদের মালিক! তাদের (বংশের) মধ্যে তাদের নিজেদের মাঝ থেকে তুমি (এমন) একজন রাসূল পাঠাও, যে তাদের কাছে তোমার আয়াতসমূহ পড়ে শোনাবে, তাদের তোমার কিতাবের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দিবে, উপরন্তু সে তাদের পবিত্র করে দিবে, কারণ তুমিই মহাপরাক্রমশালী ও পরম কুশলী। (সূরা বাকারা-১২৯)
সুতরাং ইবরাহীম (আ:) যে ঘর পুনঃনির্মাণ করলেন তা কোনো সাধারণ ঘর ছিল না। এই ঘর প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একটিই ছিল, সমগ্র বিশ্বে আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এখান থেকেই পরিচালিত হবে, এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখেই হযরত ইসমাঈল (আ:) ও তাঁর মা'কে জনমানবহীন এই প্রান্তরে রেখে যাওয়া হয়েছিল, ইসমাঈল (আ:) এর কুরবানীও ছিল ঐ একই উদ্দেশ্যে এবং কা'বার নির্মাণও ছিল ঐ একই লক্ষ্যে।
সমগ্র পৃথিবীতে যারা তাওহীদের মশাল বহন করবে, তারা যেন প্রতি বছরে একবার হজ্জ নামক বিশ্ব সম্মেলনে এসে সমবেত হয়, একত্রে সমস্বরে এক আল্লাহর দাসত্বের ঘোষণা বজ্রকণ্ঠে দিতে পারে, পারস্পরিক পরিচিতি লাভ করতে পারে, একে অপরের সমস্যা সম্পর্কে অবগত হয়ে তা সমাধানের বাস্তব পন্থা অবলম্বন করতে পারে, আল্লাহ বিরোধী শক্তির মুকাবিলা কিভাবে করা যায় এবং সমগ্র পৃথিবীতে কিভাবে এক আল্লাহ তা'য়ালার বিধান প্রতিষ্ঠা করা যায়-এ সকল কার্যক্রম গ্রহণ করার লক্ষ্যেই সেদিন কা'বা নির্মাণ করে আল্লাহর নবী হযরত ইবরাহীম (আ:) বিশ্বনবী তথা বিশ্বনেতাকে প্রেরণের দোয়া করেছিলেন এবং সাধারণ মানুষকে সে ঘরের দিকে আহ্বান জানিয়ে ছিলেন।
পবিত্র কুরআনের অনেক স্থানেই কা'বাঘর সম্পর্কে মহান আল্লাহ এই ঘর বানানোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে সম্পর্কে বলেছেন, 'এই ঘর হিদায়াতের কেন্দ্র, এখান থেকেই একত্ববাদের বাণী সমগ্র পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে'। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) এর দোয়ার প্রতি লক্ষ্য করলে কতকগুলো বিষয় আমাদের সম্মুখে স্পষ্ট হয়ে যায়।
১. এমন এক ব্যক্তিত্বকে বিশ্বনবী বা বিশ্বনেতা হিসাবে প্রেরণ করা হোক, যিনি মানবমণ্ডলীরই একজন। অর্থাৎ মানুষের বাইরের কোনো সত্তা নয়। মানুষের সকল ইচ্ছা, আকাক্সখা, কামনা-বাসনা, ব্যথা-বেদনা, মায়া-মমতা তথা সকল অনুভূতি হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে সক্ষম কেবলমাত্র মানুষই। এ জন্যেই মানুষের মধ্য থেকেই বিশ্বনেতাকে নির্বাচিত করার আবেদন করা হয়েছিলো।
২. তিনি মহান আল্লাহর সাথে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিবেন, সৃষ্টি হিসাবে স্রষ্টার প্রতি মানুষের দায়িত্ব-কর্তব্য কি তা বিশদভাবে মানুষকে জানিয়ে দিবেন এবং স্বয়ং আল্লাহই যে একমাত্র ইলাহ ও রব অর্থাৎ তিনিই আইনদাতা, বিধানদাতা এবং সকল বিষয়ের প্রতিপালক- এ বিষয়টিও মানুষের কাছে স্পষ্ট করে দিবেন।
৩. পৃথিবীতে মানুষ ভারসাম্যমূলক জীবন-যাপন করবে এবং এর জন্যে প্রয়োজনীয় যাবতীয় উপকরণ- যে সম্পর্কিত জ্ঞান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর কিতাবের মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন, এ সংক্রান্ত যাবতীয় জ্ঞান বিশ্বনবী তথা বিশ্বনেতা মানবজাতিকে শিক্ষা দিবেন। অর্থাৎ প্রগতির ফল্গুধারায় আপুত শোষণমুক্ত, শান্তিপূর্ণ জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ, বস্তুর কল্যাণকর কর্মে ব্যবহারকারী এবং উন্নত সভ্যতা-সংস্কৃতির অধিকারী দেশ, জাতি ও সমাজ বিনির্মাণে যা কিছু প্রয়োজন, তা কাংখিত বিশ্বনেতা শিক্ষা দিবেন।
৪. দোয়ায় বলা হয়েছিলো, 'এমন এক বিশ্বনেতা প্রেরণ করুন, যিনি মানুষকে পবিত্র করে দিবেন'।
যে আল্লাহ তা'য়ালা মানুষ সৃষ্টি করে তার যাবতীয় জীবনোপকরণ দিয়েছেন, সেই আল্লাহর দাসত্ব করার মধ্যেই মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নিহিত এবং মানুষ ক্রমশ মর্যাদার উচ্চ শিখরে আরোহণ করে। সম্মানের এমন এক পর্যায়ে এ মানুষ পৌঁছে যায় যে, যেখানে স্বয়ং ফিরিশতাও পৌঁছতে সক্ষম নয়। আবার এ মানুষ নিজের প্রকৃত মর্যাদা ও অবস্থান ভুলে আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে নিজের মহান মালিক আল্লাহকে ত্যাগ করে তার অনুরূপ আরেক সৃষ্টির, কোনো জড়পদার্থের বা নিজ হাতে গড়া কল্পিত কোনো শক্তির দাসত্ব করে, তখন সে মানুষের মর্যাদা শূন্যের কোঠা অতিক্রম করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীর প্রাপ্য মর্যাদাও হারিয়ে ফেলে। আর এ অবস্থায়ই একজন সম্মানিত মানুষের জন্য অপবিত্রতার মধ্যে নিমজ্জিত হওয়া বুঝায়।
যখন মানুষ তার প্রকৃত মর্যাদা সম্পর্কে উদাসীনতার পরিচয় দেয়, নিজের সম্মানকে অবহেলা করে আত্মমর্যাদা সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলে বলেই সে মানুষ তারই অনুরূপ আরেকজন মানুষকে নিজের বিধানদাতা, আইনদাতা, মুক্তিদাতা এবং যাবতীয় বিষয়ে সিদ্ধান্তদাতা হিসাবে বরণ করে। অথবা কোনো জড়পদার্থকে নিজের মনস্কামনা পূরণকারী হিসাবে বরণ করে বা নিজ হাতে গড়া কোনো কল্পিত বস্তুর দাসত্ব করে। তারই অনুরূপ সৃষ্টি আরেকজন মানুষ তাকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সমস্যার সমাধান দিবে এবং মানব সভ্যতা-সংস্কৃতির উপকরণ দিবে, যাবতীয় নীতিমালা রচনা করে দিবে আর সে তা অবলীলাক্রমে মেনে চলবে- এ ধরনের মর্যাদাহীনতার অপবিত্রতা থেকে সকল মানুষকে পবিত্র করবেন, 'এমন একজন বিশ্বনবী বা বিশ্বনেতা প্রেরণ করুন' এ দোয়াই হযরত ইবরাহীম (আ:) করেছিলেন।
মানুষের চিন্তাধারা, চেতনা, অভ্যাস, স্বভাব-চরিত্র, চলমান জীবনধারা, দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুন ও মতবাদ মতাদর্শকে ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত করে সকল কিছুকে পরিশুদ্ধ করবেন বিশ্বনবী (সা:) এ কামনাই মহান আল্লাহর কাছে করেছিলেন মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) এবং তাঁর পবিত্র এ দোয়ারই উত্তর স্বরূপ নবী করীম (সা:) প্রেরিত হয়েছেন। মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে ইবরাহীম (আ:) এর চাওয়ার সাথে সঙ্গতি রেখে বলছেন-
كَمَا أَرْسَلْنَا فِيكُمْ رَسُولاً مِّنْكُمْ يَتْلُوا عَلَيْكُمْ آيَاتِنَا وَيُزَكِّيْكُمْ وَيُعَلِّمُكُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُم مَّا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُوْنَ طَ
(এই সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্যেই) আমি এভাবে তোমাদের কাছে তোমাদের মাঝ থেকেই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছি, যে ব্যক্তি (প্রথমত) তোমাদের কাছে আমার 'আয়াত' পড়ে শোনাবে, (দ্বিতীয়ত) সে তোমাদের (জীবন) পরিশুদ্ধ করে দিবে এবং (তৃতীয়ত) সে তোমাদেরকে আমার কিতাব ও (তার অন্তর্নিহিত) জ্ঞান শিক্ষা দিবে, (সর্বোপরি) সে তোমাদের এমন বিষয়সমূহের জ্ঞান দান করবে, যা তোমরা কখনো জানতে না। (সূরা বাকারা-১৫১)
মানুষ নিজেকে কিভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র রাখবে, নিজের প্রতি, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, সমাজ, রাষ্ট্র ইত্যাদির প্রতি মানুষের দায়িত্ব- কর্তব্য কি, এসব বিষয় সম্পর্কে মানুষ ছিলো সম্পূর্ণ অন্ধকারে। মহাকাশের শূণ্য মার্গে, অগণিত গ্রহ-নক্ষত্রে, অদৃশ্য বায়ুমণ্ডলে এবং অন্যান্য স্তরে, শূণ্য মার্গের অদৃশ্য কৃষ্ণ গহ্বরে (Black hole), ওজন স্তরে, মহাশূন্যে ঘূর্ণয়মান পাথরের সাম্রাজ্যে, পাতালপুরীর কৃষ্ণ বিবরে, অগাধ জলধীর বিভিন্ন স্তরসহ অতল তলদেশে, মাটির তলদেশে খনিসমূহের স্তর অতিক্রম করে উত্তপ্ত গলিত লাভার স্তরে, পর্বতের সৃষ্টি কৌশল ও অবস্থানে, পণ্ডদলের মাঝে, অরোণ্যের ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে নবী- রাসূলগণই সর্বপ্রথম মানুষকে জ্ঞান দান করেছেন। শিক্ষা দিয়েছেন বস্তুর ব্যবহার। বিজ্ঞান যে সকল বিষয় বর্তমানে মানুষকে জানাচ্ছে, এসব বিষয় সম্পর্কে নবী করীম (সা:) পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে সর্বপ্রথম মানুষকে অবগত করেছেন। বস্তুর ধ্বংস নেই, বস্তু অবিনাশী। মানুষেরও ধ্বংস নেই, ক্ষণস্থায়ী জীবন শেষে মৃত্যুর পরে আরেকটি অনন্তকালের জীবন রয়েছে এবং সেখানে পৃথিবীর জীবনের যাবতীয় কিছুর হিসাব দিতে হবে- এ সকল বিষয় ছিলো মানুষের অজানা। অর্থাৎ মানুষ যা জানতো না তাই নবী করীম (সা:) মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন।
এ জন্যেই হাদীস শরীফে দেখা যায়, সাহাবায়ে কেরাম রাসূল (সাঃ)-এর কাছে জানতে চেয়েছেন- لِمَا بُعِثْتَ 'কী কারণে আপনার আগমন?' জবাবে তিনি জানিয়েছেন- بُعِثْتُ مُعَلِّمًا - 'আমি প্রেরিত হয়েছি শিক্ষক হিসাবে'।
মানুষের প্রয়োজনীয় সকল কিছুর শিক্ষক ছিলেন নবী করীম (সা:), এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُوْلًا مِّنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُوْ عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ ، وَإِنْ كَانُوْا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِيْنٍ
আল্লাহ অবশ্যই তাঁর ঈমানদার বান্দাদের ওপর এই অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের মাঝ থেকে একজন ব্যক্তিকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, যে তাদের কাছে আল্লাহর কিতাবের আয়াতসমূহ পড়ে শোনায় এবং (সে অনুযায়ী) সে তাদের জীবনকে পরিশুদ্ধ করে, (সর্বোপরি) সে (নবী) তাদের আল্লাহর কিতাব ও (তাঁর গ্রন্থলব্ধ) জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়, অথচ এরা সবাই ইতোপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিলো। (সূরা আলে ইমরান-১৬৪)
এ আয়াতে নবী করীম (সা:) কে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষাদাতা হিসাবে পরিচিতি দান করেছেন। দুর্ভাগ্য আমাদের, আমরা সকল বিষয়ের এই মহান শিক্ষককে 'ধর্মনেতা' পরিচয়ে আবদ্ধ রেখে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, সমাজনীতি, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষাগুরু হিসাবে গ্রহণ করেছি নীতি নৈতিকতাহীন উশৃংখল প্রকৃতির কিছু সংখ্যক বিভ্রান্ত মানুষকে। ধর্মীয় নীতিমালার সামান্য কিছু অংশ শেখার জন্যে আমরা নবী করীম (সা:) এর দিকে হাত প্রসারিত করি, আর জীবনের বিস্তীর্ণ অঙ্গনে অন্যান্য সকল নীতিমালা গ্রহণ করার জন্যে নবী করীম (সা:) এর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে স্বার্থান্বেষী চরিত্রহীন ধুরন্ধর বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত লোকদের প্রতি মুখাপেক্ষী হই।
নবী করীম (সা:) ব্যতীত অভ্রান্ত, নির্ভুল ও প্রকৃত সত্য জ্ঞান, সিদ্ধান্ত এবং কৌশল অন্য কোনো মানুষ কখনোই দিতে পারে না এবং সেটা কোনো মানুষের জানাও নেই, এ বিষয়টি মহান আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন এভাবে যে, 'তিনি এসব বিষয়ে মানবজাতিকে অবগত করানোর পূর্বে তারা স্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিলো'। আরেক আয়াতে বিষয়টি আল্লাহ তা'য়ালা এভাবে বলছেন-
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الأُمِّيِّنَ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيْهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ ، وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُّبِيْنٍ
তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি (একটি) সাধারণ জনগোষ্ঠীর মাঝে থেকে তাদেরই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, যে তাদের আল্লাহর আয়াতসমূহ পড়ে শোনাবে, তাদের জীবনকে পবিত্র করবে, তাদের (আমার) গ্রন্থের (কথা ও সে অনুযায়ী পৃথিবীতে চলার) কৌশল শিক্ষা দিবে, অথচ এ লোকগুলোই (রাসূল আসার) আগে (পর্যন্ত) এক সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিলো। (সূরা আল জুমুয়া-২)
মানুষ তার নিজের সত্তার দিক দিয়েই একটি জগৎ বিশেষ। তার এই জগতের মধ্যে অসংখ্য শক্তি, যোগ্যতা ও কর্ম-ক্ষমতা বিদ্যমান। তার এই জগতের মধ্যে জাগ্রত রয়েছে কামনা-বাসনা, লোভ-লালসা, আবেগানুভূতি, ভাবাবেগ, ঝোঁক-প্রবণতা, কাম, ক্রোধ, জেদ, হঠকারিতা, হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি। মানুষের দেহ ও মনের রয়েছে অসংখ্য দাবি। মানুষের আত্মা, প্রাণ ও স্বভাবের রয়েছে সীমাহীন জিজ্ঞাসা। প্রতিনিয়ত তার মধ্যে অসংখ্য প্রশ্নমালা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব প্রশ্নের জবাব লাভের জন্য সে অস্থির হয়ে ওঠে। এটাই হলো মানুষের জটিল অবস্থা।
এই জটিল অবস্থাসম্পন্ন মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে যে মানব সমাজ গড়ে ওঠে, সে সমাজও নানা ধরনের জটিল সম্পর্কের ভিত্তিতেই গঠিত হয়। মানব সমাজ অসীম ও অসংখ্য জটিল সমস্যার সমন্বয়ের ভিত্তিতেই গঠিত হয়েছে। সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ লাভের সাথে সাথে এসব জটিলতা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি লাভ করতে থাকে।
এসব সমস্যা ছাড়াও পৃথিবীতে মানুষের জীবন ধারণের জন্য যে প্রয়োজনীয় সামগ্রী মানুষের চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, তা ব্যবহার করা এবং মানবীয় সংস্কৃতিতে তা ব্যবহার উপযোগী করে প্রয়োগ করার প্রশ্নেও মানুষের ভেতরে ব্যক্তিগত ও সামগ্রিকভাবে অসংখ্য জটিলতার সৃষ্টি করে। মানুষ তার নিজের দুর্বলতার কারণেই তার সমগ্র জীবনের বিস্তীর্ণ অঙ্গনে একই সময়ে পূর্ণ ও সামঞ্জস্য এবং ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারে না। এ কারণে মানুষ নিজের জন্য জীবনের এমন কোন পথ স্বয়ং সে নিজেই রচনা করতে পারে না, যে পথ নির্ভুল হতে পারে।
এ কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতিটি মানুষের ভেতরেই একটি জগৎ রয়েছে এবং সে জগৎ অসংখ্য জটিল বিষয় সমন্বিত, অসংখ্য শক্তি-সামর্থ সে জগতে ক্রিয়াশীল রয়েছে। সুতরাং মানুষ স্বয়ং যে বিধি-বিধান, মত-পথ রচনা করবে, সে বিধান স্বয়ং মানুষের অন্তর্নিহিত যাবতীয় শক্তি-সামর্থের সাথে পূর্ণ ইনসাফ করবে, তার সমস্ত কামনা-বাসনার সাথে প্রকৃত অধিকার বুঝিয়ে দিবে, তার আবেগ-উচ্ছ্বাস ও প্রবণতার সাথে ভারসাম্যমূলক আচরণ করবে, তার দেহের ভেতরের ও দেহের বাইরের যাবতীয় প্রয়োজন সঠিকভাবে পূরণ করবে, তার সমগ্র জীবনের যাবতীয় সমস্যার দিকে পরিপূর্ণভাবে দৃষ্টি দিয়ে সেসব কিছুর এক সুষম ও সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধান বের করবে এবং বাস্তব জিনিসগুলোও ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক জীবনে সুবিচার, ইনসাফ ও সত্যনিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যবহার করবে, এসব কোনো কিছুই মানুষের পক্ষে কক্ষনো সম্ভব হবে না।
প্রকৃতপক্ষে মানুষ স্বয়ং যখন নিজের পথ-প্রদর্শক, আইন-কানুন, বিধান রচয়িতার ভূমিকা পালন করে, তখন নিগূঢ় সত্যের অসংখ্য দিকের মধ্য থেকে কোনো একটি দিক, জীবনের অসংখ্য প্রয়োজনের মধ্য থেকে কোনো একটি প্রয়োজন, সমাধানযোগ্য সমস্যাবলীর কোনো একটি সমস্যা তার চেতনার জগতে এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে যে, মানুষ ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক- অন্যান্য দিক ও প্রয়োজন এবং সমস্যাগুলোর ব্যাপারে সে দৃষ্টি দিতে সক্ষম হয় না।
কারণ তার চেতনার জগৎ তো আচ্ছন্ন হয়ে থাকে বিশেষ একটি সমস্যাকে কেন্দ্র করে। এভাবে বিশেষ মানুষের ওপরে বিশেষ কোনো মত বা আদর্শ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে চাপিয়ে দেয়ার কারণে জীবনের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে সামঞ্জস্যহীনতার এক চরম পর্যায়ের দিকে তা বক্র গতিতে চলতে থাকে।
মানব জীবনের এই চলার বাঁকা গতি যখন শেষ স্তরে গিয়ে উপনীত হয় তখন মানুষের জন্য তা অসহ্যকর হয়ে জীবনের যেসব দিক, প্রয়োজন ও সমস্যার দিকে ইতোপূর্বে দৃষ্টি দেয়া হয়নি, সেসব দিক তরিৎ গতিতে বিদ্রোহ করে এবং সেসব প্রয়োজন পূরণ করতে বলে, সমস্যাগুলো সমাধানের দাবি করতে থাকে। কিন্তু তখন আর মানুষের পক্ষে সেসব প্রয়োজন পূরণ করা ও সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব হয় না। কারণ পূর্বানুরূপ সামঞ্জস্যহীন কর্মনীতি পুনরায় চলতে থাকে।
পূর্বে যেসব সমস্যা সমাধান ও প্রয়োজনগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়নি, সামঞ্জস্যহীন কর্মনীতির ফলে মানুষের যেসব দাবি ও আবেগ-উচ্ছ্বাসকে ভয়-ভীতি ও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করে রাখা হয়েছিল, তা পুনরায় মানুষের ওপর প্রচণ্ড গতিতে আধিপত্য বিস্তার করে এবং তাকে নিজের বিশেষ দাবি অনুযায়ী বিশেষ একটি লক্ষ্যের দিকে গতিবান করে তোলার চেষ্টা করে।
এ সময় অন্যান্য দিক, প্রয়োজন ও সমস্যাগুলোর সাথে পূর্বের ন্যায় আচরণই করতে থাকে। এর অনিবার্য ফলশ্রুতিতে মানুষের জীবন কখনো সঠিক, সত্য, সহজ-সরল পথে একনিষ্ঠভাবে চলার মতো পরিবেশ লাভ করে না। সমস্যার সাগরে নিমজ্জিত হয়ে সে ক্রমশঃ ডুবে যেতে থাকে। একটি ধ্বংস গহ্বর থেকে কোনক্রমে সে উঠতে সক্ষম হলেও ছুটতে গিয়ে অন্য আরেকটি ধ্বংস গহ্বরে সে আছড়ে পড়ে। মানুষ এমনি চারিত্রিক বৈশিষ্টে পরিপূর্ণ এক জীব যে, কোনো কাজ করতে গেলে সর্বপ্রথম তাকে নির্ধারণ করে নিতে হয় তার কাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। অন্য কোনো জীবের ন্যায় এ মানুষ লক্ষ্যহীন কাজ করতে পারে না আর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে গেলেই তার সামনে প্রশ্ন দেখা দেয় যে, কোন্ আদর্শের ওপর ভিত্তি করে, কোন্ আদর্শের দেয়া নিয়ম অনুযায়ী সে তার কাজগুলো সম্পাদন করবে।
মানুষের নিজের রচনা করা কোনো মতবাদ মানুষকে আদর্শের সন্ধান দেয় না বিধায় মানুষ চরম হতাশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। মানব চরিত্র এমনি যে, কোনো মতবাদ যখন মানুষকে আদর্শহীন অবস্থায় পৃথিবীতে ছেড়ে দেয় তখন স্বাভাবিক কারণেই মানুষের জীবনে নেমে আসে সীমাহীন শূন্যতা।
পক্ষান্তরে আদর্শহীন অবস্থায় চিন্তা ও চেতনার শূন্যতা নিয়ে, মানুষ জীবন ধারণ করতে পারে না বলে জীবন যাত্রা নির্বাহের জন্য আদর্শের সন্ধানে মানুষ অস্থির হয়ে ওঠে। ফলে চিন্তা ও চেতনার জগতের শূন্যতা পূরণ করার জন্য তার সামনে বিচিত্র ও মানব চিন্তার বিপরীতমুখী আদর্শের সমাবেশ ঘটতে থাকে। এ অবস্থায় মানুষের যে কি করুণ পরিণতি ঘটে তা একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হতে পারে।
কোনো একজন মানুষের অনেকগুলো বন্ধু ছিলো। বন্ধুদের মধ্যে কেউ শুকনো কাঠ ব্যবসায়ী, কেউ তুলা ব্যবসায়ী, কেউ কাপড় ব্যবসায়ী, কেউ পেট্রোল ব্যবসায়ী, কেউ কেরোসিন তৈল ব্যবসায়ী, কেউ খড় ব্যবসায়ী, কেউ ছিলো কাগজ ব্যবসায়ী। হঠাৎ একদিন দেখা গেলো, গভীর রজনীতে ঐ অনেকগুলো বন্ধুর অধিকারী ব্যক্তিটির আপন বাসগৃহে আগুন লেগেছে। তখন ঐ ব্যক্তি চিৎকার করে তার বন্ধুদের কাছে সাহায্য চেয়ে বলছে, 'আমার এই চরম বিপদের মুহূর্তে তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে এসে আমাকে সাহায্য করো'।
লোকটির এই করুণ আর্তনাদে সাড়া দিয়ে তার সকল বন্ধুরা ছুটে এলো। কাঠ ব্যবসায়ী বন্ধু প্রচুর কাঠসহ ছুটে এসে অগুনের ভেতরে তা ছুড়ে দিলো। কাপড় ব্যবসায়ী বন্ধু কতকগুলো কাপড়ের থান এনে তা আগুনের ভেতরে ছুড়ে মারলো। খড় ব্যবসায়ী বন্ধু কয়েক বোঝা খড় এনে তা আগুনের ভেতরে ছুড়ে দিল। এভাবে কাগজ ব্যবসায়ী বন্ধু কাগজ, পেট্রোল ব্যবসায়ী বন্ধু পেট্রোল, কেরোসিন ব্যবসায়ী বন্ধু কেরোসিন আগুনের ভেতরে ছুড়ে দিলো। ফল যা হবার তাই হলো। আগুন নির্বাপিত হবার পরিবর্তে আরো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। সকল বন্ধুর কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল বিপদগ্রস্ত বন্ধুকে সাহায্য করা অর্থাৎ বন্ধুর ঘরের আগুন নিভিয়ে ফেলা। পক্ষান্তরে বিপদগ্রস্ত বন্ধুর জন্য এই লোকগুলো যা করলো তাতে করে বিপদগ্রস্ত বন্ধুর বিপদ বৃদ্ধি বৈ কমলো না।
প্রকৃতপক্ষে মানুষ নিজের জন্য যত আদর্শ, মতবাদ-মতাদর্শ রচনা করেছে তা সবই আঁকা-বাঁকা, উঁচু-নীচু বলে প্রতিভাত হয়েছে। ভুল দিক থেকে তার গতি শুরু হয় এবং ভুল দিকেই তা উপনীত হয়ে সমাপ্তি লাভ করে এবং সেখান থেকে পুনরায় অন্য কোনো ভুল পথের দিকেই অগ্রসর হতে থাকে। এসব অসংখ্য বাঁকা ও ভ্রান্ত পথের ঠিক মাঝামাঝি অবস্থানে অবস্থিত এমন একটি পথ একান্তই আবশ্যক। যেন মানুষের সমস্ত শক্তি ও কামনা-বাসনার প্রতি, ভালোবাসা, মায়া-মমতা, স্নেহ, প্রেম-প্রীতি ও আবেগ-উচ্ছ্বাসের প্রতি, মানুষের আত্মা ও শারীরিক দাবির প্রতি এবং জীবনের যাবতীয় সমস্যার প্রতি যথাযথ-ন্যায়-নিষ্ঠ আচরণ করা, যে আচরণে কোনো ধরনের বক্রতা ও জটিলতা থাকবে না, বিশেষ কোনো দিকের প্রতি অযথা গুরুত্ব আরোপ ও অন্যান্য দিকগুলোর প্রতি অবিচার ও জুলুম করা হবে না।
বস্তুত মানব জীবনের সুষ্ঠু ও সঠিক বিকাশ এবং তার সাফল্য ও সার্থকতা লাভের জন্য এটা একান্তভাবে অপরিহার্য। মানুষের মূল প্রকৃতিই এই সত্য-সঠিক পথ তথা সিরাতুল মুস্তাকিম লাভের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। পৃথিবীর কোনো অমুসলিম বা ইসলাম বিদ্বেষী চিন্তানায়ক এ কথার প্রতি স্বীকৃতি দিক আর না-ই দিক, এ কথা অকাট্য সত্য যে, অসংখ্য বাঁকা-চোরাপথ, ভ্রান্তপথ থেকে বারবার বিদ্রোহ ঘোষণার মূল কারণ হলো, মানব প্রকৃতি সিরাতুল মুস্তাকিম তথা সহজ-সরল পথের সন্ধানেই ছুটতে থাকে।
পক্ষান্তরে এ কথা সর্বজনবিদিত ও অকাট্য সত্য যে, মানুষ স্বয়ং মুক্তির এই রাজপথ আবিষ্কার করতে ও চিনতে সক্ষম হয় না এবং সিরাতুল মুস্তাকিম রচনা করতে পারে না-শুধুমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই সিরাতুল মুস্তাকিম রচনা করার মতো জ্ঞানের অধিকারী এবং তিনিই তা রচনা করতে সক্ষম। ঠিক এই উদ্দেশ্যসাধন করার জন্যেই আল্লাহ তা'য়ালা নবী-রাসূল প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁদের আন্দোলন-সংগ্রামের একমাত্র লক্ষ্য ছিল, মানুষকে মুক্তির রাজপথে নিয়ে আসা তথা আল্লাহর গোলামীর পথ, 'সিরাতুল মুস্তাকিম' কোনটি তা প্রদর্শন করা।
আল্লাহর কুরআন এই মহামুক্তির মহান পথ সিরাতুল মুস্তাকিমকে 'সাওয়া আস-সাবীল' নামেও মানুষের সামনে পেশ করেছে। পৃথিবীর এই নশ্বর জীবন থেকে শুরু করে আলমে আখিরাতের দ্বিতীয় পর্যায়ের জীবন পর্যন্ত অসংখ্য বাঁকা-চোরা এবং অন্ধকারে আচ্ছন্ন পথের মাঝখান দিয়ে সিরাতুল মুস্তাকিম বা মহামুক্তির মহান পথ সরল রেখার মতোই আল্লাহর জান্নাতের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। সুতরাং এই পথের যিনি পথিক হবেন, তিনি এই পৃথিবীতে নির্ভুল-অভ্রান্ত পথের পথিক হবেন এবং আলমে আখিরাতের জীবনে পরিপূর্ণভাবে সার্থক ও সাফল্যমণ্ডিত হবেন।
আর যে ব্যক্তি এই পৃথিবীতে সিরাতুল মুস্তাকিমের অভ্রান্ত পথ চিনতে ব্যর্থ হবে বা হারিয়ে ফেলবে সে ব্যক্তি এই পৃথিবীতেও বিভ্রান্ত, পথভ্রষ্ট ও ভুল পথের যাত্রী আর আলমে আখিরাতে তাকে অনিবার্যরূপে জাহান্নামে প্রবেশ করতে হবে। কারণ সিরাতুল মুস্তাকিম বা সাওয়া-আস সাবীল ব্যতিত অন্য সকল বাঁকা পথের শেষ প্রান্ত আল্লাহ তা'য়ালার সৃষ্টি জাহান্নাম পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে।
বস্তুবাদ আর জড়বাদের ওপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত একশ্রেণীর চিন্তানায়কগণ বর্তমান মানুষের জীবনকে ক্রমাগতভাবে একটি প্রান্ত থেকে বিপরীত দিকের আরেকটি প্রান্তে গিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হতে দেখে এই ভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, দ্বান্দ্বিক কার্যক্রম (Dialectical process) মানুষের জীবনের ক্রমবিকাশের স্বাভাবিক স্বভাবসম্মত পথ। এসব চিন্তাবিদগণ নিজেদের অজ্ঞতার কারণে বুঝে নিয়েছেন যে, প্রথমে এক চরমপন্থী দাবী (Thesis) মানুষকে একদিকের শেষ প্রান্তে নিয়ে যাবে, ঠিক অনুরূপভাবে সে ঐ প্রান্ত থেকে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আরেকটি চরমপন্থী দাবী (Antithesis) তাকে বিপরীত দিকের শেষ প্রান্তে নিয়ে পৌঁছাবে। এভাবে উভয় প্রান্তের আঘাতের সংমিশ্রণে মানুষের জন্য তার জীবন বিকাশের পথ (Synthesis) স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেরিয়ে আসবে আর এটাই হচ্ছে মানুষের ক্রমবিকাশ লাভের একমাত্র অভ্রান্ত পথ।
ভোগবাদে বিশ্বাসী এসব জড়বাদীদের আবিষ্কার করা ক্রমবিকাশ লাভের এই পথকে ক্রমবিকাশ লাভের পথ না বলে চপেটাঘাত খাওয়ার পথ বললে অত্যুক্তি হবে না। কারণ মানুষের জীবনের সঠিক বিকাশের পথে এই পথ বারংবার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, মানব জীবন বিকাশের পথে এ পথ অর্গল তুলে দেয়। প্রতিটি চরমপন্থী দাবী মানুষের জীবনকে তার কোনো একটি দিকে ঘুরিয়ে দেয় ও তাকে কঠিনভাবে টেনে নিয়ে যায়। এভাবে বিভ্রান্তির ঘূর্ণাবর্তে আবর্তিত হতে হতে যখন সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে তা অনেক দূরে চলে যায়, তখন স্বয়ং জীবনেরই অন্যান্য যেসব সমস্যার প্রতি কোনো গুরুত্ব প্রদান করা বা সমস্যাগুলোর সমাধান করা হয়নি, তা বিদ্রোহ শুরু করে।
এভাবে একটির পর একটি দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে, মানুষের জীবন থেকে শান্তি সুদূর পরাহত হয়ে যায়। এই অন্ধদের দৃষ্টি সিরাতুল মুস্তাকিমের দিকে যেতে বাধা দেয় তাদের সীমাহীন ভোগ বিলাস। এ জন্য তারা দেখতে পায় না, সিরাতুল মুস্তাকিমই হলো মানব জীবনের ক্রমবিকাশ লাভের একমাত্র সত্য-সঠিক পথ। আর বিশ্বনবী (সা:) এই সিরাতুল মুস্তাকিমের পথটিই মানব জাতিকে প্রদর্শন করেছেন এবং এ উদ্দেশ্যেই তাঁকে প্রেরণ করা হয়ছিলো। এই বিস্তারিত আলোচনায় নবী করীম (সা:) কে প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, পৃথিবীতে জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে সঠিক পথ ও পদ্ধতি সম্পর্কে মানুষ সম্পূর্ণ অজ্ঞ। শান্তি, শৃংখলা, উন্নতি, সমৃদ্ধি, প্রগতি সম্পর্কে মানুষ সম্পূর্ণরূপে অন্ধকারে এবং পরস্পর বিরোধী ভ্রান্ত চিন্তাধারায় তাড়িত ছিলো। অন্ধকারের কৃষ্ণ গহ্বর থেকে বের করে আলোর জগতে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যেই মহান আল্লাহ একান্ত অনুগ্রহ করে নবী করীম (সা:) কে অতুলনীয় মর্যাদা দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন।
পৃথিবীতে এটি বাস্তব সত্য যে, কোনো আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে সে আদর্শের ভিত্তিতে একটি সুসংগঠিত দল বা সংস্থা গঠন করতে হয়। সে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থাকে। সমগ্র দেশে থাকে স্থানীয় কার্যালয়। কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন সময় যে সকল নির্দেশ ঐ স্থানীয় কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয় তা ঐ আদর্শের অনুসারী নেতা-কর্মীগণ বাস্তবায়ন করে থাকেন। তেমনি মুসলিম একটি মিল্লাতের নাম এবং এ মিল্লাতের আদর্শ ইসলাম। এই মিল্লাতের জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:)।
আল্লাহ তা'য়ালার নির্দেশে তিনি এই মিল্লাতের জন্য একটি কেন্দ্র নির্মাণ করলেন। কেননা, এই মিল্লাতের যিনি বিশ্বনেতা তাঁর আগমনের সময় সমাগত। হযরত ইবরাহীম (আ:) ও তাঁর আগমনের জন্য আল্লাহ তা'য়ালার কাছে এভাবে দোয়া করলেন-
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ . وَيُزَكِّيهِمْ طَ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
হে আমাদের মালিক! তাদের (বংশের) মধ্যে তাদের নিজেদের মাঝ থেকে তুমি (এমন) একজন রাসূল পাঠাও, যে তাদের কাছে তোমার আয়াতসমূহ পড়ে শোনাবে, তাদের তোমার কিতাবের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দিবে, উপরন্তু সে তাদের পবিত্র করে দিবে, কারণ তুমিই মহাপরাক্রমশালী ও পরম কুশলী। (সূরা বাকারা-১২৯)
সুতরাং ইবরাহীম (আ:) যে ঘর পুনঃনির্মাণ করলেন তা কোনো সাধারণ ঘর ছিল না। এই ঘর প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একটিই ছিল, সমগ্র বিশ্বে আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এখান থেকেই পরিচালিত হবে, এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখেই হযরত ইসমাঈল (আ:) ও তাঁর মা'কে জনমানবহীন এই প্রান্তরে রেখে যাওয়া হয়েছিল, ইসমাঈল (আ:) এর কুরবানীও ছিল ঐ একই উদ্দেশ্যে এবং কা'বার নির্মাণও ছিল ঐ একই লক্ষ্যে।
সমগ্র পৃথিবীতে যারা তাওহীদের মশাল বহন করবে, তারা যেন প্রতি বছরে একবার হজ্জ নামক বিশ্ব সম্মেলনে এসে সমবেত হয়, একত্রে সমস্বরে এক আল্লাহর দাসত্বের ঘোষণা বজ্রকণ্ঠে দিতে পারে, পারস্পরিক পরিচিতি লাভ করতে পারে, একে অপরের সমস্যা সম্পর্কে অবগত হয়ে তা সমাধানের বাস্তব পন্থা অবলম্বন করতে পারে, আল্লাহ বিরোধী শক্তির মুকাবিলা কিভাবে করা যায় এবং সমগ্র পৃথিবীতে কিভাবে এক আল্লাহ তা'য়ালার বিধান প্রতিষ্ঠা করা যায়-এ সকল কার্যক্রম গ্রহণ করার লক্ষ্যেই সেদিন কা'বা নির্মাণ করে আল্লাহর নবী হযরত ইবরাহীম (আ:) বিশ্বনবী তথা বিশ্বনেতাকে প্রেরণের দোয়া করেছিলেন এবং সাধারণ মানুষকে সে ঘরের দিকে আহ্বান জানিয়ে ছিলেন।
পবিত্র কুরআনের অনেক স্থানেই কা'বাঘর সম্পর্কে মহান আল্লাহ এই ঘর বানানোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে সম্পর্কে বলেছেন, 'এই ঘর হিদায়াতের কেন্দ্র, এখান থেকেই একত্ববাদের বাণী সমগ্র পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে'। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) এর দোয়ার প্রতি লক্ষ্য করলে কতকগুলো বিষয় আমাদের সম্মুখে স্পষ্ট হয়ে যায়।
১. এমন এক ব্যক্তিত্বকে বিশ্বনবী বা বিশ্বনেতা হিসাবে প্রেরণ করা হোক, যিনি মানবমণ্ডলীরই একজন। অর্থাৎ মানুষের বাইরের কোনো সত্তা নয়। মানুষের সকল ইচ্ছা, আকাক্সখা, কামনা-বাসনা, ব্যথা-বেদনা, মায়া-মমতা তথা সকল অনুভূতি হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে সক্ষম কেবলমাত্র মানুষই। এ জন্যেই মানুষের মধ্য থেকেই বিশ্বনেতাকে নির্বাচিত করার আবেদন করা হয়েছিলো।
২. তিনি মহান আল্লাহর সাথে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিবেন, সৃষ্টি হিসাবে স্রষ্টার প্রতি মানুষের দায়িত্ব-কর্তব্য কি তা বিশদভাবে মানুষকে জানিয়ে দিবেন এবং স্বয়ং আল্লাহই যে একমাত্র ইলাহ ও রব অর্থাৎ তিনিই আইনদাতা, বিধানদাতা এবং সকল বিষয়ের প্রতিপালক- এ বিষয়টিও মানুষের কাছে স্পষ্ট করে দিবেন।
৩. পৃথিবীতে মানুষ ভারসাম্যমূলক জীবন-যাপন করবে এবং এর জন্যে প্রয়োজনীয় যাবতীয় উপকরণ- যে সম্পর্কিত জ্ঞান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর কিতাবের মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন, এ সংক্রান্ত যাবতীয় জ্ঞান বিশ্বনবী তথা বিশ্বনেতা মানবজাতিকে শিক্ষা দিবেন। অর্থাৎ প্রগতির ফল্গুধারায় আপুত শোষণমুক্ত, শান্তিপূর্ণ জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ, বস্তুর কল্যাণকর কর্মে ব্যবহারকারী এবং উন্নত সভ্যতা-সংস্কৃতির অধিকারী দেশ, জাতি ও সমাজ বিনির্মাণে যা কিছু প্রয়োজন, তা কাংখিত বিশ্বনেতা শিক্ষা দিবেন।
৪. দোয়ায় বলা হয়েছিলো, 'এমন এক বিশ্বনেতা প্রেরণ করুন, যিনি মানুষকে পবিত্র করে দিবেন'।
যে আল্লাহ তা'য়ালা মানুষ সৃষ্টি করে তার যাবতীয় জীবনোপকরণ দিয়েছেন, সেই আল্লাহর দাসত্ব করার মধ্যেই মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নিহিত এবং মানুষ ক্রমশ মর্যাদার উচ্চ শিখরে আরোহণ করে। সম্মানের এমন এক পর্যায়ে এ মানুষ পৌঁছে যায় যে, যেখানে স্বয়ং ফিরিশতাও পৌঁছতে সক্ষম নয়। আবার এ মানুষ নিজের প্রকৃত মর্যাদা ও অবস্থান ভুলে আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে নিজের মহান মালিক আল্লাহকে ত্যাগ করে তার অনুরূপ আরেক সৃষ্টির, কোনো জড়পদার্থের বা নিজ হাতে গড়া কল্পিত কোনো শক্তির দাসত্ব করে, তখন সে মানুষের মর্যাদা শূন্যের কোঠা অতিক্রম করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীর প্রাপ্য মর্যাদাও হারিয়ে ফেলে। আর এ অবস্থায়ই একজন সম্মানিত মানুষের জন্য অপবিত্রতার মধ্যে নিমজ্জিত হওয়া বুঝায়।
যখন মানুষ তার প্রকৃত মর্যাদা সম্পর্কে উদাসীনতার পরিচয় দেয়, নিজের সম্মানকে অবহেলা করে আত্মমর্যাদা সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলে বলেই সে মানুষ তারই অনুরূপ আরেকজন মানুষকে নিজের বিধানদাতা, আইনদাতা, মুক্তিদাতা এবং যাবতীয় বিষয়ে সিদ্ধান্তদাতা হিসাবে বরণ করে। অথবা কোনো জড়পদার্থকে নিজের মনস্কামনা পূরণকারী হিসাবে বরণ করে বা নিজ হাতে গড়া কোনো কল্পিত বস্তুর দাসত্ব করে। তারই অনুরূপ সৃষ্টি আরেকজন মানুষ তাকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সমস্যার সমাধান দিবে এবং মানব সভ্যতা-সংস্কৃতির উপকরণ দিবে, যাবতীয় নীতিমালা রচনা করে দিবে আর সে তা অবলীলাক্রমে মেনে চলবে- এ ধরনের মর্যাদাহীনতার অপবিত্রতা থেকে সকল মানুষকে পবিত্র করবেন, 'এমন একজন বিশ্বনবী বা বিশ্বনেতা প্রেরণ করুন' এ দোয়াই হযরত ইবরাহীম (আ:) করেছিলেন।
মানুষের চিন্তাধারা, চেতনা, অভ্যাস, স্বভাব-চরিত্র, চলমান জীবনধারা, দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুন ও মতবাদ মতাদর্শকে ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত করে সকল কিছুকে পরিশুদ্ধ করবেন বিশ্বনবী (সা:) এ কামনাই মহান আল্লাহর কাছে করেছিলেন মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) এবং তাঁর পবিত্র এ দোয়ারই উত্তর স্বরূপ নবী করীম (সা:) প্রেরিত হয়েছেন। মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে ইবরাহীম (আ:) এর চাওয়ার সাথে সঙ্গতি রেখে বলছেন-
كَمَا أَرْسَلْنَا فِيكُمْ رَسُولاً مِّنْكُمْ يَتْلُوا عَلَيْكُمْ آيَاتِنَا وَيُزَكِّيْكُمْ وَيُعَلِّمُكُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُم مَّا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُوْنَ طَ
(এই সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্যেই) আমি এভাবে তোমাদের কাছে তোমাদের মাঝ থেকেই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছি, যে ব্যক্তি (প্রথমত) তোমাদের কাছে আমার 'আয়াত' পড়ে শোনাবে, (দ্বিতীয়ত) সে তোমাদের (জীবন) পরিশুদ্ধ করে দিবে এবং (তৃতীয়ত) সে তোমাদেরকে আমার কিতাব ও (তার অন্তর্নিহিত) জ্ঞান শিক্ষা দিবে, (সর্বোপরি) সে তোমাদের এমন বিষয়সমূহের জ্ঞান দান করবে, যা তোমরা কখনো জানতে না। (সূরা বাকারা-১৫১)
মানুষ নিজেকে কিভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র রাখবে, নিজের প্রতি, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, সমাজ, রাষ্ট্র ইত্যাদির প্রতি মানুষের দায়িত্ব- কর্তব্য কি, এসব বিষয় সম্পর্কে মানুষ ছিলো সম্পূর্ণ অন্ধকারে। মহাকাশের শূণ্য মার্গে, অগণিত গ্রহ-নক্ষত্রে, অদৃশ্য বায়ুমণ্ডলে এবং অন্যান্য স্তরে, শূণ্য মার্গের অদৃশ্য কৃষ্ণ গহ্বরে (Black hole), ওজন স্তরে, মহাশূন্যে ঘূর্ণয়মান পাথরের সাম্রাজ্যে, পাতালপুরীর কৃষ্ণ বিবরে, অগাধ জলধীর বিভিন্ন স্তরসহ অতল তলদেশে, মাটির তলদেশে খনিসমূহের স্তর অতিক্রম করে উত্তপ্ত গলিত লাভার স্তরে, পর্বতের সৃষ্টি কৌশল ও অবস্থানে, পণ্ডদলের মাঝে, অরোণ্যের ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে নবী- রাসূলগণই সর্বপ্রথম মানুষকে জ্ঞান দান করেছেন। শিক্ষা দিয়েছেন বস্তুর ব্যবহার। বিজ্ঞান যে সকল বিষয় বর্তমানে মানুষকে জানাচ্ছে, এসব বিষয় সম্পর্কে নবী করীম (সা:) পবিত্র কুরআনে সর্বপ্রথম মানুষকে অবগত করেছেন। বস্তুর ধ্বংস নেই, বস্তু অবিনাশী। মানুষেরও ধ্বংস নেই, ক্ষণস্থায়ী জীবন শেষে মৃত্যুর পরে আরেকটি অনন্তকালের জীবন রয়েছে এবং সেখানে পৃথিবীর জীবনের যাবতীয় কিছুর হিসাব দিতে হবে- এ সকল বিষয় ছিলো মানুষের অজানা। অর্থাৎ মানুষ যা জানতো না তাই নবী করীম (সা:) মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন।
এ জন্যেই হাদীস শরীফে দেখা যায়, সাহাবায়ে কেরাম রাসূল (সাঃ)-এর কাছে জানতে চেয়েছেন- لِمَا بُعِثْتَ 'কী কারণে আপনার আগমন?' জবাবে তিনি জানিয়েছেন- بُعِثْتُ مُعَلِّمًا - 'আমি প্রেরিত হয়েছি শিক্ষক হিসাবে'।
মানুষের প্রয়োজনীয় সকল কিছুর শিক্ষক ছিলেন নবী করীম (সা:), এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُوْلًا مِّنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُوْ عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ ، وَإِنْ كَانُوْا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِيْنٍ
আল্লাহ অবশ্যই তাঁর ঈমানদার বান্দাদের ওপর এই অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের মাঝ থেকে একজন ব্যক্তিকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, যে তাদের কাছে আল্লাহর কিতাবের আয়াতসমূহ পড়ে শোনায় এবং (সে অনুযায়ী) সে তাদের জীবনকে পরিশুদ্ধ করে, (সর্বোপরি) সে (নবী) তাদের আল্লাহর কিতাব ও (তাঁর গ্রন্থলব্ধ) জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়, অথচ এরা সবাই ইতোপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিলো। (সূরা আলে ইমরান-১৬৪)
এ আয়াতে নবী করীম (সা:) কে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষাদাতা হিসাবে পরিচিতি দান করেছেন। দুর্ভাগ্য আমাদের, আমরা সকল বিষয়ের এই মহান শিক্ষককে 'ধর্মনেতা' পরিচয়ে আবদ্ধ রেখে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, সমাজনীতি, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষাগুরু হিসাবে গ্রহণ করেছি নীতি নৈতিকতাহীন উশৃংখল প্রকৃতির কিছু সংখ্যক বিভ্রান্ত মানুষকে। ধর্মীয় নীতিমালার সামান্য কিছু অংশ শেখার জন্যে আমরা নবী করীম (সা:) এর দিকে হাত প্রসারিত করি, আর জীবনের বিস্তীর্ণ অঙ্গনে অন্যান্য সকল নীতিমালা গ্রহণ করার জন্যে নবী করীম (সা:) এর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে স্বার্থান্বেষী চরিত্রহীন ধুরন্ধর বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত লোকদের প্রতি মুখাপেক্ষী হই।
নবী করীম (সা:) ব্যতীত অভ্রান্ত, নির্ভুল ও প্রকৃত সত্য জ্ঞান, সিদ্ধান্ত এবং কৌশল অন্য কোনো মানুষ কখনোই দিতে পারে না এবং সেটা কোনো মানুষের জানাও নেই, এ বিষয়টি মহান আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন এভাবে যে, 'তিনি এসব বিষয়ে মানবজাতিকে অবগত করানোর পূর্বে তারা স্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিলো'। আরেক আয়াতে বিষয়টি আল্লাহ তা'য়ালা এভাবে বলছেন-
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الأُمِّيِّنَ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيْهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ ، وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُّبِيْنٍ
তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি (একটি) সাধারণ জনগোষ্ঠীর মাঝে থেকে তাদেরই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, যে তাদের আল্লাহর আয়াতসমূহ পড়ে শোনাবে, তাদের জীবনকে পবিত্র করবে, তাদের (আমার) গ্রন্থের (কথা ও সে অনুযায়ী পৃথিবীতে চলার) কৌশল শিক্ষা দিবে, অথচ এ লোকগুলোই (রাসূল আসার) আগে (পর্যন্ত) এক সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিলো। (সূরা আল জুমুয়া-২)
মানুষ তার নিজের সত্তার দিক দিয়েই একটি জগৎ বিশেষ। তার এই জগতের মধ্যে অসংখ্য শক্তি, যোগ্যতা ও কর্ম-ক্ষমতা বিদ্যমান। তার এই জগতের মধ্যে জাগ্রত রয়েছে কামনা-বাসনা, লোভ-লালসা, আবেগানুভূতি, ভাবাবেগ, ঝোঁক-প্রবণতা, কাম, ক্রোধ, জেদ, হঠকারিতা, হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি। মানুষের দেহ ও মনের রয়েছে অসংখ্য দাবি। মানুষের আত্মা, প্রাণ ও স্বভাবের রয়েছে সীমাহীন জিজ্ঞাসা। প্রতিনিয়ত তার মধ্যে অসংখ্য প্রশ্নমালা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব প্রশ্নের জবাব লাভের জন্য সে অস্থির হয়ে ওঠে। এটাই হলো মানুষের জটিল অবস্থা।
এই জটিল অবস্থাসম্পন্ন মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে যে মানব সমাজ গড়ে ওঠে, সে সমাজও নানা ধরনের জটিল সম্পর্কের ভিত্তিতেই গঠিত হয়। মানব সমাজ অসীম ও অসংখ্য জটিল সমস্যার সমন্বয়ের ভিত্তিতেই গঠিত হয়েছে। সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ লাভের সাথে সাথে এসব জটিলতা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি লাভ করতে থাকে।
এসব সমস্যা ছাড়াও পৃথিবীতে মানুষের জীবন ধারণের জন্য যে প্রয়োজনীয় সামগ্রী মানুষের চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, তা ব্যবহার করা এবং মানবীয় সংস্কৃতিতে তা ব্যবহার উপযোগী করে প্রয়োগ করার প্রশ্নেও মানুষের ভেতরে ব্যক্তিগত ও সামগ্রিকভাবে অসংখ্য জটিলতার সৃষ্টি করে। মানুষ তার নিজের দুর্বলতার কারণেই তার সমগ্র জীবনের বিস্তীর্ণ অঙ্গনে একই সময়ে পূর্ণ ও সামঞ্জস্য এবং ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারে না। এ কারণে মানুষ নিজের জন্য জীবনের এমন কোন পথ স্বয়ং সে নিজেই রচনা করতে পারে না, যে পথ নির্ভুল হতে পারে।
এ কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতিটি মানুষের ভেতরেই একটি জগৎ রয়েছে এবং সে জগৎ অসংখ্য জটিল বিষয় সমন্বিত, অসংখ্য শক্তি-সামর্থ সে জগতে ক্রিয়াশীল রয়েছে। সুতরাং মানুষ স্বয়ং যে বিধি-বিধান, মত-পথ রচনা করবে, সে বিধান স্বয়ং মানুষের অন্তর্নিহিত যাবতীয় শক্তি-সামর্থের সাথে পূর্ণ ইনসাফ করবে, তার সমস্ত কামনা-বাসনার সাথে প্রকৃত অধিকার বুঝিয়ে দিবে, তার আবেগ-উচ্ছ্বাস ও প্রবণতার সাথে ভারসাম্যমূলক আচরণ করবে, তার দেহের ভেতরের ও দেহের বাইরের যাবতীয় প্রয়োজন সঠিকভাবে পূরণ করবে, তার সমগ্র জীবনের যাবতীয় সমস্যার দিকে পরিপূর্ণভাবে দৃষ্টি দিয়ে সেসব কিছুর এক সুষম ও সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধান বের করবে এবং বাস্তব জিনিসগুলোও ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক জীবনে সুবিচার, ইনসাফ ও সত্যনিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যবহার করবে, এসব কোনো কিছুই মানুষের পক্ষে কক্ষনো সম্ভব হবে না।
প্রকৃতপক্ষে মানুষ স্বয়ং যখন নিজের পথ-প্রদর্শক, আইন-কানুন, বিধান রচয়িতার ভূমিকা পালন করে, তখন নিগূঢ় সত্যের অসংখ্য দিকের মধ্য থেকে কোনো একটি দিক, জীবনের অসংখ্য প্রয়োজনের মধ্য থেকে কোনো একটি প্রয়োজন, সমাধানযোগ্য সমস্যাবলীর কোনো একটি সমস্যা তার চেতনার জগতে এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে যে, মানুষ ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক- অন্যান্য দিক ও প্রয়োজন এবং সমস্যাগুলোর ব্যাপারে সে দৃষ্টি দিতে সক্ষম হয় না।
কারণ তার চেতনার জগৎ তো আচ্ছন্ন হয়ে থাকে বিশেষ একটি সমস্যাকে কেন্দ্র করে। এভাবে বিশেষ মানুষের ওপরে বিশেষ কোনো মত বা আদর্শ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে চাপিয়ে দেয়ার কারণে জীবনের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে সামঞ্জস্যহীনতার এক চরম পর্যায়ের দিকে তা বক্র গতিতে চলতে থাকে。
মানব জীবনের এই চলার বাঁকা গতি যখন শেষ স্তরে গিয়ে উপনীত হয় তখন মানুষের জন্য তা অসহ্যকর হয়ে জীবনের যেসব দিক, প্রয়োজন ও সমস্যার দিকে ইতোপূর্বে দৃষ্টি দেয়া হয়নি, সেসব দিক তরিৎ গতিতে বিদ্রোহ করে এবং সেসব প্রয়োজন পূরণ করতে বলে, সমস্যাগুলো সমাধানের দাবি করতে থাকে। কিন্তু তখন আর মানুষের পক্ষে সেসব প্রয়োজন পূরণ করা ও সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব হয় না। কারণ পূর্বানুরূপ সামঞ্জস্যহীন কর্মনীতি পুনরায় চলতে থাকে।
পূর্বে যেসব সমস্যা সমাধান ও প্রয়োজনগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়নি, সামঞ্জস্যহীন কর্মনীতির ফলে মানুষের যেসব দাবি ও আবেগ-উচ্ছ্বাসকে ভয়-ভীতি ও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করে রাখা হয়েছিল, তা পুনরায় মানুষের ওপর প্রচণ্ড গতিতে আধিপত্য বিস্তার করে এবং তাকে নিজের বিশেষ দাবি অনুযায়ী বিশেষ একটি লক্ষ্যের দিকে গতিবান করে তোলার চেষ্টা করে।
এ সময় অন্যান্য দিক, প্রয়োজন ও সমস্যাগুলোর সাথে পূর্বের ন্যায় আচরণই করতে থাকে। এর অনিবার্য ফলশ্রুতিতে মানুষের জীবন কখনো সঠিক, সত্য, সহজ-সরল পথে একনিষ্ঠভাবে চলার মতো পরিবেশ লাভ করে না। সমস্যার সাগরে নিমজ্জিত হয়ে সে ক্রমশঃ ডুবে যেতে থাকে। একটি ধ্বংস গহ্বর থেকে কোনক্রমে সে উঠতে সক্ষম হলেও ছুটতে গিয়ে অন্য আরেকটি ধ্বংস গহ্বরে সে আছড়ে পড়ে। মানুষ এমনি চারিত্রিক বৈশিষ্টে পরিপূর্ণ এক জীব যে, কোনো কাজ করতে গেলে সর্বপ্রথম তাকে নির্ধারণ করে নিতে হয় তার কাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। অন্য কোনো জীবের ন্যায় এ মানুষ লক্ষ্যহীন কাজ করতে পারে না আর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে গেলেই তার সামনে প্রশ্ন দেখা দেয় যে, কোন্ আদর্শের ওপর ভিত্তি করে, কোন্ আদর্শের দেয়া নিয়ম অনুযায়ী সে তার কাজগুলো সম্পাদন করবে।
মানুষের নিজের রচনা করা কোনো মতবাদ মানুষকে আদর্শের সন্ধান দেয় না বিধায় মানুষ চরম হতাশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। মানব চরিত্র এমনি যে, কোনো মতবাদ যখন মানুষকে আদর্শহীন অবস্থায় পৃথিবীতে ছেড়ে দেয় তখন স্বাভাবিক কারণেই মানুষের জীবনে নেমে আসে সীমাহীন শূন্যতা।
পক্ষান্তরে আদর্শহীন অবস্থায় চিন্তা ও চেতনার শূন্যতা নিয়ে, মানুষ জীবন ধারণ করতে পারে না বলে জীবন যাত্রা নির্বাহের জন্য আদর্শের সন্ধানে মানুষ অস্থির হয়ে ওঠে। ফলে চিন্তা ও চেতনার জগতের শূন্যতা পূরণ করার জন্য তার সামনে বিচিত্র ও মানব চিন্তার বিপরীতমুখী আদর্শের সমাবেশ ঘটতে থাকে। এ অবস্থায় মানুষের যে কি করুণ পরিণতি ঘটে তা একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হতে পারে।
কোনো একজন মানুষের অনেকগুলো বন্ধু ছিলো। বন্ধুদের মধ্যে কেউ শুকনো কাঠ ব্যবসায়ী, কেউ তুলা ব্যবসায়ী, কেউ কাপড় ব্যবসায়ী, কেউ পেট্রোল ব্যবসায়ী, কেউ কেরোসিন তৈল ব্যবসায়ী, কেউ খড় ব্যবসায়ী, কেউ ছিলো কাগজ ব্যবসায়ী। হঠাৎ একদিন দেখা গেলো, গভীর রজনীতে ঐ অনেকগুলো বন্ধুর অধিকারী ব্যক্তিটির আপন বাসগৃহে আগুন লেগেছে। তখন ঐ ব্যক্তি চিৎকার করে তার বন্ধুদের কাছে সাহায্য চেয়ে বলছে, 'আমার এই চরম বিপদের মুহূর্তে তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে এসে আমাকে সাহায্য করো'।
লোকটির এই করুণ আর্তনাদে সাড়া দিয়ে তার সকল বন্ধুরা ছুটে এলো। কাঠ ব্যবসায়ী বন্ধু প্রচুর কাঠসহ ছুটে এসে অগুনের ভেতরে তা ছুড়ে দিলো। কাপড় ব্যবসায়ী বন্ধু কতকগুলো কাপড়ের থান এনে তা আগুনের ভেতরে ছুড়ে মারলো। খড় ব্যবসায়ী বন্ধু কয়েক বোঝা খড় এনে তা আগুনের ভেতরে ছুড়ে দিল। এভাবে কাগজ ব্যবসায়ী বন্ধু কাগজ, পেট্রোল ব্যবসায়ী বন্ধু পেট্রোল, কেরোসিন ব্যবসায়ী বন্ধু কেরোসিন আগুনের ভেতরে ছুড়ে দিলো। ফল যা হবার তাই হলো। আগুন নির্বাপিত হবার পরিবর্তে আরো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। সকল বন্ধুর কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল বিপদগ্রস্ত বন্ধুকে সাহায্য করা অর্থাৎ বন্ধুর ঘরের আগুন নিভিয়ে ফেলা। পক্ষান্তরে বিপদগ্রস্ত বন্ধুর জন্য এই লোকগুলো যা করলো তাতে করে বিপদগ্রস্ত বন্ধুর বিপদ বৃদ্ধি বৈ কমলো না।
প্রকৃতপক্ষে মানুষ নিজের জন্য যত আদর্শ, মতবাদ-মতাদর্শ রচনা করেছে তা সবই আঁকা-বাঁকা, উঁচু-নীচু বলে প্রতিভাত হয়েছে। ভুল দিক থেকে তার গতি শুরু হয় এবং ভুল দিকেই তা উপনীত হয়ে সমাপ্তি লাভ করে এবং সেখান থেকে পুনরায় অন্য কোনো ভুল পথের দিকেই অগ্রসর হতে থাকে। এসব অসংখ্য বাঁকা ও ভ্রান্ত পথের ঠিক মাঝামাঝি অবস্থানে অবস্থিত এমন একটি পথ একান্তই আবশ্যক। যেন মানুষের সমস্ত শক্তি ও কামনা-বাসনার প্রতি, ভালোবাসা, মায়া-মমতা, স্নেহ, প্রেম-প্রীতি ও আবেগ-উচ্ছ্বাসের প্রতি, মানুষের আত্মা ও শারীরিক দাবির প্রতি এবং জীবনের যাবতীয় সমস্যার প্রতি যথাযথ-ন্যায়-নিষ্ঠ আচরণ করা, যে আচরণে কোনো ধরনের বক্রতা ও জটিলতা থাকবে না, বিশেষ কোনো দিকের প্রতি অযথা গুরুত্ব আরোপ ও অন্যান্য দিকগুলোর প্রতি অবিচার ও জুলুম করা হবে না।
বস্তুত মানব জীবনের সুষ্ঠু ও সঠিক বিকাশ এবং তার সাফল্য ও সার্থকতা লাভের জন্য এটা একান্তভাবে অপরিহার্য। মানুষের মূল প্রকৃতিই এই সত্য-সঠিক পথ তথা সিরাতুল মুস্তাকিম লাভের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। পৃথিবীর কোনো অমুসলিম বা ইসলাম বিদ্বেষী চিন্তানায়ক এ কথার প্রতি স্বীকৃতি দিক আর না-ই দিক, এ কথা অকাট্য সত্য যে, অসংখ্য বাঁকা-চোরাপথ, ভ্রান্তপথ থেকে বারবার বিদ্রোহ ঘোষণার মূল কারণ হলো, মানব প্রকৃতি সিরাতুল মুস্তাকিম তথা সহজ-সরল পথের সন্ধানেই ছুটতে থাকে।
পক্ষান্তরে এ কথা সর্বজনবিদিত ও অকাট্য সত্য যে, মানুষ স্বয়ং মুক্তির এই রাজপথ আবিষ্কার করতে ও চিনতে সক্ষম হয় না এবং সিরাতুল মুস্তাকিম রচনা করতে পারে না-শুধুমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই সিরাতুল মুস্তাকিম রচনা করার মতো জ্ঞানের অধিকারী এবং তিনিই তা রচনা করতে সক্ষম। ঠিক এই উদ্দেশ্যসাধন করার জন্যেই আল্লাহ তা'য়ালা নবী-রাসূল প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁদের আন্দোলন-সংগ্রামের একমাত্র লক্ষ্য ছিল, মানুষকে মুক্তির রাজপথে নিয়ে আসা তথা আল্লাহর গোলামীর পথ, 'সিরাতুল মুস্তাকিম' কোনটি তা প্রদর্শন করা।
আল্লাহর কুরআন এই মহামুক্তির মহান পথ সিরাতুল মুস্তাকিমকে 'সাওয়া আস-সাবীল' নামেও মানুষের সামনে পেশ করেছে। পৃথিবীর এই নশ্বর জীবন থেকে শুরু করে আলমে আখিরাতের দ্বিতীয় পর্যায়ের জীবন পর্যন্ত অসংখ্য বাঁকা-চোরা এবং অন্ধকারে আচ্ছন্ন পথের মাঝখান দিয়ে সিরাতুল মুস্তাকিম বা মহামুক্তির মহান পথ সরল রেখার মতোই আল্লাহর জান্নাতের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। সুতরাং এই পথের যিনি পথিক হবেন, তিনি এই পৃথিবীতে নির্ভুল-অভ্রান্ত পথের পথিক হবেন এবং আলমে আখিরাতের জীবনে পরিপূর্ণভাবে সার্থক ও সাফল্যমণ্ডিত হবেন।
আর যে ব্যক্তি এই পৃথিবীতে সিরাতুল মুস্তাকিমের অভ্রান্ত পথ চিনতে ব্যর্থ হবে বা হারিয়ে ফেলবে সে ব্যক্তি এই পৃথিবীতেও বিভ্রান্ত, পথভ্রষ্ট ও ভুল পথের যাত্রী আর আলমে আখিরাতে তাকে অনিবার্যরূপে জাহান্নামে প্রবেশ করতে হবে। কারণ সিরাতুল মুস্তাকিম বা সাওয়া-আস সাবীল ব্যতিত অন্য সকল বাঁকা পথের শেষ প্রান্ত আল্লাহ তা'য়ালার সৃষ্টি জাহান্নাম পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে।
বস্তুবাদ আর জড়বাদের ওপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত একশ্রেণীর চিন্তানায়কগণ বর্তমান মানুষের জীবনকে ক্রমাগতভাবে একটি প্রান্ত থেকে বিপরীত দিকের আরেকটি প্রান্তে গিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হতে দেখে এই ভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, দ্বান্দ্বিক কার্যক্রম (Dialectical process) মানুষের জীবনের ক্রমবিকাশের স্বাভাবিক স্বভাবসম্মত পথ। এসব চিন্তাবিদগণ নিজেদের অজ্ঞতার কারণে বুঝে নিয়েছেন যে, প্রথমে এক চরমপন্থী দাবী (Thesis) মানুষকে একদিকের শেষ প্রান্তে নিয়ে যাবে, ঠিক অনুরূপভাবে সে ঐ প্রান্ত থেকে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আরেকটি চরমপন্থী দাবী (Antithesis) তাকে বিপরীত দিকের শেষ প্রান্তে নিয়ে পৌঁছাবে। এভাবে উভয় প্রান্তের আঘাতের সংমিশ্রণে মানুষের জন্য তার জীবন বিকাশের পথ (Synthesis) স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেরিয়ে আসবে আর এটাই হচ্ছে মানুষের ক্রমবিকাশ লাভের একমাত্র অভ্রান্ত পথ।
ভোগবাদে বিশ্বাসী এসব জড়বাদীদের আবিষ্কার করা ক্রমবিকাশ লাভের এই পথকে ক্রমবিকাশ লাভের পথ না বলে চপেটাঘাত খাওয়ার পথ বললে অত্যুক্তি হবে না। কারণ মানুষের জীবনের সঠিক বিকাশের পথে এই পথ বারংবার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, মানব জীবন বিকাশের পথে এ পথ অর্গল তুলে দেয়। প্রতিটি চরমপন্থী দাবী মানুষের জীবনকে তার কোনো একটি দিকে ঘুরিয়ে দেয় ও তাকে কঠিনভাবে টেনে নিয়ে যায়। এভাবে বিভ্রান্তির ঘূর্ণাবর্তে আবর্তিত হতে হতে যখন সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে তা অনেক দূরে চলে যায়, তখন স্বয়ং জীবনেরই অন্যান্য যেসব সমস্যার প্রতি কোনো গুরুত্ব প্রদান করা বা সমস্যাগুলোর সমাধান করা হয়নি, তা বিদ্রোহ শুরু করে।
এভাবে একটির পর একটি দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে, মানুষের জীবন থেকে শান্তি সুদূর পরাহত হয়ে যায়। এই অন্ধদের দৃষ্টি সিরাতুল মুস্তাকিমের দিকে যেতে বাধা দেয় তাদের সীমাহীন ভোগ বিলাস। এ জন্য তারা দেখতে পায় না, সিরাতুল মুস্তাকিমই হলো মানব জীবনের ক্রমবিকাশ লাভের একমাত্র সত্য-সঠিক পথ। আর বিশ্বনবী (সা:) এই সিরাতুল মুস্তাকিমের পথটিই মানব জাতিকে প্রদর্শন করেছেন এবং এ উদ্দেশ্যেই তাঁকে প্রেরণ করা হয়ছিলো। এই বিস্তারিত আলোচনায় নবী করীম (সা:) কে প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, পৃথিবীতে জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে সঠিক পথ ও পদ্ধতি সম্পর্কে মানুষ সম্পূর্ণ অজ্ঞ। শান্তি, শৃংখলা, উন্নতি, সমৃদ্ধি, প্রগতি সম্পর্কে মানুষ সম্পূর্ণরূপে অন্ধকারে এবং পরস্পর বিরোধী ভ্রান্ত চিন্তাধারায় তাড়িত ছিলো। অন্ধকারের কৃষ্ণ গহ্বর থেকে বের করে আলোর জগতে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যেই মহান আল্লাহ একান্ত অনুগ্রহ করে নবী করীম (সা:) কে অতুলনীয় মর্যাদা দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন।
📄 মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে নবী করীম (সা:) এর উচ্চ মর্যাদা
ইতোপূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি, ব্যক্তির অনন্য অসাধারণ যোগ্যতা, দক্ষতা, কর্ম সম্পাদন এবং ব্যাপক পরিধিতে দায়িত্ব পালন ইত্যাদির কারণেই ব্যক্তি মর্যাদার আসনে আসীন হয় এবং এটাই পৃথিবীতে প্রচলিত সাধারণ নিয়ম। অনন্য সাধারণ গুরুত্বের কারণে পৃথিবীতে কতিপয় স্থানও মানুষের কাছে মর্যাদাকর স্থান বলে বিবেচিত হয়। এসব স্থানে যাতায়াত করাও মানুষ আভিজাত্যের প্রতীক ও সম্মানজনক বলে মনে করে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও স্থাপনাসমূহ, শাসকবৃন্দের বাসভবন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মিলনায়তন ও দ্রব্যাদি ক্রয়ের বিপনীসমূহ, অবকাশ যাপন কেন্দ্র, চিত্তবিনোদনের স্থানসমূহ, ব্যয়বহুল হোটেলসমূহ ইত্যাদি মানুষের কাছে বিশেষ মর্যাদাকর স্থান বলে বিবেচিত হয়।
ব্যক্তির অবস্থান ভেদেও কতিপয় ব্যক্তি সাধারণ মানুষের কাছে সম্মানিত ব্যক্তি বলে বিবেচিত। এসব ব্যক্তিবর্গের সাথে কথা বলা, সান্নিধ্যে যাওয়া, সম্পর্ক রাখা ও একত্রে ছবি তোলাও সাধারণ মানুষ মর্যাদাকর কাজ বলে মনে করে। এসব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ধরনের বিষয় হলো, সম্মানিত ব্যক্তি ও মর্যাদাবান স্থান নির্বাচনে মানুষ মূখ্য ভূমিকা পালন করে এবং নির্বাচকদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন ঘটলে সম্মানিত ব্যক্তিকে আস্তা কুড়োয় নিক্ষেপ করে এবং মর্যাদাবান স্থানও নিকৃষ্ট স্থানে পরিণত হয়।
কোনো ব্যক্তি বা স্থানকে মর্যাদা প্রদান করা না করার ক্ষেত্রেও মানুষ দ্বিধা-বিভক্ত এবং মনোনয়ন সিদ্ধান্তে ঐক্য থাকে না। যেমন প্রাকৃতিক আশ্চর্যজনক বিষয় বা স্থান নির্বাচনে মানুষের মধ্যে ব্যাপক মত-পার্থক্য রয়েছে, এ বিষয়টি সুরাহা করার জন্যে বর্তমানে অনলাইনে ভোটের ব্যবস্থা করে সংখ্যা গরিষ্ঠের সমর্থনকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা, জ্ঞান-বিবেক, বুদ্ধি-প্রজ্ঞা, অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিবর্গ কোনো ব্যক্তি বা স্থানকে যখন মর্যাদা দেয় তখন, সাধারণ মানুষ ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক সে স্থান বা ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং এটাই সাধারণ মানুষের রীতি। মানুষের ক্ষেত্রে যদি এই রীতি-নীতি অনুসৃত হয়ে থাকে, তাহলে সকল বিষয়ে যিনি একক ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী এবং সমগ্র সৃষ্টিসমূহের যিনি স্রষ্টা ও প্রতিপালক এবং নিয়ন্ত্রক, সেই মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁরই সৃষ্টি কতিপয় ব্যক্তিবর্গ, স্থান ও সময়কে যখন সর্বাধিক মর্যাদাবান বলে ঘোষণা করেন, সেই মর্যাদার গুরুত্ব ও উচ্চতা কতটা বিশাল তা মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোন্ ব্যক্তিকে সর্বাধিক মর্যাদা দিবেন এবং কোন্ স্থান ও সময়কে মর্যাদায় ভূষিত করবেন, এ ব্যাপারে নিরঙ্কুশ একক ক্ষমতা কেবলমাত্র তাঁরই। কতিপয় ব্যক্তিবর্গ, স্থান ও সময়কে মর্যাদাকর মনে করা এবং সম্মান প্রদর্শন করা মানুষের 'সৃষ্টিগত স্বভাব। আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের স্বভাব- প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে কতিপয় ব্যক্তি, স্থান ও সময়কে সর্বাধিক সম্মানিত বলে ঘোষণা করেছেন। মহান আল্লাহ এ পৃথিবীতে কতক স্থানকে বিশেষত্ব প্রদান করে সর্বাধিক মর্যাদায় ভূষিত করেছেন।
যেমন মক্কা ও মদীনা নগরীকে মহান আল্লাহ অনন্য সাধারণ বিশেষত্ব দিয়ে মর্যাদা প্রদান করেছেন। এ দু'টো স্থান সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা কর্তৃক সর্বাধিক মর্যাদায় ভূষিত স্থান। আবার এ দু'টো স্থানের মধ্যেও এমন কতকগুলো বিশেষ স্থান রয়েছে, যেগুলো আরো অধিক মর্যাদা লাভ করেছে। যেমন এ দুটো স্থানের মসজিদ- মসজিদুল হারাম এবং মসজিদে নববী। মক্কায় বায়তুল্লাহ্ শরীফ, এর সাথে সংশ্লিষ্ট হাজরে আসওয়াদ, এর দরজা যার নাম মুলতাজিম, বায়তুল্লাহর উত্তর দিকের স্থান যার নাম হাতিম, মীজাবে রহমত অর্থাৎ বৃষ্টি বর্ষণকালে বায়তুল্লাহর ছাদ থেকে যে স্থান থেকে বৃষ্টির পানি ঝরে, পশ্চিম- দক্ষিণ কোণে রুকুনে ইয়ামানী, পূর্ব পাশে মাক্কামে ইবরাহীম, কা'বা শরীফের চার দিকে যে স্থান দিয়ে তাওয়াফ করা হয়, এর নাম মাতাফ এবং ফিলিস্তীনে অবস্থিত মসজিদুল আক্কসা।
পবিত্র মদীনা নগরীর সম্মানিত এলাকা, মসজিদে নববী, পবিত্র রওজা মুবারক, রিয়াজুল জান্নাত, পবিত্র মিম্বার শরীফ, মসজিদে কুবা, জাবালে ওহুদ বা ওহুদ পাহাড়, দারুস সালামসহ ইত্যাদি স্থান। মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা কয়েকটি দিন, কিছু সময় ও মাসকেও সর্বাধিক মর্যাদায় ভূষিত করে বিশেষত্ব দান করেছেন। যেমন মাসের মধ্যে সর্বাধিক মার্যাদাবান মাস রামাদান, এই রামাদান মাসের শেষ দশদিনের মধ্যে নিহিত রয়েছে সেই কদরের রাত- যে রাতকে মহান আল্লাহ অগণিত রাতের তুলনায় সর্বাধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন। পবিত্র জুমুয়ার দিন এবং এ জুমুয়ার দিনে আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত বিশেষ এক সময়কে। এ জুমুয়ার দিনে এমন কতক মুহূর্ত রয়েছে যখন দোয়া কবুল করা হয়ে থাকে। আশুরার দিন, হজ্বের মৌসুমে আরাফার দিন, যিলহজ্ব মাসের দশদিন এবং প্রতি রাতের তৃতীয়াংশ অর্থাৎ শেষ রাতের মর্যাদা অধিক। হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, রাতের শেষ অংশে মহান আল্লাহ একান্ত অনুগ্রহ করে প্রথম আকাশে অবতরণ করে বান্দাদের নানা সমস্যার কথা উল্লেখপূর্বক আহ্বান করে একমাত্র তাঁরই কাছে আবেদন জানাতে বলেন।
মহান আল্লাহ যা কিছুই সৃষ্টি করেছেন, এ সকল সৃষ্টির মধ্যে একমাত্র মানুষকেই তিনি সর্বাধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন। আবার এ মানুষের মধ্য থেকে নির্বাচিত নবীগণকে অধিক মর্যাদা দান করেছেন। নবীগণের মধ্য থেকে যাঁরা রাসূল নির্বাচিত হয়েছেন তাঁদের মর্যাদা আরো অধিক। আবার নবী-রাসূলদের মধ্য থেকে মহান আল্লাহ কতক নবী-রাসূলকে বিশেষত্ব প্রদানপূর্বক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন এবং আরবী ভাষায় যাঁদেরকে 'উলুল আযম' বলা হয়।
নবী-রাসূলদের মধ্যে 'উলুল আযম' বৈশিষ্ট্যমন্ডিত অধিকারীদের মধ্যে কেবলমাত্র নবী করীম (সা:) কে বিশেষত্ব প্রদানপূর্বক সর্বাধিক মর্যাদায় অলংকৃত করেছেন। আবার ঠিক এ কারনেই অন্যান্য নবী-রাসূলের অনুসারীদের তুলনায় নবী করীম (সা:) এর অনুসারী তথা মুসলিম মিল্লাতকে বিশেষত্ব দিয়ে মর্যাদা প্রদান করেছেন। আবার মানবজাতির প্রথম প্রজন্ম ও পরের প্রজন্মের মধ্যে মুসলিম মিল্লাতকে বিশেষ বৈশিষ্টের অধিকারী নির্বাচিত করেছেন। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ এভাবে বর্ণনা করেছেন-
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلاً
আমি অবশ্যই আদম সন্তানদের মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে আমি ওদের চলাচলের বাহন দিয়েছি এবং তাদের পবিত্র (জিনিসসমূহ দিয়ে) আমি রিফ্ট দান করেছি, অতপর আমি অন্য যতো কিছু সৃষ্টি করেছি তার অধিকাংশের ওপরই আমি তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। (সূরা বনী ইসরাঈল-৭০)
আবার এ আদম সন্তান তথা মানুষের মধ্যে নবী হিসাবে নির্বাচিত করে যাঁদেরকে নবুয়্যাত দান করা হয়েছে, তাঁদের মর্যাদা মানুষদের মধ্যে সর্বাধিক। হযরত ইবরাহীম (আ:) এর প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَقَ وَيَعْقُوْبَ ط كُلاً هَدَيْنَاج وَنُوْحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ دَاودَ وَسُلَيْمَانَ وَأَيُّوْبَ وَيُوْسُفَ وَمُوسَى وَهَارُوْنَ طَ وَكَذَلِكَ نَجْزِى الْمُحْسِنِينَ وَزَكَرِيَّا وَيَحْى وَعِيسَى وَإِلْيَاسَ ط كُلٌّ مِّنَ الصَّالِحِيْنَ وَإِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوْطًا طَ وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ
অত:পর আমি তাকে দান করেছি ইসহাক ও ইয়াকুব (এর মতো দুই জন সুপুত্র); এদের সবাইকেই আমি সঠিক পথের দিশা দিয়েছিলাম, (এদের) আগে আমি নূহকেও হিদায়াতের পথ দেখিয়েছি, অত:পর তার বংশের মাঝে দাউদ, সুলাইমান, আইয়ুব, ইফসুফ, মূসা এবং হারুনকেও (আমি হিদায়াত দান করেছি); আর এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কার দিয়ে থাকি। যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা এবং ইলইয়াসকেও (আছি সঠিক পথ দেখিয়েছিলাম); এরা সবাই ছিলো নেককারদের দলভুক্ত। (আরো পথ দেখিয়েছিলাম) ইসমাঈল, ইয়াসা, ইউনুস এবং লুতকেও; এদের সবাইকে আমি (নবুয়্যাত দিয়ে) সৃষ্টিকুলের ওপর বিশেষ মর্যাদা দান করেছি। (সূরা আল আনয়াম-৮৪-৮৬)
অপরদিকে নবীদের মধ্যেও কতক নবীকে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী বানানো হয়েছে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّنَ عَلَى بَعْضٍ - আমি একেকজন নবীকে একেকজনের ওপর মর্যাদা দান করেছি। (সূরা বনী ইসরাঈল-৫৫)
বিশেষভাবে রাসূল মনোনীত করা প্রসঙ্গে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- اللَّهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلَائِكَةِ رُسُلاً وَمِنَ النَّاسِ طَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيْعُم بَصِيْرٌج আল্লাহ তা'য়ালা (তাঁর ওহী বহন করার জন্যে) ফিরিশতাদের মধ্য থেকে বাণীবাহক মনোনীত করেন, মানুষদের ভেতর থেকেও তিনি রাসূল মনোনীত করেন। অবশ্যই আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও সবকিছু দেখেন। (সূরা হজ্ব-৭৫)
রাসূলদের মধ্যেও একের ওপর আরেকজনকে মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِّنْهُم مَّنْ كَلَّمَ اللَّهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ ط এই (যে) নবী-রাসূলরা (রয়েছে), এদের কাউকে কারো ওপর আমি বেশি মর্যাদা দান করেছি। এদের মধ্যে এমনও (কেউ) ছিলো যাদের সাথে আল্লাহ তা'য়ালা কথা বলেছেন এবং (এর মাধ্যমে) কারো মার্যাদা তিনি বাড়িয়ে দিয়েছেন। (সূরা বাকারা-২৫৩)
সকল নবী-রাসূলের মধ্যে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী করীম (সা:) কে অনন্য বৈশিষ্ট্য প্রদানপূর্বক সর্বাধিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। মহান মালিক আল্লাহর দৃষ্টিতে তাঁর মতো ব্যক্তিত্বের মর্যাদা আলোচনা করা অত্যন্ত কঠিন বিষয়। বিশেষ সীমাবদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী মানুষের পক্ষে তা নিতান্তই দূরহ বিষয়। তবে পবিত্র কুরআন-হাদীসে এ সম্পর্কে যতোটুকু আলোচনা করা হয়েছে, তার কিছু অংশ আমরা এ গ্রন্থে তুলে ধরবো ইন্শাআল্লাহ।
ইতোপূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি, ব্যক্তির অনন্য অসাধারণ যোগ্যতা, দক্ষতা, কর্ম সম্পাদন এবং ব্যাপক পরিধিতে দায়িত্ব পালন ইত্যাদির কারণেই ব্যক্তি মর্যাদার আসনে আসীন হয় এবং এটাই পৃথিবীতে প্রচলিত সাধারণ নিয়ম। অনন্য সাধারণ গুরুত্বের কারণে পৃথিবীতে কতিপয় স্থানও মানুষের কাছে মর্যাদাকর স্থান বলে বিবেচিত হয়। এসব স্থানে যাতায়াত করাও মানুষ আভিজাত্যের প্রতীক ও সম্মানজনক বলে মনে করে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও স্থাপনাসমূহ, শাসকবৃন্দের বাসভবন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মিলনায়তন ও দ্রব্যাদি ক্রয়ের বিপনীসমূহ, অবকাশ যাপন কেন্দ্র, চিত্তবিনোদনের স্থানসমূহ, ব্যয়বহুল হোটেলসমূহ ইত্যাদি মানুষের কাছে বিশেষ মর্যাদাকর স্থান বলে বিবেচিত হয়।
ব্যক্তির অবস্থান ভেদেও কতিপয় ব্যক্তি সাধারণ মানুষের কাছে সম্মানিত ব্যক্তি বলে বিবেচিত। এসব ব্যক্তিবর্গের সাথে কথা বলা, সান্নিধ্যে যাওয়া, সম্পর্ক রাখা ও একত্রে ছবি তোলাও সাধারণ মানুষ মর্যাদাকর কাজ বলে মনে করে। এসব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ধরনের বিষয় হলো, সম্মানিত ব্যক্তি ও মর্যাদাবান স্থান নির্বাচনে মানুষ মূখ্য ভূমিকা পালন করে এবং নির্বাচকদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন ঘটলে সম্মানিত ব্যক্তিকে আস্তা কুড়োয় নিক্ষেপ করে এবং মর্যাদাবান স্থানও নিকৃষ্ট স্থানে পরিণত হয়।
কোনো ব্যক্তি বা স্থানকে মর্যাদা প্রদান করা না করার ক্ষেত্রেও মানুষ দ্বিধা-বিভক্ত এবং মনোনয়ন সিদ্ধান্তে ঐক্য থাকে না। যেমন প্রাকৃতিক আশ্চর্যজনক বিষয় বা স্থান নির্বাচনে মানুষের মধ্যে ব্যাপক মত-পার্থক্য রয়েছে, এ বিষয়টি সুরাহা করার জন্যে বর্তমানে অনলাইনে ভোটের ব্যবস্থা করে সংখ্যা গরিষ্ঠের সমর্থনকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা, জ্ঞান-বিবেক, বুদ্ধি-প্রজ্ঞা, অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিবর্গ কোনো ব্যক্তি বা স্থানকে যখন মর্যাদা দেয় তখন, সাধারণ মানুষ ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক সে স্থান বা ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং এটাই সাধারণ মানুষের রীতি। মানুষের ক্ষেত্রে যদি এই রীতি-নীতি অনুসৃত হয়ে থাকে, তাহলে সকল বিষয়ে যিনি একক ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী এবং সমগ্র সৃষ্টিসমূহের যিনি স্রষ্টা ও প্রতিপালক এবং নিয়ন্ত্রক, সেই মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁরই সৃষ্টি কতিপয় ব্যক্তিবর্গ, স্থান ও সময়কে যখন সর্বাধিক মর্যাদাবান বলে ঘোষণা করেন, সেই মর্যাদার গুরুত্ব ও উচ্চতা কতটা বিশাল তা মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোন্ ব্যক্তিকে সর্বাধিক মর্যাদা দিবেন এবং কোন্ স্থান ও সময়কে মর্যাদায় ভূষিত করবেন, এ ব্যাপারে নিরঙ্কুশ একক ক্ষমতা কেবলমাত্র তাঁরই। কতিপয় ব্যক্তিবর্গ, স্থান ও সময়কে মর্যাদাকর মনে করা এবং সম্মান প্রদর্শন করা মানুষের 'সৃষ্টিগত স্বভাব। আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের স্বভাব-প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে কতিপয় ব্যক্তি, স্থান ও সময়কে সর্বাধিক সম্মানিত বলে ঘোষণা করেছেন। মহান আল্লাহ এ পৃথিবীতে কতক স্থানকে বিশেষত্ব প্রদান করে সর্বাধিক মর্যাদায় ভূষিত করেছেন।
যেমন মক্কা ও মদীনা নগরীকে মহান আল্লাহ অনন্য সাধারণ বিশেষত্ব দিয়ে মর্যাদা প্রদান করেছেন। এ দু'টো স্থান সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা কর্তৃক সর্বাধিক মর্যাদায় ভূষিত স্থান। আবার এ দু'টো স্থানের মধ্যেও এমন কতকগুলো বিশেষ স্থান রয়েছে, যেগুলো আরো অধিক মর্যাদা লাভ করেছে। যেমন এ দুটো স্থানের মসজিদ- মসজিদুল হারাম এবং মসজিদে নববী। মক্কায় বায়তুল্লাহ্ শরীফ, এর সাথে সংশ্লিষ্ট হাজরে আসওয়াদ, এর দরজা যার নাম মুলতাজিম, বায়তুল্লাহর উত্তর দিকের স্থান যার নাম হাতিম, মীজাবে রহমত অর্থাৎ বৃষ্টি বর্ষণকালে বায়তুল্লাহর ছাদ থেকে যে স্থান থেকে বৃষ্টির পানি ঝরে, পশ্চিম- দক্ষিণ কোণে রুকুনে ইয়ামানী, পূর্ব পাশে মাক্কামে ইবরাহীম, কা'বা শরীফের চার দিকে যে স্থান দিয়ে তাওয়াফ করা হয়, এর নাম মাতাফ এবং ফিলিস্তীনে অবস্থিত মসজিদুল আক্কসা।
পবিত্র মদীনা নগরীর সম্মানিত এলাকা, মসজিদে নববী, পবিত্র রওজা মুবারক, রিয়াজুল জান্নাত, পবিত্র মিম্বার শরীফ, মসজিদে কুবা, জাবালে ওহুদ বা ওহুদ পাহাড়, দারুস সালামসহ ইত্যাদি স্থান। মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা কয়েকটি দিন, কিছু সময় ও মাসকেও সর্বাধিক মর্যাদায় ভূষিত করে বিশেষত্ব দান করেছেন। যেমন মাসের মধ্যে সর্বাধিক মার্যাদাবান মাস রামাদান, এই রামাদান মাসের শেষ দশদিনের মধ্যে নিহিত রয়েছে সেই কদরের রাত- যে রাতকে মহান আল্লাহ অগণিত রাতের তুলনায় সর্বাধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন। পবিত্র জুমুয়ার দিন এবং এ জুমুয়ার দিনে আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত বিশেষ এক সময়কে। এ জুমুয়ার দিনে এমন কতক মুহূর্ত রয়েছে যখন দোয়া কবুল করা হয়ে থাকে। আশুরার দিন, হজ্বের মৌসুমে আরাফার দিন, যিলহজ্ব মাসের দশদিন এবং প্রতি রাতের তৃতীয়াংশ অর্থাৎ শেষ রাতের মর্যাদা অধিক। হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, রাতের শেষ অংশে মহান আল্লাহ একান্ত অনুগ্রহ করে প্রথম আকাশে অবতরণ করে বান্দাদের নানা সমস্যার কথা উল্লেখপূর্বক আহ্বান করে একমাত্র তাঁরই কাছে আবেদন জানাতে বলেন।
মহান আল্লাহ যা কিছুই সৃষ্টি করেছেন, এ সকল সৃষ্টির মধ্যে একমাত্র মানুষকেই তিনি সর্বাধিক মর্যাদা প্রদান করেছেন। আবার এ মানুষের মধ্য থেকে নির্বাচিত নবীগণকে অধিক মর্যাদা দান করেছেন। নবীগণের মধ্য থেকে যাঁরা রাসূল নির্বাচিত হয়েছেন তাঁদের মর্যাদা আরো অধিক। আবার নবী-রাসূলদের মধ্য থেকে মহান আল্লাহ কতক নবী-রাসূলকে বিশেষত্ব প্রদানপূর্বক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন এবং আরবী ভাষায় যাঁদেরকে 'উলুল আযম' বলা হয়।
নবী-রাসূলদের মধ্যে 'উলুল আযম' বৈশিষ্ট্যমন্ডিত অধিকারীদের মধ্যে কেবলমাত্র নবী করীম (সা:) কে বিশেষত্ব প্রদানপূর্বক সর্বাধিক মর্যাদায় অলংকৃত করেছেন। আবার ঠিক এ কারনেই অন্যান্য নবী-রাসূলের অনুসারীদের তুলনায় নবী করীম (সা:) এর অনুসারী তথা মুসলিম মিল্লাতকে বিশেষত্ব দিয়ে মর্যাদা প্রদান করেছেন। আবার মানবজাতির প্রথম প্রজন্ম ও পরের প্রজন্মের মধ্যে মুসলিম মিল্লাতকে বিশেষ বৈশিষ্টের অধিকারী নির্বাচিত করেছেন। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ এভাবে বর্ণনা করেছেন-
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلاً
আমি অবশ্যই আদম সন্তানদের মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে আমি ওদের চলাচলের বাহন দিয়েছি এবং তাদের পবিত্র (জিনিসসমূহ দিয়ে) আমি রিফ্ট দান করেছি, অতপর আমি অন্য যতো কিছু সৃষ্টি করেছি তার অধিকাংশের ওপরই আমি তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। (সূরা বনী ইসরাঈল-৭০)
আবার এ আদম সন্তান তথা মানুষের মধ্যে নবী হিসাবে নির্বাচিত করে যাঁদেরকে নবুয়্যাত দান করা হয়েছে, তাঁদের মর্যাদা মানুষদের মধ্যে সর্বাধিক। হযরত ইবরাহীম (আ:) এর প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَقَ وَيَعْقُوْبَ ط كُلاً هَدَيْنَاج وَنُوْحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ دَاودَ وَسُلَيْمَانَ وَأَيُّوْبَ وَيُوْسُفَ وَمُوسَى وَهَارُوْنَ طَ وَكَذَلِكَ نَجْزِى الْمُحْسِنِينَ وَزَكَرِيَّا وَيَحْى وَعِيسَى وَإِلْيَاسَ ط كُلٌّ مِّنَ الصَّالِحِيْنَ وَإِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوْطًا طَ وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ
অত:পর আমি তাকে দান করেছি ইসহাক ও ইয়াকুব (এর মতো দুই জন সুপুত্র); এদের সবাইকেই আমি সঠিক পথের দিশা দিয়েছিলাম, (এদের) আগে আমি নূহকেও হিদায়াতের পথ দেখিয়েছি, অত:পর তার বংশের মাঝে দাউদ, সুলাইমান, আইয়ুব, ইফসুফ, মূসা এবং হারুনকেও (আমি হিদায়াত দান করেছি); আর এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কার দিয়ে থাকি। যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা এবং ইলইয়াসকেও (আছি সঠিক পথ দেখিয়েছিলাম); এরা সবাই ছিলো নেককারদের দলভুক্ত। (আরো পথ দেখিয়েছিলাম) ইসমাঈল, ইয়াসা, ইউনুস এবং লুতকেও; এদের সবাইকে আমি (নবুয়্যাত দিয়ে) সৃষ্টিকুলের ওপর বিশেষ মর্যাদা দান করেছি। (সূরা আল আনয়াম-৮৪-৮৬)
অপরদিকে নবীদের মধ্যেও কতক নবীকে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী বানানো হয়েছে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّنَ عَلَى بَعْضٍ - আমি একেকজন নবীকে একেকজনের ওপর মর্যাদা দান করেছি। (সূরা বনী ইসরাঈল-৫৫)
বিশেষভাবে রাসূল মনোনীত করা প্রসঙ্গে মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- اللَّهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلَائِكَةِ رُسُلاً وَمِنَ النَّاسِ طَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيْعُم بَصِيْرٌج আল্লাহ তা'য়ালা (তাঁর ওহী বহন করার জন্যে) ফিরিশতাদের মধ্য থেকে বাণীবাহক মনোনীত করেন, মানুষদের ভেতর থেকেও তিনি রাসূল মনোনীত করেন। অবশ্যই আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও সবকিছু দেখেন। (সূরা হজ্ব-৭৫)
রাসূলদের মধ্যেও একের ওপর আরেকজনকে মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন- تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِّنْهُم مَّنْ كَلَّمَ اللَّهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ ط এই (যে) নবী-রাসূলরা (রয়েছে), এদের কাউকে কারো ওপর আমি বেশি মর্যাদা দান করেছি। এদের মধ্যে এমনও (কেউ) ছিলো যাদের সাথে আল্লাহ তা'য়ালা কথা বলেছেন এবং (এর মাধ্যমে) কারো মার্যাদা তিনি বাড়িয়ে দিয়েছেন। (সূরা বাকারা-২৫৩)
সকল নবী-রাসূলের মধ্যে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী করীম (সা:) কে অনন্য বৈশিষ্ট্য প্রদানপূর্বক সর্বাধিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। মহান মালিক আল্লাহর দৃষ্টিতে তাঁর মতো ব্যক্তিত্বের মর্যাদা আলোচনা করা অত্যন্ত কঠিন বিষয়। বিশেষ সীমাবদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী মানুষের পক্ষে তা নিতান্তই দূরহ বিষয়। তবে পবিত্র কুরআন-হাদীসে এ সম্পর্কে যতোটুকু আলোচনা করা হয়েছে, তার কিছু অংশ আমরা এ গ্রন্থে তুলে ধরবো ইন্শাআল্লাহ।
📄 নবী করীম (সা:) আল্লাহ তা'য়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ বান্দাহ্
পবিত্র কুরআনে তিনটি শব্দ একাধিক স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি শব্দ 'মা'বুদ' দ্বিতীয়টি 'আব্দ' আর তৃতীয়টি হলো 'ইবাদাহ্' বা ইবাদাত। 'মা'বুদ' শব্দের অর্থ হলো মুনিব, মালিক, যিনি পূজা আরাধনা লাভের যোগ্য, যার কাছে আবেদন পেশ করা হয় বা যাঁর দাসত্ব করা হয় ইত্যাদি। 'আব্দ' শব্দের অর্থ হলো, যে দাসত্ব করে, চাকর, গোলাম, দাস, কারো আদেশে যে ব্যক্তি সকল কর্ম সম্পাদন করে ইত্যাদি। আর 'ইবাদাহ্ বা ইবাদাত' শব্দের অর্থ হলো, দাসত্ব করা, গোলামী করা, আদেশকৃত কর্ম সম্পাদন করা, দায়িত্ব পালন করা, মুনিবের নির্দেশে চাকর যে দায়িত্ব পালন করে বা মুনিব কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব সন্তুষ্ট চিত্তে পালন করা অথবা প্রতিপালককে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে তাঁর নির্দেশ অনুসারে সম্পাদিত কর্ম সমষ্টি। অর্থাৎ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হলেন সমগ্র সৃষ্টির মা'বুদ বা মুনিব, সৃষ্টি হলো তাঁর দাস বা আব্দ এবং স্রষ্টার নির্দেশে সৃষ্টি যে কর্ম সম্পাদন করে সে কর্মই হলো ইবাদাত।
প্রশ্ন হলো, পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) এর ক্ষেত্রে যে 'আব্দ' শব্দ ব্যবহার করেছেন তা কোন্ অর্থে ব্যবহার করেছেন?
এ প্রশ্নের জবাব কিছুটা ব্যাখ্যার দাবী রাখে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা স্বয়ং 'ইলাহ্' এবং সমগ্র সৃষ্টিলোকের তিনিই একমাত্র ইলাহ্। তাঁর উলুহিয়াত সমগ্র সৃষ্টিব্যাপী বিস্তৃত এবং তা কোথাও সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর উলুহিয়াতে কারো সামান্যতম অংশ নেই, তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই, কেউ ইচ্ছে করলে তাঁর উলুহিয়াতের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশও দাবী করতে পারে না। কেউ দাবী করলেও তা কার্যকর করার ন্যূনতম ক্ষমতাও দাবীকারী প্রয়োগ করতে সক্ষম নয়। আল্লাহ তা'য়ালা এমন এক অদ্বিতীয় ইলাহ্- যিনি তাঁর উলুহিয়াত যেমনভাবে এবং যখন খুশী তা প্রয়োগ করে থাকেন। তাঁর অনুমতি ব্যতীত কেউ তাঁর কাছে কোনো সুপারিশও করতে পারে না বা উলুহিয়াত প্রয়োগের ক্ষেত্রে কেউ তাঁকে প্রশ্ন করার কোনো অবকাশও পায় না। সকল কিছুর ক্ষেত্রে একমাত্র তিনিই নিরঙ্কুশ উলুহিয়াত প্রয়োগকারী এবং তাঁর সমপর্যায়ের কোনো কিছুর অস্তিত্ব সমগ্র সৃষ্টিলোকে নেই।
মহান আল্লাহ তা'য়ালা যখন তাঁর সৃষ্টি কোনো মানুষকে 'আমার আব্দ বা বান্দাহ্' বলে পরিচয় দেন তখন তা সাধারণ কোনো অর্থে ব্যবহৃত হয় না। অথবা আল্লাহর ব্যবহৃত 'আব্দ' শব্দ থেকে সাধারণ কোনো অর্থ গ্রহণ করা যায় না বা সাধারণ মানুষকে যে অর্থে 'আব্দ বা বান্দাহ্' বলা হয় সে অর্থেও তা প্রয়োগ হয় না। স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা যাঁকে 'আমার আব্দ বা বান্দাহ' বলে পরিচয় দেন তখন সে বান্দাহ্ বা আব্দ-এর 'আবদিয়্যাত'-ও অদ্বিতীয় তুলনাহীন হয়ে যায়।
মহান আল্লাহ তা'য়ালা যখন তাঁর কোনো বান্দাহকে 'আমার বান্দাহ্ বা আব্দ' বলে সমগ্র সৃষ্টির কাছে পরিচয় করিয়ে দেন, তখন বুঝতে হয় সে বান্দাহ্ 'আদিয়্যাত' এর সকল স্তর অতিক্রম করে মা'বুদ বা মহান মুনিবের সান্নিধ্যে নিজের অবস্থান করে নিয়েছেন। নবী করীম (সা:) মহান আল্লাহ তা'য়ালার সেই একক ও অদ্বিতীয় তুলনাহীন 'আব্দ' যিনি 'আদিয়্যাত' এর সকল সোপান অতিক্রম করে মহান মা'বুদ আল্লাহ তা'য়ালার সান্নিধ্যে পৌঁছে গিয়েছেন। 'আদিয়্যাত' এর পূর্ণতার সকল স্তর অতিক্রম করে তিনি আল্লাহ তা'য়ালার সান্নিধ্যে উপনীত হয়েছেন- যেখানে সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে তিনিই এক, অদ্বিতীয় ও তাঁর সমকক্ষ কেউই অতীতে ছিলেন না, বর্তমানেও নেই এবং ভবিষ্যতেও উক্ত স্তর কেউ অতিক্রম করতে সক্ষম হবে না।
পবিত্র কুরআন হলো সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টা মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার আদেশ নিষেধ, পছন্দ অপছন্দ ও অন্যান্য নিয়ম পদ্ধতির সমষ্টি এবং এটি একটি অতি মর্যাদাবান কিতাব। আর নবী করীম (সা:) হলেন এ কিতাবের বাহক এবং জীবন্ত কুরআন। তিনি ছিলেন চলমান কুরআন এবং এরই বাস্তব প্রতিচ্ছবি। হযরত আয়িশা (রা:) এর কাছে কেউ কেউ জানতে চেয়েছিলেন, 'আল্লাহর রাসূলের জীবনধারা সম্পর্কে কিছু বলুন'। জবাবে তিনি বলেছিলেন, 'তোমরা কি কুরআন পড়ো না? কুরআনই তো তাঁর জীবনধারা'। অর্থাৎ সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার যে অধিকারসমূহ রয়েছে, স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টিকে যেমন দেখতে চান এবং যে স্তরে তিনি সৃষ্টিকে উপনীত করতে চান, নবী করীম (সা:) সে অধিকারসমূহ এমনভাবে আদায় করেন যে, তিনি পূর্ণতার অতি উচ্চে উপনীত হয়েছেন।
মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) এর প্রতি যে ভালোবাসা প্রদর্শন করেছেন এবং মর্যাদার সর্বোচ্চ সোপানে স্থান দিয়েছেন, এরই বাস্তব প্রকাশ হলো তিনি তাঁকে 'আবদ' বলে পরিচয় দিয়েছেন। যেমন-
وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُوْرَةٍ مِّنْ مِّثْلِهِ ص
আমি আমার (আব্দ) বান্দার ওপর যে কিতাব অবতীর্ণ করেছি, তার (সত্যতার) ব্যাপারে যদি তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকে তাহলে যাও, তার মতো (করে) একটি সূরা তোমরাও (রচনা করে) নিয়ে এসো। (সূরা বাকারা-২৩)
নবী করীম (সা:) কে মহান আল্লাহ মিরাজে নিয়েছিলেন, নিয়ে যাবার সে বিষয়টি আল্লাহ তা'য়ালা এভাবে উল্লেখ করেছেন-
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَا الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا طَ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ -
পবিত্র ও মহিমান্বিত (সেই আল্লাহ তা'য়ালা) যিনি তাঁর (এক) বান্দাকে রাতের বেলায় মাসজিদে হারাম থেকে মাসজিদে আকসায় নিয়ে গেলেন, যার পারিপার্শ্বিকতাকে আমি (আগেই) বরকতপূর্ণ করে রেখেছিলাম। যেনো আমি তাঁকে আমার (অদৃশ্য জগতের) কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি, (মূলত) সর্বশ্রোতা ও সর্বস্রষ্টা তো স্বয়ং তিনিই। (সূরা বনী ইসরাঈল-১)
কল্পনাও করা যায় না নবী করীম (সা:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা মর্যাদার কোন্ উচ্চ সোপানে উঠিয়েছেন। সম্মানিত মেহমান যে পথ বেয়ে যাবেন বা যে পথে তাঁকে আনা হবে, সেই পথের পরিবেশ আল্লাহ তা'য়ালা কিভাবে নিয়ামতে পূর্ণ করেছিলেন, কেমন ছিলো দৃষ্টিনন্দন সেই দৃশ্য, যে সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন, 'যার পারিপার্শ্বিকতাকে আমি আগেই বরকতপূর্ণ করে রেখেছিলাম'।
জাগতিক নিয়মের দিকে লক্ষ্য করলে মানুষের যে আয়োজন থাকে মেহমানের সম্মানে, তা থেকেই মহান রাব্বুল আলামীনের ব্যবস্থাপনা কেমন হতে পারে তা কিছুটা অনুমান করা যায়। সাধারণ মানুষ প্রিয় অতিথি, সম্মানিত মেহমান বা ভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে কিভাবে সম্মান প্রদর্শন করে। সাধারণ বিমান নয়, বিশেষ বিমানে তাঁকে আনা হয়। বিমান বন্দরে বিমান অবতরণ করার পূর্বেই বিমান বাহিনীর বিশেষ বিশেষ বিমান আকাশেই তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করে। অবতরণ করার পরে তাঁকে লাল গালিচা সম্বর্ধনা দিয়ে এর পর গার্ড অব অনার দেয়া হয়। বিমান বন্দর থেকে বের হয়ে তিনি যে পথে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে যাবেন এবং ওখান থেকে যে সকল স্থান তাঁকে পরিদর্শন করানো হবে, এসব পথ সজ্জিত করা হয়। মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ মেহমানকে নিয়ে যাচ্ছেন, তাঁর মর্যাদার কারণেই তাঁর ভ্রমণ পথের পারিপার্শ্বিকতাকে তিনি এমনভাবে সজ্জিত করেছিলেন যা কোনো মানুষের পক্ষেই কল্পনা করা সম্ভব নয়। শুধু সজ্জিতই নয়, তিনি ভ্রমণ পথের পারিপার্শ্বিকতাকে অত্যন্ত বরকতপূর্ণও করেছিলেন। নবী করীম (সা:) কে নিয়ে যাবার পূর্বেই মহান আল্লাহ তা'য়ালা যাবতীয় ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করেছিলেন।
আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর এ সম্মানিত বান্দার প্রতি এমন কোনো কিতাব অবতীর্ণ করেননি, যে কিতাব বোধগম্য নয়। অথবা যে কিতাবের বিধি-বিধান অনুসরণ করা কষ্টসাধ্য। অথবা যে কিতাব মানুষের জন্যে বোঝা বিশেষ। এমন ধরনের কোনো কিতাব যদি তাঁর প্রতি অবতীর্ণ করা হতো তাহলে মানুষ আপত্তি তুলতো, 'বাহক এমনি এক কিতাব বহন করে এনেছেন যা বোধগম্য নয় এবং এর বিধি-বিধান অনুসরণযোগ্যও নয়'। এ অভিযোগ নবী করীম (সা:) এর উচ্চ মর্যাদার সাথে সাংঘর্ষিক। এ কারণেই মহান আল্লাহ তা'য়ালা ঘোষণা করলেন, 'আমি আমার এ বান্দার প্রতি এমনি এক কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যার মধ্যে কোনো ধরনের বক্রতা নেই'। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَى عَبْدِهِ الْكِتَابَ وَلَمْ يَجْعَل لَّهُ عِوَجًا ط
সকল প্রশংসা আল্লাহ তা'য়ালার জন্যে, যিনি তাঁর (আব্দ) বান্দার প্রতি গ্রন্থ নাযিল করেছেন এবং তার কোথাও তিনি কোনোরকম বক্রতা রাখেননি। (সূরা কাহাফ-১)
নবী করীম (সা:) এর প্রতি যা কিছু অবতীর্ণ করার তা আল্লাহ তা'য়ালা অবতীর্ণ করলেন। এ কথাটিও বলতে গিয়ে আল্লাহ আব্দ বা বান্দাহ্ শব্দ ব্যবহার করেছেন-
فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى ط
অতপর সে তাঁর (আল্লাহর) বান্দার (আব্দ) কাছে ওহী পৌঁছে দিলো, যা তার পৌঁছানোর (দায়িত্ব) ছিলো। (সূরা নাজম-১০)
সর্বোচ্চ মর্যাদাবান ব্যক্তির প্রতি এমনই এক সম্মানিত কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে, যে কিতাব মানুষকে মূর্খতার অন্ধকার থেকে বের করে আলোর জগতে নিয়ে আসে। সকল ধরনের জ্ঞান ভাণ্ডারের খনি যে কিতাবের মধ্যে নিহিত রয়েছে সেই কিতাবই নবী করীম (সা:) এর প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
هُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ عَلَى عَبْدِهِ آيَاتِم بَيِّنَاتٍ لِيُخْرِجَكُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوْرِطَ وَإِنَّ اللَّهَ بِكُمْ لَرَؤُوفٌ رَّحِيمٌ
তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি তাঁর (আব্দ) বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াত অবতীর্ণ করেছেন, যেনো তিনি তোমাদের (জাহিলিয়াতের) অন্ধকার থেকে (ঈমানের) আলোর দিকে বের করে নিতে পারেন। (সূরা হাদীদ-৯)
إِن كُنتُمْ آمَنْتُمْ بِاللَّهِ وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَى عَبْدِنَا يَوْمَ الْفُرْقَانِ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ طَ
তোমরা যদি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করো, (আরো) বিশ্বাস করো সে (বিজয় ঘটিত) বিষয়টির প্রতি, যা আমি হক ও বাতিলের চূড়ান্ত মীমাংসার দিন এবং একে অপরের মুখোমুখি হবার দিন আমার (আব্দ) বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছিলাম। (সূরা আনফাল-৪১)
وَأَنَّهُ لَمَّا قَامَ عَبْدُ اللَّهِ يَدْعُوهُ كَادُوا يَكُونُوْنَ عَلَيْهِ لِبَدَاعِ
যখন আল্লাহর এক (আব্দ) বান্দাহ্ তাকে ডাকার জন্যে দাঁড়ালো, তখন (মানুষ বা জ্বিনের) অনেক সদস্যই তার আশেপাশে ভীড় জমাতে লাগলো। (সূরা জ্বিন-১৯)
أَرَأَيْتَ الَّذِي يَنْهَى لَا عَبْدًا إِذَا صَلَّى ط
তুমি কি সে (দাম্ভিক) লোকটিকে দেখেছো যে তাঁকে বাধা দিলো (বাধা দিলো আল্লাহর) এক (আব্দ) বান্দাকে যে নামাজ আদায় করছিলো। (সূরা আলাক-৯-১০)
হযরত ঈসা (আ:) শিশু বয়সে দোলনায় শুয়ে মহান আল্লাহ তা'য়ালার নির্দেশে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছিলেন-
إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ - 'আমি আল্লাহ তা'য়ালার বান্দাহ্'।
অপরদিকে নবী করীম (সা:) স্বয়ং যেমন নিজেকে আল্লাহর বান্দাহ্ বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেছেন তেমনি আল্লাহ তা'য়ালাও তাঁকে পরম স্নেহে পরিচয় করে দিয়েছেন 'আমার বান্দাহ্' বলে।
পবিত্র কুরআনের এসব আয়াতে নবী করীম (সা:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা 'আব্দ' বা বান্দাহ্ বলে উল্লেখ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে যে বার্তাটি পৌঁছানো হয়েছে তাহলো, নবী করীম (সা:) মহান আল্লাহর একজন বান্দাহ্, আল্লাহই তাঁকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই একান্ত অনুগ্রহ করে তাঁকে নবী-রাসূল নির্বাচিত করেছেন। তিনিই তাঁকে প্রতিপালন করছেন, যেমনটি অন্যান্য সৃষ্টিকেও তিনি প্রতিপালন করেন। প্রথমে তিনি আল্লাহর বান্দাহ্ তারপরে তিনি তাঁর রাসূল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মর্যাদার সাথে তাঁকে কখনোই তুলনা করা যাবে না এবং তাঁর উলুহিয়াতের অংশও তিনি নন। যেসব গুণ-বৈশিষ্ট মহান আল্লাহর জন্যে প্রযোজ্য সেসব গুণ-বৈশিষ্টের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম অংশেরও অধিকারী তিনি নন।
এসব ব্যাপারে যারা সাধারণ মুসলমানদের সম্মুখে কথা বলেন, তাদেরকে অবশ্যই সতর্ক হয়ে কথা বলতে হবে। নবী করীম (সা:) সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তা যেনো মহান আল্লাহর দেয়া সম্মান-মর্যাদার স্তর অতিক্রম করে আল্লাহ জাল্লাশানুহুর মর্যাদার স্তর স্পর্শ না করে। আল্লাহ তা'য়ালা যে সীমারেখা অঙ্কন করে দিয়েছেন তাঁর নবীর ক্ষেত্রে, সে সীমারেখার মধ্যে অবস্থান করেই রাসূল (সা:) এর প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন করতে হবে।
📄 নবী করীম (সা:) এর রিসালাত ও অন্যান্য নবী-রাসূলের অঙ্গীকার
মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) কে মর্যাদার কোন্ উচ্চ শিখরে উপনীত করেছেন দেখুন, পৃথিবীতে নবী-রাসূল প্রেরণের সূচনা যখন করেন তখন আদম (আ:) এর পর থেকে বিশ্বনবীর পূর্বে প্রেরিত সকল নবী-রাসূলের কাছ থেকেই এ অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন যে, 'তোমার পূর্বে যে নবী প্রেরণ করা হয়েছিলো এবং পরে যাঁকে প্রেরণ করা হবে, তাঁর প্রতি স্বীকৃতি দিতে হবে এবং তাঁকে সহযোগিতা করতে হবে'। কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন নবী করীম (সা:), যাঁকে এ ধরনের কিছু বলার প্রয়োজন আল্লাহ তা'য়ালা রাখেননি। কারণ তাঁর পরে আর কোনো নবী-রাসূল প্রেরণ করা হবে না। তাঁকে দিয়েই নবুয়াতের ধারার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে তাঁকে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে আসীন করা হবে বিধায় তাঁর কাছ থেকে এমন প্রতিশ্রুতি গ্রহণের প্রযোজন হয়নি। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبَيِّنَ لَمَا آتَيْتُكُم مِّنْ كتاب وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُوْلٌ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنْصُرُنَّه ط قَالَ أَ أَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَالِكُمْ إِصْرِى طَ قَالُوا أَقْرَرْنَا طَ قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُم مِّنَ الشَّاهِدِيْنَ
আল্লাহ তা'য়ালা যখন তাঁর নবীদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন (তখন তিনি বলেছিলেন, এ হচ্ছে) কিতাব ও (তার ব্যবহারিক) জ্ঞান কৌশল, যা আমি তোমাদের দান করলাম। অতপর তোমাদের কাছে যখন (আমার কোনো) রাসূল আসবে, যে তোমাদের কাছে রক্ষিত (আগের) কিতাবের সত্যায়ন করবে, তখন তোমরা অবশ্যই তার (আনীত বিধানের) ওপর ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে। আল্লাহ তা'য়ালা জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি (এ কথার) ওপর (আমার এ) অঙ্গীকার গ্রহণ করছো? তাঁরা বললো, হ্যাঁ আমরা (মেনে চলার) অঙ্গীকার করছি, আল্লাহ তা'য়ালা বললেন, তাহলে তোমরা সাক্ষী থেকো এবং আমিও তোমাদের সাথে (এ অঙ্গীকারের) সাক্ষী হয়ে রইলাম। (সূরা আলে ইমরান-৮১)
নবী করীম (সা:) এর পূর্বে সকল নবী-রাসূলের কাছ থেকেই মহান আল্লাহ প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছেন এবং এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই তাঁর পরবর্তী নবী-রাসূল সম্পর্কে নিজেদের অনুসারীদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন, 'আমার পরে যিনি আসবেন তোমরা তাঁকে অনুসরণ করবে'।
আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) এর পূর্বের সকল নবী-রাসূলের কাছ থেকে এ অঙ্গীকার গ্রহণ করে বিষয়টির গুরুত্ব সম্পর্কে এ কথাও স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন-
فَمَنْ تَوَلَّى بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَآئِكَ هُمُ الْفَاسِقُوْنَ
অতপর যারা তা (অঙ্গীকার) ভঙ্গ করে (এ থেকে) মুখ ফিরিয়ে নিবে, তারা অবশ্যই বিদ্রোহী (বলে পরিগণিত) হবে। (সূরা আলে ইমরান-৮২)
কিন্তু বিশ্বনবী (সা:) এর কাছ থেকে এই ধরনের কোনো অঙ্গীকার গ্রহণ করা হয়নি যে, 'আপনার পরে যিনি আসবেন আপনি আপনার অনুসারীদের জানিয়ে দিন, তাঁকে অনুসরণ করতে হবে'। এ ধরনের প্রতিশ্রুতি না নেয়াই এ কথার অকাট্য প্রমাণ যে, নবী করীম (সা:) এর পরে আর কোনো নবীর আগমন ঘটবে না এবং তিনিই সমগ্র পৃথিবীর জন্যে শেষ নবী-রাসূল। নবী-রাসূলের সিল মোহরের উচ্চ মর্যাদা মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে দান করেছেন। হযরত মূসা ও হযরত ঈসা (আ:) এর কাছ থেকেও এই প্রতিশ্রুতি আল্লাহ গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁরা তাদের অনুসারীদের এ কথা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, 'আমার পরে যিনি আসবেন তোমরা তাঁকে সমর্থন করবে, তাঁর প্রতি ঈমান এনে তাঁর আনীত বিধান অনুসরণ করবে'।
হযরত জাবির (রা:) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন-
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَوْ بَدَالَكُمْ مُوسَى فَاتَّبَعْتُمُوْهُ وَتَرَكْتُمُونِي لَضَلَلْتُمْ عَنْ سَوَاءِ السَّبِيلِ وَلَوْ كَانَ مُوسَى حَيًّا وَأَدْرَكَ نُبُوَّتِي لَاتَّبَعَنِي وَفِي رِوَايَةٍ مَّا وَسَّعَه إلَّا إِتَّبَاعِي
সে মহান সত্তার শপথ যার মুষ্ঠিতে মুহাম্মাদের প্রাণ রয়েছে, মূসাও যদি তোমাদের সম্মুখে আত্মপ্রকাশ করেন এবং তোমরা তাঁর অনুসরণ করো, আর আমাকে পরিত্যাগ করো তাহলে তোমরা নিশ্চিতভাবে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। বাস্তবিকই মূসা যদি এখন জীবিত থাকতেন এবং আমার নবুয়্যাতের সময় পেতেন, তাহলে তিনিও আমার অনুসরণ করতেন। অপর একটি সূত্রে বলা হয়েছে, তাঁর পক্ষে আমার অনুসরণ ভিন্ন কোনো উপায় থাকতো না। (দারেমী, মুসনাদে আহমদ)
নবী করীম (সা:) সম্পর্কে তাঁর পূর্বের নবী-রাসূলগণ নিজ অনুসারীদের যে নির্দেশ দিয়ে গেলেন, তা না মেনে তাঁরা নিজেদের নবীর নির্দেশও যেমন অস্বীকার করেছে এবং নবী করীম (সা:) কে অনুসরণ না করে বিদ্রোহীদের দলে শামিল হয়েছে। রাসূল (আ:) এর আনীত ইসলামী জীবন বিধান গ্রহণ না করে যারা বিকৃত আদর্শ অনুসরণ করছে বা নিজেদের আবিষ্কৃত জীবন বিধান অনুসরণ করছে, তাদের প্রতি সাবধান বাণী উচ্চারণ করে আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন-
أَفَغَيْرَ دِيْنِ اللَّهِ يَبْغُوْنَ وَلَهُ أَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُرْجَعُونَ
তারা কি আল্লাহর (দেয়া জীবন) ব্যবস্থার পরিবর্তে অন্য কোনো বিধানের সন্ধান করছে? অথচ আকাশ ও যমীনে যা কিছু আছে ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, আল্লাহ তা'য়ালার (বিধানের) সামনে আত্মসমর্পণ করে আছে এবং প্রত্যেককে তো তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। (সূরা আলে ইমরান-৮৩)
এবার দেখুন নবী করীম (সা:) কে মহান আল্লাহ তা'য়ালা সাম্প্রদায়িকতা ও সকল সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে তুলে মর্যাদার সর্বোচ্চ সোপানে পৌঁছে দিলেন। তিনি তাঁকে ঘোষণা করতে বললেন-
قُلْ آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَالأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَالنَّبِيُّوْنَ مِنْ رَّبِّهِمْ ص لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ زِ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُوْنَ
(হে নবী), আপনি বলে দিন, আমরা আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি, ঈমান এনেছি আমাদের ওপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তার ওপর, ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাদের অন্যান্য বংশধরদের প্রতি যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে তার ওপরও (আমরা আরো ঈমান এনেছি), আমরা আরো ঈমান এনেছি, মূসা, ঈসা এবং অন্য নবীদের তাদের মালিকের পক্ষ থেকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তার ওপরও, (আল্লাহর) এ নবীদের কারো মাঝেই আমরা কোনো ধরনের পার্থক্য করি না, (মূলত) আমরা সবাই হচ্ছি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী (মুসলমান) (সূরা আলে ইমরান-৮৪)
আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:)-এর মাধ্যমে সমগ্র মুসলিম মিল্লাতকেই এ নির্দেশ দিলেন যে, তাঁরা যেনো পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূলের প্রতি ঈমান পোষণ করে ঔদার্যতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে নিজেদেরকে সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে রাখে। মুসলিম মিল্লাত পবিত্র কুরআনের এ শিক্ষা অনুসরণ করে বলেই এ পৃথিবীতে তাঁরা সবথেকে পরধর্ম সহিষ্ণু জাতি এবং অমুসলিম প্রতিবেশীকে এরা অতি সহজেই নিজেদের প্রতিবেশীর অধিকার বুঝিয়ে দেয়। নিজেদের নবীর নির্দেশ অমান্য করে যারা নবী করীম (সা:) এর আনীত আদর্শ ইসলামী জীবন বিধান গ্রহণ না করে ভিন্ন বিধান গ্রহণ করেছে, তাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ ج وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
যদি কেউ ইসলাম ছাড়া (নিজের জন্যে) অন্য কোনো জীবন বিধান অনুসন্ধান করে তবে তার কাছ থেকে সে (উদ্ভাবিত) ব্যবস্থা কখনো গ্রহণ করা হবে না, আখিরাতে সে চরমভাবে ব্যর্থ হবে। (সূরা আলে ইমরান-৮৫)