📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 পৃথিবীতে নবী-রাসূলের অবস্থা

📄 পৃথিবীতে নবী-রাসূলের অবস্থা


মহান আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক, অভিভাবক এবং বন্ধু, এর পরেই নবীদের স্থান। অর্থাৎ আল্লাহ তা'য়ালার পরেই মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু পৃথিবীতে আগমনকারী নবী-রাসূল। তাঁরা যখন দেখেন মানুষ সত্য পথ ত্যাগ করে ভুল পথে চলছে এবং পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। তখন তাঁরা অস্থির হয়ে পড়েন। মানব দরদী হিসেবে তাঁরা মানুষকে সংশোধন করার জন্য চেষ্টা-সাধনা করতে থাকেন। মানুষ তাদের এই পরম বন্ধুর সাথে বড় বিচিত্র আচরণ করে। নবী-রাসূল যখন মানুষের ভুল সংশোধন করার চেষ্টা শুরু করেন, তখন এই মানুষ তাদের কথা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাদেরকে বিদ্রুপ, কারাগারে নিক্ষেপ, শারীরিক নির্যাতন, দেশ থেকে বহিষ্কার এবং ক্ষেত্র বিশেষে হত্যাও করেছে। এরপরেও তাঁরা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করেছেন। তাঁরা তাদের দায়িত্ব পালন থেকে ক্ষণিকের জন্যেও বিরত হননি।

নবী-রাসূলের ইন্তেকালের পরে তাদের প্রচারিত শিক্ষা ও আদর্শে তাঁরই অনুসারীগণ সামান্য স্বার্থের কারণে পরিবর্তন পরিবর্ধন করেছে। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যে কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল সে কিতাবের ভেতরে পরিবর্তন করা হয়েছে। অনুসারীগণ নিজেদের মনগড়া কথা সেই কিতাবে নবীর কথা বলে লিপিবদ্ধ করেছে। আল্লাহর ইবাদাত করার বিভিন্ন নতুন পদ্ধতির বিষয় লিপিবদ্ধ করেছে। কেউ কেউ স্বয়ং নবীর কবরের পূজা করা আরম্ভ করেছে। অনেকে এমন মন্তব্য করেছে যে, স্বয়ং আল্লাহ নবীর রূপ ধারণ করে আমাদের মাঝে অবতার (Incarnation of a human body) হিসেবে আগমন করেছিলেন।

অনেকে নিজেদের নবীকে স্বয়ং আল্লাহর সন্তান বলে ঘোষণা করেছে। নবী এবং তাঁর মায়ের কল্পিত মূর্তি নির্মাণ করে পূজা করেছে। আফসোস! যারা এসেছিলেন পৃথিবী থেকে মূর্তি উৎখাত করতে, আর তাদের ইন্তেকালের পরে তাঁর অনুসারীরা তাদের মূর্তি নির্মাণ করে পূজা করেছে। এমনভাবে তারা তাদের নবীর শিক্ষা এবং জীবন বিকৃত করেছে, ঐ নবীর শিক্ষা যে কি ছিল বর্তমানে তা খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত দূরহ ব্যাপার। নবীর প্রকৃত জীবন যে কেমন ছিল তাও জানার কোনো উপায় তারা রাখেনি। একমাত্র নবী করীম (সা:) এর আনিত জীবন বিধান বা তাঁরই শিক্ষা মহান আল্লাহ তা'য়ালার অসীম রহমতে অবিকৃত রয়েছে এবং তিনি তাঁর শেষ নবীর শিক্ষা কিয়ামত পর্যন্ত স্বয়ং সংরক্ষণ করবেন।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 মানুষের প্রতি নবী-রাসূলের আহ্বান

📄 মানুষের প্রতি নবী-রাসূলের আহ্বান


মহান আল্লাহ মানব জাতিকে সংশোধন করার জন্য যে সংখ্যক নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই মানুষকে একই দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। প্রত্যেক নবীই বলেছেন, 'হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর দাসত্ব করো। তিনি ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো ইলাহ নেই'। আমরা দেখি বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদগণ মানুষকে নিজ দলে আকৃষ্ট করার জন্য মুখরোচক কথাবার্তা বলে জনগণকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। অথবা সাময়িক কোনো সমস্যার দিকে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে।

কিন্তু নবী-রাসূলের কর্মপদ্ধতি এমন ছিলো না, তাঁরা দেশের কোনো সমস্যাকে প্রাধান্য দিয়ে আন্দোলন করেননি। অর্থনৈতিক মুক্তির শ্লোগান দিয়ে মানুষের সামনে অবতীর্ণ হননি। কৃত্রিম কোনো বিষয় তাঁর জাতির সম্মুখে বড় করে দেখাননি। তাঁরা প্রথমেই বলেছেন, 'হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দাসত্ব করো। তিনি ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো ইলাহ নেই'। এ কথা শোনার সাথে সাথে নবীর পরিবার, সমাজ, দেশবাসী কেনো তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তা চিন্তা করে দেখার বিষয়। 'ইলাহ্' শব্দ দিয়ে তাঁরা কি বুঝিয়েছেন যে, নবীদেরকে নির্যাতিত হতে হয়েছে। প্রত্যেক নবীর প্রতিই নির্যাতন করা হয়েছে শুধুমাত্র এই 'ইলাহ্' বলার কারণে। আমাদেরকে বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে 'ইলাহ্' শব্দ দ্বারা আসলে কি বুঝায়।

যে শক্তি এই পৃথিবী এবং পৃথিবীর বাইরের, ভেতরের সকল প্রাণী ও অন্যান্য বস্তুর যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করেন, আরবী ভাষায় সেই শক্তিকে 'ইলাহ' বলে। মানুষের সকল প্রয়োজন যিনি পূরণ করেন, সমাজ, পরিবার, দেশ পরিচালনার জন্য যিনি আইন দান করেন এবং যার আইনই একমাত্র চলতে পারে তিনিই হলেন 'ইলাহ্'। যে কোনো প্রয়োজনে মানুষ যাঁর মুখাপেক্ষী হয়, যিনি মানুষকে সাহায্য করবেন এবং মানুষ যাঁর কাছে সাহায্য চাইবে তিনিই 'ইলাহ্'। সুতরাং সমাজের কায়েমী স্বার্থবাদী শক্তি, শোষক-শাসক যখন বুঝেছে, নবীর এ কথা গ্রহণ করলে নিজের কর্তৃত্ব বলতে আর কিছুই থাকবে না, সকল কর্তৃত্ব আল্লাহ তা'য়ালার জন্য ত্যাগ করতে হবে, তখনই তারা নবীর সাথে তথা ইসলামী আন্দোলনের প্রতি শত্রুতা করেছে এবং বর্তমানেও করছে- আগামীতেও করবে।

ইতিহাস কথা বলে, প্রত্যেক নবীর সাথেই তৎকালিন সমাজের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব ও দেশের শাসক শ্রেণীর সাথে 'ইলাহ' সম্পর্কে বিতর্ক হয়েছে। পবিত্র কুরআন বিবৃত এ সকল কাহিনী অন্য কোনো পৃথিবীর নয় বরং যে পৃথিবীতে মানুষ বাস করছে, মানুষের সাথে যে পৃথিবী সম্পর্কিত সেই পৃথিবীরই ঘটনা এবং এ সকল ঘটনা মানুষের সাথে সম্পর্কিত। নবী-রাসূল যে দেশে এবং জাতির মধ্যে আগমন করেছেন তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক তথা নানা ধরণের সমস্যা ছিল। এসব উপস্থিত সমস্যা সমাধানেরও প্রয়োজন ছিল। কিন্তু নবী-রাসূলগণ এ ধরনের সাময়িক ও স্থানীয় সমস্যাকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র একটি সমস্যা সামনে রেখেছেন এবং সে সমস্যা 'ইলাহ্' কেন্দ্রিক।

তাঁরা অন্য কোন সমস্যা জাতির সামনে তুলে না ধরে প্রধান সমস্যা অর্থাৎ কৃত্রিম 'ইলাহ্'-সমূহের দাসত্ব ত্যাগ করে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে 'ইলাহ' হিসাবে স্বীকৃতি দিতে বলেছেন। নবী করীম (সা:) প্রথমে এভাবে আহ্বান জানিয়েছিলেন, 'হে মানুষ! বলো আল্লাহ ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো ইলাহ্ নেই। তাহলে তোমরা কল্যাণ লাভ করবে'।

সুতরাং এ থেকে স্পষ্ট অনুধাবন করা যায় পৃথিবীতে সমস্যার সৃষ্টি তখনই হয়, যখন মানুষ একমাত্র আল্লাহকে রব ও ইলাহ্ হিসেবে মানে না। এর পরিবর্তে নিজেকে, সমাজপতি, প্রচলিত প্রথা, নিজ পরিবার, সমাজের আইন, দেশের শাসক, দেশের নানা ধরণের নীতি, দৃষ্টির সামনের সাময়িক স্বার্থ, ধর্মনেতা তথা প্রকৃত রব ব্যতীত অন্য কোনো কিছুকে নিজের মাবুদ বা ইলাহ তথা রব হিসেবে প্রাধান্য দিয়েছে, তখনই দেশে, সমাজে, ব্যক্তি জীবনে, রাষ্ট্র জীবনে নানা ধরণের সমস্যার আবির্ভাব ঘটেছে। এ কারণে নবী-রাসূল ও তাদের অনুসারী ইসলামী নেতৃত্ব দেশের, সমাজের সকল সমস্যা উপেক্ষা করে প্রধান সমস্যার দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

নবী-রাসূলগণ জানতেন সকল সমস্যার স্রষ্টা হলো মাত্র একটি। সুতরাং এই সমস্যার সমাধান হলে অন্য সমস্যাসমূহ এমনিতেই বিলীন হবে। এই সমস্যার সমাধানের ওপর জীবনের অন্যান্য যাবতীয় সমস্যার সমাধান নির্ভরশীল। এ কারণে তাঁরা তাদের সমগ্র জীবন এই সমস্যা সমাধানের জন্যই ব্যয় করেছেন। হযরত ঈসা (আ:) যখন বনী ইসরাঈলদের কাছে আগমন করেছিলেন তখন তিনি তাদেরকে বলেছিলেন-

وَلأُحِلَّ لَكُم بَعْضَ الَّذِى حُرِّمَ عَلَيْكُمْ وَجِئْتُكُم بِآيَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ قَفَ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوْنِ إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ طَ هَذَا صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٌ

তোমাদের ওপর হারাম করে রাখা হয়েছে এমন কতিপয় জিনিসও আমি তোমাদের জন্যে হালাল করে দেবো এবং তোমাদের মালিকের পক্ষ থেকে (এই) নিদর্শন নিয়েই এসেছি, অতএব তোমরা আল্লাহ তা'য়ালাকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'য়ালা আমার এবং তোমাদেরও মালিক, অতএব তোমরা তাঁর দাসত্ব করো আর এটাই হলো একমাত্র সহজ সরল পথ। (সূরা ইমরাণ-৫০-৫১)

হযরত ঈসা (আ:) তাঁর জাতিকে কোন্ কথার দিকে আহ্বান জানিয়েছেন মহান আল্লাহ নবী করীম (সা) কে ওহীর মাধ্যমে শুনিয়ে দিয়েছেন। তিনিও মানুষকে একমাত্র মহান আল্লাহ তা'য়ালাকেই রব হিসেবে গ্রহণ করতে বলেছেন। মহান আল্লাহর উলুহিয়াত এবং রবুবিয়াতই হলো প্রধান বিষয়। মানুষ মুখে আল্লাহকে স্বীকৃতি দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত, নামাজ-রোজা ও হজ্জ আদায় করছে, কিন্তু সে ব্যক্তি মানুষের বানানো আদর্শ অনুসারে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করার জন্য চেষ্টা করছে। সে এমন রাজনীতি করছে, যে রাজনীতি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। এর পরিষ্কার অর্থ হলো তারা আল্লাহকে স্রষ্টা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজী, আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন এই কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হিসেবে সে নামাজ-রোজা ও হজ্জ আদায় করছে। কিন্তু সে আল্লাহর রবুবিয়াত এবং উলুহিয়াত গ্রহণ করতে রাজী নয়। আল্লাহকে সে আইন ও বিধান দাতা হিসেবে গ্রহণ করতে রাজী নয়। Law Giver হিসেবে সে পৃথিবীর এক শ্রেণীর দার্শনিককে গ্রহণ করছে। এই ধরণের ব্যক্তিদের জন্য নিজেকে আল্লাহর গোলাম হিসেবে দাবী করার অবকাশ আল্লাহর বিধানে উপস্থিত নেই।

পবিত্র কোরআনের উল্লেখিত আয়াত থেকে আমাদের সামনে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, পৃথিবীর অন্যান্য নবী-রাসূলের মতই হযরত ঈসা (আ:) এর দাওয়াতের মূল বিষয় ছিল তিনটি। তিনিও এই তিনটি বিষয়ের দিকে তাঁর জাতিকে আহ্বান করেছেন। তাঁর আহ্বানের প্রথম কথা ছিল, সকল ক্ষমতার মালিক মহান আল্লাহ। অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব Sovereignty, Supreme Authority, Supreme Power যা একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট। এ কারণে দাসত্ব তাঁরই জন্য নিবেদিত। তাঁরই দাসত্ব করতে হবে। তাঁর আনুগত্যের ভিত্তিতে পৃথিবীতে মানব জীবনের সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হবে। মানুষের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, সভ্যতা সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপিত হবে এই কথাটির ওপরে।

তাঁর আহ্বানের দ্বিতীয় কথা ছিল, সার্বভৌম Sovereignty ক্ষমতাসম্পন্ন অধিপতির Viceroy প্রতিনিধি হিসেবে আমার আদেশ মেনে চলতে হবে, আমার আনুগত্য করতে হবে। আমাকেই একমাত্র নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

হযরত ঈসা (আ:) এর আহ্বানের তৃতীয় কথা ছিল, পৃথিবীতে মানব জীবনের বৈধ ও অবৈধের সীমারেখা মহান আল্লাহর আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট হবে। অর্থাৎ কোনটি হালাল ও হারাম তা আল্লাহর বিধান জানিয়ে দিবে। আল্লাহ তা'য়ালার আইনের মোকাবেলায় পৃথিবীর অন্যান্য সকল আইন বাতিল বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ Law Giver হলেন একমাত্র মহান আল্লাহ। কোন্ কাজ মানুষের করণীয় এবং বর্জনীয় এ নির্দেশ দেয়ার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর।

এক শ্রেণীর তথাকথিত চিন্তাবিদ মনে করেন, প্রত্যেক নবী-রাসূলের আগমনের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন ভিন্ন। তাঁরা সবাই একই উদ্দেশ্যে আগমন করেননি। যারা এ কথা বলেন, হয় তাদের কুরআন বুঝার ক্ষমতা নেই অথবা তারা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এ কথা বলে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে সকল নবীর আহ্বান ছিল এক ও অভিন্ন। গোটা সৃষ্টি জগতের সকল ক্ষমতার অধিকারী যিনি সেই Supreme authority-এর কাছ থেকে নিয়োগ পত্র নিয়ে যিনিই তাঁর প্রজাদের কাছে আগমন করবেন, তাঁর আগমনের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে যে, তিনি প্রজাদেরকে বিদ্রোহ করা এবং স্বায়ত্ব শাসন পরিচালনা হতেও বিরত রাখবেন।

আল্লাহর আইনের মোকাবেলায় অন্যদের আইন বাতিল বলে ঘোষণা দিয়ে এ আইন গ্রহণ করলে কি পুরস্কার লাভ করা যাবে এ সম্পর্কে তিনি সুসংবাদ দিবেন। আর যারা আল্লাহর আইন গ্রহণ করবে না, তাদেরকে তিনি ভয়ংকর শাস্তির কথা শোনাবেন। মহান আল্লাহ বলেন-

رُّسُلاً مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِيْنَ لِئَلَّا يَكُوْنَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ طَ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا -

রাসূলরা (ছিলো জান্নাতের) সুসংবাদবাহী ও (জাহান্নামের) ভয় প্রদর্শনকারী, (তাদের এ জন্যেই পাঠানো হয়েছিলো) যাতে করে রাসূলদের আগমনের পর আল্লাহ তা'য়ালার ওপর মানব জাতির কোনো অজুহাত খাড়া করার সুযোগ না থাকে; (সত্যিই) আল্লাহ তা'য়ালা মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। (সূরা নিসা-১৬৫)

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি কি উদ্দেশ্যে তাঁর নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। মানুষের সামনে যেন তাঁরা আল্লাহ তা'য়ালার বিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন। আল্লাহর দাসত্ব কেনো করতে হবে তা তাঁরা যুক্তি প্রমাণ দিয়ে মানুষকে বুঝিয়ে দিবেন। কেননা, আল্লাহ তা'য়ালার আদালতে এ সকল মানুষ যখন উপস্থিত হবে তখন তাঁরা যেন এ কথা বলতে না পারে, আমাদের কাছে এমন কোনো ব্যক্তি আসেনি বা আমাদের কাছে এমন কোনো মাধ্যম ছিল না যার মাধ্যমে আমরা আপনার বিধান সম্পর্কে জানতে পারতাম। আমরা আপনার বিধান সম্পর্কে জানতে পারলে অবশ্যই আপনার আইন অনুসরণ করতাম।

এসব অজুহাত যেন মানুষ আল্লাহ তা'য়ালার সামনে তুলতে না পারে, এ কারণেই মহান আল্লাহ প্রতিটি জনপদে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। নবী-রাসূলগণ মহাসত্যের আহ্বায়ক, সেই সাথে তাঁরা মানুষের আনুগত্য লাভের অধিকারী। তাদের আনুগত্য করা অবশ্য কর্তব্য। মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَّسُوْلٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ ط

আমি যখনই কোনো (জনপদে) কোনো রাসূল পাঠিয়েছি, তাঁকে এ জন্যেই পাঠিয়েছি যে, আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী (সেখানে) তাঁর (শর্তহীন) আনুগত্য করা হবে। (সূরা নিসা-৬৪)

নবী-রাসূল পৃথিবীতে আগমন করবেন এবং মানুষ তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে-এতেই মানুষের দায়িত্ব শেষ হয় না। নবীকে বিশ্বাস করবে সেই সাথে মানুষ অন্য কারো আইন মেনে চলবে বা নিজের ইচ্ছামত জীবন যাপন করবে, এটা সম্ভব নয়। এ উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ নবী-রাসূল প্রেরণ করেননি। বরং নবী-রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্যই হলো জীবন যাপনের জন্য যে বিধান তিনি নিয়ে আসেন, পৃথিবীর সকল বিধান বর্জন করে কেবলমাত্র সেই বিধান অনুসারেই জীবন যাপন করতে হবে। আর এটাই হলো নবী-রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের প্রকৃত অর্থ।

নবী-রাসূল ও তাঁর অনুসারীদের আরো একটি দায়িত্ব হলো, তাঁরা আল্লাহর দেয়া জীবন বিধান পৃথিবীর সকল বিধানের ওপরে বিজয়ী করবেন। অর্থাৎ পৃথিবীর সকল আদর্শ, মতবাদ, মতাদর্শ, আইন-কানুনের মোকাবেলায় ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করবেন। আল্লাহর দেয়া আদর্শ রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রয়োগ করে দেশ বা পৃথিবী শাসন করবে। মহান আল্লাহ বলেন-

هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُوْلَهُ بِالْهُدى وَدِيْنِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُوْنَ

তিনিই (মহান আল্লাহ), যিনি তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট হিদায়াত ও সঠিক জীবন বিধান সহকারে তাঁর রাসূলকে পাঠিয়েছেন, যেন সে এই জীবন ব্যবস্থাকে (দুনিয়ার) সব কয়টি বিধানের ওপর বিজয়ী করে দিতে পারে, মুশরিকরা এ বিজয়কে যতো দুঃসহই মনে করুক না কেনো। (সূরা আত্ তাওবা-৩৩)

আরবী দ্বীন শব্দ সম্পর্কে সীরাতে সরওয়ারে আলমে বর্ণনা করা হয়েছে, 'দ্বীন শব্দটিকে আরবী ভাষায় এমন জীবন ব্যবস্থা বা জীবন পদ্ধতির প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে যার প্রতিষ্ঠাকারীকে সনদ ও অনুসরণযোগ্য বলে মেনে নিয়ে তার আনুগত্য করতে হয়'।

পৃথিবীর সকল বিধান থাকবে আল্লাহর বিধানের অধীনে। আল্লাহর আইন প্রচলিত কোনো বিধানের অধীনে থাকবে এ উদ্দেশ্যে আল্লাহর বিধান পৃথিবীতে আগমন করেনি। অন্য কোন বিধানের অধীনে আল্লাহর আইন সামান্য সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে অবস্থান করবে, এ উদ্দেশ্যেও আল্লাহর বিধান আগমন করেনি। পৃথিবীর সকল ধরনের মতবাদ মতাদর্শ আল্লাহ তা'য়ালার আইনের অনুগ্রহ কুড়িয়ে টিকে থাকার হলে টিকে থাকবে আর না হয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কেননা আল্লাহ তা'য়ালার আইন যিনি নিয়ে আসেন, তিনি পৃথিবী ও আকাশের বাদশাহ তথা অদ্বিতীয় ক্ষমতাশালীর প্রতিনিধি হিসেবে আগমন করেন। নবী-রাসূল নিজের বাদশাহ মহান আল্লাহর বিধানকে বিজয়ী হিসেবে দেখতে চান। আল্লাহর বিধানের মোকাবেলায় পৃথিবীতে অন্য কোনো বিধান মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, এমন ধরনের কোনো বিধানের অস্তিত্ব পৃথিবীতে থাকবে না। নবী-রাসূলের আহ্বানের এটাই হলো মূল কথা।

মহান আল্লাহ মানব জাতিকে সংশোধন করার জন্য যে সংখ্যক নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই মানুষকে একই দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। প্রত্যেক নবীই বলেছেন, 'হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর দাসত্ব করো। তিনি ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো ইলাহ নেই'। আমরা দেখি বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদগণ মানুষকে নিজ দলে আকৃষ্ট করার জন্য মুখরোচক কথাবার্তা বলে জনগণকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। অথবা সাময়িক কোনো সমস্যার দিকে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে。

কিন্তু নবী-রাসূলের কর্মপদ্ধতি এমন ছিলো না, তাঁরা দেশের কোনো সমস্যাকে প্রাধান্য দিয়ে আন্দোলন করেননি। অর্থনৈতিক মুক্তির শ্লোগান দিয়ে মানুষের সামনে অবতীর্ণ হননি। কৃত্রিম কোনো বিষয় তাঁর জাতির সম্মুখে বড় করে দেখাননি। তাঁরা প্রথমেই বলেছেন, 'হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দাসত্ব করো। তিনি ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো ইলাহ নেই'। এ কথা শোনার সাথে সাথে নবীর পরিবার, সমাজ, দেশবাসী কেনো তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তা চিন্তা করে দেখার বিষয়। 'ইলাহ্' শব্দ দিয়ে তাঁরা কি বুঝিয়েছেন যে, নবীদেরকে নির্যাতিত হতে হয়েছে। প্রত্যেক নবীর প্রতিই নির্যাতন করা হয়েছে শুধুমাত্র এই 'ইলাহ্' বলার কারণে। আমাদেরকে বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে 'ইলাহ্' শব্দ দ্বারা আসলে কি বুঝায়।

যে শক্তি এই পৃথিবী এবং পৃথিবীর বাইরের, ভেতরের সকল প্রাণী ও অন্যান্য বস্তুর যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করেন, আরবী ভাষায় সেই শক্তিকে 'ইলাহ' বলে। মানুষের সকল প্রয়োজন যিনি পূরণ করেন, সমাজ, পরিবার, দেশ পরিচালনার জন্য যিনি আইন দান করেন এবং যার আইনই একমাত্র চলতে পারে তিনিই হলেন 'ইলাহ্'। যে কোনো প্রয়োজনে মানুষ যাঁর মুখাপেক্ষী হয়, যিনি মানুষকে সাহায্য করবেন এবং মানুষ যাঁর কাছে সাহায্য চাইবে তিনিই 'ইলাহ্'। সুতরাং সমাজের কায়েমী স্বার্থবাদী শক্তি, শোষক-শাসক যখন বুঝেছে, নবীর এ কথা গ্রহণ করলে নিজের কর্তৃত্ব বলতে আর কিছুই থাকবে না, সকল কর্তৃত্ব আল্লাহ তা'য়ালার জন্য ত্যাগ করতে হবে, তখনই তারা নবীর সাথে তথা ইসলামী আন্দোলনের প্রতি শত্রুতা করেছে এবং বর্তমানেও করছে- আগামীতেও করবে।

ইতিহাস কথা বলে, প্রত্যেক নবীর সাথেই তৎকালিন সমাজের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব ও দেশের শাসক শ্রেণীর সাথে 'ইলাহ' সম্পর্কে বিতর্ক হয়েছে। পবিত্র কুরআন বিবৃত এ সকল কাহিনী অন্য কোনো পৃথিবীর নয় বরং যে পৃথিবীতে মানুষ বাস করছে, মানুষের সাথে যে পৃথিবী সম্পর্কিত সেই পৃথিবীরই ঘটনা এবং এ সকল ঘটনা মানুষের সাথে সম্পর্কিত। নবী-রাসূল যে দেশে এবং জাতির মধ্যে আগমন করেছেন তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক তথা নানা ধরণের সমস্যা ছিল। এসব উপস্থিত সমস্যা সমাধানেরও প্রয়োজন ছিল। কিন্তু নবী-রাসূলগণ এ ধরনের সাময়িক ও স্থানীয় সমস্যাকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র একটি সমস্যা সামনে রেখেছেন এবং সে সমস্যা 'ইলাহ্' কেন্দ্রিক।

তাঁরা অন্য কোন সমস্যা জাতির সামনে তুলে না ধরে প্রধান সমস্যা অর্থাৎ কৃত্রিম 'ইলাহ্'-সমূহের দাসত্ব ত্যাগ করে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে 'ইলাহ' হিসাবে স্বীকৃতি দিতে বলেছেন। নবী করীম (সা:) প্রথমে এভাবে আহ্বান জানিয়েছিলেন, 'হে মানুষ! বলো আল্লাহ ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো ইলাহ্ নেই। তাহলে তোমরা কল্যাণ লাভ করবে'।

সুতরাং এ থেকে স্পষ্ট অনুধাবন করা যায় পৃথিবীতে সমস্যার সৃষ্টি তখনই হয়, যখন মানুষ একমাত্র আল্লাহকে রব ও ইলাহ্ হিসেবে মানে না। এর পরিবর্তে নিজেকে, সমাজপতি, প্রচলিত প্রথা, নিজ পরিবার, সমাজের আইন, দেশের শাসক, দেশের নানা ধরণের নীতি, দৃষ্টির সামনের সাময়িক স্বার্থ, ধর্মনেতা তথা প্রকৃত রব ব্যতীত অন্য কোনো কিছুকে নিজের মাবুদ বা ইলাহ তথা রব হিসেবে প্রাধান্য দিয়েছে, তখনই দেশে, সমাজে, ব্যক্তি জীবনে, রাষ্ট্র জীবনে নানা ধরণের সমস্যার আবির্ভাব ঘটেছে। এ কারণে নবী-রাসূল ও তাদের অনুসারী ইসলামী নেতৃত্ব দেশের, সমাজের সকল সমস্যা উপেক্ষা করে প্রধান সমস্যার দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

নবী-রাসূলগণ জানতেন সকল সমস্যার স্রষ্টা হলো মাত্র একটি। সুতরাং এই সমস্যার সমাধান হলে অন্য সমস্যাসমূহ এমনিতেই বিলীন হবে। এই সমস্যার সমাধানের ওপর জীবনের অন্যান্য যাবতীয় সমস্যার সমাধান নির্ভরশীল। এ কারণে তাঁরা তাদের সমগ্র জীবন এই সমস্যা সমাধানের জন্যই ব্যয় করেছেন। হযরত ঈসা (আ:) যখন বনী ইসরাঈলদের কাছে আগমন করেছিলেন তখন তিনি তাদেরকে বলেছিলেন-

وَلأُحِلَّ لَكُم بَعْضَ الَّذِى حُرِّمَ عَلَيْكُمْ وَجِئْتُكُم بِآيَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ قَفَ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوْنِ إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ طَ هَذَا صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٌ

তোমাদের ওপর হারাম করে রাখা হয়েছে এমন কতিপয় জিনিসও আমি তোমাদের জন্যে হালাল করে দেবো এবং তোমাদের মালিকের পক্ষ থেকে (এই) নিদর্শন নিয়েই এসেছি, অতএব তোমরা আল্লাহ তা'য়ালাকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'য়ালা আমার এবং তোমাদেরও মালিক, অতএব তোমরা তাঁর দাসত্ব করো আর এটাই হলো একমাত্র সহজ সরল পথ। (সূরা ইমরাণ-৫০-৫১)

হযরত ঈসা (আ:) তাঁর জাতিকে কোন্ কথার দিকে আহ্বান জানিয়েছেন মহান আল্লাহ নবী করীম (সা) কে ওহীর মাধ্যমে শুনিয়ে দিয়েছেন। তিনিও মানুষকে একমাত্র মহান আল্লাহ তা'য়ালাকেই রব হিসেবে গ্রহণ করতে বলেছেন। মহান আল্লাহর উলুহিয়াত এবং রবুবিয়াতই হলো প্রধান বিষয়। মানুষ মুখে আল্লাহকে স্বীকৃতি দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত, নামাজ-রোজা ও হজ্জ আদায় করছে, কিন্তু সে ব্যক্তি মানুষের বানানো আদর্শ অনুসারে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করার জন্য চেষ্টা করছে। সে এমন রাজনীতি করছে, যে রাজনীতি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। এর পরিষ্কার অর্থ হলো তারা আল্লাহকে স্রষ্টা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজী, আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন এই কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হিসেবে সে নামাজ-রোজা ও হজ্জ আদায় করছে। কিন্তু সে আল্লাহর রবুবিয়াত এবং উলুহিয়াত গ্রহণ করতে রাজী নয়। আল্লাহকে সে আইন ও বিধান দাতা হিসেবে গ্রহণ করতে রাজী নয়। Law Giver হিসেবে সে পৃথিবীর এক শ্রেণীর দার্শনিককে গ্রহণ করছে। এই ধরণের ব্যক্তিদের জন্য নিজেকে আল্লাহর গোলাম হিসেবে দাবী করার অবকাশ আল্লাহর বিধানে উপস্থিত নেই।

পবিত্র কোরআনের উল্লেখিত আয়াত থেকে আমাদের সামনে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, পৃথিবীর অন্যান্য নবী-রাসূলের মতই হযরত ঈসা (আ:) এর দাওয়াতের মূল বিষয় ছিল তিনটি। তিনিও এই তিনটি বিষয়ের দিকে তাঁর জাতিকে আহ্বান করেছেন। তাঁর আহ্বানের প্রথম কথা ছিল, সকল ক্ষমতার মালিক মহান আল্লাহ। অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব Sovereignty, Supreme Authority, Supreme Power যা একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট। এ কারণে দাসত্ব তাঁরই জন্য নিবেদিত। তাঁরই দাসত্ব করতে হবে। তাঁর আনুগত্যের ভিত্তিতে পৃথিবীতে মানব জীবনের সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হবে। মানুষের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, সভ্যতা সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপিত হবে এই কথাটির ওপরে।

তাঁর আহ্বানের দ্বিতীয় কথা ছিল, সার্বভৌম Sovereignty ক্ষমতাসম্পন্ন অধিপতির Viceroy প্রতিনিধি হিসেবে আমার আদেশ মেনে চলতে হবে, আমার আনুগত্য করতে হবে। আমাকেই একমাত্র নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

হযরত ঈসা (আ:) এর আহ্বানের তৃতীয় কথা ছিল, পৃথিবীতে মানব জীবনের বৈধ ও অবৈধের সীমারেখা মহান আল্লাহর আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট হবে। অর্থাৎ কোনটি হালাল ও হারাম তা আল্লাহর বিধান জানিয়ে দিবে। আল্লাহ তা'য়ালার আইনের মোকাবেলায় পৃথিবীর অন্যান্য সকল আইন বাতিল বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ Law Giver হলেন একমাত্র মহান আল্লাহ। কোন্ কাজ মানুষের করণীয় এবং বর্জনীয় এ নির্দেশ দেয়ার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর।

এক শ্রেণীর তথাকথিত চিন্তাবিদ মনে করেন, প্রত্যেক নবী-রাসূলের আগমনের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন ভিন্ন। তাঁরা সবাই একই উদ্দেশ্যে আগমন করেননি। যারা এ কথা বলেন, হয় তাদের কুরআন বুঝার ক্ষমতা নেই অথবা তারা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এ কথা বলে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে সকল নবীর আহ্বান ছিল এক ও অভিন্ন। গোটা সৃষ্টি জগতের সকল ক্ষমতার অধিকারী যিনি সেই Supreme authority-এর কাছ থেকে নিয়োগ পত্র নিয়ে যিনিই তাঁর প্রজাদের কাছে আগমন করবেন, তাঁর আগমনের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে যে, তিনি প্রজাদেরকে বিদ্রোহ করা এবং স্বায়ত্ব শাসন পরিচালনা হতেও বিরত রাখবেন।

আল্লাহর আইনের মোকাবেলায় অন্যদের আইন বাতিল বলে ঘোষণা দিয়ে এ আইন গ্রহণ করলে কি পুরস্কার লাভ করা যাবে এ সম্পর্কে তিনি সুসংবাদ দিবেন। আর যারা আল্লাহর আইন গ্রহণ করবে না, তাদেরকে তিনি ভয়ংকর শাস্তির কথা শোনাবেন। মহান আল্লাহ বলেন-

رُّسُلاً مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِيْنَ لِئَلَّا يَكُوْنَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ طَ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا -

রাসূলরা (ছিলো জান্নাতের) সুসংবাদবাহী ও (জাহান্নামের) ভয় প্রদর্শনকারী, (তাদের এ জন্যেই পাঠানো হয়েছিলো) যাতে করে রাসূলদের আগমনের পর আল্লাহ তা'য়ালার ওপর মানব জাতির কোনো অজুহাত খাড়া করার সুযোগ না থাকে; (সত্যিই) আল্লাহ তা'য়ালা মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। (সূরা নিসা-১৬৫)

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি কি উদ্দেশ্যে তাঁর নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। মানুষের সামনে যেন তাঁরা আল্লাহ তা'য়ালার বিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন। আল্লাহর দাসত্ব কেনো করতে তা তাঁরা যুক্তি প্রমাণ দিয়ে মানুষকে বুঝিয়ে দিবেন। কেননা, আল্লাহ তা'য়ালার আদালতে এ সকল মানুষ যখন উপস্থিত হবে তখন তাঁরা যেন এ কথা বলতে না পারে, আমাদের কাছে এমন কোনো ব্যক্তি আসেনি বা আমাদের কাছে এমন কোনো মাধ্যম ছিল না যার মাধ্যমে আমরা আপনার বিধান সম্পর্কে জানতে পারতাম। আমরা আপনার বিধান সম্পর্কে জানতে পারলে অবশ্যই আপনার আইন অনুসরণ করতাম।

এসব অজুহাত যেন মানুষ আল্লাহ তা'য়ালার সামনে তুলতে না পারে, এ কারণেই মহান আল্লাহ প্রতিটি জনপদে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। নবী-রাসূলগণ মহাসত্যের আহ্বায়ক, সেই সাথে তাঁরা মানুষের আনুগত্য লাভের অধিকারী। তাদের আনুগত্য করা অবশ্য কর্তব্য। মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَّسُوْلٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ ط

আমি যখনই কোনো (জনপদে) কোনো রাসূল পাঠিয়েছি, তাঁকে এ জন্যেই পাঠিয়েছি যে, আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী (সেখানে) তাঁর (শর্তহীন) আনুগত্য করা হবে। (সূরা নিসা-৬৪)

নবী-রাসূল পৃথিবীতে আগমন করবেন এবং মানুষ তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে-এতেই মানুষের দায়িত্ব শেষ হয় না। নবীকে বিশ্বাস করবে সেই সাথে মানুষ অন্য কারো আইন মেনে চলবে বা নিজের ইচ্ছামত জীবন যাপন করবে, এটা সম্ভব নয়। এ উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ নবী-রাসূল প্রেরণ করেননি। বরং নবী-রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্যই হলো জীবন যাপনের জন্য যে বিধান তিনি নিয়ে আসেন, পৃথিবীর সকল বিধান বর্জন করে কেবলমাত্র সেই বিধান অনুসারেই জীবন যাপন করতে হবে। আর এটাই হলো নবী-রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের প্রকৃত অর্থ।

নবী-রাসূল ও তাঁর অনুসারীদের আরো একটি দায়িত্ব হলো, তাঁরা আল্লাহর দেয়া জীবন বিধান পৃথিবীর সকল বিধানের ওপরে বিজয়ী করবেন। অর্থাৎ পৃথিবীর সকল আদর্শ, মতবাদ, মতাদর্শ, আইন-কানুনের মোকাবেলায় ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করবেন। আল্লাহর দেয়া আদর্শ রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রয়োগ করে দেশ বা পৃথিবী শাসন করবে। মহান আল্লাহ বলেন-

هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُوْلَهُ بِالْهُدى وَدِيْنِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُوْنَ

তিনিই (মহান আল্লাহ), যিনি তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট হিদায়াত ও সঠিক জীবন বিধান সহকারে তাঁর রাসূলকে পাঠিয়েছেন, যেন সে এই জীবন ব্যবস্থাকে (দুনিয়ার) সব কয়টি বিধানের ওপর বিজয়ী করে দিতে পারে, মুশরিকরা এ বিজয়কে যতো দুঃসহই মনে করুক না কেনো। (সূরা আত্ তাওবা-৩৩)

আরবী দ্বীন শব্দ সম্পর্কে সীরাতে সরওয়ারে আলমে বর্ণনা করা হয়েছে, 'দ্বীন শব্দটিকে আরবী ভাষায় এমন জীবন ব্যবস্থা বা জীবন পদ্ধতির প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে যার প্রতিষ্ঠাকারীকে সনদ ও অনুসরণযোগ্য বলে মেনে নিয়ে তার আনুগত্য করতে হয়'।

পৃথিবীর সকল বিধান থাকবে আল্লাহর বিধানের অধীনে। আল্লাহর আইন প্রচলিত কোনো বিধানের অধীনে থাকবে এ উদ্দেশ্যে আল্লাহর বিধান পৃথিবীতে আগমন করেনি। অন্য কোন বিধানের অধীনে আল্লাহর আইন সামান্য সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে অবস্থান করবে, এ উদ্দেশ্যেও আল্লাহর বিধান আগমন করেনি। পৃথিবীর সকল ধরনের মতবাদ মতাদর্শ আল্লাহ তা'য়ালার আইনের অনুগ্রহ কুড়িয়ে টিকে থাকার হলে টিকে থাকবে আর না হয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কেননা আল্লাহ তা'য়ালার আইন যিনি নিয়ে আসেন, তিনি পৃথিবী ও আকাশের বাদশাহ তথা অদ্বিতীয় ক্ষমতাশালীর প্রতিনিধি হিসেবে আগমন করেন। নবী-রাসূল নিজের বাদশাহ মহান আল্লাহর বিধানকে বিজয়ী হিসেবে দেখতে চান। আল্লাহর বিধানের মোকাবেলায় পৃথিবীতে অন্য কোনো বিধান মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, এমন ধরনের কোনো বিধানের অস্তিত্ব পৃথিবীতে থাকবে না। নবী-রাসূলের আহ্বানের এটাই হলো মূল কথা।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবী-রাসূলের আগমনের উদ্দেশ্য বৈপ্লবিক পরিবর্তন

📄 নবী-রাসূলের আগমনের উদ্দেশ্য বৈপ্লবিক পরিবর্তন


পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী, মানুষ যখনই মহান আল্লাহর বিধানের মুকাবিলায় ভিন্ন বিধানকে প্রাধান্য দিয়েছে, তখনই নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। স্রষ্টার হিদায়াত ও পথনির্দেশ অমান্য করে ভিন্ন বিধানের ভিত্তিতে নিজেদের সার্বিক জীবন ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত করেছে তখনই প্রকৃত বিপর্যয় এবং অশান্তি অনাচার দেখা দিয়েছে। অত্যাচার, শোষণ, জুলুম, প্রতারণা ও বঞ্চনার কারণে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষের আর্তনাদ মহান আল্লাহর রহমতের দরিয়ায় তরঙ্গ সৃষ্টি করেছে। আল্লাহ তা'য়ালা মানুষকে এ অবস্থা থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে নবী-রাসূল প্রেরণ করার ফলে তাঁরা সার্বিক ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করেছেন। পূর্ব প্রতিষ্ঠিত জুলুমমূলক ব্যবস্থা উৎখাত করে মহান আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করে সার্বিক বিপর্যয় রোধ করেছেন।

নবী-রাসূল পৃথিবীর কোনো নেতার নেতৃত্ব গ্রহণ করার জন্য বা কোনো শাসকের অধীনে অবস্থান করার জন্য আগমন করেন না এবং এ অবস্থা তাঁর নবুয়‍্যাত ও রিসালাতের মর্যাদার পরিপন্থী। তাঁরা আগমন করেন মানুষের শাসক হিসেবে। সকল শ্রেণীর মানুষ নবীর আনুগত্য করে তাঁর নির্দেশ অনুসারে সমাজ ও দেশ পরিচালনা করবে, এই উদ্দেশ্যেই তাঁরা আগমন করেন। পৃথিবীর মানুষ বিশৃংখলা ও বিপর্যয় সৃষ্টি করবে, ফলশ্রুতিতে দেখা দিবে ভাঙ্গন ও ধ্বংস। এ অবস্থায় মানুষ যেনো এ অজুহাত দেখাতে না পারে যে, এ সকল কর্মকাণ্ড করলে যে শাস্তি নেমে আসবে এ কথা আমরা জানতাম না। যদি জানতাম তাহলে এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতাম। মহান আল্লাহ বলেন-

وَلَوْلَا أَنْ تُصِيبَهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ فَيَقُولُوا رَبَّنَا لَوْلَا أَرْسَلْتَ إِلَيْنَا رَسُوْلاً فَتَتَّبِعَ آيَاتِكَ وَتَكُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ

এমন যেনো না হয়, ওদের কৃতকর্মের জন্যে ওদের ওপর কোনো বিপর্যয় এসে পড়বে এবং (তখন) তারা বলবে, হে আমাদের মালিক, তুমি আমাদের কাছে কোনো রাসূল পাঠালে না কেনো? তাহলে আমরা তোমার আয়াতসমূহের অনুবর্তন করতাম এবং আমরা (সবাই) ঈমানদারও হয়ে যেতাম! (সূরা কাসাস-৪৭)

কোনো জনপদের অধিবাসীর কাছে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর বিধান অবিকৃত ছিলো এবং তা মানুষের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যমও বর্তমান ছিলো ততক্ষণ সে জাতির জন্য নবীর প্রয়োজন হয়নি। উক্ত বিধান যখন বিকৃত হয়েছে তখনই হিদায়াতকারীর প্রয়োজন হয়েছে এবং মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে হিদায়াতকারী প্রেরণ করেছেন। তাঁরা মানুষকে সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য দেখিয়ে দিয়েছেন। বর্তমান পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে এবং সমগ্র বিশ্বে তা প্রচারিত হচ্ছে, এ অবস্থায় পৃথিবীর কোনো মানব সম্প্রদায়ের পক্ষে এ অজুহাত প্রদর্শন করা সম্ভব নয় যে, 'প্রকৃত সত্য আমাদের জানা ছিল না, মুক্তির সঠিক পথ কোনটি আমরা জানতাম না বলেই ভ্রান্ত পথে চলেছি, আল্লাহর দাসত্বের সঠিক মাধ্যম ও পদ্ধতি আমরা জানতাম না। এ কারণে আমরা আমাদেরই অনুরূপ আরেক মানুষের কাছ থেকে সকল সমস্যার সমাধান গ্রহণ করেছি'। বর্তমানে মানুষের পক্ষে এই অজুহাত পেশ করার সুযোগ নেই কিয়ামত পর্যন্তও থাকবে না। কারণ, কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর বিধান ইনশাআল্লাহ অবিকৃত থাকবে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সৃষ্টির শুরুতেই মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা দান করেছিলেন। মানুষ এর ভেতরে হীন স্বার্থের কারণে পরিবর্তন পরিবর্ধন করে নানা ধরনের মত-পথ আবিষ্কার করেছে। মহান আল্লাহ বলেন-

إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللهِ الإِسْلاَمُ قف وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ إِلَّا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيَامٍ بَيْنَهُمْ طَ وَمَنْ يَكْفُرْ بِآيَاتِ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ

নিঃসন্দেহে (মানুষের) জীবন বিধান হিসেবে আল্লাহ তা'য়ালার কাছে ইসলামই একমাত্র (গ্রহণযোগ্য) ব্যবস্থা। যাদের আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাব দেয়া হয়েছিলো, তারা (এ জীবন বিধান থেকে বিচ্যুত হয়ে) নিজেরা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ ও হিংসার বশবর্তী হয়ে (বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে) মতানৈক্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলো, (তাও আবার) তাদের কাছে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) সঠিক জ্ঞান আসার পর; যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান অস্বীকার করবে (তার জানা উচিত), অবশ্যই আল্লাহ তা'য়ালা দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। (সূরা আলে ইমরান-১৯)

সমগ্র পৃথিবীতে নবী-রাসূল যেখানে যে ভাষায় আগমন করেছেন এবং তাঁদের প্রতি যে ভাষায় কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছিল, তা ছিল ইসলাম। তাদের সকল শিক্ষাই ছিল নবী করীম (সা:) এর শিক্ষার অনুরূপ ইসলামী শিক্ষা। এই ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকে বিকৃত করে এর মধ্যে পরিবর্তন পরিবর্ধন করে মানব গোষ্ঠীর ভেতরে যে বিভিন্ন ধর্মমতের প্রসার ঘটানো হয়েছে, এর আসল কারণ এটাই ছিল যে, মানুষ তাদের বৈধ অধিকারের সীমারেখা লংঘন করে পার্থিব স্বার্থ সংক্রান্ত কিছু অবৈধ সুযোগ সুবিধা কামনা করছিল। এ কারণে তারা ইসলামী শিক্ষায় বিশ্বাস ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন সাধন করেছিল। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন-

وَتَقَطَّعُوا أَمْرَهُم بَيْنَهُمْ طَ كُلَّ إِلَيْنَا رَاجِعُونَ

(কিন্তু পরবর্তী সময়ে) তারা নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ করে নিজেদের (দ্বীনের) বিষয় টুকরো টুকরো করে ফেললো (অথচ এদের সবার জানা উচিত, এরা আজ যতো মতবিরোধই করুক না কেনো), সর্বশেষে সবাইকে (এক হয়ে) আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে। (সূরা আম্বিয়া-৯৩)

পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী, মানুষ যখনই মহান আল্লাহর বিধানের মুকাবিলায় ভিন্ন বিধানকে প্রাধান্য দিয়েছে, তখনই নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। স্রষ্টার হিদায়াত ও পথনির্দেশ অমান্য করে ভিন্ন বিধানের ভিত্তিতে নিজেদের সার্বিক জীবন ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত করেছে তখনই প্রকৃত বিপর্যয় এবং অশান্তি অনাচার দেখা দিয়েছে। অত্যাচার, শোষণ, জুলুম, প্রতারণা ও বঞ্চনার কারণে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষের আর্তনাদ মহান আল্লাহর রহমতের দরিয়ায় তরঙ্গ সৃষ্টি করেছে। আল্লাহ তা'য়ালা মানুষকে এ অবস্থা থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে নবী-রাসূল প্রেরণ করার ফলে তাঁরা সার্বিক ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করেছেন। পূর্ব প্রতিষ্ঠিত জুলুমমূলক ব্যবস্থা উৎখাত করে মহান আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করে সার্বিক বিপর্যয় রোধ করেছেন।

নবী-রাসূল পৃথিবীর কোনো নেতার নেতৃত্ব গ্রহণ করার জন্য বা কোনো শাসকের অধীনে অবস্থান করার জন্য আগমন করেন না এবং এ অবস্থা তাঁর নবুয়‍্যাত ও রিসালাতের মর্যাদার পরিপন্থী। তাঁরা আগমন করেন মানুষের শাসক হিসেবে। সকল শ্রেণীর মানুষ নবীর আনুগত্য করে তাঁর নির্দেশ অনুসারে সমাজ ও দেশ পরিচালনা করবে, এই উদ্দেশ্যেই তাঁরা আগমন করেন। পৃথিবীর মানুষ বিশৃংখলা ও বিপর্যয় সৃষ্টি করবে, ফলশ্রুতিতে দেখা দিবে ভাঙ্গন ও ধ্বংস। এ অবস্থায় মানুষ যেনো এ অজুহাত দেখাতে না পারে যে, এ সকল কর্মকাণ্ড করলে যে শাস্তি নেমে আসবে এ কথা আমরা জানতাম না। যদি জানতাম তাহলে এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতাম। মহান আল্লাহ বলেন-

وَلَوْلَا أَنْ تُصِيبَهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ فَيَقُولُوا رَبَّنَا لَوْلَا أَرْسَلْتَ إِلَيْنَا رَسُوْلاً فَتَتَّبِعَ آيَاتِكَ وَتَكُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ

এমন যেনো না হয়, ওদের কৃতকর্মের জন্যে ওদের ওপর কোনো বিপর্যয় এসে পড়বে এবং (তখন) তারা বলবে, হে আমাদের মালিক, তুমি আমাদের কাছে কোনো রাসূল পাঠালে না কেনো? তাহলে আমরা তোমার আয়াতসমূহের অনুবর্তন করতাম এবং আমরা (সবাই) ঈমানদারও হয়ে যেতাম! (সূরা কাসাস-৪৭)

কোনো জনপদের অধিবাসীর কাছে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর বিধান অবিকৃত ছিলো এবং তা মানুষের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যমও বর্তমান ছিলো ততক্ষণ সে জাতির জন্য নবীর প্রয়োজন হয়নি। উক্ত বিধান যখন বিকৃত হয়েছে তখনই হিদায়াতকারীর প্রয়োজন হয়েছে এবং মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে হিদায়াতকারী প্রেরণ করেছেন। তাঁরা মানুষকে সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য দেখিয়ে দিয়েছেন। বর্তমান পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে এবং সমগ্র বিশ্বে তা প্রচারিত হচ্ছে, এ অবস্থায় পৃথিবীর কোনো মানব সম্প্রদায়ের পক্ষে এ অজুহাত প্রদর্শন করা সম্ভব নয় যে, 'প্রকৃত সত্য আমাদের জানা ছিল না, মুক্তির সঠিক পথ কোনটি আমরা জানতাম না বলেই ভ্রান্ত পথে চলেছি, আল্লাহর দাসত্বের সঠিক মাধ্যম ও পদ্ধতি আমরা জানতাম না। এ কারণে আমরা আমাদেরই অনুরূপ আরেক মানুষের কাছ থেকে সকল সমস্যার সমাধান গ্রহণ করেছি'। বর্তমানে মানুষের পক্ষে এই অজুহাত পেশ করার সুযোগ নেই কিয়ামত পর্যন্তও থাকবে না। কারণ, কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর বিধান ইনশাআল্লাহ অবিকৃত থাকবে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সৃষ্টির শুরুতেই মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা দান করেছিলেন। মানুষ এর ভেতরে হীন স্বার্থের কারণে পরিবর্তন পরিবর্ধন করে নানা ধরনের মত-পথ আবিষ্কার করেছে। মহান আল্লাহ বলেন-

إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللهِ الإِسْلاَمُ قف وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ إِلَّا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيَامٍ بَيْنَهُمْ طَ وَمَنْ يَكْفُرْ بِآيَاتِ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ

নিঃসন্দেহে (মানুষের) জীবন বিধান হিসেবে আল্লাহ তা'য়ালার কাছে ইসলামই একমাত্র (গ্রহণযোগ্য) ব্যবস্থা। যাদের আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাব দেয়া হয়েছিলো, তারা (এ জীবন বিধান থেকে বিচ্যুত হয়ে) নিজেরা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ ও হিংসার বশবর্তী হয়ে (বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে) মতানৈক্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলো, (তাও আবার) তাদের কাছে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) সঠিক জ্ঞান আসার পর; যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান অস্বীকার করবে (তার জানা উচিত), অবশ্যই আল্লাহ তা'য়ালা দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। (সূরা আলে ইমরান-১৯)

সমগ্র পৃথিবীতে নবী-রাসূল যেখানে যে ভাষায় আগমন করেছেন এবং তাঁদের প্রতি যে ভাষায় কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছিল, তা ছিল ইসলাম। তাদের সকল শিক্ষাই ছিল নবী করীম (সা:) এর শিক্ষার অনুরূপ ইসলামী শিক্ষা। এই ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকে বিকৃত করে এর মধ্যে পরিবর্তন পরিবর্ধন করে মানব গোষ্ঠীর ভেতরে যে বিভিন্ন ধর্মমতের প্রসার ঘটানো হয়েছে, এর আসল কারণ এটাই ছিল যে, মানুষ তাদের বৈধ অধিকারের সীমারেখা লংঘন করে পার্থিব স্বার্থ সংক্রান্ত কিছু অবৈধ সুযোগ সুবিধা কামনা করছিল। এ কারণে তারা ইসলামী শিক্ষায় বিশ্বাস ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন সাধন করেছিল। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন-

وَتَقَطَّعُوا أَمْرَهُم بَيْنَهُمْ طَ كُلَّ إِلَيْنَا رَاجِعُونَ

(কিন্তু পরবর্তী সময়ে) তারা নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ করে নিজেদের (দ্বীনের) বিষয় টুকরো টুকরো করে ফেললো (অথচ এদের সবার জানা উচিত, এরা আজ যতো মতবিরোধই করুক না কেনো), সর্বশেষে সবাইকে (এক হয়ে) আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে। (সূরা আম্বিয়া-৯৩)

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবুয়্যাত লাভের পূর্বে নবী-রাসূলের মন-মানসিকতা

📄 নবুয়্যাত লাভের পূর্বে নবী-রাসূলের মন-মানসিকতা


কেউ কেউ অনুমান করেন নবী-রাসূলগণ নবুয়‍্যাত লাভ করার পূর্বেও তেমনি জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন, যেমন জ্ঞান তাদের ছিল নবুয়্যাত লাভ করার পরে। কিন্তু তাদের এই ধারণা ভুল। যে সকল নবী-রাসূল সম্পর্কে আমরা কুরআন থেকে জানতে পারি, তাদের জীবনীর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেও এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তাঁরা যে নবী হবেন এই কথাটিও তাঁদের জানা ছিলো না। নবী করীম (সা:) ও জানতেন না তিনি নবী হবেন। শিশুকাল থেকেই তিনি মূর্তির প্রতি চরম ঘৃণা পোষণ করতেন। তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যগণ তাঁকে কখনো মূর্তির সামনে নিতে পারেনি। কিশোর বয়স থেকেই তিনি পরম সত্তার সন্ধানে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন এবং অনুধাবন করেছেন, দৃষ্টির সম্মুখের মানুষগুলো যাদের সামনে মাথানত করে মনের আকাংখা পেশ করছে, বিপদে যাদের কাছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, তাদের কোনই ক্ষমতা নেই। বরং সে মূর্তিই আরেকজন মহাক্ষমতাশালীর অধীন।

মহান আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে নবী করীম (সা:) ছিলেন যাবতীয় পাপ ও পংকিলতার বহু উর্ধ্বে। পবিত্র কুরআন থেকে যেমন সূরা শুরার ৫২ নং আয়াত, সূরা কাসাসের 8৬ নং আয়াত ও সূরা দুহার ৭ নং আয়াতসহ অনেক আয়াত থেকেই আমরা জানতে পারি, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী অবতীর্ণের পূর্বে নবীগণ যে জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন সে জ্ঞান ছিলো সমাজের সর্বোৎকৃষ্ট গুণ-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী মানুষেরই অনুরূপ। সমাজের সাধারণ মানুষ এবং তাঁদের মধ্যে বিশাল পার্থক্য ছিল এবং নবী-রাসূল ছিলেন দেশ ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। আল্লাহ তা'য়ালা তাদের সম্পর্কে বলেছেন-

وَإِنَّهُمْ عِنْدَنَا لَمِنَ الْمُصْطَفَيْنَ الْأَخْيَارِ طَ

নিঃসন্দেহে তাঁরা (নবী-রাসূল) আমার কাছে বিশেষ বাছাই- পছন্দ করা সর্বোত্তম ব্যক্তিবর্গের মধ্যে গণ্য। (সূরা ছোয়াদ-৪৭)

নবুয়‍্যাত লাভের পূর্বে সাধারণের থেকে তাদের জীবনধারা ছিল সম্পূর্ণ পৃথক। দৈনন্দিন সাধারণ কাজ-কর্মে অন্য মানুষের সাথে সামঞ্জস্য থাকলেও তাদের কাজের ধরন এবং মন-মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা ছিল সমগ্র পৃথিবীর সকল মানুষের থেকে পৃথক। কিন্তু আল্লাহ সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান এবং ওহী সম্পর্কে জ্ঞান ছিল না বলেই ধারণা হয়। একদিকে এ কথার সাক্ষ্য পবিত্র কুরআন দেয় অপর দিকে সাক্ষ্য দেয় স্বয়ং নবীর অবস্থা। কেননা, ওহী সম্পর্কে যদি তাদের পূর্ণ জ্ঞান পূর্ব থেকেই থাকতো, তাহলে প্রথম ওহী অবতীর্ণের সময় তাঁরা অস্থির হয়ে পড়তেন না।

পক্ষান্তরে ওহী অবতীর্ণের পূর্বে তাদের মনে এবং চিন্তার জগতে যে সকল চিন্তার উদয় হতো, সে চিন্তার ভিত্তি মিথ্যার উপরে ছিলো না। প্রকৃত সত্যের দিকেই তাদের চিন্তা ধাবিত হতো। তাঁদের চোখ যা দেখতো, ঘুমের অবচেতন জগতে যে দৃশ্য এসে চোখের সামনে ধরা দিত তা ছিল বাস্তব। মহান আল্লাহ ওহীর জ্ঞান দিয়ে তাদের সামনে মহাসত্যের এক আশ্চর্য পৃথিবীর দ্বার উন্মোচন করে দিতেন। তাদের বিশ্বাস দৃঢ় প্রত্যয়ে পরিণত হতো।

অর্থাৎ নবীগণ ওহীজ্ঞানের পূর্বে পরিচালিত হতেন বুদ্ধিবৃত্তিক এবং প্রাকৃতিক হিদায়াতের দ্বারা। তাদের বুদ্ধির জগৎ মহান আল্লাহ এমনভাবে গঠন করেছিলেন যে, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য তাঁরা অনায়াসে বুঝে নিয়ে সেভাবে জীবন পরিচালিত করতেন। ইউরোপের মুসলিম বিদ্বেষী ঐতিহাসিকগণ ব্যতীত কেউ বলতে পারবে না যে, কোনো একজন নবীও তাদের জীবনকালে মুহূর্তের জন্য কোনো মূর্তির সামনে মাথানত করেছেন। কেনো করেননি? কারণ তাদের বুদ্ধিই বলে দিত পৃথিবীর অন্যান্য জড়পদার্থের মতই এসব মূর্তিও জড়পদার্থ। এসবের নিজস্ব কোনই ক্ষমতা নেই। সমগ্র পৃথিবীর দিকে তাদের দৃষ্টি সহজাত প্রবৃত্তির কারণেই নিপতিত হতো এবং তাদের মন বলে উঠতো, এসবের পেছনে একজন মহাক্ষমতাবানের ক্ষমতা কার্যকর রয়েছে। সৃষ্টির কোনো কিছুই বৃথা সৃষ্টি করা হয়নি। সাধারণ কোনো মানুষের মনে এ ধরনের চিন্তার উদয় না হলেও নবুয়‍্যাত পূর্ববর্তী জীবনে নবীদের মনে হতো। যারা উচ্চ পর্যায়ের সাধক ছিলেন বা সৃষ্টি জগৎ নিয়ে গবেষণা করতেন এবং সৃষ্টির সন্ধান করতে যেয়ে স্রষ্টার সন্ধান করতেন তাদের মনেও উল্লেখিত চিন্তার উদয় হতো।

এ কারণেই চিন্তাশীলগণ কুরআনের আলোকে বলেছেন, নবীদের নবুয়‍্যাত পূর্ববর্তী জীবনের চিন্তাধারা উচ্চ পর্যায়ের মানুষের চিন্তাধারার মতই ছিল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ আহ্বান করেছেন, তোমরা যে পৃথিবীতে বাস করছো, তোমরা যে দেহ নিয়ে চলাফেরা করো, দৈনন্দিন জীবনে তোমরা যে সামগ্রী ব্যবহার করো, স্ত্রীর গর্ভে যা নিক্ষিপ্ত হয় এসব নিয়ে তোমরা কেনো চিন্তা-গবেষণা করো না?

এ সব নিয়ে চিন্তা গবেষণা করলেই তোমরা অনুধাবন করতে পারবে, তোমাদের প্রকৃত স্রষ্টা কে। তোমরা অনুভব করতে পারবে, তোমাদেরকে বৃথা সৃষ্টি করা হয়নি। মহান আল্লাহ যাকে নবী হিসেবে তাঁর বান্দাদের সামনে প্রেরণ করবেন, তাদের মনে এ সকল চিন্তার উদয় হতো এবং তারা মহাসত্য অনুধাবন করতেন। প্রাকৃতিক নিদর্শনাবলী পর্যবেক্ষণ চিন্তা-গবেষণা এবং সহজাত জ্ঞানের প্রয়োগ করে নবীগণ চলতেন। বিভিন্ন নবীর নবুয়‍্যাত পূর্ববর্তী জীবনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই আমাদের সামনে সে সত্য প্রতিভাত হয়ে ওঠে। নবী করীম (সা:) এর নবুয়‍্যাত পূর্ববর্তী জীবনে দেখা যায়, সে সমাজে প্রচলিত কোনো একটি প্রথার সাথে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেননি বা ক্ষণিকের জন্যও তা গ্রহণ করেননি। তিনি আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মুহূর্তের জন্যও অংশীদারিত্ব মেনে নেননি। যে বিশ্বাসের বেষ্টনে তিনি পরিবেষ্টিত ছিলেন মাতৃগর্ভ থেকে এই বিশাল পৃথিবীতে এসে চৈতন্য উদয়ের পরে তিনি ঐ সকল বিশ্বাস নিজের অন্তরে এক মুহূর্তের জন্য স্থান দেননি।

যে পরিবারে এবং পরিবেশে তিনি শিশুকাল থেকে চল্লিশ বছর বয়সে পদার্পণ করলেন, অবাক করার বিষয় হলো সে পরিবার এবং পরিবেশের সামান্য ছোঁয়া তাঁকে স্পর্শ করতে পারলো না। এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী মানুষের জীবনে আর তাঁর জীবনে কোনই পার্থক্য ছিল না। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) যে আদর্শ মানব জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিলেন, সে আদর্শে যে বিকৃত করা হয়েছিল এবং ঘৃণিত নতুন প্রথার আমদানী করে তা অনুসরণ করা হতো, ক্ষণিকের জন্য তিনি তা মেনে নেননি। প্রতিমার উদ্দেশ্যে বলিদানকৃত পশুর গোস্ত তিনি ভক্ষণ করেননি। বন্যার পানির ন্যায় যে সমাজে মদ প্রবাহিত হতো, সে মদ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি।

নারী ভোগের প্রতিটি দ্বার যেখানে ছিল উন্মুক্ত, তিনি সে দ্বারের দিকে অবচেতন মনেও কখনো নিজের পদদ্বয় দূরে থাক- মুহূর্তের জন্য স্বীয় মনকে অগ্রসর করাননি।

তাঁর গোত্র কুরাইশ গোত্র সে সমাজে আভিজাত্যের অহঙ্কারে এক বৈষম্য সৃষ্টি করে রেখেছিল। তাঁরা দাবী করতো সকল মানুষের মধ্যে তাঁরা শ্রেষ্ঠ। সুতরাং হজ্জের সময়ে অন্যদের মতো তাদেরকে আরাফাতে যাওয়া আসা করতে হবে না। তাদের দাবী ছিল, কুরাইশরা শ্রেষ্ঠত্বের কারণে কা'বার বাইরে গিয়ে সাধারণ হাজ্জীদের মতো আরাফাতে অবস্থান করতে পারে না, এটা তাদের মর্যাদার পরিপন্থী। কিন্তু তাঁরা এটা জানতো যে, মক্কা থেকে হজ্জের সময় আরাফাতে গমন করা ইবাদাতের অংশ। কিন্তু তাঁরা সম্পূর্ণ সচেতনভাবে এই ইবাদাতকে সংকীর্ণ করেছিল।

মক্কার অধিবাসীদের মধ্যে যারা কুরাইশদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে বা বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল, তাঁরাও আত্মীয়তা বা বন্ধুত্বের সূত্রে মর্যাদার দাবী উত্থাপন করে কুরাইশদের অনুকরণে হজ্জের ইবাদাতে সংকীর্ণতা এনেছিল। তাঁরাও আরাফাতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। আরেকটি প্রথা তাঁরা প্রবর্তিত করেছিল, কা'বা এলাকার বাইরে থেকে যারা আসবে তাঁরা তাদের সাথে নিয়ে আসা খাদ্য গ্রহণ এবং পোষাক পরিধান করতে পারবে না। কা'বার সেবক কুরাইশরা যে খাদ্য সরবরাহ করবে তা গ্রহণ এবং যে পোষাক সরবরাহ করবে তা পরিধান করতে হবে। সরবরাহ করতে অক্ষম হলে উলঙ্গ হয়ে কা'বা তাওয়াফ করতে হবে। সে সমাজের মানুষ এ সকল বাতিল প্রথা সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করে অনুসরণ করতো।

কিন্তু মুহাম্মাদ (সা:) কুরাইশদের এ সব প্রথা কখনো গ্রহণ করেননি। নবুয়‍্যাত লাভের পূর্বে কুরাইশদের প্রবর্তিত প্রথা নিষ্ঠুর পায়ে দলিত মথিত করে তিনি আরাফাতে গমন করতেন। হযরত ইবরাহীম (আ:) যে পদ্ধতিতে হজ্জ আদায় করেছেন, তিনি সে পদ্ধতি তথা আল্লাহ তা'য়ালার শিখানো নিয়মে হজ্জ সমাপন করেছেন। অর্থাৎ তদানীন্তন পৃথিবীতে প্রচলিত যাবতীয় অনাচার থেকে তিনি ছিলেন মুক্ত।

নবী করীম (সা:) তাঁর দৃষ্টির সামনে বিরাজিত সমস্যা সমাধানের চিন্তায় নিজেকে লোকালয় থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিলেন। প্রায়ই তিনি নির্জনতা অবলম্বন করতেন। যে সকল সমস্যা নিয়ে তিনি চিন্তায় অস্থির থাকতেন, এসব সমস্যার সমাধান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে ওহীর মাধ্যমে দান করবেন। সুতরাং ওহী নাজিলের সময় যতো এগিয়ে আসতে থাকে মুহাম্মাদ (সা:) এর নির্জনতা অবলম্বন ততই বৃদ্ধি পেতে থাকলো। তিনি মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে একটি পাহাড়ে চলে যেতেন। সে পর্বতের হেরা নামক গুহায় বিশেষ ইবাদাতে নিমগ্ন হয়ে পড়তেন। এ সময়ে তিনি সত্য এবং সুন্দর স্বপ্ন দেখতেন। তিনি এমন স্বপ্ন দেখতেন তা যেন মনে হতো তিনি তা বাস্তবে দেখছেন।

পর্বতের গুহায় তিনি ইবাদাতের কোন্ পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তা হাদীসে হযরত আয়িশা (রা:) এর বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, হেরা গুহায় তিনি যে ইবাদাত করতেন তা ছিল চিন্তা-গবেষণা ও উপদেশ গ্রহণ করা। তিনি বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে যেতেন অথবা খাদিজা (রা:) স্বয়ং দিয়ে আসতেন বা লোক মারফত প্রেরণ করতেন। কখনো কয়েকদিনের খাবার তিনি একত্রে নিয়ে যেতেন।

হযরত আয়িশা (রা:) বলেছেন, মহান আল্লাহ যে সময় তাঁকে অনুগ্রহ করে মানব জাতির জন্য নবী নির্বাচিত করলেন তখন তিনি নবুয়‍্যাতের একটি অংশ হিসেবে নির্ভুল স্বপ্ন দেখতেন। এ সময় মহান আল্লাহ তাকে নির্জন বাসের প্রতি গভীর আগ্রহী করে তোলেন। তখন তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন তা দিনের আলোর মতই বাস্তবে পরিণত হতো। একাকী কোনো নির্জন স্থান সে সময় তাঁর কাছে অধিক প্রিয় ছিল। আরেকটি বর্ণনায় দেখা যায়, নবুয়‍্যাতের সূচনা লগ্নে তিনি বাইরে বের হলেই কোনো নির্জন উপত্যকায় বা নির্জন সমভূমিতে চলে যেতেন। সে সময় তিনি কোনো জড়পদার্থের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শুনতে পেতেন, 'আস্সালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ'!

সালামের আওয়াজ শোনার সাথে সাথে তিনি সচকিত হয়ে চারদিকে তাকিয়ে সালাম দাতার সন্ধান করতেন। কিন্তু তিনি তাঁর আশেপাশে গাছ পাথর ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেতেন না। এভাবেই সময় তখন অতিবাহিত হচ্ছিল। গবেষকদের ধারণা, ওহী এবং হযরত জিবরাঈল (আ:) কে যেন নবী করীম (সা:) ধারণ করতে পারেন এ কারণেই নবুয়‍্যাতের পূর্বে কিছুদিন মহান আল্লাহ এ অবস্থা সৃষ্টি করে তাঁর অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধি করছিলেন।

হাদীসে দেখা যায়, যে সময় তিনি নির্জনতা অবলম্বন করতেন তখন তিনি প্রচুর দান করতেন। অভাবীদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করতেন। বাড়িতে ফিরে আসার সময় কা'বাঘরে এসে তিনি সাত বার বা ততোধিক বার তওয়াফ করতেন তারপর বাড়িতে যেতেন। এ সময় তিনি যে সকল স্বপ্ন দেখতেন তা শুধু মাত্র সে সময়ের জন্যই সীমাবদ্ধ ছিল না। এ ধরনের স্বপ্ন নবুয়্যাত লাভের পরেও তিনি তাঁর জীবনে বহুবার দেখেছেন।

হাদীসে কুদসী নামে যে হাদীসসমূহ রয়েছে তা অনেকই এ পর্যায়ভুক্ত। এ ছাড়াও তাঁর মনে বিভিন্ন সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে নানা কথার উদয় করে দেয়া হতো। এরপর এক রমজান মাসে তিনি হেরা গুহায় চলে গেলেন। রমজানের সেই মহান রাত বিশ্বমানবতার সামনে এসে উপস্থিত হলো, যে রাতে নির্ভুল জীবন বিধান বিশ্বনবীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হতে থাকলো।

সে সময়ের অবস্থা সম্পর্কে নবী করীম (সা:) বলেছেন, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। এ সময় হযরত জিবরাঈল (আ:) এসে আমার সামনে উপস্থিত হলেন। তাঁর কাছে ছিল একখণ্ড রেশমী কাপড়। সে কাপড়ে কিছু লেখা ছিল। হযরত জিবরাঈল (আ:) আমাকে বললেন, 'পড়ুন'। আমি জবাব দিলাম আমি পড়তে পারি না। তখন তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করলেন। তাঁর সে আলিঙ্গন এমন ছিল যে, আমার মনে হলো আমার প্রাণ বায়ু নির্গত হবে।

তিনি আমাকে পুনরায় বললেন, 'পড়ুন'। আমি পূর্ববৎ বললাম, আমি পড়তে পারি না। তিনি সেই আগের মতই আমাকে এমন জোরে জড়িয়ে ধরলেন যে, এবারেও আমার ধারণা হলো আমার প্রাণ বের হয়ে যাবে। আবারও তিনি আমাকে পূর্বের অনুরূপ বললেন, 'পড়ুন'। এবার আমি বললাম, আমি কি পড়বো? তিনি বললেন, 'পড়ুন আপনার রব-এর নাম সহকারে। যিনি সৃষ্টি করেছেন। জমাট বাঁধা রক্তের এক পিণ্ড হতে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। পড়ুন, আর আপনার রব খুবই অনুগ্রহশীল। যিনি কলমের দ্বারা জ্ঞান শিখিয়েছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান দান করেছেন যা সে অবগত ছিলো না'। নবী করীম (সা:) বলেন, 'তিনি যা পড়লেন আমিও তাঁকে তা পরে পড়ে শোনালাম। তখন তিনি বিদায় নিলেন। তারপর আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমি জাগ্রত হলাম। তখন আমার উপলব্ধি হলো ক্ষণপূর্বে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনা এবং যা আমাকে পড়ানো হয়েছিল তা আমার স্মরণে জাগরুক হয়ে আছে'।

ঐতিহাসিক এবং গবেষকগণ বলেন, বিশ্বনবীর সাথে বাস্তবে হযরত জিবরাঈল (আ:) যে আচরণ করবেন সে আচরণ তাঁর ঘুমের ভেতরে করার অর্থ হলো তা ছিল ঘটিতব্য ঘটনার ভুমিকা। ইবনে হিশাম বর্ণনা করেছেন, এরপর নবী করীম (সা:) সে পাহাড়ের গুহা থেকে বের হয়ে এলেন। পাহাড়ের মাঝামাঝি অবস্থানে আসার পরে তিনি তাঁর মাথার ওপর থেকে এক অশ্রুত কন্ঠ শুনতে পেলেন। তাকে ডেকে বলা হচ্ছে, 'হে মুহাম্মাদ (সা:)! আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আমি জিবরাঈল'!

এ কণ্ঠ শ্রবণ করে তিনি ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন, হযরত জিবরাঈল (আ:) একজন অপূর্ব সৌম্যদর্শন আকৃতি ধারণ করে আছেন, কিন্তু তাঁর দু'টো পাখা রয়েছে এবং সে পাখা দুদিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন।

তিনি পুনরায় বললেন, 'হে মুহাম্মাদ (সাঃ)! আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আমি জিবরাঈল!'

নবী করীম (সা:) হযরত জিবরাঈল (আ:) এর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। এরপর তিনি আকাশের যেদিকেই দৃষ্টি দিলেন সেদিকেই তাঁকে দেখতে পেলেন। সমগ্র আকাশ জুড়েই জিবরাঈল (আ:) কে নবী করীম (সা:) বিরাজ করতে দেখলেন। তিনি অবিচল থেকে সেই দৃশ্য দীর্ঘক্ষণ ধরে দেখলেন। তিনি তাঁর কদম মোবারক কোনো দিকেই সরাতে পারছিলেন না। তিনি দেখছিলেন তাঁর সন্ধানে তাঁর সহধর্মিনী লোক প্রেরণ করেছে, সে লোক তাঁর সন্ধান করছে কিন্তু তিনি সে লোককে বলতে পারলেন না তাঁর নিজের অবস্থানের কথা। লোকটি ফিরে চলে গেল। এরপর আকাশে আর কোনো দৃশ্য দেখলেন না। তারপর তিনি ভীত কম্পিত অবস্থায় বাড়িতে ফিরে গেলেন এবং হযরত খাদিজাকে বললেন, 'আমাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দাও! আমাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দাও'!

হযরত খাদিজা (রা:) তাঁকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দিলেন। নবী করীম (সা:) এর ভীত কম্পিত অবস্থার অবসান হলে তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, 'হে খাদিজা! আমার এ কি হলো'! তারপর তিনি সকল ঘটনা তাঁর স্ত্রীকে শুনিয়ে বললেন, 'আমার নিজের জীবনের ভয় হচ্ছে'।

হযরত খাদিজা (রা:) তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন, 'অসম্ভব! মহান আল্লাহ তা'য়ালা আপনাকে কিছুতেই অসম্মানিত করবেন না এবং আপনার যশ ও খ্যাতির যথোচিত প্রসার না ঘটিয়ে আপনাকে তুলেও নিবে না। কারণ, আপনি আত্মীয়তার হক আদায়কারী, সর্বদা সত্যবাদী, পূর্ণমাত্রায় বিশ্বাসী আমানতদার, অনাথ অক্ষম ইয়াতিম বিধবা প্রতিবন্ধীদের ভার বহনকারী, অভাবগ্রস্ত বেকারদের জন্য উপার্জনের ব্যবস্থা গ্রহণে সদাসচেষ্ট, অতিথিদের প্রতি যত্নবান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসহায় দুঃস্থ মানুষের নিকটতম বন্ধু ও সাহায্যকারী'।

মানবতার চরোমৎকর্ষের যে মূল সাতটি গুণ মহান আল্লাহ নবী করীম (সা:) এর মধ্যে দান করেছেন তা হযরত খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা:) অল্প কথায় প্রকাশ করলেন। এরপরে হযরত খাদিজা (রা:) নবী করীম (সা:) কে সাথে করে ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে গেলেন। এ লোকটি ছিলেন বয়সে বৃদ্ধ ও অন্ধ। তিনি ছিলেন খাদিজা (রা:) এর চাচাত ভাই। তিনি পৌত্তলিকতা সহ্য করতে না পেরে পরবর্তীতে হযরত ঈসা (আ:) এর অনুসারী হয়েছিলেন। তিনি আরবী এবং হিব্রু ভাষায় ইন্জিল লিখতেন। হযরত খাদিজা তাকে সকল ঘটনা জানালেন। তিনিও নবী করীম (সা:) কে প্রশ্ন করে ঘটনা জেনে নিলেন।

সবকিছু শুনে তিনি বলে উঠলেন, 'এ তো সেই ফেরেশতা যাকে মহান আল্লাহ হযরত মূসা (আ:) এর কাছে প্রেরণ করেছিলেন। আফসোস! আপনার নবুয়্যাত যুগে আমি যদি যুবক থাকতাম! আফসোস! আপনার জাতি যখন আপনাকে বহিষ্কৃত করবে! সে সময়ে যদি আমি জীবিত থাকতাম'!

তাঁর এসব কথা শুনে নবী করীম (সা:) জানতে চাইলেন, 'আমার জাতি আমাকে বের করে দেবে'?

ওয়ারাকা ইবনে নওফেল জানালো, 'অবশ্যই! আপনার ওপরে যে দায়িত্ব অর্পন করা হয়েছে, এ দায়িত্ব যার ওপরেই অর্পিত হবে অথচ তাঁর সাথে শত্রুতা করা হবে না, এমন কখনো হয়নি। সে সময় পর্যন্ত আমি যদি জীবিত থাকি তাহলে আমি অবশ্যই আপনাকে সাহায্য করবো'।

ওহীর সূচনায় নবী করীম (সা:) ও হযরত খাদিজা (রা:) এর এ সব ঘটনা অকাট্য এবং স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, হযরত জিবরাঈল (আ:) এর আগমনের মুহূর্তকাল পূর্বেও নবী করীম (সা:) কল্পনাও করেননি তাঁকে নবী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। নবী পদের জন্য আকাংখা পোষণ করা তো অনেক পরের বিষয়, তাঁকে নিয়ে এমন ঘটনা ঘটবে এ ধরনের চিন্তাও তাঁর মনে কখনো জাগেনি। জিবরাঈল (আ:) এর আগমন তাঁর কাছে ছিল সম্পূর্ণ আকস্মিক বিষয়। এ ধরনের অলৌকিক ঘটনা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ঘটলে সে মানুষের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া হতো, নবী করীম (সা:) এর মধ্যেও তাই হয়েছে। তাঁর এই প্রতিক্রিয়াই প্রমাণ করে যে, তিনি এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন ছিলেন।

এ কারণেই দেখা যায় তিনি যখন ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করলেন, তখন মক্কার লোকজন তাকে বিভিন্ন ধরনের অবাঞ্ছিত প্রশ্ন করলেও এ কথা তাঁকে তারা বলেনি, 'আপনি বহুদিন থেকে নবী হবার চেষ্টা-সাধনা করছেন এবং একদিন আপনি এমন একটা কিছু দাবী করবেন এটা আমরা জানতাম'।

কিন্তু ইতিহাস বলে, তাঁরা এ ধরণের কোনো প্রশ্ন কখনো করেনি। না করার কারণ হলো, তাদের সামনে বিশ্বনবীর সমগ্র জীবনকাল ছিল। দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে তাঁরা তাঁকে দেখছিল। নবী করীম (সা:) এর ভেতরে তাঁরা এমন কোনো কিছু দেখেনি, যার কারণে তাদের কাছেও মুহাম্মাদ (সা:) এর নবুয়‍্যাত ছিল সম্পূর্ণ আকস্মিক ঘটনা। ফলে তারা তাঁকে নানা প্রশ্ন বাণে জর্জরিত করলেও ঐ প্রশ্ন কখনো করেনি।

সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে তখন একমাত্র নবী করীম (সা:) ই ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী চরিত্রের ব্যক্তিত্ব। এ কারণেও তিনি এক মুহূর্তের জন্য মনে করেননি, তাঁর মতো সৎ এবং পবিত্র মানুষের একটা কিছু হওয়া উচিত। নবী হওয়া তো দূরের কথা, তাঁর মধ্যে সাধারণ কোনো নেতা হবার প্রবণতাও ছিল না। তারপর তাঁর ওপরে প্রথম ওহী অবতীর্ণ হবার পরে তিনি এই গুরু দায়িত্বের কথা চিন্তা করে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। সাধারণ কয়েকজন মানুষের ওপরে নয়, বিশেষ কোনো দেশ বা এলাকা অথবা শুধু মক্কার দায়িত্ব তাঁর ওপরে অর্পণ করা হয়নি। তাঁকে নির্বাচিত করা হয়েছে বিশ্বনবী, বিশ্বনেতা। তিনি শুধু সমগ্র পৃথিবীর মানুষের জন্য নির্বাচিত হলেন না, সমগ্র সৃষ্টি জগতের জন্য নির্বাচিত হলেন। এ যে কত বড় দায়িত্ব তা আমরা সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারি না। এই দায়িত্বের কথা চিন্তা করেও তিনি অস্থির ছিলেন।

নবী করীম (সা:) এর ক্ষেত্রেই যখন তাঁকে সেই শিশুকালে জানতে দেয়া হয়নি যে, তিনি নবী হতে যাচ্ছেন তখন অন্যান্য নবীদের ক্ষেত্রে তো জানানোর প্রশ্নই ওঠে না। তবে এই পৃথিবীতে যাদেরকে নবী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছিল, তাঁরা সবাই যে তৎকালিন সমাজে সর্বশ্রেষ্ঠ সৎ এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাদের চিন্তাধারা ছিল অত্যন্ত উঁচুমানের। তারপর ওহী অবতীর্ণ হবার পরে জীবনের প্রত্যেক মুহূর্তই তাদের অতিবাহিত হয়েছে মহান আল্লাহ তা'য়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের প্রচেষ্টায়।

নবুয়্যাত জীবনে সকল নবী-রাসূলই ওহীভিত্তিক জ্ঞান দ্বারা জীবন পরিচালনা করেছেন এবং নিজ সম্প্রদায়কেও আহ্বান জানিয়েছেন যেনো তারা তাঁকেই অনুসরণ করে। নবী করীম (সা:) নবুয়‍্যাত জীবনে যা কিছুই করেছেন এবং বলেছেন তা সবই ছিলো ওহীভিত্তিক। এ কারণেই তাঁর নবুয়‍্যাত জীবনের সকল কিছুই সমগ্র মানবতার জন্যে একমাত্র অনুসরণীয় অনুপম আদর্শ।

কেউ কেউ অনুমান করেন নবী-রাসূলগণ নবুয়‍্যাত লাভ করার পূর্বেও তেমনি জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন, যেমন জ্ঞান তাদের ছিল নবুয়্যাত লাভ করার পরে। কিন্তু তাদের এই ধারণা ভুল। যে সকল নবী-রাসূল সম্পর্কে আমরা কুরআন থেকে জানতে পারি, তাদের জীবনীর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেও এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তাঁরা যে নবী হবেন এই কথাটিও তাঁদের জানা ছিলো না। নবী করীম (সা:) ও জানতেন না তিনি নবী হবেন। শিশুকাল থেকেই তিনি মূর্তির প্রতি চরম ঘৃণা পোষণ করতেন। তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যগণ তাঁকে কখনো মূর্তির সামনে নিতে পারেনি। কিশোর বয়স থেকেই তিনি পরম সত্তার সন্ধানে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন এবং অনুধাবন করেছেন, দৃষ্টির সম্মুখের মানুষগুলো যাদের সামনে মাথানত করে মনের আকাংখা পেশ করছে, বিপদে যাদের কাছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, তাদের কোনই ক্ষমতা নেই। বরং সে মূর্তিই আরেকজন মহাক্ষমতাশালীর অধীন।

মহান আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে নবী করীম (সা:) ছিলেন যাবতীয় পাপ ও পংকিলতার বহু উর্ধ্বে। পবিত্র কুরআন থেকে যেমন সূরা শুরার ৫২ নং আয়াত, সূরা কাসাসের ৮৬ নং আয়াত ও সূরা দুহার ৭ নং আয়াতসহ অনেক আয়াত থেকেই আমরা জানতে পারি, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী অবতীর্ণের পূর্বে নবীগণ যে জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন সে জ্ঞান ছিলো সমাজের সর্বোৎকৃষ্ট গুণ-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী মানুষেরই অনুরূপ। সমাজের সাধারণ মানুষ এবং তাঁদের মধ্যে বিশাল পার্থক্য ছিল এবং নবী-রাসূল ছিলেন দেশ ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। আল্লাহ তা'য়ালা তাদের সম্পর্কে বলেছেন-

وَإِنَّهُمْ عِنْدَنَا لَمِنَ الْمُصْطَفَيْنَ الْأَخْيَارِ طَ

নিঃসন্দেহে তাঁরা (নবী-রাসূল) আমার কাছে বিশেষ বাছাই- পছন্দ করা সর্বোত্তম ব্যক্তিবর্গের মধ্যে গণ্য। (সূরা ছোয়াদ-৪৭)

নবুয়‍্যাত লাভের পূর্বে সাধারণের থেকে তাদের জীবনধারা ছিল সম্পূর্ণ পৃথক। দৈনন্দিন সাধারণ কাজ-কর্মে অন্য মানুষের সাথে সামঞ্জস্য থাকলেও তাদের কাজের ধরন এবং মন-মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা ছিল সমগ্র পৃথিবীর সকল মানুষের থেকে পৃথক। কিন্তু আল্লাহ সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান এবং ওহী সম্পর্কে জ্ঞান ছিল না বলেই ধারণা হয়। একদিকে এ কথার সাক্ষ্য পবিত্র কুরআন দেয় অপর দিকে সাক্ষ্য দেয় স্বয়ং নবীর অবস্থা। কেননা, ওহী সম্পর্কে যদি তাদের পূর্ণ জ্ঞান পূর্ব থেকেই থাকতো, তাহলে প্রথম ওহী অবতীর্ণের সময় তাঁরা অস্থির হয়ে পড়তেন না।

পক্ষান্তরে ওহী অবতীর্ণের পূর্বে তাদের মনে এবং চিন্তার জগতে যে সকল চিন্তার উদয় হতো, সে চিন্তার ভিত্তি মিথ্যার উপরে ছিলো না। প্রকৃত সত্যের দিকেই তাদের চিন্তা ধাবিত হতো। তাঁদের চোখ যা দেখতো, ঘুমের অবচেতন জগতে যে দৃশ্য এসে চোখের সামনে ধরা দিত তা ছিল বাস্তব। মহান আল্লাহ ওহীর জ্ঞান দিয়ে তাদের সামনে মহাসত্যের এক আশ্চর্য পৃথিবীর দ্বার উন্মোচন করে দিতেন। তাদের বিশ্বাস দৃঢ় প্রত্যয়ে পরিণত হতো।

অর্থাৎ নবীগণ ওহীজ্ঞানের পূর্বে পরিচালিত হতেন বুদ্ধিবৃত্তিক এবং প্রাকৃতিক হিদায়াতের দ্বারা। তাদের বুদ্ধির জগৎ মহান আল্লাহ এমনভাবে গঠন করেছিলেন যে, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য তাঁরা অনায়াসে বুঝে নিয়ে সেভাবে জীবন পরিচালিত করতেন। ইউরোপের মুসলিম বিদ্বেষী ঐতিহাসিকগণ ব্যতীত কেউ বলতে পারবে না যে, কোনো একজন নবীও তাদের জীবনকালে মুহূর্তের জন্য কোনো মূর্তির সামনে মাথানত করেছেন। কেনো করেননি? কারণ তাদের বুদ্ধিই বলে দিত পৃথিবীর অন্যান্য জড়পদার্থের মতই এসব মূর্তিও জড়পদার্থ। এসবের নিজস্ব কোনই ক্ষমতা নেই। সমগ্র পৃথিবীর দিকে তাদের দৃষ্টি সহজাত প্রবৃত্তির কারণেই নিপতিত হতো এবং তাদের মন বলে উঠতো, এসবের পেছনে একজন মহাক্ষমতাবানের ক্ষমতা কার্যকর রয়েছে। সৃষ্টির কোনো কিছুই বৃথা সৃষ্টি করা হয়নি। সাধারণ কোনো মানুষের মনে এ ধরনের চিন্তার উদয় না হলেও নবুয়‍্যাত পূর্ববর্তী জীবনে নবীদের মনে হতো। যারা উচ্চ পর্যায়ের সাধক ছিলেন বা সৃষ্টি জগৎ নিয়ে গবেষণা করতেন এবং সৃষ্টির সন্ধান করতে যেয়ে স্রষ্টার সন্ধান করতেন তাদের মনেও উল্লেখিত চিন্তার উদয় হতো।

এ কারণেই চিন্তাশীলগণ কুরআনের আলোকে বলেছেন, নবীদের নবুয়‍্যাত পূর্ববর্তী জীবনের চিন্তাধারা উচ্চ পর্যায়ের মানুষের চিন্তাধারার মতই ছিল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ আহ্বান করেছেন, তোমরা যে পৃথিবীতে বাস করছো, তোমরা যে দেহ নিয়ে চলাফেরা করো, দৈনন্দিন জীবনে তোমরা যে সামগ্রী ব্যবহার করো, স্ত্রীর গর্ভে যা নিক্ষিপ্ত হয় এসব নিয়ে তোমরা কেনো চিন্তা-গবেষণা করো না?

এ সব নিয়ে চিন্তা গবেষণা করলেই তোমরা অনুধাবন করতে পারবে, তোমাদের প্রকৃত স্রষ্টা কে। তোমরা অনুভব করতে পারবে, তোমাদেরকে বৃথা সৃষ্টি করা হয়নি। মহান আল্লাহ যাকে নবী হিসেবে তাঁর বান্দাদের সামনে প্রেরণ করবেন, তাদের মনে এ সকল চিন্তার উদয় হতো এবং তারা মহাসত্য অনুধাবন করতেন। প্রাকৃতিক নিদর্শনাবলী পর্যবেক্ষণ চিন্তা-গবেষণা এবং সহজাত জ্ঞানের প্রয়োগ করে নবীগণ চলতেন। বিভিন্ন নবীর নবুয়‍্যাত পূর্ববর্তী জীবনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই আমাদের সামনে সে সত্য প্রতিভাত হয়ে ওঠে। নবী করীম (সা:) এর নবুয়‍্যাত পূর্ববর্তী জীবনে দেখা যায়, সে সমাজে প্রচলিত কোনো একটি প্রথার সাথে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেননি বা ক্ষণিকের জন্যও তা গ্রহণ করেননি। তিনি আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মুহূর্তের জন্যও অংশীদারিত্ব মেনে নেননি। যে বিশ্বাসের বেষ্টনে তিনি পরিবেষ্টিত ছিলেন মাতৃগর্ভ থেকে এই বিশাল পৃথিবীতে এসে চৈতন্য উদয়ের পরে তিনি ঐ সকল বিশ্বাস নিজের অন্তরে এক মুহূর্তের জন্য স্থান দেননি।

যে পরিবারে এবং পরিবেশে তিনি শিশুকাল থেকে চল্লিশ বছর বয়সে পদার্পণ করলেন, অবাক করার বিষয় হলো সে পরিবার এবং পরিবেশের সামান্য ছোঁয়া তাঁকে স্পর্শ করতে পারলো না। এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী মানুষের জীবনে আর তাঁর জীবনে কোনই পার্থক্য ছিল না। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) যে আদর্শ মানব জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিলেন, সে আদর্শে যে বিকৃত করা হয়েছিল এবং ঘৃণিত নতুন প্রথার আমদানী করে তা অনুসরণ করা হতো, ক্ষণিকের জন্য তিনি তা মেনে নেননি। প্রতিমার উদ্দেশ্যে বলিদানকৃত পশুর গোস্ত তিনি ভক্ষণ করেননি। বন্যার পানির ন্যায় যে সমাজে মদ প্রবাহিত হতো, সে মদ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। নারী ভোগের প্রতিটি দ্বার যেখানে ছিল উন্মুক্ত, তিনি সে দ্বারের দিকে অবচেতন মনেও কখনো নিজের পদদ্বয় দূরে থাক- মুহূর্তের জন্য স্বীয় মনকে অগ্রসর করাননি।

তাঁর গোত্র কুরাইশ গোত্র সে সমাজে আভিজাত্যের অহঙ্কারে এক বৈষম্য সৃষ্টি করে রেখেছিল। তাঁরা দাবী করতো সকল মানুষের মধ্যে তাঁরা শ্রেষ্ঠ। সুতরাং হজ্জের সময়ে অন্যদের মতো তাদেরকে আরাফাতে যাওয়া আসা করতে হবে না। তাদের দাবী ছিল, কুরাইশরা শ্রেষ্ঠত্বের কারণে কা'বার বাইরে গিয়ে সাধারণ হাজ্জীদের মতো আরাফাতে অবস্থান করতে পারে না, এটা তাদের মর্যাদার পরিপন্থী। কিন্তু তাঁরা এটা জানতো যে, মক্কা থেকে হজ্জের সময় আরাফাতে গমন করা ইবাদাতের অংশ। কিন্তু তাঁরা সম্পূর্ণ সচেতনভাবে এই ইবাদাতকে সংকীর্ণ করেছিল।

মক্কার অধিবাসীদের মধ্যে যারা কুরাইশদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে বা বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল, তাঁরাও আত্মীয়তা বা বন্ধুত্বের সূত্রে মর্যাদার দাবী উত্থাপন করে কুরাইশদের অনুকরণে হজ্জের ইবাদাতে সংকীর্ণতা এনেছিল। তাঁরাও আরাফাতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। আরেকটি প্রথা তাঁরা প্রবর্তিত করেছিল, কা'বা এলাকার বাইরে থেকে যারা আসবে তাঁরা তাদের সাথে নিয়ে আসা খাদ্য গ্রহণ এবং পোষাক পরিধান করতে পারবে না। কা'বার সেবক কুরাইশরা যে খাদ্য সরবরাহ করবে তা গ্রহণ এবং যে পোষাক সরবরাহ করবে তা পরিধান করতে হবে। সরবরাহ করতে অক্ষম হলে উলঙ্গ হয়ে কা'বা তাওয়াফ করতে হবে। সে সমাজের মানুষ এ সকল বাতিল প্রথা সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করে অনুসরণ করতো।

কিন্তু মুহাম্মাদ (সা:) কুরাইশদের এ সব প্রথা কখনো গ্রহণ করেননি। নবুয়‍্যাত লাভের পূর্বে কুরাইশদের প্রবর্তিত প্রথা নিষ্ঠুর পায়ে দলিত মথিত করে তিনি আরাফাতে গমন করতেন। হযরত ইবরাহীম (আ:) যে পদ্ধতিতে হজ্জ আদায় করেছেন, তিনি সে পদ্ধতি তথা আল্লাহ তা'য়ালার শিখানো নিয়মে হজ্জ সমাপন করেছেন। অর্থাৎ তদানীন্তন পৃথিবীতে প্রচলিত যাবতীয় অনাচার থেকে তিনি ছিলেন মুক্ত।

নবী করীম (সা:) তাঁর দৃষ্টির সামনে বিরাজিত সমস্যা সমাধানের চিন্তায় নিজেকে লোকালয় থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিলেন। প্রায়ই তিনি নির্জনতা অবলম্বন করতেন। যে সকল সমস্যা নিয়ে তিনি চিন্তায় অস্থির থাকতেন, এসব সমস্যার সমাধান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে ওহীর মাধ্যমে দান করবেন। সুতরাং ওহী নাজিলের সময় যতো এগিয়ে আসতে থাকে মুহাম্মাদ (সা:) এর নির্জনতা অবলম্বন ততই বৃদ্ধি পেতে থাকলো। তিনি মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে একটি পাহাড়ে চলে যেতেন। সে পর্বতের হেরা নামক গুহায় বিশেষ ইবাদাতে নিমগ্ন হয়ে পড়তেন। এ সময়ে তিনি সত্য এবং সুন্দর স্বপ্ন দেখতেন। তিনি এমন স্বপ্ন দেখতেন তা যেন মনে হতো তিনি তা বাস্তবে দেখছেন।

পর্বতের গুহায় তিনি ইবাদাতের কোন্ পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তা হাদীসে হযরত আয়িশা (রা:) এর বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, হেরা গুহায় তিনি যে ইবাদাত করতেন তা ছিল চিন্তা-গবেষণা ও উপদেশ গ্রহণ করা। তিনি বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে যেতেন অথবা খাদিজা (রা:) স্বয়ং দিয়ে আসতেন বা লোক মারফত প্রেরণ করতেন। কখনো কয়েকদিনের খাবার তিনি একত্রে নিয়ে যেতেন।

হযরত আয়িশা (রা:) বলেছেন, মহান আল্লাহ যে সময় তাঁকে অনুগ্রহ করে মানব জাতির জন্য নবী নির্বাচিত করলেন তখন তিনি নবুয়‍্যাতের একটি অংশ হিসেবে নির্ভুল স্বপ্ন দেখতেন। এ সময় মহান আল্লাহ তাকে নির্জন বাসের প্রতি গভীর আগ্রহী করে তোলেন। তখন তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন তা দিনের আলোর মতই বাস্তবে পরিণত হতো। একাকী কোনো নির্জন স্থান সে সময় তাঁর কাছে অধিক প্রিয় ছিল। আরেকটি বর্ণনায় দেখা যায়, নবুয়‍্যাতের সূচনা লগ্নে তিনি বাইরে বের হলেই কোনো নির্জন উপত্যকায় বা নির্জন সমভূমিতে চলে যেতেন। সে সময় তিনি কোনো জড়পদার্থের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শুনতে পেতেন, 'আস্সালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ'!

সালামের আওয়াজ শোনার সাথে সাথে তিনি সচকিত হয়ে চারদিকে তাকিয়ে সালাম দাতার সন্ধান করতেন। কিন্তু তিনি তাঁর আশেপাশে গাছ পাথর ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেতেন না। এভাবেই সময় তখন অতিবাহিত হচ্ছিল। গবেষকদের ধারণা, ওহী এবং হযরত জিবরাঈল (আ:) কে যেন নবী করীম (সা:) ধারণ করতে পারেন এ কারণেই নবুয়‍্যাতের পূর্বে কিছুদিন মহান আল্লাহ এ অবস্থা সৃষ্টি করে তাঁর অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধি করছিলেন।

হাদীসে দেখা যায়, যে সময় তিনি নির্জনতা অবলম্বন করতেন তখন তিনি প্রচুর দান করতেন। অভাবীদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করতেন। বাড়িতে ফিরে আসার সময় কা'বাঘরে এসে তিনি সাত বার বা ততোধিক বার তওয়াফ করতেন তারপর বাড়িতে যেতেন। এ সময় তিনি যে সকল স্বপ্ন দেখতেন তা শুধু মাত্র সে সময়ের জন্যই সীমাবদ্ধ ছিল না। এ ধরনের স্বপ্ন নবুয়্যাত লাভের পরেও তিনি তাঁর জীবনে বহুবার দেখেছেন।

হাদীসে কুদসী নামে যে হাদীসসমূহ রয়েছে তা অনেকই এ পর্যায়ভুক্ত। এ ছাড়াও তাঁর মনে বিভিন্ন সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে নানা কথার উদয় করে দেয়া হতো। এরপর এক রমজান মাসে তিনি হেরা গুহায় চলে গেলেন। রমজানের সেই মহান রাত বিশ্বমানবতার সামনে এসে উপস্থিত হলো, যে রাতে নির্ভুল জীবন বিধান বিশ্বনবীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হতে থাকলো।

সে সময়ের অবস্থা সম্পর্কে নবী করীম (সা:) বলেছেন, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। এ সময় হযরত জিবরাঈল (আ:) এসে আমার সামনে উপস্থিত হলেন। তাঁর কাছে ছিল একখণ্ড রেশমী কাপড়। সে কাপড়ে কিছু লেখা ছিল। হযরত জিবরাঈল (আ:) আমাকে বললেন, 'পড়ুন'। আমি জবাব দিলাম আমি পড়তে পারি না। তখন তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করলেন। তাঁর সে আলিঙ্গন এমন ছিল যে, আমার মনে হলো আমার প্রাণ বায়ু নির্গত হবে।

তিনি আমাকে পুনরায় বললেন, 'পড়ুন'। আমি পূর্ববৎ বললাম, আমি পড়তে পারি না। তিনি সেই আগের মতই আমাকে এমন জোরে জড়িয়ে ধরলেন যে, এবারেও আমার ধারণা হলো আমার প্রাণ বের হয়ে যাবে। আবারও তিনি আমাকে পূর্বের অনুরূপ বললেন, 'পড়ুন'। এবার আমি বললাম, আমি কি পড়বো? তিনি বললেন, 'পড়ুন আপনার রব-এর নাম সহকারে। যিনি সৃষ্টি করেছেন। জমাট বাঁধা রক্তের এক পিণ্ড হতে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। পড়ুন, আর আপনার রব খুবই অনুগ্রহশীল। যিনি কলমের দ্বারা জ্ঞান শিখিয়েছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান দান করেছেন যা সে অবগত ছিলো না'। নবী করীম (সা:) বলেন, 'তিনি যা পড়লেন আমিও তাঁকে তা পরে পড়ে শোনালাম। তখন তিনি বিদায় নিলেন। তারপর আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমি জাগ্রত হলাম। তখন আমার উপলব্ধি হলো ক্ষণপূর্বে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনা এবং যা আমাকে পড়ানো হয়েছিল তা আমার স্মরণে জাগরুক হয়ে আছে'।

ঐতিহাসিক এবং গবেষকগণ বলেন, বিশ্বনবীর সাথে বাস্তবে হযরত জিবরাঈল (আ:) যে আচরণ করবেন সে আচরণ তাঁর ঘুমের ভেতরে করার অর্থ হলো তা ছিল ঘটিতব্য ঘটনার ভুমিকা। ইবনে হিশাম বর্ণনা করেছেন, এরপর নবী করীম (সা:) সে পাহাড়ের গুহা থেকে বের হয়ে এলেন। পাহাড়ের মাঝামাঝি অবস্থানে আসার পরে তিনি তাঁর মাথার ওপর থেকে এক অশ্রুত কন্ঠ শুনতে পেলেন। তাকে ডেকে বলা হচ্ছে, 'হে মুহাম্মাদ (সা:)! আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আমি জিবরাঈল'!

এ কণ্ঠ শ্রবণ করে তিনি ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন, হযরত জিবরাঈল (আ:) একজন অপূর্ব সৌম্যদর্শন আকৃতি ধারণ করে আছেন, কিন্তু তাঁর দু'টো পাখা রয়েছে এবং সে পাখা দুদিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন।

তিনি পুনরায় বললেন, 'হে মুহাম্মাদ (সাঃ)! আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আমি জিবরাঈল!'

নবী করীম (সা:) হযরত জিবরাঈল (আ:) এর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। এরপর তিনি আকাশের যেদিকেই দৃষ্টি দিলেন সেদিকেই তাঁকে দেখতে পেলেন। সমগ্র আকাশ জুড়েই জিবরাঈল (আ:) কে নবী করীম (সা:) বিরাজ করতে দেখলেন। তিনি অবিচল থেকে সেই দৃশ্য দীর্ঘক্ষণ ধরে দেখলেন। তিনি তাঁর কদম মোবারক কোনো দিকেই সরাতে পারছিলেন না। তিনি দেখছিলেন তাঁর সন্ধানে তাঁর সহধর্মিনী লোক প্রেরণ করেছে, সে লোক তাঁর সন্ধান করছে কিন্তু তিনি সে লোককে বলতে পারলেন না তাঁর নিজের অবস্থানের কথা। লোকটি ফিরে চলে গেল। এরপর আকাশে আর কোনো দৃশ্য দেখলেন না। তারপর তিনি ভীত কম্পিত অবস্থায় বাড়িতে ফিরে গেলেন এবং হযরত খাদিজাকে বললেন, 'আমাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দাও! আমাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দাও'!

হযরত খাদিজা (রা:) তাঁকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দিলেন। নবী করীম (সা:) এর ভীত কম্পিত অবস্থার অবসান হলে তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, 'হে খাদিজা! আমার এ কি হলো'! তারপর তিনি সকল ঘটনা তাঁর স্ত্রীকে শুনিয়ে বললেন, 'আমার নিজের জীবনের ভয় হচ্ছে'।

হযরত খাদিজা (রা:) তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন, 'অসম্ভব! মহান আল্লাহ তা'য়ালা আপনাকে কিছুতেই অসম্মানিত করবেন না এবং আপনার যশ ও খ্যাতির যথোচিত প্রসার না ঘটিয়ে আপনাকে তুলেও নিবে না। কারণ, আপনি আত্মীয়তার হক আদায়কারী, সর্বদা সত্যবাদী, পূর্ণমাত্রায় বিশ্বাসী আমানতদার, অনাথ অক্ষম ইয়াতিম বিধবা প্রতিবন্ধীদের ভার বহনকারী, অভাবগ্রস্ত বেকারদের জন্য উপার্জনের ব্যবস্থা গ্রহণে সদাসচেষ্ট, অতিথিদের প্রতি যত্নবান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসহায় দুঃস্থ মানুষের নিকটতম বন্ধু ও সাহায্যকারী'।

মানবতার চরোমৎকর্ষের যে মূল সাতটি গুণ মহান আল্লাহ নবী করীম (সা:) এর মধ্যে দান করেছেন তা হযরত খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা:) অল্প কথায় প্রকাশ করলেন। এরপরে হযরত খাদিজা (রা:) নবী করীম (সা:) কে সাথে করে ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে গেলেন। এ লোকটি ছিলেন বয়সে বৃদ্ধ ও অন্ধ। তিনি ছিলেন খাদিজা (রা:) এর চাচাত ভাই। তিনি পৌত্তলিকতা সহ্য করতে না পেরে পরবর্তীতে হযরত ঈসা (আ:) এর অনুসারী হয়েছিলেন। তিনি আরবী এবং হিব্রু ভাষায় ইন্জিল লিখতেন। হযরত খাদিজা তাকে সকল ঘটনা জানালেন। তিনিও নবী করীম (সা:) কে প্রশ্ন করে ঘটনা জেনে নিলেন।

সবকিছু শুনে তিনি বলে উঠলেন, 'এ তো সেই ফেরেশতা যাকে মহান আল্লাহ হযরত মূসা (আ:) এর কাছে প্রেরণ করেছিলেন। আফসোস! আপনার নবুয়্যাত যুগে আমি যদি যুবক থাকতাম! আফসোস! আপনার জাতি যখন আপনাকে বহিষ্কৃত করবে! সে সময়ে যদি আমি জীবিত থাকতাম'!

তাঁর এসব কথা শুনে নবী করীম (সা:) জানতে চাইলেন, 'আমার জাতি আমাকে বের করে দেবে'?

ওয়ারাকা ইবনে নওফেল জানালো, 'অবশ্যই! আপনার ওপরে যে দায়িত্ব অর্পন করা হয়েছে, এ দায়িত্ব যার ওপরেই অর্পিত হবে অথচ তাঁর সাথে শত্রুতা করা হবে না, এমন কখনো হয়নি। সে সময় পর্যন্ত আমি যদি জীবিত থাকি তাহলে আমি অবশ্যই আপনাকে সাহায্য করবো'।

ওহীর সূচনায় নবী করীম (সা:) ও হযরত খাদিজা (রা:) এর এ সব ঘটনা অকাট্য এবং স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, হযরত জিবরাঈল (আ:) এর আগমনের মুহূর্তকাল পূর্বেও নবী করীম (সা:) কল্পনাও করেননি তাঁকে নবী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। নবী পদের জন্য আকাংখা পোষণ করা তো অনেক পরের বিষয়, তাঁকে নিয়ে এমন ঘটনা ঘটবে এ ধরনের চিন্তাও তাঁর মনে কখনো জাগেনি। জিবরাঈল (আ:) এর আগমন তাঁর কাছে ছিল সম্পূর্ণ আকস্মিক বিষয়। এ ধরনের অলৌকিক ঘটনা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ঘটলে সে মানুষের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া হতো, নবী করীম (সা:) এর মধ্যেও তাই হয়েছে। তাঁর এই প্রতিক্রিয়াই প্রমাণ করে যে, তিনি এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন ছিলেন।

এ কারণেই দেখা যায় তিনি যখন ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করলেন, তখন মক্কার লোকজন তাকে বিভিন্ন ধরনের অবাঞ্ছিত প্রশ্ন করলেও এ কথা তাঁকে তারা বলেনি, 'আপনি বহুদিন থেকে নবী হবার চেষ্টা-সাধনা করছেন এবং একদিন আপনি এমন একটা কিছু দাবী করবেন এটা আমরা জানতাম'।

কিন্তু ইতিহাস বলে, তাঁরা এ ধরণের কোনো প্রশ্ন কখনো করেনি। না করার কারণ হলো, তাদের সামনে বিশ্বনবীর সমগ্র জীবনকাল ছিল। দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে তাঁরা তাঁকে দেখছিল। নবী করীম (সা:) এর ভেতরে তাঁরা এমন কোনো কিছু দেখেনি, যার কারণে তাদের কাছেও মুহাম্মাদ (সা:) এর নবুয়‍্যাত ছিল সম্পূর্ণ আকস্মিক ঘটনা। ফলে তারা তাঁকে নানা প্রশ্ন বাণে জর্জরিত করলেও ঐ প্রশ্ন কখনো করেনি।

সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে তখন একমাত্র নবী করীম (সা:) ই ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী চরিত্রের ব্যক্তিত্ব। এ কারণেও তিনি এক মুহূর্তের জন্য মনে করেননি, তাঁর মতো সৎ এবং পবিত্র মানুষের একটা কিছু হওয়া উচিত। নবী হওয়া তো দূরের কথা, তাঁর মধ্যে সাধারণ কোনো নেতা হবার প্রবণতাও ছিল না। তারপর তাঁর ওপরে প্রথম ওহী অবতীর্ণ হবার পরে তিনি এই গুরু দায়িত্বের কথা চিন্তা করে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। সাধারণ কয়েকজন মানুষের ওপরে নয়, বিশেষ কোনো দেশ বা এলাকা অথবা শুধু মক্কার দায়িত্ব তাঁর ওপরে অর্পণ করা হয়নি। তাঁকে নির্বাচিত করা হয়েছে বিশ্বনবী, বিশ্বনেতা। তিনি শুধু সমগ্র পৃথিবীর মানুষের জন্য নির্বাচিত হলেন না, সমগ্র সৃষ্টি জগতের জন্য নির্বাচিত হলেন। এ যে কত বড় দায়িত্ব তা আমরা সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারি না। এই দায়িত্বের কথা চিন্তা করেও তিনি অস্থির ছিলেন।

নবী করীম (সা:) এর ক্ষেত্রেই যখন তাঁকে সেই শিশুকালে জানতে দেয়া হয়নি যে, তিনি নবী হতে যাচ্ছেন তখন অন্যান্য নবীদের ক্ষেত্রে তো জানানোর প্রশ্নই ওঠে না। তবে এই পৃথিবীতে যাদেরকে নবী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছিল, তাঁরা সবাই যে তৎকালিন সমাজে সর্বশ্রেষ্ঠ সৎ এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাদের চিন্তাধারা ছিল অত্যন্ত উঁচুমানের। তারপর ওহী অবতীর্ণ হবার পরে জীবনের প্রত্যেক মুহূর্তই তাদের অতিবাহিত হয়েছে মহান আল্লাহ তা'য়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের প্রচেষ্টায়।

নবুয়্যাত জীবনে সকল নবী-রাসূলই ওহীভিত্তিক জ্ঞান দ্বারা জীবন পরিচালনা করেছেন এবং নিজ সম্প্রদায়কেও আহ্বান জানিয়েছেন যেনো তারা তাঁকেই অনুসরণ করে। নবী করীম (সা:) নবুয়‍্যাত জীবনে যা কিছুই করেছেন এবং বলেছেন তা সবই ছিলো ওহীভিত্তিক। এ কারণেই তাঁর নবুয়‍্যাত জীবনের সকল কিছুই সমগ্র মানবতার জন্যে একমাত্র অনুসরণীয় অনুপম আদর্শ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px