📄 ১৩. আসওয়াদ ইব্ন আবদে ইয়াগৃছ
সম্পর্কে লোকটি ছিল নবী করীম (স)-এর মামাতো ভাই। তাহার পিতা আবদে ইয়াগুছ ছিলেন মা-আমিনার আপন ভাই। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আসওয়াদ নবী করীম (স)-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের অন্যতম ছিল। সে যখনই দরিদ্র মুসলমানদিগকে দেখতি পাইত, তখন বিদ্রুপ করিয়া বলিত, ঐ ব্যক্তিরাই হইবে গোটা পৃথিবীর বাদশাহ, কিসরা কায়সারের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী! মহানবী (স)-কে দেখামাত্র উপহাস করিয়া বলিত, 'আচ্ছা, আজ ঊর্ধাকাশ হইতে কোন খবর আসে নাই?' এরূপ বিদ্রূপবার্ণে সে সর্বদা তাঁহাকে জর্জরিত করিত।
📄 ১৪. হারিছ ইব্ন কায়স আস-সাহমী
তাহার পিতার নাম কায়س এবং মাতার নাম ছিল আয়তলা (عطله)। এইজন্য তাহাকে হারিছ ইব্ن আয়তলা নামেও অভিহিত করা হইত। এই ব্যক্তিও সর্বদা নবী করীম (স)-এর সাহাবীগণকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিত। সে বলিত, মুহাম্মাদ এই নির্বোধদিগকে মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের কথা বলিয়া প্রতারণা করিতেছে। وَمَا يُهْلِكُنَا الا الدَّهْرُ . "যুগপরিক্রমা ছাড়া আর কিছুই আমাদিগকে ধ্বংস করিবে না"। এই আয়াতে তাহার বক্তব্য উদ্ধৃত হইয়াছে।
তাহাদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ যখন সীমা অতিক্রম করিয়া গেল, তখন আল্লাহ তা'আলা তদীয় নবীকে সান্ত্বনা দিয়া আয়াত নাযিল করিলেন: فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ إِنَّا كَفَّيْنَاكَ الْمُسْتَهْزِنِينَ. "অতএব তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হইয়াছ তাহা প্রকাশ্যে প্রচার কর এবং মুশরিকদিগকে উপেক্ষা কর। তোমার জন্য আমিই যথেষ্ট বিদ্রূপকারীদের বিরুদ্ধে” (১৫: ৯৫-৯৬)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিদ্রূপকারীদের পরিণতি সূরা হিজর-এর ৯৫-৯৬ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তাফসীরের কিতাবসমূহে যাহাদের নাম উল্লিখিত হইয়াছে তাহারা হইতেছেঃ (১) আসওয়اد ইب্ن আবদে ইয়াগৃছ, (২) ওয়ালীد ইب্ن মুগীরা, (৩) আসওয়اد ইবন 'আবদুল মুত্তালিব, (৪) আস ইব্ن ওয়াইল ও (৫) হারিছ ইب্ن কায়س। আল্লাহ তা'আলা তাহাদের ঠাট্টা-বিদ্রূপের মুকাবিলার জন্য যথেষ্ট বলিয়া যে সান্ত্বনাবাণী তদীয় প্রিয় রসূলকে শুনাইয়াছিলেন তাহার পরিণতি শিক্ষাপ্রদ।
একবার রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহ্র ঘরের তাওয়াফে রত ছিলেন। এমন সময় হযرت জিবরাঈل ফিরিশতার আগমন ঘটিল। নবী করীম (س) তাঁহার কাছে উক্ত কাফির নেতাদের ঠাট্টা-উপহাসের অনুযোগ করিলেন। এমন সময় ওয়ালীد ইب্ن মুগীরা তাঁহাদের পাশ দিয়া অতিক্রম করিতেছিল। নবী করীম (س) বলিলেন: ঐ যে ওয়ালীد ইب্ن মুগীরা! জিবরাঈل (আ) তাহার বাহুস্থিত ধমনীর দিকে ইঙ্গিত করিলে রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহাকে ইহার রহস্য কি জিজ্ঞাসা করিলেন। জবাবে তিনি বলিলেন، আমি তাহার জন্য যথেষ্ট।
তারপর আসওয়اد ইবন মুত্তালিব ঐ পথ অতিক্রম করিলে রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে দেখাইয়া দিলেন। জিবরাঈل (س) তাহার চক্ষুর দিকে ইঙ্গিত করিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (س)-এর প্রশ্নের উত্তরে জানাইলেন যে، আমি তাহার জন্য যথেষ্ট। তারপর আসওয়اد ইবন আবদে ইয়াগৃছ আসিলে জিবরাঈل (আ) তাহার মস্তকের দিকে ইঙ্গিত করিলেন এবং পূর্বের মতই রাসূলুল্লাহ (س)-এর প্রশ্নের জবাব জানাইলেন। তারপর হারিছের পালা আসিলে জিবরাঈل (আ) তাহার পেটের দিকে ইঙ্গিত করিলেন এবং পূর্বের মতই রাসূলুল্লাহ (س)-এর প্রশ্নের জবাব জানাইলেন। তারপর 'আস ইবন ওয়াইল সেদিকে অতিক্রমকালে তিনি তাহার পদতলের দিকে ইঙ্গিত করিলেন এবং জানাইলেন যে، তাহার ব্যাপারেও আমি যথেষ্ট।
সত্যসত্যই ওয়ালীد ইب্ن মুগীরা খুযা'আ গোত্রের জনৈক তীর প্রস্তুতকারী ব্যক্তির নিকট দিয়া অতিক্রমকালে তাহার বাহুতে তীরের আঘাত লাগে এবং উহার শিরা কাটিয়া যায়। সেই যখমের দিকে জিবরাঈলের ইঙ্গিতমাত্র উহা হইতে রক্তপাত হইতে শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত উহাই তাহার মৃত্যুর কারণ হয়।
আসওয়اد ইবন মুত্তালিব একদা একটি বাবলা গাছের নিচে উপবিষ্ট ছিল। এমন সময় হঠাৎ সে তাহার পুত্রদিগকে লক্ষ্য করিয়া বাঁচাও! বাঁচাও বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল। সে বলিল، আমার কাছে মনে হইতেছে، কে যেন আমার চক্ষুর মধ্যে কাটা বিদ্ধ করিতেছে। তাহার ছেলেরা বলিল، কোন লোক তো দেখা যাইতেছে না। এরূপ বলিতে বলিতে আসওয়اد অন্ধ হইয়া গেল।
আসওয়اد ইب্ن আবদে ইয়াগৃছের মাথার দিকে জিবরাঈل (আ) ইঙ্গিত করামাত্র তাহার মস্তকে পাঁচড়া দেখা দিল এবং এই রোগেই শেষ পর্যন্ত তাহার মৃত্যু হয়।
হারিছ ইব্ن কায়সের পেটে এমন ব্যাধি দেখা দিল যে، তাহার মুখ দিয়া পিত্তের পানি নির্গত হইতে লাগিল। ইহাতেই সে মারা যায়।
সূরা আল-আন'আমে আল্লাহ তা'আলা বলেন : "এইরূপে আমি প্রত্যেক জনপদে তথাকার অপরাধীদের প্রধানদিগকে সেখানে চক্রান্ত করার অবকাশ দিয়াছি। কিন্তু তাহারা শুধু তাহাদের নিজেদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে، অথচ তাহারা উপলব্ধি করে না। যখন তাহাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তাহারা তখন বলে، 'আল্লাহ্র রাসূলগণকে যাহা দেওয়া হইয়াছিল আমাদিগকেও তাহা না দেওয়া পর্যন্ত আমরা কখনও বিশ্বাস করিব না।' আল্লাহ তাঁহার রিসালাতের ভার কাহার উপর অর্পণ করিবেন তাহা তিনিই ভাল জানেন। যাহারা অপরাধ করিয়াছে، চক্রান্তের জন্য আল্লাহর নিকট হইতে লাঞ্ছনা ও কঠোর শাস্তি তাহাদের উপর আপতিত হইবেই" (৬:১২৩-১২৪)।
উপরিউক্ত ঘটনায় বিবৃত কাফির সর্দারদের পরিণতি ছিল আল্লাহ্ অমোঘ বাণীরই নিখুঁত ও অভ্রান্ত বাস্তবায়ন।
📄 দুর্বল মুসলমানদের প্রতি কাফিরদের নির্যাতন
ইসলামের প্রচার-প্রসারের ব্যাপকতা লক্ষ্য করিয়া কাফিরগণ অতিশয় ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিল। ইসলাম গ্রহণকারী দাস-দাসী ও দুর্বল লোকদের প্রতি তাহাদের আক্রোশ বাড়িয়া গেল। কারণ প্রথম পর্যায়ে তাহারাই ব্যাপক হারে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাই প্রত্যেক গোত্র তাহাদের অধীনস্থ মুসলমানদের উপর জুলুম করিতে শুরু করিল। তাহাদিগকে বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি দিয়া নূতন ধর্ম ত্যাগ করিতে এবং পুনরায় কুফরীতে ফিরাইয়া আনিতে চেষ্টা চালাইল। তাহারা তাহদিগকে আটক করিয়া নির্মমভাবে প্রহার করিতে লাগিল, ক্ষুৎপিপাসায় কষ্ট দিতে এবং মক্কার প্রস্তরময় মরুভূমিতে উত্তপ্ত বালুর উপর শোয়াইয়া শাস্তি দিতে থাকিল। অতঃপর কেহ কেহ তাহাদের এই নির্মম অত্যাচার সহ্য করিতে না পারিয়া দীন হইতে ফিরিয়া যাইত আর কাহাকেও বা শূলী চড়ানো হইত। ফলে আল্লাহ তাহাকে তাহাদের হাত হইতে হিফাজত করিতেন (মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ আস-সালিহী আশ-শামী, সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ ২খ., ৩৫৭; ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, ১খ., ৩৪৪)।
বিভিন্ন রিওয়ায়াতে তাহাদের নির্মম নির্যাতনের যে চিত্র পাওয়া যায় তাহাতে যে কোন লোকেরই শরীর শিহরিয়া উঠে। হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, মুসলমানদিগকে তাহাদের দীন পরিত্যাগ করিবার জন্য মারাত্মক শাস্তি দেওয়া হইত, প্রহার করা হইত এবং ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত রাখা হইত। ফলে সোজা হইয়া বসিবার শক্তিটুকু পর্যন্ত তাহাদের থাকিত না। তখন কাফিরগণ তাহাদিগকে বলিত, আল্লাহ্র পরিবর্তে আল-লাত ও আল-উয্যা কি তোমাদিগের ইলাহ নহে? তখন তাহারা বলিতেন, হাঁ। এমন কি তাঁহাদের নিকট দিয়া একটি পোকা হাটিয়া যাইতে লাগিলেও তাহা দেখাইয়া উহারা তাহাদিগকে বলিত, আল্লাহ্র পরিবর্তে এই পোকাটি কি তোমাদের ইলাহ্ নহে? তখন তাহারা বলিতেন, হাঁ। তাহাদের অত্যাচার ও নির্যাতন হইতে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য তাহারা এইরূপ বলিতেন (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৫৯)। মূলত তাঁহাদের অন্তরে এক আল্লাহ্ প্রতি বিশ্বাস অটল থাকিত। তাই আল্লাহ তাহাদিগকে তাঁহার শাস্তি হইতে নিষ্কৃতি লাভের কথা বলিয়াছেন। আল-কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হইয়াছে:
مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيْمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌ بِالْإِيْمَانِ وَلَكِنْ مَّنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ.
"কেহ তাহার ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করিলে এবং কুফরীর জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখিলে তাহার উপর আপতিত হইবে আল্লাহর গযব এবং তাহার জন্য আছে মহাশাস্তি; তবে তাহার জন্য নহে, যাহাকে কুফরীর জন্য বাধ্য করা হয় কিন্তু তাহার চিত্ত ঈমানে অবিচলিত" (১৬: ১০৬)।
দুর্বৃত্ত আবূ জাহল এই ব্যাপারে কুরায়শদিগকে উৎসাহিত ও প্ররোচিত করিত। যখন সে কোনও অভিজাত ও সম্মানিত লোকের ইসলাম গ্রহণের কথা শুনিত তখন তাহাকে নানাভাবে অপদস্থ করিত। বিভিন্ন পন্থায় তাহাকে হুমকি দিত। বলিত, 'তুমি তোমার পৈতৃক ধর্ম ত্যাগ করিয়াছ অথচ সে তোমা হইতে উত্তম ছিল। অবশ্যই আমরা তোমার বিবেক উড়াইয়া দিব; তোমার সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণিত করিব এবং তোমার মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করিব।' আর যদি সে ব্যবসায়ী হইত তবে সে বলিত, 'আমরা তোমার ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্থ করিব এবং তোমার সম্পদ বিনষ্ট করিব।' আর যদি সে শক্তিহীন ও দাস হইত তবে তাহাকে প্রহার করিত এবং অন্যকেও তাহা করিতে উৎসাহিত ও প্ররোচিত করিত (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৫৯; আশ-শামী, সুবুলুল-হুদা, ২খ., ৩৫৭)।
এই সকল কাফির মুর্শিকের হাতে দুর্বল মুসলমানগণ নির্যাতিত হইয়াছিলেন তাহার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে প্রদান করা হইল:
হযরত বিলাল (রা), তিনি ছিলেন উমায়্যা ইবন খালাফ (মতান্তরে উমায়্যা ইবন ওয়াহাব)-এর হাবশী ক্রীতদাস। পিতার নাম রাবাহ ও মাতার নাম হামামা। নির্যাতিত মুসলমানদের তালিকায় তিনি শীর্ষে রহিয়াছেন। ইসলাম গ্রহণের কারণে তাঁহাকে অমানুষিক শাস্তি দেওয়া হইত। হাদীছ গ্রন্থসমূহে উহার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়, যাহার কিছু এইখানে উল্লেখ করা হইল:
বর্ণিত আছে যে, ঠিক দ্বিপ্রহরের সময় তাঁহার মনিব তাঁহাকে মরুভূমিতে লইয়া যাইত এবং চীৎ করিয়া শয়ন করাইয়া তাঁহার বুকের উপর ভারী এক পাথর চাপা দিয়া রাখিত। অতঃপর বলিত, আল্লাহ্র কসম! তুমি মারা না যাওয়া পর্যন্ত অথবা মুহাম্মাদের নাফরমানী এবং লাত ও উয্যার উপাসনা না করা পর্যন্ত এইভাবেই থাকিবে। তখন এই ভয়ানক শাস্তি সত্ত্বেও তিনি কেবল বলিতেন, 'আহাদ' 'আহাদ', অর্থাৎ আল্লাহ এক, আল্লাহ এক। তিনি আরও বলিতেন, আমি লাত ও 'উয্যার নাফরমানী করি (ইবন হিশাম, আস-সীরা, ১খ., ৩৪৪; ইবন কাছীর, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ., ৪৯২)। আল-বালাযুরী 'আমর ইবনুল 'আস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, আমি একবার বিলালের নিকট দিয়া যাইতেছিলাম। তখন তাঁহাকে দ্বিপ্রহরের উত্তপ্ত মরুভূমিতে নির্যাতন করা হইতেছিল। গোশতের কয়েকটি টুকরা যদি তাহার উপর রাখা হইত তবে অবশ্যই তাহা পুড়িয়া যাইত। আর তখনও সে বলিতেছিল, আমি লাত ও উয্যাকে মানি না। ইহাতে উমায়্যা আরও বেশী রাগান্বিত হইয়া তাহার প্রতি নির্যাতনের মাত্রা বাড়াইয়া দিতেছিল। সে তাঁহার গলা চাপিয়া ধরিতেছিল। ফলে বিলাল বেহুঁশ হইয়া পড়িতেছিল। একটু পর আবার হুঁশ ফিরিয়া আসিতেছিল (আশ-শামী, সুবুলুল-হুদা, ২খ., ৩৫৭)।
ইবন সা'দ হাসান ইব্ন ছাবিত (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আমি একবার হজ্জ করিতে গেলাম (বর্ণনাকারী সন্দেহ করেন যে, অথবা তিনি বলেন, উমরা করিতে গেলাম)। তখন আমি বিলালকে লম্বা রশি দ্বারা বাঁধা অবস্থায় দেখিলাম, যাহা বালকদল টানিয়া লইয়া বেড়াইতেছিল আর তিনি বলিতেছিলেন, আহাদ, আহাদ। আমি লাত, উয্যা, হুবাল, লায়লা ও বুওয়ায়নার কুফরী করি। অতঃপর উমায়্যা তাঁহাকে তপ্ত বালুতে শোয়াইয়া দিল (প্রাগুক্ত)।
বালাযুরী মুজাহিদ সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, কাফিরগণ বিলালের গলায় রশি বাঁধিয়া চপলমতি বালকদিগকে নির্দেশ দিত মক্কার এক পর্বত হইতে অপর পর্বত পর্যন্ত টানিয়া লইয়া বেড়াইতে। তাহারা তাহাই করিত আর তিনি কেবল বলিতেন, 'আহাদ' 'আহাদ'। ইব্ন 'আবদিল-বারর মুজাহিদ সূত্রে আরও উল্লেখ করিয়াছেন যে, খেলাচ্ছলে বালকগণের টানাটানিতে তাঁহার গলায় রশির দাগ পড়িয়া যাইত। অতঃপর বালকরা ক্লান্ত হইয়া তাঁহাকে ফেলিয়া রাখিত (ইব্ন আবদিল-বার, আদ-দুরার ফী ইখতিসারিল-মাগাযী ওয়াস-সিয়ার, পৃ. ৪৪)। কিন্তু কোন অবস্থাতেই বিলালের মুখ দিয়া কুফরী কথা বাহির হইত না। উরওয়ার বর্ণনা মতে, মুশরিকগণ তাহাদের কথিত একটি কথাও বিলালকে দিয়া বলাইতে পারিত না (আশ-শামী, সুবুলুল-হুদা, ২খ., ৩৫৭)।
আল-বালাযুরী উমায়র ইবন ইসহাক সূত্রে বর্ণনা করেন যে, নির্যাতনের প্রচণ্ডতা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও তিনি 'আহাদ' 'আহাদ' বলিতেছিলেন। তাহারা তাঁহাকে বলিতেছিল, আমরা যাহা বলি তাহাই বল। তখন তিনি বলিতেছিলেন, আমার জিহ্বা উহা উচ্চারণ করিতে পারিবে না। স্বীয় নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়া বিলাল (রা) বলেন, তাহারা (মুশরিকগণ) আমাকে একদিন একরাত্র তৃষ্ণার্ত রাখিয়াছিল। অতঃপর প্রচণ্ড গরমের মধ্যে আমাকে বাহির করিয়া তপ্ত মরুভূমিতে লইয়া গিয়া অত্যাচার চালাইয়াছিল (আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ২খ., ৩৫৮)।
ইবন ইসহাক উরওয়া সূত্রে বর্ণনা করেন যে, একদা ওয়ারাকা ইব্ন নাওফিল বিলাল (রা)-এর নিকট দিয়া যাইতেছিলেন তখন তাঁহাকে শাস্তি দেওয়া হইতেছিল আর তিনি 'আহাদ' 'আহাদ' বলিতেছিলেন। তখন ওয়ারাকা বলিলেন, আল্লাহ্র কসম, হে বিলাল! 'আহাদ' 'আহাদ' (আল্লাহ এক)। অতঃপর তিনি উমায়্যা ও জুমাহ গোত্রের যাহারা এই কাজে জড়িত ছিল তাহাদের প্রতি লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আমি আল্লাহ্র কসম করিয়া বলিতেছি, তোমরা যদি তাহাকে হত্যা করিয়া ফেল, তবে অবশ্যই আমি তাঁহার কবরকে বরকতের বস্তু বানাইয়া লইব (ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ১খ., ৩৪৫; ইব্ন কাছীর, আস-সীরা, ১খ., ৪৯২)। তবে হাফিজ ইবন কাছীর এই রিওয়ায়াত বর্ণনা করিয়া বলেন যে, অনেকে এই রিওয়ায়াতটির ব্যাপারে আপত্তি উত্থাপন করিয়াছেন। কারণ ওয়ারাকা ইবন নাওফিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পর ওহী সাময়িক বন্ধ থাকিবার সময় ইনতিকাল করেন। আর বিলাল (রা) প্রমুখের ইসলাম গ্রহণ ছিল আরও পরের ঘটনা, যাহা সূরা আল-মুদ্দাচ্ছির নাযিল হইবার পর সংঘটিত হয়। তাই বিলাল (রা)-এর নিকট দিয়া ওয়ারাকার গমন প্রশ্নসাপেক্ষ (ইব্ন কাছীর, আস-সীরা, ১খ., ৪৯২-৯৩)।
হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর বাড়ী ছিল বিলাল (রা)-কে নির্যাতনকারী বানু জুমাহ-এর এলাকায়। একদিন তিনি সেখান দিয়া গমন করিতেছিলেন, তখনও মুশরিকগণ বিলালকে নির্যাতন করিতেছিল। ইহা দেখিয়া তিনি উমায়্যাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, এই মিসকীনের ব্যাপারে তুমি কি আল্লাহকে ভয় কর না? তুমি তাঁহাকে আর কত শাস্তি দিবে! উমায়্যা বলিল, তুমিই তাঁহাকে নষ্ট করিয়াছ। এখন যাহা দেখিতেছ তাহা হইতে ইহাকে রক্ষা কর। আবূ বাকর (রা) বলিলেন, আমি তাহা করিবই। আমার নিকট একটি কালো দাস রহিয়াছে। সে ইহা হইতে শক্তিশালী এবং তোমার দীনের উপর অটল। ইহার বিনিময়ে দাসটিকে আমি তোমাকে দান করিব। সে বলিল, আমি উহা গ্রহণ করিলাম। আবূ বাকর (রা) বলিলেন, উহা এখন হইতে তোমারই। অতঃপর আবূ বাকর সিদ্দীক (রা) তাঁহার নিজের দাসটি উমায়্যাকে প্রদান করিলেন এবং বিনিময়ে বিলাল (রা)-কে গ্রহণ করত মুক্ত করিয়া দিলেন (আয-যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন-নুবালা, ১খ., ৩৫২; আশ-শামী, সুবুলুল-হুদা, ২খ., ৩৫৮)।
বালাযুরী সহীহ সনদে অবশ্য অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করার কথা উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি মুহাম্মাদ ইব্ন সীরীন সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আবূ বাকর (রা) বিলাল (রা)-কে উমায়্যার নিকট হইতে সাত উকিয়ার বিনিময়ে ক্রয় করত মুক্ত করিয়া দেন। অতঃপর আবূ বাকর (রা) উক্ত ঘটনা এবং তাহাকে ক্রয় করার কথা রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবহিত করিলে তিনি বলিলেন, আবূ বাকর! আমাকেও উহাতে শরীক কর। তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তাঁহাকে মুক্ত করিয়া দিয়াছি। বালাযুরী অন্য রিওয়ায়াতে পাঁচ উকিয়ার বিনিময়ে ক্রয় করার কথাও উল্লেখ করিয়াছেন (আস-সালিহী, আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ২খ., ৩৫৮)।
২. খাব্বাব ইবনুল-আরাত্ (রা)ঃ তিনি ছিলেন নিগ্রো। রাবী'আ গোত্রের কিছু লোক তাঁহাকে বন্দী করিয়া লইয়া আসে এবং হিজাযে আনিয়া তাঁহাকে বিক্রয় করিয়া দেয়। অতঃপর তিনি বানু যাহরা গোত্রের মিত্র সিবা' ইব্ন আবদিল-উয্যা আল-খুযাঈ-এর দাসরূপে ছিলেন। আবুল ইয়াকজানের ধারণামতে খাব্বাব (রা) ছিলেন সিবা'-এর বৈপিত্রেয় ভ্রাতা। তাঁহার মনিব ছিল উম্মু আনমার।
আল-বালাযুরীর বর্ণনামতে খাব্বাব (রা) ছিলেন ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে ৬ষ্ঠ ব্যক্তি। তিনি শা'বী হইতে বর্ণনা করেন যে, কাফিরগণ খাব্বাব (রা)-কে উত্তপ্ত পাথরের উপর চীৎ করিয়া শোয়াইত। আর পাথরের উত্তাপে তাঁহার পিঠের চর্বি গলিয়া গলিয়া পড়িত। এইরূপে তাঁহার চর্বি নিঃশেষ হইয়া গিয়াছিল। ইহার ফলে তাঁহার পিঠে সাদা দাগ পড়িয়াছিল, যাহা পরবর্তী জীবনেও অবশিষ্ট ছিল।
শা'বী ও অন্য সনদে আবূ লায়না আল-কিনদী হইতে বর্ণিত আছে যে, একদা খাব্বাব (রা) খলীফা হযরত উমার (রা)-এর নিকট আগমন করিলেন। উমার (রা) তাঁহাকে বলিলেন, নিকটে আস, নিকটে আস। অতঃপর তাঁহাকে নিজের আসনে বসাইলেন এবং বলিলেন, এই আসনে তুমি ও অন্য একজন লোক ছাড়া আর কেহ বসার উপযুক্ত নহে। খাব্বাব (রা) বলিলেন, সে কে হে আমীরুল মুমিনীন! তিনি বলিলেন, বিলাল। শা'বীর বর্ণনামতে তিনি হইলেন, আম্মার ইবন ইয়াসির (রা)। খাব্বাব (রা) বলিলেন, সে আমা হইতে বেশী উপযুক্ত নহে। বিলালের শান্তি ফিরাইবার জন্য মুশরিকদের মধ্যে লোক ছিল। কিন্তু আমার কেহ ছিল না। আমি এখনও দেখিতে পাইতেছি যে, একদিন মুশরিকগণ আমার জন্য অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিল। অতঃপর তাহারা আমাকে উহার মধ্যে ফেলিয়া শাস্তি দিতে লাগিল। একজন আমার বুকের উপর তাহার পা রাখিল। আমি আমার পিঠের দ্বারাই মাটি হইতে নিজকে রক্ষা করিলাম। অতঃপর খাব্বাব (রা) স্বীয় পিঠ হইতে কাপড় সরাইয়া ফেলিলেন, দেখা গেল তাঁহার পিঠ সাদা হইয়া গিয়াছে (আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ২খ., ৩৫৯)।
বালাযুরী আবূ সালিহ হইতে বর্ণনা করেন যে, খাব্বাব (রা) ছিলেন কর্মকার। ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে খুবই ভালবাসিতেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যাতায়াত করিতেন। তাঁহার মালিকের নিকট এই সংবাদ পৌছিলে সে লৌহ গরম করিয়া তাঁহার মস্তকে রাখিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই ভয়ঙ্কর শাস্তির কথা বলিলে তিনি দু'আ করিলেন,اللهم انصر خبابا "হে আল্লাহ! তুমি খাব্বাবকে সাহায্য কর"। অতঃপর তাঁহার মালিক উম্মু আনমারের মস্তকে রোগ হইল। সে কুকুরের সহিত উহাদের স্বরে চীৎকার করিয়া বেড়াইত। তাহাকে লৌহ গরম করিয়া সেঁক দিতে বলা হইল। অতঃপর খাব্বাব (রা) লৌহ গরম করিয়া তাহা দ্বারা তাহার মস্তকে সেঁক দিতেন (প্রাগুক্ত)।
ইমাম আহমাদ (র) মাসরূক (র) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, খাব্বাব (রা) বলেন, আমি মক্কায় কর্মকার ছিলাম। একবার আমি আস ইবন ওয়াইলের জন্য একটি তরবারি বানাইয়া দেই। উহার মূল্য আনিতে গেলে সে বলে, আল্লাহ্র কসম! তুমি যতক্ষণ না মুহাম্মাদের নাফরমানী করিবে ততক্ষণ আমি উহা তোমাকে দিব না। আমি বলিলাম, আল্লাহ্র কসম! আমি মুহাম্মাদের নাফরমানী করিব না যতক্ষণ না তুমি মারা যাইয়া পুনর্জীবিত হও। সে বলিল, তাহা হইলে আমার মৃত্যুর পর যখন আমি পুনর্জীবিত হইব তখন তুমি আমার নিকট আসিও। সেখানে আমার সহায়-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি থাকিবে। তখন আমি তোমাকে তোমার প্রাপ্য পরিশোধ করিব। তখন আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করিলেন (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৫৯):
أَفَرَيْتَ الَّذِي كَفَرَ بِأَيْتِنَا وَقَالَ لَأُوتِيَنَّ مَالاً ووَلَدًا . اطَّلَعَ الْغَيْبَ أَمِ اتَّخَذَ عِنْدَ الرَّحْمَنِ عَهْدًا . كَلَّا سَنَكْتُبُ مَا يَقُولُ وَنَمُدُّ لَهُ مِنَ الْعَذَابِ مَدًا وَنَرِثُهُ مَا يَقُولُ وَيَأْتِيْنَا فَرْدًا. (۱۹ : ۸۸-۸۱)
"তুমি কি লক্ষ্য করিয়াছ উহাকে, যে আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, আমাকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেওয়া হইবেই। সে কি অদৃশ্য সম্বন্ধে অবগত হইয়াছে অথবা দয়াময়ের নিকট হইতে প্রতিশ্রুতি লাভ করিয়াছে? কখনও নহে, তাহারা যাহা বলে আমি তাহা লিখিয়া রাখিব এবং তাহাদের শাস্তি বৃদ্ধি করিতে থাকিব। সে যে বিষয়ের কথা বলে তাহা থাকিবে আমার অধিকারে এবং সে আমার নিকট আসিবে একা" (১৯:৭৭-৮১)।
মুহাম্মাদ ইবন উমার আল-আসলামী ও বায়হাকী বলেন, খাব্বাব (রা) যখন ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে যাতায়াত করেন তখন উতবা ইব্ن আবূ ওয়াক্কাস, ভিন্নমতে আছ-ছাবিত আল-আসওয়াদ ইব্ন আবদ ইয়াগৃছ তাঁহাকে নির্যাতন করিত। সেই নির্যাতনের কথা লোকজন রাসূলুল্লাহ (স)-কে জানাইলে তিনি তাহাদিগকে সান্ত্বনা দিতেন। ইমাম বুখারী মুহাম্মাদ ইবন উমার আল-আসলামী এবং বায়হাকী সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিলাম। তখন তিনি কা'বা গৃহের ছায়ায় তাঁহার চাদর গায়ে দিয়া শুইয়াছিলেন। আমরা কুরায়শদের পক্ষ হইতে মর্মন্তুদ শাস্তি ভোগ করিতেছিলাম। আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আল্লাহ্র নিকট আমাদের জন্য দু'আ করিবেন না? তখন তিনি উঠিয়া বসিলেন। তাঁহার চেহারা মুবারাক লাল হইয়া গিয়াছিল। অতঃপর তিনি বলিলেন, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের কাহাকেও লৌহ-চিরুনী দ্বারা দেহের গোস্ত ও শিরা হাড্ডি হইতে আলাদা করিয়া ফেলা হইত। কিন্তু ইহাও তাহাকে তাহার দীন হইতে ফিরাইতে পারিত না। কাহারও মস্তকের মধ্যখানে করাত রাখিয়া উহা দ্বারা সমগ্র শরীর ফাড়িয়া দুই টুকরা করিয়া ফেলা হইত। কিন্তু ইহাও তাহাকে তাহার দীন হইতে ফিরাইতে পারিত না। বস্তুত ইহা আল্লাহর মর্জী। এমন একদিন আসিবে যখন (আল্লাহ এই দীনকে বিজয়ী করিবেন এবং ইহার অনুসারীদিগকে সাহায্য করিবেন। তখন) একজন আরোহী সান'আ হইতে হাদারামাওত পর্যন্ত ভ্রমণ করিবে এবং সে আল্লাহ ব্যতীত আর কাহাকেও ভয় করিবে না। কিন্তু তোমরা খুব তাড়াহুড়া করিতেছ” (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাব মানাকিবিল আনসার, হাদীছ নং, ৩৮-৫২; ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৫৯-৬০)।
৩. সুহায়ব ইবন সিনান আর-রূমী (রা): ইবন সা'দ উরওয়া (র) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, সুহায়ব (রা) ছিলেন দুর্বল মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত, যাহাদিগকে আল্লাহ্ দীন গ্রহণের দরুন নির্যাতন করা হইত। ইবন সা'দ বর্ণনা করেন যে, তাঁহাকে এমন শাস্তি দেওয়া হইত যে, তিনি কি বলিতেন তাহা নিজেও জানিতেন না (তাবাকাত, ৩খ., ২৪৮)।
৪. আমের ইব্ন ফুহায়রা (রা): বালাযুরী বর্ণনা করেন যে, আমের ইব্ন ফুহায়রা ছিলেন মুমিনদের মধ্যে অসহায়। তিনি ছিলেন তুফায়ল ইব্ন আবদিল্লাহ্ ক্রীতদাস। মক্কায় তাঁহাকে শাস্তি দেওয়া হইত যাহাতে তিনি স্বীয় দীন হইতে ফিরিয়া আসেন। ইবন সা'দ মুহাম্মাদ ইব্ন কা'ব আল-কুরাজী হইতে বর্ণনা করেন যে, 'আমের ইব্ن ফুহায়রা (রা)-কে নির্দয়ভাবে নির্যাতন করা হইত। এমন কি নির্যাতনের ফলে তিনি কি বলিতেন নিজেও তাহা জানিতেন না। অবশেষে আবূ বাকর (রা) তাঁহাকে ক্রয় করত আযাদ করিয়া দেন (আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ২খ., ৩৬০)।
৫. আবু ফুকায়হা (রা): তাহার নাম আফলাহ, মতান্তরে ইয়াসার। তিনি ছিলেন বানু আবদিদ-দার গোত্রের সাফওয়ান ইবন উমায়্যার ক্রীতদাস। বিলাল (রা) যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তিনিও ইসলাম গ্রহণ করেন। উমায়্যা ইব্ن খালাফ তাঁহার পায়ে রশি বাঁধিয়া তাঁহাকে নির্যাতন করার নির্দেশ দেয়। তাহার নির্দেশমত তাঁহাকে রশি বাঁধিয়া টানিয়া লইয়া বেড়ানো হয়। অতঃপর তাঁহাকে মক্কার কংকরময় মরুভূমিতে ফেলিয়া রাখা হয়। তাঁহার নিকট দিয়া একটি পোকা হাটিয়া যাওয়ার সময় উমায়্যা বলিল, ইহা কি তোমার প্রতিপালক নহে? তিনি বলিলেন, আল্লাহই আমার প্রতিপালক, যিনি আমাকে, তোমাকে এবং এই পোকাটি সৃষ্টি করিয়াছেন। ইহাতে সে আরও কঠোরভাবে তাঁহাকে নির্যাতন করিতে লাগিল। তাঁহার গলা চাপিয়া ধরিল। তাহার সঙ্গে তাহার ভ্রাতা উবায়্যি ইব্ন খালাফও ছিল। সে বলিতেছিল, আরও বেশী করিয়া শাস্তি দাও যাহাতে সে মুহাম্মাদের নিকট গিয়া তাহার যাদুর দ্বারা পরিত্রাণ পাইতে পারে। অতঃপর দ্বিপ্রহরের প্রচণ্ড গরমে তাঁহাকে বাহির করিয়া বন্দী অবস্থায় মরুভূমিতে লইয়া গেল এবং তাহার পেটের উপর বিরাট এক পাথর চাপা দিয়া রাখিল। এই চরম নির্যাতনের ফলে তাঁহার জিহ্বা বাহির হইয়া পড়িল। তিনি বেহুঁশ হইয়া পড়িলেন (ইবন সা'দ, তাবাকাত, ২খ., ১২৩)। এই অবস্থায়ই তাঁহাকে ফেলিয়া রাখা হইত। এমনকি এক সময় তাহারা মনে করিত যে, তিনি মৃত্যুবরণ করিয়াছেন। অতঃপর ধীরে ধীরে এক সময় তাঁহার জ্ঞান ফিরিয়া আসিত। এমতাবস্থায় একদা আবূ বাকর (রা) সেখান দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি ইহা দেখিয়া তাঁহাকে ক্রয় করিয়া মুক্ত করিয়া দেন (ইবনুল আছীর, উসদুল গাবা, ৫খ., ২৭৩; ইব্ন হাজার, আল-ইসাবা, ৪খ., ১৫৬)।
ইবন সা'দ মুহাম্মাদ ইব্ন কা'ব আল-কুরাজী হইতে বর্ণনা করেন যে, আবু ফুকায়হা (রা)-কে এমন কষ্ট দেওয়া হইত যে, উহার যন্ত্রণায় তিনি কি বলিতেন নিজেও তাহা জানিতেন না (ইবন সা'দ, তাবাকাত, ৩খ., ২৪৮)।
৬. আম্মার ইবন ইয়াসির (রা), তাঁহার পিতা ইয়াসির, মাতা সুমায়্যা ও ভ্রাতা আবদুল্লাহঃ সর্বপ্রথম মুষ্টিমেয় যে কয়জন লোক ইসলাম গ্রহণ করেন ইঁহারা ছিলেন তাহাদের অন্তর্ভুক্ত। ইসলাম গ্রহণের কারণে এই গোটা পরিবারটিই নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়। বালাযুরী ও বায়হাকী মুজাহিদ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, সর্বপ্রথম ইসলাম প্রকাশ করেন আবূ বাকর, বিলাল, খাব্বাব, সুহায়ব ও আম্মার (রা)। আহমাদ ও ইবন মাজা ইবন মাস'উদ (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, সাত ব্যক্তি প্রথম ইসলাম প্রকাশ করেনঃ রাসূলুল্লাহ (স), আবূ বাকর, আম্মার, তাঁহার মাতা সুমায়্যা, সুহায়ব, বিলাল ও মিকদাদ (রা)। রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচা আবু তালিবের প্রভাবে কাফিরদের নির্যাতন হইতে তিনি অনেকাংশে রক্ষা পান। আর আবূ বাকর (রা) তাঁহার সম্প্রদায়ের প্রভাবে কাফিরদের অত্যাচার হইতে কিছুটা রেহাই পান। অবশিষ্ট পাঁচজনকে লোহার জামা পরানো হয় এবং সূর্যের উত্তাপে দগ্ধীভূত করা হয়। এমন কি তাঁহারা অতিষ্ঠ হইয়া পড়েন। আবু জাহল সুমায়্যার নিকট আসিয়া বর্শা দ্বারা তাঁহার বক্ষে আঘাত করে। ফলে তিনি ইনতিকাল করেন। তিনিই ইসলামের প্রথম শহীদ (আশ-শামী, ২খ., ৩৬০; ইব্ন কাছীর আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৫৮)।
ইবন সা'দ মুহাম্মাদ ইব্ন কা'ব আল-কুরাজী সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আম্মার ইবন ইয়াসির (রা)-কে দেখিয়াছেন এমন এক লোক আমাকে বর্ণনা করিয়াছেন যে, তিনি আম্মার (রা)-কে একদিন শুধু পাজামা পরিহিত অবস্থায় দেখিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁহার পিঠের দিকে তাকাইয়া দেখি, সেখানে দাগ পড়িয়া গিয়াছে। আমি বলিলাম, এইগুলি কি? তিনি বলিলেন, কুরায়শগণ মক্কার কঙ্করময় মরুভূমিতে আমাকে যে শাস্তি দিত ইহা তাহারই চিহ্ন (ইবন সা'দ, তাবাকাত, ৩খ., ২৪৮)। ইবন সা'দ ইহাও বর্ণনা করেন যে, আম্মার (রা)-কে কঠোর শাস্তি দেওয়া হইত। এমন কি তিনি কি বলিতেন তাহা নিজেও জানিতেন না (তাবাকাত, ৩খ., ২৪৮)।
আল-বালাযুরী উম্মু হানী (রা) সূত্রে-বর্ণনা করেন যে, আম্মার ইবন ইয়اسির (রা), তাঁহার পিতা ইয়াসির, ভ্রাতা আবদুল্লাহ ও মাতা সুমায়্যা (রা)-কে একদা শাস্তি দেওয়া হইতেছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি তাঁহাদিগকে বলিলেন, "হে ইয়াসির পরিবার! ধৈর্য ধারণ কর। কারণ তোমাদের ঠিকানা জান্নাত" (আশ-শামী, ২খ., ৩৬; ইবন সা'দ, তাবাকাত, ২খ., ২৪৯)। বায়হাকী জাবির (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) তখন বলিলেন, হে আম্মার ইবন ইয়াসিরের পরিবার! সুসংবাদ গ্রহণ কর। তোমাদের ঠিকানা জান্নাত (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৫৯)। অতঃপর ইয়াসির (রা) নির্যাতনের ফলে ইনতিকাল করেন। সুমায়্যা (রা) আবূ জাহলের সহিত উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করেন এবং ইসলাম ত্যাগ না করার ব্যাপারে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। আবু জাহল তাঁহার বক্ষে বর্শা দ্বারা আঘাত করে। ফলে তিনি শাহাদাত লাভ করেন। আর আবদুল্লাহকে তীর নিক্ষেপ করা হয়। ফলে তিনি মাটিতে পড়িয়া যান (আশ-শামী, ২খ., ৩৬০)। ইবন সা'দ বর্ণনা করেন যে, মুশরিকগণ আম্মারকে আগুনে সেঁকা দেয়। তখন রাসূলুল্লাহ (س) সেখান দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি আম্মারের মাথায় হাত রাখিয়া বলিলেন, হে আগুন! তুমি শীতল ও শান্তিদায়ক হইয়া যাও আম্মারের জন্য، যেমন হইয়াছিলে ইবরাহীমের জন্য (ইبن সা'দ، তাবাকাত، ۳খ، ২৪۸)।
۷. লাবীবা ছিলেন আল-মু'আম্মাল ইبن হাবীব বংশের একজন দাসী। তিনি উমার (را)-এর ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন। উমার (را) তাঁহাকে শাস্তি দিতে দিতে এক সময় ক্লান্ত হইয়া পড়িতেন। অতঃপর বলিতেন، আমি ক্লান্তির কারণেই তোমাকে ছাড়িয়া দিয়াছি، অন্য কোনও কারণে নহে। তখন লাবীবা বলিতেন، তোমার প্রতিপালক তোমাকে এইভাবে শাস্তি দিবেন যদি তুমি ইসলাম গ্রহণ না কর (ইبن হিশام، আস-সীরা، ১খ، ৩৪৬؛ আশ-শামী، ۲খ، ৩৬۱)।
ইবন সা'د হাসسان ইبن ছাবিত (را) সূত্রে বর্ণনা করেন، আমি একবার উমরা করিবার জন্য মক্কায় আগমন করিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (س) ও তাঁহার সাহাবীদিগকে নির্যাতন করা হইতেছিল। এক সময় আমি উمরের পাশে গিয়ে দাঁড়াইলাম। তিনি তখন বানو আমর ইبنুল মুআম্মাল-এর একজন দাসীকে গলা ধরিলেন। দাসীটি তাহার হাতের মধ্যে নিস্তেজ হইয়া পড়িল। ইহা দেখিয়া আমি বলিলাম، দাসীটি মারা গিয়াছে। অতঃপর আবূ বাকر (را) তাহাকে ক্রয় করিয়া আযاد করিয়া দেন। (আশ-শামী، ۲খ، ৩৬۱)।
۸. যিন্নীরা، এক বর্ণনামতে যানবারা আর-রূমিয়্যা উমার ইবনুল খাত্তاب ও আবূ জাহল দুইজনে মিলিয়া তাঁহাকে শাস্তি দিত। আবূ জাহل বলিত، তোমরা কি মুহাম্মاد ও তাঁহার এই অনুসারীদের সম্পর্কে বিস্ময়বোধ কর না؟ মুহাম্মاد যাহা আনিয়াছে তাহা যদি সত্য হইত আর তাহাতে যদি কল্যাণ থাকিত তবে কখনও ইহারা আমাদের পূর্বে তাহা গ্রহণ করিতে পারিত না। যিন্নীরা কি হিদায়ات ও কল্যাণের প্রতি আমাদের পূর্বেই পৌছিয়া গিয়াছে؟ সে কে তাহা তো দেখিতেছ! তাহাদের নির্যাতনের ফলে যিন্নীরা অন্ধ হইয়া গিয়াছিল। ইহা দেখিয়া ابو জাহل বলিল، লাত ও উযযা তোর এই অবস্থা করিয়াছে। দাসীটি অন্ধ অবস্থায়ই বলিল، তোমার কি জানা আছে লাত ও উযযা সম্পর্কে؟ কে তাহাদের ইবাদত করে؟ বরং ইহা তো এমন একটি বিষয় যাহা আল্লাহ্র পক্ষ হইতে হইয়াছে। ইبن হিশام-এর বর্ণনামতে সে বলিল، তাহারা মিথ্যা বলিয়াছে। আল্লাহ্র গৃহের কসম! লাত ও উযযা কোন ক্ষতিও করিতে পারে না، উপকারও করিতে পারে না (আস-সীরা، ১খ، ২৪۵)। আমার প্রতিপালক আমার চক্ষু ফিরাইয়া দিতে সক্ষম। সেই রাত্রিতেই আল্লাহ্ তাআলা তাঁহার দৃষ্টিশক্তি ফিরাইয়া দিলেন। তখন কুরায়شগণ বলিল، ইহা তো মুহাম্মাদের একটি যাদু। অতঃপর আবূ বাকر (را) তাঁহাকে ক্রয় করিয়া আযاد করিয়া দিলেন (আশা-শামী، ۲খ، ৩৬۱؛ আল-কাসতাল্লানী، আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা، ১খ، ২৩۸-৩৯؛ ইবনুল আছীর، উسdul-gaba، ৫খ، ৪৬۲)।
۹. উمم'উনায়س متانتরে উবায়سঃ তিনি ছিলেন বানو যুহরা গোত্রের দাসী। ইসলাম গ্রহণের কারণে আসআد ইبن আব্দ ইয়াগৃছ তাঁহাকে শাস্তি দিত। আবূ বাকر (را) তাঁহাকে ক্রয় করত আযاد করিয়া দেন (ইبنুল-আছীর، উسdul-gaba، ৫খ، ৬০۱؛ আল-কাসতাল্লানী، পাদটীকা)।
۱۰-۱۱. আন-নাহديয়া ও তাঁহার কন্যাঃ তাঁহারা উভয়ে ছিলেন বানو নাহد ইبن যায়দ-এর উمم'উয়ালাদ। অত:পর তাঁহারা বানو আবদিد-دار এর এক মহিলার দাসী হন। উক্ত মহিলা তাঁহাদিগকে শাস্তি দিত এবং বলিত، আল্লাহ্র কসম! আমি তোমাদিগ ছাড়িব না অথবা যে তোমাদিগ ধর্মান্তরিত করিয়াছে সে আযاد করিয়া দিবে। আবূ বাকر (را) তখন তাঁহাদের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। সে মহিলা তখন তাহাদিগকে কোন জিনিস ভাঙাইতে বা চুরাইতে পাঠাইয়াছিল। সে তখন বলিতেছিল، আল্লাহ্র কসম! আমি কখনও তোমাদিগ মুক্ত করিব না। আবূ বাকر (را) বলিলেন، হে অমুকের মাতা! তোমরা কসম ভঙ্গ কর। মহিলাটি বলিল، তুমিই ভঙ্গ কর। আল্লাহ্র কসম! তুমিই তাহাদিগকে নষ্ট করিয়াছ। তাই তুমিই তাহাদিগকে মুক্ত করিয়া দাও। তিনি বলিলেন، দুইজন কত মূল্যে؟ মহিলাটি বলিল، এত এত মূল্যে। আবূ বাকر (را) বলিলেন، উক্ত মূল্যে আমি ইহাদিগকে ক্রয় করিলাম। এখন তাহার উক্ত জিনিস ফেরৎ দাও। তাহারা বলিল، হে ابو বাকور! আমরা তাহার জিনিস ঢুকাইয়া দিয়া তবে মুক্ত হইব। আমরা তাহার হাত হইতে মুক্তি পাইলাম। আবার তিনি বলিলেন، তোমাদের যাহা ইচ্ছা তাহাই কর (ইبن হিশাম، আস-সীরা، ১খ، ৩৪۵-৪৬؛ আশ-শামী، ۲খ، ৩৬۱)।
১২. বিলাল (را)-এর মাতা হামামা (রা): ইبن আবদিل বারر তাঁহার আদ-দুরار গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন যে، তাঁহাকে আল্লাহর প্রতি ঈمان আনার কারণে শান্তি প্রদান করা হইত। অতঃপর ابو বাকر (রা) তাঁহাকে ক্রয় করত আযاد করিয়া দেন (ইبن ابديل بارر، আদ-দুরار فী ইখতিসারিল মাগাযী ওয়াস সিয়ার، পৃ. ৪৮)।
আবূ বাক্ (রা)-এর অবদান ও তাঁহার পিতার তিরস্কার : কাফিরদের নির্মম নির্যাতন হইতে অসহায় মুসলমানদিগকে রক্ষা করিবার জন্য আবূ বাকور (রা) অকাতরে অর্থ ব্যয় করেন এবং বিলাল ও তাঁহার মাতা হামামা، আমর ইبن ফুহায়রা، উمم'উনায়স، আবূ ফুকায়হা، যিন্নীরা، বানو মু'আম্মাল-এর দাসী আন-নাহديয়া ও তাঁহার কন্যা প্রমুখ ব্যক্তিবর্গকে তিনি কাফির মালিকদের নিকট হইতে ক্রয় করত মুক্ত করিয়া দেন। তাঁহার এইসব কর্মকাণ্ড দেখিয়া তাঁহার পিতা ابو কুহাفا তাঁহাকে বলিলেন، বৎস! আমি দেখিতেছি তুমি বহু অসহায় দাস ক্রয় করত মুক্ত করিয়া দিতেছ। তোমার যদি তাহা করিতেই হয় তবে শক্তিশালী পুরুষদিগকেই ক্রয় করত মুক্ত করিয়া দাও، যাহারা তোমাকে সাহায্য করিতে পারিবে। ابو বাকكر (রা) বলিলেন، হে পিতা! আমি তো ইহা কেবল মহান আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্যই করি (আদ-দুরار، পৃ. ৪৮؛ ইبن হিশাম، আস-সীরা، ১খ، ৩৪৬؛ আশ-শামী، ২خ، ৩৬۲)। তখন আল্লাহ তা'আلا এই আয়াত নাযিল করিলেন:
فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى، وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَى. وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى فَسَنُيَسِرُ لِلْعُسْرَى. وَمَا يُغْنِي عَنْهُ مَالُهُ إِذَا تَرَدُّى إِنَّ عَلَيْنَا للهُدى. وَإِنَّ لَنَا لِلْآخِرَةَ وَالْأُولَى فَانْذَرْتُكُمْ نَاراً تَلظى. لا يَصْلُهَا إِلَّا الْأَشْقَى الَّذِي كَذَّبَ وَتَوَلَّى، وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى. الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّى. وَمَا لِأَحَدٍ عِنْدَهُ مِنْ نِعْمَةٍ تُجْزَى إِلا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِ الْأَعْلَى، وَلَسَوْفَ يَرْضَى.
"সুতরাং কেহ দান করিলে، মুত্তাকী হইলে এবং যাহা উত্তম তাহা গ্রহণ করিলে আমি তাহার জন্য সুগম করিয়া দিব সহজ পথ। আর কেহ কার্পণ্য করিলে ও নিজকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করিলে আর যাহা উত্তম তাহা বর্জন করিলে তাহার জন্য আমি সুগম করিয়া দিব কঠোর পরিণামের পথ এবং তাহার সম্পদ তাহার কোন কাজে আসিবে না، যখন সে ধ্বংস হইবে। আমার কাজ তো কেবল পথনির্দেশ করা، আমি তো মালিক পরলোকের ও ইহলোকের। আমি তোমাদিগকে লেলিহান অগ্নি সম্পর্কে সতর্ক করিয়া দিয়াছি؛ উহাতে প্রবেশ করিবে সে যে নিতান্ত হতভাগ্য، যে অস্বীকার করে ও মুখ ফিরাইয়া লয়। আর উহা হইতে বহু দূরে রাখা হইবে পরম মুত্তাকীকে যে স্বীয় সম্পদ দান করে আত্মশুদ্ধির জন্য এবং তাহার প্রতি কাহারও অনুগ্রহের প্রতিদানে নহে، কেবল তাহার মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টির প্রত্যাশায়؛ সে তো অচিরেই সন্তোষ লাভ করিবে” (৯২:৫-২১)।