📄 হযরত হিযকীল (আ)-এর চারিত্রিক গুণাবলী
'... এই প্রসঙ্গে দাইরাতুল-মা'আরিফিল-ইসলামিয়্যায় উল্লেখ করা হইয়াছে যে, হযরত হিযকীল (আ) ছিলেন দৃঢ় প্রত্যয়ী, বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান, সাহসী এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। অনুরূপভাবে তিনি ছিলেন উচ্চ অভিজাত বংশীয় ও সত্যের উপরে দৃঢ়তার সাথে প্রতিষ্ঠিত এবং আল্লাহ্র নির্দেশ পালনে নিষ্ঠাবান।
টিকাঃ
১. আল-বুসতানী, দাইরাতুল মা'আরিফিল ইসলামিয়্যা, ৭খ., ২২।
📄 নবুওয়াত প্রাপ্তি ও কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা
ইবনুল আছীর তাঁহার তারীখে হযরত মূসা (আ)-এর পরে ইসরাঈল বংশীয় নবীদের নবুওয়াত প্রাপ্তির সাধারণ নিয়ম প্রসঙ্গে উল্লেখ করিয়াছেন যে, "হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আ)-এর পরবর্তীকালীন সময়ে ইসরাঈল বংশীয় লোকজন তাওরাতের বিধি-বিধান, নিয়ম-কানুন, করণীয়-বর্জনীয় ইত্যাদি যাহা কিছু ভুলিয়া যাইত উহা 'তাজদীদ' বা পুনঃসংস্কার করিবার জন্য ইসরাঈল বংশীয় নবীদেরকে নবুওয়াত প্রদান করিয়া ইসরাঈলীদের কাছে পাঠান হইত" (ইবনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ., ২১২)। এই প্রসঙ্গে অনুরূপ বর্ণনা ঐতিহাসিক তাবারী (র) তাঁহার তারীখে উল্লেখ করিয়াছেন (আত-তাবারী, তারীখ, ১খ., ৩২৫)। আল-বাগাবী (র) এবং আস-সাবী (র) উভয়ে তাঁহাদের তাফসীরে এই শব্দের উচ্চারণে কিছু কাছাকাছি পার্থক্যসহ উল্লেখ করিয়াছেন যে, হযরত মূসা (আ)-এর পরে বনী ইসরাঈলের মাঝে হযরত হিযকীল (আ) তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন, যিনি কালিব-এর স্থলাভিষিক্ত হইয়াছিলেন। হযরত মূসা (আ)-এর ইন্তিকালের সময় তিনি তাঁহার সঙ্গী হযরত যুশা' ইব্ন নূন (আ)-কে তাঁহার স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করিয়াছিলেন। অনুরূপভাবে হযরত যুশা' ইব্ন নূন (আ) তাঁহার ইন্তিকালের সময় হযরত মূসা (আ)-এর অপর সঙ্গী কালিবকে তাঁহার স্থলাভিষিক্ত করিয়াছিলেন। অবশেষে কালিব-এর ইন্তিকালের সময় তিনি হযরত হিযকীল (আ)-কে তাঁহার স্থলাভিষিক্ত করিয়াছিলেন (আস-সাবী, হাশিয়াতুস-সাবী আলা তাফসীরিল- জালালায়ন, ১খ., ১০৬; আল-বাগাবী, তাফসীর মাআলিমুত্ তানযীল, ১খ, ২২৪)। ইব্ন কাছীর তাঁহার তারীখে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক-এর সনদে ওয়াহ্হ্ ইবন মুনাব্বিহ (র) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, হযরত যূশা' (আ)-এর পরে যখন আল্লাহ তা'আলা কালিব ইব্ন্ন হান্নাকে তাঁহার কাছে উঠাইয়া নিয়াছিলেন তখন তিনি হিযকীল ইবন বৃযীকে বনী ইসরাঈলের খলীফা বানাইয়াছিলেন (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, ৩; তু. ইনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ, ২১০)। ইনসাইক্লোপেডিয়া বৃটানিকায় তাঁহার নবুওয়াত প্রসঙ্গে বর্ণিত হইয়াছে যে, হিযকীল (আ) ইসরাঈল বংশীয় একজন নবী ছিলেন যাঁহার নাম ওল্ড টেস্টামেন্টে উল্লিখিত হইয়াছে (ENCYCLOPAEDIA BRITANNICA, 7 VOL. 126, EZIKIEL)। অল্প শাব্দিক পার্থক্যসহ আরও বর্ণিত হইয়াছে যে, হিযকীল (আ) ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত খৃস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর একজন নবী ছিলেন। তিনি জুদাহ নামক এলাকাতে ব্যবিলনীয় সম্রাট-এর রাজত্বকালে নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। ওল্ড টেস্টামেন্টে তাঁহার নবুওয়াতের প্রসঙ্গটি অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছে (The Encyclopedia of Religion, 1987, Vol. 5, Ezekiel ৫.; The New lexicon, Webster's dictionary of the english publications, New York 1987, P. 336)। হিফজুর রহমান সীওয়াহারবী তাঁহার "কাসাসুল কুরআন"-এ এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করিয়াছেন যে, "কালিব-এর পরে যিনি বনী ইসরাঈলে যাবতীয় ধর্মীয় নির্দেশনা করিয়াছিলেন এবং পার্থিব কাজের যথাযোগ্য নেতৃত্ব দিয়াছিলেন তিনিই হইলেন হিযকীল (আ) (হিফজুর রহমান সীওয়াহারবী, কাসাসুল কুরআন, ২খ., ২৩)।
📄 হিযকীল (আ) সম্প্রদায়ের পরিচিতি
কওমে হিযকীলের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে কোথাও আলোচনা করা হয় নাই। তাফসীর, ধর্মীয় গ্রন্থ ও ইতিহাসে ওই সম্পর্কে কিছুটা পরিচয় পাওয়া যায়। মাওলানা হিফজুর রহমান তাঁহার কাসাসুল কুরআন-এ উল্লেখ করিয়াছেন যে, "অধিকাংশ আলেমের বর্ণনা অনুসারে হিযকীল (আ)-এর আলোচনা শুধু ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত হইয়া আসিয়াছে। আল-কুরআনের কোন আয়াতে সরাসরি তাঁহার সম্পর্কে আলোচনা করা হয় নাই" (হিফজুর রহমান সীওয়াহারবী, কাসাসুল কুরআন, করাচী, ২খ, ২৮)। উর্দু দাইরা-ই মা'আরিফ ইসলামিয়্যা আল-কুরআনুল কারীমের একটি আয়াতে হিযকীল (আ) এবং তাঁহার কওমের প্রতি ইঙ্গিত করা হইয়াছে বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। আল-কুরআনুল কারীমে হিযকীল (আ)-এর নাম প্রত্যক্ষভাবে উল্লেখ করা হয় নাই। কিন্তু সূরা আল-বাকারার ২৪৩ নং আয়াতঃ “(হে নবী!) তুমি কি তাহাদিগকে দেখ নাই যাহারা মৃত্যুর ভয়ে হাজারে হাজারে স্বীয় আবাসভূমি পরিত্যাগ করিয়াছিল? তারপর আল্লাহ তাহাদিগকে বলিয়াছিলেন, তোমাদের মৃত্যু হউক। পুনরায় আল্লাহ তাহাদিগকে জীবিত করিয়াছিলেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল; অথচ অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না" (২ : ২৪৩)-এর সংশ্লিষ্ট ঘটনা প্রসঙ্গে প্রাচীন তাফসীরকারদের ভাষ্যে সুষ্পষ্ট যে, ইহা দ্বারা হিযকীল (আ) এবং তাঁহার কওমের প্রতি ইঙ্গিত করা হইয়াছে (উর্দু দাইরা-ই মাআরিফ ইসলামিয়্যা, ৮খ, ১৭০, হিযকীল শিরো.)।
📄 হিযকীল (আ)-এর জনপদ পরিচিতি
আল-মাওয়ারদী (র) এবং ইমাম শাওকানী (র) উভয়ে তাঁহাদের তাফসীরে উল্লেখ করিয়াছেন যে, “তাঁহারা দাওয়ারদান নামে এক জনপদের অধিবাসী ছিলেন। উক্ত জনপদ হইতে তাঁহারা পলায়ন করিয়া অন্য জনপদে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন” (আল-মাওয়ারদী, তাফসীরুল মাওয়ারদী, ১খ., ২৬১; তু. শাওকানী, ফাতহুল-কাদীর, দারুল-ফিকর লিত্-তাবাআতি-ওয়ান্ নাশূরি, ১৪০৩/১৯৮৩, ১খ., ২৬২)। মুজামুল-বুলদান'-এর দাওয়ারদান-এর পরিচিতি প্রসঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে দাওয়ারদান (داوردان) শব্দটির ওয়াও (و) যার যোগে, রা (ر) সাকিন যোগে এবং শেষে নূন (نون) পঠিত হয়, যাহা ওয়াসিত (واسط)-এর কাছাকাছি একটি জনপদ। উভয়ের মাঝে দূরত্ব হইল এক ফারসাখ্ বা তিন মাইল (মু'জামুল বুলদান, ২খ., ৪৩৪)। ইবন কাছীর তাঁহার তাফসীরে জনপদটির নাম দাওয়ারদান (داوردان)-এর পরিবর্তে যাওয়ারদান (زاورداره) উল্লেখ করিয়াছেন (ইবন কাছীর, তাফসীর, ১খ., ২৯৮)। ইবনুল আছীর তাঁহার তারীখে জনপদটির নাম 'রোওয়ারদারা' উল্লেখ করিয়াছেন (আল-কামিল, ১খ, ২১০)। কোন কোন মুফাস্স্সির উল্লেখ করিয়াছেন যে, তাহারা 'আযরাআত (اذروعات) নামক জনপদের অধিবাসী ছিলেন। ইহার সমর্থনে জালালুদ্দীন সুয়ূতী (র) ইবন আবী হাতিম-এর সনদে সাঈদ ইবন আবদিল আযীয (র) হইতে একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করিয়াছেন (আদ্-দুররুল মানছুর, ১খ, ৩১০)।