📄 নবুয়্যাত সম্পর্কিত জ্ঞান
মহান আল্লাহ তা'য়ালা পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং এ মানুষকে দিয়েই মানুষের বংশধারা বৃদ্ধি করছেন। আল্লাহ তা'য়ালা যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করছেন আবার যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করছেন। কাউকে আবার তিনি বন্ধ্যা বানিয়েছেন। আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন-
ط لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ط يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ طَ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ لَا أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا جِ وَيَجْعَلُ مَنْ يَّشَاءُ عَقِيمًا إِنَّهُ عَلِيمٌ قَدِيرٌ -
আকাশমন্ডলী ও যমীনের (সমুদয়) সার্বভৌমত্ব (একমাত্র) আল্লাহ তা'য়ালার জন্যে; তিনি যা ইচ্ছা তাই সৃষ্টি করেন; যাকে চান তাকে কন্যা সন্তান দান করেন, আবার যাকে চান তাকে পুত্র সন্তান দান করেন, যাকে চান পুত্র কন্যা (উভয়টাই) দান করেন, (আবার) যাকে চান তাকে তিনি বন্ধ্যা করে দেন; নিঃসন্দেহে তিনি বেশি জানেন, ক্ষমতাও তিনি বেশি রাখেন। (সূরা আশ শূরা-৪৯-৫০)
এই মানুষকে মহান আল্লাহ তা'য়ালা পৃথিবীতে এমন এক অবস্থায় নিয়ে আসেন যখন সে মানুষের কোনো চেতনাই থাকে না। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
وَاللَّهُ أَخْرَجَكُم مِّن بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا لَا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَا لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
আল্লাহ তা'য়ালা তোমাদের মায়ের পেট থেকে (এমন এক অবস্থায়) বের করে এনেছেন যে, তোমরা (তার) কিছুই জানতে না, অতপর তিনি তোমাদের কান, চোখ ও হৃদয় দিয়েছেন, যাতে করে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো। (সূরা আন নাহল-৭৮)
আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, মানুষকে আমি এমন এক অবস্থায় তার মায়ের গর্ভ থেকে এই পৃথিবীতে নিয়ে এসেছি, যে সময় তার কোনো চেতনাই ছিল না। পেটের ক্ষুধায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হলেও তার বলার ক্ষমতা ছিল না যে, তার ক্ষুধা পেয়েছে। সেই সাথে তাকে আমি তিনটি জিনিস দান করেছি। তাকে শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি দান করেছি এবং চিন্তা করার মত মগজ দিয়েছি। তার শরীরের ত্বকের ভেতরে স্পর্শ অনুভূতি দান করেছি। নাক দান করেছি ঘ্রাণ গ্রহণ করার জন্য। এভাবে তাকে আমি সুন্দর করে সাজিয়েছি। তার যা যেখানে প্রয়োজন আমি দান করেছি। তার মাতা-পিতা এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের ভেতরে তার জন্য অসীম মায়া-মমতা সৃষ্টি করেছি। সে পৃথিবীতে চোখ খুলেই দেখতে পায়, এই পৃথিবীর সকলকিছুই তাকে প্রতিপালন করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। সৃষ্টির সকল কিছুই তার সেবায় নিয়োজিত করেছি। মানুষের জন্য যে যোগ্যতা প্রয়োজন আমি তা দান করেছি। মানুষের ভেতরে ভারসাম্য রক্ষার জন্য কোনো কোনো যোগ্যতা কারো মধ্যে বেশি দান করেছি। আবার তা কারো মধ্যে কম দান করেছি। এভাবে ভারসাম্য রক্ষা না করলে কেউ কারো মুখাপেক্ষী হতো না। একজন মানুষ আরেকজনের পরোয়া করতো না এবং মানুষের যোগ্যতার কোনো মূল্যায়ন হতো না।
যে জিনিসের প্রয়োজন যতবেশি মহান আল্লাহ তা'য়ালা তা অধিক পরিমাণে সৃষ্টি করেছেন। এই পৃথিবীর জন্য কর্মীর প্রয়োজন অধিক, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তা অধিক পরিমাণে সৃষ্টি করেছেন। বড় বড় বিজ্ঞানী, সেনাপতি, তাত্ত্বিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষের প্রয়োজন কম, সুতরাং আল্লাহ তা কম পরিমাণেই সৃষ্টি করেছেন। এ জাতিয় মানুষের সংখ্যা তিনি ঘরে ঘরে সৃষ্টি করেননি। কারণ এই ধরণের মানুষের অবদান এই পৃথিবীতে শতাব্দীর পরে শতাব্দী পর্যন্ত চলতে থাকে। সুতরাং এ ধরণের দুর্লভ যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ পৃথিবীর জন্য যে কয়জন প্রয়োজন মহান আল্লাহ তাই সৃষ্টি করেছেন। তাদের একজনের যে অবদান শতকোটি মানুষ ঐ একজন মানুষের চিন্তাধারা দ্বারাই উপকৃত হতে থাকে। আবার এ মানুষকে মহান আল্লাহ তা'য়ালা কোন্ স্তরে পৌঁছে দেন তা দেখুন-
وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ ثُمَّ يَتَوَفَّاكُمْ قِف وَمِنْكُم مَّن يُرَدُّ إِلَى أَرْذَلِ الْعُمُرِ لِكَيْ لَا يَعْلَمَ بَعْدَ عِلْمٍ شَيْئًا طَ إِنَّ اللَّهَ عَلِيْمٌ قَدِيرٌ -
আল্লাহ তা'য়ালাই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, অতপর তিনিই তোমাদের মৃত্যু দিবেন। তোমাদের কোনো ব্যক্তি (এমনও হবে যে, সে) বৃদ্ধ বয়সের দুর্বলতম স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, এতে করে (কৈশোরের এবং যৌবনে কোনো বিষয়ে) জানার পর সে (পুনরায়) অজ্ঞ হয়ে যাবে, আল্লাহ তা'য়ালা অবশ্যই সর্বজ্ঞ, (তিনিই) সর্বশক্তিমান। (সূরা আন্ নাহল-৭০)
এটাই হলো মানুষের প্রকৃত অবস্থা। অথচ এই মানুষকেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নানা ধরনের বিদ্যায় পারদর্শী করে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের জন্য প্রকৌশলী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, স্থপতি, শাসক, শিল্পী, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, সেনাপতি, শিক্ষাবিদ, সমরবিদ, নানা ধরনের বিশেষজ্ঞ, সাহিত্যিক তথা যে ধরনের গুণাবলীসম্পন্ন ও যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষের প্রয়োজন মহান আল্লাহ তা'য়ালা তা মানব জাতিকে দান করেছেন।
কিন্তু এসবের তুলনায় মানুষের যেটা বড় প্রয়োজন, তাহলো মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তির জন্ম হতে হবে যিনি মানুষকে মহান আল্লাহর পথ প্রদর্শন করবেন। পৃথিবীর যে কোনো ধরণের বা যে কোনো যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষকে তাদের যোগ্যতা যেন আল্লাহ তা'য়ালার দেখানো বা তাঁর পছন্দ অনুযায়ী পথে প্রকাশ হয়, সে পথ দেখানোর জন্য ব্যক্তির প্রয়োজন। পৃথিবীর খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞদের কাজ হলো তারা পৃথিবীর ভেতরে কি কি বস্তু আছে এবং কোনটির গুণাবলী, উপকারিতা কি এবং কোনটি কিভাবে ব্যবহার করতে হয়, ব্যবহারে লাভ ক্ষতি কি ইত্যাদী বিষয় সম্পর্কে পৃথিবীর মানুষকে অবগত করা।
কিন্তু সেই সাথে পৃথিবীর মানুষের জন্য এমন এক ব্যক্তির প্রয়োজন, যিনি এই মানব জাতিকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিবেন, এই পৃথিবীতে মানুষের আগমনের উদ্দেশ্য কি। কেনো তাকে অন্য সৃষ্টি হতে পৃথক করে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছে। মানুষকে কোন্ শক্তির দাসত্ব করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষ কার আইন-কানুন মেনে চলবে। যিনি পৃথিবীতে মানুষকে এত কিছু দান করেছেন, সেই দানকারীর ইচ্ছা কি। তিনি মানুষের কাছে কি চান। মানুষের জীবনের প্রকৃত সাফল্য কোন্ পথে আসতে পারে। ইত্যাদী বিষয় সম্পর্কে মানুষকে অবগত করবেন এমন ধরণের একজন ব্যক্তির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
মহান আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের এই প্রয়োজন কি পূরণ করেছেন? মানুষের শরীর চুলকানোর জন্য যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের হাতে নখ দান করেছেন, এই নখ দিয়ে মানুষ অসংখ্য প্রয়োজন পূরণ করে, বিভিন্নভাবে উপকৃত হয়। এতটা ক্ষুদ্র বিষয় যিনি উপেক্ষা করেননি, সেই আল্লাহ মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রয়োজনীয় দিক সম্পর্কে কি করে উপেক্ষা করতে পারেন? আল্লাহ তা'য়ালা যেমন প্রতিটি কর্ম এবং জ্ঞানের প্রতিটি শাখার জন্য যোগ্যতা ও গুণাবলীসম্পন্ন মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তেমনি এমন মানুষও তিনি সৃষ্টি করেছিলেন যাদের ভেতরে আল্লাহকে চেনা-জানার সবচেয়ে উন্নত যোগ্যতা বিদ্যমান ছিল। আল্লাহ তা'য়ালা বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদেরকে জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দান করেছিলেন। উন্নত চরিত্রের এবং মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় আইন-কানুন সম্পর্কে জ্ঞান দান করেছিলেন। পৃথিবীর সকল মানুষের শিক্ষক হিসেবে তাদেরকে প্রেরণ করেছিলেন। এই শ্রেণীর মানুষ যারা এসেছিলেন তাঁরাই হলেন নবী-রাসূল।
পৃথিবীতে মানুষ পরিণত বয়সে যে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়েছে, জন্মগতভাবে বা শৈশবকাল থেকেই তাদের মধ্যে ভিন্ন একটি প্রকৃতি পরিলক্ষিত হয়েছে বা হয়। দশটি শিশুর মধ্যে যে শিশুটি পৃথিবী বিখ্যাত কবি হিসেবে বয়সকালে আত্মপ্রকাশ করবে, সেই শিশুটি আর নয়টি শিশুর থেকে ভিন্ন প্রকৃতি ও অভ্যাস নিয়ে বড় হতে থাকে। নবীদের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনি। তাঁরা জন্মগতভাবেই এই পৃথিবীতে ভিন্ন প্রকৃতি ও অভ্যাস নিয়ে আগমন করেন। একজন স্বভাব কবির কবিতা শুনে আমরা অনুভব করতে পারি যে, এই ব্যক্তি কাব্য ক্ষেত্রে বিশেষ যোগ্যতা নিয়ে এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছেন। অন্য মানুষ চেষ্টা করেও তার মতো একছত্র কবিতা লিখতে পারবে না।
সুতরাং কোন্ মানুষ বয়সকালে কি ধরনের যোগ্যতাসম্পন্ন হবে শিশুকাল হতেই তার ভেতরে সে যোগ্যতার স্ফূরণ ঘটতে থাকে। তার চলাফেরা, আচার-আচরণ, ব্যবহার কথাবার্তায় মানুষ অনুমান করতে পারে, আজকের এই শিশু বড় হয়ে একদিন বিখ্যাত একজন হবে। তাদের কার্যাবলীর দ্বারা মানুষ সহজেই তাকে চিনে নেয়। কারণ এ সকল মানুষ তাদের কাজের মাধ্যমে এমন অসাধারণ যোগ্যতার প্রমাণ মানব সমাজে পেশ করেন যে, এ সকল কাজ অন্যদের দ্বারা সংঘটিত হবার সম্ভাবনা নেই।
মহান আল্লাহ যে নবী এবং রাসূল প্রেরণ করেন, তাদের অবস্থাও ঠিক তেমনি। তাদের চিন্তার জগতে এমন সব কথা এবং চিন্তা-চেতনার উদ্ভব হয়, যা অন্য কোনো মানুষের কখনো হয় না। তিনি এমন সব কথা বলেন, অন্য মানুষ সে কথা সম্পর্কে কখনো কল্পনা করেনি। তিনি এমন বিষয় বর্ণনা করেন, যে বিষয় সম্পর্কে পৃথিবীর অন্য মানুষের পক্ষে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তাঁর দৃষ্টি এমন সুক্ষ্ম বিষয়ের ভেতরে সহজেই প্রবেশ করে, যে বিষয় সম্পর্কে বিশেষজ্ঞগণ যুগের পর যুগ ধরে গবেষণা করেও সমাধানে পৌঁছতে পারেননি। সাধারণ মানুষ তাঁর মতো কথা এবং কর্ম করতে ইচ্ছা করলেও পারে না।
নবীর চরিত্র ও প্রকৃতি এতই পবিত্র এবং পরিচ্ছন্ন যে, তিনি প্রতিটি ব্যাপারেই ভদ্রজনোচিত ও সত্যনিষ্ঠ পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তিনি কখনো ভুল কথা বলেন না। দৃষ্টিকটু কোনো কর্ম করেন না। মানুষকে তিনি সব সময় উত্তম কথা ও কর্ম করতে আদেশ দান করেন। তিনি মানুষকে যা করতে আদেশ দান করেন প্রথমে তা নিজে করেন। তিনি মুখে যা বলেন তাঁর কাজের সাথে মিল থাকে। তাঁর কথা ও কাজের মাধ্যমে এ কথা প্রমাণ হয় না যে, তিনি তাঁর ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করবেন।
তিনি অন্যের ভালো করতে গিয়ে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করেন। কিন্তু নিজের কোনো স্বার্থ আদায় করতে গিয়ে অন্যের সামান্য ক্ষতি করেন না। তাঁর সমগ্র জীবন প্রস্তুত হয় সত্যতা, ভদ্রতা, মনের পরিচ্ছন্নতা, উত্তম চিন্তা ও উন্নত পর্যায়ের মানবতার আদর্শে। শতকোটি চোখ দিয়ে অনুসন্ধান করলেও নবীর চরিত্রে সামান্যতম দোষ খুঁজে পাওয়া যাবেচ্ছ না। সুতরাং তিনি যা বলেন, যা করেন মানুষের উচিত তা গ্রহণ করা এবং অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করা। কারণ পৃথিবীর অভিজ্ঞতা, নানা ধরণের পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ, সৃষ্টি জগতের প্রত্যক্ষ নিরীক্ষণের মাধ্যমে নবী এবং রাসূলের প্রতিটি কথা ও কর্ম সত্য বলে প্রমাণিত।
মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য মহান আল্লাহ যাকে দায়িত্ব দান করেছিলেন, আল্লাহর বিধান মানুষের মধ্যে প্রচার করার জন্য আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ হতে যাদেরকে মনোনীত করা হয়েছিলো, তাঁরাই ছিলেন নবী-রাসূল। এই দায়িত্বের অপর নামই হলো নবুয়্যাত বা রিসালাত। এই ধারা মহান আল্লাহ শেষনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা:) পর্যন্ত শেষ হয়েছে। কারণ, তাঁর নবুয়্যাত বিশ্বজনীন এবং তিনি হলেন বিশ্বনবী, সকল নবী-রাসূলদের মধ্যে তাঁকেই মহান আল্লাহ সর্বোচ্চ মর্যাদার সোপানে উপনীত করেছেন। এ কারণে তাঁর মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্য রেখেই আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর আদর্শই সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে অনুসরণ করতে হবে। তাঁর অতুলনীয় আদর্শ অনুসরণ ব্যতীত পৃথিবী ও আখিরাতে কোনো মানুষই মুক্তি পাবে না।
📄 কেনো নবী-রাসূলকে অনুসরণ করতে হবে?
নবী-রাসূলের অস্তিত্ব বর্তমান পৃথিবীতে শারীরিকভাবে থাকতেই হবে এ প্রশ্নের গুরুত্ব নেই, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নবী-রাসূলগণ যে শিক্ষা দান করেছেন, মহান আল্লাহর পক্ষ হতে যে বিধান তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল, তা বর্তমানে মওজুদ আছে কিনা। এই বিষয়টির ওপরে মানব জাতিকে গভীরভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে হবে। বর্তমানে নবীর আগমন আর ঘটবে না। কেননা নবী করীম (সা:) এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ নবুয়্যাতী ধারার সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন। তাঁর আনিত বিধান বর্তমানে অবিকৃত অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছে এবং ইনশাআল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত অবিকৃত থাকবে।
তাঁর সমগ্র জীবনকাল এবং সকল কার্যাবলী মানুষের সামনে অবস্থান করছে। তাঁর আনিত বিধান এবং তাঁর কার্যাবলী পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে তিনি ছিলেন বিশ্বনবী। সুতরাং তাঁকে অনুসরণ করা এবং তাঁর আনুগত্য করা তথা তাঁর আদর্শ অনুযায়ী জীবন যাপন করা মানুষের জন্য অবশ্য কর্তব্য। তাঁকে নবী বলে স্বীকৃতি দেয়ার পর তাঁকে অনুসরণ না করা বা তাঁর আদর্শ গ্রহণ না করা মানব বুদ্ধির বিরোধী কাজ। কারণ তাঁকে নবী বলে স্বীকৃতি দেয়ার অর্থই হলো আমরা একথার স্বীকৃতি দিলাম যে, তিনি যা কিছুই বলেছেন মহান আল্লাহর পক্ষ হতে বলেছেন, তিনি যা করেছেন তা মহান আল্লাহর ইশারায় করেছেন।
এই অবস্থায় তাঁর কোনো কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করার সুস্পষ্ট অর্থ হলো, মহান স্রষ্টা আল্লাহ্র কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করা। নবীর কোনো কাজকে অপছন্দ করার অর্থই হলো মহান আল্লাহর নির্দেশকে অপছন্দ করা। নবীর কোনো কাজের সমালোচনা করার স্পষ্ট ব্যাখ্যা হলো মহান আল্লাহর নির্দেশের সমালোচনা করার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করা। সুতরাং বুঝা গেল, নবী সম্পর্কে মনের গহিনে সামান্য প্রশ্ন সৃষ্টি করার অর্থই হলো স্বয়ং আল্লাহ্ তা'য়ালার নির্দেশ সম্পর্কে প্রশ্ন সৃষ্টি করা。
সুতরাং নবীকে নবী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পরে কোনো ধরণের প্রশ্ন ব্যতীতই নবীর সকল নির্দেশ মাথা পেতে গ্রহণ করা এবং তা অনুসরণ করা। নবীর কোনো কথা বা নির্দেশ যদি আমাদের উপলব্ধিতে না আসে তার মানে এই নয় যে, নবীর কথা ভুল। বরং ভুল আমাদের উপলব্ধির জগতে। আমরা জ্ঞানের দৈন্যতার কারণে নবীর কথা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছি। মনে রাখতে হবে, নবীর প্রতিটি কথা ও কাজের মধ্যেই মানব জাতির উন্নতি নিহিত রয়েছে। নবীর কথার প্রকৃত তাৎপর্য যদি আমাদের বোধগম্য না হয়, তবুও তা আমাদেরকে অনুসরণ করতে হবে। বরং এটা আমাদের জন্য অপরিহার্য।
নবী কক্ষনো ভুল কথা বলেন না। কেউ যদি ধারণা করে যে, নবী মাঝে মধ্যে ভুল কথা বলেন এবং ভুল করে থাকেন, তাহলে তা হবে এক মারাত্মক অপরাধ। কারণ নবী আল্লাহর নির্দেশে পরিচালিত হন এবং তাঁর নির্দেশেই কথা বলেন। আমাদের ভেতরেই ভুল রয়েছে বলে আমরা নবীর কথার তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারি না। নবীর যে কথা বা কাজ অনুধাবন করতে পারি না সেটা আমরা অনুসরণ করবো না, এমন কোনো সুযোগ মুসলমানদের জন্য অবশিষ্ট নেই। যিনি যতবড় আলেমই হন না কেনো, তাঁর কোনো কথা বা কাজের অনুসরণ করতে হলে, তাঁর নির্দেশের সাথে বা কাজের সাথে নবীর কথার বা কাজের সাদৃশ্য আছে কিনা তা অনুসন্ধান করে তবেই তা অনুসরণ করতে হবে।
একটি বিষয় অনুধাবন করতে হবে, যে ব্যক্তি কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ নয়, সে কম্পিউটারের জটিল বিষয় বুঝতে পারবে না। কিন্তু কম্পিউটার বিশেষজ্ঞের কথা যদি সে একারণে গ্রহণ না করে যে, কম্পিউটার তার বোধগম্য হচ্ছে না। তাহলে তার জন্য এটা হবে বোকামীর পরিচয়। পৃথিবীর প্রতিটি কাজের জন্যই বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হয়। কোনো কাজের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নিযুক্ত করার পরে তার কাজে হস্তক্ষেপ করার কোনো অবকাশ থাকে না।
সুতরাং প্রত্যেক মানুষ প্রতিটি কাজে বিশেষজ্ঞ হতে পারে না। পৃথিবীর সকল কাজ প্রতিটি মানুষ বুঝতে পারে না। কোনো ব্যক্তি কোন্ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তা আমাদের যাচাই করে তার ওপরে নির্ভর করতে হয়। এরপর সেই ব্যক্তির কাজে হস্তক্ষেপ করা বা তাকে বারবার উত্যক্ত করা যে, 'আমাকে প্রথমে এই বিষয়টি বুঝিয়ে দিতে হবে, নতুবা আমি তোমার কোনো কাজ বা কথা গ্রহণ করবো না'। এমন কথা যারা বলবে তাদেরকে মূর্খ ব্যতীত আর কিছুই বলা যায় না।
রোগী যখন ডাক্তারের কাছে যায় এবং সে ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে রোগীকে ব্যবস্থাপত্র প্রদান করে আর রোগী যদি ডাক্তারের কাছে আবদার জানায়, 'আপনি এই ওষুধ কেনো ব্যবহার করতে বললেন আমাকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিন'। ডাক্তার তখন বাধ্য হয়েই রোগীকে তার চেম্বার থেকে বের করে দেবেন। রোগ নিরাময়ের জন্যে ডাক্তারের নির্দেশ অনুসরণ করা প্রয়োজন, বিশেষ ওষুধ ডাক্তার কেনো নির্বাচিত করলেন তার ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া রোগীর জন্যে বোকামী বৈ আর কিছুই নয়।
আমাদের স্রষ্টা মহান আল্লাহ সম্পর্কে আমাদেরকে ঐটুকু জ্ঞান অর্জন করতে হবে, যতটুকু জ্ঞান অর্জন করলে আমরা বুঝতে পারবো যে, কোন্ কাজে তিনি সন্তুষ্ট হন আর কোন্ কাজে তিনি অসন্তুষ্ট হন। মহান আল্লাহর ইচ্ছা অনুসারে জীবন পরিচালনার পদ্ধতি কি, তা আমরা জানি না। জানার কোনো মাধ্যমও আমাদের কাছে নেই। কিন্তু এটা আমরা জানতে ইচ্ছুক। সুতরাং এটা জানার জন্যই আমাদের প্রয়োজন নবীকে অনুসন্ধান করা। এই অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও আমাদেরকে সতর্কতার পরিচয় দিতে হবে।
আমাদেরকে জানতে হবে, নবুয়্যাতের ধারা কোথেকে শুরু হয়ে কোন্ পর্যন্ত এসে শেষ হয়েছে। এই জ্ঞান যদি আমাদের না থাকে বা এই জ্ঞানের ভেতরে যদি কোনো ভ্রান্তি থাকে তাহলে আমরা যে ভুল পথে পরিচালিত হবো এতে কোনো সন্দেহ নেই।
হযরত মুহাম্মাদ (সা:) যে শেষ নবী এবং তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবে না, তাঁর আনিত জীবন বিধানই যে কিয়ামত পর্যন্ত অনুসরণ করতে হবে, এই জ্ঞান মানুষের জন্য পরিপূর্ণভাবে স্বচ্ছ থাকতে হবে। নবী করীম (সা:) এবং তাঁর পবিত্র সাহাবায়ে কেরামের সাথে যে কাজের কোনোই সম্পর্ক ছিল না, সে কাজের বাইরের অবয়ব যতই সুন্দর হোকনা কেনো, তা গ্রহণ করা যাবে না।
দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, কোনো নবী এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম মাইলের পর মাইল ভ্রমণ করে কারো কবরের কাছে গিয়ে কোনো কিছুর জন্য কখনো ধর্ণা দেননি। সুতরাং এই কাজ আমাদের জন্য করার কোনো অবকাশ নেই। ঈমান রাখতে হবে যে, মানুষের সকল প্রয়োজন পূরণ করার মালিক হলেন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তিনি কোনো মাধ্যম ব্যতীতই তাঁর বান্দার আবেদন শোনেন, সে বান্দাহ যত বড় পাপীষ্ঠই হোক না কেনো। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ طَ أَإِلَهُ مَّعَ اللَّهِ طَ قَلِيْلًا مَّا تَذَكَّرُوْنَ
তিনি (শ্রেষ্ঠ) যিনি কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির ডাকে সাড়া দেন, যখন (নিরূপায় হয়ে) সে তাঁকেই ডাকতে থাকে, তখন তার বিপদ-আপদ তিনি দূরীভূত করে দেন এবং তিনি তোমাদের এ যমীনে তাঁর প্রতিনিধি বানান; (এসব কাজে) আল্লাহ তা'য়ালার সাথে আর কোনো মা'বুদ কি আছে? (আসলে) তোমরা কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে। (সূরা আন নামল-৬২)
📄 নবী-রাসূলকে কেনো বিশ্বাস করতে হবে?
জ্ঞান, বিবেক-বুদ্ধির বিচারে যখন একথা আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, প্রকৃত সত্য জানার কোনো মাধ্যম আমাদের কাছে নেই। প্রকৃত সত্য অবগত হবার একমাত্র মাধ্যম হলো নবী-রাসূল। আমরা এ কথাও জানি যে, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী- রাসূল মানুষের জন্য সহজ সরল পথ প্রদর্শন করেন, তখন একথাও আমাদের কাছে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে যায়, নবীর ওপর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করা, তাঁর যে কোনো আদেশ পালন করা, তাঁর প্রদর্শিত পথ যে কোনো ত্যাগের বিনিময়ে অনুসরণ করা আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য।
নবীর বিধান বর্তমান অবিকৃত উপস্থিত থাকার পরেও যদি কোনো ব্যক্তি স্বীয় প্রবৃত্তি অনুযায়ী জীবন যাপন করে অন্য কোনো মানুষের আদর্শ অনুসরণ করে, তাহলে সে যে পথভ্রষ্ট হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষের ভেতর থেকেই আরেকজন মানুষ যদি মানুষকে পথ প্রদর্শন করতে সক্ষম হতো, তাহলে নবী প্রেরণের তো কোনো প্রয়োজনই হতো না। জীবন ব্যবস্থা প্রদানের কাজ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় বিধায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী প্রেরণের ব্যবস্থা করেছেন এবং নবীর মাধ্যমে জীবন ব্যবস্থা দান করেছেন।
একশ্রেণীর মানুষের অস্তিত্ব রয়েছে যারা নবুয়্যাত এবং রিসালাতের বিশ্বজনীন ধারণাকে স্বীকৃতি দেয় না। তাদের ধারণা হলো, নবীকে কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বাস করতে হবে বটে, তাঁর আনিত আদর্শও ছিল অদ্ভুত সুন্দর কিন্তু তা ছিল তাঁর যুগের উপযোগী। নবীর আদর্শ সার্বজনীন নয়। বর্তমানে চলার জন্য আদর্শ রচনা করতে হবে বা নবীর আদর্শে পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন একটি আদর্শ দাঁড় করিয়ে তা অনুসরণ করতে হবে। এদের জ্ঞানের দৈন্যতা দেখলে এদের ওপর করুণা হয়। আরেক শ্রেণীর লোক রয়েছে, যারা দাবী করে নবীকে অনুসরণ করার কোনো প্রয়োজনই নেই। কারণ আমাদের জ্ঞান বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে আমরা সত্য পথের সন্ধান করতে সক্ষম। এই শ্রেণীর মানুষ মারাত্মক ভ্রমে নিমজ্জিত। এরা বুঝতে চায় না যে, জ্যামিতিতে একটি বিন্দু থেকে আরেকটি বিন্দু পর্যন্ত সরল রেখা মাত্র একটিই হয়। এছাড়া যত রেখা অঙ্কন করা হবে তা সরল রেখা হবে না। সুতরাং নবীদের আনীত পথই হলো সহজ-সরল পথ। এই পথ ব্যতীত অন্য কোনো পথ সহজ-সরল হয় না, হতে পারে না। সুতরাং মানুষ যদি নবীর আনিত সহজ-সরল পথ ত্যাগ করে অন্য পথ অবলম্বন করে, ব্যক্তি তা করতে পারে। এ স্বাধীনতা তার রয়েছে। কিন্তু এই পথ মানব মনের চাহিদা অনুসারে তাকে শান্তি দিতে পারবে না।
সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাস এ কথার সাক্ষী। পৃথিবীর দু'একটি দেশে যেখানে নবীর আনিত আদর্শের ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্রাংশ বাস্তবায়িত রয়েছে, আর যেখানে সামান্যতমও নেই, এই দুই স্থানের অপরাধের পার্থক্য দেখলেই অনুধাবন করা যায় নবীর আনিত আদর্শ অনুসরণ করার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু। মানুষ মুখে স্বীকৃতি না দিলেও তার মনের চাহিদা এবং বিবেকের দাবী হলো, সে সত্য সহজ-সরল পথে চলতে আগ্রহী। যে পথে কোনো কন্টক নেই, কোনো বাধা নেই, কোনো ধরনের সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ নেই। কিন্তু মানুষ পার্থিব স্বার্থে এবং অহমিকা বশতঃ সেই পথেই চলতে গিয়ে ধ্বংসের অতলে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।
মানুষ দেখেও শিখে না। প্রাণী জগতের দিকেও দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে সে দেখতে পায়, একটি ইতর প্রাণীও তার গন্তব্যে পৌঁছার জন্য সহজ সরল পথ অনুসরণ করে। কিন্তু সৃষ্টির সেরা এই মানুষ বড়ই বিচিত্র। এরা সহজ সরল পথ দেখলে চিন্তা করে এই পথে চলতে গেলে পার্থিব স্বার্থে আঘাত আসবে এবং আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হবো। সুতরাং আমরা নিজেরাও এই পথে চলবো না অন্য কাউকেই এই পথে চলতে দেব না। আল্লাহ তা'য়ালার কোনো নেক বান্দাহ যখন এদেরকে সহজ সরল পথের দিকে সহানুভূতির সাথে আহ্বান জানায় তখন সে ঘাড় বাঁকা করে থাকে। নিজের আবিষ্কার করা ভুল পথের ওপরেই সে দৃঢ় থাকে।
এটা অত্যন্ত স্পষ্ট ব্যাপার যে, নবীকে অস্বীকার করে বা তাঁর আনুগত্য করতে অস্বীকার করে কোনো ব্যক্তি বা জাতি সহজ সরল পথ লাভ করতে পারে না এবং মানুষ তার কাংখিত শান্তিও লাভ করতে পারে না। নবীকে ত্যাগ করেও কোনো ব্যক্তি আল্লাহ তা'য়ালা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। পৃথিবী এবং আলমে আখেরাতে শান্তি লাভ করতে হলে তাকে অবশ্যই নবীর ওপর ঈমান এনে নবীকে অনুসরণ করতে হবে। এ ছাড়া বিকল্প কোনো পথ মানুষের সামনে উন্মুক্ত নেই।
কোনো ব্যক্তি বা জাতি সহজ-সরল পথ অবলম্বন করতে চায় অথচ সে ব্যক্তি বা জাতি একজন নবীর মতো সৎ ও সত্যনিষ্ঠ সত্ত্বার কথা গ্রহণ করতে অস্বীকার করছে, সেই ব্যক্তির বা জাতির যে বুদ্ধির বৈকল্য ঘটেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ মস্তিষ্ক বিকৃতি না ঘটলে, বুদ্ধি ভ্রষ্ট না হলে কোনো ব্যক্তির পক্ষেই সত্য বিমুখ হওয়া সম্ভব নয়। তার জ্ঞান বিবেক বুদ্ধির দৈন্যতা সৃষ্টি হতে পারে, তার মনের জগতে অহংকার নামক নিকৃষ্ট স্বভাব বাসা বাঁধতে পারে, অথবা সে স্বয়ং বাঁকা স্বভাবের হতে পারে, যে কারণে তার মন মানসিকতা সত্য গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয় না।
এ সকল কারণেই সে তার পূর্ব পুরুষ যা করে এসেছে তারই অন্ধ অনুসরণ করে। সমাজে বা বংশে শতাব্দী ধরে যে প্রথা চলে আসছে তা অনুসরণ করে। পূর্ব পুরুষ যা করে এসেছে এবং দেশ ও সমাজে কয়েক শতাব্দী ধরে যে প্রথা চলে আসছে, এ সবের বিরুদ্ধে সে কথা শুনতে চায় না। এমন ব্যক্তি ধারণা করতে পারে, পৃথিবীতে আমি যা খুশী তাই করবো, যেভাবে খুশী জীবন যাপন করবো, আমি নবীকে অনুসরণ করলে আমার সে স্বাধীনতা থাকবে না। সুতরাং আমি নবীকে অনুসরণ করবো না।
নবীকে অনুসরণ না করার ওপরে উল্লেখিত কারণগুলো যদি কোনো ব্যক্তি বা জাতির মধ্যে বিদ্যমান থাকে, তাহলে সেই জাতি বা ব্যক্তির পক্ষে কোনক্রমেই সহজ-সরল পথে চলা সম্ভব হবে না। ধর্মের নামে সে ব্যক্তি যতই পীরের দরবারে পড়ে থাক না কেনো, মাজারে মাথা ঠুকতে ঠুকতে সে ব্যক্তি যদি নিজেকে রক্তাক্তও করে, তবুও তার পক্ষে আল্লাহ তা'য়ালা পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব হবে না। নবীর প্রদর্শিত পথ ব্যতীত কোনো মানুষের পক্ষে সত্য লাভ করা সম্ভব নয়।
মনে রাখতে হবে, নবুয়্যাত বা রিসালাত দাবী করে বা চেষ্টা-সাধনা করে লাভ করার কোনো জিনিস নয়। এ সম্পর্কে আমরা এই গ্রন্থের প্রথম দিকে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সুতরাং যিনি নবী প্রেরণ করেছেন, তিনিই আদেশ দিয়েছেন নবীর আনুগত্য করার জন্য বা নবীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের জন্য। নবীর প্রতি যে ব্যক্তি বিশ্বাস স্থাপন ও আনুগত্য না করে, সে ব্যক্তি যে আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি বিদ্রোহী এতে দ্বিমতের অবকাশ নেই।
সাধারণ মানুষ যে দেশের নাগরিক এবং যে সরকারের প্রজা, সেই সরকারের নিযুক্ত প্রশাসকের আনুগত্য করতে হবে, এটা করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য। কেউ সরকারকে মানবে আর সরকার কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসককে মানবে না, বিষয়টি পরস্পর বিরোধী। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হলেন সকল সৃষ্টির বাদশাহ। তাঁর সৃষ্টি মানুষকে পথ প্রদর্শন করার জন্য তিনি যাকে খুশী নিযুক্ত করতে পারেন। তিনি যাকেই নিযুক্ত করেছিলেন, যার আনুগত্য করার জন্য মানুষকে নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর আনুগত্য করা সকল মানুষের জন্য অবধারিত কর্তব্য।
নিজেকে সকলের আনুগত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে একমাত্র নবীর আনুগত্য করা প্রতিটি মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক। মানুষ যদি তা না করে তাহলে সে নিজেকে কিছুতেই আল্লাহ তা'য়ালার গোলাম হিসেবে পরিচয় দিতে পারে না। একজন মানুষ স্রষ্টা আল্লাহ তা'য়ালাকে স্বীকার করবে অথচ তাঁর প্রেরিত নবী-রাসূলকে স্বীকার করবে না, এমন হতে পারে না। এ ধরনের ব্যক্তির জন্য আল্লাহকে স্বীকৃতি দেয়া না দেয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
📄 নবুয়্যাত-রিসালাতের সূচনা
মহান আল্লাহ এই পৃথিবী সৃষ্টি করে এখানে মানব জাতিকে প্রেরণ করেছেন। প্রথম মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছিল হযরত আদম (আ:) কে। প্রথম সৃষ্টি মানুষ হযরত আদম (আ:) কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তাঁকে নবুয়্যাত দান করা হয়েছিল এবং তিনি নবী-রাসূল ও বিজ্ঞানী ছিলেন। তাঁর থেকেই মহান আল্লাহ তা'য়ালা নবী প্রেরণের ধারাবাহিকতা শুরু করেন বা নবুয়্যাতের সূচনা হয়েছিল হযরত আদম (আ:) থেকেই। এই ধারার সমাপ্তি ঘটেছে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা:) পর্যন্ত এসে। নবী করীম (সা:) এর পরে কিয়ামত পর্যন্ত যে বা যারা নিজেকে নবী হিসেবে দাবী করবে, তাদের উক্ত দাবী অবশ্যই গ্রহণযোগ্য নয়।
মহান আল্লাহ হযরত আদম (আ:) কে সৃষ্টি করলেন এবং তাঁর থেকে আরেকজন মানুষ সৃষ্টি করলেন, যার নাম হযরত হাওয়া (আ:)। তাঁকে হযরত আদম (আ:) এর জীবন সঙ্গিনী হিসেবে মনোনীত করা হলো। সূচনায় তাদেরকে জান্নাতে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। সৃষ্টি করা হয়েছিল এই পৃথিবীর জন্য। সুতরাং তাদেরকে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হলো। এরপর মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বংশধারা চালু করলেন। হযরত আদম (আ:) এর সন্তান-সন্ততি জন্মগ্রহণ করতে থাকলো।
মানব বংশের যাত্রা শুরু হলো। এই দু'জন মানুষ থেকে ক্রমশঃ মানব জাতির বৃদ্ধি ঘটতে থাকে। কত বছরের ব্যবধানে মানব বংশ বৃদ্ধি লাভ করে বর্তমান অবস্থায় উপনীত হয়েছে, তার সঠিক হিসাব মহান আল্লাহই অবগত আছেন। সমগ্র পৃথিবীতে বর্তমানে যত সংখ্যক মানুষ আছে এবং অতীতকালে যারা ছিল, সকলেই ঐ হযরত আদম ও হযরত হাওয়া (আঃ) থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবীর সকল জাতির ধর্মীয় বর্ণনা এবং ইতিহাস এ কথা প্রমাণ করে যে, বর্তমানে এই মানব জাতি হযরত আদম (আঃ) এর বংশধর। তাঁর থেকেই মানব জাতির বংশধারার অবতারণা হয়েছে। ডারউইনের থিয়রী অর্থাৎ The theory of evolution বহু পূর্বেই পরিত্যক্ত ঘোষনা করা হয়েছে। মানুষ সৃষ্টি সম্পর্কে বিজ্ঞান এ পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত বিশ্বাসে উপনীত হতে পারেনি। বিজ্ঞান এ কথাও বলতে সক্ষম হয়নি যে, এই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধরনের মানুষ সৃষ্টি হয়েছিল。
বরং অধিকাংশ বিজ্ঞানীর ধারণা হলো, প্রথমে একজোড়া মানুষ থেকেই মানব বংশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। পৃথিবীতে পূর্বে যত মানুষ ছিল এবং বর্তমানে যত মানুষ আছে, আগামীতে যত মানুষ আসবে, তা সবই হযরত আদম এবং হযরত হাওয়া (আঃ) এরই বংশধর। বিজ্ঞান এ ব্যাপারে কি Certificate দিচ্ছে তা আমাদের আলোচনা বা অনুসরণ করার বিষয় নয়। মহান আল্লাহ কি বলছেন সেটাই বিশ্বাস এবং অনুসরণ করা মূখ্য বিষয়।
পবিত্র কুরআনে এই মানব জাতিকে মহান আল্লাহ তা'য়ালা আদম সন্তান হিসেবে আহ্বান করেছেন। হযরত আদম (আঃ) কে দায়িত্ব দেয়া হয়, তিনি যেন তাঁর সন্তানদেরকে ইসলামের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেন। তাদেরকে তিনি যেন সর্ব প্রথমে এ কথা শিক্ষা দেন, এই পৃথিবী এবং এর ভেতরে যা কিছু দৃশ্যমান এবং অদৃশ্যমান সকল কিছুর স্রষ্টা হলেন মহান আল্লাহ তা'য়ালা। তিনি অসীম ক্ষমতাবান। কোনো কিছু সৃষ্টি করতে ইচ্ছা করলে তাঁর আদেশ মাত্র তা সৃষ্টি হয়ে যায়।
কোনো কিছু ধ্বংস করতে ইচ্ছা করলে সেটাও তাঁর আদেশ মাত্র ধ্বংস হয়ে যায়। তাঁর সমকক্ষ আর কেউ নেই। তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি এক অদ্বিতীয়। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন বরং সকল কিছুই তাঁর মুখাপেক্ষী। তাঁকে কেউ সৃষ্টি করেনি বরং তিনিই সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি কারো আইন মানতে বাধ্য নন, সে প্রয়োজনও তাঁর নেই। সকল সৃষ্টি ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, তাঁর আইন মানতে বাধ্য। তাঁকে কারো কাছে জবাবদিহী করতে হয় না, বরং সকল সৃষ্টিকে তাঁরই কাছে জবাবদিহী করতে হয় এবং হবে। তিনি চিরঞ্জীব এবং সকল ধরনের দুর্বলতা থেকে তিনি মুক্ত।
তাঁর আইন ব্যতীত আর কারো আইন গ্রহণ করা যাবে না বা অনুসরণ করা যাবে না। তাঁর ইবাদাত ব্যতীত অন্য কারো ইবাদাত করা যাবে না। তাঁর কাছেই কেবল সাহায্য চাইতে হবে। অন্য কারো কাছে সাহায্য চাওয়া যাবে না। তাঁর সামনেই মাথানত করতে হবে, অন্য কারো কাছে বা সামনে মাথানত করা যাবে না। কেবলমাত্র তাঁর ইচ্ছা অনুসারেই জীবন পরিচালনা করতে হবে। নিজের খায়েস বা অন্য কারো মর্জি অনুসারে জীবন অতিবাহিত করা যাবে না। জীবনের সকল কাজের জবাব আল্লাহ তা'য়ালার কাছে দিতে হবে। তাঁর দেয়া বিধান অনুসারে জীবন পরিচালনা করলে তিনি পুরস্কার দান করবেন আর তাঁর আদেশ অমান্য করলে শাস্তি ভোগ করতে হবে।
হযরত আদম (আ:) তাঁর সন্তানদেরকে এই শিক্ষা প্রদান করলেন। তাঁর সন্তানদের মধ্যে একটি দল আদি পিতার শিক্ষা অনুসারে জীবন অতিবাহিত করতে থাকলো। আরেকটি দল আদি পিতার শিক্ষা থেকে ক্রমশঃ দূরে সরে গেল। তাদের ভেতরে কেউ আকাশের চন্দ্র সূর্যকে মহাশক্তিমান কল্পনা করে তার পূজা করতে থাকলো। কেউ ধারণা করলো বৃক্ষ তরু-লতাই হলো সর্বশক্তিমান। সুতরাং বৃক্ষ তরু-লতা পূজিত হতে থাকলো। কেউ পূজা করতে থাকলো নদী সাগর ইত্যাদীকে। কেউ মূর্তি নির্মাণ করে পূজা করতে থাকলো। কেউ আগুনের কুণ্ড নির্মাণ করে তার পূজা করা শুরু করলো।
ইতোমধ্যে সমগ্র পৃথিবীতে আদম সন্তান ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন বিভিন্ন জাতির উদ্ভব হলো। তারা তাদের ধর্ম হিসেবেও নানা ধরনের কল্পিত মতবাদ আবিষ্কার করলো। মানুষের নানা শ্রেণী, বর্ণ ও ভাষা হবার কারণে নিত্য নতুন প্রথার সৃষ্টি হলো। এভাবে মানুষ নানা বস্তুর পূজারী হবার ফলে মহান আল্লাহকে ভুলে গেল। হযরত আদম (আ:) যে শিক্ষা দিয়েছিলেন, মানুষ কালক্রমে তা ভুলে গিয়েছিল। পরিণতি যা হবার ছিল তাই হলো। যাবতীয় দুষ্কৃতি সমাজ জীবনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো।
সমাজের প্রতিটি স্তরে পুঞ্জিভূতাকারে অপকর্ম জমা হলো। এমন অনেক রীতি নীতিকে বিসর্জন দেয়া হলো, যা ছিল প্রকৃতই কল্যাণকর। আবার এমন অনেক রীতি পদ্ধতিকে একান্তই অনুসরণীয় করা হলো, যা মানব জাতির জন্য একান্তই ক্ষতিকর। পথ প্রদর্শকের অভাবে শত সহস্র ভ্রান্ত পথ ও মতের সৃষ্টি হলো। তারা সবাই দাবী করতে থাকলো, তাদের পথই একমাত্র অভ্রান্ত এবং অন্যদের পথ ও মত সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। এভাবে শুরু হলো দলাদলি। পরিণতিতে দাঙ্গা সৃষ্টি ও রক্তপাত হতে থাকলো।
পবিত্র কুরআন ও গবেষণালব্ধ ইতিহাস প্রমাণ করে যে, ইসলামের সূচনা হযরত আদম (আ:) থেকে হয়েছিল। ইসলামের শত্রুরা শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান মুসলিম সমাজে এ কথা প্রচলিত করে দিয়েছে যে, মুহাম্মাদ (সা:) ই ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক। এই কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। পবিত্র কুরআন-হাদীস এর বিপরীত কথা বলে। পৃথিবীতে প্রেরিত প্রত্যেক নবীর আদর্শই ছিল ইসলাম। তাঁরা সকলেই ছিলেন ইসলামী আন্দোলনের আল্লাহ তা'য়ালা কর্তৃক নির্বাচিত নেতা। প্রত্যেক নবীই ইসলামের দিকে মানুষকে আহ্বান করেছেন। সর্বকালে সব দেশে মানব জাতির একমাত্র আদর্শ ছিল ইসলাম।
পবিত্র কুরআন সম্পর্কে যারা অনভিজ্ঞ এবং কুরআন বাদ দিয়ে যারা ইতিহাস রচনা করেছে, তারা উল্লেখ করেছে যে, 'অংশীদারিত্বের অন্ধকারময় জগতে ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ ধর্মের গর্ভধারিণী মাতা হলো অংশীদারিত্ব। তারপর ধারাবাহিক বিবর্তনের মাধ্যমে শিরকের বা অংশীদারিত্বের অন্ধকার দূরিভূত হয়ে তাওহীদের তথা একত্ববাদের সৃষ্টি হয়। এভাবে মানুষের মধ্যে তাওহীদ বা একত্ববাদের ধারণার বিস্তৃতি ঘটতে থাকে'।
ডারউইন তার The theory of evolution-এর মাধ্যমে মানুষকে যে নাস্তিক্যবাদের দিকে আহ্বান জানিয়েছে, ধর্ম সম্পর্কে উল্লেখিত কথাটিও সেদিকেই মানব জাতিকে নিয়ে যেতে চায়। অর্থাৎ তারা বুঝাতে চায়, আদম হাওয়া কল্পিত বিষয়। মানুষ বিবর্তনের মাধ্যমে পানির পোকা থেকে অস্তিত্ব লাভ করেছে। তারপর তারা বন্যদের মত জীবন যাপন করতে থাকে। মানব প্রকৃতি বড় দুর্বল। চরম অসহায় অবস্থায় পড়লে মানুষ একটা শক্তিকে কেন্দ্র করে বাঁচতে চায়। সুতরাং অসহায় অবস্থায় নিপতিত হয়ে মানুষ নানা ধরনের কল্পিত শক্তি আবিষ্কার করে। আর কল্পিত শক্তির নামই হলো স্রষ্টা। প্রকৃত স্রষ্টা বলতে কিছুই নেই।
মানুষ কখনো চন্দ্র-সূর্যকে শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে। তখন থেকেই তাদের পূজা শুরু হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন বস্তুকে শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে মানুষ তাদের পূজা করেছে আর এভাবেই ধর্মের উদ্ভব ঘটেছে। এসব কিছু থেকে আরেকদল মানুষ আবিষ্কার করেছে এমন এক শক্তিকে, যাকে দেখা যায় না এবং অনুভবও করা যায় না। তার নাম দিয়েছে 'আল্লাহ' (নাউযুবিল্লাহ)। এভাবেই একত্ববাদের সৃষ্টি হয়েছে। যুগে যুগে কিছু ব্যক্তি এই একত্ববাদের সাথে নতুন কিছু জুড়ে দিয়ে মানুষকে তার অনুসারী বানিয়েছে।
এক শ্রেণীর মানুষ নামের বিভ্রান্ত কিছু লোক উল্লেখিত কথাগুলোর জন্ম দিয়েছে, যেসব কথার কোনো ভিত্তি নেই। মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছেন, কোনো অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে মানব জাতির যাত্রা শুরু হয়নি। পৃথিবীতে একজন মহামানব প্রেরণ করা হয়েছিল। তিনি ছিলেন সম্মানিত নবী-রাসূল এবং বিজ্ঞানী। এক আলোকিত উজ্জ্বল অবস্থা থেকে মানব জাতির সূচনা হয়েছিল এবং তারা যাত্রা শুরু করেছিল। তাঁরা সবাই ছিল এক অভ্রান্ত পথের যাত্রী। তাদের ভেতরে কোনো ধরণের দুষ্কৃতি বা দলাদলি ছিল না। ইতিহাসের ধারাপরিক্রমায় এই মানুষ প্রকৃত সত্য থেকে ছিটকে পড়ে। তারপর তাদের ভেতরে নানা মত ও পথের আবিষ্কার হয়। যারা এই নানা ধরনের মত ও পথের আবিষ্কারক ছিল, তারা যে প্রকৃত সত্য জানতো না এমন নয়। সত্য জানার পরেও এক শ্রেণীর মানুষ নিজের বৈধ অধিকারের সীমা অতিক্রম করে পার্থিব সুবিধা লাভের জন্যই এই ধরনের বাতিল ভ্রান্ত পথের ও মতের জন্ম দিয়েছিল।
তারা নিজেদের ভেতরে অন্যায় অত্যাচার আর সীমা লংঘনের ব্যাপারে অধিক আগ্রহী ছিল। তাদেরকে এ সকল অপরাধ থেকে মুক্ত করে পুনরায় আল্লাহ তা'য়ালার দেয়া সহজ-সরল পথে ফিরিয়ে আনার জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী প্রেরণ করতে থাকেন।
এ সকল নবীগণ পৃথিবীতে আগমন করে কিছু অনুসারী তৈরী করবেন তারপর একটি নতুন আদর্শের মাধ্যমে নিজের নামের অনুকরণে একটি ধর্মমত সৃষ্টি করবেন, ব্যাপার কিন্তু এমন ছিল না। মহান আল্লাহ এসব নবী-রাসূলকে এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন যে, হযরত আদম (আ:) এর মাধ্যমে যে সত্য মানব জাতির জন্য দান করা হয়েছিল, সে সত্য মানুষ হারিয়ে ফেলেছে। নবীগণ এসে সেই সত্য উদ্ধার করে মানুষকে পুনরায় সেই সত্যের অনুসারী তৈরী করবেন। সেই সত্য মানুষের সামনে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরবেন, তা পরিষ্কার করে বর্ণনা করবেন। তারপর তাদেরকে একটি জাতিতে পরিণত করবেন।