📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 মহান আল্লাহ তা'য়ালা এবং তাঁর সৃষ্টিসমূহ

📄 মহান আল্লাহ তা'য়ালা এবং তাঁর সৃষ্টিসমূহ


মহাগ্রন্থ আল কুরআন এবং হাদীসে মহান নবী-রাসূল সম্পর্কে যা কিছু আলোচনা করা হয়েছে, এ সম্পর্কে ধারণা অর্জনের পূর্বে মানুষকে সর্বপ্রথমে মহান আল্লাহ তা'য়ালা এবং তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করতে হবে। আল্লাহ তা'য়ালা এবং তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করতে হলে সর্বপ্রথমে আমাদের সামনে যে প্রশ্ন দেখা দেয় তাহলো, আল্লাহ তা'য়ালা এবং তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে জানার মাধ্যম কি? মানুষ হিসেবে আমাদের যে জ্ঞান আছে, এই জ্ঞান কি আমাদের নির্ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত করে?

এই প্রশ্নের সঠিক এবং একমাত্র জবাব হলো, না। মানুষের জ্ঞান অসীম নয় বরং সসীম এবং এ সসীম জ্ঞান মানুষকে সকল বিষয়ে নির্ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সাহায্য করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের জ্ঞান মানুষকে অনিবার্যভাবে ভুল পথে পরিচালিত করে। মানুষের দৃষ্টি শক্তির ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। শ্রবণশক্তি, অনুভবশক্তি, উপলব্ধিবোধ, চিন্তাশক্তি, বাকশক্তি, দৈহিকশক্তি তথা সকল শক্তিই সীমাবদ্ধ। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, একজন মানুষ রেল লাইনের ওপরে দাঁড়িয়ে সম্মুখের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পায়, এক পর্যায়ে মানুষ দেখে দু'পাশের রেল লাইন যেন এক হয়ে গিয়েছে। রেল লাইন আর দু'টো নেই একত্রে মিশে গেছে। আকাশের প্রান্তের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় আকাশ অনেক দূরে গিয়ে পৃথিবীর মাটির সাথে মিশে গেছে। বিশাল জলধী সমুদ্রের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখা যায় শুধু পানি আর পানি। ওপার দেখা যায় না। ওপারে যে বৃক্ষ-তরুলতার অস্তিত্ব রয়েছে, জনপদ রয়েছে, দৃষ্টিশক্তি তা দর্শন করতে ব্যর্থ হয়। সুতরাং মানুষের দৃষ্টিশক্তি মানুষকে সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে দারুণভাবে ব্যর্থ হয়।

মানুষের শ্রবণশক্তির অবস্থা আরো শোচনীয়। একত্রে পাঁচজন মানুষ যদি কোনো শব্দ শোনে, পাঁচজন পাঁচ ধরনের মন্তব্য করে। প্রকৃত যে কিসের শব্দ তা আড়াল থেকে অনুভব করা বড় কঠিন। মানুষের শ্রবণ শক্তিও মানুষকে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে অনেক সময় ব্যর্থ হয়। মানুষের ত্বক যা দিয়ে মানুষ স্পর্শ অনুভব করে, ত্বকও মানুষকে প্রকৃত সত্য অবগত করতে ব্যর্থ হয়। আড়াল থেকে একজন মানুষকে আরেকজন মানুষ স্পর্শ করলে সে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় চোখে না দেখে বলতে পারে না।

নবী করীম (সা:)-এর যুগের একটি ঘটনা, হযরত যাহের (রা:) নামক একজন বেদুঈন সাহাবী ছিলেন। রাসূল (সা:) কে তিনি প্রাণাধিক ভালোবাসতেন। তিনি মাঝে মধ্যেই রাসূল (সা:) এর জন্য উপহার সামগ্রী প্রেরণ করতেন। একদিন তিনি তাঁর এলাকা থেকে পণ্যসামগ্রী বিক্রির উদ্দেশ্যে মদীনা শহরের বাজারে এলেন। তিনি দাঁড়িয়ে পণ্যসামগ্রী বিক্রি করছেন, এমন সময় নবী করীম (সা:) তাঁর পেছন দিক থেকে এসে তাঁকে নিজের বুকের মাঝে জাপটে ধরলেন। হযরত যাহের (রা:) দেখতে পাননি কে তাঁকে জাপটে ধরেছে। তিনি একটু কঠিন স্বরেই বললেন, 'এই কে? ছেড়ে দাও বলছি'। তারপর দেখলেন যাঁর স্পর্শ পেলে সমগ্র জগৎ ধন্য হয়, সেই তাঁরই পবিত্র দু’টো বাহু তাঁর মতো মানুষকে নিজ বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরেছেন। তখন তিনি নিজের শরীরটা আরো ঘনিষ্ঠভাবে নবী করীম (সা:) এর পবিত্র দেহ মুবারকের সাথে মিশিয়ে দিলেন। আল্লাহর রাসূল (সা:) কৌতুক করে লোকজনকে বললেন, 'তোমরা কি কেউ এই গোলামটি কিনবে?'

হযরত যাহের (রা:) কুণ্ঠিত হাসি হেসে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমার মতো মূল্যহীন গোলামকে যে কিনবে সেই ঠগবে'।

নবী করীম (সা:) তাঁকে বললেন, 'আল্লাহ তা'য়ালার কাছে তোমার মূল্য কিন্তু অনেক বেশি'।

হযরত যাহের (রা:) যদি অনুভব করতে পারতেন যে, তাঁকে যিনি অনুগ্রহ করে জড়িয়ে ধরেছেন তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালার হাবীব। তাহলে তিনি অমন করে, 'এই কে, ছেড়ে দাও বলছি' বলতেন না। অর্থাৎ দেখা গেল, মানুষের অনুভব শক্তি তথা ত্বক মানুষকে সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারে না।

সুতরাং আল্লাহ তা'য়ালা এবং তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করতে হলে আল্লাহ তা'য়ালা কর্তৃক প্রেরিত মহান নবী-রাসূল ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো পথ মানব জাতির সম্মুখে উন্মুক্ত নেই। ঠিক এ কারণেই মহান মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীতে মানুষ হিসাবে সর্বপ্রথমে যাঁকে প্রেরণ করলেন তাঁকে নবুয়্যাত দান করেই প্রেরণ করলেন এবং যেখানে পাঠালেন সেখানে যে সকল বস্তু রয়েছে তার নাম ও ব্যবহার বিধি সম্পর্কিত জ্ঞানও তাঁকে দান করলেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআন বলছে-

وَعَلَّمَ آدَمَ الأَسْمَاءَ كُلَّهَا -

আল্লাহ তা'য়ালা অত:পর (তাঁর খলীফা) আদমকে (প্রয়োজনীয়) সব জিনিসের নাম শিখিয়ে দিলেন। (সূরা আল বাকারা-৩১)

পৃথিবীতে আগমন করে তিনি কিভাবে কোন্ বিধান অনুসরণে জীবন পরিচালিত করে শান্তি, কল্যাণ, সুখ-সমৃদ্ধি অর্জন করবেন সে দিকনির্দেশনাও মহান আল্লাহ তা'য়ালা এভাবে দিয়ে দিলেন-

قُلْنَا اهْبِطُوا مِنْهَا جَمِيعاً فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِّنَى هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ -

আমি (তাদের) বললাম, তোমরা সবাই (এবার) এখান থেকে নেমে যাও, তবে (যেখানে যাবে অবশ্যই সেখানে) আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে (জীবন বিধান সম্পর্কিত) হিদায়াত আসবে, অত:পর যে আমার (সেই) বিধান মেনে চলবে তার কোনো ভয় নেই, তাদের কোনো প্রকার উৎকণ্ঠিতও হতে হবে না। (সূরা আল বাকারা-৩৮)

সমগ্র সৃষ্টির স্রষ্টা আল্লাহ তা'য়ালা প্রথম মানুষটিকে জানিয়ে দিলেন তাঁর পক্ষ থেকে তিনি জীবন বিধান সম্পর্কিত হিদায়াত প্রেরণ করবেন। প্রত্যেক মানুষের কাছে তিনি পৃথকভাবে হিদায়াত প্রেরণ করবেন এটি তাঁর নিয়ম নয় এবং বিষয়টি যৌক্তিকও নয়। এ জন্যে মানব জাতির মধ্য থেকেই নবী-রাসূল নির্বাচিত করেন তথা নবুয়‍্যাত- রিসালাত দান করে তাঁর মাধ্যমে মানুষের জন্যে হিদায়াত প্রেরণ করেছেন। এ সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে নবুয়‍্যাত ও রিসালাত কি জিনিস এবং এ দু'টো জিনিসের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কিনা। এ দুটো জিনিসের দায়িত্ব কর্তব্যই বা কি এবং সম্মান-মর্যাদাই বা কি। এ বিষয় সম্পর্কে জানতে হলে আমাদেরকে পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার এই আয়াতের বক্তব্য জানতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন-

كَانَ النَّاسُ أُمَّةٌ وَاحِدَةً قف فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّنَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ صَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُوا فِيْهِ طَ وَمَا اخْتَلَفَ فِيْهِ إِلَّا الَّذِينَ أُوتُوهُ مِنم بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَاتُ بَغْيَامٍ بَيْنَهُمْ جِ فَهَدَى اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا لِمَا اخْتَلَفُوْا فِيْهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِهِ طَ وَاللَّهُ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ

(এক সময়) সকল মানুষ একই উম্মতের অন্তর্ভূক্ত ছিলো (পরে এরা নানা দল উপদলে বিভক্ত হয়ে তাদের স্রষ্টাকেই ভুলে গেলো)। তখন আল্লাহ তা'য়ালা (সঠিক পথের অনুসারীদের) সুসংবাদবাহী আর অপরাধিদের জন্যে শাস্তির সতর্ককারী হিসাবে নবীদের পাঠালেন, তিনি সত্যসহ গ্রন্থও অবতীর্ণ করলেন, যেনো তা মানুষদের এমন পারস্পরিক বিরোধসমূহের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত করতে পারে, যে ব্যাপারে তারা মতবিরোধ করে; তাদের কাছে সুস্পষ্ট হিদায়াত পাঠানো সত্ত্বেও তারা পারস্পরিক (বিদ্রোহ ও) বিদ্বেষ সৃষ্টির জন্যে মতবিরোধ করেছে, অতপর আল্লাহ তা'য়ালা তাদের সবাইকে স্বীয় ইচ্ছায় সেই সঠিক পথ দেখালেন, যার ব্যাপারে ইতোপূর্বে তাদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছিলো; আল্লাহ যাকে চান তাকে সঠিক পথ দেখান। (সূরা বাকারাহ-২১৩)

তাফসীরকারগণ পবিত্র কুরআনের উক্ত আয়াত সম্পর্কে এভাবে বিশ্লেষণ করেছেন; মানুষ সৃষ্টির শুরুতে সত্য পথ অনুসরণ করে চলছিল। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয় এবং তারা দলাদলি সৃষ্টি করে বিভিন্ন মত ও পথের অনুসারী হয়ে পড়ে। আর এ কারণেই মানব সভ্যতায় এক বিশৃংখল অবস্থার উদ্ভব হয়। এই মতভেদের কারণেই মানুষ প্রকৃত সত্য থেকে ছিটকে পড়ে, ক্রমশঃ সত্য তিরোহিত হয়ে যায়। মানুষ ভ্রান্ত পথের পথিক হয়ে উদ্ভ্রান্তের মত পৃথিবীতে জীবন পরিচালনা করতে থাকে。

সত্য তিরোহিত হবার কারণে মানুষের মধ্যে চরম হিংসা বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়, মানুষ আত্মস্বার্থে অন্ধ হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তারা সত্য অস্বীকারকারী হয়ে পড়ে। বিশৃংখলতা যখন সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন মহান আল্লাহ তাদের মধ্যে নবী-রাসূল প্রেরণ করেন। তাঁরা মানুষকে মিথ্যা বা ভ্রান্ত পথ পরিহার করে সত্য গ্রহণের আহ্বান জানান, মানুষকে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেন, যারা সত্য গ্রহণ না করে বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে থাকে তাদেরকে জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করেন।

মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর নবী- রাসূলের কাছে এমন এক কিতাব অবতীর্ণ করেন, যে কিতাবে প্রত্যেক মানুষের জন্য তাদের জীবনের প্রতিটি সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান নিহিত রয়েছে। মানুষ যে সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে, পরস্পরে দলাদলি করছে, যে বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য করছে, এ সকল কিছুর সমাধান এই কিতাবে রয়েছে। এই কিতাব সকল সমস্যার সমাধানকারী এবং মানুষকে সত্য পথ প্রদর্শনকারী। এই কিতাব ব্যতীত অন্য কোথাও সত্যের সামান্য চিহ্ন মাত্র নেই। সব সমস্যার সমাধান করার জন্যই এই কিতাব মহান আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে তাঁর নবী-রাসূলদের ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছে।

পক্ষান্তরে মানুষের কাছে সত্য প্রেরণ করার পরে এবং তাদের সামনে মহাসত্য উদ্ভাসিত হবার পরেও এই মানুষ মতভেদে নিমজ্জিত এবং সত্যের বাহকদের প্রতি অবাঞ্ছিত আচরণে লিপ্ত ছিল। আর এ কারণেই সত্যের প্রতি যারা অনুরাগী, তারাই কেবল আল্লাহ তা'য়ালার অনুগ্রহে সত্য গ্রহণ করে ধন্য হয়েছিলেন। কারণ, কোনো মানুষের যদি সত্য গ্রহণ করার মন-মানসিকতা আদৌ না থাকে, সত্য গ্রহণ করতে সে যদি প্রস্তুত না থাকে, তাহলে তার পক্ষে সত্য পথের পথিক হওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। মহান আল্লাহ ঐ সকল ব্যক্তিকেই সত্য গ্রহণে সহযোগিতা করেন, যারা সত্য গ্রহণ করতে ইচ্ছুক, যারা মিথ্যা বা বিশৃংখলা পরিহার করে শান্তিপূর্ণ জীবন-যাপন করতে আগ্রহী, তাদেরকেই আল্লাহ তা'য়ালা অনুগ্রহ করে থাকেন।

সূরা আল বাকারার উক্ত আয়াত থেকে আমরা নবী-রাসূল প্রেরণের পটভূমি জানতে পারি, সেই সাথে আমরা জানতে পারলাম মানুষ শুরুতে সত্য পথের পথিক ছিল। পরবর্তীতে তারা কেনো বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল সেটাও জানা গেল এবং কোন্ শ্রেণীর মানুষের হিদায়াত নছীব হয়, কারা সত্য পথের পথিক হতে সক্ষম তা আমরা পবিত্র কুরআন থেকে জানতে পারলাম।

এ পর্যায়ে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, 'হযরত আদম (আ:) ও হযরত নূহ (আ:) এর মধ্যে সময়ের দশটি অধ্যায়ের ব্যবধান রয়েছে। প্রথমে মানুষ সত্য পথের পথিক ছিল। পরবর্তীতে তাদের ভেতরে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। আর তারপরই মহান আল্লাহ হযরত নূহ (আ:) ও অন্যান্য নবী প্রেরণ করেন'।

মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো অজুহাত প্রদর্শন করা। মহান আল্লাহ মানুষকে যখন তাঁর কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন তখন তো মানুষ এই অজুহাত দাঁড় করবে, 'হে আল্লাহ! আমরা প্রকৃত সত্যের সন্ধান পাইনি। এ কারণে আমরা ভুল পথের পথিক ছিলাম'। এ ধরণের নানা যুক্তি আল্লাহর সামনে তারা পেশ করবে। সুতরাং মানুষের কাছে আল্লাহ তা'য়ালা নবী প্রেরণ করে তাদের কাছে সত্য প্রেরণ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন-

رُّسُلاً مُّبَشِّرِيْنَ وَمُنذِرِيْنَ لِفَلا يَكُوْنَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ ط وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا

রাসূলরা (ছিলো জান্নাতের) সুসংবাদবাহী ও (জাহান্নামের) ভয় প্রদর্শনকারী, (তাদের এ জন্যেই পাঠানো হয়েছিলো) যাতে করে রাসূলদের আগমনের পর আল্লাহ তা'য়ালার ওপর মানব জাতির কেনো অজুহাত দাঁড় করার সুযোগ না থাকে; (সত্যিই) আল্লাহ তা'য়ালা মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। (সূরা নিছা-১৬৫)

এই পৃথিবীতে নবী-রাসূলগণ আগমন করেন সকল মানুষের মুক্তিদাতা হিসেবে। তাঁরা সাথে করে জ্ঞানভান্ডার নিয়ে আসেন। মানুষকে তাঁরা মূর্খতার অন্ধকার হতে মহাসত্যের দিকে নিয়ে আসেন এবং আলোর পথের পথিক করেন। বস্তুত মহাসত্যের ধর্মই হলো, তাঁর অনুসারীকে অন্ধকার হতে আলোর জগতে আনয়ন করা। মহাসত্যের বাহক হযরত মূসা (আ:) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন-

وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِآيَاتِنَا أَنْ أَخْرِجْ قَوْمَكَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوْرِ وَذَكِّرْهُمْ بِأَيَّامِ اللَّهِ طَ إِنَّ فِي ذَالِكَ لَآيَاتٍ لِّكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ -

আমি মূসাকে অবশ্যই নিদর্শনসমূহ দিয়ে (তার জাতির কাছে) পাঠিয়েছি, আমি আদেশ দিয়েছিলাম, তুমি বের করে নিয়ে এসো তোমার জাতিকে (মূর্খতার) অন্ধকার থেকে (মহাসত্যের) আলোতে এবং তুমি তাদের আল্লাহর (অনুগ্রহের বিশেষ) দিনগুলোর কথা স্মরণ করাও; যারা একান্ত ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞতাপরায়ণ, তাদের জন্যে এ (ঘটনার) মাঝে (অনেক) নিদর্শন রয়েছে। (সূরা ইবরাহীম-৫)

নবুয়‍্যাত এবং রিসালাত চেষ্টা-সাধনা করে লাভ করার কোনো জিনিস নয়। মহান আল্লাহর পক্ষ হতে এটা একটি শ্রেষ্ঠতম নিয়ামত। তিনি যাকে ইচ্ছা তাঁকে এই নিয়ামত দানে ধন্য করেছেন। তাঁর সৃষ্টি মানুষের মধ্যে মহান আল্লাহ তা'য়ালা যাকে যোগ্য বিবেচনা করেছেন তাঁকেই তিনি নবুয়‍্যাত দান করেছেন। পৃথিবীতে মানুষ দায়িত্ব বলতে যা বুঝে, অর্থাৎ যত কঠিন দায়িত্ব এই পৃথিবীতে থাকতে পারে, এর মধ্যে নবুয়‍্যাতের দায়িত্ব হলো সবচেয়ে কঠিন। সাধারণ কোনো মানুষ এই দায়িত্ব এবং এর পরিধি সম্পর্কে কল্পনাও করতে পারে না।

যে কোনো মানুষের পক্ষে এই দায়িত্ব আঞ্জাম দেয়া সম্ভব নয়। এ কারণে মহান আল্লাহ এই দায়িত্ব যার ওপরে অর্পণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন তাঁকে তাঁর মাতৃগর্ভ থেকেই উপযুক্ত করে গড়েছিলেন। এই দায়িত্ব যে কত কঠিন নবী করীম (সা:) কে মহান আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন-

إِنَّا سَنُلْقِي عَلَيْكَ قَوْلاً ثَقِيلاً -

অচিরেই আমি আপনার ওপর একটি ভারী (গুরুত্বপূর্ণ বাণী সদৃশ) কিছু রাখতে যাচ্ছি। (সূরা মুয্যাম্মিল-৫)

দায়িত্ব যিনি অর্পণ করেন সেই আল্লাহই বলেছেন, এই দায়িত্ব অত্যন্ত কঠিন। উল্লেখিত আয়াতে এই দুর্বহ দায়িত্বের কথা তিনি তাঁর নবীকে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন। নবুয়‍্যাত এবং রেসালাত চেষ্টা-সাধনা করে লাভ করার কোনো জিনিস নয়। মহান আল্লাহর পক্ষ হতে এটা একটি শ্রেষ্ঠতম নিয়ামত। তিনি যাকে ইচ্ছা তাঁকে এই নিয়ামত দানে ধন্য করেছেন। তাঁর সৃষ্টি মানুষের মধ্যে মহান আল্লাহ যাকে যোগ্য বিবেচনা করেছেন তাঁকেই তিনি নবুয়‍্যাত দান করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন-

وَاللَّهُ يَخْتَصُّ بِرَحْمَتِهِ مَنْ يَشَاءُ طَ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ

আল্লাহ তা'য়ালা যাকে চান তাকেই তাঁর অনুগ্রহে বিশেষভাবে বেছে নেন; আল্লাহ তা'য়ালা অত্যন্ত অনুগ্রহশীল। (সূরা বাকারা-১০৫)

ذَالِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيْهِ مَنْ يَشَاءُ طَ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ

(রাসূল পাঠানো) এটা আল্লাহর এক বিরাট অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তাকে তিনি এটা দান করেন; আল্লাহ তা'য়ালা মহা অনুগ্রহশীল। (সূরা আল জুমুয়া-৪)

নবুয়‍্যাত এবং রিসালাত বংশগতভাবে বা উত্তরাধিকার সূত্রেও লাভ করা যায় না। আল্লাহ তা'য়ালা যাকে পছন্দ করেছেন, তাঁকেই তিনি নবী বা রাসূল হিসেবে মনোনীত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন-

اللَّهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلَائِكَةِ رُسُلاً وَّمِنَ النَّاسِ طَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعُم بَصِيْرٌ -

আল্লাহ তা'য়ালা (তাঁর ওহী বহন করার জন্যে) ফিরিশতাদের মধ্য থেকে বাণীবাহক মনোনীত করেন, মানুষদের ভেতর (তিনি এটা করেন) অবশ্যই আল্লাহ তা'য়ালা সবকিছু শোনেন ও সবকিছু দেখেন। (সূরা হজ্জ্ব-৭৫)

মহান আল্লাহর বাছাই নীতি সম্পর্কে সূরা আলে ইমরানে ঘোষণা করেছেন-

إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ

নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'য়ালা আদম, নূহ ও ইবরাহীমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরদের সৃষ্টিকুলের ওপর (নেতৃত্ব করার জন্যে) বাছাই করে নিয়েছেন। (সূরা আলে ইমরান-৩৩)

মহান আল্লাহর দেয়া এই নবুয়‍্যাতের দায়িত্ব যেমন কঠিন তেমনি এই দায়িত্ব যিনি লাভ করেছিলেন তাঁর সম্মান-মর্যাদা পৃথিবীতে সকলের তুলনায় সর্বোচ্চে। নবী করীম (সা:)-এর বিরোধিরা যতগুলো কারণে তাঁর বিরোধিতা করতো তাঁর মধ্যে এটাও একটি কারণ ছিল যে, এই দায়িত্ব লাভ করা অত্যন্ত সম্মান-মর্যাদার ব্যাপার। এই দায়িত্ব লাভ করবে সমকালীন দেশ-সমাজের প্রতিষ্ঠিত নেতৃবৃন্দ। আব্দুল্লাহর ইয়াতিম সন্তান মুহাম্মাদ (সা:) এই দায়িত্ব কিছুতেই লাভ করতে পারে না। এই ধারণার বশবর্তী হয়েও তারা বিরোধিতা করতো।

মহান আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের চিন্তা চেতনা এবং পছন্দ অনুসারে তাঁর নবুয়্যাত- রিসালাত বন্টন করেন না। এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মালিক স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা। তিনি বলেন-

اللَّهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ ط

আল্লাহ তা'য়ালা ভালো করেই জানেন তাঁর নবুয়‍্যাত তিনি কোথায় রাখবেন। (সূরা আনয়াম-১২৪)

এই পৃথিবীতে বিশাল ক্ষমতা লাভ করা, বিপুল ধন-ঐশ্বর্যের অধিকারী হওয়া বা বংশের দিক দিয়ে উচ্চ বংশীয় হওয়া, আর নবুয়‍্যাত বা রিসালাত পাওয়া এক কথা নয়। এ সবের সাথে নবী বা রাসূল নির্বাচিত হওয়ার দূরতম সম্পর্কও নেই। রিসালাত লাভ করা বা নবুয়‍্যাত লাভ করার জন্য যে চরিত্র বা গুণাবলীর প্রয়োজন ছিল, এসব গুণাবলীর মধ্যে ধন-ঐশ্বর্য থাকতে হবে এমন কোনো শর্ত কখনোই ছিল না। নবুয়‍্যাত বা রিসালাত একান্তভাবে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দান বিশেষ। তিনি এ জন্য যাঁকে নির্বাচিত করেছিলেন তাঁকেই তিনি তা অর্পণ করেছিলেন।

মানুষের কামনা-বাসনা বা চাহিদা অনুযায়ী নবী বা রাসূল নির্বাচিত করা হয়নি। নবী করীম (সা:) এর সময়ে ইসলাম বিরোধিরা দাবী করতো, নবী হলে হতে পারে মক্কার ঐশ্বর্যশালী নেতৃবৃন্দ বা তায়েফের ধনাঢ্য নেতারা। অর্থাৎ তাদের ধারণা ছিল, নবী হবার গুণাবলীর মধ্য এটাও অনিবার্যভাবে অন্যতম গুণাবলী যে, তাদেরকে ধনাঢ্য এবং সমাজের নেতা হতে হবে। মহান আল্লাহর নীতি তাদের ধারণার বিপরীত। নবুয়‍্যাত বা রিসালাতের সাথে ধন-ঐশ্বর্য, রাজত্ব বা প্রশাসনিক কর্তৃত্বের আদৌ কোনো সাদৃশ্য নেই। এদু'টো দিকের মধ্যে বিশাল পার্থক্য বিরাজমান।

নবুয়‍্যাত বা রিসালাত আধুনিক যুগের পীরবাদ বা মধ্যযুগীয় রাজতন্ত্রের মত বংশানুক্রমিকভাবে সংক্রমিত বা বন্টিত হয়নি। এই মহানিয়ামত উত্তরাধিকার সূত্রেও লাভ করা যায়নি। নবীর সন্তান শুধু এ কারণে নবী হতে পারেননি যে, তিনি নবীর সন্তান। নবীর সন্তান হলেও তিনি নবী হতে পারেন না। হযরত নূহ (আ:) এর সন্তান নবী হতে পারেনি। কারণ তার মধ্যে সে গুণাবলী ছিল না। দু'তিনজন নবীর সন্তান নবী হয়েছেন, কেননা তাদের মধ্যে নবী হবার অনুরূপ গুণাবলী বর্তমান ছিল এবং তদানীন্তন যুগেরও দাবী ছিল একজন নবী বর্তমান থাকা প্রয়োজন। মহান আল্লাহ তা'য়ালা সে প্রয়োজন পূরণের জন্য কোনো কোনো নবীর সন্তানকেও নবী হিসেবে নির্বাচিত করেছেন।

যে সকল নবীর সন্তানকে নবী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে, সে সন্তান কোন্ ধরণের গুণাবলী সম্বলিত ছিলেন, তা আমরা তাদের জীবনের দিকে তাকালেই স্পষ্ট অনুভব করতে পারি। কিশোর সন্তান হযরত ইসমাঈল (আ:) কে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ:) আল্লাহ তা'য়ালার সন্তুষ্টির জন্য কুরবানী করতে নিয়ে গেলেন, তখন হযরত ইসমাঈল (আ:) একজন নবীর মতই আচরণ করেছিলেন। সে সময় তাঁর এলাকার জন্য একজন নবীর প্রয়োজনও ছিল।

মহান আল্লাহ তা'য়ালার নীতি হলো, তিনি নবুয়‍্যাত এবং রিসালাত এমন কোনো ব্যক্তিকে দান করেননি, যে ব্যক্তির মধ্যে মুমিনসুলভ গুণাবলী ছিল না। অর্থাৎ কোনো কাফির ব্যক্তিকে তিনি নবুয়‍্যাত এবং রিসালাত দান করেননি। কিন্তু তিনি ধন ঐশ্বর্য কাফিরকেও দান করেন আবার মুমিনকেও দান করেন। রাষ্ট্র ক্ষমতা বা বাদশাহীও তিনি কোনো কাফির বা তাঁর কোনো অবাধ্য বান্দাহকে দান করে থাকেন। কিন্তু নবুয়‍্যাত এবং রিসালাত সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। নবুয়‍্যাত এবং রিসালাতের যখন প্রয়োজন ছিল তখন তিনি তা দান করেছেন এমন এক ব্যক্তিকে, যে ব্যক্তি তদানীন্তন পৃথিবীতে আল্লাহ তা'য়ালাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করেছেন এবং সকল মানুষের তুলনায় সকল দিক দিয়ে সর্বোত্তম ছিলেন।

হযরত মূসা (আ:) কে যখন মহান আল্লাহ নবী হিসেবে নির্বাচিত করলেন, তখন ফিরাউন দম্ভভরে তার জাতিকে বলেছিল-

وَنَادَى فِرْعَوْنُ فِي قَوْمِهِ قَالَ يَا قَوْمِ أَلَيْسَ لِي مُلْكُ مِصْرَ وَهَذِهِ الْأَنْهَارُ تَجْرِي مِنْ تَحْتِي جَ أَفَلَا تُبْصِرُوْنَ طَ أَمْ أَنَا خَيْرٌ مِّنْ هَذَا الَّذِي هُوَ مَهِينٌ لَا وَلَا يَكَادُ يُبَيِّنُ

(একদিন) ফিরাউন তার জাতিকে ডাকলো এবং বললো, হে আমার জাতি (তোমরা কি বলো), মিসরের রাজত্ব আমার জন্যে নয়? এ নদীগুলো কি আমার (প্রাসাদের) নীচে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে না? আমি কি সে ব্যক্তি থেকে শ্রেষ্ঠ নই যে (খুব) নীচু (জাতের লোক) এবং সে তো (নিজের) কথাগুলো পর্যন্ত স্পষ্ট করে বলতে পারে না'। (সূরা যুখরুফ-৫۱-৫২)

ফিরাউন তার এই কথা দিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের সপক্ষে প্রমাণ দিতে চেয়েছে। সে বলেছে, সমস্ত বাদশাহী আমার এবং সকল কিছুই আমার অধীন। আমি বিশাল ক্ষমতার অধিকারী। আমি ধনাঢ্য রাজবংশের সম্মানিত সন্তান। আর মূসার বংশ রাজবংশ নয়, আমার থেকে নীচ। সে বাগ্মী নয় এবং নিজের বক্তব্য বুঝিয়ে বলায় সক্ষম নয়। সুতরাং সে ব্যক্তি কিছুতেই আমার চেয়ে উচ্চ হতে পারে না। হযরত মূসা (আ:) যখন তাঁর ওপরে অর্পিত নবুয়‍্যাতের দায়িত্ব পালন শুরু করেছিলেন তখন ফিরাউন এসব কথা বলেছিল। অর্থাৎ তাঁর ধারণা ছিল, নবী হবে কোনো অসীম ক্ষমতাশালী এবং ধনাঢ্য ব্যক্তি।

হযরত ইবরাহীম (আ:) এর সময়ে নমরুদও এই ক্ষমতার বড়াই করেছিল। সে বলেছিল, আমি ইচ্ছা করলে কাউকে এই মুহূর্তে হত্যা করতে পারি এবং ইচ্ছে করলে এই মুহূর্তে কাউকে জীবিত ছেড়ে দিতে পারি। অর্থাৎ সে তার রাষ্ট্র ক্ষমতার গর্ব করেছিল। সকল ক্ষমতা যখন তারই হাতে তাহলে তো তারই নবী হবার কথা। তা না হয়ে তারই অনুগত এক কর্মচারীর সন্তান যার কোনো ধন সম্পদ নেই, সে হবে নবী এটা কি করে গ্রহণ করা যায়?

নবুয়‍্যাত এবং রিসালাতের প্রয়োজন যতক্ষণ ছিল ততক্ষণ মহান আল্লাহর যে নীতি ছিল, তাহলো তিনি কোনো মহিলাকে এই কঠিন দায়িত্ব অর্পণ করেননি। এই দায়িত্ব পালন করার জন্য যে কঠিন ত্যাগ তিতীক্ষা ও সংগ্রাম করতে হয় তা সৃষ্টিগতভাবে নারীর পক্ষে সম্ভব নয়। তাদের শারীরিক গঠন এই দায়িত্ব পালনের উপযোগী নয়। এই কারণে তাদেরকে নবী বা রাসূল নির্বাচিত করা হয়নি। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন-

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالاً تُوْحِي إِلَيْهِم مِّنْ أَهْلِ الْقُرَى ط

(হে মুহাম্মাদ স.) আপনার পূর্বে বিভিন্ন জনপদে যতো নবী আমি পাঠিয়েছিলাম, তারা সকলেই (আপনার মতো পুরুষ) মানুষই ছিলো, আমি তাদের ওপর ওহী প্রেরণ করতাম। (সূরা ইউসুফ-১০৯)

মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন-

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالاً تُوْحِي إِلَيْهِمْ فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ لا

(হে নবী,) আমি আপনার পূর্বেও (এ) মানুষদের মধ্য থেকেই (কিছু ব্যক্তিকে) রাসূল বানিয়ে প্রেরণ করেছি, যাদের ওপর আমি ওহী পাঠিয়েছি। অতএব যদি তোমরা না জানো তাহলে কিতাবধারীদের জিজ্ঞেস করো। (সূরা নাহল-৪৩)

নবুয়্যাত এবং রিসালাতের ক্ষেত্র অত্যন্ত বিশাল বিস্তীর্ণ। এর সামনে রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এর আন্দোলন একান্তই ভিত্তিগত এবং মৌলিক এবং একান্তভাবেই মহান আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি ঈমান গ্রহণের, আল্লাহর দাসত্ব বরণের, আলমে আখিরাতের ওপরে ঐকান্তিক দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণের। এর আহ্বান আল্লাহর দেয়া জীবন বিধান অনুসরণ করার এবং এই পৃথিবীর জীবনের তুলনায় পরকালের জীবনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার।

সুতরাং পৃথিবীর কোনো ক্ষমতাশালী শাসক বা বাদশাহকে নবী-রাসূল হতে হবে বিষয়টি এমন ছিলো না। মহান আল্লাহ তা'য়ালা ইচ্ছা করলে তা করতে পারতেন। যেমন করেছিলেন হযরত দাউদ ও তাঁর সন্তান হযরত সুলাইমান (আ:) কে। তাঁরা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীও ছিলেন এবং বাদশাহও ছিলেন। নবী করীম (সা:) ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান ছিলেন। আল্লাহ তা'য়ালার বিধান বাস্তবায়ন করার জন্য রাষ্ট্রশক্তি অর্জন করা একান্ত প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যেই নবী করীম (সা:) রাষ্ট্রশক্তি অর্জন করেছিলেন। এই রাষ্ট্রশক্তির মাধ্যমেই তিনি আল্লাহ তা'য়ালা প্রদত্ত বিধান পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করেছেন।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 কেনো নবুয়্যাতের প্রয়োজন?

📄 কেনো নবুয়্যাতের প্রয়োজন?


পৃথিবীর একজন বিজ্ঞানী একটি জটিল যন্ত্র প্রস্তুত করলেন। তারপর তা বিশ্ব বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে বাজারজাত করলেন। অসংখ্য মানুষ তা ক্রয় করে বাড়িতে এনে দেখলো এই যন্ত্রের ভেতরে (Operating Guide) অপারেটিং গাইড নেই। যে বিজ্ঞানী উক্ত যন্ত্র প্রস্তুত করেছেন তিনি কাউকেই উক্ত যন্ত্র পরিচালনা করা শিখাননি বা যন্ত্রের সাথে কোনো Operating Guide দেননি। তখন বাধ্য হয়েই ক্রেতা সাধারণ যে কোম্পানীর কাছ থেকে যন্ত্র ক্রয় করেছে সে কোম্পানীর কাছে ধর্ণা দেবে। কোম্পানী ধর্ণা দেবে যন্ত্রের প্রস্তুত কর্তার কাছে। অর্থাৎ যন্ত্রের আবিষ্কারকের দায়িত্ব হলো Operating Guide যন্ত্রের সাথে দিয়ে দেয়া。

এই পৃথিবীতে মহান আল্লাহ মানুষ প্রেরণ করেছেন। এই মানুষকে সহজ সরল ও সত্য পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব হলো মহান আল্লাহর। মহান আল্লাহ বলেন-

وَعَلَى اللَّهِ قَصْدُ السَّبِيْلِ وَمِنْهَا جَائِرٌ ط

আল্লাহ তা'য়ালার ওপরই (নির্ভর করে মানুষদের) সরল পথ নির্দেশ করা, (বিশেষ করে) যেখানে (অন্য পথের) মধ্যে কিছু বাঁকা পথও রয়েছে। (সূরা নাহল-৯)

কেননা মহান আল্লাহ হলেন মানুষের রব বা প্রতিপালক। মানুষের জীবনের যতগুলো দিক রয়েছে, সকল দিকের পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব হলো মহান আল্লাহ তা'য়ালার। পৃথিবীর মানুষের জন্য চিন্তা এবং চলার বহু ধরনের পথ অবলম্বন করা সম্ভব এবং বাস্ত বে তার অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু এ সকল পথের সবগুলো পথ কোনক্রমেই সত্য বা সহজ- সরল হতে পারে না। পারে মাত্র একটি পথ। আর একমাত্র সঠিক এবং সহজ সরল ও নির্ভুল জীবন দর্শন তাই হতে পারে যা সত্যের ওপরে প্রতিষ্ঠিত। এ কারণে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো, সত্য পথ কোনটি তা অনুসন্ধান করে বের করা।

এই বিষয়টি মানুষের জীবনের মৌলিক প্রয়োজন। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে তাঁর জীবন ধারণের জন্য এই পৃথিবীতে যা কিছু প্রয়োজন হবে, মহান আল্লাহ তাকে প্রেরণের পূর্বেই এখানে প্রস্তুত করে রেখেছেন। অর্থাৎ পৃথিবীর সকল বস্তু মানুষের প্রয়োজন পূরণের জন্য। কিন্তু এসব বস্তু মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন যে নির্ভুল জীবন ব্যবস্থার, তা পূরণ করতে পারে না। এই জীবন ব্যবস্থার প্রয়োজন যদি মানুষের পূরণ না হয় তাহলে মানুষের সমগ্র জীবন ব্যর্থ হয়ে যাবে।

একটি বিষয় গভীরভাবে চিন্তা করে দেখার প্রয়োজন যে, মহান আল্লাহ তাঁর সেরা সৃষ্টি মানুষকে এই পৃথিবীতে প্রেরণ করার পূর্বে মানুষের জীবন ধারণের জন্য সকল কিছুর আয়োজন করে রেখেছেন, সেই আল্লাহ মানুষের সবচেয়ে জরুরী প্রয়োজন যে জীবন ব্যবস্থার, সেই জীবন ব্যবস্থা দান করবেন না এটা কিভাবে চিন্তা করা যায়? কোনো বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ এটা তো কল্পনাও করতে পারেন না। মহান আল্লাহ মানুষের এই প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করেছেন তাঁর নবুয়‍্যাত ব্যবস্থার মাধ্যমে।

এখন কোনো মানুষ যদি গোটা নবুয়্যাত ব্যবস্থাকে অস্বীকার করতে আগ্রহী হয় তা সে হতে পারে এবং সে স্বাধীনতা তার রয়েছে। সেই সাথে বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তার কাছে বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করতে চায়, নবুয়্যাত ব্যবস্থা অস্বীকার করার পরে মানুষকে সত্য পথ প্রদর্শনের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তা'য়ালা আর কি ব্যবস্থা করেছেন, তা দয়া করে জানিয়ে দিতে হবে। তিনি হয়ত এই প্রশ্নের জবাবে বলবেন, সত্য পথ অনুসন্ধান করার জন্যই তো মহান আল্লাহ তাঁর সেরা সৃষ্টি এই মানুষকে জ্ঞান বিবেক-বুদ্ধি এবং অনুসন্ধানী দৃষ্টি দান করেছেন।

আমরা আবারো তাকে বিনয়ের সাথে জানাতে চাই, সত্য'সহজ সরল পথ আবিষ্কারের ক্ষেত্রে মানুষের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার প্রমাণ হলো, মানুষ ইতোমধ্যেই তার চিন্তাশক্তি প্রয়োগ করে বহু পথ ও মত আবিষ্কার করেছে। তারপরেও মানুষ আল্লাহর প্রতি এ অভিযোগ করতে পারে না যে, তিনি আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেননি। তিনি আমাদের জীবন ধারণের জন্য সকল কিছুর ব্যবস্থা এই পৃথিবীতে করেছেন, কিন্তু আমরা কোন্ জীবন দর্শন অনুসরণ করবো তা তিনি আমাদেরকে জানানোর ব্যবস্থা করেননি। এই অভিযোগ মহান আল্লাহর প্রতি করার কোনো অবকাশ তিনি মানুষের জন্য রাখেননি।

মহান আল্লাহ এই পৃথিবীর সকল সৃষ্টির পথ প্রদর্শনের ব্যবস্থা তার জন্মের সাথে সাথেই করেছেন। কেবল মাত্র ব্যতিক্রম হলো মানুষ। মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি জ্ঞান এবং স্বাধীন ক্ষমতাসম্পন্ন করে তিনি সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর ইচ্ছা ছিল এমন একটি স্বাধীন ক্ষমতাসম্পন্ন সৃষ্টিকে অস্তিত্ব দান করা, যে সৃষ্টি তার নিজের খেয়াল খুশী অনুসারে নির্ভুল অথবা ভুল যে কোনো পথ গ্রহণ করতে পারে। জীবন ব্যবস্থা অনুসরণ করার ব্যাপারে মানুষ স্বাধীন। মানুষের এই স্বাধীনতা ব্যবহার করার জন্য মানুষকে জ্ঞান নামক হাতিয়ার দান করা হয়েছে। তার মধ্যে বুদ্ধি এবং চিন্তার জগৎ সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে।

মানুষের মধ্যে ইচ্ছা ও সংকল্প গ্রহণের শক্তি দান করা হয়েছে। মানুষ যেন তার ভেতরের এবং এই পৃথিবীর বস্তু নিচয় ব্যবহার করতে পারে এমন শক্তি ও জ্ঞান দান করা হয়েছে। সেই সাথে তার মনের জগতে এবং তার দেহের বাইরের জগতে এমন সব বস্তু রাখা হয়েছে, এসব কিছু তার সত্য পথ গ্রহণের ব্যাপারেও সাহায্য করতে পারে। আবার ভুল পথ গ্রহণের ব্যাপারেও সহযোগিতা করতে পারে। পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণী এবং বস্তুর ন্যায় মানুষকে জন্মগতভাবে জীবন ব্যবস্থা অবলম্বনকারী হিসেবে সৃষ্টি করে দিলে সৃষ্টির সকল কিছুই অর্থহীন হয়ে যেত।

অন্যান্য বস্তুর মতো মানুষের যদি স্বাধীন ক্ষমতা না থাকতো, তাহলে মানুষের পক্ষে উন্নতির চরম শিখরে আরোহন করা কোনক্রমেই সম্ভব হতো গড়ে উঠতো না। এ কারণে মহান আল্লাহ মানুষকে জন্মগতভাবে জীবন ব্যবস্থা অনুসরণকারী হিসেবে সৃষ্টি না করে এমন স্বাধীন ক্ষমতা সম্পন্ন করে সৃষ্টি করেছেন, যেন মানুষের জন্য সত্য পথ প্রদর্শনকারীর প্রয়োজন হয়। এখানেই প্রয়োজন হয় নবুয়্যাত এবং রিসালাতের। এই জিনিস মানুষ গ্রহণ করে সত্য পথও অবলম্বন করতে পারে এবং তার স্বাধীনতাও বজায় থাকে। মহান আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের প্রতি এতই অনুগ্রহশীল যে, তিনি পৃথিবীতে মানুষের চলার জন্যও পথ নির্দেশ দান করেছেন।

মানুষ মরুপথে চলবে, সে যেন পথ হারিয়ে না ফেলে এ জন্য আকাশে তারকা সৃষ্টি করে তাকে পথের সন্ধান দান করেছেন। মরুপথে এবং পানি পথে মানুষ দিক ঠিক রাখে আকাশের তারকা দেখে। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাঁর মহান অনুগ্রহের কথা মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। পাহাড়ী এলাকা দিয়ে মানুষ পথ চলবে সে কারণে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাহর জন্য পাহাড়ী এলাকায় চলার পথ সৃষ্টি করেছেন। মরুপ্রান্তরে মানুষ যেন পানির তৃষ্ণায় ইন্তেকাল না করে, একারণে মরুভূমির বিভিন্ন স্থানে জলাশয় সৃষ্টি করেছেন। এমন ধরনের কতিপয় গাছ সৃষ্টি করেছেন যে গাছের ভেতর থেকে মানুষ পানি লাভ করতে পারে।

মরুভূমিতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাহর জন্য নানা ধরনের খাদ্য মওজুদ রেখেছেন। পাহাড়ে ঝর্ণা সৃষ্টি করে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাহর পানির অভাব দূর করেছেন। এতসব ব্যবস্থা যে আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের জন্য করেছেন সেই মহান আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর বান্দাহর জন্য পৃথিবীতে কোনো জীবন ব্যবস্থার প্রয়োজন পূরণ করবেন না, এটা কি মেনে নেয়া যায়? বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে বা সাগর বক্ষে তাঁর বান্দাহ যেন পথ হারিয়ে না যায়, এ জন্য মহান আল্লাহ তা'য়ালা আকাশে তারকা প্রজ্জ্বলিত করেছেন, অথচ এই পৃথিবী নামক অন্ধকার গ্রহে তিনি মহাসত্যের তারকা প্রজ্জ্বলিত করবেন না এটা কি সুষ্ঠু বিবেক-বুদ্ধি মেনে নিতে পারে?

মহান আল্লাহ তা'য়ালা প্রতিটি বস্তু এবং প্রাণীর আকৃতি দান করেছেন এবং সকল বস্তুকে তিনিই পথ প্রদর্শন করে থাকেন। পথ প্রদর্শনের এই দায়িত্ব একান্তভাবেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজের ক্ষমতায় রেখেছেন। তিনি তাঁর সৃষ্টির প্রতিটি বস্তু এবং প্রাণীকে তার অবস্থা এবং প্রয়োজন অনুসারে পথ প্রদর্শন করছেন। মহান আল্লাহ তা'য়ালা বিশ্বব্যাপী পথ নির্দেশকের মর্যাদার অপরিহার্য দাবী হলো এই যে, তিনি মানুষের সচেতন জীবনের পথ প্রদর্শনের জন্য এমন পদ্ধতি অবলম্বন করবেন না, যে পদ্ধতি পশু পাখির জন্য নির্ধারিত। যে পদ্ধতি প্রাণী জগতের জন্য উপযোগী সে পদ্ধতি তিনি মানুষের জন্য অবলম্বন করেননি। তিনি মানুষের জন্য উপযোগী পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন, এই মানুষের ভেতর থেকেই একজনকে নবী বা রাসূল হিসেবে নির্বাচিত করে তাঁর মাধ্যমে পথ নির্দেশ দান করেন।

নবী এবং রাসূল মানুষের জ্ঞান বিবেক এবং বুদ্ধির প্রতি আবেদন জানিয়ে তাদেরকে সহজ সরল পথ প্রদর্শন করেন। সুতরাং মহান আল্লাহ তা'য়ালা শুধু এই পৃথিবী এবং এর ভেতরে যা কিছু আছে তার স্রষ্টাই নন, তিনি সকলকিছুর পথ প্রদর্শক এবং করুণাময় শিক্ষকও বটে। তিনিই সকল সৃষ্টিকে শিক্ষা দান করে থাকেন। ভূমিষ্ঠ হবার পরে মানব শিশুকে অনুগ্রহ করে তিনিই শিক্ষা দান করেন, 'তোমার গর্ভধারিণীর বুকে আমি তোমার উপযোগী খাদ্য বহু পূর্বে প্রস্তুত করে রেখেছি। ওখানে মুখ দিয়ে চুষতে থাকো। উপাদেয় খাদ্য তুমি লাভ করবে'। এভাবে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর সকল সৃষ্টিকেই শিক্ষাদান এবং পথ প্রদর্শন করেন।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 নবুয়্যাত সম্পর্কিত জ্ঞান

📄 নবুয়্যাত সম্পর্কিত জ্ঞান


মহান আল্লাহ তা'য়ালা পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং এ মানুষকে দিয়েই মানুষের বংশধারা বৃদ্ধি করছেন। আল্লাহ তা'য়ালা যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করছেন আবার যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করছেন। কাউকে আবার তিনি বন্ধ্যা বানিয়েছেন। আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন-

ط لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ط يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ طَ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ لَا أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا جِ وَيَجْعَلُ مَنْ يَّشَاءُ عَقِيمًا إِنَّهُ عَلِيمٌ قَدِيرٌ -

আকাশমন্ডলী ও যমীনের (সমুদয়) সার্বভৌমত্ব (একমাত্র) আল্লাহ তা'য়ালার জন্যে; তিনি যা ইচ্ছা তাই সৃষ্টি করেন; যাকে চান তাকে কন্যা সন্তান দান করেন, আবার যাকে চান তাকে পুত্র সন্তান দান করেন, যাকে চান পুত্র কন্যা (উভয়টাই) দান করেন, (আবার) যাকে চান তাকে তিনি বন্ধ্যা করে দেন; নিঃসন্দেহে তিনি বেশি জানেন, ক্ষমতাও তিনি বেশি রাখেন। (সূরা আশ শূরা-৪৯-৫০)

এই মানুষকে মহান আল্লাহ তা'য়ালা পৃথিবীতে এমন এক অবস্থায় নিয়ে আসেন যখন সে মানুষের কোনো চেতনাই থাকে না। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

وَاللَّهُ أَخْرَجَكُم مِّن بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا لَا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَا لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

আল্লাহ তা'য়ালা তোমাদের মায়ের পেট থেকে (এমন এক অবস্থায়) বের করে এনেছেন যে, তোমরা (তার) কিছুই জানতে না, অতপর তিনি তোমাদের কান, চোখ ও হৃদয় দিয়েছেন, যাতে করে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো। (সূরা আন নাহল-৭৮)

আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, মানুষকে আমি এমন এক অবস্থায় তার মায়ের গর্ভ থেকে এই পৃথিবীতে নিয়ে এসেছি, যে সময় তার কোনো চেতনাই ছিল না। পেটের ক্ষুধায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হলেও তার বলার ক্ষমতা ছিল না যে, তার ক্ষুধা পেয়েছে। সেই সাথে তাকে আমি তিনটি জিনিস দান করেছি। তাকে শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি দান করেছি এবং চিন্তা করার মত মগজ দিয়েছি। তার শরীরের ত্বকের ভেতরে স্পর্শ অনুভূতি দান করেছি। নাক দান করেছি ঘ্রাণ গ্রহণ করার জন্য। এভাবে তাকে আমি সুন্দর করে সাজিয়েছি। তার যা যেখানে প্রয়োজন আমি দান করেছি। তার মাতা-পিতা এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের ভেতরে তার জন্য অসীম মায়া-মমতা সৃষ্টি করেছি। সে পৃথিবীতে চোখ খুলেই দেখতে পায়, এই পৃথিবীর সকলকিছুই তাকে প্রতিপালন করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। সৃষ্টির সকল কিছুই তার সেবায় নিয়োজিত করেছি। মানুষের জন্য যে যোগ্যতা প্রয়োজন আমি তা দান করেছি। মানুষের ভেতরে ভারসাম্য রক্ষার জন্য কোনো কোনো যোগ্যতা কারো মধ্যে বেশি দান করেছি। আবার তা কারো মধ্যে কম দান করেছি। এভাবে ভারসাম্য রক্ষা না করলে কেউ কারো মুখাপেক্ষী হতো না। একজন মানুষ আরেকজনের পরোয়া করতো না এবং মানুষের যোগ্যতার কোনো মূল্যায়ন হতো না।

যে জিনিসের প্রয়োজন যতবেশি মহান আল্লাহ তা'য়ালা তা অধিক পরিমাণে সৃষ্টি করেছেন। এই পৃথিবীর জন্য কর্মীর প্রয়োজন অধিক, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তা অধিক পরিমাণে সৃষ্টি করেছেন। বড় বড় বিজ্ঞানী, সেনাপতি, তাত্ত্বিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষের প্রয়োজন কম, সুতরাং আল্লাহ তা কম পরিমাণেই সৃষ্টি করেছেন। এ জাতিয় মানুষের সংখ্যা তিনি ঘরে ঘরে সৃষ্টি করেননি। কারণ এই ধরণের মানুষের অবদান এই পৃথিবীতে শতাব্দীর পরে শতাব্দী পর্যন্ত চলতে থাকে। সুতরাং এ ধরণের দুর্লভ যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ পৃথিবীর জন্য যে কয়জন প্রয়োজন মহান আল্লাহ তাই সৃষ্টি করেছেন। তাদের একজনের যে অবদান শতকোটি মানুষ ঐ একজন মানুষের চিন্তাধারা দ্বারাই উপকৃত হতে থাকে। আবার এ মানুষকে মহান আল্লাহ তা'য়ালা কোন্ স্তরে পৌঁছে দেন তা দেখুন-

وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ ثُمَّ يَتَوَفَّاكُمْ قِف وَمِنْكُم مَّن يُرَدُّ إِلَى أَرْذَلِ الْعُمُرِ لِكَيْ لَا يَعْلَمَ بَعْدَ عِلْمٍ شَيْئًا طَ إِنَّ اللَّهَ عَلِيْمٌ قَدِيرٌ -

আল্লাহ তা'য়ালাই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, অতপর তিনিই তোমাদের মৃত্যু দিবেন। তোমাদের কোনো ব্যক্তি (এমনও হবে যে, সে) বৃদ্ধ বয়সের দুর্বলতম স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, এতে করে (কৈশোরের এবং যৌবনে কোনো বিষয়ে) জানার পর সে (পুনরায়) অজ্ঞ হয়ে যাবে, আল্লাহ তা'য়ালা অবশ্যই সর্বজ্ঞ, (তিনিই) সর্বশক্তিমান। (সূরা আন্ নাহল-৭০)

এটাই হলো মানুষের প্রকৃত অবস্থা। অথচ এই মানুষকেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নানা ধরনের বিদ্যায় পারদর্শী করে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের জন্য প্রকৌশলী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, স্থপতি, শাসক, শিল্পী, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, সেনাপতি, শিক্ষাবিদ, সমরবিদ, নানা ধরনের বিশেষজ্ঞ, সাহিত্যিক তথা যে ধরনের গুণাবলীসম্পন্ন ও যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষের প্রয়োজন মহান আল্লাহ তা'য়ালা তা মানব জাতিকে দান করেছেন।

কিন্তু এসবের তুলনায় মানুষের যেটা বড় প্রয়োজন, তাহলো মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তির জন্ম হতে হবে যিনি মানুষকে মহান আল্লাহর পথ প্রদর্শন করবেন। পৃথিবীর যে কোনো ধরণের বা যে কোনো যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষকে তাদের যোগ্যতা যেন আল্লাহ তা'য়ালার দেখানো বা তাঁর পছন্দ অনুযায়ী পথে প্রকাশ হয়, সে পথ দেখানোর জন্য ব্যক্তির প্রয়োজন। পৃথিবীর খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞদের কাজ হলো তারা পৃথিবীর ভেতরে কি কি বস্তু আছে এবং কোনটির গুণাবলী, উপকারিতা কি এবং কোনটি কিভাবে ব্যবহার করতে হয়, ব্যবহারে লাভ ক্ষতি কি ইত্যাদী বিষয় সম্পর্কে পৃথিবীর মানুষকে অবগত করা।

কিন্তু সেই সাথে পৃথিবীর মানুষের জন্য এমন এক ব্যক্তির প্রয়োজন, যিনি এই মানব জাতিকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিবেন, এই পৃথিবীতে মানুষের আগমনের উদ্দেশ্য কি। কেনো তাকে অন্য সৃষ্টি হতে পৃথক করে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছে। মানুষকে কোন্ শক্তির দাসত্ব করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষ কার আইন-কানুন মেনে চলবে। যিনি পৃথিবীতে মানুষকে এত কিছু দান করেছেন, সেই দানকারীর ইচ্ছা কি। তিনি মানুষের কাছে কি চান। মানুষের জীবনের প্রকৃত সাফল্য কোন্ পথে আসতে পারে। ইত্যাদী বিষয় সম্পর্কে মানুষকে অবগত করবেন এমন ধরণের একজন ব্যক্তির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

মহান আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের এই প্রয়োজন কি পূরণ করেছেন? মানুষের শরীর চুলকানোর জন্য যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের হাতে নখ দান করেছেন, এই নখ দিয়ে মানুষ অসংখ্য প্রয়োজন পূরণ করে, বিভিন্নভাবে উপকৃত হয়। এতটা ক্ষুদ্র বিষয় যিনি উপেক্ষা করেননি, সেই আল্লাহ মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রয়োজনীয় দিক সম্পর্কে কি করে উপেক্ষা করতে পারেন? আল্লাহ তা'য়ালা যেমন প্রতিটি কর্ম এবং জ্ঞানের প্রতিটি শাখার জন্য যোগ্যতা ও গুণাবলীসম্পন্ন মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তেমনি এমন মানুষও তিনি সৃষ্টি করেছিলেন যাদের ভেতরে আল্লাহকে চেনা-জানার সবচেয়ে উন্নত যোগ্যতা বিদ্যমান ছিল। আল্লাহ তা'য়ালা বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদেরকে জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দান করেছিলেন। উন্নত চরিত্রের এবং মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় আইন-কানুন সম্পর্কে জ্ঞান দান করেছিলেন। পৃথিবীর সকল মানুষের শিক্ষক হিসেবে তাদেরকে প্রেরণ করেছিলেন। এই শ্রেণীর মানুষ যারা এসেছিলেন তাঁরাই হলেন নবী-রাসূল।

পৃথিবীতে মানুষ পরিণত বয়সে যে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়েছে, জন্মগতভাবে বা শৈশবকাল থেকেই তাদের মধ্যে ভিন্ন একটি প্রকৃতি পরিলক্ষিত হয়েছে বা হয়। দশটি শিশুর মধ্যে যে শিশুটি পৃথিবী বিখ্যাত কবি হিসেবে বয়সকালে আত্মপ্রকাশ করবে, সেই শিশুটি আর নয়টি শিশুর থেকে ভিন্ন প্রকৃতি ও অভ্যাস নিয়ে বড় হতে থাকে। নবীদের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনি। তাঁরা জন্মগতভাবেই এই পৃথিবীতে ভিন্ন প্রকৃতি ও অভ্যাস নিয়ে আগমন করেন। একজন স্বভাব কবির কবিতা শুনে আমরা অনুভব করতে পারি যে, এই ব্যক্তি কাব্য ক্ষেত্রে বিশেষ যোগ্যতা নিয়ে এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছেন। অন্য মানুষ চেষ্টা করেও তার মতো একছত্র কবিতা লিখতে পারবে না।

সুতরাং কোন্ মানুষ বয়সকালে কি ধরনের যোগ্যতাসম্পন্ন হবে শিশুকাল হতেই তার ভেতরে সে যোগ্যতার স্ফূরণ ঘটতে থাকে। তার চলাফেরা, আচার-আচরণ, ব্যবহার কথাবার্তায় মানুষ অনুমান করতে পারে, আজকের এই শিশু বড় হয়ে একদিন বিখ্যাত একজন হবে। তাদের কার্যাবলীর দ্বারা মানুষ সহজেই তাকে চিনে নেয়। কারণ এ সকল মানুষ তাদের কাজের মাধ্যমে এমন অসাধারণ যোগ্যতার প্রমাণ মানব সমাজে পেশ করেন যে, এ সকল কাজ অন্যদের দ্বারা সংঘটিত হবার সম্ভাবনা নেই।

মহান আল্লাহ যে নবী এবং রাসূল প্রেরণ করেন, তাদের অবস্থাও ঠিক তেমনি। তাদের চিন্তার জগতে এমন সব কথা এবং চিন্তা-চেতনার উদ্ভব হয়, যা অন্য কোনো মানুষের কখনো হয় না। তিনি এমন সব কথা বলেন, অন্য মানুষ সে কথা সম্পর্কে কখনো কল্পনা করেনি। তিনি এমন বিষয় বর্ণনা করেন, যে বিষয় সম্পর্কে পৃথিবীর অন্য মানুষের পক্ষে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তাঁর দৃষ্টি এমন সুক্ষ্ম বিষয়ের ভেতরে সহজেই প্রবেশ করে, যে বিষয় সম্পর্কে বিশেষজ্ঞগণ যুগের পর যুগ ধরে গবেষণা করেও সমাধানে পৌঁছতে পারেননি। সাধারণ মানুষ তাঁর মতো কথা এবং কর্ম করতে ইচ্ছা করলেও পারে না।

নবীর চরিত্র ও প্রকৃতি এতই পবিত্র এবং পরিচ্ছন্ন যে, তিনি প্রতিটি ব্যাপারেই ভদ্রজনোচিত ও সত্যনিষ্ঠ পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তিনি কখনো ভুল কথা বলেন না। দৃষ্টিকটু কোনো কর্ম করেন না। মানুষকে তিনি সব সময় উত্তম কথা ও কর্ম করতে আদেশ দান করেন। তিনি মানুষকে যা করতে আদেশ দান করেন প্রথমে তা নিজে করেন। তিনি মুখে যা বলেন তাঁর কাজের সাথে মিল থাকে। তাঁর কথা ও কাজের মাধ্যমে এ কথা প্রমাণ হয় না যে, তিনি তাঁর ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করবেন।

তিনি অন্যের ভালো করতে গিয়ে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করেন। কিন্তু নিজের কোনো স্বার্থ আদায় করতে গিয়ে অন্যের সামান্য ক্ষতি করেন না। তাঁর সমগ্র জীবন প্রস্তুত হয় সত্যতা, ভদ্রতা, মনের পরিচ্ছন্নতা, উত্তম চিন্তা ও উন্নত পর্যায়ের মানবতার আদর্শে। শতকোটি চোখ দিয়ে অনুসন্ধান করলেও নবীর চরিত্রে সামান্যতম দোষ খুঁজে পাওয়া যাবেচ্ছ না। সুতরাং তিনি যা বলেন, যা করেন মানুষের উচিত তা গ্রহণ করা এবং অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করা। কারণ পৃথিবীর অভিজ্ঞতা, নানা ধরণের পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ, সৃষ্টি জগতের প্রত্যক্ষ নিরীক্ষণের মাধ্যমে নবী এবং রাসূলের প্রতিটি কথা ও কর্ম সত্য বলে প্রমাণিত।

মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য মহান আল্লাহ যাকে দায়িত্ব দান করেছিলেন, আল্লাহর বিধান মানুষের মধ্যে প্রচার করার জন্য আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ হতে যাদেরকে মনোনীত করা হয়েছিলো, তাঁরাই ছিলেন নবী-রাসূল। এই দায়িত্বের অপর নামই হলো নবুয়‍্যাত বা রিসালাত। এই ধারা মহান আল্লাহ শেষনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা:) পর্যন্ত শেষ হয়েছে। কারণ, তাঁর নবুয়‍্যাত বিশ্বজনীন এবং তিনি হলেন বিশ্বনবী, সকল নবী-রাসূলদের মধ্যে তাঁকেই মহান আল্লাহ সর্বোচ্চ মর্যাদার সোপানে উপনীত করেছেন। এ কারণে তাঁর মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্য রেখেই আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর আদর্শই সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে অনুসরণ করতে হবে। তাঁর অতুলনীয় আদর্শ অনুসরণ ব্যতীত পৃথিবী ও আখিরাতে কোনো মানুষই মুক্তি পাবে না।

📘 সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন 📄 কেনো নবী-রাসূলকে অনুসরণ করতে হবে?

📄 কেনো নবী-রাসূলকে অনুসরণ করতে হবে?


নবী-রাসূলের অস্তিত্ব বর্তমান পৃথিবীতে শারীরিকভাবে থাকতেই হবে এ প্রশ্নের গুরুত্ব নেই, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নবী-রাসূলগণ যে শিক্ষা দান করেছেন, মহান আল্লাহর পক্ষ হতে যে বিধান তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল, তা বর্তমানে মওজুদ আছে কিনা। এই বিষয়টির ওপরে মানব জাতিকে গভীরভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে হবে। বর্তমানে নবীর আগমন আর ঘটবে না। কেননা নবী করীম (সা:) এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ নবুয়‍্যাতী ধারার সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন। তাঁর আনিত বিধান বর্তমানে অবিকৃত অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছে এবং ইনশাআল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত অবিকৃত থাকবে।

তাঁর সমগ্র জীবনকাল এবং সকল কার্যাবলী মানুষের সামনে অবস্থান করছে। তাঁর আনিত বিধান এবং তাঁর কার্যাবলী পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে তিনি ছিলেন বিশ্বনবী। সুতরাং তাঁকে অনুসরণ করা এবং তাঁর আনুগত্য করা তথা তাঁর আদর্শ অনুযায়ী জীবন যাপন করা মানুষের জন্য অবশ্য কর্তব্য। তাঁকে নবী বলে স্বীকৃতি দেয়ার পর তাঁকে অনুসরণ না করা বা তাঁর আদর্শ গ্রহণ না করা মানব বুদ্ধির বিরোধী কাজ। কারণ তাঁকে নবী বলে স্বীকৃতি দেয়ার অর্থই হলো আমরা একথার স্বীকৃতি দিলাম যে, তিনি যা কিছুই বলেছেন মহান আল্লাহর পক্ষ হতে বলেছেন, তিনি যা করেছেন তা মহান আল্লাহর ইশারায় করেছেন।

এই অবস্থায় তাঁর কোনো কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করার সুস্পষ্ট অর্থ হলো, মহান স্রষ্টা আল্লাহ্র কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করা। নবীর কোনো কাজকে অপছন্দ করার অর্থই হলো মহান আল্লাহর নির্দেশকে অপছন্দ করা। নবীর কোনো কাজের সমালোচনা করার স্পষ্ট ব্যাখ্যা হলো মহান আল্লাহর নির্দেশের সমালোচনা করার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করা। সুতরাং বুঝা গেল, নবী সম্পর্কে মনের গহিনে সামান্য প্রশ্ন সৃষ্টি করার অর্থই হলো স্বয়ং আল্লাহ্ তা'য়ালার নির্দেশ সম্পর্কে প্রশ্ন সৃষ্টি করা。

সুতরাং নবীকে নবী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পরে কোনো ধরণের প্রশ্ন ব্যতীতই নবীর সকল নির্দেশ মাথা পেতে গ্রহণ করা এবং তা অনুসরণ করা। নবীর কোনো কথা বা নির্দেশ যদি আমাদের উপলব্ধিতে না আসে তার মানে এই নয় যে, নবীর কথা ভুল। বরং ভুল আমাদের উপলব্ধির জগতে। আমরা জ্ঞানের দৈন্যতার কারণে নবীর কথা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছি। মনে রাখতে হবে, নবীর প্রতিটি কথা ও কাজের মধ্যেই মানব জাতির উন্নতি নিহিত রয়েছে। নবীর কথার প্রকৃত তাৎপর্য যদি আমাদের বোধগম্য না হয়, তবুও তা আমাদেরকে অনুসরণ করতে হবে। বরং এটা আমাদের জন্য অপরিহার্য।

নবী কক্ষনো ভুল কথা বলেন না। কেউ যদি ধারণা করে যে, নবী মাঝে মধ্যে ভুল কথা বলেন এবং ভুল করে থাকেন, তাহলে তা হবে এক মারাত্মক অপরাধ। কারণ নবী আল্লাহর নির্দেশে পরিচালিত হন এবং তাঁর নির্দেশেই কথা বলেন। আমাদের ভেতরেই ভুল রয়েছে বলে আমরা নবীর কথার তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারি না। নবীর যে কথা বা কাজ অনুধাবন করতে পারি না সেটা আমরা অনুসরণ করবো না, এমন কোনো সুযোগ মুসলমানদের জন্য অবশিষ্ট নেই। যিনি যতবড় আলেমই হন না কেনো, তাঁর কোনো কথা বা কাজের অনুসরণ করতে হলে, তাঁর নির্দেশের সাথে বা কাজের সাথে নবীর কথার বা কাজের সাদৃশ্য আছে কিনা তা অনুসন্ধান করে তবেই তা অনুসরণ করতে হবে।

একটি বিষয় অনুধাবন করতে হবে, যে ব্যক্তি কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ নয়, সে কম্পিউটারের জটিল বিষয় বুঝতে পারবে না। কিন্তু কম্পিউটার বিশেষজ্ঞের কথা যদি সে একারণে গ্রহণ না করে যে, কম্পিউটার তার বোধগম্য হচ্ছে না। তাহলে তার জন্য এটা হবে বোকামীর পরিচয়। পৃথিবীর প্রতিটি কাজের জন্যই বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হয়। কোনো কাজের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নিযুক্ত করার পরে তার কাজে হস্তক্ষেপ করার কোনো অবকাশ থাকে না।

সুতরাং প্রত্যেক মানুষ প্রতিটি কাজে বিশেষজ্ঞ হতে পারে না। পৃথিবীর সকল কাজ প্রতিটি মানুষ বুঝতে পারে না। কোনো ব্যক্তি কোন্ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তা আমাদের যাচাই করে তার ওপরে নির্ভর করতে হয়। এরপর সেই ব্যক্তির কাজে হস্তক্ষেপ করা বা তাকে বারবার উত্যক্ত করা যে, 'আমাকে প্রথমে এই বিষয়টি বুঝিয়ে দিতে হবে, নতুবা আমি তোমার কোনো কাজ বা কথা গ্রহণ করবো না'। এমন কথা যারা বলবে তাদেরকে মূর্খ ব্যতীত আর কিছুই বলা যায় না।

রোগী যখন ডাক্তারের কাছে যায় এবং সে ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে রোগীকে ব্যবস্থাপত্র প্রদান করে আর রোগী যদি ডাক্তারের কাছে আবদার জানায়, 'আপনি এই ওষুধ কেনো ব্যবহার করতে বললেন আমাকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিন'। ডাক্তার তখন বাধ্য হয়েই রোগীকে তার চেম্বার থেকে বের করে দেবেন। রোগ নিরাময়ের জন্যে ডাক্তারের নির্দেশ অনুসরণ করা প্রয়োজন, বিশেষ ওষুধ ডাক্তার কেনো নির্বাচিত করলেন তার ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া রোগীর জন্যে বোকামী বৈ আর কিছুই নয়।

আমাদের স্রষ্টা মহান আল্লাহ সম্পর্কে আমাদেরকে ঐটুকু জ্ঞান অর্জন করতে হবে, যতটুকু জ্ঞান অর্জন করলে আমরা বুঝতে পারবো যে, কোন্ কাজে তিনি সন্তুষ্ট হন আর কোন্ কাজে তিনি অসন্তুষ্ট হন। মহান আল্লাহর ইচ্ছা অনুসারে জীবন পরিচালনার পদ্ধতি কি, তা আমরা জানি না। জানার কোনো মাধ্যমও আমাদের কাছে নেই। কিন্তু এটা আমরা জানতে ইচ্ছুক। সুতরাং এটা জানার জন্যই আমাদের প্রয়োজন নবীকে অনুসন্ধান করা। এই অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও আমাদেরকে সতর্কতার পরিচয় দিতে হবে।

আমাদেরকে জানতে হবে, নবুয়‍্যাতের ধারা কোথেকে শুরু হয়ে কোন্ পর্যন্ত এসে শেষ হয়েছে। এই জ্ঞান যদি আমাদের না থাকে বা এই জ্ঞানের ভেতরে যদি কোনো ভ্রান্তি থাকে তাহলে আমরা যে ভুল পথে পরিচালিত হবো এতে কোনো সন্দেহ নেই।

হযরত মুহাম্মাদ (সা:) যে শেষ নবী এবং তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবে না, তাঁর আনিত জীবন বিধানই যে কিয়ামত পর্যন্ত অনুসরণ করতে হবে, এই জ্ঞান মানুষের জন্য পরিপূর্ণভাবে স্বচ্ছ থাকতে হবে। নবী করীম (সা:) এবং তাঁর পবিত্র সাহাবায়ে কেরামের সাথে যে কাজের কোনোই সম্পর্ক ছিল না, সে কাজের বাইরের অবয়ব যতই সুন্দর হোকনা কেনো, তা গ্রহণ করা যাবে না।

দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, কোনো নবী এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম মাইলের পর মাইল ভ্রমণ করে কারো কবরের কাছে গিয়ে কোনো কিছুর জন্য কখনো ধর্ণা দেননি। সুতরাং এই কাজ আমাদের জন্য করার কোনো অবকাশ নেই। ঈমান রাখতে হবে যে, মানুষের সকল প্রয়োজন পূরণ করার মালিক হলেন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তিনি কোনো মাধ্যম ব্যতীতই তাঁর বান্দার আবেদন শোনেন, সে বান্দাহ যত বড় পাপীষ্ঠই হোক না কেনো। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-

أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ طَ أَإِلَهُ مَّعَ اللَّهِ طَ قَلِيْلًا مَّا تَذَكَّرُوْنَ

তিনি (শ্রেষ্ঠ) যিনি কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির ডাকে সাড়া দেন, যখন (নিরূপায় হয়ে) সে তাঁকেই ডাকতে থাকে, তখন তার বিপদ-আপদ তিনি দূরীভূত করে দেন এবং তিনি তোমাদের এ যমীনে তাঁর প্রতিনিধি বানান; (এসব কাজে) আল্লাহ তা'য়ালার সাথে আর কোনো মা'বুদ কি আছে? (আসলে) তোমরা কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে। (সূরা আন নামল-৬২)

ফন্ট সাইজ
15px
17px