📄 নবী-রাসূলের সর্বপ্রধান কর্তব্য
পৃথিবীতে নবী ও রাসূল প্রেরণ করা হয় পথভ্রষ্ট মানুষকে সত্য ও সহজ-সরল পথ প্রদর্শনের লক্ষ্যে। তাদের প্রধান দায়িত্বই হচ্ছে পৃথিবীর মানুষকে সকল প্রকার দাসত্ব থেকে মুক্ত করে একমাত্র আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিয়ে তাঁরই গোলামীর দিকে আহ্বান করা। একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালাকেই সকল শক্তির উৎস হিসেবে গ্রহণ করা, তাঁকেই প্রতিপালক হিসেবে মান্য করা, একমাত্র তাঁকেই নিজের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের অধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াই হলো মানুষের কর্তব্য, এই কর্তব্য পালনের দিকেই মানুষকে আহ্বান করাই হলো পৃথিবীতে নবী-রাসূলের প্রধান দায়িত্ব। এই দায়িত্বই সকল নবী-রাসূল পালন করেছেন।
প্রত্যেক নবীই তাঁর নিজের জাতিকে ভুলে যাওয়া পাঠ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাদেরকে তাঁরা শিক্ষা দেন, দাসত্ব করতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহর। নবী-রাসূল তাঁর অনুসারীকে মূর্তি পূজা এবং শিরক থেকে হেফাজত করেন। সমাজে প্রচলিত মহান আল্লাহর অপছন্দনীয় প্রথা থেকে তাদেরকে বিরত রাখেন। তাঁর পছন্দনীয় পন্থায় জীবন যাপন করার পদ্ধতি শিক্ষা দেন এবং আল্লাহর আইন প্রচলিত করে তা মেনে চলার জন্য উপদেশ দেন।
পৃথিবীর এমন কোনো জনপদ নেই যেখানে মহান আল্লাহ নবী প্রেরণ করেননি। প্রত্যেক নবীর প্রচারিত আদর্শ ছিল ইসলাম। তবে স্থান কাল পাত্রভেদে প্রত্যেক নবীর শিক্ষা পদ্ধতি এবং আইন-কানুনে সামান্য পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। নবীগণ তাদের জাতির ভেতরে যেসব মূর্খতা অজ্ঞানতা কুসংস্কার এবং অনাচার প্রচলিত ছিল, সেগুলোর মূল উৎপাটনের ব্যাপারে অবিরাম সংগ্রাম করেছেন। যে সব ভ্রান্ত চিন্তা-চেতনা জাতিকে গ্রাস করেছিল, তা থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে তাঁরা সংগ্রাম করেছেন।
জ্ঞান- বিজ্ঞান, সভ্যতা-সংস্কৃতির দিক দিয়ে জাতি যখন প্রাথমিক পর্যায় অতিক্রম করছিল তখন নবীগণ তাদেরকে আইন-কানুন দান করেছিলেন। তারপর ক্রমশঃ জাতি উন্নতির পথে এগিয়ে গিয়েছে, সেই সাথে তাঁরা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে শিক্ষা ও আইন-কানুনও ব্যাপকভাবে দান করেছেন। মোট কথা নবী-রাসূল মানুষকে আল্লাহর গোলামে পরিণত করার জন্য ইন্তেকালের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সংগ্রাম করেছেন। নবী করীম (সা:) ইন্তেকালের মাত্র কয়েক মিনিট পূর্বেও মানুষকে নামাজের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
নবী করীম (সা:) এর এই কাজ কোনো নতুন কাজ নয়। এ কথা তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বললেন-
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُوْنِ
আমি আপনার পূর্বে এমন কোনো নবী পাঠাইনি যার কাছে ওহী পাঠিয়ে আমি একথা বলিনি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং তোমরা সবাই আমারই দাসত্ব করো। (সূরা আম্বিয়া-২৫)
পৃথিবীতে যারা নিজেদেরকে মনিব মনে করে সাধারণ মানুষকে নিজেদের দাস বানিয়ে রেখেছে, নিজেদের তৈরী আদর্শ, মতবাদ, আইন-কানুনের বেড়াজালে বন্দী করে রেখেছে, তাদেরকে যেন সাধারণ মানুষ অস্বীকার করে এই অনুপ্রেরণা মানুষের মধ্যে জাগ্রত করা এবং তাদেরকে সংগ্রাম মুখর করে গড়ে তোলাও নবীর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের কাছে ওহীর মাধ্যমে জানিয়েছেন-
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُوْلاً أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوْتَ جِ
আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি, যাতে করে (তাদের কাছে সে বলতে পারে,) তোমরা এক আল্লাহ তা'য়ালার দাসত্ব করো এবং তাঁর প্রতি বিদ্রোহী শক্তিসমূহকে বর্জন করো। (সূরা আন্ নাহল-৩৬)
মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে জীবন বিধান রচনা করেছেন নবী-রাসূল তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন। এ দায়িত্ব পালন করেন নবীগণ এবং এটাই মহান আল্লাহর নিয়ম।
তাঁর নিয়মের অধীনেই তাঁর আইন-কানুন মানুষের কাছে পৌঁছেছে। আল্লাহ তা'য়ালার নিয়ম হলো তিনি অনুগ্রহ করে তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকেই একজনকে নবী হিসেবে নির্বাচিত করেন এবং তাঁর কাছে ফেরেশতার মাধ্যমে জীবন বিধান প্রেরণ করেন। পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল এসেছেন তাঁরা তাদের সমগ্র জীবনব্যাপী এই কঠিন দায়িত্ব পালন করে যান। এ দায়িত্ব পালনে তাঁরা সামান্যতম অবহেলা প্রদর্শন করেন না। মুহূর্তের জন্য তাঁরা ভুলে যান না কোন্ দায়িত্বসহ তাদেরকে প্রেরণ করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী করীম (সা:) কে আহ্বান করে বলেছেন-
يَا أَيُّهَا الرَّسُوْلُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَّبِّكَ طَ وَإِنْ لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَه ط
হে রাসূল! যা কিছু আপনার ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছে তা আপনি (অন্যের কাছে) পৌঁছে দিন, যদি আপনি তা না করেন তাহলে আপনি তো (মানুষদের কাছে) তাঁর বার্তা পৌঁছে দিলেন না! (সূরা আল মায়েদাহ-৬৭)
নবীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো তাঁরা সাধারণ মানুষকে ঐ পথের দিকেই আহ্বান জানাবেন, যে পথকে আল্লাহ তা'য়ালা সিরাতুল মুস্তাকিম নামে অভিহিত করেছেন। এই পথের পরিচয় নবীগণ মানুষকে জানাবেন, এ পথে চলতে সাহায্য করবেন, মানুষ যেন এ পথে অগ্রসর হয়ে গন্তব্য স্থলে পৌঁছতে পারে সেভাবে তিনি সহযোগিতা করবেন। সাধারণ মানুষ আল্লাহর পরিচয় জানে না। সত্য মিথ্যার পার্থক্য তাঁরা বোঝে না। কোনটি কল্যাণের আর কোনটি অকল্যাণের পথ তা মানুষ জানে না। মানুষকে এসব ব্যাপারে দিক নির্দেশনা দান করবেন নবীগণ। মানুষ যেন নির্ভুলভাবে সহজ সরল পথে চলতে পারে এ কারণেই মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবীদের কাছে ওহী অবতীর্ণ করেন। মহান আল্লাহ তা'য়ালা ওহী প্রেরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন-
كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوْرِ لَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَى صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ لَا
(এ কুরআন এমন) এক গ্রন্থ যা আমি আপনার ওপর অবতীর্ণ করেছি, যাতে করে আপনি (এর দ্বারা) মানুষদের তাদের মালিকের আদেশক্রমে (মূর্খতার) অন্ধকার থেকে (মহাসত্যের) আলোতে বের করে আনতে পারেন, তাঁর পথে- যিনি মহাপরাক্রমশালী ও যাবতীয় প্রশংসা পাবার যোগ্য। (সূরা ইবরাহীম-১)
উল্লেখিত আয়াতে মহান আল্লাহ নবী ও ওহী প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছেন। নবী করীম (সা:) কে প্রেরণ সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا لَا وَّدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُّنِيرًا -
হে নবী! আমি আপনাকে (হিদায়াতের) সাক্ষী (করে) পাঠিয়েছি, (আপনাকে) বানিয়েছি (জান্নাতের) সুসংবাদদাতা ও (জাহান্নামের) সতর্ককারী, আল্লাহর অনুমতিক্রমে আপনি হচ্ছেন আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী ও (হিদায়াতের) সুস্পষ্ট প্রদীপ। (সূরা আল আহযাব-৪৫-৪৬)
নবী দায়িত্ব লাভের পরে মানুষকে সত্য এবং মিথ্যার পার্থক্য বুঝিয়ে দিবেন। যারা নবীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলামের পতাকাতলে শামিল হয়েছে, তাদেরকে তিনি পরকালে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করবেন এবং যারা ইসলামের বিরোধিতা করেছে, ইসলাম গ্রহণ করেনি তাদেরকে তিনি পরকালে জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন করবেন। তিনি আল্লাহ তা'য়ালার আদেশেই মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান জানাবেন। তিনি নবুয়্যাতের আলো দিয়ে মূর্খতার সকল অন্ধকার দূরীভূত করবেন। মূর্খতার অন্ধকার বিদায় করে তাওহীদের জ্ঞানের মশাল প্রজ্জ্বলিত করবেন। তাঁরাই হবেন একমাত্র অনুসরণযোগ্য নেতা। মহান আল্লাহ তাদেরকে যেমন উচ্চ মর্যাদা প্রদান করেছেন তেমনিভাবে তাঁরা হলেন পবিত্র। সুতরাং তাঁরাই হলেন মানবজাতির পথ প্রদর্শক এবং একমাত্র আদর্শ নেতা। প্রশ্নাতীতভাবে তাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করে তাদেরকেই অনুসরণ করতে হবে। এই নেতৃত্ব মানুষকে পরকাল সম্পর্কে অবহিত করবেন। পৃথিবীতে মানুষের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের হিসাব দিতে হবে- এ সম্পর্কে মানুষকে অবগত করার দায়িত্ব নবী-রাসূলগণ পালন করেছেন。
আদালতে আখেরাতে বিচারের পরে যে সকল মানুষকে জাহান্নামের দিকে নেয়া হবে তখন জাহান্নামের দ্বাররক্ষী প্রশ্ন করবে-
وَسِيقَ الَّذِيْنَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ زُمَرًا ط حَتَّى إِذَا جَاؤُوْهَا فُتِحَتْ أَبْوَابُهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِّنكُمْ يَتْلُوْنَ عَلَيْكُمْ آيَاتِ رَبِّكُمْ وَيُنْذِرُونَكُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَذَا ط
যেসব লোক কুফুরী করেছে তাদের দলে দলে জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নেয়া হবে; এমনি (তাড়া খেয়ে) যখন তারা জাহান্নামের কাছে পৌঁছুবে তখন (সাথে সাথেই) তার (সদর) দরজা খুলে দেয়া হবে এবং তার রক্ষী (ফিরিশতারা) ওদের বলবে, তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্যে থেকে কোনো রাসূল আসেনি, যারা তোমাদের কাছে তোমাদের মালিকের (কিতাবের) আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করতো এবং তোমাদের এমনি একটি দিনের সাক্ষাৎ সম্পর্কে সতর্ক করে দিতো? (সূরা যুমার-৭১)
মানুষের সকল কাজের হিসাব মহান আল্লাহর কাছে পেশ করতে হবে, এ কথা মানুষকে জানানোর দায়িত্ব নবী-রাসূলের। কারণ আদালতে আখেরাতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে প্রশ্ন করবেন-
يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالإِنْسِ أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِّنْكُمْ يَقُصُّوْنَ عَلَيْكُمْ آيَاتِي وَيُنْذِرُونَكُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَذَا ط
(আল্লাহ তা'য়ালা সেদিন আরো বলবেন,) হে জ্বিন ও মানুষ সম্প্রদায় (বলো,) তোমাদের কাছে কি তোমাদেরই মধ্য থেকে আমার (এমন এমন) সব রাসূল আসেনি, যারা আমার আয়াতগুলো তোমাদের কাছে বর্ণনা করতো, (উপরন্তু) যারা তোমাদের ভয় দেখাতো যে, তোমাদের আজকের এ দিনের সম্মুখীন হতে হবে? (সূরা আনয়াম-১৩০)
নবীগণ মানুষকে তাঁর আসল গন্তব্যের দিকে অগ্রসর করাবেন। মানুষকে জানাবেন, এই পৃথিবী তোমাদের চিরস্থায়ী বাসস্থান নয়, পরকালের জীবনই হলো প্রকৃত জীবন এবং সে জীবন হলো অনন্তকালের। সুতরাং ঐ অনন্তকালে যেন তোমরা সুখে শান্তিতে থাকতে পারো, সে পাথেয় এই পৃথিবী থেকেই তোমাদেরকে সংগ্রহ করতে হবে। অর্থাৎ নবী-রাসূল মানুষকে জড়বাদ আর নাস্তিক্যবাদী বস্তুবাদ থেকে সরিয়ে নৈতিকতাবাদীতে পরিণত করবেন আর এটাই ছিলো নবী-রাসূলের সর্বপ্রধান দায়িত্ব।
📄 পৃথিবীতে নবী-রাসূলের অবস্থা
মহান আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক, অভিভাবক এবং বন্ধু, এর পরেই নবীদের স্থান। অর্থাৎ আল্লাহ তা'য়ালার পরেই মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু পৃথিবীতে আগমনকারী নবী-রাসূল। তাঁরা যখন দেখেন মানুষ সত্য পথ ত্যাগ করে ভুল পথে চলছে এবং পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। তখন তাঁরা অস্থির হয়ে পড়েন। মানব দরদী হিসেবে তাঁরা মানুষকে সংশোধন করার জন্য চেষ্টা-সাধনা করতে থাকেন। মানুষ তাদের এই পরম বন্ধুর সাথে বড় বিচিত্র আচরণ করে। নবী-রাসূল যখন মানুষের ভুল সংশোধন করার চেষ্টা শুরু করেন, তখন এই মানুষ তাদের কথা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাদেরকে বিদ্রুপ, কারাগারে নিক্ষেপ, শারীরিক নির্যাতন, দেশ থেকে বহিষ্কার এবং ক্ষেত্র বিশেষে হত্যাও করেছে। এরপরেও তাঁরা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করেছেন। তাঁরা তাদের দায়িত্ব পালন থেকে ক্ষণিকের জন্যেও বিরত হননি।
নবী-রাসূলের ইন্তেকালের পরে তাদের প্রচারিত শিক্ষা ও আদর্শে তাঁরই অনুসারীগণ সামান্য স্বার্থের কারণে পরিবর্তন পরিবর্ধন করেছে। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যে কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল সে কিতাবের ভেতরে পরিবর্তন করা হয়েছে। অনুসারীগণ নিজেদের মনগড়া কথা সেই কিতাবে নবীর কথা বলে লিপিবদ্ধ করেছে। আল্লাহর ইবাদাত করার বিভিন্ন নতুন পদ্ধতির বিষয় লিপিবদ্ধ করেছে। কেউ কেউ স্বয়ং নবীর কবরের পূজা করা আরম্ভ করেছে। অনেকে এমন মন্তব্য করেছে যে, স্বয়ং আল্লাহ নবীর রূপ ধারণ করে আমাদের মাঝে অবতার (Incarnation of a human body) হিসেবে আগমন করেছিলেন।
অনেকে নিজেদের নবীকে স্বয়ং আল্লাহর সন্তান বলে ঘোষণা করেছে। নবী এবং তাঁর মায়ের কল্পিত মূর্তি নির্মাণ করে পূজা করেছে। আফসোস! যারা এসেছিলেন পৃথিবী থেকে মূর্তি উৎখাত করতে, আর তাদের ইন্তেকালের পরে তাঁর অনুসারীরা তাদের মূর্তি নির্মাণ করে পূজা করেছে। এমনভাবে তারা তাদের নবীর শিক্ষা এবং জীবন বিকৃত করেছে, ঐ নবীর শিক্ষা যে কি ছিল বর্তমানে তা খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত দূরহ ব্যাপার। নবীর প্রকৃত জীবন যে কেমন ছিল তাও জানার কোনো উপায় তারা রাখেনি। একমাত্র নবী করীম (সা:) এর আনিত জীবন বিধান বা তাঁরই শিক্ষা মহান আল্লাহ তা'য়ালার অসীম রহমতে অবিকৃত রয়েছে এবং তিনি তাঁর শেষ নবীর শিক্ষা কিয়ামত পর্যন্ত স্বয়ং সংরক্ষণ করবেন।
📄 মানুষের প্রতি নবী-রাসূলের আহ্বান
মহান আল্লাহ মানব জাতিকে সংশোধন করার জন্য যে সংখ্যক নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই মানুষকে একই দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। প্রত্যেক নবীই বলেছেন, 'হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর দাসত্ব করো। তিনি ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো ইলাহ নেই'। আমরা দেখি বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদগণ মানুষকে নিজ দলে আকৃষ্ট করার জন্য মুখরোচক কথাবার্তা বলে জনগণকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। অথবা সাময়িক কোনো সমস্যার দিকে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে।
কিন্তু নবী-রাসূলের কর্মপদ্ধতি এমন ছিলো না, তাঁরা দেশের কোনো সমস্যাকে প্রাধান্য দিয়ে আন্দোলন করেননি। অর্থনৈতিক মুক্তির শ্লোগান দিয়ে মানুষের সামনে অবতীর্ণ হননি। কৃত্রিম কোনো বিষয় তাঁর জাতির সম্মুখে বড় করে দেখাননি। তাঁরা প্রথমেই বলেছেন, 'হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দাসত্ব করো। তিনি ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো ইলাহ নেই'। এ কথা শোনার সাথে সাথে নবীর পরিবার, সমাজ, দেশবাসী কেনো তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তা চিন্তা করে দেখার বিষয়। 'ইলাহ্' শব্দ দিয়ে তাঁরা কি বুঝিয়েছেন যে, নবীদেরকে নির্যাতিত হতে হয়েছে। প্রত্যেক নবীর প্রতিই নির্যাতন করা হয়েছে শুধুমাত্র এই 'ইলাহ্' বলার কারণে। আমাদেরকে বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে 'ইলাহ্' শব্দ দ্বারা আসলে কি বুঝায়।
যে শক্তি এই পৃথিবী এবং পৃথিবীর বাইরের, ভেতরের সকল প্রাণী ও অন্যান্য বস্তুর যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করেন, আরবী ভাষায় সেই শক্তিকে 'ইলাহ' বলে। মানুষের সকল প্রয়োজন যিনি পূরণ করেন, সমাজ, পরিবার, দেশ পরিচালনার জন্য যিনি আইন দান করেন এবং যার আইনই একমাত্র চলতে পারে তিনিই হলেন 'ইলাহ্'। যে কোনো প্রয়োজনে মানুষ যাঁর মুখাপেক্ষী হয়, যিনি মানুষকে সাহায্য করবেন এবং মানুষ যাঁর কাছে সাহায্য চাইবে তিনিই 'ইলাহ্'। সুতরাং সমাজের কায়েমী স্বার্থবাদী শক্তি, শোষক-শাসক যখন বুঝেছে, নবীর এ কথা গ্রহণ করলে নিজের কর্তৃত্ব বলতে আর কিছুই থাকবে না, সকল কর্তৃত্ব আল্লাহ তা'য়ালার জন্য ত্যাগ করতে হবে, তখনই তারা নবীর সাথে তথা ইসলামী আন্দোলনের প্রতি শত্রুতা করেছে এবং বর্তমানেও করছে- আগামীতেও করবে।
ইতিহাস কথা বলে, প্রত্যেক নবীর সাথেই তৎকালিন সমাজের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব ও দেশের শাসক শ্রেণীর সাথে 'ইলাহ' সম্পর্কে বিতর্ক হয়েছে। পবিত্র কুরআন বিবৃত এ সকল কাহিনী অন্য কোনো পৃথিবীর নয় বরং যে পৃথিবীতে মানুষ বাস করছে, মানুষের সাথে যে পৃথিবী সম্পর্কিত সেই পৃথিবীরই ঘটনা এবং এ সকল ঘটনা মানুষের সাথে সম্পর্কিত। নবী-রাসূল যে দেশে এবং জাতির মধ্যে আগমন করেছেন তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক তথা নানা ধরণের সমস্যা ছিল। এসব উপস্থিত সমস্যা সমাধানেরও প্রয়োজন ছিল। কিন্তু নবী-রাসূলগণ এ ধরনের সাময়িক ও স্থানীয় সমস্যাকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র একটি সমস্যা সামনে রেখেছেন এবং সে সমস্যা 'ইলাহ্' কেন্দ্রিক।
তাঁরা অন্য কোন সমস্যা জাতির সামনে তুলে না ধরে প্রধান সমস্যা অর্থাৎ কৃত্রিম 'ইলাহ্'-সমূহের দাসত্ব ত্যাগ করে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে 'ইলাহ' হিসাবে স্বীকৃতি দিতে বলেছেন। নবী করীম (সা:) প্রথমে এভাবে আহ্বান জানিয়েছিলেন, 'হে মানুষ! বলো আল্লাহ ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো ইলাহ্ নেই। তাহলে তোমরা কল্যাণ লাভ করবে'।
সুতরাং এ থেকে স্পষ্ট অনুধাবন করা যায় পৃথিবীতে সমস্যার সৃষ্টি তখনই হয়, যখন মানুষ একমাত্র আল্লাহকে রব ও ইলাহ্ হিসেবে মানে না। এর পরিবর্তে নিজেকে, সমাজপতি, প্রচলিত প্রথা, নিজ পরিবার, সমাজের আইন, দেশের শাসক, দেশের নানা ধরণের নীতি, দৃষ্টির সামনের সাময়িক স্বার্থ, ধর্মনেতা তথা প্রকৃত রব ব্যতীত অন্য কোনো কিছুকে নিজের মাবুদ বা ইলাহ তথা রব হিসেবে প্রাধান্য দিয়েছে, তখনই দেশে, সমাজে, ব্যক্তি জীবনে, রাষ্ট্র জীবনে নানা ধরণের সমস্যার আবির্ভাব ঘটেছে। এ কারণে নবী-রাসূল ও তাদের অনুসারী ইসলামী নেতৃত্ব দেশের, সমাজের সকল সমস্যা উপেক্ষা করে প্রধান সমস্যার দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
নবী-রাসূলগণ জানতেন সকল সমস্যার স্রষ্টা হলো মাত্র একটি। সুতরাং এই সমস্যার সমাধান হলে অন্য সমস্যাসমূহ এমনিতেই বিলীন হবে। এই সমস্যার সমাধানের ওপর জীবনের অন্যান্য যাবতীয় সমস্যার সমাধান নির্ভরশীল। এ কারণে তাঁরা তাদের সমগ্র জীবন এই সমস্যা সমাধানের জন্যই ব্যয় করেছেন। হযরত ঈসা (আ:) যখন বনী ইসরাঈলদের কাছে আগমন করেছিলেন তখন তিনি তাদেরকে বলেছিলেন-
وَلأُحِلَّ لَكُم بَعْضَ الَّذِى حُرِّمَ عَلَيْكُمْ وَجِئْتُكُم بِآيَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ قَفَ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوْنِ إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ طَ هَذَا صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٌ
তোমাদের ওপর হারাম করে রাখা হয়েছে এমন কতিপয় জিনিসও আমি তোমাদের জন্যে হালাল করে দেবো এবং তোমাদের মালিকের পক্ষ থেকে (এই) নিদর্শন নিয়েই এসেছি, অতএব তোমরা আল্লাহ তা'য়ালাকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'য়ালা আমার এবং তোমাদেরও মালিক, অতএব তোমরা তাঁর দাসত্ব করো আর এটাই হলো একমাত্র সহজ সরল পথ। (সূরা ইমরাণ-৫০-৫১)
হযরত ঈসা (আ:) তাঁর জাতিকে কোন্ কথার দিকে আহ্বান জানিয়েছেন মহান আল্লাহ নবী করীম (সা) কে ওহীর মাধ্যমে শুনিয়ে দিয়েছেন। তিনিও মানুষকে একমাত্র মহান আল্লাহ তা'য়ালাকেই রব হিসেবে গ্রহণ করতে বলেছেন। মহান আল্লাহর উলুহিয়াত এবং রবুবিয়াতই হলো প্রধান বিষয়। মানুষ মুখে আল্লাহকে স্বীকৃতি দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত, নামাজ-রোজা ও হজ্জ আদায় করছে, কিন্তু সে ব্যক্তি মানুষের বানানো আদর্শ অনুসারে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করার জন্য চেষ্টা করছে। সে এমন রাজনীতি করছে, যে রাজনীতি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। এর পরিষ্কার অর্থ হলো তারা আল্লাহকে স্রষ্টা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজী, আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন এই কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হিসেবে সে নামাজ-রোজা ও হজ্জ আদায় করছে। কিন্তু সে আল্লাহর রবুবিয়াত এবং উলুহিয়াত গ্রহণ করতে রাজী নয়। আল্লাহকে সে আইন ও বিধান দাতা হিসেবে গ্রহণ করতে রাজী নয়। Law Giver হিসেবে সে পৃথিবীর এক শ্রেণীর দার্শনিককে গ্রহণ করছে। এই ধরণের ব্যক্তিদের জন্য নিজেকে আল্লাহর গোলাম হিসেবে দাবী করার অবকাশ আল্লাহর বিধানে উপস্থিত নেই।
পবিত্র কোরআনের উল্লেখিত আয়াত থেকে আমাদের সামনে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, পৃথিবীর অন্যান্য নবী-রাসূলের মতই হযরত ঈসা (আ:) এর দাওয়াতের মূল বিষয় ছিল তিনটি। তিনিও এই তিনটি বিষয়ের দিকে তাঁর জাতিকে আহ্বান করেছেন। তাঁর আহ্বানের প্রথম কথা ছিল, সকল ক্ষমতার মালিক মহান আল্লাহ। অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব Sovereignty, Supreme Authority, Supreme Power যা একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট। এ কারণে দাসত্ব তাঁরই জন্য নিবেদিত। তাঁরই দাসত্ব করতে হবে। তাঁর আনুগত্যের ভিত্তিতে পৃথিবীতে মানব জীবনের সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হবে। মানুষের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, সভ্যতা সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপিত হবে এই কথাটির ওপরে।
তাঁর আহ্বানের দ্বিতীয় কথা ছিল, সার্বভৌম Sovereignty ক্ষমতাসম্পন্ন অধিপতির Viceroy প্রতিনিধি হিসেবে আমার আদেশ মেনে চলতে হবে, আমার আনুগত্য করতে হবে। আমাকেই একমাত্র নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
হযরত ঈসা (আ:) এর আহ্বানের তৃতীয় কথা ছিল, পৃথিবীতে মানব জীবনের বৈধ ও অবৈধের সীমারেখা মহান আল্লাহর আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট হবে। অর্থাৎ কোনটি হালাল ও হারাম তা আল্লাহর বিধান জানিয়ে দিবে। আল্লাহ তা'য়ালার আইনের মোকাবেলায় পৃথিবীর অন্যান্য সকল আইন বাতিল বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ Law Giver হলেন একমাত্র মহান আল্লাহ। কোন্ কাজ মানুষের করণীয় এবং বর্জনীয় এ নির্দেশ দেয়ার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর।
এক শ্রেণীর তথাকথিত চিন্তাবিদ মনে করেন, প্রত্যেক নবী-রাসূলের আগমনের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন ভিন্ন। তাঁরা সবাই একই উদ্দেশ্যে আগমন করেননি। যারা এ কথা বলেন, হয় তাদের কুরআন বুঝার ক্ষমতা নেই অথবা তারা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এ কথা বলে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে সকল নবীর আহ্বান ছিল এক ও অভিন্ন। গোটা সৃষ্টি জগতের সকল ক্ষমতার অধিকারী যিনি সেই Supreme authority-এর কাছ থেকে নিয়োগ পত্র নিয়ে যিনিই তাঁর প্রজাদের কাছে আগমন করবেন, তাঁর আগমনের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে যে, তিনি প্রজাদেরকে বিদ্রোহ করা এবং স্বায়ত্ব শাসন পরিচালনা হতেও বিরত রাখবেন।
আল্লাহর আইনের মোকাবেলায় অন্যদের আইন বাতিল বলে ঘোষণা দিয়ে এ আইন গ্রহণ করলে কি পুরস্কার লাভ করা যাবে এ সম্পর্কে তিনি সুসংবাদ দিবেন। আর যারা আল্লাহর আইন গ্রহণ করবে না, তাদেরকে তিনি ভয়ংকর শাস্তির কথা শোনাবেন। মহান আল্লাহ বলেন-
رُّسُلاً مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِيْنَ لِئَلَّا يَكُوْنَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ طَ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا -
রাসূলরা (ছিলো জান্নাতের) সুসংবাদবাহী ও (জাহান্নামের) ভয় প্রদর্শনকারী, (তাদের এ জন্যেই পাঠানো হয়েছিলো) যাতে করে রাসূলদের আগমনের পর আল্লাহ তা'য়ালার ওপর মানব জাতির কোনো অজুহাত খাড়া করার সুযোগ না থাকে; (সত্যিই) আল্লাহ তা'য়ালা মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। (সূরা নিসা-১৬৫)
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি কি উদ্দেশ্যে তাঁর নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। মানুষের সামনে যেন তাঁরা আল্লাহ তা'য়ালার বিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন। আল্লাহর দাসত্ব কেনো করতে হবে তা তাঁরা যুক্তি প্রমাণ দিয়ে মানুষকে বুঝিয়ে দিবেন। কেননা, আল্লাহ তা'য়ালার আদালতে এ সকল মানুষ যখন উপস্থিত হবে তখন তাঁরা যেন এ কথা বলতে না পারে, আমাদের কাছে এমন কোনো ব্যক্তি আসেনি বা আমাদের কাছে এমন কোনো মাধ্যম ছিল না যার মাধ্যমে আমরা আপনার বিধান সম্পর্কে জানতে পারতাম। আমরা আপনার বিধান সম্পর্কে জানতে পারলে অবশ্যই আপনার আইন অনুসরণ করতাম।
এসব অজুহাত যেন মানুষ আল্লাহ তা'য়ালার সামনে তুলতে না পারে, এ কারণেই মহান আল্লাহ প্রতিটি জনপদে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। নবী-রাসূলগণ মহাসত্যের আহ্বায়ক, সেই সাথে তাঁরা মানুষের আনুগত্য লাভের অধিকারী। তাদের আনুগত্য করা অবশ্য কর্তব্য। মহান আল্লাহ বলেন-
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَّسُوْلٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ ط
আমি যখনই কোনো (জনপদে) কোনো রাসূল পাঠিয়েছি, তাঁকে এ জন্যেই পাঠিয়েছি যে, আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী (সেখানে) তাঁর (শর্তহীন) আনুগত্য করা হবে। (সূরা নিসা-৬৪)
নবী-রাসূল পৃথিবীতে আগমন করবেন এবং মানুষ তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে-এতেই মানুষের দায়িত্ব শেষ হয় না। নবীকে বিশ্বাস করবে সেই সাথে মানুষ অন্য কারো আইন মেনে চলবে বা নিজের ইচ্ছামত জীবন যাপন করবে, এটা সম্ভব নয়। এ উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ নবী-রাসূল প্রেরণ করেননি। বরং নবী-রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্যই হলো জীবন যাপনের জন্য যে বিধান তিনি নিয়ে আসেন, পৃথিবীর সকল বিধান বর্জন করে কেবলমাত্র সেই বিধান অনুসারেই জীবন যাপন করতে হবে। আর এটাই হলো নবী-রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের প্রকৃত অর্থ।
নবী-রাসূল ও তাঁর অনুসারীদের আরো একটি দায়িত্ব হলো, তাঁরা আল্লাহর দেয়া জীবন বিধান পৃথিবীর সকল বিধানের ওপরে বিজয়ী করবেন। অর্থাৎ পৃথিবীর সকল আদর্শ, মতবাদ, মতাদর্শ, আইন-কানুনের মোকাবেলায় ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করবেন। আল্লাহর দেয়া আদর্শ রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রয়োগ করে দেশ বা পৃথিবী শাসন করবে। মহান আল্লাহ বলেন-
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُوْلَهُ بِالْهُدى وَدِيْنِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُوْنَ
তিনিই (মহান আল্লাহ), যিনি তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট হিদায়াত ও সঠিক জীবন বিধান সহকারে তাঁর রাসূলকে পাঠিয়েছেন, যেন সে এই জীবন ব্যবস্থাকে (দুনিয়ার) সব কয়টি বিধানের ওপর বিজয়ী করে দিতে পারে, মুশরিকরা এ বিজয়কে যতো দুঃসহই মনে করুক না কেনো। (সূরা আত্ তাওবা-৩৩)
আরবী দ্বীন শব্দ সম্পর্কে সীরাতে সরওয়ারে আলমে বর্ণনা করা হয়েছে, 'দ্বীন শব্দটিকে আরবী ভাষায় এমন জীবন ব্যবস্থা বা জীবন পদ্ধতির প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে যার প্রতিষ্ঠাকারীকে সনদ ও অনুসরণযোগ্য বলে মেনে নিয়ে তার আনুগত্য করতে হয়'।
পৃথিবীর সকল বিধান থাকবে আল্লাহর বিধানের অধীনে। আল্লাহর আইন প্রচলিত কোনো বিধানের অধীনে থাকবে এ উদ্দেশ্যে আল্লাহর বিধান পৃথিবীতে আগমন করেনি। অন্য কোন বিধানের অধীনে আল্লাহর আইন সামান্য সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে অবস্থান করবে, এ উদ্দেশ্যেও আল্লাহর বিধান আগমন করেনি। পৃথিবীর সকল ধরনের মতবাদ মতাদর্শ আল্লাহ তা'য়ালার আইনের অনুগ্রহ কুড়িয়ে টিকে থাকার হলে টিকে থাকবে আর না হয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কেননা আল্লাহ তা'য়ালার আইন যিনি নিয়ে আসেন, তিনি পৃথিবী ও আকাশের বাদশাহ তথা অদ্বিতীয় ক্ষমতাশালীর প্রতিনিধি হিসেবে আগমন করেন। নবী-রাসূল নিজের বাদশাহ মহান আল্লাহর বিধানকে বিজয়ী হিসেবে দেখতে চান। আল্লাহর বিধানের মোকাবেলায় পৃথিবীতে অন্য কোনো বিধান মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, এমন ধরনের কোনো বিধানের অস্তিত্ব পৃথিবীতে থাকবে না। নবী-রাসূলের আহ্বানের এটাই হলো মূল কথা।
মহান আল্লাহ মানব জাতিকে সংশোধন করার জন্য যে সংখ্যক নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই মানুষকে একই দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। প্রত্যেক নবীই বলেছেন, 'হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর দাসত্ব করো। তিনি ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো ইলাহ নেই'। আমরা দেখি বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদগণ মানুষকে নিজ দলে আকৃষ্ট করার জন্য মুখরোচক কথাবার্তা বলে জনগণকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। অথবা সাময়িক কোনো সমস্যার দিকে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে。
কিন্তু নবী-রাসূলের কর্মপদ্ধতি এমন ছিলো না, তাঁরা দেশের কোনো সমস্যাকে প্রাধান্য দিয়ে আন্দোলন করেননি। অর্থনৈতিক মুক্তির শ্লোগান দিয়ে মানুষের সামনে অবতীর্ণ হননি। কৃত্রিম কোনো বিষয় তাঁর জাতির সম্মুখে বড় করে দেখাননি। তাঁরা প্রথমেই বলেছেন, 'হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দাসত্ব করো। তিনি ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো ইলাহ নেই'। এ কথা শোনার সাথে সাথে নবীর পরিবার, সমাজ, দেশবাসী কেনো তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তা চিন্তা করে দেখার বিষয়। 'ইলাহ্' শব্দ দিয়ে তাঁরা কি বুঝিয়েছেন যে, নবীদেরকে নির্যাতিত হতে হয়েছে। প্রত্যেক নবীর প্রতিই নির্যাতন করা হয়েছে শুধুমাত্র এই 'ইলাহ্' বলার কারণে। আমাদেরকে বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে 'ইলাহ্' শব্দ দ্বারা আসলে কি বুঝায়।
যে শক্তি এই পৃথিবী এবং পৃথিবীর বাইরের, ভেতরের সকল প্রাণী ও অন্যান্য বস্তুর যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করেন, আরবী ভাষায় সেই শক্তিকে 'ইলাহ' বলে। মানুষের সকল প্রয়োজন যিনি পূরণ করেন, সমাজ, পরিবার, দেশ পরিচালনার জন্য যিনি আইন দান করেন এবং যার আইনই একমাত্র চলতে পারে তিনিই হলেন 'ইলাহ্'। যে কোনো প্রয়োজনে মানুষ যাঁর মুখাপেক্ষী হয়, যিনি মানুষকে সাহায্য করবেন এবং মানুষ যাঁর কাছে সাহায্য চাইবে তিনিই 'ইলাহ্'। সুতরাং সমাজের কায়েমী স্বার্থবাদী শক্তি, শোষক-শাসক যখন বুঝেছে, নবীর এ কথা গ্রহণ করলে নিজের কর্তৃত্ব বলতে আর কিছুই থাকবে না, সকল কর্তৃত্ব আল্লাহ তা'য়ালার জন্য ত্যাগ করতে হবে, তখনই তারা নবীর সাথে তথা ইসলামী আন্দোলনের প্রতি শত্রুতা করেছে এবং বর্তমানেও করছে- আগামীতেও করবে।
ইতিহাস কথা বলে, প্রত্যেক নবীর সাথেই তৎকালিন সমাজের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব ও দেশের শাসক শ্রেণীর সাথে 'ইলাহ' সম্পর্কে বিতর্ক হয়েছে। পবিত্র কুরআন বিবৃত এ সকল কাহিনী অন্য কোনো পৃথিবীর নয় বরং যে পৃথিবীতে মানুষ বাস করছে, মানুষের সাথে যে পৃথিবী সম্পর্কিত সেই পৃথিবীরই ঘটনা এবং এ সকল ঘটনা মানুষের সাথে সম্পর্কিত। নবী-রাসূল যে দেশে এবং জাতির মধ্যে আগমন করেছেন তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক তথা নানা ধরণের সমস্যা ছিল। এসব উপস্থিত সমস্যা সমাধানেরও প্রয়োজন ছিল। কিন্তু নবী-রাসূলগণ এ ধরনের সাময়িক ও স্থানীয় সমস্যাকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র একটি সমস্যা সামনে রেখেছেন এবং সে সমস্যা 'ইলাহ্' কেন্দ্রিক।
তাঁরা অন্য কোন সমস্যা জাতির সামনে তুলে না ধরে প্রধান সমস্যা অর্থাৎ কৃত্রিম 'ইলাহ্'-সমূহের দাসত্ব ত্যাগ করে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে 'ইলাহ' হিসাবে স্বীকৃতি দিতে বলেছেন। নবী করীম (সা:) প্রথমে এভাবে আহ্বান জানিয়েছিলেন, 'হে মানুষ! বলো আল্লাহ ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো ইলাহ্ নেই। তাহলে তোমরা কল্যাণ লাভ করবে'।
সুতরাং এ থেকে স্পষ্ট অনুধাবন করা যায় পৃথিবীতে সমস্যার সৃষ্টি তখনই হয়, যখন মানুষ একমাত্র আল্লাহকে রব ও ইলাহ্ হিসেবে মানে না। এর পরিবর্তে নিজেকে, সমাজপতি, প্রচলিত প্রথা, নিজ পরিবার, সমাজের আইন, দেশের শাসক, দেশের নানা ধরণের নীতি, দৃষ্টির সামনের সাময়িক স্বার্থ, ধর্মনেতা তথা প্রকৃত রব ব্যতীত অন্য কোনো কিছুকে নিজের মাবুদ বা ইলাহ তথা রব হিসেবে প্রাধান্য দিয়েছে, তখনই দেশে, সমাজে, ব্যক্তি জীবনে, রাষ্ট্র জীবনে নানা ধরণের সমস্যার আবির্ভাব ঘটেছে। এ কারণে নবী-রাসূল ও তাদের অনুসারী ইসলামী নেতৃত্ব দেশের, সমাজের সকল সমস্যা উপেক্ষা করে প্রধান সমস্যার দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
নবী-রাসূলগণ জানতেন সকল সমস্যার স্রষ্টা হলো মাত্র একটি। সুতরাং এই সমস্যার সমাধান হলে অন্য সমস্যাসমূহ এমনিতেই বিলীন হবে। এই সমস্যার সমাধানের ওপর জীবনের অন্যান্য যাবতীয় সমস্যার সমাধান নির্ভরশীল। এ কারণে তাঁরা তাদের সমগ্র জীবন এই সমস্যা সমাধানের জন্যই ব্যয় করেছেন। হযরত ঈসা (আ:) যখন বনী ইসরাঈলদের কাছে আগমন করেছিলেন তখন তিনি তাদেরকে বলেছিলেন-
وَلأُحِلَّ لَكُم بَعْضَ الَّذِى حُرِّمَ عَلَيْكُمْ وَجِئْتُكُم بِآيَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ قَفَ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوْنِ إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ طَ هَذَا صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٌ
তোমাদের ওপর হারাম করে রাখা হয়েছে এমন কতিপয় জিনিসও আমি তোমাদের জন্যে হালাল করে দেবো এবং তোমাদের মালিকের পক্ষ থেকে (এই) নিদর্শন নিয়েই এসেছি, অতএব তোমরা আল্লাহ তা'য়ালাকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'য়ালা আমার এবং তোমাদেরও মালিক, অতএব তোমরা তাঁর দাসত্ব করো আর এটাই হলো একমাত্র সহজ সরল পথ। (সূরা ইমরাণ-৫০-৫১)
হযরত ঈসা (আ:) তাঁর জাতিকে কোন্ কথার দিকে আহ্বান জানিয়েছেন মহান আল্লাহ নবী করীম (সা) কে ওহীর মাধ্যমে শুনিয়ে দিয়েছেন। তিনিও মানুষকে একমাত্র মহান আল্লাহ তা'য়ালাকেই রব হিসেবে গ্রহণ করতে বলেছেন। মহান আল্লাহর উলুহিয়াত এবং রবুবিয়াতই হলো প্রধান বিষয়। মানুষ মুখে আল্লাহকে স্বীকৃতি দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত, নামাজ-রোজা ও হজ্জ আদায় করছে, কিন্তু সে ব্যক্তি মানুষের বানানো আদর্শ অনুসারে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করার জন্য চেষ্টা করছে। সে এমন রাজনীতি করছে, যে রাজনীতি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। এর পরিষ্কার অর্থ হলো তারা আল্লাহকে স্রষ্টা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজী, আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন এই কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হিসেবে সে নামাজ-রোজা ও হজ্জ আদায় করছে। কিন্তু সে আল্লাহর রবুবিয়াত এবং উলুহিয়াত গ্রহণ করতে রাজী নয়। আল্লাহকে সে আইন ও বিধান দাতা হিসেবে গ্রহণ করতে রাজী নয়। Law Giver হিসেবে সে পৃথিবীর এক শ্রেণীর দার্শনিককে গ্রহণ করছে। এই ধরণের ব্যক্তিদের জন্য নিজেকে আল্লাহর গোলাম হিসেবে দাবী করার অবকাশ আল্লাহর বিধানে উপস্থিত নেই।
পবিত্র কোরআনের উল্লেখিত আয়াত থেকে আমাদের সামনে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, পৃথিবীর অন্যান্য নবী-রাসূলের মতই হযরত ঈসা (আ:) এর দাওয়াতের মূল বিষয় ছিল তিনটি। তিনিও এই তিনটি বিষয়ের দিকে তাঁর জাতিকে আহ্বান করেছেন। তাঁর আহ্বানের প্রথম কথা ছিল, সকল ক্ষমতার মালিক মহান আল্লাহ। অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব Sovereignty, Supreme Authority, Supreme Power যা একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট। এ কারণে দাসত্ব তাঁরই জন্য নিবেদিত। তাঁরই দাসত্ব করতে হবে। তাঁর আনুগত্যের ভিত্তিতে পৃথিবীতে মানব জীবনের সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হবে। মানুষের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, সভ্যতা সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপিত হবে এই কথাটির ওপরে।
তাঁর আহ্বানের দ্বিতীয় কথা ছিল, সার্বভৌম Sovereignty ক্ষমতাসম্পন্ন অধিপতির Viceroy প্রতিনিধি হিসেবে আমার আদেশ মেনে চলতে হবে, আমার আনুগত্য করতে হবে। আমাকেই একমাত্র নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
হযরত ঈসা (আ:) এর আহ্বানের তৃতীয় কথা ছিল, পৃথিবীতে মানব জীবনের বৈধ ও অবৈধের সীমারেখা মহান আল্লাহর আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট হবে। অর্থাৎ কোনটি হালাল ও হারাম তা আল্লাহর বিধান জানিয়ে দিবে। আল্লাহ তা'য়ালার আইনের মোকাবেলায় পৃথিবীর অন্যান্য সকল আইন বাতিল বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ Law Giver হলেন একমাত্র মহান আল্লাহ। কোন্ কাজ মানুষের করণীয় এবং বর্জনীয় এ নির্দেশ দেয়ার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর।
এক শ্রেণীর তথাকথিত চিন্তাবিদ মনে করেন, প্রত্যেক নবী-রাসূলের আগমনের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন ভিন্ন। তাঁরা সবাই একই উদ্দেশ্যে আগমন করেননি। যারা এ কথা বলেন, হয় তাদের কুরআন বুঝার ক্ষমতা নেই অথবা তারা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এ কথা বলে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে সকল নবীর আহ্বান ছিল এক ও অভিন্ন। গোটা সৃষ্টি জগতের সকল ক্ষমতার অধিকারী যিনি সেই Supreme authority-এর কাছ থেকে নিয়োগ পত্র নিয়ে যিনিই তাঁর প্রজাদের কাছে আগমন করবেন, তাঁর আগমনের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে যে, তিনি প্রজাদেরকে বিদ্রোহ করা এবং স্বায়ত্ব শাসন পরিচালনা হতেও বিরত রাখবেন।
আল্লাহর আইনের মোকাবেলায় অন্যদের আইন বাতিল বলে ঘোষণা দিয়ে এ আইন গ্রহণ করলে কি পুরস্কার লাভ করা যাবে এ সম্পর্কে তিনি সুসংবাদ দিবেন। আর যারা আল্লাহর আইন গ্রহণ করবে না, তাদেরকে তিনি ভয়ংকর শাস্তির কথা শোনাবেন। মহান আল্লাহ বলেন-
رُّسُلاً مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِيْنَ لِئَلَّا يَكُوْنَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ طَ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا -
রাসূলরা (ছিলো জান্নাতের) সুসংবাদবাহী ও (জাহান্নামের) ভয় প্রদর্শনকারী, (তাদের এ জন্যেই পাঠানো হয়েছিলো) যাতে করে রাসূলদের আগমনের পর আল্লাহ তা'য়ালার ওপর মানব জাতির কোনো অজুহাত খাড়া করার সুযোগ না থাকে; (সত্যিই) আল্লাহ তা'য়ালা মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। (সূরা নিসা-১৬৫)
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি কি উদ্দেশ্যে তাঁর নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। মানুষের সামনে যেন তাঁরা আল্লাহ তা'য়ালার বিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন। আল্লাহর দাসত্ব কেনো করতে তা তাঁরা যুক্তি প্রমাণ দিয়ে মানুষকে বুঝিয়ে দিবেন। কেননা, আল্লাহ তা'য়ালার আদালতে এ সকল মানুষ যখন উপস্থিত হবে তখন তাঁরা যেন এ কথা বলতে না পারে, আমাদের কাছে এমন কোনো ব্যক্তি আসেনি বা আমাদের কাছে এমন কোনো মাধ্যম ছিল না যার মাধ্যমে আমরা আপনার বিধান সম্পর্কে জানতে পারতাম। আমরা আপনার বিধান সম্পর্কে জানতে পারলে অবশ্যই আপনার আইন অনুসরণ করতাম।
এসব অজুহাত যেন মানুষ আল্লাহ তা'য়ালার সামনে তুলতে না পারে, এ কারণেই মহান আল্লাহ প্রতিটি জনপদে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। নবী-রাসূলগণ মহাসত্যের আহ্বায়ক, সেই সাথে তাঁরা মানুষের আনুগত্য লাভের অধিকারী। তাদের আনুগত্য করা অবশ্য কর্তব্য। মহান আল্লাহ বলেন-
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَّسُوْلٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ ط
আমি যখনই কোনো (জনপদে) কোনো রাসূল পাঠিয়েছি, তাঁকে এ জন্যেই পাঠিয়েছি যে, আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী (সেখানে) তাঁর (শর্তহীন) আনুগত্য করা হবে। (সূরা নিসা-৬৪)
নবী-রাসূল পৃথিবীতে আগমন করবেন এবং মানুষ তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে-এতেই মানুষের দায়িত্ব শেষ হয় না। নবীকে বিশ্বাস করবে সেই সাথে মানুষ অন্য কারো আইন মেনে চলবে বা নিজের ইচ্ছামত জীবন যাপন করবে, এটা সম্ভব নয়। এ উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ নবী-রাসূল প্রেরণ করেননি। বরং নবী-রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্যই হলো জীবন যাপনের জন্য যে বিধান তিনি নিয়ে আসেন, পৃথিবীর সকল বিধান বর্জন করে কেবলমাত্র সেই বিধান অনুসারেই জীবন যাপন করতে হবে। আর এটাই হলো নবী-রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের প্রকৃত অর্থ।
নবী-রাসূল ও তাঁর অনুসারীদের আরো একটি দায়িত্ব হলো, তাঁরা আল্লাহর দেয়া জীবন বিধান পৃথিবীর সকল বিধানের ওপরে বিজয়ী করবেন। অর্থাৎ পৃথিবীর সকল আদর্শ, মতবাদ, মতাদর্শ, আইন-কানুনের মোকাবেলায় ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করবেন। আল্লাহর দেয়া আদর্শ রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রয়োগ করে দেশ বা পৃথিবী শাসন করবে। মহান আল্লাহ বলেন-
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُوْلَهُ بِالْهُدى وَدِيْنِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُوْنَ
তিনিই (মহান আল্লাহ), যিনি তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট হিদায়াত ও সঠিক জীবন বিধান সহকারে তাঁর রাসূলকে পাঠিয়েছেন, যেন সে এই জীবন ব্যবস্থাকে (দুনিয়ার) সব কয়টি বিধানের ওপর বিজয়ী করে দিতে পারে, মুশরিকরা এ বিজয়কে যতো দুঃসহই মনে করুক না কেনো। (সূরা আত্ তাওবা-৩৩)
আরবী দ্বীন শব্দ সম্পর্কে সীরাতে সরওয়ারে আলমে বর্ণনা করা হয়েছে, 'দ্বীন শব্দটিকে আরবী ভাষায় এমন জীবন ব্যবস্থা বা জীবন পদ্ধতির প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে যার প্রতিষ্ঠাকারীকে সনদ ও অনুসরণযোগ্য বলে মেনে নিয়ে তার আনুগত্য করতে হয়'।
পৃথিবীর সকল বিধান থাকবে আল্লাহর বিধানের অধীনে। আল্লাহর আইন প্রচলিত কোনো বিধানের অধীনে থাকবে এ উদ্দেশ্যে আল্লাহর বিধান পৃথিবীতে আগমন করেনি। অন্য কোন বিধানের অধীনে আল্লাহর আইন সামান্য সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে অবস্থান করবে, এ উদ্দেশ্যেও আল্লাহর বিধান আগমন করেনি। পৃথিবীর সকল ধরনের মতবাদ মতাদর্শ আল্লাহ তা'য়ালার আইনের অনুগ্রহ কুড়িয়ে টিকে থাকার হলে টিকে থাকবে আর না হয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কেননা আল্লাহ তা'য়ালার আইন যিনি নিয়ে আসেন, তিনি পৃথিবী ও আকাশের বাদশাহ তথা অদ্বিতীয় ক্ষমতাশালীর প্রতিনিধি হিসেবে আগমন করেন। নবী-রাসূল নিজের বাদশাহ মহান আল্লাহর বিধানকে বিজয়ী হিসেবে দেখতে চান। আল্লাহর বিধানের মোকাবেলায় পৃথিবীতে অন্য কোনো বিধান মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, এমন ধরনের কোনো বিধানের অস্তিত্ব পৃথিবীতে থাকবে না। নবী-রাসূলের আহ্বানের এটাই হলো মূল কথা।
📄 নবী-রাসূলের আগমনের উদ্দেশ্য বৈপ্লবিক পরিবর্তন
পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী, মানুষ যখনই মহান আল্লাহর বিধানের মুকাবিলায় ভিন্ন বিধানকে প্রাধান্য দিয়েছে, তখনই নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। স্রষ্টার হিদায়াত ও পথনির্দেশ অমান্য করে ভিন্ন বিধানের ভিত্তিতে নিজেদের সার্বিক জীবন ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত করেছে তখনই প্রকৃত বিপর্যয় এবং অশান্তি অনাচার দেখা দিয়েছে। অত্যাচার, শোষণ, জুলুম, প্রতারণা ও বঞ্চনার কারণে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষের আর্তনাদ মহান আল্লাহর রহমতের দরিয়ায় তরঙ্গ সৃষ্টি করেছে। আল্লাহ তা'য়ালা মানুষকে এ অবস্থা থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে নবী-রাসূল প্রেরণ করার ফলে তাঁরা সার্বিক ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করেছেন। পূর্ব প্রতিষ্ঠিত জুলুমমূলক ব্যবস্থা উৎখাত করে মহান আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করে সার্বিক বিপর্যয় রোধ করেছেন।
নবী-রাসূল পৃথিবীর কোনো নেতার নেতৃত্ব গ্রহণ করার জন্য বা কোনো শাসকের অধীনে অবস্থান করার জন্য আগমন করেন না এবং এ অবস্থা তাঁর নবুয়্যাত ও রিসালাতের মর্যাদার পরিপন্থী। তাঁরা আগমন করেন মানুষের শাসক হিসেবে। সকল শ্রেণীর মানুষ নবীর আনুগত্য করে তাঁর নির্দেশ অনুসারে সমাজ ও দেশ পরিচালনা করবে, এই উদ্দেশ্যেই তাঁরা আগমন করেন। পৃথিবীর মানুষ বিশৃংখলা ও বিপর্যয় সৃষ্টি করবে, ফলশ্রুতিতে দেখা দিবে ভাঙ্গন ও ধ্বংস। এ অবস্থায় মানুষ যেনো এ অজুহাত দেখাতে না পারে যে, এ সকল কর্মকাণ্ড করলে যে শাস্তি নেমে আসবে এ কথা আমরা জানতাম না। যদি জানতাম তাহলে এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতাম। মহান আল্লাহ বলেন-
وَلَوْلَا أَنْ تُصِيبَهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ فَيَقُولُوا رَبَّنَا لَوْلَا أَرْسَلْتَ إِلَيْنَا رَسُوْلاً فَتَتَّبِعَ آيَاتِكَ وَتَكُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
এমন যেনো না হয়, ওদের কৃতকর্মের জন্যে ওদের ওপর কোনো বিপর্যয় এসে পড়বে এবং (তখন) তারা বলবে, হে আমাদের মালিক, তুমি আমাদের কাছে কোনো রাসূল পাঠালে না কেনো? তাহলে আমরা তোমার আয়াতসমূহের অনুবর্তন করতাম এবং আমরা (সবাই) ঈমানদারও হয়ে যেতাম! (সূরা কাসাস-৪৭)
কোনো জনপদের অধিবাসীর কাছে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর বিধান অবিকৃত ছিলো এবং তা মানুষের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যমও বর্তমান ছিলো ততক্ষণ সে জাতির জন্য নবীর প্রয়োজন হয়নি। উক্ত বিধান যখন বিকৃত হয়েছে তখনই হিদায়াতকারীর প্রয়োজন হয়েছে এবং মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে হিদায়াতকারী প্রেরণ করেছেন। তাঁরা মানুষকে সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য দেখিয়ে দিয়েছেন। বর্তমান পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে এবং সমগ্র বিশ্বে তা প্রচারিত হচ্ছে, এ অবস্থায় পৃথিবীর কোনো মানব সম্প্রদায়ের পক্ষে এ অজুহাত প্রদর্শন করা সম্ভব নয় যে, 'প্রকৃত সত্য আমাদের জানা ছিল না, মুক্তির সঠিক পথ কোনটি আমরা জানতাম না বলেই ভ্রান্ত পথে চলেছি, আল্লাহর দাসত্বের সঠিক মাধ্যম ও পদ্ধতি আমরা জানতাম না। এ কারণে আমরা আমাদেরই অনুরূপ আরেক মানুষের কাছ থেকে সকল সমস্যার সমাধান গ্রহণ করেছি'। বর্তমানে মানুষের পক্ষে এই অজুহাত পেশ করার সুযোগ নেই কিয়ামত পর্যন্তও থাকবে না। কারণ, কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর বিধান ইনশাআল্লাহ অবিকৃত থাকবে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সৃষ্টির শুরুতেই মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা দান করেছিলেন। মানুষ এর ভেতরে হীন স্বার্থের কারণে পরিবর্তন পরিবর্ধন করে নানা ধরনের মত-পথ আবিষ্কার করেছে। মহান আল্লাহ বলেন-
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللهِ الإِسْلاَمُ قف وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ إِلَّا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيَامٍ بَيْنَهُمْ طَ وَمَنْ يَكْفُرْ بِآيَاتِ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ
নিঃসন্দেহে (মানুষের) জীবন বিধান হিসেবে আল্লাহ তা'য়ালার কাছে ইসলামই একমাত্র (গ্রহণযোগ্য) ব্যবস্থা। যাদের আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাব দেয়া হয়েছিলো, তারা (এ জীবন বিধান থেকে বিচ্যুত হয়ে) নিজেরা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ ও হিংসার বশবর্তী হয়ে (বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে) মতানৈক্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলো, (তাও আবার) তাদের কাছে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) সঠিক জ্ঞান আসার পর; যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান অস্বীকার করবে (তার জানা উচিত), অবশ্যই আল্লাহ তা'য়ালা দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। (সূরা আলে ইমরান-১৯)
সমগ্র পৃথিবীতে নবী-রাসূল যেখানে যে ভাষায় আগমন করেছেন এবং তাঁদের প্রতি যে ভাষায় কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছিল, তা ছিল ইসলাম। তাদের সকল শিক্ষাই ছিল নবী করীম (সা:) এর শিক্ষার অনুরূপ ইসলামী শিক্ষা। এই ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকে বিকৃত করে এর মধ্যে পরিবর্তন পরিবর্ধন করে মানব গোষ্ঠীর ভেতরে যে বিভিন্ন ধর্মমতের প্রসার ঘটানো হয়েছে, এর আসল কারণ এটাই ছিল যে, মানুষ তাদের বৈধ অধিকারের সীমারেখা লংঘন করে পার্থিব স্বার্থ সংক্রান্ত কিছু অবৈধ সুযোগ সুবিধা কামনা করছিল। এ কারণে তারা ইসলামী শিক্ষায় বিশ্বাস ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন সাধন করেছিল। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন-
وَتَقَطَّعُوا أَمْرَهُم بَيْنَهُمْ طَ كُلَّ إِلَيْنَا رَاجِعُونَ
(কিন্তু পরবর্তী সময়ে) তারা নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ করে নিজেদের (দ্বীনের) বিষয় টুকরো টুকরো করে ফেললো (অথচ এদের সবার জানা উচিত, এরা আজ যতো মতবিরোধই করুক না কেনো), সর্বশেষে সবাইকে (এক হয়ে) আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে। (সূরা আম্বিয়া-৯৩)
পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী, মানুষ যখনই মহান আল্লাহর বিধানের মুকাবিলায় ভিন্ন বিধানকে প্রাধান্য দিয়েছে, তখনই নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। স্রষ্টার হিদায়াত ও পথনির্দেশ অমান্য করে ভিন্ন বিধানের ভিত্তিতে নিজেদের সার্বিক জীবন ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত করেছে তখনই প্রকৃত বিপর্যয় এবং অশান্তি অনাচার দেখা দিয়েছে। অত্যাচার, শোষণ, জুলুম, প্রতারণা ও বঞ্চনার কারণে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষের আর্তনাদ মহান আল্লাহর রহমতের দরিয়ায় তরঙ্গ সৃষ্টি করেছে। আল্লাহ তা'য়ালা মানুষকে এ অবস্থা থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে নবী-রাসূল প্রেরণ করার ফলে তাঁরা সার্বিক ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করেছেন। পূর্ব প্রতিষ্ঠিত জুলুমমূলক ব্যবস্থা উৎখাত করে মহান আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করে সার্বিক বিপর্যয় রোধ করেছেন।
নবী-রাসূল পৃথিবীর কোনো নেতার নেতৃত্ব গ্রহণ করার জন্য বা কোনো শাসকের অধীনে অবস্থান করার জন্য আগমন করেন না এবং এ অবস্থা তাঁর নবুয়্যাত ও রিসালাতের মর্যাদার পরিপন্থী। তাঁরা আগমন করেন মানুষের শাসক হিসেবে। সকল শ্রেণীর মানুষ নবীর আনুগত্য করে তাঁর নির্দেশ অনুসারে সমাজ ও দেশ পরিচালনা করবে, এই উদ্দেশ্যেই তাঁরা আগমন করেন। পৃথিবীর মানুষ বিশৃংখলা ও বিপর্যয় সৃষ্টি করবে, ফলশ্রুতিতে দেখা দিবে ভাঙ্গন ও ধ্বংস। এ অবস্থায় মানুষ যেনো এ অজুহাত দেখাতে না পারে যে, এ সকল কর্মকাণ্ড করলে যে শাস্তি নেমে আসবে এ কথা আমরা জানতাম না। যদি জানতাম তাহলে এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতাম। মহান আল্লাহ বলেন-
وَلَوْلَا أَنْ تُصِيبَهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ فَيَقُولُوا رَبَّنَا لَوْلَا أَرْسَلْتَ إِلَيْنَا رَسُوْلاً فَتَتَّبِعَ آيَاتِكَ وَتَكُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
এমন যেনো না হয়, ওদের কৃতকর্মের জন্যে ওদের ওপর কোনো বিপর্যয় এসে পড়বে এবং (তখন) তারা বলবে, হে আমাদের মালিক, তুমি আমাদের কাছে কোনো রাসূল পাঠালে না কেনো? তাহলে আমরা তোমার আয়াতসমূহের অনুবর্তন করতাম এবং আমরা (সবাই) ঈমানদারও হয়ে যেতাম! (সূরা কাসাস-৪৭)
কোনো জনপদের অধিবাসীর কাছে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর বিধান অবিকৃত ছিলো এবং তা মানুষের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যমও বর্তমান ছিলো ততক্ষণ সে জাতির জন্য নবীর প্রয়োজন হয়নি। উক্ত বিধান যখন বিকৃত হয়েছে তখনই হিদায়াতকারীর প্রয়োজন হয়েছে এবং মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে হিদায়াতকারী প্রেরণ করেছেন। তাঁরা মানুষকে সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য দেখিয়ে দিয়েছেন। বর্তমান পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে এবং সমগ্র বিশ্বে তা প্রচারিত হচ্ছে, এ অবস্থায় পৃথিবীর কোনো মানব সম্প্রদায়ের পক্ষে এ অজুহাত প্রদর্শন করা সম্ভব নয় যে, 'প্রকৃত সত্য আমাদের জানা ছিল না, মুক্তির সঠিক পথ কোনটি আমরা জানতাম না বলেই ভ্রান্ত পথে চলেছি, আল্লাহর দাসত্বের সঠিক মাধ্যম ও পদ্ধতি আমরা জানতাম না। এ কারণে আমরা আমাদেরই অনুরূপ আরেক মানুষের কাছ থেকে সকল সমস্যার সমাধান গ্রহণ করেছি'। বর্তমানে মানুষের পক্ষে এই অজুহাত পেশ করার সুযোগ নেই কিয়ামত পর্যন্তও থাকবে না। কারণ, কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর বিধান ইনশাআল্লাহ অবিকৃত থাকবে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সৃষ্টির শুরুতেই মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা দান করেছিলেন। মানুষ এর ভেতরে হীন স্বার্থের কারণে পরিবর্তন পরিবর্ধন করে নানা ধরনের মত-পথ আবিষ্কার করেছে। মহান আল্লাহ বলেন-
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللهِ الإِسْلاَمُ قف وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ إِلَّا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيَامٍ بَيْنَهُمْ طَ وَمَنْ يَكْفُرْ بِآيَاتِ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ
নিঃসন্দেহে (মানুষের) জীবন বিধান হিসেবে আল্লাহ তা'য়ালার কাছে ইসলামই একমাত্র (গ্রহণযোগ্য) ব্যবস্থা। যাদের আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাব দেয়া হয়েছিলো, তারা (এ জীবন বিধান থেকে বিচ্যুত হয়ে) নিজেরা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ ও হিংসার বশবর্তী হয়ে (বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে) মতানৈক্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলো, (তাও আবার) তাদের কাছে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) সঠিক জ্ঞান আসার পর; যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান অস্বীকার করবে (তার জানা উচিত), অবশ্যই আল্লাহ তা'য়ালা দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। (সূরা আলে ইমরান-১৯)
সমগ্র পৃথিবীতে নবী-রাসূল যেখানে যে ভাষায় আগমন করেছেন এবং তাঁদের প্রতি যে ভাষায় কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছিল, তা ছিল ইসলাম। তাদের সকল শিক্ষাই ছিল নবী করীম (সা:) এর শিক্ষার অনুরূপ ইসলামী শিক্ষা। এই ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকে বিকৃত করে এর মধ্যে পরিবর্তন পরিবর্ধন করে মানব গোষ্ঠীর ভেতরে যে বিভিন্ন ধর্মমতের প্রসার ঘটানো হয়েছে, এর আসল কারণ এটাই ছিল যে, মানুষ তাদের বৈধ অধিকারের সীমারেখা লংঘন করে পার্থিব স্বার্থ সংক্রান্ত কিছু অবৈধ সুযোগ সুবিধা কামনা করছিল। এ কারণে তারা ইসলামী শিক্ষায় বিশ্বাস ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন সাধন করেছিল। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন-
وَتَقَطَّعُوا أَمْرَهُم بَيْنَهُمْ طَ كُلَّ إِلَيْنَا رَاجِعُونَ
(কিন্তু পরবর্তী সময়ে) তারা নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ করে নিজেদের (দ্বীনের) বিষয় টুকরো টুকরো করে ফেললো (অথচ এদের সবার জানা উচিত, এরা আজ যতো মতবিরোধই করুক না কেনো), সর্বশেষে সবাইকে (এক হয়ে) আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে। (সূরা আম্বিয়া-৯৩)