📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হিযকীল (আ) সম্প্রদায়ের পরিচিতি

📄 হিযকীল (আ) সম্প্রদায়ের পরিচিতি


কওমে হিযকীলের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে কোথাও আলোচনা করা হয় নাই। তাফসীর, ধর্মীয় গ্রন্থ ও ইতিহাসে ওই সম্পর্কে কিছুটা পরিচয় পাওয়া যায়। মাওলানা হিফজুর রহমান তাঁহার কাসাসুল কুরআন-এ উল্লেখ করিয়াছেন যে, "অধিকাংশ আলেমের বর্ণনা অনুসারে হিযকীল (আ)-এর আলোচনা শুধু ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত হইয়া আসিয়াছে। আল-কুরআনের কোন আয়াতে সরাসরি তাঁহার সম্পর্কে আলোচনা করা হয় নাই" (হিফজুর রহমান সীওয়াহারবী, কাসাসুল কুরআন, করাচী, ২খ, ২৮)। উর্দু দাইরা-ই মা'আরিফ ইসলামিয়্যা আল-কুরআনুল কারীমের একটি আয়াতে হিযকীল (আ) এবং তাঁহার কওমের প্রতি ইঙ্গিত করা হইয়াছে বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। আল-কুরআনুল কারীমে হিযকীল (আ)-এর নাম প্রত্যক্ষভাবে উল্লেখ করা হয় নাই। কিন্তু সূরা আল-বাকারার ২৪৩ নং আয়াতঃ “(হে নবী!) তুমি কি তাহাদিগকে দেখ নাই যাহারা মৃত্যুর ভয়ে হাজারে হাজারে স্বীয় আবাসভূমি পরিত্যাগ করিয়াছিল? তারপর আল্লাহ তাহাদিগকে বলিয়াছিলেন, তোমাদের মৃত্যু হউক। পুনরায় আল্লাহ তাহাদিগকে জীবিত করিয়াছিলেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল; অথচ অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না" (২ : ২৪৩)-এর সংশ্লিষ্ট ঘটনা প্রসঙ্গে প্রাচীন তাফসীরকারদের ভাষ্যে সুষ্পষ্ট যে, ইহা দ্বারা হিযকীল (আ) এবং তাঁহার কওমের প্রতি ইঙ্গিত করা হইয়াছে (উর্দু দাইরা-ই মাআরিফ ইসলামিয়্যা, ৮খ, ১৭০, হিযকীল শিরো.)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হিযকীল (আ)-এর জনপদ পরিচিতি

📄 হিযকীল (আ)-এর জনপদ পরিচিতি


আল-মাওয়ারদী (র) এবং ইমাম শাওকানী (র) উভয়ে তাঁহাদের তাফসীরে উল্লেখ করিয়াছেন যে, “তাঁহারা দাওয়ারদান নামে এক জনপদের অধিবাসী ছিলেন। উক্ত জনপদ হইতে তাঁহারা পলায়ন করিয়া অন্য জনপদে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন” (আল-মাওয়ারদী, তাফসীরুল মাওয়ারদী, ১খ., ২৬১; তু. শাওকানী, ফাতহুল-কাদীর, দারুল-ফিকর লিত্-তাবাআতি-ওয়ান্ নাশূরি, ১৪০৩/১৯৮৩, ১খ., ২৬২)। মুজামুল-বুলদান'-এর দাওয়ারদান-এর পরিচিতি প্রসঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে দাওয়ারদান (داوردان) শব্দটির ওয়াও (و) যার যোগে, রা (ر) সাকিন যোগে এবং শেষে নূন (نون) পঠিত হয়, যাহা ওয়াসিত (واسط)-এর কাছাকাছি একটি জনপদ। উভয়ের মাঝে দূরত্ব হইল এক ফারসাখ্ বা তিন মাইল (মু'জামুল বুলদান, ২খ., ৪৩৪)। ইবন কাছীর তাঁহার তাফসীরে জনপদটির নাম দাওয়ারদান (داوردان)-এর পরিবর্তে যাওয়ারদান (زاورداره) উল্লেখ করিয়াছেন (ইবন কাছীর, তাফসীর, ১খ., ২৯৮)। ইবনুল আছীর তাঁহার তারীখে জনপদটির নাম 'রোওয়ারদারা' উল্লেখ করিয়াছেন (আল-কামিল, ১খ, ২১০)। কোন কোন মুফাস্স্সির উল্লেখ করিয়াছেন যে, তাহারা 'আযরাআত (اذروعات) নামক জনপদের অধিবাসী ছিলেন। ইহার সমর্থনে জালালুদ্দীন সুয়ূতী (র) ইবন আবী হাতিম-এর সনদে সাঈদ ইবন আবদিল আযীয (র) হইতে একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করিয়াছেন (আদ্-দুররুল মানছুর, ১খ, ৩১০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হিযকীল সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা

📄 হিযকীল সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা


ইবনুল জাওযী (র) তাঁহার তাফসীরে হিযকীল (আ)-এর সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা সম্পর্কে সাতটি মত উল্লেখ করিয়াছেন:
১. ইবন আব্বাস (রা) বর্ণনা করিয়াছেন যে, তাহারা সংখ্যায় ছিল চল্লিশ হাজার।
২. ইবন আব্বাস (রা) হইতে অন্য একটি রিওয়ায়াতে বর্ণিত হইয়াছে যে, তাহারা সংখ্যায় ছিল চার হাজার।
৩. আবূ সালিহ (র) বলিয়াছেন, তাহারা ছিল সাত হাজার।
৪. আতা' (র) বলিয়াছেন, তাহাদের সংখ্যা ছিল নব্বই হাজার।
৫. আবূ মালিক (র) বলিয়াছেন, কওমু হিযকীল (আ)-এর সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজার।
৬. সুদ্দী (র) উল্লেখ করিয়াছেন, তাহাদের সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজারের বেশী।
৭. মুকাতিল (র) বলিয়াছেন, তাহাদের সংখ্যা ছিল আট হাজার (জাওযী, যাদুল মাসীর ফী ইলমিত্-তাফসীর, ১খ., ২৮৮)।
ইবন কাছীর (র) তাঁহার তাফসীরে সংখ্যাটি আট হাজার বলিয়া ইবন আব্বাসের আরো একটি মত উল্লেখ করিয়াছেন এবং আবূ সালিহ (র)-এর বর্ণনাতে কওমে হিযকীলের সংখ্যা সাত হাজারের পরিবর্তে নয় হাজার উল্লেখ করিয়াছেন (ইবন কাছীর, তাফসীর, ১খ., ২৯৮)। বনী ইসরাঈলের পলায়নকারী কওমে হিযকীল-এর জনসংখ্যা সম্পর্কে একাধিক মতামত উল্লিখিত হইয়াছে। তন্মধ্যে গ্রহণযোগ্য ও উত্তম ব্যাখ্যা হইল, তাহাদের সংখ্যা ছিল দশ হাজারেরও বেশী। তিন, চার সাত, আট ও নয় হাজারের যে মতগুলি রহিয়াছে উহা গ্রহণযোগ্য নয়। ইহার সমর্থনে যুক্তি হইল, আল্লাহ তা'আলা আয়াতে "উলুফ" (اﻟﻮف) শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন। আর "উল্‌ফ" (اﻟﻮف) দ্বারা সাধারণত দশ হাজারের অধিক সংখ্যা বুঝানো হইয়া থাকে। সুতরাং দশ হাজারের কম সংখ্যা বুঝাইবার জন্য "উলূফ" (اﻟﻮف) শব্দের ব্যবহার ঠিক হইবে না (আত-তাবারী, তাফসীর, ২খ, ৩৩৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হিযকীল (আ)-এর অবাধ্যতা

📄 হিযকীল (আ)-এর অবাধ্যতা


বিভিন্ন ঐতিহাসিক এবং তাফসীর গ্রন্থে কওমে হিযকীল-এর অবাধ্যতার স্বরূপ উদঘাটনে দুই ধরনের আলোচনা লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত, "কওমে হিযকীলের প্রতি জিহাদের নির্দেশ এবং উহার ভয়ে কওমের পলায়ন সম্পর্কিত আলোচনা। দ্বিতীয়ত, অবাধ্যতার কারণ হিসাবে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে কওমে হিযকীলের পলায়ন সম্পর্কিত আলোচনা। উভয় আলোচনার মধ্যে ইবনুল আরাবী তাঁহার আহকামুল কুরআন গ্রন্থে দ্বিতীয়টিকেই সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও সুপ্রসিদ্ধ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ইবন জারীরও তাঁহার তাফসীরে প্লেগে সংক্রান্ত মতটিকে প্রাধ্যান্য দিয়াছেন। প্রথমোক্ত মতের পক্ষে আছ-ছা'আলিবী বলেন: তাহারা বনী ইসরাঈলের একটি গোত্র; তাহাদিগকে জিহাদের আদেশ দেওয়া হইয়াছিল। তাহারা যুদ্ধের ময়দানে নিহত হইবার ভয়ে বাড়ি-ঘর ছাড়িয়া পলায়ন করিয়াছিল। আল্লাহ তাহাদিগকে মৃত্যু দান করিয়াছিলেন যেন তাহারা সকলেই ভালভাবে বুঝিয়া নিতে পারে যে, কোন কৌশলই মৃত্যু হইতে রক্ষা করিতে পারে না। অতঃপর তিনি তাহাদিগকে জীবিত করিয়াছিলেন এবং যুদ্ধের আদেশ দিয়াছিলেন। (আবদুর রহমান ইবনে মাখলূফ আছ-ছা'আলিবী, তাফসীর, ১খ., ১৮৮)। আবদুল হক হাককানী তাঁহার তাফসীরে উল্লেখ করিয়াছেন যে, ইসরাঈল বংশীয় কোন একজন নবীর সময়ে তাঁহার উম্মতগণ জিহাদের আদেশ উপেক্ষা করিয়া শত্রুর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্থ হইয়া যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করিয়া পালাইয়া যায়। ফলে শত্রুদের কঠোর আক্রমণে সকলেই নিহত হয়। পরবর্তী কালে নবীর দু'আতে তাহারা সকলেই পুনর্জীবন লাভ করিয়াছিল (মুকাদ্দিমা তাফসীরে হাক্কানী, ১খ, ৬৫)। আল-বাগাবী, আল-কাসিমী ও আন-নাসাফী সকলেই তাঁহাদের তাফসীরে শব্দের কিঞ্চিত পার্থক্য উল্লেখ পূর্বক জিহাদের ময়দান হইতে পলায়ন প্রসঙ্গে আলোচনা করিয়াছেন (আল-বাগাবী, তাফসীর মা'আলিমুত-তানযীল, ১খ, ২২৩; মুহাম্মাদ জামালুদ্দীন আল-কাসিমী, তাফসীরুল কাসিমী, ৩খ, ৬৩৬; আবদুল্লাহ ইবন আহমদ ইবন মাহমূদ আন নাসাফী, তাফসীরুন-নাসাফী, ১খ., ১৬৯)। প্রাচীন মুফাস্স্সির দাহ্হাক ও মুকাতিল (র) উভয়েই উল্লেখ করিয়াছেন যে, কওমে হিযকীল-ই জিহাদের ময়দান হইতে পলায়ন করিয়াছিল যাহার অকাট্য প্রমাণ আমরা পরবর্তী আয়াতের প্রারম্ভেই পাই । وقاتلوا في سبيل الله অর্থাৎ "তোমরা সকলে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ কর" (ইবনুল হাসান আত্-তাবারসী, মাজমাউল-বায়ান ফী তাফসীরিল কুরআন, ১খ, ৬০৪)। ইবন জারীর (র) তাঁহার তাফসীর তারীখে কওমে হিযকীল যে সেই সময়ের কঠিনতম বিপদে পতিত হইয়াছিলেন এবং উহা হইতে মুক্তির প্রার্থনা করিয়াছিল, সেই প্রসঙ্গে উল্লেখ করিয়াছেন ে "ওয়াহ্হ্ ইবন মুনাব্বিহ (র)-এর সূত্রে বর্ণিত হইয়াছে যে, বনী ইসরাঈলের লোকেরা সেই যুগের কঠিনতম বিপদে পতিত হইয়াছিল। এই চরম মুসীবতে তাহারা অভিযোগ করিয়া বলিয়াছিল, আমাদের বিপদ হইতে মুক্তি দান কর। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হযরত হিযকীল (আ)-এর উপর ওহী পাঠাইয়াছিলেন যে, তোমার কওম বিপদগ্রস্ত হইয়া অসহায়ভাবে কান্নাকাটি করিতেছে এবং এই ধারণা করিতেছে যে, তাহারা মরিলেই শান্তি পাইবে। তাহারা কি ভাবিতেছে মৃত্যুর পরে আমি তাহাদিগকে পুনরুত্থান করিতে পারিব না (আত-তাবারী, তাফসীর, ২খ, ৩৬৫; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ, ৩২২; তু. আস্-সুয়ূতী, দুররুল-মান্ডুর, ১খ, ৩১১)? কওমে হিযকীল-এর প্লেগে আক্রান্ত হওয়া, মৃত্যুভয়ে গ্রাম হইতে পলায়ন করা এবং ফেরেশতার ভয়ংকর আওয়াজে ধ্বংস হওয়া প্রসঙ্গে ইবন জারীর (র) তাঁহার তাফসীর ও তারীখে এবং বাগাবী (র) তাঁহার তাফসীরে সূদ্দী (র)-এর সনদে একটি হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। হাদীছটি এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে: সুদ্দী (র) হইতে বর্ণিত, তিনি মহান আল্লাহর বাণী: "হে নবী! আপনি কি তাহাদিগকে দেখেন নাই, যাহারা হাজারে হাজারে নিজ নিজ আবাসভূমি হইতে বাহির হইয়া গিয়াছিল? তারপর আল্লাহ বলিলেন, তোমাদের মৃত্যু হউক, অতঃপর মহান আল্লাহ তাহাদিগকে জীবিত করিয়াছিলেন" (২: ২৪৩) প্রসঙ্গে বলিয়াছেন যে, ওয়াসিত (واسط) -এর নিকট দাওয়ারদান (داور دان) গ্রামে মহামারী ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। এই কারণে অধিকাংশ গ্রামবাসী পলাইয়া যায়। নিকটবর্তী এক এলাকায় তাহারা আশ্রয় গ্রহণ করে। যাহারা গ্রামে ছিল, সকলেই মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছিল এবং অন্যরা নিরাপদে ছিল। ফলে, অধিকাংশ গ্রামবাসী মৃত্যু হইতে বাঁচিয়া গিয়াছিল। মহামারী চলিয়া যাওয়ার পরে তাহারা নিরাপদে বাড়িতে ফিরিয়া আসে এবং আশেপাশে যাহারা জীবিত ছিল তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিতে থাকে, আমাদের সাথীরা আমাদের পন্থা অবলম্বন করিলে মুত্যু হইতে রেহাই পাইয়া যাইত। দ্বিতীয়বার মহামারী দেখা দিলে আমরা সকলকে লইয়া বাহির হইয়া যাইব। কয়েক দিনের মধ্যেই গ্রামবাসীরা প্লেগে আক্রান্ত হয়। তাহাদের সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজারের অধিক। তাহারা সকলেই 'আফীহ' (أفيع) নামক উপত্যকায় আশ্রয় গ্রহণ করিল। মহান আল্লাহর হুকুমে ফেরেশতাগণ উপত্যকার উপরিভাগ ও নিম্নভাগ হইতে এই বলিয়া ভয়ংকর আওয়াজ দেন, "তোমাদের সকলের মৃত্যু হউক", ফলে সকলেই মারা যায় (আত-তাবারী, তাফসীর, ২খ, ৩৬৬; তু. বাগাবী, মা'আলিমুত্-তানযীল, ১খ, ২২৩)। কওমে হিযকীল-এর ধনাঢ্য ও সম্ভ্রান্ত শ্রেণী জনপদ পরিত্যাগ ও গরীব শ্রেণীর তথায় অবস্থান সম্পর্কে ইবন জারীর (র)-এর সনদে একটি হাদীছ উল্লেখ করিয়াছেন (আত-তাবারী, তাফসীর, ২খ, ৩৩৮)। ইবনুল জাওযী (র) তাঁহার তাফসীরেও প্রায় একই ধরনের বর্ণনা দিয়াছেন (ইবনুল জাওযী, ১খ, ২২৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00