📄 ওয়াদিল কুরা যুদ্ধের ফলাফল
এই যুদ্ধের ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। এই যুদ্ধের পর আরবে ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের কয়েক শতাব্দীর পুরাতন আর্থ-রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির অবসান ঘটে। ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর আনুগত্য স্বীকার করিয়া ইসলামী রাষ্ট্রের নিয়ম-কানুন মানিতে বাধ্য হয়। হুদায়বিয়ার সন্ধির পর যেমন মদীনার দক্ষিণাঞ্চল মক্কার দিক হইতে শত্রুর আক্রমণ আশংকা দূরীভূত হয়, তেমনি ওয়াদিল কুরা, খায়বার, তায়মা বিজয়ের মাধ্যমে উত্তর দিকের সকল প্রকার আক্রমণ ও সংঘর্ষের আশংকা চিরতরে তিরোহিত হয়। ইয়াহুদীদের বশ্যতা স্বীকারের পর তাহাদের সম্পর্কে মুসলমানদের বিশেষ করিয়া আনসারদের ক্ষোভ প্রশমিত হইয়া যায়।
অভিযানকালীন ইয়াহুদীদের প্রতি মহানবী (স)-এর সদ্ব্যবহার ও মার্জিত আচরণ পরমত-সহিষ্ণুতার ইতিহাসে উজ্জ্বল হইয়া থাকিবে। ওয়াদিল কুরা যুদ্ধশেষে রাসূলুল্লাহ (স) ইয়াহুদীদের কোন উপাসনালয় (Synagogue) বা তাহাদের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ তাওরাত অবমাননা বা অপবিত্র করেন নাই। কোন ইয়াহুদী মহিলা মুসলিম সেনা সদস্যদের হস্তে নির্যাতিতা হইয়াছে এমন অভিযোগ কোন বিদ্বিষ্ট ইতিহাসবিদও করেন নাই। খায়বার বিজয়ের সময় তাওরাত গ্রন্থের কয়েকটি কপি মুসলমানদের হস্তগত হয়। ইয়াহুদীগণ আবেদন করিলে রাসূলুল্লাহ্ (স) এইসব কপি তাহাদের ফিরাইয়া দেন। অথচ বিজিত ইয়াহুদীদের প্রতি বিজয়ী স্টানদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ ছিল আগ্রাসী ও বিদ্বেষপ্রসূত। এই প্রসঙ্গে ড. মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কলের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য:
This is in direct contract to the manner in which the Romans treated the Jews when they conquired Jerusalem and burned all the sacred writings they found in the Temple and trampled them under foot. It is also far from the Christian persecution of the Jews in Spain where every Torah seized was put to the torch.
"রোমান খৃস্টানরা জেরুসালেম অধিকারের পর সেখানকার মন্দিরে প্রাপ্ত তাওরাত গ্রন্থের কতিপয় কপি জ্বালাইয়া দিয়াছিল, এমনকি এইগুলিকে তাহারা পদদলিত করিয়াছিল। শুধু তাহাই নয়, স্পেন বিজয়ের পরও খৃস্টানরা সেইখানকার তাওরাত গ্রন্থগুলি আগুনে ভস্মীভূত করিয়াছিল" (The Life of Muhammad, Translated into English by Dr. Ismail Razi A. al Faruqi, P. 371-2)।
ওয়াদিল কুরায় চার দিন অবস্থানের পর রাসূলুল্লাহ্ (স) মদীনার পথে রওনা হন। গভীর রাত্রিতে তাহারা মদীনার কাছাকাছি কোন এক মনযিলে অবতরণ করেন। রাত্রির শেষভাগে বিশ্রাম গ্রহণের আগে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, “কে আছ যে জাগ্রত থাকিয়া ভোর পর্যন্ত পাহারা দিতে পারিবে”? কারণ আমার ঘুম আসিতে পারে।
হযরত বিলাল (রা) বলিলেন, আমি সারা রাত পাহারা দিব। ইহার পর রণক্লান্ত সাহাবীগণ ঘুমাইয়া পড়িলেন। হযরত বিলাল (রা) বেশ কিছুক্ষণ নফল নামায আদায় করেন, ক্লান্ত হইয়া পড়িলে তিনি একটি উটের গায়ে হেলান দিয়া বসিয়া পড়িলেন, কখন যে ঘুম তাঁহাকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল তাহা তিনি বুঝিতে পারেন নাই। নিদ্রাভিভূত অবস্থায় ফজরের সময় অতিক্রান্ত হইয়া গেল। যুদ্ধের পরিশ্রম ও পথের ক্লান্তির কারণে কেহই চোখ খুলিতে পারিলেন না। এই দিকে ফজরের সময় উত্তীর্ণ হইয়া গেল। দেখিতে দেখিতে সূর্যতাপ প্রখর হইতে লাগিল। রৌদ্রের উত্তাপে প্রথমে রাসূলুল্লাহ্ (স) জাগ্রত হইলেন এবং বিলাল (র)-কে ঘুম হইতে তুলিয়া বলিলেন, বিলাল! তুমি কেমন পাহারা দিলে? তিনি লজ্জিত হইয়া বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! যে নিদ্রা আপনাকে আচ্ছন্ন করিয়াছিল তাহা আমাকেও আচ্ছন্ন করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ্ (স) মুচকি হাসিয়া বলিলেন, ঠিক আছে, এইখান হইতে প্রস্থান কর। এই প্রান্তরে শয়তান আছে। প্রান্তর অতিক্রম করিবার পর সকলেই উযু করিয়া সুন্নত পড়িলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর হুকুমে হযরত বিলাল (রা) ইকামত দিলেন এবং জামায়াতের সহিত সকলে ফজরের নামায আদায় করিলেন। নামাযশেষে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন:
اذا نسيتم الصلاة فصلوها اذا ذكرتموها فان الله عز وجل يقول انني انا الله لا اله الا انا فاعبدني واقم الصلاة لذكرى.
“ভুলিয়া যাওয়ার কারণে তোমাদের নামায যদি কাযা হইয়া যায় তাহা হইলে স্মরণ হওয়ার পরপরই নামায আদায় করিয়া লইবে। মহান আল্লাহ্ বলেন, আমিই আল্লাহ, আমা ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। অতএব তোমরা আমার ইবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর” (২০-১৪)।
ফজরের নামায কাযা হওয়ার এই ঘটনার ব্যাখ্যা সম্পর্কে আলিমদের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। কেহ বলেন, ইহা হুদায়বিয়ার সন্ধি হইতে প্রত্যাবর্তনের পথে সংঘটিত হইয়াছিল। ওয়াকিদী বলেন, তাবুক যুদ্ধের সহিত এই ঘটনা সম্পৃক্ত ও সম্পর্কিত। আবার কেহ মনে করেন হুনায়নের যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তন করার সময়ে ইহা ঘটিয়াছিল। ইমাম বায়হাকীর মতে এমন ঘটনা সম্ভবত দুইবার ঘটিয়াছে। আলী আল-হালাবী বলেন, সাহাবায়ে কিরামের বর্ণনায় এই কথা বুঝা যায় যে, নামায কাযা হওয়ার ঘটনা ওয়াদিল কুরা যুদ্ধ হইতে মদীনা ফেরার পথে সংঘটিত হইয়াছিল। তবে এইরূপ একাধিক ঘটনাও ঘটিতে পারে, ইহা অসম্ভব নয়। সেই ক্ষেত্রে সব বর্ণনা সঠিক বলিয়া প্রমাণিত হইবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ, পৃ. ২১৩; তারিখ্ তাবারী, ৩খ, পৃ. ১৭; সীরাতু হালাবিয়া, ১খ, পৃ. ১৯৫; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২১1-২)।
ওয়াদিল কুরার যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহিত বেশ কয়েকজন মহিলাও ছিলেন। যদিও তাঁহাদিগকে গণীমাতের সম্পদে শরীক করা হয় নাই, তবে বিজিত অঞ্চলের উৎপন্ন দ্রব্যের একটি অংশ তাহাদিগকে প্রদান করা হয় (তারীখু, তাবারী, ৩খ., পৃ. ১৭)।
এই যুদ্ধের ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। এই যুদ্ধের পর আরবে ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের কয়েক শতাব্দীর পুরাতন আর্থ-রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির অবসান ঘটে। ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর আনুগত্য স্বীকার করিয়া ইসলামী রাষ্ট্রের নিয়ম-কানুন মানিতে বাধ্য হয়। হুদায়বিয়ার সন্ধির পর যেমন মদীনার দক্ষিণাঞ্চল মক্কার দিক হইতে শত্রুর আক্রমণ আশংকা দূরীভূত হয়, তেমনি ওয়াদিল কুরা, খায়বার, তায়মা বিজয়ের মাধ্যমে উত্তর দিকের সকল প্রকার আক্রমণ ও সংঘর্ষের আশংকা চিরতরে তিরোহিত হয়। ইয়াহুদীদের বশ্যতা স্বীকারের পর তাহাদের সম্পর্কে মুসলমানদের বিশেষ করিয়া আনসারদের ক্ষোভ প্রশমিত হইয়া যায়।
অভিযানকালীন ইয়াহুদীদের প্রতি মহানবী (স)-এর সদ্ব্যবহার ও মার্জিত আচরণ পরমত-সহিষ্ণুতার ইতিহাসে উজ্জ্বল হইয়া থাকিবে। ওয়াদিল কুরা যুদ্ধশেষে রাসূলুল্লাহ (স) ইয়াহুদীদের কোন উপাসনালয় (Synagogue) বা তাহাদের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ তাওরাত অবমাননা বা অপবিত্র করেন নাই। কোন ইয়াহুদী মহিলা মুসলিম সেনা সদস্যদের হস্তে নির্যাতিতা হইয়াছে এমন অভিযোগ কোন বিদ্বিষ্ট ইতিহাসবিদও করেন নাই। খায়বার বিজয়ের সময় তাওরাত গ্রন্থের কয়েকটি কপি মুসলমানদের হস্তগত হয়। ইয়াহুদীগণ আবেদন করিলে রাসূলুল্লাহ্ (স) এইসব কপি তাহাদের ফিরাইয়া দেন। অথচ বিজিত ইয়াহুদীদের প্রতি বিজয়ী স্টানদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ ছিল আগ্রাসী ও বিদ্বেষপ্রসূত। এই প্রসঙ্গে ড. মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কলের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য:
This is in direct contract to the manner in which the Romans treated the Jews when they conquired Jerusalem and burned all the sacred writings
they found in the Temple and trampled them under foot. It is also far from the Christian persecution of the Jews in Spain where every Torah seized was put to the torch.
"রোমান খৃস্টানরা জেরুসালেম অধিকারের পর সেখানকার মন্দিরে প্রাপ্ত তাওরাত গ্রন্থের কতিপয় কপি জ্বালাইয়া দিয়াছিল, এমনকি এইগুলিকে তাহারা পদদলিত করিয়াছিল। শুধু তাহাই নয়, স্পেন বিজয়ের পরও খৃস্টানরা সেইখানকার তাওরাত গ্রন্থগুলি আগুনে ভস্মীভূত করিয়াছিল"।
📄 গাযওয়া ওয়াদিল কুরা ভুমিকা
ওয়াদিল কুরা খায়বার ও তায়মার মধ্যবর্তী জায়গায় অবস্থিত একটি বিস্তীর্ণ উপত্যকার নাম। প্রাচীন কালে 'আদ ও ছামূদ বংশীয় জনগোষ্ঠী এইখানে বসবাস করিত। ইয়াকৃত আল-হামাবী মু'জামুল বুলদান গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন যে, এখানে 'আদ ও হামূদ জনগোষ্ঠীর স্মৃতিচিহ্ন অদ্যাবধি বিদ্যমান রহিয়াছে। প্রাক-ইসলামী যুগে ইয়াহুদীরাই এই জায়গা আবাদ করে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুগেও ইহা ইয়াহুদীদের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্ররূপে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল (ইয়াকৃত আল-হামাবী, মু'জামুল বুলদান, ৭খ, পৃ. ৭০; সায়্যিদ সুলায়মান নদবী, সীরাতুন্নবী, ১খ., পৃ.২৮৯)। শায়খ আবুল হাসান আলী নদবী বলেন, ওয়াদিল কুরাতে ইয়াহুদী ও আরবদের অনেক বসতি ছিল। ইহা আরব উপদ্বীপের মধ্যে অন্যতম উর্বর ও শস্য-শ্যামল এলাকা। এই উপত্যকায় বিপুল সংখ্যক প্রাকৃতিক ঝর্ণাধারা ও কূপ রহিয়াছে (নবীয়ে রহমত, ২খ., পৃ. ৪৫)।
খায়বার বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ্ (স) ওয়াদিল কুরা অভিমুখে যাত্রা করেন। মুসলমানগণ ওয়াদিল কুরায় পৌঁছামাত্র সেইখানকার ইয়াহুদী ও কতিপয় আরব মুশরিক সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের লক্ষ্য করিয়া তীর বর্ষণ করিতে শুরু করে। অথচ মুসলমানগণ সেই মুহূর্তে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। অজ্ঞাত স্থান হইতে শত্রুর আকস্মিক নিক্ষিপ্ত তীরে মিদআম (مدعم) নামক রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর এক ভৃত্য নিহত হয়। দুবাব (ضباب) গোত্রের রিফা'আ ইব্ন যায়দ আল-জুযামী নামক জনৈক ব্যক্তি কৃষ্ণকায় এই ভৃত্যটি রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে উপহার দিয়াছিলেন। তীরবিদ্ধ হওয়ার সময় সে উষ্ট্রপৃষ্ঠ হইতে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর হাওদা নামাইতেছিলেন। সাহাবীগণ এই দৃশ্য দেখিয়া বলিলেন, কি আনন্দের বিষয়! মিদ'আমের শাহাদাত মুবারক হোক। রাসূলুল্লাহ্ (স) এই কথা শুনিয়া মন্তব্য করিলেন:
كلا والذي نفسي بيده ان الشملة التي اصابها يوم خيبر من المغانم لم تصبها المقاسم لتشعل عليه نارا.
"কিছুতেই না, ঐ মহান সত্তার কসম যাঁহার হস্তে আমার প্রাণ! খায়বার যুদ্ধের গনীমতের সম্পদ হইতে সে যে চাদরটি বণ্টন করা ছাড়াই লইয়াছিল সেই চাদর অগ্নি হইয়া তাঁহাকে দগ্ধ করিবে"।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর বক্তব্য শুনিয়া জনৈক ব্যক্তি দুইটি জুতার ফিতা আনিয়া বলিলেন, আমি অনুমতি ছাড়া এই দুইটি ফিতা লইয়াছি। রাসূলুল্লাহ্ (স) জবাব দিলেন, হাঁ, আত্মসাৎকৃত একটি অথবা দুইটি জুতার ফিতা জাহান্নামের অগ্নিতে রূপান্তরিত হইবে (সহীহ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৬০৮; তাবারী, তারীখ, ৩খ., পৃ. ১৬)। উল্লেখ্য যে, ইসলামী শরীআতে যুদ্ধলব্ধ সব সম্পদ অর্থাৎ গনীমত বণ্টিত হওয়ার বিধান আছে। বণ্টন অনুযায়ী প্রাপ্ত হওয়া ছাড়া সরাসরি কোন মাল হস্তগত করা বা চুরি করা মারাত্মক খেয়ানত। কুরআন মজীদের সূরা আল ইমরানের ১৬১ আয়াতে এই বিষয়ে কঠোর সাবধানবাণী উচ্চারিত হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উপরিউক্ত হাদীছ কুরআন মজীদের এই আয়াতের ব্যাখ্যা স্বরূপ।
রাসূলুল্লাহ (স) এইরূপ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনীকে বিন্যস্ত করেন। হযরত সা'দ ইবন উবাদা (র)-কে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করা হয় এবং হযরত হুবاب ইব্নুল মুনযির (রা), হযরত সাহল ইবন হুনায়ফ (রা) ও হযরত আব্বাদ ইব্ন বিশ্র (রা)-কে একটি করিয়া পতাকা প্রদান করা হয়।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) ওয়াদিল কুরার অধিবাসীদেরকে ইসলামের দাওয়াত পেশ করিয়া বলেন, তাহারা যদি ইসলাম কবুল করে তাহা হইলে তাহাদের জান-মালের নিরাপত্তা বিধান করা হইবে এবং তাহাদের ব্যাপার আল্লাহ্ উপর ন্যস্ত করা হইবে। কিন্তু তাহারা এই আহবানে সাড়া দিল না। তাহাদের মধ্য হইতে এক ইয়াহুদী হুংকার ছাড়িয়া সম্মুখ যুদ্ধের জন্য বাহির হইয়া আসিল।
মুসলমানদের পক্ষ হইতে হযরত যুবায়র ইবনুল আওয়াম (রা) এক আঘাতেই তাহাকে দ্বিখণ্ডিত করেন; দ্বিতীয় আরেক যোদ্ধা আগাইয়া আসিলে তিনি তাহাকেও হত্যা করেন। অতঃপর তৃতীয় যোদ্ধা আগাইয়া আসিলে হযরত আলী (রা) তাহার মুকাবিলার জন্য অগ্রসর হন এবং ইয়াহুদী সেনা হযরত আলী (রা)-র তরবারির আঘাতে মাটিতে লুটাইয়া পড়ে এবং প্রাণ হারায়। এইভাবে একদিনে শত্রু পক্ষের এগার ব্যক্তি নিহত হয়। এক একজন নিহত হইলে নূতনভাবে রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। নামাযের ওয়াক্ত হইলে তিনি সাহাবীগণকে লইয়া জামাআতে নামায আদায় করিতেন। ইহার পর মুখামুখী হইয়া ইয়াহুদীদেরকে ইসলামের দাওয়াত পেশ করিতেন। এইভাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত যুদ্ধ চলিতে থাকে।
পরদিন প্রত্যুষে আবার যুদ্ধ শুরু হইলে মুসলমানদের নিপুণ অস্ত্র চালনা, পরিকল্পিত যুদ্ধ কৌশলও শাহাদতের জবার সামনে ইয়াহুদীগণ অস্ত্র সমর্পণ করিতে বাধ্য হয়। ওয়াদিল কুরা ঐ দিনই মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে আসে। এই যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ সাজ-সরঞ্জাম ও সম্পত্তি মুসলমানদের হস্তগত হয়। রাসূলুল্লাহ (স) গনীমতের সম্পদ শরীআতের বিধানমতে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে বণ্টন করিয়া দেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৬-৭; কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৭১০-১১; আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৩৮৭)।
'আলী আল-হালাবী ওয়াদিল কুরার ভূমি ও বাগান বণ্টন সম্পর্কে বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) সমুদয় ধন সম্পদ পাঁচ ভাগে বিভক্ত করিয়া বণ্টন করিয়া দেন এবং ওয়াদিল কুরার আবাদী ভূমি খায়বারের ন্যায় চাষাবাদ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইয়াহুদীদের হাতে সোপদ করেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশমত ভূমি কর্ষণ, সেচ, শস্য কর্তন, পরিচর্যা ও পরিমাপ ইত্যাদি ইয়াহুদীদের দায়িত্বে থাকিবে এবং উৎপাদিত শস্যের অর্ধেক পাইবে মুসলমানগণ। অপর এক বর্ণনায় বলা হয়, রাসূলুল্লাহ্ (স) ওয়াদিল কুরার ভূমি ও ফলের বাগান ইয়াহুদীদের তত্ত্বাবধানে ছাড়িয়া দেন। তবে তাহারা অর্থের বিনিময়ে কাজ করিতে থাকিবে অর্থাৎ পূর্বে স্বত্বাধিকারী হিসাবে কাজ করিত, এখন কর্মচারী হিসাবে কাজ করিবে (আল-হালাবী, সীরাতুল হালাবিয়া, ১খ., পৃ. ১৯৩)।
উপরিউক্ত ঘটনা হইতে এই কথা প্রতিভাত হয় যে, জিহাদে পরাজিত শত্রুর সব সম্পদই গনীমত নয়, বরং যাহা কেবল যুদ্ধের ময়দান হইতে হস্তগত হইবে তাহাই গনীমত। অন্যান্য সম্পদ, যেমন ঘর-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শিল্প-কারখানা, ভূ-সম্পত্তি ইত্যাদি ফাই-এর মাল হিসাবে গণ্য হইবে (বিনাযুদ্ধে লব্ধ সম্পত্তি যাহার বণ্টন আমীরের এখতিয়ারভুক্ত থাকে)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) আমর ইবন সাঈদ ইবনিল আস (রা)-কে ওয়াদিল কুরার প্রশাসক নিযুক্ত করেন এবং উব্রাহ (عزرة) গোত্রের সর্দার জাম্মা (جمرة) ইব্দু নু'মান ইব্ন হাওযা (هوذة) আল-উষরী (রা)-কে ওয়াদিল কুরার একখণ্ড খাস জমি বন্দোবস্ত প্রদান করেন। জাম্রা হিজাযের প্রথম ব্যক্তি যিনি তাহার গোত্রের পক্ষ হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট সাদাকা (যাকাত) লইয়া আসিয়াছিলেন ('উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১৯৭)।
- তায়মা (تيماء) অঞ্চলে বসবাসরত ইয়াহুদীরা যখন জানিতে পারিল যে, খায়বার, ফাদাক ও ওয়াদিল কুরা মুসলমানদের পদানত হইয়াছে তখন তাহারা প্রমাদ গণিল এবং নিজেদের পরিণতি চিন্তা করিয়া জিযয়া প্রদানের শর্তে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের প্রস্তাব প্রেরণ করিল। রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহাদের প্রস্তাব গ্রহণ করিয়া একটি চুক্তিপত্র সম্পাদন করেন। চুক্তিপত্রে বলা হয়:
هذا كتاب محمد رسول الله صلى الله عليه وسلم لبنى عدى أن لهم الذمة وعليهم الجزية ولا عداء ولا جلاء.
"আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হইতে এই চুক্তি বানু আদীর (তায়মা) জন্য। তাহাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব মুসলমানদের উপর, তাহাদিগকে জিযয়া দিতে হইবে। তাহাদেব সহিত শত্রুতা প্রদর্শন করা হইবে না এবং স্বদেশ ভূমি হইতে তাহাদের বহিষ্কারও করা হইবে না। এই চুক্তি স্থায়ী বলিয়া বিবেচিত হইবে"।
হযরত খালিদ ইব্ন সাঈদ (রা) রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নির্দেশক্রমে এই চুক্তিপত্র স্বহস্তে লিখেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) ইয়াযীদ ইব্ন আবী সুফয়ান (রা)-কে তায়মা অঞ্চলের প্রশাসক নিয়োগ করেন। চুক্তি অনুযায়ী তাহারা ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হইয়া নিজেদের বাস্তভিটায় নিরাপদে বসবাস করিতে থাকে। তাহাদের সম্পত্তি ও ভূমি অধিগ্রহণ করা হয় নাই। পূর্বের ন্যায় তাহারা স্বধর্ম পালন করিবার অধিকার পায়। ইয়াহুদীদের দুর্গে সংরক্ষিত স্বর্ণ ও রৌপ্য মুসলমানরা স্পর্শ করেন নাই (সীরাতু হালাবিয়া, ১খ., পৃ. ১৯২-৩; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১৭৮-৯)।
আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমার (রা) ওয়াদিল কুরা ও তায়মার জনগণকে নিজেদের জায়গায় অবস্থানের নির্দেশ দেন। কারণ উক্ত জায়গা দুইটি আরব উপদ্বীপের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাঁহার মতে, ওয়াদিল কুরা হইতে মদীনা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা হিজাযের অন্তর্ভুক্ত এবং ওয়াদিল কুরা সংলগ্ন হইতেছে সিরিয়া। কোন কোন গবেষক মনে করেন, ওয়াদিল কুরা এককালে সিরিয়ার অংশ ছিল (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৭; মুখতাসার সীরাতি রাসূলিল্লাহ, পৃ. ৩১৮; আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ২১১)।
ওয়াদিল কুরায় চার দিন অবস্থানের পর রাসূলুল্লাহ্ (স) মদীনার পথে রওনা হন। গভীর রাত্রিতে তাহারা মদীনার কাছাকাছি কোন এক মনযিলে অবতরণ করেন। রাত্রির শেষভাগে বিশ্রাম গ্রহণের আগে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, “কে আছ যে জাগ্রত থাকিয়া ভোর পর্যন্ত পাহারা দিতে পারিবে”? কারণ আমার ঘুম আসিতে পারে।
হযরত বিলাল (রা) বলিলেন, আমি সারা রাত পাহারা দিব। ইহার পর রণক্লান্ত সাহাবীগণ ঘুমাইয়া পড়িলেন। হযরত বিলাল (রা) বেশ কিছুক্ষণ নফল নামায আদায় করেন, ক্লান্ত হইয়া পড়িলে তিনি একটি উটের গায়ে হেলান দিয়া বসিয়া পড়িলেন, কখন যে ঘুম তাঁহাকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল তাহা তিনি বুঝিতে পারেন নাই। নিদ্রাভিভূত অবস্থায় ফজরের সময় অতিক্রান্ত হইয়া গেল। যুদ্ধের পরিশ্রম ও পথের ক্লান্তির কারণে কেহই চোখ খুলিতে পারিলেন না। এই দিকে ফজরের সময় উত্তীর্ণ হইয়া গেল। দেখিতে দেখিতে সূর্যতাপ প্রখর হইতে লাগিল। রৌদ্রের উত্তাপে প্রথমে রাসূলুল্লাহ্ (স) জাগ্রত হইলেন এবং বিলাল (র)-কে ঘুম হইতে তুলিয়া বলিলেন, বিলাল! তুমি কেমন পাহারা দিলে? তিনি লজ্জিত হইয়া বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! যে নিদ্রা আপনাকে আচ্ছন্ন করিয়াছিল তাহা আমাকেও আচ্ছন্ন করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ্ (স) মুচকি হাসিয়া বলিলেন, ঠিক আছে, এইখান হইতে প্রস্থান কর। এই প্রান্তরে শয়তান আছে। প্রান্তর অতিক্রম করিবার পর সকলেই উযু করিয়া সুন্নত পড়িলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর হুকুমে হযরত বিলাল (রা) ইকামত দিলেন এবং জামায়াতের সহিত সকলে ফজরের নামায আদায় করিলেন। নামাযশেষে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন:
اذا نسيتم الصلاة فصلوها اذا ذكرتموها فان الله عز وجل يقول انني انا الله لا اله الا انا فاعبدني واقم الصلاة لذكرى.
"ভুলিয়া যাওয়ার কারণে তোমাদের নামায যদি কাযা হইয়া যায় তাহা হইলে স্মরণ হওয়ার পরপরই নামায আদায় করিয়া লইবে। মহান আল্লাহ্ বলেন, আমিই আল্লাহ, আমা ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। অতএব তোমরা আমার ইবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর” (২০-১৪)।
ফজরের নামায কাযা হওয়ার এই ঘটনার ব্যাখ্যা সম্পর্কে আলিমদের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। কেহ বলেন, ইহা হুদায়বিয়ার সন্ধি হইতে প্রত্যাবর্তনের পথে সংঘটিত হইয়াছিল। ওয়াকিদী বলেন, তাবুক যুদ্ধের সহিত এই ঘটনা সম্পৃক্ত ও সম্পর্কিত। আবার কেহ মনে করেন হুনায়নের যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তন করার সময়ে ইহা ঘটিয়াছিল। ইমাম বায়হাকীর মতে এমন ঘটনা সম্ভবত দুইবার ঘটিয়াছে। আলী আল-হালাবী বলেন, সাহাবায়ে কিরামের বর্ণনায় এই কথা বুঝা যায় যে, নামায কাযা হওয়ার ঘটনা ওয়াদিল কুরা যুদ্ধ হইতে মদীনা ফেরার পথে সংঘটিত হইয়াছিল। তবে এইরূপ একাধিক ঘটনাও ঘটিতে পারে, ইহা অসম্ভব নয়। সেই ক্ষেত্রে সব বর্ণনা সঠিক বলিয়া প্রমাণিত হইবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ, পৃ. ২১৩; তারিখ্ তাবারী, ৩খ, পৃ. ১৭; সীরাতু হালাবিয়া, ১খ, পৃ. ১৯৫; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২১1-২)।
ওয়াদিল কুরার যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহিত বেশ কয়েকজন মহিলাও ছিলেন। যদিও তাঁহাদিগকে গণীমাতের সম্পদে শরীক করা হয় নাই, তবে বিজিত অঞ্চলের উৎপন্ন দ্রব্যের একটি অংশ তাহাদিগকে প্রদান করা হয় (তারীখু, তাবারী, ৩খ., পৃ. ১৭)।