📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বক্ষবিদারণ কি?

📄 বক্ষবিদারণ কি?


শাক্ক (شق) অর্থ বিদারণ অর্থাৎ কোন বস্তুকে চিরিয়া ফেলা বা খণ্ডিত করা। সদর (صدر) অর্থ বক্ষ, সীনা। সাধারণত বক্ষ বা সীনা বলিতে কণ্ঠ ও পেটের মধ্যবর্তী অংশকে বুঝায়। কিন্তু আহলে মারিফাত ও তাত্ত্বিকগণের মতে ইহার অর্থ কিছুটা ভিন্ন ও গভীর। তাহাদের মতে, কলব (قلب)-এর দুইটি দ্বার আছে। একটি দ্বার নম্স-এর দিকে। ইহাকে সদর বা বক্ষ বলে। অপর দ্বারটি রূহের দিকে। রূহের দ্বারটির তুলনায় বক্ষের দ্বারটি অতি সংকীর্ণ। মানুষের কলব স্বভাবতই বিশাল ও প্রশস্ত। উহাতে একদিকে সু-বৃত্তির (বিনয়, নম্রতা, ধৈর্য, সহনশীলতা, দান, অনুগ্রহ, স্নেহ-মমতা, অল্পে তুষ্টি ইত্যাদি গুণাবলী) উপাদান গচ্ছিত আছে; অনুরূপ কু-বৃত্তির উপাদানও বিদ্যমান রহিয়াছে (যথা হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার, ক্রোধ, লোভ, কার্পণ্য, স্বার্থপরতা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি)। শয়তান নফসের দিক হইতে কলবে হামলা করিয়া কু-বৃত্তির উপাদানগুলিকে উত্তেজিত করিয়া দেয়। ইহাতে বক্ষের দ্বারটি আরও সংকীর্ণ হইয়া যায় এবং মানুষ অপরাধপ্রবণ হইয়া উঠে। তাহার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হইতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হইতে থাকে। তাই প্রয়োজন দেখা দেয় বক্ষের দ্বারটিকে প্রশস্ত ও সম্প্রসারিত করা যাহাতে কলবের সুকুমার বৃত্তিগুলি বিকশিত হইতে পারে। সদর বা বক্ষের এই সংকীর্ণতা সম্প্রসারিত হওয়া এবং উহার শক্তির পরিসর বিশাল ও ব্যাপক হওয়া যদি শুধু আধ্যাত্মিকভাবেই সংঘটিত হয় তখন উহাকে শরহে সদর বা বক্ষ সম্প্রসারণ বলা হইয়া থাকে। আর যদি বক্ষের এই সম্প্রসারণ ও বিকাশ অর্জন কেবল আধ্যাত্মিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকিয়া দৈহিক ও শারীরিকভাবেও প্রসারিত হয় তবে উহাকে শাক্কু সদর বা বক্ষবিদারণ বলা হইয়া থাকে।
বক্ষের প্রথমোক্ত সম্প্রসারণ ও বিকাশ অর্জনের বিষয়টি পবিত্র কুরআনে সকল নবী-রাসূল, এমনকি মুমিনদের সম্বন্ধেও উল্লিখিত আছে। যেমন সূরা আল-আনআমে ইরশাদ হইয়াছে: فَمَنْ يُرِدِ اللهُ أَنْ يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ وَمَنْ يُرِدْ أَنْ يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا .
"আল্লাহ কাহাকেও সৎপথে পরিচালিত করিতে চাহিলে তিনি তাহার বক্ষ ইসলামের জন্য প্রশস্ত করিয়া দেন এবং কাহাকেও বিপথগামী করিতে চাহিলে তিনি তাহার বক্ষ অতিশয় সংকীর্ণ করিয়া দেন" (৬ঃ ১২৫)।
এই বিষয়টিই সূরা যুমার-এ এইভাবে উল্লিখিত হইয়াছে : أَفَمَنْ شَرَحَ اللَّهُ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ فَهُوَ عَلَى نُورٍ مِّنْ رَّبِّهِ فَوَيْلٌ لِلْقَاسِيَةِ قُلُوبُهُمْ مِّنْ ذِكْرِ اللَّهِ أُولَئِكَ فِي ضَلَلٍ مُّبِينٍ.
"আল্লাহ্ ইসলামের জন্য যাহার বক্ষ উন্মুক্ত করিয়া দিয়াছেন এবং যে তাহার প্রতিপালক প্রদত্ত আলোকে রহিয়াছে সে কি তাহার সমান যে এইরূপ নহে? দুর্ভোগ সেই কাঠার হৃদয় ব্যক্তিদের জন্য যাহারা আল্লাহ্ স্মরণে পরাম্মুখ। উহারা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে" (৩৯: ২২)।
যেহেতু আল্লাহ্ তাআলার অভিপ্রায় হইল অতীতের সকল নবী-রাসূল এবং ওলী, শহীদ, সিদ্দীক, সালেহ ও ফেরেশতা পৃথক পৃথকভাবে যত কামালাত ও বুযর্গীর অধিকারী হইয়াছিলেন উহার সমুদয় অংশকে একত্র করিয়া মুহাম্মাদ (স)-এর মাঝে সমবেত ও পূঞ্জিভূত করিয়া দেওয়া। আর দৈহিক বক্ষ বিদারণ ব্যতীত আধ্যাত্মিক বক্ষ সম্প্রসারণ পরিপূর্ণতা অর্জন করিতে পারে না। অতএব আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলের শরহে সদর তথা বক্ষ সম্প্রসারণের সাথে সাথে শককে সদর তথা বক্ষবিদারণও সম্পন্ন করিয়া দিয়াছেন, যাহাতে তাঁহার জাহির ও বাতিন এক ও অভিন্ন হইয়া যায়। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: أَلَمْ نَشْرَحْ لَكَ صَدْرَكَ .
"আমি কি তোমার কল্যাণে তোমার বক্ষ প্রশস্ত করিয়া দেই নাই" (৯৪: ১)।
বহু সংখ্যক মুফাস্স্সির সূরা ইনশিরাহের এই শরহে সদর অর্থ আত্মিক ও দৈহিক উভয়বিধ প্রশস্তকরণের অর্থে গ্রহণ করিয়াছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) হইতেও এই ব্যাখ্যা বর্ণিত আছে।
শেষনবী সায়্যিদুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মাদ (স) এবং অন্যান্য নবী-রাসূলের মধ্যে পার্থক্য ইহাই যে, আধ্যাত্মিক শরহে সদর তথা বক্ষ সম্প্রসারণ সকলেরই অর্জিত হইয়াছিল। কিন্তু আধ্যাত্মিকতার সাথে দৈহিক বক্ষ সম্প্রসারণ ও বিকাশ অর্জন একমাত্র তাঁহারই বৈশিষ্ট্য। জগতের মধ্যে এই বিশেষত্ব কেবল তিনিই লাভ করিয়াছিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মহর-ই নবুওয়াত

📄 মহর-ই নবুওয়াত


মহর-ই নবুওয়াত, ইহার শাব্দিক অর্থ নবুওয়াতের মহর বা সীল, আরবীতে যাহাকে বলা হয় "খাতামুন-নুবুওয়াত"। সীরাত বিশেষজ্ঞদের পরিভাষায় মহর-ই নবুওয়াত হইতেছে হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর পবিত্র দেহের সঙ্গে জড়িত স্কন্ধের মধ্যবর্তী স্থলে ঘাড় মুবারকের নীচে অবস্থিত গোশতের টুকরা যাহা তাঁহার রিসালাত ও নবৃওয়াতের প্রমাণস্বরূপ। আহলে কিতাবগণ পূর্ব তথ্য অনুযায়ী ইহার দ্বারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর পরিচয় জানিত এবং শনাক্ত করিতে পারিত যে, ইনিই সেই বহু প্রতীক্ষিত সর্বশেষ নবী।
ইতোপূর্বে যে সকল নবী ও রাসূল আগমন করিয়াছিলেন তাঁহাদের সকলের সাথেই বিশেষ একটা চিহ্ন বা নিদর্শন ছিল যাহা দ্বারা নিশ্চিতভাবে পরিচয় পাওয়া যাইত যে, তিনি একজন আল্লাহ্ মনোনীত নবী। এই প্রসঙ্গে হযরত ওয়াহ্ ইব্‌ন মুনাব্বিহ (র) বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা সকল নবীকে তাঁহাদের ডান হাতে নবৃওয়াতের তিলক দিয়া প্রেরণ করিয়াছেন একমাত্র মুহাম্মাদ (স) ব্যতীত। তাঁহার নবৃওয়াতের তিলক ছিল পৃষ্ঠদেশে কাঁধের মধ্যখানে।
মহর-ই নবুওয়াতের কথা প্রসিদ্ধ হাদীছ ও সীরাত গ্রন্থসমূহে বিশেষভাবে উল্লিখিত হইয়াছে। বেশ কয়েকজন সাহাবী (রা) যাহাদের কেহ স্বচক্ষে তাহা অবলোকন করিয়াছিলেন, কেহ বা হাত দ্বারা স্পর্শ করিয়াছিলেন, আবার কেহ তাহাতে চুম্বনও করিয়াছিলেন। তাঁহারা সকলেই ইহার বিবরণ দিয়াছেন। তবে এই মহর-ই নবুওয়াতের আকৃতির বর্ণনা ও তাহার সাদৃশ্য নিরূপণ করিতে গিয়া তাঁহারা বিভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। হাদীছ গ্রন্থসমূহে সাহাবা-ই কিরামের এই সকল বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হইয়াছে। ¹
হযরত সাইব ইব্‌ন ইয়াযীদ (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, "আমার খালা আমাকে নিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার এই ভাগিনার মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা। রাসূলুল্লাহ (স) তখন আমার মাথায় হাত রাখিলেন এবং দোআ করিলেন। অতঃপর তিনি উযু করিলেন, আমি সেই উযুর অবশিষ্ট পানি পান করিলাম। তাহার পর আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর পিছনে দাঁড়াইলাম এবং তাঁহার দুই কাঁধের মাঝখানে মহর-ই নবুওয়াত দেখিতে পাইলাম, যাহার আকৃতি ছিল তিতির পাখির ডিমের মত। ²
হযরত জাবির ইব্‌ন সামুরা (রা) বলিয়াছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর পৃষ্ঠদেশে মহর-ই নবুওয়াত অবলোকন করিয়াছি, যাহা ছিল অনেকটা কবুতরের ডিমের মত। ³
হযরত 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন সারজিস (রা) বলিয়াছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর মহর-ই নবুওয়াত দেখিয়াছিলাম। যাহা ছিল তাঁহার দুই কাঁধের মাঝে বাম কোমলাস্থির নিকট একটা বড় তিলের মত-। ⁴
হযরত কুরা ইব্‌ন ইয়াস (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আপনি আমাকে মহর-ই নবুওয়াত দেখান। তিনি বলিলেন: তোমার হাত ঢুকাইয়া দেখ। আমি হাত ঢুকাইয়া তাঁহার কাঁধের নিকট ডিমের ন্যায় একখণ্ড মাংসপিণ্ড অনুভব করিলাম। ⁵
হযরত সালমান ফারসী (রা) বলিয়াছেন: আমি যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলাম তিনি তাঁহার চাদর সরাইয়া আমাকে বলিলেন, "যাহা দেখিতে চাহিয়াছিলে তাহা দেখিয়া লও”। আমি তখন তাঁহার দুই কাঁধের মাঝামাঝিতে কবুতরের ডিমের সদৃশ্য মহর-ই নবুওয়াত দেখিতে পাইলাম। ⁶
হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা) বলিয়াছেন, মহর-ই নবুওয়াত হইল রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাঁধের কোমলাস্থির নিচে অবস্থিত আপেলের অনুরূপ একখণ্ড মাংস। ⁷
সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দূত যখন রাসূলুল্লাহ্র নিকটে আসিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তখন বলিলেন, হে দূত! যাহা তুমি আদিষ্ট হইয়াছ তাহা দেখিয়া লও। দূত বলেন, আমি তখন রাসূলুল্লাহ্র পিছনে দাঁড়াইলাম এবং তাঁহার কাঁধের কোমলাস্থির নিকট মহর-ই নবুওয়াত অবলোকন করিলাম। ⁸
হযরত আবূ যায়দ (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিলেন, নিকটে আস এবং আমার পিঠ স্পর্শ কর। আমি নিকটে গেলাম এবং আমার হাত দ্বারা তাঁহার পিঠ স্পর্শ করিলাম, তখন আমি আঙুলের মাথায় মহর-ই নবুওয়াতের অবস্থান অনুভব করিলাম। ⁹
হযরত উবাদা ইব্‌ন আমর (রা) বলেন, মহর-ই নবুওয়াত ছিল রাসূলুল্লাহ্র বাম কাঁধের নিকটে এবং রাসূলুল্লাহ (স) ইহা মানুষকে দেখাইতে অপছন্দ করিতেন। ¹⁰
হযরত ইবন উমার (রা) বলিয়াছেন, মহর-ই নবুওয়াত ছিল হেজেল বাদামের আকৃতির একখণ্ড গোশতের টুকরা যাহার উপরে লিখা ছিল, "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”। ¹¹
হ হযরত আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্র মহর-ই নবুওয়াত হইল কালো হলুদ রংয়ের মাঝামাঝি বড় আকারের একটি তিল। ইহার আশেপাশে ঘন কিছু চুল ছিল। ¹²
হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা) বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে তাঁহার পিছনে দাঁড় করাইলেন। আমি তখন মহর-ই নবুওয়াত চুম্বন করিলাম। আমি অনুভব করিলাম তাহা হইতে মিসকের সুগন্ধি বিচ্ছুরিত হইতেছিল। ¹³
উপরিউক্ত হাদীছসমূহের বর্ণনা দ্বারা হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর পবিত্র দেহে মহর-ই নবুওয়াতের অস্তিত্বের বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। তবে ইহার আকার-আকৃতি ও উপমা বর্ণনা করিতে গিয়া সাহাবীগণের একেকজন একেক জিনিসের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। ফলে হাদীছবেত্তাদের নিকটও মহর-ই নবুওয়াতের আকৃতি ও উপমা বর্ণনায় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হইয়াছে। ইমাম বুখারী (র)-এর মতে মহর-ই নবুওয়াত ছিল তিতির পাখির ডিমের ন্যায়। ইমাম মুসলিম বলেন, তাহা ছিল কবুতরের ডিমের মত, বায়হাকী (র)-এর নিকট আপেলের অনুরূপ, হাকেম (র)-এর নিকট একগুচ্ছ চুল, ইব্‌ন আসাকির (র)-এর নিকট হেজেল বাদামের মত। ইবন আবি খায়ছামা (র) বলেন, তাহা ছিল সবুজ রংয়ের বড় একটা তিল। ইব্‌ন হিব্বান (র)-এর মতে এমু পাখির ডিমের মত।
ঠিক তেমনিভাবে মহর-ই নবুওয়াত রাসূলুল্লাহ (স)-এর পৃষ্ঠদেশের কোন অংশে বিদ্যমান ছিল সেই বিষয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। আবূ নু'আয়ম (র) বলেন, তাহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডান কাঁধের নিকট। তিনি হযরত সালমান (রা) বর্ণিত হাদীছ উল্লেখ করেন, মহর-ই নবুওয়াত ছিল তাঁহার ডান কাঁধের কোমলাস্থির নিকট। ¹⁴ সুহায়লী (র) বলিয়াছেন, মহর-ই নবুওয়াত ছিল রাসূলুল্লাহ্ বাম কাঁধের নিকট। তিনি প্রমাণস্বরূপ আবদুল্লাহ ইব্‌ন সারজিস (রা) বর্ণিত "আমি মহর-ই নবুওয়াত" রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাম কাঁধের নিকট দেখিলাম" এই হাদীছ উল্লেখ করেন। অপর দিকে ইমাম মাসরূকের নিকট মহর-ই নবুওয়াত ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর দুই স্কন্ধের মাঝামাঝিতে।
প্রকৃতপক্ষে হাদীছে মাহর-ই নবুওয়াত-এর বর্ণনায় যে সাদৃশ্যগুলি পেশ করা হইয়াছে তাহা হইতে দুইটি বিষয় সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়। (এক) উহার পরিমাণ ও (দুই) উহার আকৃতি। পরিমাণের ক্ষেত্রে দেখা যায়, উহা কখনো বাড়িত, আবার কখনো কমিত। কম হওয়ার সময় উহা কবুতরের ডিমের ন্যায় এবং বৃদ্ধি পাওয়ার ক্ষেত্রে হাতের মুষ্টির ন্যায় হত। আর আকৃতিতে উহা কমলালেবুর ন্যায় গোলাকার ছিল না, বরং ডিমের ন্যায় ছিল অর্থাৎ উহার দুই পার্শে কম এবং মধ্যখানে বেশী প্রশস্ত কিছু গোলাকার। তবে 'মুষ্টিবদ্ধ আঙ্গুলের ন্যায়' শীর্ষক রিওয়াত দ্বারা বুঝা যায়, উহা ডিমের ন্যায় সমতল ও মসৃণ ছিল না।
ইমাম কুরতবী (র) এই প্রসঙ্গে বলেন, অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ আলেমের অভিমত হইল, মহর-ই নবুওয়াত রাসূলুল্লাহ (স)-এর পৃষ্ঠদেশে বাম কাঁধের নিকট ছিল, যাহার আকৃতি ছোট অবস্থায় কবুতরের ডিমের আর বড় হইলে হাতের মুষ্ঠির মত হইত। ¹⁵
মহর-ই নবুওয়াত কখন হইতে পরিলক্ষিত হইয়াছিল সে ব্যাপারেও দুইটি মত পাওয়া যায়। ১ম মত হইল, মহর-ই নবৃওয়াত হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর পবিত্র শরীরে জন্মগতভাবেই ছিল। আবুল ফাতহ ইয়ামানী এই মত ব্যক্ত করিয়াছেন। ২য় মত হইতেছে, মহর-ই নবৃওয়াত জন্মগত নহে, বরং পরে ইহা সংযোজিত হইয়াছিল। ইমাম মুগালতাঈ এবং ইব্‌ন হাজার আসকালানী এই অভিমতের স্বপক্ষে। প্রমাণস্বরূপ তিনি দুইটি হাদীছ উল্লেখ করেন। হযরত আতাবা ইব্‌ন আবদুস সুলামী (রা) রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনার নবুওয়াতের প্রথম অবস্থা কেমন ছিল? তখন তিনি বনী সা'দে অবস্থানকালীন ঘটনা উল্লেখ করিয়া বলেন, সেই দুই ফেরেশতা আমার বিদীর্ণ বক্ষ সেলাই করিয়া তাহার উপর সীল মারিয়া দিল। ¹⁶
হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: জিরবাঈল ও মীকাঈল (আ) নবৃওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে আমার নিকট আসিলেন এবং আমার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া আমার অন্তর বাহির করিলেন। অতঃপর একটা স্বর্ণের পাত্রে রাখিয়া যমযমের পানি দ্বারা তাহা ধৌত করিয়া পুনরায় যথাস্থানে রাখিয়া দিলেন। তারপর আমাকে ঘুরাইয়া আমার পিঠে মহর-ই নবৃওয়াত দ্বারা সীল মারিয়া দিলেন। আমি সেই মহরের অস্তিত্ব অনুভব করিতাম। ¹⁷
ইমাম ইবন হাজার 'আসকালানী মুগালতাঈ-এর অভিমতকে সমর্থন করিয়া ফাতহুল বারী গ্রন্থে উল্লেখ করিয়ছেন, মহর-ই নবুওয়াত জন্মের সময় নয়, বরং বক্ষ বিদীর্ণের ঘটনার সময় ফেরেশতারা ইহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর শরীরে সংযুক্ত করিয়াছিলেন। ¹⁸
তবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ওফাতের সময় মহর-ই নবুওয়াত অদৃশ্য হইয়া গিয়াছিল, ইহাতে কেহ দ্বিমত পোষণ করেন নাই। ইমাম বায়হাকী বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ওফাতের পর মানুষের মাঝে সন্দেহ ও মতানৈক্য সৃষ্টি হইল। কেহ বলিতেছিল, তিনি ওফাত পাইয়াছেন, অন্য কেহ মনে করেতেছিল, তিনি ইন্তেকাল করেন নাই। তখন আসমা বিনতে উমাইস রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দুই কাঁধের মাঝে হাত রাখিলেন এবং বলিয়া উঠিলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) ইন্তিকাল করিয়াছেন। কারণ মহর-ই নবুওয়াত তাঁহার দেহ হইতে অন্তরীণ হইয়া গিয়াছে। ¹⁹
ইমাম বায়হাকী (র) হযরত আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীছও উল্লেখ করেন। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইন্তিকালের সময় আমি মহর-ই নবৃওয়াতের স্থানে হাত রাখিলাম এবং অনুভব করিলাম তাহা আর অবশিষ্ট নাই, অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে। ²⁰
মহর-ই নবুওয়াতের হিকমত বা গূঢ় রহস্য সম্পর্কে সুহায়লী (র) বলিয়াছেন, হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর অন্তর প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও ঈমান দ্বারা যখন পরিপূর্ণ করা হইল তখন তাঁহার উপর নবৃওয়াতের মহর দ্বারা সীল মারিয়া দেওয়া হইল, যেমনিভাবে কোন পাত্র পূর্ণ করিয়া তাহাতে সীল মোহরাঙ্কিত করিয়া দেওয়া হয়। ইহা পিঠের কোমলাস্থির উপর স্থাপনের কারণ বর্ণনা করিয়া তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) শয়তানের কুমন্ত্রণা হইতে মুক্ত। শয়তান সাধারণত এই অংশ দিয়াই মানুষের শরীরে প্রবেশ করিয়া কুমন্ত্রণা প্রদান করিয়া থাকে। ²¹

টিকাঃ
১. হাকেম, জামউল ওসাইল, মোল্লা আলী কারী;
২. বুখারী, কিতাবুল মানাকিব, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৪৮, হাদীছ নং ৩৫৪১;
৩. মুসলিম, কিতাবুল ফাদাইল, ৫ খ., পৃষ্ঠা ৯৭;
৪. মুসলিম, কিতাবুল ফadail, ৫ খ., পৃষ্ঠা ৯৮;
৫. বায়হাকী, (আহমাদ) দালাইলুন নুবুওয়াত, ১ম খ., পৃষ্ঠা ১৫৯;
৬. বায়হাকী, দালাইলুন নুবৃওয়াত, ১ম খ., পৃষ্ঠা ১৫৯;
৭. তিরমিযী, ৫ম খ., পৃষ্ঠা ৫০৫;
৮. আহমাদ (বায়হাকী), ৩য় খ., পৃষ্ঠা ৪৪২;
৯. তিরমিযী, আহমাদ, হাকেম-আহমাদ, ৫ম খ., পৃষ্ঠা ৭৭;
১০. তাবারানী, আবু নুআয়ম-খাসায়েসল কুবরা, সুয়ূতী, ১ম খ.;
১১. ইব্‌ন আসাকির, হাকেম, খাসায়েসুল কুবরা, সুয়ূতী, ১ম খ.;
১২. ইব্‌ন আবী খায়ছামা-খাসায়েসুল কুবরা, সুয়ূতী, ১ম খ.;
১৩. ইব্‌ন আসাকির-খাসায়েসুল কুবরা, সুয়ূতী, ১ম খ.;
১৪. আবু নুআয়ম, দালায়েলুন-নুবুওয়া;
১৫. ফাতহুল বারী, কিতাবুল মানাকিব, ৬ষ্ঠ খ., পৃষ্ঠা ৫৬৩;
১৬. আহমাদ, তাবারানী, সীরাত, মুগালতাঈ, আযযাহরুল বাসিম;
১৭. আবু দাউদ, মুগালতাঈ, আযযাহরুল বাসিম;
১৮. ফাতহুল বারী, কিতাবুল মানাকিব, ৬ষ্ট খ., পৃষ্ঠা ৬৪৯;
১৯. বায়হাকী, দালায়েলুন নবুওয়াত, ১ম খ., পৃষ্ঠা ১৫৯;
২০. বায়হাকী, দালায়েলুন নবুওয়াত, ১ম খ., পৃষ্ঠা ১৬০;
২১. সুহায়লী, রাওদুল উনুফ, ২য় খ., পৃষ্ঠা ১৭৮।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বক্ষবিদারণের রহস্য

📄 বক্ষবিদারণের রহস্য


হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ (র) দেহলবী বলেন; সৃষ্টিগতভাবে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই মালাকুতী ও শয়তানী নামক দুইটি দৈহিক শক্তি বিদ্যমান আছে। প্রথমটি দ্বারা মানুষ ফেরেশতাদের স্বভাব গ্রহণ করে এবং দ্বিতীয়টি দ্বারা শয়তানী স্বভাব গ্রহণ করে। যেহেতু রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সংশ্রব হইবে জগতের সাথে আর সর্বদা তাঁহার সংবাদ আদান-প্রদান এবং কথোপকথন হইবে ফেরেশতাদের সাথে, তাই তাঁহার মালাকৃতী দিকটি শক্তিশালী হওয়া আবশ্যক (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, ২খ., পৃ. ১০৫)। পক্ষান্তরে শয়তান যে তাঁহাকে কোন প্রকার কুমন্ত্রণা দিতে পারিবে না, ইহাও প্রমাণিত। যেমন তিনি শয়তান সম্বন্ধে বলিয়াছেন, "আমি তাহার কুমন্ত্রণা হইতে রক্ষিত" অথবা "সে আমার আনুগত্য স্বীকার করিয়াছে"। সুতরাং তাঁহার দেহ মুবারকে শয়তানী শক্তি বিদ্যমান থাকার কোনই আশংকা নাই। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই রাসূলের বক্ষ বিদারণের অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয়।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর গোটা জীবনে বক্ষবিদারণের ঘটনা মোট চারবার সংঘটিত হইয়াছে। তবে কোন কোন রিওয়ায়াতে পাঁচবারের কথাও বর্ণিত আছে। কিন্তু তথ্যানুসন্ধানের পর প্রমাণিত হইয়াছে যে, এই পঞ্চমবার বক্ষবিদারণের ঘটনাটি সনদ ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ভরযোগ্য নহে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 প্রথম বক্ষবিদারণ

📄 প্রথম বক্ষবিদারণ


সর্বপ্রথম রাসূলে কারীম (স)-এর জীবনে বক্ষবিদারণের ঘটনা সংঘটিত হয় তাঁহার শৈশবকালে। তখন তিনি বানু সাদ গোত্রে তাঁহার দুধমাতা হযরত হালীমা সা'দিয়া (রা)-এর তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হইতেছিলেন। এই সময় তাঁহার বয়স কত হইয়াছিল এই প্রশ্নে সীরাত রচয়িতা ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রহিয়াছে। কতিপয় সীরাত রচয়িতা বলিয়াছেন যে, তখন তাঁহার বয়স হইয়াছিল দুই বৎসর কয়েক মাস। কিন্তু ইবন সা'দসহ অপর কতিপয় ঐতিহাসিক ও সীরাত রচয়িতার মতে এই সময় তাঁহার বয়স হইয়াছিল চার বৎসর।
ঘটনার বিবরণ এই যে, একদিন তিনি তাঁহার দুধভাইয়ের সহিত ছাগল ও মেষ চরাইতে চারণভূমিতে গমন করেন। হঠাৎ শ্বেত পোশাক পরিহিত দুইজন ফেরেশতা তাঁহার সামনে আবির্ভূত হইলেন। ফেরেশতাদ্বয়ের হাতে বরফের নির্মল পানিতে পরিপূর্ণ একটি স্বর্ণের পাত্র। তাঁহারা রাসূল কারীম (স)-কে মাটিতে শোয়াইয়া দিলেন এবং বক্ষ চিরিয়া তাঁহার কল্প (হৃদপিণ্ড) বাহির করিয়া আনিলেন। অতঃপর কল্ব চিরিয়া উহার মধ্য হইতে কালো বর্ণের জমাট বাঁধা কিছু রক্ত জাতীয় বস্তু বাহির করিলেন এবং বলিলেন, এই অংশটি শয়তানের অর্থাৎ এই অংশটির সাহায্যে শয়তান মানুষকে বিপথগামী করে। অতঃপর তাঁহারা কলবটিকে স্বর্ণের পাত্রে রাখিয়া বরফের পানি দ্বারা ভালভাবে ধৌত করিয়া আবার যথাস্থানে সংস্থাপন করিয়া দিলেন।
অতঃপর ফেরেশতাদ্বয় তাঁহার বক্ষ সুই দ্বারা সেলাই করিয়া দেন এবং দুই স্কন্ধের মধ্যখানে একটি মোহর স্থাপন করিয়া দেন। অতঃপর তাঁহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে বুকে জড়াইয়া ধরিলেন, কপালে চুমা খাইলেন এবং বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি ভীত হইবেন না। আপনি যদি জানিতে পারিতেন যে, মহান আল্লাহ আপনার সম্পর্কে কেমন অভিপ্রায় পোষণ করেন, তাহা হইলে আপনি অত্যন্ত খুশী ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করিতেন।
বক্ষবিদারণের কর্ম সমাপ্ত করিয়া একজন ফেরেশতা অন্য একজন ফেরেশতাকে বলিলেন, তাঁহাকে দশজন, লোকের সহিত ওজন দাও। ওজন করা হইল। ইহাতে তিনি ভারি হইলেন। ফেরেশতা আবার বলিলেন, তাঁহাকে একশতজন লোকের সহিত ওজন কর। ইহাতেও তিনি ভারি হইলেন। ফেরেশতা আবার বলিলেন, তাঁহাকে তাঁহার উম্মতের এক হাজার লোকের সহিত ওজন কর। ইহাতেও তিনি ভারি হইলেন। তখন আদেশকারী ফেরেশতা বলিলেন, আল্লাহ্র শপথ! যদি তাঁহাকে তাঁহার সমস্ত উম্মতের সহিতও ওজন কর তাহা হইলেও তিনিই ভারি হইবেন।
রাসূলে কারীম (স) বলেনঃ আমি উহার শীতলতা এখনও আমার বক্ষে অনুভব করিতেছি। তিনি আরও বলেনঃ যখন ফেরেশতাদ্বয় বক্ষবিদারণ সমাপ্ত করিয়া আসমানের দিকে ফিরিয়া যাইতেছিলেন, তখন আমার দৃষ্টি তাঁহাদের গমন পথ অনুসরণ করিতেছিল। রিওয়ায়াতকারী সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, আমি বক্ষবিদারণের চিহ্ন কখনো কখনো তাঁহার বক্ষে দেখিতে পাইতাম।
শৈশবকালে দুধমাতা হযরত হালীমা সা'দিয়া (রা)-এর তত্ত্বাবধানে অবস্থানের সময়ে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বক্ষ বিদারণের ঘটনা সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত এবং বিভিন্ন হাদীছ গ্রন্থে একাধিক সূত্রে তাহা বর্ণনা করা হইয়াছে।
প্রথম সূত্র: মুসনাদে আহমাদ ও মু'জামে তাবারানী গ্রন্থদ্বয়ে উক্ত হাদীছটি সাহাবী হযরত উতবা ইব্‌ন আব্দ (রা)-এর সূত্রে সবিস্তারে বর্ণনা করা হইয়াছে। ইমাম হাকেম তাঁহার আল-মুস্তাদরাক গ্রন্থে এই হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন এবং ইহার সত্যতা স্বীকার করিয়া বলিয়াছেন যে, এই হাদীছটি ইমাম মুসলিমের শর্তের উপর প্রতিষ্ঠিত। তবে হাদীছটির সনদে বাকিয়্যা ইবনুল ওয়ালীদ নামক একজন রাবী (বর্ণনাকারী) আছেন। তিনি কিছুটা বিতর্কিত। ইহার কারণে কোন কোন মুহাদ্দিছ হাদীছটিকে ইমাম মুসলিমের শর্তানুসারে সহীহ বলিয়া বিবেচনা করিতে সংশয় প্রকাশ করিয়াছেন। কিন্তু হযরত আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, হাফিজ ইয়াহইয়া ইব্‌ন মাঈন, আবূ যুরআ ইজালী, ইবন সা'দ প্রমুখ মুহাদ্দিছ বলেন, বাকিয়্যা ইবনুল ওয়ালীদ ব্যক্তিগতভাবে নির্ভরযোগ্য রাবী। সুতরাং তিনি যদি অপর কোন নির্ভরযোগ্য রাবী হইতে হাদীছ বর্ণনা করেন, তবে তাহা নিঃসন্দেহে গ্রহণযোগ্য। ইমাম নাসাঈ (র) বলেন: তিনি যদি হাদ্দাছানা বা আখবারানা এই জাতীয় স্পষ্ট শব্দ দ্বারা রিওয়ায়াত করেন তাহা হইলে গ্রহণযোগ্য হইবে, অন্যথায় নহে। উল্লেখ্য যে, এই হাদীছ খানার মধ্যে মুহাদ্দিসগণের ব্যবহৃত সকল শর্ত বিদ্যমান। কারণ এই হাদীছটি কোন সনদে "আন' দ্বারা বর্ণিত হইলেও মুস্তাদরাক হাকেম-এর রিওয়ায়াতে আখবারানা ও হাদ্দাছানা শব্দ ব্যবহার করা হইয়াছে এবং বাকিয়‍্যা ইবনুল ওয়ালীদ এই হাদীছটি যাহার সূত্রে রিওয়ায়াত করিয়াছেন তিনি হইলেন বাহর ইন্ন সাঈদ, যিনি একজন নির্ভরযোগ্য রাবী। হাফিজ ইব্‌ন হিব্বান, আবূ হাতিম, ইবন্ সা'দ, ইমাম নাসাঈ, আল্লামা ইজালী ও ইমাম আহমাদ ইব্‌ন হাম্বল প্রমুখ তাঁহাকে নির্ভরযোগ্য বলিয়া স্বীকৃতি দিয়াছেন। আল-হায়ছামী বলেন, উতবা ইব্‌ন আব্দ-এর সূত্রে বর্ণিত হাদীছটি যাহা ইমাম আহমাদ ও তাবারানী নিজ নিজ কিতাবে আনিয়াছেন, হাসান। আল্লামা যুরকানী বলেন, এই হাদীছটির সনদের বিশুদ্ধতা সন্দেহাতীত।
দ্বিতীয় সূত্র: আবূ যার (রা)-এর রিওয়ায়াত। শায়খ বায্যায় স্বীয় মুসনাদে এবং ইমাম দারিমী স্বীয় সুনানে তাঁহার সূত্রে শককে সদরের ঘটনাটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সবিস্তারে বর্ণনা করিয়াছেন। যুরকানী বলেন, আবূ যার গিফারী (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত উক্ত হাদীছটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। হাফেজ যিয়াউদ্দীন আল-মাকদিসীও হাদীছটিকে সহীহ বলিয়াছেন। মুহাদ্দিছগণ লিখিয়াছেন যে, সনদের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে হাফেজ মাকদিসীর মন্তব্য হাকেম-এর মন্তব্যের চেয়েও অধিক বিশুদ্ধ।
হাফিয ইবন হাজার আসকালানী বলেন, আবূ যার গিফারী (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত হাদীছটি উল্লিখিত কিতাবগুলি ছাড়াও নিম্নোক্ত কিতাবসমূহে সহীহ সনদে বর্ণিত হইয়াছে। যথা দালায়েলে আবু নুআয়ম, মুসনাদে আহমাদ, দালায়েলে বায়হাকী ইত্যাদি।
তৃতীয় সূত্র: সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-এর বর্ণনা। তাবাকাত ইবন সাদ গ্রন্থে হাদীছটি সহীহ সনদে বর্ণিত আছে। ইহার সকল রাবী নির্ভরযোগ্য এবং ইমাম বুখারী ও মুসলিম ইহা সমর্থন করিয়াছেন।
চতুর্থ সূত্র: সাহাবী হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর বর্ণনা। হাদীছটিকে আল্লামা সুয়ূতী ইমাম বায়হাকীর বরাতে রিওয়ায়াত করিয়াছেন। ইহা ছাড়া সুয়ূতী তাঁহার খাসাইস নামক গ্রন্থেও হাদীছটি একই সনদে বর্ণনা করিয়াছেন।
পঞ্চম সূত্র: সাহাবী হযরত শাদ্দাদ ইব্‌ন আওস (রা)-এর বর্ণনা। এই হাদীছটি ইব্‌ন হাজার আসকালানী তাঁহার ফাতহুল বারী গ্রন্থে এবং যুরকানী তাঁহার শরহে মাওয়াহিব এ রিওয়ায়াত করিয়াছেন। ইহা ছাড়া শায়খ আবু ইয়ালা তাঁহার মুসনাদে এবং আবূ নুআয়ম তাঁহার দালাইলে এই হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন।
ষষ্ঠ সূত্র: তাবিঈ হযরত খালিদ ইব্‌ন মা'দান (র) এই হাদীছটি ইবন সা'দ তাঁহার তাবাকাত গ্রন্থে (১খ., পৃ. ৯৬) মুরসালরূপে রিওয়ায়াত করিয়াছেন। কিন্তু মুহাম্মদ ইবন ইসহাকের সনদে সুস্পষ্ট রহিয়াছে যে, খালিদ বলেন, আমাকে সাহাবা-ই কেরামের এক জামা'আত শককে সদরের কথা বলিয়াছেন। ইব্‌ন কাছীর ইবন ইসহাকের এই রিওয়ায়াত নকল করিবার পর বলেন, এই সনদটি ভাল এবং মযবুত।
ইদরীস কান্ধলবী (র) বলেন, উল্লিখিত ইবন আব্বাস, শাদ্দাদ ইবন আওস ও খালিদ ইব্‌ন মা'দানের সূত্রে বর্ণিত রিওয়ায়াতসমূহের কোন কোন রাবী দুর্বল। এককভাবে যদিও এই হাদীছগুলি দুর্বল কিন্তু হাদীছখানা একাধিক সূত্রে বর্ণিত হওয়ার কারণে ইহার দুর্বলতা লাঘব হইয়া গিয়াছে এবং ইহা নির্ভরযোগ্য হাদীছে পরিণত হইয়াছে। কারণ মুহাদ্দিছীনে কিরামের সর্বসম্মত নীতি হইল যে, একাধিক সনদ সনদের দুর্বলতাকে লাঘব করিয়া দেয়। দ্বিতীয় কথা হইল যে, ইতোপূর্বে আমরা দেখিয়াছি, এই হাদীছটি একাধিক সহীহ সনদেও বর্ণিত হইয়াছে। সুতরাং এই দুর্বল রিওয়ায়াতগুলি ঐ সহীহ রিওয়ায়াতগুলির সমর্থক বলিয়া বিবেচিত হইবে, হাদীছটি সহীহ হওয়ার ব্যাপারে কোনরূপ সংশয় সৃষ্টির কারণ হইবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00