📄 হিযকীল (আ)-এর জন্ম ও বংশপরিচয়
প্রামাণ্য ও প্রাচীন ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলী এবং বাইবেলের প্রাপ্ত তথ্যে প্রমাণিত যে, হযরত মূসা এবং হারুন আলায়হিমা'স সালাম-এর পরে হযরত যুশা' ইব্ নূন নবুওয়াতের মর্যাদা লাভ করিয়াছিলেন। অতঃপর হযরত মূসা (আ)-এর অন্তরঙ্গ সঙ্গী হযরত কালিব ইব্ন মূহান্না হযরত যুশা' (আ)-এর স্থলাভিষিক্ত হইয়াছিলেন যিনি হযরত মূসা (আ)-এর সহোদর বোন "মারয়াম বিনতে ইমরান"-এর স্বামী ছিলেন, কিন্তু নবী ছিলেন না। তাবারী (র) উল্লেখ করিয়াছেন যে, কালিব ইন্ন য়ূহান্না-এর পরে যিনি বনী ইসরাঈলকে রূহানী বা আত্মিক উন্নয়নের পথে এবং পার্থিব কাজে যথায়োগ্য নেতৃত্ব দান করিয়াছিলেন, তিনিই হইলেন হযরত হিযকীল 'আলায়হি'স-সালাম।
টিকাঃ
১. হিফজুর রহমান সীওয়াহারবী, কাসাসুল-কুরআন, ২খ, পৃ. ২০, ২১।
📄 হিযকীল (আ)-এর নাম ও নামের অর্থ
হিযকীল, হিযকিয়াল, হিযকীঈল (حزقی إيل، حزقيال، حزقیل:) HIZKIL, E.ZE.KIEL, IZI:KI:JL) ইব্ নূরী। 'হা' এবং 'কাফ্'-এর নীচে যের এবং 'যা'- এর উপরে সাকিন যোগে পাঠ করা হয়: (আহমাদ ইবুন মুহাম্মাদ আস-সাবী, হাশিয়াতু'স সাবী আলা তাফসীরি'ল-জালালায়ন, ১খ, পৃ. ১০৬)। ইবন জারীর তাবারী (র) তাঁহার তারিখে হিযকীল ইব্ন বৃরী (حزقيل بن بوري) এর পরিবর্তে হিযকীল ইব্ন বৃষী (حزقیل بن بوزی) উল্লেখ করিয়াছেন (আত-তাবারী, তারীখ আল-উমামি ওয়াল মুলুক, ১খ, পৃ.৩২২)। ইবনুল-আছীর তাঁহার তারীখে হিযকীল ইব্ন বৃরী-এর পরিবর্তে হিযকীল ইব্ন নূরী (حزقیل بن نوری) উল্লেখ করিয়াছেন (ইনুল-আছীর, আল-কামিল, ১খ., ২১০)। তবে "ইনসাইক্লোপেডিয়া অফ ইসলাম"-এ বর্ণিত হইয়াছে যে, বৃষী শব্দটির বিকৃত রূপ হইল বৃরী" (ENCYCLOPAEDIA OF ISLAM, LEIDEN, VOL. III, P. 5. 35) । হিব্রু ভাষাতে হিযকী (حزقی) শব্দের অর্থ হইল কুদরত, শক্তি, ক্ষমতা ইত্যাদি। আর ‘ঈল’ (إبل) শব্দের অর্থ হইল আল্লাহ। অতএব হিযকীঈল শব্দের অর্থ দাঁড়ায় আল্লাহর শক্তি বা আল্লাহর ক্ষমতা (বুরুস আল-বুসতানী, দাইরাতুল মা'আরিফ, ৭খ., ২২; হিফজুর রহমান সীওয়াহারবী, কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২১) ইবনুল-'আজ্য' (ابن العجوز) অর্থাৎ "বৃদ্ধার ছেলে" তাঁহার উপাধি ছিল। কেননা হিযকীল (আ)-এর মাতা ছিলেন একজন বয়স্কা এবং বন্ধ্যা মহিলা। তিনি বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ্র কাছে সন্তান কামনা করিয়াছিলেন। ফলে আল্লাহ তাঁহাকে সন্তান দান করিয়াছিলেন। এইজন্য তাঁহাকে "ইবনুল-'আজ্য" বা বৃদ্ধার ছেলে বলা হয় (ইবন জারীর তাবারী, জামি'উল-বায়ান ফী তাফসীরিল কুরআন, ২খ, ৩৩৭; আত-তাবারী, তারীখ, ২খ ৩৩৭; আত-তাবারী, তারীখ, ১খ., ৩২২)। উর্দু দাইরা মা'আরিফি ইসলামিয়্যাতে উল্লেখ রহিয়াছে যে, আল-কুরআনুল কারীমের ২১:৮৫-এ যুল-কিফ্ল-এর উল্লেখ করা হইয়াছে। এই যুল-কিফ্ল কে ছিলেন সে সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। কোন কোন মুফাস্সির লিখিয়াছেন যে, ইয়াহুদীদের মতে যুল-কিফ্ল হইলেন হযরত হিযকীল (আ) (উর্দু দাইরা মা'আরিফি ইসলামিয়্যা, ৮খ, ১৭০)। হযরত হিযকীল (আ)-কে যুল-কিফ্ল' উপাধিতে ভূষিত করিবার কারণ প্রসঙ্গে তাবারসী (র) তাঁহার তাফসীরে উল্লেখ করিয়াছেন যে, ইয়াহুদীরা বনী ইসরাঈলের সত্তরজন নবীকে হত্যা করিবার চেষ্টা করিলে হযরত হিযকীল (আ) তাহাদেরকে য়াহুদীদের হাত হইতে রক্ষা করিয়াছিলেন এবং নবীদেরকে বলিয়াছিলেন, আপনারা দ্রুত অন্যত্র চলিয়া যান। কেননা আপনারা সকলেই একসাথে ইয়াহুদী কর্তৃক নিহত হওয়া হইতে আমি একা নিজে নিহত হওয়া অনেক ভাল। ইত্যবসরে ইয়াহুদীরা ঐ সমস্ত নবীদেরকে খুঁজিতে আসিল। তখন তিনি ইয়াহুদীদেরকে জানাইয়া দিলেন যে, নিশ্চয়ই তাঁহারা অন্যত্র চলিয়া গিয়াছেন এবং কোথায় আছেন আমি জানি না (আত-তাবারসী, মাজমাউল বায়ান ফী তাফসীরিল কুরআন, ১খ., ৬০৪)। আল-বাগাবী (র) তাঁহার তাফসীরে হযরত হাসান (র) এবং মুকাতিল (র) হইতে এই প্রসঙ্গে রিওয়ায়াত করিয়াছেন যে, "তিনিই (হিযকীল) যুল-কিফল। হিযকীল (আ)-কে যুল-কিফল উপাধিতে এইজন্য ভূষিত করা হয় যে, তিনি সত্তরজন নবীকে হত্যা করা হইতে বাঁচাইয়া দিয়াছিলেন” (আল-বাগাবী, তাফসীর মাআলিমুত্-তানযীল, ১খ, ২২২)। হযরত হিযকীল (আ)-কে যুল-কিফ্ল উপাধিতে ভূষিত করিবার কারণ প্রসঙ্গে আস-সাব্বী তাঁহার তাফসীরেও অনুরূপ বর্ণনা উল্লেখ করিয়াছেন (আস-সাব্বী, হাশিয়াতুস সাব্বী আলা তাফসীরিল জালালায়ন, ১খ, ১০৬)।
টিকাঃ
১. হিযকীল (আ)-এর জন্ম ও বংশ পরিচয় প্রসঙ্গে প্রামাণ্য ঐতিহাসিক গ্রন্থসমূহে সুস্পষ্ট কোন মতামত পাওয়া যায় না। তবে হিযকীল (আ) সম্পর্কীয় যাবতীয় বর্ণনা হইতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, তিনি ইসরাঈল বংশেই জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার পিতামাতা প্রসঙ্গে উল্লেখ পাওয়া যায় যে, শৈশব কালেই হযরত হিযকীল (আ)-এর পিতা ইন্তিকাল করেন এবং নবুওয়াত প্রাপ্তির নিকটবর্তী সময় তাঁহার মাতা বয়োবৃদ্ধা ও অস্বাভাবিক দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিলেন (হিফজুর রহমান সীওয়াহারবী, ১৩৮৯/১৯৬৯,২খ., পৃ. ২)।
📄 হিযকীল (আ)-এর সমসাময়িক যুগ
হিযকীল ইব্ন্ন বৃযী (আ) ইয়াহুদী নবীদের তৃতীয়তম ছিলেন। তিনি আরমিয়া দানিয়াল (আ) উভয়ের সমসাময়িক নবী ছিলেন এবং খৃস্টপূর্ব ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতে তিনি জীবিত ছিলেন।
টিকাঃ
১. আল-বুসতানী, দাইরাতুল মাআরিফ, ৭খ., ২২।
📄 হযরত হিযকীল (আ)-এর চারিত্রিক গুণাবলী
'... এই প্রসঙ্গে দাইরাতুল-মা'আরিফিল-ইসলামিয়্যায় উল্লেখ করা হইয়াছে যে, হযরত হিযকীল (আ) ছিলেন দৃঢ় প্রত্যয়ী, বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান, সাহসী এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। অনুরূপভাবে তিনি ছিলেন উচ্চ অভিজাত বংশীয় ও সত্যের উপরে দৃঢ়তার সাথে প্রতিষ্ঠিত এবং আল্লাহ্র নির্দেশ পালনে নিষ্ঠাবান।
টিকাঃ
১. আল-বুসতানী, দাইরাতুল মা'আরিফিল ইসলামিয়্যা, ৭খ., ২২।