📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ১০. ও ১১. নুবায়হ ও মুনাব্বিহ

📄 ১০. ও ১১. নুবায়হ ও মুনাব্বিহ


ইহারা ছিল দুই সহোদর। তাহাদের পিতার নাম ছিল হাজ্জাজ। ইহারাও ছিল আল্লাহ্ নবীর প্রাণের শত্রু। যখনই নবী করীম (স)-কে দেখিতে পাইত তখনই দুই ভাই তাঁহাকে বিদ্রূপ করিয়া বলিত, বাহ্! রসূল বানাইবার জন্য ইনি ছাড়া আল্লাহ বুঝি আর কাহাকেও খুঁজিয়া পাইলেন না! বদর যুদ্ধে এই দুই হতভাগাও নিহত হয়।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ১২. আসওয়াদ ইবনুল মুত্তালিব

📄 ১২. আসওয়াদ ইবনুল মুত্তালিব


আসওয়াদ, তাহার বন্ধুবান্ধব ও সহচররা যখনই নবী করীম (স)-কে দেখিতে পাইত, তখনই চক্ষু টিপিয়া ইশারা করিত এবং তাঁহাকে শুনাইয়া বলিত, ঐযে! ঐ ব্যক্তিই গোটা পৃথিবীর রাজত্বের অধিকারী হইবেন, রোম সম্রাট কায়সার এবং ইরান সম্রাট কিসরার রাজকোষ দখল করিবেন। এরূপ বিদ্রূপাত্মক বাক্যবাণ প্রয়োগের সাথে সাথে তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া শিশ এবং হাততালি দিত। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে অন্ধ করিয়া দেওয়ার এবং তাহার পুত্রের মৃত্যুর বদু'আ করেন। সত্যসত্যই আসওয়াদ অন্ধত্ববরণ করে এবং তাহার পুত্র বদর যুদ্ধে নিহত হয়। কুরায়শরা যখন উহুদ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেছিল তখন আসওয়াদ মৃত্যুশয্যায়। কিন্তু ঐ মৃত্যুশয্যা হইতেও সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে স্বগোত্রকে যুদ্ধের উস্কানী দিয়া যাইতেছিল। কিন্তু উহুদ যুদ্ধের পূর্বেই তাহার মৃত্যু হয়।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ১৩. আসওয়াদ ইব্‌ন আবদে ইয়াগৃছ

📄 ১৩. আসওয়াদ ইব্‌ন আবদে ইয়াগৃছ


সম্পর্কে লোকটি ছিল নবী করীম (স)-এর মামাতো ভাই। তাহার পিতা আবদে ইয়াগুছ ছিলেন মা-আমিনার আপন ভাই। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আসওয়াদ নবী করীম (স)-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের অন্যতম ছিল। সে যখনই দরিদ্র মুসলমানদিগকে দেখতি পাইত, তখন বিদ্রুপ করিয়া বলিত, ঐ ব্যক্তিরাই হইবে গোটা পৃথিবীর বাদশাহ, কিসরা কায়সারের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী! মহানবী (স)-কে দেখামাত্র উপহাস করিয়া বলিত, 'আচ্ছা, আজ ঊর্ধাকাশ হইতে কোন খবর আসে নাই?' এরূপ বিদ্রূপবার্ণে সে সর্বদা তাঁহাকে জর্জরিত করিত।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ১৪. হারিছ ইব্‌ন কায়স আস-সাহমী

📄 ১৪. হারিছ ইব্‌ন কায়স আস-সাহমী


তাহার পিতার নাম কায়س এবং মাতার নাম ছিল আয়তলা (عطله)। এইজন্য তাহাকে হারিছ ইব্‌ن আয়তলা নামেও অভিহিত করা হইত। এই ব্যক্তিও সর্বদা নবী করীম (স)-এর সাহাবীগণকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিত। সে বলিত, মুহাম্মাদ এই নির্বোধদিগকে মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের কথা বলিয়া প্রতারণা করিতেছে। وَمَا يُهْلِكُنَا الا الدَّهْرُ . "যুগপরিক্রমা ছাড়া আর কিছুই আমাদিগকে ধ্বংস করিবে না"। এই আয়াতে তাহার বক্তব্য উদ্ধৃত হইয়াছে।
তাহাদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ যখন সীমা অতিক্রম করিয়া গেল, তখন আল্লাহ তা'আলা তদীয় নবীকে সান্ত্বনা দিয়া আয়াত নাযিল করিলেন: فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ إِنَّا كَفَّيْنَاكَ الْمُسْتَهْزِنِينَ. "অতএব তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হইয়াছ তাহা প্রকাশ্যে প্রচার কর এবং মুশরিকদিগকে উপেক্ষা কর। তোমার জন্য আমিই যথেষ্ট বিদ্রূপকারীদের বিরুদ্ধে” (১৫: ৯৫-৯৬)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিদ্রূপকারীদের পরিণতি সূরা হিজর-এর ৯৫-৯৬ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তাফসীরের কিতাবসমূহে যাহাদের নাম উল্লিখিত হইয়াছে তাহারা হইতেছেঃ (১) আসওয়اد ইب্‌ن আবদে ইয়াগৃছ, (২) ওয়ালীد ইب্‌ن মুগীরা, (৩) আসওয়اد ইবন 'আবদুল মুত্তালিব, (৪) আস ইব্‌ن ওয়াইল ও (৫) হারিছ ইب্‌ن কায়س। আল্লাহ তা'আলা তাহাদের ঠাট্টা-বিদ্রূপের মুকাবিলার জন্য যথেষ্ট বলিয়া যে সান্ত্বনাবাণী তদীয় প্রিয় রসূলকে শুনাইয়াছিলেন তাহার পরিণতি শিক্ষাপ্রদ।
একবার রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহ্র ঘরের তাওয়াফে রত ছিলেন। এমন সময় হযرت জিবরাঈل ফিরিশতার আগমন ঘটিল। নবী করীম (س) তাঁহার কাছে উক্ত কাফির নেতাদের ঠাট্টা-উপহাসের অনুযোগ করিলেন। এমন সময় ওয়ালীد ইب্‌ن মুগীরা তাঁহাদের পাশ দিয়া অতিক্রম করিতেছিল। নবী করীম (س) বলিলেন: ঐ যে ওয়ালীد ইب্‌ن মুগীরা! জিবরাঈل (আ) তাহার বাহুস্থিত ধমনীর দিকে ইঙ্গিত করিলে রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহাকে ইহার রহস্য কি জিজ্ঞাসা করিলেন। জবাবে তিনি বলিলেন، আমি তাহার জন্য যথেষ্ট।
তারপর আসওয়اد ইবন মুত্তালিব ঐ পথ অতিক্রম করিলে রাসূলুল্লাহ (س) তাহাকে দেখাইয়া দিলেন। জিবরাঈل (س) তাহার চক্ষুর দিকে ইঙ্গিত করিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (س)-এর প্রশ্নের উত্তরে জানাইলেন যে، আমি তাহার জন্য যথেষ্ট। তারপর আসওয়اد ইবন আবদে ইয়াগৃছ আসিলে জিবরাঈل (আ) তাহার মস্তকের দিকে ইঙ্গিত করিলেন এবং পূর্বের মতই রাসূলুল্লাহ (س)-এর প্রশ্নের জবাব জানাইলেন। তারপর হারিছের পালা আসিলে জিবরাঈل (আ) তাহার পেটের দিকে ইঙ্গিত করিলেন এবং পূর্বের মতই রাসূলুল্লাহ (س)-এর প্রশ্নের জবাব জানাইলেন। তারপর 'আস ইবন ওয়াইল সেদিকে অতিক্রমকালে তিনি তাহার পদতলের দিকে ইঙ্গিত করিলেন এবং জানাইলেন যে، তাহার ব্যাপারেও আমি যথেষ্ট।
সত্যসত্যই ওয়ালীد ইب্‌ن মুগীরা খুযা'আ গোত্রের জনৈক তীর প্রস্তুতকারী ব্যক্তির নিকট দিয়া অতিক্রমকালে তাহার বাহুতে তীরের আঘাত লাগে এবং উহার শিরা কাটিয়া যায়। সেই যখমের দিকে জিবরাঈলের ইঙ্গিতমাত্র উহা হইতে রক্তপাত হইতে শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত উহাই তাহার মৃত্যুর কারণ হয়।
আসওয়اد ইবন মুত্তালিব একদা একটি বাবলা গাছের নিচে উপবিষ্ট ছিল। এমন সময় হঠাৎ সে তাহার পুত্রদিগকে লক্ষ্য করিয়া বাঁচাও! বাঁচাও বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল। সে বলিল، আমার কাছে মনে হইতেছে، কে যেন আমার চক্ষুর মধ্যে কাটা বিদ্ধ করিতেছে। তাহার ছেলেরা বলিল، কোন লোক তো দেখা যাইতেছে না। এরূপ বলিতে বলিতে আসওয়اد অন্ধ হইয়া গেল।
আসওয়اد ইب্‌ن আবদে ইয়াগৃছের মাথার দিকে জিবরাঈل (আ) ইঙ্গিত করামাত্র তাহার মস্তকে পাঁচড়া দেখা দিল এবং এই রোগেই শেষ পর্যন্ত তাহার মৃত্যু হয়।
হারিছ ইব্‌ن কায়সের পেটে এমন ব্যাধি দেখা দিল যে، তাহার মুখ দিয়া পিত্তের পানি নির্গত হইতে লাগিল। ইহাতেই সে মারা যায়।
সূরা আল-আন'আমে আল্লাহ তা'আলা বলেন : "এইরূপে আমি প্রত্যেক জনপদে তথাকার অপরাধীদের প্রধানদিগকে সেখানে চক্রান্ত করার অবকাশ দিয়াছি। কিন্তু তাহারা শুধু তাহাদের নিজেদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে، অথচ তাহারা উপলব্ধি করে না। যখন তাহাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে তাহারা তখন বলে، 'আল্লাহ্র রাসূলগণকে যাহা দেওয়া হইয়াছিল আমাদিগকেও তাহা না দেওয়া পর্যন্ত আমরা কখনও বিশ্বাস করিব না।' আল্লাহ তাঁহার রিসালাতের ভার কাহার উপর অর্পণ করিবেন তাহা তিনিই ভাল জানেন। যাহারা অপরাধ করিয়াছে، চক্রান্তের জন্য আল্লাহর নিকট হইতে লাঞ্ছনা ও কঠোর শাস্তি তাহাদের উপর আপতিত হইবেই" (৬:১২৩-১২৪)।
উপরিউক্ত ঘটনায় বিবৃত কাফির সর্দারদের পরিণতি ছিল আল্লাহ্ অমোঘ বাণীরই নিখুঁত ও অভ্রান্ত বাস্তবায়ন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00