📄 হযরত হিযকীল (আ)-এর ইনতিকাল এবং নূতন নবীর আবির্ভাব
ইবন জারীর (র), ইবন কাছীর এবং ইবনুল আছীর (র) সকলেই তাঁহাদের তারীখের কিতাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, হযরত হিযকীল (আ) কত বৎসর জীবিত ছিলেন তাহার কোন উল্লেখ নাই। তাঁহার ইন্তিকালের পরে বনী ইসরাঈল তাহাদের প্রতি মহান আল্লাহ প্রদত্ত অঙ্গীকারসমূহ ক্রমশ ভুলিয়া যাইতে থাকে। অবশেষে সকলেই 'বা'ল' নামীয় মূর্তির পূজা আরম্ভ করিয়াছিল। পরিশেষে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হযরত ইলয়াস ইবন য়ামীন (আ)-কে নবী হিসাবে প্রেরণ করিয়াছিলেন। (আত-তাবারী, তা'রীখ, ১খ, ৩২৪, ৩২৫; ইবন কাছীর, আল-বিদায়া, ২খ, ৪; ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ২১১,২১২)। আছ-ছা'লাবী তাঁহার 'কাসাসুল আম্বিয়া'-য় হযরত হিযকীল (আ)-এর ইন্তিকাল প্রসঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করিয়াছেন : "তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান ও ঈমানদার ব্যক্তি। যাদুকরদের উপর হযরত মূসা (আ)-এর বিজয়ী হইবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি তাঁহার ঈমান গোপন করিয়াছিলেন। যখন ঈমান প্রকাশ করিলেন তখন তাহাকে হযরত মূসা (আ)-এর প্রতি ঈমান আনয়নকারীদের সাথে শূলিবিদ্ধ করিয়া হত্যা করা হয়। এই প্রসঙ্গে তিনি এই আয়াতের উল্লেখ করিয়াছেন: وَقَالَ رَجُلٌ مُّؤْمِنٌ مِّنْ آلِ فِرْعَوْنَ يَكْتُمُ إِيْمَانَهُ أَتَقْتُلُونَ رَجُلًا أَنْ يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ وَقَدْ جَاءَكُمْ بِالْبَيِّنَتِ مِنْ رَبِّكُمْ وَإِنْ يَكُ كَاذِبًا فَعَلَيْهِ كَذِبُهُ وَإِنْ يَكُ صَادِقًا يُصِبْكُمْ بَعْضُ الَّذِي يَعِدُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كذاب . "ফিরআওন গোত্রের এক মু'মিন ব্যক্তি, যে তাহার ঈমান গোপন রাখিত, সে বলিল, তোমর। কি একজনকে এইজন্যই হত্যা করিবে যে, সে বলে, আমার পালনকর্তা আল্লাহ? অথচ সে তোমাদের পালনকর্তার নিকট হইতে স্পষ্ট প্রমাণসহ তোমাদের নিকট আগমন করিয়াছে। যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তাহার মিথ্যা তাহার উপরই চাপিবে, আর যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে সে যে শাস্তির কথা বলিয়াছে, তাহার কিছু না কিছু তোমাদের উপরে পড়িবেই" (৪০ : ২৮; আছ-ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ২০১)।
📄 হিযকীল (আ)-এর স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতি
হিযকীল (আ)-এর স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতি সম্পর্কে প্রামাণ্য ও প্রাচীন ঐতিহাসিক এবং তাফসীর গ্রন্থে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। তবে ইনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা-তে তাহার স্ত্রীর ইন্তিকালের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত একত্রে অবস্থান সম্পর্কীয় সামান্য বর্ণনা পাওয়া যায়, "জেরুসালেমের প্রথম আত্মসমর্পণের পূর্বে হিযকীল (আ) ধর্মযাজকের দায়িত্ব পালন করিতেন এবং "জেরুসালেম গির্জার" অন্যতম কর্মচারী ছিলেন। খৃ. পৃ. ৫৯৭ সালে ব্যবিলনে যাহাদিগকে নির্বাসিত করা হইয়াছিল তিনি তাহাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আর তিনি তেলআবিব এলাকার নিপুর-এর কাছাকাছি কেবার (KEBAR) নদীতীরের একজন বসবাসকারী ছিলেন। তাঁহার স্ত্রী ইন্তিকালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি তাহার সাথে নিজ বাড়িতে অবস্থান করিয়াছিলেন। তাহার অনুসারী একজাইল (EXILES), যিনি খুব প্রসিদ্ধ ছিলেন না, তাহার দাবি অনুসারে হিযকীল (আ) পেশার দিক হইতে ছিলেন নবী ও ধর্মপ্রচারক (PROPHET-PRIEST) [ENCYCLOPEDIA BRITANNICA, MACROPEDIA KNOWLEDGE IN DEPTH, 15 TH EDITION, 1768, VOLL 7, EZEKIEL CHAPTER, P. 127]। আছ-ছা'লাবী (র) তাঁহার "কাসাসুল আম্বিয়া" গ্রন্থের ১১তম অধ্যায়ের "ফী কিস্সাতি হিযকীল মু'মিন আলু ফিরআওনা ওয়া ইমরআতিহী...." শিরোনামে তাঁহার স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের ফিরআওন কর্তৃক হত্যার মর্মান্তিক ঘটনা প্রসঙ্গে উল্লেখ করিয়াছেন যে, 'হিযকীল পরিবার ফিরআওন কন্যাদের সেবিকা ও চুলের পরিপাটিকারিনী ছিলেন। এই প্রসঙ্গে সাঈদ ইবন জুবায়র (র) ইবন আব্বাস (রা) হইতে একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, মি'রাজের রাত্রে আমি যখন সৌরভ ও সুগন্ধময় স্থান দিয়া অতিক্রম করিতেছিলাম তখন জিবরাঈল (আ.)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, ইহা কিসের সুগন্ধ? উত্তরে বলিলেন, ইহা ফিরআওন পরিবারের মহিলাদের কেশ বিন্যাসকারিনী ও তাহার সন্তানদের সৌরভ। একদিন ফিরআওন কন্যার চুল বিন্যাসের সময় হঠাৎ করিয়া ঐ মহিলার হাত হইতে চিরুনী পড়িয়া যায়। উহা উঠানোর সময় তিনি বিস্মিল্লাহ উচ্চারণ করা মাত্রই ফিরআওন কন্যা বলিয়া উঠিল, আমার পিতার নাম উচ্চারণ কর। তখন হিযকীল (আ)-এর স্ত্রী বলিলেন, "না, বরং যিনি আমার প্রতিপালক এবং তোমার পিতার প্রতিপালক তাহার নামে"। ফিরআওন কন্যা বলিল, তোমার এই ব্যাপারটি আমি আমার পিতাকে অবশ্যই অবহিত করিব। ফিরআওন উক্ত ঘটনা জানিতে পারিয়া হিযকীলের স্ত্রী ও তাহার সন্তানদিগকে ডাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিল, "তোমাদের প্রতিপালক কে? উত্তরে হিযকীল (আ)-এর স্ত্রী বলিলেন, "নিশ্চয় আমার প্রতিপালক এবং আপনারও প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহ"। তখন ফিরআওন পিতলের চুল্লিতে আগুন প্রজ্জ্বলিত করিতে আদেশ করিল। আগুন প্রজ্জ্বলিত করা হইল এবং ভীষণ উত্তপ্ত হইয়া উঠিলে সন্তানাদিসহ তাঁহাকে আগুনে নিক্ষেপ করার আদেশ করা হইল। অতঃপর তিনি ফিরআওনকে বলিলেন, "তোমার কাছে আমাদের একটি দাবি আছে।" সে বলিল, সেটা কি? উত্তরে বলিলেন, "আমাদের অস্থিসমূহ দাফন করিয়া দিবে। ফিরআওন বলিল, তোমাদের জন্য ইহা করা আমার কর্তব্য। তারপর ফিরআওন-এর নির্দেশে একজন একজন করিয়া হিযকীল (আ)-এর সন্তানদিগকে প্রজ্জ্বলিত আগুনে নিক্ষেপ করা হইল। অবশেষে সবচেয়ে ছোট দুধের শিশুটি বলিয়া উঠিল : اصبري يا أماه فأنك على الحق . "হে আম্মাজান! আপনি ধৈর্যধারণ করুন। নিঃসন্দেহে আপনি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত"। তারপর এই ছোট্ট দুধের শিশুটিসহ তাহাকে চুল্লিতে নিক্ষেপ করা হইল। রাবী বলেন, যাহারা মায়ের কোলে কথা বলিয়াছিলেন তাহাদের সম্বন্ধে ইবন আব্বাস (রা) কে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল। ইবন আব্বাস (রা) উত্তর করিলেন, "মায়ের কোলে থাকাকালীন চারজন শিশু কথা বলিয়াছিল, ঈসা ইবন মারয়াম, ইউসুফ (আ)-এর পক্ষে সাক্ষ্যদানকারী শিশুটি, জুরায়জ-এর সঙ্গী শিশুটি এবং এই শিশুটি। (আছ-ছালাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া..., পৃ. ২০১)।
📄 উপসংহার
হযরত হিযকীল (আ) নবী ছিলেন কিনা? এই ব্যাপারে আল-কুরআনুল কারীমে কোথাও প্রত্যক্ষভাবে উল্লেখ করা হয় নাই। অধিকাংশ আলিমের বর্ণনা অনুসারে হযরত হিযকীল (আ) ইসরাঈল বংশের একজন নবী ছিলেন দ্র. সূরাতুল বাকারা ২৪৩ নং আয়াত; আল-বাগাবী, তাফসীর, ১খ, ২২৪; আস-সাবী, তাফসীর, ১খ, ১০৬; আস-সুয়ূতী, আদ্-দুররুল, মানছুর" ১খ, ৩১৩; আবদুল-হাক্ হাক্কানী, তাফসীর, ২খ., ৬৫; আশ্-শাওকানী, ফাতহুল-কাদীর, ১খ, ২৬২; ইবন জারীর তাবারী, তাফসীর, ২খ, ৩৬৬)। তাঁহার উপর নবুওয়াতের দায়িত্ব প্রদান করা হইয়াছিল এবং উহা তিনি যথাযথভাবে পালন করিয়াছিলেন। প্রায় অনুরূপ বর্ণনা প্রামাণ্য ও প্রাচীন বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলীতে আসিয়াছে। ইবন জারীর, তারীখ, ২খ, ৩২২; ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, ৩; ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ২১০; হিফজুর রহমান সীওয়াহারবী, কাসাসুল কুরআন ২খ, ২১-সহ বিভিন্ন মুসলিম-অমুসলিমদের রচিত ইনসাইক্লোপেডিয়াসমূহে হিযকীল (আ) প্রসঙ্গে যে সমস্ত বর্ণনা পাওয়া যায় সেইগুলি প্রমাণ করে যে, তিনি খৃ. পূ. ষষ্ঠ শতাব্দীর মেসোপটোমিয়া [MESOPOTAMIA]-তে NEBUCHADREZZAR (৬০৫-৫৬২ খৃ. পৃ.)-এর রাজত্বকালে নবী ছিলেন এবং নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করিয়াছিলেন এবং তাঁহার সমসাময়িক নবীগণ হইলেন দানিয়াল (আ) ও আরমিয়া আ)। বাইবেল হযরত হিযকীল (আ)-এর পরিচয়, নবুওয়াত লাভ ও তাঁহাকে বনী ইসরাঈলের নবী হিসাবে মনোনয়ন, কওমের কাছে উহার যথাযথ দায়িত্ব পালন, কওমের অবাধ্যতা ইত্যাদি প্রসঙ্গ পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। বাইবেলের প্রাপ্ত তথ্যে ইহা সুস্পষ্ট যে, হিযকীল (আ) ইসরাঈল বংশেরই একজন নবী ছিলেন (বুতরুস আল-বুস্তানী, দাইরাতুল মা'আরিফিল ইসলামিয়্যা, ৭খ, ২২; ENCYCLOPEDIA OF ISLAM, LEIDEN 1979, VOL. 3, 535; THE ENCYCLOPEDIA OF RELIGION, 1987, VOL. 7, 126; CHAMBERS'S BIOGRAPHYCAL DICTIONARY, EDINBURGH-LONDON 1968, 453; THE NEW LEXICON WEBSTER'S DICTIONARY, DELUXE ENCYCLOPEDIA EDITION, NEWYORK, 1987, 336) 1