📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী-রাসূলের নিষ্পাপ হবার তাৎপর্য ও মানবিক সত্তা

📄 নবী-রাসূলের নিষ্পাপ হবার তাৎপর্য ও মানবিক সত্তা


আমরা পবিত্র কুরআন থেকে জানতে পারি, নবুয়্যাত লাভ করার পূর্বে নবীগণ যে জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন, সেই জ্ঞানের দ্বারাই তাঁরা অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করতেন। ওহীর আগমন তাদের অনুভূতিলব্ধ জ্ঞানকে বিশাল শক্তিতে পরিণত করতো। ওহী অবতীর্ণের পূর্বে তাদের মন-মস্তিষ্ক যেসব সত্যের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতো, আল্লাহ তা'য়ালার ওহী সেগুলো সত্য হবার বিষয়ে নিশ্চয়তা প্রদান করতো। পরম সত্যের সাথে নবীদেরকে চাক্ষুষ পরিচয় করে দেয়া হত, নবীগণ সেসব বিষয়ে মানুষের কাছে সাক্ষ্য প্রদান করতেন।

পবিত্র কুরআন বারবার মানব জাতিকে লক্ষ্য করে বলেছে, তোমরা চিন্তা-গবেষণা করো, দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখো, আমার নিদর্শন সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করো। নবী-রাসূল নবুয়্যাত লাভ করার পূর্বে তাই করতেন। সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা গবেষণা করলে স্রষ্টার পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁরা এভাবে চিন্তা-গবেষণা করেই পরম সত্তার সন্ধান লাভ করার চেষ্টা করতেন। আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ হতে ওহী অবতীর্ণ হবার কারণে তারা প্রকৃত সত্যের জগতে প্রবেশ করেছেন এবং মানুষকেও সেদিকেই আহ্বান করেছেন।

ওহী অবতীর্ণ হবার পরে তাদেরকে এমন জ্ঞান দান করা হয়েছিল যে, যে জ্ঞান শুধু তাদের জন্যই মহান আল্লাহ নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন। অর্থাৎ মহান আল্লাহ নবী- রাসূলকে অদৃশ্য জগতের জ্ঞান দান করেছিলেন। কেউ কেউ বলে থাকেন, অদৃশ্য জগতের যতটুকু জ্ঞান মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া প্রয়োজন ছিল আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর অদৃশ্য জগতের জ্ঞান নবীকে ততটুকুই দান করেছিলেন। কিন্তু কুরআনের বর্ণনার মুকাবেলায় তাদের মতামত সঠিক নয়।

কুরআন দাবী করছে, নবীদেরকে অদৃশ্য জগতের এমন জ্ঞান ভাণ্ডার দান করা হয়েছিল যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে সে জ্ঞান লাভ করার কোনো উপায়ই নেই। পবিত্র কুরআনে হযরত ইয়াকুব (আঃ) সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। সূরা ইউসুফের ৮৬ নং আয়াত থেকে জানা যায়, তিনি তাঁর সন্তানদেরকে বলেছিলেন-

قَالَ إِنَّمَا أَشْكُوْ بَنِى وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ

সে (আরো) বললো, আমি আমার (অসহনীয়) যন্ত্রণা, আমার দুশ্চিন্তা (-জনিত অভিযোগ) আল্লাহ তা'য়ালার কাছেই নিবেদন করি এবং আমি নিজে আল্লাহ তা'য়ালার কাছ থেকে (তাঁর কথাবার্তা) যতোটুকু জানি, তোমরা তা জানো না। (সূরা ইউসুফ-৮৬)

অদৃশ্য জগতের অবস্থা সম্পর্কে নবীগণ যা জানেন এবং দেখেন, সাধারণ মানুষের পক্ষে সে স্তর অতিক্রম করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। এ কারণেই নবী করীম (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামকে বলেছিলেন, 'তোমরা শোনো, আল্লাহর শপথ! আমি যা জেনেছি তা যদি তোমরা জানতে তাহলে তোমরা খুব কমই হাসতে এবং কাঁদতে সবচেয়ে বেশি'। (বুখারী)

তিনি তাঁর সাহাবায়ে কেরামকে বলেছিলেন, 'আমি তোমাদেরকে পেছনে ঠিক তেমনভাবেই দেখি যেমনভাবে সামনে দেখি'। (বুখারী)

অর্থাৎ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী করীম (সাঃ) কে দু'টো পবিত্র চোখ দান করেছিলেন। তিনি সে চোখ দিয়ে সামনের দিকে দেখতে পেতেন। কিন্তু তাঁর পেছনে চোখ না থাকলেও তিনি আল্লাহ তা'য়ালার দেয়া শক্তির কারণে পেছনেও দেখতে পেতেন। অর্থাৎ সামনে পেছনে তিনি একইভাবে দেখতেন। নবী-রাসূলগণ অদৃশ্য জগতের যতটুকু সংবাদ মানুষকে জানিয়ে গেছেন, এ কথা ধারণা করার কোনো কারণ নেই যে, তাঁরা অদৃশ্য জগৎ সম্পর্কে ঐ পরিমাণ জ্ঞানই রাখতেন। বরং এর চেয়ে শত সহস্রগুণ বেশি জ্ঞান তাদেরকে দান করা হয়েছিল অদৃশ্য জগৎ সম্পর্কে।

অকারণে তাদেরকে এই জ্ঞান দান করা হয়নি। এসব জ্ঞান তাদেরকে দান করা হয়েছিল তাদের দায়িত্বের কারণে। তাঁরা যে দায়িত্ব পালন করতেন সে দায়িত্ব পালন করতে গেলে অদৃশ্য জগৎ সম্পর্কে তাদের সীমাহীন জ্ঞান থাকা প্রয়োজন ছিল। এই জ্ঞান তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সহায়ক হত। তাঁরা যা দেখতেন এবং বুঝতেন তা সাধারণ মানুষের জানার বা বুঝার প্রয়োজন নেই। যতটুকু প্রয়োজন ছিল ততটুকু তাঁরা মানুষকে জানিয়ে গেছেন। সাধারণ মানুষ ঐ অদৃশ্য জ্ঞান সহ্য করতে পারবে না। এ কারণেই মানুষকে আল্লাহ তা'য়ালা ঐ জ্ঞান সম্পর্কে কিছুই জানাননি।

হযরত মূসা (আ:)ই প্রথম দিকে সহ্য করতে পারেননি, নবী করীম (সা:) ও প্রথম দিকে ঐ জ্ঞানের জগৎ দেখে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন, তাহলে সাধারণ মানুষের সামনে ঐ জ্ঞানের সামান্যতম বিন্দু প্রকাশিত হলে এই মানুষের পক্ষে নিজ অস্তিত্ব বজায় রাখা সম্ভব হতো না।

এই পৃথিবীতে নবী-রাসূল সবচেয়ে অধিক মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী এবং তাঁরা মানব জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। একজন সাধারণ মানুষের জীবনে যে ঘটনা ঘটে তা হয়তঃ কোনো গুরুত্ব বহন করে না। কিন্তু ঐ একই ঘটনা যদি নবীর জীবনে ঘটে তাহলে তা গুরুত্ব বহন করে। সে ঘটনা তাঁর অনুসারীদের জন্য অবশ্যকরণীয় হয়ে দাঁড়ায়। নবী জীবনের ক্ষুদ্র ঘটনাও মানুষের জন্য আইনে পরিণত হয়। এ কারণে মহান আল্লাহর পক্ষ হতে তাদের প্রত্যেক পদক্ষেপের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়েছিলো। কারণ নবী জীবনের সকল কিছুই মানুষের জন্য অনুসরণীয়। নবী করীম (সা:) তাঁর পবিত্রা স্ত্রীদেরকে বলতেন, 'আমি তোমাদের সাথে যে আচরণ করি, তা মানুষকে জানিয়ে দাও। আমি দিনে যা করি এবং রাতে যা করি, সকল কিছুই মানুষকে জানিয়ে দাও'।

কারণ তাঁর জীবনের সকল কিছুই মানুষ অনুসরণ করবে। তাদের জীবনের কোনো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজও মহান আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে সংঘটিত হতে পারে না। কোনো নবী যদি কখনো কোনো কাজ নিজ প্রবৃত্তি অনুসারে করেও থাকেন, তাহলে সাথে সাথে তা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সংশোধন করে দেয়া হয়েছে। কেননা, ইসলামী জীবন ব্যবস্থার মূলনীতি সমূহ শুধুমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার কিতাবেই নয়, মহান নবীর জীবন আদর্শ হিসেবেও মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে, আর এই বিধানে আল্লাহ তা'য়ালার অপছন্দনীয় সামান্য কোনো অংশ থাকতে পারবে না।

পৃথিবীতে প্রেরিত প্রত্যেক নবী-রাসূল আল্লাহ তা'য়ালার কাছে একই মর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন না। তাঁদের দায়িত্ব অনুযায়ী মহান আল্লাহ তাঁদেরকে মর্যাদা দান করেছেন। তাঁদের মর্যাদা অনুসারে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁদেরকে অদৃশ্য জগতের জ্ঞান দান করেছিলেন। পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলী কিভাবে তিনি পরিচালনা করছেন, এটা তাঁদেরকে পর্যবেক্ষণ করানো হয়েছে। তিনি কিভাবে সৃষ্টি করেন এবং মৃত্যু ঘটান আবার মৃত থেকে জীবিত করেন তা প্রদর্শন করা হয়েছে। এই পৃথিবী ও অদৃশ্য জগতের মাঝে যে পর্দা অন্তরায় হিসেবে রয়েছে, মহান আল্লাহ সে পর্দা তাঁদের দৃষ্টির সামনে থেকে সরিয়ে এমন সব দৃশ্য দেখিয়েছেন, যে দৃশ্য অবলোকন করলে সাধারণ মানুষ চেতনা হারিয়ে ফেলবে।

এসব জিনিসের প্রতি মানুষ বিশ্বাস স্থাপন করবে, নবীগণ মানুষকে এসব জিনিসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার জন্য আহ্বান জানাবেন। এ কারনেই নবীদেরকে আল্লাহ তা'য়ালা ঐসব জিনিসের সাথে চাক্ষুষ পরিচয় করে দিয়েছেন। অনেকে আবার নবীদের সাথে পৃথিবীর মানুষ দার্শনিকদের তুলনা করে থাকেন। দার্শনিকগণও তো এমন অনেক কথা বলেন, যা দেখা যায় না। অর্থাৎ নবী আর দার্শনিকদেরকে তারা এক কাতারে দাঁড় করাতে চান।

পৃথিবীর দার্শনিকগণ যা বলেন তা অনুমানের ভিত্তিতে বলেন। যেসব দার্শনিক মানুষ হিসেবে নিজের মর্যাদা ও অবস্থান, জ্ঞানের পরিধি অবগত আছেন, তারা কখনো নিজের মতামতই চরম সত্য বলে রায় দেন না। কিন্তু নবী-রাসূল যা বলেন, তা নিজের চোখে দেখে এবং ওহী জ্ঞানের ভিত্তিতে বলেন। নবীগণ অনুমানের ভিত্তিতে কথা বলেন না। কিন্তু দার্শনিকগণ অনুমানের ভিত্তিতে কথা বলে। নবীদের চোখের সামনে গোপন জগতের পর্দা উঠিয়ে যা দেখানো হয়েছে সে সম্পর্কে তাঁরা নিশ্চিত হয়েই কথা বলেন।

পবিত্র কুরআনে সূরা ইউসুফে মহান আল্লাহ তা'য়ালা হযরত ইয়াকুব (আ:) ও তাঁর সন্তান হযরত ইউসুফ (আ:) সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। হযরত ইউসুফ (আ:) ঘটনাক্রমে পিতার সান্নিধ্য থেকে কয়েক বছর যাবৎ বিচ্ছিন্ন ছিলেন। পিতা তাঁর সন্তানের সন্ধান জানতেন না। তাঁর অন্যান্য সন্তানগণ ব্যবসা উপলক্ষ্যে যখন মিশর গিয়েছিল তখন হযরত ইউসুফ (আ:) মিশরের রাষ্ট্রপতি। তিনি জীবিত আছেন এর চিহ্ন স্বরূপ ভাইদের কাছে তাঁর শরীরের একটি জামা দিয়েছিলেন, যেন তাঁর পিতা সান্ত্বনা লাভ করেন।

সেই জামা নিয়ে যখন তাঁর ভাইগণ আসছিল তখন কয়েক শত মাইল দূরে অবস্থান করে হযরত ইয়াকুব (আ:) হযরত ইউসুফ (আ:) এর শরীরের গন্ধ অনুভব করছিলেন। এ ধরনের ক্ষমতা মহান আল্লাহ তাঁর এ নবীকে দান করেছিলেন। কিন্তু এরপরেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সকল নবীই মানুষ ছিলেন। তাদের ভেতরে মানবিক সত্তা ছিল। তাঁরা আল্লাহ তা'য়ালার কোনো অভিনব সৃষ্টি ছিলেন না.。 একজন মানুষকে নবী হিসেবে প্রেরণ করা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় ছিল না।

সাধারণ মানুষের এই পৃথিবীতে জীবন ধারনের জন্য যা প্রয়োজন হয়, নবী-রাসূলেরও তাই হত। তাঁরা ক্ষুধা অনুভব করতেন, তাদের প্রাকৃতিক প্রয়োজন হত। রক্ত মাংসে গঠিত ছিল তাদের শরীর। তাঁরাও বেদনা অনুভব করতেন। রোগাক্রান্ত হতেন। জীবিকা অর্জনের জন্য তাঁরাও শ্রম দিতেন। বিবাহিত জীবনে তাঁদেরও সন্তান জন্ম হতো। আল্লাহ তা'য়ালার বিধান পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজনে তাদেরকেও যুদ্ধ বিগ্রহ করতে হয়েছে। কিন্তু তাদের মানবীয় এই সত্তা পরিচালিত হত মহান আল্লাহ তা'য়ালার ইশারায়। কেননা, তাদের জীবনের সবটুকুই তাঁর অনুসারীদের জন্য ছিল অনুসরণীয়।

মুমিনদের জন্য নির্ধারিত যে গুণাবলী এবং পূর্ণমান, সে মানে প্রতিটি মুহূর্ত অবস্থান করা এই পৃথিবীতে একজন মুমিনের পক্ষেও সম্ভব নয়। অর্থাৎ মুমিনের মান ওঠা নামা করে। যখন সে মহান আল্লাহর পছন্দনীয় কাজে লিপ্ত থাকে তখন মুমিন হিসেবে সে পূর্ণমানে অবস্থান করে। আর তাঁর দ্বারা যখন সামান্য ভুল হয়ে যায় তখন সে ঐ পূর্ণমান থেকে সামান্য নীচে অবস্থান করেন। অর্থাৎ আকাংখিত মানে প্রতিটি মুহূর্ত অবস্থান করা মানুষ হিসেবে মুমিনদের জন্য সম্ভব হয় না।

প্রশ্ন হলো, নবী-রাসূলেরও অবস্থা এমন হতো কি না। এ প্রশ্নের উত্তর আমরা পবিত্র কুরআন-হাদীসে অনুসন্ধান করবো। আমরা পবিত্র কুরআনে দেখতে পাই, হযরত নূহ (আ:) এর যুবক সন্তান যখন তাঁরই চোখের সামনে পানিতে ডুবে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করছিল, তখন হযরত নূহ (আ:) এর ভেতরে মানবীয় দুর্বলতা ক্ষণিকের জন্য স্পন্দন সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তাঁর সে সন্তান ছিলো আল্লাহ তা'য়ালার বিধানের শত্রু। মুহূর্ত কয়েকের ভেতরে তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। আল্লাহর বিধানের মুকাবেলায় তিনি যুবক সন্তানের মমতা হৃদয়ে স্থান দেননি।

এ ধরনের নানা ঘটনা বিভিন্ন নবীর জীবনে সাময়িকের জন্য ঘটেছে। কিন্তু মহান আল্লাহ মুহূর্তের ভেতরে নবীকে সংশোধন করেছেন। একজন নবীর নিষ্পাপ হবার অর্থ এই নয় যে, নবীর দ্বারা পাপ সংঘটিত হবার কোনো সম্ভাবনাই ছিলো না। অথবা সব ধরনের পাপ ও ভুল করার ক্ষমতা নবীর সত্তা থেকে মহান আল্লাহ ছিনিয়ে নিয়েছেন। প্রকৃত বিষয় হলো, নবী ভুল করার প্রবণতা রাখেন কিন্তু তাঁর মানবিক আবেগ অনুভুতি, মানবিক গুণাবলী, ইচ্ছা আশা নিরাশার অধিকারী হবার পরেও তিনি এমন আল্লাহভীরু ও সৎ হন যে, তিনি কখনো সচেতনভাবে কোনো ভুল করেননি।

প্রতিটি মানুষের ভেতরে যে খারাপ প্রবৃত্তি অবস্থান করছে, মানুষ যত খারাপ কাজ করে ততই সেই খারাপ প্রবৃত্তির শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। অর্থাৎ খারাপ কাজ বা পাপের কাজই হলো কুপ্রবৃত্তির খোরাক বা আহার। নবীর ভেতরে সেই শক্তি আহার না পেয়ে মৃত্যুবরণ করে। সুতরাং নবীর মধ্যে পাপ করার কোনো আকাংখা সৃষ্টি হতে পারে না। তারপরেও তাঁর দ্বারা যদি সামান্যতম ভুল হতে থাকে, তাহলে মহান আল্লাহ সাথে সাথেই তা সংশোধন করার ব্যবস্থা করেন। কারণ নবীর পদস্খলন শুধু তাঁর পদস্খলন নয়, সমগ্র উম্মতের পদস্খলন। নবী যদি মহাসত্যের বাইরে ভুলের দিকে বিন্দু পরিমাণ এগিয়ে যান, তাহলে সমগ্র পৃথিবী ভুলের দিকে কয়েক শত মাইল এগিয়ে যাবে।

নবী-রাসূল যে নিষ্পাপ ছিলেন এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। গুনাহ তথা নাফরমানীর কাজে জড়িয়ে পড়া, নিষিদ্ধ ও ঘৃণ্য হারাম কাজ করা থেকে নবী-রাসূলকে মহান আল্লাহ রক্ষা করেছেন। এই সংরক্ষণ শুধুমাত্র নবী-রাসূলদের জন্যই নির্দিষ্ট ও সংরক্ষিত। এই গুণ ও বৈশিষ্ট্য শুধুমাত্র নবীদেরকেই দান করে মহান আল্লাহ তাঁদেরকে সম্মানিত করেছেন। সৃষ্টির সকল মানুষের তুলনায় তাদেরকে বিশিষ্ট বানিয়ে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন মর্যাদা তাদেরকে দান করা হয়েছে।

পাপ ও অবাধ্যতা থেকে আল্লাহ তা'য়ালার বিশেষ সংরক্ষণ লাভের এই মর্যাদা শুধুমাত্র নবীদেরই রয়েছে। নবী-রাসূল ব্যতীত এই গুণ-বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব সৃষ্টি জগতে আর কোনো মানুষের নেই এবং কোনো মানুষের তা প্রাপ্যও নয়। নবী-রাসূলগণ এই সংরক্ষণ লাভ করেন শুধুমাত্র বড় বড় পাপ থেকেই নয়, ছোট ছোট পাপ থেকেও তাঁরা এই সংরক্ষণ লাভ করেন। এ কারণে তাদের দ্বারা আল্লাহর সাথে সামান্যতম অবাধ্যতা সংঘটিত হওয়া অসম্ভব।

নবী-রাসূল নিষ্পাপ মাসুম, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা মানবীয় প্রকৃতিই হারিয়ে ফেলেছেন। মানুষ স্বভাবতঃই ভুল-ভ্রান্তির প্রকৃতি সম্পন্ন। মানুষের ইচ্ছা শক্তি ও উদ্যম উদ্যোগ কোনো কোনো সময় দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এ যেমন সত্য, তেমনি সাময়িক ক্রোধ বা অভিমানে ভারাক্রান্ত হয়েও নবী রাসূল এমন কোনো কাজ হঠাৎ করতে পারেন, যা আল্লাহ তা'য়ালা অপছন্দ করেন।

এ অবস্থায় মহান আল্লাহ তাদেরকে সংশোধন করে দেন। সে ভুলকে স্থায়ী হতে দেন না। সে ভুলের প্রতিক্রিয়া বা পরিণতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেন। এসব ক্ষুদ্র ভুলের ওপরে নবীগণ স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকেন না। এমন হতে পারে যে, নবীকে আল্লাহ ভুল করার সুযোগ দিয়ে এ কথা প্রমাণ করেন যে, নবীগণ মানবীয় দুর্বলতার উর্ধ্বে নয়। কিন্তু এ কারণে নবীগণ পাপী হন না বা তাদের মর্যাদাও ক্ষুন্ন হয় না।

সাময়িকের জন্য নবীগণ যে ভুল করতে পারেন বা মহান আল্লাহর বলে দেয়া কথা ভুলে যেতে পারেন, তার বড় প্রমাণ হযরত আদম (আ:) । তিনি ভুল করেছেন, এ উপলব্ধিবোধ তাঁর ভেতরে সৃষ্টি হবার সাথে সাথে তিনি ক্ষমা ভিক্ষা করেছেন, মহান আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে নবুয়‍্যাত দান করেছেন। নবীগণ যাদু প্রভাবিত হতে পারেন। হযরত মূসা (আ:) এর সামনে যখন ফিরাউনের যাদুকররা যাদু নিক্ষেপ করেছিল, সে সময়ের চিত্র সম্পর্কে বলা হয়েছে-

قَالَ بَلْ أَلْقُوا فَإِذَا حِبَالُهُمْ وَعِصِيُّهُمْ يُخَيَّلُ إِلَيْهِ مِنْ سِحْرِهِمْ أَنَّهَا تَسْعَى فَأَوْجَسَ فِي نَفْسِهِ خِيْفَةٌ مُوسَى -

যাদুর প্রভাবে তাঁর (মূসার) কাছে মনে হলো তাদের (যাদুর) রশি ও লাঠিগুলো বুঝি এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে, (এতে মূসা তার অন্তরে কিছুটা ভয় (ও শঙ্কা) অনুভব করলো। (সূরা ত্বাহা-৬৬-৬৭)

আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে অভয় দান করে বলেছিলেন, কোনো ভয় নেই। তুমিই বিজয়ী হবে। তোমার হাতে যা আছে তা নিক্ষেপ করো। তা এখনই তাদের মিথ্যা জিনিসগুলো গিলে ফেলবে। ওরা যা কিছু বানিয়ে এনেছে, তা যাদুকরের প্রতারণা ব্যতীত আর কিছুই নয়। আর যাদুকর কখনই সফলকাম হতে পারে না, তা ওরা যতই শক্তি দেখাক না কেনো।

সে সময় সাধারণ মানুষ যেমন যাদুর প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছিল, হযরত মূসা (আ:) এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। কুরআন বলছে, তিনি ভয় পেয়েছিলেন। এই ভয় পাওয়া, ছিল তাঁর মানবীয় দুর্বলতা। কিন্তু তিনি এই ভয়ের ওপর স্থায়ী ছিলেন না। ক্ষণিকের মধ্যেই তিনি নিজেকে ভয় মুক্ত করেছিলেন। পক্ষান্তরে যাদু কোনো নবীকে বিভ্রান্ত করতে বা তাঁর নবুয়‍্যাতের প্রতি বিরূপ কোনো ক্রিয়া করতে পারে না। স্বয়ং নবী করীম (সা:) এর ওপর দৈহিকভাবে যাদুর ক্রিয়া ঘটেছিল। এ কারণে তিনি তাঁর জীবনে বেশ কষ্ট অনুভব করেছেন।

হযরত ইউনুস (আ:) তাঁর জাতিকে আল্লাহর বিধান গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানালেন। তারা অস্বীকার করেছিল। তিনি তাদেরকে শাস্তির ভয় দেখালেন। বললেন তিনদিনের মধ্যে আযাব আসবে। লোকজন আল্লাহ তা'য়ালার কাছে কাতর প্রর্থনা করেছিল। মহান আল্লাহ শাস্তি মওকুফ করে দিলেন। হযরত ইউনুস (আ:) চিন্তা করলেন, তিনদিনের ভেতরে যখন আযাব এলো না তখন এবার তাঁকে লোকজন মিথ্যাবাদী ধারণা করে তাঁকে হত্যা করবে।

তিনি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আদেশের অপেক্ষা না করে দেশ ত্যাগ করলেন। আল্লাহ তা'য়ালার আদেশ ব্যতীত কোনো নবীর জন্য তাঁর স্থান ত্যাগ করা নবুয়্যাত-মর্যাদার পরিপন্থী। সুতরাং মহান আল্লাহ তাকে গ্রেফতার করলেন। তাঁকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হলো। তাঁকে বিশাল এক মাছ-গ্রাস করেছিল। আল্লাহর কাছে তিনি ক্ষমা চাইলেন। মহান আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করেছিলেন। এ ধরনের অনেক ঘটনা থেকে প্রমাণ হয়, নবীগণ সাময়িক ভুল করলেও মহান আল্লাহ তা সংশোধন করে দিতেন। কিন্তু তাদের সে ভুল মারাত্মক কিছু ছিল না। তা ছিল একেবারেই ক্ষুদ্র পর্যায়ের।

প্রত্যেক নবীর চরিত্রের সনদপত্র মহান আল্লাহ দান করেছেন। নবী করীম (সা:) সম্পর্কে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন-

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُوْلِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا -

(হে মুসলমানরা,) তোমাদের জন্যে অবশ্যই আল্লাহর রাসূলের (জীবনের) মাঝে (অনুকরণযোগ্য) উত্তম আদর্শ রয়েছে, (আদর্শ রয়েছে) এমন প্রতিটি ব্যক্তির জন্যে, যে আল্লাহ তা'য়ালার সাক্ষাৎ পেতে আগ্রহী এবং যে পরকালের (মুক্তির) আশা করে, (সর্বোপরি) যে বেশি পরিমাণে আল্লাহ তা'য়ালাকে স্মরণ করে। (সূরা আহযাব-২১)

নবী করীম (সা:) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন-

وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ

নিশ্চয়ই আপনি সর্বোত্তম চরিত্রের ওপরে প্রতিষ্ঠিত। (সূরা ক্বালাম-৪)

সূরা ইয়াসিনের প্রথম আয়াতেই বিজ্ঞানময় কুরআনের শপথ করে আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) সম্পর্কে বলেছেন, নিশ্চয়ই আপনি সবচেয়ে সহজ-সরল এবং নির্ভুল পথের ওপরে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রেরিত নেতাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা। হযরত ইবরাহীম (আ:) ও আল্লাহর কাছে অতীব মর্যাদাবান নবী এবং মানবতার জন্য উত্তম আদর্শ ছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর সম্পর্কে বলেন-

قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ ج

তোমাদের জন্যে ইবরাহীম ও তাঁর অনুসারীদের (ঘটনার) মাঝে রয়েছে (অনুকরণযোগ্য) আদর্শ। (সূরা মুমতাহিনাহ-৪)

সূরা মরিয়মে হযরত ইবরাহীম (আ:) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন, তিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ একজন মর্যাদাবান নবী। একই সূরায় হযরত মূসা, হযরত ইদরীস ও হযরত ইসমাঈল (আ:) এর প্রশংসা করেছেন। নবী-রাসূল মানব জাতির জন্য উত্তম আদর্শবান ব্যক্তি ছিলেন। এ কারণে মহান আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেন-

أُوْلَئِكَ الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ طَ فَإِنْ تَكْفُرْ بِهَا هَؤُلَاءِ فَقَدْ وَكَّلْنَا بِهَا قَوْمًا لَّيْسُوا بِهَا بِكَافِرِينَ - أُوْلَائِكَ الَّذِيْنَ هَدَى اللَّهُ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهُ ط قُل لا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا طَ إِنَّ هُوَ إِلَّا ذِكْرَى لِلْعَالَمِينَ عِ

এরাই ছিলো সেসব লোক, যাদের আমি কিতাব, প্রজ্ঞা ও নবুয়‍্যাত দান করেছি, (আজ) যদি তারা তা অস্বীকার করে (তাতে আমার কোনো ক্ষতি নেই), আমি তো (অতীতে) এমন এক সম্প্রদায়ের ওপর এ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলাম, যারা কখনো (এগুলো) প্রত্যাখ্যান করেনি। আল্লাহ (এদের) সবাইকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন; (হে নবী) আপনি এদের পথেরই অনুসরণ করুন। (সূরা আনয়াম-৮৯-৯০)

প্রত্যেক নবীই ছিলেন মহান আল্লাহর মুখাপেক্ষী। তাঁরা মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করতেন। বদরের প্রান্তরে নবী করীম (সা:) সিজদায় অবনত হয়ে মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করেছেন। তিনি এ দাবী করেননি যে আমি একাই যথেষ্ট, আমার সামনে যে শত্রু আসবে সে জ্বলে পুড়ে ভষ্ম হয়ে যাবে। হযরত আইয়ুব (আ:) রোগে আক্রান্ত হয়ে মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করেছেন। তিনি স্বয়ং এ. দাবী করেননি যে, আমি রোগ মুক্ত করতে সক্ষম।

হযরত ইউনুস (আ:) বিপদগ্রস্থ হয়ে আল্লাহ তা'য়ালার সাহায্য কামনা করেছেন, তিনি নিজে এ দাবী করেননি যে, আমি বিপদ থেকে মানুষকে মুক্ত করতে সক্ষম। পবিত্র কুরআনে তাদের ইতিহাস বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হলো, মহান নবী-রাসূল ছিলেন আল্লাহ তা'য়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদাবান বান্দা। তাঁরাই যখন রোগে আক্রান্ত হয়ে আল্লাহ তা'য়ালার মুখাপেক্ষী হয়েছেন, বিপদগ্রস্থ হয়ে তাঁরই কাছে সাহায্য কামনা করেছেন, পৃথিবীর সকল মানুষও যেনো একমাত্র মহান আল্লাহর কাছেই সাহায্য চায়। কোনো মৃত মানুষ বা পৃথিবীর কোনো শক্তির কাছে যেন সাহায্যের জন্য আবেদন না করে মানুষ যেনো আরেক মানুষের মুখাপেক্ষী না হয়।

আমরা পবিত্র কুরআন থেকে জানতে পারি, নবুয়্যাত লাভ করার পূর্বে নবীগণ যে জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন, সেই জ্ঞানের দ্বারাই তাঁরা অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করতেন। ওহীর আগমন তাদের অনুভূতিলব্ধ জ্ঞানকে বিশাল শক্তিতে পরিণত করতো। ওহী অবতীর্ণের পূর্বে তাদের মন-মস্তিষ্ক যেসব সত্যের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতো, আল্লাহ তা'য়ালার ওহী সেগুলো সত্য হবার বিষয়ে নিশ্চয়তা প্রদান করতো। পরম সত্যের সাথে নবীদেরকে চাক্ষুষ পরিচয় করে দেয়া হত, নবীগণ সেসব বিষয়ে মানুষের কাছে সাক্ষ্য প্রদান করতেন।

পবিত্র কুরআন বারবার মানব জাতিকে লক্ষ্য করে বলেছে, তোমরা চিন্তা-গবেষণা করো, দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখো, আমার নিদর্শন সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করো। নবী-রাসূল নবুয়্যাত লাভ করার পূর্বে তাই করতেন। সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা গবেষণা করলে স্রষ্টার পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁরা এভাবে চিন্তা-গবেষণা করেই পরম সত্তার সন্ধান লাভ করার চেষ্টা করতেন। আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ হতে ওহী অবতীর্ণ হবার কারণে তারা প্রকৃত সত্যের জগতে প্রবেশ করেছেন এবং মানুষকেও সেদিকেই আহ্বান করেছেন।

ওহী অবতীর্ণ হবার পরে তাদেরকে এমন জ্ঞান দান করা হয়েছিল যে, যে জ্ঞান শুধু তাদের জন্যই মহান আল্লাহ নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন। অর্থাৎ মহান আল্লাহ নবী- রাসূলকে অদৃশ্য জগতের জ্ঞান দান করেছিলেন। কেউ কেউ বলে থাকেন, অদৃশ্য জগতের যতটুকু জ্ঞান মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া প্রয়োজন ছিল আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর অদৃশ্য জগতের জ্ঞান নবীকে ততটুকুই দান করেছিলেন। কিন্তু কুরআনের বর্ণনার মুকাবেলায় তাদের মতামত সঠিক নয়।

কুরআন দাবী করছে, নবীদেরকে অদৃশ্য জগতের এমন জ্ঞান ভাণ্ডার দান করা হয়েছিল যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে সে জ্ঞান লাভ করার কোনো উপায়ই নেই। পবিত্র কুরআনে হযরত ইয়াকুব (আঃ) সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। সূরা ইউসুফের ৮৬ নং আয়াত থেকে জানা যায়, তিনি তাঁর সন্তানদেরকে বলেছিলেন-

قَالَ إِنَّمَا أَشْكُوْ بَنِى وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ

সে (আরো) বললো, আমি আমার (অসহনীয়) যন্ত্রণা, আমার দুশ্চিন্তা (-জনিত অভিযোগ) আল্লাহ তা'য়ালার কাছেই নিবেদন করি এবং আমি নিজে আল্লাহ তা'য়ালার কাছ থেকে (তাঁর কথাবার্তা) যতোটুকু জানি, তোমরা তা জানো না। (সূরা ইউসুফ-৮৬)

অদৃশ্য জগতের অবস্থা সম্পর্কে নবীগণ যা জানেন এবং দেখেন, সাধারণ মানুষের পক্ষে সে স্তর অতিক্রম করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। এ কারণেই নবী করীম (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামকে বলেছিলেন, 'তোমরা শোনো, আল্লাহর শপথ! আমি যা জেনেছি তা যদি তোমরা জানতে তাহলে তোমরা খুব কমই হাসতে এবং কাঁদতে সবচেয়ে বেশি'। (বুখারী)

তিনি তাঁর সাহাবায়ে কেরামকে বলেছিলেন, 'আমি তোমাদেরকে পেছনে ঠিক তেমনভাবেই দেখি যেমনভাবে সামনে দেখি'। (বুখারী)

অর্থাৎ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী করীম (সাঃ) কে দু'টো পবিত্র চোখ দান করেছিলেন। তিনি সে চোখ দিয়ে সামনের দিকে দেখতে পেতেন। কিন্তু তাঁর পেছনে চোখ না থাকলেও তিনি আল্লাহ তা'য়ালার দেয়া শক্তির কারণে পেছনেও দেখতে পেতেন। অর্থাৎ সামনে পেছনে তিনি একইভাবে দেখতেন। নবী-রাসূলগণ অদৃশ্য জগতের যতটুকু সংবাদ মানুষকে জানিয়ে গেছেন, এ কথা ধারণা করার কোনো কারণ নেই যে, তাঁরা অদৃশ্য জগৎ সম্পর্কে ঐ পরিমাণ জ্ঞানই রাখতেন। বরং এর চেয়ে শত সহস্রগুণ বেশি জ্ঞান তাদেরকে দান করা হয়েছিল অদৃশ্য জগৎ সম্পর্কে।

অকারণে তাদেরকে এই জ্ঞান দান করা হয়নি। এসব জ্ঞান তাদেরকে দান করা হয়েছিল তাদের দায়িত্বের কারণে। তাঁরা যে দায়িত্ব পালন করতেন সে দায়িত্ব পালন করতে গেলে অদৃশ্য জগৎ সম্পর্কে তাদের সীমাহীন জ্ঞান থাকা প্রয়োজন ছিল। এই জ্ঞান তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সহায়ক হত। তাঁরা যা দেখতেন এবং বুঝতেন তা সাধারণ মানুষের জানার বা বুঝার প্রয়োজন নেই। যতটুকু প্রয়োজন ছিল ততটুকু তাঁরা মানুষকে জানিয়ে গেছেন। সাধারণ মানুষ ঐ অদৃশ্য জ্ঞান সহ্য করতে পারবে না। এ কারণেই মানুষকে আল্লাহ তা'য়ালা ঐ জ্ঞান সম্পর্কে কিছুই জানাননি।

হযরত মূসা (আ:)ই প্রথম দিকে সহ্য করতে পারেননি, নবী করীম (সা:) ও প্রথম দিকে ঐ জ্ঞানের জগৎ দেখে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন, তাহলে সাধারণ মানুষের সামনে ঐ জ্ঞানের সামান্যতম বিন্দু প্রকাশিত হলে এই মানুষের পক্ষে নিজ অস্তিত্ব বজায় রাখা সম্ভব হতো না।

এই পৃথিবীতে নবী-রাসূল সবচেয়ে অধিক মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী এবং তাঁরা মানব জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। একজন সাধারণ মানুষের জীবনে যে ঘটনা ঘটে তা হয়তঃ কোনো গুরুত্ব বহন করে না। কিন্তু ঐ একই ঘটনা যদি নবীর জীবনে ঘটে তাহলে তা গুরুত্ব বহন করে। সে ঘটনা তাঁর অনুসারীদের জন্য অবশ্যকরণীয় হয়ে দাঁড়ায়। নবী জীবনের ক্ষুদ্র ঘটনাও মানুষের জন্য আইনে পরিণত হয়। এ কারণে মহান আল্লাহর পক্ষ হতে তাদের প্রত্যেক পদক্ষেপের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়েছিলো। কারণ নবী জীবনের সকল কিছুই মানুষের জন্য অনুসরণীয়। নবী করীম (সা:) তাঁর পবিত্রা স্ত্রীদেরকে বলতেন, 'আমি তোমাদের সাথে যে আচরণ করি, তা মানুষকে জানিয়ে দাও। আমি দিনে যা করি এবং রাতে যা করি, সকল কিছুই মানুষকে জানিয়ে দাও'।

কারণ তাঁর জীবনের সকল কিছুই মানুষ অনুসরণ করবে। তাদের জীবনের কোনো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজও মহান আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে সংঘটিত হতে পারে না। কোনো নবী যদি কখনো কোনো কাজ নিজ প্রবৃত্তি অনুসারে করেও থাকেন, তাহলে সাথে সাথে তা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সংশোধন করে দেয়া হয়েছে। কেননা, ইসলামী জীবন ব্যবস্থার মূলনীতি সমূহ শুধুমাত্র আল্লাহ তা'য়ালার কিতাবেই নয়, মহান নবীর জীবন আদর্শ হিসেবেও মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে, আর এই বিধানে আল্লাহ তা'য়ালার অপছন্দনীয় সামান্য কোনো অংশ থাকতে পারবে না।

পৃথিবীতে প্রেরিত প্রত্যেক নবী-রাসূল আল্লাহ তা'য়ালার কাছে একই মর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন না। তাঁদের দায়িত্ব অনুযায়ী মহান আল্লাহ তাঁদেরকে মর্যাদা দান করেছেন। তাঁদের মর্যাদা অনুসারে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁদেরকে অদৃশ্য জগতের জ্ঞান দান করেছিলেন। পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলী কিভাবে তিনি পরিচালনা করছেন, এটা তাঁদেরকে পর্যবেক্ষণ করানো হয়েছে। তিনি কিভাবে সৃষ্টি করেন এবং মৃত্যু ঘটান আবার মৃত থেকে জীবিত করেন তা প্রদর্শন করা হয়েছে। এই পৃথিবী ও অদৃশ্য জগতের মাঝে যে পর্দা অন্তরায় হিসেবে রয়েছে, মহান আল্লাহ সে পর্দা তাঁদের দৃষ্টির সামনে থেকে সরিয়ে এমন সব দৃশ্য দেখিয়েছেন, যে দৃশ্য অবলোকন করলে সাধারণ মানুষ চেতনা হারিয়ে ফেলবে।

এসব জিনিসের প্রতি মানুষ বিশ্বাস স্থাপন করবে, নবীগণ মানুষকে এসব জিনিসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার জন্য আহ্বান জানাবেন। এ কারনেই নবীদেরকে আল্লাহ তা'য়ালা ঐসব জিনিসের সাথে চাক্ষুষ পরিচয় করে দিয়েছেন। অনেকে আবার নবীদের সাথে পৃথিবীর মানুষ দার্শনিকদের তুলনা করে থাকেন। দার্শনিকগণও তো এমন অনেক কথা বলেন, যা দেখা যায় না। অর্থাৎ নবী আর দার্শনিকদেরকে তারা এক কাতারে দাঁড় করাতে চান。

পৃথিবীর দার্শনিকগণ যা বলেন তা অনুমানের ভিত্তিতে বলেন। যেসব দার্শনিক মানুষ হিসেবে নিজের মর্যাদা ও অবস্থান, জ্ঞানের পরিধি অবগত আছেন, তারা কখনো নিজের মতামতই চরম সত্য বলে রায় দেন না। কিন্তু নবী-রাসূল যা বলেন, তা নিজের চোখে দেখে এবং ওহী জ্ঞানের ভিত্তিতে বলেন। নবীগণ অনুমানের ভিত্তিতে কথা বলেন না। কিন্তু দার্শনিকগণ অনুমানের ভিত্তিতে কথা বলে। নবীদের চোখের সামনে গোপন জগতের পর্দা উঠিয়ে যা দেখানো হয়েছে সে সম্পর্কে তাঁরা নিশ্চিত হয়েই কথা বলেন।

পবিত্র কুরআনে সূরা ইউসুফে মহান আল্লাহ তা'য়ালা হযরত ইয়াকুব (আ:) ও তাঁর সন্তান হযরত ইউসুফ (আ:) সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। হযরত ইউসুফ (আ:) ঘটনাক্রমে পিতার সান্নিধ্য থেকে কয়েক বছর যাবৎ বিচ্ছিন্ন ছিলেন। পিতা তাঁর সন্তানের সন্ধান জানতেন না। তাঁর অন্যান্য সন্তানগণ ব্যবসা উপলক্ষ্যে যখন মিশর গিয়েছিল তখন হযরত ইউসুফ (আ:) মিশরের রাষ্ট্রপতি। তিনি জীবিত আছেন এর চিহ্ন স্বরূপ ভাইদের কাছে তাঁর শরীরের একটি জামা দিয়েছিলেন, যেন তাঁর পিতা সান্ত্বনা লাভ করেন।

সেই জামা নিয়ে যখন তাঁর ভাইগণ আসছিল তখন কয়েক শত মাইল দূরে অবস্থান করে হযরত ইয়াকুব (আ:) হযরত ইউসুফ (আ:) এর শরীরের গন্ধ অনুভব করছিলেন। এ ধরনের ক্ষমতা মহান আল্লাহ তাঁর এ নবীকে দান করেছিলেন। কিন্তু এরপরেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সকল নবীই মানুষ ছিলেন। তাদের ভেতরে মানবিক সত্তা ছিল। তাঁরা আল্লাহ তা'য়ালার কোনো অভিনব সৃষ্টি ছিলেন না.। একজন মানুষকে নবী হিসেবে প্রেরণ করা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় ছিল না।

সাধারণ মানুষের এই পৃথিবীতে জীবন ধারনের জন্য যা প্রয়োজন হয়, নবী-রাসূলেরও তাই হত। তাঁরা ক্ষুধা অনুভব করতেন, তাদের প্রাকৃতিক প্রয়োজন হত। রক্ত মাংসে গঠিত ছিল তাদের শরীর। তাঁরাও বেদনা অনুভব করতেন। রোগাক্রান্ত হতেন। জীবিকা অর্জনের জন্য তাঁরাও শ্রম দিতেন। বিবাহিত জীবনে তাঁদেরও সন্তান জন্ম হতো। আল্লাহ তা'য়ালার বিধান পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজনে তাদেরকেও যুদ্ধ বিগ্রহ করতে হয়েছে। কিন্তু তাদের মানবীয় এই সত্তা পরিচালিত হত মহান আল্লাহ তা'য়ালার ইশারায়। কেননা, তাদের জীবনের সবটুকুই তাঁর অনুসারীদের জন্য ছিল অনুসরণীয়।

মুমিনদের জন্য নির্ধারিত যে গুণাবলী এবং পূর্ণমান, সে মানে প্রতিটি মুহূর্ত অবস্থান করা এই পৃথিবীতে একজন মুমিনের পক্ষেও সম্ভব নয়। অর্থাৎ মুমিনের মান ওঠা নামা করে। যখন সে মহান আল্লাহর পছন্দনীয় কাজে লিপ্ত থাকে তখন মুমিন হিসেবে সে পূর্ণমানে অবস্থান করে। আর তাঁর দ্বারা যখন সামান্য ভুল হয়ে যায় তখন সে ঐ পূর্ণমান থেকে সামান্য নীচে অবস্থান করেন। অর্থাৎ আকাংখিত মানে প্রতিটি মুহূর্ত অবস্থান করা মানুষ হিসেবে মুমিনদের জন্য সম্ভব হয় না।

প্রশ্ন হলো, নবী-রাসূলেরও অবস্থা এমন হতো কি না। এ প্রশ্নের উত্তর আমরা পবিত্র কুরআন-হাদীসে অনুসন্ধান করবো। আমরা পবিত্র কুরআনে দেখতে পাই, হযরত নূহ (আ:) এর যুবক সন্তান যখন তাঁরই চোখের সামনে পানিতে ডুবে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করছিল, তখন হযরত নূহ (আ:) এর ভেতরে মানবীয় দুর্বলতা ক্ষণিকের জন্য স্পন্দন সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তাঁর সে সন্তান ছিলো আল্লাহ তা'য়ালার বিধানের শত্রু। মুহূর্ত কয়েকের ভেতরে তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। আল্লাহর বিধানের মুকাবেলায় তিনি যুবক সন্তানের মমতা হৃদয়ে স্থান দেননি।

এ ধরনের নানা ঘটনা বিভিন্ন নবীর জীবনে সাময়িকের জন্য ঘটেছে। কিন্তু মহান আল্লাহ মুহূর্তের ভেতরে নবীকে সংশোধন করেছেন। একজন নবীর নিষ্পাপ হবার অর্থ এই নয় যে, নবীর দ্বারা পাপ সংঘটিত হবার কোনো সম্ভাবনাই ছিলো না। অথবা সব ধরনের পাপ ও ভুল করার ক্ষমতা নবীর সত্তা থেকে মহান আল্লাহ ছিনিয়ে নিয়েছেন। প্রকৃত বিষয় হলো, নবী ভুল করার প্রবণতা রাখেন কিন্তু তাঁর মানবিক আবেগ অনুভুতি, মানবিক গুণাবলী, ইচ্ছা আশা নিরাশার অধিকারী হবার পরেও তিনি এমন আল্লাহভীরু ও সৎ হন যে, তিনি কখনো সচেতনভাবে কোনো ভুল করেননি।

প্রতিটি মানুষের ভেতরে যে খারাপ প্রবৃত্তি অবস্থান করছে, মানুষ যত খারাপ কাজ করে ততই সেই খারাপ প্রবৃত্তির শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। অর্থাৎ খারাপ কাজ বা পাপের কাজই হলো কুপ্রবৃত্তির খোরাক বা আহার। নবীর ভেতরে সেই শক্তি আহার না পেয়ে মৃত্যুবরণ করে। সুতরাং নবীর মধ্যে পাপ করার কোনো আকাংখা সৃষ্টি হতে পারে না। তারপরেও তাঁর দ্বারা যদি সামান্যতম ভুল হতে থাকে, তাহলে মহান আল্লাহ সাথে সাথেই তা সংশোধন করার ব্যবস্থা করেন। কারণ নবীর পদস্খলন শুধু তাঁর পদস্খলন নয়, সমগ্র উম্মতের পদস্খলন। নবী যদি মহাসত্যের বাইরে ভুলের দিকে বিন্দু পরিমাণ এগিয়ে যান, তাহলে সমগ্র পৃথিবী ভুলের দিকে কয়েক শত মাইল এগিয়ে যাবে।

নবী-রাসূল যে নিষ্পাপ ছিলেন এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। গুনাহ তথা নাফরমানীর কাজে জড়িয়ে পড়া, নিষিদ্ধ ও ঘৃণ্য হারাম কাজ করা থেকে নবী-রাসূলকে মহান আল্লাহ রক্ষা করেছেন। এই সংরক্ষণ শুধুমাত্র নবী-রাসূলদের জন্যই নির্দিষ্ট ও সংরক্ষিত। এই গুণ ও বৈশিষ্ট্য শুধুমাত্র নবীদেরকেই দান করে মহান আল্লাহ তাঁদেরকে সম্মানিত করেছেন। সৃষ্টির সকল মানুষের তুলনায় তাদেরকে বিশিষ্ট বানিয়ে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন মর্যাদা তাদেরকে দান করা হয়েছে।

পাপ ও অবাধ্যতা থেকে আল্লাহ তা'য়ালার বিশেষ সংরক্ষণ লাভের এই মর্যাদা শুধুমাত্র নবীদেরই রয়েছে। নবী-রাসূল ব্যতীত এই গুণ-বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব সৃষ্টি জগতে আর কোনো মানুষের নেই এবং কোনো মানুষের তা প্রাপ্যও নয়। নবী-রাসূলগণ এই সংরক্ষণ লাভ করেন শুধুমাত্র বড় বড় পাপ থেকেই নয়, ছোট ছোট পাপ থেকেও তাঁরা এই সংরক্ষণ লাভ করেন। এ কারণে তাদের দ্বারা আল্লাহর সাথে সামান্যতম অবাধ্যতা সংঘটিত হওয়া অসম্ভব।

নবী-রাসূল নিষ্পাপ মাসুম, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা মানবীয় প্রকৃতিই হারিয়ে ফেলেছেন। মানুষ স্বভাবতঃই ভুল-ভ্রান্তির প্রকৃতি সম্পন্ন। মানুষের ইচ্ছা শক্তি ও উদ্যম উদ্যোগ কোনো কোনো সময় দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এ যেমন সত্য, তেমনি সাময়িক ক্রোধ বা অভিমানে ভারাক্রান্ত হয়েও নবী রাসূল এমন কোনো কাজ হঠাৎ করতে পারেন, যা আল্লাহ তা'য়ালা অপছন্দ করেন।

এ অবস্থায় মহান আল্লাহ তাদেরকে সংশোধন করে দেন। সে ভুলকে স্থায়ী হতে দেন না। সে ভুলের প্রতিক্রিয়া বা পরিণতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেন। এসব ক্ষুদ্র ভুলের ওপরে নবীগণ স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকেন না। এমন হতে পারে যে, নবীকে আল্লাহ ভুল করার সুযোগ দিয়ে এ কথা প্রমাণ করেন যে, নবীগণ মানবীয় দুর্বলতার উর্ধ্বে নয়। কিন্তু এ কারণে নবীগণ পাপী হন না বা তাদের মর্যাদাও ক্ষুন্ন হয় না।

সাময়িকের জন্য নবীগণ যে ভুল করতে পারেন বা মহান আল্লাহর বলে দেয়া কথা ভুলে যেতে পারেন, তার বড় প্রমাণ হযরত আদম (আ:) । তিনি ভুল করেছেন, এ উপলব্ধিবোধ তাঁর ভেতরে সৃষ্টি হবার সাথে সাথে তিনি ক্ষমা ভিক্ষা করেছেন, মহান আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে নবুয়‍্যাত দান করেছেন। নবীগণ যাদু প্রভাবিত হতে পারেন। হযরত মূসা (আ:) এর সামনে যখন ফিরাউনের যাদুকররা যাদু নিক্ষেপ করেছিল, সে সময়ের চিত্র সম্পর্কে বলা হয়েছে-

قَالَ بَلْ أَلْقُوا فَإِذَا حِبَالُهُمْ وَعِصِيُّهُمْ يُخَيَّلُ إِلَيْهِ مِنْ سِحْرِهِمْ أَنَّهَا تَسْعَى فَأَوْجَسَ فِي نَفْسِهِ خِيْفَةٌ مُوسَى -

যাদুর প্রভাবে তাঁর (মূসার) কাছে মনে হলো তাদের (যাদুর) রশি ও লাঠিগুলো বুঝি এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে, (এতে মূসা তার অন্তরে কিছুটা ভয় (ও শঙ্কা) অনুভব করলো। (সূরা ত্বাহা-৬৬-৬৭)

আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে অভয় দান করে বলেছিলেন, কোনো ভয় নেই। তুমিই বিজয়ী হবে। তোমার হাতে যা আছে তা নিক্ষেপ করো। তা এখনই তাদের মিথ্যা জিনিসগুলো গিলে ফেলবে। ওরা যা কিছু বানিয়ে এনেছে, তা যাদুকরের প্রতারণা ব্যতীত আর কিছুই নয়। আর যাদুকর কখনই সফলকাম হতে পারে না, তা ওরা যতই শক্তি দেখাক না কেনো।

সে সময় সাধারণ মানুষ যেমন যাদুর প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছিল, হযরত মূসা (আ:) এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। কুরআন বলছে, তিনি ভয় পেয়েছিলেন। এই ভয় পাওয়া, ছিল তাঁর মানবীয় দুর্বলতা। কিন্তু তিনি এই ভয়ের ওপর স্থায়ী ছিলেন না। ক্ষণিকের মধ্যেই তিনি নিজেকে ভয় মুক্ত করেছিলেন। পক্ষান্তরে যাদু কোনো নবীকে বিভ্রান্ত করতে বা তাঁর নবুয়‍্যাতের প্রতি বিরূপ কোনো ক্রিয়া করতে পারে না। স্বয়ং নবী করীম (সা:) এর ওপর দৈহিকভাবে যাদুর ক্রিয়া ঘটেছিল। এ কারণে তিনি তাঁর জীবনে বেশ কষ্ট অনুভব করেছেন।

হযরত ইউনুস (আ:) তাঁর জাতিকে আল্লাহর বিধান গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানালেন। তারা অস্বীকার করেছিল। তিনি তাদেরকে শাস্তির ভয় দেখালেন। বললেন তিনদিনের মধ্যে আযাব আসবে। লোকজন আল্লাহ তা'য়ালার কাছে কাতর প্রর্থনা করেছিল। মহান আল্লাহ শাস্তি মওকুফ করে দিলেন। হযরত ইউনুস (আ:) চিন্তা করলেন, তিনদিনের ভেতরে যখন আযাব এলো না তখন এবার তাঁকে লোকজন মিথ্যাবাদী ধারণা করে তাঁকে হত্যা করবে।

তিনি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আদেশের অপেক্ষা না করে দেশ ত্যাগ করলেন। আল্লাহ তা'য়ালার আদেশ ব্যতীত কোনো নবীর জন্য তাঁর স্থান ত্যাগ করা নবুয়্যাত-মর্যাদার পরিপন্থী। সুতরাং মহান আল্লাহ তাকে গ্রেফতার করলেন। তাঁকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হলো। তাঁকে বিশাল এক মাছ-গ্রাস করেছিল। আল্লাহর কাছে তিনি ক্ষমা চাইলেন। মহান আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করেছিলেন। এ ধরনের অনেক ঘটনা থেকে প্রমাণ হয়, নবীগণ সাময়িক ভুল করলেও মহান আল্লাহ তা সংশোধন করে দিতেন। কিন্তু তাদের সে ভুল মারাত্মক কিছু ছিল না। তা ছিল একেবারেই ক্ষুদ্র পর্যায়ের।

প্রত্যেক নবীর চরিত্রের সনদপত্র মহান আল্লাহ দান করেছেন। নবী করীম (সা:) সম্পর্কে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন-

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُوْلِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا -

(হে মুসলমানরা,) তোমাদের জন্যে অবশ্যই আল্লাহর রাসূলের (জীবনের) মাঝে (অনুকরণযোগ্য) উত্তম আদর্শ রয়েছে, (আদর্শ রয়েছে) এমন প্রতিটি ব্যক্তির জন্যে, যে আল্লাহ তা'য়ালার সাক্ষাৎ পেতে আগ্রহী এবং যে পরকালের (মুক্তির) আশা করে, (সর্বোপরি) যে বেশি পরিমাণে আল্লাহ তা'য়ালাকে স্মরণ করে। (সূরা আহযাব-২১)

নবী করীম (সা:) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন-

وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ

নিশ্চয়ই আপনি সর্বোত্তম চরিত্রের ওপরে প্রতিষ্ঠিত। (সূরা ক্বালাম-৪)

সূরা ইয়াসিনের প্রথম আয়াতেই বিজ্ঞানময় কুরআনের শপথ করে আল্লাহ তা'য়ালা নবী করীম (সা:) সম্পর্কে বলেছেন, নিশ্চয়ই আপনি সবচেয়ে সহজ-সরল এবং নির্ভুল পথের ওপরে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রেরিত নেতাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা। হযরত ইবরাহীম (আ:) ও আল্লাহর কাছে অতীব মর্যাদাবান নবী এবং মানবতার জন্য উত্তম আদর্শ ছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর সম্পর্কে বলেন-

قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ ج

তোমাদের জন্যে ইবরাহীম ও তাঁর অনুসারীদের (ঘটনার) মাঝে রয়েছে (অনুকরণযোগ্য) আদর্শ। (সূরা মুমতাহিনাহ-৪)

সূরা মরিয়মে হযরত ইবরাহীম (আ:) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন, তিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ একজন মর্যাদাবান নবী। একই সূরায় হযরত মূসা, হযরত ইদরীস ও হযরত ইসমাঈল (আ:) এর প্রশংসা করেছেন। নবী-রাসূল মানব জাতির জন্য উত্তম আদর্শবান ব্যক্তি ছিলেন। এ কারণে মহান আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেন-

أُوْلَئِكَ الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ طَ فَإِنْ تَكْفُرْ بِهَا هَؤُلَاءِ فَقَدْ وَكَّلْنَا بِهَا قَوْمًا لَّيْسُوا بِهَا بِكَافِرِينَ - أُوْلَائِكَ الَّذِيْنَ هَدَى اللَّهُ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهُ ط قُل لا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا طَ إِنَّ هُوَ إِلَّا ذِكْرَى لِلْعَالَمِينَ عِ

এরাই ছিলো সেসব লোক, যাদের আমি কিতাব, প্রজ্ঞা ও নবুয়‍্যাত দান করেছি, (আজ) যদি তারা তা অস্বীকার করে (তাতে আমার কোনো ক্ষতি নেই), আমি তো (অতীতে) এমন এক সম্প্রদায়ের ওপর এ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলাম, যারা কখনো (এগুলো) প্রত্যাখ্যান করেনি। আল্লাহ (এদের) সবাইকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন; (হে নবী) আপনি এদের পথেরই অনুসরণ করুন। (সূরা আনয়াম-৮৯-৯০)

প্রত্যেক নবীই ছিলেন মহান আল্লাহর মুখাপেক্ষী। তাঁরা মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করতেন। বদরের প্রান্তরে নবী করীম (সা:) সিজদায় অবনত হয়ে মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করেছেন। তিনি এ দাবী করেননি যে আমি একাই যথেষ্ট, আমার সামনে যে শত্রু আসবে সে জ্বলে পুড়ে ভষ্ম হয়ে যাবে। হযরত আইয়ুব (আ:) রোগে আক্রান্ত হয়ে মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করেছেন। তিনি স্বয়ং এ. দাবী করেননি যে, আমি রোগ মুক্ত করতে সক্ষম।

হযরত ইউনুস (আ:) বিপদগ্রস্থ হয়ে আল্লাহ তা'য়ালার সাহায্য কামনা করেছেন, তিনি নিজে এ দাবী করেননি যে, আমি বিপদ থেকে মানুষকে মুক্ত করতে সক্ষম। পবিত্র কুরআনে তাদের ইতিহাস বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হলো, মহান নবী-রাসূল ছিলেন আল্লাহ তা'য়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদাবান বান্দা। তাঁরাই যখন রোগে আক্রান্ত হয়ে আল্লাহ তা'য়ালার মুখাপেক্ষী হয়েছেন, বিপদগ্রস্থ হয়ে তাঁরই কাছে সাহায্য কামনা করেছেন, পৃথিবীর সকল মানুষও যেনো একমাত্র মহান আল্লাহর কাছেই সাহায্য চায়। কোনো মৃত মানুষ বা পৃথিবীর কোনো শক্তির কাছে যেন সাহায্যের জন্য আবেদন না করে মানুষ যেনো আরেক মানুষের মুখাপেক্ষী না হয়।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী-রাসূলদের মর্যাদা

📄 নবী-রাসূলদের মর্যাদা


নবী ও রাসূল এ দু'টো শব্দই আরবী এবং শব্দ দু'টোর অর্থও পৃথক। নবী শব্দের অর্থ সম্পর্কে অভিধানবিদগণের মধ্যে পার্থক্য বিরাজমান। কেউ কেউ 'নবী' শব্দটিকে আরবী 'নাবা' শব্দ থেকে গঠিত বলেছেন এবং এর অর্থ করেছেন 'সংবাদ'। কেউ কেউ বলেছেন, আরবী 'নাবুউ' ধাতু থেকে 'নবী' শব্দের উৎপত্তি এবং অর্থ হচ্ছে 'উন্নতি ও উচ্চতা'। এ অর্থের দিক থেকে এর মানে হয় 'উন্নত মর্যাদা' ও 'সুউচ্চ অবস্থান'। আবার কেউ কেউ বলেছেন, মূলত শব্দটি 'নাবী' শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে এবং এর অর্থ 'পথ'। আর তাদেরকে এ জন্যে 'নবী' বলা হয়েছে যে, তাঁরা হচ্ছেন মানুষের সাথে মহান আল্লাহর সম্পর্ক সৃষ্টি করে দেয়ার পথ বা তাঁরা হলেন মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার দিকে যাবার পথ।

আরবী 'রাসূল' শব্দের অর্থ 'প্রেরিত'। এ অর্থের দিক থেকে আরবী ভাষায় দূত, পয়গম্বর, বার্তাবাহক ও রাষ্ট্রের দূতের জন্যেও এ 'রাসূল' শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আর পবিত্র কুরআনে এ শব্দটি এমনসব ফিরিশতার জন্যও ব্যবহৃত হয়েছে যাদেরকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ দায়িত্বে নিযুক্ত করা হয় অথবা এমন সব উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত মানুষকে 'রাসূল' নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে যাদেরকে আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের কাছে নিজের বাণী পৌঁছানোর জন্য নিযুক্ত করেছেন।

পবিত্র কুরআনে সাধারণত এ শব্দ দু'টি একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কুরআনে দেখা যায়, একই ব্যক্তিকে কোথাও শুধু নবী বলা হয়েছে এবং কোথাও বা শুধু রাসূল বলা হয়েছে। অথবা কোথাও নবী-রাসূল একই সাথে বলা হয়েছে। কিন্ত কোনো কোনো স্থানে রাসূল ও নবী শব্দ দুটো এমনভাবেও ব্যবহৃত হয়েছে যা থেকে অনুভব করা যায়, এ উভয়ের মধ্যে মর্যাদা বা কাজের ধরনের দিক দিয়ে কোনো পারিভাষিক পার্থক্য রয়েছে। সূরা হজ্জ-এর ৫২ নং আয়াতে নবী ও রাসূল শব্দ দুটি পৃথক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

সূরা হজ্জ-এর উক্ত আয়াতের ভিত্তিতে নবী ও রাসূল শব্দ দু'টির পার্থক্যের ধরন কি তা নিয়ে কুরআন ব্যাখ্যাতাদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কেউই চূড়ান্ত ও অভ্রান্ত দলীল প্রমাণের ভিত্তিতে নবী ও রাসূল-এর মধ্যে পৃথক মর্যাদা চিহ্নিত করতে পারেননি। গবেষকগণ শুধু এ নিশ্চয়তা সহকারে বলেছেন, রাসূল শব্দটি নবী শব্দের তুলনায় বিশিষ্টতাসম্পন্ন। অর্থাৎ প্রত্যেক রাসূল নবী হন কিন্তু প্রত্যেক নবী রাসূল হন না। অর্থাৎ নবীদের মধ্যে রাসূল শব্দটি এমন সব নবীর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে যাদেরকে সাধারণ নবীদের তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিলো।

ইতোপূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি, মর্যাদা নিরূপণ হয় জ্ঞান, বিবেক-বুদ্ধি, উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং কর্মের কারণে। নবুয়‍্যাত পূর্ব জীবনে নবী-রাসূলের চিন্তাধারা, নৈতিক চরিত্র ও বাস্তব জীবনধারা ছিলো সর্বোচ্চ মানের। কারণ হঠাৎ করেই কোনো মানুষকে নবী-রাসূল হিসাবে মনোনীত করা হয় না। রূহের জগতেই ফায়সালা হয়ে যায় আল্লাহ তা'য়ালা কোন্ ব্যক্তিকে নবী হিসাবে মনোনীত করবেন। যেমন হযরত জাকারিয়া (আ:) কে আল্লাহ তা'য়ালা জানিয়েছিলেন-

يَا زَكَرِيَّا إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلَمِنِ اسْمُه يَحْى لا لَمْ نَجْعَل لَّهُ مِنْ قَبْلُ سَمِيًّا -

হে জাকারিয়া, আমি তোমাকে একটি ছেলের সুসংবাদ দিচ্ছি। তার নাম হবে ইয়াহ্ইয়া, এর পূর্বে এ নামে আমি কোনো মানুষের নামকরণ করিনি। (সূরা মারইয়াম-৭)

কোনো দিক থেকে ত্রুটি সম্পন্ন কোনো মানুষকে মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী-রাসূল নির্বাচিত করেননি। নবী-রাসূল নির্বাচিত হয়েছেন এমন ধরনের মানুষ যারা চেহারা, সুরত, ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতার দিক দিয়ে হয়েছেন সর্বোত্তম, যাদের ভেতর বাইরের প্রতিটি দিক অন্তর ও দৃষ্টিকে প্রভাবিত করেছে। কোনো নবী-রাসূলকে এমন কোনো দোষ সহকারে পাঠানো হয়নি যে কারণে তিনি লোকদের মধ্যে হাস্যাস্পদ হন অথবা লোকজন তাকে হেয়-প্রতিপন্ন করে। প্রশ্ন উঠতে পারে, হযরত মূসা (আ:) তো তোতলা ছিলেন।

এ প্রশ্নের জবাবে আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, হযরত মূসা (আ:) এর নামে প্রচলিত এ কথাটি কুরআন-হাদীসের নয়। ইয়াহূদী- খৃষ্টানদের রচিত বাইবেল ও তালমুদ থেকে এ কথাটি গ্রহণ করা হয়েছে। বাইবেলের যাত্রা পুস্তকে ৪: ১০- মূসা (আ:) এর কথার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, 'হায় সদাপ্রভু! আমি বাকপটু নহি, ইহার পূর্বেও ছিলাম না, বা এই দাসের সহিত তোমার আলাপ করিবার পরেও নহি। কারণ আমি জড়মুখ ও জড় জিহ্বা'। তালমুদে একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, শৈশবে হযরত মূসা যখন ফিরআউনের গৃহে লালিত পালিত হচ্ছিলেন তখন একদিন তিনি ফিরআউনের মাথার মুকুট নামিয়ে নিজের মাথায় পরেন। এতে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়, এ শিশুটি এই কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে করেছে না এটি শিশুর শিশুসুলভ চপলতা। এ প্রশ্নের মীমাংসা করা হয় এভাবে যে, শিশুর সম্মুখে স্বর্ণ ও আগুন রাখা হবে। সিদ্ধান্ত অনুসারে তাই রাখা হলো। শিশু মূসা আগুন উঠিয়ে মুখে দিলেন। এতে তাঁর জিহ্বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হলো এবং তিনি তোতলা হয়ে গেলেন।

এই কাহিনী বাইবেল ও তালমুদ থেকে কুরআনের কতিপয় তাফসীরে স্থানান্তরিত হয়েছে। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তি এ কথা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। কারণ শিশু যদি আগুনেও হাত দেয় তাহলে সে আগুন উঠিয়ে মুখে দেয়া তার পক্ষে কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। কারণ আগুনের তাপ বা দহন জ্বালা অনুভব করার সাথে সাথেই তো শিশু তা ফেলে দিবে অথবা হাত সরিয়ে নিবে।

কুরআনের বর্ণনা থেকে আমরা স্পষ্ট অনুভব করতে পারি যে, হযরত মূসা (আ:) নবুয়‍্যাত লাভের পরে দাওয়াতী কাজের লক্ষ্যে যে ধরনের বাগ্মীতার প্রয়োজন তা মূসা (আ:) নিজের মধ্যে অভাব অনুভব করছিলেন। অর্থাৎ তিনি প্রথম দিকে বাকপটু ছিলেন না। ইতোপূর্বে তিনি কখনো বক্তৃতা দেননি আর বিষয়টি ফিরআউনের জানা ছিলো, কেননা তিনি ফিরআউনের ঘরেই প্রতিপালিত হয়েছিলেন। বক্তৃতা দেয়ার অভ্যাস যাদের নেই, তারা বক্তৃতা দিতে গেলে স্বভাবসুলভ সংকোচ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্যেই তিনি মানুষকে আল্লাহর দ্বীন বুঝানোর মতো শব্দ চয়ন করে মূল বিষয়টি বোধগম্য ভাষায় পরিবেশন করার যোগ্যতা আল্লাহর কাছে চেয়েছিলেন।

হযরত হারুন (আ:) ছিলেন বাকপটু, এ কারণে তিনি হযরত হারুন (আ:) কে নিজের সহযোগী হিসাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। পরবর্তীতে হযরত মূসা (আ:) এর এ দুর্বলতা দূর হয়ে গিয়েছিলো। হযরত মূসা (আ:) কে আল্লাহ কত উচ্চে মর্যাদা দিয়েছিলেন যে, মূসা (আ:) যেনো পৃথিবীর আলো বাতাসে আসতে না পারেন এ জন্যে ফিরআউন অগণিত গর্ভবতী নারীকে হত্যা করেছিলো। অসংখ্য সদ্যজাত শিশু সন্তানকে হত্যা করেছিলো। নিজের রাষ্ট্র ক্ষমতা নিরাপদ করার উদ্দেশ্যেই ফিরআউন এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলো। শিশু মূসাকে দেখার সাথে সাথে তো তাঁকে হত্যা করার কথা।

কিন্তু মহান আল্লাহ ফিরআউনসহ অন্যান্য সকলের মনে হযরত মূসার প্রতি গভীর মমতা সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁকে আল্লাহ তা'য়ালা কি বিশাল মর্যাদা দিয়েছিলেন যে তিনি তাঁকে জানিয়ে দিলেন, তুমি আমার দৃষ্টির সম্মুখেই ছিলে। মহান আল্লাহর রহমতের দৃষ্টির সম্মুখে থাকা যে কত বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার তা কল্পনাও করা যায় না। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَأَلْقَيْتُ عَلَيْكَ مَحَبَّةٌ مِّنِّي جِ وَلَتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي

হে মূসা, আমি আমার পক্ষ থেকে ফিরআউন ও অন্য মানুষদের মনে তোমার জন্যে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছিলাম, যেনো তুমি আমার চোখের সামনেই বড় হতে পারো। (সূরা ত্বাহা-৩৯)

হযরত ইউসুফ (আ:) কৈশরে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা নিজ পিতা হযরত ইয়াকুব (আ:)-এর কাছে বর্ণনা করার পর তিনি নিজ সন্তানকে বলেছিলেন-

وَكَذَلِكَ يَجْتَبِيكَ رَبُّكَ وَيُعَلِّمُكَ مِنْ تَأْوِيْلِ الأَحَادِيثِ

এমনি করেই তোমার মালিক তোমাকে (নবুয়‍্যাতের জন্যে) মনোনীত করবেন এবং তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা (সহ দুনিয়ার জ্ঞান) শিক্ষা দিবেন। (সূরা ইউসুফ-৬)

মহান আল্লাহ তা'য়ালা হযরত ইউসুফ (আ:) কে এভাবে উচ্চ মর্যাদায় ভূষিত করেছিলেন। হযরত ইয়াহইয়া (আ:) এর প্রশংসা করে আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন-

يَا يَحْيِي خُذِ الْكِتَابَ بِقُوَّة ط وَآتَيْنَاهُ الْحُكْمَ صَبَيًّا لَا وَحَنَانًا مِّنْ لَّدُنَّا وَزَكَاةً طَ وَكَانَ تَقِيًّا وَبَرَّام بِوَالِدَيْهِ وَلَمْ يَكُنْ جَبَّارًا عَصِيًّا وَسَلَمٌ عَلَيْهِ يَوْمَ وُلِدَ وَيَوْمَ يَمُوْتُ وَيَوْمَ يُبْعَثُ حَيَّاعِ

(ইয়াহইয়া যখন বড় হলো, তখন আমি তাকে বললাম) হে ইয়াহইয়া, আমার কিতাবকে তুমি শক্তভাবে ধারণ করো, প্রকৃতপক্ষে আমি তাকে ছেলে বেলায়ই বিচার বুদ্ধি দান করেছিলাম। সে আমার একান্ত কাছ থেকেই হৃদয়ের কোমলতা ও পবিত্রতা লাভ করলো, সে ছিলো আসলেই একজন পরহেযগার ব্যক্তি। তদুপরি সে ছিলো পিতা-মাতার একান্ত অনুগত, কখনো অবাধ্য ও নাফরমান ছিলো না। তার প্রতি শান্তি বর্ষিত হয়েছিলো যেদিন তাকে জন্ম দেয়া হয়েছে, (শান্তি বর্ষিত হবে সেদিন) যেদিন সে মৃত্যুবরণ করবে এবং যেদিন পুনরায় সে জীবিত হয়ে পুনরুত্থিত হবে। (সূরা মারইয়াম-১২-১৫)

প্রত্যেক নবী-রাসূলই মহান আল্লাহর কাছে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তবে তাদের মর্যাদার ধরণ ছিলো পৃথক। হযরত ঈসা (আ:) কে আল্লাহ তা'য়ালা মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হবার পরপরই কথা বলার মর্যাদাসহ অন্যান্য মর্যাদা দান করেছিলেন। ভূমিষ্ঠ হবার পর লোকজন যখন নানা ধরনের প্রশ্নের অবতারণা করেছিলো তখন তিনি উপস্থিত লোকদের বলেছিলেন-

قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ قف آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنْتُ سِ وَأَوْصَانِي بالصَّلوة وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا وَبَرًّا بِوَالِدَتي رَ وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّارًا شَقِيًّا - وَالسَّلَمُ عَلَيَّ يَوْمَ وُلِدْتُ وَيَوْمَ أَمُوْتُ وَيَوْمَ أَبْعَثُ حَيًّا -

আমি আল্লাহ তা'য়ালার বান্দাহ্, তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী বানিয়েছেন, যেখানেই আমি থাকি না কেনো তিনি আমাকে তাঁর অনুগ্রহভাজন করবেন, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন আমি জীবিত থাকি ততদিন যেন আমি নামাজ প্রতিষ্ঠা করি এবং যাকাত প্রদান করি। আমি যেন মায়ের প্রতি অনুগত থাকি, আল্লাহর শোকর, তিনি আমাকে নাফরমান করে পয়দা করেননি। আমার ওপর শান্তি, যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, শান্তি সেদিন যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করবো এবং যেদিন আমি জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হবো। (সূরা মারইয়াম-৩০-৩৩)

হযরত ইবরাহীম (আ:) কে আল্লাহ তা'য়ালা উচ্চ মর্যাদা দান করে তাঁকে মুসলিম মিল্লাতের পিতা হিসাবে ঘোষণা করেছেন-

هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ طَ مِّلَّةَ أَبِيْكُمْ إِبْرَاهِيمَ طَ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ لا

তিনি (পৃথিবীর নেতৃত্বের জন্যে) তোমাদেরই মনোনীত করেছেন এবং (এ) জীবন বিধানের ব্যাপারে তিনি তোমাদের ওপর কোনো সঙ্কীর্ণতা রাখেননি, (তোমরা প্রতিষ্ঠিত থেকো) তোমাদের (জাতির) পিতা ইবরাহীমের দ্বীনের ওপর; সে আগেই তোমাদের 'মুসলিম' নাম রেখেছিলো। (সূরা হজ্জ-৭৮)

মহান মালিক আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আ:) এর প্রশংসা করে বলেছেন-

وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِبْرَاهِيمَ طَ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَّبِيًّا -

এই কিতাবে তুমি ইবরাহীমকে স্মরণ করো, অবশ্যই সে ছিলো এক সত্যবাদী নবী। (সূরা মারইয়াম-৪১)

وَلَقَدْ آتَيْنَا إِبْرَاهِيمَ رُشْدَه مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا بِهِ عَالِمِينَ

আমি পূর্বেই ইবরাহীমকে ভালোমন্দ বিচারের জ্ঞান দান করেছিলাম এবং আমি সে সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলাম। (সূরা আম্বিয়া-৫১)

তাঁর পিতা ছিলেন নমরুদ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সরকার, দেশের জনগণ ও নিজ পিতাকে পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত দেখে তিনি পিতাকে বলেছিলেন-

يَا أَبَتِ إِنِّي قَدْ جَاءَنِي مِنَ الْعِلْمِ مَا لَمْ يَأْتِكَ فَاتَّبِعْنِي أَهْدِكَ صِرَاطًا سَوِيًّا -

হে আমার পিতা, আমার কাছে (আল্লাহর সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে) যে জ্ঞান এসেছে তা তোমার কাছে আসেনি, অতএব তুমি আমার কথা শোনো, আমি তোমাকে সঠিক পথ দেখাবো। (সূরা মারইয়াম-৪৩)

হযরত লূত (আ:) সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেছেন-

وَلُوْطًا آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ تَعْمَلُ الْخَبَائِثَ طَ إِنَّهُمْ كَانُوْا قَوْمَ سَوْءٍ فَاسِقِيْنَ لا وَأَدْخَلْنَاهُ فِي رَحْمَتِنَا طَ إِنَّهُ مِنَ الصَّالِحِينَ

(ইবরাহীমের মতো) আমি লূতকেও প্রজ্ঞা দান করেছিলাম, তাকেও আমি এমন একটি জনপদ থেকে উদ্ধার করে এনেছি যার অধিবাসীরা অশ্লীল কাজ করতো; সত্যিই তারা ছিলো জঘন্য বদ ও গোনাহগার জাতি, আর আমি তাকে আমার অনুগ্রহভাজন করেছি, সে ছিলো একজন সৎকর্মশীল। (সূরা আম্বিয়া-৭৪-৭৫)

হযরত ইসহাক (আ:) ও হযরত ইয়াকুব (আ:) সম্পর্কে বলতে গিয়ে আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন-

وَكُلًّا جَعَلْنَا نَبِيًّا وَوَهَبْنَا لَهُم مِّنْ رَّحْمَتِنَا وَجَعَلْنَا لَهُمْ لِسَانَ صِدْقٍ عَلِيَّاعِ

এদের সবাইকে আমি নবী বানিয়েছি। আমি তাদের ওপর আমার আরো বহু অনুগ্রহ দান করেছি এবং মানুষদের মধ্যে আমি তাদের সুউচ্চ সম্মানও দান করেছি। (সূরা মারইয়াম-৪৯-৫০)

হযরত ইসমাঈল (আ:) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন-

وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ رَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُوْلًا نَّبِيًّاج وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَهُ بِالصَّلوةِ وَالزَّكَاةِ وَكَانَ عِنْدَ رَبِّهِ مَرْضِيًّا -

এ কিতাবে তুমি ইসমাঈলের কথাও স্মরণ করো, নিশ্চয়ই সে ছিলো যথার্থ প্রতিশ্রুতি পালনকারী, আর সে ছিলো রাসূল ও নবী। সে তার আপনজনদের নামাজ প্রতিষ্ঠা ও যাকাত আদায় করার আদেশ দিতো, সে ছিলো তার মালিকের (আল্লাহর) একান্ত পছন্দনীয় ব্যক্তি। (সূরা মারইয়াম-৫৪-৫৫)

হযরত ইদরীস (আ:) সম্পর্কে বলা হয়েছে-

وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِدْرِيسَ زِ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَّبِيًّا قِ لَا وَّرَفَعْنَاهُ مَكَانًا عَلِيًّا

তুমি এ কিতাবে ইদরীসের কথাও স্মরণ করো, সেও ছিলো একজন সত্যবাদী নবী। আমি তাকে উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন করেছিলাম। (সূরা মারইয়াম-৫৬-৫৭)

وَوَهَبْنَا لِدَاوُودَ سُلَيْمَانَ طَ نِعْمَ الْعَبْدُ طَ إِنَّهُ أَوَّابٌ

আমি দাউদকে ছেলে হিসাবে সুলাইমানকে দান করেছি, সে ছিলো আমার উত্তম একজন বান্দা, সে অবশ্যই ছিলো তার মালিকের প্রতি নিষ্ঠাবান। (সূরা ছোয়াদ-৩০)

وَإِسْمَاعِيلَ وَإِدْرِيسَ وَذَا الْكِفْلِ ط كُلٌّ مِّنَ الصَّابِرِينَ جِ وَأَدْخَلْنَاهُمْ فِي رَحْمَتِنَا ط إِنَّهُم مِّنَ الصَّالِحِينَ

ইসমাঈল, ইদরীস ও যুলকিফল, এরা সবাই আমার ধৈর্যশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। আমি তাদের আমার রহমতের মধ্যে দাখিল করলাম, কারণ তারা ছিলো নেককার মানুষদের দলভুক্ত। (সূরা আম্বিয়া-৮৫-৮৬)

وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّنَ عَلَى بَعْضٍ

আমি একেকজন নবীকে একেকজনের ওপর মর্যাদা দান করেছি। (সূরা বনী ইসরাঈল-৫৫)

নবী-রাসূলদের অসীম মর্যাদা দিয়েছেন আল্লাহ তা'য়ালা। তাদের সাথে বিরোধিতা বা তাদের কথা অমান্য করা অথবা তাদের সাথে কোনো প্রকার বেয়াদবি করা মহান আল্লাহর সাথে বিরোধিতা করার শামিল বলে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা দেয়া হয়েছে-

وَمَنْ يُشَاقِقِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

আর যারাই এভাবে আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে, তাদের জানা উচিত আল্লাহ তাদের কঠোর আযাব দিবেন। (সূরা আনফাল-১৩)

নবী-রাসূলদের আল্লাহ তা'য়ালা এত উচ্চে মর্যাদা দিয়েছেন যে, প্রত্যেক জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হয় তাদের প্রতি প্রেরিত নবী-রাসূলের মাধ্যমে। একটি জাতিকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে দেয়া হবে অথবা তাদেরকে মর্যাদার আসনে সমাসীন করা হবে, তা নির্ধারণ করার জন্যই নবী-রাসূল প্রেরণ করা হয়। জাতি যদি তাদের প্রতি প্রেরিত নবী- রাসূলের আদর্শ অনুসরণ করে, তাহলে সে জাতিকে আল্লাহ তা'য়ালা উন্নতি সমৃদ্ধির স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দিবেন এবং তাদের জীবনের প্রত্যেক স্তরে বিরাজ করবে শান্তি। অমুসলিম দুনিয়ার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখা যায় তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবন বলতে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। সর্বত্র অশান্তির দাবানলে জ্বলতে জ্বলতে জীবনকে নিজেদের জন্যে এক দুর্বিষহ বোঝা মনে করছে, আর এ জন্যেই তারা 'স্বেচ্ছা মৃত্যুর অধিকার' এর জন্যে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে।

জাতি যদি নবীর শিক্ষা থেকে দূরে সরে যায় তাহলে তাদের জীবনে নেমে আসবে অশান্তির দাবানল। জাতি যদি নবীর সাথে ইনসাফ করে অর্থাৎ নবীর আনুগত্য করে, তাহলে সে জাতি আল্লাহ তা'য়ালার কাছ থেকে ইনসাফ লাভের অধিকারী হয়ে যায় এবং মহান আল্লাহ সে জাতির প্রতি ইনসাফ করেন। আর জাতি যদি নবী বা নবীর আনিত আদর্শের সাথে ইনসাফ না করে তাহলে তাদের ভাগ্যে অশান্তিই নির্ধারিত হয়। এর সবথেকে বড় প্রমাণ হলো বর্তমানে মুসলিম মিল্লাত। পৃথিবীতে প্রচুর অর্থবিত্ত, সম্পদ ও জনশক্তির অধিকারী হয়েও এরা আজ লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, অপমানিত, অবহেলিত, নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত।

কারণ মুসলিম মিল্লাতের ভাগ্য জড়িয়ে রয়েছে নবী করীম (সা:) এর মর্যাদার সাথে। তিনি যে আদর্শ উপহার দিয়েছেন, সেই আদর্শের প্রতি যতদিন মুসলিম মিল্লাত সম্মান প্রদর্শন করে তা অনুসরণ করেছে, ততদিন এ মিল্লাত পৃথিবীতে মর্যাদার আসনে আসীন ছিলো। যখনই তারা এ আদর্শের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করেছে, তখনই তাদের ললাটের লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্মম নির্যাতন আর নিষ্পেষন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَلِكُلِّ أُمَّةٍ رَّسُوْلٌ ج فَإِذَا جَاءَ رَسُولُهُمْ قُضِيَ بَيْنَهُم بِالْقِسْطِ وَهُمْ لَا يُظْلَمُوْنَ

প্রত্যেক উম্মতের জন্যেই একজন রাসূল আছে, অতপর যখনি তাদের কাছে তাদের রাসূল এসে যায়, তখন সিদ্ধান্ত করার কাজটি ইনসাফের সাথে সম্পন্ন হয়ে যায়, তাদের ওপর কখনো যুলুম করা হবে না। (সূরা ইউনুস-৪৭)

মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলিম মিল্লাতের ভাগ্যে যে ইনসাফের বিষয়টি নির্ধারিত হয়ে রয়েছে, তাহলো মুসলিম মিল্লাত যদি নবী করীম (সা:) এর আদর্শ অনুসরণ করে তাহলে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে মর্যাদার সুউচ্চ আসন। আর যদি তারা এ আদর্শের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করে তাহলে তাদের জন্যে রয়েছে দাসত্বের জীবন। আর এটাই হলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ইনসাফ, এ ব্যাপারে মুসলিম মিল্লাতের প্রতি সামান্যতম যুলুম করা হয়নি এবং আগামীতেও হবে না।

ইতিহাস কথা বলে, যে জাতির প্রতি আল্লাহ তা'য়ালা নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং প্রেরিত নবী-রাসূলের মর্যাদাগত কারণে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর অমোঘ নিয়ম অনুযায়ী সেই একই ইনসাফ করেছেন। যে জাতি নবী-রাসূলের প্রতি ইনসাফ করেনি, তারা অভিশাপগ্রস্ত হয়েছে আর যারা ইনসাফ করেছে তারা মর্যাদার আসনে আসীন হয়েছে।

নবী ও রাসূল এ দু'টো শব্দই আরবী এবং শব্দ দু'টোর অর্থও পৃথক। নবী শব্দের অর্থ সম্পর্কে অভিধানবিদগণের মধ্যে পার্থক্য বিরাজমান। কেউ কেউ 'নবী' শব্দটিকে আরবী 'নাবা' শব্দ থেকে গঠিত বলেছেন এবং এর অর্থ করেছেন 'সংবাদ'। কেউ কেউ বলেছেন, আরবী 'নাবুউ' ধাতু থেকে 'নবী' শব্দের উৎপত্তি এবং অর্থ হচ্ছে 'উন্নতি ও উচ্চতা'। এ অর্থের দিক থেকে এর মানে হয় 'উন্নত মর্যাদা' ও 'সুউচ্চ অবস্থান'। আবার কেউ কেউ বলেছেন, মূলত শব্দটি 'নাবী' শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে এবং এর অর্থ 'পথ'। আর তাদেরকে এ জন্যে 'নবী' বলা হয়েছে যে, তাঁরা হচ্ছেন মানুষের সাথে মহান আল্লাহর সম্পর্ক সৃষ্টি করে দেয়ার পথ বা তাঁরা হলেন মহান মালিক আল্লাহ তা'য়ালার দিকে যাবার পথ।

আরবী 'রাসূল' শব্দের অর্থ 'প্রেরিত'। এ অর্থের দিক থেকে আরবী ভাষায় দূত, পয়গম্বর, বার্তাবাহক ও রাষ্ট্রের দূতের জন্যেও এ 'রাসূল' শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আর পবিত্র কুরআনে এ শব্দটি এমনসব ফিরিশতার জন্যও ব্যবহৃত হয়েছে যাদেরকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ দায়িত্বে নিযুক্ত করা হয় অথবা এমন সব উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত মানুষকে 'রাসূল' নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে যাদেরকে আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের কাছে নিজের বাণী পৌঁছানোর জন্য নিযুক্ত করেছেন।

পবিত্র কুরআনে সাধারণত এ শব্দ দু'টি একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কুরআনে দেখা যায়, একই ব্যক্তিকে কোথাও শুধু নবী বলা হয়েছে এবং কোথাও বা শুধু রাসূল বলা হয়েছে। অথবা কোথাও নবী-রাসূল একই সাথে বলা হয়েছে। কিন্ত কোনো কোনো স্থানে রাসূল ও নবী শব্দ দুটো এমনভাবেও ব্যবহৃত হয়েছে যা থেকে অনুভব করা যায়, এ উভয়ের মধ্যে মর্যাদা বা কাজের ধরনের দিক দিয়ে কোনো পারিভাষিক পার্থক্য রয়েছে। সূরা হজ্জ-এর ৫২ নং আয়াতে নবী ও রাসূল শব্দ দুটি পৃথক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

সূরা হজ্জ-এর উক্ত আয়াতের ভিত্তিতে নবী ও রাসূল শব্দ দু'টির পার্থক্যের ধরন কি তা নিয়ে কুরআন ব্যাখ্যাতাদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কেউই চূড়ান্ত ও অভ্রান্ত দলীল প্রমাণের ভিত্তিতে নবী ও রাসূল-এর মধ্যে পৃথক মর্যাদা চিহ্নিত করতে পারেননি। গবেষকগণ শুধু এ নিশ্চয়তা সহকারে বলেছেন, রাসূল শব্দটি নবী শব্দের তুলনায় বিশিষ্টতাসম্পন্ন। অর্থাৎ প্রত্যেক রাসূল নবী হন কিন্তু প্রত্যেক নবী রাসূল হন না। অর্থাৎ নবীদের মধ্যে রাসূল শব্দটি এমন সব নবীর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে যাদেরকে সাধারণ নবীদের তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিলো।

ইতোপূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি, মর্যাদা নিরূপণ হয় জ্ঞান, বিবেক-বুদ্ধি, উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং কর্মের কারণে। নবুয়‍্যাত পূর্ব জীবনে নবী-রাসূলের চিন্তাধারা, নৈতিক চরিত্র ও বাস্তব জীবনধারা ছিলো সর্বোচ্চ মানের। কারণ হঠাৎ করেই কোনো মানুষকে নবী-রাসূল হিসাবে মনোনীত করা হয় না। রূহের জগতেই ফায়সালা হয়ে যায় আল্লাহ তা'য়ালা কোন্ ব্যক্তিকে নবী হিসাবে মনোনীত করবেন। যেমন হযরত জাকারিয়া (আ:) কে আল্লাহ তা'য়ালা জানিয়েছিলেন-

يَا زَكَرِيَّا إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلَمِنِ اسْمُه يَحْى لا لَمْ نَجْعَل لَّهُ مِنْ قَبْلُ سَمِيًّا -

হে জাকারিয়া, আমি তোমাকে একটি ছেলের সুসংবাদ দিচ্ছি। তার নাম হবে ইয়াহ্ইয়া, এর পূর্বে এ নামে আমি কোনো মানুষের নামকরণ করিনি। (সূরা মারইয়াম-৭)

কোনো দিক থেকে ত্রুটি সম্পন্ন কোনো মানুষকে মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী-রাসূল নির্বাচিত করেননি। নবী-রাসূল নির্বাচিত হয়েছেন এমন ধরনের মানুষ যারা চেহারা, সুরত, ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতার দিক দিয়ে হয়েছেন সর্বোত্তম, যাদের ভেতর বাইরের প্রতিটি দিক অন্তর ও দৃষ্টিকে প্রভাবিত করেছে। কোনো নবী-রাসূলকে এমন কোনো দোষ সহকারে পাঠানো হয়নি যে কারণে তিনি লোকদের মধ্যে হাস্যাস্পদ হন অথবা লোকজন তাকে হেয়-প্রতিপন্ন করে। প্রশ্ন উঠতে পারে, হযরত মূসা (আ:) তো তোতলা ছিলেন।

এ প্রশ্নের জবাবে আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, হযরত মূসা (আ:) এর নামে প্রচলিত এ কথাটি কুরআন-হাদীসের নয়। ইয়াহূদী- খৃষ্টানদের রচিত বাইবেল ও তালমুদ থেকে এ কথাটি গ্রহণ করা হয়েছে। বাইবেলের যাত্রা পুস্তকে ৪: ১০- মূসা (আ:) এর কথার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, 'হায় সদাপ্রভু! আমি বাকপটু নহি, ইহার পূর্বেও ছিলাম না, বা এই দাসের সহিত তোমার আলাপ করিবার পরেও নহি। কারণ আমি জড়মুখ ও জড় জিহ্বা'। তালমুদে একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, শৈশবে হযরত মূসা যখন ফিরআউনের গৃহে লালিত পালিত হচ্ছিলেন তখন একদিন তিনি ফিরআউনের মাথার মুকুট নামিয়ে নিজের মাথায় পরেন। এতে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়, এ শিশুটি এই কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে করেছে না এটি শিশুর শিশুসুলভ চপলতা। এ প্রশ্নের মীমাংসা করা হয় এভাবে যে, শিশুর সম্মুখে স্বর্ণ ও আগুন রাখা হবে। সিদ্ধান্ত অনুসারে তাই রাখা হলো। শিশু মূসা আগুন উঠিয়ে মুখে দিলেন। এতে তাঁর জিহ্বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হলো এবং তিনি তোতলা হয়ে গেলেন।

এই কাহিনী বাইবেল ও তালমুদ থেকে কুরআনের কতিপয় তাফসীরে স্থানান্তরিত হয়েছে। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তি এ কথা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। কারণ শিশু যদি আগুনেও হাত দেয় তাহলে সে আগুন উঠিয়ে মুখে দেয়া তার পক্ষে কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। কারণ আগুনের তাপ বা দহন জ্বালা অনুভব করার সাথে সাথেই তো শিশু তা ফেলে দিবে অথবা হাত সরিয়ে নিবে।

কুরআনের বর্ণনা থেকে আমরা স্পষ্ট অনুভব করতে পারি যে, হযরত মূসা (আ:) নবুয়‍্যাত লাভের পরে দাওয়াতী কাজের লক্ষ্যে যে ধরনের বাগ্মীতার প্রয়োজন তা মূসা (আ:) নিজের মধ্যে অভাব অনুভব করছিলেন। অর্থাৎ তিনি প্রথম দিকে বাকপটু ছিলেন না। ইতোপূর্বে তিনি কখনো বক্তৃতা দেননি আর বিষয়টি ফিরআউনের জানা ছিলো, কেননা তিনি ফিরআউনের ঘরেই প্রতিপালিত হয়েছিলেন। বক্তৃতা দেয়ার অভ্যাস যাদের নেই, তারা বক্তৃতা দিতে গেলে স্বভাবসুলভ সংকোচ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্যেই তিনি মানুষকে আল্লাহর দ্বীন বুঝানোর মতো শব্দ চয়ন করে মূল বিষয়টি বোধগম্য ভাষায় পরিবেশন করার যোগ্যতা আল্লাহর কাছে চেয়েছিলেন।

হযরত হারুন (আ:) ছিলেন বাকপটু, এ কারণে তিনি হযরত হারুন (আ:) কে নিজের সহযোগী হিসাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। পরবর্তীতে হযরত মূসা (আ:) এর এ দুর্বলতা দূর হয়ে গিয়েছিলো। হযরত মূসা (আ:) কে আল্লাহ কত উচ্চে মর্যাদা দিয়েছিলেন যে, মূসা (আ:) যেনো পৃথিবীর আলো বাতাসে আসতে না পারেন এ জন্যে ফিরআউন অগণিত গর্ভবতী নারীকে হত্যা করেছিলো। অসংখ্য সদ্যজাত শিশু সন্তানকে হত্যা করেছিলো। নিজের রাষ্ট্র ক্ষমতা নিরাপদ করার উদ্দেশ্যেই ফিরআউন এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলো। শিশু মূসাকে দেখার সাথে সাথে তো তাঁকে হত্যা করার কথা।

কিন্তু মহান আল্লাহ ফিরআউনসহ অন্যান্য সকলের মনে হযরত মূসার প্রতি গভীর মমতা সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁকে আল্লাহ তা'য়ালা কি বিশাল মর্যাদা দিয়েছিলেন যে তিনি তাঁকে জানিয়ে দিলেন, তুমি আমার দৃষ্টির সম্মুখেই ছিলে। মহান আল্লাহর রহমতের দৃষ্টির সম্মুখে থাকা যে কত বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার তা কল্পনাও করা যায় না। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَأَلْقَيْتُ عَلَيْكَ مَحَبَّةٌ مِّنِّي جِ وَلَتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي

হে মূসা, আমি আমার পক্ষ থেকে ফিরআউন ও অন্য মানুষদের মনে তোমার জন্যে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছিলাম, যেনো তুমি আমার চোখের সামনেই বড় হতে পারো। (সূরা ত্বাহা-৩৯)

হযরত ইউসুফ (আ:) কৈশরে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা নিজ পিতা হযরত ইয়াকুব (আ:)-এর কাছে বর্ণনা করার পর তিনি নিজ সন্তানকে বলেছিলেন-

وَكَذَلِكَ يَجْتَبِيكَ رَبُّكَ وَيُعَلِّمُكَ مِنْ تَأْوِيْلِ الأَحَادِيثِ

এমনি করেই তোমার মালিক তোমাকে (নবুয়‍্যাতের জন্যে) মনোনীত করবেন এবং তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা (সহ দুনিয়ার জ্ঞান) শিক্ষা দিবেন। (সূরা ইউসুফ-৬)

মহান আল্লাহ তা'য়ালা হযরত ইউসুফ (আ:) কে এভাবে উচ্চ মর্যাদায় ভূষিত করেছিলেন। হযরত ইয়াহইয়া (আ:) এর প্রশংসা করে আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন-

يَا يَحْيِي خُذِ الْكِتَابَ بِقُوَّة ط وَآتَيْنَاهُ الْحُكْمَ صَبَيًّا لَا وَحَنَانًا مِّنْ لَّدُنَّا وَزَكَاةً طَ وَكَانَ تَقِيًّا وَبَرَّام بِوَالِدَيْهِ وَلَمْ يَكُنْ جَبَّارًا عَصِيًّا وَسَلَمٌ عَلَيْهِ يَوْمَ وُلِدَ وَيَوْمَ يَمُوْتُ وَيَوْمَ يُبْعَثُ حَيَّاعِ

(ইয়াহইয়া যখন বড় হলো, তখন আমি তাকে বললাম) হে ইয়াহইয়া, আমার কিতাবকে তুমি শক্তভাবে ধারণ করো, প্রকৃতপক্ষে আমি তাকে ছেলে বেলায়ই বিচার বুদ্ধি দান করেছিলাম। সে আমার একান্ত কাছ থেকেই হৃদয়ের কোমলতা ও পবিত্রতা লাভ করলো, সে ছিলো আসলেই একজন পরহেযগার ব্যক্তি। তদুপরি সে ছিলো পিতা-মাতার একান্ত অনুগত, কখনো অবাধ্য ও নাফরমান ছিলো না। তার প্রতি শান্তি বর্ষিত হয়েছিলো যেদিন তাকে জন্ম দেয়া হয়েছে, (শান্তি বর্ষিত হবে সেদিন) যেদিন সে মৃত্যুবরণ করবে এবং যেদিন পুনরায় সে জীবিত হয়ে পুনরুত্থিত হবে। (সূরা মারইয়াম-১২-১৫)

প্রত্যেক নবী-রাসূলই মহান আল্লাহর কাছে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তবে তাদের মর্যাদার ধরণ ছিলো পৃথক। হযরত ঈসা (আ:) কে আল্লাহ তা'য়ালা মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হবার পরপরই কথা বলার মর্যাদাসহ অন্যান্য মর্যাদা দান করেছিলেন। ভূমিষ্ঠ হবার পর লোকজন যখন নানা ধরনের প্রশ্নের অবতারণা করেছিলো তখন তিনি উপস্থিত লোকদের বলেছিলেন-

قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ قف آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنْتُ سِ وَأَوْصَانِي بالصَّلوة وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا وَبَرًّا بِوَالِدَتي رَ وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّارًا شَقِيًّا - وَالسَّلَمُ عَلَيَّ يَوْمَ وُلِدْتُ وَيَوْمَ أَمُوْتُ وَيَوْمَ أَبْعَثُ حَيًّا -

আমি আল্লাহ তা'য়ালার বান্দাহ্, তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী বানিয়েছেন, যেখানেই আমি থাকি না কেনো তিনি আমাকে তাঁর অনুগ্রহভাজন করবেন, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন আমি জীবিত থাকি ততদিন যেন আমি নামাজ প্রতিষ্ঠা করি এবং যাকাত প্রদান করি। আমি যেন মায়ের প্রতি অনুগত থাকি, আল্লাহর শোকর, তিনি আমাকে নাফরমান করে পয়দা করেননি। আমার ওপর শান্তি, যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, শান্তি সেদিন যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করবো এবং যেদিন আমি জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হবো। (সূরা মারইয়াম-৩০-৩৩)

হযরত ইবরাহীম (আ:) কে আল্লাহ তা'য়ালা উচ্চ মর্যাদা দান করে তাঁকে মুসলিম মিল্লাতের পিতা হিসাবে ঘোষণা করেছেন-

هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ طَ مِّلَّةَ أَبِيْكُمْ إِبْرَاهِيمَ طَ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ لا

তিনি (পৃথিবীর নেতৃত্বের জন্যে) তোমাদেরই মনোনীত করেছেন এবং (এ) জীবন বিধানের ব্যাপারে তিনি তোমাদের ওপর কোনো সঙ্কীর্ণতা রাখেননি, (তোমরা প্রতিষ্ঠিত থেকো) তোমাদের (জাতির) পিতা ইবরাহীমের দ্বীনের ওপর; সে আগেই তোমাদের 'মুসলিম' নাম রেখেছিলো। (সূরা হজ্জ-৭৮)

মহান মালিক আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আ:) এর প্রশংসা করে বলেছেন-

وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِبْرَاهِيمَ طَ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَّبِيًّا -

এই কিতাবে তুমি ইবরাহীমকে স্মরণ করো, অবশ্যই সে ছিলো এক সত্যবাদী নবী। (সূরা মারইয়াম-৪১)

وَلَقَدْ آتَيْنَا إِبْرَاهِيمَ رُشْدَه مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا بِهِ عَالِمِينَ

আমি পূর্বেই ইবরাহীমকে ভালোমন্দ বিচারের জ্ঞান দান করেছিলাম এবং আমি সে সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলাম। (সূরা আম্বিয়া-৫১)

তাঁর পিতা ছিলেন নমরুদ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সরকার, দেশের জনগণ ও নিজ পিতাকে পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত দেখে তিনি পিতাকে বলেছিলেন-

يَا أَبَتِ إِنِّي قَدْ جَاءَنِي مِنَ الْعِلْمِ مَا لَمْ يَأْتِكَ فَاتَّبِعْنِي أَهْدِكَ صِرَاطًا سَوِيًّا -

হে আমার পিতা, আমার কাছে (আল্লাহর সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে) যে জ্ঞান এসেছে তা তোমার কাছে আসেনি, অতএব তুমি আমার কথা শোনো, আমি তোমাকে সঠিক পথ দেখাবো। (সূরা মারইয়াম-৪৩)

হযরত লূত (আ:) সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেছেন-

وَلُوْطًا آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ تَعْمَلُ الْخَبَائِثَ طَ إِنَّهُمْ كَانُوْا قَوْمَ سَوْءٍ فَاسِقِيْنَ لا وَأَدْخَلْنَاهُ فِي رَحْمَتِنَا طَ إِنَّهُ مِنَ الصَّالِحِينَ

(ইবরাহীমের মতো) আমি লূতকেও প্রজ্ঞা দান করেছিলাম, তাকেও আমি এমন একটি জনপদ থেকে উদ্ধার করে এনেছি যার অধিবাসীরা অশ্লীল কাজ করতো; সত্যিই তারা ছিলো জঘন্য বদ ও গোনাহগার জাতি, আর আমি তাকে আমার অনুগ্রহভাজন করেছি, সে ছিলো একজন সৎকর্মশীল। (সূরা আম্বিয়া-৭৪-৭৫)

হযরত ইসহাক (আ:) ও হযরত ইয়াকুব (আ:) সম্পর্কে বলতে গিয়ে আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন-

وَكُلًّا جَعَلْنَا نَبِيًّا وَوَهَبْنَا لَهُم مِّنْ رَّحْمَتِنَا وَجَعَلْنَا لَهُمْ لِسَانَ صِدْقٍ عَلِيَّاعِ

এদের সবাইকে আমি নবী বানিয়েছি। আমি তাদের ওপর আমার আরো বহু অনুগ্রহ দান করেছি এবং মানুষদের মধ্যে আমি তাদের সুউচ্চ সম্মানও দান করেছি। (সূরা মারইয়াম-৪৯-৫০)

হযরত ইসমাঈল (আ:) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন-

وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ رَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُوْلًا نَّبِيًّاج وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَهُ بِالصَّلوةِ وَالزَّكَاةِ وَكَانَ عِنْدَ رَبِّهِ مَرْضِيًّا -

এ কিতাবে তুমি ইসমাঈলের কথাও স্মরণ করো, নিশ্চয়ই সে ছিলো যথার্থ প্রতিশ্রুতি পালনকারী, আর সে ছিলো রাসূল ও নবী। সে তার আপনজনদের নামাজ প্রতিষ্ঠা ও যাকাত আদায় করার আদেশ দিতো, সে ছিলো তার মালিকের (আল্লাহর) একান্ত পছন্দনীয় ব্যক্তি। (সূরা মারইয়াম-৫৪-৫৫)

হযরত ইদরীস (আ:) সম্পর্কে বলা হয়েছে-

وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِدْرِيسَ زِ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَّبِيًّا قِ لَا وَّرَفَعْنَاهُ مَكَانًا عَلِيًّا

তুমি এ কিতাবে ইদরীসের কথাও স্মরণ করো, সেও ছিলো একজন সত্যবাদী নবী। আমি তাকে উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন করেছিলাম। (সূরা মারইয়াম-৫৬-৫৭)

وَوَهَبْنَا لِدَاوُودَ سُلَيْمَانَ طَ نِعْمَ الْعَبْدُ طَ إِنَّهُ أَوَّابٌ

আমি দাউদকে ছেলে হিসাবে সুলাইমানকে দান করেছি, সে ছিলো আমার উত্তম একজন বান্দা, সে অবশ্যই ছিলো তার মালিকের প্রতি নিষ্ঠাবান। (সূরা ছোয়াদ-৩০)

وَإِسْمَاعِيلَ وَإِدْرِيسَ وَذَا الْكِفْلِ ط كُلٌّ مِّنَ الصَّابِرِينَ جِ وَأَدْخَلْنَاهُمْ فِي رَحْمَتِنَا ط إِنَّهُم مِّنَ الصَّالِحِينَ

ইসমাঈল, ইদরীস ও যুলকিফল, এরা সবাই আমার ধৈর্যশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। আমি তাদের আমার রহমতের মধ্যে দাখিল করলাম, কারণ তারা ছিলো নেককার মানুষদের দলভুক্ত। (সূরা আম্বিয়া-৮৫-৮৬)

وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّنَ عَلَى بَعْضٍ

আমি একেকজন নবীকে একেকজনের ওপর মর্যাদা দান করেছি। (সূরা বনী ইসরাঈল-৫৫)

নবী-রাসূলদের অসীম মর্যাদা দিয়েছেন আল্লাহ তা'য়ালা। তাদের সাথে বিরোধিতা বা তাদের কথা অমান্য করা অথবা তাদের সাথে কোনো প্রকার বেয়াদবি করা মহান আল্লাহর সাথে বিরোধিতা করার শামিল বলে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা দেয়া হয়েছে-

وَمَنْ يُشَاقِقِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

আর যারাই এভাবে আল্লাহ তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে, তাদের জানা উচিত আল্লাহ তাদের কঠোর আযাব দিবেন। (সূরা আনফাল-১৩)

নবী-রাসূলদের আল্লাহ তা'য়ালা এত উচ্চে মর্যাদা দিয়েছেন যে, প্রত্যেক জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হয় তাদের প্রতি প্রেরিত নবী-রাসূলের মাধ্যমে। একটি জাতিকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে দেয়া হবে অথবা তাদেরকে মর্যাদার আসনে সমাসীন করা হবে, তা নির্ধারণ করার জন্যই নবী-রাসূল প্রেরণ করা হয়। জাতি যদি তাদের প্রতি প্রেরিত নবী- রাসূলের আদর্শ অনুসরণ করে, তাহলে সে জাতিকে আল্লাহ তা'য়ালা উন্নতি সমৃদ্ধির স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দিবেন এবং তাদের জীবনের প্রত্যেক স্তরে বিরাজ করবে শান্তি। অমুসলিম দুনিয়ার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখা যায় তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবন বলতে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। সর্বত্র অশান্তির দাবানলে জ্বলতে জ্বলতে জীবনকে নিজেদের জন্যে এক দুর্বিষহ বোঝা মনে করছে, আর এ জন্যেই তারা 'স্বেচ্ছা মৃত্যুর অধিকার' এর জন্যে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে。

জাতি যদি নবীর শিক্ষা থেকে দূরে সরে যায় তাহলে তাদের জীবনে নেমে আসবে অশান্তির দাবানল। জাতি যদি নবীর সাথে ইনসাফ করে অর্থাৎ নবীর আনুগত্য করে, তাহলে সে জাতি আল্লাহ তা'য়ালার কাছ থেকে ইনসাফ লাভের অধিকারী হয়ে যায় এবং মহান আল্লাহ সে জাতির প্রতি ইনসাফ করেন। আর জাতি যদি নবী বা নবীর আনিত আদর্শের সাথে ইনসাফ না করে তাহলে তাদের ভাগ্যে অশান্তিই নির্ধারিত হয়। এর সবথেকে বড় প্রমাণ হলো বর্তমানে মুসলিম মিল্লাত। পৃথিবীতে প্রচুর অর্থবিত্ত, সম্পদ ও জনশক্তির অধিকারী হয়েও এরা আজ লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, অপমানিত, অবহেলিত, নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত।

কারণ মুসলিম মিল্লাতের ভাগ্য জড়িয়ে রয়েছে নবী করীম (সা:) এর মর্যাদার সাথে। তিনি যে আদর্শ উপহার দিয়েছেন, সেই আদর্শের প্রতি যতদিন মুসলিম মিল্লাত সম্মান প্রদর্শন করে তা অনুসরণ করেছে, ততদিন এ মিল্লাত পৃথিবীতে মর্যাদার আসনে আসীন ছিলো। যখনই তারা এ আদর্শের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করেছে, তখনই তাদের ললাটের লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্মম নির্যাতন আর নিষ্পেষন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَلِكُلِّ أُمَّةٍ رَّسُوْلٌ ج فَإِذَا جَاءَ رَسُولُهُمْ قُضِيَ بَيْنَهُم بِالْقِسْطِ وَهُمْ لَا يُظْلَمُوْنَ

প্রত্যেক উম্মতের জন্যেই একজন রাসূল আছে, অতপর যখনি তাদের কাছে তাদের রাসূল এসে যায়, তখন সিদ্ধান্ত করার কাজটি ইনসাফের সাথে সম্পন্ন হয়ে যায়, তাদের ওপর কখনো যুলুম করা হবে না। (সূরা ইউনুস-৪৭)

মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলিম মিল্লাতের ভাগ্যে যে ইনসাফের বিষয়টি নির্ধারিত হয়ে রয়েছে, তাহলো মুসলিম মিল্লাত যদি নবী করীম (সা:) এর আদর্শ অনুসরণ করে তাহলে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে মর্যাদার সুউচ্চ আসন। আর যদি তারা এ আদর্শের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করে তাহলে তাদের জন্যে রয়েছে দাসত্বের জীবন। আর এটাই হলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ইনসাফ, এ ব্যাপারে মুসলিম মিল্লাতের প্রতি সামান্যতম যুলুম করা হয়নি এবং আগামীতেও হবে না।

ইতিহাস কথা বলে, যে জাতির প্রতি আল্লাহ তা'য়ালা নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং প্রেরিত নবী-রাসূলের মর্যাদাগত কারণে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর অমোঘ নিয়ম অনুযায়ী সেই একই ইনসাফ করেছেন। যে জাতি নবী-রাসূলের প্রতি ইনসাফ করেনি, তারা অভিশাপগ্রস্ত হয়েছে আর যারা ইনসাফ করেছে তারা মর্যাদার আসনে আসীন হয়েছে।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 শেষ নবী-রাসূলই বিশ্বনবী (সা:)

📄 শেষ নবী-রাসূলই বিশ্বনবী (সা:)


নবী-রাসূল প্রেরণের ধারাপরিক্রমায় মহান আল্লাহ তা'য়ালা এ পৃথিবীতে সবশেষে প্রেরণ করলেন নবী করীম (সা:) কে। অন্যান্য নবী-রাসূলকে আল্লাহ তা'য়ালা যে দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন, সেই একই দায়িত্ব তাঁর প্রতি অর্পণ করা হলেও এ দায়িত্বের গুরুত্ব ও পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। নবী-রাসূল হিসাবে দায়িত্বের গুরুত্ব ও পরিধির ব্যাপকতার কারণে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁদের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্য করেছেন। এ কথা পবিত্র কুরআনের মাধ্যমেও জানিয়ে দেয়া হয়েছে-

تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِّنْهُم مَّنْ كَلَّمَ اللَّهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتِ ط

এই (যে) নবী-রাসূলরা (রয়েছে), এদের কাউকে কারো ওপর আমি বেশি মর্যাদা দান করেছি। এদের মধ্যে এমনও (কেউ) ছিলো যাদের সাথে আল্লাহ তা'য়ালা কথা বলেছেন এবং (এর মাধ্যমে) কারো মার্যাদা তিনি বাড়িয়ে দিয়েছেন। (সূরা বাকারা-২৫৩)

গুরু দায়িত্ব অর্পণ এবং দায়িত্বের পরিধি বিস্তৃত করা হয় সর্বাধিক যোগ্যতম ব্যক্তির প্রতি- এটাই সাধারণ নিয়ম। মর্যাদাও আবর্তিত হয় যোগ্যতা ও দায়িত্বের পরিসরকে কেন্দ্র করে। প্রেরিত অন্যান্য সকল নবী-রাসূলের দায়িত্বের পরিধি ছিলো সীমাবদ্ধ তথা সসীম। নবী করীম (সা:) এর পূর্বে প্রেরিত প্রত্যেক নবী-রাসূলই দেশ, জাতি, সমাজ, এলাকা ও গোত্রভিত্তিক দায়িত্ব লাভ করে সেভাবেই দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালনে জাতি ও গোত্রগত এবং ভৌগলিক পরিধি অতিক্রম করার অনুমতি তাঁদেরকে দেয়া হয়নি। কিন্তু সমগ্র পৃথিবী এবং সৃষ্টিকুলের প্রতি দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে শুধুমাত্র নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা:) এর প্রতি এবং তাঁর প্রতি অর্পিত দায়িত্বের গুরুত্ব সর্বাধিক এবং পরিধিও অত্যন্ত ব্যাপক। তাঁর সম্মানিত দায়িত্বের পরিধি সম্পর্কে দায়িত্ব অর্পণকারী মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ جِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِ وَيُمِيتُ ص

(হে মুহাম্মাদ স.), আপনি বলুন, হে মানুষ! আমি তোমাদের সবার কাছে আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল (হিসাবে এসেছি), আল্লাহ তা'য়ালা আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের একচ্ছত্র মালিক, তিনি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, তিনিই জীবন দান করেন, তিনিই মৃত্যু ঘটান। (সূরা আল আ'রাফ-১৫৮)

আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের একচ্ছত্র মালিক, যাঁর হাতে জীবন ও মৃত্যুর বাগডোর এবং যিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই, তিনিই যাঁকে নবী-রাসূল হিসাবে পৃথিবীতে প্রেরণ করলেন, তিনি তাঁর দায়িত্বের পরিধিও জানিয়ে দিলেন। বিশেষ জনপদের অধিবাসী, জনগোষ্ঠী, গোত্র বা সম্প্রদায়ের লোকদেরকে তিনি আহ্বান জানাতে বললেন না যে, 'আমি শুধু তোমাদেরই জন্য নবী-রাসূল হিসাবে প্রেরিত হয়েছি' বরং মহান মালিক তাঁকে বলতে বললেন, 'আপনি মানুষদেরকে জানিয়ে দিন, 'আমি তোমাদের সকলের জন্য নবী-রাসূল হিসাবে আগমন করেছি'। কথা অত্যন্ত স্পষ্ট, নবী করীম (সা:) সমগ্র মানবমন্ডলীর জন্য প্রেরিত হয়েছেন এবং তাঁর দায়িত্বের পরিধি বিশ্বব্যাপী। আকাশমণ্ডলী, নদী, সমুদ্র অগাধ জলধী, ঘনারোণ্য, বিস্তীর্ণ মরুপ্রান্তর, বিপদসঙ্কুল পাহাড়-পর্বত এবং মাটির অতল তলদেশেও যদি কোনো মানুষ অবস্থান করে, সেই মানুষটির জন্যেও তিনিই একমাত্র নবী-রাসূল এবং তাঁর সম্মানিত দায়িত্বের পরিধি ঐ পর্যন্তও বিস্তৃত। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَأَرْسَلْنَاكَ لِلنَّاسِ رَسُوْلاً وَكَفَى بِاللَّهِ شَهِيدًا -

আমি আপনাকে মানুষদের জন্যে রাসূল বানিয়ে পাঠিয়েছি, আর সাক্ষী হিসাবে তো আল্লাহই যথেষ্ট। (সূরা নিসা-৭৯)

নবী করীম (সা:) কে মহান আল্লাহ মহুমাত্রিক বিশেষণে বিশেষিত করেছেন। এর মধ্যে দু'টো বিশেষণ হলো তিনি সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী। সমগ্র মানবমণ্ডলীকে তিনি যেমন সুসংবাদ দান করেছেন তেমনি শান্তি শৃঙ্খলার বিপরীত পথে চললে ধ্বংস গহ্বরে নিমজ্জিত হতে হবে এ সম্পর্কে সতর্কও করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা সমগ্র মানবজাতির কাছে তাঁর মর্যাদাবান পরিচিতি এভাবে তুলে ধরেছেন-

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا -

(হে নবী!) আমি আপনাকে সমগ্র মানব জাতির জন্যে (জান্নাতের) সুসংবাদদাতা ও (জাহান্নামের) সতর্ককারীরূপে পাঠিয়েছি। (সূরা আস সাবা-২৮)

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا وَّدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُنِيرًا -

হে নবী! আমি আপনাকে (হিদায়াতের) সাক্ষী (করে) পাঠিয়েছি, (আপনাকে) বানিয়েছি (জান্নাতের) সুসংবাদদাতা ও (জাহান্নামের) সতর্ককারী, আল্লাহর অনুমতিক্রমে আপনি হচ্ছেন আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী ও (হিদায়াতের) সুস্পষ্ট প্রদীপ। (সূরা আল আহযাব-৪৫-৪৬)

إِنْ أَنْتَ إِلَّا نَذِيرٌ - إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ بِالْحَقِّ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَإِنْ مِّنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ -

(আসলে) আপনি তো (জাহান্নামের) একজন সতর্ককারী বৈ আর কিছুই নন। অবশ্যই আমি আপনাকে সত্য জীবন ব্যবস্থাসহ একজন সুসংবাদদাতা ও (জাহান্নামের) সতর্ককারীরূপেই পাঠিয়েছি, কখনো কোনো উম্মত এমন ছিলো না, যাদের জন্যে কোনো (না কোনো একজন) সতর্ককারী অতিবাহিত হয়নি। (সূরা ফাতির-২৩-২৪)

সমগ্র সৃষ্টির জন্যে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে করুণার মূর্ত প্রতীক হিসাবে নির্বাচিত করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ

(হে নবী!) আমি তো আপনাকে সৃষ্টিকুলের জন্যে রহমত বানিয়েই পাঠিয়েছি। (সূরা আম্বিয়া-১০৭)

তাঁর প্রতি অসীম মর্যাদার প্রতীক হিসাবে এমন এক মহান গ্রন্থ আল্লাহ তা'য়ালা অবতীর্ণ করেছেন, যে গ্রন্থ কিয়ামত পর্যন্ত সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য মানবজাতিকে দেখিয়ে দিবে-

تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُوْنَ لِلْعَالَمِيْنَ نَذِيرًا -

কতো মহান তিনি, যিনি তাঁর বান্দার ওপর (সত্য-মিথ্যার মাঝে পার্থক্যকারী এই) 'ফুরকান' অবতীর্ণ করেছেন, যাতে করে (তিনি এর মাধ্যমে) সৃষ্টিকূলের জন্যে সতর্ককারী হতে পারেন। (সূরা ফুরকান-১)

উক্ত মর্যাদাবান গ্রন্থ সমগ্র মানবমণ্ডলীকে মূর্খতার অন্ধকার থেকে মহাসত্যের আলোয় আলোকিত পথের ওপর এনে দাঁড় করাবে-

كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوْرِلا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَى صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ لَا

(এ কুরআন এমন) এক গ্রন্থ, যা আমি আপনার ওপর অবতীর্ণ করেছি, যাতে করে আপনি (এর দ্বারা) মানুষদের তাদের মালিকের আদেশক্রমে (মূর্খতার) অন্ধকার থেকে (মহাসত্যের) আলোতে বের করে আনতে পারেন- তাঁর পথে, যিনি মহাপরাক্রমশালী ও যাবতীয় প্রশংসা পাবার যোগ্য। (সূরা ইবরাহীম-১)

নবী করীম (সা:) এর নবুয়‍্যাত শতাব্দী, স্থান, কাল বা কোনো জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর নবুয়‍্যাত বিশ্বজনীন এবং কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের কর্তব্য রেসালাতে নববীর প্রতি আস্থা স্থাপন পূর্বক অনুসরণ করা। এ সম্পর্কে নবী করীম (সা:) স্বয়ং ঘোষণা করেছেন, 'হযরত জাবির (রা:) বর্ণনা করেন রাসূল (সা:) বলেছেন, প্রত্যেক নবী নিজ নিজ সম্প্রদায়ের জন্যে বিশেষভাবে প্রেরিত হয়েছিলেন। কিন্তু আমি সকল মানুষের জন্য প্রেরিত হয়েছি'। (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

তিনিই বিশ্বনবী এবং তাঁর মর্যাদাবান এ দায়িত্বের পরিধি সৃষ্টি জগতের সকল সীমা অতিক্রম করে পরকালীন জগতে জান্নাত পর্যন্ত বিস্তৃত। ইন্তেকালের পরে মানুষ যখন কবর তথা আলমে বরযাখে প্রবেশ করবে তখন প্রথম প্রহরেই নবী করীম (সা:) কে. দেখিয়ে বা তাঁর পরিচয় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। এ প্রশ্নের যথাযথ জবাবের ওপর নির্ভর করবে উপস্থিত মুহূর্ত থেকে পরবর্তী স্তরসমূহ অতিক্রম করা সহজ হবে না কঠিন হবে। হাশরের ময়দানে মুসিবতের দিনে এবং হাউজে কাওসার থেকে শীতল সুস্বাদু পানি পান করিয়ে জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছানো- সকল স্তরেই নবী করীম (সা:) অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন।

মর্যাদাগত, ভক্তি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কারণে আমরা নবী করীম (সা:) এর পবিত্র নাম মোবারকের পূর্বে 'বিশ্বনবী' বিশেষণটি ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ বিশেষণটির মাধ্যমে তাঁর উচ্চ মর্যাদার শত সহস্র ভাগের এক ভাগও প্রকাশ করা যায় না। অন্যান্য সকল নবী-রাসূলের তুলনায় নবী করীম (সা:) এর মর্যাদা সর্বাধিক আর ঠিক এ কারণেই তাঁর দায়িত্বের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত। অন্যান্য নবীর মিশন জারি রাখার জন্যে তাদের উম্মতদের মধ্য থেকে কাউকে নির্বাচিত করা হয়নি। কিন্তু মুসলমানদেরকে নির্বাচিত করা হয়েছে নবী করীম (সা:) এর মর্যাদার কারণে।

অন্য কোনো নবী-রাসূলের অনুসারীদেরকে এ দায়িত্ব দেয়া হয়নি যে, তাঁরা কিয়ামত পর্যন্ত তাঁদের নবী-রাসূলের আদর্শিক মিশন সমগ্র দুনিয়াব্যাপী সম্মুখের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ব্যতিক্রম শুধু মুসলিম মিল্লাত। পবিত্র কুরআনে এ মুসলিম মিল্লাতকে 'মধ্যমপন্থা' অবলম্বনকারী মিল্লাত হিসাবে পরিচিতি দিয়ে নবী করীম (সা:) এর মিশনকে সম্মুখের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার পবিত্র দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। তাঁর অতুলনীয় মর্যাদা ও তাঁর পরে দ্বিতীয় কোনো নবী-রাসূল পাঠানো হবে না এবং অতুলনীয় মর্যাদা সমুন্নত বা প্রতিষ্ঠিত রাখার লক্ষ্যেই আল্লাহ তা'য়ালা মুসলিম মিল্লাতের প্রতি এ দায়িত্ব অর্পণ করেছেন।

নবী-রাসূল প্রেরণের ধারাপরিক্রমায় মহান আল্লাহ তা'য়ালা এ পৃথিবীতে সবশেষে প্রেরণ করলেন নবী করীম (সা:) কে। অন্যান্য নবী-রাসূলকে আল্লাহ তা'য়ালা যে দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন, সেই একই দায়িত্ব তাঁর প্রতি অর্পণ করা হলেও এ দায়িত্বের গুরুত্ব ও পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। নবী-রাসূল হিসাবে দায়িত্বের গুরুত্ব ও পরিধির ব্যাপকতার কারণে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁদের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্য করেছেন। এ কথা পবিত্র কুরআনের মাধ্যমেও জানিয়ে দেয়া হয়েছে-

تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِّنْهُم مَّنْ كَلَّمَ اللَّهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتِ ط

এই (যে) নবী-রাসূলরা (রয়েছে), এদের কাউকে কারো ওপর আমি বেশি মর্যাদা দান করেছি। এদের মধ্যে এমনও (কেউ) ছিলো যাদের সাথে আল্লাহ তা'য়ালা কথা বলেছেন এবং (এর মাধ্যমে) কারো মার্যাদা তিনি বাড়িয়ে দিয়েছেন। (সূরা বাকারা-২৫৩)

গুরু দায়িত্ব অর্পণ এবং দায়িত্বের পরিধি বিস্তৃত করা হয় সর্বাধিক যোগ্যতম ব্যক্তির প্রতি- এটাই সাধারণ নিয়ম। মর্যাদাও আবর্তিত হয় যোগ্যতা ও দায়িত্বের পরিসরকে কেন্দ্র করে। প্রেরিত অন্যান্য সকল নবী-রাসূলের দায়িত্বের পরিধি ছিলো সীমাবদ্ধ তথা সসীম। নবী করীম (সা:) এর পূর্বে প্রেরিত প্রত্যেক নবী-রাসূলই দেশ, জাতি, সমাজ, এলাকা ও গোত্রভিত্তিক দায়িত্ব লাভ করে সেভাবেই দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালনে জাতি ও গোত্রগত এবং ভৌগলিক পরিধি অতিক্রম করার অনুমতি তাঁদেরকে দেয়া হয়নি। কিন্তু সমগ্র পৃথিবী এবং সৃষ্টিকুলের প্রতি দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে শুধুমাত্র নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা:) এর প্রতি এবং তাঁর প্রতি অর্পিত দায়িত্বের গুরুত্ব সর্বাধিক এবং পরিধিও অত্যন্ত ব্যাপক। তাঁর সম্মানিত দায়িত্বের পরিধি সম্পর্কে দায়িত্ব অর্পণকারী মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ جِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِ وَيُمِيتُ ص

(হে মুহাম্মাদ স.), আপনি বলুন, হে মানুষ! আমি তোমাদের সবার কাছে আল্লাহ তা'য়ালার রাসূল (হিসাবে এসেছি), আল্লাহ তা'য়ালা আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের একচ্ছত্র মালিক, তিনি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, তিনিই জীবন দান করেন, তিনিই মৃত্যু ঘটান। (সূরা আল আ'রাফ-১৫৮)

আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের একচ্ছত্র মালিক, যাঁর হাতে জীবন ও মৃত্যুর বাগডোর এবং যিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই, তিনিই যাঁকে নবী-রাসূল হিসাবে পৃথিবীতে প্রেরণ করলেন, তিনি তাঁর দায়িত্বের পরিধিও জানিয়ে দিলেন। বিশেষ জনপদের অধিবাসী, জনগোষ্ঠী, গোত্র বা সম্প্রদায়ের লোকদেরকে তিনি আহ্বান জানাতে বললেন না যে, 'আমি শুধু তোমাদেরই জন্য নবী-রাসূল হিসাবে প্রেরিত হয়েছি' বরং মহান মালিক তাঁকে বলতে বললেন, 'আপনি মানুষদেরকে জানিয়ে দিন, 'আমি তোমাদের সকলের জন্য নবী-রাসূল হিসাবে আগমন করেছি'। কথা অত্যন্ত স্পষ্ট, নবী করীম (সা:) সমগ্র মানবমন্ডলীর জন্য প্রেরিত হয়েছেন এবং তাঁর দায়িত্বের পরিধি বিশ্বব্যাপী। আকাশমণ্ডলী, নদী, সমুদ্র অগাধ জলধী, ঘনারোণ্য, বিস্তীর্ণ মরুপ্রান্তর, বিপদসঙ্কুল পাহাড়-পর্বত এবং মাটির অতল তলদেশেও যদি কোনো মানুষ অবস্থান করে, সেই মানুষটির জন্যেও তিনিই একমাত্র নবী-রাসূল এবং তাঁর সম্মানিত দায়িত্বের পরিধি ঐ পর্যন্তও বিস্তৃত। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَأَرْسَلْنَاكَ لِلنَّاسِ رَسُوْلاً وَكَفَى بِاللَّهِ شَهِيدًا -

আমি আপনাকে মানুষদের জন্যে রাসূল বানিয়ে পাঠিয়েছি, আর সাক্ষী হিসাবে তো আল্লাহই যথেষ্ট। (সূরা নিসা-৭৯)

নবী করীম (সা:) কে মহান আল্লাহ মহুমাত্রিক বিশেষণে বিশেষিত করেছেন। এর মধ্যে দু'টো বিশেষণ হলো তিনি সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী। সমগ্র মানবমণ্ডলীকে তিনি যেমন সুসংবাদ দান করেছেন তেমনি শান্তি শৃঙ্খলার বিপরীত পথে চললে ধ্বংস গহ্বরে নিমজ্জিত হতে হবে এ সম্পর্কে সতর্কও করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা সমগ্র মানবজাতির কাছে তাঁর মর্যাদাবান পরিচিতি এভাবে তুলে ধরেছেন-

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا -

(হে নবী!) আমি আপনাকে সমগ্র মানব জাতির জন্যে (জান্নাতের) সুসংবাদদাতা ও (জাহান্নামের) সতর্ককারীরূপে পাঠিয়েছি। (সূরা আস সাবা-২৮)

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا وَّدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُنِيرًا -

হে নবী! আমি আপনাকে (হিদায়াতের) সাক্ষী (করে) পাঠিয়েছি, (আপনাকে) বানিয়েছি (জান্নাতের) সুসংবাদদাতা ও (জাহান্নামের) সতর্ককারী, আল্লাহর অনুমতিক্রমে আপনি হচ্ছেন আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী ও (হিদায়াতের) সুস্পষ্ট প্রদীপ। (সূরা আল আহযাব-৪৫-৪৬)

إِنْ أَنْتَ إِلَّا نَذِيرٌ - إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ بِالْحَقِّ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَإِنْ مِّنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ -

(আসলে) আপনি তো (জাহান্নামের) একজন সতর্ককারী বৈ আর কিছুই নন। অবশ্যই আমি আপনাকে সত্য জীবন ব্যবস্থাসহ একজন সুসংবাদদাতা ও (জাহান্নামের) সতর্ককারীরূপেই পাঠিয়েছি, কখনো কোনো উম্মত এমন ছিলো না, যাদের জন্যে কোনো (না কোনো একজন) সতর্ককারী অতিবাহিত হয়নি। (সূরা ফাতির-২৩-২৪)

সমগ্র সৃষ্টির জন্যে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে করুণার মূর্ত প্রতীক হিসাবে নির্বাচিত করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ

(হে নবী!) আমি তো আপনাকে সৃষ্টিকুলের জন্যে রহমত বানিয়েই পাঠিয়েছি। (সূরা আম্বিয়া-১০৭)

তাঁর প্রতি অসীম মর্যাদার প্রতীক হিসাবে এমন এক মহান গ্রন্থ আল্লাহ তা'য়ালা অবতীর্ণ করেছেন, যে গ্রন্থ কিয়ামত পর্যন্ত সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য মানবজাতিকে দেখিয়ে দিবে-

تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُوْنَ لِلْعَالَمِيْنَ نَذِيرًا -

কতো মহান তিনি, যিনি তাঁর বান্দার ওপর (সত্য-মিথ্যার মাঝে পার্থক্যকারী এই) 'ফুরকান' অবতীর্ণ করেছেন, যাতে করে (তিনি এর মাধ্যমে) সৃষ্টিকূলের জন্যে সতর্ককারী হতে পারেন। (সূরা ফুরকান-১)

উক্ত মর্যাদাবান গ্রন্থ সমগ্র মানবমণ্ডলীকে মূর্খতার অন্ধকার থেকে মহাসত্যের আলোয় আলোকিত পথের ওপর এনে দাঁড় করাবে-

كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوْرِلا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَى صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ لَا

(এ কুরআন এমন) এক গ্রন্থ, যা আমি আপনার ওপর অবতীর্ণ করেছি, যাতে করে আপনি (এর দ্বারা) মানুষদের তাদের মালিকের আদেশক্রমে (মূর্খতার) অন্ধকার থেকে (মহাসত্যের) আলোতে বের করে আনতে পারেন- তাঁর পথে, যিনি মহাপরাক্রমশালী ও যাবতীয় প্রশংসা পাবার যোগ্য। (সূরা ইবরাহীম-১)

নবী করীম (সা:) এর নবুয়‍্যাত শতাব্দী, স্থান, কাল বা কোনো জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর নবুয়‍্যাত বিশ্বজনীন এবং কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের কর্তব্য রেসালাতে নববীর প্রতি আস্থা স্থাপন পূর্বক অনুসরণ করা। এ সম্পর্কে নবী করীম (সা:) স্বয়ং ঘোষণা করেছেন, 'হযরত জাবির (রা:) বর্ণনা করেন রাসূল (সা:) বলেছেন, প্রত্যেক নবী নিজ নিজ সম্প্রদায়ের জন্যে বিশেষভাবে প্রেরিত হয়েছিলেন। কিন্তু আমি সকল মানুষের জন্য প্রেরিত হয়েছি'। (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

তিনিই বিশ্বনবী এবং তাঁর মর্যাদাবান এ দায়িত্বের পরিধি সৃষ্টি জগতের সকল সীমা অতিক্রম করে পরকালীন জগতে জান্নাত পর্যন্ত বিস্তৃত। ইন্তেকালের পরে মানুষ যখন কবর তথা আলমে বরযাখে প্রবেশ করবে তখন প্রথম প্রহরেই নবী করীম (সা:) কে. দেখিয়ে বা তাঁর পরিচয় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। এ প্রশ্নের যথাযথ জবাবের ওপর নির্ভর করবে উপস্থিত মুহূর্ত থেকে পরবর্তী স্তরসমূহ অতিক্রম করা সহজ হবে না কঠিন হবে। হাশরের ময়দানে মুসিবতের দিনে এবং হাউজে কাওসার থেকে শীতল সুস্বাদু পানি পান করিয়ে জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছানো- সকল স্তরেই নবী করীম (সা:) অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন।

মর্যাদাগত, ভক্তি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কারণে আমরা নবী করীম (সা:) এর পবিত্র নাম মোবারকের পূর্বে 'বিশ্বনবী' বিশেষণটি ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ বিশেষণটির মাধ্যমে তাঁর উচ্চ মর্যাদার শত সহস্র ভাগের এক ভাগও প্রকাশ করা যায় না। অন্যান্য সকল নবী-রাসূলের তুলনায় নবী করীম (সা:) এর মর্যাদা সর্বাধিক আর ঠিক এ কারণেই তাঁর দায়িত্বের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত। অন্যান্য নবীর মিশন জারি রাখার জন্যে তাদের উম্মতদের মধ্য থেকে কাউকে নির্বাচিত করা হয়নি। কিন্তু মুসলমানদেরকে নির্বাচিত করা হয়েছে নবী করীম (সা:) এর মর্যাদার কারণে।

অন্য কোনো নবী-রাসূলের অনুসারীদেরকে এ দায়িত্ব দেয়া হয়নি যে, তাঁরা কিয়ামত পর্যন্ত তাঁদের নবী-রাসূলের আদর্শিক মিশন সমগ্র দুনিয়াব্যাপী সম্মুখের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ব্যতিক্রম শুধু মুসলিম মিল্লাত। পবিত্র কুরআনে এ মুসলিম মিল্লাতকে 'মধ্যমপন্থা' অবলম্বনকারী মিল্লাত হিসাবে পরিচিতি দিয়ে নবী করীম (সা:) এর মিশনকে সম্মুখের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার পবিত্র দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। তাঁর অতুলনীয় মর্যাদা ও তাঁর পরে দ্বিতীয় কোনো নবী-রাসূল পাঠানো হবে না এবং অতুলনীয় মর্যাদা সমুন্নত বা প্রতিষ্ঠিত রাখার লক্ষ্যেই আল্লাহ তা'য়ালা মুসলিম মিল্লাতের প্রতি এ দায়িত্ব অর্পণ করেছেন।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী করীম (সা:) কে পৃথিবীতে প্রেরণের উদ্দেশ্য

📄 নবী করীম (সা:) কে পৃথিবীতে প্রেরণের উদ্দেশ্য


পৃথিবীতে এটি বাস্তব সত্য যে, কোনো আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে সে আদর্শের ভিত্তিতে একটি সুসংগঠিত দল বা সংস্থা গঠন করতে হয়। সে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থাকে। সমগ্র দেশে থাকে স্থানীয় কার্যালয়। কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন সময় যে সকল নির্দেশ ঐ স্থানীয় কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয় তা ঐ আদর্শের অনুসারী নেতা-কর্মীগণ বাস্তবায়ন করে থাকেন। তেমনি মুসলিম একটি মিল্লাতের নাম এবং এ মিল্লাতের আদর্শ ইসলাম। এই মিল্লাতের জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:)।

আল্লাহ তা'য়ালার নির্দেশে তিনি এই মিল্লাতের জন্য একটি কেন্দ্র নির্মাণ করলেন। কেননা, এই মিল্লাতের যিনি বিশ্বনেতা তাঁর আগমনের সময় সমাগত। হযরত ইবরাহীম (আ:) ও তাঁর আগমনের জন্য আল্লাহ তা'য়ালার কাছে এভাবে দোয়া করলেন-

رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ . وَيُزَكِّيهِمْ طَ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

হে আমাদের মালিক! তাদের (বংশের) মধ্যে তাদের নিজেদের মাঝ থেকে তুমি (এমন) একজন রাসূল পাঠাও, যে তাদের কাছে তোমার আয়াতসমূহ পড়ে শোনাবে, তাদের তোমার কিতাবের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দিবে, উপরন্তু সে তাদের পবিত্র করে দিবে, কারণ তুমিই মহাপরাক্রমশালী ও পরম কুশলী। (সূরা বাকারা-১২৯)

সুতরাং ইবরাহীম (আ:) যে ঘর পুনঃনির্মাণ করলেন তা কোনো সাধারণ ঘর ছিল না। এই ঘর প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একটিই ছিল, সমগ্র বিশ্বে আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এখান থেকেই পরিচালিত হবে, এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখেই হযরত ইসমাঈল (আ:) ও তাঁর মা'কে জনমানবহীন এই প্রান্তরে রেখে যাওয়া হয়েছিল, ইসমাঈল (আ:) এর কুরবানীও ছিল ঐ একই উদ্দেশ্যে এবং কা'বার নির্মাণও ছিল ঐ একই লক্ষ্যে।

সমগ্র পৃথিবীতে যারা তাওহীদের মশাল বহন করবে, তারা যেন প্রতি বছরে একবার হজ্জ নামক বিশ্ব সম্মেলনে এসে সমবেত হয়, একত্রে সমস্বরে এক আল্লাহর দাসত্বের ঘোষণা বজ্রকণ্ঠে দিতে পারে, পারস্পরিক পরিচিতি লাভ করতে পারে, একে অপরের সমস্যা সম্পর্কে অবগত হয়ে তা সমাধানের বাস্তব পন্থা অবলম্বন করতে পারে, আল্লাহ বিরোধী শক্তির মুকাবিলা কিভাবে করা যায় এবং সমগ্র পৃথিবীতে কিভাবে এক আল্লাহ তা'য়ালার বিধান প্রতিষ্ঠা করা যায়-এ সকল কার্যক্রম গ্রহণ করার লক্ষ্যেই সেদিন কা'বা নির্মাণ করে আল্লাহর নবী হযরত ইবরাহীম (আ:) বিশ্বনবী তথা বিশ্বনেতাকে প্রেরণের দোয়া করেছিলেন এবং সাধারণ মানুষকে সে ঘরের দিকে আহ্বান জানিয়ে ছিলেন।

পবিত্র কুরআনের অনেক স্থানেই কা'বাঘর সম্পর্কে মহান আল্লাহ এই ঘর বানানোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে সম্পর্কে বলেছেন, 'এই ঘর হিদায়াতের কেন্দ্র, এখান থেকেই একত্ববাদের বাণী সমগ্র পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে'। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) এর দোয়ার প্রতি লক্ষ্য করলে কতকগুলো বিষয় আমাদের সম্মুখে স্পষ্ট হয়ে যায়।

১. এমন এক ব্যক্তিত্বকে বিশ্বনবী বা বিশ্বনেতা হিসাবে প্রেরণ করা হোক, যিনি মানবমণ্ডলীরই একজন। অর্থাৎ মানুষের বাইরের কোনো সত্তা নয়। মানুষের সকল ইচ্ছা, আকাক্সখা, কামনা-বাসনা, ব্যথা-বেদনা, মায়া-মমতা তথা সকল অনুভূতি হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে সক্ষম কেবলমাত্র মানুষই। এ জন্যেই মানুষের মধ্য থেকেই বিশ্বনেতাকে নির্বাচিত করার আবেদন করা হয়েছিলো।

২. তিনি মহান আল্লাহর সাথে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিবেন, সৃষ্টি হিসাবে স্রষ্টার প্রতি মানুষের দায়িত্ব-কর্তব্য কি তা বিশদভাবে মানুষকে জানিয়ে দিবেন এবং স্বয়ং আল্লাহই যে একমাত্র ইলাহ ও রব অর্থাৎ তিনিই আইনদাতা, বিধানদাতা এবং সকল বিষয়ের প্রতিপালক- এ বিষয়টিও মানুষের কাছে স্পষ্ট করে দিবেন।

৩. পৃথিবীতে মানুষ ভারসাম্যমূলক জীবন-যাপন করবে এবং এর জন্যে প্রয়োজনীয় যাবতীয় উপকরণ- যে সম্পর্কিত জ্ঞান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর কিতাবের মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন, এ সংক্রান্ত যাবতীয় জ্ঞান বিশ্বনবী তথা বিশ্বনেতা মানবজাতিকে শিক্ষা দিবেন। অর্থাৎ প্রগতির ফল্গুধারায় আপুত শোষণমুক্ত, শান্তিপূর্ণ জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ, বস্তুর কল্যাণকর কর্মে ব্যবহারকারী এবং উন্নত সভ্যতা-সংস্কৃতির অধিকারী দেশ, জাতি ও সমাজ বিনির্মাণে যা কিছু প্রয়োজন, তা কাংখিত বিশ্বনেতা শিক্ষা দিবেন।

৪. দোয়ায় বলা হয়েছিলো, 'এমন এক বিশ্বনেতা প্রেরণ করুন, যিনি মানুষকে পবিত্র করে দিবেন'।

যে আল্লাহ তা'য়ালা মানুষ সৃষ্টি করে তার যাবতীয় জীবনোপকরণ দিয়েছেন, সেই আল্লাহর দাসত্ব করার মধ্যেই মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নিহিত এবং মানুষ ক্রমশ মর্যাদার উচ্চ শিখরে আরোহণ করে। সম্মানের এমন এক পর্যায়ে এ মানুষ পৌঁছে যায় যে, যেখানে স্বয়ং ফিরিশতাও পৌঁছতে সক্ষম নয়। আবার এ মানুষ নিজের প্রকৃত মর্যাদা ও অবস্থান ভুলে আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে নিজের মহান মালিক আল্লাহকে ত্যাগ করে তার অনুরূপ আরেক সৃষ্টির, কোনো জড়পদার্থের বা নিজ হাতে গড়া কল্পিত কোনো শক্তির দাসত্ব করে, তখন সে মানুষের মর্যাদা শূন্যের কোঠা অতিক্রম করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীর প্রাপ্য মর্যাদাও হারিয়ে ফেলে। আর এ অবস্থায়ই একজন সম্মানিত মানুষের জন্য অপবিত্রতার মধ্যে নিমজ্জিত হওয়া বুঝায়।

যখন মানুষ তার প্রকৃত মর্যাদা সম্পর্কে উদাসীনতার পরিচয় দেয়, নিজের সম্মানকে অবহেলা করে আত্মমর্যাদা সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলে বলেই সে মানুষ তারই অনুরূপ আরেকজন মানুষকে নিজের বিধানদাতা, আইনদাতা, মুক্তিদাতা এবং যাবতীয় বিষয়ে সিদ্ধান্তদাতা হিসাবে বরণ করে। অথবা কোনো জড়পদার্থকে নিজের মনস্কামনা পূরণকারী হিসাবে বরণ করে বা নিজ হাতে গড়া কোনো কল্পিত বস্তুর দাসত্ব করে। তারই অনুরূপ সৃষ্টি আরেকজন মানুষ তাকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সমস্যার সমাধান দিবে এবং মানব সভ্যতা-সংস্কৃতির উপকরণ দিবে, যাবতীয় নীতিমালা রচনা করে দিবে আর সে তা অবলীলাক্রমে মেনে চলবে- এ ধরনের মর্যাদাহীনতার অপবিত্রতা থেকে সকল মানুষকে পবিত্র করবেন, 'এমন একজন বিশ্বনবী বা বিশ্বনেতা প্রেরণ করুন' এ দোয়াই হযরত ইবরাহীম (আ:) করেছিলেন।

মানুষের চিন্তাধারা, চেতনা, অভ্যাস, স্বভাব-চরিত্র, চলমান জীবনধারা, দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুন ও মতবাদ মতাদর্শকে ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত করে সকল কিছুকে পরিশুদ্ধ করবেন বিশ্বনবী (সা:) এ কামনাই মহান আল্লাহর কাছে করেছিলেন মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) এবং তাঁর পবিত্র এ দোয়ারই উত্তর স্বরূপ নবী করীম (সা:) প্রেরিত হয়েছেন। মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে ইবরাহীম (আ:) এর চাওয়ার সাথে সঙ্গতি রেখে বলছেন-

كَمَا أَرْسَلْنَا فِيكُمْ رَسُولاً مِّنْكُمْ يَتْلُوا عَلَيْكُمْ آيَاتِنَا وَيُزَكِّيْكُمْ وَيُعَلِّمُكُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُم مَّا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُوْنَ طَ

(এই সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্যেই) আমি এভাবে তোমাদের কাছে তোমাদের মাঝ থেকেই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছি, যে ব্যক্তি (প্রথমত) তোমাদের কাছে আমার 'আয়াত' পড়ে শোনাবে, (দ্বিতীয়ত) সে তোমাদের (জীবন) পরিশুদ্ধ করে দিবে এবং (তৃতীয়ত) সে তোমাদেরকে আমার কিতাব ও (তার অন্তর্নিহিত) জ্ঞান শিক্ষা দিবে, (সর্বোপরি) সে তোমাদের এমন বিষয়সমূহের জ্ঞান দান করবে, যা তোমরা কখনো জানতে না। (সূরা বাকারা-১৫১)

মানুষ নিজেকে কিভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র রাখবে, নিজের প্রতি, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, সমাজ, রাষ্ট্র ইত্যাদির প্রতি মানুষের দায়িত্ব- কর্তব্য কি, এসব বিষয় সম্পর্কে মানুষ ছিলো সম্পূর্ণ অন্ধকারে। মহাকাশের শূণ্য মার্গে, অগণিত গ্রহ-নক্ষত্রে, অদৃশ্য বায়ুমণ্ডলে এবং অন্যান্য স্তরে, শূণ্য মার্গের অদৃশ্য কৃষ্ণ গহ্বরে (Black hole), ওজন স্তরে, মহাশূন্যে ঘূর্ণয়মান পাথরের সাম্রাজ্যে, পাতালপুরীর কৃষ্ণ বিবরে, অগাধ জলধীর বিভিন্ন স্তরসহ অতল তলদেশে, মাটির তলদেশে খনিসমূহের স্তর অতিক্রম করে উত্তপ্ত গলিত লাভার স্তরে, পর্বতের সৃষ্টি কৌশল ও অবস্থানে, পণ্ডদলের মাঝে, অরোণ্যের ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে নবী- রাসূলগণই সর্বপ্রথম মানুষকে জ্ঞান দান করেছেন। শিক্ষা দিয়েছেন বস্তুর ব্যবহার। বিজ্ঞান যে সকল বিষয় বর্তমানে মানুষকে জানাচ্ছে, এসব বিষয় সম্পর্কে নবী করীম (সা:) পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে সর্বপ্রথম মানুষকে অবগত করেছেন। বস্তুর ধ্বংস নেই, বস্তু অবিনাশী। মানুষেরও ধ্বংস নেই, ক্ষণস্থায়ী জীবন শেষে মৃত্যুর পরে আরেকটি অনন্তকালের জীবন রয়েছে এবং সেখানে পৃথিবীর জীবনের যাবতীয় কিছুর হিসাব দিতে হবে- এ সকল বিষয় ছিলো মানুষের অজানা। অর্থাৎ মানুষ যা জানতো না তাই নবী করীম (সা:) মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন।

এ জন্যেই হাদীস শরীফে দেখা যায়, সাহাবায়ে কেরাম রাসূল (সাঃ)-এর কাছে জানতে চেয়েছেন- لِمَا بُعِثْتَ 'কী কারণে আপনার আগমন?' জবাবে তিনি জানিয়েছেন- بُعِثْتُ مُعَلِّمًا - 'আমি প্রেরিত হয়েছি শিক্ষক হিসাবে'।

মানুষের প্রয়োজনীয় সকল কিছুর শিক্ষক ছিলেন নবী করীম (সা:), এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُوْلًا مِّنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُوْ عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ ، وَإِنْ كَانُوْا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِيْنٍ

আল্লাহ অবশ্যই তাঁর ঈমানদার বান্দাদের ওপর এই অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের মাঝ থেকে একজন ব্যক্তিকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, যে তাদের কাছে আল্লাহর কিতাবের আয়াতসমূহ পড়ে শোনায় এবং (সে অনুযায়ী) সে তাদের জীবনকে পরিশুদ্ধ করে, (সর্বোপরি) সে (নবী) তাদের আল্লাহর কিতাব ও (তাঁর গ্রন্থলব্ধ) জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়, অথচ এরা সবাই ইতোপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিলো। (সূরা আলে ইমরান-১৬৪)

এ আয়াতে নবী করীম (সা:) কে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষাদাতা হিসাবে পরিচিতি দান করেছেন। দুর্ভাগ্য আমাদের, আমরা সকল বিষয়ের এই মহান শিক্ষককে 'ধর্মনেতা' পরিচয়ে আবদ্ধ রেখে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, সমাজনীতি, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষাগুরু হিসাবে গ্রহণ করেছি নীতি নৈতিকতাহীন উশৃংখল প্রকৃতির কিছু সংখ্যক বিভ্রান্ত মানুষকে। ধর্মীয় নীতিমালার সামান্য কিছু অংশ শেখার জন্যে আমরা নবী করীম (সা:) এর দিকে হাত প্রসারিত করি, আর জীবনের বিস্তীর্ণ অঙ্গনে অন্যান্য সকল নীতিমালা গ্রহণ করার জন্যে নবী করীম (সা:) এর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে স্বার্থান্বেষী চরিত্রহীন ধুরন্ধর বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত লোকদের প্রতি মুখাপেক্ষী হই।

নবী করীম (সা:) ব্যতীত অভ্রান্ত, নির্ভুল ও প্রকৃত সত্য জ্ঞান, সিদ্ধান্ত এবং কৌশল অন্য কোনো মানুষ কখনোই দিতে পারে না এবং সেটা কোনো মানুষের জানাও নেই, এ বিষয়টি মহান আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন এভাবে যে, 'তিনি এসব বিষয়ে মানবজাতিকে অবগত করানোর পূর্বে তারা স্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিলো'। আরেক আয়াতে বিষয়টি আল্লাহ তা'য়ালা এভাবে বলছেন-

هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الأُمِّيِّنَ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيْهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ ، وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُّبِيْنٍ

তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি (একটি) সাধারণ জনগোষ্ঠীর মাঝে থেকে তাদেরই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, যে তাদের আল্লাহর আয়াতসমূহ পড়ে শোনাবে, তাদের জীবনকে পবিত্র করবে, তাদের (আমার) গ্রন্থের (কথা ও সে অনুযায়ী পৃথিবীতে চলার) কৌশল শিক্ষা দিবে, অথচ এ লোকগুলোই (রাসূল আসার) আগে (পর্যন্ত) এক সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিলো। (সূরা আল জুমুয়া-২)

মানুষ তার নিজের সত্তার দিক দিয়েই একটি জগৎ বিশেষ। তার এই জগতের মধ্যে অসংখ্য শক্তি, যোগ্যতা ও কর্ম-ক্ষমতা বিদ্যমান। তার এই জগতের মধ্যে জাগ্রত রয়েছে কামনা-বাসনা, লোভ-লালসা, আবেগানুভূতি, ভাবাবেগ, ঝোঁক-প্রবণতা, কাম, ক্রোধ, জেদ, হঠকারিতা, হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি। মানুষের দেহ ও মনের রয়েছে অসংখ্য দাবি। মানুষের আত্মা, প্রাণ ও স্বভাবের রয়েছে সীমাহীন জিজ্ঞাসা। প্রতিনিয়ত তার মধ্যে অসংখ্য প্রশ্নমালা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব প্রশ্নের জবাব লাভের জন্য সে অস্থির হয়ে ওঠে। এটাই হলো মানুষের জটিল অবস্থা।

এই জটিল অবস্থাসম্পন্ন মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে যে মানব সমাজ গড়ে ওঠে, সে সমাজও নানা ধরনের জটিল সম্পর্কের ভিত্তিতেই গঠিত হয়। মানব সমাজ অসীম ও অসংখ্য জটিল সমস্যার সমন্বয়ের ভিত্তিতেই গঠিত হয়েছে। সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ লাভের সাথে সাথে এসব জটিলতা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি লাভ করতে থাকে।

এসব সমস্যা ছাড়াও পৃথিবীতে মানুষের জীবন ধারণের জন্য যে প্রয়োজনীয় সামগ্রী মানুষের চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, তা ব্যবহার করা এবং মানবীয় সংস্কৃতিতে তা ব্যবহার উপযোগী করে প্রয়োগ করার প্রশ্নেও মানুষের ভেতরে ব্যক্তিগত ও সামগ্রিকভাবে অসংখ্য জটিলতার সৃষ্টি করে। মানুষ তার নিজের দুর্বলতার কারণেই তার সমগ্র জীবনের বিস্তীর্ণ অঙ্গনে একই সময়ে পূর্ণ ও সামঞ্জস্য এবং ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারে না। এ কারণে মানুষ নিজের জন্য জীবনের এমন কোন পথ স্বয়ং সে নিজেই রচনা করতে পারে না, যে পথ নির্ভুল হতে পারে।

এ কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতিটি মানুষের ভেতরেই একটি জগৎ রয়েছে এবং সে জগৎ অসংখ্য জটিল বিষয় সমন্বিত, অসংখ্য শক্তি-সামর্থ সে জগতে ক্রিয়াশীল রয়েছে। সুতরাং মানুষ স্বয়ং যে বিধি-বিধান, মত-পথ রচনা করবে, সে বিধান স্বয়ং মানুষের অন্তর্নিহিত যাবতীয় শক্তি-সামর্থের সাথে পূর্ণ ইনসাফ করবে, তার সমস্ত কামনা-বাসনার সাথে প্রকৃত অধিকার বুঝিয়ে দিবে, তার আবেগ-উচ্ছ্বাস ও প্রবণতার সাথে ভারসাম্যমূলক আচরণ করবে, তার দেহের ভেতরের ও দেহের বাইরের যাবতীয় প্রয়োজন সঠিকভাবে পূরণ করবে, তার সমগ্র জীবনের যাবতীয় সমস্যার দিকে পরিপূর্ণভাবে দৃষ্টি দিয়ে সেসব কিছুর এক সুষম ও সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধান বের করবে এবং বাস্তব জিনিসগুলোও ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক জীবনে সুবিচার, ইনসাফ ও সত্যনিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যবহার করবে, এসব কোনো কিছুই মানুষের পক্ষে কক্ষনো সম্ভব হবে না।

প্রকৃতপক্ষে মানুষ স্বয়ং যখন নিজের পথ-প্রদর্শক, আইন-কানুন, বিধান রচয়িতার ভূমিকা পালন করে, তখন নিগূঢ় সত্যের অসংখ্য দিকের মধ্য থেকে কোনো একটি দিক, জীবনের অসংখ্য প্রয়োজনের মধ্য থেকে কোনো একটি প্রয়োজন, সমাধানযোগ্য সমস্যাবলীর কোনো একটি সমস্যা তার চেতনার জগতে এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে যে, মানুষ ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক- অন্যান্য দিক ও প্রয়োজন এবং সমস্যাগুলোর ব্যাপারে সে দৃষ্টি দিতে সক্ষম হয় না।

কারণ তার চেতনার জগৎ তো আচ্ছন্ন হয়ে থাকে বিশেষ একটি সমস্যাকে কেন্দ্র করে। এভাবে বিশেষ মানুষের ওপরে বিশেষ কোনো মত বা আদর্শ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে চাপিয়ে দেয়ার কারণে জীবনের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে সামঞ্জস্যহীনতার এক চরম পর্যায়ের দিকে তা বক্র গতিতে চলতে থাকে।

মানব জীবনের এই চলার বাঁকা গতি যখন শেষ স্তরে গিয়ে উপনীত হয় তখন মানুষের জন্য তা অসহ্যকর হয়ে জীবনের যেসব দিক, প্রয়োজন ও সমস্যার দিকে ইতোপূর্বে দৃষ্টি দেয়া হয়নি, সেসব দিক তরিৎ গতিতে বিদ্রোহ করে এবং সেসব প্রয়োজন পূরণ করতে বলে, সমস্যাগুলো সমাধানের দাবি করতে থাকে। কিন্তু তখন আর মানুষের পক্ষে সেসব প্রয়োজন পূরণ করা ও সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব হয় না। কারণ পূর্বানুরূপ সামঞ্জস্যহীন কর্মনীতি পুনরায় চলতে থাকে।

পূর্বে যেসব সমস্যা সমাধান ও প্রয়োজনগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়নি, সামঞ্জস্যহীন কর্মনীতির ফলে মানুষের যেসব দাবি ও আবেগ-উচ্ছ্বাসকে ভয়-ভীতি ও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করে রাখা হয়েছিল, তা পুনরায় মানুষের ওপর প্রচণ্ড গতিতে আধিপত্য বিস্তার করে এবং তাকে নিজের বিশেষ দাবি অনুযায়ী বিশেষ একটি লক্ষ্যের দিকে গতিবান করে তোলার চেষ্টা করে।

এ সময় অন্যান্য দিক, প্রয়োজন ও সমস্যাগুলোর সাথে পূর্বের ন্যায় আচরণই করতে থাকে। এর অনিবার্য ফলশ্রুতিতে মানুষের জীবন কখনো সঠিক, সত্য, সহজ-সরল পথে একনিষ্ঠভাবে চলার মতো পরিবেশ লাভ করে না। সমস্যার সাগরে নিমজ্জিত হয়ে সে ক্রমশঃ ডুবে যেতে থাকে। একটি ধ্বংস গহ্বর থেকে কোনক্রমে সে উঠতে সক্ষম হলেও ছুটতে গিয়ে অন্য আরেকটি ধ্বংস গহ্বরে সে আছড়ে পড়ে। মানুষ এমনি চারিত্রিক বৈশিষ্টে পরিপূর্ণ এক জীব যে, কোনো কাজ করতে গেলে সর্বপ্রথম তাকে নির্ধারণ করে নিতে হয় তার কাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। অন্য কোনো জীবের ন্যায় এ মানুষ লক্ষ্যহীন কাজ করতে পারে না আর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে গেলেই তার সামনে প্রশ্ন দেখা দেয় যে, কোন্ আদর্শের ওপর ভিত্তি করে, কোন্ আদর্শের দেয়া নিয়ম অনুযায়ী সে তার কাজগুলো সম্পাদন করবে।

মানুষের নিজের রচনা করা কোনো মতবাদ মানুষকে আদর্শের সন্ধান দেয় না বিধায় মানুষ চরম হতাশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। মানব চরিত্র এমনি যে, কোনো মতবাদ যখন মানুষকে আদর্শহীন অবস্থায় পৃথিবীতে ছেড়ে দেয় তখন স্বাভাবিক কারণেই মানুষের জীবনে নেমে আসে সীমাহীন শূন্যতা।

পক্ষান্তরে আদর্শহীন অবস্থায় চিন্তা ও চেতনার শূন্যতা নিয়ে, মানুষ জীবন ধারণ করতে পারে না বলে জীবন যাত্রা নির্বাহের জন্য আদর্শের সন্ধানে মানুষ অস্থির হয়ে ওঠে। ফলে চিন্তা ও চেতনার জগতের শূন্যতা পূরণ করার জন্য তার সামনে বিচিত্র ও মানব চিন্তার বিপরীতমুখী আদর্শের সমাবেশ ঘটতে থাকে। এ অবস্থায় মানুষের যে কি করুণ পরিণতি ঘটে তা একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হতে পারে।

কোনো একজন মানুষের অনেকগুলো বন্ধু ছিলো। বন্ধুদের মধ্যে কেউ শুকনো কাঠ ব্যবসায়ী, কেউ তুলা ব্যবসায়ী, কেউ কাপড় ব্যবসায়ী, কেউ পেট্রোল ব্যবসায়ী, কেউ কেরোসিন তৈল ব্যবসায়ী, কেউ খড় ব্যবসায়ী, কেউ ছিলো কাগজ ব্যবসায়ী। হঠাৎ একদিন দেখা গেলো, গভীর রজনীতে ঐ অনেকগুলো বন্ধুর অধিকারী ব্যক্তিটির আপন বাসগৃহে আগুন লেগেছে। তখন ঐ ব্যক্তি চিৎকার করে তার বন্ধুদের কাছে সাহায্য চেয়ে বলছে, 'আমার এই চরম বিপদের মুহূর্তে তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে এসে আমাকে সাহায্য করো'।

লোকটির এই করুণ আর্তনাদে সাড়া দিয়ে তার সকল বন্ধুরা ছুটে এলো। কাঠ ব্যবসায়ী বন্ধু প্রচুর কাঠসহ ছুটে এসে অগুনের ভেতরে তা ছুড়ে দিলো। কাপড় ব্যবসায়ী বন্ধু কতকগুলো কাপড়ের থান এনে তা আগুনের ভেতরে ছুড়ে মারলো। খড় ব্যবসায়ী বন্ধু কয়েক বোঝা খড় এনে তা আগুনের ভেতরে ছুড়ে দিল। এভাবে কাগজ ব্যবসায়ী বন্ধু কাগজ, পেট্রোল ব্যবসায়ী বন্ধু পেট্রোল, কেরোসিন ব্যবসায়ী বন্ধু কেরোসিন আগুনের ভেতরে ছুড়ে দিলো। ফল যা হবার তাই হলো। আগুন নির্বাপিত হবার পরিবর্তে আরো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। সকল বন্ধুর কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল বিপদগ্রস্ত বন্ধুকে সাহায্য করা অর্থাৎ বন্ধুর ঘরের আগুন নিভিয়ে ফেলা। পক্ষান্তরে বিপদগ্রস্ত বন্ধুর জন্য এই লোকগুলো যা করলো তাতে করে বিপদগ্রস্ত বন্ধুর বিপদ বৃদ্ধি বৈ কমলো না।

প্রকৃতপক্ষে মানুষ নিজের জন্য যত আদর্শ, মতবাদ-মতাদর্শ রচনা করেছে তা সবই আঁকা-বাঁকা, উঁচু-নীচু বলে প্রতিভাত হয়েছে। ভুল দিক থেকে তার গতি শুরু হয় এবং ভুল দিকেই তা উপনীত হয়ে সমাপ্তি লাভ করে এবং সেখান থেকে পুনরায় অন্য কোনো ভুল পথের দিকেই অগ্রসর হতে থাকে। এসব অসংখ্য বাঁকা ও ভ্রান্ত পথের ঠিক মাঝামাঝি অবস্থানে অবস্থিত এমন একটি পথ একান্তই আবশ্যক। যেন মানুষের সমস্ত শক্তি ও কামনা-বাসনার প্রতি, ভালোবাসা, মায়া-মমতা, স্নেহ, প্রেম-প্রীতি ও আবেগ-উচ্ছ্বাসের প্রতি, মানুষের আত্মা ও শারীরিক দাবির প্রতি এবং জীবনের যাবতীয় সমস্যার প্রতি যথাযথ-ন্যায়-নিষ্ঠ আচরণ করা, যে আচরণে কোনো ধরনের বক্রতা ও জটিলতা থাকবে না, বিশেষ কোনো দিকের প্রতি অযথা গুরুত্ব আরোপ ও অন্যান্য দিকগুলোর প্রতি অবিচার ও জুলুম করা হবে না।

বস্তুত মানব জীবনের সুষ্ঠু ও সঠিক বিকাশ এবং তার সাফল্য ও সার্থকতা লাভের জন্য এটা একান্তভাবে অপরিহার্য। মানুষের মূল প্রকৃতিই এই সত্য-সঠিক পথ তথা সিরাতুল মুস্তাকিম লাভের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। পৃথিবীর কোনো অমুসলিম বা ইসলাম বিদ্বেষী চিন্তানায়ক এ কথার প্রতি স্বীকৃতি দিক আর না-ই দিক, এ কথা অকাট্য সত্য যে, অসংখ্য বাঁকা-চোরাপথ, ভ্রান্তপথ থেকে বারবার বিদ্রোহ ঘোষণার মূল কারণ হলো, মানব প্রকৃতি সিরাতুল মুস্তাকিম তথা সহজ-সরল পথের সন্ধানেই ছুটতে থাকে।

পক্ষান্তরে এ কথা সর্বজনবিদিত ও অকাট্য সত্য যে, মানুষ স্বয়ং মুক্তির এই রাজপথ আবিষ্কার করতে ও চিনতে সক্ষম হয় না এবং সিরাতুল মুস্তাকিম রচনা করতে পারে না-শুধুমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই সিরাতুল মুস্তাকিম রচনা করার মতো জ্ঞানের অধিকারী এবং তিনিই তা রচনা করতে সক্ষম। ঠিক এই উদ্দেশ্যসাধন করার জন্যেই আল্লাহ তা'য়ালা নবী-রাসূল প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁদের আন্দোলন-সংগ্রামের একমাত্র লক্ষ্য ছিল, মানুষকে মুক্তির রাজপথে নিয়ে আসা তথা আল্লাহর গোলামীর পথ, 'সিরাতুল মুস্তাকিম' কোনটি তা প্রদর্শন করা।

আল্লাহর কুরআন এই মহামুক্তির মহান পথ সিরাতুল মুস্তাকিমকে 'সাওয়া আস-সাবীল' নামেও মানুষের সামনে পেশ করেছে। পৃথিবীর এই নশ্বর জীবন থেকে শুরু করে আলমে আখিরাতের দ্বিতীয় পর্যায়ের জীবন পর্যন্ত অসংখ্য বাঁকা-চোরা এবং অন্ধকারে আচ্ছন্ন পথের মাঝখান দিয়ে সিরাতুল মুস্তাকিম বা মহামুক্তির মহান পথ সরল রেখার মতোই আল্লাহর জান্নাতের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। সুতরাং এই পথের যিনি পথিক হবেন, তিনি এই পৃথিবীতে নির্ভুল-অভ্রান্ত পথের পথিক হবেন এবং আলমে আখিরাতের জীবনে পরিপূর্ণভাবে সার্থক ও সাফল্যমণ্ডিত হবেন।

আর যে ব্যক্তি এই পৃথিবীতে সিরাতুল মুস্তাকিমের অভ্রান্ত পথ চিনতে ব্যর্থ হবে বা হারিয়ে ফেলবে সে ব্যক্তি এই পৃথিবীতেও বিভ্রান্ত, পথভ্রষ্ট ও ভুল পথের যাত্রী আর আলমে আখিরাতে তাকে অনিবার্যরূপে জাহান্নামে প্রবেশ করতে হবে। কারণ সিরাতুল মুস্তাকিম বা সাওয়া-আস সাবীল ব্যতিত অন্য সকল বাঁকা পথের শেষ প্রান্ত আল্লাহ তা'য়ালার সৃষ্টি জাহান্নাম পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে।

বস্তুবাদ আর জড়বাদের ওপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত একশ্রেণীর চিন্তানায়কগণ বর্তমান মানুষের জীবনকে ক্রমাগতভাবে একটি প্রান্ত থেকে বিপরীত দিকের আরেকটি প্রান্তে গিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হতে দেখে এই ভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, দ্বান্দ্বিক কার্যক্রম (Dialectical process) মানুষের জীবনের ক্রমবিকাশের স্বাভাবিক স্বভাবসম্মত পথ। এসব চিন্তাবিদগণ নিজেদের অজ্ঞতার কারণে বুঝে নিয়েছেন যে, প্রথমে এক চরমপন্থী দাবী (Thesis) মানুষকে একদিকের শেষ প্রান্তে নিয়ে যাবে, ঠিক অনুরূপভাবে সে ঐ প্রান্ত থেকে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আরেকটি চরমপন্থী দাবী (Antithesis) তাকে বিপরীত দিকের শেষ প্রান্তে নিয়ে পৌঁছাবে। এভাবে উভয় প্রান্তের আঘাতের সংমিশ্রণে মানুষের জন্য তার জীবন বিকাশের পথ (Synthesis) স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেরিয়ে আসবে আর এটাই হচ্ছে মানুষের ক্রমবিকাশ লাভের একমাত্র অভ্রান্ত পথ।

ভোগবাদে বিশ্বাসী এসব জড়বাদীদের আবিষ্কার করা ক্রমবিকাশ লাভের এই পথকে ক্রমবিকাশ লাভের পথ না বলে চপেটাঘাত খাওয়ার পথ বললে অত্যুক্তি হবে না। কারণ মানুষের জীবনের সঠিক বিকাশের পথে এই পথ বারংবার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, মানব জীবন বিকাশের পথে এ পথ অর্গল তুলে দেয়। প্রতিটি চরমপন্থী দাবী মানুষের জীবনকে তার কোনো একটি দিকে ঘুরিয়ে দেয় ও তাকে কঠিনভাবে টেনে নিয়ে যায়। এভাবে বিভ্রান্তির ঘূর্ণাবর্তে আবর্তিত হতে হতে যখন সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে তা অনেক দূরে চলে যায়, তখন স্বয়ং জীবনেরই অন্যান্য যেসব সমস্যার প্রতি কোনো গুরুত্ব প্রদান করা বা সমস্যাগুলোর সমাধান করা হয়নি, তা বিদ্রোহ শুরু করে।

এভাবে একটির পর একটি দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে, মানুষের জীবন থেকে শান্তি সুদূর পরাহত হয়ে যায়। এই অন্ধদের দৃষ্টি সিরাতুল মুস্তাকিমের দিকে যেতে বাধা দেয় তাদের সীমাহীন ভোগ বিলাস। এ জন্য তারা দেখতে পায় না, সিরাতুল মুস্তাকিমই হলো মানব জীবনের ক্রমবিকাশ লাভের একমাত্র সত্য-সঠিক পথ। আর বিশ্বনবী (সা:) এই সিরাতুল মুস্তাকিমের পথটিই মানব জাতিকে প্রদর্শন করেছেন এবং এ উদ্দেশ্যেই তাঁকে প্রেরণ করা হয়ছিলো। এই বিস্তারিত আলোচনায় নবী করীম (সা:) কে প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, পৃথিবীতে জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে সঠিক পথ ও পদ্ধতি সম্পর্কে মানুষ সম্পূর্ণ অজ্ঞ। শান্তি, শৃংখলা, উন্নতি, সমৃদ্ধি, প্রগতি সম্পর্কে মানুষ সম্পূর্ণরূপে অন্ধকারে এবং পরস্পর বিরোধী ভ্রান্ত চিন্তাধারায় তাড়িত ছিলো। অন্ধকারের কৃষ্ণ গহ্বর থেকে বের করে আলোর জগতে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যেই মহান আল্লাহ একান্ত অনুগ্রহ করে নবী করীম (সা:) কে অতুলনীয় মর্যাদা দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন।

পৃথিবীতে এটি বাস্তব সত্য যে, কোনো আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে সে আদর্শের ভিত্তিতে একটি সুসংগঠিত দল বা সংস্থা গঠন করতে হয়। সে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থাকে। সমগ্র দেশে থাকে স্থানীয় কার্যালয়। কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন সময় যে সকল নির্দেশ ঐ স্থানীয় কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয় তা ঐ আদর্শের অনুসারী নেতা-কর্মীগণ বাস্তবায়ন করে থাকেন। তেমনি মুসলিম একটি মিল্লাতের নাম এবং এ মিল্লাতের আদর্শ ইসলাম। এই মিল্লাতের জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:)।

আল্লাহ তা'য়ালার নির্দেশে তিনি এই মিল্লাতের জন্য একটি কেন্দ্র নির্মাণ করলেন। কেননা, এই মিল্লাতের যিনি বিশ্বনেতা তাঁর আগমনের সময় সমাগত। হযরত ইবরাহীম (আ:) ও তাঁর আগমনের জন্য আল্লাহ তা'য়ালার কাছে এভাবে দোয়া করলেন-

رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ . وَيُزَكِّيهِمْ طَ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

হে আমাদের মালিক! তাদের (বংশের) মধ্যে তাদের নিজেদের মাঝ থেকে তুমি (এমন) একজন রাসূল পাঠাও, যে তাদের কাছে তোমার আয়াতসমূহ পড়ে শোনাবে, তাদের তোমার কিতাবের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দিবে, উপরন্তু সে তাদের পবিত্র করে দিবে, কারণ তুমিই মহাপরাক্রমশালী ও পরম কুশলী। (সূরা বাকারা-১২৯)

সুতরাং ইবরাহীম (আ:) যে ঘর পুনঃনির্মাণ করলেন তা কোনো সাধারণ ঘর ছিল না। এই ঘর প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একটিই ছিল, সমগ্র বিশ্বে আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এখান থেকেই পরিচালিত হবে, এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখেই হযরত ইসমাঈল (আ:) ও তাঁর মা'কে জনমানবহীন এই প্রান্তরে রেখে যাওয়া হয়েছিল, ইসমাঈল (আ:) এর কুরবানীও ছিল ঐ একই উদ্দেশ্যে এবং কা'বার নির্মাণও ছিল ঐ একই লক্ষ্যে।

সমগ্র পৃথিবীতে যারা তাওহীদের মশাল বহন করবে, তারা যেন প্রতি বছরে একবার হজ্জ নামক বিশ্ব সম্মেলনে এসে সমবেত হয়, একত্রে সমস্বরে এক আল্লাহর দাসত্বের ঘোষণা বজ্রকণ্ঠে দিতে পারে, পারস্পরিক পরিচিতি লাভ করতে পারে, একে অপরের সমস্যা সম্পর্কে অবগত হয়ে তা সমাধানের বাস্তব পন্থা অবলম্বন করতে পারে, আল্লাহ বিরোধী শক্তির মুকাবিলা কিভাবে করা যায় এবং সমগ্র পৃথিবীতে কিভাবে এক আল্লাহ তা'য়ালার বিধান প্রতিষ্ঠা করা যায়-এ সকল কার্যক্রম গ্রহণ করার লক্ষ্যেই সেদিন কা'বা নির্মাণ করে আল্লাহর নবী হযরত ইবরাহীম (আ:) বিশ্বনবী তথা বিশ্বনেতাকে প্রেরণের দোয়া করেছিলেন এবং সাধারণ মানুষকে সে ঘরের দিকে আহ্বান জানিয়ে ছিলেন।

পবিত্র কুরআনের অনেক স্থানেই কা'বাঘর সম্পর্কে মহান আল্লাহ এই ঘর বানানোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে সম্পর্কে বলেছেন, 'এই ঘর হিদায়াতের কেন্দ্র, এখান থেকেই একত্ববাদের বাণী সমগ্র পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে'। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) এর দোয়ার প্রতি লক্ষ্য করলে কতকগুলো বিষয় আমাদের সম্মুখে স্পষ্ট হয়ে যায়।

১. এমন এক ব্যক্তিত্বকে বিশ্বনবী বা বিশ্বনেতা হিসাবে প্রেরণ করা হোক, যিনি মানবমণ্ডলীরই একজন। অর্থাৎ মানুষের বাইরের কোনো সত্তা নয়। মানুষের সকল ইচ্ছা, আকাক্সখা, কামনা-বাসনা, ব্যথা-বেদনা, মায়া-মমতা তথা সকল অনুভূতি হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে সক্ষম কেবলমাত্র মানুষই। এ জন্যেই মানুষের মধ্য থেকেই বিশ্বনেতাকে নির্বাচিত করার আবেদন করা হয়েছিলো।

২. তিনি মহান আল্লাহর সাথে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিবেন, সৃষ্টি হিসাবে স্রষ্টার প্রতি মানুষের দায়িত্ব-কর্তব্য কি তা বিশদভাবে মানুষকে জানিয়ে দিবেন এবং স্বয়ং আল্লাহই যে একমাত্র ইলাহ ও রব অর্থাৎ তিনিই আইনদাতা, বিধানদাতা এবং সকল বিষয়ের প্রতিপালক- এ বিষয়টিও মানুষের কাছে স্পষ্ট করে দিবেন।

৩. পৃথিবীতে মানুষ ভারসাম্যমূলক জীবন-যাপন করবে এবং এর জন্যে প্রয়োজনীয় যাবতীয় উপকরণ- যে সম্পর্কিত জ্ঞান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর কিতাবের মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন, এ সংক্রান্ত যাবতীয় জ্ঞান বিশ্বনবী তথা বিশ্বনেতা মানবজাতিকে শিক্ষা দিবেন। অর্থাৎ প্রগতির ফল্গুধারায় আপুত শোষণমুক্ত, শান্তিপূর্ণ জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ, বস্তুর কল্যাণকর কর্মে ব্যবহারকারী এবং উন্নত সভ্যতা-সংস্কৃতির অধিকারী দেশ, জাতি ও সমাজ বিনির্মাণে যা কিছু প্রয়োজন, তা কাংখিত বিশ্বনেতা শিক্ষা দিবেন।

৪. দোয়ায় বলা হয়েছিলো, 'এমন এক বিশ্বনেতা প্রেরণ করুন, যিনি মানুষকে পবিত্র করে দিবেন'।

যে আল্লাহ তা'য়ালা মানুষ সৃষ্টি করে তার যাবতীয় জীবনোপকরণ দিয়েছেন, সেই আল্লাহর দাসত্ব করার মধ্যেই মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নিহিত এবং মানুষ ক্রমশ মর্যাদার উচ্চ শিখরে আরোহণ করে। সম্মানের এমন এক পর্যায়ে এ মানুষ পৌঁছে যায় যে, যেখানে স্বয়ং ফিরিশতাও পৌঁছতে সক্ষম নয়। আবার এ মানুষ নিজের প্রকৃত মর্যাদা ও অবস্থান ভুলে আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে নিজের মহান মালিক আল্লাহকে ত্যাগ করে তার অনুরূপ আরেক সৃষ্টির, কোনো জড়পদার্থের বা নিজ হাতে গড়া কল্পিত কোনো শক্তির দাসত্ব করে, তখন সে মানুষের মর্যাদা শূন্যের কোঠা অতিক্রম করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীর প্রাপ্য মর্যাদাও হারিয়ে ফেলে। আর এ অবস্থায়ই একজন সম্মানিত মানুষের জন্য অপবিত্রতার মধ্যে নিমজ্জিত হওয়া বুঝায়।

যখন মানুষ তার প্রকৃত মর্যাদা সম্পর্কে উদাসীনতার পরিচয় দেয়, নিজের সম্মানকে অবহেলা করে আত্মমর্যাদা সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলে বলেই সে মানুষ তারই অনুরূপ আরেকজন মানুষকে নিজের বিধানদাতা, আইনদাতা, মুক্তিদাতা এবং যাবতীয় বিষয়ে সিদ্ধান্তদাতা হিসাবে বরণ করে। অথবা কোনো জড়পদার্থকে নিজের মনস্কামনা পূরণকারী হিসাবে বরণ করে বা নিজ হাতে গড়া কোনো কল্পিত বস্তুর দাসত্ব করে। তারই অনুরূপ সৃষ্টি আরেকজন মানুষ তাকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সমস্যার সমাধান দিবে এবং মানব সভ্যতা-সংস্কৃতির উপকরণ দিবে, যাবতীয় নীতিমালা রচনা করে দিবে আর সে তা অবলীলাক্রমে মেনে চলবে- এ ধরনের মর্যাদাহীনতার অপবিত্রতা থেকে সকল মানুষকে পবিত্র করবেন, 'এমন একজন বিশ্বনবী বা বিশ্বনেতা প্রেরণ করুন' এ দোয়াই হযরত ইবরাহীম (আ:) করেছিলেন।

মানুষের চিন্তাধারা, চেতনা, অভ্যাস, স্বভাব-চরিত্র, চলমান জীবনধারা, দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুন ও মতবাদ মতাদর্শকে ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত করে সকল কিছুকে পরিশুদ্ধ করবেন বিশ্বনবী (সা:) এ কামনাই মহান আল্লাহর কাছে করেছিলেন মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) এবং তাঁর পবিত্র এ দোয়ারই উত্তর স্বরূপ নবী করীম (সা:) প্রেরিত হয়েছেন। মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে ইবরাহীম (আ:) এর চাওয়ার সাথে সঙ্গতি রেখে বলছেন-

كَمَا أَرْسَلْنَا فِيكُمْ رَسُولاً مِّنْكُمْ يَتْلُوا عَلَيْكُمْ آيَاتِنَا وَيُزَكِّيْكُمْ وَيُعَلِّمُكُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُم مَّا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُوْنَ طَ

(এই সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্যেই) আমি এভাবে তোমাদের কাছে তোমাদের মাঝ থেকেই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছি, যে ব্যক্তি (প্রথমত) তোমাদের কাছে আমার 'আয়াত' পড়ে শোনাবে, (দ্বিতীয়ত) সে তোমাদের (জীবন) পরিশুদ্ধ করে দিবে এবং (তৃতীয়ত) সে তোমাদেরকে আমার কিতাব ও (তার অন্তর্নিহিত) জ্ঞান শিক্ষা দিবে, (সর্বোপরি) সে তোমাদের এমন বিষয়সমূহের জ্ঞান দান করবে, যা তোমরা কখনো জানতে না। (সূরা বাকারা-১৫১)

মানুষ নিজেকে কিভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র রাখবে, নিজের প্রতি, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, সমাজ, রাষ্ট্র ইত্যাদির প্রতি মানুষের দায়িত্ব- কর্তব্য কি, এসব বিষয় সম্পর্কে মানুষ ছিলো সম্পূর্ণ অন্ধকারে। মহাকাশের শূণ্য মার্গে, অগণিত গ্রহ-নক্ষত্রে, অদৃশ্য বায়ুমণ্ডলে এবং অন্যান্য স্তরে, শূণ্য মার্গের অদৃশ্য কৃষ্ণ গহ্বরে (Black hole), ওজন স্তরে, মহাশূন্যে ঘূর্ণয়মান পাথরের সাম্রাজ্যে, পাতালপুরীর কৃষ্ণ বিবরে, অগাধ জলধীর বিভিন্ন স্তরসহ অতল তলদেশে, মাটির তলদেশে খনিসমূহের স্তর অতিক্রম করে উত্তপ্ত গলিত লাভার স্তরে, পর্বতের সৃষ্টি কৌশল ও অবস্থানে, পণ্ডদলের মাঝে, অরোণ্যের ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে নবী- রাসূলগণই সর্বপ্রথম মানুষকে জ্ঞান দান করেছেন। শিক্ষা দিয়েছেন বস্তুর ব্যবহার। বিজ্ঞান যে সকল বিষয় বর্তমানে মানুষকে জানাচ্ছে, এসব বিষয় সম্পর্কে নবী করীম (সা:) পবিত্র কুরআনে সর্বপ্রথম মানুষকে অবগত করেছেন। বস্তুর ধ্বংস নেই, বস্তু অবিনাশী। মানুষেরও ধ্বংস নেই, ক্ষণস্থায়ী জীবন শেষে মৃত্যুর পরে আরেকটি অনন্তকালের জীবন রয়েছে এবং সেখানে পৃথিবীর জীবনের যাবতীয় কিছুর হিসাব দিতে হবে- এ সকল বিষয় ছিলো মানুষের অজানা। অর্থাৎ মানুষ যা জানতো না তাই নবী করীম (সা:) মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন।

এ জন্যেই হাদীস শরীফে দেখা যায়, সাহাবায়ে কেরাম রাসূল (সাঃ)-এর কাছে জানতে চেয়েছেন- لِمَا بُعِثْتَ 'কী কারণে আপনার আগমন?' জবাবে তিনি জানিয়েছেন- بُعِثْتُ مُعَلِّمًا - 'আমি প্রেরিত হয়েছি শিক্ষক হিসাবে'।

মানুষের প্রয়োজনীয় সকল কিছুর শিক্ষক ছিলেন নবী করীম (সা:), এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُوْلًا مِّنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُوْ عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ ، وَإِنْ كَانُوْا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِيْنٍ

আল্লাহ অবশ্যই তাঁর ঈমানদার বান্দাদের ওপর এই অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের মাঝ থেকে একজন ব্যক্তিকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, যে তাদের কাছে আল্লাহর কিতাবের আয়াতসমূহ পড়ে শোনায় এবং (সে অনুযায়ী) সে তাদের জীবনকে পরিশুদ্ধ করে, (সর্বোপরি) সে (নবী) তাদের আল্লাহর কিতাব ও (তাঁর গ্রন্থলব্ধ) জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়, অথচ এরা সবাই ইতোপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিলো। (সূরা আলে ইমরান-১৬৪)

এ আয়াতে নবী করীম (সা:) কে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষাদাতা হিসাবে পরিচিতি দান করেছেন। দুর্ভাগ্য আমাদের, আমরা সকল বিষয়ের এই মহান শিক্ষককে 'ধর্মনেতা' পরিচয়ে আবদ্ধ রেখে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, সমাজনীতি, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষাগুরু হিসাবে গ্রহণ করেছি নীতি নৈতিকতাহীন উশৃংখল প্রকৃতির কিছু সংখ্যক বিভ্রান্ত মানুষকে। ধর্মীয় নীতিমালার সামান্য কিছু অংশ শেখার জন্যে আমরা নবী করীম (সা:) এর দিকে হাত প্রসারিত করি, আর জীবনের বিস্তীর্ণ অঙ্গনে অন্যান্য সকল নীতিমালা গ্রহণ করার জন্যে নবী করীম (সা:) এর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে স্বার্থান্বেষী চরিত্রহীন ধুরন্ধর বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত লোকদের প্রতি মুখাপেক্ষী হই।

নবী করীম (সা:) ব্যতীত অভ্রান্ত, নির্ভুল ও প্রকৃত সত্য জ্ঞান, সিদ্ধান্ত এবং কৌশল অন্য কোনো মানুষ কখনোই দিতে পারে না এবং সেটা কোনো মানুষের জানাও নেই, এ বিষয়টি মহান আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন এভাবে যে, 'তিনি এসব বিষয়ে মানবজাতিকে অবগত করানোর পূর্বে তারা স্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিলো'। আরেক আয়াতে বিষয়টি আল্লাহ তা'য়ালা এভাবে বলছেন-

هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الأُمِّيِّنَ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيْهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ ، وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُّبِيْنٍ

তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি (একটি) সাধারণ জনগোষ্ঠীর মাঝে থেকে তাদেরই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, যে তাদের আল্লাহর আয়াতসমূহ পড়ে শোনাবে, তাদের জীবনকে পবিত্র করবে, তাদের (আমার) গ্রন্থের (কথা ও সে অনুযায়ী পৃথিবীতে চলার) কৌশল শিক্ষা দিবে, অথচ এ লোকগুলোই (রাসূল আসার) আগে (পর্যন্ত) এক সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিলো। (সূরা আল জুমুয়া-২)

মানুষ তার নিজের সত্তার দিক দিয়েই একটি জগৎ বিশেষ। তার এই জগতের মধ্যে অসংখ্য শক্তি, যোগ্যতা ও কর্ম-ক্ষমতা বিদ্যমান। তার এই জগতের মধ্যে জাগ্রত রয়েছে কামনা-বাসনা, লোভ-লালসা, আবেগানুভূতি, ভাবাবেগ, ঝোঁক-প্রবণতা, কাম, ক্রোধ, জেদ, হঠকারিতা, হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি। মানুষের দেহ ও মনের রয়েছে অসংখ্য দাবি। মানুষের আত্মা, প্রাণ ও স্বভাবের রয়েছে সীমাহীন জিজ্ঞাসা। প্রতিনিয়ত তার মধ্যে অসংখ্য প্রশ্নমালা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব প্রশ্নের জবাব লাভের জন্য সে অস্থির হয়ে ওঠে। এটাই হলো মানুষের জটিল অবস্থা।

এই জটিল অবস্থাসম্পন্ন মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে যে মানব সমাজ গড়ে ওঠে, সে সমাজও নানা ধরনের জটিল সম্পর্কের ভিত্তিতেই গঠিত হয়। মানব সমাজ অসীম ও অসংখ্য জটিল সমস্যার সমন্বয়ের ভিত্তিতেই গঠিত হয়েছে। সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ লাভের সাথে সাথে এসব জটিলতা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি লাভ করতে থাকে।

এসব সমস্যা ছাড়াও পৃথিবীতে মানুষের জীবন ধারণের জন্য যে প্রয়োজনীয় সামগ্রী মানুষের চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, তা ব্যবহার করা এবং মানবীয় সংস্কৃতিতে তা ব্যবহার উপযোগী করে প্রয়োগ করার প্রশ্নেও মানুষের ভেতরে ব্যক্তিগত ও সামগ্রিকভাবে অসংখ্য জটিলতার সৃষ্টি করে। মানুষ তার নিজের দুর্বলতার কারণেই তার সমগ্র জীবনের বিস্তীর্ণ অঙ্গনে একই সময়ে পূর্ণ ও সামঞ্জস্য এবং ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারে না। এ কারণে মানুষ নিজের জন্য জীবনের এমন কোন পথ স্বয়ং সে নিজেই রচনা করতে পারে না, যে পথ নির্ভুল হতে পারে।

এ কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতিটি মানুষের ভেতরেই একটি জগৎ রয়েছে এবং সে জগৎ অসংখ্য জটিল বিষয় সমন্বিত, অসংখ্য শক্তি-সামর্থ সে জগতে ক্রিয়াশীল রয়েছে। সুতরাং মানুষ স্বয়ং যে বিধি-বিধান, মত-পথ রচনা করবে, সে বিধান স্বয়ং মানুষের অন্তর্নিহিত যাবতীয় শক্তি-সামর্থের সাথে পূর্ণ ইনসাফ করবে, তার সমস্ত কামনা-বাসনার সাথে প্রকৃত অধিকার বুঝিয়ে দিবে, তার আবেগ-উচ্ছ্বাস ও প্রবণতার সাথে ভারসাম্যমূলক আচরণ করবে, তার দেহের ভেতরের ও দেহের বাইরের যাবতীয় প্রয়োজন সঠিকভাবে পূরণ করবে, তার সমগ্র জীবনের যাবতীয় সমস্যার দিকে পরিপূর্ণভাবে দৃষ্টি দিয়ে সেসব কিছুর এক সুষম ও সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধান বের করবে এবং বাস্তব জিনিসগুলোও ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক জীবনে সুবিচার, ইনসাফ ও সত্যনিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যবহার করবে, এসব কোনো কিছুই মানুষের পক্ষে কক্ষনো সম্ভব হবে না।

প্রকৃতপক্ষে মানুষ স্বয়ং যখন নিজের পথ-প্রদর্শক, আইন-কানুন, বিধান রচয়িতার ভূমিকা পালন করে, তখন নিগূঢ় সত্যের অসংখ্য দিকের মধ্য থেকে কোনো একটি দিক, জীবনের অসংখ্য প্রয়োজনের মধ্য থেকে কোনো একটি প্রয়োজন, সমাধানযোগ্য সমস্যাবলীর কোনো একটি সমস্যা তার চেতনার জগতে এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে যে, মানুষ ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক- অন্যান্য দিক ও প্রয়োজন এবং সমস্যাগুলোর ব্যাপারে সে দৃষ্টি দিতে সক্ষম হয় না।

কারণ তার চেতনার জগৎ তো আচ্ছন্ন হয়ে থাকে বিশেষ একটি সমস্যাকে কেন্দ্র করে। এভাবে বিশেষ মানুষের ওপরে বিশেষ কোনো মত বা আদর্শ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে চাপিয়ে দেয়ার কারণে জীবনের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে সামঞ্জস্যহীনতার এক চরম পর্যায়ের দিকে তা বক্র গতিতে চলতে থাকে。

মানব জীবনের এই চলার বাঁকা গতি যখন শেষ স্তরে গিয়ে উপনীত হয় তখন মানুষের জন্য তা অসহ্যকর হয়ে জীবনের যেসব দিক, প্রয়োজন ও সমস্যার দিকে ইতোপূর্বে দৃষ্টি দেয়া হয়নি, সেসব দিক তরিৎ গতিতে বিদ্রোহ করে এবং সেসব প্রয়োজন পূরণ করতে বলে, সমস্যাগুলো সমাধানের দাবি করতে থাকে। কিন্তু তখন আর মানুষের পক্ষে সেসব প্রয়োজন পূরণ করা ও সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব হয় না। কারণ পূর্বানুরূপ সামঞ্জস্যহীন কর্মনীতি পুনরায় চলতে থাকে।

পূর্বে যেসব সমস্যা সমাধান ও প্রয়োজনগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়নি, সামঞ্জস্যহীন কর্মনীতির ফলে মানুষের যেসব দাবি ও আবেগ-উচ্ছ্বাসকে ভয়-ভীতি ও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করে রাখা হয়েছিল, তা পুনরায় মানুষের ওপর প্রচণ্ড গতিতে আধিপত্য বিস্তার করে এবং তাকে নিজের বিশেষ দাবি অনুযায়ী বিশেষ একটি লক্ষ্যের দিকে গতিবান করে তোলার চেষ্টা করে।

এ সময় অন্যান্য দিক, প্রয়োজন ও সমস্যাগুলোর সাথে পূর্বের ন্যায় আচরণই করতে থাকে। এর অনিবার্য ফলশ্রুতিতে মানুষের জীবন কখনো সঠিক, সত্য, সহজ-সরল পথে একনিষ্ঠভাবে চলার মতো পরিবেশ লাভ করে না। সমস্যার সাগরে নিমজ্জিত হয়ে সে ক্রমশঃ ডুবে যেতে থাকে। একটি ধ্বংস গহ্বর থেকে কোনক্রমে সে উঠতে সক্ষম হলেও ছুটতে গিয়ে অন্য আরেকটি ধ্বংস গহ্বরে সে আছড়ে পড়ে। মানুষ এমনি চারিত্রিক বৈশিষ্টে পরিপূর্ণ এক জীব যে, কোনো কাজ করতে গেলে সর্বপ্রথম তাকে নির্ধারণ করে নিতে হয় তার কাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। অন্য কোনো জীবের ন্যায় এ মানুষ লক্ষ্যহীন কাজ করতে পারে না আর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে গেলেই তার সামনে প্রশ্ন দেখা দেয় যে, কোন্ আদর্শের ওপর ভিত্তি করে, কোন্ আদর্শের দেয়া নিয়ম অনুযায়ী সে তার কাজগুলো সম্পাদন করবে।

মানুষের নিজের রচনা করা কোনো মতবাদ মানুষকে আদর্শের সন্ধান দেয় না বিধায় মানুষ চরম হতাশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। মানব চরিত্র এমনি যে, কোনো মতবাদ যখন মানুষকে আদর্শহীন অবস্থায় পৃথিবীতে ছেড়ে দেয় তখন স্বাভাবিক কারণেই মানুষের জীবনে নেমে আসে সীমাহীন শূন্যতা।

পক্ষান্তরে আদর্শহীন অবস্থায় চিন্তা ও চেতনার শূন্যতা নিয়ে, মানুষ জীবন ধারণ করতে পারে না বলে জীবন যাত্রা নির্বাহের জন্য আদর্শের সন্ধানে মানুষ অস্থির হয়ে ওঠে। ফলে চিন্তা ও চেতনার জগতের শূন্যতা পূরণ করার জন্য তার সামনে বিচিত্র ও মানব চিন্তার বিপরীতমুখী আদর্শের সমাবেশ ঘটতে থাকে। এ অবস্থায় মানুষের যে কি করুণ পরিণতি ঘটে তা একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হতে পারে।

কোনো একজন মানুষের অনেকগুলো বন্ধু ছিলো। বন্ধুদের মধ্যে কেউ শুকনো কাঠ ব্যবসায়ী, কেউ তুলা ব্যবসায়ী, কেউ কাপড় ব্যবসায়ী, কেউ পেট্রোল ব্যবসায়ী, কেউ কেরোসিন তৈল ব্যবসায়ী, কেউ খড় ব্যবসায়ী, কেউ ছিলো কাগজ ব্যবসায়ী। হঠাৎ একদিন দেখা গেলো, গভীর রজনীতে ঐ অনেকগুলো বন্ধুর অধিকারী ব্যক্তিটির আপন বাসগৃহে আগুন লেগেছে। তখন ঐ ব্যক্তি চিৎকার করে তার বন্ধুদের কাছে সাহায্য চেয়ে বলছে, 'আমার এই চরম বিপদের মুহূর্তে তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে এসে আমাকে সাহায্য করো'।

লোকটির এই করুণ আর্তনাদে সাড়া দিয়ে তার সকল বন্ধুরা ছুটে এলো। কাঠ ব্যবসায়ী বন্ধু প্রচুর কাঠসহ ছুটে এসে অগুনের ভেতরে তা ছুড়ে দিলো। কাপড় ব্যবসায়ী বন্ধু কতকগুলো কাপড়ের থান এনে তা আগুনের ভেতরে ছুড়ে মারলো। খড় ব্যবসায়ী বন্ধু কয়েক বোঝা খড় এনে তা আগুনের ভেতরে ছুড়ে দিল। এভাবে কাগজ ব্যবসায়ী বন্ধু কাগজ, পেট্রোল ব্যবসায়ী বন্ধু পেট্রোল, কেরোসিন ব্যবসায়ী বন্ধু কেরোসিন আগুনের ভেতরে ছুড়ে দিলো। ফল যা হবার তাই হলো। আগুন নির্বাপিত হবার পরিবর্তে আরো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। সকল বন্ধুর কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল বিপদগ্রস্ত বন্ধুকে সাহায্য করা অর্থাৎ বন্ধুর ঘরের আগুন নিভিয়ে ফেলা। পক্ষান্তরে বিপদগ্রস্ত বন্ধুর জন্য এই লোকগুলো যা করলো তাতে করে বিপদগ্রস্ত বন্ধুর বিপদ বৃদ্ধি বৈ কমলো না।

প্রকৃতপক্ষে মানুষ নিজের জন্য যত আদর্শ, মতবাদ-মতাদর্শ রচনা করেছে তা সবই আঁকা-বাঁকা, উঁচু-নীচু বলে প্রতিভাত হয়েছে। ভুল দিক থেকে তার গতি শুরু হয় এবং ভুল দিকেই তা উপনীত হয়ে সমাপ্তি লাভ করে এবং সেখান থেকে পুনরায় অন্য কোনো ভুল পথের দিকেই অগ্রসর হতে থাকে। এসব অসংখ্য বাঁকা ও ভ্রান্ত পথের ঠিক মাঝামাঝি অবস্থানে অবস্থিত এমন একটি পথ একান্তই আবশ্যক। যেন মানুষের সমস্ত শক্তি ও কামনা-বাসনার প্রতি, ভালোবাসা, মায়া-মমতা, স্নেহ, প্রেম-প্রীতি ও আবেগ-উচ্ছ্বাসের প্রতি, মানুষের আত্মা ও শারীরিক দাবির প্রতি এবং জীবনের যাবতীয় সমস্যার প্রতি যথাযথ-ন্যায়-নিষ্ঠ আচরণ করা, যে আচরণে কোনো ধরনের বক্রতা ও জটিলতা থাকবে না, বিশেষ কোনো দিকের প্রতি অযথা গুরুত্ব আরোপ ও অন্যান্য দিকগুলোর প্রতি অবিচার ও জুলুম করা হবে না।

বস্তুত মানব জীবনের সুষ্ঠু ও সঠিক বিকাশ এবং তার সাফল্য ও সার্থকতা লাভের জন্য এটা একান্তভাবে অপরিহার্য। মানুষের মূল প্রকৃতিই এই সত্য-সঠিক পথ তথা সিরাতুল মুস্তাকিম লাভের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। পৃথিবীর কোনো অমুসলিম বা ইসলাম বিদ্বেষী চিন্তানায়ক এ কথার প্রতি স্বীকৃতি দিক আর না-ই দিক, এ কথা অকাট্য সত্য যে, অসংখ্য বাঁকা-চোরাপথ, ভ্রান্তপথ থেকে বারবার বিদ্রোহ ঘোষণার মূল কারণ হলো, মানব প্রকৃতি সিরাতুল মুস্তাকিম তথা সহজ-সরল পথের সন্ধানেই ছুটতে থাকে।

পক্ষান্তরে এ কথা সর্বজনবিদিত ও অকাট্য সত্য যে, মানুষ স্বয়ং মুক্তির এই রাজপথ আবিষ্কার করতে ও চিনতে সক্ষম হয় না এবং সিরাতুল মুস্তাকিম রচনা করতে পারে না-শুধুমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই সিরাতুল মুস্তাকিম রচনা করার মতো জ্ঞানের অধিকারী এবং তিনিই তা রচনা করতে সক্ষম। ঠিক এই উদ্দেশ্যসাধন করার জন্যেই আল্লাহ তা'য়ালা নবী-রাসূল প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁদের আন্দোলন-সংগ্রামের একমাত্র লক্ষ্য ছিল, মানুষকে মুক্তির রাজপথে নিয়ে আসা তথা আল্লাহর গোলামীর পথ, 'সিরাতুল মুস্তাকিম' কোনটি তা প্রদর্শন করা।

আল্লাহর কুরআন এই মহামুক্তির মহান পথ সিরাতুল মুস্তাকিমকে 'সাওয়া আস-সাবীল' নামেও মানুষের সামনে পেশ করেছে। পৃথিবীর এই নশ্বর জীবন থেকে শুরু করে আলমে আখিরাতের দ্বিতীয় পর্যায়ের জীবন পর্যন্ত অসংখ্য বাঁকা-চোরা এবং অন্ধকারে আচ্ছন্ন পথের মাঝখান দিয়ে সিরাতুল মুস্তাকিম বা মহামুক্তির মহান পথ সরল রেখার মতোই আল্লাহর জান্নাতের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। সুতরাং এই পথের যিনি পথিক হবেন, তিনি এই পৃথিবীতে নির্ভুল-অভ্রান্ত পথের পথিক হবেন এবং আলমে আখিরাতের জীবনে পরিপূর্ণভাবে সার্থক ও সাফল্যমণ্ডিত হবেন।

আর যে ব্যক্তি এই পৃথিবীতে সিরাতুল মুস্তাকিমের অভ্রান্ত পথ চিনতে ব্যর্থ হবে বা হারিয়ে ফেলবে সে ব্যক্তি এই পৃথিবীতেও বিভ্রান্ত, পথভ্রষ্ট ও ভুল পথের যাত্রী আর আলমে আখিরাতে তাকে অনিবার্যরূপে জাহান্নামে প্রবেশ করতে হবে। কারণ সিরাতুল মুস্তাকিম বা সাওয়া-আস সাবীল ব্যতিত অন্য সকল বাঁকা পথের শেষ প্রান্ত আল্লাহ তা'য়ালার সৃষ্টি জাহান্নাম পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে।

বস্তুবাদ আর জড়বাদের ওপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত একশ্রেণীর চিন্তানায়কগণ বর্তমান মানুষের জীবনকে ক্রমাগতভাবে একটি প্রান্ত থেকে বিপরীত দিকের আরেকটি প্রান্তে গিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হতে দেখে এই ভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, দ্বান্দ্বিক কার্যক্রম (Dialectical process) মানুষের জীবনের ক্রমবিকাশের স্বাভাবিক স্বভাবসম্মত পথ। এসব চিন্তাবিদগণ নিজেদের অজ্ঞতার কারণে বুঝে নিয়েছেন যে, প্রথমে এক চরমপন্থী দাবী (Thesis) মানুষকে একদিকের শেষ প্রান্তে নিয়ে যাবে, ঠিক অনুরূপভাবে সে ঐ প্রান্ত থেকে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আরেকটি চরমপন্থী দাবী (Antithesis) তাকে বিপরীত দিকের শেষ প্রান্তে নিয়ে পৌঁছাবে। এভাবে উভয় প্রান্তের আঘাতের সংমিশ্রণে মানুষের জন্য তার জীবন বিকাশের পথ (Synthesis) স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেরিয়ে আসবে আর এটাই হচ্ছে মানুষের ক্রমবিকাশ লাভের একমাত্র অভ্রান্ত পথ।

ভোগবাদে বিশ্বাসী এসব জড়বাদীদের আবিষ্কার করা ক্রমবিকাশ লাভের এই পথকে ক্রমবিকাশ লাভের পথ না বলে চপেটাঘাত খাওয়ার পথ বললে অত্যুক্তি হবে না। কারণ মানুষের জীবনের সঠিক বিকাশের পথে এই পথ বারংবার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, মানব জীবন বিকাশের পথে এ পথ অর্গল তুলে দেয়। প্রতিটি চরমপন্থী দাবী মানুষের জীবনকে তার কোনো একটি দিকে ঘুরিয়ে দেয় ও তাকে কঠিনভাবে টেনে নিয়ে যায়। এভাবে বিভ্রান্তির ঘূর্ণাবর্তে আবর্তিত হতে হতে যখন সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে তা অনেক দূরে চলে যায়, তখন স্বয়ং জীবনেরই অন্যান্য যেসব সমস্যার প্রতি কোনো গুরুত্ব প্রদান করা বা সমস্যাগুলোর সমাধান করা হয়নি, তা বিদ্রোহ শুরু করে।

এভাবে একটির পর একটি দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে, মানুষের জীবন থেকে শান্তি সুদূর পরাহত হয়ে যায়। এই অন্ধদের দৃষ্টি সিরাতুল মুস্তাকিমের দিকে যেতে বাধা দেয় তাদের সীমাহীন ভোগ বিলাস। এ জন্য তারা দেখতে পায় না, সিরাতুল মুস্তাকিমই হলো মানব জীবনের ক্রমবিকাশ লাভের একমাত্র সত্য-সঠিক পথ। আর বিশ্বনবী (সা:) এই সিরাতুল মুস্তাকিমের পথটিই মানব জাতিকে প্রদর্শন করেছেন এবং এ উদ্দেশ্যেই তাঁকে প্রেরণ করা হয়ছিলো। এই বিস্তারিত আলোচনায় নবী করীম (সা:) কে প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, পৃথিবীতে জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে সঠিক পথ ও পদ্ধতি সম্পর্কে মানুষ সম্পূর্ণ অজ্ঞ। শান্তি, শৃংখলা, উন্নতি, সমৃদ্ধি, প্রগতি সম্পর্কে মানুষ সম্পূর্ণরূপে অন্ধকারে এবং পরস্পর বিরোধী ভ্রান্ত চিন্তাধারায় তাড়িত ছিলো। অন্ধকারের কৃষ্ণ গহ্বর থেকে বের করে আলোর জগতে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যেই মহান আল্লাহ একান্ত অনুগ্রহ করে নবী করীম (সা:) কে অতুলনীয় মর্যাদা দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px